গোধুলীলগ্নে গলির সামনে ফারাবীর মুখে সজোরে চড় বসিয়ে দেয় মেহুল। ছেলেটার সাহস হয় কি করে তার মতো বিবাহিত নারীকে প্রেম নিবেদন করার। বলা নেই, কওয়া নেই, আকস্মিক ভাবেই ছেলেটা তার পথ আটকেছে। শুধু তাই নয় কি সাহস তার! সে কি না বলে,

 — “মেহুল, আমি আপনাকে ভালোবাসি”

মেহুল রাগে কাঁপছে। সে ক্ষীপ্র দৃষ্টি তাক করে আছে সে ফারাবীর দিকে। অদৃশ্য লহমান শিখা বের হচ্ছে তার দৃষ্টি থেকে। যেনো ছেলেটিকে দৃষ্টি দিয়েই পুড়িয়ে দিবে মেহুল। তীব্র রোষের সাথে বলে সে,

 — “তোমার স্পর্ধা দেখে আমি অবাক হচ্ছি। সাহস হয় কি করে আমাকে আজেবাজে প্রস্তাব দেবার?”

 — “স্পর্ধা তো অন্যায় করতে লাগে মেহুল, আমি তো অন্যায় করি নি। আমি কেবল আপনাকে ভালোবেসেছি। তাও নিস্পাপ, নিষ্কলুষিত ভালোবাসা। এতে কোনো অন্যায় নেই নিশ্চয়ই?”

ছেলেটির নির্লিপ্ত কথা আরো ক্ষিপ্র করে তোলে মেহুলকে। নিস্পাপ ভালোবাসা! একজন বিবাহিত নারীকে ভালোবাসা নিস্পাপ হয় কি আদৌ? অসম্ভব। মেহুল দ্বিগুন ক্ষিপ্ত স্বরে বলে,

 — “কোনটাকে নিস্পাপ ভালোবাসা বলে ফারাবী? একজন বিবাহিত নারীকে ভালোবাসাটা নিস্পাপ? নিষ্কলুষিত?”

মেহুলের প্রশ্নে কিছুক্ষণ মাথা চুলকায় ফারাবী। তারপর নির্বিকার চিত্তে বলে,

 — “আমার ভালোবাসা নিস্পাপ; তার যুক্তি হলো, পূর্বে যখন রাজিব ভাই বেঁচে ছিলেন আমি কখনোই আপনাকে এমন নজরে দেখি নি। রাজিব ভাই মারা গেছেন তিন বছর হয়ে গিয়েছে। অথচ আপনাকে আমি এই ছয় মাস যাবৎ ভালোবাসতে শুরু করেছি। তাই আমার ভালোবাসাকে অসম্মান করবেন না দয়া করে।”

ফারাবীর কন্ঠের দৃঢ়তা অবাক করলো মেহুলকে। ছেলেটা কতটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে কথাটা বলছে, যেনো দোষটা মেহুলের। মেহুল ভ্রু কুঞ্চিত করে, মুখ খিঁচিয়ে মনোযোগ দিয়ে কিছুক্ষণ ফারাবীর দিকে চাইলো। একই গলিতে থাকার দরুন ফারাবীকে সে ভালো করেই চিনে। রাজীব অর্থাৎ তার স্বামীর গলির আড্ডামহলের একজন ফারাবী। রাজীবের সাথে তার সম্পর্কটাও ছিলো খুব মিহি। রাজীবের মৃত্যুর পর ছেলেটা তাদের পরিবারকে নানা ভাবে সাহায্য করেছে। রাজীবের পরিবারে আয়ের উৎস কেবল রাজীব ই ছিলো। তার অকাল মৃত্যুতে পরিবারটি একেবারেই তাল হারিয়ে ফেলে। বৃদ্ধ শ্বশুরের পেনসনের টাকায় সংসার এবং ননদ রিমির পড়াশোনা যেনো হিমসিম খাচ্ছিলো। তখন মেহুল ফারাবীর কাছে সাহায্য চেয়েছিলো যেনো একটা ছোট খাটো চাকরীর ব্যাবস্থা করে। বি.এ পাশ বিধায় একটা এন.জি.ও তে চাকরির ব্যাবস্থা ফারাবী করে দেয়। ফারাবীর প্রতি চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকবে মেহুল। কিন্তু তার এই অন্যায়, অযৌক্তিক আবদারখানা কোনো সময় ই মেনে নিবে না। মেহুল রুদ্ধশ্বাস ফেলে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে ফারাবী শান্ত গলায় বলে,

 — “উত্তর খানা বাকি রয়ে গেলো কিন্তু মেহুল। সমস্যা নেই, আমি অপেক্ষা করবো”

মেহুল উত্তর দিলো না। ক্রোধিত চিত্তে হনহন করে গলির পানে হাটা শুরু করলো। ফারাবী ব্যথিত নয়নে মেহুলের দিকে চেয়ে রইলো। তার ভালোবাসাটা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সে জানে এই ভালোবাসা সে দূর আকাশের রুপালি চাঁদটির ন্যায়। যাকে দূর থেকে দেখা যায় ঠিক ই, মুগ্ধ নয়নে তাকে নিয়ে হাজারো রঙ্গতুলির আঁকিবুঁকির রেখা টানা যায় কিন্তু সেই চাঁদকে ছোয়া যায় না। আলিঙ্গন তো দূরে থাকুক। মেহুলের প্রতি তার ভালোবাসাটা নোংরা নয়। ভালোবাসা তো নোংরা হয় না; সেটা নিস্কলুষ, দাগহীন, স্বচ্ছ। হ্যা মেহুল বিবাহিত, সে তার বন্ধুসুলভ পাঁড়ার ভাই এর বিধবা স্ত্রী। কিন্তু ভালোবাসায় তো কোনো জোর নেই। নেই কোনো জবরদস্তি। প্রেম এমন ই এক অনুভূতি যা ক্রর, কঠিন হৃদয়কেও মোমের ন্যায় গলিয়ে দেয়। মেহুলকে ঠিক কবে থেকে ভালোলাগা শুরু হয়েছে জানে না ফারাবী। তবে এটুকু জানে মেয়েটার স্বচ্ছ চোখজোড়ায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে তার খুব ভালো লাগে। ইচ্ছে হয় সেই জোড়া কেবল তাকে দেখবে। শুরু তাকেই চাইবে। ফারাবী আকাশের পানে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। নীল আকাশটা কমলা রঙ্গে নিজেকে রাঙ্গিয়েছে। একটু পর ই তীব্র অন্ধকারে তা নিকষকৃষ্ণ হয়ে উঠবে। হাজারো তারা জোনাকীর ন্যায় জ্বলজ্বল করে উঠবে তখন। থালার ন্যায় রুপালী চাঁদটা উম্মোচিত হবে গগণে। প্রতিনিয়ত আকাশ বদলায়, প্রকৃতি বদলায় তবে মানুষের বদলাতে কি দোষ! ফারাবী জানে মেহুল একা, ফারাবী জানে মেহুলের ও কষ্ট হয়। কত বা বয়স মেয়েটির! পঁচিশ বা ছাব্বিশ বড় জোর। একাকীত্ব তাকেও গ্রাস করে প্রতিনিয়ত। নিঝুম নির্ঘুম রাতে সে যখন ছাঁদের রেলিং ঘেষে বাতাসে চুল ছাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, হয়তো তার ও ইচ্ছে হয় কেউ তাকে নিজের উষ্ণ আলিঙ্গনে আবদ্ধ করুক, কেউ তার চুলে হাত ঘুরাক, কেউ জিজ্ঞেস করুক —- “তুমি ভালো আছো তো কাজললতা?         

মেহুলের ক্লান্ত পা জোড়ার সিড়ি বেয়ে উঠতে কষ্ট হচ্ছে। হাতে থাকা পলিথিনের ব্যাগটার ভারে বান হাতটা ব্যাথা করছে ঈষৎ। আর ডান হাতটা জ্বলছে। ফারবীকে হয়তো একটু জোড়েই আঘাত করেছিলো সে। মেহুল হাতটা অবলোকন করে, লাল হয়ে গিয়েছে অনেকটা। আচ্ছা, ছেলেটি এতোটা নির্বিকার কিভাবে ছিলো! তার কি একটু ও ব্যাথা লাগে নি? একটুও কি বিচলিত হয় নি হৃদয়? ফারাবীর কথা ভাবতেই নিজেকে জোরে বকে দিলো মেহুল। অসম্ভব! সে কখনই একটা বেয়াদব ছেলের কথা চিন্তা করবে না। যে ছেলে তার বন্ধুর স্ত্রীকে নির্লজ্জের মতো বলে ভালোবাসে তার প্রতি আবার কি দরদ! মেহুল মাথা ঝাকিয়ে কলিংবেল বাজালো। দরজা খুললো রিমি। রিমির মুখে অসন্তোষের ছাপ। তিক্ততা মুখ চুয়ে পরছে যেনো। মেহুল যেদিকে লক্ষ্য না করেই ভেতরে চলে যায়। বাজারের পলিথিনটি খাবার টেবিলে রেখে চেয়ারে আয়েশ করে বসে সে। রিমির সূচালো দৃষ্টি এখনো মেহুলকেই দেখে যাচ্ছে। মেহুল পানির গ্লাসটা হাতে নিতে নিতে বললো,

 — “কিছু বলবে রিমি?”

 — “ভাবী, তুমি যা করছো তা বাবা-মা জানলে তাদের মুখ দেখাতে পারবে তো?”

মেহুল পানিটুকু খেতে যেয়েও খেলো না। ভ্রু কুচকে তাকালো রিমির দিকে। অবাক স্বরে বললো,

 — “আমি কি করছি?”

 — “ভাইয়া নেই বলে ভুলে যেও না যে তুমি একজন বিবাহিতা। ফারাবী ভাই এর সাথে তোমার মেলামেশাটা বেশ চোখে লাগছে। ভুলে যেও না আমাদের গলিটা কিন্তু খুব ছোট।”

রিমি এতোটুকু বলেই ভেতরে চলে গেলো। মেহুলের বুঝতে বাকি রইলো না ঘটনা কি! রিমি তাকে এবং ফারাবীকে একসাথে দেখেছে। তাই তাকে সর্তক করে গেলো। মেহুল সেখানেই বসে থাকে। ক্লান্ত শরীরটা যেনো অনড় হয়ে রয়েছে। ভালো লাগছে না কিছুই। কি দরকার ছিলো ফারাবীর আজ এমন কিছু করার! সব তো ঠিক ই ছিলো, মেহুল তো ভালোই ছিলো। বেঁচে ছিলো         

তিনদিন পর,

জামান সাহেব অর্থাৎ মেহুলের শ্বশুর বিকালের হাটাহাটি শেষ করে বাড়ি ফিরলেন খুশি মনে। তার খুশি মুখটি দেখে তার স্ত্রী মুনমুন বেগম আপ্লুত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,

 — “কি গো! এতোটা খুশির কারণ কি?”

 — “খুশির খবর আছে গিন্নী। বসো বলছি”

মুনমুন বেগম পাশে বসলেন। জামান সাহেব গদগদ কন্ঠে বললো,

 — “আজ করিম ভাই এর সাথে দেখা হলো জানো তো! কথায় কথায় ফারাবীর কথা তুললেন। ছেলেটা বেশ ভালো চাকরী করছে। ভালো মাইনেও পায়। আমাদের রিমি ও কম বড় হয় নি। তাই উনি ফারাবীর জন্য রিমির কথা বলছিলো। আমি উনাদের আগামীকাল বিকেলে আসতে বলেছি”

 — “বাহ! এতো খুব ভালো কথা, রাজীব যাবার পর ছেলেটা আমাদের খুব সাহায্য করেছে। ভালোই হলো। একটা ভালো ছেলের সাথে রিমির বিয়ে হলে আমরা নিশ্চিন্ত হতে পারি। ছেলেটা তো হুট করেই চলে গেলো। এখন মেয়েটা খুশি থাকলেই হয়”

মুনমুল বেগমের আক্ষেপের কন্ঠ জামান সাহেবকেও আবেগপ্রবণ করে তুললো। ছেলেটা সত্যি অকালেই তাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে। কি স্বাদ করে ঘরে বউ তুলেছিলো। অথচ হুট করেই হৃদরোগে আক্রান্ত হলো ছেলেটা। চিকিৎসা করার ও সুযোগ দিলো না সে। তাদের কথা গুলো মেহুলের কান অবধি ঠিক পৌছালো। খুশির সংবাদ বটেই কিন্তু কেনো যেনো অস্বস্তিতে হৃদয় ভরে উঠলো। কারণটা সত্যি তার জানা নেই।

পরদিন,

বিকালের দিকে ফারাবী এবং তার পিতা মাতা আসলো মেহুলদের বাড়ি। জামান সাহেব এবং মুনমুন বেগমের আপ্পায়নের কমতি রইলো না। করিম সাহেব অর্থাৎ ফারাবীর বাবা উৎফুল্ল স্বরে বললেন,

 — “ভাই এতো আয়োজনের কি দরকার ছিলো? আর আমাদের মেয়েটা কোথায়? রিমি মা কে ডাকুন”

মুনমুন বেগম হাসি মুখে বললেন,

 — “মেহুল নিয়ে আসছে ভাই। আপনারা সিঙ্গারা নিন।”

ফারাবী শক্ত হয়ে বসে রয়েছে। তার মুখশ্রীতে কোনো ভাবলেশ মাত্র নেই। হাজার বার মানা করবার পর ও আজ জোর করে তাকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। মা মাথার কসম না দিলে সে কখনোই আসতো না। এর মাঝেই মেহুল রিমিকে দিয়ে ঘরে প্রবেশ করে। হালকা বাদামী সালোয়ার কামিসে চমৎকার লাগছে মেহুলকে। মাথায় ঘোমটা দিয়ে রয়েছে সে। কোনো সাজগোজের বালাই নেই। শ্যাম মুখখানায় মলিনতা এটে রয়েছে। ফারাবী মুগ্ধ নয়নে মেহুলকে দেখছে। তার হৃদয়টা বিচলিত হয়ে আছে। মেহুলের একটি বার ও খারাপ লাগছে না? সে তো জানে ফারাবী রিমি নয় তাকে ভালোবাসে! কথাগুলো ভাবতেই হৃদয়ের যন্ত্রণাটা তীক্ষ্ণ রুপ নিলো। ফারাবী চোখ নামিয়ে নিলো। হাট মুষ্টিবদ্ধ করে বসে রইলো। এদিকে, বিয়ের কথা এগুতে লাগলো। ফারাবীর মা শেফালী বেগম রিমির পাশে গিয়ে বসলেন। তার কপালে চুমু একে বললেন,

 — “মেয়ে আমাদের বরাবর ই পছন্দ, আমি তো আজ ই রিমিকে আংটি পড়াতে চাই ভাই। কি মত আপনার?”

জামান সাহেবের মুখে প্রসন্নতার হাসি। এদিকে ফারাবী আড়চোখে চাইলো মেহুলের পানে। মেয়েটির মুখে বিস্তৃত হাসিটি দেখে তার রাগ হলো। নিজেকে কিছুতেই আটকে রাখতে পারলো না সে। শান্ত কন্ঠে বলে উঠলো,

 — “আমার কিছু কথা ছিলো মা……..

চলবে

বেলা শেষে

সূচনা পর্ব

মুশফিকা রহমান মৈথি

বেলা শেষে (কপি করা নিষেধ)

২য় পর্ব

করিম সাহেবের মুখশ্রী লজ্জা এবং অপমানে লাল হয়ে গিয়েছে নিজের ছেলের কথাটা শুনে। ফারাবী কাউকে পরোয়া না করেই সবার সামনে বলে উঠলো,

— “আমি এই বিয়ে করতে পারবো না। বিয়েটা যখন আমাকেই করতে হবে তাহলে নিশ্চয়ই আমার মতামতের একটা গুরুত্ব থাকা উচিত, তাই নয় কি? আর এই বিয়েতে আমার কোনো মত নেই। এই বিয়ে হলে না আমি সুখী হবো না রিমি। আমাকে ক্ষমা করবেন আংকেল, ছোট বেলা থেকে আপনাদের সামনেই বড় হয়েছি। আপনাদের অপমান করার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। কিন্তু রিমিকে আমি বিয়ে করতে পারবো না”

ফারাবীর শান্ত কন্ঠের কথাটা উপস্থিত সবাইকে নাড়িয়ে দেয়। জামান সাহেব বিমূঢ় দৃষ্টিতে করিম সাহেবের মুখপানে তাকিয়ে রইলেন। মুনমুন বেগম ফারাবীর এমন আচারণে বেশ অবাক হলেন। মেহুলের কৌতুহল দৃষ্টিতে ফারাবীর মুখপানে তাকিয়ে রইলো। করিম সাহেব তীব্র স্বরে বললেন,

— “কি ফাজলামি হচ্ছে ফারাবী?”

— “ফাজলামি করতে যাবো কেনো বাবা? আমাকে দেখে কি তোমার মনে হচ্ছে এতোটা গম্ভীর সময়ে আমি ফাজলামি করবো?”

— “তোমার যদি এতোই আপত্তি তবে প্রথমেই বলতে পারতে?”

— “মাকে বলেছি, কিন্তু মা আমলে নেয় নি। আর পরে ভাবলাম এক ঢিলে দু পাখি মারা হবে। তাই এখানে আসা”

— “খোলশা করে বলবে কি?”

ফারাবী ফোশ করে নিঃশ্বাস ফেললো, তারপর আড়চোখে মেহুলের পানে চাইলো। মেহুল ভীত দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে তার দিকে। মেহুলের মুখশ্রীতে ভয়ের ছাপটা ঠিক আন্দাজ করে নিলো ফারাবী। ফারাবী দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত কন্ঠে বললো,

— “আমি মেহুলকে ভালোবাসি, মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসি। আমি তাকে ব্যাতীত কাউকে বিয়ে করতে পারবো না। তোমরা যদি বিশ্ব সুন্দরীও আমার সম্মুখে এনে দাও তাকে আমার ভালো লাগবে। কিন্তু সমস্যা হলো মেহুল আমার প্রেম নিবেদনকে নাখোচ করে দিয়েছে। এখন আপনারাই বলেন, আমি যদি রিমিকে বিয়ে করি সে বা আমি কি সুখী হবো? কখনোই না। আমি রিমিকে মন থেকেই মেনে নিতে অক্ষম, তাহলে এই বিয়েটা তো মূল্যহীন। তাই এই বিয়েটা আমি করবো না।“

রিমি আড় চোখে মেহুলের দিকে চাইলো। মেহুল নতমস্তকে দাঁড়িয়ে আছে। লজ্জায় মুখখানা লাল হয়ে গিয়েছে তার। মাটির ভেতরে ঢুকে গেলে হয়তো মুক্তি পেতো এই লজ্জার থেকে। জামান সাহেব বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। মুনমুন বেগম চোখ মুখ খিঁচিয়ে বলে উঠলেন,

— “তোমার মাথা ঠিক আছে তো ফারাবী? কোথায় কি কথা বলা উচিত তার বোধজ্ঞান কি হারালে নাকি?”

— “আমি অনুচিত কোনো কথা বলি নি আন্টি, আমি শুধু সত্যিটা বললাম। আমি মেহুলকে ভালোবাসি। তার অতীত যেমন হোক না কেনো আমার আপত্তি নেই। সবার জীবনে এগিয়ে যাবার অধিকার রয়েছে, সবার ভালোবাসা পাবার অধিকার আছে। তদ্রুপ মেহুলের ও অধিকার রয়েছে এই বেরঙ জীবনের ইতি টেনে নতুন করে সব শুরু করা। আমি তো অযৌক্তিক কোনো কিছু বলি নি। যদি মেহুল রাজী থাকে আমি মেহুলকে এক কাপড়ে বিয়ে করতে রাজী”

করিম সাহেব নিজের ছেলের কন্ঠের দৃঢ়তা দেখে অবাক হলেন। তার শরীর রাগে কাঁপছে, ছেলের স্পর্ধা দিনদিন আকাশ ছুয়ে যাচ্ছে। এমনটা চলতে থাকলে লোকের সামনে মুখ দেখাতে পারবে না তারা। শেষমেশ কি না একটা বিধবা মেয়েকে বিয়ে করবে তার ছেলে। মেয়ের কি অভাব? এই মেয়েই কেনো? এর মাঝেই মুনমুন বেগম বলে উঠলেন,

— “করিম ভাই, ছেলেকে দিয়ে এভাবে অপমানিত না করালে তো পারতেন? এতো বছরের সম্পর্ক এক দিনেই শেষ করে দিলো আপনার ছেলে। আমাদের বাড়ির বউকে এভাবে লাঞ্চিত করার কি মানে?”

মুনমুন বেগমের কথায় ফারাবী অবাক কন্ঠে বললো,

— “লাঞ্চিত? আমি লাঞ্চিত করেছি মেহুলকে? আমি হতবাক আন্টি। ভালোবাসা কি লাঞ্চিত করা?”

— “করছো না? নয়তো কেনো আমাদের বউ এর নামে বাজে কথা বলছো? সবাই তো ওকেই দোষ দিবে”

— “আমি তো স্পষ্ট করেই বললাম, আমি ওকে বিয়ে করতে রাজী”

মেহুল আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। ছুটে অন্দরে চলে গেলো সে। ফারাবী মেহুলের যাবার পানে চেয়ে রইলো, আটকাতে চেয়েও পারলো না। সেই অধিকার যে তার নেই। মেহুল ঘরের দরজা দিলো। মাটিতে নতজানু বসে চোখের পানি ছেড়ে দিলো। কি দরকার ছিলো ফারাবীর এমনটা করার! ভালোই তো ছিলো সে, বেরঙ জীবনটাকে তো বরণ ই করে নিয়েছে। তবে কেনো ফারাবী সব এলোমেলো করতে উদগ্রীব হয়ে রয়েছে। সে চায় না নতুন করে কিছু। করিম সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। নিজের স্ত্রীকে কড়া স্বরে বললেন,

— “শেফালী চলো, এখানে বসে অপমানিত হবার ইচ্ছে নেই আমার।“

ফারাবী আর বসে রইলো না, তীব্র যন্ত্রনায় বুক জ্বালা করছে তার। কেনো যেনো নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে তার। সে কি সত্যি মরীচিকার পেছনে ছুটছে!

বাসায় প্রবেশ করতেই হুংকার ছাড়লেন করিম সাহেব, 

— “তোমার কি আক্কেল জ্ঞান নেই ফারাবী? এতো মেয়ে থাকতে শেষ পর্যন্ত একটা বিধবা মেয়েকে তোমার মনে ধরলো? একবার চিন্তা করে দেখেছো আমার মান সম্মানের কথাটা? জামান ভাইয়ের সামনে আমার মুখ দেখানোর উপায় রাখো নি তুমি”

— “আমার সাথে বিয়ে করে যদি রিমি সুখী না হতো, তখন মুখ দেখাতে পারতে তো? 

ফারাবীর প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেন না করিম সাহেব। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। করিম সাহেবের ক্ষুদ্ধ নজর ফারাবীকে বারংবার প্রশ্নবিদ্ধ করতে লাগলেন। ফারাবী সেই নজরকে উপেক্ষা করে বললো,

— “একটা কথা স্পষ্ট জানিয়ে দিতে চাই বাবা, বিয়ে করলে মেহুলকেই করবো। এ ব্যতীত আমি কোনো মেয়েকে নিজের দুনিয়াতে প্রবেশ করাবো না”

কথাটা বলেই হনহন করে নিজের ঘরে চলে গেলো ফারাবী। করিম সাহেব শেফালী বেগমকে বললেন,

— “দেখলে ছেলের স্পর্ধা?”

— “ও কিন্তু ভুল কিছু বলে নি”

নিজ স্ত্রীর নির্লিপ্ত কথায় আরোও চটে গেলেন করিম সাহেব। হিনহিনে স্বরে বললেন,

— “তুমি ওর এমন কাজে সায় দিচ্ছো?”

— “অন্যায় তো করে নি সে, আর মেহুল মেয়েটিকে আমার মন্দ লাগে না। রাজীব মারা যাবার মর থেকে মেয়েটা এক হাতে সংসারটাকে চালাচ্ছে, এমন মেয়ে আমার বাড়ি বউ হয়ে এলে মন্দ হবে বলে মনে হচ্ছে না”

করিম সাহেবের রাগ আসমান ছুলো, নিচুস্বরে “যতসব” বলেই উনি নিজ রুমে চলে গেলেন। শেফালী বেগমের মুখে স্মিত হাসি। হাসির কারণটা সে ব্যাতীত কেউ ই জানে না।

****

অফিস থেকে বের হলো ফারাবী। নীল আকাশে কালো মেঘেরা দল বেধে জড় হয়েছে। যেনো শীতের আগমন তাদের পছন্দ হয় নি। তারা হরতাল করবে তাই, সেই হরতালে পৃথিবীর বুকে নেমে আসবে অজস্র বারিধারা। ফারাবী সকালের ফকফকা আকশ দেখে ছাতাটা আনে নি। আর ডিসেম্বরের মাঝপ সপ্তাহে প্রকৃতির এমন মুখ গোমড়া ভাবটা আঁচ করে নি সে। তাই দ্রুত পায়ে এগিয়ে যেতে লাগলো বাসস্ট্যান্ড এর কাছে। ভিজে গেলেই ঠান্ডা লাগবে। তখন অবস্থা ব্যাপক খারাপ হবে। হঠাৎ গতি মন্থর হয়ে গেলো তার। সামনে থাকা নারীটিকে দেখে বিস্ময়ে আত্নহারা হলো ফারাবী। মেহুল নিজে এসেছে তার সাথে দেখা করতে?………

চলবে

মুশফিকা রহমান মৈথি

বেলা শেষে (কপি করা নিষেধ)

৩য় পর্ব

মেহুলের সামনে নতমস্তকে দাঁড়িয়ে আছে ফারাবী। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। বুকের এক কোনায় প্রচন্ড যন্ত্রণা অনুভূত হচ্ছে। মেহুল তার সাথে দেখা করতে এসেছে, ব্যাপারখানা প্রথমে তাকে আনন্দ দিলেও সেই আনন্দ মূহুর্তেই মিয়ে গেছে যখন জানতে পারে মেহুলের আসার উদ্দেশ্য। মেহুল ফারাবীর জন্যই অপেক্ষা রত ছিলো। ফারবী মেহুলকে দেখতে পেয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো তার কাছে। আকুল কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

— “আপনি এখানে? কাজ ছিলো বুঝি?”

মেহুল শান্ত গলায় উত্তর দিলো,

— “আপনার সাথেই দেখা করতে এসেছি”

মেহুলের উত্তরটা তপ্ত খরার একপশলা বৃষ্টির ন্যায় ফারাবীর হৃদয়ের আঙ্গিনায় শীতল পরশ বুলিয়ে দিলো। উচ্ছ্বাসিত চিত্তে সে বললো,

— “আপনি সত্যি আমার সাথে দেখা করতে এসেছেন? আপনার ধারণা নেই আমার কতটা আনন্দ হচ্ছে! চলুন, আমরা কোথাও যেয়ে বসে কথা বলি। এখানে দাঁড়িয়ে থাকাটা ভালো দেখাচ্ছে না।”

— “আমি কোথাও যাবো না। অহেতুক ব্যস্ত হবার প্রয়োজন নেই। আপনার সাথে কিছু কথা আছে। কথাগুলো শান্ত মস্তিষ্কে শুনুন”

ফারাবী এবার কিছুটা দমলো। সকল উৎসাহ মূহুর্তেই যেনো বাস্পায়িত হয়ে গেলো। তার ভ্রু যুগল কুঞ্চিত হয়ে গেলো। বিস্ময়ভরা কন্ঠে বললো,

— “বলুন”

মেহুল ভনীতা বিহীন নির্লিপ্ত কন্ঠে বললো,

— “আমার পক্ষে আপনাকে ভালোবাসা সম্ভব নয় ফারাবী। ভালোবাসাটা জোর করে হয় না। আমি আপনার ভালোবাসাটাকে অপমান করছি না। তবে আপনার ভালোবাসাটা এক পাক্ষিক। এই এক পাক্ষিক ভালোবাসার ভার আমার পক্ষে মেনে দেওয়াটা সম্ভব নয়। আমি রাজীবের স্থানে আপনাকে বসাতে পারবো না। তাই পাগলামীটা এবার ছেড়ে দিন। আপনি বলে ছিলেন, আমি যদি চাই তবে আপনি আমাকে বিয়ে করতে রাজী। কিন্তু আমি চাই না। নিশ্চয়ই এই ভালোবাসার জোরাজোরিতে আমার মতের একটা দাম আছে? তাই নয় কি!”

— “তবে কি আপনি চান আমি রিমিকে বিয়ে করি?”

— “সেটা আপনার ব্যাপার। আমি তাতে কিছুই বলবো না, আমার বলা না বলাতে কিছুই যায় আসে না। তবে আমাকে আপনি ভুলে যান। একটা কথা জানেন তো, জীবন সবকিছু একমুঠোতে দেয় না। কিছু মূহুর্ত, কিছু সুখ মুঠো ছাড়া হবে, হতেই হবে। যাহা চাই তাহা সর্বদা কি পাই! বেলা শেষে জীবনের হিসেবে কিছু খোয়াবোই; এটাই জীবনের নিতান্ত সত্যতা। অতি তিক্ত কিন্তু বাস্তবতা”

মেহুল থামলো। অজানা অনুভূতিগুলো গলায় এসে জমেছে। বিদ্রোহ করছে, কথাগুলো আটকে যাচ্ছে। স্বর কাঁপছে, তার কি তবে কষ্ট হচ্ছে? কেনো হচ্ছে? সে তো ফারাবীকে ভালোবাসে না! তবে কেনো তার এতোটা কষ্ট হচ্ছে! মেহুলের জানতে ইচ্ছে করছে না! শুধু এটুকু জানে সে, এই ভালোবাসাকে সে গ্রহন করতে পারবে না। এটাই চিরন্তন সত্যি। মেহুল ফারাবীর অগোচরে নিজেকে সামলে নিলো। শক্ত গলায় বললো,

— “আশাকরি, আপনি বুঝেছেন। এর পর থেকে আমাকে বিরক্ত করবেন না। অন্যথা আমার রুদ্র রুপ দেখতে বাধ্য হবেন”

মেহুলের কথাগুলো ফারাবীর কর্ণকুহরে ঝংকার তুলছে। বুকের অতলের জল সমুদ্রে এক বিস্তার ঘূর্ণিঝড় বয়ে যাচ্ছে। নিবৃত্ত চিত্ত এক মূহুর্তেই প্রচন্ড আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে উঠলো। এই রক্ত কেউ দেখতে পারে না। কিন্তু এই রক্তক্ষরণে তীব্র যন্ত্রণা রয়েছে যা ফারাবীর শীতল আঁখিজোড়াকে ঝাপসা করে তুললো। আবেগ কন্ঠকে ভারী করে তুললো। সে নতমস্তকেই দাঁড়িয়ে রইলো, নিজের স্বচ্ছ জল গুলো ফেললো অতি সংগোপনে। ছেলেদের নাকি কাঁদতে নেই। কে বলেছে! যতসব পচা মস্তিষ্কের জং ধরা চিন্তাধারা। আরে! তারা কি আইরন ম্যান নাকি! তাদের হৃদয়টাও তো রক্ত মাংসের। সেটায় ও কষ্ট অনুভূত হয়। ফারাবী রুদ্ধশ্বাস ফেলে ভারী কম্পিত স্বরে বললো,

— “চিন্তা করবেন না, আমি আর আপনাকে বিরক্ত করবো না। তবে একটা কথা দিতে পারছি না, সেটা হলো আপনাকে ভুলে যাওয়া। আমি কখনোই আপনাকে ভুলতে পারবো না। আসলে কি বলুন তো! আমরা কেউ পারফেক্ট নই, জীবনে কেউ পার্ফেক্ট হয় না। এটা একটা মিথ। আমি আপনাকে ভালোবেসেছি, কারণ আপনার সামনে আমার কখনো পার্ফেক্ট হবার মেকি অভিনয় টা করতে হয় নি। আপনার সামনে আমি পুরোদস্তুর “আমি” হয়ে থাকতে পেরেছি। পাড়ার দোকানের সামনে থেকে যখন আপনি আমার হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা দেখেও না দেখার ভান করতেন এবং পড়ে এক সময় দেখা হলে স্মিত হেসে বলতেন “সিগারেটটা না খেলেও তো পারেন ফারাবী ভাই, লাঙ্গস তো যাবে” কথাটা স্বল্প কিন্তু ভালো লাগতো। আমাদের মূহুর্তগুলো ক্ষুদ্র, কিন্তু মনের দেয়ালে সোনালী ফ্রেমে বাঁধা। আপনার জন্য সব ভুলে নিজেকে উজার করে দিতেও হয়তো আমি দুবার ভাববো না। রাতের আধারে যখন আপনি ছাদের কর্ণিশে দাঁড়িয়ে তারা গুনে, আমি চাঁদ ছেড়ে আপনাকে দেখি। খানিকটা আফসোস ও হয় আমি যদি ওই আকাশটা হতে পারতাম, হয়তো আপনি আমাকে দেখতেন। অদূর ভবিষ্যতে আপনার সাথে নীল-লাল সংসার গড়ার এক মরীচিকা স্বপ্ন দেখেছিলাম শুধু মাত্র কয়েক মূহুর্তের মোহ এর জন্য নয়। তাই আপনাকে ভালোবাসাটা ছাড়তে পারছি না। পারবো না। ক্ষমা করবেন, আপনাকে ভুলতে পারবো না। হয়তো সময়ের স্রোতে, মনকে ভালো লাগা টাইপ বিশেষণ দিয়ে বুঝিয়ে দেবো। কিন্তু মনের কোনে আপনি চিরকাল থাকবেন। আপনি এখন নিশ্চিন্তে বাড়ি যেতে পারেন”

ফারাবী দাঁড়িয়ে রইলো না। একটা রিক্সা ডেকে মেহুলকে উঠতে বললো। তারপর  এলোমেলো পায়ে হাটতে লাগলো ব্যস্ত খুলনার ফুটপাতে। আজ যেনো আকাশ টাও তার সাথে মন খারাপের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। নীল আকাশের কোনায় সূর্যের রক্তিম বর্ণ জড় হতে লাগলো। ব্যস্ত শহরের দিবসটি আজ অন্ত গেলো। 

মেহুল যন্ত্রচালিত রোবটের ন্যায় সেই রিক্সায় উঠে যায়। তার হৃদয়টা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। মনে হচ্ছে কিছু একটা হারিয়ে গেছে। কিন্তু তার জানা নেই জিনিসটা কি। বাসায় পৌছালে শাশুড়ী মা প্রশ্ন ছুড়েন,

— “আজ এতোটা দেরি হলো যে? কোথাও গিয়েছিলে?”

মেহুল উত্তর দেয় না। শুধু নতমস্তকে নিজ ঘরে চলে যায়। জামান সাহেব মেহুলের শুকনো মুখটা বেশ ভালো করেই অবলোকন করলেন। মেয়েটির গাল ভেজা সেটা বুঝতে বাকি রইলো না। মেহুল, নিজের ঘরে চলে গেলো। গা এলিয়ে দিলো বিছানায়। ফারাবীর মুখখানা চোখের সামনে ভাসছে তার। মেহুল এতোটা কঠিন না হলেও হয়তো পারতো। কিন্তু সমাজের একদল গোষ্ঠী তার চরিত্রে আঙুল তুলতে সর্বদা যে প্রস্তুত। তার সেদিনের কথাটি আজ ও বেশ স্পষ্ট মনে আছে। যেদিন ফারাবীর মা শেফালী বেগম তাকে বলেছিলেন,

— “আজকালকের মেয়েরা কত চালু হয় তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ তুমি, পুরুষদের কিভাবে বশে আনতে হয় তুমি ভালোই জানো।”

সেদিন লজ্জা এবং অপমানে মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছিলো মেহুলের। ফারাবীর সাথে তার বন্ধুসুলভ মেলামেশাকে নোংরাভাবে সম্বোধন করেছিলেন শেফালী বেগম। সেদিন থেকেই মেহুল ফারাবীকে এড়িয়ে চলছিলো। তার সপ্তাহ দুয়েকের মাঝেই ফারাবী তাকে প্রমে নিবেদন করে বসে। ফলে সেদিনের অপমানের বিভৎস্তা স্মৃতিকে বিষাক্ত করে তুলে। ফলে ফারাবীকে চপেটাঘাত করতেও দুবার ভাবে না মেহুল। আজ পুনরায় সেই স্মৃতিগুলো ক্যামেরায় সেলুলয়েডের রিলের মতো একের পর এক চোখের সামনে ভাসছিলো। ভাগ্যের এমন অবাক পরীক্ষায় কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়েছে মেহুল! আজ সত্যি নিজেকে পরাজিত মনে হচ্ছে, কে বলেছে প্রেম মানে সুখ, প্রেম মানে সুখ নয় বরং বিষাদ, বিষাক্ত নীল বিষাদ। 

মেহুলের দিনগুলো স্বাভাবিক নিয়মেই কাটতে লাগলো। অফিস, বাড়ি, শ্বশুরবাড়ির মানুষদের নিয়েই তার দিনগুলো নিজস্ব বৈচিত্রেই ব্যাতীত হয়। মাঝে মাঝে মুনমুন বেগম এবং রিমি তার উপর নিজেদের বিরক্ত জাহির করে। মেহুল উত্তর বিহীন তার মতো করে নিজেকে গুছাতে লাগলো। কিন্তু মনে লুকায়িত প্রকোষ্ঠে কেনো যেনো এক আগুন্তক বারেবারে কড়া নাড়ছিলো। কর্ণকুহরে ফিসফিস করে বলছিলো,

 “তুমি হীনা আমি, এবং আমিহীন তুমি বড্ড অসহায়”

এক নিবিড় রাত,

মেহুল ছাদের কর্ণিশে উদাস নয়নে তারা গুনছিলো। রাতে তারা গুনতে ভালো লাগে তার। নিজের প্রিয় মানুষগুলোকে তারার আড়ালে খুজতে ভালো লাগে তার। যেমন নিজের বাবা, রাজীব। রাজীবের সাথে তার সম্পর্কটা খুব নিবিড় ছিলো। কোনো মনোমালিন্য ছিলো না সম্পর্কে। হয়তো নির্মম ভাগ্যের তার ঝুলিতে এই স্বল্প সুখটাই লেখা ছিলো। তাই বিয়ের দু বছরের মাঝেই এই অঘটন টা ঘটে। তাই এখন সিদুরে মেঘ দেখলেই ভয় করে। এই বুঝি ভাগ্য আবার পরিহাস করতে ব্যাস্ত। এর মাঝেই জামান সাহেব উপস্থিত হয় সেখানে। গম্ভীর স্বরে বলে,

— “মেহুল, তোমার সাথে গুরুত্বপূর্ণ কথা রয়েছে।”

মেহুল পিছনে ফিরে বিনয়ী স্বরে বলে,

— “বলুন বাবা”

— “তোমার কাছ থেকে এমন কিছু আমি কখনোই আশা করি নি……

চলবে…..

মুশফিকা রহমান মৈথি

বেলা শেষে (কপি করা নিষেধ)

অন্তিম পর্ব

জামান সাহেবের কথায় বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মেহুল। সে ভেবেছিলো জামান সাহেব হয়তো তাকে কড়া কথা বলবেন, কিন্তু মেহুলকে সম্পূর্ণ অবাক করে তিনি বললেন,

— “তোমার কাছ থেকে এমন কিছু আমি কখনোই আশা করি নি। আমি তো তোমাকে কখনোই রিমি কিংবা রাজীব থেকে আলাদা ভাবি নি। কিন্তু আমার মনে হয় না তুমি আমাকে নিজের বাবার মতো ভাবো।”

— “কেনো বাবা! আমি কি কোনো ভুল করেছি?”

— “ভুল নয় অন্যায় করেছো। অন্য কারোর সাথে নয়, নিজের সাথে। তুমি অন্যায়টা নিজের সাথে করেছো, এবং এখনো করে যাচ্ছো। যে চলে গেছে তাকে ফেরানো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয় কিন্তু আগামী ভবিষ্যতকে আপন করার সুযোগ তো আছে আমাদের। জীবন কিন্তু খুব স্বার্থপর, সে সবাইকে দ্বিতীয় সুযোগ দেয় না। তোমায় হাসিমুখে সেই সুযোগ আলিঙ্গন করতে চাচ্ছে। তুমি তাকে ফিরিয়ে দিও না মেহুল৷”

— “কিন্তু বাবা…”

— “একটা কথা কি জানো তো, কোনো মানুষ একাকীত্বকে বরণ করতে পারে না। তোমার সম্পূর্ণ জীবনটাই পড়ে আছে মেহুল। আমি বলছি না একজন নারোর জীবন কাটাতে পুরুষের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম, আমি শুধু বলছি একজন মানুষের একজন নিবিড় বন্ধুর প্রয়োজন হয়। আর সেই বন্ধুটি তুমি ফারাবীর মাঝে ঠিক খুজে পাবে। ছেলেটা তোমাকে অনেক ভালোবাসে, সম্মান করে। কোনো বদ গুন নেই তার, যথেষ্ট বুদ্ধিমান এবং সৎ ছেলে সে। তার চিন্তাধারাগুলো বেশ পরিণত। তোমার যেকোনো মতামতকে সে সম্মান করে। এমন মানুষকে ফিরিয়ে দেওয়াটা বুদ্ধিমানের হবে না হয়তো। তাই আরেকটাবার ভেবে দেখো। শুনেছি ছেলেটা নাকি এই সপ্তাহের শেষে ঢাকা চলে যাবে। ওর চাকরি হয়েছে ঢাকায়।”

জামান সাহেবের কথাগুলো মন দিয়ে শুনছিলো মেহুল, ফারাবীর ঢাকায় চলে যাওয়া শুনে তার মনের আকাশে কালো মেঘের সঞ্চারণ হয়। বুকের ভেতরটা শূন্যতায় ছেয়ে গেলো। চোখটা জ্বালা করছে, এই বুঝি আকাশপাতাল ভেঙ্গে বর্ষণ নামবে আঁখিজোড়ায়৷ মেহুল নতমস্তকে দাঁড়িয়ে আছে, যেনো তার চোখের লবণাক্ত ধারা জামান সাহেবের চোখে না পড়ে। জামান সাহেব মেহুলের মাথায় মমতার স্পর্শ বুলিয়ে দিলেন। পরম মমতাভরা কন্ঠে বললো,

— “তুমি যদি রাজী থাকো তবে আমাকে জানিও”

— “বাবা, ওবাড়ির কেউ আমাদের এই সম্পর্কটাকে মেনে নিবেন না।”

জড়ানো কন্ঠে ধীর স্বরে মেহুল বললো। জামান সাহেব স্মিত হাসি হাসলেন। তারপর বললেন,

— “বিয়ে দু পরিবারের হলেও সংসারটি কিন্তু দুটো মানুষের হয়। তারা সুখী হলে আশেপাশের মানুষগুলো এমনিতেই সুখী থাকে। পারিপার্শ্বিক বাঁধা তো থাকে, অগ্নির ভেতর দিয়ে যায় বলেই সোনার রঙ চকচক করে। আর একটা কথা, যখন সব রঙ হারিয়ে যায়, তখন ক্লান্ত পৃথিবী কালো রঙ বরণ করে নেয়; এই আশায় যখন নতুন সূর্য উঠবে তখন হাজারো রঙ্গের মেলায় নিজেকে বিলীন করবে সে। তাই এতো ভেবো না। শান্ত চিত্তে ভাবো, তুমি কি চাও!”

কথাটা বলেই জামান সাহেব প্রস্থান করলেন। মেহুল ছাদের কর্ণিশেই দাঁড়িয়ে রইলো। শীতল বাতাস বইছে। উড়ছে তার কালো ঢেউ খেলানো চুলগুলো। চোখ তার বিষাদসিন্ধুর বাঁধ ভাঙলো। চোখ বুঝে আকাশ পানে মুখ করে দাঁড়িয়ে রইলো। রাত নিঃস্তব্দ, হাওয়া কথা বলছে তার কানে কানে;

“আর কত! আর কত অন্যের জন্য বাঁচবে। নিজের জন্য ও বাঁচো”

ফারাবী তার ব্যাগ গুছাতে ব্যস্ত। শেফালী বেগম তার দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে আছেন। ছেলের রাগ সম্পর্কে তার বেশ ভালো করেই ধারণা আছে। চরম শান্ত ছেলেটি যদি একবার রেগে যায় তবে তার রাগ দমানো বহু কষ্টের হয়। আর সেই রাগের ফলাফল আজ ছেলের ঢাকায় একেবারের জন্য প্রস্থান। আজ মূলত মায়ের উপর রাগ করেই ঘর ছাড়ছে ফারাবী। নিজের ছেলের চোখেই আজ নিচু মনের মানুষের খেতাব পেয়েছেন শেফালী বেগম। 

 মেহুলের সাথে সেদিন শেষ বারের মতো কথা বলে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে    যায়। বাসায় ফিরলে ঘরের ছোট কাজের মেয়েটা দরজা খুলে দেয়। ফারাবীর রুমটি শেফালী বেগমের রুম পেরিয়েই যেতে হয়। ফারাবী যখন নিজের রুমের দিকে এলোমেলো পায়ে যাচ্ছিলো তখন কানে আসে,

“তুমি চিন্তা করো না, মেহুলের ভুত তোমার ছেলের মাথায় বেশিদিন টিকবে না, আমি তো মেহুলকে চিনি মেয়েটার আত্মসম্মানের বেশ বড়াই। তাই এসব নিয়ে চিন্তা করো না”

মেহুলের হৃদয়বিদারক কথাগুলো তখনো ফারাবীর মস্তিষ্কে ঘুরছিলো। সেই সময়ে মায়ের এমন ধারা কথা শুনে বেশ অবাক হয় ফারাবী। অনুমতি বিহীন তার ঘরে প্রবেশ করে, প্রশ্ন ছুড়ে দেয় মায়ের দিকে,

— “আত্মসম্মানের এমন কি ঘটেছে যে মেহুল তা রক্ষার্থে আমাকে প্রত্যাখ্যান করবে?”

ছেলের প্রশ্নে হতচকিত হন শেফালী বেগম। করিম সাহেব ছেলের উপর বেশ চটে উঠেন,

— “একটা বাহিরের মেয়ের জন্য তুমি তোমার মাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারো না ফারাবী”

— “আমি তো প্রশ্নবিদ্ধ করছি না, কৌতুহল জাহির করছি। তবে সত্যি প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়! আমার খুশির মর্ম কি আদৌ আছে? মা তুমি চিন্তা করো না, মেহুল আমাকে একেবারে শূন্য হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে। তবে আফসোস মেহুলের ভুত নামবে না। কারণ ভুতটা আমি মাথায় উঠিয়েছি। মেয়েটির তো দোষ নেই। লজ্জা করছে, আমার জন্য না জানি তাকে কি কি শুনতে হয়েছে!”

সেদিনের পর থেকে ফারাবী সিদ্ধান্ত নেয় এই বাড়িতে থাকবে না। এই শহরের প্রতি বড্ড অনীহা জন্মেছে তার। জোর পূর্বক ভালো থাকার অভিনয়টা সে যে করতে পারে না। ব্যাগটা গুছিয়ে পেছনে ফিরতেই দেখে শেফালী বেগম অপরাধীর ন্যায় মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে। ফারাবী তার কাছে যায়। মলিন হাসি একে বলে,

— “ভেতরে আসছো না যে?”

— “কেনো চলে যাচ্ছিস?”

— “ভালো লাগে না এখানে থাকতে, দিনে না হলেও সপ্তাহে তার দেখা মিলে যে, তখন অসহায় কাগে নিজেকে”

— “আমি তোর বাবাকে বলেছি, জামান ভাই এর সাথে কথা বলার কথা”

— “লাগবে না মা, তুমি যে বলেছিলে মেয়েটির আত্মসম্মানের বড্ড বড়াই”

ছেলের করুন অসহায় মুখখানা শেফালী বেগমের সহ্য হচ্ছে না। উচু, লম্বা ছেলেটিকে বড্ড রোগা লাগছে তার। না ঘুমের কোনো ঠিক আছে না খাওয়ার ঠিকানা। নিজের ব্যাস্ত রাখতে ব্যাস্ত সে। অহেতুক কাজে নিজেকে জড়িয়ে রাখে। যেনো মেহুলের নিবিড় চিন্তাগুলো মনকে দূর্বল না করে। মেহুলের জন্য নিজের মায়ের সাথে সে খারাপ আচারণ করে নি। তবে তার উচ্ছ্বাসিত ছেলেটি যেনো কোথাও হারিয়ে গেছে। যা শেফালী বেগমকে ভেতর থেকে চুরমার করে দিচ্ছে। ফারাবী মায়ের মুখখানা আলতো করে ধরে বলে,

— “তুমি মন খারাপ করো না মা, আমি ঠিক হয়ে যাবো। আমার ভাগ্যেই মেহুল নেই, তোমার এতে কোনো দোষ নেই”

ফারাবীর মলিন হাসিটা শেফালী বেগমকে আরোও অপরাধবোধে কুড়ে কুড়ে খায়। নিজের স্বার্থপরতা আজ ছেলেটাকে বিষাক্ত যন্ত্রণা দিচ্ছে। ফারাবী সব কিছু গুছিয়ে নেয়। তার ট্রেন নয়টায়। এখন না বের হলে ট্রেন মিস হবে। ফারাবী নিজের ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে নিলো। শীতের সকালে ইজি বাইক পাওয়াটা বড্ড দুষ্কর। ফারাবী মাকে জড়িয়ে ধরে বেড়িয়ে পড়ে। আগামী পরশু তার এপোয়েনমেন্টের কাজ করতে হবে। সামনের সপ্তাহ থেকে জয়েনিং। তাই আজ ই রওনা দিচ্ছে ফারাবী। ঢাকায় থাকার ব্যাবস্থাটাও পাকাপাকি করতে হবে তাকে। সবার সাথে বিদায় নিয়ে ইজিবাইকে উঠে ফারাবী। গন্তব্য ট্রেন স্টেশন। ইজিবাইক যখন মেহুলের বাড়ির সামনে থেকে যায় তখন দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে ফারাবী। হয়তো আর দেখা হবে না তাদের     

ফারাবী ট্রেন স্টেশনে পৌছায় নয়টা বাজার পনেরো মিনিট পূর্বে। স্টেশনের ভেতরে পৌছাতেই পা জোড়া আটকে যায় তার। নীল শাড়িতে এক রমনী দাঁড়িয়ে আছে ট্রেনের সামনে। যেনো রমনীটি তার অপেক্ষাতেই ছিলো। ফারাবী অবাক নয়নে তাকিয়ে থাকে মেয়েটির দিকে। রমনী এগিয়ে আছে তার দিকে। মুচকি হেসে বলে,

— “পালাচ্ছেন বুঝি?”

রমনী আর কেউ নয় বরং মেহুল। মেহুলের শান্ত মিহি কন্ঠের কথা শুনে কাঁধের ব্যাগটি পড়ে যায় ফারাবী। অবাক কন্ঠে বলে,

— “আপনি এখানে?”

— “পারলাম না নিজেকে আটকে রাখতে! বহুবার জিজ্ঞেস করলাম নিজেকে কি চাই আমার? উত্তরটা একটাই একজন নিবিড় বন্ধু। যার সাথে নীল-লাল সংসারটা ভালোই জমবে। আমাকে নিবেন আপনার সাথে?”

মেহুলের প্রশ্নে ফারাবীর চোখজোড়া চকচক করে উঠে। পারিপার্শ্বিক পরোয়া না করেই জড়িয়ে ধরে মেহুলকে। মেহুলকে জামান সাহেব ই নিয়ে এসেছে ট্রেন স্টেশন অবধি। কারণ মেহুল তাকে বেশ সাহস নিয়ে মনের কথাগুলো বলেছিলো। আজ সে শ্বশুর নয় একজন পিতা রুপে তার কন্যাকে এখানে নিয়ে এসেছেন।

ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠেছে। ফারাবী এবং মেহুলের সেদিকে হুশ নেই। তারা নিজেদের মাঝেই আবদ্ধ করেছে নিজেদের। হঠাৎ মেহুল প্রশ্ন করলো,

— “ট্রেন চলে যাচ্ছে, ঢাকায় যাবেন না?”

ফারাবী মেহুলের হাতটা নিজের মুঠোয় নিলো। স্মিত হেসে বললো,

— “যাহা চাই তাহা কি পাই? বেলা শেষে জীবনের হিসেবে কিছু খোয়াবোই; এটাই জীবনের নিতান্ত সত্যতা।”

বলেই হাটতে লাগলো ট্রেনের বিপরীতে। মেহুল ও স্মিত হেসে হাটতে লাগলো তার সাথে সাথে। বেলা শেষে সত্যি কিছু বা কিছু খোয়ানো যায় ই, আবার জীবনের হিসেবে জমা হয় না পাওয়া অনেক কিছু        

||সমাপ্ত||

মুশফিকা রহমান মৈথি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।