চারুলতা ভালোবেসেছিলো

ধারাবাহিক গল্প পর্ব১ 

 

আব্বা মারা গিয়েছেন, কাল রাতেও যিনি আমাদের দুইবোনকে তীব্র গালিগালাজ করছিলেন, আজ সকালে তিনি মৃত। ভাইয়া জানতে পেরে ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছেন, কিছুক্ষণের ভিতর হয়তো পৌঁছে যাবেন। আব্বার মৃত্যুতে আমার তীব্র কষ্টে বুকটা ভেঙে আসার কথা, কিংবা চিৎকার করে কাঁদার কথা।

কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে আমার কারো তেমন কোন অনুভূতি হচ্ছে না। আমার মতো লতা আর ভাইয়ারও কী একই অনুভূতি হচ্ছে! কেননা লতাও বেশ স্বাভাবিক, আর ভাইয়ার সাথে আব্বার কখনোই খুব বেশি সখ্যতা ছিল না। আব্বার মৃত্যুর খবরে ভাইয়াও খুব একটা কষ্ট পেয়েছে বলে মনে হলো না। আমরা তিন ভাইবোন কী তবে আব্বাকে ভালোবাসতে পারিনি!! ছিঃ কি বাজে কথা! বাবার মৃত্যুতে সন্তানেরা কী ভাবে এমন ঠান্ডা থাকতে পারে, যেখানে আব্বার মৃত্যুর পর আজ আমরা পুরোপুরি এতিম হয়ে গেলাম।

 

আমার আম্মার মৃত্যু হয়েছে আজ থেকে দুই মাস একুশ দিন আগে। জনমদুঃখী কথাটা আম্মার সাথে খুব যায়। মামা মামীর সংসারে বড় হয়েছিলেন আম্মা।

নাহ আমার নানা নানী মৃত ছিলেন না, দুইজনই জীবিত ছিলেন। তারপরও আম্মাকে এতিমের মতো বড় হতে হয়েছিল। আমার নানা কাউকে না জানিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করায় নানী রাগ করে বাবার বাড়ি চলে এসেছিলেন। কিন্তু নানা ওনার কাছে ক্ষমা চেয়ে  ফিরিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে তালাক দেন। দুই বছর বাবার সংসারে থাকার পর নানীর আবার বিয়ে হয়। নতুন সংসারে আম্মাকে নিয়ে যেতে পারেননি নানী।

আম্মা তাই বড় হয়েছেন তার বড় মামা মামীর সংসারে, বলা যায় অনেকটা বিনা বেতনের কাজের মেয়ের মতো।

 

আম্মা আব্বার দ্বিতীয় স্ত্রী। বড় আম্মার মৃত্যুর পর আম্মাকে বিয়ে করেন আব্বা। আব্বা আম্মার বয়সের পার্থক্য প্রায় বিশ বছর। মামার সংসারে এতিমের মতো বড় হওয়া  মেয়ের বিয়ের জন্য বিনা খরচে এরচেয়ে ভালো পাত্র আর কাকে পাবে। তাও সবাই বলতো আম্মার ভাগ্য ভালো সতীনের সংসার তো করতে হচ্ছে না। ভাইয়া বড়মার ছেলে। বড়মা কে আমরা দুই বোন দেখিনি। ভাইয়ার বয়স যখন সাত বছর তখন বড় মা মারা যান। শুনেছিলাম পাঁচ দিন জ্বরে ভুগে মারা গিয়েছিলেন বড় মা। হতেও পারে, আম্মার মতো বড়মাও নিশ্চয়ই  আব্বার কাছে শুধু  অবহেলাই পেয়েছেন। 

 

আব্বা সবসময় বদরাগী মানুষ ছিলেন। ইদানীং এই স্বভাব আরো খারাপ পর্যায়ে যায়, পান থেকে চুন খসলেই তিনি গালাগালি শুরু করতেন। ফলে পাড়া প্রতিবেশী কারো সাথে ওনার সম্পর্ক ভালো চলছিলো না। নোয়াখালীর হরিনারায়ণপুরে পুরনো আমলের দোতলা বিল্ডিং আমাদের, নীচ তলাটা গুদামঘর।

আব্বার ব্যবসার নানা সামগ্রী মজুদ করে রাখেন একপাশে, অন্য পাশটা ভাড়া দেওয়া। সেটাও গুদামঘর হিসেবেই ভাড়া দিয়েছিলেন আব্বা। 

 

বাড়ির পিছনে বড় একটা পুকুর ছিল, আর বাড়ির সামনে এক চিলতে উঠোন। পেছনের পুকুরটা আব্বা ভরাট করে ফেলেছিলেন, প্রায় দেড়বছর আগে। আব্বার ইচ্ছে ছিলো পুকুরের জায়গা ভরাট করা শেষে বড় করে নতুন বিল্ডিং ওঠাবেন, আর পুরনো বিল্ডিং ভেঙে সামনে দোকানঘর করবেন, সেগুলো ভাড়া হবে।

 

কিন্তু হঠাৎ করোনার ভয়াল থাবায় সব পরিকল্পনা এলোমেলো হয়ে যায়। ব্যবসা আর আগের মতো থাকে না, যার প্রভাব আব্বার মন মেজাজের উপরও এসেছিল। ইদানীং তিনি কাউকে সহ্য করতে পারছিলেন না। সবার সাথে খারাপ ব্যবহার করতেন।

আম্মা সারাক্ষণ আব্বার ভয়ে তটস্থ থাকতেন। আর

আমি তো নিজের দুঃখেই নিরব হয়ে গিয়েছিলাম, বিয়ের মাত্র এগারো মাস না যেতেই বিধবা হয়ে বাবার বাড়ি ফিরে এসেছি। স্বামীর মৃত্যুর সাথে সাথে শ্বশুর বাড়িও আমার জন্য পর হয়ে যায়। নাতি নাতনি নেই, কমবয়সী বিধবা ছেলের বৌ কে তারা রাখতে চায় না। বড় জা ভয় পেত ভাসুরের নজর যায় নাকি আমার উপর, শাশুড়ি আম্মা চিন্তা করতেন দেবরকে নিয়ে।

অপয়া বিধবা ভাইয়ের বৌ এর প্রতি দেবরের আকর্ষণ তৈরি হোক এটা তিনি চাইতেন না।

 

যতই নিজেকে আড়ালে রেখে ঐ বাড়িতে পরে থাকতে চাইতাম, লাভ হয়নি। আসলে আমি বাবার বাড়ি ফিরে আসতে চাইনি, জানতাম এখানে আমাকে সাদরে গ্রহণ করা হবে না। কিন্তু একরকম জোর করেই শ্বশুর শাশুড়ি আমাকে এখানে নিয়ে আসেন। কী কদর্য ছিল সেই দিন, আব্বা ব্যাপক চিৎকার চেঁচামেচি করলেন ওনাদের সাথে, বিয়ে দিয়েছেন এখন আমি ঐ বাড়ির বৌ, ওনাদের দ্বায়িত্ব। ওনারাও ঠিক করে এসেছেন আমাকে দিয়ে যাবেন।

 

ছিঃ এক ফেলনা জিনিস যেন, এ বলছে তুমি রাখো, ও বলছে তুমি। বরাবরের মতো আম্মা নিরব দর্শক, একপাশে শুধু আঁচল চাপা দিয়ে কান্না করে গিয়েছেন।

পাড়া প্রতিবেশীরা মজা দেখতে ভীড় করেছিলো। শেষে একলাখ টাকা, আর আমার বিয়ের গয়না গুলো ফেরত দিয়ে আমাকে রেখে যেতে পারেন শ্বশুর শাশুড়ি। হাঁপ ছেড়ে বাঁচেন তারা।

 

কমবয়সী বিধবা ছেলের বৌ তারা রাখতে চায় না, বিধবা মেয়ের বোঝা আব্বা আর নিতে চায় না। 

তবু অনিচ্ছা সত্ত্বে আমাকে রাখতে অবশেষে বাধ্য হন। তবে আমি চোখের সামনে পড়লেই আব্বা খিটমিট করতেন। কথার আঘাতে এত জর্জরিত হয়েছি, যে মাঝেমাঝে মনে হতো আত্মহত্যা করি। আম্মার কান্না আমাকে একসময় আর স্পর্শ করতো না। নিরব থেকে সারাজীবন সন্তানের সাথে অন্যায় হতে দিয়েছেন বলে আম্মার উপর তীব্র অভিমান হতো। মা পাখি ও তো ঝড় ঝাপটা থেকে বাচ্চা কে বুকে আগলে রেখে উদ্ধার কে, অথচ আম্মা মানুষ হয়েও কোনদিন ঢাল হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।

 

একসময় আম্মার সমব্যথী ছিলাম, বিড়ালের মতো পায়ে পায়ে ঘুরে বেড়াতম, সেই আমি তীব্র অভিমানে নিজেকে আম্মার কাছ থেকে এতটাই গুটিয়ে নিলাম যে আম্মার শরীর ভালো নেই তা শুরুতে চোখে পরেনি।

আম্মা ছোটবোন লতার হাতে বুকে সরিষার তেলে রসুন পুড়ে মালিশ করাতেন। খুব ব্যথা পেতেন বুকে।

 

অভিমান আর ধরে রাখতে পারিনি। আব্বাকে অনুরোধ করেছিলাম ডাক্তার দেখাতে। ব্যবসায় মন্দা, আমার বিধবা হয়ে শ্বশুর বাড়ি থেকে বিতাড়িত হওয়া, আব্বাকে এতটা আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল যে আম্মার বুকে ব্যথাটা একটা উটকো ঝামেলা ছিলো তার জন্য।

তবে আম্মা বেশি জ্বালাননি, দুম করে ঘুমের ভিতর হার্ট অ্যাটাক করে মারা যান। ভয় পেতে পেতে আম্মার হার্ট বোধহয় একদম দূর্বল হয়ে পরেছিলো, অথবা দীর্ঘদিন ধরেই হয়তো অসুখ চেপে রেখেছিলেন তিনি।তাই শেষের দিকে আর সময় দেয়নি।

 

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো সারাজীবন যে আম্মাকে আব্বা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন, সেই আম্মার মৃত্যুতে আব্বা যেন শোকে মুহ্যমান হয়ে পরেছিলেন।

আম্মার জন্য আব্বার শোকের বহিঃপ্রকাশ আমার কাছে উপহাস লাগতো। কারণ জানতাম খুব তাড়াতাড়ি স্বরূপে ফিরে আসবেন। হয়েও ছিলো তাই। একমাসের মধ্যে আব্বা তৃতীয় বিয়ের জন্য উঠেপড়ে লাগলেন। নাহ সামাজিক বা ধর্মীয় কোনভাবেই  আব্বার বিয়ে করতে চাওয়াটা অবৈধ নাহ। আমার আর লতার আব্বাকে আটকানোর কোন ক্ষমতা ও ছিলো না।

তা-ও আমি বিরোধিতা করেছিলাম, কেননা কমবয়সী তরু খালাকে বিয়ে করার জন্য আব্বা দোকানঘর পর্যন্ত বিক্রি করে দিতে চলেছিলেন। 

 

তরু খালার ভাই তার বোনকে এত বয়সী একজনের লোকের সাথে বিয়ে দিতে চাইছিল না। যদিও তরু খালার ও এটা প্রথম বিয়ে নয়, তবুও সুন্দরী খালার জন্য তার দাবী ছিলো পনেরো লাখ টাকার কাবিন।আর তা হাতে হাতে উসুল হবে। আব্বা রাজি হয়ে গিয়েছিলেন, একাকিত্ব তাকে এতটাই নাকি কুড়ে খাচ্ছিল যে এর হাত থেকে মুক্তি পেতে তিনি সম্পদও বিক্রি করতে রাজি। এই নিয়ে ঘরে অশান্তি শুরু হয়। চিরকাল আমাদের ভালোমন্দ থেকে দূরে থাকা ভাইয়াও এবার বিরোধিতা করেন। প্রথমে ফোনে ভাইয়া, তারপর বাড়িতে  আমি আর তরু দোকানঘর বিক্রি না করতে অনুরোধ করায় আব্বার মাথা গরম হয়ে যায়, তীব্র গালিগালাজ করেন আমাদের।

 

আম্মা আর আমরা দুইবোন নাকি অপয়া, জোঁকের মতো শুধু ওনার রক্ত শুষে গিয়েছি। বিয়ে দিয়েও শান্তি পাননি, একবছর হতে না হতে আবার কাঁধে এসে উঠেছি। অথচ পড়ার মাঝপথে বিয়ে না দিতে আব্বাকে কত অনুরোধ করেছে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছি, আব্বা যেনো সব ভুলে গেলেন। রাতে যে লোক সবাইকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে শুতে গেলেন,  আজ একটু পর তিনি ই এ-ই বাড়ি থেকে চিরবিদায় নেবেন। খাটিয়া এনে রাখা হয়েছে,  ভাইয়া এলে আব্বাকে শেষ গোসল দেওয়া হবে।

 

আম্মার মৃত্যুর পর ও ভাইয়াকে  খবর দেওয়া হয়েছিলো, কিন্তু সৎ মায়ের জন্য ভাইয়া সেবার আসেনি। এবার আব্বার মৃত্যুতে আসছেন, 

কেন আসছেন জানি। তবে এবার আমি চারু আর  চারাগাছের মতো নুয়ে পরব না, চারু এবার মহিরুহ হবে। লতা আর আমার জন্য এবার আমাকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। ভাইয়া যে মহত উদ্দেশ্যে আসছেন না আমরা দুবোন জানি। তবে আমরাও এবার লড়াইয়ে প্রস্তুত। দেয়ালে যে পিঠ ঠেকেছে, ঘুরে তো দাঁড়াতেই হবে।

 

Rukshat Jahan

 

চারুলতা ভালোবেসেছিল 

ধারাবাহিকগল্প পর্ব ২ 

 

আব্বা যখন মারা যান ঘড়িতে তখন ভোর ৬ টা বেজে ২৩ মিনিট। আমি ফজরের নামাজ পড়ে বারান্দায় বসে নিজের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভাবছিলাম। হঠাৎ জোরে একটা শব্দ কানে আসে,দৌড়ে গিয়ে দেখি আব্বা খাবার ঘরের মেঝেতে পড়ে আছেন। মুখটা কেমন বেঁকে গিয়েছে। স্ট্রোক করেছিলেন আব্বা, এম্বুলেন্স আসতে আসতে সব শেষ। 

 

ভাইয়া রওনা দিয়েছেন সাত টার পর, পাঁচ ঘন্টা অন্ততঃ লাগবে। এখন বাজে এগারোটা, বারোটার আগে ভাইয়ার পৌঁছানোর কথা না। সাথে ভাবি আর বাচ্চারা আসবে কিনা জানি না। কিছু খাবারের ব্যবস্থা করা উচিত, বাচ্চারা এলে যদি খেতে চায়, ছোট মানুষ তো জন্ম মৃত্যর এত কঠিন হিসেব বুঝবে না।

 

কী আনাবো তাই ভাবছি, মরা বাড়িতে চুলা জ্বালাতে হয় না, রাঁধতে হয় না, মফস্বলে এমনটাই প্রচলিত। 

আমাদের অবশ্য তেমন কোন আত্মীয় স্বজন নেই যে প্রতিবেলায় বেলায় খাবার পাঠাবে, তাই দীর্ঘসময় চুলা না জ্বালিয়ে থাকা সম্ভব না, তবে মৃত্যুর কয়েকঘন্টার মধ্যে না জ্বালানোই শোভনীয়। আমার আর লতার নানা বাড়ির দিকে তেমন কেউ নেই। আম্মা যেহেতু মামা মামীর কাছে বড় হয়েছেন তাই ওনার সৎ ভাই বোন কারো সাথে যোগাযোগ নেই। মামাতো ভাই বোনেরাও কেউ তেমন খোঁজ খবর করে না।

 

একই অবস্থা দাদা বাড়ির দিকে ও, এক ফুপু ছিলেন, গত বছর মারা যান, ফুপাতো ভাই বোনেরা কেউ দেশের বাড়ি থাকে না। ভাইয়ার দু’জন মামা আর খালা দেশের বাড়িতে থাকেন, ওনারা কী আসবেন, আসতেও পারেন, আজ ভাইয়া তার দল ভারী রাখতে চাইবে, দুটি অবলা মেয়েদের কোনঠাসা করতে এর বিকল্প নেই। 

তাহলে হয়তো ভাবিও আসবেন, স্বামীর সাথে শক্তি হয়ে। ভাবির সাথে আসলে আমাদের দেখা বা কথা এত কম হয়েছে যে তার সম্পর্কে ধারণা খুব কম। ভাবি ভাইয়ার অফিসেই চাকরি করতেন, একসাথে কাজ করতে গিয়ে ভালোলাগা আর বিয়ে। ওনাদের বিয়েটা একদম ঘরোয়া ভাবে হয়েছিল।

 

ভাইয়া চাকরিতে ঢোকার পর দেশের বাড়ি খুব কম আসতেন। আমাদের দুইবোনের সাথে তার সবসময় একটা দূরত্ব ছিলো। ভাবিকে পছন্দ হওয়ার পর বাড়িতে জানিয়েছিলেন, আব্বা আম্মাকে সাথে নিয়ে ঢাকায় যায়, সেখানে ভাবির মায়ের বাড়িতে আকদ হয়। আমাদের দুইবোন কে নেওয়া হয়নি। শুনেছিলাম ভাবির বাবা মা এ বিয়েতে খুশি ছিলেন না, তাই কোন আয়োজন করার আগ্রহ ওনাদেরও ছিল না। নিতান্ত মেয়ের ইচ্ছের কাছে নতি স্বীকার করে মেনে নিয়েছিলেন।

 

এরপর কয়েকটি ঈদে বাড়ি এসেছিলেন ভাবি, কিন্তু ভাইয়ার সাথে সহজ সম্পর্ক না থাকায় ভাবির সাথেও আমরা মিশতে পারিনি। আমার বিয়ের সময় ভাবির সাথে আব্বার কথা কাটাকাটি হয়, সে সময় আমার বিয়ের বিরোধিতা যদি কেউ করে থাকেন, তাহলে সেটা ভাবি। আমার চেয়ে বয়সে প্রায় তেরো বছরের বড়,স্বল্প শিক্ষিত ছেলের সাথে শুধু আর্থিক অবস্থা ভালো বলে বিয়ে ঠিক করাটা ভাবি মেনে নিতে পারেননি।

যদিও কোন লাভ হয়নি, তাও ভাবি চেষ্টা করেছিলেন আব্বা কে বোঝাতে। এই জন্য একটা ধন্যবাদ দেওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল, কিন্তু পারিনি। আব্বার সাথে তর্ক করায় ভাইয়া খুব বিরক্ত হয়, আমার বিয়ে পর্যন্ত আর তারা থাকেনি, হলুদের আগের দিন ঢাকা ফিরে যায়। আমিও চলে যাই নতুন সংসারে।

 

ভাইয়ার জমজ ছেলে হয়েছে , দুইবছর চলছে বাচ্চাদের । এই বয়সী বাচ্চারা নিশ্চয়ই চিকেন ফ্রাই, কেক এমন খাবার পছন্দ করে। আব্বার দোকানের ছেলেটাকে পাঠিয়েছি, এলাকার সবচেয়ে ভালো বেকারি থেকে ভালো কেক আর বিস্কুট আনতে, চিকেন ফ্রাই পাওয়া যাবে না। আর কয়েকটা নুডলসের প্যাকেট আনতে বলেছি।

আনার বড় জা য়ের মেয়ে দেখতাম খুব নুডলস পছন্দ করতো। নিশ্চয়ই অন্য বাচ্চাদের ও  পছন্দ। 

 

ভাইয়া পড়ালেখায় ভালো ছিলেন, আব্বা যখন আম্মাকে বিয়ে করে আনেন, তখন ভাইয়া ক্যাডেট স্কুলে। এরপর ছুটি ছাটায় বাড়ি আসলেও আম্মা থেকে দূরে ই থাকতেন, হয়তো নিজের মায়ের জায়গায় অন্য মহিলাকে মেনে নিতে পারেননি তিনি।

তবে প্রকাশ্যে কখনো ঝগড়া করতে দেখিনি। 

ভাইয়া বাড়তি আসতেন, দুই চার দিন নিজের মতো থেকে বাকি সময় টা মামা বা খালার বাসায় কাটাতেন।

আব্বা বা আম্মা কেউ ওনাকে ঘাটাঘাটি করতো না।

 

আজ ভাইয়া এ বাড়ির একমাত্র  পুরুষ কর্তা হয়ে ফিরে আসছেন।

 

“আপা ভাইয়া কি মারুফ ভাই আর সোহেল ভাইয়ের মতো সম্পত্তি নিয়ে মারামারি করবে? কি মনে হয় তোর? “

 

লতা কখন পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। 

বসার ঘরে অনেক মানুষ, পাড়া প্রতিবেশী, আব্বার পরিচিত লোকজন।

 মৃত ব্যক্তির উপর রাগ ধরে রাখতে হয় না, তাই সম্পর্ক ভালো হোক বা খারাপ, পরিচিত অনেকেই এসেছেন শেষ বিদায় দিতে।

 

মারুফ ভাই আর সোহেল ভাই, হারুন চাচার ছেলে। হারুন চাচার বাড়ি পিছনের গলিতে। চাচার মৃত্যুর পর সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে রীতিমতো মারামারি লেগে গিয়েছিল ভাই বোন দের মধ্যে। মারুফ ভাই তো বাঁশ দিয়ে বাড়ি মেরে বোন জামাইয়ের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলেন। পুলিশ এসে পরিস্থিতি ঠান্ডা করে।

 

“জানিনা লতা। ভাইয়া তো শিক্ষিত মানুষ, এত নিচে নামবে না। তবে আমাদের ও শক্ত থাকতে হবে। মাথার উপর ছাদের নিশ্চয়তা পেতে হলে ভয় পাওয়া যাবে না।”

 

” আপা এত মানুষ নিচে, ওনাদের নাস্তার ব্যবস্থা কি করবো। আব্বা তো আমাদের হাতে কোন বাড়তি টাকা দিতো না। 

আলমারি কি খুলে দেখবো টাকা আছে কিনা? “

 

” কত লাগতে পারে লতা? আমার কাছে জমানো হাজার পাঁচেক  আছে, কি আনাবো, চা পরোটা?”

 

” আপা তোর টাকাটা খরচ করিস না আর। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা, থাক হাতে। এমনিও দেখলাম ঢলু কে এক হাজার টাকা দিলি ভাইয়ার বাচ্চাদের জন্য এটা সেটা আনাতে। “

 

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচে তাকিয়ে দেখি একটা মাইক্রোবাস এসে থেমেছে গেটে, ভাইয়া নামছেন সামনের দরজা খুলে।

 

” নিচে চল লতা, ভাইয়া ভাবি এসেছেন।”

 

Rukshat Jahan

 

চারুলতা ভালোবেসেছিল 

ধারাবাহিক গল্প পর্ব৩

 

গাড়ি থেকে ভাইয়া ভাবি আর বাচ্চাদের পাশাপাশি আরো একজন লোককে নামতে দেখলাম। 

সম্ভবত ভাইয়ার শ্যালক। ভাইয়ার শ্যালকের সাথে আমাদের পরিচয় নেই। গত চার বছরে শুধু একবারই দেখা হয়েছে। বিয়ের পর প্রথম ঈদে ভাবির সাথে এসেছিলেন। কয়েকঘন্টা থেকে চলে যান সেবার, তাই পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাইনি।

 

ভাইয়া আসতেই উপস্থিত সবাই ভাইয়াকে ঘিরে ধরে, আমি আর লতা নিচে নেমে বারান্দার একপাশে দাঁড়িয়ে থাকি। আনোয়ার চাচা ভাইয়া কে ধরে শব্দ করে কেঁদে উঠলেন, অথচ গত সপ্তাহে  নারকেল নিয়ে ঝগড়া করে আব্বার সাথে চাচার হাতাহাতি পর্যন্ত হয়ে গিয়েছে। ঘটনা ছিল, আমাদের সীমানার নারকেল গাছ থেকে নারকেল ঝরে পড়ে আনোয়ার চাচার বাড়ির সীমানায়, দুই বাড়ির মাঝে বেড়া দেওয়া। সেই নারকেলের মালিকানা নিয়ে ঝগড়া আর ধস্তাধস্তি পর্যন্ত হয়ে যায় আব্বা আর চাচার মাঝে। অথচ আব্বা নারকেল খায় না, আর আনোয়ার চাচার নিজেরই নারকেল গাছের সংখ্যা দশের অধিক!

 

যদিও আব্বা আর আনোয়ার চাচার সম্পর্ক অম্লমধুর ছিল, কিন্তু এই সময় চাচার এই কান্না কেন জানি বেমানান লাগলো না, বরং বড় বেশি স্বাভাবিক লাগছে। হয়তো প্রতিবেশী সুলভ নানা ঝগড়া ঝামেলার মাঝেও কোন ভালো সময়ের স্মৃতি  তাদের ছিল, বন্ধুত্ব ছিল।

আমি মনে করার চেষ্টা করলাম আমার সাথে আব্বার প্রিয় স্মৃতি কোনটা, কিন্তু মনে আসছে না। সম্ভবত স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময়টা। দোকান থেকে রোজ দুপুরে বাড়ি আসতেন আব্বা, খাওয়া দাওয়া করে একটা ভাতঘুম দিয়ে বিকেলে আবার যেতেন।

 

মফস্বলের দোকানগুলো এমনই, শহরের মতো সবসময় জমজমাট না, দুপুরে ফাঁকাই থাকে। দোকান থেকে বাড়ি ফেরার পথে আমাদের দুইবোন কে নিয়ে আসতেন। আব্বার দোকান মাইজদী মসজিদ মার্কেটে,  

আমি আর লতা পড়ালেখা করেছি নোয়াখালী সরকারি গার্লস স্কুলে। স্কুলের বাইরে বখাটে ছেলেদের আড্ডা বসতো ছুটির সময়, বেশিরভাগ মেয়ের বাবা ই এসময় চেষ্টা করতেন স্কুলে আসার। আব্বা রাগী মানুষ ছিলেন, আমি আর লতা সাহস করতাম না ফুচকা বা চটপটির আবদার করার। তবে যেদিন আব্বার মন ভালো থাকতো আমরা না চাইতে পেয়ারা মাখা, জাম মাখা, না হয়  আইসক্রিম কিনে দিতেন।

আমরা দুইবোন তাতেই খুশি। লতা আর আমার বয়সের পার্থক্য চার বছর। আব্বার হোন্ডার পিছনে আমরা দুইবোন বসতাম, লতা ছোট,  ও মাঝে বসতো, এরপর আমি। যখন বাতাসের বেগে আব্বা হোন্ডা চালাতেন, আমরা আব্বার শার্ট  খামছে ধরে রাখতাম। 

হঠাৎ মনে পরা এই স্মৃতিটা যেন বুকটা দুমড়ে  মুচড়ে দিলো

 

সকাল থেকে কাঁদার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু চোখ যেনো শুকনো খটখটে হয়েছিল। অথচ এখন হঠাৎ দুচোখে বর্ষা নেমেছে। 

 

‘আব্বা’ আমার আব্বা,

তিনি হয়তো আদুরে আব্বা ছিলেন না, সন্তান নিয়ে আহ্লাদ করতে পারতেন না, কিন্তু তিনি আমাদের আব্বা। বদরাগী ছিলেন,কারো মতামত শুনতে চাইতেন না, কথার আঘাতে আঘাত করতেন। কিন্তু আমাদের পড়াশোনা করিয়েছেন, আর্থিক নিরাপত্তা দিয়েছেন, মাথার উপর ছায়া হয়ে ছিলেন। স্বার্থপর তো আমরাও, আজ সকালে তিনি চোখ বুঝেছেন, আর দুপুর হওয়ার আগেই তার রেখে যাওয়া সম্পত্তির ভাগ পাব কিনা সে চিন্তা করছি। এই যে ভাইয়া, আজ মৃত্যুর পর পাঁচ ঘন্টার মধ্যে হাজির হলো। সেই ছেলে গত দুই মাস একুশ দিন কোথায় ছিল! আমার মা না হয় সৎ মা ছিলেন, কিন্তু বাবা তো তার নিজের বাবা ছিলেন।

আমাদের থেকে পাওয়া অবহেলাই হয়তো বাবাকে এতটা একাকিত্বের মুখোমুখি করেছিলেন যে তিনি মূল্য চুকিয়ে হলেও বিয়ে করতে চাইছিলেন।

 

নিজেকে ভীষণ ছোট লাগছে। আব্বা কোনদিন আদর করে পাশে বসিয়ে দুটো কথা বলেনি, সেই অভিমান করেছি। কিন্তু নিজে কয়দিন আব্বার জন্য তার প্রিয় মুড়িমাখা করে দিয়েছি, নিজ থেকে আব্বার পাশে বসে দুটো কথা বলেছি! শুধু ভয় করে গেলাম, কিন্তু  আমার আর আব্বার মাঝে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা অদৃশ্য দেয়াল ভাঙার কোন চেষ্টাও করিনি। জানতাম বিকেলে আব্বা মুড়িমাখা দিয়ে চা খান। কিন্তু আম্মার মৃত্যুর পর একদিনও আমি বা লতা নিজ থেকে মুড়ি মাখাইনি।

আব্বা রেগে নাস্তা চাইলে বিরক্ত হয়েছি। আব্বা ভালো বাবা যদি না হয়, আমরা ও কি সুসন্তান ছিলাম।

 

এই যে আম্মার মৃত্যুর জন্য আব্বাকে দায়ী করি, 

বলি আব্বা অবহেলা করেছেন। কিন্তু আমি বা লতা পাশে থেকেও কি কোনদিন বুঝতে চেয়েছি যে আম্মার ঠিক কতটা ব্যথা হচ্ছে, শুধু কী গ্যাসের সমস্যা না অন্য কিছু। অবহেলা তো আমরাও করেছি। লতা সবসময়ই আত্মকেন্দ্রিক, সাজতে ভালোবাসে, নিজের জগতে থাকে। আর আমি! অসময়ে বিয়ে,আর অকালে বিধবা হওয়ার কষ্ট আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। তার উপর শ্বশুর বাড়ি ও বাবার বাড়ি দুই বাড়িতে ব্রাত্য হয়ে পড়ায় মনে বিশাল অভিমান বাসা বাধে। না আম্ম, না আব্বা কারো প্রতি বিন্দুমাত্র যত্ন, ভালোবাসা দেখাতাম না। আববা আমাকে দেখলে খিটমিট করতো, তাই আব্বার সামনে যাওয়াই ছেড়ে দিয়েছিলাম। স্ত্রীর মৃত্যুর পর লোকটা সময় মতো খাচ্ছে কিনা,ঔষধ নিচ্ছে কিনা খেয়াল করা কি মেয়ে হিসেবে আমারো দ্বায়িত্ব ছিল না।

 

আব্বা যদি ভালো বাবা না হোন, আমিও তো ভালো মেয়ে না। না ভালো স্ত্রী হয়েছি। মুবিন আমার চেয়ে বয়সে বেশ বড় ছিল, লেখাপড়া বেশিদূর করেনি, কিন্তু লোকটা খারাপ ছিল না, আমার উপর কখনো স্বামিত্ব ফলায় নি, জোর করেনি। সেই লোকটা যখন জীবিত ছিল, কী অনিহাই না দেখাতাম। অথচ তার মৃত্যুর পর এত শোক কোথা থেকে আসলো! আমিও কি তাহলে অভিনয় করছি না! জীবিত যে লোকটা কে একটা ফুল কখনো দেই নি, তার কবরে আজ মালা দিতে চাওয়াটা তো উপহাসই। 

 

হঠাৎ একটা পর্দা চোখের সামনে উন্মোচন হয়ে গেল যেন, ভালো মেয়ে হইনি, ভালো স্ত্রী হইনি। তবে ভালো বোন তো হতেই পারি। সম্পর্কের এই ঢিলে হয়ে আসা সুতো কি আমি পারবো শক্ত বাঁধনে বাঁধতে। ভাইয়ার সাথে শত্রুতায় যেতে চাই না, আবার নিজেদের অধিকার ও ছেড়ে দেব না। ভালো বোন হওয়ার একটা চেষ্টা লতার জন্য হলেও করবো।

 

“আনু চাচা ভিতরে যাই চলেন,আব্বার গোসল দেব।”

 

আনোয়ার চাচার সাথে আরো কয়েকজন কেঁদে উঠেছিলেন, কিন্তু  ভাইয়ার নির্লিপ্তততায় সবাই একটু থতমত খেয়ে যায়।

 

“তাতো অবশ্যই বাবা, তোমার জন্য ই অপেক্ষা করছিলাম। না হলে লাশ তাড়াতাড়ি দাফনের ব্যবস্থা করাই উত্তম। “

 

আনোয়ার চাচা নিজেকে সামলে নেন।

 

বাদ যোহর আব্বার লাশ সমাহিত হবে, বাড়ির পিছনে, মুরুব্বি রা এটাই ঠিক করেছিলেন।

 

“আব্বার লাশ মসজিদের কবরস্থানে দাফন করবো।”

 

ভাইয়ার কথায় একটু চমকালেও, অবাক হইনি। কেন জানি মনে হচ্ছিল ভাইয়া বাড়িতে দাফন করতে না করবেন।

 

“কেনো হিল্লোল বাবা , বাড়িতেই তো ভালো, জায়গা তো আছে। তোমরাও যখন তখন কবর জিয়ারত করতে পারব।”

 

“চাচা সেটাতো মসজিদের কবরস্থানেও পারব। বাড়িতে থাকে মেয়েরা, তারা তো আর কবর জিয়ারত করতে পারবে না। আমি ঢাকা থেকে আসবো যখন, তখন সেখানেই জিয়ারত করবো।”

 

“আব্বার দাফন বাড়িতেই হবে ভাইয়া, তোমার অংশে না করলে আমার আর লতার অংশে করবো।”

 

ভাইয়া যেন কেঁপে উঠলেন আমার কথায়।

 

কাঁপুক, সারাজীবন কথা বলিনি, তাতে লাভ কিছু হয়নি। এখন বলে যদি হয়, তবে তাই হোক।

 

Rukshat Jahan

 

চারুলতা ভালোবেসেছিল 

ধারাবাহিক গল্প পর্ব৪

 

ভাইয়া খুব দ্রুত নিজেকে সামলে নিলো, “তোমার আর লতার অংশ মানে? বাবা মারা গেলেন ছয় ঘন্টাও হয়নি, এরমধ্যেই আমার অংশ, তোমার অংশ ভাগাভাগি, চমৎকার চারু। “

 

“ভাইয়া, বড়মার কবর এ বাড়িতে, আম্মারও এ বাড়িতে, তাহলে আব্বার কবর কেন অন্য জায়গায় হবে? আমি ভাগাভাগি করছি না, তুমি ভুল বুঝেছ। আমি বলতে চাইছি এটা আব্বার বাড়ি। আর আমরা তিন জনই ওনার সন্তান। তুমি একা সিদ্ধান্ত নিতে পার না।”

 

ভাইয়া রেগে যাচ্ছেন বুঝতে পারছি। কিন্তু আমি সত্যি চাই আব্বার নিজের বাড়িতে তার কবর হোক।

 

“হিল্লোল বাবা, চারু কিন্তু অন্যায় কিছু বলেনি। মসজিদের কবরস্থানে তারাই সাধারণত কবর দেয় যাদের নিজস্ব জায়গা নাই। তোমার আব্বার দুই স্ত্রীর কবরের পাশে তার কবর হওয়াই শোভনীয়।”

 

উপস্থিত সকলের সায়ে কথা আর আগায় না, ভাইয়া বিরক্ত হলেও মেনে নেয়। আব্বার কবর খোঁড়া হচ্ছে, মেয়েদের সামনে যাওয়ার নিয়ম নেই, তাই দোতলায় আব্বার ঘরের জানালা থেকে আমি আর লতা দেখছি।

 

“চারু, আরাফ আর আনান এর জন্য কেক আর বিস্কুট আনিয়ে অনেক উপকার করলা। তাড়াহুড়ায় আমি কিছু নিতে পারি নাই ওদের জন্য। বাইরে তো অনেক মানুষ, নাস্তা দিয়ে দেই কী বলো?  “

 

নীলু ভাবি দুই বাচ্চা কে নিয়ে আজ এই রুমেই আছেন, ভাইয়া সরাসরি লাগেজ এই রুমে উঠিয়েছেন।

 

“ভাবি অন্যদের জন্য  কিছু তো আনাইনি, কী নাস্তা দেবেন?”

 

“আমার ভাইয়া বাজার থেকে নিয়ে এসেছেন নাস্তা, পরোটা আর সবজি ভাজি। ওটাই দেই। চা এর ঝামেলা এখন আর করা যাবে না।”

 

ভাবির সাথে লতাও গেলো মেহমানদের নাস্তা দিতে।

দুপুরের খাবার ভাইয়ার মামার বাড়ি থেকে আসবে, রাতে আনু চাচার বাড়ি থেকে। কাল আব্বার বন্ধু হামিদ চাচা আর রাতে রাবেয়া খালার পরিবার দেবেন। রাবেয়া খালা আমাদের প্রতিবেশী। গ্রামের বাড়িতে এমনই হয়। মৃত লোকের বাড়িতে পরিচিত মানুষ, আত্মীয় স্বজন একেকজন একেক বেলায় খাবার পাঠায়। আমার নানা বাড়ির দিকে কেউ খাবার পাঠাতে যোগাযোগ করেনি। অবশ্য করার কথাও না। আশ্চর্যজনক ভাবে মৃতমানুষের বাড়িতে পাঠানো এই খাবার খুবই মজা হয়। বাবুর্চি দিয়ে রান্না করায় সাধারণত। ভাত, গরুর মাংস, বুটের ডাল, সাথে লাউ, এ রকমই থাকে মেনু। যত মানুষ আসে সবাই খেয়ে যায়। মৃত বাড়ির শোক থেকে উৎসবের আমেজ আসে।

 

“চারু, লতা, আব্বা দোকান বিক্রি করবে ঠিক করেছিলেন জানোই তো। ছাব্বিশ লাখ দাম উঠেছে দোকানের। আমি যেহেতু চাকরি করি দোকান দেখা সম্ভব না, আর তোমরা দু’জন মেয়ে মানুষ এসব বুঝবে না। তাই আমার মনে হয় এখন দোকানটা বিক্রি করাই ঠিক সিদ্ধান্ত।”

 

রাত সবে সাড়ে আটটা বাজে। ভাইয়ার মামা, খালা খালু, আনোয়ার চাচা, আব্বার ব্যবসায়ী মহলের বন্ধুরা অনেকেই উপস্থিত আছেন। ভাইয়াই থাকতে বলেছেন হয়তো। সবার সামনে কথা বলবেন বলে।

 

“ভাইয়া তুমি তো দোকান বিক্রির বিরুদ্ধে ছিলে, তাহলে এখন করতে চাও?”

 

ভাইয়া প্রস্তুতি নিয়েই বসেছেন, তাই উত্তর গোছানো।

 

“হ্যাঁ, করোনার শুরুর সময় থেকে হার্ড ওয়্যারের ব্যবসা ভালো না যাচ্ছে না। মফস্বলে আরও চলে না। আর আমি চাকরি করি দোকান কে দেখবে? ভাড়াও হবে না বেশি টাকায়। তখন মানা করছি কারণ বাবা না হলে আরেকটা বিয়ে করে টাকা ওড়াতো। “

 

‘আরেকটা বিয়ে’ কথাটার মধ্যে কেমন ব্যঙ্গ। 

অথচ আব্বা জীবিত থাকতে তার সামনে ভাইয়াকে খুব কমই মুখ খুলতে দেখেছি।

 

“ঠিক আছে করো তাহলে।”

 

আমি এত সহজে হ্যাঁ বলবো ভাবেনি ভাইয়া। কিন্তু আসলেই আব্বার অনুপস্থিতিতে দোকান রাখার পক্ষে আমি আর লতাও নেই। ক্যাশ টাকাটাই ভালো, তাছাড়া দোকান দেখার বা চালাবার কেউ নেই।

 

“ঠিক আছে, তোমার আর লতার জন্য পাঁচ লাখ দেব, বাকি টাকা আমার, রেজিষ্ট্রেশন এর টাকা তোমাদের থেকে কাটবো না।”

 

“আমাদের পাঁচ লাখ কোন হিসেবে ভাইয়া !! ভাইয়ের তিন ভাগের এক ভাগ বোন পায়, সে হিসেব তুমি যা পাবে,তার তিন ভাগের এক ভাগ লতা আর আমি পাব। তুমি ছাব্বিশ লাখ থেকে থেকে তেরো লাখ পেলে বাকি তেরো লাখের অর্ধেক আমার অর্ধেক লতার।”

 

ভাইয়ার মামা খালারা হইহই করে উঠলেন, “এটা কি হিসেব হলো?”

 

“আমরাও আব্বার মেয়ে, আব্বার বৈধ সন্তান, 

অবৈধ না যে লাম ছাম একটা দিলেই হলো।”

 

লতা রেগে বলে উঠলো। লতাটা চিরকাল ঠোঁটকাটা।

আমি ঝগড়া চাই না, ওর হাত চেপে ধরলাম। কিন্তু বসার ঘরের মানুষগুলো দুইভাগ হয়ে গেলো। ভাইয়া উচ্চশিক্ষিত, বড় চাকরি করে, তাই শুরুতে গালাগালিতে গেল না। কিন্তু ভাইয়া স্পষ্ট স্বরে জানিয়ে দিল সে আব্বার প্রথমঘরের সন্তান, একমাত্র উত্তরাধিকারী। বেশি বাড়াবাড়ি করলে আমাদের কিছুই দেবে না, বরং ঘাড় ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় বের করবে।

 

“বড়মার মতো আম্মাও আব্বার স্ত্রী ছিলেন। ভাইবোনের সঠিক হিসেবেই আমরা পাব, আপনি ধাক্কা দিয়ে বের করার ক্ষমতা রাখেন না।”

 

আমিও চুপ থাকলাম না।

 

ভাইয়ার খালা ফুঁসে উঠলেন, “আমার বোইনের সাথে তোমার মায়ের তুলনা আসে ক্যামনে? ফকিন্নির ঝি, না বাপের বাড়ি আছিল না বাপ মা। বারো ভাতারির মাইয়া ছিল তোমার মা, তার লগে আমার বইনের তুলনা! দুলাভাইয়ের মাথা খারাপ হওয়ায় বিয়া করছে, নাইলে আমাগোর বাড়ির কামের বেটির যোগ্য নি তোমার মা।”

 

পরিপাটি শাড়ি পরা, মার্জিত সাজে বসে থাকা খালার মুখের ভাষা আমাদের দুইবোন কে রক্তাক্ত করে দিয়েছে যেন। না চাইলেও নিজেকে ঠান্ডা রাখতে পারিনি।জবাব, পাল্টা জবাবে বসার ঘর উতপ্ত।

আমি দৃঢ়ভাবে যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করলেও, লতার ধৈর্য কম। লতা, ভাইয়ার খালার সাথে সমানে সমান চিৎকার করেই যাচ্ছে, ভাইয়া ও ভদ্রতার মুখোশ খুলে ফেলেছেন।

আমাদের তিনি কোনদিন ও বোন বলে মানেন না, এতদিন নিশ্চয়ই আম্মা তলে তলে বহু টাকা পয়সা সরিয়েছে, আব্বা কে নিঃস্ব করে ব্যাংক ব্যালেন্স নাকি রেখে গিয়েছে , যা মনে আসছে তাই বলছেন।

অথচ তিনি নিজেও জানেন এটা সত্যি নয়। আব্বা সে রকম স্বামী ছিলেনই না যে তার স্ত্রী তার মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খেতে পারবে। আম্মার হাতে হাত খরচের টাকাটা পর্যন্ত কোনদিন আলাদা করে দেয়নি আব্বা। 

 

কিন্তু ভাইয়ার অভিযোগ যে, আম্মাতো টাকা ঠিকই নিয়েছেন এতদিন, বাকি যেটুকু আছে সেটা ভাইয়ার প্রাপ্য। সেই  সম্পদও নাকি আমরা দুই ডাইনি এখন নিয়ে যেতে চাইছি। মফস্বলের এক সাধারণ ব্যবসায়ীর কী এমন সম্পদ ছিল তা সবাই জানে, তাও একপক্ষ দেখলাম সহমত পোষণ করলেন।

ভাইয়ার মামা আর খালা যেভাবে গলাবাজি করছেন, মনে হলো সম্পত্তি ভাইয়ার না, ওনাদের হাতছাড়া হচ্ছে। অথচ ওনাদের দু’টাকার লাভ নেই। বোনের মৃত্যুর পর বোনের ছেলের দ্বায়িত্ব কেউ নেয়নি, 

সংসারটা আমার নিরীহ মাই করেছেন, অথচ আজ নাকি তিনি ফকিন্নি, বারো ভাতারি। 

 

সমাজের কিছু মানুষই আছেন এমন। ঝগড়া লাগিয়ে আর ঝগড়া করে মজা পান। সেখানে একজন মহিলা, অপরিচিত আরেকজন মহিলাকে এক মুহূর্তে বারো ভাতারি বলে ফেলেন, পুরুষেরা নোংরা ইঙ্গিত করেন।

যেমন থেকে থেকে ভাইয়ার শালাও সুযোগে অশ্লীল ইঙ্গিত করে চলছে কখনো আমাকে, কখনো লতাকে।

উপস্থিত মুরুব্বীরা থামাতে চেয়ে ও পারছে না।

 

ভাবিকে দেখলাম এতক্ষণ এককোণে দাঁড়িয়ে ছিলেন, ঝগড়া চরম রূপ নিলে বাচ্চাদের নিয়ে উপরে চলে যান। না স্বামীর পক্ষ নিয়ে আমাদের সাথে ঝগড়া করেছে, না স্বামীকে থামানোর চেষ্টা করেছেন।

অবশেষে হামিদ চাচা আজকের মতো পরিস্থিতি সামলায়। আব্বার মৃত্যুর চব্বিশ ঘন্টাও হয়নি,অথচ আমরা কামড়াকামড়ি শুরু করে দিলাম। ঝগড়া থামার কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি আবার আগের মতো।

সবাই খেতে বসেছেন, গরুর মাংস রান্নাটা জটিল হয়েছে, বুটের ডাল আরেকটু নরম হলে টেস্ট বাড়তো, এগুলোই এখন আলোচনার বিষয়।

 

সহায় সম্পদ বন্টনের বাকি ঝগড়া কালকের জন্য তোলা থাকলো। প্রকৃতির নিয়মে আমারো ক্ষুদা লাগলো, শুরুতে মনে হয়েছিলো বেশি খেতে পারব না। কিন্তু পরে দেখলাম আসলেই রান্নাটা মজা হয়েছে, 

আরো দুবার ভাত নিলাম, সারাদিন ভালো করে খাওয়া হয়নি। ভাবিকে আর নিচে আসতে দেখিনি। খাওয়া যা বাঁচলো ভাইয়ার খালা নিয়ে গেলেন। কাল সকালে তো নতুন খাবার আসবেই, এগুলো নাকি নষ্ট হবে।

কিছু বললাম না। নিলে নেক। এতক্ষণ কষ্ট করে ঝগড়া করলেন, এই বাড়তি খাবার গুলো ওনার প্রাপ্য।

 

(চলবে)

 

Rukshat Jahan

 

চারুলতা ভালোবেসেছিল 

ধারাবাহিক গল্প পর্ব৫

 

লতা ফোন টিপছে। আমারও ঘুম আসছে না, সারাদিন ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা ভাবছি। অন্য দিন আমরা দু’বোন আলাদা রুমে ঘুমালেও আজ একসাথে শুয়েছি।

 

“লতা বারান্দায় বসবি? ভালো লাগছে না।”

 

“তুমি যাও আপু, আমি একটু পরে আসছি”

 

আজ আমি লতার রুমে শুয়েছি। আমাদের বাড়িটা পুরোনো আমলের। একটাই টানা বড় বারান্দা সব রুমের সাথে লাগানো। শহরের বাড়ি গুলোর মতো আলাদা ছোট ছোট বারান্দা না। ঘোরানো বারান্দার একপাশে কিছু ফুলের গাছ করেছে লতা। হাসনা হেনা ফুটেছে, কী মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে বাতাসে। কয়েকটা চেয়ার আর মোড়া পাতা আছে বারান্দায়। সব রুমের দরজা খুলেই এই বারান্দাটা আসা যায়। লতার রুমটা দোতলার মাঝামাঝি, তারপাশেরটা আমার রুম, এরপর সবচেয়ে কোণের রুমটা ভাইয়ার, যেটায় আজ ওনার শ্যালক আছেন।

 

ভাইয়া এবার ভাবিকে নিয়ে আব্বা আম্মার রুমে উঠেছেন। সে রুমটা বড় আর এটাচ বাথরুম আছে, কারণ হিসেবে এটা বললেও, মূল উদ্দেশ্য যে নিজেকে এখন গৃহকর্তা রূপে জাহির করা, সেটা আমি আর লতা ঠিক  জানি। থাকুক ঐ রুমে ভাইয়া, ভাইয়াকে গৃহকর্তা মানতে তো আমাদেরও আপত্তি নেই। কিন্তু আমাদের এ বাড়ির ভৃত্য মনে করায় আপত্তি আছে। ভাইয়া যদি গৃহকর্তা হোন, আমরাও এই পরিবারের মেয়ে, ভাইয়ারই বোন, হতে পারি আপন নই। কিন্তু তাই বলে ভাইয়া আমাদের ঠকাতে পারে না, দূর দূর করে তাড়াতে পারে না।

বারান্দায় এসে দেখি দখিনের চেয়ারে একজন নারীমূর্তি বসে আছেন। দূর থেকেই বুঝলাম ভাবি।

এত রাতে, ভাবিকে বারান্দায় দেখে অবাকই হলাম।

 

“ভাবি আপনি এত রাতে?”

 

“চারু, আমাকে তুমি করেই বলো। বয়সে আমি বড় ঠিক, তবে ননদ ভাবির সম্পর্কে তুমিটা বেশি ভালো লাগে।”

 

“জ্বি বলবো, অভ্যাস নেই তো, আস্তে আস্তে বলবো।”

ভাবি তুমি আমাদের দু’বোনের উপর রাগ তাই না?

কিন্তু আমি বা লতা এখনো কিছু করি না, 

আমার ডিগ্রি পাস সার্টিফিকেট দিয়ে কোন চাকরি পাচ্ছি না, লতার তো পড়াও শেষ হয়নি।

টাকার যে খুব দরকার আমাদের। “

 

নীলু ভাবি উঠে এসে আমার হাত ধরলেন।

 

“লতা, তোমার ভাইয়া যতই তার বাবার উপর রাগ করার ভান করুক, সে তার বাবারই সন্তান।

একই রকম বদরাগী, কারো মতামতের তোয়াক্কা করে না। স্ত্রী কে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, অবহেলা করা সে নিজেও স্বাভাবিক মনে করে।”

 

নীলু ভাবি কেঁদে উঠলেন 

 

“প্রেগন্যান্সির সময় জোর করে আমার চাকরি ছাড়িয়েছে তোমার ভাইয়া। দুই জমজ বাচ্চা নিয়ে আমি যেন আর্থিক ভাবে ওর উপর নির্ভরশীল থাকি তাই চেয়েছে ও। এবং হয়েছেও তাই। ভালোবেসে বিয়ে করেছি, তাই কাউকে নালিশ করব,  সাহায্য চাইব সে মুখ নেই। “

 

ভাবি একটু চুপ করলেন, কিন্তু ওনার আরো কিছু বলার আছে বুঝতে পারছি।

 

“আমি তোমাদের কোন সাহায্য করতে পারব না চারু, তবে তোমাদের উপর কোন রাগ নেই বিশ্বাস করো।হিল্লোলের মন এত ছোট, বিয়ের আগে বুঝিনি, মা হারা ছেলে হিসেবে ওর উপর একটা মমতা কাজ করতো।

সৎ মা, সৎ বোনের গল্প, ও এমন ভাবে করতো, 

যে তোমাদের সাক্ষাৎ শয়তান মনে হতো আমার।

তাই শুরুতে বিয়ের পর তোমাদের সাথে দূরত্ব বজায় রেখে চলতাম।”

 

ভাবির কথা অবাক হয়ে শুনছি, শান্ত কিন্তু গম্ভীর ভাব নিয়ে থাকা ভাইয়ার চরিত্রের এই দিকটা আমার অজানাই। হয়তো ভাইয়াকে কাছ থেকে খুব কম দেখেছি তাই বুঝিনি। ভাইয়া সবসময় বাইরে বাইরেই থেকেছেন পড়াশোনা আর চাকরির জন্য। 

 

” চারু আমি আস্তে আস্তে বুঝেছি, হিল্লোল মোটেও নরম মানুষ নয়, বরং বেশ জটিল। কিন্তু ততদিনে আমি প্রেগন্যান্ট, বাচ্চার ক্ষতি হবে চাকরি করলে, এই অজুহাতে হিল্লোল আমার চাকরি করা বন্ধ করলো।

ও এখন আমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কের এই রূপই ছোটবেলা থেকে ওর মনে আঁকা হয়ে গিয়েছে, অবচেতন ভাবে হোক বা সচেতন ভাবে, হিল্লোলও একরোখা, বদরাগী, ডমিনেটিং হ্যাসবেন্ডে পরিণত হয়েছে। “

 

ভাবিকে স্বান্তনার দেওয়ার মতো কোন কথা আসলে খুঁজে পাইনি। আমি আমার ভালোবাসা হারিয়ে কাতর ছিলাম, ভাবিকে দেখলাম তার ভালোবাসা থেকে পাওয়া আঘাতে কাতর হতে। ভাবি রুমে চলে গেলেন।

একা একা বসে আছি, রাত বোধহয় একটার বেশি,  মফস্বল শহরের জন্য গভীর রাত। লতা এসে দাঁড়ালো বারান্দায়, “আপু আমি হৃদয় ভাইকে ফোন দিয়েছিলাম, ভাইয়া কাল নোয়াখালীতে আসবেন। পুলিশ ট্রেইনিং সেন্টারে একটা কাজ নাকি আছে। বাড়িতে এসে আমাদের দেখে যাবেন, ভাইয়ার সাথেও কথা বলবেন বললো। “

 

লতার কথায় আমি বেশ চমকালাম। হৃদয় ভাই আসবেন! কতদিন পর এই নাম শুনলাম। লতা কখনো বলেনি ভাইয়ার সাথে ওর যোগাযোগ আছে। ভাইয়া এখন পুলিশের সাব ইনস্পেকটর, শেষ দেখা হয়েছিলো চার বছর আগে। অথচ আজও মনে হয় এই তো সেদিনের ঘটনা। আমরা একসাথে সাপলুডু খেলেছি, আম মাখা খেয়েছি, গাছের তলায় পাকা জাম কুড়িয়েছি। ভাইয়া আমার তিন বছরের বড় হলেও সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো।

 

হৃদয় ভাই আমাদের ফুপাতো ভাই, আম্মার পরে যদি আমরা দুইবোন কারো কাছে আদর আহ্লাদ পেয়েছি, তবে তা ফুপুর কাছে। কিন্তু ছোট্ট একটা ঘটনায় সেই ফুপু আমাদের থেকে দূরে সরে যান। যদিও সেই ছোট ঘটনার ফলাফল বেশ জটিল ছিল আমার জীবনে।

হৃদয় ভাই ফুপুর একমাত্র ছেলে, চারবোনের এক ভাই। বেশ আদরে বড় হয়েছেন ভাইয়া, দেখতে শুনতে সুপুরুষ, লেখাপড়ায় ভালো।

 

অষ্টাদশী আমার স্বপ্নের মানুষ ছিলেন হৃদয় ভাই। ফুপুর সাথে ভাইয়া যেদিন বাড়িতে আসতো, আমার বিকেলে প্রাইভেট পড়তে যাওয়া মাথায় উঠতো। স্যার আজ পড়াবে না, স্যার দেশের বাড়িতে গিয়েছেন, এমন কত বাহানা।

সেই বাহানার ক্রাইম পার্টনার হতো দোলা, আমার ক্লাসমেট, জানের বান্ধবী। দোলা রাবেয়া খালার মেয়ে, আমাদের প্রতিবেশী ওনারা। দোলাও তাই সারাদিন এ বাড়িতেই থাকতো। আমি, দোলা, লতা আর হৃদয় ভাই বারান্দায় সাপলুডু খেলতাম সারা বিকেল। ফুপু এসে ফাঁকে ফাঁকে বসতেন আমাদের সাথে।

 

ধীরে ধীরে ভাইয়ার আসা যাওয়া বেড়ে যায়। একদিন দুপুরে ফুপুর আগমন হয় ঝড়ের মতো। ভাইয়ার বইয়ের ভেতর প্রেমপত্র পেয়েছেন, সেটা নাকি আমার জন্য লিখেছেন ভাইয়া। ফুপুর সে কি রাগ, ভাতিজি কে আর একটুও সহ্য হচ্ছে না। ফুপুর একমাত্র ছেলে হৃদয় ভাই, ভাইয়ার যখন বিয়ে দিবেন, তখন নাকি সে রকম কোন রাজকন্যার সাথেই দেবেন, রূপে গুণে অনন্য হবে সে মেয়ে। আমার মতো মেঘ কালো মেয়ে কী ওনার সুন্দর ছেলের সাথে মানায়! ফুপুর ছেলের মাথা খেয়েছি আমি, না হলে না আছে রূপ না আছে গুণ, কী দেখে আমাকে পছন্দ করলো হৃদয় ভাই।

 

ফুপুর বিদায়ের পর আব্বার সমস্ত রাগ এসে পড়ে আমার উপর। এত মেরেছিলেন যে এরপর এক সপ্তাহ জ্বরে ভুগেছি। চার বছর আগের কথা, অথচ মনে হয় এইতো সেদিন। কত বয়স ছিলো আমার! মাত্র সতেরো  চলছিল। অনার্সে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সব মাথায় উঠলো। দোলা কেমিস্ট্রিতে চান্স পায় ঢাকার তিতুমীর কলেজে, আমাকে একা রেখে চলে যায় দুইমাসের মাথায়। একসময় হৃদয় ভাইকেও ফুপু ঢাকা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। অনার্সে ভাইয়া নোয়াখালী কলেজে পড়লেও, মাস্টার্স করেন ঢাকায়। আমার আর বাইরে পড়তে যাওয়া হয় না। আব্বা পড়াবে না ঠিক করলেও আমার কান্নাকাটিতে বিরক্ত হয়ে সরকারি মহিলা কলেজে ডিগ্রিতে ভর্তি করান।

 

কী লঘু পাপে আমি গুরু দন্ড পেলাম নিজেও জানি না।

ভালো একটা সাবজেক্টে অনার্সে ভর্তি হওয়ার সুযোগটাও পাইনি। কলেজে পড়ার একবছরের মধ্যে আব্বা বিয়ে ঠিক করেন, আঠারো উনিশ বছর বয়সী মেয়ের পাত্র তেত্রিশ বছর বয়সী ব্যবসায়ী মুবিন। 

আহ্ কালো মেয়ে!! একজন যখন অবশেষে এই কালো মেয়েকে পছন্দ করেছে, তাহলে এবার হাত পা বেঁধে হলেও বিয়ে নামক কুয়োতে ফেলে দিতেই হবে।

 

কত কান্না করেছি, আমি বিয়ে করতে চাইনি।

আশা ছিলো একদিন হয়তো আবার হৃদয় ভাইয়ের সাথে দেখা হবে, ফুপু হয়তো মেনে নেবেন। কতদিন আর আদরের ভাতিজীর সাথে রাগ করে থাকবেন!

ছেলের পছন্দ অবশ্যই মেনে নেবেন। কিন্তু লাভ হয়নি, 

আব্বার মতে মুবিনের আয় রোজগার ভালো, ভালো পরিবারের ছেলে। আমার মতো কালো মেয়ের জন্য এরচেয়ে ভালো পাত্র হয় না।

 

মুবিন আসলেই ভালো মানুষ ছিলেন নিঃসন্দেহে।

লেখাপড়া বেশিদূর করতে পারেননি ঠিক, তবে আচরণে বহু শিক্ষিত মানুষের চেয়ে সেরা ছিলেন। 

এইচএসসি পাশের পর মুবিন ব্যবসায় ঢুকে যায়। বড় ভাসুর প্রবাসী ছিলেন, তবে অবৈধভাবে যাওয়ার কারণে ভালো কাজ পেতেন না, তাই শুরুতে বাড়িতে কোন টাকা পয়সা দিতে পারতেন না। সেই সময় শ্বশুর একা সংসার সামলাতে পারছিলেন না, তাই মুবিন অল্প বয়সে সংসারের হাল ধরে।

 

আমার বড় ভাসুর অবৈধ পথে ইটালি  গিয়েছিলেন, একসময় চুরির দায়ে ধরা পড়ে জেল খাটেন সাত বছর। সে সময়টা সংসার টেনেছে মুবিন। লেখাপড়া করার আর সুযোগ হয় নি। বড় ভাইয়ের সংসার দেখা, বোনদের বিয়ে দেওয়া এসব করতেই বয়স হয়ে যায় তেত্রিশ। বিয়ের পর মুবিন আমাকে সময় দিয়েছিলেন নতুন জীবনে মানিয়ে নেওয়ার জন্য। কালো ছিলাম বলে শাশুড়ি মায়ের আমাকে পছন্দ ছিল না , কিন্তু মুবিনের ইচ্ছেতে আমার সাথে ওর বিয়ে হয়।

 

আমার মাঝে নাকি অসম্ভব মায়া খুঁজে পেতো মুবিন।

কিন্তু আমার মনে যে হৃদয়ের বাস, মুবিনের ভালোবাসা আমাকে টানতো না।দোকান থেকে ফেরার পথে আমার জন্য হাতে করে কখনো টিপের পাতা, কখনো কাঁচের চুড়ি নিয়ে আসতেন মুবিন। কিন্তু সারা দুনিয়ার উপর একবুক অভিমান, অভিযোগ নিয়ে বসে থাকা আমি মুবিনের ভালোবাসা অবহেলায় ফিরিয়েছি। স্ত্রীর দ্বায়িত্ব পালন করতাম, কাছে যেতাম, কিন্তু  সবই হতো দায়সারা। তিনি বুঝলেও আমাকে কোনদিন জোর করেননি। এক বছর তেইশ দিনের সংসারে আমাকে সে তার মনের রানী করেই রেখেছিলেন। নিজেকে নিয়ে এত হীনমন্যতা আর হতাশায় ভুগতাম যে মুবিনের চোখে আমার জন্য মুগ্ধতা, আমার কাছে অভিনয় মনে হতো।  তাছাড়া হৃদয়  ভাই যে আমার মন জুড়ে বসেছিলেন, মুবিনার তাই ঠাঁই হয়নি।

 

বিয়ের আগে আমার একটা আশা ছিল, আমি পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াব, নিজেকে যোগ্য করব, ফুপু তখন আমাকে ফেরাতে পারবেন না। হৃদয় ভাইকে আমি আমার নিজের করে পাব। অথচ সেদিনের পর আর ভাইয়ার সাথে যোগাযোগ করার সুযোগও পাইনি। আমার বা আম্মার, কারো কাছে পার্সোনাল ফোন ছিল না। আর আব্বার ফোন থেকে ফোন করা অসম্ভব ছিল।

 

বিয়ের পর মুবিন ফোন কিনে দিয়েছিলেন, কিন্তু তখন আমি নিজেই আর যোগাযোগ করার চেষ্টা করিনি, কেননা তখন এই সম্পর্কের নাম হতো ‘ পরকীয়া’। ফুপু তো বাড়িতে আসাই বন্ধ করে দিয়েছিলেন। একমাত্র বোনের সাথে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ায় আব্বাও আমার উপর খুব রেগে থাকতেন। সবার কাছেই যেন আমি ব্রাত্য। শ্বশুর বাড়িতে মুবিন ছাড়া আর কেউ আমাকে আপন করে নেয়নি। তাইতো বাইক এক্সিডেন্টে মুবিন যখন মারা যায়, আমার আর সেখানে জায়গা হয়নি।

শাশুড়িতো রীতিমতো অপয়া ভাবতেন।

 আমি চারু, বোধহয় আমার আম্মার মতো মন্দভাগ্য নিয়ে দুনিয়ায় এসেছি। মুবিনের মৃত্যুর পর আমি বুঝেছি যে আমি কত বড় অভাগা, নিজে যাকে ভালোবেসেছি তাকে পাইনি, আমাকে যে ভালোবেসেছিল, তার ভালোবাসা পেয়েও গ্রহণ করতে পারিনি। হৃদয়কে কে মনে পুষে রেখে, মুবিনকে দূরে ঠেলেছি, তাই হয়তো আল্লাহ ওকে আমার কাছ থেকে নিয়ে গিয়েছেন।

 

“আপু, কী ভাবিস?”

 

লতার ডাকে বাস্তবে ফিরে আসি।

“হৃদয়  ভাইয়ের সাথে তোর যোগাযোগ আছে লতা? “

 

লতা একটু ইতস্তত করছে বুঝতে পারছি।

হৃদয় ভাইকে নিয়ে যা হয়েছে এরপর এ বাড়িতে আর আমরা কেউ ভয়ে ভাইয়ের নাম নিতাম না। পরিবারের বাইরের কেউ অবশ্য কিছু ভালো ভাবে জানে না। আব্বা আর ফুপু ঘটনাটা চেপে গিয়েছিলেন।

 

“আপু গত বছর ফুপু যখন মারা যান, তুই শ্বশুর বাড়িতে ছিলি। আম্মা আব্বার সাথে আমি গিয়েছিলাম ফুপুর বাড়িতে। তখন ভাইয়ার সাথে দেখা হয়, ভাইয়া আমাকে ফোন নাম্বার দিয়েছেন, মাঝে মাঝে কথা হয়।

এছাড়া ফেসবুকে নিয়মিত যোগাযোগ হয়। “

 

এ বাড়িতে ফিরে এসেছি আজ এত দিন হয়ে গেলো, অথচ এ কথা লতা একদিনও বলেনি। মাঝেমাঝে ওকে ফোনে কথা বলতে দেখি লুকিয়ে, কিন্তু কার সাথে তা জানার আগ্রহ বোধ করিনি। আসলে বিধবা হওয়ার পর সব কিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু লতাতো আমাকে বলতে পারতো। ও গোপন করলো কেন, আব্বার ভয়ে???

আজ আব্বা নেই দেখে কি ওর সাহস হয়েছে এত সহজে এসব বলার! আচ্ছা ভাইয়া কি কখনো আমার সাথে কথা বলতে চায়নি? আমি যে এখন বিধবা এটা নিশ্চয়ই জানেন। আমার কথা কী লতার কাছে জানতে চান হৃদয় ভাই!!

মনের মধ্যে আমার অসংখ্য প্রশ্ন। 

কিন্তু জিজ্ঞেস করতে পারছি না। 

হৃদয় ভাই বিয়ে করেনি জানি, আমার ফুপু চাঁদের মতো রাজকন্যা খুঁজে পাওয়ার আগেই মারা যান। ভাইয়া এখন পুলিশে চাকরি করছেন, পোস্টিং দূরে, সহজে নোয়াখালী আসা হয় না তাই।

 

“লতা তোর ফোন কি আব্বা কিনে দিয়েছিল? “

 

” হ্যাঁ আপু”

 

“কেন???  আমাকে তো দেয়নি,আর তোকে রীতিমতো স্মার্টফোনই কিনে দিলেন, বাহ্।”

 

“আপু কী হয়েছে তোর, হঠাৎ ফোনের পিছনে লাগলি কেন!! তোকে কেন দেয়নি তা তুই নিজেও জানিস।

আমাকে নিয়ে সে ভয় ছিল না, তাই দিয়েছেন।”

 

লতা কেমন রেগে গেলো।

 

আমি লতার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাই, লতা সুন্দরী, ছিপছপে, উচ্ছল তরুণী। কিন্তু আমি লতার মাঝে সেই অষ্টাদশী চারুকে খুঁজি।  লতার বয়সও এখন আঠারো। আচ্ছা চারু আর লতা কি একই হৃদয়ে হৃদয় দিয়েছে!!

 

(চলবে)

 

চারুলতা ভালোবেসেছিল 

ধারাবাহিক গল্প পর্ব ৬

 

সকালে নাস্তার পর আবার সবাই বসবে ঠিক হয়েছে। 

ভাইয়া আজই একটা ফয়সালা করে ফেলতে চান, আর আমরাও। কিন্তু গতরাতে লতার মুখে হৃদয় ভাই আসবে শুনে আমার আর কোন কিছুতে মন নেই। 

রাতে লতার সাথে আর কথা বাড়াইনি, দুইবোন চুপচাপ শুয়ে পড়েছি। সকালে দু’জনই স্বাভাবিক চলার চেষ্টা করছি। সবার খাওয়া যখন মোটামুটি  শেষ, তখন ঘড়িতে প্রায় নয়টা বাজে। এমন সময় বাইরে বাইক থামার শব্দ পেলাম। কিন্তু আমার নিজের হৃৎস্পন্দনও যেন বন্ধ হয়ে গেলো, যখন সেই পরিচিত কন্ঠস্বরটা শুনলাম এত বছর পর।

 

ভাইয়া, হৃদয় ভাইকে এখানে আশা করেনি। আমার আর হৃদয় ভাইয়ের ঘটনাটা ওর কানেও গিয়েছিল। 

যদিও ঐ ঘটনার আগে যে হৃদয় ভাইয়ের সাথে ভাইয়ার খুব মাখামাখি ছিল, তা কিন্তু না। ভাইয়া ফুপু বা হৃদয় ভাই কারো সাথেই খুব একটা মিশতেন না। ফুপু, আম্মাকে পছন্দ করে আব্বার সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন, এ জিনিস টা সম্ভবত ভাইয়ার মনে দাগ কেটেছিল। 

 

“হৃদয় তুমি এখানে হঠাৎ? নোয়াখালী কবে আসলা?

সাথে কে? “

 

হৃদয় ভাই সাথে জানি কাকে নিয়ে এসেছেন। আমি সরাসরি তাকাতে পারছি না, কেমন এক লজ্জা, আর ভয় মনকে গ্রাস করে রেখেছে। লতাকেও দেখতে পাচ্ছি না অনেকক্ষণ হলো।

 

“ভাইয়া ফুপার কবর জিয়ারত করতে আসলাম।

আমার সাথে আসলাম ভাইকে নিয়ে এসেছি। আসলাম ভাই মাইজদী কোর্টে আছেন। আপনারা শুনলাম সম্পদ ভাগাভাগি নিয়ে সমস্যায় আছেন। আসলাম ভাই এই ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবে। “

 

হৃদয় ভাই পরিমিত হেসে উত্তর দিলেন। আগের চেয়েও যেন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন তিনি।পুলিশের পোশাকটা কী মানিয়েছে ভাই কে। পুলিশ আর উকিলের উপস্থিতিতে ভাইয়ার মামা আর খালাকে একটু উসখুস করে উঠতে দেখলাম। খালার তো তখুনি জরুরি কাজ মনে পড়ে গেল। অথচ আজ সকাল সাতটা না বাজতে হাজির হয়েছিলেন আমাকে আর লতাকে শায়েস্তা করার জন্য। একটু হাসি পেল। হৃদয় ভাই যেন এখন নায়ক রূপে আছেন। লতা নেমে আসছে সিঁড়ি বেয়ে, এত সকালে গোসল করেছে, মিষ্টি গোলাপী সালোয়ার কামিজে কী স্নিগ্ধ লাগছে লতাকে।

 

লতা আম্মার মতো হয়েছে, খুব মায়াবী চেহারা। আর আমি হয়েছি আব্বার মতো। বাবার মতো চেহারা পেলে নাকি মেয়ে ভাগ্যবতী হয়!! তাহলে আমার এমন মন্দভাগ্য কেন? এতবছর পর যখন মনের মানুষের দেখা পেলাম, তখন সামনে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে নিজেরই ছোট বোন দাঁড়িয়ে আছে।

 

“হৃদয়, ফুপা ফুপির মৃত্যুর পর তো আমরা তোমাদের জায়গা জমি ভাগ করার ব্যাপারে সাহায্য করতে যাইনি। তাহলে তোমার এত দরদের কী কারণ? পুরানো পিরিতি জেগে উঠেছে নাকি? “

 

ভাইয়া রিতীমত রাগ। কিন্তু হৃদয় ভাই দেখলাম স্বাভাবিক। বললেন, “কারণ আমার চার বোনের সাথে কোন অন্যায় হয়নি। তাই অন্য কারো সাহায্যের তাদের  প্রয়োজন হয়নি। চারু আর লতা তোমার সৎ বোন হতে পারে, কিন্তু তোমরা তিন জনই আমার আপন মামাতো ভাই বোন। “

 

বেশ কিছুক্ষণ বাকবিতণ্ডা চললেও, শেষ পর্যন্ত উপস্থিত সবার পরামর্শে ভাইয়া উকিলের সাহায্য নিতে বাধ্য হোন। পুলিশের লোক বলে হৃদয় ভাইয়ের অবস্থানই আলাদা, আর হৃদয় ভাই আমাদের দু’বোনের ঢাল হয়েছেন এটাও সবাই বুঝতে পারছেন। শেষ পর্যন্ত সব কিছু এত সহজে সমাধান করতে পারব তা আমি আর লতা কোনদিন ভাবিনি। কৃতজ্ঞতায় মন ভরে গেল যেন। বাড়ির পিছনে পুকুর ভরাট অংশের জায়গার পরিমান পুরনো বিল্ডিং এর তিনগুন। আগে সেখানে বড় পুকুর ছিল, আব্বা সেটাতে নতুন বিল্ডিং করবেন ভেবে ভরাট করেছিলেন।

 

সিদ্ধান্ত হয়, আমরা দুইবোন এই পুরানো বিল্ডিং টা পাব, যেহেতু নতুন বাড়ি তোলা আমাদের পক্ষে এখন সম্ভব না। তার বিনিময়ে ভাইয়াকে বড় জায়গাটা ছেড়ে দেব। আমরা দুইবোনই তাতে রাজি হই। দোকানের টাকাটা তিন ভাগের এক ভাগ হিসেবেই ভাগ হয়।

আব্বার নিজের একাউন্টে সামান্য টাকাই ছিল, সব মিলেয়ে লাখ দেড়েক,  সেটাও ভাগাভাগি হয়।

জমিজমা গ্রামে, তবে আমি আর লতা জমির দাবি ছেড়ে দিয়ে তার বিনিময়ে ভাইয়ার কাছ থেকে ক্যাশ টাকা পাব ঠিক হয়। গ্রামের জমি দেখাশোনা করা বা দখলদারি হতে রক্ষা করা আমাদের জন্য কষ্টসাধ্য। 

 

দুপুরে হৃদয় ভাই এখানেই খেয়েছেন, লতা নিজে ভাইয়াকে সার্ভ করে। আমি নিজেকে যেন একদম গুটিয়ে নিয়েছিলাম, লতাই যেন আজ এ বাড়ির কর্ত্রী স্থানীয়। আমি শুধুই দর্শক।ভাইয়া দেখলাম একটু ফোঁড়ন কাটলেন

 

“হৃদয়ের কি প্রেমের কাঁটা ঘুরে গিয়েছে?”

 

“ভাইয়া কী বোঝাচ্ছেন বুঝতে পারছি না। তবে আমার মনের  মানুষ সবসময় একজনই ছিলো। “

 

পরিষ্কার স্বরে বললেন হৃদয় ভাই। একমুহূর্তের জন্য আমার পৃথিবী যেনো থমকে গেলো, সাথে মনে হলো লতারও। একটু আগের হাসি মাখা মুখটা মলিন হয়ে গেল যেন। 

 

বিকেলে দোতলার বারান্দায় বসে আছি, হৃদয় ভাইয়া বেরিয়ে যাবেন একটু পর। ঝড়ের মতো আসলেন, আবার চলেও যাচ্ছেন। আমাদের দুইবোনের জন্য যেনো ত্রাতা হয়ে এসেছেন এই অল্প সময়ে। তবে চলে যাওয়ার পর হয়তো আমাদের দুজনকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে যাবেন।

 

“চারু যাচ্ছি আমি। “

 

বিদায় নিতে এসেছেন হৃদয় ভাই, চার বছর পর প্রথম কথা,তাও বিদায়। কাঁদলে খুব খারাপ দেখাবে, প্রাণপণে চেষ্টা করছি না কাঁদার।একটা বিধবা মেয়ে স্বামী ছাড়া অন্য কারো জন্য কাঁদলে কেমন বাজে হবে সেটা। 

 

“চারু আমার উপর খুব রাগ তাই না। তোমার জীবনটা আমার জন্য কত এলোমেলো হলো। আম্মা এমন করবেন আমি সত্যি ভাবিনি। মাফ চাওয়ার ভাষা নেই আমার। এত লজ্জিত ছিলাম যে আর সামনে আসার সাহস হয়নি।”

 

মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছি আমি। সময় আমাকে বয়সের আগেই পরিণত করে দিয়েছে, কিন্তু মনটা যে এখনো নেচে বেড়ায়।

 

“চারু আমি আরও তিনদিন আছি নোয়াখালী, কাল আবার আসব ইনশাআল্লাহ। সব সমাধান করে তবেই যাব। চার বছর আগে তোমাকে বিপদের হাত থেকে বাঁচানোর মতো সাহস বা শক্তি ছিল না। কিন্তু আজ আছে।তোমার বা লতার কারো ক্ষতি হবে না, ভরসা রাখ। “

 

কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই চলে যায় হৃদয় ভাই।

ভাইয়া আর ভাবি আরো দুইদিন থাকবে। আব্বার জন্য মিলাদ পড়াবেন আর এতিম খাওয়ানো হবে। যেহেতু আমরা দুইবোন টাকা পেয়েছি, তাই মিলাদ আর এতিম খাওয়ানোর খরচে আমাদের ও শরিক হতে হবে।

কত খরচ হবে, কী আয়োজন হবে তাই নিয়ে নিচে আলোচনা চলছে। লতা আমার জন্য ছাদে চা নিয়ে এসেছে। 

 

“আপা হৃদয় ভাইয়ের সাথে তোর কী নিয়ে কথা হয়েছে? “

 

“কেন, সেটা তোর কী দরকার? “

 

“আপা এত ঝামেলা হলো, অসম্মান হলো, তাও মন ভরেনি তোর? লজ্জা করে না, তুই তো বিধবা এখন।”

 

লতা কে আমার এখন বিষাক্ত লাগছে, মনে হচ্ছে ছাদ থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেই। 

ছিঃ! এ কী ভাবছি আমি, আমি কি পাগল হয়ে গেলাম!

 

“লতা তুই কী বলছিস তুই নিজে ভেবে দেখ। আর তোর এত গায়ে লাগছে কেন? হৃদয়ের ব্যবহারে তো আমি তোর জন্য আলাদা কোন ফিলিংস দেখিনি। “

 

“তাহলে কী তোর জন্য ফিলিংস দেখেছিস, কী ফিলিংস দেখালো শুনি? লুকিয়ে চুমু খেয়েছে বুঝি।

তোর তো একবছরের বিয়ের অভিজ্ঞতাও আছে।

ছলাকলা ভালো জানার কথা।”

 

সর্বশক্তি দিয়ে চড় মারলাম লতার গালে, কাল পর্যন্ত ভালো বোন হতে চেয়েছি, আর এখন মনে হচ্ছে ওর গলা টিপে ধরি।

 

(চলবে

 

চারুলতা ভালোবেসেছিল 

ধারাবাহিক গল্প পর্ব৭

 

লতাকে থাপ্পড় মেরে আমি নিজেই নিজের কাছে ছোট হয়ে গেলাম। হ্যাঁ খুব নোংরা ইঙ্গিত করেছে লতা, কিন্তু এই তীব্র মোহ আর আবেগের সময় তো আমিও পার করেছি। মনের ভিতর কী ভাঙা গড়ার খেলা চলে এই আঠারো উনিশ বছর বয়সে, তা তো আমার অজানা নয়। আমার তো উচিত ছিল লতাকে বুঝিয়ে বলা, নিজের মাথা ঠান্ডা রাখা। কিন্তু আমিও আব্বার মতো মাথা গরম করে শাস্তি দিয়ে ফেললাম। শাসনের মানে তো শুধু গায়ে হাত নয়, একথা আমি নিজেই বলতাম,

আর আজ যখন সময় আসলো, আমিও তাই করলাম যা আব্বা করতেন।

এত বড় একটা মেয়েকে চড় মারাটা অনুচিত, এখন লতার মান অপমান বোধ তীব্র। এই দুনিয়ায় আপন বলতে আমাদের দুই বোনের আর কেউ নেই।

এ সময় হৃদয় ভাইকে নিয়ে আমাদের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব আমাদের আরও একা করে দেবে।

 

সন্ধ্যার পর থেকে লতা কে আর দেখেনি,  নিজের রুমে দরজা বন্ধ করে আছে। ভয় লাগছে উল্টো পাল্টা কিছু করে ফেলে কিনা। একবার মনে হচ্ছে গিয়ে ক্ষমা চাই থাপ্পড় মারার জন্য,  আবার যখন লতার বলা নোংরা কথা গুলো মনে পড়ে, অন্তর টা জ্বলে ওঠে। লতা ঠোঁটকাটা মানলাম, তাই বলে যা মনে আসে তাই কী বলবে! ভাবি খেতে ডেকেছিলেন, কিন্তু লতা বলেছে ওর পেট খারাপ, কিছু খাবে না। আমিও খেতে গেলাম না। ভাবি আমাদের দুইবোনের মধ্যে যে কিছু একটা ঠিক নেই তা বুঝতে পারলেন মনে হলো। আমাকে বলেছেন আমাদের সাথে কথা আছে,৷ বাচ্চাদের ঘুম পারিয়ে এসে কথা বলবেন। ভাবির অপেক্ষায় আমি বারান্দায় বসে আছি।

 

আজ রাতে বাড়িতে বাইরের লোক কেউ নেই। যে কয়েকজন ছিলেন রাত দশটার মধ্যে খেয়েদেয়ে চলে গিয়েছেন। বাড়িটা একদম নিরব। ভাইয়া ভাবি চলে গেলে আমরা দুইবোন কিভাবে থাকব এই নিশ্চুপ নিস্তব্ধতায়! ভাবতেই কেমন ভয়ভয় লাগে। ভাবির রুম থেকে ঘুম পাড়ানি গান ভেসে আসছে, জমজ দুই ছোট বাচ্চা নিয়ে ভাবি আসলেই দৌঁড়ের উপর থাকে। ভাইয়াকে বাচ্চাদের রাখার ব্যাপারে কোন সাহায্য করতে দেখি না, কিন্তু ছেলেরা কান্না করলে ভাবিকে ধমক দিতে ভোলে না। 

 

আমি  বারান্দায় বসে আছি। আজ নিজের রুমে ঘুমাতে হবে, লতাকে ডাকব না ভাবলাম। ও দূরত্ব নিয়ে চললে, আমিও একা থাকতে জানি। এমন সব এলোমেলো ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে আছি। হঠাৎ  প্রচন্ড রকম চমকে উঠলাম, কোমরে কে যেন হাত রাখলো! চমকে ফিরে তাকাতেই দেখি ভাইয়ার শ্যালক, সবুজ ভাই।

 

“বেয়াইন কি ভয় পেলেন?”

 

“নাহ ভয় পাইনি, তবে আপনি আমার নাম ধরে ডাকতে পারতেন, এভাবে পিছন থেকে গায়ে হাত দেওয়া অভদ্রতা। “

 

” বাপরে! বেয়াইন দেখি রেগে গেলেন। আমি তো ভাবলাম খুশি হবেন। বয়স কম আপনার, তার উপর একা মানুষ। কারো সঙ্গ পাওয়া তো খারাপ না।”

 

“আপা, ঘুমাবি আয়।”

 

লতা কখন এসে দাঁড়ালো টেরও পাইনি, কিন্তু এত ভালো লাগছে লতাকে দেখে।

 

“আর আপনি শুনেন ভাই, আপার একা লাগা নিয়ে না ভেবে নিজের বৌয়ের কথা ভাবেন, আপনি এখানে আছেন, ওদিকে আপনার বৌ না জানি নিজের একা একা লাগা কার কাছে দূর করতেছে।”

 

সবুজ ভাই অপ্রস্তুত হলেও রেগে গেলেন, চড়া গলায় বললেন,  “লতা আর চারু এত ভাব নেওয়ার কিছু নাই। দুপুরে তোমরা দুইবোন ছাদে ঐ পুলিশের জন্য  কেমন কামড়াকামড়ি করতেছিলা দেখছি আমি। তাই ভাবলাম একজনরে আমি ঠান্ডা করি।”

 

বলেই নিজের অশ্লীল হাসিটা দিলেন। ঘৃণায় গা রিরি করে উঠলো আমার। আচ্ছা বিধবা নারী, বয়স্ক অবিবাহিত মেয়ে, প্রবাসীর স্ত্রী, এমন একা নারীদের দেখলে এক শ্রেণীর পুরুষদের  কেন মনে হয় যে তারা যেকোন পুরুষের ডাকে সাড়া দেবে! একাকী নারী যেন সহজলভ্য। যে কেউ ইচ্ছে করলেই সুযোগ পাবে ভেবে নেয়।

 

“সবুজ ভাই কামড়াকামড়ি যখন দেখেছেন, তাহলে আমার থাপ্পড়ও দেখার কথা। আমার বোনকে যদি থাপড়াতে পারি, আপনি কে!!!  শুধু ভাবির কথা ভেবে এখনো হাত তুলিনি।”

 

“দে আপা একটা, অপেক্ষা করছিস কেন? আমাকে তো সাথে সাথে মারতে পারছিস, আর এখন কাজের সময় এত চিন্তার কী আছে।”

 

সবুজ ভাই হয়তো আমাদের পাল্টা  কিছু বলতেন, কিন্তু ভাইয়ার রুমের দরজা খোলার শব্দ হওয়ায়,  চোখ রাঙিয়ে সরে গেলেন।

 

“চারু, লতা কার সাথে কথা বলছিলে?”

 

“আপনার ভাইয়ের সাথে, আপুর একাকিত্ব নিয়ে খুব চিন্তায় আছেন তিনি।”

 

আমি কিছু বলার আগেই লতা বলে উঠলো। আমি একটু বিব্রত হলাম, যতই হোক ভাবির আপন ভাই। কথাটা নিশ্চয়ই ভালো ভাবে নেবে না।

 

“লতা আমার ভাই বলো, আর তোমার ভাই, এমন পুরুষের অভাব নেই যারা বাইরের মহিলার একাকিত্ব নিয়ে এত চিন্তা করে যে ঘরের মানুষটাকে আর সময় দিতে পারে না। “

 

ভাবির এত সহজ স্বীকারোক্তি আমরা দুইবোন আশা করিনি, ভেবেছিলাম ভাবি ওনার ভাইয়ের হয়ে প্রতিবাদ করবে। আমাদের কারও মুখে তাই সহসা কোন কথা আসে না। ভাবিই আবার কথা বললেন, “চারু তোমার আর হৃদয়ের কথা আমি কিছু কিছু তোমাদের হিল্লোল ভাইয়ের কাছে শুনেছি, তবে সে যতটুকু বলেছি তাতে নিশ্চয়ই তার নিজের মতো করে কাহিনী বর্ননা করেছে। আমি তোমার কাছে জানতে চাই আসলে কী ছিল, কতটা ছিল? “

 

আমি আড়চোখে লতা কে দেখি, লতা ও উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে।

 

“ভাবি বলার মতো কোন ঘটনা আসলে নেই। হ্যাঁ আমি মনে মনে সব সময় হৃদয় ভাইকে ভালোবেসেছি, কিন্তু মুখ ফুটে বলার কথা কোনদিন ভাবিনি। আসলে আমি কোনদিন চিন্তা ও করিনি যে ভাইয়াও আমাকে পছন্দ করে। বরং ভাবতাম এই কথা ভাইয়াকে বললে যদি ভাইয়া আমাকে নিয়ে তামাশা করে, বা আব্বার কাছে বলে দেয়। “

 

আসলেই আমি কাউকে কোনদিন বলিনি এই গোপন ভালোলাগার কথা, জানতাম শুধু আমি আর আমার ডায়েরি। আবার কথার খেই ধরি, “এরপর একদিন হঠাৎ ফুপু এলেন ঝড়ের মতো, হাতে একটা চিঠি, সেই চিঠি নাকি আমাকে লেখেছেন ভাইয়া। কী লেখা ছিলো সেই চিঠিতে আমি জানি না। তবে ফুপু বলেছিলেন প্রেম পত্র। “

 

“তার মানে হৃদয় তোমাকে কখনো সরাসরি কিছু বলেনি, কোন ইশারাও করেনি। কেননা একটা ছেলে যদি কোন মেয়েকে পছন্দ করে, তাহলে মুখে না বললেও তার আচরণে অনেক কিছু প্রকাশ পায়।

কোন ইশারাটা ভালোবাসার, আর কোনটা নোংরা এসব বোঝার তুমুল  অনুভূতি মেয়েদের জন্মগত।

হ্যাঁ ভালোবাসার মানুষ চিনতে হয়তো ভুল হতে পারে, তবে প্রেমে পরার আগের অনুভূতি গুলো কিন্তু মিথ্যা না।”

 

ভাবি একটানে অনেকটা কথা বললেন। আমিও ভাবনায় পরলাম, আসলেই তো সেদিনের সেই চিঠির আগে কখনো এমন মনে হয়নি যে হৃদয় ভাই আমাকে পছন্দ করেন। তবে কি সে চিঠি ষোড়শী সুন্দরী  লতার জন্য ছিল, আর ফুপু আমাকে ভেবে ভুল করেছিলেন!!

 

Rukshat Jahan

 

চারুলতা ভালোবেসেছিল 

ধারাবাহিক গল্প ( সমাপ্তি পর্ব) 

 

মফস্বল শহরে রাত বারোটা মানে বলতে গেলে গভীর রাত। গতরাতে ঘুমাতে পারিনি, আজ ও বোধহয় পারব না। লতাও জেগে আছে বুঝতে  পারছি। আমরা আজও একসাথেই শুয়েছি। আমার কথা শেষ হওয়ার পর ভাবি লতার কাছে জানতে তার কথা চেয়েছিল। হৃদয় ভাইকে নিয়ে যে লতারও অন্য রকম অনুভূতি আছে, তা আমার পাশাপাশি ভাবিও টের পেয়েছেন। 

 

নাহ, হৃদয় ভাই লতাকে ও ভালোবাসার কোন কথা বলেনি। দেড় বছর আগে ফুপুর মৃত্যুর সময় ভাইয়ার সাথে যখন দেখা হয়, তখনো নাকি লতার মনে এসব কিছু ছিল না। ভাইয়ার নাম্বার ছিল, মাঝেমাঝে কথা হতো এটুকুই। 

 

আমিও তখন বিবাহিত ছিলাম, শ্বশুর বাড়িতে সংসার করছি। ফেসবুকে চ্যাট আর ফোনে অল্প স্বল্প কথা বলতে বলতে লতা নিজের অজান্তে দুর্বল হয়ে পরে।

টিন এজ বয়সটাই হয়তো এমন। তাছাড়া আমার বিয়ে হয়ে গিয়েছে, ফুপু মারা গিয়েছেন, হৃদয় ভাই ভালো চাকরি করছে এবং সিঙ্গেল আছেন। এসব দেখে লতা ভেবে নিয়েছিল যে এবার পারিবারিক ভাবে হয়তো কোন সমস্যা হবে না। আমি হয়তো মন খারাপ করব, কিন্তু যেহেতু  নিজের সংসার আছে, লতাকে আটকাবো না। তবে আব্বা জীবিত থাকতে লতা কখনো সাহস পায়নি একথা বলার, তাছাড়া ততদিনে আমিও বিধবা হয়ে বাবার বাড়ি ফিরে এসেছি। লতা ভয় পেয়ে গিয়েছিল। তাই হৃদয়ের জন্য মনের টান আর আকর্ষণ সবার কাছে লুকিয়ে রেখেছে। 

 

মেয়েটা বড্ড বেশি অবুঝ, অবশ্য এ বয়সে আমিও এমন ছিলাম, হয়তো এখনো আছি। না হলে যে সহজ জিনিসটা ভাবি একমুহূর্তে ধরিয়ে দিলেন, সেটা চার বছরেও আমি বুঝতে পারিনি। কেমন বোকার মতো ছোটবেলার অবুঝ ভালোবাসা বুকে লালন করে গিয়েছি, নিজের ভাগ্য কে দোষ দিয়েছি। যে হয়তো আমার ছিল না, তাকে না পাওয়ার কষ্টে ক্ষতবিক্ষত হয়েছি।

 

মুবিন, হায় মুবিন! স্বামীর ভালোবাসা থেকে ওকে আমি বঞ্চিত করেছি।

 

তাই হয়তো অল্প বয়সে বিধবা হওয়াটা আমার নিয়তি ছিল, প্রকৃত ভালোবাসার মূল্য দিতে পারিনি বলে তা আমার হাতের মুঠো থেকে জলের মতো বেরিয়ে গেলো, 

আমি ধরে রাখতে পারিনি।

 

“আপা, আমাকে মাফ করে দে প্লিজ, আমি তোকে খুব বাজে কথা বলেছি।”

 

হঠাৎ লতা এসে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো।

অবুঝ বোনটা আমার, ওর উপরে রাগ করে থাকতে পারি না। আল্লাহ আমার মতো মন্দভাগ্য ওর না করুক, 

সত্যি যদি হৃদয়ের মনে লতার জন্য কোন অনুভূতি থাকে, আমি খুশি খুশি ওদের বিয়ের ব্যবস্থা করব।

এখনতো আমিই লতার অভিভাবক। 

 

উঠোনে প্যান্ডেল টাঙানো হয়েছে, মসজিদে মিলাদ পড়ানো শেষ। চমচম, সিঙ্গারা, নিমকি দিয়ে প্যাকেট করে নামাজের পর মুসুল্লিদের দিয়েছেন ভাইয়া।

আত্মীয় স্বজনেরা দুপুরে বাড়িতে খাবে। বাবুর্চি রান্না করেছে। কুলখানির খাবার যেমন হয়, মুরগীর মাংস,গরুর মাংস, বুটের ডাল, চিকন চালের ভাত আর লাউ। হৃদয় ভাই আর আমার বড় দুই ফুপাতো বোন এসেছেন পরিবার নিয়ে। আব্বার কুলখানি উপলক্ষে আপারা ঢাকা থেকে আসলেন। রাতে আমাদের বাড়িতেই থাকবেন। ভাইয়ার শ্যালক সবুজ ভাই আর আমাদের দুইবোনের সাথে কোন কথা বলার চেষ্টা করেনি, দুপুরের খাওয়াদাওয়া শেষে নাকি ঢাকা চলে যাবেন। সম্ভবত নীলু ভাবি কিছু বলেছেন তার ভাইকে।

 

ভাবি বলেছেন সুযোগ পেলে হৃদয় ভাইয়ের সাথে কথা বলবেন, ঢাকা ফেরার আগেই তিনি সঠিক বিষয়টা জানতে চান। ভাবির উপর সত্যি বলতে আমরা কৃতজ্ঞ।

আমাদের জন্য আর কেউ এতটা ভাবেনি, এমনকি ভাইয়া ও না। সম্পদের বন্টন শেষে ঢাকা ফিরে যেতে প্রস্তুত ভাইয়া, আমার আর লতার কথা  মনে হয় না কিছু ভেবেছেন। কিন্তু ভাবি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই আমরা সবাই সব জানতে পারি, এত দিন বয়ে বেড়ানো ভুল বোঝাবুঝির অবসান অবশেষ ঘটে, তবে বড়ো দেরিতে।

 

দুপুরের খাবার শেষে সবাই বারান্দায় চেয়ার পেতে বসেছেন। আমার ফুপাতো বোন দীলু আপা কিছু বলতে চান। আপা হঠাৎ সবার সামনে আমার হাত চেপে ধরেন ।

 

“চারু, বোন আমার, তোর সাথে কত অন্যায় হলো, তখন আমরাও আম্মাকে না বুঝে তোর বিরুদ্ধে  কথা লাগিয়েছি। কী করবো হৃদয় নিজে তোর নাম নিয়েছিলো। “

 

আমার হাত পা ঘামছে, মনে হচ্ছে জ্ঞান হারাবো,

হঠাৎ আমাকে শক্ত করে ধরলো একটা হাত, লতা আমার বোন, আমাকে ধরে আছে কী শক্তি আর ভালোবাসা নিয়ে।

 

” চারু,  আম্মা বেঁচে থাকতে হৃদয় কখনো আর কথা তোলেনি। আমরাও এতদিন তাই প্রকৃত সত্যটা জানতে পারিনি। জানিসই তো ঐ দিনের পর আম্মা ওকে ঢাকা পাঠিয়ে দেয়। আম্মার কত ইচ্ছে ছিলো নিজের পছন্দে ছেলের বৌ আনার , কিন্তু তার আগেই আল্লাহ আম্মাকে নিয়ে গেলেন।”

 

আপা কেঁদে ফেললেন বলতে বলতে।

 

“চারু, এতদিন পর হৃদয় আমাকে সত্যিটা বললো।

চিঠিটা তোর জন্য লেখেনি হৃদয়।”

 

লতার বাঁধন আস্তে আস্তে  ঢিলে হয়ে গেলো, আমার বুকের পাথরটাও যেন নেমে গেলো।

 

আপা বললেন “চিঠিটা রাবেয়া খালার মেয়ে দোলার জন্য ছিলো, চারু।”

 

একটা বোমা পরলেও বোধহয় আমি এত অবাক হতাম না, কী বললেন আপা, দোলা! আমার জানের বান্ধবী দোলা! আমাদের প্রতিবেশী রাবেয়া খালার মেয়ে দোলা! তাহলে দোলাই ছিলো হৃদয়ের মনের রানী।

 

দোলার জন্যই যখন তখন বাড়ি আসতেন ভাইয়া,

হায় বোকা মেয়ে আমরা! আমি আর লতা। আমার আর ভাবির চোখাচোখি হলো। লতা কাঠ হয়ে বসে আছে। হৃদয় ভাই মুখে তালা ঝুলিয়েছেন, মাটির দিকে তাকিয়ে বসে আছেন। আমার এতদিনের অন্ধ আবেগটা এক নিমিষে যেনো ফুঁ দিয়ে উড়ে গেলো।

 

“জানিসই তো রাবেয়া খালার স্বামী, হামিদ চাচার সাথে আব্বার সম্পর্ক ভালো ছিল না, আম্মাও দেখতে পারতো না। তাই আম্মা যখন চিঠিটা কার জন্য লেখা জিজ্ঞেস করলেন, হৃদয় নাকি ভয়ে তোর নাম বলেছে। “

 

এই লোক আসলে চিরকালই কাপুরষ ছিল, আজ ও তার হয়ে কথা বলতে আপাকে নিয়ে এসেছে।  

 

“চারু, হৃদয় ভেবেছিলো আম্মা তোকে এত আদর করে, তোর জন্য লেখা বললে কিছু মনে করবে না।

কিন্তু যখন আম্মা এত রেগে গেলেন, হৃদয়ের আর সাহস হয়নি সত্যি বলার। ও ভেবেছিলো আম্মা ঠান্ডা হলে, পরে তোকে সত্যি টা জানাবে। কিন্তু আম্মা এত হইচই করলেন, যে আর কিছু জানানোর সুযোগ হয়নি।”

 

চার বছরেও হৃদয় ভাইয়ের সাহস হয়নি সত্যি বলার, ভালোই। আর আমার ফুপুর সাহস হয়নি, ভাইয়ের আদরের মেয়েটাকে ছেলের ভবিষ্যত বৌ হিসেবে মেনে নেওয়ার। কেননা মেয়েটা সুন্দরী ছিল না। হৃদয়ের বলা একটা মিথ্যে, চারটা বছর ধরে আমার জীবনটা এলোমেলো করে রেখেছে। আর আজ কী অবলীলায় ওরা বলছে সামান্য ভুল বোঝাবুঝি। 

 

কাল পর্যন্ত হৃদয় ভাইকে আমাদের ক্রান্তিলগ্নে নায়ক হয়ে এসেছেন বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে হৃদয় ভাই সবসময়ই কাপুরুষ ছিলেন, আছেন, থাকবেন। কিছু বলার রুচি হলো না। যে সময় জীবন থেকে চলে গিয়েছে তাতো আর ফিরে পাবো না। 

 

এখন আমি লতাকে সামলাবো।চারু আর লতা ভুল করে কোন কাপুরষ কে ভালোবেসেছিল ঠিক, তবে এই বার তাকে মন থেকে ভুলে যাবে। চারু, লতা নিজের জন্য  বাঁচবে, নিজেদের ভালোবাসবে। সময়ের আবর্তনে যদি কেউ ভালোবেসে  জীবন সঙ্গী হতে চায় তবে ভালো, না চাইলেও আফসোস নেই। একবারই ভুল করে ভালোবেসে নিজেদর হারিয়েছিলাম আমরা, তবে আর না।

 

দোলার সাথে হৃদয় ভাইয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে।  ঢাকা গিয়েও নাকি দুজনের যোগাযোগ সবসময়ই ছিল। দোলার পড়াশোনা শেষ হয়েছে, ভাইও চাকরি করছে।

দুই পরিবারে আর বাঁধা দেওয়ার কেউ নেই।

এই দোলাও জানতো কত অবিচার হচ্ছে আমার সাথে, তারপরও নিজের স্বার্থের কথা ভেবে মুখ খোলেনি।

বিয়ে ঠিক হওয়ার পর এসেছিলো বাড়িতে, ঘরে আসা মেহমানের মতো আপ্যায়ন করেছি, বন্ধুত্বের বিসর্জনতো কবেই দিয়েছি।

 

যেহেতু ফুপুর পরিবারের কেউ এখন দেশের বাড়ি থাকেনা, তাই বিয়ের আয়োজন আমাদের বাড়িতেই হবে। আমরা দুবোন অবশ্য  স্বাভাবিক ভাবেই সব আয়োজনে অংশ নিচ্ছি। এখন আমরা নীলু ভাবির সাথে আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করি অবসর সময়ে। ভাবি আমাদের খালি রুম গুলো মহিলা বোর্ডিং করে ভাড়া দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, তাহলে এই বড়ো বাড়িতে আমাদের একা ও লাগবে না, আবার নিরাপত্তা ও থাকবো, সাথে আয়ও হবে।

 

নিচের গুদামঘর টা খালি করে কোচিং সেন্টার খুলব খুলবো। আমি আর লতা এলাকার বাচ্চাদের প্রাইভেট পড়াব। পাশাপাশি আমি প্রাইমারি নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করব। আর লতা তার পড়াশোনা শেষ করবে।

 

ভাইয়া, ভাইয়ার মতোই আছেন, দুই দিনে পরিবর্তন হয়ে যাবেন আশাও করি না। তবুও শেষ পর্যন্ত সম্পদের বন্টন যে তিক্ততা ছাড়া, সুন্দর ভাবে হয়েছে আমরা তাতেই খুশি। এই সব কিছুর মধ্যে আমাদের প্রাপ্তি আরেকটা বোন নীলু ভাবি। তিন ভিন্ন বয়সী তিন নারী, একে ওপরের শক্তি আর সমব্যথী হয়ে গিয়েছে নিজেদের অজান্তে। ভাবিও এখন আর ভাইয়ার কাছ থেকে পাওয়া অবহেলা নিয়ে কষ্ট পাবেন না বলেছেন।

 

ভাবির ইচ্ছে আছে বাচ্চাদের নিয়ে এখানে চলে আসার, নিজের মতো করে কুটির শিল্প বা বুটিক নিয়ে কাজ করবেন ভাবছেন। সব সময় শুধু পুরুষের কাছেই আশ্রয় পেতে হবে ভালোবাসা আর ভালো থাকার জন্য, এমন তো না। নিজেও নিজেকে ভালোবাসা যায়, ভালো রাখা যায়।

 

তাই চারু লতা ভালোবেসেছিল, এটা আর ঠিক না,

 

চারু লতা ভালোবাসে এখন নিজেকে, 

আর সেটা  অনেক বড় পাওয়া।

 

Rukshat Jahan

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।