গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন :: ২(মুখোশ)

পর্ব:: ৮১ (১ম ভাগ)

লেখক:: মির্জা শাহারিয়া

 

রাত ৩ টা। চারপাশ ঘোর অন্ধকার। দূর থেকে শিয়ালের ডাক ভেসে আসছে। আকাশ ঘন মেঘে ঢাকা। এক মেয়ে এক গাছের গোড়ার হাত দিয়ে কী যেনো টানছে। মুখে দুই ঠোঁট দিয়ে চেপে ধরে আছে ফ্লাশ লাইট জালানো মোবাইল। মেয়েটা আর কেউ নয়, নিপা। সে দ্বিতীয় গাছটার গোড়ায় একটা লাঠির মতো হাতল খুঁজে পেয়েছে। সে এটা ধরে টেনেই যাচ্ছে। কিন্তু কিছুই হচ্ছে না। সে তার হাত দুটো আবার ওড়নায় মুছে। সে এই শীতের রাতেও ঘেমে গিয়েছে। নিপা আবার ভালোভাবে বসে দুই হাত দিয়ে হাতলটা ধরে খুব জোড়ে টান দিতে থাকে। চোখ বন্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে টানতে থাকে। তখনই হঠাৎ হাতল টা মৃদু নড়ে উঠে আর সাথে সাথে দ্বিতীয় আর তৃতীয় গাছের মধ্যেবর্তী ফাঁকা যায়গাটার মাটি সড়ে যায় এবং একটা দরজার মতো ঢাকনা খুলে যায়। নিপার হাত থেকে হাতল টা ফসকে যায় আর সাথে সাথে সে পিছনে ছিটকে পড়ে। নিপা উঠে বসে। সে হাপাচ্ছে। মুখ থেকে ফ্লাস জালানো ফোনটা হাতে নেয় সে। উঠে দাঁড়ায়। এগিয়ে এসে সেই দ্বিতীয় আর তৃতীয় গাছ টার মর্ধোবর্তী স্থানের মাটি সড়ে খুলে যাওয়া ঢাকনাটার সামনে দাঁড়ায়। আকাশে বড় এক বিজলী চমকিয়ে উঠে। জোড়ে বাতাস বয়ে যায়। নিপার ওড়নার এক প্রান্ত হাওয়ায় উড়ছে। মাথায় ঘোমটা দেওয়া তাই চুল গুলো ওড়না ভিতরে‌। নিপা আজ বিকালে তার ঘরের দরজার নিচে আরো একটা কাগজ পেয়েছিলো। যেখানে লেখা ছিলো গাছের গোড়ার আগাছার মাঝে থাকা হাতল টার বিষয়ে। আর এর পর পরই নিপার কৌতুহলী মন তাকে এখানে নিয়ে এসে হাতলটা খুঁজে বের করায়। রাত এখন আড়াইটা কী তিনটা। দুদিন হলো রায়হান বাড়ি ফিরেনি। বলেছিলো আজ ভোরের দিকে আসতে পারে। তাই নিপা রাতেই চলে এসেছে এই হাতলের রহস্য উদঘাটন করতে। নিপা তার কোমরে গুঁজে রাখা ছুরি টা হাতে নেয়। সে ভেবেছিলো যদি কোন দরকার হিসেবে লাগে, তাই নিয়ে এসেছে। নিপা ফোনটাকে আবার দুইঠোটের মাঝে চেপে ধরে। ফোনটা ছোট বাটন ফোন। তাই নিতে বেশি একটা কষ্ট হচ্ছিলো না। নিপা দেখে একটা লোহার সিঁড়ি নেমে গেছে নিচের দিকে‌। নিপা আর সাতপাঁচ না ভেবে নিচে যাওয়ার জন্য এগিয়ে যায়। আগে পা নামিয়ে সিঁড়ির খাজে রাখে, তারপর হাত দিয়ে সিড়ির অংশ টা ধরে। সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে নিচে নেমে যেতে থাকে। নিচ টা ছিলো ঘন অন্ধকার। ফোনের ফ্লাসলাইটের আলোটা সামনে পড়ায় শুধু সিঁড়ির অংশটা ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছিলো না। নিপা সিঁড়ি ধরে ধরে নামছে আর নামছে। তার পা এখনো মাটির ছোঁয়া খুঁজে পায়নি। যতই নিচের দিকে নামছে ততই একটা গোমট গন্ধ ভেসে আসছে। একটা কড়া বাজে গন্ধ। নাকে বেশ লাগছে সেটা। নিপা নামতে থাকে, নামতে থাকে এবং এক পর্যায়ে পায়ের নিচে ফ্লোর পায়। সে সিঁড়ি থেকে ফ্লোরে নেমে পড়ে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে ফ্লোরে পানি ছিলো। পানিটা নিপার পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত। নিপা ফোনের লাইট টা মুখ থেকে হাতে নেয়। নিচে তাক করে দেখে পানিটা ঘোলা। কিছু ময়লাও ভেসে বেড়াচ্ছে তাতে। নিপা ফোনের আলো সামনে তাক করে‌। একটা সুড়ঙ্গ চলে গিয়েছে সামনে সোজা। কোন আলোর দেখা নেই। নিপা আস্তে আস্তে পা বাড়ায়। পানিতে টা পড়ার সাথে সাথেই ছলাৎ ছলাৎ শব্দ হচ্ছে। নিপা লাইট দিয়ে সুড়ঙ্গ টার চারপাশে দেখতে দেখতে এগিয়েই যায়। সুড়ঙ্গটা ইট, সিমেন্টের ছিলো। অর্থাৎ এটা বানানো সুড়ঙ্গ। নিপা হাতের লাইট সুড়ঙ্গের দেয়ালে ফেলতেই কিছু তেলাপোকা আর নাম না জানা কিছু পোকা দেখতে পায়। নিপা সাথে সাথেই ফোনের আলো নামিয়ে নেয়। তেলাপোকা তার অনেক ভয় লাগে। এখানকার দেয়ালে থাকা তেলাপোকা গুলা সাইজে বেশ বড় বড় ছিলো। দেখে তো মনে হয় উড়তেও পারে। নিপা সেদিক থেকে মন সড়াতে থাকে‌‌। সামনে কি থাকতে পারে সেটা নিয়ে ভাবতে থাকে। সুড়ঙ্গটা একদম সোজা চলে আসেনি। কিছুটা বেঁকেও গিয়েছে সামনে দিয়ে। নিপা সুড়ঙ্গ ধরে ধরে এগিয়ে যায়। বেশ কিছুক্ষণ হাটার পর সে দূরে সামনে আলোর দেখা পায়। সাদা লাইটের আলো। নিপা তার ছুড়িটা শক্ত করে ধরে নেয়। এগিয়ে যায় সেদিকে। যতই এগোচ্ছিলো আলোর পরিমাণ ততই বাড়ছিলো। সে হাঁটতে হাঁটতে পানির অংশ পেড়িয়ে একটা করিডোরে এসে উঠে। এই করিডোরে কোন পানি ছিলো না। নিপা করিডোরে উঠে পা গুলো মৃদু নাড়িয়ে পানি ঝেড়ে নেয়। করিডোরটার দেয়াল সাদা রং করা ছিলো। উপরের জ্বলছিলো সাদা এনার্জি লাইট। নিপা তার ফোনের ফ্লাশ অফ করে রাখতে চায়, কিন্তু কী ভেবে জেনো অফ করে না। তার কোমরের ওড়নার ভাঁজে গুঁজে রেখে দেয় ফোনটাকে। এগিয়ে যায় করিডোর ধরে। করিডোর টা তেমন বড় না। কিছুটা সামনে গিয়েই দেওয়াল দেখা যাচ্ছে। তবে সেই দেয়ালটা ছিলো এই করিডোরের শেষাংশ। নিপা এগিয়ে এসে দেখে আরেকটা করিডোর আড়াআড়ি ভাবে চলে গিয়েছে। নিপা তার ছুরিটা ধরে। হাতের বাম পাশে যেই করিডোর টা চলে গিয়েছে সেদিকে নজর দেয়‌। দেখে এইদিকের করিডোরে কিছু রুমের দরজা দেখা যাচ্ছে। মুখ ঘুড়িয়ে ডান দিকে তাকায়। এইদিকের করিডোর টা মাত্র দুটো দরজা দেখা যাচ্ছে। আর দুটো দরজা পড় পড়ই করিডোর শেষ। নিপা সিদ্ধান্ত নিতে থাকে সে কোনদিক টায় যাবে। তখনই হঠাৎ কারো পায়ের শব্দ। নিপা এলার্ট হয়ে যায়। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকে। তার মনে হতে থাকে জুতার শব্দ টা যেনো তার থেকে দূরে সড়ে যাচ্ছে। নিপা দেয়ালের আড়াল হতে চোখ তাক করে বাম করিডোরের দিকে। একজন লোক হেঁটে হেঁটে চলে যাচ্ছে। লোকটার পিছন টা দেখা যাচ্ছে। কাঁধে একটা ছোট্ট বস্তা ঝুলিয়ে ধরে আছে। নিপা আড়াল হতে দেখতে থাকে সেই লোকটাকে। লোকটা হেঁটে যেতে যেতে হঠাৎ পিছনে ফিরে তাকায়। নিপা নজর সড়িয়ে নেয়। লোকটা এমনি একজন হালকা দাড়ি-মোছ ওয়ালা লোক ছিলো। সে এই খাঁন বাড়ির কেউ না। লোকটা ভাবে কিছুই নেই। তাই সে আবার সামনে ফিরে চলে যেতে থাকে। নিপা জুতার শব্দ পেয়ে আবার তার এক চোখের মণি দেয়ালের আড়াল হতে বের করে। দেখতে থাকে সেই লোকটার চলে যাওয়াটাকে। হঠাৎ লোকটা ফিরে তাকায়। নিপা সাথে সাথে চোখ সড়িয়ে নেয়। এবার আর লোকটা ফিরে তাকিয়েই থেমে থাকে না। সে এপাস ফিরে হেঁটে হেঁটে এবার নিপার দিকেই আসতে থাকে। নিপা জুতার শব্দ শুনে বুঝতে পারে লোকটা এদিকেই আসছে। তার বুকের হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। দেয়ালের সাথে একদম পিঠ ঠেকিয়ে চুপটি করে থাকে। তার বুকের ভিতর টা ঢং ঢং করে ঘন্টার মতো বাজছে। লোকটা প্রায় কাছাকাছি চলে আসে। নিপা চোখ বন্ধ করে বিরবির করে কিছু একটা বলতে থাকে‌। তার চোখে মুখে ভয়। ঘাম বেয়ে পড়ছে। লোকটা প্রায় নিপার এদিকটায় এসেই যায়‌। আর দুই কদম পেড়োলেই সে তিন করোডোরের মোড়ে চলে আসবে আর নিপাকে দেখে ফেলবে। নিপা দেয়ালের সাথে একদম লেগে রয়। সে যেনো চাচ্ছিলো দেয়ালের সাথে মিশে যেতে। লোকটার পা এই করিডোরের দিকে পড়ে তখনই পিছন থেকে তাকে কেউ জেনো ডেকে উঠে। 

‘ তানভীর, কাজ শেষ হইছে তোর! ‘

লোকটা থেমে যায়। পিছনে ফিরে বলে,

‘ না ভাই। বস্তা নিয়া প্যাকেজিং রুমে যামু। ‘

‘ তাড়াতাড়ি আয়। কালকে মাল ডেলিভারি দেওয়া লাগবো। ‘

‘ জী আচ্ছা ভাই। ‘

বলেই লোকটা আবার যেই পাশ দিয়ে এসেছিলো সেই পাশে চলে যেতে ধরে। নিপা যেনো হাফ ছেড়ে বাঁচে। আবার লোকটা কি জানি ভেবে থেমে যায়। আর উঁকি দেওয়ার জন্য মাথা এগিয়ে নিতে থাকে তখনই আবার সামনে থেকে ডাক আসে। 

‘ তানভীর, তাড়াতাড়ি আয়। ‘

লোকটা আর তাকায় না। দৌড়ে করিডোরের ভিতরের দিকে চলে যেতে থাকে। নিপা তার আঁটকে রাখা দম ফোঁস করে ছেড়ে দেয়। আরেকটু হলেই ও যেনো ধরা পড়ে যেতো। কিসের প্যাকেজিং চলছে এখানে! আর লোকটাই বা কে ছিলো! 

নিপা তার বুকে থুতু ছিটায়। মায়ের কাছ থেকে শুনেছে এমনটা করলে বলে ভয় কমে। নিপা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দেয়ালে হাত দিয়ে বাম করিডোরের দিকে আবার নজর ফেলতে যায়। তখনই বিপরীত পার্শ্বের করিডোর অর্থাৎ ডান করিডোর থেকে দুইজনের কথার আওয়াজ পায়। নিপা তৎক্ষণাৎ আবার পিছিয়ে যায়। সে ডান করিডোরের দেয়ালের দিকে যায়‌। দেয়ালের আড়াল হতে তার চোখ বের করে দেখতে থাকে। ডান করিডোরে যেই দুটো রুম ছিলো তার মধ্যে একটা ছিলো করিডোরের সাইডে মানে রঞ্জুর আস্তানার মতো করে সাইডে দরজা। আর আরেকটা যেই দরজাটা ছিলো সেটা ছিলো বেশ কিছুটা দূরে, একদম শেষ মাথায়। অর্থাৎ করিডোর যেখানে শেষ ওখানেই দরজাটা সামনের দিকে মুখ করে আছে। নিপা দেখে সাইডের দরজা থেকে এক লোক আর এক মেয়ে বেড়িয়েছে। লোকটার পড়নে ফরমাল প্যান্ট। লোকটা একটু মোটা। গায়ে ফরমাল শার্ট। তার চোখে কাপড় বাঁধা। তাকে ধরে ধরে করিডোরের শেষ মাথার দরজার দিকে নিয়ে যাচ্ছে মেয়েটি। মেয়েটির পড়নে কালো জিন্স আর কালো টি শার্ট। মুখে মুখোশ। তবে এই মুখোশ তার পুরোটা মুখ কভার করেনি। তার চোখ থেকে নাকের নিচের অংশ শুধু মুখোশ দিয়ে ঢাকা। শহরের পার্টিতে যেই মাস্ক গুলো পড়ে, ঐরকম মাস্ক। মেয়েটা চোখ বাঁধা লোকটাকে ধরে ধরে করিডোরের শেষের দরজার দিকে নিয়ে যেতে থাকে। লোকটা কী যানি কথা বলছিলো মেয়েটার সাথে। মেয়েটা ‘ হু আর হা ‘ ছাড়া আর কিছুই বলছে না। নিপা লোকটাকে আরো ভালোভাবে পরখ করে। আরে, লোকটা তো তার শশুর আব্বা! উনি এখানে কী করছেন! 

নিপার মন বলতে থাকে, এখানে কিছুতো একটা হচ্ছে যা ঠিক নয়। এই বাড়ির নিচে এমন পাতাল আস্তানা থাকতে পারে এটা কেউ কল্পনাই করতে পারবেনা। তখনই নিপার মনে প্রশ্ন উঁকি দিতে থাকে,

‘ আচ্ছা রায়হান কী এই পাতাল সম্পর্কে জানে! ‘

তখনই নিপা করিডোরের দিকে আবার নজর দেয়। মেয়েটা তার শশুরকে নিয়ে করিডোরের শেষ মাথার দরজা দিয়ে সেই রুমে প্রবেশ করলো। করে দরজাটা ভিড়িয়ে দিলো। নিপা ওড়না দিয়ে মুখ আংশিক ঢেকে নেয়। তার মন কেমন জানি করছে। তার ভিতর টা যেনো বলছে সে আজকে নতুন কিছুর সাক্ষী হতে চলেছে। নিপা বা পাশে তাকিয়ে একবার বাম করিডোর টা দেখে। না, এদিকে কেউ নেই। এই সুযোগ। তাকে গিয়ে দেখতেই হবে তার শশুর সেই ঘরে গিয়ে কী করেন। নিপা ছুরিটা শক্ত করে ধরে দৌড় লাগায় ডান করিডোরের দিকে। তার দৌড়ের গতি যেনো বাতাস চেয়েও বেশি ছিলো। তার শরীর খুব বেশি রিয়েক্ট করছিলো মস্তিস্কের সংকেতে। নিপা এক দৌড়ে প্রায় চলে আসে এই রুমটার কাছাকাছি। সে দৌড়ের গতি কমায়। তার জুতার শব্দ হয়েছিলো দৌড়ানোর সময়। সে পিছনে ফিরে একনজর দেখে। না, বাম করিডোর থেকে কেউ বেরোয়নি। নিপা দৌড়ানো থামায়। সে দরজাটার কাছে চলে এসেছে। দরজাটা লাগানো ছিলোনা। ভিড়িয়ে দেওয়া ছিলো। নিপা আর সাতপাঁচ না ভেবে দরজার যেই হালকা ফাঁকটুকু ছিলো তা দিয়ে ভিতরে উঁকি দেয়। ঘরে লাল লাইট জ্বলছিলো। একপাশে ফাঁকা যায়গা। আরেক পাশে স্টেচার, মদের বোতলের থাক, চুলা আরো অনেক কিছু রাখা। নিপা অতদিকে চোখ দেয়নি। সে দেখছিলো সেই মেয়েটা আর তার শশুরকে। মেয়েটা নজরুল সাহেবকে ধরে এনে ফাঁকা যায়গাটার দেয়ালের দিকে থাকা একট টেবিলে বসায়। টেবিল টা দেখে মনে হচ্ছিলো কোন সমুদ্র সৈকতের ক্যান্ডেল লাইট ডিনারে যেই ছোট্ট টেবিল গুলো ব্যাবহার করা হয়, ঠিক তেমন। মেয়েটা নজরুলকে সেই টেবিলের একটা চেয়ারে বসায়। টেবিলে একটা ছোট্ট ফুলদানি ছিলো। আর একটা সাদা গোল প্লেট রাখা ছিলো নজরুল সাহেবের সামনে আর দু পাশে দুটো কাঁটা চামচ। মেয়েটা নজরুল সাহেবকে সেখানে বসিয়ে দিয়ে বলে,

‘ আজ তোমার জন্মদিন উপলক্ষে একটা বিশেষ কেক এনেছি আমি। সারপ্রাইজ কেক! ‘

‘ কেক আনছো! তুমি, তুমি আমার জন্মদিনও মনে রাখছো! ‘

‘ রাখবো না! আমার স্যারের জন্মদিন আমি কীভাবে ভুলি! আর সরি, তোমার জন্মদিনের কেক রাত ১২ টার দিকে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কেক আসতে আসতে দেরি হয়ে গেছে। ‘

‘ কোনো বেকারির ডেলিভারি ম্যান আবার এখানে আসছিলো নাকি! তোমাকে না নিচের ঠিকানা কাউকে দিতে বলিনি। ‘

‘ আরে বোকা, এই কেক রক্ত মাংসের কেক। খুবই স্পেশাল কেক। আর তোমার জীবনে অন্যতম সুস্বাদু কেক হতে চলেছে এটা, খুব সুস্বাদু। ‘

‘ তাই নাকি! তাইলে তাড়াতাড়ি কেকটা আনো। আমি কাটি। আর তুমি আমার চোখ কেনো বাঁধছো। আমি এমনিই তো কেক কাটতে পারতাম‌। ‘

‘ বললাম না এটা বিশেষ কেক! আর এটা তোমাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য এনেছি। চোখ খুলতে পারবানা। আচ্ছা তুমি বসো। আমি ছুরি গুলো একটু ধার দিয়ে নেই। ‘

‘ তুমি ছুরি আগে থেকে ধার দিয়ে রাখবানা! ‘

‘ আরে আমি তো সেই তখন থেকে তোমার ঘরেই ছিলাম। ছুরি ধার দিতে আসতেই পারিনি। একটু বসো। আমি ধার দিয়ে তারপর তোমাকে ধরে নিয়ে সেখানে যাচ্ছি। ঠিক আছে! ‘

‘ আচ্ছা যাও। কে জানে কী স্পেশাল কেক আনছো! ছোট কেক না বড় কেক তাও জানিনা। ‘

‘ এই কেক, বড় কেক। (ধীর গলায়) তোমার জীবনে খাওয়া শেষ কেক। ‘

‘ কিছু বললা ? ‘

সোনালী সৌজন্যমূলক হেঁসে বলে,

‘ কই, নাতো। তুমি বসো। আমি আসছি। ‘

মেয়েটা নজরুল সাহেবকে চেয়ারে বসিয়ে রেখে চলে যেতে থাকে স্টেচারের দিকে। দরজার আড়াল হতে চোখ রাখা নিপাও এবার তার নজর ঘুড়িয়ে ঘরের অন্য প্রান্তে নিয়ে যায়। মেয়েটা একটা স্টেচারের দিকে যাচ্ছে। নিপা সেই স্টেচার টা দেখা মাত্রই থ হয়ে যায়। তার চোখ,মুখ যেনো পূর্নিমার চাঁদের মতো বড় বড় হয়ে যায়। তার চোখকে যেনো সে বিশ্বাস করতে পারছিলোনা সে। স্টেচারে ছিলো তার শাশুড়ি সুমনা! তার পুরো দেহ উলঙ্গ করে রাখা। হাত দুটো বোধহয় বেঁধে শরীরের নিচে রাখা হয়েছে। সুমনা বেগমের উলঙ্গ দেহ টা চিৎ করে শুইয়ে মোটা দড়ি দিয়ে স্টেচারের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখা। মুখে কাপড় গুজে দিয়ে তার উপর আবার পাতলা কাপড় দিয়ে বাঁধা। নিপা কখনো ভাবতেও পারেনি সে তার শাশুড়ি মা’কে এখানে এভাবে দেখবে।

মেয়েটা এসে স্টেচারের সামনে দাঁড়ায়। স্টেচারের পাশের টেবিলে রাখা একটা বক্সে হাত ঢুকায়। একটা মোটা চাপাতি বের করে আনে। তা দেখেই সুমনার চোখ গুলো বড় বড় হয়ে যায়। সে মাথা নাড়িয়ে মেয়েটাকে না করতে থাকে। মেয়েটা চাপাতি টাকে উঁচিয়ে ধরে দেখতে থাকে। আলোর রিফ্লেকশনে চকচক করে উঠছিলো চাপাতি টা। মেয়েটা চাপাতি দেখতে দেখতে সুমনা বেগমকে ধীর গলায় সুর ধরে বলে বলে,

‘ হ্যাপি বার্থডে টু ইউ, হ্যাপি বার্থডে টু ইউ, হ্যাপি বার্থডে ডেয়ার খালামণি, হ্যাপি বার্থডে টু ইউ!! ‘ 

সুমনা ভয়ে চোখ বড় বড় করে মাথা নাড়াচ্ছিলেন। মেয়েটা চাপাতি থেকে নজর সড়িয়ে সুমনার দিকে তাকায়। ছটফট করছে থাকা সুমনাকে দেখে তার অনেক ভালো লাগছে। একরম টাই তো চেয়েছিলো সে। মেয়েটা চাপাতি নামিয়ে রেখে হেলে সুমনার মুখের কাছে আসে। সুমনার মুখটা দেখে। মেয়েটার মুখে হাসি ফুটে উঠে। মেয়েটা ধীর গলায় বলে,

‘ নিয়তির কী পরিহাস দেখো! তোমার আর খালুর জন্মদিন একই দিনে। তবে খালু জন্মদিন উৎযাপন করবে আনন্দের সাথে, আর তুমি উৎযাপন করবে, মৃত্যুর সাথে! (ম্লিন গলায়) আমার মা’কে এক নরখাদকের খাবার বানানোর সময় একবারো তোমার বিবেকে বাঁধলো না! আমার মা বাদ দিলাম। তোমার তো বোন ছিলো। নিজের বোনকে এভাবে বিলিয়ে দিতে পারলে নিজের স্বামীর কাছে! ছোট থেকে আমাদের পরিবারের সবকিছু কেড়ে নিয়েছো তুমি। সবকিছু। এবার আমার পালা। তোমার জন্মদিন টাকে রক্তে রাঙাতে, আর খালুর জন্মদিন টাকে,,,,, হ্যাহ। খালু কাল সকালে পাবে তার জন্মদিনের প্রথম উপহার। তার জীবনে পাওয়া, সবচেয়ে দামী উপহার!!! ‘ 

সুমনা বেগম মাথা নেড়ে না করতে থাকে। দরজার আড়ালে থাকা নিপা দম আটকে যাচ্ছিলো এসবকিছু দেখে। 

মেয়েটা সোজা হয়ে দাঁড়ায়। সুমনা বেগমকে দেখিয়ে দেখিয়ে বলতে থাকে,

‘ স্যার,,! আপনার কেক প্রস্তুত! আর আমার ছুরিতে ধার দেওয়াও শেষ। ‘

টেবিলে বসা নজরুল সাহেব বলেন,

‘ আমি একলা কীভাবে যাবো! আমায় ধরো। আমার তো চোখ বাঁধা। ‘

‘ ও হ্যা স্যার। ভুলেই গেছিলাম। ‘ 

বলেই সুমনা বেগমের দিকে এক চাহনি দিয়ে চলে যেতে থাকে মেয়েটা নজরুল সাহেবের দিকে। নজরুল সাহেব তার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ান। মেয়েটা এসে নজরুল সাহেবকে ধরে। মেয়েটার মুখ হাসৌজ্জল। খুশি যেনো তার মুখে আর ধরেনা। মেয়েটা নজরুল সাহেবকে ধরে নিয়ে যেতে থাকে স্টেচারের দিকে। দরজার আড়াল হতে চোখ দেওয়া নিপার দম যেনো থেমে থেমে আসছিলো। তার মন যেনো বলছিলো সে খুব বিভৎস কোন দৃশ্যের সম্মুখীন হতে চলেছে। তার ভিতর টা অস্থীর। 

মেয়েটা নজরুল সাহেবকে এনে স্টেচারের পাশে দাঁড় করায়। বলে,

‘ তো আগে চোখ দিয়ে শুরু করবে! না শরীর কেটে! ‘

‘ চোখ দিয়েই শুরু করি। চোখের মতো স্বাদ আর কোথাও আছে নাকি! ‘ 

‘ আচ্ছা। তাইলে তোমার হাতটা দেও। (নজরুলের হাত ধরে সুমনার মুখের উপর দিয়ে) এই যে চোখ। উঠিয়ে নিয়ে খেয়ে নেও। ‘

সুমনা বারবার মাথা নাড়াচ্ছিলো। তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিলো। তিনি কাঁদছেন। নজরুল সাহেব বলে উঠেন,

‘ এতো নড়তেছে কেনো! আমি ঠিকভাবে ধরতেই পারছিনা। ‘

‘ জীবিত তো। এইজন্য বার বার মাথা নাড়াচ্ছে। তুমি দাঁড়াও আমি মাথাটা শক্ত করে ধরতেছি। ‘

বলেই সোনালী নজরুল সাহেবকে ছেড়ে দিয়ে স্টেচারের মাথার দিকে চলে যায়। হাঁটু গেড়ে বসে দুই হাত দিয়ে সুমনার মাথা টাকে শক্ত করে ধরে। নজরুল হাত দিয়ে খুঁজতে খুঁজতে সুমনা বেগমের বাম চোখটা পেয়ে যান। স্টেচারের মাথার দিকে থাকা মেয়েটা ঠোঁট কামড়ে হাসছে। তার খুশির মুহুর্ত গুলো যে মাত্র শুরু হয়েছে। নজরুল সাহেব সুমনার চোখ টা ধরে তুলার চেষ্টা করে। দরজার আড়াল থেকে সব দেখতে থাকা নিপা নিজের মুখ, হাত দিয়ে চেপে ধরে। তার বুকটা লাফাতে থাকে। এই বুঝি তার হ্রদপিন্ড টা লাফাতে লাফাতে তার শরীর থেকে বেড়িয়ে গেলো। নজরুল সাহেব দাঁতে দাঁত চেপে সুমনার চোখের সাইডে আঙ্গুল ঢুকানোর চেষ্টা করছেন। সুমনা বেগম তার মাথা নাড়াবার অনেক চেষ্টা করছেন। কিন্তু পারছেনা না। মেয়েটা অনেক শক্ত করে তার মাথাটা ধরে আছে। নজরুল সাহেব তার আঙ্গুল গুলো সজোরে চোখের সাইড দিয়ে ঢুকাবার চেষ্টা করে। অনেক বল প্রয়োগ করেন। সুমনার বেগমের যেনো জান বেড়িয়ে আসতে থাকে। তিনি এই বীভৎস যন্ত্রনার থেকে মৃত্যু কামনা করতে থাকেন। নজরুল সাহেব তার দুটো আঙ্গুল চোখের এক সাইড দিয়ে ঢুকানে পারেন। চেপে ধরে চোখটাকে বের করতেই যাবেন তখনই চোখ টা ফটাস করে ফেটে যায়। সুমনা বেগম সহ স্টেচার টা যেনো খিচুনি দিয়ে উঠে। সাদা সাদা তরল পদার্থ ছিটকে পড়ে মেয়েটা আর নজরুল সাহেবের চোখেমুখে। মেয়েটা হাঁসতে থাকে। তার ঠোঁটে পড়া কিছুটা তরল সে জিহ্বা দিয়ে চেটে খেয়ে নেয়। নিপা একদম মুর্তি হয়ে গিয়েছে এই দৃশ্য দেখে। নজরুল সাহেব সেই ফাটা চোখের গলিত অংশ গুলাই কোটর থেকে টেনে নিয়ে খেয়ে নিতে থাকে। একটা রগ, যেটা চোখের সাথে ছিলো সেটা ধরে নজরুল সাহেব টান মারেন। মেরে সেটাও মুখে লুফে নেন। সুমনা যেনো আধমরা হয়ে যায়। মেয়েটা বলতে থাকে,

‘ নেও নেও, এবার ডান চোখটা নেও। আর এইবার এতো চাপ দিয়ো না‌। আস্তে করে টেনে বের করে নেও। ‘

‘ ঠিক আছে ঠিক আছে। ‘

নজরুল সাহেব তার আঙ্গুল গুলো চেটে নিয়ে লালা মিশ্রিত করে এইবার ডান চোখের সাইডে ঢুকাবার ‌চেষ্টা করেন। সুমনা চোখের পাতা বন্ধ করার চেষ্টা করেন কিন্তু পারেন না। তিনি মাথা ছুটাবার চেষ্টা করেন। মেয়েটা আবারো শক্ত করে ধরে তার মাথাটাকে। নজরুল সাহেব খুব বল প্রয়োগ করেন। তিনি সুমনার উলঙ্গ দেহটার উপর ভর দিয়ে আঙ্গুল গুলোকে চোখের কোটরে ঢুকাবার খুব চেষ্টা করতে থাকেন। সোনালী ঠোঁট কামড়ে হাসছে। আর সুমনাকে দেখছে। নিপা এইবার হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে নেয়। আর সাথে সাথেই তার কানে আসে স্টেচারটার নড়ে উঠার আওয়াজ। তার মানে এই চোখ টাও বের করে ফেলেছে নজরুল। নজরুল সাথে সাথে সেটা মুখে পুড়ে নেন। খেতে থাকেন‌ ‘ কচমচ কচমচ ‘ শব্দ করে। মেয়েটা সুমনার মাথা ছেড়ে দেয়। নজরুলকে ধরে একটু সাইডে দাড় করায়। নজরুল চোখটা এখনো চাবিয়ে যাচ্ছিলো। চোখ আবার ভালো করে না চাবিয়ে তিনি গিলেন না! 

মেয়েটা এসে সুমনার খালি দুই অক্ষি কোটর দেখে। কোটরের ভিতর দিয়ে আঙ্গুল ঢুকিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকে। তার আঙ্গুলের অগ্রভাগে নরম কিছু এসে ঠেকে। সুমনা ব্যাথায় কুকিয়ে উঠে। মেয়েটা বুঝতে পারে তার আঙ্গুলে সুমনার নরম মস্তিক এসে ঠেকেছে। মেয়েটা ঠোঁটের কোনে একটা শয়তানি হাসি দেয়। সুমনার দুই অক্ষিকোটর থেকে বেড়োনো রক্তে তার মুখ রন্জিত হয়ে গিয়েছে। মেয়েটা দ্রুত ঘরের যেই পাশ টায় চুলা আছে সেদিকটায় যায়। গিয়ে একটা বোয়ম নিয়ে আসে। এসে স্টেচারের পাশে দাঁড়িয়ে সেটার ঢাকনা খুলে। সেটার ভিতরে ছিলো মরিচের গুঁড়া! লাল লাল মরিচের গুঁড়া হাত দিয়ে চিমটি করে উঠিয়ে চোখের কোটরের উপর ধরে আস্তে আস্তে ফেলতে থাকে। মরিচের গুঁড়া গুলো চোখের কোটরের ভিতর যেতেই সুমনার বাঁধা শরীর টা স্টেচার সহ নড়ে উঠতে থাকে। কী নির্মম কষ্ট! কী যন্ত্রনা দায়ক! মেয়েটা তার হাতের মরিচের গুঁড়ার ডিব্বাটাই সুমনার চোখের উপর ধরে সবটুকু মরিচের গুঁড়া তার চোখের গর্ত দুইটায় ঢেলে দেয়। সুমনার শরীর বাঁধা অবস্থায় যেনো বেঁকে উঠতে থাকে। সাথে সাথে মেয়েটা বোয়ম টা নিচে ফেলে দেয়। দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা নিপা যেনো আর এসব দেখতে পারছিলো না। তার হৃদয় কেঁপে উঠছিলো। সে যেনো আরেকটু হলেই হার্ট অ্যাটাক করবে। এদিকে মেয়েটা নিচ থেকে বড় চাপাতি টা উঠায়। এক হাত দিয়ে ধরে এক কোপে সুমনার উলঙ্গ দেহের একটা স্তন আলাদা করে দেয়। রক্ত ছিটকে পড়ে তার চোখে মুখে। মেয়েটার নিঃশব্দে হাসে। আবার কোপ দেয় আরেকটা স্তনে। সেটাও ছিটকে গিয়ে পড়ে ঘরে এক কোনে। মেয়েটা যেনো উন্মাদের মতো সব করছিলো। সাথে সাথেই সে তার চাপাতি টা পাশের টেবিলে রেখে হাত দুটো সেই স্তন কাঁটা বুকের পাজরের উপর দেয়। দরজার আড়াল হতে নিপা মাথা নাড়িয়ে না করছিলো। সে আর দেখতে পারছিলো না। এদিকে মেয়েটা দুই হাত বুকের পাজরের উপর রেখে লাফ দিয়ে উপরে লাফিয়ে উঠে এক জোড়ে চাপ দেয়। সাথে সাথে মটমট করে সবকটা হাড় ভেঙ্গে যায়। মরিচের গুঁড়া দিয়ে ভর্তি চোখের কোটর থেকে পিচকারির মতো রক্ত ছিটকে বেড়িয়ে আসে। কিছু রক্ত গিয়ে পড়ে নজরুল সাহেবের পিঠির উপর। মেয়েটা সাথে সাথে টেবিলের পাশ থেকে চাপাতি টা হাতে নেয়। নিয়ে কোপাতে থাকে সুমনার শরীরকে। নিপার শরীর যেনো অবশ হয়ে আসতে থাকে। সে সাথে সাথেই দরজার দিক থেকে নজর সড়িয়ে নেয়। বাইরের দেয়ালে পিঠ রেখে হাঁপাতে থাকে। তার কি যেনো মনে হতেই আবার সে দরজার আড়াল হতে নজর দেয় আর তখনই ভিতরের মেয়েটা তার দিকে ফিরে তাকায়। নিপা তার চোখের পলক ফেলার সাথে সাথেই মেয়েটা রক্তাক্ত চাপাতি হাতে দৌড়ে আসতে থাকে তার দিকে। নিপার সারা শরিরে যেনো রক্ত চাঙ্গা হয়ে উঠে। নিপা সাথে সাথেই এক দৌড় দেয়। দরজা খুলে বেড়িয়ে আসে ভিতরের সেই মেয়েটাও। দৌড় দিতে থাকে নিপার পিছু পিছু। নিপা দৌড়াতে দৌড়াতে আম্মা আম্মা বলে চিৎকার দিতে থাকে। সে কান্না করে দেয়। পিছন থেকে মেয়েটা রাগের মাথায় তার দিকে চাপাতি নিয়ে দৌড়ে আসতে থাকে। তখনই সামনের করিডোর থেকে দুইজন বেড়িয়ে আসে। নিপাকে দৌড়ে আসতে দেখেই তারাও এগিয়ে যায়। নিপাকে ধরতে যায়। নিপা চিৎকার দিয়ে উঠে। হাতের ছুরিটা এলোপাথাড়ি ভাবে ঘুরাতে ঘুরাতে চোখ বন্ধ করে সামনে দৌড়ে দেয়। ছেলে দুটো নিপার কাছে আসতে আসতেও ভয়ে আর আসেনা। নিপা তাড়াতাড়ি করিডোর থেকে বাম পাশের রাস্তাটায় চলে যায় অর্থাৎ সে যেই রাস্তা দিয়ে এখানে এসেছিলো সেইটায়। মেয়েটাও দৌড়ে তার পিছে যায়। নিপা কাঁদতে কাঁদতে দৌড়াতে থাকে। পানির অংশে চলে আসে সে। তার কোমরের ফ্লাশ জালানো মোবাইল দিয়ে কোনমতে যা দেখতে পায় সেই আলোতেই প্রাণপনে ছুটতে থাকে। পিছন পিছন মেয়েটাও আসতে থাকে। মেয়েটা তার মুখের মুখোশ টেনে ছিঁড়ে ফেলে। সে আর কেউ নয়। সোনালী নিজেই! 

নিপা পানির মধ্যে দৌড়াতে দৌড়াতে পড়ে যায়। তার পুরো শরীর পানিতে ভিজে যায়। নিপা সাথে সাথে পিছনে ফিরে এক চিৎকার দিয়ে তার হাতের ছুরিটা ছুড়ে মারে সোনালীর দিকে। সোনালী চাপাতি দিয়ে সেই ছুরিটাকে ছিটকিয়ে দেয়। নিপা কোনমতে উঠে দাঁড়িয়েই আবার দৌড় দেয়। পায়ের পানি ছিটকে তার চোখে মুখে পড়ে। প্রাণ হাতে নিয়ে দৌড়াতে থাকে। পিছন পিছন আসতে থাকা সোনালীও তার দৌড়ের গতি বাড়ায়। নিপা সামনে কিছুটা দূরেই সিঁড়িটা দেখতে পায়। সে দৌড়ে এসে এক লাফে সিড়িটা ধরে ফেলে। সিড়ি ধরে উপরে যেতে থাকে। দৌড়ে আসা সোনালীই চিৎকার দিয়ে বলতে থাকে

‘ এই মাগী থাম,,,, থাম তুই,,,, তোরে না মারে আমি যাইতে দিবো না। থাম,,,,,! ‘

নিপা সিঁড়ি ধরে ধরে তাড়াতাড়ি উপরে চলে যেতে থাকে। সোনালী দৌড়ে আসতে আসতে এক চিৎকার দিয়ে তার হাতের বড় চাপাতি টা নিপার শরীরকে উদ্দেশ্য করে ছুরে মারে। নিপা তাড়াতাড়ি উপরে উঠতে থাকে। তখনই চাপাতিটা এসে তার পায়ের জুতার উপর আঘাত আনে। জুতা সহ চাপাতিটা দেয়ালে গিয়ে গেঁথে যায়। নিপা হুড়মুড় করে উপরে উঠে মাটিতে ছিটকে পড়ে। সে হাপাচ্ছে। হাত দিয়ে চোখ মুছে কোনমতে উঠে দৌড় লাগায় বাড়ির দিকে। সোনালী এসে থামে সিঁড়ির সামনে। জোড়ে এক চিৎকার দিয়ে ঘুষি মারে সিঁড়িতে। সিঁড়ির কিছু অংশ বেঁকে যায়। তার হাত ফেটে রক্ত বেড়িয়ে আসে। সোনালী আবার চিৎকার দিয়ে উঠতে থাকে। সে চেয়েছিলো নিপাকে এখানে এনে তাকেও সে মেরে ফেলবে। নিপার মাংস খেয়ে সে বুনো উল্লাস করত্বে। কিন্তু তার সব প্ল্যান ভেস্তে গেলো। সে আবারো এক পিশাচ রুপি চিৎকার দিয়ে উঠে। দূরে একই সাথে ভেসে আসে এক শিয়ালের হুংকার!

 

    নিপা দৌড়ে বাগান পেড়িয়ে বাড়ির অন্দরমহলের মূল ফটকের সামনে চলে আসে। সে থামে। হাঁটুতে দুই হাত দিয়ে হাঁপাতে থাকে। কোনমতে জান নিয়ে পালিয়ে আসতে পেরেছে সে। নাহলে আজ হয়তো তারও চোখ দুটো আর শরীরের মাংস গুলো কারো খাদ্য পরিনত হতো। নিপা হাঁপাতে থাকে জোড়ে জোড়ে। তখনই তার কানে আসে গেইট খুলার আওয়াজ। সে সামনে তাকায়। দেখে দাড়োয়ান রহিম চাচা দরজা খুলে দিচ্ছে। রায়হান ভিতরে আসছে। তার কাঁধে অফিস ব্যাগ। নিপা রায়হানকে দেখে সাথে সাথেই অন্দরমহলের দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকে। এক দৌড়ে সিঁড়ি দিকে চলে যায়। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যায়।

 

     দরজা খুলে নিজের ঘরে প্রবেশ করে নিপা। এসেই সে ফ্লোরে কোনমতে বসে পড়ে। দম নিতে পারছেনা সে। এতো দৌড় সে এই পুরো জীবদ্দশায় দিয়েছে কি না জানেনা। নিপার পুরো শরীরের কাপড় ভিজে গিয়েছে। ভেজা কাপড় গায়ে লেপ্টে আছে। কোমরের ওড়নার ভাঁজে এখনো ফ্লাশ জালানো ফোনটা আছে। তখনই তার কানে আসে করিডোর দিয়ে তার ঘরের দিকে কারো হেঁটে আসার আওয়াজ। এটা নিশ্চয়ই রায়হান! নিপা তাড়াতাড়ি ফ্লোর থেকে উঠে আলনা থেকে টাওয়াল টা নিয়ে দৌড়ে ওয়াশরুমের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে পড়ে। ঘরের দরজা খুলে তখনই ভিতরে আসে রায়হান। তার এক কাঁধে অফিস ব্যাগ, আরেক হাতে মিষ্টির প্যাকেট। রায়হান ভিতরে ঢুকেই ঘরের লাইট জ্বালিয়ে দেয়। দেখে বিছানায় নিপা নেই। সে চারপাশ তাকায়। না ঘরে নিপা নেই। রায়হান একটু এগিয়ে গিয়ে ব্যালকনির দিকে তাকায়। না সেদিকেও নেই। তখনই ওয়াশরুমের ভিতর থেকে ঝর্নার আওয়াজ আসতে থাকে। রায়হান ফিরে তাকায় ওয়াশরুমের দরজার দিকে। মনে মনে বলে,

‘ সুবা এখন গোসল করতেছে! (উচ্চস্বরে) সুবা,,,, সুবা,,,, তুমি কী ভিতরে! ‘

ভিতর থেকে কোন আওয়াজ আসেনা। রায়হান কিছুটা ভ্রু কুঁচকে তাকায়। নিপা তাকে সাড়া দিলো না কেনো! রায়হান আবার বলে,

‘ সুবা,,,, তুমি কী ভিতরে,,,,! ‘

ভিতর থেকে মগে মগে পানি ঢালার আওয়াজ আসতে থাকে। তারমানে নিপা ভিতরেই। তাইলে আওয়াজ কেনো দিচ্ছে না? তখনই রায়হানের মনে পড়ে ও দুইদিন পর বাসায় ফিরলো। আজ সারাদিন কল করেও ও নিপাকে পায়নি। হয়তো নিপা ওর উপর রেগে আছে। রায়হান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। হাতের প্যাকেট আর কাঁধের ব্যাগ ‌খুলে রাখতে রাখতে বলে,

‘ এই কাজই আমার লাইফ শেষ করে দিলো। এইগুলা সব বাদ দিয়ে দিতে হবে। লাগবেনা আমার টাকা। এই টাকার জন্য কোনদিন না জানি,,,,,,! না। আমার কাছে আমার সুবা বড়। আমার টাকা চাইনা। আমি পারভেজকে কালই বলবো, আমি ওদের সাথে আর কনটিনিউ করতে পারবোনা। একদম না। ‘

রায়হান কাপড় খুলতে থাকে। দূর থেকে ভেসে আসে ফজরের আযান। বাগান থেকে ভেসে আসে নতুন ফোঁটা ফুলের মৃদু সুবাস! 

 

______

 

সকাল ৭ টা। হালকা কুয়াশা পড়েছে। রোদ নেই। আকাশ সাদা মেঘে ঢাকা। বাতাসও তেমন একটা বইছে না।‌ মাঝে মাঝে পাখির হালকা কিচিরমিচির ডাক শোনা যাচ্ছে। 

মতিন মেম্বার বারান্দার গ্রিল দরজাটার সামনে দাঁড়ালেন। পড়নে সবুজ পান্জাবি আর সাদা কুরতা। বারান্দার টেবিলে নাস্তা করছে সুমু, লায়লা, আর ফুলমতি। হনুফা টেবিলের পাশেই ফ্লোরে পড়ে পড়ে ঝিমুচ্ছে। তাকে লায়লা এনেছিলো খাবার খাওয়ানোর জন্য। কিন্তু সকাল সকাল উঠায় এখনো তার ঘুম পুরেনি। শিউলি বেগমও তাদের সাথেই বসেছেন খেতে। আফাজ ঘুমাচ্ছে।‌ সে এতো সকালে উঠে না। মতিন মেম্বার নাস্তা করেছেন। এখন একটু যাবেন গন্জের দিকে। সামনে আর কয়েকদিন পরেই গ্রাম ইলেকশন শুরু। অনেক প্রচার প্রচারণা করা লাগবে এখন তার। শিউলি বেগম খেতে খেতে লায়লা, সুমু আর ফুলমতির সাথে গল্প করছিলেন।

 

হন্তদন্ত হয়ে বাড়িতে প্রবেশ করে শৈশব। মেম্বারের নতুন চামচা হিসেবে যে এসেছিলো তার নামই শৈশব। শৈশব দৌড়ে আঙিনা পেড়িয়ে এসে বারান্দার দরজার সামনে দাঁড়ায়। সে হাপাচ্ছে। তার এমন দৌড়ে ছুটে আসা দেখে বারান্দায় খেতে বসা ‌শিউলি বেগম, আর বাকিরাও ফিরে তাকায়। মতিন মেম্বার অবাক হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করেন,

‘ কীরে, তুই এতো সকালে! আর এতো হাপাইতাছোস ক্যা! কিছু হইছে! ‘

শৈশব হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,

‘ মেম্বার সাব, মেম্বার সাব গ্রামে অনেক বড় ঘটনা ‌ঘইটা গেছে। আপনি, আপনি তাড়াতাড়ি আমার লগে লন। ‘

মতিন মেম্বার বলেন,

‘ কী হইছে কইবি তো। এতো সকাল সকাল আবার গ্রামে কী হইলো! আমাগো উত্তর পাড়ার জমিডা কী ইসহাকের লোকেরা দখল করতে আইছে নি আবার! ‘

‘ না না মেম্বার সাব। ঘটনা ঘটছে নজরুল চাচাগো বাড়িত। ওগো বাড়িত পুলিশ আইছে। সবাইরে ধইরা লইয়া যাইতাছে। ওগো, ওগো বাড়ির নিচে পাতাল ঘর পাওয়া গেছে। ঐহানে অনেক মানুষের কাঁটা লাশ পাওয়া যাইতাছে। আপনি, আপনি তাড়াতাড়ি আমার লগে লন। ‘

কথাটা শুনেই মতিন মেম্বারের মাথায় যেনো বাজ ভেঙ্গে পড়ে। হন্তদন্ত হয়ে বলেন,

‘ কীসব কইতাছোস তুই। সবাইরে ধইরা লইয়া যাইতাছে মানে! ‘

‘ হ মেম্বার সাব। নজরুল চাচার বউ আছেনা! হেরও লাশ পাওয়া গেছে। ‘

বারান্দার টেবিলে থেকে তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে পড়েন শিউলি বেগম। মতিন মেম্বার তাড়াতাড়ি বারান্দা থেকে নামেন। বলতে থাকেন,

‘ এই আমি ঐদিকে যাইতাছি। তোমার কেউ বাড়িত্তে বাইর ‌হবানা ‘

‘ আমিও যামু। আমার নিপা, আমার মাইয়াডার কিছু,,,,,! ‘

শিউলি বেগম কান্না করে উঠেন। খাবার টেবিল থেকে সবাই ‌উঠে দাঁড়ায়। হনুফার ঘুম ভাঙে। সে আলাভোলা চোখ নিয়ে পরিস্থিতি বুঝে উঠার চেষ্টা করে।‌ মতিন মেম্বার হন্তদন্ত হয়ে বলেন,

‘ তাড়াতাড়ি আহো। এই ফুলমতি, তোরা কেউ বাড়িত্তে বাইর হবিনা আমরা না আওয়া পর্যন্ত। (শৈশবের দিকে ফিরে) নিপারে দেখছিলি তুই! আমার মাইয়া ঠিক আছে তো! ‘

‘ জানিনা মেম্বার সাব। আমি খবর পাওয়া মাত্রই ছুইটা আইলাম। ‘

শিউলি বেগম কাঁদো কাঁদো মুখ নিয়ে বারান্দা থেকে নামেন। শিউলি বেগম, মতিন মেম্বার আর শৈশব তড়িঘরি করে চলে যেতে থাকে।‌ বারান্দার দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় ফুলমতি। তাদের সবার মুখেই ভয়ের প্রতিচ্ছবি। লায়লা পিছন থেকে ফূলমতিকে বলে,

‘ আমি আর ‌হনুফা যাই! ‘

ফুলমতি পিছনে ফিরে তাকে ধমকিয়ে বলে,

‘ একদম না। তাড়াতাড়ি ঘরে যা তোরা। একদম ঘর থেকে বাইর ‌হবিনা। ‘

‘ আইচ্ছা ঠিক আছে। ‘

পিছনে ফিরে গিয়ে লায়লা হনুফাকে বলে,

‘ চল, আমরা ‌ঘরে গিয়া লুডু খেলি। ‘

বলেই হনুফাকে ধরে কোনমতে টানতে টানতে নিয়ে যায় লায়লা। সুমু এসে ফুলমতির পাশে দাঁড়ায়। তার চোখে মুখেও অজানা এক ভয়। ফুলমতি সুমুর দিকে ফিরে একবার তাকিয়ে আবার সামনে তাকায়। দূরের আকাশ প্রান্তরের দিকে চোখ দেয়। তখনই তাদের কানে আসে বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে গ্রামের মানুষদের হুড়মুড় করে ছুটে যাওয়ার শব্দ। নিশ্চয়ই তারাও খাঁন বাড়ির দিকেই যাচ্ছে!

 

____

 

((( ২য় ভাগের লিংক কমেন্টে দেওয়া আছে 👇)))

 

উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন :: ২(মুখোশ)

পর্ব:: ৮১ (১ম ভাগ)

লেখক:: মির্জা শাহারিয়া

 

উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন :: ২(মুখোশ)

পর্ব:: ৮১ (২য় ভাগ)

লেখক:: মির্জা শাহারিয়া

 

দিথী নাস্তার প্লেট হাতে সোফার রুমে প্রবেশ করে। সোফায় বসে টিভি দেখছিলো আহনাফ আর শাহারিয়া। টিভিটা দেয়ালে লাগানো। টিভিতে সিআইডি চলছে। দিনের বেলা সনি আটে সিআইডি হয়না তাই ইউটিউব থেকেই ছেড়েছে শাহারিয়া। দিথী নাস্তার প্লেট দুটো নিয়ে এসে সোফার সামনের টেবিল টায় রাখে। শাহারিয়ার সোফার উপর পা তুলে বসে ছিলো, দিথীকে দেখেই পা নামিয়ে বসে। আহনাফও সোজা হয়ে বসে। নাস্তার প্লেটের উপর থেকে ঢাকা উঠিয়ে দিথী একটা প্লেট আহনাফকে দেয়। আরেকটা শাহারিয়ার দিকে এগিয়ে দেয়। প্লেটে ৩ টা পরোটা আর ডিম ভাজা ছিলো। শাহারিয়া তার প্লেট টা নিয়েই বলে,

‘ তোমার টা ? ‘

‘ আমি রান্না ঘরে খেয়ে নিবো। ‘

‘ তোমার রান্না ঘরে খাওয়া লাগবেনা। এখানে নিয়ে আসো। একসাথে খাবো। ‘

‘ এখানে,,,! ‘

‘ হ্যা আনো। এইযে আমার পাশে বসবা। সোফা তোমার জন্য ফাঁকা রাখছি। ‘

‘ হইছে! ঢং! ‘

দিথী লজ্জা মাখা মুখ নিয়ে চলে যায় তার খাবার আনতে। শাহারিয়া হাঁসতে হাঁসতে পরোটা মুখে দেয়। আহনাফ চুপচাপ কোনোকিছু না দেখার ভান করে টিভির দিকে তাকিয়ে আছে। মানে সে যেনো ছোট বাচ্চা, কিছুই বুঝেনা। শাহারিয়া আহনাফকে এমন ভাবে দেখে তার পায়ের রানে আস্তে করে মারে। আহনাফ খেতে খেতে শাহারিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে উঠে,

‘ হ্যা স্যার,, বলেন। ‘

‘ বলতো টিভিতে দয়া একটু আগে কী ডায়লগ দিলো! ‘

‘ কী ডায়লগ দিছে! ঐতো, ঐতো বললো যে,,,,,! ‘

‘ হ্যা কী বললো! ‘

‘ ঐতো বললো ড,সারিকাকে নাকি তার ভালো লাগে! ‘

‘ অভিনয় টাও ঠিক মতো করতে পারিস না হ্যা! (আহনাফের পায়ে আরেকটা মেরে) সারিকাকে দয়া পছন্দ করে না অভিজিৎ পছন্দ করে! তোর ভাবির কথা শুনতে গিয়ে তো সব উল্টায় ফেলছিস হ্যা! হা হা হা! ‘

‘ না মানে স্যার! ‘

শাহারিয়া হাসতে থাকে। বলে

‘ হইছে হইছে বুঝছি। নে খা এখন। ‘

আহনাফ কিছুটা লজ্জা পায়। তার স্যার ঠিকই ধরে ফেলছে তার কাঁচা অভিনয়। আহনাফ স্বাভাবিক হয়। বলে,

‘ স্যার! ‘

শাহারিয়ার টিভির দিক থেকে ফিরে বলে,

‘ হ্যা বল। ‘

‘ স্যার আমি একটু ঢাকা যেতে চাচ্ছিলাম। ‘

‘ ঢাকা! কেনো ? ‘

‘ মায়ের জ্বর। আফরিন ফোন দিছিলো আজ সকালে। এমনিতেই ওর মা’ই এখনো সম্পূর্ণ সুস্থ হয়নি, তার উপর আমার মায়ের জ্বর। একলা একটা মেয়ে, সব সামলাতে পারছেনা স্যার। যদি যাওয়ার অনুমতি টা দিতেন! ‘

‘ অনুমতি নেওয়ার কি আছে। এখন তো কোন কাজই নাই। এখন শুধু তোমাকে অভিনয় করতে হবে। মানে আমি যে হারায় গেছি আর তোমরা দুঃখে আছো এই অভিনয়‌। (একটু থেমে) যেই রঞ্জু কেসের জন্য এতো কাঠখড় পুরানো সেই রন্জু তোমার সামনে বসে এখন নাস্তা খাইতেছে। হে হে হে! এখন তো আর তেমন কোন কাজই নাই। ‘

বলেই শাহারিয়া টিভির দিকে তাকায়। নাস্তা খেতে থাকে। আহনাফ বলে,

‘ স্যার তাইলে আমি আজকেই রওনা দেই! ‘

‘ হ্যা দেও। তবে একটা কাজ করা বাকি তোমার। নাস্তা শেষ করে বাইরে গিয়ে রুমানের সাথে ৫-৬ দিনের বাজার করে নিয়ে আসিও। আমি এখন বাইরে সবার কাছেই কিন্ত মৃত বা গুম হওয়া একজন। আমার এখন বাইরে যাওয়াটা উচিত হবেনা। ‘

‘ আচ্ছা স্যার ঠিক আছে। আমি বাজার করে এনে রাখবো। ‘

‘ রুমানের কাছে টাকা আছে। ওর কাছ থেকে নিয়ে নিও। ‘

‘ আচ্ছা স্যার। ‘

দিথী প্রবেশ করে সোফার রুমে। তার হাতেও নাস্তার প্লেট। সে প্লেট নিয়ে এসে আলাদা সিংগেল একটা সোফায় বসতে যায় তখনই শাহারিয়া তাকে তার পাশেই বসতে বলে, দিথী চোখ দিয়ে ইশারায় আহনাফকে দেখায়। শাহারিয়া মাথা নাড়িয়ে বলে কিচ্ছু হবেনা। তবুও দিথী আর শাহারিয়ার পাশে বসে না। চোখ সরু সরু করে শাহারিয়াকে ইশারায় বলে দেয় পড়ে বসবে। বলেই দিথী সিঙ্গেল একটা সোফায় বসে পড়ে। শাহারিয়া মুচকি হেসে টিভির দিকে তাকায়। তিনজন মিলে টিভি দেখতে দেখতে নাস্তা করতে থাকে। শাহারিয়া মাঝে মাঝে দিথীর দিকেও তাকায়। দিথী তা বুঝে কিন্তু টিভির দিক থেকে মুখ ঘুড়িয়ে শাহারিয়ার দিকে তাকায় না। মাঝখান দিয়ে আহনাফ পড়ে যায় লজ্জায়। সে খালি চুপচাপ সামনে টিভির দিকে তাকিয়ে তাড়াতাড়ি পরোটা খেয়ে এই খান থেকে তার ঘরে পালানোর চিন্তা করতে থাকে। 

 

____

 

খাঁন বাড়ির সামনে অনেক মানুষের জটলা। বাড়ির বড় মেইন গেইট খোলা। বাড়ির বাইরের রাস্তায় তিনটে পুলিশ ভ্যান দাঁড়ানো। দিনাজপুর থেকেও কিছু পুলিশ এসেছে এখানে। 

 

মতিন মেম্বার আর শিউলি বেগম কোনমতে ভিড় ঠেলে বাড়ির ভিতরে আসেন। শিউলি বেগম মুখে শাড়ির আঁচল চেপে কাঁদছেন। মতিন তার হাত শক্ত করে ধরে তাদের মেয়ের খোঁজ করছে। তারা এগিয়ে আসে। এদিকটাতেও লোকের সমাগম বেশ। তখনই তারা দেখে, বাড়ির অন্দরমহলের ভিতর থেকে পুলিশরা একে একে বাড়ির কর্তাদের হাতে হ্যান্ডকাপ ও কোমড়ে দড়ি পড়িয়ে বের করছে। সবার সামনেই নজরুল সাহেব। তিনি মাথা নিচু করে আছেন। তার পাশে একজন কনস্টেবল। মতিন মেম্বার রাগান্বিত হয়ে পাগলা ঘোড়ার মতো তাকে মারতে ছুটে যান। তিনি ভাবছিলেন তার মেয়েরও বোধহয় ক্ষতি করেছে এই নজরুল। তখনই পুলিশের কয়েকজন কনস্টেবল এসে মতিন মেম্বারকে ধরেন। তাকে সামলান। নজরুল সাহেব একদম মাথা উঠান নি। তাকে নিয়ে যায় কনস্টেবল রা। তখনই তার পিছন পিছন বাড়ির অন্দরমহল থেকে বের করা হয় শাহেদ আর সাদিক কে। তারা দুইজন বারবার পুলিশ দের বোঝানোর চেষ্টা করছিলো যে তারা কিছু করেনি। তারা এইসব বিষয়ে কিচ্ছু জানে না। তবুও তাদের এরেস্ট করে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশেরা। শিউলি বেগম গিয়ে অন্দরমহলের দরজার সামনে দাঁড়ান। আশেপাশে কিছু মহিলা দাঁড়ানো। তারা বলাবলি করতে থাকে একে অপরের সাথে,

‘ এগোরে আমরা কতো ভালা জানি, আর এরাই কিনা এইসব কাম করতো! ছিঃ ছিঃ ছিঃ! ‘

‘ হ। নিজের বউডারে পর্যন্ত মাইরা খাইয়া ফেললো! এইডা কোন মানুষ না জানোয়ার গো ভাবি! এগোরে আমরা কতো ভালা জানতাম! আর ভালা মানুষের মুখোশ পইড়া এরা মানুষের মাংস খাইতো! আমার তো ভাইবাই গা গুলায়া আইতাছে। ‘

‘ ছোট ছোট বাচ্চাডিরে বলে ধইরা আইনা খাইতো। আল্লাহ, কত যে মায়ের কোল খালি করছে এই নজরুল! আল্লাহ তুমি হেই মা’গোরে ধৈর্য্য ধরার তৈফিক দেও গো আল্লাহ। ‘

তখনই শিউলি বেগম তাদেরকে কাঁদো কাঁদো হয়ে জিজ্ঞেস করেন,

‘ আমার, আমার মাইয়াডারে তোমার কেউ দেখছো মরিয়ম! ‘

‘ না গো দেহি নাই শিউলী। কে জানে তোমার মাইয়াডারেও নি আবার নজরুলে,,,,,! ‘

‘ না,,,, এমন কইয়ো না। আমার নিপার কিছু হয়নাই। অর কিছু হয়নাই। ‘ 

তখনই তিনি অন্দরমহলের ভিতর থেকে নিপার কথা শুনতে পান। তিনি তাড়াতাড়ি অন্দরমহলের দরজার সামনে দাঁড়ান। ভিতরে যেতে চাইলে পুলিশ তাকে বাধা দেয়। তখনই ভিতর থেকে কোমড়ে দড়ি পড়া হাতে হাত কড়া দেওয়া রায়হানকে বের করে আনে কনস্টেবল। নিপা রায়হানের হাত জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলো। বারবার পুলিশদের বলছিলো রায়হানকে ছেড়ে দিতে। রায়হানও নিপাকে বারবার ভেজা গলায় বলছিলো সে কিছু করেনি। সে এসবের সাথে নেই। নিপাও তার রায়হানকে ছাড়তে নারাজ। সে বারবার রায়হানকে টেনে টেনে পুলিশ দের কাছ থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছিলো। হাউমাউ করে কাঁদছিলো। তখনই এক পুলিশ কনস্টেবল এসে জোড়ে ধাক্কা দিয়ে নিপাকে ফেলে দেয়। নিপা পড়ে যায়। সেই কনস্টেবল টা এসে নিপা পায়ে সজোরে লাত্থি মারে। নিপা মা বলে চিৎকার দিয়ে উঠে। রায়হানের মস্তিকে সাথে সাথেই যেনো রক্ত উঠে যায়। সে সাথে সাথেই পিছনে ফিরে চিৎকার দিয়ে উঠে জোড়ে এক ঘুষি মারে কনস্টেবলের মুখে। কনস্টেবলের নাকটা সম্পূর্ণ ভেঙে রক্ত বেড়িয়ে আসে। কনস্টেবল ছিটকে পড়ে বাড়ির দেওয়ালের সাথে। রায়হান তার শরীরের দড়ি টেনে ছিঁড়ে ফেলে। গিয়ে সেই কনস্টেবলকে লাত্থি দিতে থাকে। ঘুষি মারতে থাকে। পাশে পড়ে থাকা একটা বড় ইট উঠিয়ে সেই কনস্টেবলের মাথায় মারতে যায় তখনই কিছু কনস্টেবল এসে তাকে ধরে ফেলে। রায়হান যেনো পাগল, উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলো। তার সুবার গায়ে এই লোক লাত্থি মেরেছে! সে এই কনস্টেবলকে ছাড়বে না। রায়হান তেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করে সেই কনস্টেবলের দিকে। ৬-৭ জন অন্য কনস্টেবল একসাথে ধরেও যেনো তাকে সামলাতে পারছিলো না।‌ এক হইহুল্লোড় পড়ে যায় বাড়ির সামনে।‌ রিয়াদ দূরে দাঁড়িয়ে আছে। সে এগিয়ে আসে না। সে চায়না এখানে তার অন্তর্ভুক্তি। তখনই আরো কিছু কনস্টেবল এসে রায়হানকে ধরে নিয়ে যেতে থাকে। রায়হান ঐ কনস্টেবলকে যা ঘুষি আর লাত্থি মেরছে তাতেই সে গুরুতর আহত হয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে। এদিকে নিপাকে ধরে উঠায় শিউলি বেগম সহ আরো কিছু মহিলা। নিপা কাঁদছিলো। ছলছল চোখ নিয়ে তাকিয়ে ছিলো রায়হানের দিকে। রায়হানকে কনস্টেবলরা নিয়ে গিয়ে গাড়িতে উঠায়।  গাড়িটা বাড়ির বাইরে ছিলো। নিপা তার মা’কে জড়িয়ে ধরে। খুব কাঁদতে থাকে। বাড়ির অন্দরমহলের ভিতর থেকেও কান্নার আওয়াজ আসে। সাথী বেগমের কান্নার আওয়াজ। তিনি তার ছেলে আর স্বামীকে বারবার ছেড়ে দিতে বললেও পুলিশেরা ছাড়েনি‌। সাথীর সাথে আঁখিকে এই বাড়িতে রেখে বাকি কর্তাদের গাড়িতে তুলে পুলিশ। তবে তারা রাফসানকে পায়নি।

 

নিপাকে শান্ত করতে থাকে তার মা। নিপা কাঁদতে কাঁদতে তার মা’কে জড়িয়ে বলে,

‘ মা, আমার রায়হান কিছু করেনি। ও নির্দোষ। ও নির্দোষ। ‘

‘ কান্দিস নারে মা। হয়, এমন হয়। ওরা সবাই নরখাদকরে মা। ওরা কেউ মানুষ না। ‘

নিপা কাঁদতে কাঁদতে বলে,

‘ আমার রায়হান,, আমার রায়হান এমন টা কেনো করলো। ও কেনো করলো। মানুষ কেনো এতো ছদ্মবেশী হয় মা। কেনো হয়। ‘

শিউলি বেগম কিছু বলেন না। নিপাকে বুকে জড়িয়ে তাকে শান্ত করতে থাকেন। নিপা কাঁদতে থাকে অঝোর ধারায়। আরো কিছু মহিলা ভিতরে চলে যায় সাথী বেগমকে শান্ত করার জন্য। মতিন মেম্বার শান্ত হয়েছেন। তিনি এই গ্রামের মেম্বার। তার মেজাজ হারানো উচিত হয়নি। তিনি দূরে চোখে মুখে পানি দিয়ে এসে পুলিশ ওসির কাছে ক্ষমা চান তার কাজের জন্য। 

 

এদিকে বাড়ির পিছন থেকে একে একে লাশ আনতে থাকে পুলিশ কনস্টেবলরা। কয়েকটা এম্বুলেন্সও চলে আসে বাড়ির সামনে। পুলিশরা ভিড়ের মাঝে রাস্তা করে দেয়। কনস্টেবলরা একে একে লাশ নিয়ে যেতে থাকে।

 

   বাড়ির দক্ষিণের ফাঁকা যায়গাটায় দাঁড়িয়েছেন মতিন মেম্বার, রিয়াদ আর দিনাজপুর জেলা পুলিশ সুপার জয়দেব কুমার। জয়দেব কুমারকে মতিন মেম্বার অনুনম সুরে বলেন,

‘ সরি ওসি সাব। আমার মাইয়ারে আমি এই বাড়িতে বিয়া দিছিলাম। আমি ভাবছিলাম আমার মাইয়ারেও ওরা,,,,, এরলাইগা একটু মেজাজ হারাইছিলাম। ‘

‘ এরপর থেকে একটু সতর্ক থাকবেন। (রিয়াদের দিকে ফিরে) ভিতরে কত গুলো লাশ দেখেছো! ‘

‘ অনেক গুলো স্যার। সব ছোট বাচ্চাদের। কয়েকজন ছেলেকে আমরা আটক করেছি। ‘

‘ আচ্ছা এই যায়গার বিষয়ে খবর আজ সকালে তোমাকে কে দিয়েছিলো! ‘

‘ জানিনা স্যার। সকালে একটা চিঠি আর একটা পেনড্রাইভ পাই আমরা থানায়। চিঠি খুলতেই এইযায়গার বিস্তারিত আর পেনড্রাইভে বাচ্চাদের মারার ভিডিও পাই। ‘

‘ তারমানে এই যায়গারই কেউ জিনিস টা আমাদের কাছে ফাঁস করেছে! কিন্তু সেটা কে! ‘ 

‘ খুঁজে বের করতে হবে আমাদেরকে স্যার। আর স্যার, আপনি জানি খান পোল্ট্রি ফিড নিয়ে কী বলছিলেন তখন! ‘

‘ এই নজরুল খাঁন, তার পোল্ট্রি ফিডের বস্তার মাঝে ছোট ছোট বাচ্চাদের কাটা মাংস সাপ্লাই করতো দেশের আরো নরখাদকের কাছে। সাথে ড্রাগসেরও কারবার ছিলো এদের। ‘

‘ এতো মারাত্মক বিষয় স্যার! ‘

‘ হমম। তা আর বলতে। ঐদিকে রাজশাহীতে আমাদের এক ইউনিট গিয়েছে ওখানকার এক ব্যবসায়ীকে ধরতে। খাঁন পোল্ট্রি ফিড এখন তার নামে। নজরুল হয়তো বুঝতে পেরেছিলো যে তাকে ধরে ফেলা হবে। তাই সে তার কম্পানি বেঁচে দেশ থেকে পালানোর চিন্তা করছিলো। ভাগ্যেস আমাদের কাছে ইনফরমেশন গুলা এসেছিলো! ‘ 

‘ হমম স্যার। সেই ব্যবসায়ীকে ধরলে এদের সাথেই আরো কেউ আছে কী না তা জানা যাবে। ‘

‘ রিয়াদ, তুমি গিয়ে ঐদিকে কতগুলো লাশ বের হলো তার লিস্ট করো। আর মেম্বার সাব, আপনি আমাদের সাথে আসুন। আপনার মেয়ে এই বাড়ির বউ ছিলো। আপনাকে সেইজন্য জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আমরা নিয়ে যাচ্ছি। (এক কনস্টেবলের দিকে ফিরে) এই শামীম, সবাইকে গাড়িতে তুলছে! ‘

‘ জ্বী স্যার। ‘

‘ মেম্বার সাব। আসেন। ‘

মতিন মেম্বারকে নিয়ে গাড়ি বহরের দিকে চলে যেতে থাকেন ওসি জয়দেব। মতিন মেম্বার অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার সাথে যান।

 

   খাঁন বাড়ির বাইরের দিক। অনেক লোকের কোলাহল বাইরে। তাদের মধ্যে থেকে এক বোরখা পড়া মেয়ে হেঁটে সাইডে আসে। সে তার মুখের উপর থেকে বোরখার কালো কাপড় টা তুলে। সে ছিলো সোনালী। রাফসানের কাছ থেকে খাঁন গ্রুপ অফ ইন্ড্রাস্টিজ কিনে নিয়ে সেটা আবার নজরুল খানেরই বায়ারের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে মোটা দামে। আর তারপর দুই পক্ষেরই সব ফাঁস করে দিয়েছে। সুমনাকেও মেরে ফেলছে। সোনালী সবকিছু ভেবে একটা শয়তানি হাসি দেয়। বিরবির করে বলে

‘ সবাই ধরা পড়লো। রাফসান বোধহয় গাঁ ধাকা দিছে না! ওকেও ধরা পড়তে হবে। (একটু থেমে) এখন আমার কাজ হচ্ছে নজরুল আর রাফসানের সাথে করা গোপন ভিডিও গুলো ফাঁস করা। এইবার দেখি, তোরা মুখ কীভাবে দেখাস এই সমাজে! টাকা দিয়ে যদি বেরও হয়ে আসিস এই পর্ণ* ভিডিওর জন্য আজীবন ছিঃ ছিঃ করে যাবে লোকজন তোদের। (থেমে) এই সোনালীর সাথে মাইন্ড গেমে পারে উঠা, এতো সহজ না!!! হ্যাহ!! তোদের মতো বেকুপদের দশদিন আর এই সোনালীর একদিন!!!

 

_______

 

তালুকদার বাড়ি। হয়তো ভাবছেন এটা আবার কাদের বাসা! আরমানকে মনে আছে আপনাদের নিশ্চয়ই! সেই আরমান, যে নোমানের বোন নুপুরকে মেরে ফেলেছিলো। নোমানের বউ রিয়ার সাথে পরকীয়ায় লিপ্ত ছিলো। অর্থাৎ আয়ানের আসল বাবা আরমান। সে তালুকদার বাড়ির ছেলে। তার বাবার নাম ইসহাক তালুকদার। 

 

তালুকদার বাড়ি অতটা বড় নয়। মেম্বার বাড়ির মতোই দেখতে কিছুটা। শুধু মাঝ দিয়ে বাড়িটা বাঁকানো, মানো ইংরেজি অক্ষর L এর মতো। বাড়ির ছেলে আরমান আর তার ছোট বোন আনিকার অকাল মৃত্যুতে আরমানের মা জোহরা বেগম বেশকিছুদিন শোকে কাতর ছিলেন। এখন কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছেন। বাড়িতে এখন তিনজন থাকে। ইসহাক তালুকদার, তার পত্নী অর্থাৎ মৃত আরমান-আনিকার মা জোহরা ও তাদের বাড়ির কাজের মেয়ে উর্মি। মেয়েটা শুধু দিনে এসে রান্না করে দিয়ে যায়। মাঝে মাঝে জোহরা বেগম তাকে থাকতে বললে থাকে, নাইলে সে তার বাসায় যায়। বাসায় তার ছোট ভাই আর মা আছে। তার বাবা ছোট বেলায় মারা গিয়েছে।

 

এখন সময়টা দুপুরের কাছাকাছি।‌ হালকা রোদ উঠেছে। আকাশে সাদা পেঁজা তুলোর মতো মেঘ দেখা যাচ্ছে। ইসহাক তালুকদার তার রুমের আলমারি খুলে কিছু একটা খুঁজছেন। বেশ অনেক পুরোনো কাগজ, ফাইল বের করেছেন আলমারি থেকে। সেগুলো তার পায়ের পাশেই পড়ে আছে। ঘরে প্রবেশ করেন জোহরা বেগম। তার মুখ শুকনো। গাঁয়ে শাড়ি। মাথার চুল গুলো হালকা পাকা। তিনি এগিয়ে এসে ইসহাক সাহেবের পাশে দাঁড়ান। উঁকি মেরে আলমারির ভিতরে দেখেন। ইসহাক সাহব তার ঘাড়ের উপর কারো উপস্থিতি টের পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে আলমারি থেকে মাথা বের করে নেন। জোহরা বেগম সড়ে যান

বলেন,

‘ কী খুজতেজো এভাবে! ‘

‘ ক,কী কিছুনা। তুমি এখানে, কিছু বলবা! ‘

‘ গ্রামের খবর শুনোনাই! তোমার বন্ধু, নজরুলের বাসা থেকে কী কী উদ্ধার হইছে! তাদেরকে যে পুলিশ নিয়ে গেছে! ‘

‘ কখন নিয়ে গেলো! ‘

বলেই পান্জাবির কাপড় টা উঠিয়ে মুখের ঘাম মুছতে থাকেন ইসহাক সাহেব। জোহরা বেগম অবাক হন। বলেন,

‘ তুমি এতো ঘামতেছো কেনো! কোন সমস্যা! ‘

‘ ন,না তেমন কিছুনা। আর তারপর কী হইলো। নজরুলকে কেন ধরে নিয়ে গেছে! ‘

‘ ওদের বাড়ির পাতাল থেকে অনেক বাচ্চার লাশ পাওয়া গেছে। তোমার বন্ধু বলে নরখাদক ছিলো! ‘

‘ নরখাদক! ‘ 

‘ হ্যা। তুমিও জানতেনা নাকি! ‘

‘ ন,না জানতাম না। আচ্ছা তুমি যাও। আমি যাচ্ছি একটু পর। ‘

বলেই আবার আলমারির ভিতর থেকে কি যেনো খুঁজে বের করতে লেগে যান ইসহাক সাহেব। জোহরা বেগম কিছুই বুঝে উঠেন না। তিনি চলে যেতে থাকেন ঘর থেকে। ইসহাক সাহেব বেশ পুরোনো খাতা, ফাইলের মাঝে কিছু একটা খুঁজছিলেন। এবং হঠাৎ তিনি আলমারির ভিতর থেকে একটা হলুদ ফাইল বের করেন। সেটা নিয়ে সড়ে আসেন। তার মুখে কিছুটা স্বস্তির রেখা। হয়তো এই ফাইল টাই খুঁজছিলেন তিনি। ইসহাক সাহেব তাড়াতাড়ি সেটা বিছানার উপর রেখে দিয়ে ঘরের দরজার সামনে গিয়ে ছিটকিনি লাগিয়ে দেন। তাড়াতাড়ি জানালার কাছে গিয়ে জানালার পর্দা টেনে দেন। যেনো তিনি কোন গুপ্ত জিনিস খুলতে চলেছেন, যা তিনি আর কাউকেই দেখাতে চাননা! 

 

_______

 

রংপুর মেডিকেল কলেজ। ২০৪ নং কেবিনের বাইরের চেয়ারে বসে আছেন ইকরার মা মৌসুমী হালদার। তার পাশেই তাদের বাসার কাজ করেন যে খালা, বানু খালা, তিনি বসে আছেন। তাদের দুইজনের মুখের চিন্তার ভাঁজ। কয়েকজন নার্স চলে যায় করিডোর দিয়ে। ইকরা খুব অসুস্থ। সে হাসপাতালে ভর্তি। কাল হঠাৎ ঘরে গিয়ে মৌসুমী বেগম তার মেয়েকে অচেতন অবস্থায় পান। পানি ছিটিয়ে জ্ঞান ফিরানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু ইকরার জ্ঞান ফিরেনি। তাদের পরিচিত এক ডাক্তার এসে কাল রাতে ইকরাকে দেখে। তাদেরকে জানায় ইকরাকে যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে ভর্তি করাতে। কোন জটিল রোগ হয়েছে তার। মৌসুমী বেগম একলা কী করবেন ভেবে পাননা। আফাজও নেই। তার স্বামীও নেই। তার স্বামী ব্যবসা করেন চট্টগ্রামে। ফোন দিলে তার স্বামী জানান আজ সকালেই ক্লিনিকে ভর্তি করাতে। টাকাও পাঠান কিছু।  মৌসুমী বেগম তার মেয়েটাকে নিয়ে কোনমতে রাতটা পাড় করেই সকাল সকাল এনে রংপুর মেডিকেলে ভর্তি করান। ইকরার কাল রাতে সেন্স ফিরলেও সকালে আবার সেন্সলেস হয়ে গিয়েছিলো। এখনো পর্যন্ত ভিতরে ডাক্তার নার্সেরা আছেন। তারা সকাল থেকে তাকে পর্যবেক্ষণ করছেন। মাঝে মাঝে দু-একজন নার্স বেড়িয়েছিলো। তবে মৌসুমী বেগমের সাথে তারা কথা বলেনি। মৌসুমী বেগম আর বানু খালা ইকরারা চিন্তায় নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে পড়ে রয়েছেন এখানে, কখন ডাক্তার বের হবে আর তারা ইকরার খবর পাবেন। রিয়াদ কাল রাতে বিষয়টা জানতে পারে। সে আজ সকালেই চলে আসতে চেয়েছিল এখানে। তখনই খান বাড়ির সব খোলাসা হয় আর বড় বড় অফিসার আনন্দপুরে আসায় রিয়াদ আর আসতে পারেনি। রিয়াদ একটু পর পর ফোন দিয়ে তার শাশুড়ি মায়ের থেকে ইকরার খোঁজ-খবর নিচ্ছে। সে বলেছে আজ রাতে যেভাবেই হোক সে আসবে। মৌসুমী বেগমও তাকে ফাঁকা হলে চলে আসতে বলেছেন।

 

বেশ কিছুক্ষণ পর,,,

 

কেবিনের দরজা খুলে যায়। মৌসুমী বেগম আর বানু খালা তৎক্ষণাৎ বসার যায়গা থেকে উঠে আসেন। ভিতর থেকে বের হন ডাক্তার আজাদ। তিনি হাতে ধরে থাকা স্থেতোস্কোপ যন্ত্রটা গলায় ঝুলান। মৌসুমী বেগম উৎসুক হয়ে তার কাছে এসে বলেন,

‘ ডাক্তার, ডাক্তার আমার মেয়ে,,,,’

‘ ২৪ ঘন্টা না পেড়োনো অব্দি আমরা কিছু বলতে পারছিনা। (একটু থেমে) তবে একটা বিষয়, আচ্ছা আপনাদের মেয়ের যে নাক দিয়ে রক্ত পড়তো, তা আপনারা জানতেন না! ‘

‘ হ্যা জানতাম। তবে দুই একবার দেখেছিলাম। ভাবছিলাম হয়তো আঘাত পেয়েছে তাই পড়ছে। ‘

‘ আর তার এ্যাপেনটিসাইড ব্যাথার বিষয়ে! ‘

‘ এ্যাপেনটিসাইডের ব্যাথা? ওর এ্যাপেনটিসাইডের ব্যাথা আছে! ‘

‘ হ্যা। কেনো ও আপনাদের বলেনি! ‘

‘ না। (বানুর দিকে ফিরে) কখনো কী বলছিলো! না ডাক্তার এমন কিছুতো বলেনি। ‘

‘ আপনাদের মেয়েটা হয়তো চাপা স্বভাবের। ওর ব্রেইনে টিউমার ধরা পড়েছে। সাথে এ্যাপেনটিসাইড বেশ ফুলে গিয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব এ্যাপেনটিসাইডের অপারেশন করাতে হবে। আর, ব্রেইন টিউমার টাও বেশ বড় হয়ে গিয়েছে। আমরা স্ক্যান করে দেখেছি। ‘

‘ কী বলছেন ডাক্তার সাব। ওর, ওর অসুখ এতোটা বেরে গেছে! ‘

‘ হ্যা।‌ আপনারা রিসিপসনে টাকা জমা দিন। আজ রাতের মধ্যেই তার এ্যাপেনটিসাইডের অপারেশন করতে হবে। আর ব্রেইন টিউমার টার সম্পর্কে আমরা এখনো সঠিক কিছু বলতে পারছিনা। ঐটা খুব বড় হয়ে গিয়েছে এটাই শুধু আমরা স্ক্যান রিপোর্টে দেখেছি। আপনাদের আরো অনেক আগে ডাক্তার দেখানো প্রয়োজন ছিলো। ‘

মৌসুমী বেগম কাঁদো কাঁদো হয়ে বানু খালাকে ধরেন। বলতে থাকেন, 

‘ বানু, বানুরে,,, আমার মেয়েটা বাঁচবে তো। ওর এতো রোগ কীভাবে হয়ে গেলো! ‘

‘ ভেঙে পড়বেন না। ধৈর্য ধরুন। আপাতত এ্যাপেনটিসাইডের অপারেশন করাটা জরুরি। এটার ব্যাথার জন্যই ও অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে। আপনারা রিসিপসনে গিয়ে টাকার বিষয়টা নিয়ে কথা বলুন। ‘

বলেই ডাক্তার আজাদ চলে যেতে ধরেন তখনই বানু খালা তাকে ডেকে বলে উঠেন, 

‘ অপারেশনে কত টাকা লাগতে পারে! ‘

‘ ১ লাখের মতো। আপনারা রিসিপসনে কথা বলুন। সবকিছু ইন-ডিটেইলসে ধরা বলে দিবে। ‘

বলেই ডাক্তার আজাদ চলে যায়। মৌসুমী বেগম, বানু খালাকে ধরে কাঁদতে থাকেন। বানু খালা মৌসুমী বেগমকে শান্ত করতে থাকেন। কেবিনের দরজার মাঝে একটা কাঁচের গোল অংশ ছিলো। যা দিয়ে ভিতরের দিকটা দেখা যাচ্ছিলো। এতোক্ষণ পর্দা টানা থাকায় তারা ভিতরটা দেখতে পারেনি। তবে তারা এখন দেখতে পাচ্ছে। তাদের ইকরাকে দেখছে। মেয়েটাকে দেখে মনে হচ্ছে সে যেনো বেডে ঘুমাচ্ছে। তার মুখ মলিন। সবসময় হাসিখুশিতে থাকা মেয়েটার আজ সকাল থেকেই জ্ঞান নেই। বানু খালা শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছেন। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন ইকরার সুস্থতার জন্য। 

ভিতরে শুয়ে থাকা ইকরার পাশের মনিটর টায় তার হার্ডবিট দেখা যাচ্ছিলো। সেটা বেশ ধীরে ধীরে কাপছিলো। ভিতরে কেউ নেই এখন। ইকরার বেডের পাশের জানালাটা খোলা। খোলা সেই জানালাটার পর্দাটা দখিনের বাতাসে নড়ে উঠে। ইকরার চুল সাইড থেকে উড়ে কিছুটা তার মুখের উপর চলে আসে। ইকরা যে চোখ বুজেছে, এই চোখ কী আর ‌আদেও খুলবে! রিয়াদ কি আবার তার প্রেয়সীর হাস্যোজ্জল মুখখানা দেখতে পাবে! নাকি সাদার মাঝে কালো বসিয়ে, বিদায় নিবে ইকরা! 

 

চলবে ,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

 

( গল্পের এই পর্যায়ে এসে কী মনে হচ্ছে? কী হতে চলেছে এরপর? আপনার মতামত জানাতে পারেন কমেন্টে ❤️। কালকেও পর্ব পাবেন ❤️)

 

গল্প নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা করুন আমার গ্রুপে।

গ্রুপ লিংক 👇

https://www.facebook.com/groups/743016887019277/?ref=share_group_link

 

উপন্যাস :: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন :: ২(মুখোশ)

পর্ব :: ৮১ (২য় ভাগ)

লেখক :: মির্জা সাহারিয়া

 

উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন:: ২(মুখোশ)

পর্ব:: ৮২

লেখক:: মির্জা শাহারিয়া

 

১ দিন পর,

৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০

 

সন্ধ্যা ৭ টা। শম্পা রান্না ঘরে বসে রান্না করছে। রান্না ঘরটা কাঁচা। চারপাশে বেতের দেয়াল আর উপরে খড়ের চালা। রান্না ঘরটাও ছোট। মাটির চুলার সামনে বসে কড়াইয়ে খুন্তি নাড়ছে শম্পা। কড়াইয়ে পিঁয়াজ মরিচ ভাজতেছে সে‌। পড়নে এক পুরোনো থ্রী পিস। চুলার সামনে একটা পিড়িতে বসে আছে। চুলার কিছুটা সাইডে একটা লম্বা বয়ামের উপর কুপি রাখা। রান্না ঘরের লাইটটা কাল ফিউজ হয়ে গিয়েছে। তাই আজ কুপি জ্বালিয়েছে। সেটা থেকে যা আলো আসছে তাই দিয়ে রান্না করে নিচ্ছে শম্পা।  বিকালে কচু শাকের পাতা তুড়ে এনেছিলো। সেটাই এখন রান্না করবে আর সাথে আলুর ভর্তা। সংসারে টানা পোড়েনে এখন এগুলাই তাদের নিত্যদিনের আহার।  

শম্পা ওড়নার আঁচল দিয়ে মুখের ঘাম মুছে। ভাজা পেঁয়াজ মরিচের উপর ধুয়ে আনা কচুর পাতা গুলো দিয়ে দেয়। ‘শা শা’ শব্দ আসতে থাকে কড়াই থেকে। শম্পা গামলার গাঁয়ে লেগে থাকা বাকি পাতা গুলাও হাত দিয়ে নিয়ে কড়াইয়ে দিয়ে দেয়। গামলাটা সাইডে রেখে কড়াইয়ের হাতল কাপড় দিয়ে ধরে খুন্তি দিয়ে কচুর পাতা গুলো নেড়েচেড়ে দিতে থাকে। ট্রেন স্টেশনের পথচারী থেকে এখন এই সংসারের একজন। যদিও পথ টা এতো সহজ ছিলোনা। তবুও সে এখানে যতটা ভালো আছে তার জন্য আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া আদায় করে। 

সাইকেলের শব্দ পাওয়া যায়। হয়তো রাশেদ বাজার থেকে ফিরে এসেছে। রাশেদ সারাদিন খেটে পাওয়া পয়সা দিয়ে সন্ধ্যার দিকে গন্জে গিয়েছিলো সদাই পাতি আর তার মা-বাবার ওষুধ আনতে। মাত্রই ফিরলো সে। শম্পা সেদিকে একবার কান দিয়েই আবার তার রান্নার দিকে মনযোগ দেয়‌।

 রান্না ঘরের খোলা দরজা দিয়ে ভিতরে আসে রাশেদ। পড়নে লুঙ্গি আর একটা পুরান শার্ট। হাতে বাজারের ব্যাগ। শম্পা পিছন ফিরে তাকায়। বলে,

‘ আপনে আইছেন! ‘

‘ হ্যা। মা-বাবা ঘুমাচ্ছে? ‘

শম্পা সামনে ফিরে। তরকারি নেড়ে দিতে দিতে বলে

‘ হ।‌ হেরা একটু আগেই ঘুমাইলো। হেগোরে ঘুম পাড়ায়া দিয়াই আমি পাকের ঘরে আইছি। ‘

রাশেদ ব্যাগ টা থেকে কিছু বের করতে থাকে। শম্পা পিছনে ফিরে তাকায় না। রাশেদ ব্যাগ থেকে আরো একটা ছোট ব্যাগ বের করে। শম্পার পিছনে এসে দাঁড়ায়। বলে,

‘ এটা নেও। ‘

শম্পা পিছন ফিরে তাকায়। দেখে একটা ছোট ব্যাগ রাশেদ তাকে দিচ্ছে। শম্পা হাতের তালু তার কাপড়ে মুছে ব্যাগটা হাতে নেয়। বলে,

‘ কী এইডা! ‘

‘ শাড়ি। আমার বোনের কাপড়ে আর কয়দিন থাকবা‌। (একটু থেমে) আজ থেকে এই শাড়িটা পড়িও। বেশি দামি না, কমদামিই বলতে পারো। আজ সারাদিন খেটে ৬০০ টাকার মতো পেয়েছি। ঐখান থেকে ৩০০ টাকা দিয়ে এটা নিয়েছি। (থেমে) বের করে দেখো। ‘

শম্পা মুখ খুশিতে ছেয়ে যায়। সে তাড়াতাড়ি ব্যাগ থেকে শাড়িটা বের করে। শাড়িটা খয়েরি রঙের। শম্পা শাড়িটাকে উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে দেখে হাসিমুখে রাশেদের দিকে তাকায়। বলে,

‘ অনেক সুন্দর হইছে। আপনারে অনেক অনেক ধইন্যবাদ। ‘

‘ কাছের মানুষদের ধন্যবাদ দিতে হয়না। (হাতের ব্যাগ টা রান্না ঘরেই রেখে) এটায় মা-বাবার ওষুধ আছে। আর মসুরের ডাল আছে। কাল দেখি, পারলে ডিম আনার চেষ্টা করবো। আজ যা টাকা পেয়েছিলাম। এগুলা দিয়ে এর চেয়ে বেশি কিছু কিনতে পারলাম না। ও হ্যা, লাইট টাও এনেছি। দাঁড়াও লাগিয়ে দেই। ‘

বলেই হেলে ব্যাগ থেকে লাইট টা বের করতে থাকে রাশেদ।শম্পা সামনে ফিরে এক হাত দিয়ে কড়াইয়ের তরকারি উল্টে পাল্টে দেয়। তাঁরপর আবার পিছনে ফিরে রাশেদকে দেখে। রাশেদের সম্পূর্ণ মনযোগ ব্যাগের দিকে ছিলো। কুপির মৃদু অগ্নি শিখায় রাশেদের শ্যামসুন্দর মুখ খানা বেশ ফুটে উঠছিলো। শম্পা ম্লিন হাসে। রাশেদ ব্যাগের ভিতর থেকে লাইট টা বের করে। লালচে রঙের লাইট যেগুলো গ্রামে ব্যবহার করা হয়, এটা ঐ লাইট। দাম ৪০ টাকা। কিন্তু এই ৪০ টাকাই এখন রাশেদ দের কাছে অনেক মূল্যবান। রাশেদ লাইটের প্যাকেট থেকে লাইটটা বের করতে যায়, তখনই শম্পা বলে,

‘ আপনে ঘরে গিয়া রেষ্ট নেন। আমার এইডা রান্না হইলেই রান্নার কাম শ্যাষ। কুপি দিয়াই চইলা যাইবো। আপনে সারাদিন অনেক পরিশ্রম কইরা আইছেন। একটু শরীর ডারে রেষ্ট না দিলে তহন অসুস্থ হইয়া যাইবেন। ‘

রাশেদ মুখ তুলে শম্পার দিকে তাকায়। বলে,

‘ তাইলে রেখে দিবো! ‘

‘ হ রাইখা দেন। ব্যাগের ভিতরেই রাইখা দেন।‌ আমি ঘরে আপনার বিছানা ঝাইড়া পরিস্কার কইরা রাখছি। শুইতে চাইলে শুইতে পারেন। ‘

‘ আচ্ছা ঠিক আছে। (উঠে দাঁড়িয়ে) শাড়িটা দেও, ঘরে রেখে আসি। কাল গোসল করে পড়িও। ‘

শম্পা হাসিমুখেই শাড়িটা রাশেদের দিকে এগিয়ে দেয়। রাশেদ শাড়িটা নেয়। ছোট্ট ব্যাগটায় ঢুকিয়ে রাখতে থাকে।‌ শম্পা বলে উঠে,

‘ আপনে ঘরে যান, আমি আপনার লাইগা লেবুর শরবত কইরা আনতাছি। ঠান্ডা পানি দিয়া লেবুর শরবত খাইলে ভিতরডা একদম ঠান্ডা ঠান্ডা হইয়া যাইবো।‌ ‘

‘ লেবু কই পাইলা! ‘

‘ কচু পাতা তুইড়া আনার সময় একটা লেবু গাছ থেইকা ৩-৪ ডা তুইরা আনছিলাম। অবশ্য ঐ বাড়ির কেউ বিষয়ডা দেহে নাই। আর আমারে ধরতেও পারেনাই। হি হি হি ‘

‘ এরপর আর এমন করতে যেওনা। পরে তখন চোর চোর বলে তাড়া দিবে তোমাকে। তোমার যা লাগবে, বা খাইতে মন চাইবে তুমি আমাকে বলিও। আমি যতটুকু পারি বাজার থেকে কিনে এনে দিবো। ঠিক আছে! ‘

শম্পা মুখ মলিন করে। ধীর গলায় বলে,

‘ আইচ্ছা। এরপর থেইকা আর এমন করমু না। ‘

‘ ওড়না কাপড় ঠিক করে রাখো। চুলা থেকে আগুন বেড়িয়ে এসে কাপড়ে যখন তখন আগুন ধরে যাবে। ‘

শম্পা চুলার খড়ি গুলা একটু ঠেলে দিয়ে হাসি মুখে বলে,

‘ নাহ। ঐরকম কিছু হইবো না। (ওড়নার ঝুলন্ত অংশটা কোলের উপর নিয়ে) আমি সবসময় সাবধানেই আছি। ‘

‘ আমার লুঙ্গি টা ঘরে! ‘

‘ কোনডা, আইজ সকালে যেইডা ধুইয়া দিলাম! হ ঐডা ঘরেই। আমি ভাঁজ কইরা বিছানার কোনে রাইখা দিছি। ‘

‘ ঠিক আছে। ‘

বলেই রাশেদ রান্না ঘরের খোলা দরজা দিয়ে বাইরে চলে যায়। বাইরে আজ জোছনা পড়েছে কিছুটা। সেই আলোয় আঙিনা মৃদু দৃশ্যমান। রাশেদ আঙিনা পেড়িয়ে ঘরের দিকে চলে যায়। 

শম্পা সামনে ফিরে কড়াই ধরে তরকারি নাড়তে থাকে। তার কেনো যানি খুব খুশি খুশি লাগতেছে। রাশেদ ওর জন্য শাড়ি আনছে। হোক কমদামি। কিন্তু ঐটাই যে শম্পার কাছে অমূল্য রত্ন ধনের সমান। শম্পা লবণের বোয়ম খুলে এক চিমটি লবণ নিয়ে তরকারিতে দিয়ে দেয়। বোয়মের ঢাকনা লাগিয়ে সাইটে রেখে তরকারি নেড়ে চেড়ে দিতে থাকে। কুপির অনির্বান শিখা হালকা বাতাসে মৃদু দোল খেয়ে উঠে। 

 

_____

 

রাত ৯ টা। মেম্বার বাড়ির ডায়নিং টেবিলে খাবার খাচ্ছে সাথী আর আঁখি। তাদের পাশেই শিউলি বেগম দাঁড়ানো। তিনি বারবার চারপাশ চেয়ে দেখছেন মতিন আসছেন কি না। তার মুখে একটু ভয়ের ছাপ। 

 

সেদিন সবাইকে পুলিশ নিয়ে যাওয়ার পর নিপাকে শিউলি বেগম আর মতিন মেম্বার এ বাড়িতে নিয়ে আসেন। ও বাড়িতে সাথী আর আঁখি একলাই ছিলো। তবে আজ সকালে আঁখি এসে জানায় সাথী বেগমের পিঠির ব্যাথা অনেকটা বেড়েছে। সে কোথায় যাবে কি করবে তা ভেবে না পেয়ে মেম্বার বাড়িতেই ছুটে এসেছে সাহায্যর জন্য। তখন মতিন মেম্বার ছিলেন না। শিউলি বেগমেরও মায়া হয়। সাথী বেগম আর এই ছোট্ট আঁখি তো কিছুই করেনি। যা করেছে, তা তো করেছে এদের বাড়ির কর্তারা। শিউলি বেগম তখনই আঁখির সাথে খান বাড়িতে চলে যান। গিয়ে সাথী বেগমকে নিয়ে এবাড়িতে চলে আসেন। এনে বাড়ির দক্ষিণের ফাঁকা ঘরটায় যেটায় আফাজের মা-বাবা এসে থেকেছিলো সেটায় থাকার ব্যবস্থা করেন। তবে মতিন মেম্বার যখন ফুলমতির কাছ থেকে জানতে পারেন যে ও বাড়ির কেউ এই বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে, তিনি চটে যান। তার সাথে এই নিয়ে শিউলি বেগমের বেশ কয়েকবার বাক-বিতণ্ডাও হয়। 

শিউলি বেগম এখন তাই এদের দুইজনকে আগে আগে খাইয়ে ঘরে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। যাতে মতিন মেম্বারের চোখে এরা আবার না পড়ে আর তিনিও চিল্লাচিল্লি না করেন। 

সাথী বেগম আর আঁখির খাওয়া হয়ে যায়। তারা সেখানেই প্লেটে হাত ধুয়ে নেয়। আঁখি আগে চেয়ার সড়িয়ে উঠে দাঁড়ায়। তারপর শিউলি বেগম আর আঁখি মিলে ধরে সাথীকে উঠান। উঠিয়ে ঘরের দিকে নিয়ে যেতে থাকেন। তখনই পিছনে মতিন মেম্বার তার ঘর থেকে বের হন। সাথী আর আঁখিকে দেখে যেনো আবার তার মাথায় রাগ চড়ে যায়। তিনি চিল্লাতে চিল্লাতে এগিয়ে আসেন। ঘর থেকে বাকিরাও এই চিল্লানোর আওয়াজ শুনে বেড়িয়ে আসে। শিউলি বেগম সাথীকে ছেড়ে দেন আঁখির উপর। ঘর থেকে বের হওয়া সুমুকে একটু অনুনয় করে বলেন সাথীকে ধরতে। সুমু সাথীর আরেক প্রান্ত ধরে তাকে ঘরের দিকে নিয়ে যেতে থাকে। শিউলি বেগম চলে আসতে থাকেন মতিন মেম্বারের দিকে। মতিন মেম্বার চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে বলছিলেন,

‘ মানুষের মাংস খাইতে কও ওগোরে। ওগো পেট দিয়া কী গরুর মাংস নামবো! পুলিশ এই দুইডারেও নেয়নাই ক্যা! এই দুইডারে ছাইড়া দিছে ক্যা। ওরা আমার বাড়িত ক্যান আইবো। খান বাড়ির কেউ এই বাড়িতে ক্যান পা রাখবো,,,! ‘

শিউলি বেগম হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে দাঁড়ান মতিন মেম্বারের সামনে। তিনিও চিল্লিয়ে উঠে বলতে থাকেন,

‘ চুপ করো তুমি। দেখতাছো উনি অসুস্থ। তুমি ক্যান উনাগোর লগে এমন করতাছো! ‘

‘ আমি এইহানে আশ্রয়কেন্দ্র খুইলা বহিনাই! এইডা আমার বাড়ি বুজ্জো, আমার বাড়ি। এইহানে আমি মানুষ ছাড়া কোন জানোয়ার থাকতে দিমুনা। ‘

‘ ঠিক কইরা কথা কও। তোমরা পুরুষেরা পাপ করবা, আর বোঝা আমরা লইমু ক্যান! উনার পোলাহ স্বামী খারাপ কাজ করছে। উনি তো আর করেন নাই। ‘

‘ সবডি একই কাম করতো। সবডি। ওরা এহন আমাগোরে মাইরা খাওয়ার লাইগা নাটক করতে আইছে এহানে। তুমি ওগোরে অহনি বাইত্তে বাইর কইরা দেও। ‘

‘ ওগোরে যদি তুমি বাইর কইরা দেও তাইলে আমিও ওগো লগে যামুগা। (কাঁদো কাঁদো হয়ে) করমুনা আমি তোমার এই সংসার। ‘

মতিন মেম্বার চোখ গরম গরম করে শিউলি বেগমের দিকে তাকান। তিনি যেনো আরো কয়েকটা কথা শুনিয়ে দিতে চাইছিলেন। তখনই ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে আফাজ। মতিন মেম্বার আফাজকে দেখে আর কিছু বলেন না। ডায়নিং টেবিলের একটা চেয়ারে লাত্থি মেরে চলে যান তার ঘরের দিকে। ফুলমতি এসে শিউলি বেগমের পাশে দাঁড়ান। ঐদিকে দরজা দিয়ে উঁকি দিয়ে অবাক হয়ে এদিকে তাকিয়ে আছে লায়লা আর হনুফা। আফাজ তার ঘরের ভিতর চলে যায়। শিউলি বেগম তার চোখের পানি মুছেন। ফুলমতিকে বলেন,

‘ ওরা ঘরে গ্যাছে! ‘

‘ হ চাচি। ‘

‘ নিপা ঘরে কী করতাছে! ‘

‘ চুপচাপ হইয়া আছে চাচি। দরজা লাগাইয়া ঘরে চুপচাপ কইরা আছে। ‘

‘ আমি ভাত উডায়া দিতাছি। তুই একটু তোর চাচার ঘরে গিয়া দিয়া আয়। হের যে কী হইছে, এমনে এমনে খালি রাইগা যাইতাছে আইজ। 

‘ আইচ্ছা দেন চাচি। আমি দিয়া আইতাছি। ‘

শিউলি বেগম ফিরে টেবিলে একটা প্লেট সোজা করে রাখেন। সেখানে ভাত তরকারি উঠিয়ে দিতে থাকেন। ফুলমতি তরকারির বাটি শিউলি বেগমের দিকে এগিয়ে দেন। শিউলি বেগম শাড়ির আঁচলে তার চোখ মুছেন। 

 

   নিপা বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে। সে কাঁদছে। নিঃশব্দে কাঁদছে। তার ভিতরটা বারবার রায়হানকে খুঁজে ফিরছে। যেই মানুষটাকে ছাড়া সে একটা মুহুর্ত ভাবতে পারতো না সেই মানুষটার মুখ দেখেনি এ দু’দিন। ভালোবেসে ওরা ঘর বাধিলো, তাদের সেই ছোট্ট সুখের নীড় টা কতটাই না ভালোবাসার সমৃদ্ধ ছিলো। সেই নীড়ের দুটি পাখি আজ দুদিকে। নিপা এখনো বিশ্বাস করে রায়হান নরখাদক না। রায়হান এমন হতে পারে না। তার ভালোবাসার মানুষটা ছদ্মবেশ ধারণ করতে পারেনা। নিপা বারবার মন থেকে চাইছে, সব মিথ্যে প্রমাণ হোক। তার রায়হান আবার তার কাছে ফিরে আসুক। ভালোবাসায় থাক না কিছু কলঙ্ক, যদি সেই ভালোবাসা সত্যি হয় তবে দুইজন দুইজনকে হাজারো বাঁধা, প্রতিকূলতার মাঝেও ভালোবেসে যাবে। কলঙ্কগুলো আগুনে ঝলসে দিয়ে ভালোবাসাকে পুড়িয়ে খাঁটি করতে ক’জনই বা যানে এই যুগে! 

 

নিপার বিছানার পাশেই ঘরের জানালা। জানালাটা খোলা। বাইরে জোছনা রাত। বাগানের ফুল গুলো মৃদু বাতাসে দোল খাচ্ছে। এক ছায়ামূর্তি এসে দাঁড়ায় জানালার সামনে। ঘরের আলো পড়তেই সেই ছায়ামূর্তির দেহ স্পষ্ট হয়ে উঠে। এক বোরখা পরিহিত মহিলা দাঁড়িয়ে আছে জানালার বাইরে। মুখ কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা। নিপা জানালার বাইরে থাকা এই নারীর উপস্থিতি টের পায়নি। সে তার প্রিয়কে ভেবে চোখের জল ফেলেই যাচ্ছে। তখনই হঠাৎ সেই বোরখা পরিহিত মহিলাটা জানালার গ্রিল গুলো ধরে ফিসফিসিয়ে বলে,

‘ সুবা,,, সুবা,,, এই সুবা,,,’

নিপা তৎক্ষণাৎ সোজা হয়ে বসে। ফিরে তাকায় জানালার দিকে। দেখে বোরখা পরিহিত কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। নিপা ফিরে তাকাতেই সেই বোরখা পরিহিত মহিলাটা তার মুখের উপর থেকে কালো কাপড় উঠায়। নিপা দেখে বোরখার আড়ালে আর কেউ নয়, ছিলো রায়হান! নিপা অবাক হলেও সে রায়হানকে কোন কথা বলেনা। সে আবার মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বিছানায় চুপটি করে বসে থাকে। তখনই রায়হান আবার বলে,

‘ সুবা,,, আমার, আমার তোমার সাথে কিছু কথা ছিলো। প্লিজ পিছনের বাগানে আসো। আমি সত্যিই এসবের সাথে জড়িত নই! ‘

নিপা চোখের জল মুছে। তার নরম মনটাকে এক কঠিন মুখোশে ঢেকে বলে

‘ আমি, আমি কোন নরখাদকের সাথে কথা বলতে চাই না। চলে যাও তুমি। ‘

‘ সুবা প্লিজ, আমার কথাটা শুনো। আমি সত্যিই এসবের সাথে নেই। আমি, আমি তোমাকে কিছু কথা বলতে চাই। প্লিজ পিছনের বাগান টায় আসো। আমি অনেক কষ্টে জেল থেকে পালিয়েছি। পুলিশ আমায় খুঁজছে। আমি তোমার সাথে একটাবার দেখা করতে চাই। প্লিজ পিছনের বাগান টায় আসো। প্লিজ! ‘

‘ কী বলবে আমায়! আবার তোমার মিছে মায়ায় জড়িয়ে নিজের করে নিতে চাইবে! আমি, আমি তোমার মুখ দেখতে চাই না। ‘

‘ প্লিজ সুবা। আমার অনুরোধ টা রাখো। (চারপাশ তাকিয়ে) আমার কথা গুলা একটু শুনো। পিছনের বাগান টায় একটু আসো। প্লিজ আসো। ‘

নিপা পিছনে ফিরে রায়হানকে একবার দেখে। আবার সামনে তাকায়। হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায়। এগিয়ে গিয়ে ঘরের আলমারি থেকে একটা ছোট্ট বাঁধা ব্যাগ বের করে। আলমারির দরজা লাগিয়ে দিয়ে ঘরের দরজার সামনে দাঁড়ায়। ছিটকিনি খুলে ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়। রায়হান ভাবতে থাকে নিপা কী বাগানে আসার জন্য বের হলো! হয়তো তাই হবে। রায়হানও জানালার পাশ থেকে সড়ে যায়।

 

   মেম্বার বাড়ির পিছনের বাগান। বাগানের একপাশ টায় ফুলের গাছ। তারপর একটু ফাঁকা যায়গা। আর তারপরই বাড়ির দেয়াল ঘেঁষে লাগানো বসার যায়গাটা। আকাশ আজ জোছনায় ভরা। গোলগাল চাঁদের সাথে তারাকারাজিরাও ঝলমলিয়ে উঠেছে। বোরখা পড়া রায়হান পায়চারি করছে ফাঁকা যায়গাটায়। নিপা গলিটা দিয়ে বাড়ির পিছনে আসে। তার চোখ মুখ কঠিন। পড়নে শাড়ি। একটু পর পর হাত দিয়ে চোখ মুছছে সে। নিপা এসে দাঁড়ায় ফাঁকা যায়গাটায়। রায়হান পিছনে ফিরে তাকায়। দেখে নিপা চলে এসেছে। সে এগিয়ে এসেই ‘সুবা’ বলে নিপার হাত ধরে। তখনই নিপা হাত টেনে ছাড়িয়ে নেয়। রায়হান কিছু বলতেই যাবে তখনই নিপা তার হাতে করে আনা ছোট্ট বাঁধা ব্যাগটা খুলতে থাকে। রায়হান দেখতে থাকে। বলে,

‘ এটা কী সুবা! ‘

নিপা কিছু বলেনা। সে ব্যাগ টা খুলে সেটার ভিতর হাত ঢুকায়। ভিতর থেকে বের করে একটা মোবাইল ফোন। রায়হানকে সেই ফোনটা দেখিয়ে কঠিন গলায় বলে,

‘ এটা কী ? ‘

‘ ফোন। কেনো যে কেউই তো বলবে এটা একটা ফোন। ‘

‘ এই ফোনটা না তোমার খাগড়াছড়িতে হারিয়ে গিয়েছিলো! ‘

সাথে সাথেই রায়হানের চোখ মুখ বড় বড় হয়ে যায়। সে এক ঢোক গিলে। নিপা আবার ব্যাগের ভিতর হাত ঢুকায়। ভিতর থেকে বের করে কিছু ছবি। ছবি গুলো ছিলো নিপা আর রায়হান যে খাগড়াছড়ির পাহাড়ে তাঁবু টেনে ছিলো, রাতে গান গেয়েছিলো, খাবার খেয়েছিলো সেসব ছবি। নিপা ছবি গুলো রায়হানকে দেখিয়ে বলে,

‘ এই ছবি গুলো কে তুলেছে! কী হলো বলো। কে তুলেছে এই ছবি গুলো। ‘ 

বলেই ছবি গুলো ছুড়ে মারে রায়হানের মুখের উপর। রায়হান বুঝে পায়না কি বলবে। নিপা রুঢ় গলায় বলে,

‘ এই ছবি গুলো আঁখি তোমার অফিস ব্যাগ থেকে পেয়েছে। এই ফোন, এই ফোনটাও ব্যাগে ছিলো। এইসবের মানে কী,,,! আর ফোনে, ফোনে (ফোন টিপে একটা রেকর্ডিং চালূ করে) এসব কীসের রেকর্ডিং। তুমি কাকে মারার কথা বলছো। এসব কী রায়হান, এসব কী! (কাঁদো কাঁদো হয়ে) তুমি দিনের পর দিন আমার থেকে কী লুকিয়ে রেখেছিলে। কেনো লুকিয়ে রেখেছিলে। ‘

‘ সুবা, সুবা আমার কথাটাতো শোনো। ‘

‘ কী শুনবো আমি তোমার। কী শুনবো। (চোখ মুছে) এটাই বলবে যে তুমি তোমার বাবার সাথে জড়িত নও তো। তাইলে মানুষ খুন করার কথা কেনো বলছিলে তুমি। কেনো,,,! ‘

রায়হান জোড়ে বলে উঠে,

‘ হ্যা হ্যা, আমি মানুষ খুন করি। আমি একজন কন্ট্রাক্ট কিলার। আমি টাকার বদলে মানুষ খুন করে বেড়াই। (ধীর গলায়) কিন্তু আমি মানুষ খাই না। আমি বাবার কোন কাজের সাথেই জড়িত নই। আমি,আমি শুধু বাবার ফিডের বিজনেস টা দেখাশুনা করতাম। আর, আর কিছুই না। ‘

‘ বাহ রায়হান বাহ। একজন খুনি হিসেবে নিজেকে শিকার করতেও তোমার মুখে বাঁধলো না। আর এই মানুষটার সাথেই কিনা আমি দিনের পর দিন থেকেছি। বাহ। ‘

‘ সুবা। সুবা আমি অনেক বার চেষ্টা করেছি এই খারাপ জগত থেকে বেড়িয়ে আসতে। কিন্তু, কিন্তু পারিনি‌। আমি কলেজ থেকেই এসবের সাথে জড়িত। আমার বন্ধু পারভেজ আমাকে এই লাইনে এনেছে। আমি, আমি নিজ ইচ্ছায় আসিনি সুবা। ‘

‘ তো এখন সব দোষ তোমার বন্ধুর। তুমি কিছু জানোনা। তুমি একদম নির্দোষ! ‘ 

‘ আমি তা বলছিনা। আমি অনেক বার চেষ্টা করেছি এখান থেকে বের হওয়ার। কিন্তু, কিন্তু আমার ম্যাডাম আমাকে বের হতে দেয়নি। ‘

‘ ম্যাডাম! ও আচ্ছা ম্যাডাম। তোমার জীবনে আমার থেকে ম্যাডামের মূল্য বেশি! তাইলে আমাকে কেনো মায়ায় জড়াতে গেলে। ম্যাডামকে নিয়েই জীবন কাটিয়ে দিতে। (জোড়ে চিৎকার করে) ম্যাডামকে গিয়ে বিয়ে করতে। আমাকে কেনো স্বপ্ন দেখাতে এসেছিলে। কেনো আমার মন নিয়ে খেলতে এসেছিলে। ‘

রায়হান তৎক্ষণাৎ নিপার দুই হাত ধরে। নিপা হাত ছাড়াতে যায় কিন্তু রায়হান এইবার শক্ত করে ধরায় সে আর ছাড়াতে পারে না। রায়হান তাকে কাছে টানে। চোখে চোখ রেখে ধীর গলায় বলে,

‘ এই রায়হান শুধু তাকেই আপন করে নিয়েছে, যাকে সে ভালোবেসেছে। আমার ভালোবাসা মিথ্যে ছিলোনা। আমার কৃতকর্মের জন্য আমার ভালোবাসা মিথ্যে হয়ে যেতে পারেনা। ‘

নিপা তার কঠিন মুখোশ টা আর ধরে রাখতে পারেনা। কান্না করে উঠে সে। রায়হানকে হঠাৎ জড়িয়ে ধরে। খুব আপন করে জড়িয়ে ধরে। কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে,

‘ তুমি কেনো এমন হলে রায়হান, আমাদের আলো ভরা জীবনে কেনো অন্ধকার নেমে আসলো। এমনটা তো হওয়ার কথা ছিলোনা। আমাদের ছোট্ট সুখের সংসার টা এমন কেনো অগোছালো হয়ে যাচ্ছে। আমি, আমি তোমায় হারাতে চাই না। কিন্তু আমি তোমার পেশাকেও মেনে নিতে পারবোনা। প্লিজ রায়হান, তুমি, তুমি সব কিছু বাদ দিয়ে দাও। তুমি-আমি আবার নতুন করে সংসার বুনি। আমাদের স্বপ্ন গুলোকে এক সুতোয় গাঁথি। তুমি সবকিছু ছেড়ে দাও রায়হান। প্লিজ, সবকিছু ছেড়ে দাও! 

 

বেশ কিছুক্ষণ পর,,,

 

   বাগানের পাশের বসার যায়গাটায় বসে আছে রায়হান নিপা। দুইজন একদম স্তব্ধ। আকাশের জোছনারা উঠোন পেতে রয়েছে। হালকা বাতাস বয়ে যায়। রায়হান বলতে শুরু করে তার কাহিনী প্রথম থেকে। 

 

‘ আমি তখন কলেজে পড়তাম। বাবা আমাকে ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন পড়াশোনা শেষ করার জন্য। সাউথইস্ট কলেজে তখন আমার শেষ সেমিস্টার চলছিলো। আমার বন্ধু পারভেজ আর আমি দুইজনেই ছোট থেকে একসাথে ছিলাম। দুইজন অনেক ভালো বন্ধু ছিলাম। ও সুটার ছিলো। ভালো স্যুট করতে পারতো। ওর পাশপাশি আমিও নিশানায় বেশ পারদর্শী ছিলাম। আমরা তখন খেলনা বন্দুক দিয়ে নিশানা বাজি করতাম। কলেজের গানের দল ছেড়েছি তখন আমি খালি। সারাদিন অলস সময় যেতো। একদিন পারভেজ খবর আনে সে একটা কাজের সন্ধান পেয়েছে। সেখানে নাকি অনেক অনেক টাকা। আমি নিশানা ভালো পারি তাই পারভেজ তার সাথে আমাকেও নিতে চাইছিলো। আমারও টাকার প্রতি লোভ ছিলো। এতো গুলা টাকা পাওয়ার লোভ তখন আমি ছাড়তে পারিনি। কাজ এসেছিলো মোসাদ থেকে। মোসাদ ইসরাইলের এক গুপ্ত গোয়েন্দা সংস্থা। তারা ভালো গোয়েন্দা না। তাদের হাজারো এজেন্ট দেশে,দেশে ছড়িয়ে রয়। তাদের কাজ থাকে বিভিন্ন গোপন হত্যা মিশন চালানো আর কোন দেশে ভালো কিছু উদ্ভাবন হলে সেটা যে কোন ভাবেই হোক তাদের দেশে নিয়ে যাওয়া, ইত্যাদি। পারভেজ আর আমি মোসাদের কিলিং এজেন্ট হিসেবে সিলেক্ট হই। আমাদের বিভিন্ন গোপন মিশনের মাধ্যমে মানুষ খুন করতে হতো। প্রথম প্রথম আমি টাকার এমাউন্টের দিকে দেখে মানুষ খুন করে যেতাম। তেমন একটা খারাপ লাগা বা অনুতপ্ত বোধ কাজ করতো না আমার মাঝে। কলেজ শেষ করে বাবার ব্যবসায় জয়েন করি। বাবা আমাকে তার ফিডের বিজনেস দেখা শোনার দায়িত্ব দেন। আমি বিজনেস হাতে নেওয়ার পর প্রথম প্রথম বাবার গোপন কাজ সম্পর্কে জানতাম না। তবে পরবর্তীতে গুপ্তচরের মাধ্যমে সব খবর পাই। বাবার এই কাজ গুলো শুনে তুমি এখন যতটা অবাক হচ্ছো, তার থেকেও আমি বেশি অবাক হয়েছিলাম। (একটু থেমে) বাবা আমাকে কেনো তার এই দিকটা সম্পর্কে জানাননি, তা জানিনা। হয়তো তিনি চাচ্ছিলেন না যে আমি এসবের সাথে জড়াই‌। কিন্তু তিনি তো জানতেন না, তার ছেলেও তার মতোই খারাপ কাজে লিপ্ত। পার্থক্য শুধু এটাই, তিনি নিজের মানসিক শান্তির জন্য মানুষ মারতেন, আর আমি টাকার জন্য। আমাকে আর পারভেজকে বিভিন্ন মিশনের কমান্ড দিতো আমাদের ম্যাডাম সিমরান। উনাকে সবাই লেডি সিমরান হিসেবেই জানে। হয়তো এটা উনার ছদ্মনাম। তাকে আমরা দেখিনি। তিনি আমাদের ফোনেই সব কাজের অর্ডার দিতেন। অবশ্য তিনি আমাকে আর পারভেজকে অর্ডার দিচ্ছেন এই ৩-৪ বছর থেকেই। আগে আমাদের দুইজনের প্রধান অন্য এক লোক ছিলো। অবশ্য এরা সবাইই মোসাদের এজেন্ট। গুপ্ত এজেন্ট। ‘

নিপা বলে,

‘ তুমি এই পর্যন্ত কতজনকে মেরেছো! ‘

‘ হিসাব নেই। তবে আপাতত ধরে নেও শ’পাঁচেক। আমার বেশির ভাগ মিশন থাকতো শহরের দিকে। এই জন্য আমাকে মাঝে মাঝে ঢাকা যেতে হতো। তবে এই গ্রামেও আমাকে দুইটা মিশন চালাতে হয়েছে। অবশ্য দুইটা হতোনা যদি আমি প্রথম টাতেই সফল হতাম। আমাদের গ্রামে বেশ কিছুদিন আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এসেছিলো মনে আছে! উনাকে মারার কাজ ছিলো। আমি কলেজের ছাদে উঠে মুখোশ পড়ে সব নিশানা ঠিকও করে ফেলেছিলাম। কিন্তু তখনই চেয়ারম্যান চাচা সামনে এসে যায় আর গুলি গিয়ে তার গায়ে লাগে। আমি ছাদ থেকে তৎক্ষণাৎ নেমে যাই। নিচে নেমে মুখোশ খুলে রায়হান হয়ে আবার রিয়াদ ও বাকিদের সাথে ছাদে আসি খুনিকে খুঁজতে। (একটু থেমে) স্বরাষ্ট মন্ত্রীকে এই যাত্রায় মারতে না পারায় আমাকে অনেক বকা শুনতে হয়েছিলো সিমরান ম্যাডামের কাছ থেকে। ম্যাডাম খুব রেগে ছিলেন এই বিষয় টা নিয়ে আমার উপর। তারপর যখন রাতে স্বারষ্ট্র মন্ত্রী চলে যেতে ধরেন তখন তার গাড়ি বহরে আমি হামলা করে তাদের মেরে ফেলি। আর ম্যাডামের রাগ টাও কিছুটা শান্ত করি। ‘

‘ তোমার ঐ মেমরিতে এই ম্যাডামের সাথে বলা কথোপকথন গুলো ছিলো! ‘

‘ হ্যা। আর তাই,,’

‘ আমি জানি। আমি তখন জেগে ছিলাম। তুমি যে আমার ফোন থেকে মেমরি কার্ড বের করেছিলে আর তারপর অন্য মেমরি কার্ড ঢুকিয়ে আসল টা ভেঙ্গে ফেলেছিলে, সব আমি দেখেছি। তুমি যখন আমায় ধরে সেই রাতে কেঁদেছিলে তখনই আমি বুঝতে পারি আমার জন্য হয়তো সামনে কোন কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। তবে ভাবতে পারিনি, বিষয়টা এতো বড়! ‘

‘ আমি তোমাকে বিয়ে করার পর থেকেই ভয়ে ভয়ে থাকতাম। যদি তুমি যেনে ফেলো, আর আমাকে ছেড়ে চলে যাও। আমি যে তোমাকে ছাড়া একদম থাকে পারিনা। তোমাকে একটা মুহুর্ত না দেখলে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। জানো তোমাকে ভালোবাসার পর থেকে আমি কেমন যেনো বদলে গিয়েছিলাম। আমার ভিতরে কেমন যেনো এক মায়া জেগে উঠেছিলো। ভালো এক বিবেকবোধ জেগে উঠেছিলো। আমি যাদের মেরেছি, তারাও তো কারো আপন কেউ, কারো প্রিয় মানুষ। তারা যখন তাদের প্রিয় মানুষের লাশ দেখে, তাদের কতটা খারাপ লাগে! আমি যেনো তা তোমার মধ্যে দিয়ে অনুধাবন করতে পারতাম। এরপর থেকে আমি সবসময় চাইতাম এই লাইন থেকে বেড়িয়ে যেতে। আমাকে যখন আমার ম্যাডাম ফোন দিতো কাজের জন্য, আমার খুব রাগ হতো। ইচ্ছে করতো ফোনটা ভেঙে ফেলি। সেই ম্যাডাম টাকেই গুলি করে মেরে ফেলি। কিন্তু না, আমি পারতাম না। ওরা আমাকে বের হতে দেয়নি। এই লাইনে যে একবার আসে, সে আর স্বাভাবিক জীবন ফিরতে পারেনা। ফিরতে চাইলেই মোসাদের লোকেরা তাকে মেরে ফেলে। তার ফ্যামিলিকে মেরে ফেলে। আমি হাজার টা খুন করে যেতে রাজী আছি, কিন্ত আমার জন্য তোমার গাঁয়ে একটা আঁচড়ও পড়ুক, তা আমি চাইনা, আমি সইতে পারবো না। তাই, তাই এক গোলকধাধার মতো চক্রাকারে ঘুড়েই যাচ্ছি। চাইলেও বের হতে পারছিনা। বের হতে গেলেই যে ওরা আমাকে আর তোমাকে মেরে ফেলবে। আমার শরীর রক্তে ভেসে যাক, ছিন্নভিন্ন হয়ে যাক। কিন্তু আমি তোমার শরীরের এক ফোঁটা রক্তও দেখতে পারবোনা। এক ফোঁটাও না। ‘

 

নিপা সবটুকু শুনে। তার বলার যেনো কিছুই নেই আর। সে কখনোই এক খুনির সাথে ঘর বাঁধতে পারবেনা, আবার সে রায়হানকে ছাড়াও থাকতে পারবেনা। রায়হানের মতো যেনো সেও এক গোলক ধাঁধায় পড়ে যায়। রায়হান পাশ ফিরে নিপার দিকে তাকায়। বসার যায়গায় রাখা নিপার হাতটা ধরে। নিপা ফিরে তাকায়। রায়হান বলে,

‘ আমি আজ চলে যাচ্ছি। তুমি একটু ভেবো। আমি তোমার আর আমার ভালোর জন্য বলছি। আমরা ঢাকায় একটা ফ্ল্যাট কিনে সেখানে ছদ্মবেশে থাকবো। পুলিশ তখন আমাদের আর ধরতে পারবেনা। (একটু থেমে) ভালোবাসার হ্রদয়ে কলঙ্কের দাগ একটা-দুটো থাকেই, তাই বলে কী ভালোবাসা মিথ্যে হয়ে যায়! (ধীর গলায়) আমি তোমার উত্তরের অপেক্ষায় থাকবো, স্রোতোসিনী! 

রায়হান এগিয়ে এসে নিপার কপালে একটা ছোট্ট চুমু খায়। ধীর গলায় বলে,

‘ সাবধানে থেকো। ‘

রায়হান বসার যায়গা থেকে উঠে যায়। মুখে বোরখার কালো কাপড় টা দিয়ে দেয়। পিছনে ফিরে হাত দিয়ে নিপাকে বিদায় জানায়। নিপার চোখ ছলছল। সে রায়হানের দিকে চেয়ে থাকে। রায়হান চলে যায়। হারিয়ে যায় দূরের অন্ধকারের মাঝে। নিপা মুখ তুলে আকাশের দিকে চায়। এই জোছনা ভরা রাত টা আজ তাদের কোন সুন্দর মুহূর্তের সাক্ষী হতে পারতো। তাদের আবেগের সাথে জড়িয়ে যেতে পারতো আষ্টেপৃষ্ঠে। কিন্তু না, সব কেমন যেনো এলোমেলো হয়ে গেলো।

 নিপা গোলগাল চাঁদ টার দিকে তাকায়। আনমনে বলে উঠে,

‘ চাঁদের গাঁয়ে দাগ থাকলেও সে যেমন সবার কাছে প্রিয়, তুমি আমার হাজার খারাপের মাঝেও রইবে হয়ে আত্মার আত্মীয়! ‘

 

____

 

রংপুর মেডিকেল কলেজ। ইকরা তার বেডে শুয়ে আছে। মুখ শুকনো।‌ গাঁয়ের কাঁথাটা বুক পর্যন্ত তুলে দেওয়া। পাশেই বসে আছে রিয়াদ। সে বই দেখে সূরা ইয়াসিন পড়ছে। ইকরা এক দৃষ্টে রিয়াদের দিকে তাকিয়ে আছে।

 

সেদিন ইকরার অপারেশনের বিষয় টা জানার সঙ্গে সঙ্গেই রিয়াদ ছুটে আসে। অপারেশনের পুরো টাকাটাও সেই জমা দেয়। ইকরার এ্যাপেনটিসাডের অপারেশন হয়। রিয়াদ সেই রাতে যে এসেছে তার পর থেকে আর বাড়ি ফিরেনি। এখানেই ইকরার পাশে সারাক্ষণ থেকেছে। ইকরার সেবা করেছে। এখন ইকরার মা আর খালা বাইরে আছে। তারা কাল সারারাত ছিলো, আজ সারাদিন ছিলো। এখন একটু ঘুমাচ্ছেন তারা। 

 

রিয়াদ সূরা ইয়াসিন পড়া শেষ করে ইকরার উপর ফু দেয়। ইকরা এক দৃষ্টে চেয়ে আছে রিয়াদের দিকে। রিয়াদ মৃদু গলায় বলে,

‘ কিছু বলবা! ‘

‘ খাবার খেয়েছো তুমি! ‘

‘ হ্যা খেয়েছি। তোমার কিছু খেতে মন চাইছে! আনার দিবো! ‘

বলেই হাতের বইটা রেখে পাশের টেবিল টা থেকে আনার হাতে নেয় রিয়াদ। ইকরা বলে,

‘ না না। আমি খাবোনা। আমার খিদা নাই। ‘

‘ আচ্ছা তাইলে চোখ বন্ধ করে থাকো। পেটের দিকটায় ব্যাথা করছে কী এখন! ‘

‘ কিছুটা। ‘

‘ ডাক্তার বলছে আস্তে আস্তে ব্যাথাটা কমে যাবে। যদি তোমার কখনো বেশি ব্যাথা হয়, আমাকে বলিও। ‘

‘ ঠিক আছে। ‘

রিয়াদ আবার বইটা হাতে নেয়। সুরা পড়তে থাকে। ইকরা আবার রিয়াদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। রিয়াদকে দেখে। রিয়াদ সুরা পড়ে ইকরার উপর আবার ফু দেয়। ইকরা হালকা চোখ বুঁজে আবার খুলে ফেলে‌। ধীর গলায় বলে,

‘ রিয়াদ। ‘

‘ হ্যা বলো। ‘

‘ আমি মরে যাবো তাই না! ‘

হঠাৎ ইকরার এমন কথায় রিয়াদ অবাক হয়। ইকরার মুখ মলিন। চোখ হালকা ছলছল। রিয়াদ কি বলবে তা মনে গুছিয়ে ঠিক করতে করতেই ইকরা আবার বলে,

‘ তুমি একটা ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে করি নিও। তাকেও ঠিক আমার মতো করে ভালোবাসিও। যা ইচ্ছে সব করিও। শুধু, শুধু আমাকে ভুলে যাইয়ো না। আমার জন্যও একটু ভালোবাসা তুলে রাখিও! ‘

রিয়াদ ইকরার কাছে আসে। তার মুখের উপরে পড়া কিছু চুল সড়িয়ে রাখে। বলে,

‘ তোমার কিচ্ছু হবেনা। তুমি ঠিক সুস্থ হয়ে যাবে। ‘

‘ আমি জানি আমার অনেক বড় রোগ হয়েছে। আমার এই রোগ, এই রোগ এতো সহজে সাড়বে না।‌ কী দরকার এতো কারি কারি টাকা খরচ করার। ‘

রিয়াদ সোজা হয়ে চেয়ারে বসে। বইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,

‘ টাকার দিক তোমায় কে দেখতে বলছে। তুমি চুপচাপ ঘুমাও। কোন আজেবাজে চিন্তা করিও না। ডাক্তার বলছে থেরাপি দিলে তুমি সুস্থ হয়ে যাবে। ‘

‘ সাথে এটাও বলেছে, স্বাভাবিক ভাবে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।‌ কী দরকার একটা বোঝাকে সারাজীবন কাঁধে করে বয়ে বেড়ানোর! ‘

‘ আমি কখনোই তোমাকে বোঝা মনে করবো না। তুমি যেভাবেই থাকো না কেনো। আমার শুধু তোমাকেই চাই‌। তুমি বিকলাঙ্গ হলেও আমি তোমাকে মগ্ন থাকবো, তুমি একদম প্যারালাইসিস হয়ে সয্যাশায়ী হলেও আমি তোমার পাশেই পড়ে থাকবো। দুনিয়ার মিছে মায়ার থেকে নিজের মানুষের বিশেষ মায়ায় পড়ে থাকা অনেক অনেক ভালো। তুমি ওসব নিয়ে চিন্তা করোনা তো। ঘুমাও।‌ ‘

‘ ভালোবাসার মায়াজাল বড়ই অদ্ভুত বলো। এই মায়ায় যে কেউ মুহূর্তের মধ্যেই পড়তে পারলেও, চাইলেই সে মায়া কাটিয়ে উঠতে পারে না। এই মায়া তার অন্তর্জালে চিরজীবনের জন্য রয়ে যায়। গোপনে সে আগলে রাখে তার মনের কোন এক সুপ্ত কুঠুরিতে। ‘

‘ আমিও এই মায়াজালেই আবদ্ধ। (ইকরার হাত শক্ত করে ধরে ম্লিন গলায়) শুধু তোমার মায়াজালে আবদ্ধ। ‘

ইকরাও রিয়াদের হাতটা খুব শক্ত করে ধরে। হাত ছেড়ে দিলে এই বুঝি সে হারিয়ে যাবে অসীম অজানায়। তার গাল বেয়ে অশ্রুজল গড়িয়ে পড়ে। রিয়াদ হাতের বইটা টেবিলে রেখে এগিয়ে আসে। ইকরার ভেজা চোখ দুটোয় চুমু খায়। ইকরা মৃদু হাসে। মনের কল্পনায় ভেসে উঠে এক প্রতিচ্ছবি। 

 

‘ এক গ্রামীণ মেঠোপথ। পথ টা আঁকাবাঁকা হয়ে চলে গিয়েছে। সূর্যের আভারা পথে প্রান্তরে পড়েছে। ইকরা দৌড়ে যাচ্ছে। সে হাসছে। রিয়াদও তার পিছু পিছু দৌড়ে তাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করছে। ইকরার নীল শাড়ির আঁচল হাওয়ায় উড়ছে। আকাশ দিয়ে এক দল পাখিরা ডাকতে ডাকতে উড়ে যায়‌। ইকরা দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ কিছু একটার সাথে পা বেজে পড়ে যেতে নেয় তখনই যেনো রিয়াদ বাতাসের বেগে এসে তাকে ধরে নেয়। ইকরা রিয়াদের কোলে পড়ে যায়। দুইজনেরই চোখে চোখ পড়ে। ইকরা হাসে। রিয়াদও হাঁসতে থাকে। এক দখিনা হাওয়া দুইজনকে ছুঁয়ে চলে যায়। শুভ্রতার বিন্দুতে গেঁথে রাখা প্রনয় রেখা মিলে যায় অনিকেত প্রান্তরে। আকাশের সূর্য এক টুকরো মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ে।  ‘

ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজতে থাকে গান,

 

আজ মন চেয়েছে আমি হারিয়ে যাবো,

হারিয়ে যাবো আমি তোমার সাথে,

 

চলবে ,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

 

( আজকের পর্বটা একটু ছোট করেই দিলাম। আরো বড় করে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিলো। কিন্তু গরম আর লোডসেডিংয়ে আমার মাথার বারোটা বাজে গেছে। ভালো করে মনই বসাতে পারছিলাম না। একটু খাপছাড়া লাগতে পারে শেষটা 😿। তবুও আজকের পর্বটার কোন কোন জিনিস ভালো লাগছে কমেন্ট করে জানাতে পারেন। কালও পর্ব আসছে। )

 

গল্প নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা করুন আমার গ্রুপে।

গ্রুপ লিংক 👇

https://www.facebook.com/groups/743016887019277/?ref=share_group_link

 

উপন্যাস :: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন :: ২(মুখোশ)

পর্ব :: ৮২

লেখক :: মির্জা সাহারিয়া

 

উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন:: ২(মুখোশ)

পর্ব:: ৮৩ (১ম ভাগ)

লেখক:: মির্জা শাহারিয়া

 

সকাল ৮ টা। শহুরে কিচেন। আহনাফ রান্নাঘরের বেসিনে কাপ ধুচ্ছে। সিলেট থেকে ঢাকায় তার বাসায় আসার হলো ২ দিন। এখন আপাতত বাড়িতেই পরিবারের সাথে সময় কাটাচ্ছে সে। কাপ ধোঁয়া শেষ হলে বেসিনের কলটা অফ করে দিয়ে কাপের পানি ঝাড়াতে ঝাড়াতে কিচেনের আরেকপাশে যায়। এখানে চায়ের ফ্লাক্স রাখা ছিলো। সকাল সকাল মুখ ধুয়ে এসে এক কাপ গরম চা না হলেই যেনো তার নয়। চায়ের কাপে চুমুক দিয়েই সে সকাল টাকে তাজা করে। ফ্লাক্সের ঢাকনা খুলে চা ঢেলে নিতে থাকে সে। চোখে মৃদু ঘুমঘুম ভাব।‌ মাঝে মাঝে হাই তুলছে। কাল রাতে ঘুমাতে একটু দেরিই হয়ে গিয়েছিল বোধহয়। তাই ঘুম পুরোপুরি মিটেনি। আহনাফ কাপে চা ঢেলে নিয়ে ফ্লাক্সের ঢাকনা এঁটে সাইডে রেখে দেয়‌। চায়ের কাপ আঙ্গুল দিয়ে তুলে মুখের কাছে নেয় চুমুক দেওয়ার জন্য। তখনই হঠাৎ তার মায়ের রুম থেকে কারো কান্নার আওয়াজ। আহনাফ কাপ মুখ থেকে সড়ায়। পিছনে ফিরে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। হ্যা, কেউ কাঁদছে। কিন্তু কে সে ? গলা শুনে তো মনে হচ্ছে তার মা! কিন্তু তার মা কেনো কাঁদছে! আহনাফ তাড়াতাড়ি হাতের কাপটা রান্নাঘরের থা’কের উপর রেখে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে বেড়িয়ে যায় রান্না ঘর থেকে। 

 

টিভির রুম। বিছানায় বসে কাঁদছে আহনাফের মা রাবেয়া বেগম। তার পাশেই আফরিন তাকে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করছে। বারবার বলছে ‘ আন্টি আপনের কী হইছে, কানতাছেন ক্যান। ‘ কিন্ত রাবেয়া বেগম কোন কথা বলছেন না। তিনি আফরিনের কোলে মাথা রেখে কেঁদেই যাচ্ছেন। ঘরে হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করে আহনাফ। তড়িঘরি করে এসে বিছানার প্রান্তে দাঁড়ায়। তার মা’কে বলতে থাকে,

‘ মা,,, মা তোমার কী হয়েছে। মা, তুমি কাঁদছো কেনো! আফরিন, মায়ের কী হইছে! এভাবে কাঁদছে কেনো! ‘

বলেই আহনাফ তার মায়ের পাশে বসে পড়ে। আফরিন অবাক গলায় বলে,

‘ আমিও কিছুই বুঝতাছিনা। হঠাৎ কইরাই আন্টি কাইন্দা উঠলো। আপনি একটু দেহেন না। ‘

আহনাফ তার মা’য়ের হাত ধরে ঝাকিয়ে দেয়। বলে,

‘ মা,, তোমার কী হয়েছে! শরীর ব্যাথা করছে! মা,,,! ‘

রাবেয়া বেগম কাঁদতে কাঁদতে আহনাফের দিকে তাকান। আঙ্গুল দিয়ে আহনাফকে টিভির দিকে দেখতে বলেন। 

‘ কী মা ? টিভি ? টিভিতে কী হইছে ? ‘

বলেই আহনাফ টিভির দিকে তাকায়। টিভিতে খবর চলছিলো। এক মেয়ে উপস্থাপিকা সংবাদ উপস্থাপন করছিলো। বলছিলো। 

‘ দেশের অন্যতম বড় ফার্ম “খাঁন ফিড এন্ড হ্যাচারি লিমিটেড” এর মালিক নজরুল খানের বাসার পাতাল থেকে পাওয়া গেছে অসংখ্য শিশুর লাশ। দিনাজপুর থানার ওসি জয়দেব জানান, নজরুল খাঁন তার পাতাল ঘরে বাচ্চাদের মেরে তাদের মাংস ভক্ষণ করতো। আর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা তারই মতো নরখাদকদের মাংস সাপ্লাই করতো ফিড ব্যবসার আড়ালে। সাথে এও জানা যায়, তিনি ড্রাগস ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন। বিদেশি অনেক দামি দামি ড্রাগ তিনি ফিডের বস্তার ভিতরে দিয়ে দেশের সারা বিভাগে ছড়িয়ে দিতেন। এই ঘটনায় নজরুল খাঁন ও তার ভাই শাহেদ খাঁনকে পুলিশ হেফাজতে নিয়েছে। নজরুল খানের বড় ছেলে রাফসান পলাতক এবং তার ছোট ছেলে রায়হানও জেল থেকে পালিয়েছে। আমরা আরো বিস্তারিত জেনে নিবো আমাদের দিনাজপুর প্রতিনিধি সীমান্ত লালের কাছ থেকে। সীমান্ত, আপনি আমাদের শুনতে পাচ্ছেন! নজরুল খানের দুই ছেলেকে কী পুলিশ পরবর্তীতে গ্রেফতার করতে পেরেছে! পুলিশ কী বলছে এই বিষয়ে ? ‘

খবর টা দেখেই আহনাফ অবাক হয়। নজরুল খাঁন তো আনন্দপুরের! আর কয়েকদিন আগে তার স্যারের বোনের সাথে নজরুলের ছেলে রায়হানের বিয়ে হলো। তারা কিনা মানব মাংস ভক্ষণ করতো! আহনাফের তখনই মনে পড়ে যায় সেই আশরিফের বিষয়টা। তার মায়ের খোঁজ করা আশরিফ যে রায়হান এই খবর এখনো সে তার মাকে দেয়নি। তখনই আহনাফের মা কাঁদতে কাঁদতে বিলাপ বকতে থাকেন,

‘ বলছিলাম, বলছিলাম এইসব ছাড়ে দিতে। ছাড়লোনা। সব ধ্বংস করে দিলো ওকে। পাপের সাম্রাজ্য সব ধ্বংস করে দিলো। (কাঁদতে কাঁদতে) আমার আশরিফকেও ও মেরে খেয়ে ফেলছে। পাষাণ ও। ওর বুকে একদম মায়া দয়া নেই, একদম নেই। আমার আশরিফরে,,, আমার সোনা,,, তোকে আমি ওর হাত থেকে বাঁচাইতে পারলাম রে না বাবা। তোকেও খেয়ে ফেললো ও। তোকেও খেয়ে ফেললো। ‘

‘ মা,,, মা এইসব কী বলতেছো। তুমি নজরুল খাঁনকে আগে থেকে চিনো? ‘

রাবেয়া বেগম কান্নারত মুখ নিয়ে আহনাফের দিকে তাকান। কিছু বলেন না। আহনাফের মাথায় প্রশ্নের বোঝা ধীরে ধীরে বেড়েই চলেছে। সে বলে উঠে,

‘ মা কথা বলো। তুমি নজরুল খাঁনকে কীভাবে চিনো ? আর আশরিফকে খেয়ে ফেলছে মানে ? আশরিফকে তো আমি,,,,! ‘

আহনাফ কথাটা থামিয়ে দেয়। রাবেয়া বেগম আহনাফের মুখ থেকে কথাটা শুনেই কান্নারত মুখে বলে উঠেন,

‘ আশরিফ, বাবা তুই আশরিফরে দেখছিস! বাবা ও ভালো আছেতো। আমার, আমার আশরিফ ভালো আছেতো! ‘

‘ আমি বলবো। আমি আশরিফের খবর তোমাকে দিবো। কিন্তু তোমাকে আগে বলতে হবে এই আশরিফ তোমার কী হয় ? আর, নজরুল খাঁনকে তুমি কীভাবে চিনো ? তুমি কী এই মানুষের মাংস খাওয়ার বিষয়টা জানতে! বলো মা বলো। চুপ করে থেকোনা। আশরিফ তোমার কে হয়। কী সম্পর্ক তোমার তার সাথে। কী সম্পর্ক! ‘

রাবেয়া বেগম চোখ মুছতে থাকেন। আহনাফের দিকে তাকান। ভেজা গলায় বলেন,

‘ আজ আমি আর কিচ্ছু লুকাবোনা তোর থেকে। অনেক হয়েছে লুকোচুরি খেলা। আর না। (কঠিন গলায়) জানতে চাস এই নজরুল খাঁন কে ? জানতে চাস ? ‘

আহনাফ চুপচাপ হয়ে যায়। তার মা’কে এইরকম ভাবে কথা বলতে সে খুব কমই দেখেছে। তার ভিতরটা কেমন যেনো করছে। মনে হচ্ছে সে কোন এক লুকানো চিরন্তন সত্য জানতে চলেছে। যা দিনের পর দিন তার মা তার থেকে লুকিয়ে গেছেন। রাবেয়া বেগম কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে,

‘ তোর, তোর জন্মদাতা পিতা ও। নজরুল তোর জন্মদাতা পিতা। এক নরখাদক পিতা। ‘

আহনাফের মাথায় যেনো বাজ ভেঙে পড়ে। তার চোখই মুখ বড় হয়ে যায়। তার কাছে যেনো চারপাশের সব থেমে থেমে আসে। নজরুল তার বাবা ? ছোট বেলা থেকে শুনে এসেছে তার বাবা মৃত, তার বাবা মারা গেছে। কিন্তু সবই মিথ্যে ছিলো! আহনাফের চোখ ছলছল করে উঠে। রাবেয়া বেগম আবার বলেন,

‘ আশরিফ তোর বড় ভাই। আমার, আমার প্রথম সন্তান। ওকে নজরুল আমার থেকে কেড়ে নিয়েছে। আমাকে নিঃস্ব করে দিয়েছে। ‘

আহনাফ যেনো এই কঠিন সত্য গুলো নিতে পারছিলো না। সে হয়তো জানতোও না আজকের সকাল টা তার কাছে এমন ভয়ংকর সত্য নিয়ে হাজির হবে। আহনাফ মাথায় হাত দেয়। মাথার চুল গুলো পাগলের মতো নাড়ে। সামনে ফিরে তার মায়ের দিকে তাকায়। তার ভিতর থেকে কোন কথা বেড়িয়ে আসছে না। সে একদম যেনো বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছে। রাবেয়া আহনাফের হাত ধরেন। অনুনয় করে বলতে থাকেন,

‘ বাবা, বাবা তুই আশরিফের কি খবর পেয়েছিস বলনা। ও, ও বেঁচে আছেতো! ও ঠিক আছে তো! ‘

আহনাফ বলে,

‘ নজরুল সত্যিই আমার বাবা! ‘

‘ হ্যা। ওই তোর জন্মদাতা। ওর রক্তই তোর শরীরে বইছে। (অনুনয় কন্ঠে) আমার আশরিফের  কী খবর পেয়েছিস বলনা বাবা। ওকে নজরুল সত্যিই খায়নি তো! ‘

আহনাফ তার মাথা জোড়ে ঝাঁকায়। তার মস্তিষ্ক যেনো বিকলাঙ্গ হয়ে যাবে। সব কিছু তার মাথা এখনো সয়ে উঠতে পারেনি। আহনাফ তার মাথায় হাত দিয়ে বাড়ি মারে। চোখ বন্ধ করে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে। তার মায়ের দিকে তাকায়। তার মা উৎসুক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার মায়ের চোখ মুখ ভেজা। পাশে বসে থাকা আফরিন তাদের কথা না বুঝতে পারলেও সে এটা বুঝেছে যে বিষয়টা কোন গুরুতর কিছু। আহনাফ মাথা আরেকবার ঝাঁকায়। নিজেকে একদম শান্ত-স্বাভাবিক করতে থাকে। তার মা’কে বলতে শুরু করে,

‘ তোমার আশরিফ, তোমার আশরিফ বেঁচে আছে মা। তার পরিচয় এখন নজরুল খানের ছোট ছেলে (মায়ের দিকে মুখ তুলে) রায়হান খাঁন হিসেবে। ‘

‘ ঐযে টিভিতে যে বললো রায়হান নামে তার একটা ছেলে জেল থেকে পালিয়েছে। সে, সে আমার আশরিফ! ‘

‘ হ্যা। সেই তোমার আশরিফ। (সামনে তাকিয়ে) আমার বড় ভাই। ‘

রাবেয়া বেগম উপরের দিকে মুখ করে দুই হাত তুলে বলেন,

‘ তোমার কাছে হাজার হাজার শুকরিয়া মাবুত। তুমি আমার ছেলেটাকে বাঁচিয়ে রেখেছো। ‘

আহনাফ বলে,

‘ কয়দিন আগে যেই বিয়ে খেতে গিয়েছিলাম আমার স্যারের বোনের, সেই বিয়েটা আশরিফেরই ছিলো। আমার স্যারের বোনের সাথে তার বিয়ে হয়। আশরিফ একদম ঠিক আছে। খান বাড়ির বিজনেস দেখাশোনা করছে। ‘

‘ নজরুল তাইলে আমার আশরিফকে খায়নি। ও বলেছিলো ও খাবেনা। কিন্তু ওর মানুষের মাংসের প্রতি যে লোভ। আমার, আমার খুব ভয় হতো, আমার আশরিফকেও যদি ও মেরে খেয়ে ফেলে। আল্লাহ, হাজার হাজার শুকরিয়া তোমার কাছে। আমার ছেলেটাকে তুমি বাঁচিয়ে রেখেছো। হাজার হাজার শুকরিয়া। ‘

আহনাফ তার মায়ের দিকে তাকায়। সে পাথরের মতো হয়ে আছে। ভারি গলায় বলে,

‘ আমাকে প্রথম থেকে সব বলো মা। আমি সবটা জানতে চাই। ‘

রাবেয়া ফিরে আফরিনের দিকে তাকান। বলেন,

‘ মা, তুই একটু তোর ঘরে যা। আমি পড়ে তোকে আবার ডেকে নিবো। ‘

‘ জে আইচ্ছা আন্টি। ‘

আরফিন হাতের রিমুট টা বিছানায় রেখে চলে যায়। আহনাফ আফরিনের যাওয়ার পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে তার মায়ের দিকে তাকায়। নিজেকে প্রস্তুত করে নেয় আরো কঠিন কিছু বাণী গ্রহণ করার জন্য। 

 

     দিনাজপুর জেলা কারাগার। ৪০৬ নাম্বার সেলে বন্দী নজরুল সাহেব। সেলের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে হাঁটু ভাঁজ করে বসে আছেন তিনি। সেলের একটা ছোট জানালা দিয়ে এইখানে যা আলো প্রবেশ করছে সেই আলোতে চারপাশ খানিকটা দৃশ্যমান। তাকে আঁধার কুঠুরি খ্যাত সেলে রাখা হয়েছে। পুলিশ ভাবছে নজরুল সাহেব মানষিক ভাবে বিকারগ্রস্ত, তাই এমন মানুষের মাংস ভক্ষণ করতো। নজরুল সাহেবের এই সেলটা ফাঁকা। অবশ্য আজ সকাল সকালও এই সেলে শাহেদ আর তার ছেলে সাদিক ছিলো। তবে নজরুল সাহেব সব দোষ নিজের কাঁধে নিয়ে শিকারক্তি দেওয়ায় শাহেদ আর সাদিককে সাধারণ জেলে নেওয়া হয়েছে। তাদের বিষয়ে তদন্ত করবে পুলিশ। যদি সত্যিই তাদের সাথে এসবের কোন সম্পৃক্ততা না থাকে তবে তাদের জামিন দিবে। নজরুল সাহেব তার ছেলে রায়হানকেও ছেড়ে দিতে বলেছেন। বলেছেন রায়হান শুধু কম্পানির ভালো দিকটা দেখাশোনা করতো। তারও কোন যোগসূত্র নেই এগুলোতে। তবুও পুলিশ রায়হানকে খুঁজছে। সে কেনো জেল থেকে পালালো সেই কৈফিয়ত পুলিশ নিয়েই ছাড়বে। 

নজরুল সাহেব হাঁটুতে মাথা গুঁজে কাঁদছেন। তার আজ খুব রাবেয়া কথা মনে পড়ছে। তিনি রাবেয়ার স্মৃতি মনে করে রাবেয়ার সাথে কাটানো সোনালী সময় গুলো ভেবে কাঁদছেন। নজরুল সাহেব মাথা উঠান। তার চোখ মুখ একদম ভিজে গেছে কাঁদতে কাঁদতে। ছেলেদের এমন ভাবে কান্না হয়তো খুব কমই দেখা যায়। নজরুল সাহেব কাঁদো কাঁদো গলায় নিজে নিজেই বলে উঠেন,

‘ মানা করেছিলে আমায় সেদিন। শুনিনি আমি। যদি সব ছাড়তে পারতাম, তবে আজ জীবন টা ভিন্ন হতো। তুমি আমার কাছে থাকতে। রায়হানকে নিয়ে আমরা সুখে থাকতে পারতাম। কিন্তু আমার নেশা, আমাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। সব শেষ হয়ে গেছে। সব। ‘

নজরুল কাঁদতে থাকেন। কাঁদতে কাঁদতে মাথা নিচু করে ফেলেন। সেলের ছোট্ট জানালা দিয়ে ভিতরে আসা তীর্ষক সূর্য রশ্মি তার একাকিত্বের সঙ্গি হিসেবে নিজের অস্তিত্বকে জানান দেয়। নজরুল সাহেব তার জীবনকে স্মৃতির পাতায় ভাবতে থাকেন প্রথম থেকে। 

 

ফিরে দেখা নজরুল খানের সেই অতীত,,,

‘ নজরুল ছিলেন পরিবারের বড় সন্তান। তার বাবার নাম ছিলো নীশেখ খাঁন। তিনি ছিলেন নারী দেহলোভী। খান বাড়ির নিচের পাতাল ঘর গুলো তিনি তার এই পাপকার্য সম্পাদন করার জন্যই গড়ে তুলেছিলেন। নজরুলের বাবা আর চাচা মিলে কমবয়সী মেয়েদের ধরে আনতো। সেখানে ধর্ষণ করে হয় মেরে ফেলতো। নাহয় সেই ধর্ষিতা মেয়ে গুলোকেই আবার বাজারে বিক্রি করে দিতে। খাঁন বাড়ির ভিতরে এতো অন্ধকার জগত থাকলেও বাইরে থেকে গ্রামের সবাই খাঁন বাড়িকে খুব ভালো বলেই জানতো। নজরুলের বাবা নীশেখ খাঁন গ্রামের মাতব্বর ছিলেন। চৌড়চকে থাকা সেই ক্লিনিক টাও তার তৈরি করা। গ্রাম টাকে তিনি এক কথায় আলাদা একটা রাজ্য হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। যেই রাজ্যে সব ছিলো। মানুষে-মানুষে ছিলোনা কোন ভেদাভেদ বা ঝামেলা। সব কিছুই নজরুলের বাবা নীশেখ খাঁন নিজ হাতে পরিচালনা করতেন। 

নজরুল বাবা নীশেখ খাঁনের বউ হিসেবে সবাই জানতো নজরুল আর শাহেদের মা’কেই। তার নাম ছিলো নয়নাবতী। তিনি বেশ সুন্দরী থাকায় তাকেই নীশেখ খাঁন জনসম্মুখের স্ত্রী হিসেবে শো পিচ রাখেন। আর এদিকে তার পাতাল করে নিয়মিত নারী ভোগ, নারী পাচারের কাজ করে যেতেন। সেইখান কারী এক দাসীর পেটে জন্ম সুরাইয়া বেগমের। অর্থাৎ আলিশার মায়ের। নজরুল তাই প্রথম থেকেই সুরাইয়া বেগমকে সহ্য করতে পারতেন না। আর নজরুলের বাবা নীশেখ খাঁনের দুই পুত্র থাকলেও কণ্যা না থাকায় তিনি সুরাইয়াকে নিজের মেয়ে বলেই সবার সম্মুখে পরিচয় দিতেন। 

নীশেখ খাঁন চেয়েছিলেন তার বড় ছেলে নজরুল তার এইসব কাজের উত্তরাধিকারি হোক। তাই তিনি নজরুলকে কিশোর বয়স থেকেই তার কাছে কাছে রাখতেন। নিজের ছেলের সামনেই হাজারো নারীর দেহ ভক্ষণ করতেন। তবে নজরুল এসবের সাথে নিজের গা ভাসাতো না। সে প্রথম থেকেই নারী দেহ ভোগের বিপরীতে ছিলো। সে শুধু তার বাপ-চাচাদের সব করতে দেখতো আর চুপচাপ বসে বসে টাকার হিসাব করতো। তবে একদিন ঘটে এক ভিন্ন ঘটনা। পাতাল ঘরে তার বাপ-চাচারা যেই নারীদের ভোগ করে মেরে ফেলতেন সেই লাশ গুলো আলাদা একটা ঘরে সংরক্ষণ করা হতো। নজরুল একদিন ভুল করে সেই ঘরে ঢুকে পড়ে। সেখানে বেশি বাসী লাশ সংরক্ষণ করা হতো না। লাশকে ২ দিনের মতো সেখানে রাখা হতো আর বাইরে লাশের জন্য নীশেখ আর তার ভাই খরিতদার খুঁজতো। যখন তারা লাশের খরিতদার পেয়ে যেতো তখন সেগুলো বিক্রি করে দিতো। তারপর খরিতদাররা সেইসব লাশ নিয়ে কালো জাদু, তারপর অর্গান-টর্গান খুলে পাচার করে দিতো। 

তো নজরুল সেইদিন সেই ঘরে ঢুকে অনেক উলঙ্গ মেয়ের লাশ বড় বড় বক্সে বরফের মাঝে হিমায়িত অবস্থায় দেখে। তার কেনো জানি সেই সাদা ত্বকের দেহের মেয়েদের দেখে খুব আকর্ষন হয়। তবে এটা যৌবনের আকর্ষণ নয়। সেই মেয়েদের নরম দেহের মাংসের প্রতি আকর্ষণ। তার মনে প্রশ্ন আসে নরম মাংস গুলো খেতে কেমন হয়! সাধারণ মাংসর মতোই কী এর স্বাদ! নানা চিন্তা তার মাথায় ঘুরে। এরই মাঝে সে গিয়ে একটা লাশের সামনে দাঁড়ায়। সেইসময় লাশ সংরক্ষণ ঘরে আর কেউ ছিলোনা। সে একটা মেয়ের গালের মাংসটায় হাত দেয়। কিছুক্ষণ আগেই এই মেয়েটা মারা গিয়েছে। নজরুল চারপাশ একবার দেখেই হেলে সেই মৃত মেয়ের গালে কামড় বসায়। গালের মাংস দাঁত দিয়ে টেনে তুলে ফেলে। রক্ত বেড়িয়েছিলো কিছুটা। নজরুল মাংসের অংশটা হাতে নিয়ে একটু একটু করে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়। তার কাছে যেনো এই মাংস অমৃত স্বাদের লাগে। এই স্বাদ আর সে কোথাও পায়নি। নজরুল আবার সেই মেয়ের অপর গালে কামড় বসায়। সেই গালেরও মাংস খেয়ে নেয়। এই থেকে তার মানুষের মাংস খাওয়ার যাত্রা শুরু হয়। এরপর থেকেই তার বাপ-চাচারা যেই মেয়েদের দেহ ভোগ করে মেরে ফেলতো সেই মেয়েদের মাংস পরে নজরুল খেয়ে ফেলতো। সে শুধু মেয়েদের মৃত লাশের চোখ, গালের মাংস, বুকের মাংস আর পায়ের রানের মাংস খেতো। কোন রান্না করতো না। এমনিই কাঁচাই খেয়ে ফেলতো। নজরুলের বাবা নীশেখ খাঁন তার এই বিষয়টাকে বেশ ভালো ভাবেই নেন।

নজরুল বড় হয়। তার বয়স যখন ২০ পেড়োয় তখন গ্রামের এক সুন্দরী মেয়ের সাথে তার বাবা বিয়ে করিয়ে দেন। মেয়েটার বয়স তখন ছিলো মাত্র ১৬ বছর। মেয়েটার নাম ছিলো সুমনা। নজরুল সুমনাকে নিয়ে শুধু বাইরেই বউয়ের পরিচয় দিতো। কিন্তু সে মন থেকে কখনোই সুমনাকে বউ হিসেবে গ্রহণ করেনি। তবুও, এক বিছানায় থাকলে মানসিক চাহিদা না থাকুক, শারীরিক চাহিদা জাগবে এটাই স্বাভাবিক। নজরুল প্রথম প্রথম নিজেকে সংযত রাখতো। কিন্তু বয়স টা যৌবনের বয়স হওয়ায় সে আর নিজেকে বেশিদিন সংযত রাখতে পারেনা। সুমনা কয়েকদিন পরই গর্ভবতী হয়। বছর পেড়োতেই ঘরে রাফসান জন্ম নেয়। তবে এতে নজরুল তেমন একটা খুশি ছিলেন না। তিনি আগে যেমন স্বাভাবিক ছিলেন, রাফসান হওয়ার পরও তেমনি স্বাভাবিকই থাকেন।

এদিকে নজরুলের বাবা নীশেখ সিদ্ধান্ত নেন ব্যবসায় হাত দিবেন। তিনি ঢাকায় এক ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠান নিজেদের নামে কিনে নেন। তার বড় ছেলে নজরুলকে পাঠিয়ে দেন ঢাকায় ব্যবসায় পটু হবার জন্য। এদিকে তার ছোট ছেলে শাহেদকে আবার তার বাবা পাতাল সম্পর্কে জানায়নি। শাহেদ ছোট থেকেই কেমন যেনো ভিতু টাইপের ছিলো। সে ঘর থেকে বের হতোনা। সারাদিন ঘরের কোনে চুপটি করে বসে থাকতো। আর সে রক্ত দেখলে অনেক ভয় পেতো। তাই নীশেখ খাঁন, শাহেদকে এই পথে আনেন না। শাহেদকে তিনি পড়ালেখা করিয়ে বিজনেসের ভালো দিকটায় লাগিয়ে দেন। শাহেদ একটু হাবাগোবা,বোকা ছিলো। তাই সে কখনোই বিজনেসের খারাপ দিকটা ধরতে পারেনি। আর খাঁন বাড়িরও আঁধার অধ্যায় সম্পর্কে জানতে পারেনি।

নজরুলকে তার বাবা ৬ বছরের জন্য ঢাকায় পাঠান। কাজ ছিলো একটা প্রতিষ্ঠানে চাকরি আর তার পাশাপাশি ব্যবসা দাড় করাতে হবে। আর ৬ বছর পেড়োলে গ্রামে এসে তারপর ব্যবসা দিনাজপুরের দিকে নিয়ে আসতে হবে। তো নজরুল এই কাজের জন্য ঢাকায় এসে পাড়ি জমায়। চাকরি নেয়। তবে তার মানুষের মাংস খাওয়ার অভ্যাস এখনো যায়না, উল্টো সে আরো ঢাকার কয়েকটা হাসপাতালের মর্গের লোকদের হাত করে রাখে যাতে যখন মাংস খেতে ইচ্ছা করে সে যেনো যেয়ে খেতে পারে। 

তারপরই একদিন তার পরিচয় হয় রাবেয়ার সাথে। রাবেয়া তখন কলেজে পড়তো। তার মা-বাবা ছিলোনা। মামা বাসায় থাকতো। রাবেয়ার সাথে তার সম্পর্ক ধীরে ধীরে প্রনয় রেখায় পরিনত হয়। তারা দুইজন বিয়ে করে। নজরুল ভাবে সে সব খারাপ কাজ ছেড়ে দিবে। সে এখনো কিন্ত নরখাদক হওয়ার পাশাপাশি তার বাবার মেয়ে পাচারের দিকটা দেখতো। কিন্তু রাবেয়ার সাথে সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়ার পর থেকে সে নতুন জীবনের আলো খুঁজে পায়। সে সব খারাপ কাজ ছেড়ে রাবেয়াকে নিয়ে আলাদা একটা জীবনে পদার্পণ করতে চায়। সে সব ছেড়েও দেয়। তার বাবার জন্য বায়ার দেখা, বিদেশিদের সাথে মেয়ে নিয়ে যোগাযোগ করা, সব ছেড়ে দেয়। তবে ছাড়তে পারেনি তার নেশাকে, অর্থাৎ মাংস খাওয়ার নেশাকে। এদিকে বিয়ের এক বছর পেড়োতেই রায়হানের জন্ম হয়। নজরুল তখন বুঝেছিলো বাবা হওয়া কতটা আনন্দের। রায়হানকে সে অনেক ভালোবাসতো। অনেক আদর করতো। আর তার প্রিয়তমা স্ত্রী রাবেয়া তো আছেই। তাদের তিনজনের সংসার টা অনেক সুখেই অতিবাহিত হতে থাকে।

ধীরে ধীরে নজরুল সাহেবের সময় ফুরিয়ে আসতে থাকে। মানে তার বাবা যে ৬ বছরের জন্য তাকে ঢাকা পাঠিয়েছিলেন এই সময়টা ফুরিয়ে আসে। শেষে আর মাত্র ১ মাস বাকি। তখনই নজরুলের বাবা জানতে পারেনি নজরুল আরো বিয়ে করেছে। তাও আবার প্রেম করে। সেইজন্যই সে সবকিছু ছেড়ে দিয়েছে। নজরুলের বাবা এতে রেগে জান। তিনি যেকোনো মূল্যে তার এই আঁধার জগতে তার যেকোনো এক ছেলেকে চান। কিন্তু শাহেদকে তো তিনি আনতে পারবেন না। তাই নজরুলকেই আবার তার এই জগতে ফিরাতে হবে। তিনি খবর পান যে নজরুল সব ছাড়লেও তার মাংস খাওয়ার নেশাটাকে ছাড়তে পারেনি। উল্টো দিকে রাবেয়া, নজরুলের এই বিষয়টা সম্পর্কে জানতোও না। নীশেখ এইখানে তার গুটি চালেন। মর্গে তার লোক পাঠিয়ে নজরুল যখন লাশের মাংস খেতো তখনকার ছবি তুলিয়ে নেন। যদিও ছবি গুলো সাদাকালো ছিলো তখনকার সময়ে। আর তাঁরপর সেই ছবি গুলো তার লোকদের দাড়াই নজরুল যেই ফ্ল্যাটে থাকতো সেই ফ্ল্যাটে পাঠিয়ে দেন, নজরুল যখন অফিসে থাকে সেসময়। তার লোকেরা গিয়ে রাবেয়াকে সব খুলে বলে। এটাও বলে যে নজরুল মেয়ে পাচার করে। সাথে ও আরো নানা অনৈতিক কাজের সাথে যুক্ত। রাবেয়াকে সেসবের ছবিও তারা দেখায়। তারপর তারা চলে যায়। সেই রাতে নজরুল বাড়ি ফিরলে রাবেয়া সেই ছবি গুলো তাকে দেখায়। তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয় এই নিয়ে। নজরুল তাকে বুঝায় সে এখন সব ছেড়ে দিয়েছে। শুধু মাংস খাওয়াটাকে ছাড়তে পারেনি। সে আর তার বাবার আঁধার কালো অধ্যায়ে ফিরে যেতে চায় না। সে রাবেয়াকে নিয়ে একটা সুন্দর জীবন কাটাতে চায়। কিন্তু রাবেয়া তাকে মাংস খাওয়াটাকেও ছেড়ে দিতে বলে। কিন্তু নজরুল এটা করতে পারেনা। এটা এক প্রকারের ড্রাগসের মতো তার নেশা ধড়িয়ে দিয়েছিলো।

আস্তে আস্তে নজরুলের ঢাকায় থাকার সময় ফুরিয়ে আসতে থাকে। এদিকে নজরুল আর রাবেয়ার সম্পর্কেও এই নরমাংস খাওয়া নিয়ে অনেক ঝামেলা হয়, ঝগড়া হয়। সম্পর্কে ফাটল ধরে। তারপর নজরুল জানায় সে গ্রামে চলে যাচ্ছে। আর রাবেয়াকেও সে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু রাবেয়া যাবেনা। সে নজরুলকে বলে এখানে থাকতে তবে অবশ্যই নরমাংস খাওয়া বাদ দিয়েই থাকতে। ঐদিকে নজরুলের বাবা তাকে চাপ দিতে থাকেন। নজরুল এক গোলকধাধায় পড়ে যান। এবং এরই মাঝে একদিন তার সাথে রাবেয়ার অনেক ঝগড়া হয়। নজরুল সেদিন রাগের মাথায় তার ছোট্ট ৪ বছর বয়সী রায়হানকে নিয়ে চলে আসে। রাবেয়া রায়হানকে ছাড়তে নারাজ ছিলো। তিনি ভেবেছিলেন রায়হানকেও হয়তো নজরুল খেয়ে ফেলবে। কিন্তু তিনি নজরুলকে আর আটকাতে পারেন না। নজরুল তার বাবার চালের কাছে হার মেনে বুকে পাথর চেপে রাবেয়ার কাছ থেকে চলে আসেন। যদিও তাদের ঝগড়া দিয়েই ছাড়াছাড়ি হয়েছিলো, কিন্তু পরবর্তীতে নজরুল আর রাবেয়া দুইজনেই অনেক কষ্ট পেয়েছিলেন। তারা চাইছিলেন আবার এক হয়ে থাকতে। কিন্তু নজরুলের বাবা তা আর হতে দেয় নি। নজরুল যাওয়ার ১ সপ্তাহ পর রাবেয়া জানতে পারেন নজরুলের একটা অংশ তার মাঝেই বড় হচ্ছে। অর্থাৎ, তিনি প্রেগন্যান্ট। ডাক্তারি পরীক্ষা করার পর জানা যায় তিনি ২ মাসের প্রেগন্যান্ট। তার ভিতরে নজরুলের অস্তিত্ব বড় হচ্ছে। এরই মাঝে তার জীবনে নেমে আসতে থাকে একের পর এক ভয়াল ছায়া। তাকে তার মামা-মামিরা গ্রহণ করে না। তাকে কেউ চাকরিও দেয় না। তিনি একলা হয়ে পড়েন। তার ভিতরের জনকে বড় করা, তার বেঁচে থাকা, সবকিছুই যেনো মুশকিল হয়ে উঠতে থাকে। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, নিজে সাবলম্বী হবেন। তার বিয়ের গয়না আর তার সাথে চারপাশের মানুষের থেকে কিছু ধার দেনা করে টেইলার্সের দোকান দেন। সিলাইয়ের কাজ তিনি আগে থেকেই জানতেন তাই এই পেশায় তাকে বেশি কাঠখর পোড়াতে হয়নি। ধীরে ধীরে তার ভিতরে আহনাফ বড় হয়। নজরুল সেইদিন যে চলে যায় তারপর আর তার কোন খবর পাওয়া যায়নি। হয়তো তার বাবাই তাকে এদিকে মুখ ফিরাতে দেয়নি। রাবেয়ার দোকান বেশ ভালোই চলতে থাকে। কিছু মহিলার সাথে তার সক্ষতা গড়ে উঠে। তারাও তার এই করুণ সময়ে পাশে এসে দাঁড়ান। এভাবে করেই সময় যেতে যেতে একদিন রাবেয়ার প্রসব বেদনা উঠে। তাকে হসপিটালে নিয়ে যায় সেই মহিলারা। আহনাফের জন্ম হয়। আহনাফ দেখতে অনেকটা তার বাবার মতোই হয়েছিলো। আর আশরিফ, মানে রায়হান হয়েছিলো তার মায়ের মতো। 

রাবেয়া মনে মনে প্রতিজ্ঞা বদ্ধ হন, তার এই ছেলেকে তিনি নিজের মন মতো বড় করবেন। পড়ালেখা করিয়ে মানুষের মতো মানুষ করবেন। তার দেহে এক নরখাদকের রক্ত বইলেও তিনি আহনাফকে কোন অনৈতিক কাজের সাথেই মিশতেও দিবেন না। 

 

এদিকে নজরুল যখন রাবেয়ার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে আনন্দপুরে আশরিফকে নিয়ে ফিরে আসে তখন তাকে পড়তে হয় নানা ঝামেলায়। তার বাবার কাছ থেকে অনেক কড়া কথা শুনতে হয়। তবে তার বাবা তাকে এটা বুঝতে দেননি যে তার বিয়ে সম্পর্কে তিনি জানেন। এদিকে নজরুল তার সাথে আনা আশরিফের নাম পরিবর্তন করে তার বড় ছেলের নামের সাথে মিল রেখে রায়হান রাখেন। রাফসানের ভাই রায়হান। বাড়িতে বলেন এই ছেলেকে তিনি রাস্তায় পেয়েছেন। তিনি এই ছেলেকে এখন থেকে নিজের কাছে রাখতে চান। নিজ স্নেহে বড় করতে চান। রায়হানের মাঝে নজরুল তার প্রথম ও শেষ ভালোবাসা রাবেয়াকে খুঁজে পেতো। পাশাপাশি সে রায়হানকে এমনিতেও অনেক ভালোবাসতো। তাই সে সবসময় রাফসানের থেকে রায়হানকে বেশি স্নেহ করতো। রায়হান যেই জিনিসটা একবার চাইতো নজরুল তাকে যেভাবেই হোক এনে দিতো। অন্যদিকে রাফসান সারাদিন কান্না করে শরীরের সব পানি যদি শেষও করে ফেলতো, তবুও নজরুল সাহেবের টনক নড়তো না। 

নজরুলের বাবা মারা যান। তার বাবা মারা যাওয়ার পর নজরুল এই বাড়ির আঁধার অংশের দায়িত্ব নেয়। তবে তিনি এটা পণ করেন যে তার বড় ছেলেকে তিনি এসবের সাথে জড়ালেও রায়হানের বেলা তিনি এমনটা করবেন না। তার বাবার মতো এই ভুলটা তিনি রায়হানদের সাথে করতে চান না। রায়হানকে তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাঁচতে শিখাবেন। তার ভালোমন্দ, প্রেম ভালোবাসা সবকিছুকেই তিনি প্রাধান্য দিবেন। আর হয়ও তাই। রায়হানের যখন বিয়ের সময় চলে আসে রায়হান নিজে থেকেই তার পছন্দ সম্পর্কে তার বাবাকে বলে। নজরুল প্রথম প্রথম না করেন কারণ নিপার ভাই শাহারিয়া একজন গোয়েন্দা অফিসার। এক গোয়েন্দার বাড়ির মেয়েকে এই বাড়িতে নিয়ে আসলে যদি তার সব সাম্রাজ্য নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু রায়হানের দ্বিতীয় বার জোড়াজুড়ি করাতে তিনি আর তার কথা ফেলতে পারেন না। বিয়ে দিয়ে দেন রায়হানের সাথে নিপার। “

 

নজরুল তার জীবনের সবটা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ভাবলেন। তার নিজের উপরই এখন রাগ হতে থাকে। তিনি কেনো তার মাংস খাওয়ার নেশাটাকে ছাড়তে পারলেন না! সেদিন যদি এটাকে তিনি ছাড়তে পারতেন তবে আজ তিনি রায়হানকে নিয়ে তার রাবেয়ার সাথে থাকতে পারতেন। একটা রঙিন জীবন হতো তাদের। কিন্তু কথায় আছেনা, পাপ তার বাপকেও ছাড়েনা। ঠিক তেমনি তার বাবাও পাপের মাশুল এক যন্ত্রনা দায়ক মৃত্যুর মাধ্যমে দিয়েছিলেন। আর আজ নজরুলকে, এই জেলের কাল কুঠুরিতে থেকে দিতে হচ্ছে। হয়তো এখানেই তিনি সারাজীবন থেকে পচেঁ পচেঁ মরবেন। তবে মৃত্যুর আগে তার একটাই ইচ্ছে, যদি রাবেয়াকে একটা বার দেখতে পারতেন। তার কাছে মাফ চেয়ে নিতে পারতেন! তার মনের বন্ধ দরজাটায় যে এখনো তিনি তাঁর ভালোবাসা, রাবেয়াকে যতন করে রেখে দিয়েছেন!

 

     আহনাফ সবকিছু তার মায়ের মুখ থেকে শুনে। তার মায়ের সাথে নজরুলের সম্পর্ক গড়া থেকে ভাঙা পর্যন্ত সবকিছু। তার খুব খারাপ লাগছে। তার বাবা একজন নরখাদক এই ভেবে নয়, তার বাবার একটা ভুল সিদ্ধান্তের জন্য সে যে ছোট থেকেই তার বাবার আদর থেকে বঞ্ছিত হয়েছে, সেইজন্য। রাবেয়া বেগম সবটুকু বলে চুপ করে আছেন। হয়তো তার মনের গোপন ব্যাথাটা আবার জেগে উঠেছে। আহনাফ তার মায়ের দিকে তাকায়। ধীর গলায় বলে,

‘ বাবা আজও জানেনা, যে তার আরেকটা সন্তান আছে ? ‘

‘ না জানেনা। আমিই জানাইনি। ভয় হতো। যদি তোকেও আমার থেকে ও কেড়ে নেয়। তাইলে আমি কি নিয়ে বাঁচবো। মায়েদের কাছে সন্তান যে কী, তা শুধু আমরা মায়েরাই জানি। ‘

আহনাফ এক দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। বলে,

‘ দোষটা তোমাদের কারোরই ছিলোনা। বাবা চাইলেও তার মাদক নেশার মতো তৈরি হওয়া মানব মাংস খাওয়া একনিমিষেই ছাড়তে পারতোনা। আর তুমিও এক নরখাদকের সাথে সারাজীবন থাকতে পারতেনা। তোমার বিবেক তা মেনে নিতো না। দোষটা আমার দাদুর। যে কিনা ইচ্ছা করেই সব নষ্ট করেছে। তিনি চাইলেই কিন্তু তার ছেলেকে এক নতুন জীবনের দিকে ঠেলে দিতে পারতেন। কিন্তু না। সব এক নিমিষেই ধূলিসাৎ করে দিলেন। ‘

 

রাবেয়া বিছানা উঠে দাঁড়ান। আহনাফ তার মায়ের দিকে তাকায়। রাবেয়া ভেজা গলায় বলেন,

‘ রান্না ঘরে নাস্তা রাখা আছে। খেয়ে নিস। ‘

‘ তুমি কোথায় যাচ্ছো মা! ‘

‘ আমি। আমি একটু একা থাকতে চাই। ‘

বলেই ঘর থেকে বের হয়ে যান রাবেয়া বেগম। আহনাফ তার মায়ের যাওয়ার পথ থেকে নয়ন সড়িয়ে সামনে তাকায়। তার ভিতরে এক অন্যরকম বেদনা বইছে। সবকিছু তারও কেমন জেনো ভালো লাগছে না। আহনাফ বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে পরে। উপরে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রয়। এক লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ভাবে,

‘ বাবা শব্দটা হয়তো আমার জীবনে, এক টুকরো অতীত হয়েই রয়ে যাবে। ‘ 

 

____

 

((( ২য় ভাগের লিংক কমেন্টে দেওয়া আছে 👇)))

 

উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন:: ২(মুখোশ)

পর্ব:: ৮৩ (১ম ভাগ)

লেখক:: মির্জা শাহারিয়া

 

উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন:: ২(মুখোশ)

পর্ব:: ৮৩ (২য় ভাগ)

লেখক:: মির্জা শাহারিয়া

 

(((১ম ভাগের লিংক কমেন্টে দেওয়া আছে 👇)))

 

পরন্ত বিকেল। শাহারিয়ার রুম। উপরে ফ্যান চলছে। আজ একটু গরম পড়েছে। অন্যান্য দিন শ্রীমঙ্গলে সূর্যের দেখা না পাওয়া গেলেও আজ কড়া তাপদাহ। শাহারিয়া শুয়ে আছে‌। দিথীও তার বা’পাশে শুয়ে তার বুকে মাথা দিয়ে আছে‌। গরম হওয়ায় শাহারিয়ার গাঁয়ে সেন্ডো গেঞ্জি। দিথী থ্রি পিস পড়ে আছে। দিথী আঙুল দিয়ে শাহারিয়ার বুকে কী যেনো আঁকিবুঁকি করছে। শাহারিয়া দিথীর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। দিথী শাহারিয়ার গাঁয়ে আঁকিবুঁকি করতে করতে একটা ছোট্ট চিমটি কাটে। 

‘ আহ্, চিমটি দিওনা। ‘

‘ ব্যাথা লাগে! ‘

‘ লাগেনা মানে! তোমার যে লম্বা লম্বা নখ। কতবার বলছি নখ গুলা কাটে ফেলতে। ‘

‘ তুমি কাটে দিয়ো। ‘

‘ নেইল কাটার টা নিয়ে আসো। কাটে দেই। ‘

‘ না। পড়ে। এখন উঠতে মন চাচ্ছে না। তোমার বুকে মাথা রাখলে আর আমার উঠতে মন চায় না। ‘

‘ কেনো! আমার বুকে কী আঠা লাগে আছে নাকি! ‘

‘ হ্যা। আছে। (একটু থেমে ধীর গলায়) আচ্ছা আমি শুনেছি ছেলেদের বুকের বা’পাশের হাড় দিয়েই নাকি নারীরা সৃষ্টি! ‘

‘ হ্যা, বিভিন্ন ইসলামিক বক্তা এমনটা বলেন। কেনো! ‘

‘ তোমার বুকের বা পাশটায় মাথা রাখলে আমি যেই প্রশান্তি পাই,নির্ভরতা পাই। তা আর কোন কিছুতেই পাইনা। এই বুকের বা পাশ টা আমার জন্য, জান্নাতের এক টুকরো নরম পরশ পাথর স্বরুপ। ‘

‘ জান্নাতে এর চেয়েও অনেক ভালো ভালো আর আরাম দায়ক জিনিস আছে। জান্নাত কতটা সমৃদ্ধ তা আমাদের চিন্তারও বাইরে। ‘

‘ তারপরও। আমার কাছে তোমার বুকের বা পাশ যতটা প্রিয়, দুনিয়ার আর তেমন কিছুই ততটা প্রিয় নয়। আসলেই কী আমাদেরকে পুরুষের বুকের বা পাশের হাড় দিয়ে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টি করেছেন! ‘

‘ অনেক আলেমরা বলেন, আল্লাহ তায়ালা নারীকে সেই পুরুষের বুকের বা পাশের হাড় দিয়ে সৃষ্টি করেন, যেই পুরুষের সাথে সেই নারী ইহলোকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে। মেয়েদের শরীরের হাড় ছেলেদের মতো এতোটা শক্ত মজবুত না। মেয়েদেরকে আল্লাহ তায়ালা ছেলেদের তুলনায় নরম করে তৈরি করেছেন। আর ছেলেদের বুকের বা পাশের হাড়ও তেমনি নরম। সেই হিসেবে অনেকে বলেন যে নারী তার পুরুষের বুকের বা পাশের হাড় থেকেই তৈরি। ‘

দিথী ধীর গলায় বলে,

‘ আমার এক মুঠো সুখের আশ্রয়স্থল তোমার এই বুকের বা’পাশটা ছাড়া আর কোথাও না হোক। ‘ 

বলেই শাহারিয়ার বুকে একটা ছোট্ট চুমু খেয়ে আবার মাথা রেখে শুয়ে থাকে দিথী। শাহারিয়া মৃদু হাসে। দিথীর মাথায় বুলি কেটে দিতে থাকে। দিথী শাহারিয়ার বুকে কান দিয়ে তার হৃদস্পন্দন শুনছে। একেকটা স্পন্দন যেনো তার জন্যই উৎসর্গ হচ্ছিলো। দিথী মনে মনে ভাবতে থাকে,

‘ আমার এই আঁধার কালো জীবনে তুমি আশির্বাদ স্বরুপ এসেছো। আমার জীবনে আমার বাবা ছাড়া আর কেউ আপন ছিলো না। সেই জীবনে তোমার আগমন, বসন্তের ফোঁটা নতুন ফুলের মতো ছিলো। আমি জানিনা আমি কতটা তোমার আপন হয়ে উঠতে পেরেছি। কিন্তু তুমি আমার যতটা নিজের মানুষ হয়ে উঠেছো, আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারবোনা। তোমাকে ছাড়া আমি আর কিছুই ভাবতে পারিনা। বারবার তোমাকে নিয়ে ভয় হয়। যদি স্যার তোমাকে মেরে ফেলে! কিন্তু আমি তা হতে দিবোনা। আমার কাজ শেষ হয়ে গেলে তুমি-আমি এক রঙিন সুন্দর জীবন গড়ে তুলবো। যেখানে থাকবে না কোন মুখোশের হাতছানি। থাকবে না কোন রক্তের খেলা। শুধু থাকবে তোমার-আমার এক শান্তির নীড়। দুজনার দুই রাস্তা এসে মিলিত হবে এক বিন্দুতে। ভালোবাসি তোমায়, হয়তো নিজ মুখে কখনো বলা হয়ে উঠেনি। কিন্তু আমি তোমাকে সত্যিই এখন খুব খুব ভালোবাসি। আগে তোমার সাথে করা প্রত্যেক অভিনয় আলিঙ্গন আমাকে পীড়া দিতো। কিন্তু এখন, এখন এই আলিঙ্গন গুলো আমাকে সুখ এনে দেয়। যদি পারতাম, সব ছেড়ে এখনি তোমায় নিয়ে সুদূর কোন অজানা গন্তব্যে পাড়ি জমাতাম। কিন্তু আমার যে হাত-পা বাঁধা। চাইলেও ছুটতে পারবোনা। এক বিন্দু শিশির কণাকে ঘাস যতটা আপন করে নেয়, আমি তার থেকেও তোমাকে বেশি আপন করে নিয়েছি। তুমি শুধু আমার পাশে সবসময় থেকো। যেমনটা এখন আছো, তেমনটাই সেই বিভীষিকাময় প্রহর শেষেও থেকো! 

 

_____

 

সিলেটের বৈরাগী মোড়। বৈরাগী মোড় পেড়িয়ে কিছুকা সামনে আসলেই লম্বা লম্বা ইমারত। এগুলো আবাসিক ভবন। সব ভবন সাদা রংয়ের। একটা ছোট্ট রাস্তা চলে গিয়েছে ভবন গুলোর সাড়ির মাঝ দিয়ে। একটা রিকশা ঢুকে সেই রাস্তায়। রিকশাটা এগিয়ে আসতে থাকে। রিকশায় ছিলো তানিয়া। তানিয়াকে ভুলে গেছেন নাকি আবার আপনারা! এটা সেই তানিয়া যে দিথীর ওখানে গিয়েছিলো আসুভেকে ধ্বংস করার জন্য। 

তানিয়াকে নিয়ে আসা রিকশাটা একটা বিল্ডিংয়ের সামনে থামে। তানিয়া রিকশা থেকে নামে। পড়নে বোরখা। তবে মুখ কোন কাপড়ের আড়ালে নয়। ভাড়া পরিশোধ করে দিয়ে তানিয়া বিল্ডিংয়ের গেইটের দিকে এগোয়। এই বিল্ডিংয়ে তার বান্ধবী কানিজ থাকে। কানিজও কিন্ত তানিয়ার সাথে আনন্দপুর গিয়েছিলো আসুভে অধ্যায়ের সময়। তানিয়াকে নিয়ে আসা অটো রিকশাটা চলে যায়‌।

 

     সিড়ি বেয়ে উপরে উঠছে তানিয়া। ৪ তালায় কানিজের রুম। কানিজ তার থেকে প্রায় ১৫ বছরের ছোট। কানিজের বয়স ২৫। কানিজের সাথে তার পরিচয় হয়েছিলো তার সার্ভে সংস্থায়। তানিয়া এসে কানিজের ফ্ল্যাটের রুমের সামনে দাঁড়ায়। কলিংবেল চাপতে যাবেই, তখনই দেখে দরজাটা খোলা। তানিয়া অবাক হয়। সে আর কলিংবেল বাজায় না। দরজাটা আস্তে করে ঠেলে ভিতরে ঢুকে। সে কানিজ বলে ডাকতেই যাবে তখনই তার কানে আসে কতগুলো লোকের ফিসফিসিয়ে কথা বলার আওয়াজ। তানিয়া এগিয়ে যায়। কানিজের বেড রুম থেকে ফিসফিস করে কথা বলার আওয়াজ আসছে। কানিজের বাসায় তো কানিজ ছাড়া আর তেমন কেউ থাকেনা। তাইলে!

তানিয়া এগিয়ে এসে দাঁড়ায়। কানিজের বেড রুমের দরজার সামনে। এই দরজাটাও খোলা ছিলো। তানিয়া এগিয়ে এসে নিঃশব্দে দরজা একটু ফাঁকা করে। আড়াল হতে ভিতরের দিকে নজর দেয়‌। তখনই সে যা দেখে তাতে তার চোখ মুখ বড় বড় হয়ে যায়। ভিতরে কানিজ আর সাথে কিছু ছেলে ছিলো। কানিজের হাতে ছিলো বন্দুক। তার পড়নে কালো জ্যাকেট, কালো জিন্স প্যান্ট। আর বাকি ছেলেগুলোর পড়নেও একই কাপড়। তারাও বন্দুক ধরে রয়েছে হাতে। কি নিয়ে যেনো তারা পরিকল্পনা করছিলো। দরজার বাইরে থাকা তানিয়া ভিতরের এই প্রতিচ্ছবি দেখে ভয়ে পিছিয়ে আসতে যায়। তখনই দরজার পাশে রাখা ফুলদানি টা পড়ে যায়। ভিতরের কানিজ তৎক্ষণাৎ দরজার দিকে তাকায়। দরজার বাইরে থাকা তানিয়া দৌড় দিতে যায় তখনই কানিজ তার বন্দুক উঁচিয়ে ধরে। সাথে সাথেই এক গুলি চলার আওয়াজ। এক নারীর আত্মচিৎকারের আওয়াজ। সব অন্ধকার হয়ে যায়। 

 

______

 

রাত ১০ টা। মেম্বার বাড়ির পিছনের বাগান। নিপা এসে দাড়িয়ে আছে ফুল গাছ গুলোর সামনে। আকাশে মেঘ করেছে। বাতাস বয়ে যাচ্ছে শো শো করে। নিপার শাড়ির আঁচল উড়ছে। দূর থেকে ভেসে আসে বাজ পড়ার আওয়াজ। নিপা মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকায়। বৃষ্টি তার খুব প্রিয়। আবহাওয়া এরকম হলেই তার মন ঘরে থাকতে চায় না। তবে সে এখানে এসেছিলো রায়হানের জন্য। কিন্তু রায়হান আজ আসেনি। নিপা রায়হানের জন্য অপেক্ষা করতে করতে খোলা আকাশ মেঘে ছেয়েছে। বর্ষণ করার আবহাওয়া তৈরি হয়েছে। তবুও এখনো রায়হান আসেনি। আবারো দূর আকাশ‌ থেকে বজ্রপাতের শব্দ ভেসে আসে। আকাশ থেকে এক ফোঁটা দু ফোঁটা করে বৃষ্টি নামতে শুরু করে। নিপার মুখে যেনো খানিকক্ষণের জন্যও মৃদু হাসি ফুটে উঠে। বৃষ্টির বেগ বাড়ে। বাতাস বইতে থাকে। নিপা দুই হাত মেলে দেয়। আকাশ ভেঙে নেমে আসা বৃষ্টিকে আপন করে নিতে থাকে। উপরে মুখ তুলে চোখ বুজে ফেলে সে। চোখের পাতায়ও ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়ে। তখনই তার পিছন থেকে আওয়াজ ভেসে আসে,

‘ স্রোতোসিনী, শ্রাবণ ধারায় এতো চেনা কী খুঁজে পাও, যা আমার মাঝে নেই এক বিন্দু পরিমাণও! ‘

নিপা চোখ খুলে ফেলে। তৎক্ষণাৎ পিছনে ফিরে তাকায়। এই লাইন টাযে তার ভীষণ প্রিয়। পিছনে ফিরেই দেখে রায়হান দাঁড়িয়ে আছে। এক দমকা হাওয়া সহ বৃষ্টি এসে দুইজনকে ভিজিয়ে দেয়।‌ নিপার মনে পড়ে যায় তাদের প্রথম দেখা হওয়ার সময়টাকে। 

 

” সেদিন বৃষ্টি ছিলো। ছাতা হাতে নিপা এসেছিলো কলেজে। ভেবেছিলো আজ হয়তো ক্লাস হবে। কিন্তু বৃষ্টির কারণে আজ অনেক শিক্ষার্থীই স্কুলে আসেনি। নিপা এক হাতে একটা মোটা বই কোলের সাথে ধরে রয়েছে। পিঠে ছোট ব্যাগ। পড়নে স্কুল ড্রেস। আরেক হাতে ছাতা। কলেজ মাঠেই কিছুটা দূরে খেলা করছিলো কিছু ছেলে। এই ঝুম বৃষ্টির মাঝেও তারা ফুটবল খেয়াল মেতে উঠেছে। তখনই ঐদিক থেকে ফুটবল টা উড়ে এসে তার কিছুটা সামনে পড়ে লাফাতে লাফাতে তার পায়ের সামনে এসে থামে। নিপা ফুটবলকে দেখে সেদিক থেকে নজর উঠায়। দেখে একটা ছেলে দৌড়ে আসছে। তখনই এক বড় বিজলী চমকিয়ে উঠে। নিপা ঘুরে অন্যদিকে তাকায়। তার মন চাইছিলো ছাতা ফেলে এই ঝুম বৃষ্টিতে ভিজতে। কিন্তু এখানে সে চাইলেও এতো গুলো ছেলের সামনে ভিজতে পারবেনা। নিপা তার অপর হাতে ধরে থাকা বইটা ছাতা যেই হাতে ধরেছিলো সেই হাতে ধরে। খালি হাত বাড়িয়ে দেয় ছাতার বাইরে। ছাতাটাকে কাঁধে নিয়ে হালকা বৃষ্টি হাত দিয়ে ছোঁয়। তখনই সে পিছন থেকে কারো গলার আওয়াজ পায়। 

‘ স্রোতোসিনী, শ্রাবণ ধারায় এতো চেনা কী খুঁজে পাও, যা আমার মাঝে নেই এক বিন্দু পরিমাণও! ‘

নিপা পিছনে ফিরে। ছেলেটা ছিলো রায়হান। নিপা এই প্রথম তার চিঠি প্রেরককে খুঁজে পায়। স্রোতোসিনী সম্মোধন করে যে চিঠি গুলো আসতো সেই চিঠির লেখক রায়হান, সেদিন প্রথম নিপাকে কথা বলেছিলো। আর প্রথম বলা কথাটাতেও চিঠির মতো কাব্যিক সুর মিশানো ছিলো। “

 

নিপা বাস্তবে ফিরে আসে। বৃষ্টি বেড়েছে। খুব বৃষ্টি পড়ছে এখন। রায়হান এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়ায়। রায়হানের বোরখা ভিজে চুপচুপে হয়ে গিয়েছে। রায়হান বলে,

‘ এই লাইনটাই তোমাকে বলা আমার প্রথম কথা ছিলো। এই ঝুম বৃষ্টি সেদিনের সাক্ষী স্বরুপ আজও বর্ষমান। ‘

‘ তোমার বলা এই কথাটা আজও যে আমার কতটা পছন্দের! তোমার সেই চিঠি গুলা আজও আমি খুব যতনে করে সংরক্ষণ করে রেখেছি। ‘

‘ সেই স্রোতোসিনী থেকে সুবা। একপাক্ষিক ভালোবাসা থেকে প্রনয়। যাত্রা পথ টা আমাদের জন্য বেশ সহজই ছিলো। ‘

‘ আর এখন! ‘

‘ এখন প্রান্তরের শেষে দাঁড়িয়ে। ‘

নিপা কথাটা শুনেই চুপ হয়ে যায়‌। রায়হান উপরে তাকিয়ে একবার বৃষ্টি দেখে। তাঁরপর নিপার দিকে তাকিয়ে বলে,

‘ কী ভেবেছো। আমাদের সম্পর্ক কী আরো অন্য কোন দিকে মোড় নিবে! ‘

‘ তুমি তোমার কাজ টা ছেড়ে দিতে পারবেনা। (এগিয়ে এসে রায়হানের হাত উঁচিয়ে ধরে) তুমি আমি ছদ্মবেশে এমন যায়গায় থাকলাম যেনো তোমার দলের লোক আমাদের খুঁজে না পায়। তুমি পরিশ্রম করবে। সারাদিন কাজ করে যা টাকা পাবে তা দিয়ে আমাদের ছোট্ট সংসার চলবে। এক ছোট্ট কুড়েঘরে আমরা থাকবো। সুখী সংসারের হাতেখড়ি করবো! আমাদের ঘর আলো করে এক ছোট্ট ফুটফুটে মেয়ে হবে। সুন্দর রঙিন স্বপ্নজাল বুনবো। তুমি প্লিজ সব কিছু ছেড়ে দেও। ফিরে এসো নতুন পথে! প্লিজ! ‘

‘ ওরা তো আমাদের খুঁজে বের করবে সুবা! ‘

‘ পারবেনা। আমরা এমন যায়গায় থাকবো যাতে তারা আমাদের একদমই খুঁজে না পায়। পাপের কলসি মাথায় নিয়ে বড় অট্টালিকায় থাকলেই সুখি হওয়া যায় না রায়হান। ছোট্ট এক কুড়েঘরে দিন এনে দিন খেয়েও সুখী থাকা যায়। আমার টাকা চাইনা, ফ্ল্যাট চাইনা। আমি শুধু আমাদের সন্তানের এক সুন্দর ভবিষ্যৎ চাই। তাকে যেনো শুনতে না হয় তার বাবা একজন খুনি, তাকে যেনো শুনতে না হয় তার বাবা একজন জেল পালানো আসামি। সে একজন সাধারণ পরিশ্রমি বাবা হিসেবেই তোমার পরিচয় দিবে সমাজে। রায়হান, এমনটা কি করা খুব কঠিন! জীবনে একটু আধটু রিক্স নিলে ক্ষতি কি! যদি তাতে আমরা একটা ভালো জীবন পেতে পারি। আমাদের অনাগত সন্তানকে এক পূর্নের সাম্রাজ্যে জন্মগ্রহণ করাতে পারি। একটু ভেবে দেখো। আমার কিন্তু চাইলেই পারবো! শুধু দরকার তোমার একটু সদিচ্ছা। তোমার এই খারাপ পথ থেকে বেড়িয়ে আসার তাড়না। আমি সবসময় তোমার পাশে থেকে তোমাকে সাপোর্ট দিয়ে যাবো। দরকার হলে আমিও বাসায় সেলাইয়ের কাজ করবো। সংসারে যতটুকু পারি আর্থিক দিক দিয়েও ভূমিকা রাখার চেষ্টা করবো। তবুও তুমি ফিরে এসো। সবকিছু ছেড়ে দিয়ে, এক নতুন রায়হান হয়ে! ‘

রায়হান নিপার কথা গুলো শুনে তার দিকে মলিন দৃষ্টে তাকিয়ে রয়। সে জীবনে এমন একজন সঙ্গিনী পেয়ে হয়তো সবচেয়ে ভাগ্যবান হিসেবে নিজেকে মনে করতেই পারে। রায়হান বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ হয়ে ভাবে। নিপার কথা গুলো তার মস্তিস্কে বাজতে থাকে। আসলেই তো, তাদের সন্তান কী পরিচয়ে বাঁচবে। তাদের সন্তান এই সমাজে ছিঃ ছিঃ হয়ে কেনো বেড়াবে। তারা চাইলেই তো একটা সুন্দর জীবনে পা রাখতে পারে। রায়হান মুখ তুলে তাকায় নিপার দিকে। নিপা ছলছল চোখ নিয়ে তার দিকে মাথা নাড়ায়। তাকে চোখের ভাষায় বলে যে, সে সবসময় তার সাথে আছে। আকাশের বৃষ্টি কিছুটা কমে যায়। রায়হান উপরে আকাশের দিকেও তাকায়। চোখ বুঁজে। এই একটা সিদ্ধান্ত সব পাল্টে দিতে পারে। যদিও এখানে একটু রিস্ক থেকেই যায়। তবুও তারা দুইজন মিলে চাইলেই সব বাঁধা পেড়োতে পারবে। রায়হান চোখ খুলে। নিপার দিকে তাকায়। মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলে,

‘ হ্যা। আমরা পারবো। আমরা অবশ্যই পারবো। আমি সব ছেড়ে দিবো। আজ, এমনকি এখন থেকেই। আমার জীবনে আর কোন অন্ধকার জগত থাকবেনা। কোন অন্ধকার জগত না। ‘

বলেই রায়হান তার পকেট থেকে তার ফোন গুলো বের করে। ৩-৪ টের মতো ফোন ছিলো সেখানে। রায়হান সব মাটিতে ফেলে দেয়। সব পা দিয়ে মাড়িয়ে ভেঙে ফেলে। নিপা সবই চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছে। তার মুখে হাসি, চোখ ছলছল। রায়হান ফোন গুলো ভেঙ্গে ফেলেই এসে নিপাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। নিপার গালে মুখে চুমু খেতে খেতে বলে,

‘ আমি, আমি আর কখনো মানুষ মারবোনা। আমার স্রোতোসিনীর জন্য, আমার ভালোবাসার জন্য আমি সব ছেড়ে দিয়েছি। এই রায়হান আর পিছু ফিরে তাকাবে না। আর না। ‘

নিপাও দুই হাতে রায়হানকে আগলে নেয়। সে রায়হানকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে‌। সে এই রায়হানকেই তো ভালোবাসতো। যে তার ভালোবাসার জন্য সবকিছু ছাড়তেও প্রস্তুত। নিপা রায়হানকে এক উষ্ণতম আলিঙ্গন দিয়ে নিজের করে নেয়। আকাশের বৃষ্টি একটু বেড়ে যায়। ফোঁটায় ফোঁটায় মেঘ ভেঙে নেমে আসা শ্রাবণ ধারারা সাক্ষী হয়ে রয়, এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করা দুই নর-নারীর আলিঙ্গনে। এক ঠান্ডা বাতাস বয়ে যায়। তবে তা নিপা-রায়হানের উষ্ণতম আলিঙ্গনের উষ্ণতা বিন্দু মাত্রও কমাতে পারেনি। প্রকৃতি সজীব হয়ে উঠে। তার সাথে নতুন রঙে রঙিন হওয়া দুই প্রজাপতিও বাগানে ফোঁটা নতুন ফুলের সুবাস নেয়। 

 

চলবে ,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

 

( কেমন লেগেছে আজকের পর্বটা! কী মনে হয়, এরপর কী হতে চলেছে! আর গল্প এখন রহস্যময় চরিত্র মানে যারা জনসমক্ষে আসেনি এমন দুইটা চরিত্র হলো জুডাস আর সিমরান। কী মনে হয় এরা কে! আচ্ছা আমি একটা ছোট ক্লু দিয়ে দিলাম। গল্পের সবগুলো চরিত্রেরই কোন না কোন ভাবে এই গল্পের পটভূমির সাথে যুক্ত আছে। তো এখন কোন কোন চরিত্রকে আপনারা তেমন কোন ভূমিকা এতোদিন রাখতে দেখেননি এমন চরিত্রের সন্ধান করুন। অবশ্যই সিজন ২ এ দেখানো চরিত্র গুলার মধ্যেই জুডাস আর সিমরান লুকিয়ে আছে 😉। কাল পর্ব আসছেনা। পরসুদিন পর্ব পাবেন। আর যদি লাল পানি খেতে মন চায়, তবে অবশ্যই সোনালীর সাথে যোগাযোগ করবেন। সোনালীর নাম্বার : 01969696969। থাক, ধন্যবাদ দেওয়া লাগবেনা। আমি মাঝে মাঝে এমন একটু-আধটু জনসেবা করেই থাকি  :⁠-⁠)

 

গল্প নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা করুন আমার গ্রুপে।

গ্রুপ লিংক 👇

https://www.facebook.com/groups/743016887019277/?ref=share_group_link

 

উপন্যাস :: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন :: ২(মুখোশ)

পর্ব :: ৮৩ (২য় ভাগ)

লেখক :: মির্জা সাহারিয়া

 

উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন:: ২(মুখোশ)

পর্ব:: ৮৪

লেখক:: মির্জা শাহারিয়া

 

কার্জন হল পুকুর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পুকুর পাশে বসে আছে ফারদিন। অনার্স ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী সে। এখন সময় রাত ১০ টা। একটা সিগারেট জ্বালিয়ে তাতে টান দিতে দিতে ফেসবুক স্ক্রল করছে সে। এদিকটায় এখন তেমন কেউ নেই। হালকা নিমনিমে আলো জ্বলছে তার কিছুটা সামনের এক ল্যাম্পপোস্ট লাইটে। ফারদিন ফেসবুকে স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ তার মেসেন্জারে মেসেজ আসার শব্দ হয়। তার বন্ধু রাহুল নক দিয়েছে। ফারদিন মেসেজ টা ইগনোর করে চ্যাট উইন্ডো টা নিচে নামিয়ে ক্রস করে দেয়। ফেসবুকে ভিডিও দেখতে দেখতে হাতের জলন্ত সিগারেটে টান দেয়। তখনই আবার রাহুল তাকে মেসেজ করে। ফারদিন মুখ দিয়ে ‘চ’ সূচক বিরক্তি শব্দ বের করে মেসেন্জার উইন্ডোতে ট্যাপ করে‌। রাহুল বলছিলো। 

‘ মামা। নতুন ভিডিও আইছে। নিবি ? ‘

রাহুল টাইপ করে,

‘ কীসের ভিডিও ? ‘

‘ আরে এতো ভোলা সাজতাছোস ক্যা! আমি তোরে কোন ভিডিওর সাপ্লাই দেই তা মনে হয় তুই জানোস না! ‘

‘ ওও। ঐগুলা! নতুন আবার কার ভিডিও লিক হইলো! কোন নায়িকার নাকি! ‘

‘ নায়িকার থেইকাও সুন্দরী। কিন্তু মামা। চেহারা ব্লার করা। এতে চলবো তোর! ‘

‘ চেহারা ব্লার! চেহারা ছাড়া বাকি ঐ যায়গা গুলাও নি ব্লার করা! ‘

‘ না না। শুধু মাইয়াডার চেহারা ব্লার করা। চেহারা ছাড়া সব দেখা যাইতাছে। একদম একের জিনিস। আর ভিডিওডা কার জানোস! ‘

‘ কার? ‘

‘ ঐযে কয়েকদিন আগে যে একজন নরখাদকরে ধরলো, অর আর অর পোলার। পোলা ডায় তো পুরা ইচ্ছা মতো দিছে রে মামা। অবশ্য নরখাদক টায় অতো পারেনাই। কিন্তু দেখতে মজা আছে। ‘

‘ দে দেখি ভিডিওডা। ‘

‘ মামা, আমারে কিন্তু কোক খাওয়ান লাগবো! ‘

‘ আরে খাওয়ামুনে। ভিডিও ভালো হইলে অবশ্যই কোক খাওয়ামু। ‘

‘ আচ্ছা মামা তাইলে ল। ‘

রাহুল ৪ টা ভিডিও পাঠায়। ফারদিন তাড়াতাড়ি সিগারেটে একটা লম্বা টান মেরে সিগারেটটা ফেলে দেয়। পা দিয়ে মাড়িয়ে নষ্ট করে। চারপাশ দেখে। না কোন লোক নাই। হেডফোন সে সাথে আনেনি। দেখলে এমনিই দেখতে হবে। সে ৪ টা ভিডিওর মধ্যে কোনটা প্লে করবে তা ভাবতে থাকে‌। সে দেখে লাস্টের টায় মেয়েটা একটু বেশিই খোলামেলা পোশাকে আছে। ফারদিন আর বেশি কিছু ভাবে না। চারপাশ আরেকবার দেখে নিয়ে লাস্টের ভিডিওটা প্লে করে দেয়। দিয়ে ফোনটাকে কাত করে দুই হাতে ধরে। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছিলো রাফসানকে। সে বরের পোশাক পড়ে আছে। আর একটা মেয়ে রাফসানের দিকে লাস্যময়ী রূপ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটার মুখ ব্লার করা। তাই চেহারা দেখা যাচ্ছে না। তবে বাকি শরীর উদ্যম। মেয়েটাযে আর কেউ নয় সোনালীই, তা বোঝার আর বাকি রয় না। তবে ফারদিন সেই মেয়েটাকে দেখেনা চেহারা ব্লার করে থাকার কারণে। মেয়েটা বিকিনি পড়ে ঢংয়ী হয়ে রাফসানের দিকে এগোচ্ছে। হেঁটে হেঁটে যাওয়ার সময় বিভিন্ন পোজ দিচ্ছে। যা দেখে যে কোন ছেলেরই মাথায় যৌবন চড়ে যাওয়ার কথা। সোনালী এগিয়ে এসে বিছানার সামনে দাঁড়ায়। বিছানায় উঠে। রাফসানের শেওরানি খুলে দিতে থাকে। রাফসান হাত দিয়ে বারবার সোনালীর দেহটা ছুইছিলো। সোনালী রাফসানের শেওরানি টা খুলে দিয়ে নিচে ছুড়ে মারে। রাফসানকে ধাক্কা মেরে শুইয়ে দেয়। বিছানার পাশের টেবিলে বরফ কুচি রাখা ছিলো। সোনালী সেখান থেকে এক টুকরো বরফ মুখে নিয়ে রাফসানের গলার কাছে আসে। রাফসান নিজেকে খুব কষ্টে কন্ট্রোলে রেখেছে। সোনালী রাফসানের গলায় তার মুখে ধরা রাখা বরফ কুচি দিয়ে ছুঁয়ে দিতে দিতে নিচের দিকে নামে। রাফসান পাগলা ঘোড়ার মতো লাফাচ্ছে বিছানায়। সোনালী রাফসানের বুক পর্যন্ত বরফ নিয়ে এসেছে তখনই রাফসান আর রয়ে সয়ে থাকতে পারেনা। সে সোনালীকে ধরে ধপ করে বিছানায় শুইয়ে তার উপরে উঠে যায়। সোনালীর শরীরে যেই দুই টুকরো কাপড় ছিলো তা ছিড়ে ফেলে। নিজের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিয়ে সোনালীর থেকে কেড়ে নিতে থাকে সর্গীয় সুখ। 

ভিডিওটা দেখতে দেখতে যেনো ফারদিনেরই অবস্থা খারাপ। এই রাত-বিরাতে এমন ভিডিও দেখলে কারোরই মাথা ঠিক থাকার কথা না। ফারদিন তাড়াতাড়ি ভিডিওটা অফ করে। এখন তার প্রথম কাজ হচ্ছে ওয়াশরুমে যাওয়া। নিজের খায়েশ যতটুকু পারে মিটিয়ে নেওয়া। ফারদিন এক দৌড়ে হলের দিকে চলে যায়। কিছুদূরের ল্যাম্পপোস্টের আলোয় তার দৌড়ে চলে যাওয়া বেশ ভালোভাবেই দৃশ্যমান হয়। 

 

____

 

সোনালী বিছানায় বসলো। পড়নে থ্রী পিস। এইটা তার সেই কুঠুরি যেই কুঠুরিতে এনে সে রাফসানের সাথে নিজের গোপন ভিডিও ধারণ করেছিলো। এই কুঠুরিতেই এখন সোনালী গা ঢাকা দিয়েছে। তার বাড়িতে বলেছে সে একটু ঢাকা যাবে, যাতে তার প্রতি তার বাড়ির লোকেরা কোনরকম সন্দেহ না করে। 

সোনালীর হাতে পেয়ারা। পেয়ারায় কামড় দিয়ে বিছানায় বসে পা দোলাচ্ছে  সে। তার মুখে খুশি খুশি ভাব। আজই সে সব ভিডিও ভাইরাল করে দিয়েছে। তার নিজের মুখচ্ছবি ব্লার করে দিয়েছে, যাতে তার পরবর্তীতে কোন সমস্যা না হয়। সোনালী পেয়ারা খেতে খেতে আনমনে বলে উঠে,

‘ রাফসান। পালিয়ে আর কতদিন থাকবা! এখন তো তোমার উপর খাঁন বাড়ি ট্রাজেডি আর সাথে এই ভাইরাল ভিডিওর চাপ। যেইখানেই যাবা, লোকজন তোমাকে ঠিকই চিনে ফেলবে। আর নজরুল, ও তো ওর পাপের শাস্তি পাওয়া শুরু করে দিছে। খুব খাওয়ার শখ ছিলো ওর। এখন খা, জেলে পচেঁ পচেঁ নিজের মাংস নিজেই খুবলে খুবলে খা। (উপরে তাকিয়ে) মা, তোমার মৃত্যুর প্রতিশোধ আমি নিয়েছি মা। তোমার মেয়ে যে কোন মূল্যেই হোক, খাঁন বাড়ি ধ্বংস করেই থেমেছে। তোমার আত্মা মুক্তি পাক। তুমি স্বর্গ বাসী হও মা। ‘

 

ফিরে দেখা অতীত,,,

 

সময়টা ১৯ শতকের শেষের দিক। গ্রামের আর দশটা স্বাধারণ পরিবারের মতোই এক পরিবারে বাস করতো সুরভী, সুমনারা। সুমনার ছোট বোন সুরভী। দুইজনেরই রূপের দিক দিয়ে বেশ খ্যাতি ছিলো গ্রামে। তাদের মা নেই। বাবার আদরেই ছোট থেকে বড় হয়েছে দু’জন। সুমনার যখন ১৬ বছর, তখন গ্রামের একমাত্র সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসে। গ্রামের মাতব্বর নীশেখ খাঁনের বড় ছেলে নজরুল খানের সাথে বিয়ের জন্য। এক গরীব ঘরে এই বড় পরিবার থেকে আসা বিয়ের প্রস্তাব আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতোই ছিলো। সুমনাকে তার বাবা বিয়ে দিয়ে দেন। বয়স কম হলেও তিনি এতে পিছুপা হননি। নজরুলের সাথে সুমনার বিয়ে হওয়ায় সুমনা, খাঁন বাড়িতে পাড়ি জমায়। বাসায় একলা রয়ে যায় সুরভী। এও তার বড় বোনের মতোই বেশ সুন্দরী ছিলো। কিন্ত বয়স খুব কম হওয়ায় কেউ বিয়ের প্রস্তাব দেয়নি। সময় অতিবাহিত হতে থাকে। সুরভির বাবা ধীরে ধীরে সয্যাশায়ি হন। সুরভির বয়স তখন ১৭। সুরভির বাবা চাইছিলেন মৃত্যুর আগে তার এই মেয়েকেও বিয়ে দিয়ে কোন ছেলের হাতে তুলে দিতে। এবং করেনও ঠিক তেমন। তবে সুরভীর ভাগ্য সুমনার মতো অতোটাও সুখশ্রী ছিলোনা। তার বিয়ে হয় গ্রামের এক সাধারণ কৃষকের বাড়িতে। সুরভীর বাবা তার মেয়ের বিয়ের কিছুদিন পর পরই মারা যান। সুরভীর মাঝে অহংকার বা বড়াই ভাব টা ছিলোনা। সে এই গরীব ঘরেও তার স্বামী সংসার নিয়ে বেশ সুখে শান্তিতেই ছিলো। সময় পেড়োয়। সুরভী প্রেগন্যান্ট হয়। তাদের ঘর আলো করে আসে এক মেয়ে সন্তান। মেয়েটাও সুরভীর মতোই অনেক সুন্দর আর ফর্সা ছিলো। মায়ের নামের সাথে মিল রেখেই তার নাম রাখা হয় সোনালী। সোনালী রোদ্দুরের মতো প্রজ্জলিত হওয়া মেয়েটার, সোনালী নামকরণ বৃথা যায় না। সোনালী বড় হয় আর পাঁচটা গ্রামের সাধারণ মেয়ের মতোই। সেও বাকিদের মতো সবার সাথে মিশতো, সবার সাথে খেলতো। সোনালী ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। চারপাশের পরিবেশ সমাজ এগুলোকে তার ক্ষুদ্র মস্তিস্কে ধারণ করতে থাকে। এরই মাঝে তার মায়ের পেটে দ্বিতীয় বাচ্চা আসে। কিন্তু কোন কারনে সেটা ১০ মাস তো যাইই না, উল্টো ৭ মাসের মাথায় এক মৃত বাচ্চা হিসেবে সুরভী প্রসব করেন। এরপর থেকেই সুরভী রোগে ভুগতে শুরু করেন। ঠিক মতো চলাফেরা করতে পারতেন না। হাত পা ফুলে ফুলে উঠে। সোনালীর বয়স তখন ৭ কী ৮ বছর। তার মা’কে ভর্তি করানো হয় চৌড়চকের সেই হাসপাতাল টায়। কিন্তু সেখান থেকে চিকিৎসকেরা রেফার্ড করে দেয়। আর বলে দিনাজপুর মেডিকেলে নিয়ে যেতে। সুরভীর অবস্থা খুব সিরিয়াস ভেবে সোনালীর বাবা সুরভীকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে নিয়ে যান। সেখানে ভর্তি করানো হয় সুরভীকে। তবে তখনই তাদের অবাক করে দিয়ে সুমনা আসেন সুরভীর সাথে দেখা করতে। সুমনা তার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর, তেমন একটা যোগাযোগ রাখতেন না তার বোনের। কিন্তু সেদিন হঠাৎ তার আগমন সোনালীর বাবাকে বেশ আশ্চর্য করেছিলো। ধীরে ধীরে সময় পেড়োয়। সোনালীর মায়ের অবস্থা আগের মতোই থাকে। এদিকে সুমনাযে সুরভীকে দেখতে এসেছিলো সেদিন, তারপর থেকে তিনি নিয়মিতই আসতেন সুরভীকে দেখতে। ফলমূল আনতেন। সেবা যত্ন করতেন। সোনালীর বাবা এই ব্যাপার গুলোকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ভাবেই নিতে থাকেন। এবং তারই মাঝে একদিন খবর আসে সোনালীর মা মারা গিয়েছে। এই খবরটা সোনালীর বাবা বিশ্বাসই করেনি। কারণ সুরভী ধীরে ধীরে সুস্থ হতে ধরেছিলো। বিগত রাতে হসপিটালের বেডে সুরভীর সাথে তার কথাও হয়েছিলো। কিন্তু তার পরদিনই সুরভীর মৃত্যু যেনো কোন রহস্যের জন্ম দেয় তার মনে। এবং সেই রহস্য আরো জোড়ালো হয় যখন সুরভীর লাশ হসপিটাল তাদেরকে দেয় না। হসপিটালের লোকেরা মোটা অংকের টাকা দাবী করে। টাকা না দিলে তারা লাশটা দিবে না, আর লাশটাকে দেখাবেও না। সোনালীর শিশুসুলভ মন তার মায়ের মৃত্যুতে অনেক কেঁদেছিলো। তার বাবা রহস্যের পারদ কমিয়ে রেখে হাসপাতালের ওয়ার্ড বয়দের কাছে অনেক অনুনয়-বিনুনয় করেন। তবুও সেই ওয়ার্ড বয়দের মন গলেনা। সোনালীর বাবা একজন সাধারণ কৃষক হওয়ায় সেই মোটা অংকের টাকা দিতেও পারছিলেন না। তিনি যান সুরভীর বোন সুমনার কাছে সাহায্য চাইতে। তখন তিনি তো সাহায্য পানই না, উল্টা আরো তাকে অপদস্থ করে খাঁন বাড়ির লোকেরা। তাকে বিভিন্ন কটু কথা শুনিয়ে অপমান করে তাড়িয়ে দেয়। সোনালীর বাবা ফিরে আসেন। তার অন্যান্য পরিচিত জনদের কাছ থেকে টাকা ধার নেন। আর সেই টাকা দিয়ে তিনি যখন সুরভীর লাশটাকে ছাড়িয়ে আনতে যান, তখনই ওয়ার্ড বয় রা জানায় লাশ তারা বিক্রি করে দিয়েছে, লাশ হসপিটালে নেই। সোনালীর বাবা মেজাজ হারান। তার স্ত্রীর লাশ, তাকে না বলেই বিক্রি কেনো করবে তারা। এই নিয়ে বেশ তর্কাতর্কি হয় ওয়ার্ড বয়দের সাথে। এবং একটা পর্যায়ে হসপিটালের ওয়ার্ড বয়’রা মিলে তাকে মারতে শুরু করে। তাকে আহত করে রাস্তায় এনে ফেলে দেয়। সোনালীর বাবা বাসা চলে আসেন। বাসায় একা থাকা ছোট্ট সোনালী তার মায়ের মৃত্যুর শোক শয়ে উঠতে না উঠতেই তার বাবার আহত শরীর নিয়ে বাড়ি ফেরা তাকে আরো কষ্টের সাগরে এনে ফেলে দেয়। সোনালীর বাবা পরবর্তীতে আর লাশের দাবী নিয়ে হসপিটালের দোড়গোড়ায় জাননি।

সময় পেড়োয়, সোনালী বড় হয়। তার বাবা সারাদিন নিজের জমিতে কাজ করে যা ফসল ফলাতেন তা বিক্রি করেই বাবা-মেয়ের দিন চলে যেতো। সোনালীর বয়স তখন ১৪। খাঁন বাড়ি থেকে তাদের কাছে আদেশ আসে এই ভিটামাটি তাদের ছেড়ে দিতে হবে। পাশপাশি তাদের জমিজমাও সব খাঁন বাড়ির কাছে হস্তান্তর করতে হবে। তারা টাকা দিবে, কিন্ত তা নিহতই সংখ্যায় কম। সোনালীর বাবা তো জমি ছাড়তে নারাজ। কিন্তু খাঁন বাড়ির কর্তারা এই জমি নিয়েই ছাড়বে। তাদের ফার্ম খুলবে এই জমি গুলোয় তারা। এই জমি তাদের চাইই চাই। সোনালীর বাবা খাঁন বাড়ির সব প্রস্তাব উপেক্ষা করে তার স্বাভাবিক কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যেতে থাকে। তখনই একদিন খাঁন বাড়ির কর্তারা লোকজন নিয়ে এসে সোনালীর বাড়িতে ভাঙচুর চালায়। তাদেরকে তাদের বসত বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে। তাদের সব জমিজমা নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়। এই সব কিছুর নেপথ্যে ছিলেন সুমনা বেগম নিজেই। তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সোনালী আর তার বাবাকে বাড়ি ছাড়া করেন। সোনালী, তার বাবা দুইজন সুমনার পা পর্যন্ত ধরেছিলো, কিন্তু সুমনার মন গলাতে পারেননি। সব কিছু কেড়ে নেয় সুমনা, তাদের থেকে। সোনালী আর তার বাবা গৃহহীন হয়ে পড়ে। তখন সোনালীর চাচা তাদেরকে তার নিজের বাসায় থাকতে দেয়। এদিকে সুমনা বেগম যা দখল করে নিয়েছেন সেগুলোতে ‘খাঁন ফিড এন্ড হ্যাচারি’ গ্রুপের মালিকানায় ফার্ম গড়ে উঠে। 

 

সোনালী বড় হয়। তার বয়স গিয়ে দাঁড়ায় ১৯ এ। তার মায়ের মতোই সে দারুন সুন্দরী হয়। গ্রামের লোকেরা রাস্তা দিয়ে গেলে, তার দিকে একবার ফিরে না তাকিয়ে আর পারেনা। তার চাচারা যেই ঘরে তাদের থাকতে দিয়েছিলো সেই ঘরের সামনের আঙিনার পেড়িয়ে পরের ঘর গুলোর থাকতো তার চাচারা। তার চাচার বড় ছেলে একদিন ঢাকা থেকে বাড়িতে আসে। সোনালী সাধারণ আর পাঁচ টা মেয়ের মতোই বাড়িতে থাকতো। রান্না-বান্না করতো। কিন্তু তার চাচার সেই ছেলে তাকে ভালো নজরে দেখতো না। সবসময় তার প্রতি খারাপ নজর দিতো। সোনালীর এই জিনিসটা খুব খারাপ লাগতো। যতই হোক, মেয়েতো। ধীরে ধীরে জল গড়াতে থাকে। সেই ছেলেটা সোনালীর কাছে ঘেঁষার চেষ্টা করে। তার শরীরে খারাপ স্পর্শ দেওয়ার চেষ্টা করে। সোনালীর খারাপ লাগলেও সে প্রতিবাদ করতে পারতো না। তারা এইখানে আশ্রয় নিয়েছে। যদি প্রতিবাদ করলে তখন তাদের এ বাড়ি থেকে বের দেয়। সোনালী চেষ্টা করে যতটা সম্ভব সেই ছেলের থেকে দূরে দূরে থাকার। এরই মাঝে একদিন ঘটে এক বিপত্তি। সেই রাতে তুমুল ঝড় বৃষ্টি হয়। সোনালীর বাবা আর তার চাচা সন্ধায় গন্জে গিয়েছিলো। ঝড়-বৃষ্টির কারণে তারা সময় মতো ফিরে আসতে পারেনি। বাড়িতে তখন সোনালী, সেই ছেলেটা আর এক বুড়ি ছিলেন। বুড়িটা সোনালীর দাদি। তবে তিনি কানে শুনতে পেতেন না। সেই ছেলেটা সুযোগ নেয়। সোনালীর ঘরের দরজা সবসময় বন্ধ রাখতো যখন তার বাবা বাসায় থাকতো না। সেদিন রাতেও বন্ধ ছিলো। সেই ছেলেটা দরজার এপাস থেকে শব্দ করে তার বাবার গলা নকল করে এমন ভাবে কথা বলে যেনো সোনালী ভাবে তার বাবা ফিরে এসেছে। সোনালী ভাবেও তাই। বিছানায় ভয়ে ভয়ে বসে থাকা সোনালী যেনো তার বাবার গলা পেয়ে প্রাণ ফিরে পায়। সে বিছানা থেকে নেমে এসে দরজা খুলে দেয়। আর তৎক্ষণাৎ ভিতরে ঢুকে পড়ে সেই ছেলেটা। সোনালীকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয় ঘরের ভিতরে। ঘরের দরজা লাগিয়ে দেয়। সোনালীর সাথে জোড়-জবরদোস্তি করতে থাকে। সোনালী বারবার বাঁচার জন্য চিৎকার দেয়। কিন্তু তার দাদি কানে শুনতে না পাওয়ায় তিনি এসব সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেন না। ছেলেটা সোনালীর মুখ, হাত বেঁধে সেই ঘরে সারারাত কয়েকদফা ধর্ষণ করে। সোনালী সেই রাতে পায় এক মৃত্যু সমান যন্ত্রনা। যেনো আরেকটু হলেই তার আত্মা দেহ থেকে বেড়িয়ে যেতো। ছেলেটা খুব খারাপ ভাবে তাকে ধর্ষণ করে।‌ অচেতন সোনালীকে ঘরের মধ্যেই ফেলে রেখে মাঝরাতে ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়। সেই রাতে তার বাবা আর চাচা বাড়ি ফিরেনি। তখন সোনালীর কাছে বা তার বাবার কাছে ফোন ছিলোনা। নাহলে সোনালীর বাবা তাকে ফোন করে জানিয়ে দিতে পারতেন যে তিনি তার ভাইয়ের সাথে গন্জ থেকে কাছে-পিঠে তার এক বোনের বাড়িতে গিয়ে উঠেছিলেন। 

পরদিন সকালে সোনালীর বাবা ফিরে আসেন। ঘরে সোনালীকে তিনি বিছানায় পান। সোনালী ঘুমাচ্ছিলো ভেবে তিনি আর তাকে না ডেকেই তার কাজে চলে যান। তবে সোনালি সে সময় জেগে ছিলো। সে ভোর বেলায় তার জ্ঞান ফিরে পেয়েছিলো। ব্যাথা ভরা শরীর নিয়ে কোনমতে গোসল করে এসে শুয়ে থাকে ছিলো। তার বাবাকে সে বিষয়টা জানাতে চায়নি। কীভাবেই বা বলবে সে। লজ্জায় ঘৃণায় সোনালী আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলো। কিন্তু তার বাবার কথা ভেবে আর করেনি। তার বাবার সে ছাড়া যে আর আপন কেউ নেই। সে মারা গেলে তার বাবাকে কে দেখবে। তার বাবা যে অনেক কষ্ট পাবেন। সোনালী নিজেকে ধীরে ধীরে শক্ত করে নিতে থাকে। কথায় আছেনা, মানুষ ঠেকে শিখে। সোনালীর বেলায়ও তাই। ছোট থেকে এক স্বাভাবিক মেয়ের মতো বড় হওয়া সোনালী ধীরে ধীরে অস্বাভাবিক হয়ে যায়। সেই ছেলেটা কয়েকদিন পরেই ঢাকায় চলে যায়। কিন্তু তার সোনালীর সাথে করা কাজ গুলো সোনালীর মনে প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে গিয়েছিলো। সোনালী আগে তার বাবার প্রতি হওয়া অবিচার গুলো ভেবে কাঁদতো, তবে এখন তার মনে এসবের জন্য, প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠে। পণ নেয় সে একদিন অনেক বড় একজন হবে, আর তার বাবাকে যেভাবে সেই খাঁন বাড়ির লোকেরা অপদস্থ করেছিলো সেই ভাবে সেও প্রতিশোধ নিবে। আর সাথে তার চাচার ছেলে যে তার সবকিছু লুটে নিয়েছে সেই ছেলেটাকেও ছাড়বেনা। 

বছরের পর বছর পেড়োয়। সোনালী ডাক্তারিতে ভর্তি হয়। তার বাবা চেয়েছিলো তাকে ডাক্তার করাবেন। গরীব দুঃখীদের সোনালী বিনা পয়সায় চিকিৎসা করে দিবে। তার বাবা তার মেয়েকে নিয়ে গর্ব করবেন। সোনালীও তার বাবার এই স্বপ্ন পূরণে লেখাপড়ায় ভালোমতন  মনযোগ দেয়। সে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজেই ডাক্তারি পড়তো। সরকারি হওয়ায় তেমন একটা খরচ ছিলোনা। ১ম বর্ষে থাকাকালীন একদিন তাদের স্যার তাদের মর্গে নিয়ে যায় লাশ কাটাছেঁড়া দেখানোর জন্য। সব শিক্ষার্থীর মতো সোনালীও যায়। বাকি ছাত্র-ছাত্রীরা এই লাশ কাটাকাটি দেখে বেশ ভয় পেলেও সোনালীর কেনো জানি কোন ভয় লাগেনি। উল্টো সেখানকারই এক ছোট বাচ্চার লাশ তার কাছে খুবই আকর্ষণীয় লাগছিলো। সোনালীর ছোট বাচ্চা দেখলেই সেগুলোর গাল, পায়ের রান, এগুলা মন করতো দাঁত দিয়ে চিবিয়ে ছিঁড়ে ফেলতে। কিন্তু আজ এই ছোট বাচ্চার লাশটা তাকে খুব বেশিই কাছে টানছিলো। তাদের স্যার তাদেরকে মর্গের কার্যক্রম দেখানো শেষ করে সবাইকে নিয়ে চলে যায়। তবে সোনালি যায় না। সবাই চলে যাওয়ার পরও সে মর্গে একলা একলা থেকে যায়। তার কেনো জানি সেই বাচ্চার গালে কামড় দিতে মন চাইছিলো। মর্গে তখন আর কেউ নেই। সাদা এপ্রোন পড়া সোনালী চোরের মতো চারপাশ ভালো করে দেখে সেই ছোট বাচ্চার লাশটার কাছে আসে। লাশটা বেশি পুরোনো নয়। মাত্র একদিন হয়েছে বাচ্চাটার লাশ এখানে আনার। দিনাজপুর মেইন রোডে এক্সিডেন্ট হয়ে এই বাচ্চা আর তার মা মারা গিয়েছে। বাচ্চাটার মাথায় আঘাত লেগেছে। তাই মাথা ফেটে সে মারা গিয়েছে। তবে বাকি শরীর টা একদম সাদা ধবধবে আর সুন্দর ছিলো। বাচ্চাটার বয়স ৫ কী ৬ হবে। সোনালী এগিয়ে এসে চারপাশ আরেকবার দেখেই সেই লাশের গালে কামড় বসায়। এক টানে পুরো গালের মাংস তুলে ফেলে। এই প্রথম মানব মাংসের স্বাদ নেয় সে। তার কাছে সে এ স্বাদ যেনো অমৃতের চেয়েও বেশি ছিলো। সোনালী গবগব করে মাংস টুকু খেয়ে নিয়ে বাচ্চাটার অপর গালে কামড় বসায়। সেই গালেরও মাংস ছিঁড়ে খেয়ে নেয়। তখনই মর্গে চলে আসে এক বৃদ্ধ। তিনি এই মর্গের দেখা শোনা করতেন। তার কাছে হাতে নাতে ধরা পড়ে সোনালী। তবে সোনালিকে দেখে সেই বৃদ্ধ তেমন একটা অবাক হয়নি। উল্টো বলে,

‘ মাংস খাইতে হইলে টাকা দেওয়া লাগবো। ফ্রি ফ্রি মাংস খাওয়া যাইবো না। ‘

সোনালী ভ্রু কুঁচকে তাকায়। বলে,

‘ আমার আগেও কি কেউ মাংস খেয়েছিলো নাকি? ‘

‘ খাইছিলো না। এহনো খায়। বিগত ২৫ বছর থেইকা আমার এক কাস্টমার নিয়মিত আইয়া মাংস খাইয়া যায়। তয় সবসময় আহেনা, মাসে ৩-৪ বারের মতোন আহে। ‘

‘ কে সেই লোক! যার মানুষের মাংসের প্রতি এতো লোভ যে ২৫ বছর থেকে এখানে মাংস খায়! ‘

‘ আনন্দপুরের নজরুল খাঁনরে চিনো! চিনার কতা। গ্রামে এতো বড় বড় ফার্ম গইড়া তুলছে। দিনাজপুর পুরের সবাই হেরে চিনে। হেয় এহন একটু মাংস কম খায়। তয় আগে অনেক মাংস খাইতো। ‘

সোনালী এইসব তথ্য পেয়ে যেনো আকাশ থেকে পড়ে। সে জিজ্ঞেস করে,

‘ উনি যে মাংস খান এর কোন প্রমাণ আছে আপনার কাছে ? ‘

‘ না আমার ধারে নাই। তয় হের বউয়ের ধারে গেলে পাইবা। হের বউও এইসবের লগে জড়িত। তুমি চাইলে হের থে জিগাইতে পারো এই বিষয়ে। ‘

সোনালী এইবার আরো অবাক হয়। তার বড় খালাও এইসব জানে! সোনালী বলে,

‘ তার বউও কী মানুষের মাংস খায়! ‘

‘ না। হেয় শুধু লোক জোগাড় কইরা আনতো তার স্বামীরে খাওয়ানোর লাইগা। হেয় নিজে খায় না। ‘

তখনই হঠাৎ সোনালীর কী যেনো একটা মনে পড়ে। আর সে বলে,

‘ ২০০৪ সালে আমার মা মারা গিয়েছিলো। আমার মায়ের লাশের কোন রেকর্ড কী আপনার কাজে আছে! আমার মায়ের লাশটা কী করা হয়েছিলো! ‘

‘ তোমার মায়ের নাম কী ? ‘

‘ সুরভী। সুরভী পারভিন। ‘

‘ তোমার মায়েরেও তো মনে হয় নজরুলই খাইয়া ফেলছিলো। হ হ মনে পড়ছে। তার বউ সুমনা এই কাজের লাইগাই প্রথম হসপিটালে আইছিলো। ‘

‘ মানে? সুমনা খালা, না মানে নজরুলের বউ, সে তো আমার মায়ের সেবা করার জন্য আসছিলো। ‘

‘ না। কে কইছে তোমারে। হেয় তো যাগোরে ধইরা আনতো তাগোরে ড্রাগস দিয়া দিয়া আগে অসুস্থ করতো। তারপর নিজ হাতে শাঁস রোধ কইরা মাইরা নজরুলের লাইগা রাইখা দিতো। নজরুল তারপর আইসা সুযোগ বুইজা মাংস খাইয়া যাইতো। ‘

কথা গুলো শুনে যেনো সোনালীর শরীরের রক্ত গুলো দৌড়াতে থাকে। তার মা’কে ইচ্ছা করে তার খালা মেরে ফেলেছিলো! তাও আবার তার খালুর ভক্ষনের জন্য। সোনালী সাথে সাথেই সেখানে থাকা একটা লম্বা লোহার মতো জিনিস দিয়ে বৃদ্ধের মাথায় বাড়ি মারে। সেই বৃদ্ধের উপর ঝাপিয়ে পড়ে তাকে সেখানেই নির্মম ভাবে হত্যা করে। সোনালী যেনো তখন চলে গিয়েছিলো অন্য এক সত্তায়। যেই সত্তায় ছিলো তার মায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়ার তাড়না, তাদের সাথে হওয়া একেকটা অবিচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সূচনা ঘোষণা করা। সোনালী সেদিন থেকেই বদলে যায়। বদলে হয়ে যায় অন্য এক সোনালী। যে খেতো ছোট বাচ্চাদের মাংস আর মগ্ন থাকতো খাঁন বাড়িকে ধ্বংস করার পরিকল্পনায়। 

 

সোনালী ধীরে ধীরে খাঁন বাড়িতে যাতায়াত বাড়াতে থাকে। তার খালা সুমনার সাথে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে সক্ষতা গড়ে তুলে। তার খালাও আগের জিনিস গুলো প্রায় ভুলে গিয়ে এখনকার সোনালীকে বেশ আদরই করতে থাকেন। এবং যখন তাদের সম্পর্ক একটু ভালো হয় তখন সোনালী তাকে জানায় যে সেও মানুষের মাংস খায়। শুনেছে তার খালুও নাকি খায়। কিন্তু তার খালু তো বড়দের মাংস খায়। কিন্তু বড়দের থেকে ছোট বাচ্চাদের মাংস আরো বেশি মজার। তাই সে তার খালুকে ছোট বাচ্চাদের মাংস খাওয়াতে চায়। সুমনা প্রথম প্রথম অবাক হলেও পরবর্তীতে একটু স্বস্তিই প্রকাশ করেন। কারণ নজরুল তাকে বারবার বলতো লোক জোগাড় করতে। সে মাংস খাবে। এখন যদি মাংস খাওয়ানোর দায়ভারটা সোনালী নেয়, তাইলে সে এই জ্বালা থেকে মুক্তি পাবে। সেও সোনালীকে অনুমতি দিয়ে দেয়। সোনালী তারপর একদিন ছোট বাচ্চার মাংস হালকা রান্না করে আনে। নজরুলকে দিয়ে টেস্ট করায়। নজরুলের বেশ পছন্দ হয়। ছোট্ট বাচ্চাদের মাংস গুলো অনেক নরম আর মোলায়েম ছিলো। খেতেও অনেক সুস্বাদু ছিলো। নজরুল সোনালীকে তার কাজে রাখেন। সুমনাকে বলেন সোনালীকে সবকিছু বুঝিয়ে দিতে। আর সোনালীকে কাজ দেন, সে প্রতিদিন বাচ্চা নিয়ে আসবে আর সেগুলো রান্না করে নজরুলকে খাওয়াবে। সোনালী রাজি হয়ে যায়। খাঁন বাড়ি ধ্বংসের জন্য তাকে খাঁন বাড়িতে আগে প্রবেশ করতে হতো, আর সে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যায়। সুমনা সোনালিকে বাড়ির পাতাল রাজ্য দেখায়। সোনালী আগে জানতোনা এই বাড়ির নিচে যে পাতাল পুরি আছে। সে সবকিছু দেখে বুঝে তার পরিকল্পনা ধীরে ধীরে সাজাতে থাকে। এরই মাঝে সে ডাক্তার হওয়ায় নজরুলের কথা মতো সে সুরাইয়া বেগমের শরীরেও নিয়মিত অসুধের নামে ড্রাগ পুশ করতো। সুরাইয়া বেগম পাতাল সম্পর্কে জেনে গিয়েছিলেন। আর নজরুল তাকে এমনিতেও ছোট থেকে দেখতে পারতেন না। আর এই সুযোগে সোনালী নজরুলের পথের কাঁটাকে তার কথা মতোই ড্রাগ দিয়ে, এই বাড়িতে নিজের অবস্থান আরো পাকাপোক্ত করে নেয়। পরিকল্পনা করে গঠনমাফিক। তার মনোবল ছিলো অনেক দৃঢ়। সে তার সর্বস্ব দিয়ে হলেও এই খান বাড়িকে ধ্বংস করবেই করবে। সেসময় বাড়ির ছেলেরা অর্থাৎ রায়হান আর রাফসান ঢাকায় ছিলো। সোনালী ঠিক করে সে তার রূপের জালে এই ছেলে দুইটার মধ্যে যেকোনো একটাকে বন্দি করবে। আর তারপর বাকি কাজ এগিয়ে নিবে। পরবর্তী রায়হান গ্রামে আসে। কিন্তু রায়হানের ব্যাক্তিত্ব ওরকম না হওয়ায় সোনালী প্রথম থেকেই একজন ভালো মেয়ের রূপ ধরে রায়হানের সামনে থাকতো। এদিকে সময় পেড়িয়ে যাচ্ছিলো। সোনালী ধীরে ধীরে পাতাল ঘরের সব কাজের ভিডিও করে রাখতে থাকে। এবং তখনই তার মাথায় উদ্ভট এক জিনিস আসে। সে নজরুলের সাথে খারাপ ভিডিও করে রাখার চিন্তা করে। আগে থেকেই তার কুমারীত্ব নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং কয়েকবার তার চাচাতো ভাইয়ের হাতে ধর্ষিত হওয়ায় এই চিন্তা তাকে অতটা পিড়া দেয়নি। সোনালি তার প্রতিশোধ চিন্তায় এতোটাই মগ্ন ছিলো যে সে খাঁন বাড়ি ধ্বংসের জন্য নিজের জান যদি দিতেও হয়, তাও সে পিছু পা হবে না। পরিকল্পনা অনুযায়ী সে মদের গ্লাসে উত্তেজক ওষুধ মিশিয়ে দিয়ে নজরুলকে খাওয়ায়। নজরুলকে মাতাল করে, নিজের রূপে উত্তেজিত করে তার সাথে সঙ্গম করে। আর সেই ভিডিও ধারণ করে রাখে। এরই মাঝে গ্রামে আসে রাফসান। রাফসানকেও সোনালি রায়হানের মতোই ভদ্র ভেবেছিলো। কিন্তু পরে রাফসানের নজর দেখেই সে বুঝে যায় এই ছেলেটা ছোটটার মতো ভদ্র না। তবুও সোনালি তার ভালো মেয়ের মুখোশ টা বজায় রাখে। সে দেখতে চাইছিলো রাফসান কতোদূর যেতে পারে। তারপর কিছু সময় পেরোতে না পেরোতেই রাফসান তাকে রাস্তায় উক্ত্যক্ত করতে শুরু করে। বাইক নিয়ে তার কলেজের সামনে গিয়ে লাইন মারতে থাকে। সোনালীও তার ভালো মানুষের মুখোশ টা বজায় রেখেই সব হ্যান্ডেল করে। এবং তারপরই একদিন সে খাঁন বাড়ির পেপারস হাতে পায়। সেখানে দেখে খাঁন গ্রুপের সম্পূর্ণ মালিকানা নজরুলের বড় ছেলে রাফসানের নামে করে রাখা। আর বাড়িটা রায়হানের নামে লেখা। সোনালীর মাথায় বুদ্ধি খেলে যায়। রাফসান তো এমনিই ওর উপর পাগল। আরো সে যদি রাফসানের সাথে কো অপারেট করে তাকে হাত করতে পারে, তাইলে তো সব কাজ করা তার জন্য আরো সহজ হয়ে যাবে। সোনালীও একদিন পাতাল ঘরে রাফসানকে তার আসল রূপ দেখায়। সেদিন রাফসান যা অবাক হয়ে ছিলো তার ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। তার চোখ গুলো এতো বড় বড় হয়েছিলো যেনো আরেকটু হলেই খুলে হাতে পড়ে যাবে। সোনালী রাফসানকে তার আসল রুপ দেখালেও সে রাফসানের সাথে খুব বেশি তেল দিয়ে বেড়াতো না। সে কম কথা বলতো। আর নিজের মতো একটা ভাব বজায় রাখতো। এতে রাফসান আরো বেশি তার জন্য পাগল থাকতো। তার ব্যাক্তিত্বের প্রতি পাগল থাকতো। এবং এরই মাঝে একদিন সোনালী দেখে সুরাইয়া বেগম সবকিছু নিপাকে প্রায় বলতে বলতে বলেননি। সোনালী চিন্তায় পড়ে যায়। সে নিপা একটু হলেও চিনতো। গোয়েন্দা বাড়ির মেয়ে সে। কৌতুহল বসত যদি সব খুঁজে বের করে ফেলে আর তার প্ল্যান নষ্ট হয়! এই ভেবে সে সুরাইয়া বেগমকে মারার সিদ্ধান্ত নেয়। আর সুরাইয়া বেগমের সাথে যেহেতু তার মেয়ে আলিশা থাকে সবসময়, তাই মারলে তাদের দুইজনকে একসাথেই মারতে হতো তাকে। আর সোনালী করেও তা। আলিশা আর সুরাইয়া বেগমকে খুবই নিষংশ ভাবে হত্যা করে। 

সুমনা বেগম তাকে প্রথম থেকেই রাস্তা দেখিয়ে এতোদূর আনায় তাদের দুইজনের সম্পর্ক ভালো ছিলো। তাই সুরাইয়া বেগমের মৃত্যুতে তারা দুইজনই খুশি ছিলো। এদিকে সময় পেড়োতে থাকে। তারই মাঝে রাফসান সোনালীকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। সোনালী রাফসানের সাথে কয়েকবার মিলিত হয়ে রাফসানের খুদা যেনো আরো বাড়িয়ে দিয়েছিলো। সোনালী মিলিত হওয়ার জন্য মোটা অংকের টাকা নিতো আর গোপনে ভিডিও করে রাখতো। এখন রাফসানের থেকে বিয়ের প্রস্তাব যে সে চাইছিলো না, তা না। সে চাইছিলো। বিয়ের লোভ দেখিয়ে সব যে তাকে লিখে নিতে হবে। কিন্তু রাফসান খুব তাড়াতাড়িই প্রস্তাব টা দিয়ে দিয়েছিলো। সোনালী কিন্তু এই প্রতিশোধের নেশায় তার ক্যারিয়ার নষ্ট করতে চায়নি। সে এই খান বাড়ির সবাইকে জেলে পাঠিয়ে তারপর একজন স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে, এক ভালো ডাক্তার হিসেবে সমাজে থেকে যেতে চেয়েছিলো। আর সোনালী শেষ বর্ষে ছিলো, শেষ একমাসের পরীক্ষাটা দিয়ে দিতে পারলেই আর কোন পড়ালেখার ঝামেলা নেই। তাই সোনালী এক মাস রাফসানকে অপেক্ষা করায়। এই একমাসে সোনালী সম্পূর্ণ মনযোগ তার পড়ায় দিয়ে ভালো করে পরীক্ষা দেয়। আর তাঁরপর পরীক্ষা শেষ হতেই সে নামে তার অন্তিম খেলায়। নিপাকে সে একটা কাগজ দিয়ে দেয়। ভাবে সে যদি নিজে এইসব বের করে, তখন রায়হানের সাথে তার সম্পর্ক খারাপ হবে। আর তাইলে তখন রায়হান জেলে চলে গেলে রায়হানের আর পিছু টান থাকবে না। আর এখন সবকিছু সোনালীর কন্ট্রোলের মধ্যেই ছিলো। তাই নিপাকে নকশাটা দিলেও তার তেমন কোন ক্ষতি হতো না। নিপা নকশা অনুযায়ী খোঁজ শুরু করে বেশ অনেক পরে। তবে নিপা পাতালে যাওয়ার দরজার হাতলটা আর খুঁজে পায়না। তাই সোনালী সেই হাতলটা কই আছে আর কীভাবে গোপন দরজা খুলতে হবে তা নিয়ে আরেকটা চিরকুট পাঠায়। আর পাঠায় ঠিক সেদিন যেদিন সে তার অন্তিম খেলাটা খেলতে চলেছিলো। এইদিকে রাফসানের থেকে ও সব লেখে নিয়ে নজরুলেরই এক বায়ারের কাছে মোটা অংকে ছদ্মবেশ ধরে বিক্রি করে দেয়। টাকা গচ্ছিত করে রাখে ভবিষ্যতের জন্য। নজরুলের জন্মদিনেই সে সব খেলাটা খেলতে চাইছিলো। তাই সুমনাকে সে বেঁধে নিচের পাতালে আনে। নিপাকে নকশা দেয় যাতে নিপাও পাতালে আসে। সোনালী নজরুলের দাঁড়াই তার মায়ের খুনি অর্থাৎ সুমনাকে কঠিন থেকে কঠিনতর মৃত্যু দেয়। আর তারপরই নিপার উপর হামলা চালাতে যায়। দরজার আড়াল হতে যে নিপা তাদেরকে দেখছিলো তা সোনালী জানতো। সোনালী নিপাকে ধরার জন্য ধাওয়া করে‌। সে ভেবেছিলো নিপাকেও সে হত্যা করবে নিজ হাতে। কিন্তু এই কাজে সে আর সফল হতে পারেনা। নিপা বেঁচে যায়। 

পরদিন সকালে সোনালী সব তথ্য আর পাতাল ঘরের ভিডিও তার হাত করে রাখা পুলিশ স্টেশনের কনস্টেবল নয়নের দাঁড়া পুলিশ স্টেশনে রাখে। পুলিশ খবর পায়। খান বাড়িতে ছুটে আসে সবাইকে ধরার জন্য। সোনালী ছদ্মবেশ ধরে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যায়। আর বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার বিজয় দেখে। তবে রাফসান পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে কীভাবে যেনো পালিয়ে যায়। 

সবকিছু পরিকল্পনা মতোই হয়েছে সোনালীর। এখন সে সেই ভিডিও গুলোও ছেড়ে দিয়েছে তার মুখ ব্লার করে। খাঁন বাড়ির নজরুল আর রাফসান যদি জেল থেকে পরবর্তীতে বেড়িয়েও আসে, তারা সমাজে আর ভালোভাবে থাকতে পারবেনা। উঠতে বসতে লোকজন তাদের ছিঃ ছিঃ করবে। সোনালী এখন কয়েকদিন গাঁ ঢাকা দিয়ে থাকবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরিস্থিতি শান্ত হলে সে আবার তার বাড়ি ফিরে যাবে। এতোদিন রাফসানের থেকে নেওয়া টাকা, খাঁন গ্রুপ বেঁচে পাওয়া মোটা অংকের টাকা নিয়ে আর তার বাবাকে নিয়ে শহরে চলে যাবে। সেখানে বড় বাড়ি কিনে তার বাবাকে নিয়ে থাকবে। আর ভালো দেখে এক হসপিটালে ডাক্তারের চাকরি নিয়ে সমাজে ভালো মানুষের মুখোশ ধরে রইবে। তবে সোনালি কিন্তু এখনো ছোট বাচ্চাদের মাংস খায়। এবং এটা এখন তার নেশায় পরিনত হয়েছে। এক মরণ নেশায়!!!

 

____

 

আঁধার রাত পেড়িয়ে হয় সকাল। এক নতুন অরুনোদয়ে ধরিত্রী আলোকিত হয়ে উঠে। পথ, ঘাট প্রান্তর সব যেন আবার জীবন ফিরে পায়। এক দল পাখি উড়ে যায় অর্ধ থালার মতো সূর্যের সামনে দিয়ে।‌

 

তালুকদার বাড়ি। ইসহাক তালুকদার তার ঘরের দরজা খুললেন। গাঁয়ে সেন্ডো গেন্জি। পড়নে লুঙ্গি। শরীর মোড়াতে থাকেন। চোখে মুখে ঘুম ঘুম ভাব। হাই তুলতে তুলতে বারান্দায় এসে দাঁড়ান তিনি। দুইপাশে তাকিয়ে দেখে ডাকতে থাকেন,

‘ জোহরা,,, জোহরা,,,’

আঙিনার দিক থেকে আওয়াজ আসে,

‘ কী,,, ‘

‘ উর্মি কই, আমার নাস্তা দেয়নাই ক্যান! ‘

‘ ও নাস্তা বানাইতেছে। তুমি ফ্রেশ হয়ে নেও যাও। ‘

ইসহাক সাহেব হাই তুলতে তুলতে বলেন,

‘ ঠিক আছে,, ঠিক আছে। সকাল সকাল এক কাপ চাও দিতে আসেনা। কিসব কাজের লোক আমার। ‘

বলেই শরীর মোড়াতে মোড়াতে এগিয়ে চলে যেতে থাকেন বারান্দার বেসিনের দিকে। লুঙ্গিটা দুইহাত দিয়ে ভালো ভাবে গিট্টু দিতে থাকেন। তার যাওয়ার পর পরই ঘরের দরজার সমান সমান থাকা জানালায় কারো দাঁড়ানোর ছায়া পড়ে। লোকটা এগিয়ে এসে জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়ায়। সেটা লোক ছিলোনা। ছিলো একটা মেয়ে। মেয়েটা জানালার গ্রিল ধরে ঘরের ভিতরটা ভাল ভাবে দেখতে থাকে। এবং দেখতে দেখতে তার চোখ যায় আলমারির দিকে। এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকে সে সেদিকে। মেয়েটা আর কেউ ছিলোনা। ছিলো সেই সখিনা ভাঙারিওয়ালি ছদ্মবেশে আসা শিমলা আক্তার মোনালিকা!!!

 

চলবে ,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

 

( সোনালীর ইতিহাস জানার পর আপনার মনে কী কথা উদয় হচ্ছে তা কমেন্টে জানাতে পারেন। পরবর্তী পর্বও আজই পোস্ট করা হয়েছে। লিংক কমেন্টে 👇)

 

গল্প নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা করুন আমার গ্রুপে।

গ্রুপ লিংক 👇

https://www.facebook.com/groups/743016887019277/?ref=share_group_link

 

উপন্যাস :: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন :: ২(মুখোশ)

পর্ব :: ৮৪

লেখক :: মির্জা সাহারিয়া

 

উপন্যাস :: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন :: ২(মুখোশ)

পর্ব :: ৮৫ (🟢বোনাস পর্ব🟢)

লেখক :: মির্জা সাহারিয়া 

 

২ দিন পর,

৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০

 

রাত ৯ টা। দুইপাশে সাড়ি সাড়ি গাছ। মাঝ দিয়ে চলে গেছে এক রাস্তা। জোছনা রাত, এক ব্যাক্তি হেঁটে আসছে সেই রাস্তা দিয়ে। হাতে বাটন ফোনের টর্চ লাইট। সেই আলোতেই রাস্তা দেখে দেখে হাঁটছে সে। জঙ্গল থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। লোকটার এক হাতে একটা ব্যাগ। গ্রাম-গন্জে বাজারের ব্যাগ হিসেবে যেই ব্যাগ গুলা পরিচিত সেই ব্যাগ। আর আরেক হাতে নেট ব্যাগের ভিতর কিছু ফলের প্যাকেট। লোকটার পড়নে লুঙ্গি। একটা পুরান শার্ট। মুখে দাঁড়ি-মোছ। গালে একটা বড় তিল। লোকটা আর কেউ নয়। রায়হান নিজেই। রায়হান এখন কাজ নিয়েছে দিনাজপুরের এক ফার্নিচারের দোকানে। লালু-সালু যেই দোকানে কাজ করে সেই দোকানে। মতিন মেম্বারের চামচা শৈশবের পরিচিত লালু-সালু। শিউলি বেগম শৈশবকে বলায়, শৈশব লালু-সালুর মাধ্যমে রায়হানকে ফার্নিচারের দোকানে একট কাজ নিয়ে দেয়। রায়হান আর নিপা এখন নিলগিরি জঙ্গলের শেষ মাথায় একটা থাকা কাঁচা কুড়েঘরে‌ থাকে। নিলগিরি জঙ্গলের প্রবেশ পথ সেই চৌড়চকে। আর জঙ্গল শেষ হয়ে যেখান থেকে রাস্তাটা বের হয়েছে সেখানেই রাস্তার পাশে এক ছোট কুড়েঘরে তারা থাকে। কুড়েঘরের খোঁজ দিয়েছিলো ফুলমতি। এই গ্রামে আগে এক বুড়ি থাকতো এই কুড়েঘরে। পরে সেই বুড়ি মারা যাওয়ায় এই কুড়ে ঘর টা একদম ফাঁকাই পড়ে থাকে। আর নিলগিরি জঙ্গলের রাস্তা পাড় করে এদিকটায় কোন লোক আসেনা। এদিকটা একদম নিরিবিলি। তাই এই ঘর টাকেই রায়হান আর নিপা বেছে নিয়েছে তাদের নতুন বসবাসের জন্য। মতিন মেম্বার তার মেয়েকে রায়হানের সাথে ছাড়তে নারাজ ছিলেন। পরবর্তীতে শিউলি বেগমের বোঝানোয় তিনি অনুমতি দেন। 

 

রায়হান রাস্তাটা দিয়ে হেঁটে হেঁটে জঙ্গল থেকে বেড়িয়ে আসে। জঙ্গল থেকে এদিকটায় বেড়োলেই রাস্তার ডান সাইডে তাদের কুড়েঘর টা। এই রাস্তাটা একদম সোজা চলে গিয়ে মেইনরোডে উঠেছে। তবে মেইন রোড দিয়ে এদিকটায় কেউ আসেনা। এদিকের জমি গুলোও ফাঁকা পড়ে আছে। ফসল হয়না এদিকটায়। বলা যায় একদম নির্জন, নিরিবিলি একটা যায়গা।

রায়হান এসে তাদের কুড়েঘরের সামনে দাঁড়ায়। কাঠের দরজায় কড়া নাড়ে। ভিতর থেকে নিপার আওয়াজ আসে,

‘ কে!! ‘

‘ সুবা, আমি। ‘

‘ তুমি কে! ‘

‘ তোমার জামাই গো সুবা। রায়হান ‘

‘ রায়হান নামে আমি কাউকে চিনিনা। আপনি চলে যান। ‘

‘ তাড়িয়ে দিচ্ছো বউ! ‘

‘ হ্যা দিচ্ছি। রাত বিরাতে মেয়েধরা ছাড়া কী আর কেউ আসে! আপনি নিশ্চয়ই মেয়েধরা। ‘

‘ হ্যা আমি মেয়েধরা। এখন দরজাটা খুলে দেও। তোমাকে তুলে নিয়ে যাই। ‘

নিপা হাসতে থাকে। হাসতে হাসতে দরজা খুলে দেয়। রায়হানও ম্লিন হাসে। নিপার পড়নে এক স্বাধারণ শাড়ি। ফুল হাতা ব্লাউজ। নিপা রায়হানের হাত থেকে ব্যাগ দুটো নেয়। একটা ব্যাগে ছিলো ফার্নিচারের দোকানের যন্ত্রপাতি। আরেকটা ব্যাগ উঁচিয়ে দেখতে দেখতে নিপা বলে,

‘ এটা কি ! ‘

‘ ফল। আঙ্গুরফল। শীত তো চলেই যাচ্ছে। এই সিজিনে এই শেষ আঙ্গুরফল। ‘

‘ টাকা,,,! ‘

‘ চিন্তা করোনা। আজকের দিনের টাকাটা দিয়েই কিনেছি। আজকে ৫০০ টাকা পেয়েছিলাম। ঐটার মধ্যে থেকে ২০০ টাকার আঙুর নিছি আর বাকি টাকার সদাই পাতি। ‘

‘ এতো দাম দিয়ে আনার কি দরকার ছিলো। ‘

‘ শখের বয়সে শখ পূরণ করতে হয়, পড়ে একসময় টাকা থাকবে ঠিকই। কিন্তু এখনকার মতো আনন্দ থাকবে না। ‘

‘ হমম। মন্দ বলোনাই। আসো, ভিতরে আসো। ‘

নিপা রায়হানকে নিয়ে ঘরের ভিতরে আসে। ঘর টা কাঠের তৈরি। ঘরের চালা খড়ের। এই কুড়ে ঘরে একটাই রুম। রুমের একপাশে একটা বিছানা। বিছানা টাও কাঠ দিয়ে কোনরকমে বানানো। তারপর ঘরের মাঝে একটু ফাঁকা যায়গা রেখে দেয়ালের দিকে একটা রেক, আর একটা কাঠের আলমারির মতো বড় বক্স। নিপা রায়হানকে নিয়ে ভিতরে এসে দাঁড়ায়। হাতের ব্যাগ দুইটা রেকের পাশে রেখে দেয়। রায়হান গামছা দিয়ে শরীরে ঘাম মুছে থাকে। নিপার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে ও। নিপা ব্যাগ দুটো রেখে উঠে দাঁড়িয়ে বলতে বলতে আসে,

‘ হাত মুখ ধুয়ে নেও। আমি ভাত,,, হাসতেছো  ক্যানো! ‘

‘ এমনিই। ‘

‘ এমনি! এমনি কেনো হাসতেছো! আমি আগেও দেখছি, তুমি ওবাড়িতে থাকতেও বাসায় আসে আমাকে দেখেই মুচকি মুচকি হাসো। আমার চেহারা কী দেখতে সংয়ের মতো! ‘

‘ না। আমি হাঁসি কারণ, তোমার মুখশ্রী আমাকে দিনশেষে এক প্রশান্তির খুশি এনে দেয়! ‘

‘ বাব্বাহ! বউকে পটানোর তো ভালোই কৌশল জানা আছে তোমার! ‘

‘ আরে না সত্যি সুবা। তোমাকে দেখলে আমার সারাদিনের ক্লান্তি একনিমিষেই দূর হয়ে যায়‌। সারাদিন তোমাকে মিস করি। ভাবি কখন কাজ শেষ হবে, কখন রাত ৮ টা বাজবে আর আমি তোমার কাছে ছুটে আসবো। ‘

‘ বউকে চোখে হারাইতেছো দেখি একদম! ‘

‘ হারাবো না! আমার কি ১০ টা বউ নাকি! বউ তো আমার একটাই। এই একটা বউয়ের জন্য আমার ভিতরটা যা উথাল-পাতাল করে, তা আর কারো জন্যই করে না। ‘

‘ হইছে আর মিষ্টি মিষ্টি কথা বলা লাগবে না। যাও হাত মুখ ধুয়ে আসো। আমি খাবার বাড়তেছি। ‘

‘ টিউবওয়েল টা চলতেছে ঠিক মতো! ‘

‘ হ্যা চলে। আজকে শৈশব আর ফুলমতি আসছিলো। ওরা নাটবল্টু সব ঠিক করে দিয়ে গেছে। ‘

‘ আচ্ছা আমি হাত মুখ ধুয়ে আসতেছি। তুমি তাড়াতাড়ি ভাত বাড়ে ফেলো। ‘

বলেই রায়হান গামছা কাঁধে নিয়ে কুঠির থেকে বেড়িয়ে যায়। কুঠিরের পিছনেই একটা পুরনো টিউবওয়েল আছে। যেই বুড়িটা থাকতো তার জন্য গ্রাম বাসী বানিয়ে দিয়েছিলো। এখন তা রায়হান-নিপাদের কাজে লেগে যাচ্ছে! নিপা চলে যায় ঘরের রেকের দিকে। ভাত-তরকারি এনে বাড়ার জন্য। 

 

বেশ কিছুক্ষণ পর,,,

 

মেঝেতে রায়হান আর নিপা খেতে বসেছে। নিপা একহাতে প্লেটের নিচে দিয়ে তুলে ধরে খাচ্ছে। রায়হান ফ্লোরে প্লেট রেখেই খাচ্ছে।  রায়হান খেতে খেতে বলে,

‘ রান্না তো আজকে দারুন হইছে! তুমি রান্না করছো নাকি! ‘

‘ হমম। আমার হাতের রান্না তো ওবাড়িতে খাওই নাই। রান্নাঘরেই তো আমাকে যাইতে দিতানা। ‘

‘ আজকে কোথায় রান্না করলা! বাড়ি গেছিলা নাকি! ‘

‘ না। ফুলমতি আর শৈশব যে আসছিলো, ওরাই বাড়ির পিছনে একটা মাটির চুলা বানায় দিয়ে গেছে। কিছু লাকড়িও আনে দিছে। ঐখানেই রান্না করছি। ‘

‘ মাছ দেওনা আরেকটা। ‘

‘ আর দুইটা আছে। কাল সকালে খাইয়ো! (একটু থেমে) নেও, আমার টা নেও। ‘

বলেই নিপা তার পাতের মাছ টা তুলে দিতে যায়। রায়হান বলে উঠে,

‘ না না। তুমি খাও। তোমার এখন শরীরে পুষ্টির দরকার। ‘

‘ কেনো! আমি কী পোয়াতি নাকি! ‘

‘ পোয়াতি না। কিন্তু হইতে আর দেরি কই! হি হি হি! ‘

নিপা রায়হানের পায়ে দুম করে কিল বসিয়ে দেয়। 

‘ ওহো মা। তোমার হাতের মাইর গুলা অনেক লাগে বউ! ইশশ্ পায়ের মাংস গুলা পচেঁ গেছে মনে হয়! ‘

‘ সবসময় দুষ্টামির কথা বললে এমনই মাইর খাবা। ‘

‘ বউ আমার ঘরের ফৌজদারি। দেশ ১৯৭১ এ স্বাধীন হইলেও আমি এই ঘরে পরাধীন। ‘

‘ তুমি পাকিস্তান, আমি বাংলাদেশ। ব্যাস। তুমি পরাধীন, আমি স্বাধীন। ঝামেলা মিটমাট। ‘

‘ তুমি বহুত ডেন্জেরাস আছো। এতোদিন তোমাকে দেখে বুঝি নাই তুমি যে আসলে ধানী লংকা। ওহ্ মা। পা টা এখনো ব্যাথা করতেছে। ‘

‘ একটু আধটু জামাইকে টাইট দিতে হয়। নাইলে বিগড়ায় যাবে। নেও খাও এখন। রাতে ঘুমানোর সময় পায়ে তেল মালিশ করে দিবো। ‘

‘ খালি পায়েই তেল মালিশ করবা! **** খানেও করিও। ‘

‘ তাইলে ঐখানে একটা কিল দেই! কিল ছাড়া মালিশ করে মজা আছে নাকি! ‘

‘ হায় হায় না না। আমার বংশের বাতি নিভাইতে চাও নাকি! আমার মালিশ লাগবেনা বাপু। আমি এমনিই ঠিক আছি। ‘

নিপা হাসতে থাকে। রায়হান চুপচাপ মাথা নিচু করে। কোনমতে ভাত গিলতে থাকে। নিপা দেখি এখন তার উপরেই শাসন কায়েম করা শুরু করে দিছে। নিপা হাসি থামাতে থামাতে রায়হানের পাতে মাছের ঝোল তুলে দেয়। তখনই রায়হান নিপার গালে টুস করে একটা চুমু দেয়। নিপার মুখ হা হয়ে থাকে। ঝোল দেওয়া শেষ করে আরো দু-চারটা কিল বসিয়ে দেয় রায়হানের পায়ের রানে। রায়হান তো ব্যাথায় ভাত ছেড়েই ফ্লোরে গড়াগড়ি খেতে থাকে। নিপা হাসে। বেশ সুন্দর একটা সময় কাটে তাদের।

 

       নিপা জানালার একপাশ টা বসে আছে। জানালা গুলা কাঠের হওয়ায়, জানালার ফ্রেমটা বেশ মোটা। বসার উপযোগীই বলা যায়। আর জানালা গুলা নিচু। নিপার তো মাত্র কোমড় অব্দি। আর উচ্চতার দিক দিয়ে বেশ বড়। তাই বসা যায়। নিপা জানালার একসাইডে বসে হেলান দিয়ে দূরের আকাশে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। আকাশে আজ জোছনা পড়েছে। গোলগাল চাঁদ তার বন্ধুসঙ্গী হাজারো তারা নিয়ে ঝলমলিয়ে উঠেছে। চাঁদের জোছনা আলো এসে পড়েছে নিপার ম্লিন মুখশ্রীতে। এই ঘরে কারেন্ট নেই। মোমবাতি, আর কুপির আলোই সম্বল। 

রায়হান এসে দাঁড়ায় জানালার সামনে। নিপা রায়হানের দিকে না তাকিয়েই এক দৃষ্টে আকাশের দিকে চেয়ে থাকে। রায়হান জানালার অপর সাইডে হেলান দিয়ে নিপার দিকে তাকায়। দুই হাত কোলে ভাঁজ করে ধরে। এক দৃষ্টে চেয়ে থাকে নিপার দিকে। নিপা নজর ফেড়ায়। রায়হানের দিকে তাকায়। ম্লিন গলায় বলে,

‘ কী দেখছো! ‘

‘ তোমাকে! ‘

নিপা আবার আকাশের দিকে তাকায়। বলে

‘ আকাশ টা আজ অনেক সুন্দর তাই না! ‘

রায়হানও আকাশের দিকে তাকায়। আবার নিপার দিকে ফিরে একনজরে চেয়ে বলে,

‘ হমম সুন্দর। কিন্তু তোমার বিচরণে, আমার আকাশ এর চেয়েও বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠে! ‘

‘ আমার বিচরণ! আমি তোমার আকাশে বিচরণ করে বেড়াই! ‘

‘ হমম। অবশ্যই। তোমার একেটা পদধ্বনি আমার বুকের স্পদনের সাথে মিলিত হয়ে ভালোবাসার শব্দ সৃষ্টি করে। ‘

নিপা আবার আকাশের দিকে তাকায়। বলে,

‘ এই ছোট্ট কুঠুরির সুখী জীবন টা কেমন লাগছে! ‘

‘ আমার কাছে তুমি থাকলেই হলো। বাকি যা যেমন থাকে থাকুক। তুমি কাছে আছো মানে আমার কাছে সবকিছুই স্বর্গস্বরুপ। ‘

নিপা রায়হানের দিকে তাকায়। বলে,

‘ আর তুমি, তুমি কাছে থাকা যে আমার কাছে নশ্বর এই দুনিয়ায় অবিনশ্বর শান্তি এনে দেয়। ভালোবাসা এতোটা রঙিনও হয়! ‘

‘ সঠিক মানুষটার সাথে জনম-জনম থাকলে, এই ইহকালেও স্বর্গ সুখ অনুভব করা যায়। (একটু থেমে) তোমায় দেখার শেষ হবেনা দুচোখ বোজার আগে, আকাশ হয়ে জড়িয়ে রব গভীর অনুরাগে।  ‘

রায়হান এক দৃষ্টে তাকায় নিপার দিকে। নিপার চোখের থেকে যেনো তার চোখ সড়ছেই না। নিপাও তাকিয়ে আছে। যেনো তারা দুজন চোখের ভাষায় অনেক অনুভূতির প্রকাশ করে ফেলছে। নিপার চোখ দুটো জোছনা আলোতেও চিকচিক করে উঠছে। নিপা বলে,

‘ চোখে চোখে এতো কথা বলো, মুখে তো কিছু বলোনা! ‘

‘ চোখের ভাষায় যার সাথে কথা বলা যায়, তার সাথে হাজারো মনব্যাক্ত চোখে চোখে ভাগাভাগি করে নিতে দোষ কী! ‘

‘ আমার চোখে এমন কি আছে, যা আর কারো চোখে নেই! ‘

‘ তোমার ঐ নয়ন দুটি আমার আকাশের শুকতারা, যা দেখে হয়ে যাই আমি বারংবার দিশেহারা। এই দিশেহারাটা আমি তোমা ছাড়া আর কোথাও পাই না! ‘

‘ কলুষিত করছো! ‘

‘ ভালোবাসার অন্তরে কলুষ বলতে কিছুই থাকেনা। যা থাকে, সবই পূর্ণের ভাটা। ‘

নিপা আকাশের দিকে তাকায়। বলে,

‘ তুমি কাব্যিক এক কবি। ‘

‘ এই কবির কবিতারা শুধু তোমাকে ঘিরেই রচনা হয়। ‘

‘ রচনারা আবর্তিত হয়ে সারাজীবন রয়ে যাক! ‘

রায়হান এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বলে,

‘ রইবেই তো। এই রচনারা কখনোই ক্ষান্ত হবে না। বহমান নদীর মতো বইতেই থাকবে। তুমি আবার জন্ম নিও, আমি আবার তোমার প্রেমে পড়বো। ‘

‘ পুনর্জন্ম! আমি যদি পরের জন্মে তোমায় চিনতে না পারি! ‘

‘ স্রোতোসিনী বলে ডাকবো তোমায়, চিনে নিও এই একটি আমায়! ‘

‘ বাব্বাহ! ছন্দ বলতে পারোতো বেশ! ‘

‘ সবই তোমায় নিয়ে। ‘

‘ গান ধরবে একখানা! ‘

‘ ধরবো বলছো! তাইলে ধরি। কিন্তু কোনটা গাইবো! ‘

‘ তোমার মনে যেটা আসে। আমার তো তোমার সব গানই ভালো লাগে। ‘

‘ আচ্ছা তাইলে এইটাই গাই। ‘

নিপা ভ্রু উচিয়ে রায়হানের দিকে ফিরে চায়। বলে,

‘ কোনটা! ‘

রায়হান গান ধরে। সুরের মঞ্চনায় নিপাকে নিয়ে হারিয়ে যায় এক নতুন দুনিয়ায়। যেই দুনিয়ায় সে আর প্রিয়তমা ছাড়া কেউ নেই। তাল ও ল’য়ের বাঁধনে বাঁধে এক বহমান বর্তমানকে। নিপা উজ্জ্বল দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে চেয়ে শুনে রায়হানের গান। 

 

আমি চেয়ে চেয়ে দেখি সারাদিন

আজ ঐ চোখে সাগরেরও নীল

আমি তাই কি গান গাই কি

বুঝি মনে মনে হয়ে গেল মিল 

,

,

 

কবরীতে ঐ ঝরঝর কনক চাঁপা

না বলা কথায় থর থর অধর কাঁপা 

তাই কি আকাশ হল আজ

আলোয় আলোয় ঝিলমিল

 

আমি চেয়ে চেয়ে দেখি সারাদিন

আজ ঐ চোখে সাগরেরও নীল

আমি তাই কি গান গাই কি

বুঝি মনে মনে হয়ে গেল মিল

,

,

 

এই যেন নয়গো প্রথম

তোমায় যে কত দেখেছি

স্বপ্নেরও তুলি দিয়ে তাই

তোমার সে ছবি এঁকেছি

 

মৌমাছি আজ গুনগুন দোলায় পাখা

যেন এ হৃদয় রামধনু খুশিতে মাখা

তাই কি গানের সুরে আজ

ভরে আমার রিনিকিন

 

আমি চেয়ে চেয়ে দেখি সারাদিন

আজ ঐ চোখে সাগরেরও নীল

আমি তাই কি গান গাই কি

বুঝি মনে মনে হয়ে গেল মিল,,,

 

গান শেষ হতেই নিপার পাশে এসে দাঁড়ায় রায়হান। নিপা তার বুকে মাথা রেখে হেলান দেয়। এক জোনাকি পোকা তার আলো জেলে উড়ে উড়ে আসে জানালার কপাটে বসে‌। দূরের কিছু গাছের লতা হাওয়ায় নড়ে উঠে। আকাশের চাঁদকে পাহারা দিতে খন্ড খন্ড কিছু মেঘ জড়ো হয় তার চারপাশে। রায়হান নিপার মাথায় সিঁথিতে চুমু খায়। জড়িয়ে ধরে নিপাকে। নিপা স্বীয় সত্বাকে খুঁজে পায় আরো এক নতুন রূপে। দূর জঙ্গল থেকে ভেসে আসে নিশিরাত খ্যাত ডাহুক পাখির কুহু কুহু আওয়াজ। হারিয়ে যায় দুই আত্মা, সুদূর এক অজানায়। 

 

____

 

নতুন সকালে অর্ধ থালার মতো জেগে উঠে নতুন এক সূর্য। পাহাড়ের আড়াল হতে টুকি দিয়ে মেঘের সাথে লুকোচুরি খেলতে থাকে। পাহাড়ের গাঁয়ে পশমের ন্যায় গড়ে উঠে চা বাগান গুলো শ্রমিকের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠে। 

 

শাহারিয়া ওয়াশরুম থেকে বের হলো। খালি গায়ে আছে সে। নিচে শুধু ট্রাউজার। সময় এখন সকাল ৭ টা। হালকা রোদ আর সাথে ভোরের ঠান্ডা বাতাসের বহমান, সব মিলিয়ে প্রকৃতি আজ দারুন। শাহারিয়া হেঁটে হেঁটে এগিয়ে আসে বিছানার কাছে। তার ফোনটা চার্জে দেয়। দিথী নিচে রান্না ঘরে নাস্তা বানাচ্ছে। আহনাফ চলে যাওয়ায় এখন এ বাড়ি একদমই ফাঁকা বলা যায়।শাহারিয়া ফোন চার্জ দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। শরীর মোড়াতে থাকে। তার শরীরে ছোট ছোট লাল লাল দাগ গুলো এখনো দিথীর হিংস্র এক সত্ত্বার অস্তিত্বের প্রমাণ হিসেবে রয়ে গেছে। সাথে নখের দাগে তার শরীর যেনো ডোরাকাটা সাপের মতো দেখাচ্ছে। শাহারিয়া এগিয়ে যায় ব্যালকনি বারান্দার দিকে। ব্যালকনির দরজাটা ধরে খুলতেই নিবে তখনই নিচ থেকে কোন কিছু পড়ার আওয়াজ আসে। কাঁচের কিছু ভাঙার আওয়াজ। আর সাথে সাথেই দিথীর জোড়ে এক চিৎকার দিয়ে কান্না। শাহারিয়া হঠাৎ এমন কিছু শুনে হকচকিয়ে যায়। দিথীর কিছু হয়ে যায়নি তো!  তৎক্ষণাৎ শাহারিয়া দৌড় দেয়। ঘরের দরজা এক টানে খুলে দৌড়ে বেড়িয়ে যায়।

 

   দিথী হাতে ফোন ধরে রয়েছে। ডায়নিং টেবিলের পাশে একটা চেয়ার ধরে দাঁড়িয়ে সে কাঁদছে অঝোর ধারায়। পাশেই দুটো ভাঙা প্লেটের টুকরো পড়ে আছে। শাহারিয়া পিছন থেকে সিড়ি বেয়ে হন্তদন্ত হয়ে নামছে। নেমেই সে ছুটে আসে দিথীর দিকে। বলতে থাকে,

‘ বউজান, বউজান কী হয়েছে তোমার। ‘

দিথী শাহারিয়াকে দেখেই তাকে জড়িয়ে ধরে। জোড়ে জোড়ে কাঁদতে থাকে। তার হাতে ফোন। শাহারিয়া দিথীর হঠাৎ কান্নার কারণ বুঝতে পারেনা। মেয়েটা এভাবে পাগলের মতো কাঁদছে কেনো! শাহারিয়া বলতে থাকে,

‘ বউজান। বউজান কেউ এসেছিলো! কি হয়েছে, তুমি এভাবে কাঁদছো কেনো! ‘

দিথী কাঁদতে কাঁদতে বলে,

‘ বাবা, বাবা আর নেই। বাবা আর নেই। ‘

‘ আঙ্কেলের কি হয়েছে। উনি নেই মানে! ‘

দিথী আর কিছু বলতে পারে না। শাহারিয়ার কোল আঁকড়ে ধরে পাগলের মতো কাঁদতে থাকে। শাহারিয়া দিথীর হাত থেকে তার ফোনটা নেয়। ফোনে এখনো কেউ হ্যালো হ্যালো করছিলো। শাহারিয়া তাড়াতাড়ি ফোনটা কানে তুলে। বলতে থাকে,

‘ হ্যালো হ্যালো। ‘

ওপাস থেকে সামিহার কান্না ভেজা গলা পাওয়া,

‘ দুলাভাই, দুলাভাই আব্বু আর নাই। আব্বু, আব্বু মারা গেছেন। ‘

‘ ইন্নালিল্লাহ ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন। কখন, কীভাবে হইলো! ‘

ওপাস থেকে সামিহা কান্না ভেজা গলায় বলে,

‘ আজ ভোরে, আজ ভোরে আব্বু মারা গেছেন। উনার শরীরের রোগ গুলো বেড়ে গেছিলো। আজ রংপুর নিয়ে যাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু তার আগে, তার আগেই,,,! ‘

সামিহার কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায়। আরো কতকগুলো কান্নার আওয়াজ ফোনের অপর প্রান্ত হতে আসে। সামিহা আবার কান্নারত অবস্থায় বলে,

‘ দুলাভাই, আপুকে একটু দেখিয়েন। পারলে আপুকে নিয়ে চলে আসুন। ‘ 

‘ হ্যা আমি আছি। আচ্ছা আমি দিথীকে আনন্দপুরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। ও ওর বাবাকে শেষ দেখা দেখুক। ‘

‘ আপনি আসবেন না! ‘

‘ আমি! আমার আজকে জরুরি একটা কাজ আছে, তাই আসতে পারছিনা। দিথী যাচ্ছে। ও যাচ্ছে। ‘

‘ ঠিক আছে দুলাভাই। আপু অনেক কাঁদছে মনে হয়। আপুকে একটু সামলিয়ে রাখিয়েন। ‘

‘ আ, আচ্ছা ঠিক আছে। ‘

শাহারিয়া ফোনটা কান থেকে নামিয়েই কেঁটে দেয়। এদিকে দেখে দিথী কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে। শাহারিয়া দিথীকে ধরে সামনে নিয়ে তার গাল ধরে তাকে জাগাতে থাকে। 

‘ দিথী, দিথী,, এই দিথী। ‘

শাহারিয়া দিথীকে ধরেই একটা চেয়ারে বসে। গ্লাস থেকে কোনমতে একটু পানি নিয়ে দিথীর মুখে ছিটিয়ে দেয়। আবার আরেকটু পানি নিয়ে ছিটায়। দিথীর চোখের পাতা নড়ে উঠে। দিথী চোখ খুলতে থাকে‌। আবারো কান্নায় ভেঙে পড়ে। শাহারিয়াকে জড়িয়ে ধরে জোড়ে জোড়ে কাঁদতে থাকে। ‘ আব্বু,, আব্বু,,’ বলে চিৎকার দিতে থাকে। দিথীকে শান্ত করার চেষ্টা করে শাহারিয়া। দিথী একপ্রকার পাগলই হয়ে গেছে কাঁদতে কাঁদতে। হওয়ারই কথা। ছোট থেকে তার বাবাই যে তার সব ছিলো। সেই বাবার মৃত্যু তাকে পিড়া দিবে এটাও তো স্বাভাবিক। শাহারিয়া দিথীকে ধরে শান্ত করতে থাকে। তাকে বলতে থাকে,

‘ দিথী, দিথী পাগলামি করে না। দিথী,, শান্ত হও দিথী। আল্লাহ উনাকে নিয়ে গেছেন দিথী। কান্না করিও না। শান্ত হও। ‘

‘ আব্বু আমাকে ছাড়ে যাইতে পারে না। আব্বু,,, আব্বু,,, না,,, আমার আব্বু যাইতে পারে না। আব্বু,,, ‘

দিথী পাগলের মতো বিলাপ বকতে বকতে কাঁদতে থাকে। শাহারিয়া যতটা সম্ভব তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে। এমন করলে দিথীকে একলা কীভাবে ছাড়বে ও। নিজেও তো বাইরে যেতে পারবে না। তার ড্রাইভারকে পাঠাতে হবে দিথীর সাথে। তাছাড়া আর কিছুই করার নেই শাহারিয়ার হাতে। শাহারিয়া দিথীকে শান্ত করার চেষ্টা করে। এদিকে উপরের ঘর থেকে তার ফোন বাজার আওয়াজ আসতে থাকে। কিন্তু শাহারিয়া দিথীকে ছেড়ে যায়না। সে দিথীকে জড়িয়ে ধরে তার পিঠিতে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে তাকে সান্ত্বনা দিতে থাকে। দিথী শাহারিয়াকে জড়িয়ে ধরে জোড়ে জোড়ে কাঁদতে থাকে। বাবা হারানোর পর যেনো এই শাহারিয়াই তার দুনিয়ার এক মাত্র আপন কেউ। দিথী শাহারিয়াকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। তার কান্নায় যেনো পুরো বাড়ি ভারি হয়ে উঠে। দূরের আকাশও মেঘে-মেঘে ছেয়ে যায়।

 

____

 

দুপুর বেলা। রোদের তেজ নেই। উল্টো হালকা ঠান্ডা বাতাস বয়ে যাচ্ছে মাঝে মাঝে। 

মতিন মেম্বার বারান্দার দরজার সামনে দাঁড়ালেন। মাথায় টুপি পড়ে নিতে থাকেন। পিছনে এসে দাঁড়ান শিউলি বেগম। মুখ কালো তার। মতিন মেম্বার পিছনে ফিরে শিউলি বেগমকে বলেন,

‘ বাদ যোহর চেয়ারম্যান সাবের জানাজা। আমি গেলাম। তুমি বাইত্তে থাইকো। বাইর হইয়ো না। ‘

‘ শাহারিয়ারা কী আইবো ? ‘

‘ ফোন-টোন‌ তো দেয় নাই। আইলে দেখাতেই পাইবা। আফাজরে কইলাম আমার লগে চল, আইলো না। তোমার ভাইয়ের মতো জেদ অর। ‘

‘ হইছে ঐসব কথা বাদ দেও। শাহারিয়া ফোন দিলে শৈশবরে দিয়া খবর পাঠাইয়ো‌। রান্ধন-বারনে একটা ব্যাপার আছে। ‘

‘ আইচ্ছা ঠিক আছে। গেলাম আমি। ‘

মতিন মেম্বার বারান্দার সিড়ি বেয়ে নিচে নামেন। চলে যেতে থাকেন আঙিনা পেড়িয়ে বাড়ির গেইটের দিকে। শিউলি বেগম চলে যান ভিতরে। এক দখিনা হাওয়া এসে আঙিনার রশিতে থাকা কাপড় গুলোকে দুলিয়ে দিয়ে চলে যায়। 

 

____

 

কানিজ কানে ফোন উঠায়। তার হাতের আঙুলের নানা রঙ-বেরঙের আংটি গুলো ঝলমল করে উঠছে। সে বারান্দার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে সুদূরে কিছু পাহাড় দেখা যাচ্ছে। ফোনটা ওপাসের লোক তুলে। কানিজ বলে,

‘ হ্যালো,,! ‘

‘ হ্যালো, আসসালামুয়ালাইকুম ম্যাডাম। আপনে যা কইছিলেন ঐ অনুযায়ী সব কাম হইয়া গেছে। ‘

‘ গুড। টাকাটা তুমি তোমার ব্যাংক একাউন্টে পেয়ে যাবা। আর, তুমি যে আমাদের সাথে আছো, তা যেনো কেউ ঘুনাক্ষরেও জানতে না পারে। ‘

‘ জ্বী অবশ্যই ম্যাডাম। কেউ জানবো না। ‘

‘ হমম। ঠিক আছে। ‘

কানিজ কান থেকে ফোনটা নামায়। তার চোখের সানগ্লাস টা খুলে দূরের পাহাড়ের দিকে তাকায়। তার ঠোঁটের কোনে ফুটে ওঠে এক রহস্যময় হাসি,,,!

 

___

 

রংপুর মেডিকেল কলেজ। সময় বিকাল ৫ টা। একটা স্টেচারে করে ইকরাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আই সি ইউ বেডের দিকে। রিয়াদ, ইকরার মা, বানু খালা তিনজনই স্টেচারের সাথে সাথে স্টেচার ধরে দৌড়ে যাচ্ছেন। ইকরা আজ সকাল থেকে কথা বলছে না। তার হার্ট রেট কম। ব্রেইন স্ট্রোক হওয়ার আশংকা করছে ডাক্তারেরা। তাই তাকে তাড়াতাড়ি স্বাধারণ বেড থেকে আই সি ইউ বেডের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। রিয়াদের চোখে পানি। ইকরার মা, বানু খালা তারা সবাই কাঁদছেন। ইকরার মুখে অক্সিজেন মাস্ক। রিয়াদ ইকরার দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারছেনা। তার ভিতর টা ব্যাথায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে। সে চায়না ইকরাকে এতো তাড়াতাড়ি হারাতে। তাদের পথ টা কী আরেকটুও দীর্ঘ হবে না!

আইসিইউ কেবিনের সামনে এনেই ওয়ার্ড বয় আর নার্সরা ইকরার স্টেচার টাকে নিয়ে ভিতরে চলে যায়। তবে রিয়াদ আর বাকিদের ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হয়না। রিয়াদ বাইরে দাঁড়িয়ে দরজার ছোট্ট কাঁচের গোল অংশ দিয়ে ভিতরের ইকরাকে দেখতে থাকে। খুব কান্না পাচ্ছে তার। ইকরাকে তবে কী সে হারিয়ে ফেলবে! হারিয়েই ফেলবে চিরকালের জন্য!! নীল শাড়িতে ইকরা, বৃষ্টি ভেজা সেই দিনটা, এক গুচ্ছ কদম হাতে ভিজতে থাকা দুজন। সবই কী এক টুকরো অতীত হয়েই রয়ে যাবে রিয়াদের জীবনে!

 

_____

 

রাত ৯ টা। নিলগিরি জঙ্গলের মাঝের পথটা দিয়ে হেঁটে আসছে রায়হান। পড়নে লুঙ্গি আর পুরান শার্ট। মুখে দাঁড়ি-মোছ লাগানো। একহাতে কারখানার যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ সেই ব্যাগ। আরেক হাতে ফ্লাশ জালানো বাটন মোবাইল। আজ আকাশ মেঘলা। মাঝে মাঝে শো শো করে বাতাস বয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় থাকা পলিথিন গুলো উড়ে উড়ে রাস্তার এক পাশ থেকে অন্য পাশে চলে যাচ্ছে। জঙ্গলটাকেও বেশ ভয়ানকই লাগছে আজ। তবে রায়হান ভয় পাচ্ছে না। সে ভূত বা অলৌকিক কিছুতে বিশ্বাসী নয়। রায়হানের মাথায় চলছে অন্য চিন্তা। আজ বিকালে যখন সে ফার্নিচারের কারখানায় কাঠ মাড়াইয়ের কাজ করছিলো তখন কেউ একজন এসে তাকে একটা গিফট বক্স দেয়। তবে রায়হান সেটা তখন খুলে দেখেনি। ভেবেছে হয়তোবা তার কোন বন্ধুর বিয়ের বিষয়ের কার্ড আছে সেই বক্সে। বক্সটাও খুব ছোট ছিলো। এই ধরুন দুইটা জ্যামিতি বক্স পাশপাশি রাখলে যতটা হয়, ততটা। তাই রায়হান তখন বেশি না ভেবে বক্সটা তার ব্যাগে রেখে দিয়েছিলো। কিন্তু এখন সেটা তাকে ভাবাচ্ছে। বক্সটা ছোট থাকলেও বেশ ভারি ছিলো। আর কোন বন্ধুই বা তাকে বিয়ের কার্ড পাঠাতে পারে! ঢাকার এক বন্ধু অবশ্য আছে, যার বিয়ে হওয়ার কথা চলছিলো। কিন্তু সে কীভাবে খোঁজ পেলো যে রায়হান ঐ ফার্নিচার কারখানায় কাজ করে! তার এই কাজের বিষয় টাতো মেম্বার বাড়ির সদস্যরা, নিপা আর লালু,সালু ছাড়া কেউ জানেনা! আর সে তো শক্ত এক ছদ্মবেশ ধরেই চলে, তাকে এতো সহজে তো কারো চিনার কথা না। তাইলে কী তার বন্ধু এই বক্সটা পাঠায় নি! 

না। রায়হান আর বেশি চিন্তা করতে পারছেনা। তাকে দেখতেই হবে বক্সের ভিতর কি আছে। আদেও সেটা বিয়ের ইনভাইটেশন কার্ড না অন্য কিছু। রায়হান থেমে যায় রাস্তার মাঝেই। হেলে ব্যাগটা নিচে রাখে। পিচ ঢালা রাস্তা হলেও পুরান হওয়ায় রাস্তায় তেমন ধার নেই। রায়হান তার ব্যাগ টা সামনে নিয়ে একহাত দিয়ে আলো দেখাতে দেখাতে আরেক হাত দিয়ে ভিতরের যন্ত্র পাতি গুলা সড়িয়ে সেই বক্সটা খুঁজতে থাকে। বক্সটা একদম ব্যাগের তলানিতে ছিলো। সব যন্ত্রপাতি সড়িয়ে সে বক্সটা বের করে। হালকা কাঠের ধুলা-ময়লা পড়েছে বক্সটার উপর। রায়হান বক্সের উপরে ফু দিয়ে ধুলা ঝেড়ে নেয়। ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে দেখতে থাকে। বক্সের উপর কোন নাম বা কোন চিহ্ন নেই। পুরো বক্সটাই কালো। রায়হান বক্সটা খোলার চেষ্টা করে। মোটা পেপার বোর্ডের তৈরি বক্সটা। এক হাতে খুলতে না পাড়ায় সে মোবাইল টা মুখে দুই ঠোট দিয়ে চেপে ধরে। তারপর দুইহাত দিয়ে খুলার চেষ্টা করে বক্সটাকে। বেশ শক্ত ভাবেই লাগানো ছিলো বক্সটা। তবুও রায়হান দ্বিতীয় বারের চেষ্টায় বক্সটা খুলতে পারে। রায়হান বক্সের ভিতর তাকায়। সাথে সাথে তার চোখ মুখ বড় বড় হয়ে যায়। তখনই দূরে এক বড় বাজ পড়ার শব্দ ভেসে আসে। বক্সের ভিতরে ছিলো একটা বন্দুক! রায়হান তার অতীত অধ্যায় ছেড়ে দেওয়ার সময় যেই বন্দুক টা ফেলে দিয়েছিলো এক ময়লার ভাগাড়ে, এটা সেই বন্দুক। রায়হান চোখ বড় করে সামনে তাকায়। তার বন্দুক টা আবার তাকেই পাঠালো কে! বন্দুকের সাথে বক্সে দেওয়া ছিলো দুই রাউন্ড গুলি। রায়হানের হাত থেকে বক্সটা পড়ে যায়। তার হাত পা কাঁপছে। এই শীতের রাতেও কপাল বেয়ে ঘাম ঝড়ে পড়ছে। তখনই সে দেখতে পায় একটা চিরকুট। বক্সটা হাত থেকে নিচে পড়ে যাওয়াতে বন্দুকটা বক্স থেকে বেড়িয়ে এসেছিলো। আর সেই বন্দুকের নিচেই ছিলো চিরকুট টা। রায়হান ভয়ে ভয়ে হাত বাড়িয়ে চিরকুট টা উঠায়। তার হাত কাঁপছে। ভয়ে সারা শরীর যেনো অবশ হয়ে আসছে। মোসাদ তার অবস্থান সম্পর্কে জেনে গেছে। এবার কী হবে! 

রায়হান চিরকুট টা হাতে ধরে থাকে। এক ঢোক গিলে। কাঁপো কাপো হাতে চিরকুটের ভাঁজ খুলে। সেখানে কম্পিউটার টাইপ করে কিছু লেখা ছিলো। রায়হানের পড়ার সাহস হচ্ছে না। তার ভিতর টা ভয়ে বারবার শুকিয়ে যাচ্ছে। গলা-মুখ সব যেনো মরুভূমির মরিচিকার মতো পানি শুন্য হয়ে পড়ছে। রায়হান চিরকুট টার দিকে তাকায়। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ রেখে আবার চোখ খুলে। পড়তে শুরু করে প্রথম থেকে।

 

রায়হান,,,

কী খবর তোমার। মোসাদ থেকে বেড়িয়ে গিয়ে তো মনে হয় ভালোই জীবন-যাপন করছো, তাই না! নিলগিরি জঙ্গলের শেষে কুঠির নিছো, দিনাজপুরে ফার্নিচারের দোকানে কাজ নিছো। বেশ সাদামাটা জীবনে চলে গেছো। 

খুব সাহস বেড়ে গেছে না! যে মোসাদ থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করো! মোসাদ থেকে বেড়োনো কী এতোই সহজ! তুমি কি তাদের পরিণতি দেখোনাই, যারা মোসাদ থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছিলো! তাদের প্রত্যেককে ঠিকই আমরা খুঁজে বের করে নির্মম মৃত্যু উপহার দিয়েছি! তারপরও মোসাদ থেকে বেড়োনোর চেষ্টা করতে, তোমার একটাবারও বুক কাঁপলো না! 

বউ তোমাকে সাহস জুগিয়েছে, তাই না! এখন এই সাহসই যে তোমার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়াবে! সেটার জন্য কে দায়ী থাকবে! তোমার বউ! না তোমার বিবেক! না তুমি নিজেই! 

খুব বড় ভুল করে ফেলেছো রায়হান! খুব বড় ভুল। আর মোসাদকে যে ভুলের মাশুল কীভাবে দিতে হয়, জানোতো! মৃত্যু দিয়ে। নির্মম, যন্ত্রানদায়ক মৃত্যু দিয়ে। 

তবুও, এতোদিন তুমি আমাদের সাথে কাজ করেছো। তোমাকে মারতে আমাদেরও ভালো লাগবে না। তাই আমি, এই সিমরান। তোমাকে একটা ছোট্ট  সুযোগ দিচ্ছি। এই সুযোগ টা কাজে লাগালে, তুমি বাঁচবে। আর না লাগালে! নিজের মৃত্যুর জন্য নিজেই দায়ী থাকবে!

ভাবছো তোমাকে বন্দুক দিয়ে বলবো আবার ফিরে আসতে। হ্যা, তা তো বলবোই। কিন্তু এই মোসাদ থেকে বেড়োনোর যে তুমি অপচেষ্টা করেছো, তার জন্য ছোট্ট একটা মাশুল তো দিতেই হবে! 

বন্দুকের সাথে দুই রাউন্ড গুলি দেওয়া আছে। এই দুই রাউন্ড গুলি বন্দুকে লোভ করে, কী করতে হবে তোমায় জানো! তোমার বউ, নিপা। তাকে খুন করতে হবে! যদি তুমি খুন করতে পারো! তাইলে তুমিও বেঁচে যাবে। আমিও তোমাকে মাফ করে দিবো, মোসাদও তোমাকে মাফ করে দিবে। আর তারপর আবার তুমি আমাদের সাথে যুক্ত হয়ে আগের মতো কাজ করে মোটা অংকের টাকা কামাবে। বড়লোক জীবন যাপন করবে। 

আর যদি তুমি নিপাকে খুন না করো, তাইলে আমাদের মোসাদের লোক গিয়ে তোমাকে আর তোমার নিপা, দুইজন কেই তুলে নিয়ে আসবে। তোমাকে বেঁধে তোমার চোখের সামনেই মোসাদের সব ছেলেরা একে একে তোমার নিপাকে ধর্ষণ করবে। খুব খারাপ ভাবে, ব্রুটালি ধর্ষণ করবে। নিপা মৃত্যু যন্ত্রনায় চিৎকার করবে, তোমার কাছে সাহায্যের জন্য আকুতি মিনতি করবে। কিন্তু হাত-পা বাঁধা তুমি, তাকে এই অবস্থায় দেখা ছাড়া আর কিচ্ছু করতে পারবেনা। কিচ্ছু না। ভাবছো ধর্ষণ করেই তোমার নিপাকে ছেড়ে দেওয়া হবে! এতোটাও ভালো নয় এই মোসাদ। তোমার নিপাকে পালা ক্রমে ধর্ষণের পর, তার শরীরের চামড়া তুলে ফেলা হবে। কাঁটা ঘায়ে লবণ-হলুদ ছিটালে কেমন হয় জানোতো! ঠিক তেমন টাই হবে তোমার নিপার দেহ থেকে চামড়া ছিলার পর। ভাবছো তারপরই ছেড়ে দেওয়া হবে! না রায়হান, এতো তাড়াতাড়ি না। তোমার নিপাকে তোমার চোখের সামনেই কেটে, ছোট ছোট হাজারো টুকরা করা হবে। আর তুমি, এক নিরব দর্শক হয়ে তোমার প্রিয়তমার নির্মম মৃত্যু দেখবে। তোমার প্রিয়তমার আহাজারি, বাঁচার জন্য আকুতি মিনতি সব তোমার জন্য পুরস্কার হিসেবে থাকবে।‌ নিপার শরীর কেটে ফেলার পর, তোমাকে আমরা ছেড়ে দিচ্ছিনা রায়হান। তোমার শরীরের এক প্রান্ত একটা গাড়ির সাথে বেঁধে অপর প্রান্ত আরেক গাড়ির সাথে বেঁধে, গাড়ি দিয়ে টেনে ছিঁড়ে তোমাকে এক বিভীষিকাময় মৃত্যু উপহার দেওয়া হবে। যা মোসাদ আর কাউকেই এই পর্যন্ত দেয়নি। 

 

কী চাও এখন! নিপাকে নিজ হাতে মেরে মোসাদের সাথে থেকে একটা সুন্দর জীবন পেতে! নাকি নিজের প্রিয়তমাকে নিজের চোখের সামনে নির্মম ভাবে মরতে দেখে, নিজেও এক বীভৎস মৃত্যুর সাক্ষী হিসেবে নিজের প্রাণ দিতে! 

তোমার হাতে সময়, মাত্র ৪৮ ঘন্টা। সিদ্ধান্ত নিতে বেশি দেরি করে ফেলো না কিন্তু রায়হান! মনে রেখো, তোমার এই সিদ্ধান্তের উপর তোমার বাঁচা মরা, আর নিপার নির্মম অথবা ভালো মৃত্যু নির্ভর করছে। 

তো কী, রেডি তো রায়হান! মোসাদের সাথে করা ভুলের মাশুল দিতে! Your time, Start now!!!

 

ইতি,

তোমার প্রিয় ম্যাডাম,

সিমরান

 

চলবে ,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

 

( কী হতে চলেছে এরপর! গল্প কোন দিকে মোড় নিবে! আপনার মতামত জানাতে ভুলবেন না কিন্তু! আর আমার সামনে পরীক্ষা। ঈদের পর পরই পরীক্ষা তাই এখন একটু পড়তে হবে। এখন পরীক্ষা ঈদের পরে তা জানি, কিন্তু এই অকর্মা আমি এটাও শিওর জানিনা যে পরীক্ষা কয় তারিখ। কেউ বলে ৩, কেউ বলে ১৫। তো যদি এখন ৩ তারিখে পরীক্ষা হয়, তবে আমি একদম পরীক্ষা শেষ করে তারপর গল্পের বাকি পর্ব নিয়ে হাজির হবো, আর যদি ১৫ তারিখ বা তার পরে হয়, তাইলে এই মাসেরই ২৮ তারিখ থেকে পর্ব দেওয়া শুরু করবো। গল্পটা ১০০ পর্বে বা তার আগেই শেষ হবে। আর আমি এরপর যখনই পর্ব দেওয়া শুরু করিনা কেনো, তখন সপ্তাহে ৫ দিন করে পর্ব দিবো। আর তাড়াতাড়িই গল্পটা শেষ করে ফেলবো। আমি পরীক্ষা শেষ করেই গল্পে ফিরে আসবো। এতোদিন যেভাবে আমাকে সাপোর্ট দিয়েছিলেন, আশাকরি তখন ফিরে আসলেও একই ভাবে দিবেন 😿❤️। দোয়া করবেন, এই হতভাগা আমি যেনো পরীক্ষাটা ভালোভাবে দিতে পারি। আর গল্প কেমন হচ্ছে তা কমেন্টে জানাইয়েন ❤️

 

গল্প নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা করুন আমার গ্রুপে।

গ্রুপ লিংক 👇

https://www.facebook.com/groups/743016887019277/?ref=share_group_link

 

উপন্যাস :: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন :: ২(মুখোশ)

পর্ব :: ৮৫

লেখক :: মির্জা সাহারিয়া

 

উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন:: ২(মুখোশ)

পর্ব:: ৮৬

লেখক:: মির্জা শাহারিয়া

 

রাতের প্রথম প্রহর। ঘড়িতে ১২ টা পেড়িয়েছে। বাইরে থেকে মাঝে মাঝে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে। দূরের শেয়ালের ডাকও ক্ষীণ হয়ে কর্ণপর্দায় ধরা দিচ্ছে।

দিথী তার বাবার ঘরে বসে আছে। কারেন্ট নেই। বিছানায় একটা ছোট্ট প্লেটের উপর মোমবাতি রাখা। সেই আলোতেই ঘরেই আংশিক আলোকিত হয়েছে। দিথী আর মোমবাতির মাঝের ফাঁকা যায়গাটায় ছিলো কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পুরোনো ছবি। দিথী ছবি গুলো হাতড়ে দেখছে। তার ডুকরে কেঁদে উঠার শব্দ এই নিস্তব্দ রুমের মাঝে প্রতিফলিত হচ্ছে। ছবি গুলো ছিলো তার ছোটবেলাকার। ছবিতে ৫ বছর বয়সী ছোট্ট দিথী, ও তার বাবা মা। তিন জনের হাসিমুখ, পাশপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দিথীর ভিতরের ব্যাথাটাকে আরোও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিকেলে দিথীর বাবার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। জানাজা পড়ানো হয়। দিথী কাছে যেতে পারেনি। দূর হতে দাঁড়িয়ে দেখেছিলো, আর ভুগেছিলো এক নিদারুণ অনুশোচনায়। কাঁদতে কাঁদতে তার চোখের পানি শুকিয়ে এসেছিলো। তবুও ভিতরের কষ্টরা নিম্নধারায় বয়নি।

 

দিথী ছবি গুলোর মাঝ থেকে একটা ছবি হাতে নেয়। ছবিতে ছোট্ট দিথী তার বাবার কোলে। তার বাবার পাশে শাড়িতে দাঁড়ানো তার মা। মা’কে সে হারিয়েছে অনেক আগে, আজ তার বাবাকেও হারালো। নিঃস্ব হতে আর কিইবা বাকি রয়েছে তার। একজন মেয়েকে তার বাবা যতটা আদর করে, যতটা স্নেহ দিয়ে বড় করে, তা হয়তো এই জগতে এই সম্পর্ক টাকে সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্ক হিসেবে আখ্যায়িত করতে যথার্থ। ছোট থেকে সৎ মায়ের জ্বালা থেকে বাঁচানোর জন্য দিথীকে তার নানু বাসায় রেখে আসা, প্রতি সপ্তাহে দু-তিন বার গিয়ে দেখে আসা, ছোট্ট দিথীর নানা আবদার পূরণ। সবই এখন এক অতীতের কাল-কুঠুরিতে আবদ্ধ। দিথী ছবিটা বুকের সাথে জড়িয়ে নেয়। ডুকরে কেঁদে উঠে। কান্নার আওয়াজ নেই। চোখের পাতা পানি বহাতে অপারগ। সব যে শুকনো নদীতটের মতো শুকিয়ে গিয়েছে। দিথী ছবিটা উঠিয়ে চুমু খেতে থাকে। আবার বুকে জড়িয়ে নেয়। মোমবাতির আগুনের শিখা মৃদু নড়ে উঠে। দিথীর ছায়াটাও দেয়ালে কিছুটা নড়ে উঠে। দিথী ছবিটা বুক থেকে নামিয়ে দেখতে থাকে। ছবিটায় হাত বুলিয়ে দেয়। ভেজা কন্ঠে বলে, ‘ মা, তুমি আমায় আর কেনো দেখা দেও না মা। আমি তোমায় এখন কেনো অনুভব করতে পারি না। বাবা, চলে গেলে আমায় একা রেখে। আমাকে নিঃস্ব করে দিয়ে গেলে। (একটূ থেমে) পাপ কখনো পিছু ছাড়ে না। পাপি তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত বোধহয় এভাবেই দেয়। নিজের প্রিয়জনদেরকে হারিয়ে, তাদের যন্ত্রনায় ছটফট করতে করতে। জানো বাবা, এই নিঃস্ব আমার এখন শেষ সম্বল বলতে শুধু ওই আছে। ঔ কী হারিয়ে যাবে! আমি ওকে এখন সত্যিই আপন কেউ ভাবি বাবা। নিজের আত্মাকে তার মধ্যে সঁপে দিয়েছি আমি। তার নিঃসঙ্গতা, আমাকে পিড়া দিচ্ছে। আমার কষ্টের দাবানল, আমাকে জ্বালিয়ে ছাড়খাড় করে দিচ্ছে। আমি কী ওকেও হারিয়ে ফেলবো। বলোনা বাবা। আমি কী পাবোনা একটা সুন্দর জীবন! এই দুনিয়া কী এভাবেই আমাকে নিঃসঙ্গ করে নিঃশেষ করে দিবে! (চোখ মুছে) পাপ কখনো পিছু ছাড়েনা, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা ছাড়া এই পাপীস্ঠ জীবন আমায় ছাড়বে না। আমায় ছাড়বে না।’

দিথী ছবিটাকে বিছানায় রেখে কেঁদে উঠে। বিছানা জোড়ে জোড়ে ঘুষি মারে। উপরে মুখ করে জোড়ে কেঁদে উঠে। হঠাৎ যেনো হতাশা, বিষন্নতা সব ঘিড়ে ধরেছে তাকে। আষ্টেপৃষ্ঠে জাপটে ধরেছে। দিথী পাগলের মতো কাঁদতে থাকে। তখনই ঘরে হন্তদন্ত হয়ে প্রবেশ করে সামিহা। দৌড়ে বিছানার কাছে আসতে আসতে বলে, ‘ আপু, আপু কি হয়েছে তোর। আপু। ‘

বিছানায় এসে সামিহা দিথীর পাশে বসা মাত্রই দিথী সামিহাকে জড়িয়ে ধরে। পাগলের মতো হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। সামিহা বিষয়টাকে স্বাভাবিক ভাবেই নেয়। দিথীর নিজের বাবা, জন্মদাতা পিতা আজ মারা গেছে। এমন উন্মাদ হওয়াটা দিথীর জন্য এখন স্বাভাবিকই বটে। সামিহা দিথীকে শান্ত করতে থাকে। তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে তাকে শান্তনা দিতে থাকে। দিথী কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে বলে উঠে, ‘বাবা। আমায় ক্ষমা করে দিও বাবা। আমায় ক্ষমা করে দিও।’

‘ কাদিস না। কিচ্ছু হয়নি। কাঁদিস না।’

সামিহার চোখও ভিজে আসে। এতোক্ষণ সে নাজিয়া বেগমকে সামলে তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে আসলো, এখন দিথীর এমন পাগলামী করছে। ছোট্ট নিবিড়কে পাশের বাড়ির প্রতিবেশীরা নিয়ে গেছেন। তাদের বাসায় ঘুম পাড়িয়ে দেওয়ার জন্য। বাড়ির পরিবেশ আজ সকাল থেকেই ভারি হয়ে আছে। সামিহা খুব কষ্টে নিজে সামলে রেখেছে, শক্ত রেখেছে। তবে দিথীর এমন উন্মাদ ক্রন্দন তার শক্ত হ্রদয়টাকে বোধহয় আর বেশিক্ষণ শক্ত থাকতে দিবেনা।

 

বিষন্ন আকাশের চাঁদ চলে যায় মেঘের আড়ালে। প্রকৃতিতে আজ নিস্তব্ধতায় ছায়া। দূরের কোন এক জঙ্গল থেকে কিছু শিয়ালের একত্রে ‘হুক্কা হুয়া’ ডাক ভেসে আসে।

 

_______

 

প্রভাত ফেরীর গান গেয়ে রাস্তা দিয়ে এক সাইকেলে চলে যায় এক দুধওয়ালা। আকাশে উঠেছে নতুন দিগন্ত রাঙানো অগ্নিপিন্ড। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ে চলে যায়। মাঠের পর মাঠ একে একে রঙীন হয়ে উঠছে এক রঙের ফেড়িওয়ালার রংতুলিতে।

 

মেম্বার বাড়ি। আর পাঁচটা সকালের মতোই আজকের সকাল টাও মেম্বার বাড়ির লোকদের জন্য স্বাধারণ। মতিন মেম্বার বারান্দার দরজা দিয়ে বের হয়ে আঙিনায় নেমে চলে যেতে থাকেন তার কাজে। পড়নে আজও পান্জাবি আর কুর্তা। শিউলি বেগম বাড়ির উত্তর কোনে ছোট্ট কুঠার দিয়ে কিছু লাকড়ি কাটছেন। সুমু নাস্তার প্লেট নিয়ে রান্না ঘর থেকে বেড়িয়ে আঙিনায় আসে। পিছনে ফিরে শিউলি বেগমকে বলে,

‘ মা, নাস্তা নিছি এক প্লেট। ‘

শিউলি বেগম লাকড়ি কাটতে কাটতে বলেন,

‘ তোর সাথী খালা উঠছে! ‘

‘ হ্যা মা। উনি ফ্রেশ হয়ে টেবিলে বসছেন। ‘

‘ তাইলে তোর খালার প্লেট টাও লইয়া যা। ‘

‘ এই প্লেট টাই খালার জন্য নিয়ে যাচ্ছি। ‘

‘ ও আইচ্ছা। আর ঐ ফাজিল ডি উডছে না নাই! ‘

‘ ফুলমতি আপু গেছে ওদের ডাকতে। ‘

‘ ভালা। তুইও নাস্তা নিয়া খাইয়া নে। ‘

‘ আচ্ছা মা। ‘

সুমু সামনে ফিরে হেঁটে চলে আসে বারান্দার সামনে। জুতো খুলে বারান্দায় উঠে চলে যায় হাতের ডান দিকের ডায়নিং টেবিলের দিকে। 

ঘরের পর্দা সড়িয়ে ঘুম ঘুম চোখ নিয়ে বের হয় লায়লা। তার পিছন পিছন বের হয় হনুফা। হনুফা আগের মতোই হাওয়ায় ভেসে চলছে।‌ তাদের দুইজনের চোখ মুখ দেখে মনে হচ্ছে এখনো ঘুমই ভাঙেনি। তারা হেঁটে হেঁটে চলে যায় ফ্রেশ হতে। ঘরের ভিতর থেকে বেড়িয়ে আসে ফুলমতি। এদের দুইজনকে প্রতিদিন সকালে ডাকতে ডাকতে তার গলার অবস্থা কাহিল। মসজিদের মাইকের মতো এদের দুইজনের কানের সামনে বয়ান না দিলে এদের যেন সকালের ঘুমই ভাঙে না!

 

সুমু বারান্দায় উঠে টেবিলের দিকে যেতে থাকে। তখনই আফাজ দরজা খুলে তার ঘর থেকে বের হয়। আফাজ সুমুকে দেখেও না দেখার ভান করে এগিয়ে গিয়ে বারান্দার রশি থেকে নিজের মুজা গুলা নেয়। সুমু দাড়িয়ে যায়। নিজে থেকেই আফাজকে বলে,

‘ কোথাও যাবেন! ‘

আফাজ কিছু বলে না। সুমু আবার বলে,

‘ নাস্তা করেনিন। আমি নাস্তা এনে দিচ্ছি! ‘

‘ পরে খাবো। ‘

‘ সকাল সকাল কোথায় যাচ্ছেন। আপনি তো এখনো পুরোপুরি সুস্থ নন। ‘

‘ আমি কোথায় যাচ্ছি না যাচ্ছি তার কৈফিয়ত তোমায় দিতে হবে নাকি! যে কাজে যাচ্ছিলা যাও। ‘

সুমু মাথা নিচু করে নেয়। আফাজ সবসময় সুমুকে কষ্ট দিয়ে কথা বলে। সুমুর খুব খারাপ লাগে এই জিনিসটা। সুমু চলে যায় ডায়নিং টেবিলের দিকে।

আফাজ মুজা গুলো নামিয়ে বারান্দায় থাকা একটা চেয়ারে বসে পড়ে নিতে থাকে। তখনই শিউলি বেগম শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে এসে বারান্দায় উঠেন। আফাজকে মুজা পড়তে দেখে বলেন,

‘ কোথাও যাইতাছো! ‘

আফাজ মুখ না তুলেই বলে,

‘ হ্যা। শৈশবকে নিয়ে একটু পুলিশ স্টেশনের দিকে যাবো। ‘

‘ খাইয়া যাও। ‘

‘ এসে খেয়ে নিবো ফুফু। ‘

‘ তোমার মা’য়ে আইজ সকালে ফোন দিছিলো। ইকরার অবস্থা বলে খুব সিরিয়াস। তোমারে রংপুর যাইতে কইছে। ‘

‘ হ্যা আমাকেও ফোন দিয়ে বলেছিলো। কিন্তু আমি আজ যাবোনা। আগে থানায় গিয়ে যানবো আলিশার খুনের তদন্ত কতদূর, তারা পাড়বে না আমাকে মাঠে নামতে হবে এই ফয়সালা না করা অব্দি আমি আনন্দপুর ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না। ‘

‘ ইকরা কিন্তু তোমার বোন লাগে। আপন বোন। জীবন মৃত্যুর দাড় প্রান্তে আছে অয়। পড়ে আফসোস কইরো না। ‘

বলেই শিউলি বেগম তার ঘরের দিকে চলে যান। শিউলি বেগমের শেষ কথাটা আফাজের কাছে একটু অন্যরকমই ঠেকে। আফাজ মাথা তুলে শিউলি বেগমের চলে যাওয়াটা দেখে। আলিশার জন্য ও এতোটা উন্মাদ হয়ে গেছে যে নিজের বোনকে পর্যন্ত দেখতে যাচ্ছেনা! আসলেই তার বোনের যদি কিছু হয়ে যায়! আফাজের ভাবনায় বাগড়া দিয়ে বারান্দার সামনে এসে দাঁড়ানো শৈশব বলে উঠে,

‘ ভাইজান। আমি আইছি। ‘

আফাজ ভাবনার জগত থেকে বেড়িয়ে আসে। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। আজ থানায় গিয়ে এদিকের অবস্থা আগে বুঝবে তারপর রংপুর যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিবে। এই চিন্তা মনে মনে করে এসে বারান্দার দরজার সামনে দাঁড়ায় আফাজ। শৈশবকে বলে,

‘ ছাতা নিতে হবে! বৃষ্টি নামবে কী! ‘

‘ না ভাইজান। (আকাশের দিকে তাকিয়ে) আকাশের এই হালকা মেঘে কিছু হইবো না। আপনি আহেন। ‘

আফাজ বারান্দার দরজার কোন থেকে তার ‘শু’ গুলো পড়ে নেয়। নেমে চলে যায় শৈশবের সাথে। 

 

সুমু সেদিক থেকে ফিরে তাকায় সাথী বেগমের দিকে। সাথী বেগম ডায়নিং টেবিলের চেয়ারে বসে আছেন। সামনে সেমাই আর পিঠার বাটি। সাথী বেগম সুমুকে তার দিকে ফিরতে দেখে বলেন,

‘ তুমি খাবা না! ‘

‘ আমি পড়ে খেয়ে নিবো। আঁখি কোথায়! ‘

‘ ও একটু গোসলখানার দিকে গেছে। ‘

‘ এতো সকাল সকাল গোসল! ‘

‘ আজকে ওর তারিখ। সকালে উঠতে উঠতে দেরি করছে। কাপড় নাপাক হয়ে গেছে। ‘

‘ ওহ। পরোটা নিবেন! রান্না ঘরে আছে‌। নিয়ে আসি! ‘

‘ না না। আমার বেশি তেলের জিনিস খাওয়া নিষেধ আছে। শিউলি কী ঘরে গেলো! ‘

‘ হ্যা। মা ঘরে। কেনো! ‘

‘ আমার সাদিক আর উনি জেল থেকে ছাড়া পেলো কি না। কিছুই তো খবর পেলাম না। ‘

‘ চিন্তা করবেন না। বাবা গেছেন দিনাজপুর পুলিশ স্টেশনে ওসির সাথে কথা বলতে। ওরা নির্দোষ প্রমাণিত হলে অবশ্যই পুলিশ তাদের ছেড়ে দিবে। ‘

‘ আমারা ছেলেকে আমি চিনি মা। ও এসব কাজ করতেই পারে না। আর তোমার খালুও অনেক সহজ সরল। উনি তো ছোট থেকেই রক্ত দেখলে ভয় পান। উনি কীভাবে মানুষ মারতে পারেন বলো তুমি! ‘

সুমু এক লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বলে,

‘ হয়তো তারা নির্দোষ। ছাড়াও পেয়ে যাবেন। তবে, তবে আমার উনি। উনি তো শাস্তি পাচ্ছেন। বিচ্ছেদের যন্ত্রনা, শাস্তির থেকে তো কম নয়! আর আমাকেও অবহেলা করছেন। শত্রু না হয়েও আমাকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবছেন। ‘

‘ তুমি আফাজকে ভালোবাসো! ‘

সুমু মৃদু হাসে। বলে,

‘ বিরহ ডোরে তো আমি তাকে খুব যতনেই বেঁধেছি। শুধু উনিই আমার মুখাপেক্ষী নন। ‘

‘ আলিশা না আসলে হয়তোবা তুমিই তার জীবন সঙ্গী হতে! ‘

সুমু সাথীর কথা শুনে ম্লিন হাসে। বলে, 

‘ কিছু কিছু জিনিস কল্পনাতেই সুন্দর। যেমন আমার প্রতি তার আবেগ, আর আমার তার প্রতি এক মুঠো ভালোবাসা। দিনশেষে বাস্তবতা আমাদের দুজনকে দুই তীরে এনে ফেলেছে। যেই দুই তীর হয়তো কোন এক দিন, নীরব রেখায় মিলিত হবে। আর সেই দিনটার দিনানিপাত আমি প্রতিটি প্রহরেই করে যাই। এক নতুন প্রহরী হিসেবে। ‘

সুমু চেয়ার থেকে উঠে। চলে যায় নিজের ঘরের দিকে। সাথী বেগম কথা গুলোর মর্মার্থ বুঝতে পারলেও, তিনি নীরব দর্শক হিসেবেই নিজেকে এই নাট্যমঞ্চে সাবিশ করেছেন। সামনে ফিরেন তিনি চামচ উঠিয়ে সেমাই খেতে থাকেন।

 

দূরের কাঁঠাল গাছ থেকে দুটো পাখি উড়ে যায় দুটো অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।

 

______

 

দুপুর ১২ টা। রোদ্রের খাড়া তাপে আবহাওয়া বেশ উত্তপ্ত। বাতাসে বয়ে বেরাচ্ছে গরম আভা।

 

নিয়াসিন ফার্নিচার এন্ড ‘স’ মিল। দিনাজপুরের ফার্নিচার পট্টির বেশ ভালো আর নাম করা ফার্নিচার দোকান। দোকানের ভিতরে একদিকে কাঠ মাড়াই করা হয়, অন্যদিকে কাঠকে পলিশ ও সংযোজন করে বিভিন্ন কাঠের আসবাবপত্র বানানো হয়। কাঠ মাড়াই করার মেশিনের দুই পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে দুইজন। একজন কাঠটাকে কেটে অপর পাশে পাঠাচ্ছে। আর অপর পাশের জন তা সংগ্রহ করে নিচে রাখছে। কাঠ কাটার কাজটা করছিলো রায়হান। যদিও তাকে চিনার জো কারো নেই। মুখে দাঁড়ি-মোছ, পড়নে লুঙ্গি আর একটা সাধারণ শার্ট। শার্টে কাঠের ময়লা লেগে আছে। রায়হান অন্যমনস্ক হয়ে কাঠ মাড়াই করছে। তার চোখে মুখে হাজারো চিন্তার ভাঁজ। কাঠ মাড়াই মেশিনের অপর প্রান্তের লোক রায়হানকে উদ্দেশ্য করে জোড়ে বলে উঠে,

‘ কিও মিয়া। তাড়াতাড়ি করোনা। এডি সেকশনে পাডাইতে হইবো তো। সময় নাই। তাড়াতাড়ি হাত চালাও। ‘

রায়হানের ঘোর কিছুটা ভাঙে। সে তাড়াতাড়ি কাঠ গুলো মেশিন দিয়ে সাইজ মতো কেটে কেটে অপর পাশে পাঠাতে থাকে। ঘামে গাল-মুখ তার ভিজে একাকার। বড়লোক বাড়ির ছেলে হয়ে হঠাৎ এসব কায়িক পরিশ্রমে থেতু হওয়া মোটেই সহজ কথা নয়! 

 

লালু এসে রায়হানের পিছনে দাঁড়ায়। সে আর সালু এই কারখানাতেই ফার্নিচার সংযোজন আর কাঠ সমান করার কাজ করে। সালু এখন ঐদিকেই কাজ করছে। তবে লালু এখানে এসে দাঁড়িয়েছে অন্য এক কারণে। সে রায়হানের কাঁধে হাত রেখে তাকে ডাকে,

‘ রফিক ভাই। রফিক ভাই। একটু হুনেন তো। ‘

রায়হান পিছনে ফিরে তাকায়। তার ছদ্মনাম রফিক। সালু তার হাতে থাকা একটা সাদা বক্স রায়হানের দিকে এগিয়ে দেয়। বলে,

‘ এইডা আপনারে একজন দিতে কইলো। ‘

রায়হান হাতের ময়লা কিছুটা ঝেড়ে বক্সটা হাতে নেয়। পিছন থেকে তখনই লোকটা হাঁক দিয়ে উঠে,

‘ আরে মিয়া আবার কি হইলো! এমন করলে কী সময়মতো কাম শ্যাষ হইবো! ধ্যাত! ‘

রায়হান সামনে ফিরে লালুকে বলে একটু ঐদিকটা দেখতে। লালু মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলে চলে যায় রায়হানের কাজ টা করতে। রায়হান বক্সটা হাতে নিয়ে পিছনে মুখ করে হাঁক দিয়ে বলে,

‘ দুলাল ভাই। আমি একটু পানি খাইয়া আইতাছি। লালু ততক্ষনে আমার কাম ডা কইরা দিবো। ‘

‘ যাও যাও খাইয়া আও। আইজ তো তোমার কামে একদমই মন নাই। ‘

রায়হান আর সে কথা কানে তুলে না। বক্স হাতে নিয়ে কারখানার এক কোনের দিকে চলে যায়। গিয়ে চারপাশ ভালো করে দেখে বক্সটা খুলতে থাকে। তার হৃদস্পন্দন যেনো ধীরে ধীরে বেড়েই চলছিলো। ঠিক এই রকমই একটা বক্স কাল রাতে তার জীবনে নতুন ঝড় বইয়ে দিয়েছে। আবার এমন একটা বক্স। কী রয়েছে এতে! রায়হান তাড়াতাড়ি বক্সের উপরের প্যাকেজিং খুলে বক্সটার ঢাকনাটা উঠায়। এই বক্সটাও আগের টার সাইজেরই ছিলো। রায়হান ঢাকনাটা খুলার সাথে সাথেই চমকে উঠে। ভিতরে নিপার কিছু ছবি রাখা। রায়হান তাড়াতাড়ি সেই ছবি গুলো বের করে। ছবিতে নিপাকে কুঠুরির সামনের টিউবওয়েলে পানি নিতে দেখা যায়। আর তার পড়নের থ্রী পিস টাও আজকেরই। রায়হান ভয়ে ভয়ে একটার পর একটা ছবি বদলায়। একেকটা ছবি একেক খানে তুলা। কোনটা কুঠিরের ভিতরে তোলা, কোনটা কুঠিরের বাইরে তোলা। যেনো কেউ ইচ্ছে করে নিপার সব গতিবিধির ছবি তুলেছে। রায়হান ছবি গুলো পাশে রেখে বক্সের ভিতরে তাকায়। একটা ছোট্ট টাইমার ঘড়ি। রায়হান ঘড়িটা হাতে নেয়। ঘড়িতে কাউন্টডাউন চলছিলো। সংখ্যায় তা ৩৩:১১। সংখ্যা টার সেকেন্ড ক্রমেই কমে কমে যাচ্ছিলো। রায়হান ভয়ে এক ঢোক গিলে।‌ সে ঘড়িটা সড়িয়ে রেখে আবার বক্সের ভিতর তাকায়। দেখে ভিতরে শুধু একটা সাদা ভাঁজ করা কাগজ আছে। রায়হান তাড়াতাড়ি ছবি আর ঘড়িটা পাশের টেবিলে রেখে ভাঁজ করা কাগজ টা বক্স থেকে বের করে। কাগজটা খুলে। প্রতিটা সেকেন্ড যেনো তাকে আরো বেশি ভীতিকর পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। রায়হান কাগজ টা খুলে পড়তে শুরু করে। 

 

‘কী খবর রায়হান। কী ভাবলে! ৪৮ ঘন্টা থেকে কিন্তু ১৫ ঘন্টা চলে গিয়েছে। আর আছে, মাত্র ৩৩ ঘন্টা। এই ৩৩টা ঘন্টা কিন্তু খুব কম সময় রায়হান। তোমার একটা সুন্দর সিদ্ধান্ত তোমার জীবনটাকেও বাঁচাবে আর নিপাকেও একটা সুন্দর মৃত্যু দিবে। তেমনি তোমার নেওয়া কোন ভুল সিদ্ধান্ত, তোমাকে আর তোমার নিপাকে নিকৃষ্ট থেকে নিকৃষ্টতম মৃত্যু উপহার দিবে। আমি চাইনা যে তুমি কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেও। জীবন থাকলে আরো অনেক মেয়ে পাবে রায়হান। জীবন কিন্তু একটাই। একবার শেষ হয়ে গেলে, পরবর্তীতে কিন্তু আর শুধরানোর পদ পাবেনা! 

ছবি গুলো দেখেছো! আমাদের লোক কিন্তু সবসময় নিপার উপর নজর রাখছে। তার প্রত্যেকটা চাল-চলন সবকিছুর খবরাখবর আমাদের কাছে আছে। একবার ভাবোতো রায়হান! তুমি কী আদেও আমাদের এতো বড় একটা সংঘের সাথে পেড়ে উঠবে! বুদ্ধিতে, শক্তিতে মোসাদ সমৃদ্ধ। এটা কিন্ত তুমি খুব ভালো করেই জানো! 

দেরি করোনা রায়হান। যাস্ট একটা বুলেট, যাস্ট একটা বুলেট খরচ করতে হবে তোমায়। নতুন এক দুনিয়া তোমাকে স্বাগতম জানানোর জন্য প্রস্তুত রায়হান। ফিরে এসো। হাজারো নারী, টাকা, সব পাবে। সব পাবে। ‘

 

চিঠিটা যেনো রায়হানের শরীরের শিরা-উপশিরা পর্যন্ত কাপিয়ে তুলে। ভয়ে সে জমে গিয়েছে। এ কোন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এসে পড়লো সে! পরিত্রাণ পাওয়ার কী কোন উপায়ই নেই! 

 

রায়হান শরীর একটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে। চারপাশ তাকায়। হঠাৎ তার শরীরে যেনো রক্ত চলাচলের মাত্রা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। রায়হান তৎক্ষণাৎ হাতের সবকিছু ওখানেই ফেলে দিয়ে দৌড়ে লালুর দিকে ছুটে আসে। লালু কাঠ সাইজ করে মেশিন দিয়ে কেটে অপর পাশে পাঠাচ্ছিলো। রায়হান এসে তাকে কড়া গলায় হন্তদন্ত হয়ে বলে,

‘ কে এই বক্সটা দিয়েছে। কে দিয়েছে? ‘

‘ বাইরে এক সাদা শার্ট পড়া পোলায় আমারে এই বক্সটা দিলো। ক্যান ভাই। কি হইছে। ‘

‘ সাদা শার্ট পড়া ছেলে। ‘

বলা মাত্রই রায়হান এক দৌড়ে কারখানার দরজার দিকে চলে যায়। দরজা খুলে বাতাসের গতিতে বাইরে বেড়িয়ে যায়। লালু তার হাতের কাঠটা মাড়াই করে কেটে অপর পাশে পাঠিয়ে দেয়। মাথা নিচু করে ফেলে। তার ঠোঁটের কোনে ফুটে উঠে এক রহস্যময় হাসি! 

 

রায়হান বাইরে বের হয়ে চারপাশ পাগলের মতো ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে। এইটা ছিলো একটা সাধারণ রাস্তা। রাস্তার দুইপাশেই দোকান, সবজি বোঝাই ভ্যান আর ফলমূলের দোকান। আজ হাঁটের দিন। তাই বেশ ভিড়। রায়হান লোকের ভিড়ের মাঝে চারপাশ ঘুরে তন্ন তন্ন করে খুঁজছে সাদা শার্ট পড়া কোন লোককে। তখনই হঠাৎ তার চোখ পড়ে সামনে। দূরে এক সবজির ভ্যানের সামনে দাঁড়ায় আছে সাদা শার্ট পড়া এক মধ্যবয়সী ছেলে। রায়হান দিকবিদিক না দেখেই ছুট লাগায়। সামনে যত লোক আসছে সব লোককে হাত দিয়ে ধাক্কা মেরে সড়িয়ে দিয়ে উন্মাদের মতো সেদিকে ছুটে যায় সে।

 

সাদা শার্ট পড়া ছেলেটা তার হাতে থাকা বাজারের ব্যাগ সবজি বিক্রেতার দিকে আগায়। সবজি বিক্রেতা মেপে রাখা এক কেজি বেগুন সেই ব্যাগের মধ্যে ঢেলে দেয়। তৎক্ষণাৎ কোথা থেকে যেনো এক লোক উড়ে এসে সাদা শার্ট পড়া ছেলেটার বুকে সজোরে এক লাত্থি মারে। ছেলেটা ছিটকে গিয়ে পড়ে রাস্তার মাঝে। লোকে লোকারণ্য এই রাস্তার মাঝে সবাই ফিরে তাকায় সেই সাদা শার্ট পড়া ছেলেটার দিকে। তখনই রায়হান উঠে দাঁড়িয়ে এসে সাদা শার্ট পড়া ছেলেটার উপর ঝাপিয়ে পড়ে। দিকবিদিক না দেখে নাকে, মুখে, পেটে জোড়ে জোড়ে ঘুষি মারতে থাকে। চিৎকার করতে থাকে। চারপাশের লোকজন অবাক হয়ে দেখে এই মারামারি। সাদা শার্ট পড়া ছেলেটার নাক মুখ ফেটে রক্ত বেড়িয়ে আসে। সাদা শার্ট ভিজে যায় লাল রক্তে। কয়েকজন লোক এগিয়ে আসে তাদের দুইজনকে ছাড়াতে। কিন্তু রায়হানের উন্মাদের সাথে তারা পেড়ে উঠছে না। আরো কয়েকজন এগিয়ে আসে। রায়হানকে শক্ত করে ধরে সেই রক্তাক্ত ছেলেটা থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসে। ছেলেটার এক চোখ ফেটে গিয়েছে ঘুষির আঘাতে। আম্মা আম্মা বলে কাঁদতে কাঁদতে ছেলেটা রাস্তা থেকে উঠেই এক ছুটে দৌড়ে পালায়। রায়হানের রাগ যেনো সর্বোচ্চ শিখায় পৌঁছে যায়। এক ঝটকায় ৭-৮টা লোককে ছিটকিয়ে দিয়ে দৌড়ে দেয় ছেলেটার পিছন পিছন। 

রক্ত মাখা ছেলেটা কাঁদতে কাঁদতে দৌড়াচ্ছে। দৌড়াতে দৌড়াতে ছেলেটা পিছনে মুখ করে দেখে, রায়হান তার দিকে বুনো চিৎকার করে তেড়ে আসছে। ছেলেটা আরো ভয় পেয়ে যায়। সে আরো জোড়ে দৌড়াতে থাকে। সামনে চলে আসে এক ফলের ভ্যান। ছেলেটা লম্বা এক লাফ দিয়ে ভ্যানের উপর দিয়ে ডিগবাজি খেয়ে অপর পাশে পড়ে দৌড় লাগায়। রায়হান দৌড়ে এসে এক জোড়ে ধাক্কা মেরে ভ্যান উল্টিয়ে দেয়। সে নিজেও রাস্তায় পড়ে যায়। রাস্তায় পড়ে এক ডিগবাজি দিয়ে উঠে দৌড় দেয় ছেলের পিছন। ছেলেটা লোকদের ভিড় কাটিয়ে ফাঁকা রাস্তার দিকে চলে এসেছে। সে প্রাণপনে ছুটছে। পিছন পিছন ‌রায়হানও দৌড়ে আসছে। সামনেই মেইন রোড। ছোট্ট এই রাস্তা টা গিয়ে সেই মেইন রোডেই মিলিত হয়েছে‌। ছেলেটা দৌড়াতে দৌড়াতে পিছনে মাথা ঘুড়িয়ে দেখতে যায় রায়হানকে। রায়হান চিৎকার দিয়ে তাকে থামতে বলছে। রায়হানের চোখ মুখ আগুনের শিখার মতো প্রজ্জলিত। ছেলেটা রায়হানকে দেখতে দেখতে দৌড়াতে থাকে। সে মেইন রোডে উঠে পড়ে আর তখনই এক দ্রুত গতির ট্রাক এসে পাশ থেকে তাকে সজোরে ধাক্কা দেয়। ট্রাকের গতি খুব বেশি থাকায় ছেলেটা ছিটকে ১৫-২০ ফিট দূরে গিয়ে রাস্তার উপর পড়ে। ট্রাকের ড্রাইভার ব্রেক চেপে ধরে। কিন্তু ট্রাক গতি কমাতে কমাতে ছেলেটা ট্রাকের চাকার নিচে পড়ে। পেটে উপর দিয়ে চাকা পড়ার সাথে সাথে তার দেহ বেলুনের মতো ফেটে যায়। পিচকারির মতো রক্ত ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। ছেলেটার পেট হতে নাড়ি-ভুড়ি সব বের হয়ে যায়। ট্রাক ব্রেক করে। চারপাশের লোকজন দৌড়ে এগিয়ে যায়। রায়হান দৌড় থামায়। তার নিজের উপরই নিজের রাগ হতে থাকে। সে ছেলেটার থেকে কিছু জানার আগে ছেলেটা মারা গেলো। তার অতীত কর্মের জন্যই তাকে নতুন এই যন্ত্রনায় পড়তে হলো। পাপ, পাপ, পাপ। তার জীবন যেনো শেষ অনিকেতের দারপ্রান্তে। রায়হান হেলে রাস্তায় জোড়ে জোড়ে ঘুষি দিতে থাকে। চিৎকার করে উঠে সজোরে। চিৎকারের তীব্রতায় দূরের গাছের পাখিরা সব উড়ে যায়। এক বিষাদের বিন্দুতে সে যেনো আটকে গেছে। আটকে গেছে মহাকালের তোড়ে!

 

______

 

বিকেল ৫ টা। নিপা কুঠুরির দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করলো। মাথায় চুলে গামছা পেঁচানো। সে গিয়েছিলো গোসলে। বাড়ির পিছনের যেই টিউবওয়েল টা আছে সেখানেই গোসল সেড়ে নিলো সে। এদিকটায় কেউ আসেনা, তবুও ওখানে ওড়না দিয়ে পর্দা টেনে তারপর গোসল সেড়েছে। এখানে আসার পর থেকে তার রুটিনে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। এখন রাতের রান্না বিকেলের দিকেই সেড়ে তারপর গোসল করে একদম ঘরে ঢুকে সে। রায়হান সকালে বাটিতে করে খাবার নিয়ে যায়। দুপুরে বাসা আসেনা। একদম কাজ শেষে রাতে বাড়ি ফিরে। 

নিপা মাথার চুল থেকে গামছা খুলে। ঘরের মাঝখানটায় দাড়িয়ে গামছা দিয়ে চুলের পানি ঝাড়তে থাকে। নাকের নাক ফুলটায় জমে থাকা এক ফোঁটা পানি ঝিলিক দিয়ে উঠছে। তার চোখে মুখে শুভ্রতার ছোঁয়া। জানালা খোলা। মৃদু বাতাস আসছে জানালা দিয়ে। নিপা মাথার চুলের পানি ঝেড়ে গামছাটা জানালার ঠিক পাশেই ঘরের মধ্যে মেলে দেয়। ঘরের জানালা গুলোর পাশে পাশে দড়ি টাঙিয়েছে সে কাপড় শুকানোর জন্য। ঘর টাকে নিজের মনমতো সাজিয়েছে সে। গামছাটা মেলে দিয়ে বিছানায় এসে বসে নিপা। এমনি সাধারণত বাসায় সে থ্রী পিস পড়লেও আজ সে শাড়ি পড়েছে। তেমন কোন কারণ নেই। রায়হান তাকে শাড়িতেই দেখতে বেশি পছন্দ করে। তাই পড়েছে। নিপা বিছানার বালিশ উঠিয়ে সোজা করে। এখন একটু হেলান দিয়ে গল্পের বই পড়বে। অবসর সময় কাটানোর এই একটাই যা উপায় আছে তার হাতে। পা তুলে উঠে বসে বিছানায়। পাশেই কাঠ ও বাঁশ দিয়ে বানানো টেবিলে একটা ছোট্ট বইয়ের তাক। নিপা সেখান হতে একটা বই হাতে নেয়। এই উপন্যাস টা কাল পড়া শুরু করেছিলো। আরেকটু বাকি, তাই এটাই আগে শেষ করবে। বইটা নিয়ে বিছানায় হেলান দিতে যাবেই, তখনই হঠাৎ তার গা গুলিয়ে উঠে। সে বইটা বিছানায় রেখে বুকে হাত দেয়। তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে নামে। তার বমি হতে চাইছে। নিপা তাড়াতাড়ি জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। জানালার কপাট ধরে মুখ বাইরে করে বমি করে ফেলে। তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিলো। এক হাত বুকে চেপে ধরে আরো বমি করে। নিমনিমে স্বরে ‘রায়হান, রায়হান’ বলে ডাকতে থাকে। ভিতরটা যেনো নিংড়ে বেড়িয়ে আসছিলো। নিপা সোজা হয়ে দাঁড়ায়। আর বমি আসছে না। পাশেই ঝোলানো গামছায় নাক মুখ আলতো মুছে টেবিল থেকে পানি ভর্তি গ্লাস হাতে নেয়। জানালার কপাট ধরে দাঁড়িয়ে পানির গ্লাস মুখে তুলতে যায়, তখনই হঠাৎ তার মাথা চক্কর দিয়ে উঠে। চোখ বুঝে আসতে থাকে। নিপা আর তাল সামলাতে পারেনা। তার হাত থেকে স্টিলের পানির গ্লাস টা নিচে পড়ে যায়। নিপা শেষ বারের মতো ‘রায়হান’ বলে ডেকেই মাথায় হাত দিয়ে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। জ্ঞান হারায় সে। পাশেই পড়ে রয় উল্টে থাকা খালি স্টিলের গ্লাস। 

 

______

 

নীলগিরি জঙ্গলের মাঝের এক ছোট্ট ফাঁকা যায়গা। আকাশ পরিষ্কার। জোছনা রাত। চারপাশের সবকিছু জোছনার আলোয় বেশ দৃশ্যমান। এক মেয়ে কোলে দুই হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে আছে। পড়নে জিন্স আর জ্যাকেট। মেয়েটা যেনো কারো জন্য অপেক্ষা করছিলো। আশেপাশ থেকে পেঁচার ডাক ভেসে আসে। আকাশের চাঁদ খন্ড এক মেঘের আড়ালে হারিয়ে যায়। চারপাশের জোছনার আলো কমে। কারো হেঁটে আসার আওয়াজ পাওয়া যায়। শুকনো পাতা পাড়িয়ে কে যেনো এদিকেই আসছে। জ্যাকেট পড়া মেয়েটা এখনো চুপচাপ আগের মতো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। গাছ পালার মধ্যে থেকে বেড়িয়ে আসে আরেকটা মেয়ে। এই মেয়ের পড়নে ছিলো থ্রী পিস। আকাশের খন্ড মেঘ খানা সড়ে যায়। জোছনার আলোয় আবারো চারপাশ মৃদু আলোকিত হয়ে উঠে। সেই আলোয় থ্রী পিস পড়া মেয়েটার চেহারা দৃশ্যমান হয়। মেয়েটা আর কেউ নয়, শিমলা আক্তার মোনালিকা। অর্থাৎ সেই ছদ্মবেশী ভাঙারিওয়ালি। শিমলা এগিয়ে আসে জ্যাকেট পড়া মেয়েটার দিকে। সে একটু ইতস্তত বোধ করছে। এক হাত দিয়ে আরেকহাতের নখ খোটাচ্ছে। শিমলা, জ্যাকেট পড়া মেয়েটার পিছনে এসে দাড়িয়ে কাঁপো কাপো গলায় বলে উঠে,

‘ ম,ম্যাডাম। ‘

জ্যাকেট পড়া মেয়েটা ফিরে তাকায়। সে আর কেউ ছিলোনা, ছিলো কানিজ। তার মুখে ফুটে উঠে এক রহস্যময় হাসি। শিমলা কিছুটা ভয় পাচ্ছে। কানিজ বলে,

‘ আসছো তাইলে। এতো দেরি হইলো ক্যানো! ‘

‘ ন,না মানে। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আসতে আসতে দেরি হয়ে গিয়েছে। আর এমন হবেনা ম্যাম। ‘

বলেই শিমলা মাথা নিচু করে ফেলে। কানিজ এক সৌজন্যমূলক হাঁসি হেঁসে এগিয়ে আসে। শিমলার কাঁধে হাত রেখে তাকে আশ্বস্ত করে। বলে,

‘ ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি তো তোমাকে খেয়ে ফেলছিনা। ‘

‘ ন,না মানে ম্যাম। আপনি হঠাৎ আনন্দপুরে এলেন যে। আমার কাজে কী কোথাও ভুল হয়েছে! আমি আপনার কথা মতো তো মেম্বার বাড়ি আর তালুকদার বাড়ি দুইটাই নজরে নজরে রেখেছি। আমি কাগজ গুলা নেওয়ার জন্য ছদ্মবেশও ধরেছিলাম। কিন্তু সফল হইনি। আমার দ্বারা কী কোন ভুল হয়েছে ম্যাম! ‘

শিমলার গলায় করুণ সুর দেখে কানিজ মৃদু হাসে। শিমলার কাঁধ থেকে হাত নামিয়ে নিজের হাতের আঙ্গুল দেখতে থাকে। বলে,

‘ ভালো, ভয় থাকা ভালো। তবে না। তুমি কোনো ভুল করোনি। আর আমি তোমাকে কোন শাস্তি দিতেও এখানে আসিনি। আমি এসেছি অন্য একটা কাজে। ‘

‘ কী কাজ ম্যাম! ‘

‘ বিশেষ এক কাজ। আপাতত তোমার এ বিষয়ে না জানলেও চলবে। ফাইল আনতে পেরেছো! ‘

শিমলা মাথা নিচু করে ফেলে। নিম্ন স্বরে বলে,

‘ না ম্যাম। আমি চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারিনি। ‘

‘ তালুকদারকে নিয়ে কোন নতুন খবর! ‘

‘ উনি মাঝে মাঝেই ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে আলমারিতে কী যেনো করেন। আমি প্রথম দিন জানালা লাগানোর আগ পর্যন্ত তার হাতে একটা হলুদ ফাইল দেখেছিলাম। তবে তার পর থেকে আর তেমন কিছু দেছিনি। উনি সবসময় জানালা, দরজা লাগিয়ে তারপর কাজ করেন। ‘

কানিজ এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে। নিজের আঙ্গুল উঠিয়ে দেখে। আঙ্গুলের নখে ফু দিয়ে চোখ না সড়িয়েই বলে,

‘ জানো। তানিয়া যে মারা গেছে! ‘

‘ কোন তানিয়া ম্যাম! ‘

‘ যার প্রজেক্ট আমার দায়িত্বে ছিলো। সেই তানিয়া। ‘

‘ কিন্তু আপনি তো তার বান্ধবী ছিলেন। আপনি উনাকে কেনো মারলেন? ‘

‘ আচ্ছা শিমলা। আমরা কার হয়ে কাজ করি বলোতো! ‘

‘ কেনো, মোসাদের হয়ে। আপনি, আমি দুইজনেই মোসাদের এজেন্ট।‌ ‘

‘ মোসাদ আমাদের কেনো রেখেছে! ‘

‘ এইতো, বিভিন্ন মিশন পরিচালনা করার জন্য। মোসাদের বিভিন্ন কাজ সম্পূর্ণ করার জন্য। ‘

‘ তুমি এখন কী কাজে নিয়োজিত আছো! ‘

‘ আমি! আমি তো আপনার অধীনে নিয়োজিত আছি। কাজ হিসেবে বলতে গেলে ফর্মুলার ফাইল নেওয়াটাই এখন আমার প্রধান কাজ। ‘

‘ তুমি যেমন এই কাজে নিয়োজিত, আমিও তেমন তানিয়ার থেকে একটা ম্যাপ নেওয়ার কাজে নিয়োজিত ছিলাম। এক গুপ্তধনের ম্যাপ। ‘

‘ গুপ্তধনের ম্যাপ! ‘

‘ হ্যা। এই ম্যাপ তানিয়া পেয়েছিলো এক আদিবাসী সম্প্রদায়ের কাছ থেকে। আর আমার কাজ ছিলো সেটা হাতিয়ে নেওয়া। কোনরকম জোড়-জবরদোস্তি করতে বলা হয়নি, তাই আমি ওর অফিসে চাকরি নিয়ে ওর কাছের বন্ধু হওয়ার চেষ্টা করি। আর পরে হইও। এখন কিছুদিন আগেই ওর থেকে ম্যাপ টা উদ্ধার করেছি। তাই ওকে মেরে ফেলেছি। স্যার নিষেধ করায়, আগে খুন করিনি। আগে খুন করলে এতো ছদ্মবেশ, এতো নাটক, করতেই হতোনা। ‘

‘ তারমানে আপনি তানিয়ার থেকে কোন গুপ্তধনের ম্যাপ উদ্ধারে কাজ করছিলেন! ‘

‘ হ্যা। অবশ্য এই বিষয়টা অর পার্সোনাল সেক্রেটারী, রিতু না কী যেনো নাম মেয়েটার। ও যেনে যায়। তবে ও তানিয়াকে বলার আগেই ওকে মোসাদের তরফ থেকে এক নির্মম মৃত্যু উপহার দিয়ে দিয়েছি। খুব যন্ত্রনা দিয়ে মেরেছি ওকে। ‘

‘ রিতুকে আপনারা মেরেছেন! কিন্তু, কিন্তু এটা কী করে সম্ভব। আমি তো সেদিন, মানে যেদিন তানিয়া আপনাদের সবাইকে আসুভে না কী এক অশরীরীর অধ্যায় সম্পর্কে বলছিলো তখন শুনেছিলাম, যে আসুভে সেই রিতুকে মেরে ফেলেছে। আমি ঐদিন ঘরের জানালার বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমি নিজ কানে এটা শুনেছি। ‘

‘ হ্যা এটা তানিয়া বলছিলো যে আসুভেই রিতুকে মারছে। তবে এটা হয়তো সে অনুমান করে বলেছে। মানে এখানে হয়তো একটা কাকতালীয় ব্যাপার ঘটে গেছে।‌ ঐ তান্ত্রিক যে কোন ভাবে আসুভের পুনর্জন্ম মানে সুমুকে তানিয়ার কাছে রাখতে চেয়েছিলো যাতে সে আংটিটা নিতে পারে। এইজন্য হয়তো তারা পথ খুঁজছিলো। আর তখনই রিতু আমার ব্যাপারে যেনে যায় বিধায় ওকে আমি মেরে ফেলি। আর এইটাই ওদের কাজটাকে আরো সহজ করে দেয়, আর তারপর তান্ত্রিক সুমুকে তানিয়ার কাছে পাঠিয়ে দেয় তানিয়ার সেক্রেটারি হওয়ার জন্য। ‘

‘ কী বলেন ম্যাম! এইখানে এতোকিছু লুকায় আছে! ‘

‘ হমম। আরো যে কতকিছু এই আনন্দপুরে হয়েছে বা চলছে, তা জানলে তোর মাথায় জিলাপির মতো প্যাচ লাগে যাবে। অতকিছু তোর এখন জানা লাগবেনা। তুই শুধু এখন উপায় খোঁজ। স্যার কিন্ত রগ চটা। মাথায় রাগ উঠলে যেকোনো কিছু করে ফেলতে পারেন। ‘

‘ আচ্ছা ম্যাম করে ফেলবো। (একটু থেমে) ম্যাম, আপনি কী তাইলে একসাথে দুই প্রজেক্টে ছিলেন এতোদিন! ‘

‘ হমম। একটা তানিয়ার থেকে ম্যাপ নেওয়ার, আরেকটা,,,’

‘ মেম্বার বাড়ি থেকে ফর্মুলা নেওয়ার। ‘

‘ হমম। একটার কাজ শেষ, আরেকটার কাজও অতিশীঘ্রই শেষ হবে। ‘

‘ আমি কী মেম্বার বাড়িতে এট্যাক করবো! ‘

‘ না। এমন কিছুই করবে না। স্যারের সম্পূর্ণ নিষেধ আছে। ‘

‘ আচ্ছা ম্যাম, এই স্যার টা কে! আমি আজ পর্যন্ত তাকে দেখিনি। উনি কি মোসাদের হেড! কিন্তু মোসাদ তো ইসরাইলের সংস্থা। আর এটার হেড তো দাভিদ বার্নেয়া। ‘

‘ হম দাভিদ বার্নেয়া হেড। তবে বাংলাদেশ রিজিওনাল হেড হচ্ছেন আমাদের স্যার। উনি যেমন ঠান্ডা, তেমন গরম। পরিকল্পনা সাজাতে তার জুড়ি মেলা ভার। অবশ্য মাথায় রাগ উঠলে তখন আবার কিছু বুঝেন না। সবকিছু ধ্বংস করে ফেলতেও দ্বিতীয়বার ভাবেন না। ‘

‘ স্যারের নাম কী ম্যাম! ‘

‘ তা তোর জানা লাগবেনা। তুই তোর কাজে মন দে। ‘

‘ আচ্ছা ম্যাম, আপনি কিছু মনে না করলে একটা প্রশ্ন করতাম।’

‘ হ্যা কর। ‘

‘ আচ্ছা মেম্বার বাড়িতে আমাকে নজর রাখতে বলেছেন ঔষধের ফর্মুলার ফাইল নেওয়ার জন্য। কিন্তু তালুকদার, মানে ইসহাক তালুকদারের বাসাতেও নজর রাখতে বলছিলেন কেনো! আমার জানা মতে উনি তো চিকিৎসক বা বিজ্ঞানী নন। উনি তো ব্যবসায়ী। মাছের আরত আছে উনার। ‘

‘ সবসময় চোখের সামনে যা ঘটে, তা কিন্তু সত্য হয়না। কিছু বড় বড় মিথ্যে কে ঢাকার জন্য এই সত্য গুলো আমাদের দেখানো হয়। আর দেখায় কে! মুখোশ। মুখোশ যেমন ভালোর আড়ালে খারাপকে ঢাকতে পারে, তেমনি খারাপের আড়ালে ভালোকে ঢাকতে পারে। মুখোশ চিনতে যে পারে, সেই আসল বুদ্ধিমান। কারণ সে তার ধ্বংসকে চিনতে পেরেছে। নয়তো পিছন থেকে ছুরি মারার লোক এই মহাকালের অনন্তে পদে পদে গচ্ছিত আছে! ‘

‘ হয়তো আমি কিছুটা বুজতে পারছি। তালুকদারের ভিতরে অন্য এক রহস্য আছে। তাই না ম্যাম! ‘

কানিজ মৃদু হাসে। সে কিছু বলেনা। শিমলার দিকে থেকে ফিরে অন্যদিকে হেঁটে কিছুটা সামনে এগিয়ে যায়। শিমলা থায় দাঁড়িয়ে আছে। নখ খোটাচ্ছে। মাঝে মাঝে ভেসে আসা পেঁচার ডাকের উৎপত্তিস্থল খুঁজতে চারপাশ তাকিয়ে দেখছে। কানিজ তার পকেট থেকে ফোন বের করে। ফোনে একটা নাম্বার উঠিয়ে কল দিয়ে কানে তুলে। কানিজের মুখে ছিলো আনন্দের আভাস। তার ফোনের অপর প্রান্ত হতে কোন এক পুরুষের গলা ভেসে আসে। 

‘ হ্যা বলো। ‘

‘ স্যার।‌ আমি একটু আনন্দপুরে এসেছি। আপনি যদি ফ্রি থাকেন, দেখা করতাম একটু। ‘

‘ কী বিষয়ে! ‘

‘ জুডাসের ‌বিষয়ে স্যার। ‘

‘ জুডাস! ঐ হারামীর বাচ্চাটা কোথায়! ও কী এই আনন্দপুরেরই! ‘

‘ হয়তো স্যার। আমরা জুডাসের খুব কাছাকাছি আছি। খুব শীঘ্রই তাকে ধরে ফেলবো। ‘

‘ গুড। এই না হলে আমার এজেন্ট।‌ আমি তোমাকে একটা ঠিকানা মেইল করছি। এখানে এসে দেখা করো। ‘

‘ ঠিক আছে স্যার। রাখছি তাইলে। ‘

কানিজ ফোনটা কান থেকে নামায়। পিছনে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা শিমলা উৎসুক হয়ে আছে। কান পেতেছে যদি কিছু শুনতে পায়। কানিজ পিছনে ফিরে তাকায় না। সে তাকিয়ে ছিলো ফোনের অন করা ডিস্প্লের দিকে। তখনই একটা মেইল আসে। কানিজ নোটিফিকেশন উইন্ডো টা নামায়। মেইলে দেওয়া ছিলো সেই ঠিকানা। 

‘ নিয়াসিন ফার্নিচার এন্ড ‘স’মিল, ফার্নিচার পট্টি, দিনাজপুর ‘

 

চলবে ,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

 

( অনেক দিন পর লেখালেখিতে আসলাম, তাই হয়তো সিন উপস্থাপনে একটু খাপছাড়া লাগতে পারে। গল্পে এখন থেকে নানা মোড় দেখতে পাবেন। কী মনে হয়, এরপর কী হতে চলেছে! রায়হান কী নিপাকে মেরে ফেলবে! নিয়াসিন ফার্নিচার এন্ড ‘স’ মিলে তো রায়হান আর লালু সালু কাজ করে। কী রহস্য রয়েছে এখানে! রিতু আর তানিয়ার মৃত্যু রহস্য জানতে পারলেন আজ। কালও এমন হঠাৎ কিছু রহস্য নিয়ে হাজির হবো। কালও পর্ব পাবেন। গল্প কেমন এগোচ্ছে জানাতে ভুলবেন না কিন্তু। আপনাদের গঠনমূলক মন্তব্যের অপেক্ষায় রইলাম ❤️)

 

গল্প নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা করুন আমার গ্রুপে।

গ্রুপ লিংক 👇

https://www.facebook.com/groups/743016887019277/?ref=share_group_link

 

উপন্যাস :: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন :: ২(মুখোশ)

পর্ব :: ৮৬

লেখক :: মির্জা সাহারিয়া

 

উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন:: ২(মুখোশ)

পর্ব:: ৮৭

লেখক:: মির্জা শাহারিয়া

 

মেম্বার বাড়ির পিছনের ফুল বাগান। সকালের নীলচে আভায় চারিপাশ আলোড়িত। সুমু ফুলের গাছে পানি দিচ্ছে। গুন গুন করছ গাইছে গান। আজকের সকালটা কেনো যানি তার জন্য বেশ সুখকর লাগছে। তার কিছুটা পিছনেই একটা বেলুন নিয়ে খেলছে হনুফা। বারবার সেটা আকাশে উড়িয়ে দিচ্ছে, আবার যখন বেলুনটা নেমে আসছে তখন হাত দিয়ে ধাক্কা দিয়ে উপরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। সকালের প্রথম প্রহরে বাগানে আজ কিছু ফুল ফুটেছে। সেই ফুলের মধু সংগ্রহে এসেছে কিছু মৌমাছি। সুমু হাঁটু গেড়ে মৌমাছিদের দেখছে। মুখের উপরে চলে আসা চুল গুলো কানের পাশ টায় রেখে আবার গাছে পানি দেওয়া শুরু করে। গাছটা কিছুটা নড়ে উঠায় মৌমাছিরা উড়ে চলে যায়। সুমুর মন খারাপ হয়। তবে সে দেখে মৌমাছিরা উড়ে পাশেরই একটা গাছের ফুলের উপর গিয়ে বসেছে। সুমুর মুখে হাসির ছটা ফুটে উঠে। সে পানির মগ থেকে কিছু পানি হাতে নিয়ে মগটা বালতিতে রেখে দেয়। উঠে দাঁড়িয়ে ধীর পায়ে এসে এইগাছটার পাশে দাঁড়ায়। হাঁটু গেড়ে বসে। গাছের নিচে হাতে করে আনা পানি গুলো দিয়ে দেয়। হাত শরীরে মুছে দেখতে থাকে মৌমাছিদের। খুব কাছ থেকে মৌমাছিদের মধু সংগ্রহ দেখার ইচ্ছে ছিলো তার। আজ পূরণ হয়ে গেলো। সুমু মৌমাছিদের ছুতে চাইলো, কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়লো, যদি কামড় দেয়! মৌমাছির হুলের ব্যাথা সে সহ্য করতে পারবেনা। সুমু আরেকটু কাছে এসে মৌমাছি টাকে দেখতে থাকে। আনমনে গুন গুন করে যায় কোন এক অজানা সুর। গাছের ছোট্ট ছোট্ট পাপড়ির আড়াল হতে সুমুর শুভ্রতায় ছেয়ে যাওয়া মুখখানা বেশ লাগছে। এক চিলতে রোদ এসে পড়ে বাগানটার একাংশে। সুমু এবার গুনগুনিয়ে গাওয়া গানটা নিজ গলায় গেয়ে উঠে। 

 

অলিরও কথা শুনে বকুল হাসে

কই তাহার মত 

তুমি আমার কথা শুনে হাসো না তো।

 

সুমুর গলায় হঠাৎ গান শুনে বেলুন ছেড়ে সুমুর দিকে ফিরে তাকায় হনুফা। সুমু ফুলের গাছ থেকে একটা সদ্য ফোঁটা ফুল তুড়ে নেয়। নিয়ে সেটা নিজের কানের পাশটায় সযত্নে রাখে। হনুফা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে সুমুর দিকে। সুমু আবার গাইতে থাকে।

 

ধরার ও ধুলিতে যে ফাগুন আসে

কই তাহার মত 

তুমি আমার কাছে কভু আসো না তো।।

 

হনুফা সুমুর পিছনে এসে দাঁড়ানো মাত্রই সুমু উঠে দাঁড়ায়। তার মন আজ রংয়ে ছেয়েছে। সে হনুফার দুই হাত ধরে। তাকে নিয়েই যুগল নাচে মেতে উঠে।

 

আকাশ পারে ওই আনেক দূরে

যেমন করে মেঘ যায় গো উড়ে,

আকাশ পারে ওই আনেক দূরে

যেমন করে মেঘ যায় গো উড়ে,

যেমন করে সে হাওয়ায় ভাসে

কই তাহার মত 

তুমি আমার স্বপ্নে কভু ভাসো না তো।

 

হনুফার এক হাত ধরে তাকে ঘুড়িয়ে তাকে কাছে টেনে নেয় সুমু। হনুফা একদম থ হয়ে ছিলো। সে তো সুমুর হঠাৎ এমন স্বভাবে ভয়ও পাচ্ছিলো। সুমু তাকে এক হাত দিয়ে হেলিয়ে ধরে। তার মুখের উপর দিয়ে এক আঙ্গুল আলতো করে ছুঁইয়ে নামিয়ে আনে গলা পর্যন্ত। হনুফা সাথে সাথে সুমুর থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ছুটে পালায়। সুমু এবার লজ্জা পায়। দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ লুকায়। 

 

হনুফা আবার ফিরে আসে বাগানে। এবার দেখে সুমু এক গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে সামনের বাগানের দিকে তাকিয়ে আছে। গাইছে তাহার সুমধুর কন্ঠে গান।

 

চাঁদের আলোয় রাত যায় যে ভরে

তাহার মত তুমি করো না কেন 

ও গো ধন্য মোরে,

চাঁদের আলোয় রাত যায় যে ভরে

তাহার মত তুমি করো না কেন 

ও গো ধন্য মোরে। 

 

হনুফা গিয়ে সুমুর পিঠে হেলান দেয়। সুমু ফিরে আবার হনুফাকে ধরতে যায় তখনই হনুফা পালিয়ে যায়। সুমু মুখ ফুলিয়ে দুই হাত কোমরে দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়। তখনই হনুফা তার পিছনে উদয় হয়ে সুমুর চোখ দুইহাত দিয়ে চেপে দিয়ে চেপে ধরে। সুমু বলে, ‘ হনুফা। ছাড়। ছাড়। আমি ব্যাথা পাচ্ছি। ‘

হনুফা এবার একটু আলতো করে ধরে। তারপরও সুমু হনুফাকে বলে হাত ছেড়ে দিতে। তখনই এক মানব এসে দাঁড়ায় সুমুর সামনে। হনুফা সুমুর চোখ থেকে হাত সড়িয়ে নেয়। সুমু চোখ মেলে সামনে তাকায়। তার সর্বাঙ্গে যেনো এক অজানা শিহরণ বয়ে যায়। সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো আফাজ! মুখে কাঠিন্য ভাব। দুই হাত কোলে একসাথে করে দাঁড়িয়ে আছে। সুমু আমতা আমতা করতে করে কিছু বলতে নেয়, তখনই পিছন থেকে হনুফা সুমুকে ধাক্কা মেরে আফাজের দিকে ঠেলে দেয়। সুমু কিছু বুঝে উঠার আগেই গিয়ে পড়ে আফাজের কোলে। হনুফা দৌড়ে পালিয়ে যায়। সুমুর হৃদস্পন্দন বেড়ে গিয়েছে। সে মুখ তুলে তাকাতেও ভয় পাচ্ছে। তখনই সে তার পিঠে কারো ছোঁয়া অনুভব করে। সে তৎক্ষণাৎ মুখ তুলে তাকায়। দেখে আফাজের মুখের কাঠিন্য ভাব এক ছোট্ট হাসির মাঝে মিলিয়ে গেছে। সুমুর মুখ লজ্জায় লাল হয়ে যায়। আফাজ তার কানের পাশে থাকা ফুল টাকে খুলে নিয়ে আরো ভালোভাবে কানের উপর গুজে দেয়। কানে ঝুলতে থাকা দুলে এক ছোট্ট ছোঁয়া দেয়। সুমু ছুটে পালাতে যায়, তখনই তার হাত আফাজ ধরে নেয়। সুমুর ভয়ে সারা শরীর কাঁপছে। তখনই পিছন থেকে সে শুনতে পায় আফাজের কন্ঠে গান,

 

যেমন করে নীড়ে একটি পাখি

সাথীরে কাছে তার নেয় গো ডাকি,

যেমন করে নীড়ে একটি পাখি

সাথীরে কাছে তার নেয় গো ডাকি,

যেমন করে সে ভালবাসে

কই তাহার মত 

তুমি আমায় তবুও ভালবাসো না তো। 

 

সুমু তৎক্ষণাৎ ফিরে তাকায়। আফাজ হেচকা টান মেরে সুমুকে তার বুকের উপর টেনে নেয়। সুমুর দুই কাঁধে দুই হাত রেখে কপালে কপাল লাগিয়ে নেয়। সুমুর চোখের পাতা কাঁপছে। আফাজ তার দৃষ্টি সুমুর অক্ষি কোটরে ফেলে। চোখে চোখ পড়তেই সুমু থ হয়ে যায়। আফাজের চোখের ভাষা তার খুব চেনা চেনা লাগছে। দুইজনের গরম নিঃশ্বাস দুইজনের উপর পড়ছে। আফাজ গেয়ে উঠে এক ধীর কন্ঠে,

 

অলির কথা শুনে বকুল হাসে

কই তাহার মত 

তুমি আমার কথা শুনে হাসো না তো।

ধরার ও ধুলিতে যে ফাগুন আসে

কই তাহার মতো 

তুমি আমার কাছে কভু আসো না তো।।

 

আফাজ ধীরে ধীরে সুমুকে আরো কাছে টেনে নিতে থাকে। সুমুর হৃদস্পন্দন বেড়েই চলেছে। আফাজ একপাশে মাথা হেলিয়ে তার ঠোঁট দুটো সুমুর ঠোঁটের কাছাকাছি আনতে থাকে। সুমুর চোখযুগল ধীরে ধীরে বুজে আসে। সেও তার ঠোঁট দুটো এগিয়ে দেয়। আফাজ তাকে খুব আপন করে নেয়। দুইজনের ঠোঁট দ্বয় খুব কাছে চলে আসে। তখনই হঠাৎ পিছন থেকে হনুফা এসে সুমুর কামিজ ধরে এক হেঁচকা টান দেয়। দুইজনের মনযোগ নষ্ট হয়। সুমু ধপাস করে পড়ে যায় মাটিতে।

 

সুমুর ঘুম ভেঙ্গে যায়। তৎক্ষণাৎ সে উঠে বসে। হাঁপাতে থাকে। চারপাশে তাকিয়ে দেখে সে তার ঘরেই আছে‌। তারমানে সে এতোক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলো! 

‘ইশশ্, স্বপ্নটাও ভেঙ্গে গেলো। আর হনুফা, ঐ বজ্জাতটা আমাকে আর শান্তি দিবেনা। আরেকটু হলেই ও আমাকে চুমু খেতো! ধ্যাত! ‘

বলেই মুখ গোমড়া করে বসে রয় সুমু। বাইরে থেকে আকাশ গর্জনের শব্দ আসে। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। ভোরের আলো ফুটেছে কিছুটা। জানালার ছোট ফুটো দিয়ে বাইরের নীলচে আলো ঘরে ঢুকেছে। সুমু পাশ ফিরে তাকায়। দেখে শিউলি বেগম এখনো ঘুমে। সুমু কাথাটা ভালো করে টেনে দেয় তার উপর। সামনে ফিরে সোজা হয়ে বসে থাকে। আহা, কতই না সুন্দর স্বপ্ন দেখছিলো সে। আফাজ তার কাছে এসেছে, তাকে মেনে নিয়েছে। ‘ইশ, বাস্তবেও যদি এমন হতো! (গোমড়া মুখে) কিন্তু উনি তো আমাকে সহ্যই করতে পারেন না। সবসময় এড়িয়ে যান।‌ তবে সমস্যা নেই। সবুরে মাওয়া ফলে। একদিন ঠিক উনি আমাকে উপলব্ধি করতে পারবেন। আর তখন আমরা ঠিক এভাবেই একে অপরকে জড়িয়ে ধরে,,,!!! ইহিহি! ‘ মুচকি হেসেই সুমু দুই হাতে তার মুখ লুকায়। প্রথম প্রেম, প্রথম অনুভূতি সবসময় সুখের হয়। জীবনে মানুষ তো অনেক বারই প্রেমে পড়ে। জীবন সঙ্গী পাওয়ার তাড়না তাকে প্রেমে পড়তে আর প্রেম করার উৎসাহ যোগায়। তবে প্রথম প্রেম! প্রথম প্রেম প্রত্যেকটা মানুষের মনেই একটা আলাদা যায়গা নিয়ে থাকে। কারও সেই প্রেমবিলাস সুখস্মৃতি বয়ে আনে, কারো বা হতাশার ছায়ায় ডুবিয়ে রাখে। তবুও প্রথম প্রেমে পড়া মানুষেরা তাদের জীবনের শত আশাকে পূরণের সান্নিধ্যে প্রথম যুগলটাকে কখনো ভুলেনা, চাইলেও ভুলতে পারেনা। এক্ষেত্রে যে আমাদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় অপারগ! 

 

সুমু শুয়ে পড়ে পাশ ফিরে। দুই হাত ভাঁজ করে মাথার নিচে রাখে। মুখে এখনো খুশির ছায়া। সুমু চোখ বুজে ফেলে। মনের সুতোয় গাঁথে কিছু আবেগ মাখা বাক্য। হারিয়ে যায় সে সুদূর এক কল্পনার রাজ্যে।

 

‘ ভেজা ঘাস মারিয়ে, ছুটে চলি সপ্নের দেশে। হঠাৎ কালো মেঘ এসে যায় আকাশে। এমনি করে সপ্ন আমার হারিয়ে যায় বৃষ্টিতে, ভাঙ্গা সপ্নের সুর ফিরে আসে আমাতে। দুরাকাশে আবির মেঘে, সপ্ন দেখব আমি। ভোরের সপ্ন সত্যি হবে একথা আমি জানি।

শেষ প্রহরে তাই ঘুমিয়ে পরি। হব বলে, সপ্ন ঘুড়ি! ‘

 

_____

 

নিপা খাবারের বাটি গুলো একটার উপর আরেকটা রাখে। সবার নিচের টায় ভাত, তারউপর ডাল, আর তারউপর শাক ভাজির বাটি। ঢাকনা লাগিয়ে দেয়। একটা মেলে রাখা কাপড়ের মাঝখানটায় টিফিন ক্যারিয়ার টা রেখে কাপড় দিয়ে বেঁধে দিতে থাকে। বেঁধে দিয়ে উপরের ধরার যায়গাটায় ধরে টেবিল থেকে সেটা নিয়ে চলে আসে ঘরের দরজার কাছে। দরজার দিকটায় দাঁড়িয়ে ছিলো রায়হান। পড়নে লুঙ্গি আর শার্ট।‌ মুখ মলিন। মুখে কোন অনুভূতির রেখা নেই। নিপা এসে টিফিন ক্যারিয়ার টা রায়হানকে দেয়। রায়হান হাতে নেয়। বাইরে বেশ বৃষ্টি হচ্ছে। মাঝে মাঝে বড় বাজ পড়ার শব্দ ভেসে আসছে। কাল সারারাত বৃষ্টি হয়েছে। সকাল হলেও আকাশ এখনো বেশ অন্ধকার। বাইরে দেখে যেনো মনে হচ্ছে সূর্য অস্ত গেছে। রায়হান ঘরের দরজার পাশ থেকে কালো ছাতাটা হাতে নেয়। বাইরের দিকে ফিরে ছাতাটা খুলে। পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা নিপা বলে,

‘ আজকে না গেলে হয়না! ‘

‘ মাহাজন ফোন দিয়ে বলছে আজকেও আসতে। ‘

‘ সাবধানে যাইও। বাইরের আবহাওয়া তো সুবিধার মনে হচ্ছে না। রাস্তার সাইড দিয়ে যাইয়ো। আর, রাতের বেলা একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরো। ‘

রায়হান পিছন ফিরে তাকায়। ধীর গলায় বলে,

‘ কেনো! ‘

‘ রাতেও যদি এমন ঝড় বৃষ্টি হয়! আমি একলা কীভাবে থাকবো! ‘

‘ আচ্ছা ঠিক আছে। আমি সন্ধ্যা হওয়ার আগেই চলে আসবো। ‘

নিপা হঠাৎ উৎফুল্ল হয়ে বলে,

‘শুনোনা, আসার সময় আমার জন্য একটা ফুল এনো! যেকোনো ফুল। গোলাপ, পদ্ম যেকোনো একটা। ‘

‘ ফুল! ‘

‘ হ্যা। আর (গলার আওয়াজ নিম্ন করে) তোমার কাছে যদি টাকা থাকে, তাহলে একটা আইসক্রিমও আনিও। মানে যদি থাকে আরকি। না থাকলে পরে যখন বেতন পাবা তখন আনিও। ‘

‘ আচ্ছা। কিন্তু এই ঠান্ডা আবহাওয়ার মধ্যে আইসক্রিম খেলে তখন যদি! ‘

‘ কিচ্ছু হবেনা। ঐটা আমার দুইজন ভাগ করে খাবো। অল্প আইসক্রিম খেলে কিচ্ছু হয়না। ‘

রায়হান ঘরের ভিতরটা ভালো ভাবে একবার দেখে নেয়। নিপাকে বলে,

‘ সাবধানে থেকো। প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যেওনা। ‘

‘ আচ্ছা। (ধীর গলায়) তোমার মাথা ঝিমঝিম করছে! ‘

‘ না। ‘

‘ তাইলে তুমি এতো নিস্তেজ হয়ে আছো ক্যানো! (রায়হানের কাছে এসে দাঁড়িয়ে) কী হয়েছে রায়হান! কোন খারাপ কিছু কি! ওরা কী আমাদের এই ঠিকানা জেনে গিয়েছে! ‘

রায়হান ফিক করে ছোট্ট হাঁসি দেয়। লুকানোর চেষ্টা করে তার হতাশাভাব । বলে,

‘ না না। এমন কিছুনা। এমনিই একটু ধকল যাচ্ছে তো। তাই আরকি। ‘

‘ খুব বেশি কষ্ট হয়ে যাচ্ছে তোমার পক্ষে তাইনা! আমি আজ মায়ের কাছে গিয়ে বলবো আমায় একটা সেলাই মেশিনের ব্যবস্থা করে দিতে। আমি সেলাইয়ের কাজ পারি। বাসায় তো সারাদিন বসেই থাকি। মেশিন টা হলে একটু টুকটাক কাজ করে সংসারে যদি অবদান রাখতে পারি, তাহলে এতো বেশি চাপ পড়বেনা তোমার উপর। ‘

‘ না। তোমার কোন কাজ করতে হবেনা। তোমার কাজ হচ্ছে শুধু একজন ভালো গৃহিণী হয়ে থাকা। বাকি সবদিক আমি একা হাতে সামলাবো। এসব নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না। ‘

নিপা আর কিছু বলেনা। রায়হানের মুখে আবার সেই ভয়ের ছায়া পড়ে। সে একটু ইতস্তত হয়ে পিছনে ফিরে বলে,

‘ সাবধানে থেকো। ঘরের দরজা ভিতর থেকে লাগিয়ে দিয়ো। ‘

নিপা মাথা নাড়িয়ে বলে,

‘ আচ্ছা। ‘

রায়হান একহাতে ছাতা ধরে আরেকহাতে টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে। বাইরে বৃষ্টির সাথে ঝড়ো হাওয়াও বইছিলো। নিপা দরজার কপাট ধরে রায়হান যাওয়ার পথে চেয়ে থাকে। রায়হান ধীরে ধীরে হেঁটে গিয়ে জঙ্গলের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া পিচ ঢালা রাস্তাটায় উঠে। বাইরের বৃষ্টির ঝাপটায় নিপার শাড়ির একাংশ ভিজে যায়। তবুও নিপা দাঁড়িয়ে রয়। তার চোখের সিমানায় যতক্ষণ রায়হান রয়েছে, সে পথপানে চেয়েই রইবে। 

 

দূরে কোথাও বড় বাজ পড়ে। মেঘলা আকাশ আজ টন কে টন বর্ষণ করার জন্য এসেছে বোধহয়। বৃষ্টি কমার নাম গন্ধই নেই! 

 

_____

 

দিথী জানালার পাশে হেলান দিয়ে বসে আছে। জানালার একসাইড লাগানো। আরেক সাইড দিয়ে হালকা দিনের আলো ঘরে ঢুকেছে। তবে তাও বৃষ্টির ঝাপটায় নিয়ে। দিথীর মন আজও নিভে যাওয়া মোমের মতো নিস্তেজ। চোখের পাতায় পলক পড়ছেনা। মুখ শুকিয়ে গিয়েছে। কাল সারারাত ঘুমায়নি সে। কাঁদতে কাঁদতে চোখ শুকিয়েছে। এখন একফোঁটা পানি ফেলবারও যো নেই তাতে। 

দিথীর ফোন বেজে উঠে। রিংটোনের শব্দটা দিথীর ঘোরটাকে কিছুটা কাটায়। টেবিলের উপর থেকে ফোনটা হাতে নেয়। শাহারিয়া ফোন দিয়েছে। দিথী ফোনটা রিসিভ করে কানে তুলে। ওপাশ থেকে শাহারিয়া হন্তদন্ত হয়ে বলে উঠে,

‘ বউজান, তুমি ঠিক আছো তো! আমি কাল রাত থেকে কতবার ফোন দিচ্ছি। বারবার তোমার ফোন বন্ধ বলছে। সামিহা, শাশুড়ি মা কেউই ফোন তুলছে না। তুমি ঠিক আছোতো! ‘

‘ হ্যা আমি ঠিক আছি।’

‘ তোমার ফোন কই রাখছিলা! ফোন ধরতেছিলা না কেনো? ‘

‘ সবার ফোন আলমারিতে ঢুকায় রাখছিলো। বাড়িতে কালকে অনেক লোক আসছিলো। ফোন এদিক সেদিক রাখলে চুরি যেতে পারে তাই সামিহা ফোনগুলো আলমারিতে ঢুকিয়ে রাখছে। কোথায় তুমি এখন। নাস্তা করছো! ‘

‘ আমি বাসায়। হ্যা একটু আগে করলাম। তুমি খাইছো! ‘

‘ না। খাবো একটু পর। ‘

‘ একটু পর আবার কেনো! কান্না করতে করতে তো গলা বসায় ফেলছো। যাও, যায় নাস্তা করে নাও। ‘

‘ হমম করবো একটু পর। মুখ ধুইনি এখনো। ‘

‘ আব্বার জানাজা কখন হইছিলো! ‘

‘ পরসু বিকালে। ‘

‘ বাড়ি থেকে কে কে আসছিলো! ‘

‘ আব্বা আর মা। ‘

‘ আফাজ যায় নাই! ‘

‘ না ও আসেনি। ‘

‘ কেউ আমার কথা জিগাইছিলো নাকি! ‘

‘ আমাকে জিগায় নি। সামিহাকে বলে বলছিলো। ও বলছে তুমি আসোনি। ‘

‘ এখন কী এবাড়িতেই না ওবাড়ি গেছো! ‘

‘ এবাড়িতেই। ‘

‘ কেউ আমার বিষয়ে জিগ্গেস করলে এড়িয়ে যেও। আর মা-বাবা যদি বলে যে কেনো আসিনি, তাইলে বলিও যে আমি চট্টগ্রাম গেছি অফিসের কাজে। ঠিক আছে! ‘

‘ আচ্ছা। ‘

শাহারিয়া গলার সুর নরম করে। বলে,

‘ নামাজ পড়িও। নামাজ ছাড়িও না। আর ২-১টা দিন থাকেই চলে আসিও। এখানে একলা একলা আমার অসহায় লাগতেছে।‌ মনে হইতেছে আমার জীবনে কী যেনো নাই, কী যেনো নাই। জীবন কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। ‘

দিথীর মুখে এই প্রথম বার একটু হাঁসি ফুটে উঠে। দিথী হাঁসি মুখে বলে,

‘ দুইটা দিন নাই, তাতেই অসহায় লাগতেছে! ‘

‘ লাগবেনা! আমি এখন অফিসের কাজেও ঠিক মতো মন দিতে পারতেছিনা। অফিস থেকে তাড়াতাড়ি চলে আসে ঘরে তোমার ছবি দেখে সময় কাটাই। এখন সকালে আর ‌কাউকে কোরআন পড়ে শুনাইতে পারিনা। ভোরে ভেজা ঘাসে কারো সাথে খালি পায়ে হাঁটতে পারিনা। চরম দুর্ভোগ নামে গেছে আমার জীবনে। ‘

দিথী হাসতে থাকে। বলে,

‘ হা হা হা। বউ পাগলা হয়ে গেছো দেখি! ‘

‘ হইলে হইছি একটু, তোমার জন্যই তো হইছি। আর কারো জন্য তো না। ‘

‘ আমি আজ দেখি, ওবাড়িতে যাইতে পারি। তারপর কাল সিলেট চলে আসবো। ‘

‘ সত্যি! কখন আসবা আমাকে বলে রাখিও। আমি রুমানকে বলবো গাড়ি নিয়ে যাইতে। আসার সময় মা’কে  বাদাম দিতে বলিও তো। আগেরবার যেগুলা আনছিলাম সব শেষ। ‘

‘ আচ্ছা ঠিক আছে। রাখলাম এখন, মুখ ধুইতে হবে। বাসী মুখে এখনো আছি। ‘

‘ এখনি যাবা! আরেটু থাকোনা। কথা বলি। ‘

‘ শখ মিটেনাই! দিন দিন তোমার শখ কী বাড়তেছে নাকি আরো! ‘

‘ একটু আধটু বাড়তে হয় বুজছো। বিয়ের আগে প্রেম করতে পারিনি, তাই এখন প্রেম করবো। যখন মন, তখন করবো। ‘

দিথী হাসে। এই একটা মানুষই তাকে যেকোনো পরিস্থিতিতে মুখে হাসির রেখা এনে দিতে পারে। সব দুঃশ্চিন্তা, হতাশা মুহুর্তেই দূর করে দিতে পারে। শাহারিয়া আর দিথী কথা বলতে থাকে নিজেদের মতো করে। দুইজনেই কথার মাঝে মাঝে হেঁসে উঠে। নানা মজার আলাপে মেতে উঠে। 

 

দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে দুইজনের প্রেম আলাপ শুনছে সামিহা আর শেফালী। তাদের মুখেও দুষ্টু মিষ্টি হাসি। সাথে আবার ছোট্ট নিবিড় কেউ নিয়ে আসছে বড়দের প্রেম দেখানোর জন্য। নিবিড় সামিহা আর শেফালীর মুচকি মুচকি হাসি আর ভিতরের দিথীর প্রেম বাক্য শুনে মনে মনে বলে,

‘ ইয়ে ইনলোক ক্যায়া কার রাহে হে। মেরে সামাজমে তো কুচ ভি নেহি আরাহা! ‘

 

_____

 

সাপের রাজ্যে থিমপার। আর এই রাজ্যের মুকুট মাথায় উঠেছে রাজা জুডাসের। জুডাসের আস্তানায় একপাশ সাপেদের বাসস্থান। সেখানে নানা প্রজাতির দেশি ও বিদেশি সাপ ফণা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। জুডাস এক সাপের মাথায় আলতো করে আদর করে। তার পড়নের ভারি রাজার পোশাক। হাতের প্রত্যেকটা আঙ্গুলে সাপের মাথা খচিত আংটি। জুডাস সাপগুলোর মধ্যে হতে একটা মাঝারি আকৃতির সাপ হাতে নেয়। সাপটা জুডাসের হাত পেঁচিয়ে ধরে ফণা তুলে তাকায়। জুডাস উঠে দাঁড়ায়। এগিয়ে আসতে থাকে। তার সিংহাসন আর কিছুটা দূরেই। সিংহাসনের সামনে একটা লোককে ঘোড়া আকৃতির মতো করে ফ্লোরে হামাগুড়ি দিয়ে ধরে রেখেছে জুডাসের লোকেরা। তাদের সবার কাঁধেই বন্দুক। শরীরে সবুজাভ রঙয়ের পোশাক। জুডাস সাপ নিয়ে এগিয়ে আসে। ঘোড়া হয়ে থাকা লোকটা ভয়ে কাঁপছে। জুডাস এসে লোকটার মুখের সামনে হেলে বসে। সাপ ফণা তুলে তার দিকে‌। ছোবল দিতে যায়। লোকটা ভয়ে চিৎকার করে উঠে। তখনই জুডাস হাত সরিয়ে নেয়। হাসতে থাকে। লোকটা অনুনয় সুরে জুডাসের কাছে মাফ চাইতে থাকে। জুডাস উঠে দাঁড়ায়। লোকটার একপাশে এসে তার গার্ড দের ইঙ্গিতে বলে ছেড়ে দিতে। গার্ডরা লোকটাকে ছেড়ে পিছিয়ে দাঁড়ায়। লোকটার হাত পা বাঁধা ছিলো। তাই চাইলেও পালাতে পারতোনা। লোকটা ঘোড়া অবস্থা থেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। দুই হাত একখানে করে ক্রন্দনরত মুখে জুডাসের কাছে মাফ চাইতে থাকে। জুডাস জোড়ে হেসে উঠে। তার হাঁসি পুরো সাপের নগরী যেনো কাঁপিয়ে তুলছে। গার্ডদের শরীরে এক ঠান্ডা ‌স্রোত বয়ে যায়। জুডাসকে তারা মারাত্মক ভয় পায়। জুডাস হাঁসি থামায়। লোকটার সামনে হেলে বসে। হাতে জড়ানো সাপটাকে আদর করতে করতে বলে,

‘ শাহারিয়া মারা গেছে না! এই খবর তো তুইই এনেছিলি! ‘

‘ আমার ভুল হইয়া গেছে বস। আর, আর ভুল হইবো না। মাফ কইরা দেন। ‘

‘ মাফ! তুই জানিস না জুডাসের কাছে ছোট্ট থেকে ছোট্ট ভুলেরও কোন মাফ নেই! (একটু থেমে) শাহারিয়া যে বেঁচে আছে। এই খবরটা আগে দিলেই তো পারতি। তাইলে তোকে এই অকালে জান দিতে হইতো না! ‘

‘ বস, বস আমি জানতাম না যে শাহারিয়া গুটিবাজি করছে। বস, আমি আপনারে প্রভু মানি বস। আমারে মাফ কইরা দেন। আমারে শেষবারের মতো মাফ কইরা দেন। ‘

‘ আমাকে প্রভু মানিস! ভালো ভালো। তবে তোর এটাও জানা উচিত, প্রভুরা যখন ইচ্ছা তখনই কিন্তু তার অনুগতদের জান নিয়ে নেয়। কী! নেয় না! ‘

বলেই জুডাস লোকটার দিকে ফিরে তাকায়। লোকটা ভয়ে কান্না শুরু করে দেয়। বারবার মাফ চাইতে থাকে। জুডাস হাঁসতে থাকে পিশাচ রুপি হাসি। জুডাস হাঁসতে হাঁসতে তার হাত নামায়। হাত থেকে সাপটা নেমে যায়। জুডাস উঠে দাঁড়ায়। তার সিংহাসনের দিকে ফিরে চলে যেতে থাকে। যেতে যেতে হাত উঠিয়ে ইশারা করে। তখনই পিছনে দাড়ানো গার্ড রা বাধ্যের মতো ‘ইয়েস স্যার’ বলে উঠে। তারা তাদের পকেট থেকে একটা ছোট্ট কন্ট্রোলার বের করে। সেটায় থাকা এক লাল বোতামে চাপ দেয়। 

সাথে সাথেই হাত-পা বাঁধা লোকটা যেইখানে ছিলো সেইখান কার মাটিটা কিছুটা উঠে যায়। গার্ড রা কন্ট্রোলারে থাকা হাতল নাড়ায়। হাত-পা বাঁধা লোকটাকে নিয়ে সেই উঁচু মাটিটা চলে যেতে থাকে দেওয়ালের দিকে। তখনই দেয়াল উঠে যায়। ভিতরে এক জেল খানা। সেটার সামনের দরজাটাও উঠে যায়। হাত পা বাঁধা লোকটাকে নিয়ে মাটিটা সেখানে নেমে ভূমির সাথে মিশে যায়। জুডাস হাত থেকে নামা সাপ টাও বেয়ে বেয়ে চলে আসে জেল খানার ভিতরে। গার্ডরা বোতাম চেপে জেলখানার দরজা নামিয়ে দেয়। তখনই জেলখানার ভিতরে উপর থেকে এক গুচ্ছ কালো কুচকুচে সাপ পড়ে। সেগুলো পড়া মাত্রই ছুটে আসে লোকটার দিকে। লোকটা ‘বাচাও বাঁচাও’ বলে চিৎকার করে উঠে। সাপ গুলো এসে তার শরীরকে খেতে শুরু করে। খুব দ্রুত খেতে থাকে। লোকটার চিৎকার, আর্তনাদে পাতালপুরী কেঁপে উঠে। কতগুলো সাপ লোকটার দেহের মাংস খেয়ে খেয়ে গর্ত করে লোকটার দেহের ভিতরে ঢুকে পড়ে। রক্তে ভেসে যায় পুরো জেলখানার ফ্লোর। তখনই তার পেট ফুটো করে ঢুকা এক সাপ তার চোখ ভেদ করে বেড়িয়ে আসে। বেড়িয়ে এসে আবার গলায় খেয়ে গর্ত করে সেই গর্তে ঢুকে যায়। নিমেষেই চোখের পলকে সব সাপ গুলো লোকটার দেহে গর্ত করে দেহের ভিতরে ঢুকে তার সবকিছু ছিন্নভিন্ন করে খেতে থাকে। লোকটা এক তীব্র জন্ত্রনার সাথে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। পুরো শরীরে হাজারো গর্ত থেকে সাদা রঙের পুঁজ বের হতে থাকে। আঠালো সেই পুঁজ ফ্লোরে একসাথে জমা হয়ে ফেনা তৈরি করে ফেলে। 

 

সিংহাসনে এসে বসে জুডাস। পায়ের উপর পা তুলে সিংহাসনের হাতলে হাত রাখে। আঙ্গুলের পর আঙুল উঠাতে আর নামাতে থাকে। দূরে থাকা গার্ড দের উদ্দেশ্য করে বলে উঠে,

‘ আজ রাতের মিশন যেনো কিছুতেই না ভেস্তে যায়। যদি বিফল হও, তবে তোমাদের পরিণতি কিন্তু এর থেকেও খারাপ হবে। ‘

 

গার্ডরা ভয়ে মাথা নিচু করে ফেলে। মাথা নাড়িয়ে হ্যা সূচক ইঙ্গিত দেয়। জুডাসের ঠোঁটের কোনে ফুটে উঠে এক রহস্যময় হাসি! 

 

চলবে ,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

 

(একসাথে দুটো পর্ব পোস্ট করা হয়েছে। পরবর্তী পর্বের লিংক কমেন্টে দেওয়া আছে 👇)

 

উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন:: ২(মুখোশ)

পর্ব:: ৮৭

লেখক:: মির্জা শাহারিয়া

 

উপন্যাস :: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন :: ২(মুখোশ)

পর্ব :: ৮৮ (🟢বোনাস পর্ব🟢)

লেখক :: মির্জা সাহারিয়া 

 

    বিকেল ৩ টা। বৃষ্টি কমেছে। তবে এক দু ফোঁটা এখনো পড়ছে। আকাশের মেঘ এখন কিছুটা সাদা বর্ণ ধারণ করেছে। বাতাসে বইছে ঠান্ডা আবহ। 

শিউলি বেগম আর নিপা আঙিনা দিয়ে হেঁটে বারান্দার দিকে আসছে‌। তাদের উপর ছাতা ধরে রয়েছে লায়লা। নিপা শিউলি বেগমের কাঁধে হাত দিয়ে পুরো ভর শিউলি বেগমের উপর দিয়েছে। তারা তিনজনই এসে বারান্দার সামনে দাঁড়ায়। শিউলি বেগম নিপাকে ধরে সাবধানে বারান্দায় তুলতে থাকেন। হাঁক দিয়ে ডাক দেন,

‘ সুমু,,,,, সুমু,,,,, ঘর থেইকা চিয়ার ডা আনতো। ‘

 

সুমু হুড়মুড় করে বেড়িয়ে আসে ঘর থেকে। নিপাকে শিউলি বেগমের কাঁধ ধরে থাকতে দেখে তাড়াতাড়ি ঘরের ভিতরে চলে যায় চেয়ার আনতে। পিছন থেকে লায়লা ছাতাটা বন্ধ করে গ্রিলের দরজার একপাশে রাখে। সেও নিপাকে ধরে বারান্দায় উঠতে সাহায্য করে। ভিতর থেকে একটা প্লাস্টিকের চেয়ার নিয়ে বের হয়ে আসে সুমু। এসে বারান্দার দরজার পাশেই রাখে। নিপাকে আস্তে করে সেখানে বসিয়ে দেন শিউলি বেগম। সুমু অবাক হয়ে তাদের দেখছে। শিউলি বেগম পানি আনতে বলেন। সুমু তাড়াতাড়ি ডায়নিং টেবিলের দিকে ছুট লাগায়। বাড়িতে হই হুল্লোড় শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে ফুলমতি আর হনুফা। ফুলমতি ঘর থেকে বেড়িয়েই নিপাকে এমন কাহিল অবস্থায় দেখে অবাক হয়ে বলে,

‘ মা, নিপা আপুর কী হইছে! ‘ বলতে বলতে এগিয়ে যায় সেদিকে। হনুফা চুপচাপ তার পিছু পিছু যায়। সুমু একগ্লাস পানি নিয়ে ছুটে আসে। শিউলি বেগমকে দেয়। শিউলি বেগম তা নিপাকে খাইয়ে দিতে থাকেন। বাড়ির আবহাওয়া যেনো মুহুর্তেই কিছুটা থমথমে রূপ ধারণ করে। তবে এতো হইহুল্লোড় শুনেও আফাজ তার ঘর থেকে বেড়োয় নি। 

 

নিপা এক ঢোকে পুরোটা পানি খেয়ে নেয়। তার মুখ দেখে এখন মনে হচ্ছে, সে যেনো জান ফিরে পেলো। তার চারপাশে ফুলমতি, হনুফা, সুমু উৎসুক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। নিপা সোজা হয়ে আরাম করে বসে। সুমু, ফুলমতি, হনুফা একে অপরের দিকে চায়। তারপর শিউলি বেগমের দিকে তাকিয়ে ফুলমতি বলে,

‘ মা। নিপা আপুর কী হইছিলো! তুমি আপুকে নিয়ে কোথায় গেছিলা! ‘

‘ কই আর যামু। ক্লিনিকে গেছিলাম। ‘ শিউলি বেগম স্বাভাবিক সুরেই বলেন।

‘ ক্লিনিকে? নিপা আপুর কী শরীর খারাপ! নিপা আপু। তোমার কী হইছে! ‘ সুমু বলে।

‘ হয়নাই হয়নাই। হইবো। তোগো আপু তো ঐদিকে ঘটনা ঘটাইয়া ফেলছে! ‘ শিউলি বেগম হাসি মুখে বলেন। 

‘ ঘটনা! কী ঘটনা! আর তোমরা আসার সময় এতোটা সিরিয়াস ছিলে, এখন আবার মজার মুডে চলে গেলা। কী হইতেছে কিছুই আমার মাথায় ঢুকতেছে না। ‘ সুমু অবাক হয়ে বলে। 

‘ আওনের সময় সেই হামিদুলের বাড়ির ঐদিকেই ভ্যান আমাগো নামায় দিছে। রাস্তায় কাঁদা। এরলাইগা বাকিডা পথ হাইটা আইতে হইছে। আর আইতে আইতে নিপা কাহিল হইয়া গেছে।এরলাইগা তাড়াতাড়ি আইয়া আগে অরে পানি খাওয়াইলাম। ‘

‘ এই ছোট্ট বিষয়ের জন্য এতো সিরিয়াস হয়ে গেছিলা! আমি আরো ভাবছিলাম কি না কি। ‘ ফুলমতি বলে।

‘ খালি এইডাই না। কাহিনী তো আরো আছে। কীরে নিপা। কমুনি এগোরে! ‘ মজার ভং ধরে বলেন শিউলি বেগম। 

‘ আপু, তুমি বলোতো। মা যে কী বলতে চাইতেছে কিচ্ছু বুঝতেছিনা। ‘ নিপার কাঁধে হাত রেখে সুমু বলে। নিপা লজ্জায় মাথা নিচু করে নেয়। শিউলি বেগম বলে উঠেন,

‘ ভাবছিলাম মাইয়ার আগেই নিজে মা হমু। কিন্তু এই মতিনডা, হের ইলেকশন মনে হয় না এই জীবনে শ্যাষ হইবো। এরলাইগা আমার মাইয়াই আমার আগে গোল দিয়া দিলো। ‘

‘ নিপা আপু মা! এই সুমু, সত্যি নাকি রে! ‘ ফুলমতি বলে।

‘ আমি কীভাবে জানবো। এ নিপা আপু। তুমি কী সত্যিই মা হতে চলেছো! ‘

‘ আরে হ রে হ। বেক্কেলের দল ডি এহনো বুঝে নাই। নিপা প্রেগন্যান্ট। খাস বাংলায় যারে কয় পোয়াতি। কীরে, পোয়াতি। তোরে আইজ থে পোয়াতি নিপু কইয়া ডাকমু। হা হা হা। ‘

‘ আরে মা। থামোতো। সবসময় খালি মজা আর মজা। ‘ লজ্জা মাখা মুখে নিপা বলে। 

‘ আপু!!! তুমি মা,, মানে আমি খালা হবো! এই সুমু,,, তুইও তো তাইলে খালা হবি! ‘ উৎফুল্ল হয়ে ফুলমতি বলে।

‘ আমাদের বাড়িতে ছোট্ট অতিথি আসবে! ইশশ্, আমারো যদি বিয়েটা হয়ে যাইতো! তাইলে আমারো,,,,’

সুমু কথা বলতে বলতে চোখ বুজে জিহ্বা কামড়ে ধরে। কী বলতে কী বলে ফেলতেছিলো ও! এদিকে সবাই সুমুর কথা শুনে হাসিতে ফেটে পড়ে। 

হনুফা সবার হাঁসি আর তারা কী নিয়ে কথা বলতেছে তা বুঝার চেষ্টা করতেছে। কিন্তু সবই যেনো তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। সে সুমুকে বলে উঠে,

‘ এই। পোয়াতি কী! এইডা কী খাওয়ার জিনিস! ‘

তার কথা শুনে সবাই আরো হাসিতে ফেটে পড়ে। হনুফা মাথা চুলকাতে চুলকাতে এদের হাসির কারণ খুঁজতে থাকে। শিউলি বেগম হাসি থামাতে থামাতে বলেন,

‘ ওহ, আইজ মেলা হাসলাম। এতোডি মাইয়া একলগে আইজ আমারে হাসায়া মারলো। (হনুফার দিকে ফিরে) পোয়াতি মানে পেডে বাচ্চা আছে। বাচ্চা হইবো। ‘

‘ বাচ্চা! মানে ছোট বাচ্চা! এই মেয়েটা পোয়াতি! তার বাচ্চা হবে!’ নিপাকে দেখিয়ে হনুফা বলে। 

‘ হ। মোর মাইয়ার পেডে বাবু আইছে। হের বাচ্চা হইবো। (সুমু, ফুলমতির দিকে ফিরে) আইজ বৃষ্টি হইছে, তাও ক্লিনিকে কী ভিড়! ডাক্তারের সিরিয়ালই দেওয়া যাইতাছিলো না। ডাক্তার কইলো দেড় মাস চলতাছে।‌ অন্যান্য মাইয়াগো ২ মাসের দিকে লক্ষণ দেখা যায়, নিপার ক্ষেত্রে বলে আগেই দেহা দিছে। আমার মাইয়া বইলা কথা। আমারো তো এমন এক-দেড় মাসের দিকেই সব লক্ষণ দেখা দিছিলো। বুজছো, চালাক মায়ের চালাক মাইয়া। এরলাইগাই আগে ভাগেই সব টের পাইয়া গেছে। হা হা হা। ‘

হনুফা তখনই শিউলি বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠে,

‘ ও হাসাহাসি আফা। শুনোনা।‌’ 

শিউলি বেগম হাঁসি থামিয়ে হনুফার দিকে তাকান। বলেন,

‘ কীহ! ‘

‘ আমারও পোয়াতি হইতে ইচ্ছা করতাছে। আমিও পোয়াতি হমু।’

‘ তাইলে তোমার লাইগা পোলা দেখতাছি খারাও। তোমারেও বিয়া দেওয়া লাগবো। বিয়া কইরা তারপর পোয়াতি হইয়ো। হা হা হা। ‘

‘ না আমি এহনি পোয়াতি হমু। ও সুমু। ক না। আমিও পোয়াতি পোয়াতি খেলমু। ‘

‘ হোপ। আগে তোর বর খুজ। তারপর পোয়াতি হইস।’ 

‘ ঐ তোর টা দেনা। তোরটা সুন্দর আছে। ‘ 

‘ তোরে আমি, তোরে আমি পিটায় ভর্তা বানাবো। আমার বরের দিকে নজর দিতে গেছিস! ‘

হনুফাকে তাড়া দেয় সুমু। হনুফা ছুটে বারান্দার দরজা দিয়ে বেড়িয়ে পালিয়ে যায়। শিউলি বেগম সুমুকে থামিয়ে দেয়। বলে,

‘ বেশি লাফ-ঝাপ কইরো না। নিপার গাঁয়ে লাগতে পারে। নিপা, রায়হান কী দিনাজপুর গ্যাছে! ‘

‘ হ্যা মা। সকালেই চলে গেছে। ‘

‘ কাইলকার বমি আর মাথা ঘুরার বিষয়ডা অরে কইছিলি! ‘

‘ না মা। আমি শিওর হয়ে তারপর বলবো বলে কাল এই বিষয়ে কিছু বলিনি। তবে আজ ফুল আনতে বলছি। ফুল আনলে তখন ওর থেকে ফুলটা নিয়ে ওকেই দিবো, আর এই সারপ্রাইজ টাও দিবো। সাথে আইসক্রিমও আনতে বলছি। ‘

‘ ভালো‌। বুদ্ধি আছে তোর। চল এহন ভাত খাইয়া নে। আসরের পর আমি আর লায়লা মিল্লা তোরে বাড়ি দিয়া আমুনে। চল। ‘

‘ ডায়নিং টেবিলে ভাত খাবো না। ঘরে নিয়ে আসো। তুমি খাইয়ে দেও। অনেক দিন হলো তোমার হাতে ভাত খাইনি। ‘

‘ আইচ্ছা আইচ্ছা আয়। সুমু, তোর সাথী খালা আর আঁখি কী ঘুমায়! ‘

‘ হ্যা মা। ওরা দুপুরের খাবার খায় শুইছে। ‘

‘ ওহ। আচ্ছা তাইলে তুই একটু বিছানাডা ঝাড় দিয়া দেতো। আমি ওরে কয়ডা ভাত খাওয়াইয়া দেই। ‘

‘ আচ্ছা মা। ‘

শিউলি বেগম নিপাকে চেয়ার থেকে ধরে উঠান। তবে নিপা এবার নিজে নিজেই স্বাভাবিক ভাবে হাঁটতে পারছিলো। নিপা,শিউলি বেগম,সুমু ঘরে চলে যায়। লায়লা চলে যায় হুনুফাকে খুঁজতে। আর ফুলমতি যায় ডায়নিং টেবিলের দিকে ভাত আনতে। 

 

         বিছানায় হেলান দিয়ে বসে রয়েছে আফাজ। চোখ টলমল। পাশের খোলা জানালা দিয়ে বৃষ্টি পরবর্তী ঠান্ডা বাতাস বয়ে আসছে। ঘরের দরজা ভিড়িয়ে দেওয়া। ঘরের লাইট বন্ধ। খোলা জানালা দিয়ে যতটুকু আলো আসছে তাই ঘরকে আংশিক আলোকিত করে তুলেছে। আফাজের হাতে ছিলো আলিশার দেওয়া চিঠিখানা। পাশেই বিছানায় পড়ে আছে ‘শেষ বিকেল ‘ বইটা। চিঠিটার লেখা গুলো আজ যেনো জীবন্ত এক ব্যাথা হয়ে আফাজ বুক ছাড়খাড় করে দিচ্ছে। আফাজ চোখের পানি মুছে। কিন্তু চোখের জল বাঁধ ভাঙা কোন নদের মতো আবার বইতে থাকে আফাজের গাল বেয়ে। আফাজ হেলান দেওয়া হতে সোজা হয়ে বসে। চিঠিটাকে দুইহাত দিয়ে তার সামনে ধরে। এইতো সেদিনই চিঠিটা পেলো সে। শুধু চিঠির মানুষটা মহাকালের তোড়ে হারিয়েছে অসীমে। তাছাড়া তার স্মৃতি! সে তো আমরণ প্রেম হিসেবে আফাজের হ্রদপিন্ডে গেঁথে আছে। আলিশার সেই হাসি মুখ। তাদের দুইজনের কল্পনাতিত শেষ বিকেল, সাদা কাগজ রাঙানো যুগল ছবিদয় সব আজ আলিশার স্মৃতির মহাসাগরে আফাজকে ভাসায়। 

আফাজ চিঠির দিকে তাকায়। আজ সকাল থেকে কতশত বার যে পড়েছে তা সে জানেনা, তবুও কেনো জানি তার ক্ষুধা মিটছে না। তার মন বারবার পড়তে চাইছে। আফাজ চোখের পানি মুছে। পড়তে শুরু করে চিঠিটাকে, আবারো হারিয়ে যায়, সেই অতীত কালস্রোতে ভেলা ভাসিয়ে।

 

“প্রিয় শেহওরান,

 

আপনার আসল নাম জানিনা, তাই শেহওরান বলেই সম্বোধন করলাম। আপনি যখন আমার আঁকা ছবিটা দেখছেন, আমি তখন বুকশেলফের কাছে এসে এই চিঠিটা লিখছি। ভাবছি যদি আপনি ছবিটার সেই দুজনকে চিনতে পারেন তবেই এই বইসহ চিরকুট টা আপনাকে দেবো। হয়তো আপনি চিনতে পেরেছেন। তাই এখন চিরকুট টা আপনার হাতে। 

আমি জানি একজন মেয়ে কখনোই একজন ছেলেকে সচরাচর ভালোবাসার কথা আগে জানায় না। প্রেম চিঠিও আগে ছেলেরাই মেয়েকে দেয়। তবে আমি আপনার চিঠি পাওয়ার আগেই নিজেই আপনাকে নিয়ে লিখলাম। আমি জানিনা আপনি আমার কী জাদু কাঠি করেছেন। আপনার ব্যাক্তিক্ত, আপনার কথার ভাঁজ, আমার অন্তর এতোটা কাছের করে নিয়েছে যে আমি তা ভাষায় ব্যাক্ত করতে পারছিনা। আপনি কী আমায় নিয়ে কিছু অনুভব করেন! আমি করি। সেদিন ঐ জলপাই গাছের নিচে বসে আপনার সাথে কথায় মশগুল হওয়ার পর থেকে সবসময় আমি আপনাকে অনুভব করি। কল্পনায় আপনাকে আমি আমার আপন কেউ হিসেবে দেখতে পাই। “শেষ বিকেল” বইটার শেহওরান চরিত্রের মতো করেই আপনিও আমার মনে ঢুকে গিয়েছেন। তবে আপনি শেহওরান নন, আপনি আপনিই। গল্পে শেহওরান আগে অপরূপাকে তার ভালোবাসার কথা জানিয়েছিলো। কিন্তু আমাদের বেলায় আমি জানাবো। আমি কাব্যের মতো করে নিজের অভিব্যাক্তি প্রকাশ করতে পারিনা। তাই নিজের মতো করেই বলি ,,? আমি না আপনাকে খুব ভালোবেসে ফেলেছি। কতটা বেসেছি তা নিজেও জানিনা। হয়তো নিজের থেকেও বেশি, এই জগতে থাকা সব অমূল্য রত্নের থেকেও বেশি। হয়তো আপনি ভাবতে পারেন আমি কেমন মেয়ে। এভাবে করে নিজে থেকে ভালোবাসার চিঠি প্রেরণ করছি,,? ধরে নিন না এটা আমাদের ভালোবাসার একটা অংশ। কেনো সবসময় ছেলেদেরই প্রকাশ করতে হবে! মেয়েরাও করুক! থাকনা একটু অন্যরকম, আপনার আমার বেলায়,,! 

আপনি কাল চলে যাবেন। আবার কবে ফিরবেন, আমি জানিনা। হয়তো আপনিও শেহওরানের মতো অনেক দিন পর ফিরে আসবেন। তবে আমি যে আশা হারাবো, তা কিন্তু না। আমিও আপনার জন্য অপেক্ষায় থাকবো। অপরুপা যতটা ছিলো তার থেকেও বেশি। কথায় আছে না, অপেক্ষার ফল বেশি মিষ্টি হয় ,,!

 

আমার একটা আবদার, আবদার না ধরেন অনুরোধই। যেদিন আপনি আমার জন্য ফুল নিয়ে আসবেন সেদিন আপনি আমার আঁকা ছবিটার মতো এক সাদা পাঞ্জাবি পড়ে আসিয়েন,,! হাতে থাকবে এক গুচ্ছ জবা আর গাঁদা ফুলের বাহার। আমি সেদিন ঠিক আঁকা ছবিটার মতো করেই লাল টুকটুকে এক শাড়ি পড়বো, কাঁচের চুড়ি পড়বো। হয়তো মেহেদী দিতে পারবোনা, তবুও সেটার দরকার নেই। খোঁপা করে চুল বাধবো। আপনি আসবেন, আদর কন্ঠে আমায় ডাকবেন, আমি দৌড়ে এসে আপনাকে জড়িয়ে ধরবো। অবশ্যই কোন এক শেষ বিকেলে আসবেন। কারণ আমিও চাই, আমাদের সম্পর্কটা কোন এক শেষ বিকেলের সূর্যাস্তে রঙিন হোক। আমি আপনার সাথে ডানা মেলে উড়বো সেদিন। কেউ থাকবেনা আমাদের বাঁধা দেওয়ার।

 

আমার ফোন নেই। তাই কল কিংবা মেসেজে আপনার সাথে যোগাযোগ করতে পারবো না। মাঝে মাঝে আমায় চিঠি লিখবেন। আমিও লিখবো। আমার যদি একটা কবুতর থাকতো, তাইলে সেটার পায়ে আমার চিঠি বেঁধে আপনার উদ্দেশ্য পাঠিয়ে দিতাম। কিন্তু আমার তো কবুতর নেই। আপনি নিপা ভাবির ঠিকানায় চিঠি পাঠাইয়েন। আমি ভাবির কাছ থেকে নিয়ে পড়বো। তবে অবশ্যই একলা পড়বো। আমার মানুষটার প্রতিটা অক্ষর খুব মন দিয়ে পড়বো। 

আর লেখতে পারছিনা, এমনিতেই আমার হাতের লেখা খারাপ হয়েছে তাড়াতাড়ি লিখতে গিয়ে। আপনি হয়তো এতোক্ষণে ধরে নিয়েছেন আমার আঁকা ছবিটার মানে, আমি দেখতে পেয়েছি আপনি আপনার হাত ঘড়িটা উঠিয়ে মিলালেন। আপনিও তারমানে আমাকে ভালোবাসেন। আপনার মুখ থেকে ভালোবাসি কথাটা শুনার জন্য আমার ভেতরটা উতলা হয়ে যাচ্ছে। জানিনা কবে শুনতে পাবো। তবে আমি অপেক্ষা করে যাবো। আসবেন কিন্তু,,! 

শেষ বিকেলে হারিয়ে যাওয়া, স্মৃতি হাতড়ে বেড়ায়। নিঝুম রাতের অন্ধকারে, স্বপ্ন ধরার খেলায়! আমি মেলবো না আর স্বপ্নডানা, ঐ নীল মেঘেদের ছোঁয়ায়। আমি লিখবো না আর কাব্য কোনো, স্মৃতির ছেঁড়া পাতায়,,,! 

 

ইতি, 

আপনার খুব কাছের কেউ, ছদ্মবেশী নাম অপরুপা।”

 

আফাজ কান্না থামিয়ে রাখতে পারেনা। চিঠিটা যেনো আলিশা চরিত্রটাকে তার সামনে আবারো জীবন্ত করে তুললো। এই মেয়েটা এতোটা মায়াবী কেনো! মায়া জড়ানো তার সেই হাসিটা আজও কেনো আফাজ ভুলতে পারেনা! এই মায়াজাল কী সে কখনোই কাটিয়ে উঠতে পারবেনা! 

হঠাৎ ঘরের দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করে সুমু। আফাজ চিঠিটা ভাঁজ করে চোখ মুছতে থাকে। সুমুর মুখে থাকা হাসির রেখা কিছুটা নেতিয়ে যায়। আফাজ আবারো এক মৃত ব্যাক্তির স্মৃতিতে কাতর হচ্ছে। আজ সে আফাজকে আর ছেড়ে যাবেনা। যতক্ষণ না সে আফাজের সাথে ভাব করতে পারে, সে এই ঘর থেকেই যাবেনা। সুমু আবার তার মুখে হাসি এনে আফাজের বিছানার দিকে এগোয়। 

আফাজ চিঠিটা ভাঁজ করে বইয়ের ভিতর রেখে দেয়। দুইহাত দিয়ে চোখ মুখ মুছে নিতে থাকে। সুমু এসে বসে বিছানায়। আগে সে বিনা অনুমতিতে কখনো আফাজের বিছানায় বসেনি। চেয়ার টেনে তাতে বসতো। কিন্তু আজ বিছানায় বসেছে। আফাজ এতে কিছুটা অবাক হয়। সে গলা ঝেড়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলে,

‘ তুমি, তোমাকে না বলেছি রুমে ঢুকার আগে নক না করে ঢুকবে না! ‘

‘ ওহ সরি। আমি আসলে আপনাকে একটা খুশির খবর দিতে এসেছিলাম। তাই মনে ছিলোনা। জানেন, নিপা আপুর না বাবু হবে। ‘

‘ কোন নিপা! ‘

‘ নিপা নামের কয়টা ফুফাতো বোন আছে আপনার! ‘

‘ ও। নিপা। ভালো। ডাক্তার দেখিয়েছে! ‘

‘ হ্যা। কিছুক্ষণ আগেই ক্লিনিক থেকে আনলো। আপনি তো ঘর থেকে বেরই হলেন না। ‘

‘ আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। ‘

‘ ঘুমিয়ে ছিলেন না চিঠি পড়ছিলেন তা আপনিই ভালো জানেন। ‘

‘ আর কিছু বলবে! না বলার হলে আমাকে একটু একা ছেড়ে দাও। আমি একটু ঘুমাবো। ‘

‘ এইতো বললেন আপনি বলে ঘুমিয়ে ছিলেন! ‘

আফাজ সুমুর দিকে মুখে কাঠিন্য ভাব এনে তাকায়। সুমুর মুখ এখনো হাসৌজ্জল। আফাজ শুয়ে পড়তে নেয় বিছানায়, তখনই সুমু বলে,

‘ আমি আপনার আলিশার খুনিকে বের করতে আপনার সাহায্য করতে পারি। ‘

কথাটা শুনেই আফাজ থেমে যায়। তাড়াতাড়ি উঠে বসে। অবাক হয়ে বলে,

‘ কীভাবে! ‘

‘ আমার কাছে অলৌকিক শক্তি আছে। ‘

‘ কিন্তু দিথী ভাবি তো বলেছে তুমি স্বাধারণ কেউ। ‘

‘ হ্যা, তবে আবার অলৌকিক শক্তি আনতে পারবো। ‘

আফাজ তৎক্ষণাৎ সুমুর হাত ধরে। অনুনয় সুরে বলতে থাকে,

‘ প্লিজ, তুমি আমার আলিশার খুনিকে বের করে দাও। আমি, আমি তোমার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ হয়ে থাকবো। ‘

‘ কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে। ‘

‘ কী শর্ত! (একটু থেমে সুমুর হাত ছেড়ে দিয়ে) আমি তোমার সাথে সম্পর্কে জড়াতে পারবো না। ‘ বলেই মুখ ঘুড়িয়ে নেয় আফাজ। 

‘ সম্পর্কে জড়াতে হবে না। আমরা দুইজন ভালো বন্ধু তো হতে পারি! বেষ্টফ্রেন্ড! ‘

আফাজ সুমুর দিকে তাকায়। সুমু মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলে। আফাজ আবার বলে,

‘ শর্তটা কী! ‘

‘ এটাই। ‘

‘ শুধু বন্ধুত্ব! ‘

‘ ভালো বন্ধুত্ব। ‘

‘ তাহলে আমার আলিশার খুনিকে বের করে দিবা! ‘

‘ হ্যা। ‘

আফাজ তার এক হাত বাড়িয়ে দেয়। সুমু হাতের দিক থেকে নজর উঠিয়ে আফাজের দিকে চায়। আফাজের মুখের কাঠিন্যতা কমে এসেছে। তবে তার মুখে এখনো একটু অস্বস্তি ভাব বিদ্যামান। সুমু খুশিতে তাড়াতাড়ি তার হাত বাড়িয়ে আফাজের হাত ধরে। সে আজ এতোটা খুশি হয়েছে, যা বর্ণনার বাহিরে। আফাজ বলে,

‘ আজ থেকে আমরা বন্ধু। ‘

‘ ভালো বন্ধু। সবসময়, সবখানে চিরকাল থাকবো। ‘

‘ আপনি! ‘

‘ কে! ‘

বলেই সুমু পিছনে ফিরে তাকায়। দেখে তার সাথী খালা দরজার পাশে দরজার কপাট ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সাথী খালা ভিতরে আসতে যায়। কিন্তু তার হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিলো। আফাজ বলে,

‘ ধরো একটু উনাকে। ‘

‘ আপনার হাত ছাড়তে মন চাইছে না। ‘

‘ হারিয়ে যাচ্ছিনা‌তো।‌ উনি পড়ে যাবেন। উনাকে গিয়ে ধরো। ‘

আফাজ হাত টেনে নেয়। সুমু তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে সাথী বেগমকে ধরেন। ধরে নিজের কাঁধে তার ভর নিয়ে তাকে ভিতরে নিয়ে আসেন। আফাজ বিছানা থেকে নেমে একটা চেয়ার টেনে দিতে যায়। কিন্তু সুমু এনে সাথী বেগমকে বিছানায় বসিয়ে দেয়। আর তার পাশেই বসে পড়ে। আফাজকেও চোখের ইশারায় চেয়ারে বসতে বলে। তবে আফাজ বসে না। চেয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। সুমু, সাথী বেগমের দিকে তাকায়। বলে,

‘ খালামণি তুমি এখানে! ‘

‘ আমি সব কথা শুনেছিরে মা। আমি এবাড়িতে আসার পর থেকেই আফাজকে দেখছি। আলিশার জন্য তার বেকুলতা আমার ভিতরে আর সত্যকে চেপে ধরে রাখতে দিচ্ছেনা। আমি আজ তোমাদের কিছু কথা বলতে চাই। ‘

‘ কী কথা খালামণি! কোন সিরিয়াস কিছু কি! ‘

‘ আমি, আমি জানি কে আলিশাকে মেরেছে। ‘

কথাটা শুনার সাথে সাথেই আফাজের শরীরের রক্ত চলাচল বেড়ে যায়। সুমু অবাক হয়ে সাথী বেগমের দিকে তাকায়। সাথী বেগম বলতে শুরু করেন,

‘ সেদিন আমি আমার ঘরে শুয়ে ছিলাম। আমার পিঠের ব্যাথা ঐদিন খুব বেশি ছিলো। সারাদিন ঘর ছাড়া আমি একলা একলা বাইরে যেতে পারতাম না। খুব কষ্ট হতো। সময়টা হয়তো তখন দুপুর বেলা। বাড়িতে কোন পুরুষ মানুষ নেই। নিপা আর রায়হান কক্সবাজার গিয়েছিলো বেড়াতে। কে জানতো,‌ এই ফাঁকা বাড়িটা আলিশা আর তার মায়ের জন্য মৃত্যু ডেকে আনবে! ‘

‘ কে মেরেছে আমার আলিশাকে! বলুন। কে মেরেছে! ‘

‘ সোনালী। সোনালী নিজ হাতে আলিশা আর তার মাকে খুন করেছে। আলিশার মা বলে চিৎকার করে উঠা, মেয়েকে বাঁচানোর জন্য মায়ের চিৎকার, সবকিছু। সবকিছু সোনালী ধুলিসাৎ করে দিয়েছে। মেরে ফেলছে ও, খুব নিষ্ঠুর ভাবে মেরে ফেলেছে। ‘ বলেই সাথী বেগম কান্নায় ভেঙে পড়েন। 

আফাজ, সুমু দুইজনেরই‌ চোখ মুখ বড় বড় হয়ে যায়। আফাজের শরীরের রক্ত চলাচল তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছিলো। আফাজের চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকে। তার ‌চোখ লাল হয়ে গিয়েছে। আফাজ কঠিন গলায় বলে,

‘ সেই সোনালী! যে আমার পাশে বসে সেদিন কেঁদেছিলো! ‘

‘ হ্যা। হ্যা। সেই সোনালীই। সাথে, সাথে সুমনাও ছিলো। কিন্তু সুমনাকে নজরুল মেরে ফেলেছে। সুমনা তার পাপের শাস্তি পেয়ে গিয়েছে। ‘

‘ সোনালী এখন কোথায়! (চিৎকার দিয়ে) সোনালী কোথায়! ‘ 

‘ ও, ও খাঁন বাড়িতে পুলিশ আসার আগেই পালিয়ে গিয়েছে। ওকে, ওকে কেউ দেখেনি তারপর থেকে। ‘

আফাজ তৎক্ষণাৎ চিৎকার করে উঠে তার পাশের চেয়ার টা উঠিয়ে টেবিলের উপর এক জোড়ে আছাড় মারে। হঠাৎ এমন কিছুর জন্য সাথী বেগম আর সুমু প্রস্তুত ছিলো না।‌ তারা চমকে উঠে। ফিরে তাকায় আফাজের দিকে। আফাজের চোখের শিরা উপশিরা লালচে বর্ণ ধারণ করেছে।‌ চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। চেয়ার টুকরো টুকরো হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। আফাজের গাঁয়ে যেনো এ এক অসম শক্তি চলে এসেছে। তখনই আফাজ চকিতে ফিরে তাকায় দরজার দিকে। দরজার আড়ালে দাঁড়ানো একজন দৌড়ে ছুটে পালায়। আফাজ সাথে সাথেই দৌড়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়। সুমু কিছু বুঝে উঠতে পারে‌না। সে সাথীকে রেখে তাড়াতাড়ি উঠে বের হয়ে যায়। 

 

পুলিশ কনস্টেবল নয়ন বারান্দা দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে। তার পিছনে বাতাসের গতিতে দৌড়ে আসছে আফাজ। এবং এক পর্যায়ে আফাজ দৌড়াতে দৌড়াতে ঝাপিয়ে পড়ে নয়নের উপর।‌ নয়ন ফ্লোরে পড়ে যায়। আফাজ তাকে সোজা করে তার বুকের উপর বসে। তার কলাড় চেপে ধরে। রাগান্বিত কষ্ঠে বলে,

‘ তুই! তুই এখানে কী করছিলি! থানায় গেলে সবসময় তুই আমার আলিশাকে নিয়ে বাজে কথা বলতি। মন চাইতো তোর জিহ্বা টেনে ছিড়ে ফেলি। আলিশার কেস ফাইল আমাকে দিতিনা কেন! বল। তুই কেস ফাইলের কি করছিস বল! ‘

‘ আমি, আমি মতিন মেম্বাররে ডাকতে আইছিলাম। আমার, আমার কলাড় ছাড়েন। ‘

‘ তুই আমার আলিশার ফাইলের কী করছিস বল! তুই নিশ্চয়ই কিছু লুকাইছিস! ‘

‘ আমি, আমি কিচ্ছু জানিনা। আমি জানিনা সোনালি আফায় কই আছে। ‘

কথাটা শোনা মাত্রই আফাজের চোখ মুখ বড় হয়ে যায়। পিছনে দৌড়ে এসে দাঁড়ায় সুমু।‌ হাঁপাতে থাকে সে। আফাজ জোড়ে এক ঘুষি মারে নয়নের মুখে। কলাড় চেপে ধরে বলে,

‘ আমি তো তোরে সোনালীর কথা জিগাই নাই! তারমানে তুই জানতি সোনালী আমার আলিশাকে খুন করছে। তুই জানতি! ‘ বলেই আরো ঘুষি দিতে থাকে নয়নের মুখে। একের পর এক ঘুষিতে নয়নের মুখ ফেটে রক্ত বের হয়ে যায়। নয়ন তাকে থামতে বলে। সে কিছু বলতে চায়। সুমু এগিয়ে এসে আফাজকে বলতে থাকে,

‘ থামুন, থামুন উনি কিছু বলতে চাইছেন। ‘

আফাজ ঘুষি মারা থামায়। সে হাপাচ্ছে। নয়নের গাল,নাক ফেটে রক্ত পড়ছে। নয়ন কাঁপো কাপো গলায় বলে,

‘ সোনালী আপাই খুন করছে।‌ না না সোনালী আপা খুন করে নাই। আমি কিচ্ছু জানিনা। ‘

‘ সুমু বটিটা নিয়ে আসোতো। ও এভাবে মুখ খুলবে না। ওকে আমি কোপায় টুকরো টুকরো করে ফেলবো। ‘

সুমু তাড়াতাড়ি আফাজের আদেশ পাওয়া মাত্র রান্নাঘরের দিকে দৌড়ে যায়। 

 

এদিকে বাড়িতে হইহুল্লোড় শুনে শিউলি বেগম, নিপা, ফুলমতি তারা ঘর থেকে বের হয়। তখনই তাদের সামনে দিয়ে বাতাসের গতিতে রান্না ঘরের দিকে ছুটে চলে যায় সুমু। তারা কিছু বুঝে উঠার আগেই সুমু বটি হাতে রাগান্বিত হয়ে রান্না ঘর থেকে বেড়িয়ে দৌড়ে আসে। শিউলি বেগম, নিপা বটি দেখেই চিৎকার দিয়ে উঠে। তারা বারান্দার আরেকপাশে তাকায়। দেখে আফাজ একজনকে খুব ঘুষি মারছে। পুলিশি পোশাক দেখে শিউলি বেগমরা আরো ভয় পেয়ে যান, চিৎকার দিয়ে সুমু-আফাজকে থামতে বলেন।

সুমু বটি নিয়ে এসে আফাজের পাশে দাঁড়ায়। বলতে থাকে,

‘ ওকে, ওকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলুন। ওর মতো পুলিশ দের বাঁচার কোন অধিকার নাই। ‘

সুমুর হাত থেকে আফাজ বটিটা নিতে যায় তখনই নয়ন হাত জোড় করে বলতে থাকে,

‘ না না। আমি, আমি সব কইতাছি। আমারে মাইরেন না। ‘

আফাজ বটি নিয়ে কোপ দেওয়ার জন্য হাত উঁচিয়ে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

‘ বল, বল সোনালী কই! বল নাইলে এক কোপে মাথা আলাদা করে দিবো! ‘

‘ কইতাছি, কইতাছি। সোনালী আফা, সোনালী আফা নীলগিরি জঙ্গলের মাঝের এক কুঠিরে গাঁ ঢাকা দিছে। ঐ কুঠিরেই আছে।’

‘ কীভাবে বিশ্বাস করবো যে সোনালী ঐ কুঠিরেই আছে! তুই আবার কোন গুটিবাজি করতেছিস না তো! ‘ সুমু বলে। 

‘ না না। আমি কোন মিছা কইতাছি না। নীলগিরি জঙ্গলের মাঝ দিয়া যেই পাকা রোড টা গেছে। ঐ রোড, ঐ রোডের মাঝে একটা পুরান বাড়ি আছে। ঐ পুরান বাড়ি অপর পাশে সোজা ভিতরে কিছুদূর গেলেই একটা কাঁচা কুঠির ঘর পাইবেন। ঐহানেই সোনালী আফা আছে। ‘

‘ যদি তোর কথা মিথ্যা হয়রে! খোদার কসম, তোর রক্ত দিয়ে আমি গোসল করবো। ‘ রাগে কটমট হয়ে বলে আফাজ।

‘ আমারে ছাইড়া দেন। আমি সব সত্যি কইছি। আমারে ছাইড়া দেন। ‘

শিউলি বেগম, নিপা, লায়লা, ফুলমতি সবাই এগিয়ে আসে। আফাজ বটিটা সুমুর হাতে দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। কলাড় ধরে রক্তাক্ত নয়নকে টেনে তুলে। শিউলি বেগম চিৎকার দিয়ে বলেন,

‘ আফাজ, আফাজ ছাইড়া দাও। পুলিশ মারলে জেল হাজত হইবো। ছাইড়া দেও। ‘

‘ যেই পুলিশ দেশের গাদ্দারি করে, ঐ পুলিশের কোন দরকার নাই। ওকে তোমরা এখনি বেঁধে ঘরে আটকে রাখবা। আমি যাবো সেই কুঠিরে। ঐ সোনালীর শরীর থেকে আমার আলিশার প্রত্যেক বিন্দু রক্তের প্রতিশোধ নিতে। ‘

‘ কিন্তু,,,! ‘

‘ কোন কিন্তু না মা। তোমরা এখনি একে বাধো। (আফাজের দিকে ফিরে) চলুন, আমিও যাবো আপনার সাথে। ‘

‘ তুমি! তুমি কেনো! আমি একলাই সোনালীর জন্য যথেষ্ট। ‘

‘ আমরা তো এখন বন্ধু। এক বন্ধু আরেক বন্ধুর সবসময় পাশে থাকবে এটাই তো ভালো বন্ধুত্বের উদাহরণ। আমি আপনার সাথে যাবো। আপনার সহযোদ্ধা হয়ে। ‘

‘ ওকে বেঁধে ঘরে তালা মেরে রাখো। চাবি আমরা নিয়ে যাবো। ‘

বলেই ঘরের দিকে যেতে থাকে আফাজ। 

‘ ঐদিকে যাচ্ছেন যে! ‘

‘ তুমি এ বাড়িতে যত ধারালো জিনিস আছে সব নিয়ে আমার ঘরে এসো। আর সাথে লবণ, হলুদ,মরিচ এই তিনটার গুঁড়া রান্নাঘর থেকে নিয়ে আসো। সোনালীকে আমি এতো সহজে মারবোনা। তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে দিয়ে ওর জান কবজ করবো আমি। ‘

‘ ঠিক আছে। আপনি ঘরে যান। আমি সব আনছি। আর এটাকে আমার হাতে দিন। এর খবর আমি করতেছি। ‘ বলেই নয়নকে আফাজের হাত থেকে নেয় সুমু। নয়ন প্রায় আধমরা হয়ে গিয়েছে। সুমু তার কলাট ধরে আরেক হাতে থাকা বটিটা তার গলায় ধরে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

‘ আসে তোরে গরুর মতো জবাই দিবো। পুলিশ হয়ে কেমন গাদ্দারি করিস শালা! চল, চল। ‘ 

নয়নকে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যেতে থাকে সুমু। বটিটা নামিয়ে নেয়। এদিকে দাড়িয়ে থাকা শিউলি বেগম, আর বাকিরা অবাক হয়ে এই নতুন সুমু আর আফাজকে দেখছে। এই দুইজনকে যেনো তাদের কাছে একদমই অপরিচিত লাগছে। আফাজের রাগ, সুমুর পারিপার্শ্বিকতা। এই দুইয়ে মিলে যে যুগল তৈরি হয়েছে, তা যেনো ফুটন্ত রক্তের ন্যায়। 

আবহাওয়া থমথমে রূপ ধারণ করে। বাইরে জোড়ে হাওয়া বয়। হয়তো আবার বৃষ্টি নামবে। দিনের আলো ক্রমেই কমে আসতে থাকে। রাত ঘনিয়ে আসতে থাকে আনন্দপুরে। তবে এই রাত, এই রাত হয়তো এক চিরস্মরণীয় রাত হিসেবে আনন্দপুরবাসীরা মনে রাখবে। দেখতে চলেছে তারা, এই রাতকে এক ভয়াল রাতের উদাহরণ হিসেবে! 

 

চলবে ,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

 

(এটা সম্পূর্ণ টা মিলে একটা পর্বই হতো। কিন্তু দুই ভাগে আসতো। আমি দুই ভাগে না দিয়ে দুই পর্ব হিসেবে দিছি কারণ গল্প ১০০ পর্বের আগেই শেষ হয়ে যেতে পারে। এভাবে করে যদি পর্ব বাড়ানো যায় তাইলে আরকি সেঞ্চুরি করাটা সহজ হবে। আর আপনাদের কোন কষ্ট নাই কারন যেটা আগে এক পর্বের দুই ভাগে ভাগ হয়ে আসতো, সেটা এখন দুইটা আলাদা পর্ব হিসেবে আসছে। পাচ্ছেন কিন্ত একসাথেই! 

কী হতে চলেছে এরপর! গল্প কোন দিকে মোড় নিতে চলেছে? আপনার মূল্যবান মন্তব্য কমেন্টে জানাতে পারেন। দেখি কে কে গল্পের ভবিষ্যৎ আগেই ধরে ফেলতে পারে 😉 )

 

গল্প নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা করুন আমার গ্রুপে।

গ্রুপ লিংক 👇

https://www.facebook.com/groups/743016887019277/?ref=share_group_link

 

উপন্যাস :: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন :: ২(মুখোশ)

পর্ব :: ৮৮

লেখক :: মির্জা সাহারিয়া

 

উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন:: ২(মুখোশ)

পর্ব:: ৮৯

লেখক:: মির্জা শাহারিয়া

 

 বিকেল ৫ টা। এক পুরোনো পাকা রাস্তা চলে গিয়েছে আঁকাবাঁকা হয়ে সুদূর এক জঙ্গলের মাঝে। আকাশ খারাপ। মেঘের ঘনঘটা ক্রমেই বাড়ছে। মাঝে মাঝে ঠান্ডা হিমশীতল বাতাস বয়ে যাচ্ছে। সুদূরের মেঘ গর্জন এই আবহাওয়া টাকে আরো ভয়াবহ করে তুলছে।

 রায়হান হেঁটে আসছে। দুই এক ফোঁটা বৃষ্টি পড়ছে। হাতে ছাতা। তার মুখ যেনো এই অন্ধকার আকাশের থেকেও বেশি কালো। মনে এক অজানা ভয়। আজ রাতে কী হবে তা সে নিজেও জানেনা। এক হাতে টিফিন ক্যারিয়ার। খাবার গুলো সে খেতে পারেনি। চিন্তায় তার গলা দিয়ে আজ কোন দানাপানি নামেনি। তবে টিফিন ক্যারিয়ারের উপর একটা ছোট্ট ফুল রাখা‌। গোলাপ ফুল‌। নিপা নিয়ে যেতে বলেছিলো তাই এই একটা ফুল তার কাছে অবশিষ্ট থাকা কিছু টাকা দিয়ে কিনেছে। আইসক্রিম নিতে পারেনি। দোকানপাট আজ বেশির ভাগ বর্ষার জন্য বন্ধ ছিলো। রায়হান যেই পথ টা ধরে চলছে এটা সেই জঙ্গলের রাস্তাটাই। তবে এখন সে জঙ্গলের কাছাকাছি আসেনি। সে অনান্য দিন চৌড়চক হয়ে জঙ্গলের রাস্তায় ঢুকতো, আর তারপর নীলগিরি জঙ্গল পেড়িয়ে তাদের ছোট্ট কুঠুরি টায় আসতো। কিন্তু আজ সে যাচ্ছে উল্টো পথে। এই রাস্তাটা তাদের কুঠির পেড়িয়ে ফাঁকা ফসলি মাঠের মাঝ দিয়ে এসে মেইনরোডে মিলেছে‌। আজ সে মেইন রোড দিয়ে এই রাস্তায় প্রবেশ করেছে। অর্থাৎ সে এখন ফাঁকা ফসলি মাঠের অংশটার এদিক দিয়ে বাসা যাচ্ছে। এতে অবশ্য একটা কারণ আছে। সে আজ একটা চিরকুট পেয়েছিলো। সেই ফার্নিচার কারখানায়। সেখানে লেখা ছিলো এই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার কথা। রায়হান না চাওয়া সত্ত্বেও এই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে। মনে ভয়ের মাত্রা দ্বিগুণ। না জানি কী অপেক্ষা করছে সামনে। এই রাস্তাটা দিয়ে কেউ চলাচল করেনা। মেইন রোড দিয়েও এই রাস্তায় কেউ প্রবেশ করেনা। সবার ধারণা জঙ্গলে ভৌতিক কিছু আছে। তবে তা যে আসুভে ছিলো, আর এখন যে সেটা নেই তা আর তাদের অজানা। এই বিষয়টা শুধু মেম্বার বাড়ির লোকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। 

রায়হান হাঁটতে হাঁটতে বেশ অনেকটা পথ চলে আসে। দূরে ক্ষুদ্র পিঁপড়ার আকৃতি ন্যায় নীলগিরি জঙ্গল টা দেখা যাচ্ছে। আর জঙ্গলের প্রবেশ মুখেই তাদের কুঠুরি টা। সেটাও বেশ ছোট্ট দেখা যাচ্ছে। তার মানে সে এখনো অনেক দূরেই আছে‌। মেইন রোড থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে নীলগিরি জঙ্গল শুরু। বেশ দূরই আছে বলা যায়। এক দমকা হাওয়া সহ পানির ঝাপটা এসে পড়ে রায়হানের গায়ে। শার্ট আর লুঙ্গির একপাশে কিছুটা ভিজে যায়। তবে রায়হান থামেনি। সে হেঁটে চলেছে নিরবে। যেনো মনে হচ্ছে এই মেঘলা দিনে কোন মৃত লাশ হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে। হঠাৎ রায়হানের চোখে পড়ে কিছু একটা। তার হাঁটার গতি ধীরে ধীরে কমে যায়। সে দাঁড়িয়ে পড়ে। বাতাসে তার লুঙ্গির নিচের কুচিটা উড়ছে।‌ শার্টের নিচ প্রান্তর টাও বাতাসে উড়ছে। রায়হানের থেকে কিছুটা সামনেই রাস্তার মাঝে একটা বড় ক্রস চিহ্ন আঁকা। আর ক্রস চিহ্নের মাঝে বেশ বড় একটা চারকোনা আকৃতির বক্স। রায়হানের যেনো ভিতরটা শুকিয়ে আসে। রক্ত চলাচল নিস্তেজ হয়ে যায়। শরীরে যেন আর এক পাও এগোতে চাইছেনা। আবারো একটা বক্স! এইবারের বক্সে কী অপেক্ষা করছে তার জন্য! মোসাদ আবার কী পাঠিয়েছে তাকে! 

রায়হান এগোতে চাইছেনা। সে এসব দেখতে দেখতে ক্লান্ত। সে নিপাকে কখনোই মারতে পারবেনা। আবার নিজেও নিপার মৃত্যুকে সচোখে দেখতে পারবেনা। এসব যে তার মস্তিষ্কের সহ্য সীমার বাইরে। জীবন যেনো এক দমকা হাওয়ায় বদলে গিয়েছে তার। খাদের কিনারায় সে দাঁড়িয়ে। সামনে খাদ। পিছনে মৃত্যু। কীভাবে কী করবে এখন সে! 

রায়হান ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। না চাওয়া সত্ত্বেও তার পা তাকে যেনো টেনে নিয়ে আসছে। রায়হান ছাতা নিয়ে এসে বক্সটার সামনে দাঁড়ায়। বৃষ্টির বেগ মৃদু বেড়ে যায়। বক্সটা পলিথিনে মোড়ানো ছিলো। রায়হান এসে বক্সটার সামনে হেলে বসে। হাত বাড়ায় বক্সটার পলিথিন সড়ানোর জন্য।‌ তার হাত কাঁপছে। তবুও তার ইচ্ছেরা বিরুদ্ধে গিয়ে সে বক্সটা ধরে। বড় এক ঢোক গিলে। বক্সের পলিথিন টা টেনে ছিঁড়ে ফেলে। পলিথিন হাওয়ার তোড়ে উড়ে দূরের কোন এক ফাঁকা মাঠে গিয়ে পড়ে। বক্সের উপর এক ফোঁটা, দু ফোঁটা করে বৃষ্টির জল পড়তে থাকে। রায়হান বক্সের ঢাকনাটা ধরে। ধীরে ধীরে ঢাকনাটা খুলে উঠাতে থাকে। তার হৃদস্পন্দন ক্রমেই বাড়ছিলো। সে চোখ বুজে ফেলে। এক হেঁচকা টান মেরে ঢাকনা তুলে ফেলে বক্সের উপর থেকে। ছাতা থেকে ফোটা ফোটা পানি বক্সের ভিতরে পড়ছিলো। তবে ভিতরেও পড়ার পর এমন শব্দ হচ্ছিলো যেনো কোন পলিথিনের উপর পানি গুলো পড়ছে। রায়হান এমন শব্দে কৌতুহল হয়ে চোখ খুলে। তবে ভিতরে সে যা দেখে। তা যেনো তার অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে তুলে। রায়হান এক চিৎকার মেরে পিছনে পিছিয়ে যায়। আকাশে জোড়ে এক বিজলী চমকিয়ে উঠে। বক্সের ভিতরে ছিলো তার বাবা, নজরুল সাহেবের কাঁটা মাথা! কী বীভৎস দেখতে সেই মাথা। চোখ গুলো আধখোলা ছিলো। গলার অংশটা দিয়ে এখনো রক্ত বের হচ্ছে। মুখে আঁচড়ের দাগ। রায়হান চিৎকার দিতে দিতে উঠেই দৌড়ে ছুটে যায় বক্সের পাশ দিয়ে তার বাড়ির উদ্দেশ্যে। রাস্তায় পড়ে রয় তার ছাতা। ছাতাটাকেও বাতাস উড়িয়ে নিয়ে রাস্তার পাশে এনে ফেলে। রায়হান টিফিন ক্যারিয়ার নিয়েই দৌড় দিয়েছে। দৌড়াতে দৌড়াতে সে অনেক দূর চলে যায়।

 

 পলিথিনে মোড়ানো মাথাটার পাশেই রাখা ছিলো এক ছোট্ট চিরকুট। সেই চিরকুটে রক্ত দিয়ে লেখা ছিলো। 

 ‘ আর, মাত্র ৪ ঘন্টা! ‘

 আকাশ থেকে বৃষ্টির ফোঁটা এসে পড়ে সেই কাগজে। ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ কাগজটা ভিজে যায়। দূর হতে ভেসে আসে আরো কিছু মেঘের গর্জন। 

 

______

 

মেম্বার বাড়ি। সন্ধ্যা ৬ টা। নিপা বারান্দার দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। তার পিছু পিছু এসে দাঁড়ান শিউলি বেগম। শিউলি বেগম বাইরের দিকে তাকান। বাইরে এখন বৃষ্টি নেই এখন, তবে আকাশ মেঘলা। দিনের আলো ক্রমেই কমে যাচ্ছিলো। শিউলি বেগম নিপার কাঁধে হাত রাখেন। নিপা ফিরে তাকায়। শিউলি বেগম বলেন,

‘ আইজ রাইত টা বাড়িতেই থাইকা যা মা। আকাশ খারাপ। এহন আবার এতোডা পথ একলা যাইবি! ‘

‘ কিচ্ছু হবেনা মা। আমি ঠিক চলে যেতে পারবো। ও হয়তো এতোক্ষণ চলেও আসছে। বাসায় আমায় না দেখলে চিন্তা করবে। আমি আবার কাল সকালে আসবো। তুমি চিন্তা করিও না। আব্বা কই। আসবে কখন! ‘

‘ তোর আব্বা মনে হয় পৌরসভা অফিস গেছে। আইতে রাইত হইবো মনে হয়। তুই লায়লারে নিয়া যা। একলা একলা তোরে ছাড়তে মন চাইতাছে না। ‘

‘ লায়লা তো ঘুমাচ্ছে মনে হয়। ওকে ডাকা লাগবেনা। আমি একলাই যেতে পারবো মা। তুমি শুধু আমাকে একটা ছাতা দেও। ‘

‘ খারা, দিতাছি। ‘ ম্লিন গলায় বলে বারান্দার একটু সাইডে এগিয়ে যান। সেখান থেকে ছাতাটা নিয়ে এসে নিপাকে দেন। 

‘ রায়হানরে কইস আইতে। কাইল ভালোমন্দ কিছু রান্ধুম নে। আর, অরে কইস কিন্তু ঐ কথাডা‌। অয় অনেক খুশি হইবো। অয় তো বাবু বাবু করতো। এহন বাবুর বাপ হইবো শুনলে অর খুশির সীমা থাকবো না দেহিস। ‘

‘ তা আর বলতে। আচ্ছা মা। যাই এখন। পরে নাইলে আবার বৃষ্টি নামবে। তুমি ঠিকঠাক মতো থাকিও। আর বাবা আসলে বাবাকে বলিও। ‘

‘আইচ্ছা মা। সাবধানে যাইস। ‘

নিপা এক ম্লিন হাসি দিয়ে মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলে। ছাতা হাতে নিয়ে নেমে যায় বারান্দা থেকে। তবে কেনো জানি আজ তার মন খুব টানছিলো। তাকে এই বাড়ি ছেড়ে যেতে দিতে চাইছিলোনা। নিপা ছাতা হাতে এক পা দু পা করে এগিয়ে যায় বাড়ির গেটের দিকে। বেশ কিছুটা এগিয়ে আসতেই, এক অজানা ব্যাথায় হঠাৎ তার বুক টা মোচড় দিয়ে উঠে। সে বুকের বাঁ পাশে হাত দেয়। সাথে সাথেই পিছনে ফিরে তাকায়। দেখে শিউলি বেগম দরজার কপাট ধরে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ মুখে মন খারাপের ছায়া। মুখে বিষন্নতার ছাপ। নিপা তার এই ব্যাথার কোন কারণ খুঁজে পায়না। সে মুখ তুলে তার মায়ের দিকে তাকায়। ক্ষীণ স্বরে বলে,

‘ গেলাম মা। ‘

হয়তো এই কথাটা শিউলি বেগমের কান পর্যন্ত পৌঁছায়নি। শিউলি বেগম হাত নেড়ে তাকে বিদায় জানান। নিপা আবার ফিরে সামনে তাকায়। চলে যায় বাড়ির দরজার দিকে।

 

শিউলি বেগম দরজার কপাট ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন। কিছু অজানা ব্যাথায় তারও বুক ব্যাধিত হয়। শিউলি বেগম দরজার কপাট ছেড়ে চলে যেতে নেন তার ঘরের দিকে। তখনই তার পা কিছু একটার উপর পড়ে। তিনি নিচে তাকান। দেখেন একটা ছোট্ট কানের দুল। হেলে নিচ হতে সেই দুলটা তুলেন। দুলটা তো নিপার। হয়তো বিকালে নিপাকে ধরে আনার সময় তার কান থেকে খুলে পড়ে গেছে। শিউলি বেগম সেই দুল হাতে নিয়ে চলে যান তার ঘরের দিকে। 

 

দূরের মসজিদের মাইক হতে ভেসে আসে মাগরিবের আযান।

 

______

 

নীলগিরি জঙ্গল। সারাদিন বৃষ্টি হওয়ায় জঙ্গলের ভিতরে ভেজা ও স্যতাসাতে পরিবেশ। উপরে পাতায় জমে থাকা ছোট্ট ছোট্ট বৃষ্টির ফোঁটা একত্রে হয়ে মাঝে মাঝে গড়িয়ে পড়ছে নিচে। চারপাশ হতে দিনের আলো ক্রমেই নিভে আসছে। আফাজ একটা দাঁ দিয়ে সামনে সুচোলো ডাল-পালা কেটে এগিয়ে যাচ্ছে। তার কাঁধে ব্যাগ। তার ঠিক পিছনেই আসছে সুমু। সুমু ঘুরে ঘুরে চারপাশের পরিবেশ দেখছে আর আফাজের সাথে সাথে পা চালাচ্ছে। জঙ্গলের ভিতরের আবহাওয়াটা বেশ গোমট। পানির টোপ টোপ পড়ার শব্দ ছাড়া আর তেমন কোন শব্দ নেই। মাটিটাও কর্দমাক্ত। চলতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। মাঝে মাঝে কিছু পাখির কলকাকলি শোনা যাচ্ছে গাছপালার আশপাশ থেকে। সুমু আর আফাজ দুইজনেই নিশ্চুপ। সুমু চারপাশ দেখতে দেখতে আফাজের দিকে তাকায়‌। দেখে আফাজের কাঁধে কী যেনো একটা ছোট্ট পোকা পড়েছে। সুমু আফাজের কাধ থেকে সেই ছোট্ট পোকাটা নিয়ে ফেলে দেয়। আফাজ যেতে যেতে ঘাড় ঘুরিয়ে বলে,

‘ কী! ‘

‘ পোকা ছিলো একটা। ‘

‘ ওহহ। ‘

‘ কয়টা বাজে? ‘

আফাজ তার হাত তুলে হলুদ রঙের ঘড়িটা দেখে। হাত নামিয়ে বলে,

‘ ৬ টা ০৫। ‘

‘ আমরা ঠিক পথ ধরেই এগোচ্ছি তো! ‘

আফাজ দা দিয়ে একটা বড় ডালে কোপ দেয়। আরো দুটো কোপ দিয়ে সেটা তাদের পথ থেকে ছেটে ফেলে। বলে,

‘ নয়ন যা বলেছিলো, ঐরকম পথ ধরেই তো এগিয়ে যাচ্ছি। ‘

‘ মিথ্যা বলেনি তো ও আবার! ‘

‘ মনে হয়না মিথ্যা বলছে। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে কেউ মিথ্যা বলেনা। দেখি, আরেকটু ভিতরে যাই। হয়তো কুঠির টা আরেকটু ভিতরে। ‘

‘ বৃষ্টি হয়েছে না। সাপ-টাপ আসতে পারে। সামনে দেখে শুনে পা ফেলিয়েন। ‘

‘ আমি দেখে শুনেই হাটতেছি। আর সাপ আসলে এই দা দিয়ে এক কোপে কেটে দুই টুকরা করে ফেলবো। ‘

সুমু চারপাশ দেখতে দেখতে দেখতে আফাজের পিছু পিছু এগিয়ে যায়। উপর থেকে পড়া পানিতে আফাজের নীল রঙের শার্ট টা কিছুটা ভিজেছে। সুমুর কামিজটাও একটু ভিজেছে। তবে তা কাঁধের দিকটায়। তখনই সুমুর পাশে উদয় হয় হনুফা। সুমু হঠাৎ হনুফাকে দেখে অবাক হয়। হনুফা সুমুর সাথে সাথেই চলছিলো। আর চারপাশ দেখছিলো। সুমু সামনে আফাজের দিকে একবার দেখে হনুফার দিকে তাকায়। হাঁটতে হাঁটতে ধীর গলায় বলে,

‘ তুই! তুই এখানে কেনো! ‘

‘ আসলাম। দেখতে, তোরা কই যাইতেছিস। ‘

‘ তোকে আমি আসতে বলছি! যা বাড়ি যা। লায়লার সাথে খেল যা। ‘

‘ লায়লা ঘুমাইতেছে। ‘

‘ লায়লা ঘুমাইতেছে বলে তুই এখানে চলে আসবি। ‘

‘ লায়লা আর তুই ছাড়া আমি আর কার কাছে যাবো বল। ‘

‘ আচ্ছা তুই চৌড়চক মোড়ে চলে যা। ওখানে যে পাগল-পাগলী দুইটা আছে, ওদের সাথে গিয়ে খেল। ‘

‘ ওখানে যাবো! ‘

‘ হ্যা যা। আমরা গুরুত্বপূর্ণ কাজে যাইতেছি। ডিসটার্ব করিস না। ‘

‘ জামাইরে নিয়ে কি গুরুত্বপূর্ণ কাজে যাস হ্যা! তোর মতলব তো ভালো থেকতেছে না! ‘ মুখ চেপে হাঁসতে হাঁসতে হনুফা বলে।

‘ তুই গেলি না ওর দা টা নিয়ে কোপ দিবো। ‘

‘ আচ্ছা আচ্ছা যাইতেছি। জামাই পায় আমারে তো ভুলেই গেলি। আমিও মনে রাখলাম। ‘

‘ হ্যা রাখিস রাখিস। যা ভাগ। ‘

হনুফা হাওয়ায় মিলিয়ে গায়েব হয়ে যায়। চারপাশ বেশ অন্ধকার হয়ে আসছে। দিনের আলো একদম ফুরিয়ে এসেছে। সুমু সামনে তাকিয়ে আফাজকে উদ্দেশ্য করে বলে,

‘ কয়টা বাজে! ‘

আফাজ দা দিয়ে গাছ কেটে কেটে এগোতে থাকে। সে হয়তো সুমুর কথা শুনতে পায়নি। সুমু আবার বলে,

‘এইযে। শুনুন না।’

আফাজ এইবার থেমে দাঁড়ায়। ফিরে সুমুর দিকে চায়। আফাজ ঘামে একাকার হয়ে গেছে। গলা, বুকের দিকে শার্ট সব ভিজে গেছে ঘামে। আফাজ দুইহাত কোমরে দিয়ে কিছুটা বিরক্ত মিশ্রিত গলায় বলে,

‘ কী হইছে! ‘

‘ না মানে কয়টা বাজে! ‘

আফাজ হাতের দা টা নিচে রেখে দিয়ে এক হাত দিয়ে তার বা হাতের ঘড়িটা খুলতে থাকে। সুমু চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখে। আফাজ ঘড়িটা খুলে সুমুকে দিয়ে দেয়। বলে,

‘ এখন আর দয়া করে জিগাইয়ো না কয়টা বাজে। ‘

নিচ থেকে দা টা উঠিয়ে আবার সামনে ফিরে এগিয়ে যেতে থাকে আফাজ। আফাজ সামনের দিকে যাওয়া মাত্রই সুমু খুশিতে ছোট খাটো একটা লাফ দিয়ে উঠে। আফাজ তাকে নিজের ঘড়িটা দিয়ে দিছে‌। আফাজের কোন জিনিস এখন তার কাছে আছে। ভাবতেই যেনো তার খুব খুশি লাগছে। তখনই সামনে থেকে আফাজের ডাক আসে,

‘ তাড়াতাড়ি আসো। অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। ‘

সুমু ডাকটা শুনেই তাড়াতাড়ি আফাজের দিকে চলে যায়। হলুদ ঘড়িটাকে সে খুব যত্নের সহিত নিজের কাছে রাখে। আকাশের মেঘ ধীরে ধীরে কেটে যেতে থাকে। তবে ঠান্ডা বাতাস এখনো বইছিলো। গাছের কিছু পাতা সেই বাতাসে দোল খেয়ে উঠে। জঙ্গলের গহীন অরণ্য থেকে ভেসে আসে কিছু নাম জানা প্রাণীর ডাক।

 

___

 

ইসহাক তালুকদার আলমারির ভিতর কিছু একটা খুঁজছেন। তিনি অস্থির, উৎদীপ্ত। দূরেই বিছানায় একটা সুটকেস খোলা অবস্থায় পড়ে আছে‌। ইসহাক তালুকদার আলমারি থেকে হন্তদন্ত করে একটা হলুদ ফাইল বের করেন। তৎক্ষণাৎ শব্দ করে আলমারির দরজা তিনি লাগিয়ে দেন। আলমারির গায়ে হেলান দেন। তিনি হাপাচ্ছেন। যেনো এতোক্ষণ দম আটকে ছিলো উনার। ঘরের ভিতরে চারপাশে তাকান। তার কেনো জেনো মনে হচ্ছে এই বদ্ধ ঘরেও তার উপর কেউ নজর রাখছে। কিন্তু না। ঘরে তিনি ছাড়া আর কেউ নেই। ইসহাক সাহেব তাড়াতাড়ি হলুদ ফাইলটা নিয়ে ছুটে আসেন বিছানার দিকে। ফাইলটা খোলা সুটকেসেরি ভিতর ঢুকিয়ে রাখেন। সুটকেস বন্ধ করে দেন। চারপাশে তাকান। ভয়ে তার গাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। ঘরে তার শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। তিনি তড়িঘরি করে বিছানা থেকে সুটকেস টা হাতে নেয়। দৌড়ে ছুটে যান দরজার দিকে। 

দরজা খুলে বেড়িয়ে আসেন। দরজার হ্যাজবল আটকিয়ে দিয়ে তালা মেরে দেন। তিনি খুব দ্রুত কাজ গুলো করছিলেন। দরজা লাগানোর শব্দ শুনে রান্ধা ঘর থেকে বেড়িয়ে আসেন জহুরা বেগম। তিনি কিছু বলতেই যাবেন তখনই দেখেন ইসহাক সাহেব একটা সুটকেস ব্যাগ হাতে হন্তদন্ত হয়ে নেমে বারান্দা থেকে আঙিনায় নামছেন। ইসহাক সাহেব আঙিনা দিয়ে যাওয়ার সময় রান্না ঘরের দিকে তাকান। দেখেন জহুরা বেগম দাঁড়িয়ে আছেন। জহুরা বেগম শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে এগিয়ে আসেন ইসহাক সাহেবের দিকে। ইসহাক সাহেবের হাত পা কাপছিলো। জহুরা বেগম অবাক কন্ঠে বলে উঠেন,

‘ কোথায় যাচ্ছো এতো তড়িঘরি করে। ‘

ইসহাক সাহেব চারপাশে তাকান। দেখেন আরো কেউ আছে কি না। জহুরা বেগম ইসহাক সাহেবের এমন ভাব-সাব কিছুই বুঝে উঠতে পারেন না। তিনি আরো কিছু বলতেই যাবেন তখনই ইসহাক সাহেব কাঁপো কাপো গলায় বলেন,

‘ আমি, আমি একটা জরুরী কাজে যাইতেছি। আজ রাতে নাও ফিরতে পারি। তুমি, তুমি দরজা লাগায় শুয়ে পড়িও। ‘

জহুরা বেগম কথাগুলো শুনে আরো অবাক হন। তিনি কিছু বলতেই যাবেন তখনই ইসহাক সাহেব হনহন করে বাড়ির মূল গেইটের দিকে পা বাড়ান। জহুরা বেগম আর কিছু বলেন না। তিনি ভাবেন হয়তো ইলেকশন নিয়ে কিছু হবে হয়তো। তিনি শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে রান্না ঘরের দিকে যেতে নেন তখনই দূর হতে ইসহাক সাহেব বলে উঠেন,

‘ আমি না ফিরলে, থানায় যেওনা। আর, নিজের খেয়াল রেখো। ‘

হঠাৎ এমন কথা শুনে চকিতে ফিরে তাকান জহুরা বেগম। ইসহাক সাহেব কথা গুলো বলেই হনহন করে দরজা দিয়ে বেড়িয়ে যান। জহুরা বেগম তাকে পিছু ডাকতে থাকেন,

‘ শুনো, শুনো। তুমি কোথায় যাচ্ছো! শুনো! ‘

ইসহাক সাহেব চলে যান। জহুরা বেগম এবার বেশ অবাক হন, সাথে ভয়ও পান। ইসহাক সাহেব কেনো এমন কথা বললো। কোন কি গুরুতর কিছু হতে চলেছে! জহুরা বেগমের ভাবনার মাঝেই আকাশে বড় এক বিজলী চমকিয়ে উঠে। আর সাথে সাথেই পুরো বাড়ি অন্ধকার হয়ে যায়। অর্থাৎ কারেন্ট চলে যায়। শুধু ইসহাক সাহেব নয়। অন্ধকার হয়েছে পুরো আনন্দপুর। পরিবেশ খুবই শান্ত হয়ে যায়। যেনো কোন কিছুই হয়নি। তবে বড় কোন ঝড় আসার আগেও কিন্তু ঠিক একরমই শান্ত হয়ে যায় সবকিছু। তবে এই ঝড় কী আবহাওয়ার পালাবদলের ঝড়! নাকি ক্ষমতার পালাবদলের ঝড়! তা বোধগম্য কেবল এক নতুন অরুনোদয়ই করতে পারে। অমানিশা কাটানো অরুনোদয়! 

 

_____

 

আফাজ আর সুমু হেঁটে চলেছে। জঙ্গলের এদিকটা ঘন নয়। হালকা। যেনো কেউ গাছ গুলো কেটে কেটে এই দিকটা হালকা করেছে। আকাশের মেঘ কেটেছে। আফাজের হাতে টর্চ লাইট। সুমু আফাজের হাত ধরে তার সাথে সাথে আসছে। আফাজ সামনে এগোচ্ছে আর কোন কাঁচা কুঠির খুঁজে ফিরছে। তার মুখে চিন্তার ভাঁজ। তবে সুমু বেশ আনন্দেই আছে। তার হাত আফাজ ধরেছে। আফাজের ছোঁয়া সে পেয়েছে। এই অনন্তকালে যদি তারা দুই পথভ্রষ্ট যাত্রী হয়ে এভাবেই একসাথে হাঁটতে থাকতো, তাহলে কতই না ভালো হতো! 

 

আফাজ চারপাশে আলো ফেলে দেখছে। বেশ অনেকক্ষণ হলো তারা কোন কুঠিরের সন্ধান পায়নি। নয়ন কি তাইলে মিথ্যে বললো! না কী আসলেই কুঠির আছে‌। নাকি আবার সুমু আফাজ পথ হারিয়ে অন্য দিকে চলে এসেছে। আফাজ এইসব চিন্তা করতে করতেই হঠাৎ দূর থেকে কিছু আলো দেখতে পায়। সাথে কিছু কথাও শুনতে পায়। আফাজ দাঁড়িয়ে যায়। সুমুও আফাজের সাথে সাথে দাঁড়িয়ে যায়। সুমু কিছু বলতেই নেয় তখনই আফাজ তাকে মুখে আঙুল দেখিয়ে চুপ থাকতে বলে। আফাজ আর সুমু একদম নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। তখনই তারা দূরের আলোর উৎস হতে শুনতে পায় একটা মেয়ে আর একটা ছেলের গলার আওয়াজ। আওয়াজ শুনে মনে হচ্ছিলো যেনো তারা ঝগড়া করছে। আফাজ সুমুর দিকে ফিরে। ধীর গলায় বলে,

‘ এটা সোনালীর গলা না! ‘

‘ হ্যা। আমার তো তাই মনে হচ্ছে। ‘

‘ চলো তাড়াতাড়ি। আমরা আমাদের ঠিকানা পেয়ে গেছি। ‘

‘ চলুন। ‘

আফাজ সুমুর হাত শক্ত করে ধরে তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে যেতে থাকে। সুমুও তাড়াতাড়ি চলার চেষ্টা করে। কিন্তু আফাজের সাথে জোড়ে হাঁটায় সে পেড়ে উঠছিলো না। আফাজের উত্তেজিত মুখখানা সে বারবার দেখছিলো। আফাজ তাকে এক প্রকার টেনেই তার সাথে নিয়ে যাচ্ছিলো।

 

আফাজ আর সুমু এসে দাঁড়ায় কুঠিরের সামনে। কুঠির টা কাঁচা। বেতের বেড়া দিয়ে বানানো। উপরে টিন। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো ভিতরে আলো জ্বলছিলো। কিন্তু এই ঘন জঙ্গলের মাঝে কারেন্টের লাইন কীভাবে আসলো তা আফাজ আর সুমুর বোধগম্য হয়না। আফাজ সুমুকে নিয়ে কুঠুরির দরজার সাইডে এসে দাঁড়ায়। দরজাটা ভিড়িয়ে দেওয়া ছিলো। দুইজনই দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কুঠুরির দেয়ালে হেলান দেয়। সুমু আফাজকে ইশারা করে দরজার সামনের দুই জোড়া জুতা দেখায়। আফাজ সুমু দুইজনই অবাক হয়। ভিতর থেকেও এক ছেলে মানুষের গলা পাওয়া যাচ্ছে। সোনালীর সাথে কী আর কেউ আছে! আফাজ আর সুমু এবার দরজা আড়াল হতে ভিতরে নজর দেয়। দরজাটা হালকা ভিড়িয়ে দেওয়া ছিলো। অল্প যেইটুকু ফাঁকা রয়েছে দরজার মাঝে, তাই দিয়ে সুমু আর আফাজ দৃষ্টি ফেলে ঘরের ভিতরে। ঘরের ঠিক মাঝখান টায় ঝগড়া করছিলো সোনালী আর একটা ছেলে। ছেলেটা আর কেউ নয়, খাঁন বাড়ির বড় ছেলে রাফসান খাঁন! দুইজনের মধ্যেই কথা কাটাকাটি হচ্ছিলো। দুইজনেই রাগান্বিত ছিলো। 

 

‘ সোনালী, খুব খারাপ হবে কিন্তু। বিজনেসের সব কাগজ আমায় দিয়ে দাও। ‘

‘ আমার বাল দিবো তোকে। একটা কাগজও তুই পাবিনা। আমি সব বিক্রি করে দিছি। ‘

‘ তুমি আমার মন নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলতে পারলে! আমি তো তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম। তোমাকে খাঁন বাড়ির বড় বউ বানিয়েছিলাম। তারপরও তুমি এমনটা কেনো করলে! ‘

‘ তোর বাপ, ঐ রাক্ষস টা যে আমার মা’কে খাইছিলো! সেই বেলা! আমার পরিবার, আমার জীবন সব তোরা ধ্বংস করে দিছিস। সব ধ্বংস করে দিছিস। ‘

‘ বেশ করেছে। আব্বু তোর মাকে খেয়েছে বেশ করেছে। দেখ, এইবার কিন্তু খুব বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। তোকে আমি মারতে চাইনা। ভালোয় ভালোয় আমাকে সম্পত্তি বেঁচা সব টাকা দিয়ে দে, নাইলে কিন্তু আমার আসল রূপ দেখবি! ‘

‘ কী রুপ দেখাবি তূই হ্যা! এই সোনালীকে দেখলে না তোর মিটার ফিউজ হয়ে যাইতো! রুপ দেখলে বল, আমি তোকে দেখাই।’ 

‘ তুই তো শালি একটা জন্মের মাঘি। বেশ্যা। লোকেদের বিছানায় শুয়ে পড়িস টাকার জন্য। তোর মাও নিশ্চয়ই এমন বেশ্যা ছিলো।‌ পতিতার পেটে জন্ম হইছিস তুই। ‘

সোনালী সাথে সাথে তার পিছনের টেবিলে থাকা একটা ছূরি হাতে নেয়। রাফসানের দিকে ছুরির ডগা ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলতে থাকে,

‘ কুত্তার বাচ্চা তুই যদি আমার মা’কে নিয়ে আর একটা কথা বলছিস, তোর শরীর আমি কাটে কুচি কুচি করছ ফেলবো। ‘

‘ কাটবি! আয়। আয় দেখি কেমন কাটতে পারিস। তোর শরীর যদি আমি গুলি করে ঝাঝড়া না করছি তাইলে আমার নামও রাফসান না।‌’

বলতে বলতেই রাফসান তার কোমরের ভাঁজ থেকে বন্দুক বের করে সোনালীর দিকে তাক করে। সোনালী দুই হাত উপরে তুলে ফেলে। ছুরি হাত থেকে ফেলে দেয়। তার মুখের কাঠিন্যতা নিমেষেই মিলিয়ে যায়। সোনালী কন্ঠ নরম করে বলে,

‘ দেখো, আমি কিন্তু এতোক্ষণ মজা করতেছিলাম। তুমি, তুমি বন্দুকটা নামাও। গুলি চলে যেতে পারে। ‘

‘ হ্যা। এখন বলনা। কই গেলো তোর মুখের খই ফুটা! মরণকে সবাই ভয় পায়। আর আমি তোর ফাঁদে পা দিচ্ছি না। আমাদের সব কিছু ধ্বংস করেই দিছিলি না! আজকে তোকে মারে সবকিছুর বদলা নিবো। ‘

‘ রাফসান প্লিজ বন্দুক টা নামাও। তুমি চাইলে আমরা বিছানায় কিছুটা সময় কাটাতে পারি। আমি সব কিছু আবার তোমায় বিলিয়ে দিবো রাফসান। প্লিজ বন্দুকটা নামাও। ‘

‘ তোর রুপরে আমি গুল্লি মারি শালি। তোর জালে আমি আর পরবো না। তুই মর। মর। ‘

 

আফাজ সুমু ভয় পেয়ে যায়। আফাজ সোনালিকে এতো সহজে মরতে দিবে না। তার আলিশার এতো কঠিন মৃত্যুর বদলা সে এতো সহজ মৃত্যুর সাথে কিছুতেই মেনে নিতে পারবেনা। আফাজ চারপাশ দেখতে থাকে। হন্ন হয়ে খুঁজতে থাকে কিছু একটা। সুমু বুঝতে পারছেনা এখন কি করা উচিত। তীরে এসে এভাবে তরী ডুবতে দেওয়া যাবেনা। কিছু একটা করতে হবে। তখনই আফাজ দূরে একটা মোটা বাঁশ দেখতে পায়। দৌড়ে গিয়ে সে সেই বাঁশ টাকে হাতে তুলে নেয়।

 

সোনালী রাফসানকে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে ঠান্ডা করার চেষ্টা করছে। রাফসান আর এবার সেই কথায় ভিজতে রাজী না। তার মাথায় ভূত চাপছে, সোনালীকে মারার ভূত। রাফসান ট্রিগারে আঙ্গুল দেয়। সোনালী ভয়ে মাথা নাড়িয়ে না করছে। শেষ বারের মতো রাফসানের কাছে সবকিছুর জন্য হাত জোড় করে ক্ষমা চাইছে। রাফসান শয়তানের মতো মিটিমিটি হাসছে। সে ট্রিগারে আঙ্গুল রেখে চাপ দিতে যাবেই তখনই তার মাথায় কেউ সজোরে বাড়ি মারে। চিৎকার দিয়ে রাফসান ছিটকে পরে ঘরের এক কোনায়। বাড়িটা আফাজ এতো জোড়ে মেরেছিলো যে বাঁশটা ফেটে দু টুকরো হয়ে গেছে। রাফসান ঘরের এক কোনে পড়ে ব্যাথায় কাতরাতে থাকে। সোনালী হঠাৎ এমন কিছুর জন্য একদম অপ্রস্তুত ছিলো। সে পরিস্থিতি খারাপ বুঝে দৌড়ে পালাতে যায়। তখনই দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় সুমু। তার আগমন কোন হিরোইনের থেকে কোন অংশ কম নয়। সোনালী সুমুকে ঘুষি মারতে যায়। সুমু সাথে সাথে মাথা একপাশে হেলিয়ে নেয়। সোনালীর হাত ধরে উল্টো তারই পেটে সজোরে এক ঘুষি মারে। সোনালী কুকিয়ে উঠে। ঐদিকে রাফসানকে বাঁশ দিয়ে আরো পেটাতে থাকে আফাজ। রাফসান ব্যাথায় চিৎকার করে উঠছিলো। তার পা, হাত ফেটে রক্ত বের হয়ে আসে। আফাজ সেই বাঁশ টার একটা সুচালো প্রান্ত উঠিয়ে রাফসানের পায়ের মাংশ পেশীতে গেথে দেয়। চিৎকার করে মাটিতে দাপাদাপি করতে থাকে রাফসান। আফাজ রাফসানকে ছেড়ে দেয়। রাফসান এখন প্রায় আধমরা হয়ে গেছে। এখন ওর কাজ সোনালীকে জাহান্নামের রাস্তায় পাঠানো। 

 

সুমু সোনালীর চুলের মুঠি ধরে। ধরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঘরের সাইডে থাকা কিছু কাঁচের বোতলের দিকে ছুড়ে ফেলে। সোনালী গিয়ে ছিটকে পরে কাঁচের বোতল গুলোর উপর। ভাঙা কাঁচ দিয়ে তার শরীর যায়াগায় যায়গায় বিঁধে যায়। আফাজ ঘরের মাঝখানে এসে তার কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামায়। ব্যাগের চেইন খুলে ব্যাগটা উবুড় করে উঠিয়ে ধরে ঝাকাতে থাকে। ভিতর থেকে একে একে পড়তে থাকে বিভিন্ন কৌটা, দা, বঁটি, ছুরি, কাঁচি, আর পিন। সুমু গিয়ে সোনালীকে উঠায়। সোনালী এবার সুমুকে এক জোড়ে ধাক্কা দেয়। সুমু তাল সামলাতে না পেরে পিছনে পড়ে যেতে নেয়। আর পিছনেই ছিলো আফাজের ব্যাগ থেকে বের করে রাখা নানা ধারালো জিনিস। সে সেগুলোর উপর প্রায় পড়তেই যাবে তখনই আফাজ তাকে ধরে ফেলে। সুমু গিয়ে পড়ে আফাজের দুই হাতে। দুইজন দুইজনের দিকে তাকায়। চোখে চোখ খানিকক্ষণের জন্য হলেও আটকে যায়। এ যেনো রোমান্টিক কোন যুগল! ঐদিকে সোনালী তার টেবিল থেকে একটা ভাঙা কাঁচের বোতল হাতে নেয়। দৌড়ে ছুটে আসে সুমু আফাজদের দিকে। সুমু তো আফাজের চোখ থেকে চোখই উঠাতে পারছেনা। আফাজ তখনই সোনালীর কাঁচের বোতল নিয়ে তেড়ে আসা টের পেয়ে সুমুর এক হাত ধরে। তাকে তুলে সোজা করে একপাশে সড়িয়ে দেয়। সুমু ফিরে তাকায়। দেখে আফাজ তৎক্ষণাৎ হাতে এক বড় দাঁ উঠিয়ে চোখের পলকে ছুড়ে মারে সোনালীর হাত বরাবর। সোনালী কিছু বুঝে উঠার আগেই দাঁ এসে তার বোতল ধরা হাতের কব্জি কেটে আলাদা করে দেয়‌। বোতল সহ কব্জি মাটিতে পড়ে যায়। সোনালী চিৎকার করে উঠে। রক্ত ছিটকে পড়ে চারপাশে। আফাজ তৎক্ষণাৎ সুমুকে উদ্দেশ্য করে বলে,

‘ এবার আসল কাজ শুরু। ‘ সুমু মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলে। তার মুখে ফুটে উঠে হাসি। তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে সে সোনালীর চুলের মুঠি ধরে। ধরেই চিৎকার দিয়ে এক আছাড়ে সোনালীকে মাটিতে শুইয়ে দেয়। সোনালীর ব্যাথায় চিৎকার দিয়ে উঠে। সুমু সাথে সাথে গিয়ে সোনালীর মাথার দিকটায় বসে পড়ে। সোনালী বাম হাত আর মাথা শক্ত করে ধরে। আফাজ ধারালো অস্ত্র থেকে একটা সবজি ছিলার মেশিন নিয়ে আসে। যেটা দিয়ে আম, আলু এসবের উপরের ভাগটা ছিলা হয়, ঐটা। আফাজ এসেই সোনালীর পেটের দুইপাশে দুই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। সোনালীর কবজি কাঁটা বাম হাত আর মাথা সুমু চেপ ধরে আছে। আফাজ ধরে সোনালীর ডান হাত। কল্পনায় ভেসে উঠে আলিশার মৃত্যুচ্ছবি। আফাজের মধ্যে বদলা নেওয়ার আগুন জ্বেলে উঠে। আফাজ কর্কষ গলায় বলে উঠে, ‘ এই হাত দিয়ে আমার আলিশাকে মেরেছিলি না! এই হাত দিয়ে,,,! ‘ বলেই এক হাত দিয়ে সোনালীর হাতের কব্জি চেপে ধরে আরেকহাত দিয়ে সোনালীর হাতের চামড়া ছিলতে থাকে। সোনালী চিৎকার করে উঠে। তার চিৎকারে ঘর কেঁপে উঠতে থাকে। আফাজের চোখ রক্ত লাল। সুমু মুখ ঘুড়িয়ে নেয়। সে এসব দেখতে পারছিলো না। আফাজ সোনালীর হাতের চামড়া ছিলে ফেলতে থাকে। সব চামড়া ছিলে পাশে রাখা কৌটা গুলো থেকে লবণ, হলুদ, মরিচ সব কিছুর গুড়া মাটিতে ঢালে। একখানে মিশিয়ে নিয়ে সোনালীর চামড়া ছিলা হাতের উপর চেপে চেপে মালিশ করে দিতে শুরু করে। সোনালীর যেনো জান বেড়িয়ে আসছিলো। চিৎকার দিতে দিতে যেনো তার গলা ছিঁড়ে যাচ্ছিলো। আফাজ এমন ভাবে হাতের মাংসে সেই গুঁড়া গুলো লেপে দিচ্ছিলো যেনো কোন মাটির ঘরে সিমেন্ট লেপা হচ্ছে। রক্তে ভিজে যায় আফাজের হাত। আফাজ আরেকটা কৌটা নেয়। সেই কৌটার ঢাকনা খুলে ছাল ছাড়ানো হাতটার উপর পিন ঢেলে দেয়। কৌটার নিচের অংশ দিয়ে সেই পিন গুলো চেপে চেপে দিতে থাকে। একেকটা পিন ফুটছিলো আর সোনালীর অন্তর আত্মা কেঁপে উঠছিলো। চিৎকার করতে করতে তার গলা ভেঙ্গে যায়। মরা মুরগীর মতো ছটফট করতে থাকে সে। সুমু খুব শক্ত করে ধরে আছে। তারপরও সোনালী ছুটার চেষ্টা করছে। তখনই আফাজ একটা ছূরি হাতে নেয়। চোখ বন্ধ করে কোপাতে থাকে সোনালীর সেই হাতটাকে। রক্ত ছড়িয়ে পরে চারপাশে। মাংস খন্ড খন্ড হয়ে আফাজের চোখে মুখে ছিটকে পড়ছিলো। আফাজ সোনালীর হাতটাকে খন্ডবিখন্ড করে দেয়। তার ক্রোধ কিছুটা থামে। শার্টের হাতা দিয়ে মুখে ছিটকে আসা রক্ত মুছে। ঐদিকে রাফসান এখনো ব্যাথায় ঘরের এক কোনে কাতারাচ্ছিলো। সোনালীর চিৎকার গুলো যেনো তার কানের পর্দা ফাটিয়ে দিচ্ছিলো। আফাজ সোনালীর উপর থেকে উঠে যায়। সুমুও সোনালীর মাথার দিকটা থেকে উঠে দাঁড়ায়। আফাজ গিয়ে বসে সুমুর যায়গায়। সুমু এসে বসে সোনালী পায়ের মাংসপেশিতে। আফাজ সোনালীর মাথা আর বাম হাত চেপে ধরে। সুমু পাশের অস্ত্র গুলোর মধ্যে থেকে দুটো কৌটা নেয়। আধমরা সোনালী নিস্তেজ হয়ে যেতে শুরু করেছে। সুমু কৌটা দুটো নিজের কোলে রাখে। সোনালীর কামিজ তুলে। আফাজ মুখ ঘুড়িয়ে অন্য দিকে তাকায়। চোখ বুজে ফেলে। সুমু সোনালীর পাজামার ফিতা খুলে। তার কোলে থাকা একটা কৌটা হাতে নেয়। ঢাকনা খুলে পাজামা কিছুটা টেনে কৌটা থেকে সাদা সাদা দানাদার চিনি ভিতরে ফেলে দেয়। কৌটা আর ঢাকনা ফেলে দেয় অন্যদিকে। এরপর হাতে দেয় আরেকটা কৌটা। এই কৌটাটার ঢাকনা তাড়াতাড়ি খুলতে থাকে। খুলেই উবুড় করে পাজামার ভিতরে ফেলে দেয় কিছু লাল বিশ পিঁপড়া। দিয়েই কৌটা দূরে ফিকে মেরে পাজামা উঠিয়ে পাজামা ফিতা বেঁধে দেয়। হাত দিয়ে পাজামার উপর দিয়েই সব নেড়েচেড়ে দেয়। উঠে দাঁড়ায়। চলে যায় পায়ের দিকে। পা দুটো দুই হাতে জাপটে ধরে। চোখ বুজে ফেলে। তখনই শুরু হয় সোনালীর জাহান্নাম সমতুল্য যন্ত্রনা। তার শরীর অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপতে থাকে। চিৎকার দিয়ে উঠতে থাকে সে। চিৎকার দিয়ে বলতে থাকে, ‘ না, না, ভিতরে না। ভিতরে না। আ,,,,,,, না,,,,, ভিতরে ঢুকিস না,,,, ও মা,,,,,,, ও মা,,,,,,, আল্লাহ,,,,,,, ‘ 

সোনালীর চিৎকার এবার তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। তার চিৎকার শুনে ঘরের একপাশে কাতরানো রাফসানের রুহ পর্যন্ত কেঁপে উঠে। পুরো ঘর কাঁপতে থাকে। সোনালীর শরীর ধরে রাখা আফাজ আর সুমু দুইজনের জন্যই খুব কষ্টের হয়ে যাচ্ছিলো। সোনালী খুবই খারাপ ভাবে কেঁপে উঠছিলো। তার শরীরে মাঝ দিয়ে বেঁকে গিয়েছিলো। আফাজ তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ায়। সুমু কিছু বুঝে উঠার আগেই সে গিয়ে অস্ত্র গুলোর মধ্যে থেকে সবচেয়ে ধারালো আর বড় ছুরিটা নেয়। এসে উঠে বসে সোনালীর পায়ের উপর। চিৎকার দিয়ে একের পর এক ছুরি ঢুকতে থাকে সোনালী পেটে। রক্ত ছিটকে পড়তে থাকে চারদিকে। তার কানে বাজতে থাকে আলিশার চিৎকার, আলিশার বাঁচার আকুতি। চোখে ভাসে উঠছিলো ভালোবাসার মানুষকে একবার দেখার আকাঙ্ক্ষা, আলিশার সেই সুন্দর মুখে রক্ত, তার সারা শরীরে ছুরির দাগ, পেটে ছুরি দিয়ে জখম করা গর্ত, সব আফাজের চোখে ভাসছিলো। আফাজ আরো জোড়ে জোড়ে ছুরি দিয়ে আঘাত করে সোনালীর পেটে। চিৎকার দিতে থাকে। এই চিৎকারে ছিলো না পাওয়া ভালোবাসার ব্যাথা, প্রিয়জন হারানোর ব্যাথা, এক বুক আশা নিভিয়ে দেওয়ার ব্যাথা। মিষ্টি ফুলের মতো আলিশাকে তার থেকে কেড়ে নেওয়ার ব্যাথা। সব সব সব। আফাজের অনবরত আঘাতে সোনালী নির্মম ভাবে মৃত্যু বরণ করে। সোনালীর চোখ খোলা অবস্থায় পড়ে রয়। আফাজ এখনো ছুরি চালিয়েই যাচ্ছে। সে থামছেই না। সুমু গিয়ে বসেছে অস্ত্র গুলোর পাশে। সে অন্য দিকে ফিরে ছিলো। এমন নারকীয় হত্যাযজ্ঞ তার মস্তিষ্ক নিতে পারছিলো না। আফাজ খুব জোড়ে চিৎকার দিয়ে উঠে। আর তখনই এক গুলি চলার আওয়াজ। সুমু ফিরে তাকায়। আবার একটা গুলি চলার আওয়াজ। ধপ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আফাজের দেহ। সুমু দুই কানে হাত দিয়ে চিৎকার করে উঠে। চারপাশ যেনো থেমে থেমে আসছিলো তার কাছে। কানে কোন শব্দ সে শুনতে পারছিলো না। সে তাকায় রাফসানের দিকে। দেখে রাফসান গুলি চালিয়েছে আফাজের শরীরে। আবারো একটা গুলি চলার আওয়াজ। আফাজ দেহ শেষ বারের মতো কেঁপে উঠে। হাতে মুঠ করা থাকা ছুরি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। রাফসান সাথে সাথে বন্দুক তাক করে ধরে সুমুর দিকে। সুমু দিকদিশা হারিয়ে ফেলেছে। রাফসান গুলি চালাতে যাবেই তখনই সুমু চিৎকার দিয়ে মরিচের গুঁড়া হাত দিয়ে ছিটিয়ে দেয় রাফসানের দিকে। রাফসানের চোখে মরিচ ঢুকে যায়। সুমু উঠে দাঁড়ায়। আফাজের পাশে এসে তাকে নাড়ায়। চিৎকার করে ডাকতে থাকে। তার কানে সে কিছু শুনতে পারছিলো না। মাথা ঝিম মেরে উঠছিলো। চোখ ভিজে যাচ্ছিলো অশ্রু জলে। সুমু বারবার আফাজকে নাড়িয়ে দিতে থাকে। ডাকতে থাকে। আফাজ উঠেনা। আর উঠেনা।

সুমু সাথে সাথে পাশে থাকা অস্ত্র গুলোর মধ্যে থেকে বটি হাতে তুলে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে রাফসানের উপর। কান্নামিশ্রিত চিৎকার দিতে দিতে খুব করুণ ভাবে কোপাতে থাকে রাফসানকে। রাফসানের হাত সম্পুর্ন কেটে যায়। পুরো শরীরে হাজারো কোপের বন্যা বইয়ে দেয় সুমু। রক্ত ছিটকে পড়ে সুমুর গায়ে। রাফসানের পুরো দেহ কাঁপতে থাকে। সুমু চিৎকার দিয়ে উঠে রাফসান ঘাড়ে এক কোপ দেয়। মাথা আলাদা হয়ে ছিটকে পড়ে ঘরের দরজার সামনে। জেদ, রাগ, কষ্ট সব নিয়ে সুমু উঠে আসে। কাঁদতে থাকে। ফিরে তাকায় আফাজের দিকে। তার ভিতরটা ক্রমেই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যায়। হাত থেকে রক্ত মাখা বটিটা পড়ে যায়। সুমু হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে আফাজের লাশের পাশে। হাঁটুর ভরে এসে আফাজের মাথার পাশে বসে। আফাজের মাথাটা তার কোলে তুলে নেয়। চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। তার কান্নায় যেনো এই পুরো জঙ্গল নিস্তব্দ হয়ে যায়। আবহাওয়া থমথম রূপ ধারণ করে। সুমু আফাজের মুখ টা দেখে। আফাজের গাল ধরে তাকে নাড়ায়। কান্না মিশ্রিত গলায় ডাকতে থাকে, ‘ এইযে,, শুনুন না।‌ কথা বলুন। আপনি চুপ করে কেনো আছেন। কথা বলুন।‌ একটাবার কথা বলুন। এভাবে চুপ করে থাকবেন না। আমার কষ্ট হচ্ছে। খুব কষ্ট হচ্ছে। দয়া করে একটাবার চোখ খুলুন। আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি। অনেক অনেক ভালোবাসি। ‘ বলেই কাঁদতে কাঁদতে সুমু আফাজকে বুকে জড়িয়ে ধরে। আফাজকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। ওর কান্না শুনে দূরের মা হারা পাখিটিও চুপ হয়ে যায়। আকাশ এক ভারি মেঘে ঢেকে যায়‌। সবকিছু যেনো নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছে এই কান্নায়। সুমু আফাজকে চুমু খেতে থাকে। তাকে জড়িয়ে ধরে খুব কান্না করতে থাকে। আফাজকে আবার তার কোলে শুইয়ে দেয়। আফাজের মুখের উপর থেকে ছিটকে পরা রক্ত মুছে দেয়। কান্না মিশ্রিত গলায় বলতে থাকে, ‘ আপনি না আমাকে সহ্য করতে পারেন না। আমি আর কখনো আপনার সামনে আসবো না। একটাবার চোখ খুলুন। আমি কখনো আর আপনাকে জ্বালাবো না। অনেক দূরে চলে যাবো। অনেক দূরে। শুধু একটা বার কথা বলুন। আমাকে একটা বার সুমু বলে ডাকুন। আমি যে আপনাকে ছাড়া অসহায়। আমি আপনাকে খুব ভালোবাসি। এভাবে চুপ করে থাকবেন না।‌ আমি মরে যাবো। আমি মরে যাবো।’ সুমু আফাজের কোলে মাথা রেখে কাঁদতে থাকে। তার গলায়, মুখে অনবরত চুমু খেতে থাকে। তাকে জড়িয়ে ধরে। কান্নাভেজা গলায় বলে, ‘ আমরা, আমরা বন্ধু। আমরা বন্ধু। আমরা খুব ভালো বন্ধু। (চিৎকার দিয়ে) আমার ভালোবাসা। আপনি আমার ভালোবাসা। আপনি যেতে পারেন না। আপনি আমাকে ছেড়ে যেতে পারেন না। আমাকে এতোটা কষ্ট দিবেন না প্লিজ। আমি মরে যাবো। আমি মরো যাবো। ‘ 

 

সুমু আফাজের পাশেই শুয়ে পড়ে। তাকে জড়িয়ে ধরে। তার কাঁধে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে থাকে। তার এই কান্নায় ছিলো নিজের ভালোবাসার মানুষকে নিজের চোখের সামনে হারানোর যন্ত্রনা।‌ নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে নিজের করে না পাওয়ার বেদনা। সুমু আফাজের গলায় চুমু খায়। আফাজের কানের কাছে গিয়ে ভেজা গলায় ক্ষীণ কন্ঠে বলে, ‘ আপনি কেনো আমার হলেন না। আমায় কেনো ভালোবাসলেন না। খুব কষ্ট দিয়েছি না আপনাকে! খুব জালিয়েছি! এভাবে আমাকে তার শাস্তি দিবেন! আমি তো শুধু একটুখানি আশ্রয় চেয়েছিলাম আপনার কাছে। ভালোবাসার মায়াজালে আমায় কেনো জড়ালেন! কেনো এই নিরহারা পাখিটাকে আশায় বুক বাধালেন। খুব খারাপ আপনি। খুব খারাপ। ‘ 

বলেই আফাজকে জড়িয়ে ধরে সুমু। ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠে।

 

  খোলা জানালা দিয়ে আসা এক ছোট্ট হিমেল হাওয়া বয়ে যায় ঘরের মাঝে। ঘরের এক কোনে পড়ে থাকে মাথা বিহীন ছিন্নভিন্ন রাফসানের লাশ। আর একদিকে পড়ে থাকে ক্ষতবিক্ষত সোনালীর মৃতদেহ। আর মাঝে এক মৃত লাশের সাথে এক জীবিত মেয়ে। মেয়েটা লাশটাকে জড়িয়ে ধরে পাশে শুয়ে আছে। মাঝে মাঝে তার গলায় লম্বা করে চুমু খাচ্ছে। মৃতলাশের কানের পাশে মুখ এনে বিরবির করে কিছু বলছে। জড়িয়ে ধরছে সেই লাশটাকে। খুব করে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে উঠছে। মহাকালের তোড়ে হারিয়েছে একজন, আরেকজন এখনো একপাক্ষিক ভাবে তাকে ভালোবেসে যাচ্ছে। খারা স্রোত আজ দুই আত্মাকে, দুই ধারে এনে ফেলেছে। যেখান হতে পুনরায় মিলিত হওয়া শুধু অসম্ভব নয়, বরং অনস্বীকার্য। 

 

চলবে ,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

 

(পরবর্তী পর্ব পাবেন পরসুদিন। গল্প নিয়ে কোন মতামত জানাতে চাইলে কমেন্টে জানাতে পারেন।)

 

গল্প নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা করুন আমার গ্রুপে।

গ্রুপ লিংক 👇

https://www.facebook.com/groups/743016887019277/?ref=share_group_link

 

উপন্যাস :: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন :: ২(মুখোশ)

পর্ব :: ৮৯

লেখক :: মির্জা সাহারিয়া

 

উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন:: ২(মুখোশ)

পর্ব:: ৯০

লেখক:: মির্জা শাহারিয়া

 

রাত ৭ টা ৩০। বাইরে বৃষ্টি পরবর্তী হিমেল হাওয়া বইছে। শীতের পর এই বসন্তে আবারো সেই ঠান্ডা আবহ নিয়ে নেমেছে। তবে তীব্রতা অতটাও বেশি না। 

মেম্বার বাড়ি। কারেন্ট নেই, তাই অন্ধকার চারপাশ। সাথী বেগম তার ঘর থেকে বের হলেন। কোমরের ব্যাথাটা একয়দিনে একটু প্রশমিত হয়েছে। এখন নিজে নিজে চাইলে বেড়াতে পারেন। তবে কিছুটা খুরিয়ে খুরিয়ে হাঁটেন। সাথীর সাথে ঘর থেকে বের হয় আঁখি। বাইরের বারান্দায় ডায়নিং টেবিলের ওদিক হতে মোমবাতির আলোক শিখা দেখা যাচ্ছে। সাথী বেগম একবার আঁখির দিকে তাকান। তারপর আবার সামনে তাকান। এগিয়ে যান ধীর পায়ে সেদিকে।

 

শিউলি বেগম আর শম্পা ডায়নিং টেবিলের চেয়ার গুলো টেনে মুখোমুখি হয়ে বসে কি নিয়ে যেনো কথা বলছে। শিউলি বেগম কিছু একটা তাকে বুঝাচ্ছেন‌। সাথী বেগম আর আঁখি এসে দাঁড়ায় শম্পার চেয়ারের পিছনে। শিউলি বেগম কথা বলতে বলতে মুখ তুলে তাকান। মোমবাতির মৃদু আলোয় সাথী বেগমের চেহারা আংশিক আলোকিত হয়েছে। শিউলি বেগম কথা থামান। শম্পা শিউলি বেগমের নজর তার পিছনে দেখে মুখ ঘুরিয়ে পিছনে তাকায়‌। দেখে এক মধ্যবয়সী নারী দাঁড়িয়ে আছেন। শম্পা সামনে তাকায়‌। তার দৃষ্টিতে ছিলো কিছুটা উৎকণ্ঠা মিশ্রিত চাহনি। তখনই পিছন থেকে সাথী বেগম বলেন,

‘ বুবুজান। মেয়েটা কে ? ‘

‘ শম্পা। অর নাম শম্পা। ‘

‘ এই গ্রামেরই! ‘

‘ হ। রাশেদ গো বাড়ি নতুন আইছে। ‘

‘ ওহ। অনেক দিন ধরে বাইরে বের হওয়া হয়না। নতুন মানুষ গুলাকে এইজন্য অপরিচিত মনে হয়। ‘

শম্পা শিউলি বেগমের দিকে তাকিয়ে কাঁপো কাপো গলায় বলে,

‘ চ,চাচি। আপনি তাইলে চলেন আমার লগে। ‘

‘ কোথায় যাওয়ার কথা বলছে ও? ‘ সাথী বেগম বলেন। 

‘ মাইয়াডা একটু কাপড়ে ফুল,নকশা এডি কেমনে সিলাইতে হয়, তা আমার থে শিখতে চাইছিলো। আমি কইছিলাম একদিন যাইয়া শিখায়া দিমু। এরলাইগাই আইছে। ‘

সাথী বেগম শম্পার কাঁধে হাত রাখেন। শম্পা কিছুটা ইতস্তত বোধ করে পিছনে ফিরে তাকায়। সাথী বেগম তাকে একবার দেখে শিউলি বেগমের দিকে ফিরে তাকান। বলেন,

‘ ঘরে লায়লার জ্বর আসছে। তোমার ঔষধের বক্সটা কোথায় বুবুজান! ‘

‘ লায়লার জ্বর আইছে! দেখছো‌। কইছিলাম যে দুইডা ছাতা নে। শুনলোই না। বিকালে আমাগো লগে যে গেছিলো, তখন বৃষ্টিতে ভিজছে। এরলাইগা এহন জ্বর আইছে। (সাথীর দিকে তাকিয়ে) আইচ্ছা আমি ঔষধের বক্সটা আনতাছি। ‘

শিউলি বেগম চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। শম্পা উৎসুক দৃষ্টিতে শিউলি বেগমের দিকে তাকিয়ে আছে। শিউলি বেগম তার চাহনি দেখে বলেন,

‘ আমি কাইল আই! আইজ আমার রান্না বহাইতে হইবো। কারেন্ট ডাও নাই। এহন ঐদিকে গেলে তোমার চাচায় আইয়া আমারে বকবো। ‘

শম্পা তার দৃষ্টি নামিয়ে নেয়। বাধ্যের মতো নাড়িয়ে বলে ‘আইচ্ছা’। শিউলি বেগম চলে যেতে নেন তখনই সাথী বেগম বলে উঠেন। 

‘ আমি ওকে শিখিয়ে দেই! ‘

শিউলি বেগম ফিরে তাকান। বলেন,

‘ অর বাসা যাইয়া শিখাইতে হইবো। এহন এতো রাইতে বাইরে যাইবা! ‘

‘ সমস্যা নাই। শুয়ে বসেই তো থাকছি সারাদিন। আর দুলাভাইয়ের ফিরতে হয়তো আরো দেরি হবে। আমি চেষ্টা করবো ওকে শিখিয়ে দিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার। সাথে তো আঁখি আছেই।’

শিউলি বেগম শম্পার দিকে ফিরে তাকান। বলেন,

‘ মা। তোমার এই চাচিরে তাইলে লইয়া যাও। তোমারে সব শিখায়া দিবো। ‘

শম্পা মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। শিউলি বেগম বলেন,

‘ আইচ্ছা তে তোমরা তাইলে যাও। আমি লায়লারে ঔষধ দিয়া রান্না বহায়া দেই। আজকে এমনিই কামে তালগোল পাইকা গেছে। ‘

শিউলি বেগম চলে যান তার ঘরের দিকে। শম্পা তার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। সাথী বেগম তাকে যেতে বলেন সামনে। শম্পা আগে আগে গিয়ে বারান্দার দরজা থেকে নিচে নেমে জুতো পড়ে। সাথী বেগম খুরিয়ে খুরিয়ে হেঁটে যান বারান্দার দরজার দিকে। সাথে আসে আঁখি। দুইজন দরজা থেকে নেমে জুতো পড়ে নেয়। সারাদিন বৃষ্টি হওয়ায় আঙিনা ভেজা। আকাশে মেঘ কেটেছে। হালকা জোছনার মতো আলো পড়েছে। তা দিয়েই পথ দেখে এগিয়ে যায় শম্পা আর সাথী। পিছু পিছু আসে আঁখি। 

 

শম্পা দুই হাত একসাথে করে নখ খুঁটিয়ে যাচ্ছিলো। তার চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছিলো সে একটু বেশিই ইতস্তত বোধ করছে। সাথী বেগম তার পাশে এসে তার সাথে হাঁটতে থাকেন। রাস্তার একপাশে কাঁদা, তারা অপর পাশ দিয়ে হাঁটছে। সাথী বেগম, শম্পাকে বলেন,

‘ তোমার মায়ের নাম কী! ‘

‘ জ,জরিনা। ‘

‘ আনন্দপুরে তো জরিনা বলে কারো নাম মনে পড়ছে না! ‘

‘ জে আমরা। আমরা রেলস্টেশনে থাকতাম। ‘

বলেই শম্পা মাথা নিচু করে নেয়।

‘ ওহ। তোমার মা এখন কোথায়! বাবা নেই তোমার! ‘

‘ আমার বাবারে আমি কহনো দেহি নাই। মায়ে কইছিলো আমার বাবা নাই। হারায়া গেছে। আর, আর আমার মায়ে, ট্রেনে কাটা পইড়া মইরা গেছে দুই মাস আগে। ‘

শেষের কথাটা বলার সময় শম্পার গলা জড়িয়ে আসে। সাথী বেগম বিষয়টা বুঝতে পারেন। তাই এইনিয়ে আর কোন কিছু না জিগাবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন। তিনি প্রসঙ্গ ঘুড়িয়ে দিয়ে বলেন,

‘ সুঁই সুতা আছেতো! ‘

শম্পা মুখ তুলে পাশ ফিরে সাথী বেগমের দিকে তাকায়। মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলে। সাথী বেগম বলেন,

‘ রাশেদ এখন কী করে! শুনলাম পড়াশোনা নাকি ছেড়ে দিছে! ‘

‘ হেয় এহন এমনি কাম করে। বাসায় তো হেয় ছাড়া আর কেউ নাই সংসার দেখার। ‘

‘ ওর বোনটাও তো মারা গেলো। ভাগ্নে টাও নিখোঁজ। ভাগ্নে টাকে পড়ে আর পুলিশ খুঁজে পাইছিলো কী? ‘

‘ না। ‘

‘ গ্রাম দিন দিন খারাপ হয়ে উঠতেছে। গ্রামের আর দোষ দিয়ে কী লাভ। মূলে তো। নিজের পরিবারই আছে। ‘

‘ মানে! ‘

‘ তুমি বুঝবেনা। ‘ 

‘ আচ্ছা আপনারে একটা কথা জিগাই! ‘

‘ হ্যা বলো। ‘

‘ আপনের পায়ে কী ব্যাথা পাইছেন! না মানে এমনে হাটতাছেন যে। আপনার কষ্ট হইলে আপনি বাড়ি ফিরা যাইতে পারেন। আমি কাইল চাচির থে শিখা নিমু। ‘

‘ আরে না সমস্যা নাই। আর আমার পায়ে কোন সমস্যা না। আমার ব্যাথা কোমরে। কোমরের ব্যাথার জন্যই কিছুটা আস্তে আর ডান পায়ের উপর বেশি ভর দিয়ে হাটি। ‘

‘ ওহ।‌ ‘

‘ রাশেদের বাবা-মা এখন কেমন আছে! ওনারা তো বলে অসুস্থ শুনছিলাম। ‘

শম্পা বলতে শুরু করে। সাথী বেগম হাঁটছেন আর মন দিয়ে তার কথা শুনছেন। তাদের পিছন পিছন আসছে আঁখি। তবে সে একটু অন্যমনস্ক। দুই হাত একসাথে করে সে নখ খোটাচ্ছিলো। তার চোখে যেনো কোন এক অজানা ভয়। চারপাশে খুবই নিস্তব্দতা। আর তারা এখন যেই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে, তার একপাশ টায় বাঁশঝাড়।। আরেকপাশ টায় ফসলি মাঠ। এক ফোঁটা বাতাস বইছে না। সব কেমন যেনো নিরব, নিস্তব্দ। 

 

আকাশের চাঁদ ঢেকে যায় মেঘের আড়ালে। দূরের আকাশে কিছু কালো মেঘ জমেছে। হয়তো সেগুলো আনন্দপুরে আসছে, এক ভারি বর্ষণ দেওয়ার জন্য।

 

_____

 

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। রিয়াদ হন্তদন্ত হয়ে করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। নার্স, মানুষ সবাইকে সড়িয়ে তাড়াতাড়ি হাঁটছে। দূরেই বসার যায়গায় বসে আছেন ইকরার মা আর বানু খালা। রিয়াদ তাড়াতাড়ি তাদের দিকে এগিয়ে যায়‌।

 

রিয়াদকে আসতে দেখে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ান মৌসুমী বেগম আর বানু খালা। রিয়াদ হন্তদন্ত হয়ে এসে তাদের সামনে দাঁড়ায়। মৌসুমী বেগম কিছু বলতেই যাবেন তখনই রিয়াদ বলে,

‘ আমি, আমি টাকা পে করে এসেছি। ডাক্তার কোথায়। এখানেই তো আপনাদের সাথে থাকার কথা। ‘

‘ উনি একটু ভিতরে গেছেন বাবা। এতোগুলো টাকা। তুমি একটু অপেক্ষা করতে পারতে। তোমার শশুর নিচে গিয়েছেন এটিএম থেকে টাকা তুলতে। ‘

‘ আমার কাছে ছিলো। আমি পে করে দিয়েছি। আব্বাকে বলুন টাকা গুলো রেখে দিতে। পরে কাজে লাগতে পারে। ‘

 

কেবিনের দরজা খুলে বেড়িয়ে আসে ডাক্তার সোয়েব। রিয়াদ আর মৌসুমী বেগম ডাক্তারকে দেখা মাত্রই তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। হন্তদন্ত হয়ে বলতে থাকে,

‘ আমার মেয়ে। ওর, ওর জ্ঞান ফিরেছে! ‘

‘ ইকরা, ইকরা কেমন আছে। ‘

‘ আপনারা শান্ত হোন।‌ রিসিপসনে টাকা জমা দিয়েছেন! ‘

‘ হ্যা। আমি, আমি টাকা পে করে এসেছি। ‘

‘ আপনি যেনো রুগির কী হন! ‘

‘ স্বামী। আমাদের ১৫ দিনও হয়নি কাবিন হওয়ার। ‘

‘ পেসেন্টের অবস্থা খুব সিরিয়াস। খুব সিরিয়াস মানে খুবই সিরিয়াস। মাথায় ব্লাডের প্রেসার বাড়ছে। যেকোনো সময় রক্ত নালি ছিড়ে যেতে পারে। আমরা আজকে রাতেই শেষ অপারেশন টা করবো। এই অবস্থায় রুগীকে আর বেশিক্ষণ ফেলে রাখা যাবেনা। ‘

‘ শেষ অপারেশন মানে! ‘ রিয়াদ বলে।

‘ মানে এটাই রুগির শেষ অপারেশন। যদি এটা সাকসেসফুল হয়, তাহলে রুগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা ৮০%। আর যদি,,,,,! ‘

‘ আর যদি কী! ওর অপারেশন যদি সাকসেসফুল না হয় তাহলে! ‘

‘ তাহলে ওকে আর বাঁচানো যাবে না। আপনারা উপর ওয়ালার কাছে প্রার্থনা করুন। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো তাকে বাঁচানোর। বাকিটা উপরওয়ালার হাতে। ‘

ডাক্তার সোয়েব চলে যান অপারেশন থিয়েটারের দিকে। রিয়াদ মাথায় হাত দেয়। তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। ইকরার মা, বানু খালা দুইজনই কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। রিয়াদ পাগলপ্রায় হয়ে এসে দেয়ালের কাছেই দাঁড়ায়। দেয়ালে জোড়ে সোড়ে একটা ঘুষি মেরে বসে। ইকরাকে কী ও আর ফিরে পাবেনা! মেয়েটার সাথে যে সে সারাজীবন থাকার ওয়াদা করেছিলো। ইকরা কী তাকে ছেড়ে চলে যাবে এভাবে! রিয়াদ কী হারিয়ে ফেলবে ইকরাকে! 

হাসপাতালের কোলাহল রিয়াদের কানে এসে ঠেকেনা। সব নিস্তব্দ হয়ে যায় তার কাছে। চোখ বুজে ফেলে সে। মস্তিষ্কে ভাসতে থাকে ইকরা আর তার সেই বৃষ্টিতে ভেজার দিনটার কিছু মুহুর্ত। সে যেনো স্মৃতিতে হারিয়ে যায়‌।

 

_______

 

জানালার পাশে এক টেবিলের সামনে বসে রয়েছে নিপা। টেবিলে মোমবাতি রাখা। মোমবাতির আলোয় নিপার স্নিগ্ধ মলিন মুখ খানা বেশ মিষ্টি লাগছে। শাড়ি পড়েছে সে। কানে ছোট্ট দুল। হালকা সেজেছে সে আজ। তবে এই সাজার উপলক্ষ যে বিশেষ কিছু, তা এখনো রায়হান জানেনা। 

ঘরে রায়হান নেই। নিপা তাকে পাঠিয়েছে পাশের জঙ্গলে। তবে কোন শিকারে নয়, জঙ্গলের মাঝে একটা গোল ফাঁকা যায়গা আছে। সেই যায়গাটা পরিস্কার করতে পাঠিয়েছে। সেখানে বসে আজ তারা দুজন চন্দ্রবিলাস করবে। আকাশে মেঘ কেটেছে। গোলগাল একটা চাঁদ উঠেছে। সাথে হালকা জোছনা। 

 

টেবিলে মোমবাতির আলোয় নিপা নেড়ে দেখছিলো কিছু পুরোনো চিঠি। চিঠিগুলো ছিলো তার প্রেম অধ্যায়ের সূচনা লগ্নের সময়কার। তখনকার, যখন নিপা জানতো যে, কেউ একজন তাকে অসম্ভব ভালোবাসে, কিন্তু মানুষটাকে সে চিনতো না। তার ঠিকানায় সেই মানুষটা চিঠি পাঠাতো। আর তার মনব্যাক্তি প্রকাশ করতো। নিপারও চিঠি গুলা বেশ ভালো লাগতো। চিঠি গুলো পড়ে সে তখন ভাবতো, আর যাই হোক। ছেলেটা বাকি সবার মতো না। একটু আলাদা। ছেলেটা লেখার মাধ্যমে তাকে নিয়ে হাজারো প্রেম কাব্য রচনা করতে পারবে। যদি সেই ছেলেটার মাঝে তাকে নিয়ে ভালোবাসাই না জন্মায়, তাহলে এতো সুন্দর প্রেমপত্র লেখা, কোন স্বাধারণ ছেলের পক্ষে সম্ভব নয়। 

অতীত টুকু ভেবেই নিপার মুখে এক লজ্জা মাখা হাঁসি ফুটে উঠে। মোমবাতির আলোক শিখায় সেই হাসিটা যেনো কোন মূলবান রত্নতুল্য এক ফোয়ারা মনে হয়। নিপা রায়হানের দেওয়া সর্বপ্রথম চিঠিটা হাতে নেয়। কেনো জানি এই চিঠিটা তার কাছে খুব ভালো লাগে। প্রথম প্রেম, প্রথম চিঠি। ভালোলাগা তো অবশ্যই কাজ করবে। 

নিপা চিঠিটা খাম থেকে বের করে। খামের উপর হাত দিয়ে আঁকা নানা রঙের ফুল, পাতা। ছেলে হয়েও রায়হান এসব এঁকেছে কীভাবে তাই নিপা আজও বুঝে উঠতে পারেনা। সে নিজেও তো এতো ভালো আঁকতে পারে না। নিপা খাম থেকে কাগজ টা বের করে। কলমের কালি গুলো সেই সাদা কাগজে যেনো কোন উত্তম লেখন শৈলির পরিচয় দিচ্ছে।‌ কতটা যত্ন করে লেখলে লেখা গুলো এতো মনকাড়া হতে পারে! ভেবেই নিপার মুখে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠে। 

কাগজ টা বের করে মোমবাতির আলোয় পড়তে শুরু করে নিপা। জানালা দিয়ে মৃদু হাওয়া ঘরে প্রবেশ করে। মোমবাতির আলো নৃত্য শিল্পীর মতো নেচে নেচে উঠে। নিপা পড়তে শুরু করে তার প্রথম প্রেম চিঠি,

 

প্রিয়র চেয়ে প্রিয় স্রোতস্বিনী,,,,

 

শ্রাবণ ধারার মাঝে তোমার ঐ অপলক রূপের সাক্ষী হওয়া এক নির্বাক প্রান্তর বলছি। সেইদিন টা হয়তো আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ও স্মরনীয় দিনগুলোর মধ্যে একটি ছিলো,,,! আমার কর্মস্থলে যাওয়ার তাড়না একমুহুর্তের জন্য রুখে দেওয়া রূপবতী নন্দিনী, তোমার খোলা চুলকে হাওয়ায় দোল খাওয়ানো যদি সেই দখিন হাওয়া হতাম,,,! নিজেকে অনেক ধন্য মনে করতাম।‌ আমার পৃথিবী মুহুর্তের মধ্যে থমকে গিয়েছিলো তোমায় দেখে। ছাতা হাতে তুমি দাঁড়িয়ে ছিলে বৃষ্টির থেকে বাঁচতে, সেই তোমায় দেখে আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম এক গহীন প্রেমরণ্যে,,,! তোমার সেই ডাগর ডাগর চোখ দুটিতে হারিয়ে গিয়েছিলাম একাকিত্বে। যদি পারতাম হতে, আষাঢ়ের সেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বৃষ্টি কণা! মেঘ ভেঙে এসে ভিজিয়ে দিতাম তোমার ঐ অমলিন মুখশ্রী। জানো, তুমি যখন তোমার বান্ধবীর সাথে কথা বলার মাঝে হাসছিলে, মন বলছিলো এই হাসির জন্য দুনিয়া এফোড় ওফোড় করে দিতেও রাজি,,,! পুব আকাশে ঘটা মেঘের ঘনঘটা, তার মাঝে অঝোর ধারায় ধরিত্রীকে ভিজিয়ে দেওয়া বৃষ্টিকে বলেছিলাম। হে মেঘলা আকাশ, তোমার বর্ষণ তুমি থামিও না। এই অপলক সুন্দর মুহুর্তকে তুমিই পারো আরো একটু দীর্ঘ করতে,,,,,,

তোমার ঐ রুপনগরে অববাহিকায় বয়ে যাওয়া এক নদীর স্রোতধারায় নিজের গা ভাসিয়ে ছিলাম সেদিন। তাই তোমার নাম দেই স্রোতস্বিনী। আমি তোমার অববাহিকায় জনম জনমের মাঝি হিসেবে বৈঠা বাইতে চাই। এই অভাগা মাঝি কী পাবে সেই সুযোগ ? স্রোতস্বিনী কী আমায় তার স্রোতের জোয়ারে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে বহুদূর ? নাকি এনে ফেলে দিবে এক জনমানবহীন দীপ পুন্জে ?

 স্রোতস্বিনী, তোমার সেই উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম,,,,!

 

ইতি,

তটিনী তীরের এক অভাগা মাঝি

 

চিঠিটা পড়া মাত্রই যেনো এক আনন্দ ধারা বয়ে যায় নিপার সারা শরীরে। চোখ যেনো অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে কাগজ খানার দিকে। কী মায়া জড়ানো প্রতিটা বাক্য। নিজেকে এখন ধন্য মনে হচ্ছে নিপার। সে দিনশেষে এই সঠিক মানুষটাকেই বেছে নিয়েছে। বিছে নিয়েছে এই অনন্তকালের মহিমায়, এক পথচলার সঙ্গী হিসেবে। নিপা চিঠিটা ভাঁজ করে। ছোট্ট একটা চুমু খায় সেটায়। রায়হান আজও তাকে ঠিক প্রথম দিনের মতোই ভালোবাসে। রায়হানের এই ব্যাক্তিত্বটাই তাকে মুগ্ধ করে। এমন একটা মানুষকে সে ভালোবেসেছে, যে তার সব পাপের রাজ্যে ফেলে তাকে নিয়ে এই ছোট্ট ভালোবাসার কুঠিরে এসে উঠেছে। এই মানুষটা আর যাই হোক, প্রিয়তমার জন্য দুনিয়া জয় করতেও পিছুপা হবেনা।

 

নিপা আরেকটা চিঠি হাতে নেয়। এই চিঠিটা রায়হান তাকে দিয়েছিলো তাদের দেখা হওয়ার পর। তবে তখন নিপা সরাসরি রায়হানের সাথে কলেজে কথা বলতো না। শুধু এমনি চিনতো রায়হানকে। নিপা চিঠিটা খুলে। পড়তে শুরু করে মন দিয়ে,

 

” স্রোতোসিনী,

 

দু দিন হলো, কলেজে তোমায় দেখিনি। তোমার কী শরীর খারাপ! কদিন আগে বৃষ্টি হয়েছিলো। তুমি নিশ্চয়ই সেই বৃষ্টিতে ভিজেছিলে! আর এখন জ্বর বাঁধিয়ে বসেছো। প্রতিদিন কলেজের গেটে তোমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকি। ক্যাম্পাসে গিয়ে পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে খুঁজে ফিরি তোমায়। কিন্তু নাহ, তুমি কলেজেই আসছো না। 

তোমার বান্ধবীদের কাছে তোমার কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম। ওরা আমাকে কিচ্ছু বলেনা। উল্টো আমায় এমন ভাবে তাড়িয়ে দেয়, যেনো আমি ওদের কোনো পাকা ধানে বিনা অনুমতিতে মই দিয়ে আসছি। 

তোমার বাসার সামনে গিয়েছিলাম। তোমায় একটাবার দেখার জন্য ঝড়, বৃষ্টি, কাঠফাঁটা রোদ সব উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিন্তু না। তাও তোমার দেখা পেলাম না। তুমি যদি চিঠিটা পেয়ে থাকো, তবে আমায় একবার দেখা দিও। জানালা খুলে দেখবে আমি এখনো তোমাদের বাড়ির সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে। তোমায় শুধু একটা বার দেখেই আমি চলে যাবো। শুধু একটাবার। 

কলেজে আসিও। সামনে তোমার ফাইনাল পরীক্ষা। এইসময় কলেজ মিস দেওয়া মোটেই ঠিক নয়। এতে তোমার পড়ালেখারও ক্ষতি হবে, আর আমিও যন্তনায় ছটফট করতে করতে নিঃশেষ হয়ে যাবো। আমার তৃষ্ণা ভরা দুই চোখ, তোমায় একপলক না দেখে শান্ত হতে পারছেনা। 

এই হতভাগাটাকে আর কষ্টে রেখোনা! একটাবার দেখা দাও। শুধু একটা বার! 

 

ইতি, 

অসহায় এক প্রেমিক “

 

নিপা হেসে ফেলে। শেষের টুকু যতবারই পড়েছে ততবারই সে হাঁসি থামাতে পারেনি। ইশশ্, রায়হান কতো উতলা ছিলো তাকে দেখবার জন্য। নিপাকে একদম স্বার্থহীন ভাবে ভালোবেসে রায়হান। তার এমন শত-শত চিঠি আজ নিপা খুব যত্নে সংরক্ষণ করে রেখেছে। তবে কখনো এসব চিঠির উত্তর দেয়নি। তার কেনো জানি উত্তর দিতে মন চাইতো না। রায়হানের একপাক্ষিক ভাবে চিঠি পাঠানো, তার আলাদা একটা ভালোলাগার যায়গা জুড়ে ছিলো। 

নিপা চিঠিটা ভাঁজ করে খামে ঢুকিয়ে রাখে। এই খামটাকেও বাকি খামের সাথে একটা কাঠের বক্সে ঢুকিয়ে রাখে সযত্নে।

 নিপা দুই গালে হাত দেয়। মোমবাতির দিকে একপলকে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে ভাবে, ‘ রায়হান তো সবসময় আমাকে চিঠি দিয়েছে। আমি আজ পর্যন্ত তাকে একটা চিঠিও দেইনি। বেচারা বার বার বলতো তাকে চিঠি লিখতে। (একটু থেমে) আচ্ছা, আমার বিষয়টা ওকে চিঠির মাধ্যমে জানালে কেমন হয়! ইয়েস, এটাই সবচেয়ে বেষ্ট হবে। ওকে প্রথম চিঠিটাও দেওয়া হয়ে যাবে। আর ওর জীবনের সবচাইতে খুশির খবর টাও জানানো হবে। এক ঢিলে দুই পাখি। রায়হান অনেক খুশি হবেরে,,,,! ইশ,,,,! ওর খুশি মুখটা দেখতে ইচ্ছা করতেছে। ও নিশ্চিত খুশিতে নাচতে শুরু করবে। হ্যা। ও এমনটাই করবে। ও যে বাবু পাগল! সবসময় বলে ছোট্ট সুবা কবে হবে, ছোট্ট সুবা কবে হবে। এইবার ওর সব আশা পূরণ। হুঁ হুঁ নিপা।‌ জব্বর একটা বুদ্ধি বের করছিস। তোর মাথার প্রসংশা করতে হয় বল!!! ‘

বলেই জিহ্বা কামড়ে হাসে নিপা। অনেক খুশি খুশি লাগতেছে ওর। তাড়াতাড়ি একটা সাদা পাতা আর কলম নেয় টেবিল থেকে। ওর পড়া নিঃশ্বাসের হাওয়ায় মোমবাতির শিখা দোল খেয়ে উঠে। একটা খাতার উপর রাখে সাদা পেইজ টা। কলম হাতে নেয়। ভাবতে থাকে কী দিয়ে শুরু করা যায়। কলমের নিব কামড়াতে কামড়াতে চিন্তা করতে থাকে। রায়হানকে তো ও রায়হান বলেই ডাকে। রায়হান ওর নানা নাম দিলেও আজ পর্যন্ত নিপা রায়হানকে কোন নাম দেয়নি। কি দিয়ে তাইলে শুরু করা যায়! 

হঠাৎ নিপার মাথায় বুদ্ধি খেলে যায়। তাড়াতাড়ি কলম নিয়ে লেখতে শুরু করে সাদা কাগজের উপর। মোমবাতির আলোয় মনযোগ দিয়ে লেখতে থাকা নিপাকে দেখতে বেশ লাগছিলো। নিপা লেখতে থাকে তার চিঠিটা।‌ খুব মন দিয়ে লেখতে থাকে।

 

‘ প্রিয় অভাগা স্বামী! 

 

অভাগা বলা যায় না, এখন তো আপনি আর অভাগা নাই। আমাকে তো পেয়েই গেছেন। আপনার প্রেম, ভালোবাসা সবই তো এখন সহজ হয়ে গেছে। চিঠি লেখাও তো বিয়ের পর ছেড়ে দিছেন। চিঠি লিখেই বা আর কী করবেন। লোকটা তো সবসময় পাশেই থাকে আপনার। যখন মন চায় ভালোবাসা প্রকাশ করে ফেলেন। শুধু এখনকার ভালোবাসায় আপনার দুষ্টামি মিশছে, তাছাড়া সব একদম প্রথম দিনের মতোই আছে। 

 

তো এখন শুনুন। যেই উদ্দেশ্য আপনাকে চিঠি লেখা। আপনি তো খুব বাবু বাবু করতেন। খুব বলতেন আমাদের একটা ছোট্ট সুবা কবে হবে। আমিও ভাবতাম, আমাদের ঘরে ছোট্ট মেহমান টা কবে আসবে। তবে আমাদেরকে অপেক্ষার প্রহরটা আর বেশি লম্বা হয়নি।

 আমাদের ঘর আলো করে নতুন মেহমান আসতে চলেছে। হ্যা, ঠিকই শুনেছেন আপনি। আমাদের ছোট্ট সুবা আসতে চলেছে। ছোট্ট সুবা। আজ মা’কে নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছিলাম। ডাক্তার দেখিয়েছি। ডাক্তার বলেছে আর মাত্র কিছু মাস পড়েই আপনি, আমরা, আমাদের ছোট্ট সুবাকে কোলে নিতে পারবো। 

শুনছেন, ছোট্ট সুবাইযে হতে হবে তার কিন্তু কোন মানে নেই। ছোট্ট রায়হানও হতে পারে। তবে আমি চাই, আমাদের ছোট্ট সুবাই হোক। দিনশেষে আপনার খুশিই আমার খুশি। আর আপনার চাওয়াই আমার চাওয়া। 

এইযে এতো বড় একটা খুশির খবর আপনাকে দিলাম, এর বদলে কিন্তু আমাকেও কিন্তু কিছু দিতে হবে। তবে বেশি কিছু না। শুধু পাশ ফিরে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরবেন। আপনার মুখ থেকে ভালোবাসি কথাটা শুনতে আজ খুব ইচ্ছে করছে। খুব ইচ্ছে করছে আপনার উষ্ণ আলিঙ্গন পেতে। মুখে বলতে লজ্জা করে। তাই এটাও চিঠিতেই লিখে দিলাম।

 

আপনি করে বলছি বলে অবাক হচ্ছেন! অবশ্য আপনি করে বলি আর তুমি করেই বলি, দিনশেষে আপনার চেয়ে আপন আর কেউ নেই। আপনার সাথে আমার আত্মাস্থের মিলনটা এতোটাই গভীর, যা আর কারো সাথেই নেই। যৌবন তো একটা সময় পর শেষ হয়ে যায়। কিন্তু এই আত্মাস্থের মিলন টা, সারাটা জীবন রয়ে যায়।

শুনছেন, ডাক্তার কিন্তু বলেছে এইসময়টায় আমাকে আপনার ছায়াতলে থাকতে। এইসময় বলে মানষিক প্রশান্তি বেশি প্রয়োজন। তাই এখন আমার প্রতি ভালোবাসার পরিমাণটা আরেকটু বাড়াবেন, বুঝেছেন! বললাম এইজন্যই, কারণ ইদানিং আপনি একটু মনমরা হয়ে থাকছেন। হয়তো কাজের চাপে, তবে সেটা যেনো দীর্ঘস্থায়ী না হয়। আপনি আবার আমার প্রেম পুরুষ হয়ে ফিরে আসুন। ফিরে আসুন নতুন আঙ্গিকে।‌

 

শুনছেন, আমাদের ছোট্ট সুবা আসতে চলেছে। ছোট্ট সুবা! 

 

ইতি,

আপনার স্রোতোসিনী

 

নিপা কাগজের উপর থেকে কলম উঠায়। এই প্রথম কোন চিঠি লিখলো সে। কলমটা পাশে রেখে চিঠিটা তুলে চোখ বোলাতে থাকে সেটায়। রিভাইস করতে থাকে। ‘ চিঠিটা রায়হানের মতো অতটাও ভালো হয়নি। হবেই বা কী করে। আমি ওর মতো কাব্যিক নাকি। স্কুলের আবেদন পত্রই ঠিক ভাবে লেখতে পারতাম না।‌ (একটু থেমে) তাও, যা হইছে তাও মন্দ না। রায়হান নিশ্চয়ই খুশি হবে। ‘ বলেই নিপা চিঠিটাকে ভাজ করতে থাকে। এতোক্ষণে হয়তো রায়হান ঐদিকে ক্যাম্পফায়ার জ্বালিয়ে ফেলেছে। নিপা তাড়াতাড়ি চিঠিটা ভাঁজ করে টেবিল থেকে উঠে পড়ে। ফু দিয়ে মোমবাতিটা নিভিয়ে দেয়। চলে যায় ঘরের দরজার দিকে। দরজা খুলে বেড়িয়ে যায়।

 

জানালা দিয়ে নিপার হেঁটে চলা ঘর থেকে দৃশ্যমান। জোছনা পড়েছে যে, তাই পথ চলতে কোন সমস্যা হচ্ছে না নিপার। নিপা রাস্তা দিয়ে মাঠে নামে। মাঠের কিছুটা আলি পেড়িয়েই জঙ্গলের এদিকটায় ঢুকে পড়ে সে। ছোট্ট এক হিমেল হাওয়া খোলা জানালা দিয়ে এসে টেবিলের কাগজ গুলোকে মৃদু নাড়িয়ে দিয়ে যায়।

 

         নীলগিরি জঙ্গলের মাঝে একটা ছোট্ট ফাঁকা যায়গা। যায়গাটা গোলাকৃতির প্রায়। ঠিক মাঝখানে একটা কাঁটা মোটা গাছের গুঁড়ি রাখা। গুড়ি টা আড়াআড়ি ভাবে মাটিতে শুইয়ে রাখা। তাতে হেলান দিয়ে বসে রয়েছে নিপা রায়হান। নিপার রায়হানের কাঁধে মাথা দিয়েছে। রায়হান এক পা মেলে দিয়েছে, আরেক পা ভাঁজ করে উঠিয়ে রেখেছে। সেই পায়ের হাঁটুর উপর এক হাত। আরেক হাত নিপার কাঁধে। তাদের হতে কিছুটা সামনেই শুকনো পাতা জড়ো করে রাখা। তবে মাটি ভেজা হওয়ায় সেখানে আগুন ধরছে না। ধরলেও কিছুক্ষণ বাদ নিভে যাচ্ছে। তাই ক্যাম্পফায়ার  জ্বালায়নি তারা। 

         

 আকাশের চাঁদ টা আজ আলো জেলেছে। মাঝে মাঝে কিছু মেঘ এসে চাঁদের অর্ধেক আড়াল করে ধরছে। আবার সরে যাচ্ছে। নিপা রায়হানের কাঁধে মাথা রেখে তাকিয়ে আছে সেই দূর আকাশের চাঁদের দিকে। চাঁদের আশেপাশে অনেক তারাও আজ দেখা দিচ্ছে। বৃষ্টি ভেজা দিনের পর এমন রাত হয়তো খুব কমই দেখা যায়। 

 রায়হান হাত দিয়ে গাছের পাতা ছোট্ট ছোট্ট করে ছিড়ছে। নিপা এক ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে। রায়হান বুকে হাত রাখে। রায়হান মাথা ঘুড়িয়ে নিপার দিকে তাকায়। নিপার একেকটা শান্তির প্রশ্বাসই বলে দিচ্ছে, যে সে রায়হানের কাঁধে মাথা রেখে কতটা সুখী। রায়হান নিপার মাথার সেতিতে একটা ছোট্ট চুমু খায়। নিপার এই ছোট্ট ছোট্ট ভালোবাসা গুলো তার মনের মেঘ গুলোকে ধীরে ধীরে কাটিয়ে দিচ্ছিলো। মেঘের আড়াল হতে উঁকি দিচ্ছিলো নতুন দিগন্ত রাঙানো অগ্নিপিন্ড। তবে তা ছিলো ক্ষণস্থায়ী। রায়হানের মনে আবার পড়ে যায় আজ রাতের কথা। রায়হান মুখ ঘুড়িয়ে অপর পাশে তাকায়। গাছের গুঁড়ির উপর রাখা ছিলো কাউন্টডাউন ঘড়িটা। ঘড়িটায় আর মাত্র ৩৩ মিনিট বাকি। রায়হানের ভিতরটা আঁতকে উঠে। তখনই নিপা ম্লিন গলায় বলে উঠে,

 ‘ আজকের চাঁদটা অনেক সুন্দর তাই না! ‘

 রায়হান ফিরে তাকায় নিপার দিকে। নিপার দৃষ্টি ঐ দূর আকাশে। রায়হানও আকাশের দিকে তাকায়। এই নিদারুণ চন্দ্রবিলাশ টাও যেনো তার মনের মধ্যে এখন প্রভাব ফেলতে পারছেনা। রায়হান মুখে মিথ্যে হাসি ফোটাবার চেষ্টা করে। বলে,

 ‘ হ,হ্যা। অ,অনেক সুন্দর। ‘

 ‘ এই রাত আমাদের জীবনে বারবার ফিরে আসুক। আর আমি যেনো এভাবেই তোমায় নিয়ে চন্দ্রবিলাসে মেতে উঠতে পারি। ‘

 নিপা রায়হানের হাত জড়িয়ে ধরে। হাতের মাংসপেশিতে মাথা রাখে। রায়হান কী বলবে, কী করবে কিছুই বুঝে পায়না। তার মস্তিষ্ক যেনো চিন্তা করার সবটুকু ক্ষমতা হারিয়ে বসেছে। নিপা আবার বলে,

 ‘ রায়হান, তুমি আমায় ছেড়ে কখনো যেয়ো না। আমার আশা, সব তোমায় ঘিরে। শত আশার ভিড়ে আমি যেনো চিরকাল তোমায় খুঁজে পাই। ‘

 ‘ হয়তো, হয়তো পাবে। ‘

 নিপা রায়হানের হাত থেকে উঠে সোজা হয়ে বসে। একটু গোমড়া মুখ করে বলে,

‘ রায়হান, তুমি ঠিক আছো তো! ‘

 রায়হান নিপার দিকে তাকায়। মুখে মিথ্যে হাসি এনে বলে,

 ‘ হ,হ্যা। আমি, আমি ঠিকাছি তো। কিচ্ছু হয়নি আমার। ‘

 ‘ তোমার মুখটা এমন দেখাচ্ছে কেনো! তুমি কী কোন কিছূ নিয়ে চিন্তিত! ‘

 ‘ ক,কই। না, না তো। তুমি ভুল দেখছো। ‘

 রায়হান হাত দিয়ে তার গাল,মুখের ঘাম মুছতে থাকে। নিপা রায়হানকে আপাদমস্তক ভালো করে দেখে। রায়হান এমন কেনো করছে! সে কী খুব ক্লান্ত! তার কী শরীর খারাপ! বিভিন্ন প্রশ্ন এসে নিপার মাথায় উঁকি দিচ্ছে।

 রায়হান নিপার এমন অবাক চাহনি দেখে বুঝে যায় নিপা তাকে সন্দেহ করছে। সে যে কোন কিছু নিয়ে খুব চিন্তায় আছে তা বুঝতে পারছে। কিন্তু সে কী চিন্তায় চিন্তিত এটা নিপাকে কীভাবে বলবে। সে যে বলতে পারবেনা। এ কোন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এসে পড়েছে সে। বাঁচার পথ কী সে পাবেনা! 

রায়হান তার মুখভঙ্গি পাল্টানোর চেষ্টা করে। বলে,

‘ আরে আরে এভাবে কী দেখছো। আমার হয়তো একটূ ঠান্ডা লেগেছে। সকালে যাওয়ার সময় শরীরে বৃষ্টির ছিটা পড়ছিলো অনেক। ‘

‘ তোমার কী জ্বর আসছে! ‘

নিপা রায়হানের কপাল ছোঁয়। বলে,

‘ না তো। জ্বর তো নাই। ‘

‘ আচ্ছা বাদ দাও। আমি ঠিক হয়ে গেছি। আমার সুবা পাশে থাকলে ওসব কোন কিছুই আমার কিছু করতে পারবেনা। ‘

রায়হান নিপার কাঁধে হাত দিয়ে তাকে তার পাশে আরো টেনে নেয়। নিপার মনের চিন্তার ভাঁজ কিছুটা কমলেও এখনো মন থেকে পুরোটা যায়নি। সে বাঁ হাতে এখনো তার চিঠিটা মুঠ করে ধরে আছে। সে ভেবেছিলো রায়হানের সাথে চন্দ্রবিলাস করতে করতে চিঠিটা রায়হানকে দিবে। কিন্তু রায়হান এখন কেমন জানি করছে। 

রায়হান সোজা হয়ে বসে। নিপাও সোজা হয়ে বসে। রায়হান তার ডান পাশের একটা ব্যাগের ভিতর হাত ঢুকায়। রায়হানের অপর পাশে বসে থাকা নিপা নজর বাড়িয়ে দেখতে থাকে রায়হান কি করছে। তখনই রায়হান একটা লাল গোলাপ বের করে সেই ব্যাগ থেকে। গোলাপ দেখা মাত্রই নিপার চোখ মুখ খুশিতে ছেয়ে যায়। রায়হান নিপার দিকে তাকায়। নিপাকে গোলাপ টা দেয়। বলে,

‘ লাল গোলাপ। পছন্দ হয়েছে! ‘

‘ পছন্দ হয়েছে মানে, খুব পছন্দ হয়েছে! ‘

নিপা রায়হানের হাত থেকে গোলাপ টা নেয়। নাকের কাছে এনে চোখ বুজে গোলাপের সুঘ্রাণ নেয়। চোখ মেলেই বলে,

‘ অনেক সুন্দর সুবাস। ‘

‘ তোমার সুবাসিত চুলের কাছে এটা কিছুই না।‌ ‘

‘ হমম, বলছে তোমাকে। ‘

‘ আসলেই। বিশ্বাস হয়না! ‘

‘ না। ‘

‘ তোমার না হলে না হোক। আমার কাছে তোমার চুলের সুঘ্রাণ সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে। ‘

নিপা লজ্জা মাখা হাঁসি দেয়। রায়হানটাও না! তাকে বেশ লজ্জা দিয়ে কথা বলতে পারে। 

রায়হান নিপার আরো কাছে এসে পাশপাশি বসে। নিপার কাঁধে হাত দিয়ে তাকে কাছে টেনে নেয়। নিপা আবারো রায়হানের কাঁধে মাথা রাখে। দুই হাত দিয়ে ফুলটা ধরে তার সুবাস নিতে থাকে। রায়হান হাত উঁচিয়ে দূরের চাঁদ, আর পাশের তারাকারাজি দেখায়। বলে,

‘ ঐ চাঁদকে সাক্ষী রেখে বলছি, তুমি আমার জীবনে সবচাইতে শ্রেষ্ঠ উপহার। যেই উপহারকে কখনোই মূল্য দিয়ে পরিমাপ করা যায়না। পরিমাপ করা যায় শুধুমাত্র ভালোবাসা দিয়ে। ‘

নিপা মুচকি হাসে। রায়হান আবার কাব্যিক সুরে বলে,

‘ আবির মাখা রাঙা সকাল যদি জানতো, তার চেয়েও উজ্জ্বল এক নক্ষত্র আমার জীবনে রয়েছে, সে কখনোই আমার আকাশ প্রজ্জলিত করতে আসতো না। জোছনার আলোয় ভরা চাঁদ যদি জানতো, তার থেকেও মিষ্টি এক কিরণ আমার অর্ধাঙ্গিনী আমায় দেয়, সে কখনোই আমায় জোছনা দিতে আসতো না। এই পৃথিবী যদি জানতো, আমার জীবন শুধু তোমায় ঘিরে, সে কখনোই আমার জীবন নেওয়ার জন্য দিন-রাত অতিবাহিত করতো না। এই মহাকালকে সাক্ষী রেখে বলছি। আমি আমার স্রোতোসিনীর তুলনা কারো সাথে করবো না। আমার স্রোতোসিনীর তুলনা সে নিজেই। তারা তোমায় দেখে হিংসে করলে করুক, নিন্দুকেরা তোমায় নিয়ে কলঙ্ক ছুড়লে ছুড়ুক, তবুও আমার কাছে তুমি, এক টুকরো ভালোবাসা। যেমন আগে ছিলে, তেমন আছো, তেমনি রইবে। ‘

নিপার সারা শরীরে যেন ভালোবাসার পরশ বইয়ে দেয় কথা গুলো। রায়হান এতো সুন্দর করে কিভাবে তার অনুভূতি জানায়! নিপা যে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে। তার শব্দ ভান্ডার যে খালি পড়ে রয়। 

 

রায়হান নিপার কপালে একটা ছোট্ট চুমু খায়। নিপার চোখ গুলো বুজে বুজে আসছিলো। এই ঠান্ডা রাত্রি তাকে ঘুমের রাজ্যে পাঠানোর তাড়া দিচ্ছিলো। নিপা রায়হানকে নিম্ন স্বরে বলে,

‘ রায়হান, আমার ঘুম পাচ্ছে। আমায় একটা ঘুম পাড়ানি গান শোনাবে! ‘

রায়হান নিপার দিকে তাকায়। নিপার চোখ গুলো বুজে বুজে আসছিলো। নিপা মাথা নেড়ে হ্যা বলে। রায়হান, নিপার মাথা তার বুকে রাখে। নিজে হেলান দেয় মোটা গাছের গুঁড়িতে। গান ধরে একখানা। সমুধুর সুরের মঞ্চনায় নিপাকে নিয়ে যায় ঘুমের রাজ্যের রাণী বানাতে।

 

খোলা চোখখানা করো বন্ধ

বাতাসের ঠান্ডা গন্ধ

বয়ে বেড়ায় ঘরেরও বাহিরে

আসো ছোট্ট একটা গান করি

যাতে ঘুম পাড়ানি মাসি এসে পাশে

বসে হাত খানা দিবে কপাল ভরে

ভয় নেই আমি আছি পাশে

হাতখানা ধরে আছি হেসে

কোলেতে আমার মাথা তোমার

 

অন্ধকার রাত নিশ্চুপ সব

জোনাকির দল আজও জেগে আছে

তারা হয়তো অপেক্ষায় তোমার ঘুমের

হাতে রেখে হাত দেখে ঘড়ি

বসে অপেক্ষা করি

কবে হবে কাল?

ফুটবে সকাল..

আয় ঘুম চুম্বন দে

তার সারা কপালে

যাতে ঘুম আসে সব নিশ্চুপ হয়ে যায়

আয় চাঁদ মামা কাছে আয়

যাতে অন্ধকার না হয়

আলোমাখা কপালেতে টিপটা দে যাতে

কিছু আলোকিত হয়

সে যাতে ভয় না পায়

 

পরী আয় তার দুহাত ধরে

নিয়ে যা স্বপ্নের খেলা ঘরে

যেথা মিলবে তার সুখের ঠিকানা

তারাদল ছুটে আয় এইখানে

তার ঘুমখানা যাতে না ভাঙ্গে তাই

নিয়ে যা তাকে স্বর্গের বিছানায়

 

যদি দেখো সেথা আমায়

বসে গান তোমায় শোনায়

তুমি মিষ্টি এক চুমু খেয়ো মোর গালে

 

অন্ধকার রাত নিশ্চুপ সব

জোনাকির দল আজও জেগে আছে

তারা হয়তো অপেক্ষায় তোমার ঘুমের

হাতে রেখে হাত দেখে ঘড়ি

বসে অপেক্ষা করি

কবে হবে কাল?

ফুটবে সকাল..

 

আয় ঘুম চুম্বন দে

তার সারা কপালে

যাতে ঘুম আসে সব নিশ্চুপ হয়ে যায়

আয় চাঁদ মামা কাছে আয়

যাতে অন্ধকার না হয়

আলোমাখা কপালেতে টিপটা দে যাতে

কিছু আলোকিত হয়

আহা.. আহা ..

 

রায়হান গান থামায়। নিপা নিশ্চুপ। রায়হান নিপাকে নাড়িয়ে দিয়ে ডাকে,

‘ সুবা, ও সুবা! ‘

নিপার কোন সারা নেই। মেয়েটা বোধহয় ঘুমিয়েছে। রায়হান নিপার মাথাটা তার কোল থেকে নিয়ে গাছের মোটা গুঁড়িতে নিপাকে হেলান দিয়ে শুইয়ে দেয়। নিপার ভাঁজ করা পা দুটো ধরে মেলে দেয়। ঘুমন্ত নিপার মুখটা এই চাঁদের আলোয় বেশ ফুটে উঠছিলো। যেনো কোন ডানা বিহীন পরী ঘুমিয়ে আছে। রায়হান সোজা হয়ে বসে। চোখ মুছে। তার চোখে ভিজে যাচ্ছে। ভিতরের যন্ত্রনাটা বেড়ে যাচ্ছে। রায়হান হাঁটু ভাঁজ করে। দুই হাঁটুর মাঝে মুখ লুকিয়ে নেয়। তার কান্নার শব্দ আসছে। ছেলে হয়েও রায়হান কাঁদছে। রায়হান কাঁদতে কাঁদতে মুখ তুলে তাকায় নিপার ঘুমন্ত দেহটার দিকে। বলে,

‘ আমার কাছে আর কোন পথ ছিলোনা সুবা। ফুলে ঘুমের স্প্রে করে তোমাকে তা দিতে হলো। আমি কী করতাম বলো। আমার পাপ যে আমার পিছু ছাড়ছে না। এমন এক চোরাবালিতে আমি পা দিয়েছি, যা আমাকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে। আমি কোন পথ খুঁজে পাচ্ছি না। আমার ভীষণ অনুতাপ হচ্ছে। কেনো আমি এক স্বাধারণ মানুষ হলাম না। কেনো এই বিষাদের রাস্তায় আমায় হারিয়ে যেতে হলো। (চোখ মুছে) তোমায় আমি ভীষণ ভালোবাসি সুবা। তোমায় আমি ওদের হাতে কিছুতেই মরতে দিতে পারিনা। এই নিরস্ত্র আমি, ওদের কাছে যে ক্ষুদ্র পিঁপড়ার ন্যায়! আমি কী করবো সুবা। আমাকে প্লিজ বলো আমি কী করবো। আমি যে আর পারছিনা। আমার মস্তিষ্ক আমাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। আমাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। আমি তোমার সাথে থাকতে চাই। সারাটা জীবন তোমার সাথে কাটাতে চাই। আমাদের পথচলা, আমি, আমি এতো তাড়াতাড়ি ইতি টানতে চাই না। আমি কী করবো। আমি কী করবো। ‘

কান্নায় ভেঙে পড়ে রায়হান। আকাশের চাঁদ মেঘের আড়ালে চলে যায়। চারপাশের জোছনা মৃদু কমে যায়। রায়হান তার অপর পাশ হতে ঘড়িটা হাতে নেয়। ঘড়িতে আর মাত্র ১৫ মিনিট বাকি। রায়হান ঘড়িটা ফেলে দেয়। ব্যাগের ভিতর হাত ঢুকায়। সে কাঁদছে। সে যেনো তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে সব করছে। তীব্র মানসিক জন্ত্রনায় সে কাবু হয়ে গেছে। রায়হান ব্যাগ থেকে বন্দুক বের করে। এই বন্দুক দিয়ে সে আগে শত শত নিরীহ মানুষের প্রাণ নিয়েছে। আজ নিয়তি তার হাতে আবার এই বন্দুক তুলে দিয়েছে। তার প্রিয়তমাকে হত্যা করার জন্য। রায়হান বন্দুকে গুলি লোড করে। বন্দুকের উপরের অংশ টেনে ছেড়ে দেয়। উঠে দাঁড়ায়। হেঁটে হেঁটে গিয়ে শুকনো পাতাগুলোর অপর পাশে গিয়ে থামে। সে এখনো কাঁদছিলো। তার মানসিক বিচ্যুতি তাকে দিয়ে সব বাধ্যের মতো করাচ্ছিলো। রায়হান ফিরে নিপার দিকে তাকায়। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রয়। আকাশ থেকে মেঘের খন্ড সরে যায়। জোছনা আলো এসে পড়ে রায়হানের পিঠে। জোছনার আলোয় রূপময়ী নিপার ঘুমন্ত দেহ শিশির বিন্দুর মতো পুলকিত হয়ে উঠছিলো। রায়হান নিপার দিকে তাকায়। মনে পড়তে থাকে নিপার সাথে তার কাটানো ভালো ভালো কিছু মুহুর্ত। একসাথে কত রজনী, চাঁদের আলোয় রাঙিয়েছে তারা দুজন। গোধূলি লগ্নে তাদের দুইজনের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখা, ভোরের আলোয় না বলা কিছু কথার ভাঁজে জমে থাকা ভালোবাসা, সমুদ্র তটে এক রমনীর পিছু পিছু এক পুরুষের ছুটে চলা। জীবনটা কতই না রঙীন ছিলো। কতশত সুন্দর মুহুর্ত সে নিপার সাথে কাটিয়েছে। আজ সেই নিপাকেই তার মারতে হবে। কিন্তু সে কীভাবে মারবে। তার যে সেই শক্তি টুকুও নেই। তার শরীরের রক্ত চলাচল ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। তবুও ঘড়ির কাঁটা যে থেমে নেই। ৯ টা বাজতে যে আর মাত্র কিছু মিনিটই বাকি। রায়হান মাথা নাড়ায়। না ও মারতে পারবেনা। ও নিপাকে মারতে পারবেনা। এই অগ্নি সমতুল্য কঠিন কাজ তার দ্বারা হবে না। সে কিছুতেই পারবে না।

রায়হান মাথা নিচু করে ফেলে। চোখ বুজে ফেলে। চোখের পাতা ভেজানো ফোঁটা পানি গাল বেয়ে পড়ে যায়। হঠাৎ সে দৃষ্টি ভ্রম দেখতে থাকে। কিছূ মুখোশ রুপি মানুষ তার নিপাকে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। তার নিপা চিৎকার করে তাকে ডাকছে। রায়হানকেও কিছু মুখোশ পরিহিত লোক টেনে নিপার বিপরীতে নিয়ে যাচ্ছে। নিপার হাত পা বেঁধে তাকে বিছানায় ফেলে দেয় সেই মুখোশ পড়া লোক গুলো। নিপাকে ভোগ করার জন্য তারা নিপার উপর ঝাপিয়ে পরে। রায়হান চিৎকার দিয়ে তাদের থামতে বলছে। নিজেকে ছুটানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। বারবার মাফ চাইছে। নিপাকে ছেড়ে দিতে বলছে। কিন্তু না। তারা রায়হানকে শুনেনা। নিপাকে খারাপ ভাবে ধর্ষণ করে তারা। সাথে সাথেই ‌কিছু লোক এসে নিপার শরীর চাপাতি দিয়ে কাটতে থাকে জীবন্ত অবস্থায়। রায়হান পাগলের মতো চিৎকার করছে। নিপার প্রাণ ভিক্ষা চাইছে। কিন্তু না। নিপাকে তারা জীবন্ত অবস্থায় কেটে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলে। নিপা একটা চোখ ছুড়ে দেয় রায়হানের দিকে। রায়হান জোড়ে এক চিৎকার দিয়ে উঠে। সাথে সাথেই সে দৃষ্টিভ্রম থেকে বেড়িয়ে আসে। চারপাশ তাকায়। নিপা নিপা বলে ডাকতে থাকে। নিজেকে আবার আবিষ্কার করে নীলগিরি জঙ্গলের ছোট্ট গোল যায়গাটায়। সামনে দেখতে পায় নিপা গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে ঘুমাচ্ছে। রায়হান চিৎকার করে উঠে। দুই হাত দিয়ে মাথা চুল টানতে থাকে। তার নিপাকে সে যদি না মারে তাহলে মোসাদের লোক তার নিপাকে নিষ্ঠুর ভাবে মেরে ফেলবে। এই দৃশ্য সে কীভাবে দেখবে। সে আর পারছেনা। আর পারছেনা। রায়হান সাথে সাথে বন্দুক তুলে তাক করে নিপার ঘুমন্ত দেহ বরাবর। তার হাত কাঁপছে। বুকের হ্রদপিন্ড অস্বাভাবিক ভাবে উঠানামা করছে। তার মাথায় রক্তনালী অচল হয়ে পড়ছে। রায়হান ট্রিগারে আঙ্গুল দেয়। হাতের প্রত্যেকটা আঙুল কাঁপছে। রায়হান মুখ তুলে নিপার দিকে তাকায়। নিপার মলিন মুখখানায় চাঁদের আলো পড়ছিলো। কী মিষ্টি একটা মেয়ে নিপা! ক্রমেই জোছনার আলো যেনো তার মুখে প্রজ্জলিত হয়ে উঠছিলো। রায়হান ট্রিগারে আঙ্গুল ঢুকিয়ে ফেলে। সাথে সাথে সে বন্দুক টা ঘুড়িয়ে নিজের মাথায় ঠেকায়। তার শরীরের কাপুনি ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকে। তার অশ্রুসিক্ত দূই নয়নে সে শেষ বারের মতো দেখে নিপার মুখশ্রী। ভেজা গলায় বলে উঠে, ‘ ভালো থেকো স্রোতোসিনী। আমি তোমায় কখনোই মারতে পারবোনা। কখনোই না। ‘ সাথে সাথেই গুলি চলার আওয়াজ। বন্দুক টা ধপ করে মাটিতে পড়ে যায়। আশপাশের আবহাওয়া একদম নিশ্চুপ হয়ে যায়। রায়হান সাথে সাথে পিছনে ফিরে তাকায়। তার হাত থেকে রক্ত পড়ছে। পিছনে ফিরেই দেখে দূরে এক ছায়া মানবী দাঁড়িয়ে আছে বন্দুক তুলে। সেই ছায়া মানবী তার হাতে গুলি করেছে যাতে রায়হান নিজেকে নিজে মারতে না পারে। রায়হানের চোখ মুখ ভয়ে বড় বড় হয়ে যায়। তখনই সেই ছায়া মানবী রায়হানের বা পা গুলি করে। রায়হান কুকিয়ে উঠে। এক পায়ের উপর ভর দিয়ে কোনমতে দাঁড়িয়ে থাকে। তখনই সে দেখে ছায়া মানবী নিপার দিকে বন্দুক তাক করে ধরেছে। রায়হান চিৎকার দিয়ে উঠে। এক পায়ের উপর ভর দিয়ে পাগলের মতো ছুটতে থাকে নিপার দিকে। চিৎকার দিয়ে বলতে থাকে, ‘ আমার সুবাকে মারবেন না। আমার সুবাকে মারবেন না।’ রায়হান খোরাতে খোরাতে ছুটে যায় নিপার দিকে। তখনই পিছন থেকে ছায়া মানবী গুলি ছুড়ে নিপার শরীর বরাবর। গুলি এসে লাগে নিপার পেটে। রক্ত ছিটকে উঠে চারপাশে। রায়হান হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘ আমার সুবাকে মারবেন না। আমার সুবাকে মারবেন না। ‘ রায়হান নিপার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। নিপাকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো কাঁদতে থাকে। তখনই পিছন থেকে ছায়া মানবী গুলি ছোড়ে। গুলি এসে লাগে রায়হানের পিঠে। পিঠ ভেদ করে সামনে দিয়ে বেড়িয়ে তা নিপার দেহে ঢুকে পড়ে। নিপা দেহ নড়ে উঠে। রায়হানের গুলির ব্যাথার থেকেও বেশি ব্যাথা হচ্ছিলো নিপার এই নড়ে উঠা দেখে। রায়হান রক্ত মাখা হাতে নিপার গাল ধরে তাকে নাড়ায়। কাঁপো কাপো গলায় বলে, ‘ সুবা। এ,এই সুবা। কথা বলো। কথা বলো সুবা। ‘ ছায়া মানবী ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। তখনই আরেকটা গুলি এসে লাগে রায়হানের পিঠে। তাও তার শরীর ভেদ করে এসে নিপার শরীরে বিঁধে যায়। রায়হান মুখ দিয়ে রক্ত পড়ছে। সে খুব শক্ত করে নিপাকে জড়িয়ে ধরে আছে। নিপার মুখে চাঁদের আলোয় শুভ্রতার ছোঁয়া বইয়ে দিয়ে যায়। রায়হান নিপার গাল ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘ আমার স্রোতোসিনী, তোমায় আমি বাঁচাতে পারলাম না। আমায় ক্ষমা করে দিও। সারাজীবন তোমার সাথে থাকতে চেয়েছিলাম আমি, পারলাম না। আমি পারলাম না তোমায় বাঁচাতে। ‘ তখনই আরো একটা গুলি এসে বিঁধে রায়হান শরীরে। নিপার শরীর এখন আর কেঁপে উঠছে না। রায়হানের বুকটা যেনো মোচড় দিয়ে উঠে। সে নিপার গাল ধরে নাড়াতে থাকে। তার কন্ঠনালি নেতিয়ে আসছিলো। কথা বের হচ্ছিলো না। রায়হান খুব কষ্টে মৃদু স্বরে বলে উঠে, ‘ আমার স্রোতোসিনী। কোন এক পুনর্জন্মের শহরে আমাদের, আমাদের আবার দেখা হবে। আবার দেখা হবে।’ তখনই পিছনের ছায়ামানবীর এগিয়ে আসে হন্তদন্ত হয়ে। বলতে থাকে, ‘ কুত্তার বাচ্চার কই মাছের জান। মরেই না। ‘ একের পর এক গুলি ছুড়তে থাকে রায়হানের শরীরকে উদ্দেশ্য করে। রায়হান দেহ কেঁপে উঠে। চোখজোড়া বুজে আসতে থাকে। শেষ বারের মতো নিপার গাল আলতো করে রক্ত মাখা হাতে ছোঁয়। ছোট্ট একটা চুমু খায়। তার শরীরে একের পর এক গুলি বিঁধতে থাকে। সে নিপার গলায় মাথা রাখে। সবকিছূ অন্ধকার হয়ে আসতে থাকে তার কাছে। চোখের পাতা ধীরে ধীরে নেতিয়ে পড়ে। তখনই আবছা আবছা দৃষ্টে সে দেখতে পায়। এক সাদা আলোর মাঝ থেকে এক ছোট্ট মেয়ে দৌড়ে আসছে। ‘বাবা বাবা’ বলে ডাকছে। কী মিষ্টি সেই ডাক। মেয়েটা হাসতে হাসতে দৌড়ে আসছে রায়হানের দিকে। রায়হান তার এক হাত বাড়ায় সেদিকে। তখনই তার দেহটা শেষ বারের মতো কেঁপে উঠে। রায়হানের হাত পড়ে যায়। জীবন যুদ্ধে হেরে সে বিদায় নেয় এই পৃথিবী ছেড়ে। তার প্রিয়তমা, যাকে সে তার আশ্রয়স্থল ভাবতো, তার কোলেই সে তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। নিপার গালে রয়ে যায় রায়হানের রক্তমাখা হাতের ছাপ। চাঁদের আলোয় এ দুই নর-নারীর মৃত্যু আলিঙ্গন, যেনো কোন এক নিঃস্বার্থ ভালোবাসার উদাহরণ হয়ে রয়! 

 

ছায়া মানবী হেঁটে হেঁটে এগিয়ে আসে। রায়হান, নিপাকে মৃত্যুর পরও জড়িয়ে ধরে ছিলো। ছায়া মানবী আরো গুলি চালায়। রায়হান দেহ থেকে রক্ত ছিটকে আসে। দুই দেহের তাজা রক্ত মিলিত হয়ে মাটিতে পড়ছে। ছায়া মানবী গুলি ছোঁড়া থামায়। এগিয়ে আসে। লাশ দুটোর পাশে হেলে বসে। নিপার বা হাতটা ধরে। সেই হাতের মুঠ থেকে কাগজটা বের করার চেষ্টা করে। হাতটা খুলছিলো না। তখনই ছায়া মানবী একটা ছুরি বের করে। নিপার আঙ্গুল গুলোকে কেটে বের করে সেই কাগজটা কে। উঠে দাঁড়ায়। ছুরিটা গেঁথে দেয় গুলিতে ঝাঁঝরা হওয়া রায়হানের পিঠে। কাগজের ভাঁজ খুলে। খুলে কাগজটা দেখতে থাকে। তার মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠে। পকেটে হাত দিয়ে এক গ্যাস লাইটার বের করে। কাগজটা এক হাতে ধরে সেই কাগজের শেষ প্রান্তে লাইটার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনে জ্বলে যেতে থাকে চিঠিটা। ছায়া মানবী ছেড়ে দেয় কাগজটা কে। নিচে এসে রক্তের পাশেই পড়ে যায় সেটা। ছায়া মানবী চলে যেতে থাকে। তবে তাড়াতাড়ি হেঁটে নয়। ধীরে ধীরে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। 

 

রায়হান,নিপার ঝাঝড়া দেহ থেকে গরম রক্ত গড়িয়ে পড়ে একসাথে মিলিত হয়। যেনো এটাও তাদের ভালোবাসার, এক মৃত্যু পরবর্তী প্রতীক হিসেবে জানান দিচ্ছে। চারপাশ একদম নিস্তব্দ। চাঁদের আলোয় দৃশ্যমান হয়ে রয় গাছের গুঁড়ির উপর দুই নর-নারীর মৃত্যু আলিঙ্গন। আর তার পাশে জ্বলতে থাকে একটা ছোট কাগজ। জোছনার আলোয় চারপাশ বেশ ভালোই দৃশ্যমান। কাগজটার নিচের অর্ধেক আগুনে জ্বলেছে। আগুন ধীরে ধীরে উপরে উঠছে। জোছনার আলোয় সেই আগুনের উপরের কিছু লেখা বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠে। তারই মাঝে এক লাইন ছিলো,

 

‘ আমাদের ছোট্ট সুবা আসতে চলেছে। ছোট্ট সুবা… ‘

 

_____

 

কবির(৪৫) সাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফিরছেন। গ্রামের কাঁচা রাস্তা। আকাশ পরিস্কার। সাইকেলের হেন্ডেলে ব্যাগ ঝোলানো।‌ তিনি বাজার করতে গিয়েছিলেন গন্জের দিকে। এখন বাড়ি ফিরছেন। আনমনে গুন গুন করে গাইছেন গান। আর সাইকেল নিয়ে যাচ্ছেন রাতের জোছনায় মেটোপথ ধরে। তখনই হঠাৎ দূর থেকে তার কানে ভেসে আসে কিছু নরনারীর আত্মচিৎকারের আওয়াজ। একের পর এক গুলি চলার আওয়াজ। তিনি তাড়াতাড়ি সাইকেল থামিয়ে পিছনে চোখ দেন। দূরের পাকা বাড়ি থেকে চিৎকার ভেসে আসছে। একের পর এক অনবরত গুলি চলার আওয়াজ ভেসে আসছে। তিনি ভয়ে জমে যান। সাথে সাথে কিছু অস্ত্রধারী লোক সেই বাড়ি থেকে বেড়িয়ে আসে। আগুন ধরে যায় সেই বাড়িতে।‌

 

_____

 

শাহারিয়া ব্যালকনি থেকে ঘরে আসলো। ল্যাপটপে কিছু কাজ তার এখনো বাকি। তবে এগুলো অফিসের কেসের নয়। এগুলো জুডাসের বিষয়ে। শাহারিয়া এসে বসে বিছানায়।‌ ল্যাপটপটা খুলে। তখনই তার মনে পড়ে, ‘ এক কাপ কফি নিয়ে আসা দরকার। কাজ করতে করতে রাত হবে অনেক। ‘

শাহারিয়া এই ভেবে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়। তখনই তার ফোন বেজে উঠে। 

‘ এখন আবার কে ‌ফোন দিলো? ‘

শাহারিয়া এসে বিছানার পাশের টেবিল থেকে তার ফোনটা হাতে নেয়। রিয়াদ ফোন দিয়েছে। শাহারিয়া কিছু না ভেবেই ফোনটা রিসিভ করে কানে তুলে। তখনই ওপাস থেকে ভেসে আসে রিয়াদের কান্না মাখা কন্ঠ,

‘ দোস্ত, দোস্ত। ‘

শাহারিয়া রিয়াদের কান্না শুনে অবাক হয়। ভ্রু কুঁচকে বলে,

‘ রিয়াদ! রিয়াদ কী হইছে! তুই কাঁদছিস,,,’ 

‘ দোস্ত সব শেষ হয়ে গেছে রে। সব শেষ হয়ে গেছে। ‘

‘ সব শেষ হয়ে গেছে মানে? তুই তো রংপুরে ইকরার কাছে। (অবাক কন্ঠে) এই ইকরার কিছু হইছে নাকি? ইকরার আজকে অপারেশন হওয়ার কথা ছিলো। ‘

‘ দোস্ত। দোস্ত ইকরার কিছু হয়নাই। ওর অপারেশন ঠিকঠাক হইছে। কিন্তু, কিন্তু,,,, ‘

‘ ইকরার অপারেশন ঠিকঠাক হইছে, কিন্তু তুই কাদতেছিস, (থেমে) এই রাতুল স্যার আর মায়া ভাবির কিছু হইছে নাকি! ‘

‘ না না। আমি, আমি তোরে কীভাবে বলবো। আমি এই কথা,,,,’

রিয়াদ আর বলতে পারেনা। কান্নায় ভেঙে পড়ে। শাহারিয়া এবার কন্ঠ কঠিন করে বলে,

‘ রিয়াদ, কী হইছে তোর। তুই আমাকে বল। মায়া ভাবি রাতুল স্যারের কিছু না হইলে কার কী হইছে! ‘

‘ দোস্ত, দোস্ত চাচা দের,,,,’

‘ বাবা! বাবার কী হইছে! হ্যালো রিয়াদ বাবার কি হইছে! ‘

‘ তোদের বাসার সবাইকে গুলি করে মেরে ফেলছে। বাসায়, বাসায় আগুন লাগায় দিছে। থানা থেকে ফোন আসছিলো। দাঁও দাঁও করে আগুন জ্বলতেছে।‌ সবাইকে মেরে ফেলছে। সবাইকে। ‘

শাহারিয়ার হাত থেকে ফোনটা পড়ে যায়। বাইরে বড় এক বিজলী চমকিয়ে উঠে।

 

চলবে ,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

 

( পরবর্তী পর্ব পাবেন শনিবার। গল্প নিয়ে কোন মতামত জানাতে চাইলে কমেন্টে জানাতে পারেন। )

 

গল্প নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা করুন আমার গ্রুপে।

গ্রুপ লিংক 👇

https://www.facebook.com/groups/743016887019277/?ref=share_group_link

 

উপন্যাস :: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন :: ২(মুখোশ)

পর্ব :: ৯০

লেখক :: মির্জা সাহারিয়া

 

 

 

 

 

 

 

উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন:: ২(মুখোশ)

পর্ব:: ৯১

লেখক:: মির্জা শাহারিয়া

 

২ দিন পর,

৩রা ফেব্রুয়ারি, ২০২০

 

সকাল ৯ টা। রোদের ঝিলিক এসে পড়েছে মেম্বার বাড়ির পিছনের বাগানে। আবহাওয়া পরিস্কার। বাতাসে ভাসছে পোড়া গন্ধ।‌ চারপাশে পাখির মৃদু কিচিরমিচির শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। গোমট পরিবেশ। 

বাগানের সামনের দিকটায় একসাথে ৫ টা কবর। তার হতে কিছুটা ফাঁকা রেখে ডান দিকে আরো ২ টা কবর। কবর গুলোর সামনে দাঁড়িয়ে কবর জিয়ারত করছে শাহারিয়া, রিয়াদ আর রাতুল। তিনজনের মাথায় টুপি। শাহারিয়া মোনাজাত পড়ছে। কান্না ভেজা গলা তার। চোখ দুটো থেকে বাধ ভাঙ্গা জলরাশির মতো অশ্রুজল গড়িয়ে পড়ছে। রিয়াদ রাতুল তার দুইপাশে দাঁড়ানো। তাঁদের মুখেও অন্ধকার ছায়া। 

কিছুদূরে একটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে দিথী আর সামিহা। দুইজনরই মাথায় কাপড় দেওয়া। চোখ মুখ মলিন।

 শাহারিয়া দুই হাত তুলে চুমু খেয়ে নেয়। রিয়াদ আর রাতুল ও মোনাজাত শেষ করে। খুলে রাখা জুতো জোড়া তারা তিনজন পড়ে নেয়। শাহারিয়া চোখ মুছে। ছেলে হয়ে ও উন্মাদের মতো কেঁদেছে এ দু’দিন। প্রিয়জন হারানোর শোকে সে পাথর হয়ে গিয়েছে। দিথী আর সামিহা এগিয়ে আসে তাদের দিকে। শাহারিয়ার কাঁধে হাত রাখে রাতুল। ধীর গলায় বলে,

‘ কাঁদিস না আর। আল্লাহ তুলে নিছে ওদেরকে। দোয়া করি, ওরা জান্নাত বাসী হোক। ‘

শাহারিয়া হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে। যতই চোখ মুছছে ততই চোখ যেনো আবারো ভিজে যাচ্ছে। দিথী, সামিহা তাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। রাতুল তাদের দিকে তাকায়। তারা দুইজনই চুপচাপ। রাতুল শাহারিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে,

‘ দিথীরে নিজের কাছে সবসময় রাখিস। গ্রামের পরিস্থিতি দিনে দিনে খারাপ হয়ে উঠতেছে। (একটু থেমে) রিয়াদ, বাসায় তোর ভাবি একলা আছে। আমি যাই। আর শাহারিয়া, আজকে দুপুরে তুই আর দিথী আমাদের বাসায় খাবি। আমি নিজের হাতে সব রান্না করবো। গেলাম হ্যা। রিয়াদ, শাহারিয়াদের সাথে থাকিস। ‘

‘ আচ্ছা ভাইজান। ‘

‘ গেলাম। ‘

শাহারিয়ার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যেতে থাকে রাতুল। বাগানের উত্তর দিকে প্রাচীর ভেঙে দরজা কাটা হয়েছে। রাতুল ওখান দিয়ে বেড়িয়ে চলে যায়। 

দিথী সামিহা এসে শাহারিয়ার পাশে দাঁড়ায়। দিথী একটা রুমাল এগিয়ে দেয় শাহারিয়ার দিকে। শাহারিয়া তাতে চোখ মুখ মুছে। নিজেকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। হালকা বাতাস বয়। গাছের পাতা মৃদু নড়ে উঠে। 

শাহারিয়া ফিরে কবর গুলোর দিকে তাকায়। কবর গুলো দেখলেই যেনো তার ভিতর টা নিমেষেই তাসের ঘরের মতো চুড়মাড় হয়ে যাচ্ছে। তার মা,বাবা প্রিয়জন, সব এক অজানা ঝড়ে সে হারিয়ে ফেলেছে। কোনদিন আর ফিরবেনা তারা। শিউলি বেগমের সেই কথায় কথায় খুনসুটি, মতিন মেম্বারের রূঢ়তা, সবই যেনো শাহারিয়ার হ্রদয়কে বারবার ব্যাথায় প্রকম্পিত করে তুলছে। শাহারিয়া সামনে ফিরে। রিয়াদ তাকে দেখে বলে উঠে,

‘ কোনটা কার কবর! ‘

‘ মাঝের টা মায়ের কবর। মায়ের কবরের ডান পাশে বাবার। তার ডানে আফাজের। (থেমে) মায়ের কবরের বামে লায়লার, তারপর ফুলমতির। আর, ঐদিকের দুটো নিপা, রায়হানের। ‘

‘ কী থেকে যে কী হয়ে গেলো। চাচা-চাচিদের কেউ কেনো এভাবে মারলো। ‘

‘ কেনো মেরেছে, তা হয়তো আমার অজানা নয়। তবে যে মেরেছে, তার দিন ফুরিয়ে এসেছে। সব কেড়ে নিয়েছে ও আমার থেকে। আমিও এবার কেড়ে নিবো। ওর থেকে ওর রক্তাক্ত হ্রদপিন্ড কেড়ে নিবো। ‘

‘ কে করছে এগুলো? তুই কী তাকে চিনিস? ‘

‘ জুডাস। ‘

‘ জুডাস কে? ওয়েট ওয়েট, নর্থের কিং মাফিয়া জুডাস! ও তো অনেক বড় একজন মাফিয়া। ও কেনো চাচাদের মারতে গেলো!’

‘ পড়ে বলবো তোকে সব। (চোখ মুছে) রায়হান নিপার খোঁজ পেয়েছিলি কীভাবে! ‘

রিয়াদ এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বলে,

‘ সেই রাতে এখানে এসে দেখি আগুন নিভেছে। চারপাশে শুধু পোড়া লাশের গন্ধ। লাশ পাওয়া গেলো ৫ টা। চাচা চাচিদের প্রত্যেকেরই মাথায় গুলি করে বারান্দায় ফেলে রাখা হয়েছিলো। আমি রায়হানকে ফোন দেই এখানে আসার জন্য। কিন্তু তার ফোন বন্ধ বলছিলো। আমি বেশ কয়েকবার ট্রাই করার পরেও বন্ধ পাই। আমার কিছু ভালো ঠেকছিলো না। দিনাজপুর থানায় যোগাযোগ করি। রায়হানের নাম্বার ওদেরকে দেই ট্রেস করার জন্য। তারপর ওরা আমাদের ঠিকানা দেয়। গিয়ে দেখি নিলগিরি জঙ্গলের একদম শেষ প্রান্তে, একটা ছোট্ট গোল যায়গায়, একটা গাছের গুঁড়ির উপর শুয়ে আছে নিপা। তার গলায় মাথা রেখে তাকে জড়িয়ে ধরে আছে রায়হান। রায়হান পিঠ গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে ছিলো। রক্ত জমাট বেঁধে মাটির উপর লেগে ছিলো। পাশেই কিছু ছাই। লাশ দুটোকে নিয়ে আসি‌। তাদের বডি থেকে ২৬ রাউন্ড গুলি পাওয়া যায়। রায়হানের শরীরে দুটো বেশি ছিলো। হাতে ছিলো একটা, আর পায়ে ছিলো একটা। গুলি গুলো বের করেই তাদের দাফন করার ব্যবস্থা করি। ময়নাতদন্ত ছাড়া এমন লাশ দাফন করা ঠিক হয়নি, তবুও। রায়হান আমার বন্ধু হতো। নিপা যেমন তোর বোন ছিলো। তেমনি আমারো ছোট্ট বোনের মতো ছিলো। তাদের গুলিতে ঝাঁঝরা শরীরটাকে আর কাঁটা ছেড়া করাতে চাইনি। তাই, তাদের দাফন করানোর ব্যবস্থা করি।’

‘ আফাজকে কোথায় পেয়েছিলি! ‘

‘ আফাজের লাশ বাড়িতে না পেয়ে ভেবেছিলাম ও হয়তো দিনাজপুর থানায় গিয়েছে। কিন্তু ফোন দিয়ে জানতে পারি ওখানে ও যায়নি। ওর নাম্বার আমার কাছে ছিলো না। ইকরার মায়ের কাছ থেকে ওর নাম্বার নেই। এদিকে ওরাও এই আগুন লাগার কথা জেনে গিয়েছিলো। ইকরার বাবা তাই আমার সঙ্গে রওনা দেয়। আমি আফাজের নাম্বার টা থানায় পাঠাই ট্র্যাকিং এর জন্য। ওরা আমাদের ঠিকানা দেয়। একদম নীলগিরি জঙ্গলের মাঝামাঝি একটা যায়গায় আফাজের ফোনের লোকেশন দেখায়। ভোরের দিকে রওনা দেই দুইজন কনস্টেবল নিয়ে। গিয়ে দেখি গাছপালা ঘেরা জঙ্গলের মাঝে একটা কাঁচা কুঠির। ভিতরে ঢুকে যা দেখি, তা আমার আত্মা কাপায় তুলে জানিস! ঘরের দরজার সামনেই রাফসানের কাঁটা মাথাটা পড়ে ছিলো। এক চোখ খোলা, আরেক চোখ আধখোলা। ঘরের একপাশে পড়ে ছিলো তার মাথা কাঁটা শরীর। আরেক পাশে সোনালীর ক্ষতবিক্ষত লাশ। লাশের নিচের অংশ পোকায় খেতে ধরেছিলো। আর ঘরের মাঝে আফাজের ডেডবডি। আফাজের বুকে মাথা রাখে একটা মেয়ে ঘুমিয়ে ছিলো। মেয়েটাকে চিনতে পারিনি। আগে কখনো দেখেছি বলে মনে হয়নি। মেয়েটাকেও প্রথমে মৃত ভেবে তাকে ধরতে গিয়েছিলাম, কিন্তু পড়ে মেয়েটা উঠে গেলো। অনেক ভয় পাইছিলাম। কিন্তু পড়ে দেখি, না কোন অলৌকিক কেস না। মেয়েটা বেঁচে ছিলো। আমরা লাশ গুলো আনার ব্যবস্থা করি। কিন্তু মেয়েটা কিছুতেই আফাজের লাশটাকে আনতে দিচ্ছিলো না। পাগলের মতো চিৎকার করতেছিলো। বিলাপ বকতেছিলো। পরে লেডি কনস্টেবল এনে মেয়েটাকে আফাজের লাশ থেকে বেশ কষ্টে ছাড়াই। লাশটাকে নিয়ে আসি। সোনালী আর রায়হানের লাশটাও আনি। তাদের দুইজনের লাশ এখনো দিনাজপুর মেডিকেলের মর্গে রাখা আছে।’

‘ ঐ মেয়েটা কে ছিলো! আগে কখনোই দেখিস নি তাকে ? ‘

‘ না। আগে কখনো দেখছি বলে মনে হয়না। বয়স ১৮-১৯ এর মতো হবে। ‘

‘ রিয়াদ ভাই, বাসায় তোমরা কয়টা লাশ পাইছিলা? ‘ দিথী অবাক হয়ে বলে।

‘ ৫ টা। ৪ টা বারান্দায় গুলিবিদ্ধ আর আধ পোড়া অবস্থায়, আর একটা ঘরের ভিতরে ছিলো। ঐটা পুরা পুড়ে গেছে। শুধু হাড় গুলা পাইছিলাম মাটিতে। এখন ঐটা যে কে, তা জানা যায়নি। ‘

‘ ঐটা সুমু নয়তো! হায় আল্লাহ। মেয়েটা, মেয়েটা এভাবে মারা গেলো! ‘

‘ না না। লাশ টা কোন পুরুষের। মেয়ের না। ‘ 

‘ মেয়ের না? তাইলে, তাইলে সুমুর লাশ উদ্ধার হয়নি! ‘

‘ চাচিদের ৫ জনের লাশ আর ঘরের ঐ লাশটা ছাড়া আর কারো লাশই পাওয়া যায়নি। ‘

‘ তাইলে আফাজের ওখানকার মেয়েটা নিশ্চয়ই সুমুই ছিলো। ‘

‘ কোন সুমু ? ‘ শাহারিয়া জিজ্ঞেস করে। 

‘ আরে ঐ মেয়েটা। যাকে আমি এনেছিলাম। ঐযে আসুভের বিনাশের পর। ‘

‘ ওহ ঐ মেয়েটা! হ্যা আসলেই ঐ মেয়ের লাশ তো ঘরে পাওয়া যায়নি। কোথায় গেলো ও ? ‘

‘ রিয়াদ ভাই একটু আগেই বললো না, আফাজের ওখান থেকে একটা মেয়ে পাওয়া গেছে! আমি নিশ্চিত ঐটা সুমু। সুমু আফাজকে পছন্দ করতো। মেয়েটা ওখানে কী করে গেলো! ‘

‘ তা হয়তো আর জানা সম্ভব না। ‘ ধীর গলায় রিয়াদ বলে। 

‘ কেনো ? ‘ 

‘ মেয়েটাকে লেডি কনস্টেবল এই বাড়িতে নিয়ে এসেছিলো। আমাকে না বলেই ছেড়ে দিয়ে থানা চলে গিয়েছিল। কিন্তু, কিন্তু পরে আর মেয়েটাকে পাওয়া যায়নি। লোকের মুখে শুনেছি এক মেয়ে আর এক সাদা ধোয়াকে এই গ্রাম ছেড়ে তারা চলে যেতে দেখেছে। মেয়েটার বয়সও বলে ঐ ১৮-১৯। মেয়েটার চোখ মুখ বলে বিষন্ন ছিলো। হয়তো এই সুমুই হবে ঐ মেয়েটা। ‘

‘ সুমু চলে গিয়েছে! কিন্তু ও কোথায় যাবে! আমরা ছাড়া তো আর কেউ নেই ওর। ‘

‘ এখন কে জানে কই গেছে। মেয়েটা তো পাগল প্রায় হয়ে গেছিলো। মানসিক দিক দিয়ে মনে হয় সে অসুস্থ। ‘

‘ না ও অসুস্থ ছিলো না। ও একদম সুস্থ ছিলো। আমি, আমি সিলেট যাওয়ার আগে ওকে এখানেই রেখে গিয়েছিলাম। ‘

‘ আচ্ছা আমি দেখবো ওকে খুঁজে পাওয়া যায় কি না। তুমি এতো চিন্তিত হয়ো না। (ধীর গলায়) রিয়াদ। ‘

‘ হ্যা বল। ‘

‘ নোমানের লাশ টা কোথায়? ‘

‘ নোমান? কোন নোমান? ‘

‘ আরমান, সেই আম গাছ, মনে নেই! ‘

‘ ওহো! ঐ নোমান! হ্যা মনে পড়ছে মনে পড়ছে। কী হইছে নোমানের। আর ও তো মৃত। ওতো একটা আত্মা ছিলো। ‘

‘ হ্যা জানি। ওর লাশ টা আম বাগান থেকে উঠার পর আমরা কোথায় যেনো দাফন করছিলাম ? ‘

‘ বড় দিঘীর পাশের বড় গোরস্থান টায় মনে হয়। হ্যা ঐটাতেই হবে। কেনো ? ‘

‘ লাশ টা উঠানোর ব্যবস্থা কর। ‘

‘ লাশ টা উঠাবো! কিন্তু কেনো! তোর কি মনে হয় ও এইসবের সাথে জড়িত? কিন্তু ও তো মুক্তি পেয়ে গেছে। ‘

‘ না ও এসবের সাথে জড়িত না। তুই ওর লাশটা এনে (পিছনে ফিরে) ফুলমতির কবর টার পাশে একটা কবর খুঁড়ে দাফন করার ব্যবস্থা কর। ‘

‘ এখানে! ‘

‘ হ্যা। আর আলিশা না কী যেনো নাম, খাঁন বাড়িতে যে ১ মাস আগে মারা গেলো। ওর লাশ কোথায় দাফন করা হইছে! ‘

‘ ময়নাতদন্তের পর ওর আর ওর মায়ের লাশ খাঁন বাড়িরই বাগানের এক কোনে দাফন করছিলো। কেনো! ‘

‘ আলিশা আর ওর মায়ের লাশ টাও ওখান থেকে এনে (পিছনে ফিরে) এখানে, আফাজের পাশে দাফন করার ব্যবস্থা কর। আফাজের পাশে আলিশার লাশ, তারপর আলিশার মায়ের। ‘

‘ হঠাৎ এমন কবর বন্টন! ‘

‘ ফুলমতি নোমানকে কতটা ভালোবাসতো, দেখেছিলি তো! আর আফাজ, আলিশার লাশ টাকে দেখে কেমন পাগলের মতো কেঁদেছিলো! দুইজনই দুইজনকে ভালোবাসতো। শুধু এই ইহকাল, তাঁদের এক হতে দেয়নি। অন্তত পরকালে তো তারা একত্রে থাকুক! (থেমে) লাশ দুটো এনে ফুলমতি আর আফাজের পাশে দাফন করার ব্যবস্থা কর। ভালোবাসা কী জিনিস, তা তুইতো এখন বুঝিস। ওরাও ভালোবাসেছিলো। শুধু নিয়তি ওদের পক্ষে যায়নি। ‘

রিয়াদ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। বলে,

‘ আচ্ছা। আমি ব্যবস্থা করছি। ‘

‘ ইকরা কেমন আছে! ‘

‘ এখন কিছুটা সুস্থ। তবে ওর মাথার চুল সব পড়ে গেছে। থেরাপি দেওয়ার জন্য বলে এমন হচ্ছে। ডাক্তার বললো আর ২ মাস থেরাপি নিতে হবে। তারপর ও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবে। ‘

‘ ভালো। আফাজের বাবা মা কোথায়! ‘

‘ আফাজের সংবাদ শুনে তারা আমার সাথেই চলে আসে। ইকরার ওখানে বানু খালা ছিলো এই দুইদিন। কাল রাতে তারা ফিরে গেছে। লাশ টাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। আমি বলায়, এখানেই দাফন করেছে। ‘

‘ আচ্ছা‌। তুই এখন যায় লাশ দুটো আনার ব্যবস্থা কর। দুপুরে গিয়ে তোর সাথে কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো। ‘

রিয়াদ চারপাশে একবার তাকায়। তারপর শাহারিয়ার দিকে ফিরে বলে,

‘ আহনাফ আসছে। ‘

‘ আহনাফ! ও এখানে কেনো! ‘

‘ আহনাফ নজরুল সাহেবের ছেলে। রায়হান আর আহনাফ দুইজনই আপন ভাই। ‘

কথাটা শোনা মাত্রই দিথী আর শাহারিয়া অবাক হয়। শাহারিয়া বলে,

‘ আহনাফ নজরুল চাচার ছেলে ? ঐ নজরুল, যে,,,,,,’

‘ হ্যা। ঐদিকে নজরুল জেল থেকে পালিয়েছে। ওকেও পুলিশ খুঁজে বেড়াচ্ছে। ‘

‘ কিন্তু রায়হানের ভাই আহনাফ কী করে হয়। আহনাফের মা তো ওর কাছে থাকে। আর রায়হানের মা তো সুমনা বেগম। ‘

‘ না। সুমনা চাচি রায়হানের মা না। রায়হানের আসল মা রাবেয়া খাতুন। মানে আহনাফের মা। ওরা আনন্দপুরে আসছে। খাঁন বাড়ি টা হয়তো আহনাফ নিজের নামে পাবে। বাড়িটা রায়হানের নামে লিখা ছিলো। আর রায়হান তো….। কিছু আইনি প্রক্রিয়ার মাঝে আছে ওরা। তবে বাড়িটা পেলেও নিচের পাতাল পুরিতে ওরা যেতে পারবে না। পুলিশ পাতাল পুরির রাস্তা একদম সিলগালা করে তারপর বাড়িটা ওদের কাছে হস্তান্তর করবে। ‘

‘ এতো এতো গল্প জড়িয়ে আছে আমাদের জীবনে। শুধু পর্দা উন্মোচন না হওয়ায় সব অজানা থেকে যায়। ‘

‘ হমম। আচ্ছা আমি গেলাম। (হাত ঘড়ি দেখে) থানার দিকে একটু যাবো। তারপর লাশ আনার ব্যবস্থা করছি। ‘

‘ আচ্ছা যা। ‘

রিয়াদ চলে যেতে থাকে। আকাশের সূর্য এক খন্ড মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ে। চারপাশের প্রকৃতি কিছুটা শান্ত রূপ ধারণ করে। 

দিথী এসে দাঁড়ায় শাহারিয়ার পাশে। সামিহা এখানো তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। দিথী বলে,

‘ চলো। এখানে তো সেই ভোর থেকে আছো। মা নাস্তা বানিয়েছে। খেয়ে নিবে চলো। ‘

শাহারিয়া পিছনে ফিরে আরেকবার কবর গুলোকে দেখে। মনে মনে শেষ বারের মতো সালাম দেয়। সামনে ফিরে। সামিহা সৌজন্যমূলক হাঁসি হেঁসে বলে, ‘ দুলাভাই, আসেন। অনেক বেলা হয়ে গেছে। নাস্তা করে নিবেন চলেন। ‘ 

শাহারিয়া দিথীর হাত ধরে। সামিহাকে বলে, ‘ চলো। ‘

 

দিথী, শাহারিয়া আর সামিহা চলে যেতে থাকে। বাগানের একপাশে এখনো কিছু ফুলের গাছ অবশিষ্ট রয়েছে। তবে তার থেকে ফোঁটা ফুল এই কালচে পোড়াবাড়ী হতে বেড়োনো পোড়া লাশের গন্ধকে কমাতে পারছেনা। সূর্যের সামনে থেকে মেঘ খন্ড সরে যায়। এক মুঠো সোনালী আলো এসে পড়ে কবর গুলোর সামনে। পিছনে দাঁড়িয়ে রয় এক পোড়া কালচে বাড়ির স্তম্ভ। যার দেয়ালে দেয়ালে আজো মিশে রয়েছে শিউলি বেগমের সেই হাসি, ফুলমতির কর্মব্যস্ততা, হনুফা লায়লার খুনসুটি, আর মতিন মেম্বারের ক্ষমতার দৌড়ত্ব। সবই যেনো আজ মাটিতে মিশে বিলিন হয়ে গিয়েছে। রয়ে গিয়েছে এক সোনালী অতীত হয়ে! 

 

_____

 

এক গ্রামীণ মেঠোপথ। দুইধারে সারি সারি গাছ। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। এক মেয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছ সেই পথ দিয়ে। তার পাশেই বাতাসে ভাসছে এক সাদা ধোঁয়া। ছোট্ট এক হিমেল হাওয়া এসে মেয়েটার চুল গুলো মৃদু নাড়িয়ে দিয়ে যায়। 

মেয়েটা মাথা নিচু করে হেঁটে যাচ্ছে। তার মন, মুখ বিষন্ন। এক না পাওয়ার যন্তনা নিয়ে সে চলে যায় কোন অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। ভেসে উঠে বিষাদ সুরে গাঁথা কিছু কথা, 

‘ আমার জীবনে আসা সবচাইতে উজ্জ্বল নক্ষত্র, আপনার প্রতি জমা কিছু অনুভূতি, কিছু আকাঙ্ক্ষা। সবগুলোকে মনের এক তালা বিহীন দরজায় বদ্ধ করে নিয়েছি। অনেক জ্বালাতাম না আপনাকে! আর জ্বালাবো না। আমার উপস্থিতি আপনি সহ্য করতে পারতেন না। আমি আর কোনদিন আপনার সামনে উপস্থিত হবো না। চলে যাচ্ছি আমি। চলে যাচ্ছি বহুদূর। আর ফিরবো না কখনো। জানিনা, এ জীবন সামনে আমার জন্য কী রেখেছে। শুধু জানি, আমার একটা মানুষ ছিলো। যাকে আমি একতরফা ভাবে ভালোবেসে গিয়েছিলাম। মায়া হরিণের মতো সে আমার জীবনে এসেছিলো। শুধু ছুঁয়ে দেখার আগেই, সে হারিয়ে যায়। ভালো থাকবেন। আমি আপনাকে আমার শেষ নিঃশ্বাস অব্দি ভালোবাসে যাবো। ভালোবাসে যাবো নিঃস্বার্থভাবে। ‘

 

_____

 

বিকেল বেলা‌। জহুরা বেগমের কান্নায় তালুকদার বাড়ির বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। তিনি বারান্দার চেয়ারে বসে কাঁদছেন। বিলাপ বকছেন। সেই সকাল থেকে শুরু হওয়া কান্না থামার যেনো কোন নাম গন্ধই নেই। ঘর থেকে বেড়িয়ে আসলো উর্মি। হাতে একটা ছোট্ট কাগজ। উর্মি এগিয়ে আসে জহুরা বেগমের দিকে। জহুরা বেগম কাঁদছেন আর বিলাপ বকছেন, ‘ মানুষ টা গেছে,,, আর ফিরে নাই। কই গেলো। আমার সোনার টুকরা দুইডা সন্তানরে হারাইছি। মানুষ টাও নাই। আমি এখন কী করমু। কোথায় যামু। ‘ কান্নায় ভেঙে পড়েন জহুরা বেগম। উর্মি এসে তার পাশে দাঁড়ায়। সে কিছুটা ইতস্তত বোধ করছে। মুখ ফুটে কিছু একটা বলতে চাইছে। কিন্তু জহুরা বেগমের কান্না তো থামছেই না। উর্মি গলা ঝেড়ে নেয়। শব্দ করে বলে উঠে, ‘ খালা।‌ এই কাগজটা আমি খালুর ঘরের খাটের নিচ থেইকা পাইছি। ‘ 

কথাটা শোনা মাত্রই জহুরা বেগম ফিরে তাকান উর্মির দিকে। চোখ মুছতে থাকেন। নিঃশ্বাস না ফেলেই বলতে থাকেন, ‘কাগজ! কীসের কাগজ! ‘ 

‘ এইযে দেহেন। ‘

উর্মি কাগজটা জহুরা বেগমকে দেয়। জহুরা বেগম কাগজটা হাতে নেন। উর্মির দিকে একবার তাকিয়েই কাগজটার দিকে ফিরে তাকান। কাগজটায় কিছু লেখা ছিলো। কোন চিরকুটের মতো করে লেখার ধরন ফুটে উঠেছিলো। জহুরা বেগম পড়েন, 

‘ তালুকদার,,,

ফাইল নিতে আসছি আমি। অন্যের আমানত নিজের কাছে রাখতে নেই  তালুকদার। এতে ক্ষতি হয়। খুব ক্ষতি হয়। আর জানোতো, আমি ক্ষতিটা কীভাবে করি! আজ রাতই তোমার জন্য শেষ রাত হতে চলেছে। রেডি থেকো শেষ নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য। 

 

তোমার এক শুভাকাঙ্ক্ষী,,,,”

 

চিঠিটা পড়া মাত্রই জহুরা বেগম অবাক হয়ে যান। কান্নার জল তার চোখ বেয়ে অনবরত পড়তে থাকে। তিনি উর্মির দিকে তাকান। উর্মি উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে বলছে, ‘ কী লেহা আছে ঐহানে খালা! ‘ 

জহুরা বেগমের মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছেনা। তিনি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছেন। উর্মি জহুরা বেগমকে নাড়িয়ে দেয়‌। ডাকতে থাকে, ‘খালা, আপনে আমারে শুনতাছেন! খালা! ‘

জহুরা বেগমের শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে। মুহুর্তেই চেয়ার থেকে ফ্লোরে লুটিয়ে পড়েন। উর্মি চিৎকার দিতে দিতে জহুরা বেগমকে ডাকতে থাকে, ‘ খালা। খালা আপনার কী হইছে খালা। কথা কন। কথা কন। ‘ 

জহুরা বেগম জ্ঞান হারান। চারপাশ শান্ত হয়ে যেতে থাকে। বিন্দুমাত্র বাতাস বয়না। সব যেনো থেমে গিয়েছে এক নিমিষেই। 

 

_____

 

সন্ধ্যা নেমেছে। বাইরের হলুদাভ আলো জানালা দিয়ে বিছানায় এসে পড়ছে। দিথী কাপড় ভাঁজ করে আলনায় ভালোভাবে রাখে। পিছনে ফিরে বিছানার দিকে তাকায়। বিছানা একদম পরিপাটি করে গুছানো। পাশের পড়ার টেবিলটাও ঠিকঠাক। দিথী সব দেখে নিয়ে আবার আলনার দিকে তাকায়। যা যা কাপড় আজ ধুয়েছিলো সব এনে ভাঁজ করে রেখেছে কিনা তা এক হাত কোমরে দিয়ে দেখতে থাকে। 

ঘরে প্রবেশ করে শাহারিয়া। হাতে ফোন। দিথী কারো উপস্থিতি টের পেয়ে পিছনে ফিরে তাকায়। দেখে শাহারিয়া এসেছে। শাহারিয়া এসে ফোনটা বিছানার পাশের পড়ার টেবিলে রাখতে থাকে। দিথী বলে, ‘ কোথায় গেছিলা তুমি! ‘ 

‘ বাইরে। বটগাছ টার ওদিকে। ঘরে নেট পায়না। ‘

‘ সামিহা নাস্তা দিয়ে গেছে। খেয়ে নাও। ‘

‘ আযান দিবে এখন। নামাজ পড়ে তারপর খেয়ে নিবো। ‘

 

দিথী এসে দাঁড়ায় শাহারিয়ার পাশে। শাহারিয়া মোবাইল চার্জে দিচ্ছে। দিথী শাহারিয়ার কাঁধে লেগে থাকা শুকনো পাতা হাত দিয়ে ঝেড়ে দেয়। বলে, ‘ লাশ গুলো এনে দাফন করছে? ‘

‘ কোন গুলা ? ‘ শাহারিয়া পিছনে ফিরে। বলে, ‘ ওহ ঐগুলা! হ্যা। বিকালেই দাফন করে দিছে। ‘

‘ টি শার্ট টা বদলাবে! ঘেমে গেছে তো এইটা। ‘

‘ দেও একটা বের করে। বাইরে একদম বাতাস নাই। গরমে খালি ঘামতেছি। ‘

দিথী চলে যায় আলনার দিকে। ব্যাগে করে শাহারিয়া যে কয়টা কাপড় এনেছিলো সব দিথী এখানে গুছিয়ে রেখেছে। দিথী ওখান থেকে একটা নীল টি শার্ট নিয়ে চলে আসে শাহারিয়ার কাছে। শাহারিয়া বিছানায় বসে। দিথীকে বলে, ‘ দরজাটা ভিড়ায় দাও। ‘ 

দিথী দরজাটা ভিড়িয়ে দিয়ে এসে শাহারিয়ার সামনে দাঁড়ায়। শাহারিয়া আগের টি শার্ট টা খুলে পাশে বিছানায় রেখে দেয়। ভিতরে শুধু সেন্টো গেন্জি। দিথী হাত বাড়িয়ে আলনা থেকে আনা টি শার্ট টা দেয়। শাহারিয়া পড়ে নিতে থাকে। দিথী দেখছে শাহারিয়াকে। বুক, হাতের মাংস পেশীর সংকোচন, এসবে দিথী খুবই দুর্বল অনুভব করে। শাহারিয়া টি শার্ট টা পড়ে নেয়। দিথী বিছানা থেকে আগের খুলে রাখা টি শার্ট টা হাতে নেয়। শাহারিয়া বলে, ‘ আজ সিলেট যাচ্ছি আমরা। ব্যাগ গুছিয়ে নিও। ‘ 

‘ আজ? এখন তো সন্ধ্যা নেমে গেছে। ‘

‘ এখনই কী আর বের হচ্ছি নাকি। রাতের ট্রেনে যাবো। তুমি লাগেজ গুছিয়ে নিয়ো। ‘

‘ টিকিট! ‘

শাহারিয়া উঠে বিছানার পাশের পড়ার টেবিলটা হতে তার মানি ব্যাগটা নেয়। এসে বসে সেটা খুলে দেখতে দেখতে বলে, ‘টিকিটের ব্যবস্থা হয়ে গেছে। ‘

শাহারিয়া মানিব্যাগ থেকে কতগুলো বড় বড় নোটের ছোট একটা বান্ডিল বের করে দিথীর দিকে এগিয়ে দেয়। দিথী কিছুটা অবাক হয়। টাকা গুলো হাত বাড়িয়ে নেয়। বলে, ‘ কীসের টাকা এগুলো! ‘

‘ শাশুড়ি মা’কে দিয়ো এগুলো। ‘

‘ কেনো? ‘

‘ তোমার বাবা নাই এখন।‌ তুমিই সবার বড়। নিবিড় তো ছোট। ছেলে হলেও ওর উপার্জন করার বয়স হয়নি। এগুলো উনাকে দিও। এই মাসটা চলে যাবে বেশ ভালোভাবেই। ‘

‘ আমি এই টাকা নিতে পারবোনা। তুমি রেখে দাও। ‘

দিথী টাকা গুলো আবার শাহারিয়াকে দিয়ে দিতে নেয়। শাহারিয়া বলে,

‘ আরে থামো থামো। এমন কেনো করছো। আমি কী দয়া মায়া করে দিচ্ছি নাকি! আমি এ বাড়ির বড় জামাই। এ বাড়ির সবাই আমার আপন কেউ। আমি আমার নিজের বিবেক বোধ থেকে এটা দিচ্ছি। আর, জমির ধানের টাকা আসতেও দেরি আছে‌। ওটা আসলে তখন আর উনাদের সমস্যা হবে না। তুমি এটা উনাকে দিয়ে দিও। মনে করো আমি ছেলে হয়ে আমার আরেক মা’কে দেওয়ার জন্য টাকা গুলা তোমাকে দিলাম। ‘

দিথীর থেকে টাকা গুলা নেয়না শাহারিয়া। দিথীর কিছুটা আত্মসম্মান বোধে লাগে, তবে শাহারিয়ার শেষ কথাটায় সে সব স্বাভাবিক ভাবেই নেয়। 

হঠাৎ শাহারিয়ার ফোন বেজে উঠে। শাহারিয়া বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে কে ফোন দিয়েছে। ফোনটা হাতে নেওয়া মাত্রই দ্রুত চার্জ থেকে খুলে ফোনটা নিয়ে বসে বিছানায়। একদম শান্ত স্বাভাবিক হয়ে ফোনটা রিসিভ করে। শাহারিয়া বলে,

‘ আসসালামুয়ালাইকুম স্যার। ‘

‘ ওয়ালাইকুমুস সালাম শাহারিয়া। কী খবর তোমার। ‘

‘ এইতো স্যার আলহামদুলিল্লাহ। আপনি কেমন আছেন! ‘

‘ আছি, ভালো মন্দ নিয়েই আছি। রঞ্জুর কেসের বিষয়টার কী খবর! তোমাকে আর আহনাফকে যে এই কেসের দায়িত্ব দিলাম, কতদূর কী কুলকিনারা করতে পারলে! ‘

‘ রন্জুর কেস! হ্যা, অনুসন্ধান প্রায় অনেক দূর এগিয়েছে। আশা করা যায় খুব শীঘ্রই আমরা একশনে যেতে পারবো। ‘

‘ হমম তাই করো। ইদানিং তো কোন আপডেটই দিচ্ছো না আমায়। আমি আরো ভাবলাম তুমি সিলেট গিয়ে ওখানকার কোন কেসে বিজি হয়ে গেলে নাকি আরো। ‘

‘ না না স্যার। তেমন কিছুই না। এমনি সিলেট জেলা পুলিশের একটা মার্ডার কেস সলভ করেছিলাম তো মাঝে, তাই এইদিকে অনুসন্ধানে একটু সময় লেগে যায়। ‘

‘ ভালো ভালো। গোয়েন্দাদের চর্চার মধ্যে থাকা ভালো। তো এখন কোথায় আছো! সিলেটেই না ঢাকায়! ‘

‘ আমিতো স্যার এখন একটু দিনাজপুর আসছি। আসলে আমার পরিবারের সবাইকে, সবাইকে কারা যেনো খুন করেছে। আমি দু’দিন হলো এখানে আছি। আজ রাতে সিলেটের উদ্দেশ্য রওনা দিবো। ‘

‘ কী বলো কি! তোমারে ফ্যামিলির সবাইকে খুন করছে! কে করছে! ‘

‘ জানিনা স্যার। তবে যে করছে, সে হয়তো আমাদের পূর্ব কোন শত্রু। আমি আমার কাজের পাশাপাশি এদিকটাও দেখছি। আপাতত কিছুদিনের জন্য সিলেট যাচ্ছি। ‘

‘ তুমি চাইলে কিছুদিনের জন্য ছুটি নিতে পারো। এমন অবস্থায় তোমার কাজ থেকে কিছুদিন দূরে থাকাই ভালো। ‘

শাহারিয়া একটা সৌজন্যমূলক হাঁসি দিয়ে বলে,

‘ না স্যার সমস্যা নেই। আমার কাজে কোন ব্যাঘাত ঘটবে না। আপনি তো ঢাকায় আছেন। তাই না স্যার! ‘

‘ আমি! হ্যা ঢাকায়। এদিকে আবার দু’দিন আগে জোড়া খুনের একটা কেস আমাদের সিবিআইকে পুলিশ হস্তান্তর করছে। ঐটা দেখতে দিয়েছি আমার কিছু ইমপ্লয়িদের। ‘

‘ ওহহ। ভালোই। ‘

‘ রাখছি শাহারিয়া। তুমি রন্জুর বিষয়ে পরবর্তী কোন আপডেট পেলে আমায় জানাইয়ো। ‘

‘ আচ্ছা স্যার। আসসালামুয়ালাইকুম। ‘

‘ ওয়ালাইকুমুস সালাম। ‘

 

নাঈম আহমেদ (৪৫) তার কান থেকে ফোন নামান। পড়নে সুট, বুট, টাই। তার মুখে ফুটে উঠে এক ছোট্ট হাঁসি। তিনি দাড়িয়ে ছিলেন এক ব্যস্ত রাস্তায়। পিছনেই কিছুটা দূরে কিছু ফার্নিচারের দোকান। সেইসব দোকানের সাইনবোর্ডের বড় করে শেষ দিকটায় লেখা ছিলো, ‘ ফার্নিচার পট্টি, দিনাজপুর ‘

 

শাহারিয়া ফোনটা কান থেকে নামায়। সে যেনো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। উঠে ফোনটা আবার টেবিলে চার্জে লাগিয়ে দেয়। দিথী অবাক হয়ে বলে, ‘ কে ফোন দিয়েছিলো! ‘

‘ নাঈম স্যার। ‘

‘ নাঈম স্যার! উনি আবার কে? ‘

‘ আমাদের সিবিআই এর প্রধান।‌ নাঈম আহমেদ দুর্জয়। ‘

‘ উনি তোমার কাছ থেকে রঞ্জুর বিষয়ে কেনো জানতে চাচ্ছিলো! রঞ্জু তো তুমিই। ‘

‘ আমি যে রঞ্জু, এটা তো উনি জানেন না। ঐযে ঐদিন আমার আস্তানায় তোমাদেরকে বললাম না, যে আমি রঞ্জুর কেস টা নিজ দায়িত্বে নিছি, যেনো কেউ আমাকে খুঁজবার দুঃসাহস না করে। আমি যে রঞ্জু তা শুধু আমার কাছের মানুষরা ছাড়া আর কেউ জানেনা। ‘

‘ কে কে জানে যে তুমি রন্জু! ‘

‘ তুমি জানো, আহনাফ জানে, আর আমার বাবা। আমাকে গড়ার কারিগর তো আমার বাবাই। আফসোস, আমি উনাকে জুডাসের মৃত্যু দেখানোর আগেই……… বাদ দাও। সব বিধাতার লেখনি। আমরা তো তার সুতো বাঁধা পুতুল মাত্র। ‘

‘ হমম। ‘

শাহারিয়া নিজেকে সামলে নেয়। কষ্ট পেতে পেতে আজ সে শক্ত হতে শিখেছে। আগুনে পুড়তে পুড়তে জলন্ত কয়লায় রূপ নিয়েছে। আর কী পুড়বে ও! 

দিথী কথার প্রসঙ্গ বদলাবার চেষ্টা করে। বলে,

‘ রাত কটার ট্রেন! ‘

‘ নয়টা। এখন তো মনে হয় ৬ টা বাজছে না! ‘ হাত ঘড়ি উঠিয়ে, ‘ না। আরো ৩ মিনিট বাকি ৬ টা বাজতে। ঐ ধরে নাও ৬ টা বাজে গেছে। আর ৩ ঘন্টা আছে আমাদের হাতে। ‘

‘ তুমি নাস্তা গুলা খেয়ে নাও তাইলে। যাওয়ার সময় ভাত খেয়ে বেড়োবো। ‘

‘ আযান দিয়ে দিবে। আমি অযু করতে যাচ্ছি। তুমি জায়নামাজ বিছাও। একসাথে নামাজ টা পড়ে তারপর খাবো‌। ‘

‘ আচ্ছা। যাও। আমি সামিহাকে বলছি মটর টা ছাড়তে। ইদানিং মটর ছাড়া কলে পানিই আসছে না কেনো জানি। ‘

‘ আমি টিউবওয়েল থেকে ওযু করে নিবো। তুমিও জায়ানামাজ গুলো বিছিয়ে অযু করতে আসো। ‘

‘ ঠিক আছে। ‘

শাহারিয়া বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়। দিথীর পাশে এসে তাকে পাশ থেকে হালকা জড়িয়ে ধরে, চলে যেতে থাকে দরজার দিকে‌‌। দিথী মৃদু হাসে। শাহারিয়ার মন এই দুইদিনের মধ্যে এখন একটু ভালো হলো। ছেলেটা সব হারানোর শোকে একদম পাথর হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু আজ, এখন দিথীকে সে ছোট্ট আলিঙ্গন করে তার কষ্টের বোধ টাকে একটু হলেও প্রশমিত করার চেষ্টা করেছে‌। দিথীর বেশ ভাল্লাগে এই ছোট্ট ছোট্ট বিষয় গুলো। সেও চায়, তার স্বামীর আনন্দ, সুখ সবকিছু শুধু তাকে ঘিরেই হোক। দিথী চলে যায় আলনার দিকে। জায়নামাজ গুলো নিয়ে নেয় নিচে বিছিয়ে দেওয়ার জন্য। 

দূরের মসজিদের মাইক হতে ভেসে আসে মাগরিবের আযান। ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত হতে থাকে চারপাশ। মুসল্লিরা রাস্তা দিয়ে চলে যায় মাথায় টুপি পড়তে পড়তে।

 

______

 

চলবে ,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

 

((( পরবর্তী পর্বও একসাথে পোস্ট করা হয়েছে‌। লিংক কমেন্টে 👇)))

 

উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন:: ২(মুখোশ)

পর্ব:: ৯১

লেখক:: মির্জা শাহারিয়া

 

উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন:: ২(মুখোশ)

পর্ব:: ৯২

লেখক:: মির্জা শাহারিয়া

 

   সন্ধ্যা ৭ টা। রাতের আঁধারে চারপাশ থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে। আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে কিছুটা, তবে মনে হয়না সেসব বৃষ্টি নামানোর জন্য পর্যাপ্ত।

 

শম্পা রান্না ঘরে রান্না করছে। মাটির চুলায় একটা কড়াই বসানো। তার সামনে একটা ছোট্ট পিড়ায় বসে পেঁয়াজ মরিচ তেলে দিয়ে নাড়ছে সে। কাঁচা রান্না ঘরটার কোনে একটা টেবিল রাখা। তারই সামনের অগ্রভাগের উপর রাখা একটা ছোট্ট কেরোসিনের কুপি। সেটা হতেই জলন্ত শিখার আলো রান্না ঘরকে পুরোপুরি না পাড়লেও, যথেষ্ট আলোকিত করে তুলছে। আজ সন্ধায় রান্নাঘরের লাইটটা আবার ফিউজ হয়েছে। রাশেদও তার আগেই বাজারে চলে যায়। তাই লাইট আনার কথা আর তাকে বলা হয়নি।

পেঁয়াজ মরিচ বাদামী রং ধারণ করে। শম্পা পাশ থেকে ধুয়ে রাখা ঢেড়সের গামলাটা হাতে নেয়। অল্প অল্প করে হাত দিয়ে উঠিয়ে ছেড়ে দিতে থাকে ভাজা পেঁয়াজ মরিচের উপর। শা শা শব্দ আসতে থাকে কড়াই থেকে। 

রান্না ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় এক ছায়া মুর্তি। ছোট্ট কুপির আলোয় রান্না ঘরের দরজার দিকটা ততটাও আলোকিত না। তাই ছায়ার মতো মনে হচ্ছে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মানবীকে। ধীরে ধীরে তিনি রান্নাঘরের ভিতরে আসেন। খুড়িয়ে খুড়িয়ে হেঁটে এসে দাঁড়ান শম্পার পিছনে। শম্পার কাঁধে হাত রেখে শব্দ করে বলে উঠেন, 

‘ কী রান্না করছো! ‘

শম্পা পিছনে ফিরে তাকায়। কুপির আলোয় এখন সেই ছায়া মুর্তির মুখ দৃশ্যমান। শম্পা দেখে তার পিছনে সাথী বেগম দাঁড়িয়ে আছেন। শম্পা বলে, ‘ ঢেড়স ভাজি করতাছি চাচি। ‘

শম্পা সামনে তাকায়। গামলায় অবশিষ্ট থাকা বাকি ঢেড়স গুলোও হাত তুলে দেয় কড়াইয়ে। সাথী বেগম একটা কাঠের উচু টুল টেনে শম্পার পাশে বসেন। শম্পা একবার ফিরে তার দিকে দেখে, তারপর আবার সামনে ফিরে কড়াই ধরে খুন্তি দিয়ে ঢেড়স গুলো নেড়ে দিতে থাকে। সাথী বেগম শম্পার দিকে কিছু একটা এগিয়ে দেন। বলেন, ‘ এটা নেও। ‘

শম্পা ফিরে তাকায়। দেখে সাথী বেগমের হাতে হাজার টাকার ৫টে নোট। শম্পা অবাক হয়ে সাথী বেগমের মুখের দিকে চায়। বলে, ‘ এডি কীসের টাহা! ‘

‘ আজ সকালে দিনাজপুর থানা থেকে চিঠি আসছিলো। ও কিছু টাকা পাঠাইছে। এগুলা রাশেদকে দিয়ো। ‘

‘ উনি আপনাগো কাছ থেইকা টাকা পাইতো! ‘

‘ কে রাশেদ! না। এই গুলো আমাদের থাকা-খাওয়ার খরচ। এমনিই তোমাদের অভাবের সংসার। তার উপর আবার দুটো মানুষ উড়ে এসে জুড়ে বসেছি। রাশেদ একলা এতো বোঝা কীভাবে টানবে। এগুলো ওকে দিয়ো। ‘

শম্পা অবাক হয়ে সাথীর দিকে চেয়ে আছে। সাথী বেগম বলেন, ‘ নেও। ‘

শম্পা হাত গুলো পাজামায় মুছে টাকাটা নেয়। তবে ওর মুখের গাম্ভীর্য ভাব টা এখনো কাটে নি‌। সাথী বেগম বলেন, ‘ নেড়ে দেও। নিচে লেগে যাবে নাইলে। ‘ শম্পা টাকা গুলো তার কোলে রেখে তাড়াতাড়ি কড়াই ধরে খুন্তি দিয়ে নেড়ে দিতে থাকে। চুলা থেকে কিছু খড়ি বের করে রাখে, যাতে চুলার জাল কিছুটা কমে যায়। খড়ির আগুন পা দিয়ে মাড়িয়ে নিভিয়ে দেয়। তরকারি গুলো নেড়ে দিয়ে আবার সাথীর বেগমের দিকে ফিরে তাকায়। বলে, ‘ উনি আপনাগোর আসাতে কিন্তু বেজার হয়নাই। ‘

‘ হ্যা জানি। তারপরও, এভাবে কারো বাড়ি এসে থাকাটা খারাপ দেখায়। চিঠিতে ও বলেছে, হয়তো এই সপ্তাহের মধ্যেই ওকে আর আমার ছেলে সাদিক কে ছেড়ে দিতে পারে। তখন আমরা দিনাজপুরের কোন ভাড়া বাসায় গিয়ে উঠবো। এদিকে আবার শুনলাম নজরুল ভাইয়ের আগের পক্ষের বউ আছে। ছেলেও আছে বলে একটা। আবার শুধতেছি রায়হানও নাকি ঐ পক্ষেরই সন্তান। এখন কে জানে সত্যিটা কি। (থেমে) যদি ওদের দাবি সত্যি হয়, তাহলে বাড়িটা ওদের নামে হবে। অবশ্য বাড়িতে আমাদেরও কিছু ভাগ আছে, মানে তোমার চাচারও কিছু অংশ ভাগে আসবে। যদি আসে, তাহলে খাঁন বাড়িতেই ফিরে যাবো। ‘

‘ আপনার পোলা আছে! ‘

‘ হ্যা। সাদিক আহমেদ রাফি। আমি ডাকি সাদিক নামে। রাশেদের ব্যাচ ও। ‘

‘ ওহহ। এহন হেয় কই থাহে! ঢাকায়! ‘

‘ না। পুলিশ, তোমার চাচার সাথে ওকেও নিয়ে গেছে। ‘

‘ একটু পানির জগটা দিয়েন তো চাচি। নাইলে খারান আমিই উঠতাছি…’

‘ কোনটা এইটা! নেও। ‘

সাথী বেগম তার পাশে থাকা একটা কাসার জগ এগিয়ে দেন শম্পার দিকে। শম্পা তরকারিতে হালকা একটু পানি দেয়। পানির জগটা পাশে রেখে খুন্তি দিয়ে নেড়ে দিতে দিতে বলে,

‘ আঁখি আফায় কই গেছে! ‘

‘ ঘরেই আছে ও। রাশেদের বাবা-মায়ের পাশে আছে। ‘

‘ ওহহ। (থেমে) আচ্ছা চাচি, আপনারে একটা কথা জিগাই! ‘

‘ কী কথা। বলো। ‘

‘ যেইদিন মেম্বার বাড়ি আগুন লাগলো, হেইদিন আপনি কই জানি গেছিলেন। আগুন লাগার আগেই বাইরাইছিলেন। আমি, আঁখি আফায় আপনারে মেলা খুঁজছিলাম। কিন্তু পাইনাই। কই গেছিলেন আপনে! ‘

প্রশ্ন শোনা মাত্রই সাথী বেগম এক ঢোক গিলে দৃষ্টি অন্যদিকে নিয়ে নেন। শম্পা তরকারি নেড়ে দিতে দিতে ফিরে তাকায় সাথী বেগমের দিকে। উত্তরের অপেক্ষা করতে থাকে। সাথী বেগম হঠাৎ কাঠের টুল ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। শম্পা অবাক হয়। সে কিছু বলতেই যাবে তখনই সাথী বেগম বলে উঠেন, ‘ আঁখি মনে হয় আমাকে ডাকতেছে। আমি একটু ঘরে যাচ্ছি। ‘

‘ আঁখি ডাকতাছে! কই! আমি তো হুনলাম না! ‘

সাথী বেগম খুড়িয়ে খুড়িয়ে হেঁটে চলে যান রান্নাঘরের দরজার দিকে। আঁখি তাকে পিছু ডাকতে যায়, কিন্তু কী ভেবে যেনো আর ডাকেনা। ঘর থেকে তো আঁখির কোন ডাক সে শুনতে পেলোনা! সাথী বেগম কী তাইলে তাকে এড়িয়ে গেলো! শম্পা আর কিছু ভাবেনা। সামনে ফিরে তরকারি নাড়তে থাকে। একটা ছোট্ট কৌটা হাতে নিয়ে তা থেকে হালকা লবণ দিয়ে দেয় তরকারিতে। টেবিলের উপরে থাকা ছোট্ট কুপিটা মৃদু হওয়ায় দোল খেয়ে উঠে। বাইরে থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আরো বেড়ে যায়। ছোট্ট ছোট্ট দমকা হাওয়া বয়ে যায় বাড়ির উঠোন জুড়ে‌।

 

_______

 

দিথী ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে‌‌। বাইরে ঝড়ো হাওয়াসহ মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। মাঝে মাঝে বড় বড় বিজলী চমকিয়ে উঠছে। জানালার কাচ নামানো। তাই বৃষ্টির পানি ভিতরে আসছে না। চারিদিকে যতদূর দৃষ্টি যায় খালি ফসলি মাঠ আর মাঠ। যখন বিজলী চমকিয়ে উঠছে, তখনই যেনো সব কিছু আলোকিত রূপে ধরে দিচ্ছে দিথীর চোখে‌।

বরাবরের মতোই তারা কেবিন নিয়েছে ভ্রমণের জন্য। দিথী কেবিনের একপাশের বেড টায় বসে আছে‌। তার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়েছে শাহারিয়া। গাঁয়ে পাতলা কাঁথা। দিথী জানালার দিক থেকে নজর সরিয়ে শাহারিয়ার দিকে তাকায়। মাথার চুল গুলোয় আঙ্গুল ঢুকিয়ে বুলি কেটে দিতে থাকে। ছেলেটা ২ রাত ঘুমায়নি। চোখের নিচে কালো দাগ জমে গেছে। ছেলে হয়েও শাহারিয়া একদম বাচ্চাদের মতো কেঁদেছে। উন্মাদের মতো ছুটে গিয়েছে তার বাবা-মায়ের কবরের কাছে। তাকে দিথী ছাড়া কেউ শান্ত করতে পারেনি। দিথী ছাড়া যে এই পৃথিবীতে তার আর কেউ নেই। নিজের জন্মদাতা মা’কে সেই ছেলেবেলায় হারিয়েছে। দু’দিন হলো তার বাবা, নতুন মা, বোন সবাইকে হারিয়ে এখন নিঃস্ব সে। দিথীই এখন যেনো তার শেষ নির্ভরতার ঠিকানা। 

এ দুইদিনের ক্লান্তির পর শাহারিয়া আজ শান্তি মতো ঘুমিয়েছে। এই ঘুমটা যেনো তাকে স্বর্গসুখ এনে দিয়েছে‌। দিথী শাহারিয়ার কপালে একটা ছোট্ট চুমু এঁকে দেয়। ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকে আধো খোলা চোখে। চেহারাটা বেশ মায়াবী লাগছে। ছেলেদের চেহারা মানেই তো রুক্ষতা, রুঢ়তা, কাঠিন্য ভাব। কিন্তু ঘুমন্ত সবাইকেই দিথীর কাছে মায়াবী মনে হয়। আর শাহারিয়া তো তার স্পেশাল কেউ। মায়াবনের এক বিশেষ হরিণ। যেই হরিণকে শুধু সেই ধরতে পেরেছে পালিয়ে যাওয়ার আগে। 

বাইরে এক বড় বিজলী চমকিয়ে উঠে। দিথী নজর ঘুড়িয়ে জানালার দিকে নেয়। বাইরের আবহাওয়া যেনো ক্রমেই খারাপ রূপ ধারণ করছিলো। ট্রেন ছেড়েছে ৩ ঘন্টার মতো হবে। এদিকটায় যেমন বৃষ্টি দেখা যাচ্ছে, সিলেটে না জানি কী অবস্থা হয়। 

দিথী শাহারিয়ার দিকে তাকায়। তার গায়ের কাথাটা টেনে গলা পর্যন্ত উঠিয়ে দেয়। নিজের কোলটাকে যে এক রাজকুমারের আরামদায়ক বালিশ হিসেবে বিলিয়ে দিয়েছে, তাতে দিথীর কোন আক্ষেপ নেই। উল্টো তার আরো ভালো লাগছে। এ দুইদিন পর শাহারিয়ার স্পর্শ সে খুব কাছ থেকে পাচ্ছে। খুব কাছ থেকে।

হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়তেই দিথীর মুখ কালো মেঘে ছেয়ে যায়। তার চোখ যেনো ভিজে আসতে থাকে। সে শাহারিয়ার দিকে তাকায়। শাহারিয়ার গাল ছুঁয়ে একনজরে তাকিয়ে থাকে। সামনে মুখ তুলে তাকায়। আবার নজর নিজের দিকে নেয়। মনে মনে ভাবে, ‘ আচ্ছা ও কী আমার আসল পরিচয় জানার পর, আমাকে ছেড়ে চলে যাবে! প্লিজ আল্লাহ, এমনটা যেনো না হয়। আমি মরে যাবো। ও ছাড়া আমার আর কেউ নেই। আমিও ওর মতো অসহায়, আমাদের দুইজনকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে সারাজীবন একসাথে রেখো! ও আল্লাহ, তুমি তো পরম দয়ালু, তোমার আরশে তো সব ভুলেরই ক্ষমা আছে। আমাকেও তুমি ক্ষমা করে দাও। আমি, আমি আমার কাজ টা শেষ হলেই সব ছেড়ে দিবো। সব ছেড়ে ওকে নিয়ে সুদূরে চলে যাবো। প্লিজ আল্লাহ, ও যেনো আমার আসল সত্য জানার পর আমাকে মেনে নেয়। ও, ও যদি আমায় ত্যাগ করে, আমার আত্মহত্যা ছাড়া আর কোন পথ থাকবে না। আমি মরতে চাই না। আমি, আমি ওর সাথে থাকতে চাই। আল্লাহ, আল্লাহ আমি তওবা করবো। আমি সব খারাপ কাজ ছেড়ে দিবো। আমি যে ওকে ছাড়া আমার একটা মুহূর্তও ভাবতে পারি না। আমাদের প্রথম দেখা, প্রথম প্রথম ওর সাথে করা আমার প্রেমের অভিনয়, সেসব মিথ্যে হলেও, এখন তো আমি সত্যিই ওকে ভালোবাসি। ওকে আমি আমার খুব আপন কেউ ভাবি। আল্লাহ, আল্লাহ দয়া করে তুমি ওকে আমার থেকে কেড়ে নিয়ো না। ও যেনো আমাকে মেনে নেয়। ঠিক তেমন ভাবেই পাশে থাকে, যেমনটা এখন আছে‌। এই কঠিন হৃদয়ে ও বৃষ্টি নামিয়েছে। নতুন অনুভূতির জন্ম দিয়েছে। যেই আমি মানুষত্বকে হারিয়ে বসেছিলাম, সেই আমাকে ও নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখিয়েছে‌। প্লিজ আল্লাহ, আমি তোমার কাছে আমার সব কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাইছি। আমাকে মাফ করে দাও। আমায় তুমি ওর থেকে আলাদা করে দিয়ো না। এই পাপীস্ঠ জীবন থেকে আমায় ফিরে আসার সুযোগ দেও। আমি আমার অন্তিম কাজ টা শেষ করেই সব ছেড়ে দিবো। জানি, পথটা সহজ হবেনা। কিন্তু ও থাকলে, ও থাকলে আমি  শতরাজ্যে জয় করতে পারবো। (থেমে) ও এমনই এক নক্ষত্র, যাকে ঘিরে আমার ভালোবাসারা আবর্তিত হয়। এই নক্ষত্রকে আমার থেকে কেড়ে নিয়ো না। কেড়ে নিয়ো না। ‘

দিথী শাহারিয়ার দূই গালে চুমু খায়। দিথীর চোখের পানির ফোঁটা পড়ে শাহারিয়ার কপালে। গভীর ঘুমে থাকায় শাহারিয়ার মস্তিষ্ক এই ফোঁটা পানির উৎস জানতে চেষ্টা করেনি। দিথী শাহারিয়াকে জড়িয়ে ধরে। তার গলায় মাথা রেখে চোখ বুজে। ও কাঁদছে।‌ নিঃশব্দে কাঁদছে।

 

ট্রেন চলে যায় মাঠ,ঘাট, পথ, প্রান্তর পেড়িয়ে। মুষলধারে বৃষ্টি নামতে থাকে মেঘ ভেঙে ধরিত্রীর বুকে। দূরের আকাশে বড়সড় এক বিজলী চমকিয়ে উঠে। ট্রেন চলে যায় অজানা এক গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ….

 

________

 

শিমলা গাছের ডাল সড়াতে সড়াতে এগিয়ে যাচ্ছে। চারপাশ ঘোর অন্ধকারে ঢাকা। মেঘ গর্জন করছে। হয়তো কোথাও বৃষ্টি নেমেছে। আর সেই বৃষ্টির আগাম বার্তা দিতেই এই মেঘ গুলো আনন্দপুরে ছুটে এসেছে‌। শিমলার হাতে টর্চ লাইট। তবে তারও আলো ক্ষীণ হয়ে আসছে। মনে হয় ব্যাটারির চার্জ ফুরিয়ে এসেছে‌। শিমলা আরো জোড়ে চলতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে চলে আসে জঙ্গলের মাঝের এক ছোট্ট ফাঁকা যায়গায়। সেখানে আগে থেকেই দাড়িয়ে ছিলো কানিজ। আকাশে বিজলী চমকিয়ে উঠে। দমকা হাওয়া বয়ে যায়। শিমলা ভয়ে ভয়ে এসে দাঁড়ায় কানিজের পিছনে। সেদিন ও এতোটা ভয়ে ছিলোনা, যতটা আজ আছে। শিমলা কাঁপো কাপো গলায় বলে উঠে, ‘ ম্যাম। আমি, আমি পাইনি। ‘

সাথে সাথেই পিছনে ফিরে তাকায় কানিজ। আকাশ মেঘে বজ্রপাত ধরিত্রীকে যেনো কাঁপিয়ে তুলে। কানিজের চোখ মুখে ক্রোধ। সে খুড়িয়ে খুড়িয়ে হেঁটে এসে শিমলার থুতনি চেপে ধরে। শিমলার ভয়ে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। কানিজ দাঁতে দাঁত চেপে বল, ‘ তালুকদার কোথায়! ‘

‘ ম্যা, ম্যাম। আমি, আমি অনেক খুঁজেছি। কিন্তু পাইনি। আমি পাইনি। ‘

‘ এই কথাটা বলতে তোর এক বারও জান কাপলো না! তুই জানিস এর জন্য তোর কী শাস্তি হতে পারে! ‘

শিমলা কান্না করে ফেলে। কানিজ ওর মুখ ধরেই ওকে ছিটকিয়ে ফেলে মাটিতে। শিমলা হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে এসে শিমলার পা জড়িয়ে ধরে। কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘ আমায় মাফ করে দেন ম্যাডাম। আর ভুল হবেনা। আর ভুল হবেনা। ‘ 

কানিজ শিমলার চুলের মুঠি ধরে তাকে টেনে তুলে‌। কোমড়ের ভাজ থেকে বন্দুক বের করে শিমলার মুখের নিচে ধরে। বলে, ‘ তালুকদার কীভাবে তোর নজর থেকে পালায়! কীভাবে পালায়!’

‘ ম্যাম ওকে, ওকে আমি চোখে চোখেই রেখেছিলাম। ঐদিন রাতে যখন উনি ফাইল নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসেন, আমি উনার পিছু পিছুই আসছিলাম। কিন্তু তখনই মেম্বার বাড়ি থেকে গুলির আওয়াজ আর চিৎকার শুনতে পাই। আগুন জ্বলতে দেখি। ঐদিকে মনযোগ দিতে গিয়ে তালুকদার আমার হাত ছাড়া হয়ে যায়‌। (কাঁদো কাঁদো হয়ে) প্লিজ ম্যাম, আমায় ক্ষমা করে দিন। আমার ২ বছরের বাচ্চাটা এতিম হয়ে যাবে। প্লিজ আমাকে মারবেন না। ‘

‘ তোর বাচ্চা! ওহ হ্যা। তুই তো আবার মা হইছিস। তোর স্বামীটাকে যেভাবে মারছিলাম, মনে আছেতো! এখন যদি ঐভাবে তোকে মারি! কেমন হবে! ‘

‘ ম্যাম প্লিজ দয়া করুন। আমাকে শেষ বারের মতো একটা সুযোগ দিন। আমার বাচ্চাটাকে এতিম করে দিবেন না। আমি ছাড়া ওর কেউ নেই! ‘

‘ তাইলে তোর ঐ বাচ্চাটাকেও মেরে ফেলি! (জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে) গার্ডস, বের করে আনো। ‘

তখনই জঙ্গলের এক পাশ হতে দু জন মুখোশধারী লোক একটা ২ বছর বয়সী মেয়ে বাচ্চাকে নিয়ে আসে। শিমলা তা দেখা মাত্রই চিৎকার দিয়ে সেদিকে ছুটে যেতে চায়, তখনই কানিজ তার চুলের মুঠি ধরে এক হেঁচকা টান মেরে তার কাছে এনে তার মাথায় বন্দুক ধরে। শিমলাকে চেপে ধরে থাকে। কানিজের মুখে শয়তানি হাসি। হাঁসতে হাঁসতে সে দুইজন লোককে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘ গার্ডস, বাচ্চাটাকে টেনে মাঝ দিয়ে ছিড়ে ফেলো। ‘

শিমলা চিৎকার দিয়ে উঠে। বারবার কানিজের কাছে তার ছোট্ট মেয়ের প্রাণ ভিক্ষা চাইতে থাকে। কানিজ পিশাচ রুপি হাসিতে মেতে উঠে। 

মুখোশ পড়া লোক দুটো অর্ডার পাওয়ার পর পরই রেডি হয়ে যায়। এক জন মেয়েটার বুকের দিকটা ধরে, আরেকজন মেয়েটার তলপেটের দিকটায় চেপে ধরে। শিমলা পাগলের মতো চিৎকার করছে। চিৎকার করে বলছে, ‘ আমার মিলিকে মারবেন না। আমার মিলিকে মারবেন না। ‘

তখনই দুই লোক নিজেদের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে বাচ্চাটাকে দুইদিকে টানতে থাকে। অবুঝ শিশুটা চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। শিমলা কানিজ কে এক সজোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। কাঁদতে কাঁদতে ছুটে যায় তার মেয়েকে বাঁচাতে। তখনই কানিজ শিমলার পায়ে গুলি করে। শিমলা হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়ে যায়‌। আরো একটা গুলি করে শিমলার আরেক পায়ে। শিমলা আহাজারি করছে। তার মেয়েটাকে বাঁচানোর জন্য দুই হাতের বলে মাটির সাথে ঘেঁষে ঘেঁষে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। দুই লোক খুব জোড়ে বল প্রয়োগ করে। ছোট মেয়েটার শরীরের হাড় গুলো মটমট করে ভাঙতে থাকে। শিমলা পাগলের মতো কাঁদতে থাকে। মাটিতে ঘুষি মারতে থাকে‌। সাথে সাথেই লোকদুটো ছোট মেয়েটার দেহ মাঝ থেকে টেনে ছিড়ে ফেলে। শিমলা ‘নাআআআআআ,,,,,’ বলে চিৎকার দিয়ে উঠে। সাথে সাথেই কানিজ বন্দুক তাক করে ধরে কানিজের মাথা বরাবর। পরপর দুটো গুলি শিমলার মাথা ভেদ করে সামনের কপাল দিয়ে বের হয়ে যায়। থেমে যায় সব চিৎকার। শিমলার দেহটা মরা মুরগীর মতো ছটফট করতে থাকে। কানিজ আরো দুটো গুলি চালায়। শিমলার দেহ থেকে রক্ত ছিটকে উঠে। তার নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়। দুই লোক সেই ছোট্ট মেয়ের দেহের দুই অংশ ছুড়ে ফেলে শিমলার মৃত দেহের উপর। কানিজ খুড়িয়ে খুড়িয়ে হেঁটে এসে দাঁড়ায় কানিজের দেহের পাশে। ছোট্ট মেয়েটার শরীর থেকে রক্ত পানির স্রোতের মতো বইছে‌। ভিতরের কলিজা, নাড়িভুঁড়ি সব বেড়িয়ে এসেছে। কানিজ থুতু ফেলে মৃত মা-মেয়ের উপর। মুখ ভেংচে বলে, ‘ আমার আন্ডারে কাজ করছিস মানেই ভুলের মাশুল তোকে দিতে হবে। দিতে হবে মৃত্যু দিয়ে। (সামনে তাকিয়ে) তোমরা যাও। স্যারের নিরাপত্তায় যেনো বিন্দু মাত্র ত্রুটি না থাকে। ‘

‘ ওকে ম্যডাম। ‘

সেই দুই লোক চলে যেতে থাকে। কানিজ খুড়িয়ে খুড়িয়ে হেঁটে এসে একটা বড় পাথরের উপর বসে। বাম পায়ের উপর ডান পা তুলে জুতো খুলতে থাকে। জুতো খুলে ফেলে দেয়। তার পায়ের পাতায় ছিলো ব্যান্ডেজ করা। কানিজ ব্যান্ডেজ খুলতে থাকে। চারপাশ থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, পেঁচার ডাক ভেসে আসছে‌।‌ আকাশ চমকে উঠে এক উজ্জ্বল আলোক রশ্মির সহিত। কানিজ ব্যান্ডেজ খুলে ফেলে দেয়। তার পায়ের পাতায় এক বড় ঘা। তবে স্বাধারণ কোন ঘা নয়। বেশ বড় সড় একটা ঘা। সাদা সাদা পুজ দলা পেকে আছে। এমনি ঘায়ের তো শুধু একটাই মুখ থাকে। কিন্তু এই ঘা, এই ঘায়ে ছিলো বেশ কয়েকটা মুখ। ঘা টা পুরো পায়ের পাতার মাঝে ছিলো। সাইজে বড় একটা কমলা লেবুর মতো গোল। 

ছোট্ট একটা কেঁচোর মতো পোকা সেই ঘায়ে থাকা এক ছোট্ট গর্তে ঢুকে যায়। ব্যাথায় কানিজ চোখ বুঝে ফেলে। পাথরের পাশেই একটা ছোট্ট বক্স ছিলো। সে বক্সটা থেকে একটা ছোট্ট চিমটা নেয়। পা টাকে আরো কাছে আনে। এই ঘায়ের দুর্গন্ধে স্বাধারণ মানুষ টেকা দায়। কানিজ চিমটা দিয়ে সেই ছোট গর্ত থেকে সেই কেচোর মতো পোকাটা বের করার চেষ্টা করে। ব্যাথায় পুরো শরীর কেঁপে উঠছে তার, কিন্তু তাকে পোকাটা বের করতেই হবে। একসময় সে চিমটা দিয়ে পোকার কিছু অংশ ধরতে পারে। টেনে বের করে সেই পোকাটাকে। তুলে দেখতে থাকে সেটাকে। গা যেনো মুহুর্তেই ঘিন ঘিন করে উঠে। ছুড়ে ফেলে দেয় সেই পোকাটাকে। কানিজ ঘায়ের উপরের মুখ গুলা ধরে। চেপে দেখতে থাকে পেকেছে কি না। ঘায়ের একদিকটায় চাপ দিতেই পচপচ শব্দ করে উঠে। কানিজ ব্যাথায় ককিয়ে উঠে। সে ঘায়ের আরেক দিকে হালকা চাপ দেয়, না। এদিকটা শক্ত ছিলো। কানিজ পা নামায়। ডাক্তার বলেছে অপারেশন করলে ১ মাসের মতো সে হাঁটতে পারবেনা। কিন্তু তার স্যার যে তাকে অপারেশন করতে দিচ্ছে না। যতদিন না ফাইল টা উদ্ধার হচ্ছে, ততদিন তাকে এভাবেই ব্যান্ডেজ করে কষ্ট করে চলতে হবে। কানিজ পাশের বক্স টা থেকে স্যাভলন ক্রিম বের করে। কিছুটা ক্রিম হাতে নিয়ে লাগিয়ে দিতে থাকে ঘায়ের উপর। বক্স থেকে ব্যান্ডেজ নিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিতে থাকে। 

দূরেই পড়ে রয় এ মায়ের গুলিবিদ্ধ লাশ, আর তার উপরেই তার সন্তানের দ্বি খন্ডিত দেহ। তার হতে কিছুটা দূরে এক নারী পাথরের উপর বসে তার পায়ে ব্যান্ডেজ করছে। আকাশের চাঁদের আলো ঢেকে যায় কিছু কালো মেঘের অন্তরালে।

 

______

 

সকাল ৭ টা। হালকা কুয়াশা আর কালো মেঘ দিয়ে ঘেরা আবহাওয়া। সূর্যের দেখা নেই। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে।

গাছপালা ঘেরা পাহাড়ি রাস্তার মাঝ দিয়ে চলে যায় এক প্রাইভেট কার। এই রাস্তাটা নির্জন। রাস্তার একপাশে পাহাড়ী গাছ গাছালি, আরেক পাশে একটা ফাঁকা উদ্যানের মতো যায়গা। সেই যায়গার পর পরই খাড়া খাঁদ। 

দিথী প্রাইভেট কারের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। চোখ মুখে কিছুটা ঘুম ঘুম ভাব। পড়নে গোলাপী থ্রি পিস, তার উপরেই জিন্সের জ্যাকেট, ওড়না আর গোলাপী প্লাজু। পাশের সিটেই হেলান দিয়ে ঝিমুচ্ছে শাহারিয়া। গায়ে হালকা নীলাভ ফরলাম শার্ট, আর প্যান্ট। গাড়ি চালাচ্ছে রুমান। 

জানালার কাঁচে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ছে। দিথী সেই ভেজা গ্লাসের মধ্যে থেকেই নজর রেখেছে দূরের পাহাড় গুলোর দিকে। সেই পাহাড় গুলো আরো মেঘে ঢাকা ছিলো। পাহাড়ের গায়ে গায়ে জুম চাষ করা। চায়ের বাগান। বেশ মনোরম একটা পরিবেশ। 

হঠাৎ দিথীর গ্লাসের পাশ দিয়ে শো করে একটা মোটরসাইকেল চলে যায়। দিথীর মনযোগ নষ্ট হয়। সে মুখ দিয়ে চ সূচক শব্দ করে সোজা হয়ে বসে। তখনই তার মাথায় আসে, ‘ আরে, এই রাস্তায় মোটরসাইকেল আসলো কিভাবে! এটা তো তাদের বাসা যাওয়ার শর্টকার্ট আর গোপন রাস্তা! ‘

  ভাবার সাথে সাথে সে মাথা হেলিয়ে সামনের দিকে তাকায়। বাইকে ছিলো দুইজন। দুইজনই হেলমেট পড়া। দিথী কিছু বুঝে উঠার আগেই বাইকের পিছনের লোক বন্দুক বের করে রুমানকে উদ্দেশ্য করে গুলি ছোড়ে। রুমান কিছু বুঝে উঠার আগেই গুলি এসে লাগে তার বুকে। দিথী সাথে সাথে চিৎকার দিয়ে উঠে। সে শাহারিয়ার হাত ধরে তাকে টেনে নিচে হেলে পড়ে। একের পর এক গুলি ছুড়তে থাকে সামনের বাইকাররা। শাহারিয়ার শান্ত মস্তিষ্ক হঠাৎ পরিস্থিতি বুঝে উঠতে পারে না। রুমান গাড়ির স্টেয়ারিংয়ের উপর ঢলে পড়ে। গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারায়। ঘুরে রাস্তা থেকে চলে যেতে থাকে পাহাড়ের খাদের দিকে। শাহারিয়া দ্রুত মাথা উঠিয়ে দেখে তারা খাদে পড়তে চলেছে। সে সাথে সাথেই দুই সিটের মাঝ দিয়ে সামনে ঝুঁকে পড়ে গাড়ির ব্রেক প্যাডে হাত দিয়ে চেপে ধরে। ৫০ কিমি গতিতে থাকা গাড়িটা এসে ঠিক খাদের কিনারায় আগ মুহুর্তে এক বড় ঝাঁকি দিয়ে থেমে যায়। দিথী আর শাহারিয়া যেনো খানিকক্ষণের জন্যও হাফ ছেড়ে বাঁচে। তখনই তারা শুনতে পায় মোটরসাইকেলের শব্দ। মাথা উঠিয়ে পিছনের গ্লাস দিয়ে চোখ রাখে বাইরে। দেখে আরো ৪-৫ টা মোটরসাইকেল রাস্তা থেকে তাদের দিকে আসছে। শাহারিয়া দিথী দুইজনই ভয় পেয়ে যায়। দিথী হন্তদন্ত হয়ে বলতে থাকে, ‘ তোমার কাছে বন্দুক কয়টা আছে। আমাকে একটা বন্দুক দাও। ‘

‘ আমার কাছে তো একটাই আছে। তুমি রোমানের পকেট থেকে বন্দুক নাও। রোমানের পকেটে ওর বন্দুক আছে। ‘

দিথী মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। হামলে পড়ে দুই সিটের মাঝ দিয়ে সামনে। রোমানের পকেট থেকে বন্দুক বের করতে থাকে।

 

মোটরসাইকেল নিয়ে প্রাইভেট কারের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে হেলমেট পড়িহিত লোকেরা। প্রত্যেক মোটরসাইকেলে দুইজন রয়েছে। একজন বাইক চালাচ্ছে, আরেক জন বন্দুক ধরে আছে। তারা প্রায় প্রাইভেট কারের কাছাকাছি এসেই যায়, তখনই প্রাইভেট কারের দুই পাশের দুই দরজা মেলে যায়। শাহারিয়া আর দিথী নিজেদের পাশের দরজা দুটোর হাতল একহাতে ধরে ঝুলছে, আরেক হাতে ধরা বন্দুক থেকে গুলি ছুড়ছে‌। গুলি এসে লাগে বাইকের চাকায়। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায় সাথে সাথে। গুলি এসে লাগে আরেক বাইকারের গলায়। সাথে সাথে বাইক থেকে ছিটকে পড়ে সে। একে একে গুলি এসে লাগতে থাকে বাকি বাইকার দের গায়ে। সামনে পড়ে যাওয়া বাইক গুলোর উপর পিছনের বাইক গুলো এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ে এক ধ্বংস্তুপে পরিণত হয়েছে।

 

দিথী শাহারিয়া দুইজনই বের হয়ে আসে কার থেকে। এক দক্ষ শুটারের মতো অনবরত গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে এগিয়ে আসতে থাকে দুজন। গুলির তীব্রতা আর সামনে উল্টে যাওয়ার বাইকের ধ্বংস্তুপে সব বাইকাররা যেনো নিমেষেই কাবু হয়ে যায়‌। দিথী শাহারিয়া দুইজনই গুলি নামায়‌। 

তখনই দেখতে পায় রাস্তা দিয়ে আরো ১০-১২ টা মোটরসাইকেল ছুটে আসছে তাদের দিকে। তাদের সবারই হাতে চাপাতি আর হকি স্টিক। দিথী আর শাহারিয়া আবার বন্দুক তুলে গুলি ছুড়তে থাকে তাদের দিকে। প্রথম ৩-৪ টে বাইক গুলির আঘাতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তা তেই উল্টে পড়ে। তা দেখেই পিছনের বাইক গুলো থেমে যায়‌। বাইক থেকে নামতে থাকে হেলমেট পড়িহিত লোকেরা। কোন কিছু না বুঝেই তেড়ে আসতে থাকে শাহারিয়া, দিথীর দিকে। দুইজনই আবার গুলি ছুড়তে নেয়। কিন্তু না। বন্দুক আর চলছে না। বন্দুকের শেষ গুলি টুকুও তারা ছুড়ে ফেলেছে। শাহারিয়া আর দিথী দুইজন দুইজনের দিকে তাকায়‌। বন্দুক দুটো একসাথে পিছনে ফেলে দেয়। দিথী তার ওড়না খুলে পিঠ থেকে বুকের উপর দিয়ে পেঁচিয়ে এনে কোমড়ে বাঁধে। চোখের ইশারায় তারা দুজন দুজনকে জানান দেয় কী করতে চলেছে। দুই পক্ষই সেই কাজে যেনো অগ্রীম সম্মতি জানিয়ে বসে। সামনে তাকায়‌। চিৎকার দিয়ে দৌড়ে ছুটে যায় অস্ত্রধারীদের দিকে। 

 

ছুরি দিয়ে শাহারিয়াকে আঘাত করতে নেয় একজন। সাথে সাথে শাহারিয়া সড়ে গিয়ে সেই হাত ধরে ফেলে। হাত ধরেই এক সজোরে ঘুষি মারে লোকের মুখে‌। নাক ফেটে রক্ত ছিটকে পড়ে। শাহারিয়া সাথে সাথে তার গলা ধরে তুলে এক আছাড় মারে মাটিতে। 

দিথীর দিকে তেড়ে আসতে থাকে দুজন। দিথী দৌড়ে তাদের সামনে এসেই এক লাফ দিয়ে উপরে উঠে এক গাছের ডাল ধরে নেয়। সজোরে লাথি দেয় একজনের বুকে। ছিটকে পড়ে সে একদিকে। আরেক জন দিথীকে আঘাত করতে যাবেই তখনই দিথী গাছের ডাল ছেড়ে নিচে নেমে একদম বসে পড়ে। লোকটা ছুরি দিয়ে আঘাত করতে যায়‌‌। ছুরি দিথীর মাথার উপর দিয়ে চলে যায়। লোকটা দিথীর আক্রমণ বুজে উঠতে উঠতে দিথী এক পা ঘুড়িয়ে ল্যাং মেরে লোকটাকে ফেলে দেয়। সাথে সাথে দিথী নিজের পায়ের ভাঁজ থেকে ছুরি বের করে বিঁধে দেয় সেই লোকটার বুকে। দিথীর দিকে তেড়ে আসে আরো দু জন। দিথী ছুরিটা বুক থেক বের করেই এক ডিগবাজি দিয়ে সামনে এগিয়ে ছুরে মারে হাতের ছুরিটা। ছুরিটা গিয়ে বিঁধে একজনের গলায়‌। মুহুর্তেই পড়ে যায় সে মাটিতে। আরেকজন দিথীর দিকে এগিয়ে আসে। দিথীর দেহে তলোয়ার দিয়ে আঘাত করতে যায়‌‌। দিথী দৌড়ে গিয়ে এক উচু পাথরের উপর পা দিয়ে লাফিয়ে উঠে লোকটার মুখে এক জোড়ে ঘুষি মারে। লোকটার হাত থেকে তলোয়ার পড়ে যায়‌। দিথী ডিগবাজি দিয়ে মাটিতে নামে। নেমেই তার সামনের একজনের চোখে তার বড় নখ ওয়ালা আঙ্গুল ঢুকিয়ে দেয়। টেনে বের করে নেয় চোখ গুলা। পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখে একজন শাহারিয়ার পিছন থেকে আঘাত করার জন্য তার দিকে তলোয়ার নিয়ে ছুটে যাচ্ছে। দিথী সাথে সাথে তার কিছুটা সামনে থাকা তলোয়ার টা উঠিয়ে জোরে ছুরে মারে সেদিকে। তলোয়ার গিয়ে সেই লোকটার পাশ দিয়ে পেটে ঢুকে যায়‌। সে তৎক্ষণাৎ পড়ে যায়‌‌। আর ঠিক সেসময় তার হাতে থাকা তলোয়ারের ছোয়া লাগে শাহারিয়ার গায়ের শার্টের। শার্ট মাঝামাঝি কেটে যায়। দিথী তার সামনে আসা আরেকটাকে ঘায়েল করতে ছুটে যায়। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিতে এই দূই নর নারীকে যেনো কোন লড়াকু দুই সৈনিকের মতো লাগছে‌। 

 

শাহারিয়াকে এক লোক এক হকি স্টিক দিয়ে মারতে ছুটে আসে। শাহারিয়া এদিকে একজনকে ঘুষি মারতে মারতে তার বুকের পাজরের হাড় ভেঙে ফেলছিলো। তখনই সে টের পায় কেউ তার দিকে ছুটে আসছে‌। শাহারিয়া সাথে সাথেই উঠে পিছনে ফিরে। লোকটা হকি স্টিক দিয়ে শাহারিয়ার মাথায় আঘাত করতে যায়। তখনই শাহারিয়া এক চিৎকার দিয়ে সেই হকি স্টিকে সজোরে ঘুষি মারে। ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় সেই লোকটার হাতের শক্ত হকিস্টিক। শাহারিয়া যেনো জোশে এসে গিয়েছিলো‌। সে সাথে সাথেই লাফ দিয়ে উঠে লোকটার ঘাড়ের এক পাশে জোড়ে ঘুষি মারে। লোকটার ঐপাশের পাজর গুলো সব মটমট করে ভেঙে যায়। লোকটা ধপ করে মাটিতে পড়ে যায়। তখনই এক লোক যাকে দিথী এক ঘুষি মেরেই চলে গিয়েছিলো সে শাহারিয়াকে এসে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে। সে নিরস্ত্র ছিলো। শাহরিয়া তাকে ধরে সামনে আনতে থাকে। কিন্তু না, সে সামনে আসবেই না। শাহারিয়ার কনুই দিয়ে এক জোড়ে আঘাত করে তার পেটে। লোকটা কুকাতে কুকাতে শাহারিয়ার শার্ট ধরে পড়ে যায়। শাহারিয়ার গা থেকে শার্ট খুলে যায়। শুধু রয় সাদা সেন্ডো গেঞ্জি। তখনই মোটরসাইকেলে করে একজন ছুটে আসে তাকে চাপাতি দিয়ে আঘাত করতে। শাহারিয়া দৌড়ে গিয়ে জোড়ে সেই চলন্ত বাইকের সামনের চাকায় লাত্থি দেয়। আচমকা বাইক থেমে হাওয়ায় উঠে যায় বাইকার। শাহারিয়া এক চিৎকার দিয়ে বাইকের চাকা ধরে পুরো বাইকটাকেই ঘুড়িয়ে ছুরে ফেলে। উপরে উঠা পড়া লোকটার ঠিক মিটার বক্স বরাবর এক ঘুষি দেয়। ঘুষিতে পুরো থেতলে যায় সেই লোকের স্পর্শকাতর যায়গা। ধপ করে পড়ে যায় সে মাটিতে। ব্যাথায় তার পুরো শরীর বেঁকে যায়‌। শাহারিয়ার শরীরে যেনো বিদ্যুৎ চলে এসেছিলো। টেনে ছিড়ে ফেলে সে শরীরের গেঞ্জি টাকে। দূরে আরেকজনের সাথে ফাইট করতে থাকা দিথীর চোখ হঠাৎই শাহারিয়ার উপর পড়ে।  তার সারা শরীরে যেনো এক সিহরণ বয়ে যায়। শাহারিয়ার দেহের মাংসপেশী গুলো একদম পুরিপুষ্ট হয়ে উঠেছিলো। খাজ কাটা সেই ৬ প্যাক, চওড়া বুক, হাতের মাংস পেশি, সব কিছু থেকে যেনো দিথীর চোখ সড়ছিলোই না। দিথী নিজের অজান্তেই বলে উঠে, ‘ wow, Nice body men! ‘ বলেই সে যেটাকে ধরে ছিলো সেটার ঘাড় মটকে সেখানেই ফেলে দেয়। এদিকে আর তাকে মারার জন্য কেউ নেই। সে চারপাশ তাকিয়ে ছুটে যায় শাহারিয়ার দিকে, তাকে ফাইটে সাহায্য করার জন্য। 

 

শাহারিয়াকে একজন লাফিয়ে ঘুষি মারতে আসে, তখনই শাহারিয়া তার হাত ধরে তাকে এক তুড়িতেই আছড়ে ফেলে মাটিতে। দিথী দৌড়ে এসে মাটিতে উবুড় হয়ে পড়া সেই দেহের মেরুদন্ড বরাবর এক লাথি দেয়। টাস্ শব্দে মেরুদন্ডের হাড় ভেঙে দু টুকরো হয়ে যায়। দিথী শাহারিয়া দুইজনই উঠে দাঁড়ায়। দিথী শাহারিয়ার ঢাল তূল্য বুকে থাপ্পড় মেরে বলে, ‘ সুন্দর আছে কিন্তু! ‘ 

শাহারিয়া একটা ছোট্ট হাঁসি দিয়ে সামনে তাকায়। আর মাত্র তিনজন বাকি। দিথী শাহারিয়া একে অপরের দিকে তাকায়। মাথা নাড়িয়ে ‘হ্যা’ সূচক ইঙ্গিত দিয়েই দৌড়ে যায়। 

 

শাহারিয়া একটার হাত ধরে তাকে জোড়ে ঘুরাতে শুরু করে। দিথী সেই ঘুরন্ত দেহটায় সজোরে তলোয়ার ঢুকিয়ে দেয়। পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জনের যেনো ভিতরটা কেঁপে উঠে। ভয়ে দু জন আর আসতে চায় না এদের মারতে। তারা তাড়াতাড়ি বাইক দাড় করিয়ে পালিয়ে যেতে নেয়। দিথী সাথে সাথেই লোকটার দেহ থেকে তলোয়ার বের করে ছুঁড়ে মারে সেই দুইজনের দিকে। তলোয়ার এসে বাইকের চাকা ভেদ করে ইন্জিনে গিয়ে ঠেকে। দিথী শাহারিয়া দৌড়ে যায়। 

বাইক থেমে যাওয়ায় লোক দুটো বাইক ফেলেই পালিয়ে যেতে নেয়, তখনই দিথী দৌড়ে এসে শাহারিয়ার দুই কাঁধের উপর ভর দিয়ে লাফিয়ে উঠে ডিগবাজি খেয়ে সেই দুই বাইকারের বুকে সজোরে ঘুষি মারে। মাটিতে ছিটকে পড়ে সেই দুইজন। একজন গিয়ে পড়ে এক ভাঙা বাইকের উপর। তার পেট ভেদ করে এক লোহা ঢুকে যায়। সেখানেই তার মৃত্যু হয়। আরেকজন মাটিতে পড়ে ব্যাথায় ছটফট করতে থাকে বুকে হাত দিয়ে। দিথী পায়ে হিল জুতো ছিলো। যদিও অতটা উঁচু না, তবুও এই লাত্থি তার বুকের অবস্থা যে খারাপ করে দিছে তা তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। শাহারিয়া আর দিথী এসে দাঁড়ায় লোকটার সামনে। লোকটা হাত জোড় করে ক্ষমা চাইতে থাকে। ওকে ছেড়ে দিতে বলে। শাহারিয়া হাঁটু গেড়ে হেলে বসে। লোকটার গাল দুটো চেপে ধরে। রাগে কটমট হয়ে বলে,  ‘ কে পাঠিয়েছে তোদের! কে পাঠিয়েছে! ‘

‘ আমি, আমি জানিনা। আমি জানিনা। ‘

দিথী বলে উঠে, ‘ ও এমন ভাবে মুখ খুলবে না।‌ জানোয়ারের বাচ্চাটাকে আরো আদর করা লাগবে। ‘

বলেই দিথী চারপাশে হন্ন হয়ে খুঁজতে থাকে কিছু। দূরেই এক হকি স্টিক দেখতে পায়। তাড়াতাড়ি গিয়ে সেই হকি স্টিক নিয়ে এসেই লোকটার পায়ে সজোরে মারতে থাকে। লোকটা ব্যাথায় চিৎকার করে উঠে। তাকে ছেড়ে দিতে বলে। তখনই দিথী হকি স্টিক টা উঠিয়ে তার বুকের উপর এক সজোরে আঘাত করে। এতো জোড়ে আঘাত করে যে ব্যাট টাই দু টুকরো হয়ে যায়। লোকটা চিৎকার দিয়ে উঠে। শাহারিয়া তার গাল গুলো আবার চেপে ধরে। দাঁত কটমট করে বলে, ‘ বল কে পাঠাইছে, নাইলে কিন্তু এখন আমি আদর করা শুরু করবো। ‘

‘ সুলতান, সুলতান ভাই। ‘ 

‘ সুলতান ভাই! ‘

তখনই দিথী লোকটার মুখে পাড়া দিয়ে ধরে। ওর মাথায় যেনো জিদ উঠে গেছিলো। শাহারিয়ার লোকটাকে ছেড়ে দেয়। দিথী তার জুতো দিয়ে একের পর এক আঘাত করে লোকটার মুখে। ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় তার মুখ।‌ ছটফট করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে সে। দিথী ক্ষান্ত হয়। তার মুখে হাসি ফুটে উঠে। তার এবার ভালো লাগছিলো। ও প্রথম প্রথম যে বলছিলো “জানেনা”, এইজন্যই দিথীর মাথায় রক্তটা বেশি উঠে যায়। দিথী লোকটাকে ছেড়ে এসে শাহারিয়ার পাশে দাঁড়ায়। শাহারিয়া বলে, ‘ মনের আশা মিটছে! ‘

‘ হ্যা। মিটছে।‌’ 

বলেই দিথী শাহারিয়ার দিকে ফিরে তাকায়। তখনই তার চোখে পড়ে শাহারিয়ার শরীরটা। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হওয়ায় তার দেহ ভিজে গিয়েছিলো। প্যাক গুলো বেশ চমৎকার লাগছিলো। দিথী এগিয়ে এসে ৬ প্যাকের উপরে লেগে থাকা কিছু রক্ত মুছে দেয়। বলে, ‘ এইবার আরো জোশ লাগতেছে। ‘ 

‘ তুমি এইজন্য ফাইট করার সময় খালি আমার দিকে তাকাচ্ছিলা! ‘

‘ তোমার একইরকম শরীর আমি আগে কখনোই দেখিনি! আজ হঠাৎ কই থেকে আসলো! ‘

‘ তুমি আমাকে খালি গায়ে দেখোই বা কখন। রাতে। ঐসময় অন্ধকারে আর কতটুকুই বা দেখো। আর এখন একটু জোশে চলে গেছিলাম, এইজন্য শরীর আসল রূপে তাড়াতাড়ি আসছে।’

দিথী শরমে জিহ্বা কামড়ে অন্যদিকে ফিরে তাকায়। আসলেই তো রাত ছাড়া শাহারিয়াকে খালি গায়ে সে তেমন একটা দেখেই নি। রাত জাগা সেই কথা গুলো মনে পড়তেই দিথীর মুখ লজ্জায় লাল হয়ে যায়। শাহারিয়া মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলে, ‘ওপাশে ফিরলা যে! ‘

দিথী ফিরে তাকায়। বলে, ‘ তুমি কী আমাকে লজ্জা দিয়ে দিয়ে মেরে ফেলবা। এভাবে করে কেউ বলে! ‘

‘ আমি আবার কী বললাম। আমি তো শুধু রাতের……… ও হো হো। এইটা শুনে লজ্জা পাইছো! ওরে আমার লজ্জা বাতীরে! বিয়ের প্রথম প্রথম তোমার লজ্জা কই ঘুরতে গেছিলো! ‘

দিথীর নাক ধরে তাকে নাড়ায় শাহারিয়া। দিথী শাহারিয়াকে আলতো করে ধাক্কা মারে। ‘ যাও। এভাবে বলিও না।‌ ‘

‘ তো! তো কীভাবে বলবো! ‘

তখনই হঠাৎ একজন লোকের পকেট থেকে ফোন বেজে উঠে। শাহারিয়া আর দিথী ফিরে তাকায়। এটা সেই লোকটাই ছিলো যার মুখে দিথী একটু আগে নিজের ক্রোধ মিটিয়ে আসলো। শাহারিয়া এগিয়ে যায়। হেলে ফোনটা বের করে সেই লোকের পকেট থেকে। একটা নাম্বার থেকে কল এসেছে। দিথী এসে শাহারিয়ার পাশে দাঁড়ায়। শাহারিয়া একবার ফিরে দিথীর দিকে তাকায়, আবার সামনে ফিরে ফোনের দিকে তাকায়। ফোনটা রিসিভ করে কানে তুলে। ওপাস থেকে ভেসে আসে এক লোকের কন্ঠস্বর। 

‘ মুরাদ। ঐ দুইটাকে মারছিস! ‘

‘ তোর মুরাদ এখন পরপারে পারাপার হয়ে গেছে। ‘

‘ কে তুই! মুরাদের ফোন তোর কাছে কেনো! ‘

‘ আমি কে! আমি সেই, যাকে তুই মারতে পাঠাইছিলি। ‘

‘ শাহারিয়া! তুই, তুই বেঁচে আছিস কী করে। মুরাদ না তোকে…..’

‘ মুরাদ আমাদের আদরের সামনে, ছোট্ট শিশু। ভয়ে তো আরো বাইক নিয়ে পালাচ্ছিলো।‌ কিন্তু ও তো জানেনা যে কোন জোড়ার উপর ও হাত দিছে। একদম দুইজনে মিলে কাটিং টু ফিটিং করে দিছি তোর মুরাদ কে।’

‘ এতো গুলা লোক পাঠাইলাম। ওরা সব….’

‘ কাটিং টু ফিটিং হয়ে গেছে। একদম ঝাক্কাস করে।‌ ‘ 

সুলতান ক্রোধে ফেটে পড়ে। বলে, 

‘ আমি, আমি তোকে যদি না মারছি, আমার নামও সুলতান না। ‘

তখনই দিথী পাশ থেকে বলে উঠে, 

‘ আকিকার জন্য গরু রেডি রাখিস। নাম টা আমরা গিয়ে বদলে দিয়ে আসবো। ‘

‘ এই, এই তুই কে? ‘

‘ আকিকা স্পেশালিস্ট। যারা যারা নাম বদলাতে চায় তাদের নাম যত্ন সহকারে বদলে দিয়ে আসি। আর সাথে তো জামাই আদর ফ্রি!’

‘ তোদের দুইটারেই আমি দেখে নিবো। ‘

‘ ঠিকানাটা দে, গিয়ে দেখা দিয়ে আসি! ‘

‘ খুব তেজ না! তোর তেজ আমি ছুটাবো। সময়মতো ছুটাবো।’

‘ আরে যা যা। ‘

ফোনটা কেটে যায়। শাহারিয়া ফোনটা কান থেকে নামায়। উঠে দাঁড়ায়। দিথী বলে, ‘ কে এই সুলতান! ‘

‘ এটা তো ওর কাছে যাওয়ার পরই বুঝা যাবে। ‘

‘ বাড়ি ফিরবো কীভাবে।‌ (পিছনে ফিরে) রোমানকে তো ওরা মেরে ফেলছে। ‘

‘ আমরা গাড়ি চালিয়ে ফিরবো। (থেমে) কামিজ তো রক্ত দিয়ে মাখিয়ে লাল করে দিছো।’

‘ কামিজ বাদ দাও। তোমার শরীর এভাবে উদ্যম রাখিও না।‌ দাঁড়াও। ‘

বলেই দিথী তার কোমর থেকে ওড়নার বাঁধন খুলতে থাকে। ওড়নায় তেমন একটা রক্ত লাগেনি। দিথী ওড়না খুলে হাতে নেয়। শাহারিয়া অবাক হয়। বলে, ‘ কী করছো!’

‘ কী করতেছি দেখতে থাকো। ‘

দিথী ওড়নাটাকে মেলে শাহারিয়ার শরীরকে ভালোভাবে সেই ওড়নাটা দিয়ে জড়িয়ে দিতে থাকে। বলে, ‘ তোমাদের লোকদের আসতে বলো। এই লাশ গুলাকে নিয়ে যাক। এগুলারও হার্ট, কিডনি বেঁচে দিতে পারবা।’

‘ রঞ্জুর বউ তো দেখি রঞ্জুর অনুপস্থিতিতে তার সাম্রাজ্য সামালোর উপযোগী হয়ে গেছে। কী সুন্দর ফাইট পারে, বুদ্ধিও তো চমৎকার। ‘

‘ তোমার চেয়ে বেশি বুদ্ধি আমার ঘটে নাই। ‘

শাহারিয়া হাসে। দিথী শাহারিয়াকে শাড়ির মতো করে ওড়না পেঁচিয়ে দেয়। শাহারিয়া নিজেকে একবার দেখে। তারপর দুই হাত কোমরে দিয়ে দিথীকে বলে, ‘ এটা কী করছো! ‘

‘ কী করলাম! (ওড়না আরেকটু টেনে দিয়ে) ঠিকই তো আছে। তোমার শরীর আর দেখা যাচ্ছে না। ‘

‘ আমাকে তো শাড়ি পড়ায় দিছো মনে হচ্ছে। এইযে আঁচল, এইযে কোমর। আমি কী মেয়ে নাকি! ‘

‘ হ্যা আপু। আপনি মেয়ে।‌ এখন আসেন, গাড়িতে বসে দুইজন মিলে আলাপচারিতা করি। ‘

শাহারিয়ার দিথীর মুখের কাছে এসে ধীর গলায় বলে,

‘ খালি আলাপ চারিতা করলে হয়, অন্য কিছু করা যায় না! ‘

‘ মাইর দিবো। চলো। মেয়ে বানায় দিছি মেয়ের মতো থাকবা।‌ ছেলে হওয়ার চেষ্টা করবা না। ‘

‘ ইয়ে জওয়ানি হ্যায় সেরফ অর সেরফ রোমান্টিক হোনে কে লিয়ে। সামঝা নাদায়েক লাড়কি! ‘

‘ হা সামাজ গেয়া। আব চালো ‘

দিথী শাহারিয়া দুইজনই হেসে উঠে। চলে যেতে থাকে গাড়ির দিকে। যাওয়ার সময় শাহারিয়া এক হাত কোমরে দিয়ে আরেক হাত মাথায় দিয়ে ছোট্ট করে নাচ দেখায় দিথীকে। দিথী তো হাঁসতে হাঁসতে শেষ। দুইজন মিলে বেশ মজা করে। ৩ দিন পর এমন প্রাণ খুলে হাসলো শাহারিয়া আর দিথী। শোকে কাতর দুই ব্যাক্তিত্ব এখন এই খোলা হাওয়ায় ডানা মেলে উড়ছে। এই টুক খুশি যেনো জীবনের বড় এক ট্রমার পর তাদের দুইজনেরই খুব দরকার ছিলো। আর তা আজ, এই উছিলায় হয়ে গেলো। 

 

বৃষ্টি এখন থেমেছে। আকাশের মেঘ কেটে যাচ্ছে। রোদ এসে পড়েছে এই ফাঁকা উদ্যানে। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে মৃতদেহ। দূরে গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে দুই নর নারী হাসি ঠাট্টায় মেতে উঠেছে। তাদের খুনসুটিতে চারপাশের পরিবেশ উৎজীবিত। দূরের পাহাড়ের কোল ঘেঁষে থাকা মেঘদ্বয় উড়ে চলে যায়, উড়ে চলে যায় অন্য কোন দম্পতিকে খুশির ধারায় ভিজিয়ে দেওয়ার জন্য।  

 

চলবে ,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

 

( দুঃখিত আজকের পর্ব টা ২ ঘন্টা লেট করে দেওয়ার জন্য। কাল কিছু সমস্যার কারণে লেখতে পারিনি। তাই আজ দু পর্ব দিয়েছি। দু পর্ব মিলিয়ে মোট শব্দ সংখ্যা ৯২৭৪। আর আজ গল্পে আসা নতুন দুই চরিত্র হচ্ছে নাঈম স্যার আর সুলতান। নাঈম স্যারকে যদিও আমি আগের প্রথম দিকের পর্ব গুলায় দেখিয়েছিলাম। আর আপনারা দ্বিধায় যাতে না পড়েন তাই আগেই বলে রাখছি গল্পের মূল ভিলেন জুডাস, মোসাদের হেড অথবা সিমরান। এই তিনজনের মধ্যে একজন হবে। আজকে আসা সুলতান নামক চরিত্রটা ক্ষণস্থায়ী। তবে গল্পে তার অনেক বড় একটা ভূমিকা আপনারা সামনে দেখতে পাবেন। অবশ্য আজও সে কিছু ভূমিকা রেখেছে। ভূমিকা রেখেছে শাহারিয়া আর দিথীকে শোক থেকে বের করে হাসি খুনসুটিতে মাতাতে। গল্প কেমন হচ্ছে কমেন্টে জানাতে ভুলবেন না কিন্তু। আপনাদের কমেন্টের উপরই বলতে গেলে গল্পের অনেক কিছু নির্ভর করে। চরিত্রের ভূমিকা, বিভিন্ন চিত্রনাট্য বন্টন ইত্যাদি ইত্যাদি। কালও পর্ব পাবেন ❤️)

 

গল্প নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা করুন আমার গ্রুপে।

গ্রুপ লিংক 👇

https://www.facebook.com/groups/743016887019277/?ref=share_group_link

 

উপন্যাস :: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন :: ২(মুখোশ)

পর্ব :: ৯২

লেখক :: মির্জা সাহারিয়া

 

উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন:: ২(মুখোশ)

পর্ব:: ৯৩

লেখক:: মির্জা শাহারিয়া

 

বেলা ১২ টা। হালকা রোদ উঠোনে এসে পড়ছে। বাতাস কম। দূরে মেঘ করেছে। আকাশের রোদ মাঝে মাঝে মেঘের আড়ালে লুকোচুরি খেলছে। 

রাশেদ ঘর থেকে বের হলো। পড়নে লুঙ্গি আর ছেঁড়া সেন্ডো গেন্জি। রাশেদ আঙিনায় নেমে আঙিনার রশিতে শুকোতে থাকা গামছাটা কাঁধে নিয়ে হাঁক দিয়ে শম্পাকে ডাকতে থাকে, ‘ শম্পা! শম্পা! আমার লুঙ্গিটা কই! ‘

শম্পা রান্না ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। হাতে গামলায় আলুর ভর্তা মাখাচ্ছিলো সে। রান্নাঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলে, ‘ কোনডা, সাদাডা না নীলডা? ‘

‘ সাদাটা কোথায়? ‘

‘ ঐডা আমি আলনায় গুছায়া রাখছি। খারান আইতাছি। ‘ বলেই শম্পা রান্না ঘরের ভিতরে চলেই যায়। রাশেদ দুই হাত কোমড়ে দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে‌। ছোট্ট এক দমকা হাওয়া বয়ে যায়‌‌। রাশেদ হাওয়ার বিপরীতে ফিরে দাঁড়ায় যাতে ধূলোবালি চোখে না পড়ে। শম্পা রান্না ঘর থেকে কামিজে হাত মুছতে মুছতে বেড়িয়ে আসে। শম্পা রাশেদের কাছে আসতেই রাশেদ বলে, ‘ ্কাপড় গুলা ভিতরে নিয়ে নেও। যখন তখন বৃষ্টি নামতে পারে। ‘

‘ জে আইচ্ছা। ‘

শম্পা আঙিনার রশিতে ঝুলতে থাকা তার আর সাথী বেগমের কামিজ টেনে হাতে নিয়ে নেয়। চলে যায় ঘরের দিকে। রাশেদ এগিয়ে আঙিনার কোনে গিয়ে দাঁড়ায়। সেখানে থাকা কোদাল টা নেড়ে দেখতে থাকে। কোদালের হাতলটার মাটি ঝেড়ে দেয় হাত দিয়ে। 

শম্পা ঘর থেকে লুঙ্গি নিয়ে বেড়িয়ে আসে। বারান্দার খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে বলে, ‘ এইডা না! ‘

রাশেদ ফিরে তাকায়। বলে, ‘ হ্যা এইটাই। নিয়ে আসো। ‘

শম্পা বারান্দা থেকে আঙিনায় নেমে চলে যায় রাশেদের দিকে। গিয়ে তাকে লুঙ্গিটা দেয়। রাশেদ লুঙ্গি নিয়ে কাঁধে ঝুলিয়ে বলে, ‘ভাত রান্না হইছে! ‘

‘প্রায় হইয়া গেছে। একটু পর মাড় ফালামু। ‘

‘ওহহ। আমি ভাত খেয়ে একটু গন্জের দিকে যাবো। দেখি কোন কাজের সন্ধান করতে পারি কি না। ‘

‘ আইচ্ছা। ‘

রাশেদ কাঁধে লুঙ্গি গামছা নিয়ে চলে যায় রান্না ঘরের পাশে থাকা টিউবওয়েল পাড়ের দিকে। টিউবওয়েল পাড়টা সিংজার বেড়া দিয়ে ঘেরা। পাশে দুই-তিনটে কলা গাছ। রাশেদ কলে পাড়ে গিয়ে টিউবওয়েল চেপে বালতি ভরতে থাকে। 

শম্পা চলে আসে বাড়ির আঙিনায়। বাড়িটা যেহেতু কাঁচা, বারান্দাটাও তাই মাটির বানানো। উপরে টিনের চালা ঘর থেকে বারান্দার উপর কিছুটা টানা। শম্পা বারান্দায় এসে বারান্দায় টানানো রশি গুলায় আঙিনা থেকে আনা কাপড় গুলো মেলে দেয়। বেশ অনেকটাই শুকিয়েছে। তবে এখনো কোন গুলো একটু ভেজা ভেজা লাগছে। 

 

বাইরে বাতাস বাড়তে থাকে। আকাশ মেঘে ছেয়ে যায়। একটু আগের রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশ নিমেষেই যেনো মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে। ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন সাথী বেগম। শম্পা কাপড় গুলো মেলে দিয়ে বারান্দার খুঁটি ধরে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করছিলো। সাথী এসে শম্পার পিছনে দাঁড়িয়ে তার কাঁধে হাত রাখেন। শম্পা পিছনে ফিরে তাকায়। সাথী বেগম বলেন, ‘ গোসল খানায় কে? ‘

‘ গোসল খানায় তো উনি গেছেন গোসল করতে। আপনিও গোসল দিবেন! ‘

‘ হ্যা। কাল গোসল করিনি। আজও না করলে তখন হাঁসফাঁস লাগবে। ‘

‘ ওহ। আইচ্ছা উনি বাইর হোক। তারপর আপনে যাইয়েন। ‘

‘ রাশেদ আজ কাজে যায়নি! ‘

শম্পা ফিরে বলে, ‘ না। আইজ কাজ পায় নাই। যার ক্ষেতের ধান কাটতো একয়দিন, হের সব ধান কাটা শ্যাষ। এহন তাই আর যায় নাই। ‘

‘ টাকা গুলা দিয়েছিলে! ‘

‘ টাকাডি! হ। আমি কাইল রাইতেই হেরে দিয়া দিছিলাম। ‘

‘ কিছু বলছিলো! ‘

‘ প্রথমে নিতে চায়নাই, পড়ে নিছে। ‘

সাথী বেগম আরেটু কাছে এসে দাঁড়ান। শম্পা মাথা বাড়িয়ে মেঘলা আকাশ, দমকা বাতাস দেখছে। সাথী বেগম বলেন, ‘আচ্ছা রাশেদ তোমাকে কী চোখে দেখে! বোন, না অন্য কিছু! ‘

শম্পা ফিরে তাকায়। বলে, ‘ হঠাৎ এই কথা! ‘

‘ না মানে ও তোমার প্রতি খুব সংবেদনশীল। আমি একয়দিনে যা দেখলাম আরকি। ‘

শম্পা সামনে তাকায়। বলে, ‘ আমি জানিনা। তয়, আমি যতদূর বুঝি, হেয় আমারে বইনের চোহেই দেহে। ‘

‘ আর তুমি! ‘

শম্পা ফিরে তাকায়। তার চোখ কিছুটা অস্থির। বারবার দৃষ্টি অন্যদিকে নিচ্ছে। সাথী বলেন, ‘ ভালোবাসো! ‘

‘ জানিনা। ‘

‘ ওর কিন্ত বিয়ের বয়স হইছে। আর তুমি একটা কুমারী মেয়ে। এভাবে এক বাড়িতে…. সমাজ কিন্তু ভালো চোখে দেখবেনা। ‘

‘ কিন্তু উনি তো আমারে নিজের বইন বইলা সবার ধারে পরিচয় দিছেন। ‘

‘ পরিচয় দিলেও, লোকজন আসল ঘটনা জানে। যে তোমায় ও রেলস্টেশন থে