উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন :: ২(মুখোশ)

পর্ব :: ৬১

লেখক :: মির্জা শাহারিয়া

 

৫ তারকা হোটেলর ভিতর প্রবেশ করলো রায়হান আর নিপা। এইটা নিচ তালা। চারপাশে বেশ কয়েকজন বসে আছে। কেউ ফোন দেখছে, কেউবা পেপার পড়ছে। রায়হান একহাতে নিপার হাত ধরে আরেকহাতে লাগেজ ধরে এগিয়ে যায় রিসিপসনের দিকে। চারপাশ বেশ সৌন্দর্যমন্ডিত। দূরে দেওয়ালে ৫ টা ঘড়ি বিভিন্ন দেশের সময় দেখাচ্ছে। রায়হান এসে রিসিপসনের সামনে দাঁড়ায়। রিসিপসনের ওপাশে থাকা এক কালো কোর্ট পরিহিত হোটেল ইম্পয়ি বলে উঠে,

– আসসালামুয়ালাইকুম স্যার। হোটেল ইম্পেরিয়াল এ আপনাদের স্বাগতম। 

– ওয়ালাইকুমুস সালাম। আমি আজ সকালে অনলাইনে একটা রুম বুক করে রেখেছিলাম। ইউজার নেইম রায়হান খাঁন দেওয়া। 

– জ্বী স্যার। আমি এখুনি চেক করছি‌।

হোটেল ইম্প্লয়ি তার সামনে থাকা কম্পিউটারে কিছু একটা টাইপ করে। রায়হানের হাত ধরে থাকা নিপা চারপাশ মাথা ঘুড়িয়ে দেখছে। আশপাশ বেশ গোছানো আর সাজানো। ৫ তারকা হোটেল। এখানে থাকা নিশ্চই বেশ ব্যায়বহুল হবে ,,! 

ইম্প্লয়ি কম্পিউটার চেক করে বলে,

– হ্যা স্যার। আপনি একটা সিঙ্গেল বেডের রুম বুক করেছিলেন। (একটু নিচে হেলে একটা কার্ড বের করে রায়হানের হাতের দিকে এগিয়ে দিয়ে) এই নিন স্যার, রুম নং ২০২ এর চাবি। 

– থ্যাংকস। 

– ইউ আর ওয়েলকাম স্যার। (মাথা ঘুরিয়ে একটু ডান দিকে নিয়ে আওয়াজ বাড়িয়ে) এই রতন ,,! স্যার দের ল্যাগেজ ২০২ এ দিয়ে আয়। (রায়হানের দিকে ফিরে) হ্যাভ এ নাইস টূর স্যার এন্ড ম্যাডাম। 

– হমম। 

একজন হোটেল কর্মী এগিয়ে আসে। এসে রায়হানের পাশে থাকা ব্যাগ টা হাতে নেয়। চলে যেতে থাকে সিড়ির দিকে। রায়হান নিপার হাত ধরে। তারা দুইজন চলে যেতে থাকে লিফটের দিকে। 

 

দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করে রায়হান। তার পিছু পিছু ঘরে আসে নিপা। হোটেল কর্মী তাদের ব্যাগ টা রুমে রেখে দিয়েই চলে যায়। রুমটা বেশ গোছানো ছিলো। একটা বড় বেড। তার সামনাসামনি বিপরীত পার্শ্বের দেয়ালে একটা বড় টিভি লাগানো। বিছানার পার্শে একটা টেবিল। সেখানে কিছু বইয়ের শো পিস রাখা। বিছানার মাথার পার্শে উপরের দেয়ালে একটা বড় চিত্রকর্ম আঁকা। নিপা চারপাশে ঘুরে ঘুরে রুমটা দেখছে। রায়হান দরজা লাগিয়ে দিলো। নিপা রুম দেখতে দেখতে হাসি মুখে বলে,

– রুমটা অনেক সুন্দর,,! 

– হ্যা। ঐযে ঐদিকে ব্যালকনি আছে। গিয়ে দেখো। ভালো একটা ভিউ পাবে সমুদ্রের। 

নিপা রায়হানের কথা শুনে সেদিকে এগিয়ে যায়। ব্যালকনির দরজা সম্পূর্ণ গ্লাসের। সে দরজা দুটোকে টেনে খুলে। একটা ছোট্ট ব্যালকনি বারান্দা। সে ব্যালকনি থেকে দাঁড়িয়ে সামনে তাকানো মাত্রই অবাক হয়ে যায়। এখান থেকে সমুদ্র সৈকত বেশ দারুন ভাবে উপভোগ করা যাচ্ছিলো। তারা ৪ তালায়। এই হোটেল টার সামনে কিছু ছোট ছোট দোকান আর তারপরই সমুদ্রের পাড় শুরু। সমুদ্রের ঢেওয়ের শব্দ এখান থেকে শোনা যাচ্ছে। 

সময় টা সন্ধ্যা। সূর্য ডুবতে শুরু করেছে। নিপা তাড়াতাড়ি রায়হানকে ডাক দিলো এখানে আসার জন্য। রায়হান ব্যালকনিতে চলে আসে। নিপা তার হাত ধরে টেনে তার পাশে দাঁড় করায়। আনন্দ মুখ নিয়ে বলতে থাকে। 

– দেখো দেখো সূর্যটা ডুবে যাচ্ছে ,,! 

– হ্যা। দারুন টা দৃশ্য টা ,,! 

 

নিপা রায়হানের হাত জড়িয়ে ধরে। তার হাতের মাংসপেশিতে আলতো করে মাথা রাখে। ধীর গলায় বলে,

– তুমি যে পাশে আছো, তাই এই সূর্যাস্ত আরো বেশি সুন্দর লাগছে। 

রায়হান একটা ছোট্ট হাসি দেয়। নিপার কপালে চুমু খায়। নিপার মাথায় তার মাথা রেখে বলে,

– আমার মিষ্টি বউটা ,,! 

 

দুইজনেই সূর্যাস্ত উপভোগ করতে থাকে। আকাশ খানা হলদেটে বর্ণ ধারণ করেছে। থালার মতো সূর্য টা সমুদ্রের মাঝে যেন ডুবে যাচ্ছে। সেই অর্ধ ডুবন্ত সূর্যের সামনে দিয়ে কিছু নিড়ে ফেরা পাখি উড়ে যায়। সূর্য ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ টা ডুবে যায় সমুদ্রের অতলে। 

 

    ঘরে চলে আসে দুজনেই। নিপা এসে বিছানায় বসে। বিছানার তোশকটা একদম নরম, তুলতুলে। রায়হান এসে নিপার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে থাকে,

– যাও, ফ্রেশ হয়ে নাও। অনেকটা রাস্তা জার্নি করলে তো। 

– তুমি যাও আগে। আমি এখানে একটু বসে থাকবো। এই বিছানায় শুতেও নিশ্চয়ই অনেক আরাম পাওয়া যাবে। 

বলেই গা এলিয়ে দেয় নিপা। চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে। রায়হান বলে,

– তাইলে আমি গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসি আগে। 

নিপা মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলে। শুয়ে এক দৃষ্টে চেয়ে থাকে রায়হানের দিকে। রায়হান তার পকেট থেকে ফোন বের করে। বের করে অন করার চেষ্টা করে। কিন্তু ফোন বন্ধ। রায়হান ফোনটাকে বিছানার উপর ফেলে দিয়ে বলে,

– চার্জে দিয়োতো। বাসা থেকে বের হওয়ার সময়ই ১২% ছিলো। এখন একদম বন্ধ হয়ে আছে। বাবাকে ফোন দিয়ে বলতাম যে আমরা পৌছাইছি। 

– আমার ফোনটা আছে তো। ঐটা দিয়ে ফোন দাও। 

– তোমার টায় তো নতুন সিম। আমার আর তোমার বাড়ির লোকদের নাম্বার ছাড়া কারো নাম্বার নাই। আর আমার তো বাবার নাম্বার টাও মুখস্থ নাই। 

– আচ্ছা আমি চার্জে দিচ্ছি। পরে ফোন অন হইলে কল দিয়ো। 

– ঠিক আছে। 

রায়হান চলে যেতে থাকে ওয়াশরুমের দিকে। রুমের সাথে এটাচ ওয়াশরুম আছে। রায়হান ওয়াশরুমের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলো। 

 

নিপা বিছানা থেকে উঠলো। এভাবে শুয়ে থাকলে তো হবে না। রাত হয়ে যাচ্ছে। রায়হান বেড়োলে তাকেও ফ্রেশ হয়ে নিতে হবে। বাস জার্নি আগে এতোটা করেনি সে। সেই দিনাজপুর থেকে কক্সবাজার। এতোটা রাস্তা বাস জার্নি করে কিছুটা খারাপ লাগছে এখন। তখন সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে ক্লান্তিটা যেন এক মুহুর্তের জন্য হলেও উধাও হয়ে গিয়েছিলো। তবে এখন বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়ায় মাথাটা কিছুটা ধরেছে। 

নিপা গিয়ে ফ্লোরে থাকা ব্যাগ টা নিলো। ব্যাগ টা সোজা করে চেইন খুললো। এখন গোসল করে কী পড়া যায় সেটা খুঁজছে সে। একটা থ্রী পিস বের করে নিলো। শাড়ি এনেছে একটা। তবে এখন শাড়ি পড়ার আর সামলানোর মতো এনার্জি বা ইচ্ছা কোনটাই তার নেই। 

নিপা এক সবুজ থ্রী পিস বের করে নিলো। তখনই তার চোখ গেলো সেই কাপড়ের বক্সটার উপর। এটা সবার শেষে ব্যাগে ঢুকাইছিলো তাই উপরের দিকেই ছিলো। নিপা তা দেখা মাত্রই লজ্জায় লাল হয়ে যায়। পিছনে ফিরে ওয়াশরুমের দিকে দেখে। রায়হান এখানো ভিতরেই আছে। নিপা আবার সামনে তাকায়। কাপড়ের বক্সটা বাকি কাপড়ের ভিতরে ঢুকিয়ে রাখে। বিরবির করে বলে,

– রায়হানের একদম লজ্জা নাই। খালি এসব হাতে পাইলেই হইছে। আমাকে না পড়ায় আর ছাড়বেনা। (একটু থেমে নিজের মাথা নিজেই ধরে) আর তুই এতো লজ্জা পাইতেছিস ক্যান,,! ও তো তোরই জামাই ! অন্য লোক তো না !  ধ্যাত ,,! 

নিজের মাথায় নিজেই হাত দিয়ে থাপড় দিয়ে ব্যাগের চেইন আটকিয়ে রেখে দিতে থাকে সে। লজ্জায় মুখ খানা তার এখনো লাল টুসটুসে হয়ে আছে। থ্রী পিস হাতে নিয়ে উঠে পড়ে। চলে যায় বিছানার দিকে। 

 

_____

 

সন্ধ্যা তারার নিচে বসা দুই পাগল পাগলী কথা বলছে একে অপরের সাথে। আকাশ আজও বেশ পরিস্কার। হালকা জোছনা পড়েছে। সুমু দুটো রুটি হাতে এদিকেই এগিয়ে আসছে। পড়নে লায়লার জামাটা। মুখে ওড়না দেওয়া। কাল রাতে ও লায়লার কাছ থেকে টাকা চেয়ে নিয়েছিলো। লায়লা তার কাছে থাকা ৫০ টা টাকা সুমুকে দিয়েছিলো। সেটা দিয়েই আজ সে দুটো রুটি কিনেছে। এই পাগল পাগলির একে অপরের প্রতি ভালোবাসাটা যেন আবারো তার দেখতে মন চাইছে। 

 

পাগলীর মাথা থেকে উকুন বেছে দিচ্ছিলো পাগলটা। আলো নেই তেমন। এদিকটা অন্ধকার। তবুও তারা নিজেদের মন মতো কাজ করছে। সুমু এসে তাদের পাশে দাঁড়ায়। মুখের উপর থেকে ওড়না খানা সড়াবার আগে পিছন ফিরে আশপাশটা ভালোভাবে দেখে নেয়। সামনে ফিরে তাদের দিকে রুটি দুটো এগিয়ে দেয় সে। মুখের ওড়না খানা নামানো মাত্রই পাগল পাগলী চিনতে পেরে যায় সুমুকে। পাগলী পাগলকে বলে,

– রাজা,,! এইডা কাইলকার মাইডা না ,,! দেখ আবার আইছে আমাগো লাইগা রুটি নিয়া। 

– হ রাণী। এইডা কাইলকার ঐ মাইয়াডাই। 

– আজ দুটো এনেছি তোমাদের জন্য। হয়তো তোমাদের সম্পূর্ণ খুদা মিটবে না। আমি লায়লাকে আজ বলবো ভাত বেশি করে আনতে। রাতে এসে তোমাদেরও ভাত দিয়ে যাবো। কেমন ! 

– রাজা, মাইয়াডা আমাগো ভাতও দিবো। মাইয়াডার মন অনেক ভালা, তাইনা রাজা ,,! 

– হ রাণী। তুমি ঠিক কইছো। মাইয়াডার মন অনেক ভালা। সবাই যদি এমন কইরা আমাগোর লগে কথা কইতো ,,! (মন খারাপ করে) ঐ দোকানদার গুলা খালি আমাগোরে মারতে আহে‌। 

– আচ্ছা আর মারবেনা। নাও। রুটি গুলা খাও। 

দুই পাগল পাগলী রুটি দুটো হাতে নেয়। পাগলীটা তার রুটি টা পাগলের রুটির সাথে বদলে নেয়। মুখে হাসি। পাগলটাও তার টা দিয়ে পাগলির টা নেয়। প্যাকেট থেকে বের করে দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেতে খেতে থাকে তারা। লায়লা তাদের পাশেই হাঁটু গেড়ে বসা। এদিকের ২-৩ টে দোকান বন্ধ থাকায় পাগল পাগলী দুটোর এদিকটায় আশ্রয় হয়েছে। নাইলে তাদের এখান থেকেও হয়তো কেউ না কেউ খেদিয়ে দিতো। 

সুমু বলে,

– আচ্ছা যখন বৃষ্টি হয়, তখন তোমরা কোথায় থাকো ,,! 

খেতে খেতে পাগলিটা সুমুর দিকে তাকায়। বলে,

– যহন বৃষ্টি আহে তহন মুই আর রাজা বন্ধ দোকান গুলার সামনে গিয়া খারাই। মাঝে মাঝে মাহাজন খারাইতে দেয়। মাঝে মাঝে আমাগোরে তাড়ায়া দেয়। তহন আমরা দুইজন মিল্লা কোনো গাছের নিচে গিয়া খারাই। 

– তোমাদের বাসা নাই। তোমরা কী আগে থেকেই একসাথে ছিলে? 

– না। আমি রাজারে রেলস্টেশনে খুঁইজা পাইছিলাম। রাজা অসুস্থ আছিলো। ঐদিন রাইতে রাজার অনেক জ্বর আইছিলো। আমি আমার পোটলা থেইকা কাথা বাইর কইরা অর উপরে দিছিলাম। সারারাইত অর লগে আছিলাম। আমি খাওন পাইলে অর লগে ভাগাভাগি কইরা খাইতাম। আমার রাজারে হেইদিনের পর থেইকাই ভালা লাইগা যায়। তারপর থেইকা আমি আর অরে ছাইড়া যাইনাই। তাইনা রাজা ,,! হি হি হি! 

– হ রাণী। তুমি আমারে ছাইড়া আর যাইও না। আমি তোমারে ছাড়া মইরা যামু। 

– আমি কোত্থাও যামুনা রাজা। 

দুই পাগল পাগলী হাসি খুশি খেয়ে নিতে থাকে রুটি টা। সুমু

তার স্মৃতি বিচরণ করতে থাকে। আজ বিকেলেও সে একজনকে দেখেছে। সাদা পাঞ্জাবি পড়া এক সুদর্শন যুবক। হাতে ফুলের তোড়া ছিলো। মাথার চুল গুলো সুন্দর করে আঁচড়ানো। চেহারায় একটা ম্লিন ভাব ছিলো। ছেলেটার থেকে তখন যে সে চোখই সড়াতে পারছিলো না। এখনও ছেলেটার মুখয়ব তার হ্রদয়ের আয়নায় ভাসছে ,,! 

ধীর গলায় সুমু বিরবির করে বলে উঠে,

– উনি কে ছিলেন ,,! এই গ্রামে হয়তো বেড়াতে এসেছিলেন। তার পোশাক দেখে তো তাই মনে হলো। (একটু থেমে) আচ্ছা উনার নাম কি,,! আমি কী আবার কোনসময় তার দেখা পাবো না ,,! 

পাগল পাগলীর হঠাৎ কথায় সুমুর ঘোর ভাঙে। পাগলিটা পাগলকে বলছিলো,

– রাজা, রুটিতে ক্রিমও আছে। অনেক মজা না রুটিডা ,,! 

– হ রাণী। অনেক মজা। আমার রুটির ক্রিম ডা খাইবা তুমি ,,! 

– না। তুই তোর ডা খা। আমি আমার ডা খাই। তুই কম খাইলে পরে তহন অসুস্থ হইয়া যাইবি ,,! 

– আইচ্ছা রাণী। 

 

সুমু তাদের দেখে এক ম্লিন হাসি দেয়। এই জুটিটা কতো সুন্দর। তারও যদি একটা মানুষ হয়, খুব যত্নে রাখবে সে তাকে। একদম মনের মধ্যে রেখে দিবে সারাজীবন,,! রাতের চাঁদের আলোয় তার স্বপ্ন যেন আকাশ ছুঁতে চাইছে ,,! আশপাশের ঝি ঝি পোকার ডাক, রাতের সৌন্দর্য যেন দিগুন বাড়িয়ে দেয়। তখনই সুমুর কানের কাছে ছোট্ট আকৃতি নিয়ে ভেসে উঠে হনুফা। সুমুর কানের কাছে গিয়ে বলতে থাকে,

– ঐ, শুননা ,,! 

– তুই,,! কেন আসছিস। কী হইছে ,,! 

– আমাকে একটা রুটি কিনে দে না। ওরা বলতেছে রুটি টা বলে অনেক মজার। ক্রিমও বলে আছে‌। আমিও খাবো। আমাকে একটু দিতে বলনা। 

– চুপ থাক। তুই এইসব খাইতে পারবিনা‌। সর এখন কানের কাছ থেকে‌।

হনুফা মুখ গোমড়া করে। বলে,

– তুই আমাকে কিচ্ছু খাইতে দিস না। 

– তুই না ভূত। তুই কীভাবে খাবি ,,! 

– আমার তাও খাইতে মন চাইতেছে। দেখ, ওরা কত মজা করে খাইতাছে। দেনা আমারে একটা রুটি কিনে ,,!

– তুই গেলি আমার কানের পাশ থেকে ,,! নাইলে কিন্তু দিবো একটা ,,! 

– কী দিবা ,,! 

– মাইর। এমনে করে মাইর। 

বলেই হাত দিয়ে কানের পাশে থাকা হনুফার ধোঁয়াটাকে ছত্রভঙ্গ করে দেয় সুমু। হনুফা পালিয়ে যায়। সুমু তা দেখে একটা ছোট্ট হাসি দিয়ে পাগল পাগলির দিকে চায়। দেখে ওরা এখনো খাচ্ছে। সুমু তাদের বলে,

– আচ্ছা তোমরা তাইলে খাও। আমি আবার রাতে আসবো তোমাদের জন্য ভাত নিয়ে।

– আইচ্ছা। তুমি ভালো থাইকো। 

– আচ্ছা। 

সুমু উঠে দাঁড়িয়ে চলে যেতে থাকে। আকাশের উজ্জ্বল চাঁদের আলোয় তার মন খানা তিরিং বিরিং ই করছে বটে। হনুফা আবার তার দু কানের সামনে মাছির মতো ভনভন করতে থাকে। সুমুও তার এমন দুষ্টু মিষ্টি খুনসুটি দেখে মুচকি হাসে।

 

       চৌড়চকের উত্তররের রাস্তাটার পাশে থাকা ক্লিনিক থেকে বেড়িয়ে এলো ফুলমতি, সামিহা,দিথী আর শিউলি বেগম। এই ক্লিনিকে আফাজ ভর্তি। এই ক্লিনিকটাকে আপনারা আগেও দেখেছিলেন। সেই ১৯৯৮ সালে যখন তাসনুভাকে এখানে তার ভাইয়েরা চেকআপে জন্য এনেছিলো তখন। এই ক্লিনিকটা বেশ পুরোনো। এই গ্রামে এটা আর খান বাড়িই কেবলমাত্র দোতল ইমারত। তাছাড়া আর কোন দিতল ভবন নেই এই গ্রামে। এই ক্লিনিকটার নাম ‘রেজারিও ক্লিনিক’। এইটা বানিয়েছিলেন নজরুল সাহেবের দাদা। তার দাদার পত্নির নামে এই ক্লিনিকের নামকরণ করা। তার পত্নি খ্রিষ্টান ছিলেন। 

 

শিউলি বেগম,দিথীরা ক্লিনিক থেকে বেড়িয়ে তার সামনে দাঁড়ালো। বাজারে বেশ ভিড়। ব্যাটারিচালিত ভ্যান, অটো সব আরোহী নিয়ে যাচ্ছে আর আসছে। শিউলি বেগম রা একটু সাইড হয়ে দাড়ান। ভিড় টা একটু কমলে বাড়ির দিকে পা এগোবেন। দিথী তার পাশে দাঁড়ানো। ঐদিকে সামিহা আর ফুলমতি একে অপরের সাথে কথা বলছে কী বিষয় নিয়ে জানি। শিউলি বেগম দিথীকে ধীর গলায় বলে উঠেন,

– আফাজের কথা অর মা বাপরে কইতেও ডর লাগতাছে। পোলাডা নিপার ননদ রে এতো পাগলের মতো ভালোবাসে এইডা আমরা কেউই বুঝতে পারিনাই‌।

– হ্যা মা। আফাজ ও তো মাত্র এই ৩-৪ দিন ই ছিলো এইখানে। একয়দিনেই আলিশাকে ভালোবেসে ফেলছে ও। 

– ভালোবাসা হইতে সময় লাগেনা মা। একমিনিটেও হইতে পারে, আবার এক সেকেন্ডেও হইতে পারে। দেখছো আফাজের হাত কেমন ফাইটা গেছে,,! ডাক্তার তো কইলো প্রেশারও লো। সেলাইন দিছে। জ্ঞান ফিরলেই আলিশা আলিশা কইয়া চিৎকার করতাছে। ইনজেকশন দিয়া ঘুম পাড়াইয়া রাহোন ছাড়া ওরে শান্ত করা যাইতাছে না। এই সব এহন আমি আমার ভাইরে কেমনে কই ,,! ফোন দিতেও ভয় লাগতাছে আমার।

– সব ঠিক হয়ে যাবে মা। চিন্তা করিয়েন না। আফাজের মা-বাবারা বলে সৈয়দপুর গেছে। ইকরা আর আফাজ এখনো রংপুরেই আছে এটাই ওরা জানে। আপনি ফোন করে বলিয়েন না। পড়ে ওরা টেনশন করবে। আফাজ সুস্থ হলে কয়দিন এবাড়িতেই থাক। তারপর নাহয় ওকে রংপুর পাঠিয়ে দিয়েন। 

– হ। এইডাই করা লাগবো। আফাজের শরীরও দুর্বল। ডাক্তার তো কইলো যাউ ভাত নাইলে সাবু খাওয়াইতে। রাইতে লায়লা সহ আমি আইয়া ওরে সাবু খাওয়াইয়া যামু। (একটু থেমে) আর এদিকে আমার মতিন ডা যে হেই সকালে গন্জে গেছে আর কী ফিরার কোনো খোঁজখবর আছে ,,! গ্রামে দুই দুইডা নৃশংস খুন হইয়া গেলো। তার কানে কী এহনো খবর পৌছায় নাই ,,! 

– আব্বা মনে হয় দিনাজপুর শহরে গেছে। গন্জে থাকলে এতোক্ষণে খবর পায় যাওয়ার কথা। 

– অর তো খালি পৌরসভা অফিস আর গন্জ বাজার। এই দুইডা ছাড়া কী অর আর ঘরবাড়ি আছে ,,! বাড়িত মাইয়া পোলার কী হয় হোক। অয় ঐদিকে যাইয়া পৌরসভা অফিসে বইয়া থাকবো। আমারও হইছে সব জ্বালা। 

– আচ্ছা রাগ করিওনা মা। আব্বা ঠিক চলে আসবে। চলেন বাসার দিকে এগোই। বাতাস করতেছে খুব এদিক। 

– হ লও। এই সামিহা, ফুলমতি লও। তাড়াতাড়ি বাসা যাইতে হইবো। 

– দিথী,,,,! (পিছন থেকে শাহারিয়ার ডাক ভেসে আসে। দিথী সঙ্গে সঙ্গে পিছন ফিরে তাকায়। দেখে একটা ব্যাটারি চালিত ভ্যানে করে শাহারিয়া আসছে। কাল যে বিকালে আহনাফকে নিয়ে ঢাকার জন্য বেড়িয়েছিলো এই আজ ফিরলো। 

 

ভ্যান টা এসে দিথীদের পাশেই থামে। শাহারিয়া সেখান থেকে নামে। ভ্যান টা চলে যায়। শাহারিয়া দিথীকে দেখেই তার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। দিথী তাকে ছোট্ট একটা আলিঙ্গন করে। তার পাশে দাঁড়িয়ে বলে,

– এতোদেরি হলো কেনো ,,! 

– আর বলিও না। আসতে চাইছিলাম রাতের ট্রেনে। কিন্তু না, ট্রেনই পাইলাম না। তাই সকালের ট্রেনে আসতে হইলো। তোমার এখানে কী করো। মাও তো দেখি এখানে। ব্যাপার কী। 

– তোর বউরে বাজারে কেজি দরে বেচতে আইছিলাম। (শিউলি বেগম)

– হেইস। কি যে বলোনা মা। (দিথীর দিকে ফিরে) এখানে এতো রাতে কেনো ,,! 

– আফাজ ক্লিনিকে ভর্তি। 

– আফাজ ? ওকে তো কাল ট্রেনে উঠিয়ে দিয়ে আসলাম। ওরতো রংপুরে থাকার কথা। 

– হ্যা রংপুর গেছিলো। তারপর আবার ফিরে আসছে। গ্রামে অনেক কিছু ঘটে গেছে আজকে। 

– মানে বুঝলাম না কিছু। কী হইছে। কোন সিরিয়াস কিছু,,!

– হ্যা। তুমি চলো, একসাথে যেতে যেতে বলছি। (মৃদু গলায় বলে দিথী) 

– আচ্ছা চলো। দুপুরের খাওয়া ঠিকমতো করছিলা ,,! 

– হমম। 

দিথী শাহারিয়ার একহাত জড়িয়ে ধরে তার পাশে একসাথে হেঁটে হেঁটে আসতে থাকে। শাহারিয়াও তার কাঁধে হাত রেখে তার থেকে সব কথা শুনতে থাকে। পিছুপিছু শিউলি বেগম, সামিহা আর ফুলমতি যেতে থাকে। তারা তিনজন যেন শাহারিয়া আর দিথীকে দেখে তাদের নিয়েই একে অপরের সাথে কথা বলছিলো। 

বাজারের এক দোকানের সামনে হতে মুখে ওড়না চেপে শাহারিয়া আর দিথীকে যেতে দেখে সুমু। তার থেকে আর মাত্র ৮-৯ হাত দূরেই তারা। সুমু শাহারিয়া আর দিথীর এমন সুন্দর মিল দেখে মৃদু হাসে। তার মনে হতে থাকে দিথীর মতো সেও একদিন কারো হাত জড়িয়ে ধরে এভাবে হাঁটবে। আর কেউ একজন তার কাঁধে হাত রেখে তাকে আরো আগলে নেবে। সুমুকে এভাবে চেয়ে থাকতে দেখে তার পাশে উদয় হয় হনুফা। বলতে থাকে,

– চল বাড়ি যাই ,,! 

– হমম যাচ্ছি। (একটু হেঁসে ম্লিন গলায়) দেখ হনুফা। ওরা দুজন কতসুন্দর একে অপরের সাথে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে। 

– হ্যা। যাচ্ছে তো। কিন্তু তাতে আমাদের কি। ঐ দিথীকে তো আমাদের মেরে ফেলতে হবে। আর ওর কাছ থেকে আংটিটা ছিনিয়ে নিতে হবে। নাইলে যে দিথী আর বাকি তিনজন মিলে আসুভেকে ধ্বংস করে দিবে। তোমাকে মেরে ফেলবে। 

সুমু চকিতে হনুফার দিকে ফিরে তাকায়। বলে,

– আমাকে কেনো ওরা মেরে ফেলবে ,,! আমি তো কিছুই করিনি। যা করেছে সব আসুভে নামের ঐ খারাপ আত্মাটাই করেছে। 

– আসুভে করলেও তোমার উপর তাদের ধারনা এই যে তোমার মাঝেও কোন না কোন শক্তি আছে। যা দিয়ে তুমি ওদের ক্ষতি করতে পারো। তাই ওরা তার আগেই তোমারে আর আসুভেকে মারে ফেলবে।

– কিন্তু তুইই তো কাল বললি যে আমার মধ্যে কোন খারাপ শক্তি নেই। আমি একজন স্বাধারণ মানুষ। 

– হ্যা তুই স্বাধারণই তো। কিন্তু ওরা যে তা জানেনা। 

– তারমানে ওরা আমাকে ভুল ভাবছে,,! 

– হ্যা। 

সুমু কিছুক্ষণের জন্য চুপচাপ হয়ে যায়। সে আর হনুফা দাঁড়িয়ে ছিলো জঙ্গলে যাওয়ার রাস্তাটার মুখের সামনে। সুমু কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠে,

– আচ্ছা আসুভে যদি মারা যায়, তাইলে তোর আর তান্ত্রিকের কী হবে ,,! 

– আমার কিছু হবে না। আমি শুধু তখন কোন কিছু করতে পারবোনা। শুধু তুইই আমাকে তখন দেখতে পাবি। আর তান্ত্রিক মারা যাবে। কারণ ওর সাথে আসুভের জীবন রেখা জড়ায় আছে। 

– আচ্ছা হনুফা। ধর আসুভে আমার শরীরে প্রবেশ করলো না। তুই আর আমি এভাবেই এখনকার মতো স্বাধারণ হয়ে রয়ে গেলাম। তখন কী তুই আমাকে ছেড়ে চলে যাবি ,,! 

– না। আমি ক্যন যাবো। তুমি ছাড়া যে আমার কোন বন্ধু নাই।

সুমু, হনুফার কথা শুনে আরো কিছু ভাবে। ভাবতে ভাবতে পা বাড়ায় রাস্তাটার দিকে। যেতে থাকে বাড়ির উদ্দেশ্যে। হনুফা সুমুর কাছ থেকে কোন উত্তর না পেয়ে তার সামনে ঘুর ঘুর করতে থাকে। বলতে থাকে,

– তোর কী মন খারাপ,,! 

– জানিস আমার না একটা ছেলেকে খুব ভালো লাগছে ,,! (মাথা নিচু করেই ম্লিন গলায় বলে সুমু)

– একটা ছেলেকে ভালো লাগছে ,,! কে সে ,,! কোথায় থাকে ,,! আমাকে বলো বলো ,,! (সুমুর সামনে ঘুর ঘুর করতে করতে বলে হনুফা)

– নাম জানিনা। ছেলেটা ফর্সা। গালে হালকা চাপ দাড়ি। চোখ আর চোখের পাপড়ি গুলা ঘন কালো। (মাথা তুলে) আর জানিস, ও সাদা পান্জাবি পড়ে ছিলো। হাতে ফুলও ছিলো। 

– কী বলিস ,,! তুই ওকে কোথায় দেখছিলি ,,! 

– আমি বিকেলে যখন বাইরে বেড়িয়েছিলাম তখন তাকে দেখেছি। তবে তার নাম জানিনা। 

– আয় হায় ,,! (লজ্জা মুখে) তুই প্রেমে পড়ছিস ,,! 

– ধুর ,,! তেমন কিছুনা ,,! 

– তাইলে তাইলে ,,! 

– যাহ্ তোকে বলবোনা। 

– এই বলোনা বলোনা। আমিও একটা ছেলের সাথে প্রেম করবো। তোমার মুখ থেকে শুনে এখন আমারো পছন্দ হয়ে গেছে ছেলেটাকে। আমি ছেলেটাকে দেখবো। 

– একদমই না। ঐ ছেলেটা শুধু আমার। তোকে দিবো ক্যানো ,,! তুই চকলেট, রুটি যা ইচ্ছা নিয়ে যেতে পারিস। কিন্তু আমি ওকে দিবো না না না। 

– এই দেওনা দেওনা। আমিও প্রেম করবো। 

– সর। আমার সামনে থেকে সর। 

সুমু হনুফাকে সড়িয়ে দিয়ে আগে আগে যেতে থাকে। হনুফা তার পাশে পাশে ঘুর ঘুর করতে করতে আবদার করতে থাকে। আজও আকাশে গোল থালার মতো উজ্জ্বল চাদ খানা উঠেছে। আর সেই জোছনার আলোয় এই কিশোরী সুমুর চারপাশে জীনির মতো ঘুরঘুর করতে থাকা হনুফাকে দেখতে বেশ লাগছে। যেন এক প্রদীপ থেকে বেড়োনো জ্বীন আবদার করছে তার মালিকের সাথে ,,!

 

____

 

বিছানায় বসে টিভি দেখছে রায়হান। পড়নে একটা টি শার্ট আর ট্রাউজার। টিভিতে ফুটবল খেলা দেখছে সে। ডেনমার্ক তার পছন্দের টিম। তাই ডেনমার্ক আর বেলজিয়ামের খেলাটা রিপ্লে দেখছিলো সে। নিপা গোসল খানার দরজা খুল্লো। খুলে বেড়িয়ে আসলো। রায়হান টিভির দিকে থেকে একবার নিপার দিকে হালকা তাকিয়ে আবার টিভির দিকে চোখ নিয়েছিলো। তাতেই যেন সে হঠাৎ চমকে উঠলো। সে আবার চোখ ফিরিয়ে নিপার দিকে তাকালো। 

নিপা গোসল খানা থেকে বের হয়। পড়নে টিয়া পাখির মতো সবুজ এক থ্রী পিস। মুখ খানা যেন এক শুভ্রতার ছোঁয়া। তাকে দেখতে যেনো আরো আগের থেকেও অনেক সুন্দর আর ফ্রেশ লাগছে। নিপা তার ভেজা চুল গুলো তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে ফিরে তাকায় রায়হানের দিকে। রায়হান এক নয়নে তার দিকে চেয়ে ছিলো। নিপা কিছুটা ভ্রু কুঁচকিয়ে হাত নাড়িয়ে ইশারা দেয় তাকে। রায়হান যেনো ঘোরেই চলে গিয়েছে। নিপা তা দেখে এক মুচকি হাসি দিয়ে ভেজা চুল গুলো মুছতে থাকে। রায়হান এক পানে চেয়ে বলে উঠে,

– তোমাকে আমি যতবার দেখি ততবারই নতুন লাগে ,,! তোমার রুপের বাহারে আমি বারবার মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি,,! এতো মায়া ভরা চেহারা ,,! (বুকের বা পাশে হাত দিয়ে) এই খান টা যেন আমার মুহূর্তেই রঙিন হয়ে গেলো ,,! 

নিপা তা শুনে এক মুচকি হাসি দেয়। গিয়ে দাঁড়ায় ডেসিন টেবিলের আয়নার সামনে। গামছা দিয়ে চুল মুছতে থাকে। রায়হান বিছানা থেকে নেমে পড়ে। এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় নিপার পিছনে। মাথা হেলিয়ে আয়নায় দেখতে থাকে নিপাল মুখখানা। নিপা তা দেখে আমার একটা সুন্দর হাসি দেয়। রায়হান গুন গুন করতে করতে এগিয়ে আসে। এসে পিছন থেকে নিপার দুই কোমড়ে হাত রাখে। নিপার কাঁধে মুখ রাখে। কাঁধে একটা ছোট্ট চুমু খায়। নিপা চুলের সুবাস তার নাকে লাগছিলো। এ যেন মন মাতানো ঘ্রাণ ,,! রায়হান নিপার কাঁধে থুতুনি রেখে খালি গলায় গান ধরে,

 

আয়নাতে ঐ মুখ দেখবে যখন

 

কপোলের কালো তিল পড়বে চোখে

 

ফুটবে যখন ফুল বকুল শাঁখে

ভ্রমর যে এসেছিলো জানবে লোকে

,

,

নিপাকে ঘুড়িয়ে নিজের সামনে করে নেয় রায়হান

,

,

মনটি তোমার কেন দুরুদুরু কাঁপছে

মনের মানুষ কি গো, চেনা চেনা লাগছে

তুমি কি তারে কাছে ডাকবে

হৃদয়ের কাছে সে রয় অলোকে

হঠাৎ যখন তুমি দেখবে তাকে

শরমে নয়ন কি গো রাখবে ঢেকে,,

 

আয়নাতে ঐ মুখ দেখবে যখন

 

কপোলের কালো তিল পড়বে চোখে

ফুটবে যখন ফুল বকুল শাঁখে

ভ্রমর যে এসেছিলো জানবে লোকে

 

নিপা রায়হানের কোলে মুখ লুকায়। এতো রোমান্টিক গান শুনে যে সেও রোমান্টিক হয়ে যাচ্ছে। তার শরম লাগছে। রায়হানকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে নিপা। রায়হানও নিপার কাঁধে নাক ডুবিয়ে দেয়। নিপা রায়হানের দুই পায়ের উপর পা দেয়। রায়হান নিপার চুলের সুবাসে হারিয়ে যাচ্ছিলো। নিপাকে এভাবে জড়িয়ে ধরার অনুভুতি যে ভাষাহীন। এটা ভাষায় ব্যাক্ত করার মতো না। নিপাও তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিলো। নিপার গাঁয়ের গন্ধ যেন তার এক চেনা রাজকন্যার প্রতিরূপ হিসেবে ধরা দেয়। রায়হান ফিরে এক পা দু পা করে বিছানার দিকে এগোয়। পিছনে টিভির সাউন্ড অফ করা। নিপা রায়হানের উপর দুই পা রাখায় তার পায়ের সাথে সাথে সে নিজেও চলছিলো। বিছানার কাছে এসে থেমে যায় রায়হান। নিপার মুখ খানা তার বুক হতে ধরে সামনে নেয়। নিপার চোখ দুইখানা ছলছল করছে। সে যেন কুসুম কোমল কোন ফুলের মতো। ঝাপটে ধরলেই যেন ভেঙে যাবে ,,! রায়হান তার ছলছল চোখ দুখানা চুমু খায়। চোখের পাপড়ির জল গুলো তার ঠোঁট ভিজিয়ে দেয়। রায়হান ধীর গলায় বলে,

– খোলা আকাশে মেঘ রা যেমন স্বাধীন,

তোমার আকাশ প্রান্তরে আমিও তেমন সীমাহীন,

তোমার মায়ায় এভাবেই আমাকে সারাজীবন জড়িয়ে রেখো ,,! 

স্রোতোসিনীর অববাহিকায় যেন এই ক্ষুদ্র মাঝি চিরকাল রয়ে যেতে পারে ,,! কথা দিচ্ছি, মৃত্যুকালের আগ অব্দি তোমায় আমার বুকের বা পাশটায় খুব যত্নের সাথে রেখে দিবো। 

মৃত্যুর পরেও আমি যেন তোমাকেই পাই। শুধু তোমাকেই,,!

রায়হান নিপার কপালের সাথে তার কপাল খানা রাখে। নিপার চোখে চোখ রেখে বলে,

– ভালোবাসি তোমায়,,! অনেক ভালোবাসি,,! 

 

নিপা চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। রায়হান তাকে এতোটা ভালোবাসা দিয়েছে যে সে বাকরুদ্ধ। নিপা রায়হানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। রায়হানের পিঠখানা শক্ত করে চেপে ধরে। ছেড়ে দিলে এই বুঝি হারিয়ে যাবে। রায়হান তার কাঁধে চুমু খেয়ে তার ভেজা চুলের মাঝে নাক ডুবায়। খুব আগলে ধরে রাখতে থাকে নিপাকে। খুব যত্ন করে রেখে দেয় তার শরীরের সাথে।

তাদের ঘরে এসেছিলো জান্নাতি বাগানের সুবাস। এই প্রথম নিপা তার সবটুকু জুড়ে রায়হানকে অনুভব করেছিলো। রায়হানের ছোঁয়া তার খুব করে পেতে মন চাইছিলো। ভিতরটা যেন অনেক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে রায়হানের দেহের সাথে মিলে একাকার হয়ে যেতে চাইছিলো। রায়হান তাকে নিয়ে বিছানায় পড়ে যায়। দুজন দুজনকে আবারো নতুন ভাবে চিনতে থাকে। নিজের করে নিতে থাকে তাদের সবটুকু দিয়ে। 

 

______

 

– তুই কেনো ওদের দুইজনকে মারতে গেলি ,,! মারার আগে আমাকে একবার জিগাবার প্রয়োজন বোধ করলি না ,,! 

– আমি না মারলে যে সুরাইয়া, নিপাকে সব বলে দিতো ,,! নিপাতো এখন এটাও জানে যে তুমি মানুষের মাংস খাও। বাকিটুকু বলে দিলে তোমার এই লুকানো সাম্রাজ্য থাকতো ,,! রায়হান জানতে পারলে সব তাসের ঘরের মতো ভেঙে চুরমার করে দেবে তোমার এই সুখ, সাম্রাজ্য,,! 

– সোনালী ,,! আওয়াজ নিচে। রায়হান যেনো এইসব কোনো ভাবেই জানতে না পারে। 

– আমি সুরাইয়াকে তো এইজন্যই মেরে ফেলছি। পথের কাঁটা নিপাকেও সড়িয়ে দিবো। 

– চুপ, একদম চুপ। (মুখ বেঁকিয়ে) নিপাকে মারতে যাবে,,! এতো সহজ না ,,!  রায়হান নিপার জন্য সবকিছু করতে পারে। ও নিপার জন্য আমাকে মারতেও দু বার ভাববে না। 

– বাহ,,! ছেলে তার বাপকে মেরে ফেলবে আর তার বাপ চুপচাপ বসে দেখবে। (দাঁতে দাঁত চেপে) ঐ টাকেও এইসব সম্পর্কে বলোনাই কেনো ,,! রাফসান যেমন এতকিছু জানে ও জানে না কেনো,,! কীসের এতো আদিখেতা ওর প্রতি হ্যা ,,! ও কী যে ওকে সবসময় ভালো রাখতে চাও ,,! 

– ও আমার নয়ন মণি। ও আমার প্রাণ। আমি ওর মাঝে আমার রাবেয়াকে খুঁজে পাই। আমার প্রথম ভালোবাসাকে খুঁজে পাই। আমার বাবা জোর করে আমাকে এই লাইনে আনছে। নাইলে, নাইলে আমি আজ একটা সুখি সংসার করতে পারতাম। 

– রাবেয়া কে ? 

– ক,কেউ না। ও এখন আমার কেউ না।

কথাটা বলতে গিয়ে নজরুল সাহেবের গলা লেগে লেগে আসছিলো। নজরুল সাহেব তার কন্ঠ স্বাভাবিক করে আবার বলেন। 

– আমার সবকিছুই এখন রায়হান। আমি রায়হানকে আমাদের থেকে আলাদা করে দিবো। ও আলাদা থাক। ও ওর ভালোবাসাকে নিয়ে সুখে শান্তিতে আমাদের বিজনেস দেখা শোনা করুক। আমি, আমি শুধু এটাই চাই। 

– বাহ,, ! নিজের বড় ছেলের প্রতি কোন দরদ নাই আর ছোট ছেলের প্রতি এতো দরদ ,,! 

– আমি তোর মুখ থেকে কোন কথা শুনতে চাই না। তুই আমাকে না বলে আলিশা আর সুরাইয়াকে মেরে ফেললি ,,! আলিশা তো কিছুই জানতো না। ওকে কেনো মারতে গেলি,,? এখন থানা পুলিশ হবে। কেস হবে। পুলিশ তদন্ত করতে আসবে। (রাগে কটমট হয়ে) ওরা যদি কোনমতে এই আস্তানার খবর পায় তাইলে কিন্তু আমি তোকে ছাড়বোনা। একদম শেষ করে ফেলবো ,,!

বলেই হন হন করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় নজরুল। যাওয়ার সময় অনেক জোড়ে শব্দ করে দরজা লাগিয়ে দিয়ে যায়। সোনালী নজরুলের রাগ দেখে চেয়ারে বসে পড়ে। টেবিলে জোরে এক ঘুষি মারে। রাগের চোখ নিয়ে দরজার দিকে তাকায়। বলে,

– আমি ওর ভালোর জন্য মারতে গেলাম আর আমারেই তেজ দেখাইতে আসে ,,! দেখাক। যত তেজ দেখাবার দেখাক। ওর সময় তো ফুরায় আসতেছে। প্রতিশোধ না নিয়ে তো আমি যাচ্ছিনা ,,! (টেবিলে জোড়ে এক ঘুষি দিয়ে) আমি নিজ হাতে এই খান বাড়ি ধ্বংস করবো। এই ফ্যামিলির বিজনেস, সম্মান সব ধুলায় মিশায় দিবো। এই সোনালীকে তুই চিনিস নাই। সুচ হয়ে ঢুকবো, আর ফাল হয়ে সব তছনছ করে বেড়োবো ,,! তাতে যদি নিজের সবটুকুও সপে দেওয়া লাগে, আমি তা দিতেও দু বার ভাববো না। 

 

চলবে ,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

 

উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন:: ২(মুখোশ) 

পর্ব :: ৬২

লেখক:: মির্জা শাহারিয়া

 

(১৮+ এলার্ট)

 

সূর্যস্নাত রোদ জানালা দিয়ে এসে পড়েছে বিছানায়। নিপার ঘুম ভাঙে। চোখের পাতা গুলো ধীরে ধীরে মেলতে থাকে। সূর্যের আলোখানা বেলকনির জানালা দিয়ে বিছানায় এসে পড়েছে। আবহাওয়া মৃদু ঠান্ডা। নিপা উঠে বসে। সাদা চাদর খানা তার বুকের উপর উব্ধি দেওয়া। আড়মোরা ভাঙতে ভাঙতে হাত দুটো উপরে তোলে। ঘুম বেশ ভালোই হয়েছে। কাল রাতে ডিনার করেই শুয়ে পড়েছিলো তারা। নিপা পাশে চেয়ে তাকায়। দেখে রায়হান বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। চাদর খানা তার নাভি বরাবর। চিৎ হয়ে শুয়ে থাকায় বুকের লোমকূপ গুলো রোদের আলোয় চিকচিক করছে। নিপার ঘুমঘুম চোখে রায়হানকে দেখে এক ম্লিন হাসি হাসে। মাথার দিক থেকে রায়হানের ফোন খানা হাতে নেয়। নিয়ে ফ্রন্ট ক্যামেরা ওপেন করে। নিজের মুখয়ব ক্যামেরায় দেখে। খোলা চুল গুলো হাত দিয়ে কানের ওপাশে দিয়ে দেয়। মুখে ঘুম ঘুম ভাব এখনো কাটেনি। নিপা হেলে রায়হানের কাছে আসে। রায়হানের গালে একটা ছোট্ট চুমু খায়। চাপ দাড়ি গুলো কাল তার গালে শরীরে বেশ খোঁচা দিয়েছে। অবশ্য এতে সে ব্যাথীত হয়নি, বরং সুখই অনুভব করেছে। নিপা রায়হানের গালে ঠোঁট লাগিয়ে আরেক হাতে ফোনখানা উঁচিয়ে ধরে একটা সেলফি নেয়। গাল থেকে ঠোঁট দুটো সড়িয়ে এবার নিজের গালের সাথে রায়হানের গাল লাগিয়ে এক হাসি মুখ করে আরেকটা সেলফি নেয়। নিজের জিহ্বা হালকা একটু বের করে আরেকটা সেলফি নেয়। হেঁসে ফেলে সে। রায়হানকে ঘুমন্ত অবস্থায় বেশ কিউট লাগছে। রায়হান জেগে থাকলে নিশ্চয়ই তাকে জড়িয়ে ধরে আবার চুমু খেতো। নিপা এবার রায়হান বুকে মাথা রাখে। আরেকটা সেলফি নেয় এভাবেই। এই বুকটাই যেন তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল। এই বুকে মাথা রেখেই কাল ঘুমিয়েছিলো সে। প্রিয়জনের বুকে মাথা রেখে ঘুমানোতে আলাদা প্রশান্তি আছে। নির্মল আনন্দ আছে। 

 নিপা উঠে বসে। ফোনে তোলা ছবি গুলো দেখতে থাকে। তার বুক বরাবর সাদা চাদর খানা আর রায়হানের উদাম বুক, ছবি গুলো বেশ সুন্দর উঠেছে। নিপা ছবি গুলো দেখতে দেখতে ফোনের নোটিফিকেশন উইনডো টা নামায়। দেখে ৭ টা মিসড কল। আব্বু নামে সেভ করা নাম্বার থেকে কাল রাতে ফোন এসেছে। নিপা ট্যাপ করে নটিফিকেশন টায়। কিন্তু ফোন লক থাকায় ভিতরে ঢুকতে পারে না। নিপা মনে মনে ভাবে,

 ‘নিশ্চিত ও ফোনটা সাইলেন্ট করে রাখছিলো। এইজন্য এতোবার ফোন দিছে আমরা বুঝতেই পারিনি। নিজের সুন্দর সময় কেউই নষ্ট করতে চায় না। আর আমার রায়হান হলে তো কথাই নাই ,,!’

 নিপা ফোনটা আবার মাথার পাশে রেখে দেয়। রায়হানের উপর কাঁথা খানা টেনে দিয়ে ঘুরে নেমে যাওয়ার জন্য বিছানা থেকে পা নামায়। মাথার দিকে থাকা ওড়ানাটা হাতে নেয়। এটা দিয়ে দেহ মুড়িয়ে গোসল খানায় ঢুকবে সে। বিছানা থেকে উঠতে যাবে তখনই পিছন থেকে তার হাত রায়হান ধরে নেয়। নিপা পিছন ফিরে তাকায়, সাথে সাথেই হেঁচকা টান মেরে রায়হান নিপাকে তার কোলের উপর এনে ফেলে। নিপা লজ্জা মুখো করে বলে,

 – তুমি জেগে ছিলা ,,! 

 – হমম। তোমার চুমু মিস না করার জন্য একটু ঘুমের অভিনয় করছিলাম আরকি। (ঘুম ঘুম গলায় বলে রায়হান)

 – ছাড়ো এখন। আমি গোসলে যাবো। 

 – পরে যাইয়ো। আসো আরেকটু ঘুমাই।

 – না না। অনেক বেলা হয়ে গেছে। ঘড়িতে দেখো, ৯ টা বাজে। 

 – বাজুক। আমাদের কেউ ডিসটার্ব করতে আসবেনা। আসো আরেকটু আদর করি তোমায়। 

 – যাও। এখন কোন আদর সোহাগ না। ফ্রেশ হইতে হবে ছাড়ো। 

 – না ছাড়বোনা। এভাবে বুকে জড়িয়ে রাখবো সারাজীবন। 

 – তা রেখো, কিন্ত এভাবে বেশিক্ষণ থাকতে নেই। গোসল করতে হবে। ছাড়ো। আর তুমিও উঠো। 

 – আরেকটু ঘুমাই আমরা,,!

 – না। আর একটুও না। উঠো। আর রিসিপসনে কল দিয়ে বলো বিছানার চাদর পাঠাতে। গোসল করে এসে বদলে দিতে হবে। 

 – সে পরে দেখা যাবে। আগে আমি তোমাকে একটু জড়িয়ে ধরে থাকি। আমার সুবাটা যে অনেক তুলতুলে,,! 

 – হইছে ছাড়ো এখন। আমার শরীরটাকে তো চেপে ধরে তোমার শরীরের ভিতরেই নিয়ে যাবা। 

 – তুমি তো আমার ভিতরেই আছো। তুমি যে আমার আত্মার আত্মীয়। তোমায় ছাড়া একটা ছোট্ট মুহুর্ত অসীম মনে হয় আমার কাছে। (নিপার চুল গুলো মুখের উপর নিয়ে) আহ, এই মনমাতানো সুবাসে আমি আবার পাগল হতে চাই ,,! 

 – হইয়ো। কেউ তো ধরে রাখতেছেনা। চলো তো উঠো। 

 – আগে চুমু খাও। তারপর ভেবে দেখবো। 

 – খেলাম তো। 

 – আরো খাও। গালে তোমার পাপড়ির মতো ঠোঁট দুখানা আমার সকল শিরা উপশিরার রক্ত হিম করে দেয়। আমার গায়ে যেন সুখের নদী বয়ে যায়। দেও না আর দু’টো। 

 – শুধু দুটোই কিন্তু ,,! 

 – হম, দুটোই দেও। একটা এই গালে,(ঠোঁট দেখিয়ে) আরেকটা এইখানে।

 – না না ওখানে না। আমি শুধু গালে দিবো। 

 – না দিলে আর ছাড়বোনা। এভাবেই আজ সারাদিন তোমায় জড়িয়ে ধরে রাখবো। 

 – ছোট্ট করে দিয়েই কিন্তু আমি উঠে যাবো। আর তুমিও আমার সাথে উঠবা। বুঝছো।

 – তুমি চুমু খেলে আমি সব করবো। 

 – চোখ বন্ধ করো। 

 – কেনো। চোখ বুজে কী করবো। 

 – আমি বন্ধ করতে বলেছি করো। 

বলেই নিপা তার হাত দিয়ে রায়হানের চোখ দুটো চেপে ধরে আলতো করে। তার ঠোঁট দুটো এগিয়ে নিয়ে রায়হানের ঠোঁটের কাছে আনে। নিজেও চোখ বুজে রায়হানের ঠোঁটের উপর আলতো করে ছোঁয়া দেয়। দুই ঠোঁট দিয়ে চুমু খেয়ে রায়হানের নিচের ঠোঁট খানা চুষে দেয়। রায়হান ঠোট ভিজে যায়। নিপা নিজের ঠোঁট দুখানা তুলে নিতেই যায় তখনই রায়হান হাত দিয়ে নিপা ঘাড় চেপে ধরে তার ঠোঁটে গভীর ভাবে চুমু খেতে থাকে। নিপা উঠে যেতে চাচ্ছিলো রায়হানের উপর থেকে। রায়হান আরো ওকে ধরে নিজের গাঁয়ের উপর শুইয়ে দেয়। খুব গভীর ভাবে চুমু খেতে থাকে নিপাকে। কাঁথা খানা তাদের মাথার উপর ফেলে দেয়। দিয়ে আবারো ছোট্ট সময়ের জন্য সুখ রাজ্যে হারিয়ে যাওয়ার পায়তারা করতে থাকে রায়হান। সূর্যের আলো বিছানায় এসে তাদের সাদা কাঁথার উপর পড়ছে। সেই আলোতে দুই আত্মার আত্মীয়তা ভীষণ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

 

_____

 

জঙ্গলের মাঝের রাস্তা। পুরোনো আমলে তৈরি হওয়ায় পাকা রাস্তাটার কিছু কিছু যায়গা একটু খয় হয়েছে। রাস্তাটা দিয়ে হেঁটে আসছে সুমু। গায়ে একটা শাল চাদর জড়ানো। এদিকে আবার ঠান্ডা পড়েছে কিছুটা। চারপাশে গাছ গুলো যেন কুয়াশা নামক শাল গায়ে জড়িয়ে বসে আছে। শিশির বিন্দু জমেছে গাছের পাতা গুলোয়। মাঝে মাঝে দু চার বিন্দু একসাথে হয়ে পাতা থেকে নিচে পড়ে যাচ্ছে। তেমনি এক ফোঁটা এসে পড়লো সুমুর মাথায়। চুল ভেদ করে ঠান্ডা শিশির মাথার শিয়রে পৌঁছানো মাত্র সুমু উপরে মুখ তুলে তাকায়। রাস্তার একপাশ ধরে হেঁটে চললে এই এক ব্যাপার। গাছের ডালে থাকা পক্ষীর মল আর গাছের পাতায় থাকা শিশির। সব এসে মাথায় পড়ে। সুমু আবার হাঁটতে শুরু করে। তার মুখ খানা একটু গম্ভীর। কাল সারারাত ঘুম হয়নি। চোখের পর্দায় বারংবার খালি সেই যুবকের মুখখানাই ভেসে উঠছিলো। ঘুম যেন‌ তার চোখ থেকে চলে গিয়েছিলো অন্যকারো চোখে। হ্রদয়টা যেন খুব করে অনুভব করছিলো কাউকে। ভিতরটা নিঃসঙ্গতার অতলে হারিয়ে যাচ্ছিলো বারবার। এ কেমন অনুভূতি। আগে তো কখনো তার ভিতরে এমন অনুভুতির জানান পায়নি সে। ঐ ছেলেটার কী জাদুকাঠি আছে,,! যে তাকে সেই জাদুকাঠির পরশে বশ করে ফেলেছে,! না, কিচ্ছু ভালো লাগছেনা। আরেকবার দেখা না পেলে যেন সে ছটফট করতে করতেই প্রাণ হারাবে। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি এতোটা আকর্ষণ বোধয় এই প্রথম জাগ্রত হয়েছে তার মাঝে। এটা কী ভালোলাগা না ভালোবাসা? জানেনা সে। তার ছোট্ট মনের ডিকশনারি এসবের উত্তর দিতে পারছেনা। সে এখনো কিশোরী। ১৭ থেকে ১৮ তে পা দিবে। এই ‌বয়সে বুঝি এসব অস্বাভাবিক কিছুই নয়,!

সুমু এক গাছের সামনে থেমে যায়। আর হাঁটতে ইচ্ছে করছেনা তার। একটু বসে না জিরুলেই নয়। সুমু বসে পরে রাস্তার পাশে থাকা এক বড় বট গাছের নিচে। মাটিটা শুকনো। তাও কিছু পাতা একখানে করে সেগুলোর উপর বসেছে সে। আশেপাশের গাছ পালা থেকে নানা পোকামাকড়ের ডাক, পাখির কলতান সুর ভেসে আসছে। এখনো সূর্য ঘুম থেকে উঠেনি। মেঘের আড়ালে হয়তো কাপড়-চোপড় পড়ে রেডি হচ্ছে আলো দেবার জন্য। সুমু গাছে হেলান দিয়ে বসে থাকে। পাশে পাওয়া একটা ছোট্ট ভাল হাতে নিয়ে সেথা হতে পাতা ছিঁড়তে থাকে। তার সামনে আলাদিনের জীনের মতো আবির্ভূত হয় হনুফা। সুমু সামনে তাকিয়ে হনুফাকে একবার দেখে। হনুফা ঘুরে ঘুরে চুপচাপ বসে থাকা সুমুকে পর্যবেক্ষণ করে। সুমু চুপচাপ হাত দিয়ে পাতা ছিঁড়ছে। হনুফা বলে উঠে,

– কিরে, তুই চুপচাপ কেন।

– ভাল্লাগে না। 

– কী ভাল্লাগেনা ,,! ঐ ছেলেটাকে ,,!  তোর ভালো না লাগলে আমাকে দিয়ে দে। আমি ওকে নিয়ে যাই। 

– কচু দেবো তোকে। ঐ ছেলেটা শুধু আমার আর আমারই থাকবে। 

– এই, শুননা।

– কী। 

– আমি তোর শাল চাদরের ভিতর ঢুকি! আমার বাইরে শীত করতেছে। (দুই হাত দিয়ে নিজের গা জড়িয়ে ধরার ভং করে) উরি বাবা,, কী ঠান্ডা। আমাকে তোর শালের ভিতর যায়গা দে না। 

– তুই তো ভূত। তোর আবার ঠান্ডা গরম আছে নাকি। যা ঐদিকে পাতা-পুতো জড়ো করে আগুন জ্বালায় তাপ নে। 

– না বাপু। আগুনে আমার ডর করে। তোর শাল টার ভিতরেই ঢুকে যাই। 

বলেই বাইরে থেকে অদৃশ্য হয়ে একদম শালের ভিতরে গিয়ে দৃশ্যমান হয় হনুফা। শাল টা একপাশে কিছুটা ফুলে গেছে। তারমানে ঐখানটায় হনুফা আশ্রয় নিয়েছে। সুমু শালের চাদর খুলে দিয়ে বলতে থাকে,

– পালা এখান থেকে। আমার গরম নষ্ট করতে আসছিস। এমনিতে এতো ঠান্ডা তার মাঝে ও ভাগ বসাইতে আসছে। 

– দিলিনা তো থাকতে ,,! তুই খুব বদ। একদম আমাকে কিছু দিতে চাস না। (বলেই হনুফা বেড়িয়ে যায়) 

– হ্যা আমি বদ। এইবার হইছে! এখন তুই যা। আমার কিছু ভাল্লাগতেছেনা।

– ফল খাবি ,,! 

– ফল ? ফল কই পাবি। 

– আগে বলনা খাবি নাকি। 

– লায়লা তো আজ সকালের নাস্তা দিয়ে যায় নি। খিদা লাগছে হালকা একটু। 

– তাইলে দাড়া আমি ফল নিয়ে আসতেছি। 

– কই থেকে আনবি তুই। 

– কালকের বাজার টা আছেনা। ঐখানে একটা ফলের দোকান দেখছিলাম। লাল টুকটুকে আপেল, টসটসা কমলা, আরো কতো কি। তুই এখানেই থাক। আমি একটা আপেল আর একটা কমলা নিয়ে আসতেছি।

– কিন্তু টাকা ,,!

– আমি চুপচাপ লুকিয়ে নিয়ে আসবো। কেউ টের পাবেনা! 

– সাবধানে আনিস। ধরা পড়িস না যেনো আবার।

– ধরা পড়লেই বা কী। আমি বাতাসের গতিতে পালিয়ে যাবো। কেউ আমায় ছুঁতে পারলে তো ধরবে ,,! 

– হইছে যা এখন। মেলা পটর পটর করিস তুই। 

– তোর ভাতার পটর পটর করে। তুই পটর পটর করিস। 

– তোরে আমি জুতা পিটা করবো শালী। (বলেই পায়ের জুতোটা খুলে হনুফার দিকে ফিকে মারার জন্য হাত তুলে, হনুফা দিকবিদিক না দেখেই রাস্তা দিয়ে পালিয়ে যেতে থাকে। সুমু তার যাওয়ার পথে জুতা ফিকে মারে। হনুফা পালিয়ে যায়। সুমু আবার হাঁটু জড়ো করে বসে। হাতদুটো একসাথে করে গাছের গায়ে হেলান দেয়। একফোঁটা শিশির বিন্দু এসে তার কপালে পড়ে। নিপা উপর মুখ করে এক ছোট্ট মুচকি হাসি দিয়ে বলে,

– এই হনুফাটাও না, অনেক পাজি,,! 

 

_____

 

রায়হান গোসল খানা থেকে বেড়োয়। নিপা নিচে ব্যাগের চেইন খুলে কাপড় বের করছিলো। সময় এখন ১০ টা। নিপা আগেই গোসল করে বের হয়েছে। ভেজা চুল গুলো মেলে দিয়েছে কাঁধে যেন শুকিয়ে যায় তাড়াতাড়ি। রায়হান গামছা পড়ে গোসল খানা থেকে বেড়িয়ে বিছানার পাশে এসে দাঁড়ায়। হাত দুখানা দিয়ে দেহ জড়িয়ে ধরে বলে,

– সুবা, ভিতরের পানি দেখি অনেক ঠান্ডা। 

– হ্যা। একটু ঠান্ডা। (লাগেজের পাশ থেকে উঠে) নাও, তোমার কাপড়। ট্রাউজার আর টি শার্ট ই পড়ো এখন। পড়ে যখন বাইরে যাবা তখন জিন্স পড়িও। 

– আচ্ছা দেও এখন। এগুলাই পড়ি। (কাপড় গুলো হাতে নেয় রায়হান)

– হোটেলের লোক আসছিলো। সকালের ব্রেকফাস্ট দিয়ে গেছে। 

– ব্যাগ দেয়নি কোনো ? 

– কিসের ব্যাগ? 

– একটা বড় ব্যাগ দেওয়ার কথা। আজকে আমরা ঘুরতে বেড়োবো। 

– ঘুরতে যাওয়ার সাথে ব্যাগের কি সম্পর্ক। 

– ঐ বাগে তাঁবু আছে। আমরা খাগড়াছড়ি যাবো আজ। ঐখানে এক পাহাড়ে উঠে তাঁবু খাটিয়ে রাত থাকবো। 

– পাহাড়ে তাঁবু বানিয়ে রাত থাকবো ,! কী বলতেছো এসব! ঐখানে কীভাবে ঘুমাবো। 

– ট্যুর দেওনাই আগে কখনো এইজন্য এই কথা বলছো। আমি কলেজে থাকতে অনেকবার ট্যুরে এসেছিলাম বন্ধু বান্ধবদের সাথে। খাগড়াছড়ির একটা পাহাড়ে সবাই মিলে তাঁবু বানিয়ে রাত কাটিয়েছিলাম। রাতের বেলা কত যে মনোরম দৃশ্যের দেখা পাওয়া যায়,! আজকে চলো, দেখবে অনেক ভালো লাগবে। 

– জন্তু জানোয়ার যদি আক্রমণ করে ,,! 

– আমরা যেই পাহাড়ে গেছিলাম ঐখানে কিছু বানর ছাড়া আর কোন জংলি, জানোয়ার নাই। নির্ভয়ে থাকতে পারবা। আর আমি তো আছিই। তোমার কিছু হওয়ার আগে নিজের জান দিয়ে দিবো। তাও একটা ফুলের টোকা তোমার গাঁয়ে পড়তে দিবো না। 

নিপা রায়হানের শেষ কথাটা শুনে একটা হাসি মুখ করে।  রায়হান আবারো বলে উঠে,

– আচ্ছা শোনো। আমরা নাস্তা করেই বেড়োবো। যেতে যেতে বেশ সময় লাগবে। তোমার জিন্স আছে ? 

– না। আমি জিন্স পড়িনা। 

– আচ্ছা তাইলে প্লাজু তো আছে। প্লাজু সাথে একটা গোল জামা পড়িও। আর শীতের কাপড় তো আনা হয়েছে না, ঐগুলা বের করো। বড় ব্যাগটা আসার কথা। ঐটার ভিতর নিয়ে নিবো। 

– আচ্ছা ঠিক আছে। 

নিপা কথা বলে তার নজর নিচের দিকে দেয় দেখে রায়হান এখানে তার সামনেই কাপড় বদলাতে শুরু করে দিছে। নিপা এক লজ্জা মিশ্রিত মুখ নিয়ে রায়হানের দিকে চায় তারপরই অপর পাশে ফিরে। ব্যাগের দিকে চলে যায়। বলে,

– তুমিও না ,,! একদম শরম নাই। 

– বউয়ের সামনে লজ্জা শরমের কী আছে। 

– হইছে থামো। (একটু থেমে স্বাভাবিক গলায়) শশুর আব্বা ফোন দিয়েছিলো তোমার ফোনে। তুমি তো কাল রাতে ফোন সাইলেন্ট করে রাখে দিছিলা। আমি আজ সকালে উঠে দেখি ৭ টা মিসড কল। তুমি কল দাও। পড়ে নাইলে কি না কি মনে করবে। 

– ও হ্যা, বাবাকে পড়ে আমিই কল দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ভুলে গেছি। দাঁড়াও এখুনি দিচ্ছি। 

রায়হান ট্রাউজার টা পড়ে বিছানার পাশ থেকে ফোনটা হাতে নেয়। নিপা তার বাইরে যাওয়ার কাপড় আর শীতের কাপড় গুলো বের করে হাতে নিয়ে এনে বিছানায় রাখে। রায়হান তার বাবার নাম্বারে ফোন দিয়ে কানে উঠায়। রিং হচ্ছে। রিং হচ্ছে। রিং হচ্ছে,,,,,,, না বাবা ফোন তুলছে না। রায়হান ফোনটা কান থেকে নামিয়ে আবার কল দেয়। রিং হচ্ছে। কিন্তু কেউ ফোন তুলছে না। রায়হান ফোনটা কানের কাছে কিছুক্ষণ রেখে আবার নামিয়ে নেয়। বলে,

– ফোন তুলছে না তো। 

– হয়তো ব্যাস্ত আছেন। 

– হতে পারে। (একটু থেমে) আচ্ছা শোনো, আমাকে জিন্স বের করে দাও। ঘড়িতে তো সাড়ে ১০ টা বেজে যাচ্ছে। কাপড় পড়ে খেয়ে বেড়িয়ে পড়বো। 

– এইযে এখানে আছে সব কাপড়। পড়ে নাও। 

– তুমিও রেডি হয়ে নাও। তোমার তো সময় লাগবে আরো। 

– আচ্ছা তাইলে তুমি থাকো, আমি চেন্জ করে আসছি। আর ঐ টেবিলে খাবার গুলো আছে। আমি এসে বেড়ে দিচ্ছি।

– কই যাও।

– কেনো চেন্জ করতে। ওয়াশরুমে।

– চেন্জ করার জন্য ওয়াশরুমে যাওয়া লাগে,,! এখানেই করো। 

– হমম, তোমার মতো বেহায়া না ,,! যে এখানে চেন্জ করতে যাবো। 

– রাতে একসাথে ঘুমিয়ে এখন বলতেছো আমার সামনে চেন্জ করা যাবেনা। এইটা কেমন কথা। 

– এইটা এমনই কথা। (লজ্জা মুখে) তুমি বহুত পঁচা রায়হান। তোমার সামনে আমি দিনেদুপুরে ড্রেস চেঞ্জ করবো ,,! না না। আমি নাই,,!

বলেই হন হন করে ওয়াশরুমের দিকে চলে যায় নিপা।

– সুবা,,, এই সুবা,,, চলে গেলো। আমরা জামাই বউ, আর ওর নাকি এখনো লজ্জা করে। আমার ফুলটার যে কবে লজ্জা ভাঙবে ,,! খালি লজ্জায় লাল হয়ে যায়।

ঘরের কলিংবেল বেজে উঠে। রায়হান তোয়ালে টা গাঁয়ে জড়িয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। কে না কে আসছে এভাবে খালি গায়ে যাওয়া তো ঠিক না। প্যান্ট আছে নিচে, কিন্তু উপরটা যে ফাঁকা।

রায়হান দরজা খুলে। ওপাশ থেকে ডেলিভারি ম্যান তাকে একটা বড় ক্যাম্পিং ব্যাগ দেয়। রায়হান সেটা নিয়ে ভিতরে রাখে। ডেলিভারি ম্যান তার খাতায় সই করতে বলে। রায়হান কলম টা নিয়ে সই করে দেয়। ডেলিভারি ম্যান তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে যায়। রায়হান দরজা লাগিয়ে দেয়।

 

ভিতরে এসে ফ্লোরে থাকা ব্যাগটা খুলে। দেখতে থাকে ভিতরে সবকিছু ঠিকঠাক আছে কি না। বিছানায় নিপার রেখে যাওয়া শীতের কাপড় গুলো ঢুকিয়ে রাখতে থাকে সেই ব্যাগের ভিতর। কাপড় গুলো ঢুকিয়ে রেখে উঠে টিভির রিমোট দিয়ে টিভি ছেড়ে দেয়। দিয়ে বিছানায় বসে টিভি দেখতে শুরু করে।

 

_____

 

সুরাইয়া বেগমের রুম। নিচে ফ্লোরে রক্তের ছোপ শুকিয়েছে। তবে তা এখনো পরিষ্কার করা হয়নি। আলিশার ডেড বডিটা যেখানে পড়েছিলো সেখানে চক দিয়ে তার বডি টা যেভাবে ছিলো তার আকৃতি আঁকা। এদিকে বিছানার কাছে সুরাইয়া বেগমের মাথা বিহীন লাশটা যেভাবে ছিলো সেখানে তেমন ভাবে চক দিয়ে আঁকা। একজন কনস্টেবল এসবের ছবি তুলছে। পড়ার টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে বইয়ের পাতা উল্টিয়ে দেখছে রিয়াদ। হাতে হ্যান্ড গ্লাভস। বইটা বন্ধ করে টেবিলে রাখলো সে। পিছনে ফিরে কনস্টেবলদের দেখলো। আরেকজন কনস্টেবল সুরাইয়া বেগমের লাশটা যেখানে ছিলো সেখান টা দেখছে। রিয়াদ বিছানার কাছে এসে হেলে বসে। বিছানায় যেখানে বেশি রক্ত লেখেছিলো সেখান টায় আঙ্গুল দিয়ে ছোঁয়। রক্ত একদম শুকিয়ে গিয়েছে। তাজা রক্ত কতটা ঘন হয় তা সে এখন দেখছে। এভাবে রক্তরন্জিত কেস খুব কমই পেয়েছিলো সে। উঠে দাঁড়ায় রিয়াদ। দাঁড়িয়ে ভাবতে থাকে কে এদের এতোটা নিষ্ঠুর ভাবে খুন করতে পারে। খুনির কী শত্রুতা ছিলো এই দুইজন মা মেয়ের সাথে। তখনই তার পিছন থেকে এক কনস্টেবল ডাক দেয়,

– স্যার,,! 

রিয়াদ পিছনে ফিরে তাকায়। দেখে কনস্টেবল এক জোড়া হাই হিল জুতো ধরে রয়েছে। রিয়াদ বলে,

– কার জুতা ? 

– জানিনা স্যার। খাটের নিচে ছিলো এইগুলা। রক্তও লাগে আছে স্যার। 

– খাটের নিচে ছিলো ? (রিয়াদ কৌতুহলি হয়ে এগিয়ে যায়। গিয়ে হেলে বসে কনস্টেবলের সামনে। জুতো জোড়া হাতে নেয়। এক জুতার হিলের অংশে কিছুটা মাংসও লেগে আছে। জুতো জোড়ায়ও বেশ ভালো রকমই রক্ত লাগে আছে। রিয়াদ কৌতুহলি হয়ে কনস্টেবলকে বলে,

– জুতা গুলা কার হতে পারে নয়ন,,! 

– স্যার। মনে তো হয় খুনির। 

– তাইলে কী খুনি একজন মেয়ে ? একজন মেয়ে কীভাবে এই দুই মা মেয়েকে একই সাথে এতোটা নিষ্ঠুর ভাবে মারতে পারে ,,! 

– হয়তো মেয়েই হবে স্যার। দেখেন জুতা গুলার রক্তের ছাপ দেখে এমন মনে হচ্ছে উপর থেকে রক্ত ছিটকে পড়েছে। আর লাশ দুইটার মধ্যে একটার হাত ফুটো করা ছিলো। আর এখানেরও একটা হিলের সুচোলো অংশে মাংস লেগে আছে। 

– মানুষ এতোটা নির্দয় হয় কিভাবে,,! খুন গুলা করতে একবারও বুক কাপলো না ,,! 

– আজকালকার মানুষ টাকার জন্য সবকিছু করতে পারে স্যার। 

– হমম। টাকা, এই টাকাই সম্পর্ক গড়ে দিতে পারে আবার দুনিয়া ছাড়াও করতে পারে। (একটু থেমে) আচ্ছা আমি এখন দিনাজপুর শহরে যাবো একটু। লাশ গুলার পোস্টমর্টেমের রিপোর্ট আনতে হবে। আর তার সাথে একজন ডাক্তারকে নিয়েও আসতে হবে এই রক্ত গুলার স্যাম্পল নিয়ে পরীক্ষা করার জন্য। তুমি আর সবুজ এখানেই থাকবা। আমি না আসা পর্যন্ত যাবানা। আর কাউকেই এই ঘরে ঢুকতে দিবানা। বুঝছো আমি কী বলছি ? 

– ওকে স্যার। সব বুঝে গেছি। 

– হুমম। বি কেয়ারফুল। 

রিয়াদ হাতে থাকা টুপিটা মাথায় পড়ে চলে যেতে থাকে। কনস্টেবল আবার দেখতে থাকে ঘরে কিছু আছে কি না। 

 

রিয়াদ দরজা দিয়ে বেড়োনো মাত্রই এক মহিলাকে দরজার আড়ালে দেখতে পায়। রিয়াদ ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে তাকায়। মহিলাটা ছিলো সাথী বেগম। রিয়াদ অবাক গলায় বলে উঠে,

– আপনি ? আপনি কে? এখানে কী করছিলেন? 

– আ,আমি সাথী। এমনিই এখানে দাঁড়ায়ছিলাম। 

– সাথী ? কোন সাথী ? আপনি এই বাড়ির কেউ ? 

– হ,হ্যা। আমি এই বাড়ির ছোট বউ। 

– যারা খুন হয়েছে তারা আপনার কী হয় ?

– সুরাইয়া আমার ননদ ছিলো। 

– যার মাথা ছিলোনা সে ? 

সাথী বেগম মাথা নাড়ায়। তার চোখ মুখে ভয় স্পষ্ট। কিছুটা কাঁদো কাঁদো ভাব। রিয়াদ আবার বলে,

– আপনি কী শাহেদ চাচার বউ ? 

সাথী বেগম আবার মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলে।

– আপনার কী মনে হয়। এদেরকে কে মারতে পারে ? 

সাথী বেগম ছলছল চোখ নিয়ে রিয়াদের দিকে তাকায়। তার মন চাইছে সব বলে দিতে। কিন্তু তার ভয় হচ্ছে। তার ছেলেটার যদি তখন কিছু হয়ে যায়। সাথী পিছন ফিরে করিডোরের মুখের দিকে তাকায়। দেখে সুমনা বেগম ডায়নিং টেবিলের ওখান থেকে এক নজরে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সাথী বেগমের বুক হঠাৎ কেঁপে উঠে। সাথে সাথেই সাথী সামনে তাকিয়ে মুখে ওড়না চেপে বলে,

– জানিনা। আমি, আমি কিচ্ছু জানিনা। 

বলেই সেখান থেকে যত দ্রুত সম্ভব চলে যেতে থাকেন। কোমরের ব্যাথা থাকায় তিনি দৌড়াতে পারছিলেন না। তবুও যতটা তাড়াতাড়ি হাঁটা যায় তিনি পা চালিয়ে যেতে থাকেন। রিয়াদ অবাক চোখে চেয়ে থাকে সাথী বেগমের দিকে। বিরবির করে বলে,

– উনি এতো ভয় পেয়ে ছিলেন কেনো ,,! এমন মনে হলো যেনো উনি কিছু একটা আমায় বলতে চাইছেন ,,! 

 

____

 

খাঁন বাড়ির পিছনের সাতরঙা পুকুর। পুকুরে গোসল করছে রাফসান। আকাশ পরিষ্কার। হালকা রোদ উঠেছে। পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে সোনালী। হাতে গামছা, আর লুঙ্গি। সোনালীর পড়নে খয়েরী রঙের থ্রী পিস। রাফসান পুকুরে আরেকটা ডুব দিলো। বুদবুদ ভেসে উঠলো পানির উপরে। সোনালী পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে একবার চেয়ে আবার পুকুরের দিকে তাকায়। রাফসান ডুব দিয়ে উঠে। পুকুরের মাঝে ভাসতে থাকে। বলে,

– সোনালী, তুমিও আসো। 

– আপনি গোসল করেন। আমি পড়ে একলা গোসল করে নিবো। 

– আরে আসো আসো। মজা হবে। 

– না। আপনিই মজা করেন।

– কাপড় এনেছো ,,! 

– হ্যা। হাতেই আছে। 

– দাঁড়াও তাইলে আমি পাড়ে আসছি। তুমি যেহেতু আসবেনা। একলা একলা বেশিক্ষণ গোসল করে মজা নাই‌

বলেই রাফসান এক ডুব দেয় পুকুরে। সাঁতরে এসে পুকুর পাড়ের কাছে ভেসে উঠে। পুকুর পাড় টা সিঁড়ি দিয়ে বাঁধানো। পুকুর টাও এই বাড়ির মতোই বেশ পুরোনো আমলের। রাফসান সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে উঠে। পড়নে কিছু নেই। সোনালী তার দিকে একবার নজর দিয়েই গামছাটা ফিকে মারে। রাফসান গামছাটা ধরে। শরীর মুছতে থাকে। কিন্তু গায়ে জড়ায় না। সোনালীও তেমন একটা অস্বস্তি বোধ করেনা। এগিয়ে যায় রাফসানের দিকে। এগিয়ে গিয়ে তাকে লুঙ্গিটা দেয়। রাফসান লুঙ্গি টা হাতে নেয়। বলে,

– তুমিও আসতা। মজা করতাম। 

– আমি বাইরে যাবো। কাজ আছে।

– আব্বা কাজ দিছে ? 

– হমম।

 রাফসান গামছা দিয়ে শরীর টা কিছুটা মুছে গামছাটা সোনালীর হাতে দেয়। তার হাত থেকে লুঙ্গিটা নেওয়ার সময় তার স্তনে হাত দেয়। সোনালী তার হাত ছাড়িয়ে দেয়। রাফসান হাসছে। লুঙ্গিটা নিয়ে পড়তে থাকে। বলে,

– তোমার যে অভিনয়,,! আমি তো প্রথম বার ধরতেই পারিনাই। আমি একবার এভাবে হাত দিছিলাম মনে আছে ? ঐযে রাস্তায়। তুমি সে কি কান্না। কেউ যদি ঐ দৃশ্যটা দেখতো, আর ওদের যদি আমি বলতাম যে তুমি বেশ্যা। বিশ্বাসই করতো না। 

– আমি বেশ্যা না। 

– হ্যা জানি। তবে তোমার চলন ভঙিমা পশ্চিমাদের মতো। সর্টস, জিন্স, এসব গ্রামের মেয়েরা তো দূর, শহরের গুলা পড়তেও ১০ বার ভাবে। 

– তাড়াতাড়ি শরীর মুছে দিনাজপুর শহরে যান। উনি বলেছেন তাড়াতাড়ি যেতে। 

– কে ? আব্বা ? 

– হম। আর যাওয়ার সময় টালি খাতাটা নিয়ে যেতে বলছে।  আপাতত এইকয়দিন নিচের ঘরের কাজ কম থাকবে। ততদিনে বাকি কাজ আগায় নিতে বলছে। 

– আচ্ছা ঠিক আছে। 

– আর বাড়িতে পুলিশ আছে। উনি বলছেন খুব সাবধানের সহিত চলতে,আর কথা বলতে। পুলিশ যেন মার্ডার কেস বা নিচের ঘর কোন বিষয়েই না জানতে পারে। 

– বাবা ওদের টাকা দিয়ে কিনে নিতে পারে না ! তাইলে তো ঝামেলা মিটেই যায়।

– আমাদের গ্রামের অফিসার কাজে হাত দিছে। আর আপনি জানেনই যে গ্রামে আমাদের সম্মান কতটা উপরে ,,! অন্য পুলিশ হলে উনি ঠিকই ম্যানেজ করে নিতেন। 

– হম। (একটু থেমে) আচ্ছা আজকে রাতে আমার ঘরে আসিও। 

– কেনো ? 

– আনন্দ করবো। 

– উনি বিষয়টা জানলে কিন্ত,,,,,,

– আরে আব্বা জানবে না। খালি কয়েক ঘন্টারই তো ব্যাপার। মোটা অংকের বখসিস পাবা ,,! 

– আমি অন্য মেয়ে এনে দিবো। আমি যেতে পারবোনা। 

– ক্যান। তুমি আসলে সমস্যা কোথায়,,! আর (সোনালীকে আপাদমস্তক দেখে) তোমার রুপ আমার মনে ধরছে খুব। একবার টেস্ট না করলে যে আমার জীবন বৃথা,,! 

– ১ লাখ লাগবে। পারবেন দিতে ,,! 

– আরে বাপরে,,! এতো ,,! 

– ভার্জিন ,,! 

– সত্যি? 

– হম।

– কয়েক কিস্তিতে টাকাটা পরিশোধ করা যায় না ,,! 

– আগে টাকা, পড়ে কাজ। আর কাজ টাও আমার মর্জি অনুযায়ী যায়গায় হবে। 

– হেইস। কাজটাও তোমার পছন্দের যায়গায় হবে ,,! আমার রুমে হবে না ,,! 

– না। যদি ইচ্ছা থাকে তো আমাকে বিকেলের মধ্যে বলবেন। আর যদি না থাকে তো (একটা থেমে) নাই। 

বলেই সোনালী চলে যেতে ধরে। তখনই রাফসান তার হাত ধরে ফেলে। সোনালী ফিরে তাকায়। মুখে গাম্ভীর্যতা। রাফসান বলে,

– বিকালে টাকা পেয়ে যাবা। কোথায় আসতে হবে বলো।

কথাটা শুনেই সোনালী শুনেই ঠোঁটের কোনে ফুটে উঠে এক রহস্যময় হাসি। এক গভীর চাহনি দেয় রাফসানের দিকে। বলে,

– দম আছে ,,! 

রাফসান সোনালীকে হেঁচকা টান দিয়ে কাছে টানে, তার কপাল সোনালীর কপালের সাথে লাগায়। সোনালীর কাঁধে দুই হাত দিয়ে ধীর গলায় বলে,

– তা না হয় যায়গা মতো দেখবে ,,!  

 

_______

 

– কাল বাদে পরসু অমাবস্যা। এই অমাবস্যার জন্যই কিন্তু আমাদের এতো অপেক্ষা,,! (তানিয়া)

– পরসুদিন ২১ তারিখ? (দিথী)

– হ্যা। (একটু থেমে) সেইদিন অমাবস্যার আঁধারে চারপাশে ছেয়ে যাবে। আসুভে সহ সব খারাপ শক্তি গুলো একে একে জেগে উঠবে। আমাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। আমাদের খুব সাবধানে কাজটা শেষ করতে হবে। নাইলে কিন্তু দেহের প্রাণ টা পর্যন্ত যাওয়ার সম্ভাবনা আছে ,,! 

– শুধু ঐ আংটিটা ছাড়া আমাদের কাছে কোন আর হাতিয়ার নেই ? (সামিহা)

– না। শুধু ঐ আংটিটাই আমাদের একমাত্র সম্বল। ঐটা দিয়েই আসুভে নামক খারাপ আত্মাটাকে আমাদের ধ্বংস করতে হবে। চিরতরে মুছে ফেলতে হবে। 

– আসুভে তখনই তার শক্তি ব্যবহার করতে পারবে যখন সে ঐ পুর্নজন্ম হওয়া মেয়েটার গায়ে প্রবেশ করতে পারবে তাই না ,,! 

– হ্যা। তখনই সে পূর্ণ শক্তি লাভ করবে। 

– আচ্ছা আমরা যদি মেয়েটাকে মেরে ফেলি ,,! তবে তো আর আসুভে দেহে প্রবেশ করতে পারবেনা,,! (সামিহা)

– ওকে মারা এতো সহজ না। আসুভে সহ তান্ত্রিক ওকে সবসময় প্রটেক্ট করবে। ওর গাঁয়ে একটা স্পর্শও লাগতে দিবেনা।

– তাইলে এখন আমাদের উপায় ,,! 

– ঐ ছেলেটা কী চলে গেছে ? 

– কোনটা ? আহনাফ ? 

– হ্যা। 

– পরসুদিন চলে গেছে। 

– ওর গাঁয়ের এক ফোঁটা রক্ত লাগবে। ওর গাঁয়ের এক ফোঁটা, সামিহার গাঁয়ের একফোঁটা আর,,,,,

– আর রাশেদের গাঁয়ের একফোঁটা। 

– হম। এই তিনজনের রক্ত দিয়ে আংটিটাকে ভিজাতে হবে। সাথে দিথী, তোমারও রক্ত লাগবে। 

– কিন্ত আহনাফকে আমি এখন কীভাবে পাবো ,,! ওতো ঢাকায়।

– তোমার মা’কে বলো। উনি এনে দিবেন। 

– আচ্ছা। (একটু থেমে) ঐদিন মা বলেছিলো আমার পায়েশে বিষ মিশানো আছে। তাই তোমার শিখিয়ে দেওয়া মন্ত্রটা পড়েই সেটা খাই। তান্ত্রিক আমাকে মারার জন্য ওর দলবল সবাইকে লেলিয়ে দিছে আমার পিছনে। 

– তোমার মা বলেনি বিষ কে মিশিয়েছিলো ? 

– না। বলেনি। শুধু বলেছে বিষ আছে, মন্ত্র পড়ে খেতে। 

– এখন তাইলে আমাদের কী করা উচিত? (সামিহা)

– এখন অমাবস্যার অপেক্ষা করা ছাড়া আর আমাদের কাছে কোন পথ নেই। আমাদের সুযোগ খুঁজতে হবে ঐ মেয়েটাকে মারার জন্য। ঐ মেয়েটা এখন নিশ্চয়ই খাবার খাওয়ার জন্য ঐ বাড়ি থেকে বের হয়। ও এখন মানুষ। ওরো আমাদের মতোই খিদা লাগবে। আমাদের চোখকান খোলা রাখতে হবে। যখনই আমরা তাকে বাগে পাবো। একদম খেলা শেষ করে দিতে হবে। 

– হমম। বুঝতে পেরেছি। (একটু থেমে) আচ্ছা মেয়েটা যদি নিজে থেকে এসব পিছিয়ে যায়, তখন ? (দিথী)

– মেয়েটা কেনো নিজে থেকে পিছে হটবে ? কীসের জন্য হটবে ? ওর তো কোন পিছুটান নাই। ও পিছু হটবে না। 

– ওহ,,। আচ্ছা ঠিক আছে আমি মা’কে বলবো রক্ত নিয়ে আসতে। আর তার সাথে (তখনই জানালার দিকে নজর যায় দিথীর। হঠাৎ চিৎকার দিয়ে বলে উঠে,

– কে ওখানে ,,,,,! 

 

চলবে ,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

 

উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন :: ২(মুখোশ) 

পর্ব:: ৬৩

লেখক:: মির্জা শাহারিয়া

 

– এখন অমাবস্যার অপেক্ষা করা ছাড়া আর আমাদের কাছে কোন পথ নেই। আমাদের সুযোগ খুঁজতে হবে ঐ মেয়েটাকে মারার জন্য। ঐ মেয়েটা এখন নিশ্চয়ই খাবার খাওয়ার জন্য ঐ বাড়ি থেকে বের হয়। ও এখন মানুষ। ওরো আমাদের মতোই খিদা লাগবে। আমাদের চোখকান খোলা রাখতে হবে। যখনই আমরা তাকে বাগে পাবো। একদম খেলা শেষ করে দিতে হবে। 

– হমম। বুঝতে পেরেছি। (একটু থেমে) আচ্ছা মেয়েটা যদি নিজে থেকে এসব পিছিয়ে যায়, তখন ? (দিথী)

– মেয়েটা কেনো নিজে থেকে পিছে হটবে ? কীসের জন্য হটবে ? ওর তো কোন পিছুটান নাই। ও পিছু হটবে না। 

– ওহ,,। আচ্ছা ঠিক আছে আমি মা’কে বলবো রক্ত নিয়ে আসতে। আর তার সাথে (তখনই জানালার দিকে নজর যায় দিথীর। হঠাৎ চিৎকার দিয়ে বলে উঠে,

– কে ওখানে ,,,,,! 

সাথে সাথেই উপস্থিত ৩ জন চকিতে জানালার দিকে তাকায়। দিথী বিছানা থেকে উঠে হনহন করে এগিয়ে যায় জানালার দিকে। গিয়ে জানালার পর্দাটা সড়ায়। দেখে কেউ নাই। পিছন থেকে তানিয়া বলে,

– কেউ ছিলো ওখানে ? 

– আমি একজনের ছায়া দেখছিলাম মনে হলো। 

– ছেলে না মেয়ে ? 

– ততটাও বুঝতে পারিনি। হয়তো মেয়ে হবে‌।

– তাইলে নিশ্চিত হনুফা কারো শরীরে প্রবেশ করে জানালার পাশে এসে আমাদের কথা শুনছিলো। সে তো এখন আর এই ঘরে ঢুকতে পারেনা, এইজন্য এইরকম করে লুকিয়ে লুকিয়ে কথা শুনতে আসছে। 

দিথী জানালার দিক থেকে চলে আসে। তার মুখে কিছুটা চিন্তার ছাপ। সে যেন জানতো কে এসেছিলো জানালার ওপাশে। আর যে এসেছিলো সে যে দিথীর মাথা ব্যাথার কারণ তাও দিথীর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। দিথী এসে বিছানায় বসে। তানিয়া আবার তাকে কিছু বলতেই যাবে তখনই ঘরের দরজায় কারো কড়াঘাতের আওয়াজ আসে। দিথী চমকে উঠে। তবে বাকিরা স্বাভাবিক ভাবেই নিয়েছিলো ব্যাপার টা। আবার দরজায় কড়াঘাত। ভেসে আসলো শেফালীর কন্ঠ,

– তানিয়া আফা, খালাম্মা আপনাগোরে নাস্তা খাইতে আইতে কইছে‌। 

– যাচ্ছি,,, (দিথীর দিকে ফিরে) এসব নিয়ে তাইলে পরে আলাপ করা যাবে কেমন ,,! 

– ঠিক আছে। আর আমার বাবাকেউ একটু দেখে যেতে হবে‌। ২ দিন পর শাহারিয়ার সাথে চলে যাবো। পরে কখন আসতে পারি ঠিক নেই। 

– আচ্ছা চলো। 

দিথী বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায়। চেয়ারে বসে থাকা সামিহা উঠে গিয়ে দরজার ছিটকিনি খুলে। বিছানা হতে তানিয়া আর কানিজও নেমে যায়। দিথী সবার শেষে ঘর থেকে বের হয়। আর বের হওয়ার আগে এক নজর দেয় জানালার দিকে। দিয়েই আবার পিছনে ফিরে চলে যায় ঘরের বাইরে। 

জানালার বাইরের দিক। উপরের গাছের পাতা নিচে পড়ে জমে স্তুপে পরিণত হয়েছে। একজনের পায়ের জুতো দেখা যায়। এক জোড়া কালো বুট। সেই জুতো পড়া ব্যাক্তি হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতে থাকে। তার হাত থেকে একটা আধ খাওয়া সিগারেট মাটিতে পড়ে যায়।

 

_____

 

বাস থেকে নামলো নিপা আর রায়হান। উপরের হালকা রোদের ঝিলিক এসে পড়ছে তাদের উপর। এইটা খাগড়াছড়ির মহালছড়ি বাসস্ট্যান্ড। সময়টা এখন দুপুর। তারা ১১ টার দিকেই রেডি হয়ে হোটেল থেকে বেড়িয়ে পড়েছিলো। এখানে বাসে করে আসতে আসতে দুপুর ২ টো বেজে গেছে। বাসের কন্ডাক্টর কেবিন থেকে বড় ব্যাগটা নামিয়ে দেয়। রায়হান সেটা ধরে একটু ঝেড়ে কাঁধে নিয়ে নেয়। বাস টা চলে যায়। ব্যাগ টা লম্বার দিক দিয়ে বেশ বড়ই বলা যায়। পাহাড়ে আরোহণের সময় আরোহীরা যেই ব্যাকপ্যাক ইউজ করে দেখতে প্রায় তেমনি। রায়হানের মাথায় একটা ক্যাপ, পড়নে একটা লাল রঙের টি শার্ট আর খয়েরি রঙের থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট। নিপার পড়নে একটা গোল জামা আর প্লাজু। মাথায় হিজাব করেছে সে। রায়হান নিপার হাত ধরে। এগিয়ে যেতে থাকে একটা হোটেলের দিকে। খাওয়া দাওয়া করে তারপর রওনা দিবে পাহাড়ের উপরে উঠার জন্য। এদিকটায় বাস স্ট্যান্ডের পাশেই একটা হোটেল রয়েছে। নামটাও একটু আনকমন। ‘হোটেল ভুরিভোজ’। রায়হান আর নিপা সেটাতে গিয়েই তাদের খাওয়া দাওয়া সেড়ে নেয়। 

 

কিছুক্ষণ পর,

হোটেল থেকে বেড়োয় তারা দুজন। রায়হান নিপার হাত ধরে। দু’জন হেঁটে হেঁটে এগিয়ে যেতে থাকে বাসস্ট্যান্ড পার হয়ে সামনে থাকা গাড়ি স্ট্যান্ডের দিকে। কিছুটা সামনে এগোতেই তারা পেয়ে যায় গাড়ির স্ট্যান্ড। এই গাড়ি গুলো পাহাড়ী পথ ধরে উপরে গিয়ে এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে চলে যায়। তারপর অপর পাহাড়ের পৃষ্ঠদেশে পৌছে দেয়। রায়হান একটা গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। গাড়িতে বেশকয়েকজন পর্যটক উঠেছিলো। গাড়ি গুলাকে এখানের লোকেরা ‘চান্দের গাড়ি’ বলে। এমনিতে দেখতে শহরে চলা লেগুনার বড় ভাইদের মতো লাগে গাড়ি গুলোকে। পিছনের দিকে বসার যায়গা থাকে। দুই সাড়িতে লোকজন বসে। একেক সাড়িতে ৬ জন এর বেশি বসা যায় না। নিপা আগে উঠে গিয়ে বসলো।  নিপার পাশে একটা মেয়ে বসা ছিলো। পোশাক দেখে এখানকার লোক মনে হয়না। হয়তো পর্যটক হিসেবে এসেছে। মেয়েটা ফোন টিপছে। রায়হান গাড়ির লোকদের বলে দিলো যে সে কোথায় নামবে। বলে তাদের দুইজনের ভাড়া আগেই দিয়ে উঠে পড়ে সে। উঠে নিপার পাশে গিয়ে বসে। আর ১ জন হলেই ১২ জন হয়ে যাবে। তখন গাড়ি ছাড়বে। গাড়ির লোকেরা উপরের ছাওনিটা খুলে দিলো। চান্দের গাড়ির উপরের ছাওনিটা একটা মোটা প্লাস্টিকের কভারের মতো। বৃষ্টি আসলে দিয়ে দেয় আবার বৃষ্টি না থাকলে খোলা রাখে। এতে চারপাশের পাহাড়ি সৌন্দর্য গুলো বেশ দারুন ভাবে উপভোগ করা যায়। 

আরেকটা মেয়েও উঠে পড়ে গাড়িতে। মোট ১২ জন হয়ে যায়। গাড়ির কন্ডাক্টর সামনে গিয়ে ড্রাইভারের পাশে বসে আর গাড়ি ছাড়ার নির্দেশ দেয়। গাড়ি চলতে শুরু করে। আবহাওয়া খুব বেশি গরম না। এখানে বলে দুই তিন দিন আগেও বেশ শীত আর কুয়াশা ছিলো। কিন্তু আজ দিয়ে ২ দিন হলো রোদের দেখা পাওয়া যাচ্ছে। তাই ঠান্ডার অনুভূতি টা খুব বেশি হচ্ছে না। গাড়ি চলতে চলতে প্রবেশ করলো পাহাড়ী পথে মুখে। পথ টা পাহাড়ের চারপাশ দিয়ে ঘুড়ে উপরের দিকে চলে গেছে‌। গাড়িটা খুব জোড়ে চলছে না। একটা মধ্যম স্পিড বজায় রেখে চলছে। ধীরে ধীরে গাড়িটা উর্ধমুখী হয়। অর্ধাৎ তাদের গাড়ি এখন পাহাড়ী পথ দিয়ে উপরে উঠা শুরু করেছে। নিপা চারপাশ মাথা ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে দেখছে। তার মুখ হাসৌজ্জল। এইরকম পরিবেশে সে এই প্রথম ঘুড়তে আসলো। পাহাড়ি বনভূমির গাছপালার ফাঁক-ফোকর দিয়ে মাটিতে রোদ এসে পড়ছে। পাখি উড়ছে এক গাছ থেকে আরেক গাছে। নিপা পিছনে ফিরে দেখে তারা বেশ কিছুটা উপরে উঠে গেছে। আস্তে আস্তে নিচের ভূমির বস্তু গুলো ক্ষুদ্র হয়ে আসছে। দূরে অনেক পাহাড় দেখা যাচ্ছে। পাহাড়ের চূড়া মেঘ দিয়ে আবৃত। তাদের মাথার উপরের সূর্য টাও এক পেঁজা তুলোর মতো মেঘের আড়ালে মুখ লুকায়। নিপা রায়হানের হাত জড়িয়ে ধরে রেখেছে। আর চারপাশ দেখছে। রায়হান বলে দিচ্ছে কোন পাহাড়ের নাম কি। এখানে কোন কোন অধিবাসী থাকে। নিপা সেই কথা গুলো মন দিয়ে শুনছে আর দেখছে। গাড়ি থেকে নিপা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে থাকা কিছু চাকমা নারীদেরও দেখা পায়। উপরে লাল রঙের বড় ব্লাউজ, আর নিচে লুঙ্গির মতো এক ভারি কাপড় পরা। নিপা আঙ্গুল দিয়ে সেগুলো রায়হানকে দেখায়। রায়হান দেখে। নিপাকে বলে সেই চাকমাদের খাদ্য ভাস আর তাদের উৎসব সম্পর্কে। নিপা বেশ আগ্রহের সহীত শুনে। রায়হান নিপাকে বলে দাড়াতে, এখানে দাঁড়ানোও যায়। গাড়িতে থাকা কয়েকজন দাড়িয়েও আশপাশের ভিউ নিচ্ছিলো। নিপাও দাড়িয়ে একবার দেখতে চায়। উঠে দাঁড়ায়। তবে তার একটু ভয় হচ্ছিলো, তাই সে রায়হানের কাঁধ শক্ত করে এক হাত দিয়ে ধরে। উপরে ছাওনির লোহার মাঝ দিয়ে সে উঠে দাঁড়ায়। বাতাসে তার হিজাবের নিচের প্রান্ত উড়ছে। পাগলা দখিনা বাতাস এসে মুখে বাড়ি খাচ্ছে। নিপার নিঃশ্বাস নিতে যেনো একটু কষ্টই হয়ে যায়। নিপা মাথা ঘুরিয়ে চারপাশ দেখে। এইবার সে আরো ভালো ভিউ পাচ্ছিলো। পাশ ফিরে দেখে পাহাড়ের নিচের গ্রাম আর ঘর গুলা খুব খুব ছোট দেখাচ্ছে। দূরের মেঘে ঢাকা পাহাড় গুলোকেও ভালো ভাবে দেখা যাচ্ছিলো। হঠাৎ গাড়িটা চলন্ত অবস্থায় একটু ঝাকুনি দিয়ে উঠে। নিপা ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি আবার বসে যায়। রায়হানকে জড়িয়ে ধরে। তার মনে হচ্ছিলো আরেকটূ হলেই যেন সে গাড়ি থেকে পড়ে গিয়ে পাহাড়ের খাদের কিনারায় হারিয়ে যেতো। রায়হান তাকে ভালোভাবে এক হাতে আলিঙ্গন করে ধরে রাখে। আরেক হাত দিয়ে সে উপরের লোহা ধরে ছিলো। নিপা বেশ ভয় পেয়েছে। রায়হান তাকে শান্ত করায়। বলে যে ‘ভয়ের কিছু নাই। কেউ পড়বেনা এখান থেকে।’ নিপা তাও এখানো বসে তাকে জড়িয়ে ধরে আছে। সময়টা বেশ ভালো কাটে দুজনের। গাড়ি চলে যায় পাহাড়ের চারপাশ ঘেড়া রাস্তা গুলো দিয়ে। 

 

_______

 

মেম্বার বাড়ির আঙিনা থেকে বারান্দায় উঠলো দিথী। মাথার চুল গুলো ভেজা। গোসল করে আঙিনায় চুল ঝাড়ছিলো ও এতোক্ষণ। ও বাড়ি থেকে আসতে আসতে প্রায় দুপুর হয়ে গেছে। এসেই গোসল করে নিলো। আজ রোদ উঠেছে কিছুটা। তবে আকাশে মেঘও আছে। দিথী বারান্দায় উঠে একটা চেয়ার টেনে বসে। হাতের নখ গুলো দেখতে থাকে। ওর নখ গুলো লম্বা লম্বা। যত্ন করে এতোটা বাড়িয়েছে সে। নেইলপলিশ করেনি। নেইলপলিশ টা ওবাড়ি থেকে আনাও হয়নি‌‌। দিথী নখ গুলো দেখে হাত নামাতেই দেখে আঙিনা দিয়ে শিউলি বেগম আর লায়লা আসছে। শিউলি বেগমের হাতে একটা টিফিন বাটি। তারা গিয়েছিলো ক্লিনিকে। আফাজের জন্য খাবার নিয়ে। তবে তাদের মুখ মলিন। দিথী তাদের দেখে উঠে দাঁড়ায়। এগিয়ে যায় বারান্দার দরজার দিকে‌। শিউলি বেগমের হাত থেকে টিফিন বাটিটা নেয়। বলে,

– মা, খাবার খায়নি ? 

– না গো মা, আফাজ কিচ্ছুই খাইতাছে না। কথাও কয়না। 

– খালি চুপচাপ কান্দে ভাবি। আমার অনেক মায়া লাগতেছিলো তারে দেইখা। (লায়লা)

– মনে যে অনেক বড় আঘাত পাইছে, ঐজন্য পাথর হয়ে গেছে। 

– শাহারিয়া কই ? 

– গোসলে গেছে মা। 

– তুমি কহন আইলা ঐ বাড়ি থেইকা ?

– এইতো মা এসে গোসল করে বের হলাম। 

– আচ্ছা তাইলে খাইতে আহো। আমার কিচ্ছু ভাল্লাগতাছে না। আফাজের এমন অবস্থা আগে আমি কহনো দেহি নাই‌। পোলাডা একদম নিভা গেছে। চোখ গুলা সবসময় ভিজা। আলিশারে মনে হয় অনেক ভালোবাসতো। 

– হয়তো। ভালোবাসার মানুষের লাশ নিজ চোখে দেখার ব্যাথা যে অনেক মা ,,! 

– আচ্ছা আহো টেবিলে। খাবার বাইড়া দিতাছি খাইয়া লও। শাহারিয়াও চইলা আইবো ততক্ষণে গোসল দিয়া। 

– ঠিক আছে মা। 

শিউলি বেগম চলে যান তার ঘরের দিকে। তার পিছু পিছু বারান্দায় উঠে লায়লা। লায়লা দিথীর দিকে তাকিয়ে বলে,

– ভাবি, আপনের লগে আমার কিছু কথা আছে। 

– কী কথা ? 

– আহেন, কইতাছি। 

লায়লা দিথীর হাত ধরে তাদের ঘরের দিকে নিয়ে যেতে থাকে। দিথীর বুঝে আসেনা হঠাৎ লায়লা তাকে কী বলার জন্য তার ঘরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। লায়লা টেবিল পেড়িয়ে দিথীকে নিয়ে তার ঘরের দরজার সামনে আসে। দিথীকে নিয়ে ভিতরে চলে যায়। দরজায় পর্দা ফেলে দেয়। 

 

______

 

চান্দের গাড়ি এসে থামে পাহাড়ের একটা যায়গায়। এটা বলতে গেলে মাঝপথই বলা যায়। পাহাড়ের এই উচ্চতায় কিছুটা সমতল যায়গা আছে। যায়গাটা গাছপালা দিয়ে ঘেড়া। রায়হান নিপা নেমে পড়ে গাড়ি থেকে। চান্দের গাড়িটা আবার চলে যেতে থাকে। নিপা রায়হানের হাত ধরে আছে। রায়হান নিপাকে নিয়ে রাস্তা থেকে গাছপালা গুলোর পাশ টায় এসে দাঁড়ায়। নিপা বলে,

– পড়ে তখন কীভাবে ফিরবো ? 

– কাল সকালে যখন আরো গাড়ি এই রাস্তা দিয়ে নিচের দিকে যাবে তখন সেটায় উঠে পড়বো। 

– কিন্তু সব গাড়িই তো ফুল থাকে। আমাদের দুইজনের তো যায়গা মিলবে না। 

– আমার নিচের পরিচিত কয়েকজন ড্রাইভার আছে। ফোন দিলে খালি গাড়িও পাঠিয়ে দিবে। চিন্তা করোনা। চলো এগিয়ে যাই। 

নিপা আর কিছু বলেনা। রায়হান নিপার হাত ধরে এগিয়ে গাছপালার অংশটায় ঢুকে। গাছপালার ঘনত্ব বেশি একটা নেই। ৪-৫ ফিট দূরে দূরে একেকটা গাছ। গাছ গুলোর মধ্যে কিছু নীম গাছ, কিছুবা মেহগনি গাছ। সাথে নাম না জানা আরো অনেক গাছ। নিপা চারপাশ দেখতে দেখতে রায়হানের হাত ধরে ভিতরে এগোচ্ছে। সময়টা বিকেল। আলো তাই কমে এসেছে প্রায়। গাছপালা গুলোর বেশ খানিকটা ভিতরে আসায় পাখির কিচিরমিচির ডাক ভালো রকমই শোনা যাচ্ছে। নিপার চোখে পড়ে দূরে। দেখে এক গাছ থেকে অন্য গাছে লাফিয়ে যাচ্ছে দুই বানর। এইরকম পরিবেশে সে এই প্রথম এলো। 

রায়হান নিপাকে নিয়ে একটা যায়গায় এসে থামে। এখান টা কিছুটা ফাঁকা। দেখে মনে হচ্ছে আগে গাছ ছিলো তবে পরে কোন কারণে গাছ গুলো কেটে ফেলা হয়েছে বা মরে গিয়েছে। রায়হান তার কাঁধ থেকে ব্যাগ টা নামায়। এক বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে। নিপা বলে,

– এখানে থাকবো আমরা ? 

– হ্যা। এইখানে থাকবো। আগে যখন বন্ধুদের সাথে এসেছিলাম, তখন এখানেই ছিলাম। 

– কয়জন ছিলা তখন তোমরা ? 

– এইতো ৫-৬ জন। দুইটা তাঁবু বানিয়ে ছিলাম তখন। 

– এইখানে আগে গাছ ছিলো ? 

– হ্যা। এই যায়গায় বজ্রপাত হইছিলো। এইজন্য এখানকার কয়েকটা গাছ জ্বলে যায়। তারপর থেকে এখানে আর গাছ জন্মায়নি। শুধু ঘাস আছে। 

– আমার তো ভয় হচ্ছে। না জানি কখন আবার হারিয়ে যাই এই গাছপালার মাঝে।

– আরে হারাবেনা হারাবেনা। এই গাছপালার অংশটুকু আয়তনে খুবই কম। পাহাড়ের মাঝামাঝিতে ছোট্ট একটা সমতল যায়গা বলতে পারো এটাকে। (একটু থেমে মাথার উপরের দিকে তাকিয়ে) একটু পরেই রাত নামবে। তাঁবু বানিয়ে ফেলতে হবে আমাদের। আসো কাজে হাত লাগাও। 

নিপা এগিয়ে আসে। রায়হান ব্যাগের চেইন খুলে তাঁবু বের করে। দড়ি, হাতুড়ি আর বড় বড় লোহার পিন বের করে। রায়হানের কাছে এসে হেলে বসে নিপা। রায়হান ব্যাগ থেকে কী কী বের করছে তা সে দেখছে। তাঁবু বানানোর প্রায় সব জিনিস গুলো বের করে নিয়ে রায়হান তাঁবুর এক কোন নিয়ে একটু এগিয়ে যায়। নিপাও সাথে সাথে এগোয়। একটা যায়গায় ঘাস গুলো হাত দিয়ে কিছুটা তুলে দেয় রায়হান। তুলে দিয়ে তাঁবুর এক কোন গাড়ার জন্য লোহার লোহার পিন সেখানে ধরে। তারপর নিপাকে বলে,

– হাতুড়ি মারতে পারবা ? 

– যদি তোমার হাতে লেগে যায় ! 

– আচ্ছা তাইলে তুমি এখানটায় ধরো। শক্ত করে ধরবে কিন্তু। 

– ঠিক আছে। 

রায়হান সেই লোহার পিনটা নিপাকে ধরতে দেয়। নিপা শক্ত করে ধরে। রায়হান হাতুড়ি দিয়ে পিনটার মাথায় বাড়ি দিতে থাকে জোরে জোরে। নিপার হাতও তাতে কিছুটা কেপে কেপে উঠছে। নিপা মাথা উঠিয়ে কর্মঠ রায়হানের মুখ খানা দেখে। রায়হানের সম্পূর্ণ মনযোগ কাজের দিকে। হালকা ঘাম বেড়িয়েছে কপালে। নিপা এক মিষ্টি স্মাইল দিয়ে নিচের দিকে তাকায়। ভালো করে ধরে থাকে লোহার পিনটা। রায়হান বেশ কয়েকবার হাতুড়ি দিয়ে পিটানোর পর লোহাটা ভালোভাবে মাটি ভেদ করে ঢুকে। রায়হান আর নিপা উঠে দাঁড়ায়। রায়হান কোমরে হাত দিয়ে বলে,

– মাটিটা শক্ত হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি লোহাটা ঢুকছেই না ,,! 

– এভাবে করেই বাকি ৩ কোন গাড়তে হবে ? 

– হ্যা। চলো আরেকটা কোন গেড়ে ফেলি। কিছুক্ষণ পরই সন্ধ্যা নামবে। তখন অন্ধকারে কিছুই করা যাবেনা। চলো।

নিপাও মাথা নাড়িয়ে রায়হানের সাথে অন্য আরেক কোন ধরতে আরেকপাশে চলে যায়। দুইজন মিলে তাঁবু বানিয়ে ফেলতে থাকে। 

 

কিছুক্ষণ পর,

তাঁবুর অবশিষ্ট শেষ কোনের লোহাটায় শেষ বারের মত ঠুকে রায়হান। তাঁবুর চারটা কোনই রেডি। রায়হান আর নিপা উঠে দাঁড়ায়। রায়হান বেশ ঘেমে গিয়েছে। এখন শীতকাল, তবুও এদিকে ভ্যাপসা গরম করছে। রায়হান হেলে তাঁবুর মাঝের গেইটচেইন খুলে। দেখে ভিতরেও সব ঠিকঠাক। নিপাও হেলে রায়হানের পাশ দিয়ে মাথা ঢুকিয়ে ভিতরে দেখতে থাকে। দুইজনের শোয়ার জন্য যায়গাটা মন্দ নয় কিন্তু,,! নিপা বলে,

– এমনিই এখানে শুয়ে পড়বো ? 

– না। ব্যাগে পাতলা তোষক আছে, ওটা বিছিয়ে দিয়ে তারপর শুবো। ঘাসের উপর তাঁবুর প্লাস্টিক, আর তার উপর পাতলা তোষক। একদম ঠিকঠাক। 

দুইজনই মাথা বের করে তাঁবু থেকে। বসে পড়ে ঘাস গুলোর উপরেই। রায়হান চারপাশে দেখতে থাকে। নিপা তার হিজাব খানা ঠিকঠাক করে। রায়হান বলে,

– আমি আগুন জালাবার জন্য কিছু জোগাড় করে আনি। তারপর আগুন জ্বালিয়ে একসাথে সূর্যাস্ত দেখতে যাবো। 

– আমিও তোমার সাথে যাবো। আমার একলা থাকতে ভয় লাগতেছে।

– আরে কীসের ভয়। কোন ভয় নাই। আমি তো এই আশেপাশেই থাকবো। 

– তারপরও, আমি এই যায়গা চিনিনা। আমাকে একা ফেলে যেওনা। 

– কিন্তু তখন বানররা এখানে এসে তাঁবুর প্লাস্টিক ছিঁড়ে ফেলবে যে। (একটু থেমে) আচ্ছা দাঁড়াও,

বলেই উঠে দাঁড়ায় রায়হান। এগিয়ে গিয়ে ব্যাগের সামনে হেলে বসে কিছু একটা বের করতে থাকে। নিপা তার পায়ে উঠা একটা ছোট্ট পোকা হাত দিয়ে ফেলে দেয়। রায়হান ডাক দেয় সামনে থেকে,

– সুবা,,! 

নিপা সামনে ফিরে তাকায়। তখনই দেখে তার দিকে কী জানি একটা কালো জিনিস ফিকে দিয়েছে রায়হান। নিপা দ্রুত সেটা ক্যাচ ধরে নেয়। দেখা এটা একটা ওয়াকিটকি। সে সেটা নিয়ে ভালোভাবে দেখতে যাবে, তখনই ওয়াকিটকি থেকে রায়হানের কথা ভেসে আসে। 

– সুবা, শুনতে পাচ্ছো আমায়,,! 

– হ্যা, শুনতে পাচ্ছি।

– এটা দিয়ে আমরা কথা বলতে পারবো একে অপরের সাথে। এটা ১০০ মিটারের মধ্যে কাজ করবে। এখানে ফোনের নেটওয়ার্ক নাই। তাই ফোন করে তো যোগাযোগ করা যাবেনা। তাই এটা দিয়ে আমরা কথা বলবো। 

– কীভাবে কথা বলে এটা দিয়ে ! 

– এটার মধ্যে থাকা লাল বাটন টা প্রেস করে দিয়ে মুখের সামনে আনে কথা বলবে। আর এখানে থাকা স্পিকার দিয়ে আমার কথা শুনতে পাবে। 

– আচ্ছা ঠিক আছে। 

– আমি কিছু খড়কুটো কিংবা কাঠ জোগাড় করে আনছি। তুমি তাঁবুর ভিতরে গিয়ে বসো, কেমন! 

– তাড়াতাড়ি চলে আসিও,,! আমার একলা থাকতে ভয় করছে।

– আমি এই যাবো আর আসবো। তুমি তাঁবুর ভিতরে গিয়ে বসো।

 

নিপা সামনে মুখ তুলে তাকায়। কিছুটা সামনে থাকা রায়হান হাত উঠিয়ে একটা থাম্পস আপ জানায়। নিপা কপালে চিন্তার ভাঁজ। মুখে কিছুটা ভয়। 

রায়হান ব্যাগের ওখান থেকে উঠে চলে যেতে থাকে গাছপালা গুলোর দিকে। এখানে সামনের যেকোনো গাছের মোটা কয়েকটা ডাল ভাঙতে পারলেই কাজ চলে যাবে। রাতে ক্যাম্প ফায়ার না জ্বালালে ক্যাম্পিংয়ের যেন মজাটাই আসবে না। তখনই তার ওয়াকিটকি তে নিপার ম্লিন গলা ভেসে আসে,

– রায়হান,,,

রায়হান থেমে পিছন ফিরে তাকায়। দেখে নিপা তাঁবুর সামনে দাঁড়িয়ে এক ভয় ভয় মুখ নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। রায়হান তার ওয়াকিটকি টা মুখে কাছে নিয়ে বলে,

– ভিতরে বসো, আমি খালি যাবো আর আসবো।  

বলেই এক হাসি মুখ করে নিপাকে আস্বস্ত করে রায়হান। চলে যেতে থাকে আগুন জ্বালানোর জন্য জ্বালানি জোগাড় করতে। 

 

নিপা ক্যাম্পের চেইনদরজা খুলে ভিতরে ঢুকে। চেইন লাগিয়ে দেয়। এখনো পাতলা তোষক গুলো এখানে বিছানো হয়নি। তাই খালি প্লাস্টিকের উপর বসে আসে সে। চারপাশ থেকেই দিনের আলো ক্রমে ক্রমে নিভে যাচ্ছে মনে হচ্ছে। গাছ থেকে দু-একটা শুকনো পাতা এসে পড়ে তাবুর উপরিভাগে। সেই শব্দেও যেন নিপা আঁতকে উঠে। এরকম অচেনা যায়গায় একলা থাকতে কেনো যানি তার ভয় করছে। মনে হচ্ছে এই বুঝি কিছু খারাপ মানুষ এসে তাকে তুলে নিয়ে গেলো। তাকে রায়হানের কাছ থেকে আলাদা করে দিলো। নানারকম দুশ্চিন্তা আসছে তার মাথায়। নিপা নিজেকে ঠান্ডা করার চেষ্টা করে। হাতের ওয়াকিটকি টা ভালো করে দেখতে থাকে। দেখে বেশ পুরোনোই মনে হচ্ছে। হালকা স্ক্র্যাচ ও আছে ওয়াকিটকি টার গায়ে। নিপা তার হিজাব টা হাত দিয়ে ঠিকঠাক করে দেয়। পায়ে নূপুর পড়ে এসেছিলো সে। নুপুর গুলো একবার হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখে সোজা হয়ে বসে। মনের মধ্যে কিছুক্ষণের জন্যেও বাড়ির কথা ভেসে উঠে। আলিশা তাকে ঝিনুক আর মুক্তার মালা নিয়ে যেতে বলেছিলো। সেগুলোতো এখনো কিনাই হয়নি। কাল কিনে নিতে হবে। পড়ে নাহলে বাড়ি গেলে মেয়েটা মন খারাপ করবে। বলবে তার জন্য জিনিস গুলা আনলো না। নিপা ভাবে আলিশার জন্য ঝিনুক, মুক্তোর মালার সাথে সাথে একটা কারুকাজ করা হাতে বানানো টুপিও নিবে। পাহাড়ে উঠার আগে এক দোকানে অনেক হাতে তৈরি কারুকার্য করা জিনিস দেখেছিলো সে। আর আলিশার কথা শুনে সে এটা এতোদিনে বুঝতে পেরেছে যে আলিশার সৌখিন জিনিসের প্রতি ঝোঁক বেশি। এইগুলো ও নিশ্চয়ই পছন্দ করবে। 

হঠাৎ কারো পায়ের আওয়াজ আসে নিপার কানে। নিপার মেরুদন্ড সোজা হয়ে যায়। কেউ একজন হেঁটে হেঁটে এদিকেই আসছে মনে হচ্ছে। তবে আওয়াজ টা মৃদু। তারমানে এখনো কাছাকাছি আসেনি। আওয়াজ শুনে মনে হচ্ছে দুইজন হেঁটে আসছে। শুকনো পাতায় পা পড়লে যেমন আওয়াজ হয় ঠিক তেমন আওয়াজ। নিপার বুকের হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। রায়হান টাও এখনো আসলো না। কে না কে এদিকে আসছে। যদি ওরা খারাপ লোক হয় তখন ,,! আওয়াজ শুনে নিপা এইবার বুঝতে পারে আওয়াজ দুটো। সেগুলাও একসাথে না, দুদিক থেকে আসছে। একটা যেইদিকে গেলে রাস্তায় উঠা যায় ঐদিক থেকে, আরেকটা ভিতরের দিক থেকে। দুই দিক থেকে দুইজনের হেঁটে আসার আওয়াজ। আওয়াজ গুলা ক্রমশ কাছাকাছি আসছে। নিপা ঘামছে। হাত দিয়ে মুখের ঘাম মুছার ব্যার্থ চেষ্টা করে সে। হাত টাও যে কাঁপছে। হঠাৎ একজনের পায়ের আওয়াজ আসা থেমে যায়। খুব কাছে এসেই যেন সেটা থেমে গেছে। কিন্তু ভিতরের জঙ্গলের দিক থেকে আওয়াজ টা এখনো আসছে। নিপা একটু এগিয়ে তাঁবুর চেইনটা হালকা নামায়। সেই ছোট্ট ফাঁকা দিয়ে চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা করে যে লোকটা কে, তখনই যেন তার সবটুকু জমিয়ে রাখা দম ফুস করে নাক মুখ দিয়ে বেড়িয়ে আসে। রায়হানই ছিলো এদিকের টা। নিপা তাড়াতাড়ি চেইন গেইট টা খুলে তাঁবু থেকে বেড়িয়ে যায়। উঠে দাঁড়িয়ে দৌড়ে রায়হানের দিকে এগিয়ে যায়। 

রায়হান কিছু কাঠ এনে ব্যাগের পাশে রাখে। উঠে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। দুই হাত কোমরে দিয়ে কাঠ গুলো দেখতে থাকে আর ভাবে এগুলো দিয়ে হবে কি না। তখনই নিপা এসে পিছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে। রায়হান এমন কিছুর জন্য একটু অপ্রস্তুতই ছিলো বটে। রায়হান পিছন ফিরে তাকায়। দেখে নিপা ভয়ে ঘেমে শেষ। রায়হান হাত দিয়ে তার মুখের ঘাম মুছে দেয়। বলে,

– এতো ঘামে গেছো ,,! 

– জানো আমার কতো ভয় হচ্ছিলো! কেউ একজন রাস্তার দিক থেকে এদিকে আসছিলো, আমি হাঁটার আওয়াজ পেয়েছি। 

– কে আসবে এখানে। এখানকার ক্যাম্পিংয়ের যায়গা তো আমি আর আমার বন্ধুরা ছাড়া কেউ জানেনা। 

– আমি নিজ কানে শুনেছি। ঐ পায়ের আওয়াজ টা হঠাৎ থেমে গিয়েছে। আমার মনে হচ্ছে কেউ একজন আমাদের এখানে এসে আমাদের দেখছে। 

– আরে না সুবা। হয়তো বেশি স্ট্রেস এ ছিলে, তাই ভুল শুনেছো। চারপাশ তাকিয়ে দেখো। গাছপালা গুলো তো ফাঁকা ফাঁকা। কেউ নেই আমরা দুজন ছাড়া। 

নিপা চারপাশে একবার চোখ বুলায়। দেখে চারিদিকে গাছ ছাড়া তেমন কিছু একটা চোখে পড়ছেনা। নিপা সামনে ফিরে আবার রায়হানকে জড়িয়ে ধরে। বলতে থাকে

– তুমি আর আমাকে একলা রেখে যাবানা। আমি কতটা ভয় পেয়েছিলাম তুমি জানো ! 

– আচ্ছা এখন আমি আসছি তো। কিচ্ছু হবেনা। (নিপাকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে) চলো সূর্যাস্ত দেখতে যাই। সন্ধ্যা হয়েছে তো বেশ খানিকক্ষণ হলো। সূর্য এতোক্ষণে ডুবতে শুরু করেছে। 

– বাদর যদি আসে ,,! 

– অন্ধকার হতে শুরু করছে না, ওরা এখন ওদের গাছে গাছে গিয়ে চুপচাপ থাকবে। রাতের বেলা ওরা আর বাদরামি করবে না। চলো। 

নিপার কাঁধে হাত রেখে তাকে পাশে নিয়ে রায়হান চলে যেতে থাকে রাস্তার দিকে। বলতে থাকে এইখানে আগে যখন এসেছিলো তখনকার এক মজার ঘটনা। নিপার মনযোগ এখানে নেই। মন বারবার খালি বোঝার চেষ্টা করছে যে আরেকটা পায়ের আওয়াজ কার ছিলো। 

নিপা রায়হান রা তাঁবু ছেড়ে চলে যায় রাস্তার দিকে। দুইজন পাশপাশি হাটছে, নিপার কাঁধে রায়হানের হাত। তখনই কিছুটা দূরে এক গাছের আড়ালে দাঁড়ানো একজনের ছায়ামুর্তি দেখা যায়।

 

রায়হান নিপা গাছপালার অংশ থেকে বেড়িয়ে রাস্তায় চলে আসে। তারা রাস্তা পার হয় না। এইপাশে থেকেই সোজা চোখ ফেলে। দূরের পাহাড় গুলোর মাঝে অর্ধেক সূর্য ডুবে গিয়েছে। পাহাড়ের চূড়ায় থাকা ঘন সাদা মেঘ যেন সূর্ঘটাকে আড়ালে নিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী হতে। নিপা রায়হানের কাঁধে মাথা রাখে। তার মন এখন সময়টাকে অনুভব করতে চায়। রায়হান নিপার কাঁধে হাত রেখে তাকে আরো কাছে টেনে নেয়। প্রিয়জনের সাথে কাটানো এমন সুন্দর মুহুর্ত গুলোকে যেন স্বপ্নের মতো রঙিন এক দুনিয়া মনে হয়। এ দৃশ্য যেন চোখ জুড়িয়ে দেয়,এই বসুন্ধরার ভুবন ভোলানো রূপ কেমন তার জানান দেয়। রায়হান আরেকহাত দিয়ে নিপার হাত ধরে। ধীর গলায় বলে,

– সূর্যটাও আজ আমাদের ভালোবাসার সাক্ষি হলো। 

– হম, পৃথিবীর বুক থেকে সূর্য চলে গেলেও আমার দুনিয়া সবসময় তুমি আলোকিত করে রেখো, কেমন,,! 

– আমি তো সবসময় তোমার চাঁদ, সূর্য হয়েই থাকবো। তবে কখনো অস্ত যাবোনা। সবসময় তোমার আকাশে ভালোবাসার রঙিন আলো ছড়াবো, স্নিগ্ধ মধুর জোছনায় হারাবো। 

– আমার বর টা যেমন সুন্দর গায়ক, তেমনি সুন্দর কাব্যেও বের করে তার ঝুলি থেকে। 

– আর ভালোবাসা, সেটা দিয়ে যে আমার ঝুলি ভর্তি!

– ঐটায় তো শুধু আমার ভাগ। আমি যখন মন ঝুলি থেকে একটু একটু করে নিবো। 

– নিও, আর আমায় তোমার সাথে চিরজনম রেখো দিও ,,! 

– রাখবোই তো। তোমার বুকে মাথা রাখার লোভ কী আমি কখনো সামলাতে পারি,,! (এক হাত দিয়ে রায়হানের বুক ছুঁয়ে) এটাই যেন আমার শেষ আশ্রয়স্থল হয়। এটাই যেন আমার সুখের আশ্রয়স্থল হয়। জীবনের শেষ মুহূর্ত টাও যেন আমি তোমার বুকে মাথা রেখেই কাটাতে পারি।(একটু থেমে ধীর গলায়) চলোনা ঐ মেঘের ভেলায় ভেসে বেড়াই ,,! 

– গোধূলি বেলায় মেঘ ভেলায়, ভাসবো দুজন, মাতবো খেলায় ,,,! 

নিপা ছোট্ট হাঁসি দেয়। রায়হানও সুন্দর এক হাসৌজ্জল মুখ করে। নিপা রায়হানের কাঁধে মাথা রেখে উপভোগ করতে থাকে এই সুন্দর সময়টাকে। স্বর্নাক্ষরে লিখে রাখে এই দিনটাকে তার স্মৃতির রুপালি পাতায়,,! 

 

চলবে ,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

 

উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন:: ২(মুখোশ)

পর্ব :: ৬৪

 (বোনাস পর্ব 🟢)

লেখক:: মির্জা শাহারিয়া

 

আহনাফ কেবিনে প্রবেশ করলো। আফরিনের মা এই কেবিনেই এডমিট আছে। আহনাফ ভিতরে ঢুকে দরজা চাপিয়ে দিলো। আফরিন তার মা’কে স্যূপ খাওয়াচ্ছিলো। আফরিনের পাশে দাঁড়ানো এক নার্স তাদের দেখছিলো। আহনাফ গিয়ে আফরিনের পাশে দাঁড়ায়। আফরিন স্যুপ খাওয়াতে খাওয়াতে আহনাফের দিকে ফিরে তাকায়। আবার তার মায়ের দিকে ফিরে তাকে স্যুপ খাওয়াতে থাকে। আহনাফের উপস্থিতি দেখে নার্সটা চলে যায়। তাকে রাখা হয়েছিলো রুগির কাছে সবসময় থাকার জন্য। কিন্তু এখন দুই দুইজন মানুষ এসেছে তাই সে চলে গিয়েছে। 

আহনাফ একটা চেয়ার টেনে আফরিনের পাশে বসে। আফরিনও একটা চেয়ারে বসেই বেডে থাকা তার মা’কে স্যুপ খাওয়াচ্ছিলো। আহনাফ স্বাভাবিক গলায় বলে উঠে,

– মাথার চুল গুলো সব পড়ে গেছে উনার। 

– হ। নার্স আফায় কইলো থেরাপি দিলে বলে এরম হয়। (ধীর গলায় আফরিন বলে)

– হ্যা, থেরাপি দিলে মাথার চুল পড়ে যায়। এখন উনার শরীর আগের থেকে ভালো মনে হচ্ছে। 

– কিছুডা। তয় মায়ে কথা কয় না। সবসময় চুপচাপ এমনে হেলান দিয়া বইসা থাকে। নাইলে শুইয়া থাকে। 

– আরেকটু সুস্থ হোক। তখন দেখবে ঠিক কথা বলছে। তুমি দুপুরে খাইছো ? 

– হ। 

– আমার বাসায় একটু কাজ ছিলো তাই দুপুরে বাসায় যেতে হয়েছিলো। (একটু থেমে) তোমার মা সুস্থ হলে তোমরা দুইজন আমাদের বাসায় থাকবে, কেমন,,! 

আফরিন ফিরে তাকায়। হাতে স্যুপের বাটিটা হালকা একটু কেঁপে উঠে। তার মুখে অবাক আর সাথে করুণ অনুনয় স্পষ্ট। আহনাফ আবার বলে,

– তোমার মা’কে আর ৩ টা থেরাপি দিলেই তিনি সুস্থ হয়ে যাবেন। তখন তোমরা আমাদের বাসায় চলে আসবে। আর সেখানেই থাকবে। 

আফরিন তার মায়ের দিকে মুখ ঘুড়ায়। তার মায়ের মুখে স্যুপ তুলে দিতে দিতে বলে,

– আমি আম্মারে লইয়া বস্তিতে যামুগা। আপনাগো উপর বোঝা হইয়া থাকতে চাইনা আমরা। এমনিতেই আপনাগোরে মেলা কষ্ট দিছি। আর না। 

– আরে কী বলছো। কীসের কষ্ট। আমরা কোন কষ্ট পাইনি। আর বোঝা কেনো হতে যাবে। তুমি আমার বাসায় আমার বন্ধু হিসেবে উঠবে। আমাদের বাসায় আমি আর আমার মা ছাড়া কেউ থাকেনা। মাঝে মাঝে খালামণি আসে, এই আরকি। তোমাদের কোন সমস্যা হবে না।

– আপনাগো মতো বড়লোক গো ইমারত আমাগো মতো গরীবের সইবো না। আমরা টিনের চালের নিচে থাইকা বড় হইছি। ইমারত আমাগো কাছে সপন। 

– আরে কিচ্ছু হবেনা। তুমি আমার মায়ের কাছে অনেক আদরে থাকবা।

– আপনারা আমাগো লাইগা অনেক করছেন। আপনাগো বাড়িত উইঠা আপনাগো আর কষ্ট বাড়াইতে চাই না। 

– আরে কেনো কষ্ট হবে বলোতো। তুমি আমার আত্মীয় হিসেবেই উঠলে। জানি তোমার আত্মসম্মানে কিছুটা বাঁধছে, তবুও এখন তোমার মা’কে নিয়ে বস্তিতে তোমাদের থাকাটা ঠিক হবে না। ঐ অস্যাস্থকর পরিবেশে উনি আবার অসুস্থ হয়ে যাবেন। 

– তাই বইলা আমি তো আপনাগো ঘাড়ে বইসা সারাজীবন ঋণি হইয়া থাকতে পারিনা, তাই না ,,! 

– আচ্ছা তাইলে আমার মায়ের ব্যবসায় হাত লাগাইয়ো। আমার মা মুক্তাবাংলা মার্কেটে ৪ টা কাপড় আর টেইলার্সের দোকান পরিচালনা করেন। তুমি মায়ের সাথে সেগুলো দেখা শোনা করিও। তাইলে তো আর কোন সমস্যা নেই। আর ধরে নাও তুমি আমার এক বিশেষ আত্মীয়। (ধীর গলায়) যে আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার তাড়না আমার কখনো জাগবেনা,,! 

– মানে। 

– কিছু না। তুমি আর তোমার মা আমাদের বাসাতেই উঠছো এটাই ফাইনাল। আমি আজ দুপুরে মা’কে বলেও আসছি। 

– আমি যদি সেলাইয়ের কাজ শিখতে পারতাম, তয় সেইডা কইরাই আপনাগো ঋণের কিছুডা হইলেও মিটাইতাম। আপনেরা আমার মরণ জন্ত্রনায় ভুগতে থাকা মা ডারে বাচাইছেন। আমাগো মতো গরীবরে এই বড়লোক গো হাসপাতালে আনছেন। আমি আপনাগো কাছে চিরজীবনের লাইগা ঋণী হইয়া থাকলাম। 

– আরে তেমন কিছুনাতো। তুমি আমাদের বাসায় যাওয়ার পর আমার মায়ের সাথে ব্যবসায়ীক দিক টা দেখবে। আমাদের কাপড়, আর সেলাইয়ের ব্যবসা। তোমার আত্মসম্মান বোধের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি, এই গুলা সামলানোতে মায়ের হেল্প করিও। তাতে তোমার মনেও কোন খুদ থাকবে না। আর আমিও তোমাকে,,,,,,,

– আমারে কী ,,! 

– না, কিছুনা। তোমার মা কে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিও। 

– মায়ে এহন ঘুমাইবো না। একদম মাঝরাতে ঘুমাইবো। আর যহন যাইগা থাকে, সারাদিন এমনে চাইয়া চাইয়া দেহে চারপাইশ। 

– হমম,, উনার শরীর আগের থেকে অনেক টা উন্নত হয়েছে। নার্স তো বলেছিলো তোমার মায়ের উন্নতির সম্ভাবনা ২-৩ শতাংশের মতো। লাস্ট স্টেজের কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন তিনি। ভাগ্যেস স্যার নতুন কিছু দামী দামী থেরাপি দিতে বলে গেলেন। তাই তোমার মায়ের ক্যান্সার টা লাস্ট স্টেজে যাওয়ার আগেই কমতে শুরু করেছে। 

– হ। আইচ্ছা উনি আপনের কী হয় ? 

– কে ? শাহারিয়া স্যার ? 

– হ। 

– উনি আমার স্যার। উনার অধীনে আমি গোয়েন্দা বিভাগে চাকরি করি। একটা কেস সূত্রে উনার-সাথে-আমার,,,,,,

শেষের কথা গুলো বলতে গিয়ে আহনাফের গলার স্বর নিম্ন হয়ে যায়। চোখ মুখ অবাক হয়ে যায়। হঠাৎ আবার বলে উঠে,

– এতোদিন ব্লাক রন্জুর কেস টার বিষয় তো মাথাতেই ছিলোনা। স্যার গেলো তার বোনের বিয়ে দিতে। নিজেও বিয়ে করে এখনো গ্রামেই আছে। এদিকে আমিও পড়ে গেছি আশরিফ নামের নতুন চিন্তায়। মানে এতোদিন এতোসব কিছু যেন আমার আর স্যারের মাথা থেকে রন্জূ কেস টাই ভুলিয়ে দিয়েছিলো। 

– কে রঞ্জু ? 

– রন্জু একজন বড় কিডনাপার। অনেক মেয়েদের সে কিডন্যাপ করে। খবর আছে আন্ডার ওয়ার্ল্ডের সাথে তার অনেক বড় সংযুক্তি আছে। 

– ওহ,,

– আচ্ছা তুমি তোমার মা’কে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও। আমি একটু আসছি। 

বলেই চেয়ার থেকে উঠে পড়ে আহনাফ। চলে যেতে থাকে। তখনই পিছন থেকে আফরিন ডাকে,

– রাইতে আর আইবেন না ? 

আহনাফ পিছন ফিরে তাকায়। বলে,

– আসবো। আমি বাসা থেকে রন্জুর কেস ফাইল গুলো নিয়ে আসি। এখানে বসে সেগুলো দেখবো। 

– ও, আইচ্ছা ঠিক আছে। 

আহনাফে মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলে চলে যায় দরজা খুলে বাইরে। আফরিন তার মায়ের দিক ফিরে তার মায়ের মুখে আরেক চামচ স্যুপ তুলে দেয়। তার মা এক নজরে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের মণি গুলো যেন থমকে আছে তার। আফরিন তার মা’কে সম্পূর্ণ স্যুপ টা খাইয়ে খালি বাটিটা পাশের টেবিলে রেখে দেয়।

 

_____

 

আনন্দপুরের চৌরচক মোড়। লোকজন ছুটোছুটি করছে। অটো, ভ্যান গুলো তাড়াতাড়ি তাদের বাড়ির দিকে চলে যাচ্ছে। ছোটখাটো একটা হইহুল্লোড়ই লেগে গেছে বলা যায়। ঝড়ো বাতাস উঠেছে। মাগরিবের আযান পড়েছে একটু আগে। আকাশ ছেয়ে গেছে কালো বাদলে। ঝড়ো হাওয়ায় ধুলা,বালু রাস্তায় থাকা পলিথিন সব উড়ছে। সুমু, পাগল পাগলিকে নিয়ে দৌড়ে ক্লিনিকের সামনে বর্ধিত ছাওনির দিকে আসছে। বাতাসে তার চোখ মুখে বালি ঢুকে যাওয়ার উপক্রম। হাত দিয়ে মুখ কিছুটা ঢেকে পাগল পাগলিকে নিয়ে দৌড়ে আসতে থাকে সে। সে ধরেছে পাগল টার হাত। পাগলটা ধরেছে পাগলিটার হাত। পাগলিটা কোলে একটা পটলা ধরে রয়েছে। পাগলির শাড়ির আঁচল টা হাওয়ায় উড়ছে। তারা তিনজনই দৌড়ে এসে ক্লিনিকে মূল দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। ক্লিনিকের মূল দরজার সামনে বর্ধিত ইট,পাথরের তৈরি একটা ছাওনি আছে। তারা এসে সেখান টাতেই আশ্রয় নেয়। দূরে বিকট আওয়াজে বজ্রপাত হচ্ছে। এখন ডিসেম্বর মাস। শীতের সময়। তবুও যেন গ্রীষ্মের কালবৈশাখী এসে পড়েছে আনন্দপুরে। 

ছাওনির এক কোনার বসে পাগল আর পাগলীটা। সুমু দরজার দিকটায় একটা উকি দিয়ে আবার তাদের দিকে এগোয়। পাগলীটা বজ্রপাতের শব্দে ভয় পাচ্ছিলো। তাই সে পাগল টাকে জড়িয়ে ধরে তার কোলে মুখ লুকিয়ে বসে ছিলো। সুমু তাদের সামনে এসে বলে,

– ভিতরে চলো। বৃষ্টি শুরু হলে পানির ছিটে লাগবে। পড়ে তখন জ্বর আসবে। 

– না, আমরা ভিতরে যামুনা। আমরা, আমরা এহানেই থাকমু। 

– আরে ভিতরে চলো। এখানে থাকলে ভিজে যাবা বললাম তো। 

– না না। আমরা যামুনা। 

– আচ্ছা তাইলে তুমি তোমার রাণীকে শক্ত করে ধরে রাখো। ও আকাশ ফাঁটার শব্দে ভয় পাচ্ছে।

– আ,আমি আছি। ওরে আমি জড়ায়া ধইরা রাখছি।

– হ্যা এভাবে জড়ায় ধরে রাখো। আজকে মনে হয় অনেক বৃষ্টি আসবে। 

বলেই সুমু চৌড়চকের দিকে তাকায়। মাঝখানে থাকা বড় মূর্তিটাও যেন বাতাসে নড়ে উঠছে, এতো জোড়ে জোড়ে বাতাস বইছে। সব্জির দোকানদাররা মোটা প্লাস্টিক দিয়ে তাদের সব্জি ঢেকে দিতে ব্যস্ত। এতো জোড়ে বাতাস বইছে যে ৩-৪ জন মিলে প্লাস্টিক বাঁধতে হচ্ছে কাঁচা শাক, সবজির পাটাতনের উপর। দোকানপাট গুলোর সাটার নামিয়ে তালা মারতে ব্যস্ত মুদির দোকানদারেরা। মাঠ চড়ানো ছাগল আর গরু গুলো ছুটে ছুটে যাচ্ছে। তাদের গলায় বাঁধা দড়ি গুলো মাটিতে পড়ে ময়লা ধূলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছে। পিছে পিছে তাদের মালিক ছুট লাগিয়েছে। এক প্রকায় হট্টগোল লেগে গেছে চৌড়চকে। দিনের আলো একদম ফুরিয়ে এসেছে। কিছু ঘন কালো মেঘ এদিকেই ছুটে আসছে দ্রুত গতিতে। সুমুর চোখের আড়াল হয়না সেই মেঘ। বাতাস এসে তার খোলা চুল গুলোকে উড়িয়ে শুন্যৈ নিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ সে দেখে হনুফা ঝড়ো বাতাসের মাঝে দৃশ্যমান হয়েছে। বাতাসে উড়ে আসা একটা পলিথিন হনুফার মাথায় ঢুকেছে। সে তিড়িংবিড়িং করে এদিক সেদিক হাওয়ায় ছুটছে। সুমু তা দেখেই হেঁসে ফেলে। সে বুঝতে পেরেছে হনুফা এই আবহাওয়াতেও মজার মুডে আছে। বড় বড় বৃষ্টির ফোটা পড়তে শুরু করে আকাশ থেকে। বিশাল, বিশাল বজ্রপাতের শব্দ যেন কান ঝালাপালা করে দিতে থাকে। 

 

      আফাজ বেডে শুয়ে আছে। তার চোখ থেকে অনবরত পানি পড়ছে। সে কাঁদছে। ডুকরে ডুকরে কাঁদছে। গাঁয়ে এখন অন্য কাপড়। রক্ত ভেজা পান্জাবি কালই খুলে রেখেছিলো শিউলি বেগম। হয়তো বাড়িও নিয়ে গিয়েছে। সেটা খুলে শাহারিয়ার কাপড় পরিয়ে দিয়ে গেছে। আফাজ তার বাম হাত উঠিয়ে চোখ মুছার ব্যর্থ চেষ্টা করে। তার চোখের পানি যে কোন বাঁধা মানছে না। বারবার আলিশার লাশটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। তার প্রাণসখীর লাশ, ক্ষতবিক্ষত শরীর। দুইদিন আগেও কত সুন্দর কথা বললো তার সাথে।হাত ধরে এদিক ছুটে বেড়েলো দু’জন, অথচ মাত্র একটা দিন, একটা দিন সব বদলে দিলো। 

আফাজের এই রুম টা ক্লিনিকের দোতলায়। রুমে শুধু একটা বেড, যেটায় আফাজ শুয়ে আছে। বেডের পাশে একটা ছোট টেবিল। আর দেওয়ালের উত্তর কোণে আছে একটা টেবিল। আফাজের বেডের অপর পার্শ্বে একটা জানালা। জানালার কপাট গুলো বাতাসে বারবার খোলা-লাগা করছে। ঝড়ো বাতাস বয়ে বেড়াচ্ছে রুমের মধ্যে। হঠাৎ কারেন্ট চলে যায়। পুরো ঘর অন্ধকারে ছেয়ে যায়। গ্রামে ঝড়বৃষ্টি মানেই কারেন্ট উধাও। জানালা দিয়ে বাইরে মৃদু দিনের আলোয় ঘরকে অস্পষ্ট আলোকিত করেছে। আফাজের কাছে যেন এই ঘরটা কোন আঁধারের গহীন অরণ্যে লাগছে। বুকের মধ্যে থাকা ব্যাথাটা তার সর্বাঙ্গ অসার করে দিচ্ছে। আলিশার শেহওরান বলে ডাক দেওয়া তার কানে ভেসে আসছে। কিন্তু না। এটা তো শুধু একটা ভ্রম, শ্রুতিভ্রম। আশপাশ যে তার কাছে আবার নির্জন হয়ে উঠে। হয়ে উঠে এক বিষাদের কান্ডারি। কানে ভেসে আসে বিষাদ সুরে ভরা কিছু লাইন ,,,

 

অন্ধকার ঘরে, কাগজের টুকরো ছিঁড়ে

কেটে যায় আমার সময়

তুমি গেছো চলে

যাওনি বিস্মৃতির অতলে

যেমন শুকনো ফুল বইয়ের মাঝে রয়ে যায়

 

রেখেছিলাম তোমায় আমার হৃদয় গভীরে

তবু চলে গেলে, এই সাজানো বাগান ছেড়ে

আমি রয়েছি তোমার অপেক্ষায়…

 

নিকষ কালো এই আঁধারে

স্মৃতিরা সব খেলা করে

রয় শুধু নির্জনতা

নির্জনতায় আমি একা

একবার শুধু চোখ মেলো

দেখো আজ পথে জ্বালি আলো

তুমি আবার আসবে ফিরে

বিশ্বাসটুকু দু’হাতে আঁকড়ে ধরে।

,

,

,

 

কিছু পুরোনো গান

কিছু পুরোনো ছবির অ্যালবাম

এসবই আমার সাথী হয়ে রয়

 

কাকডাকা ভোরে

যখন সূর্য ঢুকে ঘরে

কালো পর্দায় বাধা পেয়ে সরে যায়

আমার এ জগত বড় আগলে রাখে আমায়

তবু মাঝে মাঝে মনে হয়

মৃত্যুই কি শ্রেয় নয়

আমি রয়েছি তোমার অপেক্ষায়

 

নিকষ কালো এই আঁধারে

স্মৃতিরা সব খেলা করে

রয় শুধু নির্জনতা

নির্জনতায় আমি একা

একবার শুধু চোখ মেলো

দেখো আজ পথে জ্বালি আলো

তুমি আবার আসবে ফিরে

বিশ্বাসটুকু দু’হাতে আঁকড়ে ধরে

 

আফাজ জোড়ে কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার দিয়ে বলে উঠে,

– আলিশা, ভ্রমর আমার। তোরে আমি অনেক ভালোবাসি রে,,! অনেক ভালোবাসি। কেনো আমায় ফেলে চলে গেলি। আমি যে নিঃস্ব হয়ে গেলাম। চিরতরে মুছে গেলো আমার জলন্ত শিখার প্রদীপ। আয়না ফিরে। আমি তোকে অনেক আগলে রাখবো। অনেক আদরে রাখবো। একটা বার ফিরে আয়,,,! 

কান্নার অশ্রজল বাঁধ মানেনা। অঝোর ধারায় বৃষ্টির মতো ঝড়তে থাকে আফাজের চোখ বেয়ে। তার কান্না শুনে যেন আশাপাশে থাকা মৃত আত্মারও কেঁদে উঠছে। পুরো ঘর কান্নায় ভারি হয়ে উঠে। আফাজের আকুতি, চিৎকার কানে এসে জানান দিচ্ছে বিচ্ছেদের সুর কতটা কষ্টদায়ক, কতটা বেদনাদায়ক হয়। আফাজের ডান হাত অসার। সেই হাত তার ফেটে গিয়েছে। সেটায় সেলাইন লাগানো। আফাজ দুই হাত উপরে তুলে তার কল্পনাতিত আলিশাকে ছোঁয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। তার বুকের ভিতরের ছিন্ন ভিন্ন ব্যাথা গুলো তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। আফাজ হাত নামিয়ে ফেলে। কাঁদতে থাকে তার প্রিয়তমাকে স্মৃতির পাতায় প্রজলিত করে। 

এক জোড়া পায়ের আওয়াজ ভেসে আসে। করিডোর দিয়ে কেউ হেঁটে আফাজের রুমের দিকেই আসছে। সাথে ছোট্ট এক আলোয় দৃশমান হচ্ছে। আওয়াজ কানে এসে ঠেকতেই আফাজ ছলছল চোখ গুলো নিয়ে দরজার দিকে মুখ ফিরে তাকায়। এক মেয়ে এসে দরজার সামনে দাঁড়ায়। মেয়েটার হাতে জ্বলতে থাকা এক লম্বা মোমবাতি ঘরকে কিছুটা মৃদু আলোকিত করে তোলে। মোমবাতির আলোয় মেয়েটার চোখ দুটো চিকচিক করছে। চুল গুলো কোমর অব্দি তার। মৃদু হাওয়ায় উড়ছে সেগুলো।‌  মোমবাতির জ্বলতে থাকা আলোক শিখা কিছুটা নড়ে উঠে। আফাজ অস্পষ্ট ছলছল চোখে সেই নারীকে পরিলক্ষিত করে। বাম হাত খানা বাড়িয়ে সেই অবয়বকে ছুঁতে চায়। এটা নিশ্চয়ই তার আলিশা। তার আলিশা আবার তার কাছে ফিরে এসেছে। আফাজ বা হাত খানা কিছুটা উঠিয়ে তার ভেজা কন্ঠে ডাকতে থাকে,

– আলিশা, আমার আলিশা। ত,তুমি এসেছো ,,! 

তখনই সেই মেয়ে হতে এক ধীর আওয়াজ ভেসে আসে,

– আ,আমি আলিশা না। আমি সুমু। সামিয়া বিনতে সুমু। 

আফাজ আবার আশাহত হয়ে ভেঙে পড়ে। কাঁদতে থাকে। সুমু ধীর পায়ে ভিতরে এগিয়ে আসে। জানালার কপাট খানা বারবার খোলা বন্ধ হচ্ছে বাতাসে। কিছুটা ঝড়ো হাওয়ার মোমবাতির আলোক শিখা নড়ে উঠতে থাকে। সুমু এসে আফাজের বেডের পাশে দাঁড়ায়। মোমবাতির আলোটা আফাজের মুখ অব্দি পৌঁছায়। আলিশার আগ্রহ ভরা চোখ গুলো সেই চেহারা দেখেই প্রকম্পিত হয়ে উঠে। তার বুকের হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। তার সারাদেহের মরা কোষ গুলো আবার জীবন ফিরে পায়। এই মোমবাতির অনির্বাণ শিখায় সে কাকে দেখতে পেলো ,,! তার চোখ ভুল দেখছে নাতো ,,! এটা তো সেই যুবক। যার ছবি খানা তার অন্তরের আয়নায় সয়নে-সপনে ভাসে। রাতের ঘুম গুলো চোখ থেকে কুড়িয়ে নিয়ে যায়। উনি এখানে ভর্তি কেনো ? উনি এভাবে কাঁদছেন কেনো ? কী হয়েছে উনার ? এক গাঁদা প্রশ্ন যেন মনের দরজায় এসে কড়া নাড়তে থাকে। সুমু এক ঢোক গিলে। হাতে থাকা মোমবাতি টা আফাজের বেডের পাশে থাকা টেবিল টায় রাখে। মোমবাতির আলো অস্থীর। জানালা দিয়ে ঢুকতে থাকা ঝড়ো হাওয়া তাকে নানা ভঙিতে নাচিয়ে তুলছে। সুমু ধীর পায়ে বিছানার অপর পার্শ্বে যায়। খোলা-বন্ধ হতে থাকা জানালার কপাট গুলো লাগিয়ে ছিটকিনি তুলে দেয়। পিছন ফিরে তাকায়। আফাজ ডুকরে ডুকরে কাঁদছে। মোমবাতির ম্লিন আলোয়া এই দুই নরনারীকে বেশ ভালোভাবেই অবলোকন করা যায়। একজন স্মৃতি হাতড়ে কষ্টের নদীতে বৈঠা বাইছে। আরেকজন কৌতুহলের সাগরে পাল তোলা নৌকা নিয়ে তীর খুঁজে ফিরছে। 

সুমু এসে বিছানার আরেকপাশে দাঁড়ায়। যেপাশ টায় ছোট্ট টেবিল আছে সে পাশটায়। সুমুর মনে থাকা প্রশ্ন গুলো আর বাঁধ মানেনা। বেড়িয়ে আসে মুখ দিয়ে সশব্দে। 

– আপনি কাঁদছেন কেনো !

আফাজ ছলছল চোখ নিয়ে সুমুর দিকে তাকায়। সুমু আবার বলে,

– আপনাকে কে কষ্ট দিয়েছে,! আমাকে বলুন। (একটু থেমে ধীর গলায়) আ, আলিশা কে! 

শেষ প্রশ্নটা করার সময় সুমুর বুকে ঝড় উঠে মেঘ গর্জন করে। তার বুকখানা কাঁপছে। আফাজের কান্না ভেজা গলা দিয়ে আওয়াজ বেড়িয়ে আসে,

– আলিশা আমার ছোট্ট ফুল। আমার মন বাগানে আসা প্রথমো-শেষ ফুল। 

– আলিশার কী হয়েছে ? 

– মেরে ফেলেছে ওকে। আমার ফুলটাকে প্রফুষ্টিত হতে দেয়নি ওরা। ঝড়ে পড়েছে আমার বাগান থেকে। পাপড়িহীন হয়ে। 

বলেই কাঁদতে থাকে আফাজ। সুমুর বুকের ঝড় যেন এখনো আগের মতোই বইছে। সুমুর কৌতুহল তাকে দিয়ে আবার প্রশ্ন করায়। 

– ভালোবাসতেন ওকে! 

– নিজের থেকেও বেশি। এই ভুবনের সবকিছুর থেকেও বেশি। 

সুমু নিজের মনটাকে যেন প্রস্তুত করে ফেলেছিলো এমন কিছু শোনার জন্য। সুমু এক ঢোক গিলে। তার লেগে লেগে আসা গলাটাকে খুলে আবার ধীর কন্ঠে বলে,

– আ,আপনি কাঁদবেন না। এভাবে কাঁদা আপনাকে মানায় না। 

আফাজ কিছু বলেনা। এক দৃষ্টে উপরের সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে থাকে। 

সুমু বলে,

– সবাইকে তো একদিন না একদিন আমাদের ছেড়ে চলে যেতেই হয়। এটাই তো প্রকৃতির নিয়ম। 

আফাজ আবারো নিশ্চুপ। শুধু তার ম্লিন কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে। 

– জীবন কখনো থেমে থাকেনা। যে চলে গিয়েছে তাকে তো কখনো ফিরিয়ে আনতে পারবেন না। তাই বলে কী আপনি সারাজীবন ওর জন্য কাঁদতেই থাকবেন,! 

– ও আমার বিশেষ একজন ছিলো। আমার প্রাণ ভোমরা ছিলো। 

কান্না ভেজা গলার স্বর গুলো কিছুটা বিষাদের সুর নিয়ে সুমুর কানে এসে ঠেকে। সুমু নিজের মন কে শান্ত করে। বিরবির করে বলে,

– রং হীন জীবনকে রংতুলির আঁচড়ে রঙিন করার দায়িত্ব টা না হয় আমিই নিলাম ,,! 

আফাজের কান অব্দি সুমুর সেই ক্ষীণ আওয়াজ পৌঁছায়নি। আস্তে আস্তে আফাজের চোখ বুজে আসতে থাকে। ঘরে থাকা কান্নার আওয়াজ নিভে যেতে থাকে। সব ‌নিশ্চুপ হয়ে যায়। সুমু আফাজের দিকে মুখ তুলে তাকায়। দেখে আফাজ চোখ বুজেছে। একদম নিথর হয়ে গেছে। কোন শব্দ নেই। কিছুক্ষণের জন্যও যেনো সুমুর দম আটকে আসে। সুমু তাড়াতাড়ি বিছানায় থাকা আফাজের বাম হাতটা ধরে। পালস চলছে। তার মানে কোন খারাপ কিছু হয়নি। তবে, তবে হাত যেনো জলন্ত আগুনের মতো উত্তপ্ত। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। সুমুর পায়ের তলা থেকে মাটি সড়ে যাওয়ার উপক্রম। সুমু তাড়াতাড়ি দরজার দিকে ফিরে ডাকতে থাকে,

– ডাক্তার,,,,,, নার্স,,,,,,, প্লিজ তাড়াতাড়ি আসুন। কেউ কি আছে ,,,,, ডাক্তার ,,,,,,,,

না। কারো সাড়া শব্দ শোনা যাচ্ছে না। বাইরে ঝড়বৃষ্টির প্রকোপ বেড়েছে। নিশ্চই ডাক্তার নার্স বাড়ি ফিরে গিয়েছে। এই রকম রুগী ফেলে তারা চলে যেতে পারলো ,,! সুমু কী করবে বুঝতে পারেনা। সে অস্থীর হয়ে যায়। রুমের মধ্যে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। তার ভিতর টা যেন উৎকণ্ঠিত, ছটফট করছে। উত্তর পাশের দেওয়ালের দিকে থাকা বড় টেবিলের কাছে একটা ১ লিটারের খাওয়ার পানির বোতল দেখতে পায় সুমু। ছুটে সেখানে যায়। বোতলে অর্ধেকের বেশি পানি ছিলো। সুমু তাড়াতাড়ি সেই বোতল টা হাতে নেয়। খুঁজতে থাকে কোন এক পাত্র। সেই টেবিলেই একটা ঔষধ বক্স খুঁজে পায় সে। বক্সের ঢাকনা খুলে সব গুলো ঔষধ টেবিলের উপরেই ঢেলে রেখে ছুটে চলে আসে বিছানার কাছে। মোমবাতি রাখা বিছানার পাশের ছোট্ট টেবিল টায়। সেই মোমবাতির পাশেই সেই প্লাস্টিকের ছোট্ট বক্সটা রাখে সুমু। হাটু গেড়ে বসে পড়ে ফ্লোরে। বোতল থেকে পানি ঢালতে থাকে বক্সে। বেশ কিছুটা পানি ঢেলে তার ওড়নাটা গা থেকে খুলে। ওড়নার এক প্রান্ত হাত দিয়ে টেনে ছিঁড়তে থাকে। বেশ শক্ত। তবুও খুব জোড় দিয়ে টান দেয়। ওড়নার একপ্রান্তের কাপড় ‌টুকু ছিঁড়ে ফেলে। তার বুকের হ্রদপিন্ড উঠানামা করছে। যেন এই বুঝি লাফাতে লাফাতে দেহ থেকে পড়ে যাবে। ওড়না থেকে ছেঁড়া অংশটুকু সেই বক্সের পানিতে ভিজায়। ভালোকরে ভিজিয়ে পানি চিপে ফেলে। উঠে দাঁড়ায়। আফাজের কপালে রাখে ভেজা কাপড় টা। শরীরে অনেক তাপ। তার কাছে এখন আর এ ছাড়া আর কিছুই করার নেই। আফাজের কপালে কাপড় খানা ভালভাবে দিয়ে পায়ের দিকে থাকা কাঁথাটা তুলে দিতে থাকে আফাজের গলা অব্দি। বাইরের বজ্রপাত শোনা যায়। বৃষ্টির বেগ বেড়েছে। সই সই করে বয়ে চলা বাতাস আর পানির ঝাপটা এসে জানালার কাঠের কপাটে শব্দ ‌তুলছে। সুমু আফাজের কপাল থেকে কাপড়টা তুলে। ভেজা কাপড়টা যেনো মুহুর্তেই গরম হয়ে গেলো। সুমু আবার সেই কাপড়টাকে ভিজিয়ে নিয়ে চিপে আফাজের কপালে দেয়। আফাজের শরীরটা কাঁপছে। হ্যা, আসলেই কাঁপছে। বোধহয় খুব ঠান্ডা লাগছে তার। এমনিতেই শীতকাল চলছে তার উপর এমন বর্ষা বাদলের রাত। আবহাওয়া যেন আরো বেশি ঠান্ডা হয়ে উঠেছে। সুমু আশেপাশে দেখে আর কোন কাপড় পায় না। শুধু এই পাতলা কাঁথাটা ছাড়া বিছানায় আর কিছু নেই। সুমু তার ওড়নাটাও কাঁথার উপর দিয়ে দেয়। নিচে গিয়ে কারো কাছে সাহায্য চাইবে কি না তা ভাবতে থাকে। কিন্তু নিচে তো পাগল পাগলি ছাড়া আর কোন মানুষ নেই। যারা ছাওনিতে এসে দাঁড়িয়েছিলো তারাও চলে গেছে বৃষ্টি শুরু হওয়ার সময়ই। ক্লিনিকে মনে হয় খালি রুগিরাই আছে একলা। এই গ্রামের ডাক্তার নার্সরাও এমন দায়সারাভাবে রুগিদের ফেলে চলে গিয়েছে। সুমু পায়চারি করছে। বারবার ভাবছে কি করা যায়। সে এসে আবার আফাজের কপালের কাপড় টা নতুন করে ভিজিয়ে চিপে আবার কপালে রেখে দেয়। আবার বেডের পাশে পায়চারি করতে থাকে। তখনই তার সামনে উদয় হয় হনুফা। সে সুমুকে এমন অস্থির দেখে বলে উঠে,

– কীরে, তুই এমন উতলা ক্যান ? কী হইছে ? 

– হনুফা, ঐযে ঐ উনি। উনার জ্বর আসছে। শরীর কাঁপতেছে। আমি কি করবো বুঝতেছিনা। তুই কোথা থেকে আমাকে মোটা কাঁথা বা কম্বল এনে দিতে পারবি ,,! 

– আমি, আমি কই পাবো,,! 

– দেখ না কোথাও থেকে যদি আনতে পারিস। প্লিজ দেখ না। উনার শরীর আরো খারাপ হয়ে যাবে নাইলে। 

– আচ্ছা তাইলে তুই থাক। আমি দেখি কোথাও কাঁথা কম্বল পাই কিনা। 

– হ্যা একটু দেখ।

হনুফা গায়েব হয়ে যায়। সুমু আবার গিয়ে আফাজের কপালের কাপড় টা ভিজিয়ে বদলে দেয়। আবার পায়চারি করতে থাকে। এভাবে করলে তো দেহের তাপ কমবে না। শরীরে যদি গরম কিছু চাপা না দেওয়া যায়। তাইলে তো উনার আরো ঠান্ডা লাগবে। জ্বর আরো বাড়বে। সুমু পায়চারি করছে আর ভাবছে এখন তার কী করা উচিত। কি করলে আফাজের শরীর সে গরম রাখতে পারবে। তখনই হঠাৎ তার মস্তিষ্ক অন্য কিছুর জানান দেয়। সুমু পায়চারি থামিয়ে দেয়। পিছন ফিরে আফাজের কাঁপতে থাকা দেহটার দিকে তাকায়। সুমু এক ঢোক গিলে। তার মস্তিষ্ক এখন তাকে যেই সিদ্ধান্ত এনে উপনিত করলো তা করতে যেন তার সর্বাঙ্গে এক আলাদা স্রোত বয়ে যাচ্ছে। সুমু ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। তার হাত পা গুলো এক অজানা কারণে কাঁপছে। এই প্রথম বার তার এমন অনুভূতি হচ্ছে। তার মস্তিষ্কে এক নতুন সেল গঠন হচ্ছে। সুমু গিয়ে আফাজের বেডের পাশে দাঁড়ায়। বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে সে। তার মন যেন সায় দিচ্ছে আবার দিচ্ছেও না। তার ৫ ইন্দিয় যেন দোটনায় পড়ে গেছে। কী করবে কী করবেনা সেই সিদ্ধান্তে অটল হতে পারছেনা। হঠাৎ সুমু হেলে আফাজের বুকে মাথা রেখে তাকে জড়িয়ে ধরে। খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। চোখ বুজে ফেলে। তার হ্রদপিন্ডের ধুকপুকানি যেন ধীরে ধীরে শান্ত শীতল হয়ে যাচ্ছে। সুমু তার উষ্ণতা দিয়ে আফাজের শরীর চেপে ধরে। নতুন এক অনুভূতি হচ্ছে তার। বাইরে এক জোড়ে বজ্রপাত হয়। সুমু আরো শক্ত করে চেপে ধরে আফাজকে। তার বুকে নিজের মাথা রেখে আফাজের বুকের ধুকপুক ধুকপুক শব্দ শুনে। সুমুর চুল গুলো আফাজের মুখের কিছুটা অংশে পড়েছিলো। মোমবাতির মৃদু আলোয় যেন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনার সাক্ষী হলো ঘরে থাকা মৃত আত্মারা। মোমবাতির আলোক শিখা কিছুটা নড়ে উঠলো। দুজনের জড়িয়ে ধরে থাকার ছায়াটাও যেন দেয়ালে দুলে উঠলো ,,,! 

 

_______

 

কাঠের দরজায় করাঘাতের শব্দ। সোনালী বিছানা থেকে নামে। দরজার দিকে এগিয়ে যায়। ঘরটা কাঁচা খরের ঘর। বাইরে বৃষ্টি পড়ার আওয়াজ আসছে। ঘরের টেবিলে জ্বলছে একটা লন্ঠন। সেই আলোতেই ঘরটা আলোকিত হয়ে উঠেছে।বাইরের বৃষ্টির শব্দ শুনে মনে হচ্ছে কোন বিরান জঙ্গলের মাঝে ঘরটা একা দাঁড়িয়ে আছে। আশেপাশে গাছের পাতায় বৃষ্টি পড়ে তারপর মাটিতে নেমে আসছে। 

সোনালী দরজা খুলে দেয়। তার মুখ ফুটে উঠে এক দুষ্টু হাসি। একটা টাকার বান্ডিল ছুড়ে মারে কেউ তার দিকে। সোনালী সেইটা ক্যাচ ধরে। দরজা মেলে দেয়। রাফসান ঘরের ভিতরে প্রবেশ করে। হাতে থাকা ছাতাটা বন্ধ করে ঘরের মেঝেতে ফেলে দেয়। সোনালী টাকার বান্ডিল টার ঘ্রাণ নেয়। নিয়ে রাফসানের দিকে এক গভীর চাহনিতে তাকায়। আঙ্গুল দিকে তাকে ডাকতে থাকে। রাফসান তার গায়ের জ্যাকেট টা খুলে ছুড়ে মারে মাটিতে। পিছনে ফিরে দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে দিতে থাকে। সোনালী এসে বিছানার পাশে থাকা একটা টেবিলের ড্রয়ারে টাকার বান্ডিল টা রাখে। রেখে বিছানায় বসে। রাফসান দরজা লাগিয়ে এসে বিছানার সামনে দাঁড়ায়। তার মাথার চুল গুলো হালকা ভিজা। বাইরে বৃষ্টির মধ্যে আসতে গিয়ে ভিজে গিয়েছে হয়তো‌। সোনালী পা তুলে বিছানায় বসে। পড়নে এক হালকা স্লিভ শাড়ি। শাড়ির একপাশ থেকে আরেকপাশের বিষয়বস্তু একদম স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। রাফসানের গায়ে এক সাদা শার্ট। ছোপ ছোপ পানি লেগে কিছু যায়গা ভিজে গিয়েছে। বিশাল দেহি শরীরের সাথে যেন ফুল হাতা সাদা শার্টটা লেপ্টে গিয়েছে। সোনালী এক আধখোলা চোখ নিয়ে অনড় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে রাফসানের দিকে। রাফসান এক ম্লিন হাসি দিয়ে বলে,

– তো চলো, বৃষ্টির মুখোর রাত টা এবার উপভোগ করা যাক ,,! 

সোনালী এক দুষ্টু হাসি দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে। রাফসান বিছানায় উঠার জন্য প্রস্তুত হয়। তখনই সোনালী গড়িয়ে বিছানায় উবুর হয়ে শুতে। তার পিঠ থেকে খোলা চুল গুলো হাত দিয়ে সড়িয়ে দেয়। ব্লাউজের ফিতা গুলো ছাড়া আর কিছুই নেই পিঠে। খোলা উদ্যম পিঠ আর কোমর যেন রাফসানকে খুব টানছে। রাফসান তার শার্টের বোতাম খুলে ফেলে। শার্ট ছুড়ে ফেলে দেয় মাটিতে। ঝাঁপিয়ে পড়ে ক্ষুধার্ত বাঘের মতো এক কিশোরী হরিণীর উপর। বাইরে এক বড় বাজ পড়ার শব্দ ভেসে আসে। সাথে অঝোর ধারায় বৃষ্টি। দূরে থাকা এক টেবিলে বইয়ের থাকের মাঝে এক মোবাইল ফোন রাখা। সেখানকার ভিডিও ক্যামেরায় ধারণ হতে থাকে সোনালী আর রাফসানের প্রতিটি উষ্ণতম মুহূর্ত ,,,! 

 

______

 

খাবারের খালি ক্যান টা রায়হানের সামনে রাখে নিপা। পানির বোতল টা হাতে নিয়ে মুখে চুমুক দেয়। সামনে ক্যাম্প ফায়ার জ্বলছে। আকাশ পরিষ্কার। জোছনা রাত। দূর হতে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে দু একটা জোনাকি পোকা আলো জ্বেলে তাদের সামনে দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। রায়হানও তার খালি খাবারের ক্যান টা রাখে নিপার ক্যানটার পাশে। এলুমিনিয়াম ক্যানের প্রকিয়াজাত করা খাবার খাচ্ছিলো তারা দুজন। খাবার গুলো ব্যাগেই ছিলো। নিপা পানির ঢোক গিলে বোতল টা রায়হানকে দেয়। রায়হান বোতল নিয়ে চুমুক দেয়। নিপা বলতে থাকে,

– ক্যানের খাবার এই প্রথম খাইলাম। একদম ভালো না। সাদামাটা। 

রায়হান বোতল টা মুখ থেকে নামায়। পানির ঢোক গিলে বলে,

– ক্যানের খাবার গুলো এরকমই হয়। তবে এগুলাতে পুষ্টি আছে অনেক। এই ক্যান খেয়েই তুমি ১ মাস বেঁচে থাকতে পারবা। 

– ১ মাস! আমি এখনই খাইতে পারতেছিলাম না ঠিকমতো সেই যায়গায় ১ মাস খালি এগুলো খেয়ে কাটানো ,! আমার দ্বারা সম্ভব না বাপু। 

– আমার সয়ে গেছে। আগে বন্ধুদের সাথে যখন এসেছিলাম তখন মাংস পুড়িয়ে খেয়েছিলাম। আর সাথে এই ক্যানের খাবার। আমার তো পোড়া মাংসের চেয়ে এই ক্যানের স্বাদই ঢের ভালো লাগে। 

– খালি ক্যান গুলা কী করবা এখন ? 

– এইযে এভাবে আগুনে ফেলে দিবো। এই গুলা অনেকক্ষণ ধরে জ্বলবে। 

– আচ্ছা তুমি বসো, আমি আমার সোয়েটার টা নিয়ে আসছি। ঠান্ডা লাগতেছে আমার। 

– তোমার উঠতে হবেনা। আমিই যাচ্ছি। আমার আরেকটা জিনিস আনতে হবে। 

– আচ্ছা ঠিক আছে। 

রায়হান উঠে যায়। নিপা পানির বোতলের ছিপিটা লাগিয়ে দিয়ে পাশে রাখে। আগুনের খুব বেশি সামনে বসে নেই তারা। তাদের থেকে দেড় দুই হাত দূরে আগুন টা জ্বলছে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক বেড়েছে। মাঝে মাঝে কিছু বানরের চিঁ চ্যাঁ আওয়াজও ভেসে আসছে দূরের গাছপালা থেকে। নিপা হাটু দুটো জড়ো করে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বসে। রায়হান চলে আসে। নিপাকে তার সোয়েটার টা দেয়। নিপা দেখে রায়হান একটা ছোট্ট গিটার নিয়ে এলো ব্যাগ থেকে। রায়হান নিপার পাশে বসে। নিপা বলে,

– এইটা কখন আনলা ? 

– এইটা ব্যাগেই ছিলো। তবে এইটা আমার টা না। আমার টা তো বাসায়। ব্যাগটা আমার বন্ধুর। এই গিটার টাও ওর। দেখোনা এইটা ছোট। আমার টা তো বড়। 

– হ্যা তোমার টা এইটার থেকে বড়। আমি আরো ভাবলাম তোমার মনে হয় দুইটা গিটার। 

– না না। একটাই। এইটা আমার বন্ধু পারভেজের। 

– তোমার বন্ধুও কী গান করে ?

– আমাদের সার্কেলে ৪ জনই আমরা গানের সাথে জড়িত। কলেজে থাকার সময় তো আমাদের একটা ব্যান্ডও বানাইছিলাম। কিন্তু পড়ে আর মিউজিকের সাথে কো অপারেট করা হয়নি আমার। পড়াশোনা শেষ করে বাবার ব্যবসায় হাত দিয়েছি। (গিটার আঙ্গুল দিয়ে একটা টান দিয়ে) এই সময়টা গান গাওয়ার জন্য পারফেক্ট। দেখো সামনে ক্যাম্প ফায়ার জ্বলছে। পাশে তুমি বসে আছো। উপরে গোলগাল চাঁদটা জোছনা ছড়াচ্ছে। এই রকম ভাইব আর কোথাও পাবেনা। 

 

নিপা সোয়েটার পড়ে নেয়। নিয়ে রায়হানের সাথে কাছাকাছি হয়ে বসে। রায়হানের এক হাত জড়িয়ে ধরে। রায়হান তার সামনে থাকা আরেকটা খালি ক্যান আগুনের দিকে দিয়ে দেয়। কিছু ফুলকি আকাশে উড়ে মিলিয়ে যায়। রায়হান বলে,

– শুরু করি তাইলে ,,! 

– কোন গান টা গাইবে ,,! 

– যেটা আমার প্রথম মাথায় এসেছিলো তোমায় দেখে ,,! 

নিপা একটা মুচকি হাসি দেয়। রায়হান গিটারের হাতের আঙ্গুল বোলায়। সুর তুলতে থাকে এই নিদারুণ প্রকৃতির সৌন্দর্যের মাঝে। নিপা রায়হানের কাঁধে মাথা রেখে তার হাত জড়িয়ে ধরে এক দৃষ্টে ক্যাম্পফায়ারের দিকে তাকিয়ে থাকে। সেই ক্যাম্পফায়ারের আলোতে তাদের দুইজনের মুখয়ব জলমলিয়ে উঠছে। রায়হান গান ধরে,

 

আমার একলা আকাশ

থমকে গেছে

রাতের স্রোতে ভেসে

শুধু তোমায় ভালবেসে

 

আমার দিনগুলো

সব রঙ চিনেছে

তোমার কাছে এসে

শুধু তোমায় ভালবেসে

 

তুমি চোখ মেললেই

ফুল ফুটেছে

আমার ছাদে এসে

ভোরের শিশির

ঠোট ছুঁয়ে যায়

তোমায় ভালবেসে

 

আমার একলা আকাশ থমকে গেছে

রাতের স্রোতে ভেসে

শুধু তোমায় ভালবেসে

,

,

আমার ক্লান্ত মন ঘর খুঁজেছে যখন

আমি চাইতাম, পেতে চাইতাম

শুধু তোমার টেলিফোন

 

ঘর ভরা দুপুর

আমার একলা থাকার সুর

রোদ গাইতো, আমি ভাবতাম

তুমি কোথায় কতদূর

 

আমার বেসুরে গীটার সুর বেঁধেছে,

তোমার কাছে এসে

শুধু তোমায় ভালবেসে

আমার একলা আকাশ চাঁদ চিনেছে

তোমার হাসি হেসে

শুধু তোমায় ভালবেসে

 

রায়হান গিটারের সুর থামায়। নিপার চোখ গুলো ক্যাম্পফায়ারের আগুনের আলোয় চিকচিক করছে। নিপা রায়হানের কাঁধ থেকে মাথা উঠায়। রায়হান বলে,

– কেমন ছিলো ,,! 

– অসাধারণ,,! আমি তোমার গানে হারিয়ে গিয়েছিলাম,,! 

– বুঝতে হবে। আমি আমাদের ব্যান্ডের মেইন ভোকালিস্ট ছিলাম। আর আজ তোমার প্রেমেতে গায়ক তকমায় আবার নিজেকে ভাসালাম। 

– ছোট বেলা থেকেই তুমি গান গাইতে ,,!

– না। কলেজে উঠার পর থেকে গানের যাত্রা শুরু। আচ্ছা শুনো এখন, আমি তোমার জন্য যেই গান টা লিখেছিলাম সেটা গাই। 

– তুমি আমার জন্য গান লিখেছো ,,!

– হ্যা। তোমায় চিঠি পাঠানোর পর থেক আজকের এই রাত পর্যন্ত। তোমায় আমি যতটা চিনেছি, যতটা উপলব্ধি করতে পেরেছি, যতটা ভালোবাসার সাগরে ভেলা ভাসিয়েছি সব আমার গানে আমি লিখেছি। সুর দিয়েছি। অপেক্ষায় ছিলাম দুজনে যখন একসাথে এক সুন্দর পরিবেশে থাকবো তখন তোমায় গেয়ে শুনাবো। আজকেই সেই দিন। 

– প্লিজ শোনাও। আমার খুব শুনতে ইচ্ছে করছে ,,! আমার প্রিয় আমার জন্য গান লিখেছে ,,,! প্লিজ শোনাও। 

– আচ্ছা তাইলে ঠিক আবার আগের মতো আমার হাত জড়িয়ে ধরো। কাঁধে মাথা রাখো,,! 

নিপা সাথে সাথে আবার রায়হানের হাত জড়িয়ে ধরে তার কাঁধে মাথা রাখে। খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে দুজন। আকাশে ছোট এক পেজা তুলোর মতো সাদা মেঘ ভেসে যায়। চাঁদ খানা তার আড়াল হতে উঁকি দেয়। নিপা চোখ বুজে। রায়হান গিটারের সুর বাঁধে তার মায়ার বাঁধনে। গাইতে শুরু করে তার প্রিয়তমার জন্য লেখা প্রথম গান,

 

তুমি আমার নওতো সুখ

তুমি সুখের বেদনা,

সব স্বপ্নের রং হয়নাতো 

বেদনার মতো নয় রঙা,

জীবনের সব কথা নয়

আমি জীবনটাকেই বলতে চাই,

হয়তো দু’বাক্য নয়

সেতো ভালোবাসার কাব্য কয়,

আমি কবি নই

তবু কাব্যের ভাষাই বলবো আজ,,,

,

,

তুমি বললে আজ দু’জনে 

নীল রঙা বৃষ্টিতে ভিজবো,

রোদেলা দুপুরে একসাথে 

নতুন সুরে গান গাইবো,

,

,

আমি কবি নই

তবু কাব্যের ভাষাই বলবো আজ,

তোমার হাসির শ্রাবণ ঢলে 

স্বপ্ন নিয়ে ভাসতে চাই,

তোমার হাসির শ্রাবণ ঢলে 

স্বপ্ন নিয়ে ভাসতে চাই,,,

,

,

তুমি বললে আজ দুজনে 

সাত রঙা প্রজাপতি ধরবো,

নোনা বালিচরেতে একসাথে 

আকাশের সমুদ্র স্নান দেখবো,

গোধুলির আলো আঁধারিতে ঊর্মির সাথে দুজনা

নীলের বুকে আজ হারাবো,,,

 

আমি কবি নই

তবু কাব্যের ভাষাই বলবো আজ,

তোমার হাসির শ্রাবণ ঢলে 

স্বপ্ন নিয়ে ভাসতে চাই,

তোমার হাসির শ্রাবণ ঢলে 

স্বপ্ন নিয়ে ভাসতে চাই,,,,

 

নিপা চোখ খুলে। সে যেনো হারিয়ে গিয়েছিলো কোনো রঙিন স্বপ্নের রাজ্যে। গানের প্রতিটা লাইন সে অনুভব করতে পারছিলো। সুরের সাগরে ঢেউ খেলে বেড়াচ্ছিলো তার মন। রায়হান গানটা কতটা আবেগ দিয়ে লিখেছে,,! রায়হান গিটার থেকে আঙ্গুল উঠায়। আশেপাশের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের মাঝে নিরবতা ভেঙ্গে বলে,

– আমার সুবাটার কী গানটা পছন্দ হয়েছে ,,! 

নিপা কিছু বলে না। হঠাৎ জড়িয়ে ধরে রায়হানকে। ও কাঁদছে। রায়হান অবাক হয়। বলে,

– কী হয়েছে,,! সুবা তুমি কাঁদছো কেনো ,,! 

নিপা আরো শক্ত করে রায়হানকে জড়িয়ে ধরে থাকে। তার চোখের জল গুলো রায়হানের কাঁধে পড়ছিলো। রায়হান নিপার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে তাকে আরো ভালোভাবে আলিঙ্গিত করে নেয়। নিপা কান্না ভেজা কন্ঠে বলে,

– তোমার এতোটা ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য আমি নই ,,! আমার ভয় হয়। আমি যদি তোমাকে হারিয়ে ফেলি ,,! তুমি, তুমি সবসময় আমার হয়ে থেকো। সবসময়। 

– আরে বোকা। কাদেনা তো। আমি তো তোমার সাথেই আছি। তোমার অনেক কাছে আছি। তোমায় ছেড়ে জনম,জন্মান্তরেও যাবো না।

– আমার মনে হয় আমি যেন তোমার ভালোবাসায় মরে যাই। তোমায় হাতে আমি আমার হৃদয়টা উঠিয়ে দেই। তোমার ভালোবাসা আমার অনেক আপন করে নিয়েছে। প্রিয়জন থেকে প্রয়োজন। সব হয়ে উঠতে চাই আমি তোমার। সবসময় তোমায় ভালোবাসায় আমায় এভাবেই জড়িয়ে রেখো ,,! আমায় আগলে রেখো ,,! 

– আচ্ছা আচ্ছা কান্না থামাও এখন। আমি তো আছি। সবসময় তোমার কাছেই আছি। আর থাকবোও। আর কেদোনা। 

রায়হান তার কোল থেকে নিপাকে উঠায়। মেয়েটার চোখ দুটো ভিজা। এখনো কাঁদছে। রায়হান নিপার কপালে আর দুই চোখের পাতায় চুমু খায়। তার মুখের উপর থেকে চুল গুলো সড়িয়ে কানের পাশে রাখে। বলে,

– তুমি আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার। আমি সবসময় তোমায় আমার অঙ্গে অঙ্গে বেঁধে রাখবো। ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে দিবো। আমার ভালোবাসা, আমার স্রোতোসিনী। 

নিপা ছলছল চোখ নিয়ে একটা মুচকি হাসি দেয়। রায়হানকে আবার জড়িয়ে ধরে। রায়হান তাকে আলিঙ্গনে বেঁধে রাখে। নিপাকে এতোটা ঘনিষ্ঠ ভাবে রায়হান আলিঙ্গন করেছিলো যে নিপার হৃদস্পন্দন সে তার দেহে অনুভব করছিলো। যেন দুই হ্রদয় এক প্রান্তরে এসে মিলে একাকার হয়ে গিয়েছে। রায়হান নিপাকে বলে,

– ঘুম ধরেছে ,,! 

– উমম, কিছুটা। 

– চলো ঘুম পাড়ানির গান বলে তোমায় ঘুম পাড়িয়ে দেই। 

– আমি এভাবেই থাকবো। তোমাকে জড়িয়ে ধরে। 

– কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ো। তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে গান গাইবো। 

– ঘুমিয়ে গেলে আমাকে কিন্তু কোলে করে তাঁবুতে দিয়ে আসতে হবে। 

– আমি তো সেই কোলে নেওয়ার লোভেই তোমায় এখন ঘুম পাড়িয়ে দিবো ,,,! 

– দুষ্টু,,,! 

নিপা রায়হানের কোল থেকে মাথা উঠায়। একটা মিষ্টি হাসি দেয়। রায়হানের কোলে মাথা রেখে শোয়। দুই হাত দিয়ে রায়হানের কোমর জড়িয়ে ধরে। পেটে একটা ছোট চুমু খায়। রায়হান তা দেখে এক ছোট্ট হাসি হেসে তার মাথায় হাত রাখে। চুলে বুলি কেটে দিতে থাকে। নিপার মাথার হিজাব টা খাওয়ার সময়ই খুলে রেখেছিলো সে। রায়হান নিপার মাথায় এক হাত রেখে আরেক হাত দিয়ে নিপার তুলতুলে গালে আলতো করে ছুঁয়ে দেয়। নিপা মুচকি হাসে। রায়হান নিপার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে গান ধরে। আকাশের জোছনায় তারাকারাজিরাও ঝলমলিয়ে উঠে,

,

,

খোলা চোখ খানা কর বন্ধ

বাতাসের ঠান্ডা গন্ধ,

বয়ে বেড়ায় ঘরেরও বাহিরে,,

আসো ছোট্ট একটা গান করি

যাতে ঘুম পাড়ানি মাসি এসে পাশে,

বসে হাতখানা দিবে কপাল ভরে,,

 

ভয় নেই আছি আমি পাশে,

হাতখানা ধরে আছি হেসে,

কোলেতে আমার মাথা তোমার..

অন্ধকার রাত, নিশ্চুপ সব,

জোনাকির দল আজো জেগে আছে,

তারা হয়তো অপেক্ষায় তোমার ঘুমের

 

হাতে রেখে হাত দেখে ঘড়ি,

বসে অপেক্ষা করি,

কবে হবে কাল, ফুটবে সকাল,,

 

আয় ঘুম চুম্বন দে

তার সারা কপালে,

যাতে ঘুম আসে সব নিশ্চুপ হয়ে যায়,

আয় চাঁদমামা কাছে আয়,

যাতে অন্ধকার না হয়,

আলোমাখা কপালেতে টিপ টা দে যাতে,

কিছু আলোকিত হয়,

সে যাতে ভয়, না, পায়,,

,

,

 

পরী আয় তার দুই হাত ধরে

নিয়ে যা স্বপ্নের খেলাঘরে

যেথা মিলবে তার সুখের ঠিকানা,,

তারাদল ছুটে আয় এখানে

তার ঘুমখানা যাতে না ভাঙে তাই

নিয়ে যা তাকে স্বর্গের বিছানায়,,

যদি দেখো সেথা আমায়,

বসে গান তোমায় শোনায়

তুমি মিষ্টি এক চুমু খেয়ো মোর গালে,,

 

অন্ধকার রাত নিশ্চুপ সব

জোনাকির দল আজো জেগে আছে,

তারা হয়তো অপেক্ষায় তোমার ঘুমের,,

 

হাতে রেখে হাত দেখে ঘড়ি,

বসে অপেক্ষা করি,

কবে হবে কাল, ফুটবে সকাল,,

 

আয় ঘুম চুম্বন দে

তার সারা কপালে,

যাতে ঘুম আসে সব নিশ্চুপ হয়ে যায়,

আয় চাঁদমামা কাছে আয়,

যাতে অন্ধকার না হয়,

আলোমাখা কপালেতে টিপ টা দে যাতে,

কিছু আলোকিত হয়, আহা …………. আহা………….

 

নিপা চোখ বুজে পাড়ি দিয়েছে ঘুম রাজ্যে। সারাদিন জার্নি করায় হয়তো চোখের কোনে থাকা ঘুম সারা চোখের পাতায় ছেয়ে গিয়েছে। রায়হান নিপার দিকে তাকায়। মেয়েটা ঘুমালে যেনো আরো কিউট লাগে। রায়হান আবার হাত দিয়ে গাল গুলো ছোঁয়। একদম নরম তুলতুলে গাল। রায়হান নিপার কপালে এক ছোট্ট চুমু খায়। গিটার টাকে ওখানে রেখেই নিপাকে দুই হাত দিয়ে কোলে তুলে নেয়। বিশাল দেহি রায়হানের কাছে যেন নিপাকে তুলার পুতুল মনে হচ্ছে। মেয়েটা এতো নরম কেনো ,,! নিপার লম্বা চুল গুলো ঝুলছে, হালকা বাতাসে দুলছে। চাঁদের জোছনা ঘুমন্ত মুখে এসে পড়ে শুভ্রতার আলো ছড়াচ্ছে। রায়হান তাকে কোলে নিয়ে চলে যায় তাঁবুর দিকে। আকাশের উজ্জ্বল চাদ খানাও আলো দিতে দিতে বোধয় আজ ক্লান্ত। সেও চলে যায় মেঘের আড়ালে কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমাতে। নিচে শুধু জ্বলতে থাকে ক্যাম্প ফায়ারের আগুন। আর তার কিছু দূরে পড়ে থাকে রায়হানের ছোট্ট গিটার টা। 

 

দূরে থাকা কোন এক লোক হেঁটে হেঁটে চলে যায় রাস্তার দিকে। এতোক্ষণ বোধহয় সে নজর দারির সাথে সাথে নিপার আর রায়হানের সুন্দর মুহুর্তটাকেও উপভোগ করছিলো ,,! 

 

____

 

আফাজের ঘুম ভাঙে। নিজেকে আবিষ্কার করে সেই ক্লিনিকের রুমের ছোট্ট বিছানাটায়। বাইরের বৃষ্টির আওয়াজ তার কানে এসে পৌঁছায়। শরীর দুর্বল লাগছে। মাথা ঘুরে পাশ ফিরে তাকাতেই সে থমকে যায়। একটা মেয়ে তার হাতের মাংসপেশিতে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছে। ফ্লোরে বসে তার হাতের মাংসপেশিতে মাথা দিয়েছে সেই মেয়ে। টেবিলে জ্বলতে থাকা মোম টা অর্ধেকে এসে নেমেছে। সেই মোমের জলন্ত শিখায় মেয়েটার ঘুমন্ত মলনি মুখ খানা উজ্জ্বল চাঁদ হিসেবে ধরা দেয় আফাজের চোখে। আফাজ তার কপালে এক ভাঁজ করা কাপড় আবিষ্কার করে। কাপড় টা তার কপাল থেকে উঠিয়ে দেখে একটা ছেঁড়া কাপড়। তার শরীরে কাঁথা তুলে দেওয়া। সাথে একটা পাতলা ওড়নাও দেখে সে। হাতে নেওয়া কাপড় টা আর ওড়নার কাপড় টা একই। সে আবার মেয়েটার ঘুমন্ত মুখখানার দিকে তাকায়। টেবিলে দেখতে পায় সচ্ছ পানির বোতল আর তার পাশে থাকা বক্সটায় পানি। সে এখন কিছুটা বুঝতে পারে। তার হয়তো জ্বর এসেছিলো। সে এখন যেন জ্বর থেকে উঠে আস্তে আস্তে তার হারানো জ্ঞান ফিরে পাচ্ছে। একটা মেয়ে এসেছিলো এই ঘরে। ঘুমন্ত মেয়েটার দিকে আফাজ আবার তাকায়। এইটাই তো সেই মেয়েটা। মেয়েটা তার সেবা করলো ,,! কেনো করলো ! মেয়েটা কী হয় তার ,,! আফাজ মেয়েটার মুখের উপরে চলে আসা দু একটা চুলকে ফুঁ দিয়ে সড়িয়ে দেয়। তার কাছে যেন মনে হতে থাকে আলিশা ঘুমিয়ে আছে তার হাতে বাহুবলে, আলিশার মতোই মেয়েটা ছোট্ট। ফর্সা চেহারা তার। জ্ঞান হারাবার আগে যখন মোমবাতি নিয়ে এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো তখন মোমের আলোয় মেয়েটার চিকচিকে চোখ গুলো দেখেছিলো সে। আফাজ কিছু বলে না। মেয়েটাকেও ডাক দেয় না। তার মন থেকে মেয়েটার মুখয়ব সড়ে গিয়ে আলিশার মুখয়ব ভেসে উঠে। এমনই তো একটা মিষ্টি ফুল ছিলো আলিশা। মিষ্টি মেয়েটার কথা গুলো মনে পড়তেই আফাজের ভিতর টা খাঁ খাঁ করে উঠে। তার সবটুকু ভালোবাসা জুড়ে শুধু আলিশাই ছিলো। আর আলিশাই থাকবে। সে কখনোই আর কাউকে সেই যায়গায় বসাতে পারবেনা। তার মন অন্য আর কাউকে মেনে নিতে পারবেনা সেই আসনে। আফাজের চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে দু ফোঁটা অশ্রু। তখনই হঠাৎ দেখে তার বাহুবলে মাথা রাখা মেয়েটি নড়ে উঠেছে। সে চকিতে সেদিকে তাকায়। মেয়েটা ঘুমের মধ্যেই নড়ে আফাজের বুকে কনুইরেখে গলায় হাত রাখে। নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায় তারপর। আফাজের বাম হাতে মাথা রেখেছিলো সেই মেয়েটা। আর ডান হাতটা তার অবশ। সে মেয়েটাকে উঠিয়ে দিতে পারছিলোনা। তার মনই কেনো জানি চাইছিলোনা। তবে মেয়েটার হাতের আঙ্গুল গুলো তার গলায় ত্বকে লেগেছিলো। তবে তা এক ভিন্ন স্পর্ষ হিসেবেই তার মস্তিষ্ক সনাক্ত করে। আফাজ তার চোখ বুজে। আলিশার স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে ঘুমিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। বাইরের বৃষ্টির আওয়াজে ঘরে থাকা মোমের আলোয় এই দুই নরনারীকে যেন খুব আপন মনে হয়,,! তাদের পরিচয় যেন ছিলো পূর্বজন্মের ,,,! 

 

______

 

ব্রেকিং নিউজ,,,

খাগড়াছড়ির পাগলাপিড়, আর মহালছড়িতে জঙ্গি হামলায় নিহত হয়েছে স্থানীয় চাকমা ও মারমা সম্প্রদায়ের নারী ও শিশু সহ ৫৭ জন। আহত শতাধিক। আক্রমণকারী জঙ্গিরা মহালছড়ি আর পাগলাপিড় অঞ্চলের সব পাহাড় আর যায়গা নিজেদের দখলে করে নিয়েছে। খাগড়াছড়ির সাথে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। পুলিশ আর বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের সাথে জঙ্গিদের কয়েকদফা গুলি বিনিময় হয়েছে। আমরা আরো বিস্তারিত জানার জন্য যুক্ত হচ্ছি আমাদের খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি কমল দে’র সাথে। কমল, আপনি আমাদের কথা শুনতে পাচ্ছেন ,,! হঠাৎ এই জঙ্গি হামলা কী করে হলো? মৃতের সংখ্যা কী আরো বাড়তে পারে ? 

 

চলবে ,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

 

উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন :: ২(মুখোশ)

পর্ব :: ৬৫

লেখক :: মির্জা শাহারিয়া

 

সকালের এক নতুন অরুনোদয় ঢাকা পড়ে মেঘের আড়ালে। হালকা গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে শেষ রাত থেকে। তাঁবুর ভিতরে রায়হানকে জড়িয়ে ধরে গুটিসুটি হয়ে বসে আছে নিপা। উপর থেকে ২-১ ফোঁটা বৃষ্টির পানি এসে তাঁবুর গাঁয়ে পড়ছে। ওয়াটার প্রুফ তাঁবু হওয়ায় ভিতরে পানি ঢুকেনি। মাঝে মাঝে ঠান্ডা বাতাসে গাছের পাতা গুলো দুলে উঠছে। বাইরে থেকে আসছে গোলাগুলির আওয়াজ। সকালের আলো ফোটার আগেই এই গুলির আওয়াজ রায়হান আর নিপার ধরীত্রিতে আঁধার নামিয়ে দিয়েছে। নিপা অনেক ভয় পাচ্ছে। রায়হানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। রায়হানের মুখেও চিন্তার ছাপ। হঠাৎ এতো গুলি বিনিময়ের আওয়াজ আসছে কেনো ? পাহাড়ের নিচে হচ্ছে টাই বা কী ? আর আজই হতে হলো ! নিপাকে নিয়ে সে একটু ঘুরতে এসেছিলো কিন্ত সব আবহ এই গুলির আওয়াজে ভয়ের কুপ জমিয়ে দিয়েছে তাদের মনে। রায়হান নিজের মুখের উপর থেকে ভয়ের মেঘ কাটাবার সিদ্ধান্ত নেয়। নাইলে যে নিপার ভয়টা সে দূর করতে পারবেনা। নিপা তার উপর নির্ভর করে আছে। নিজে ভেঙে পড়লে তো হবেনা। রায়হান গলা ঝেড়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলে উঠে,

– খিদা লাগছে তোমার ,,! 

– আ, আমার কোন খিদা লাগেনি। আমার ভয় লাগছে। খুব ভয় লাগছে। নিচে কিসের গোলাগুলি হচ্ছে, আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না।

– আরে ভয় পেয়ো না। তেমন কিছু না। হয়তো কোন রাজনৈতিক বিষয়। মিছিল মিটিং এ পুলিশ রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে না! এটা ঐটারই শব্দ। ভয় পাইয়ো না। আমি আছিতো। 

– তারপরও, তারপরও আমার ভয় লাগছে। আমাদের, আমাদের কিছু হয়ে যাবে না তো ! তোমার কিছু হলে কিন্তু আমি নিঃশেষ হয়ে যাবো। 

– আরে পাগলি কিছু হয়নি। আমি আছি তো তোমার সাথে। তোমার আমার কারো কিচ্ছু হবেনা। আমি আছি কী জন্য হ্যা ,,! ভয় পেয়োনা। (একটু থেমে) আচ্ছা দাঁড়াও আমি একটু বাইরের পরিস্থিতি দেখে আসি। 

– নাআআআআ। একদম না।‌ (রায়হানের উপর হামলে পড়ে) তোমাকে আমি একদম যেতে দিবো না। 

– আমি খালি রাস্তার এখান থেকে দেখেই চলে আসবো। 

– না, তোমাকে দেখতে যেতে হবেনা। তুমি আমার সাথে থাকো। আমার, আমার (কাঁদো কাঁদো হয়ে) ভয় করতেছে খুব। 

– আরে আরে কাঁদছো কেনো ! তেমন কিছুই হয়নি তো। আচ্ছা আচ্ছা আমি এখানেই আছি, বাইরে যাবোনা। (একটু থেমে বিরবির করে) এই গেন্জাম লাগারও সময় পাইলো না। আমি সুবাকে নিয়ে যেদিন বেড়াতে আসলাম সেদিনই গেন্জাম লাগতে হলো। 

নিপা কন্ঠ খাদে ফেলে বলে,

– আমরা এখান থেকে বেড়োনোর পর সোজা বাড়ি চলে যাবো। এখানে আর থাকবো না। 

– আরে কী বলো কী। কোন না কোন ঝামেলার জন্য আমাদের ট্রিপ ক্যান্সাল করবো ! না না। একদমই না। আমি আরো আজকে সেইন্টমার্টিন যাওয়ার প্ল্যান করে রাখছি। সুবা তুমি চিন্তা করতেছো কেনো। নিচের গ্যান্জাম তো উপরে আসবেনা। আর আমার কাছে, আমার কাছে এইটা আছে। (কোমর থেকে এক পিস্তল বের করে রায়হান। নিপা তা দেখেই আর ভয় পেয়ে রায়হানকে ছেড়ে পিছিয়ে যায়। রায়হান আস্বস্তের সুরে বলে,

– আরে ভয় পাইয়ো না। এইটার লাইসেন্স করা আছে। কোন দরকার লাগতে পারে ভেবে আনছিলাম। যদি কেউ তোমার আর আমার উপর কিছু করতে আসে এটা দিয়ে তাদের শরীর ঝাঝড়া করে দিবো। 

– র, রায়হান। তুমি বন্দুক সাথে নিয়ে ঘুরো ,,! 

– তো কী হইছে ! তুমি আমি একযায়গায় ঘুরতে আসবো, আমাদের সেইফটি কে নিশ্চিত করবে ! আমাদের টা আমাদেরকেই দেখতে হবে। এখন আসো তো কাছে। এতক্ষণ কত জোড়ে চেপে জড়িয়ে ধরেছিলা। এখন আবার থাকো। 

– তুমি এখনো মজার মুডে আছো রায়হান। আমার ভয়ে প্রাণ যায় যায় অবস্থা। 

– আরে কিছু হবেনা তো। এইটা তো আছেই। ধরে দেখো, এইটা খেলনা না। আসল কিন্তু। (বলেই নিপার দিকে বন্দুকটা এগিয়ে দেয় রায়হান। নিপা ভয়ে আরো পিছিয়ে গিয়ে বলতে থাকে,

– দূরে সড়াও ঐটা, আমার থেকে দূরে সড়াও। 

– আচ্ছা আমি তাইলে আবার এটাকে যায়গা মতো রেখে দিলাম। এবার তো কাছে আসো। আমার কোলে উঠে বসে থাকো। এখন তো একসাথে বসে থাকা ছাড়া আর আমাদের কিছু করার নাই। 

নিপা ভয়ে ভয়ে কাছে আসে। এসে রায়হানের পাশে বসে। রায়হান মৃদু হাসে। নিপার বুক যেন ধুকধুক ধুকধুক করছে। উপর থেকে পাতায় জমা বৃষ্টির পানি ফোঁটা ফোঁটা হয়ে এসে তাঁবুতে পড়ছে। হঠাৎ গোলাগুলির আওয়াজ আসা বন্ধ হয়ে যায়। হইহুল্লোড়ের আওয়াজও পাওয়া যায় না। নিপা রায়হানের কাঁধ থেকে মাথা উঠায়। চারপাশে মুখ ঘুড়িয়ে বলতে থাকে,

– রায়হান, গুলির আওয়াজ হঠাৎ থেমে গেলো।

– হ্যা। মনে হয় পুলিশ ওদের ধরে ফেলেছে। 

– কাদের ? 

– ইয়ে মানে যারা আরকি হড্ডগোল করছিলো। তাদের। (কিছুটা নার্ভাসের সুরে কথাটা বলে রায়হান)

– আমার পানির পিপাসা পেয়েছে। পানির বোতল টা দেওতো।

রায়হান তার পাশে থাকা পানির বোতল টা হাতে নেয়। কিন্তু বোতল একদম খালি। বোতলে এক ফোঁটাও পানি অবশিষ্ট নেই। রায়হান নিপাকে বোতল দেখিয়ে বলে,

– এইটার পানি তো শেষ। দাঁড়াও আমি বাইরের ব্যাগ থেকে আরেকটা বোতল আনছি। ব্যাগে আরো বোতল থাকার কথা। 

– না, তুমি যাবেনা। বাইরে যাওয়ার দরকার নেই। আমি পানি খাবো না।

– আরে বাচ্চাদের মতো করছো কেনো ? গোলাগুলি তো থেমে গেছে। এখন আবার কীসের ভয়। আর ব্যাগটা তো আগুন যেখানে ধরিয়েছিলাম ঐখানেই আছে। ভয়ের কিছু নাই। 

– তুমি যেওনা। আমার এখনো ভয় করতেছে। 

– আচ্ছা এখন কীসের ভয় হচ্ছে তোমার বলোতো ! না আছে গুলির শব্দ, না আছে অন্য কিছু। আমি তো এখন নিচে কিংবা রাস্তার দিকে যাচ্ছি না। ব্যাগটা থেকে পানির বোতল নিয়েই চলে আসবো। 

নিপা রায়হানের কথা গুলো শুনে ভয়ে ভয়ে তার হাত ছেড়ে দেয়। রায়হান তাঁবুর চেইন খুলে। বাইরে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়ছে। আকাশ কিছুটা মেঘলা। আবহাওয়া ভয়ঙ্কর সুন্দর, কিন্ত সকালের এই গুলাগুলি সব রোমান্টিক আবহ ভেস্তে দিয়েছে। রায়হান মনে মনে সেই হড্ডগোল সৃষ্টিকারি লোকজনের জন্য কিছু গালি ছুড়ে দিয়ে তাঁবু থেকে বেড়োয়। নিপা তাঁবুর গেইট দিয়ে মাথা বের করে বসে আছে। চোখ,মুখে ভয়ের ছাপ। রায়হান উঠে দাঁড়িয়ে হেঁটে হেঁটে ব্যাগের দিকে যেতে থাকে। ঝিরঝিরে বৃষ্টি হওয়ায় কিছুটা কর্দমাক্ত হয়েছে ঘাসঘেরা ভূমিটা। রায়হান হেঁটে গিয়ে ব্যাগের পাশে দাঁড়ায়। ব্যাগের কিছুটা সামনেই তারা ক্যাম্পফায়ার জালিয়েছিলো। কিন্তু শেষ রাতে আসা বৃষ্টিতে তা নিভে গেছে। রায়হান হেলে ব্যাগের চেইন খুলে। সেখান থেকে পানির ‌বোতল বের করতে থাকে। নিপা তাঁবুর গেইট থেকে মুখ বের করে চেয়ে আছে রায়হানের দিকে। হঠাৎ কয়েকজন লোকের কাঁদা মাড়িয়ে দৌড়ে আসার শব্দ। রায়হান এলার্ট হয়ে যায়। নিপা শব্দ শুনেই ভয়ে দ্রুত তাঁবু থেকে বের হয়। রায়হান তাঁবুর দিকে ফিরে তাকায়। নিপা তাঁবু থেকে বেড়িয়ে পিছনে ফিরে দেখে কিছু মুখে কালো কাপড় বাঁধা লোক গাছপালা দিয়ে ছুটে এই খালি যায়গার দিকে দৌড়ে আসছে। তাদের সকলের হাতে বড় বড় অস্ত্র। লোকগুলো গাছপালার অংশ থেকে বেড়িয়েই তাদের বন্দুক উঠিয়ে নিপার দিকে তাক করে ধরে। নিপা তাদের দেখে ভয়ে এক জোড়ে চিৎকার দেয়। লোকগুলোর মধ্যে একজন নিপাকে গুলি করতে যাবেই তখনই এক গুলি এসে তার বুক এফোড় ওফোড় করে দেয়। লোকটা ধপ করে পড়ে যায়। বাকি লোকগুলো সামনে চেয়ে দেখে, রায়হান ব্যাগের পাশে দাঁড়িয়ে হাত উঁচিয়ে তার পিস্তল ধরে রেখেছে। বাকিরা রায়হান দিকে নিশানা করতেই রায়হান এগিয়ে আসতে থাকে আর একে একে ট্রিগার চেপে গুলি ছুড়তে থাকে। রায়হান আর তাদের গুলি বিনিময়ের মাঝেই নিপা দুই হাতে কান চেপে চিৎকার করতে করতে রায়হানের দিকে ছুটে আসে। রায়হান নিপাকে জোড়ে চিৎকার দিয়ে থামতে বলে। নিপা না থেমেই দৌড়ে আসতে থাকে, তখনই রায়হান দৌড়ে এক ডিগবাজী খেয়ে সেই বন্দুকধারীদের পা উদ্দেশ্য করে গুলি চালাতে থাকে। সেই জঙ্গিদের ছোড়া এক গুলি নিপার হাতের কনুইয়ের খুব কাছ দিয়ে চলে যায় অদূর গন্তব্যে। নিপার হাতে সেই গুলির ছোঁয়া লাগেনা। নিপা দৌড়ে এগিয়ে আসে রায়হানের কাছে। রায়হান উঠে দাঁড়িয়ে নিপাকে এক হাত দিয়ে তার বুকে জড়িয়ে ধরে এক দক্ষ শুটারের মতো সব গুলো লোকের শরীরে গুলি বিধিয়ে দেয়। সবার দেহ মাটিতে একে একে লুটিয়ে পড়ে। চারপাশ মুহুর্তেই মধ্যৈই যেন শান্ত হয়ে যায়। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে। আশপাশের আবহাওয়া কালো মেঘে ঢেকে যায়। রায়হান তার পিস্তল ধরা হাত নামায়। তাঁবুর সামনে পড়ে আছে সেই বন্দুক ধারীদের ঝাঝড়া দেহ, নিপাকে এক হাতে বুকে জড়িয়ে ধরে রায়হান এক দৃষ্টে চেয়ে আছে সেদিকে। চোখে উত্তপ্ত আগুন রেখা। নিপা রায়হানের বুকে কাঁদছে। উপর থেকে নেমে আসা বৃষ্টি দুজনকে ভিজিয়ে দিচ্ছে। রায়হানের আরেকহাতে থাকা পিস্তলের নল বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টির পানি পড়ে যাচ্ছে ভেজা ঘাসের আড়ালে। আকাশে বিজলী চমকিয়ে উঠে।

 

_____

 

রিয়াদ আর তার দুই কনস্টেবল প্রবেশ করে সুরাইয়া বেগমের রুমে। রুমে তালা লাগিয়ে রেখে দিয়ে গিয়েছিলো রিয়াদ। পুলিশি তদন্ত যতদিন না শেষ হচ্ছে এই ঘর তাদের দায়িত্ব থাকবে।

 

ভিতরে ঢুকেই চারপাশ ঘুরে দেখতে থাকে রিয়াদ। জানালাটা খোলা। বাইরের হালকা আলো এসে ঘরে পড়ছে। এক কনস্টেবল লাইটের সুইচ গুলো জ্বালিয়ে দেয়। এসে রিয়াদের পাশে দাঁড়ায়। রিয়াদ বলে,

– এই রুমের যা কিছু আছে সবকিছু নেড়েচেড়ে দেখো। কেউ মারার হুমকি মুলক কিছু দিয়েছিলো কী না তাইলে জানা যাবে। বিশেষ করে আলমারী, বিছানা আর এই টেবিল দুটো। এইগুলো ভালোভাবে সার্চ করো। ওকে!

– ওকে স্যার হয়ে যাবে। 

– হমম, আমি একটু অন্দরমহলে গিয়ে বাকিদের সাথে কথা বলে আসি। (বিরবির করে) এই বাড়ির মধ্যে কিছুতো সমস্যা আছে, নাইলে দুইজন মারা গেলো অথচ সবাই এতোটা স্বাভাবিক! যেনো কিছুই হয়নি। বিশেষ করে বাড়ির কর্তা আর তার বউ। (একটু থেমে) কিছু না কিছু তো চলছেই এ বাড়িতে। সেটা কী, তা আমাকে জানতেই হবে।

– কিছু বললেন স্যার ? 

– না। কিছুনা। কোথাও কিছু পেলে তাড়াতাড়ি আমাকে ইনফর্ম করবে, আমি অন্দরমহলেই আছি। 

– ওকে স্যার। 

রিয়াদ ঘরের চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে হাতে থাকা টুপিটা মাথায় পড়ে চলে যায়। ঘরে যেই দুই যায়গায় লাশ পড়ে ছিলো সেখানটায় এখনো চক দিয়ে মার্ক করা আছে। দুই কনস্টেবল সুজন আর নয়ন চারপাশ খোঁজা শুরু করে। সুজন দেখতে থাকে খাটের তোষক উল্টিয়ে তার নিচ টায়। আর নয়ন আসে পড়ার টেবিলটার কাছ। বই গুলো অগোছালো। নয়ন বই গুলো হাতে নিয়ে পৃষ্ঠার উড়িয়ে দেখতে থাকে ভিতরে কোন কাগজ বা এমনকিছু আছে কী না। বইয়ে কিছু না পেয়ে বইটা রেখে দেয় সে। টেবিলে থাকা অন্য বইগুলো হাত দিয়ে টেনে সামনে নেয়। তখনই তার হাত লেগে কলমদানিটা মাটিতে পড়ে যায়। নয়ন মুখ দিয়ে বিরক্তসূচক ‘চ’ শব্দটি বের করে। হেলে মাটি থেকে কলমদানি আর কলম গুলো উঠাতে থাকে। তখনই একটা মোটা খয়েরি রঙের কলম দেখে সে কিছুটা অবাক হয়। কলম টাকে তুলে চোখের কাছে এনে দেখতে থাকে। কিছুক্ষণ দেখার পর তার চোখ,মুখ বড় হয়ে যায়। আরে এটাতো পেন ক্যামেরা। এটায় তো ক্যামেরা লাগানো ! 

‘ এই পেন ক্যামেরা এহানে কেমনে আইলো! তারমানে কী এইডা এইহানে আগে থেইকাই কেউ রাইখা গেছিলো! ‘ বলা মাত্রই সে তার মুখ তুলে তাকায়। দেখতে থাকে সুজন কী করছে। দেখে ও এখন বিছানা ছেড়ে অপর পাশের বইয়ের থাকের মাঝ দিকে গেছে। নয়ন সাথে সাথে পেন ক্যামেরাটা তার পকেটে ঢুকায়। চারপাশে এমনভাবে নজর দিয়ে দেখতে থাকে যে কেউ তাকে দেখলো কী না। যেন সে চোরের মতো কোন জিনিস সাপ্টে নিয়েছে। নয়ন বাকি স্বাধারণ কলমসহ কলম দানিটা উঠিয়ে টেবিলে রেখে দেয়। দিয়ে চলে যায় আলমারির দিকে। 

 

     রিয়াদ করিডোর দিয়ে বেড়িয়ে এসে অন্দরমহলে দাঁড়ালো। অন্দরমহলের মাঝে দাঁড়িয়ে ছিলো আঁখি, সুমনা বেগম, আর সোনালি। রিয়াদ এসে তাদের সামনে দাঁড়ায়। চারপাশে একবার তাকিয়ে আবার তাদের দিকে ফিরে। বলে,

– যেইসময় এই মার্ডার গুলো হয়েছিলো তখন আপনার কোথায় ছিলেন ? 

– আ,আমি বাইরে ছিলাম। এতিম খানায় গিয়েছিলাম, বাচ্চাগুলোকে দেখতে। (সুমনা বেগম) 

– আর তুমি ? 

– আ,আমি রান্না ঘরে পাক করতাছিলাম। খালাম্মা আমারে রাইন্ধা রাখতে কইছিলো, হেয় বলে এতিম খানায় যাইবো। আমি রান্না করোনের সময় কেউ যানি আইয়া আমার মুখ পিছন থেইকা চাইপা ধরছিলো। তারপর, তারপর আর আমার কিছু মনে নাই। (সুমনা বেগমের দিকে তাকিয়ে) পরে খালাম্মা আমার মুহে পানি ছিটাইয়া আমার জ্ঞান ফিরাইছে, আর দেহি আমি রান্নাঘরের ফ্লোরে হুইয়া আছি।

– তারমানে তোমাকে বেহুঁশ করে তারপর এই কাজ টা করেছে ওরা! (একটু থেমে সোনালীর দিকে ফিরে) তুমি উত্তর পাড়ার সোনালী না ?

– হ্যা। 

– তোমাকে আমি ঐদিনও এই বাড়িতে দেখছিলাম। আজও এই বাড়িতে দেখতেছি। ঘটনা কী ? এই বাড়িতে এতো আসাযাওয়া ? 

– আ, আমি,,,,

– ও আমার হবু বউ হতে চলেছে। তাই ইদানিং ওকে এই বাড়িতেই দেখছেন। 

রাফসানের ধীর কন্ঠি কথা শুনে সবাই পিছনে ফিরে সিড়ির দিকে তাকায়। রাফসান হেঁটে হেঁটে সিড়ি দিয়ে নামে। এসে সোনালীর পাশে দাঁড়ায়। রিয়াদ কিছুটা অবাকই হয়। রাফসান সোনালীর কাঁধে হাত রেখে বলে,

– ওর আর আমার বিয়ের কথা চলতেছে। তাই এবাড়িতে একটু আধটু আসে। কিছু জিগাবার থাকলে আমাকে বলো।

– তুমি রাফসান না ? ঢাকা থেকে কবে এসেছো ? 

– ২ সপ্তাহ হবে আসার।

– রায়হানের বিয়েতে তো তোমাকে দেখলাম না! 

– আমি যাইনি, তাই দেখেননি। 

– কোথায় ছিলা সেই রাতে ! (কিছুটা সন্দেহের সুরে প্রশ্নটা করে রিয়াদ) 

– আজব, আমি ঐদিন রাতে কোথায় থাকি না থাকি তা দিয়ে আপনার কী! আপনি আসছেন আলিশাদের মার্ডার কেস সলভ করতে, করেন। সেটা নিয়ে মাথা ঘামান। এ ব্যাতীত অন্য কিছু কিন্তু আপনি জিগ্যেস করতে পারেন না! (ধীর গলায়) আপনার সেই অধিকার নেই! 

রায়হানের কথা গুলোর সুর রিয়াদের কাছে কাটার মতো লাগে। রাফসানের মুখ ভঙ্গিতে কিছুটা শয়তানি হাসি ফুটে উঠেছিলো রিয়াদকে কিছু কথা শুনিয়ে দেওয়ার পর। 

 রিয়াদ আর কিছু বলেনা। রায়হানের দিকে একবার কঠিন ভাবে তাকিয়ে চলে যেতে উদ্যত হয়, তখনই দেখে অন্দরমহলের দরজা পেড়িয়ে বাড়িতে ঢুকছে সাদিক (২২)। সাদিক সাথী বেগম, আর শাহেদের ছেলে। রিয়াদ থেমে দাঁড়ালো।  সাদিক এসে তাদের সামনে দাঁড়ায়। হাতে একটা ব্যাগ। সাদিক রিয়াদকে চিনতো। তাই সে স্বাভাবিক ভাবেই রিয়াদকে দেখে বলে উঠে,

– রিয়াদ ভাই না ! কেমন আছেন। 

– ভালো। তুমি কোথায় ছিলা একয়দিন ! তোমাকে তো এই বাড়িতে ক’দিন দেখলাম না! 

– আমি তো ঢাকায় গেছিলাম। রাফসান ভাই আমারে পাঠাইছিলো। 

– একয়দিনে এ বাড়িতে কী ঘটে গেছে তা সম্মন্ধে তোমাকে কেউ কিছু জানায় নি ? 

– কী বিষয়ে। আমাকে তো একয়দিন এ বাড়ি থেকে কেউই ফোন দেয়নি মা ছাড়া। আর মা তো তেমন কিছু বলেনি। কিছু হইছে নাকি। 

রিয়াদ এক ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বলে,

– ঘরে গিয়ে তোমার মায়ের থেকে জিগ্গেস করে নিও। (পিছনে ফিরে রাফসানের দিকে এক নজর দিয়ে) আমি এখন যাচ্ছি, তবে পড়ে আবার আসবো। আর জিগ্গাসাবাদ ! রিয়াদ খুব ভালো করে জানে কোন থেরাপি কাদেরকে দিতে হয়। (ধীর গলায়) আগে কেস, তারপর সম্পর্ক ! 

বলেই এক ছোট্ট মুচকি হাঁসি দিয়ে চলে যেতে থাকে রিয়াদ। রাফসানের কাঁটা যেন তার গাঁয়েই আবার বিধিয়ে দিয়ে গেলো যাওয়ার আগে। রাফসান রাগান্বিত হয় এতে। সাদিক এদের সবকিছু দেখে যেনো কিছু বুজতে পারেনা। সে সরল মনে সুমনা বেগমকে জিগ্গেস করে,

– কী হইছে চাচিআম্মু! রিয়াদ ভাই এখানে কেনো আসছিলো?

সুমনা কোন উত্তর না দিয়েই হনহন করে চলে যায় রান্না ঘরের দিকে। সুমনা বেগমের এমন ইগনোর করাটা সাদিকের কেমন জানি লাগে। বাকিদের তাই সে আর কিছু বলে না। হাতে থাকা ব্যাগটা নিয়ে চলে যায় দ্বিতীয় করিডোরের দিকে। আঁখিও চলে যায় রান্নাঘরের দিকে। অন্দরমহলে শুধু দাঁড়িয়ে রয় রাফসান আর সোনালী‌। রাফসান দাঁত কটমট করে অন্দরমহলের দরজার দিকে তাকিয়ে বলতে থাকে,

– তোর পুলিশ গিরি একদম ছুটায় দিবো খা*** বাচ্চা। আমাকে দেমাগ দেখাইতে আসিস ! 

বলেই ফ্লোরের কার্পেটে এক জোড়ে লাত্থি দেয় রাফসান। রেগেমেগে সে একদম লাল। সোনালী তার কাঁধে এক হাত রাখে। ধীর গলায় বলে,

– বেশি বারাবারি করতে যাইয়েন না। উনি কিন্তু একজন পুলিশ !

– ঐ দুই টাকার পুলিশ আমার কোন বা* ছিড়ে আমি দেখি ! ওর কেস সলভ করার খুব শখ উঠছে না! ওর চাকরি থাকলে তো কেস সলভ করবে। ওর চাকরির যদি আমি ১২ টা না বাজাইছি ! 

– আচ্ছা এবার শান্ত হন। (একটু থেমে) উনি বলে গেছেন নিচের মাল গুলো প্যাকেট করতে। চলুন। 

রাফসান সোনালীর দিকে ফিরে। সোনালী একটা হলুদ রঙের থ্রী পিস পড়ে ছিলো। রাফসান সোনালীকে দেখে ও তার মলিন কথা শুনে নিজেকে কিছুটা শান্ত করার চেষ্টা করে। ফিরে আবার অন্দরমহলের চৌকাঠের দিকে চায়। সোনালী রাফসানের হাত ধরে। ধীর গলায় বলে ‘চলুন’। রাফসানও সোনালীর এক কাঁধে হাত দিয়ে তাকে নিয়ে চলে যেতে থাকে অন্দরমহলের দরজার দিকে। নিজের রাগকে প্রশমিত করতে থাকে সে।

 রান্নাঘরের দরজার আড়াল হতে তাদের সব কথা শুনে ফেলে আঁখি। তখনই আঁখির পিছনে এসে দাঁড়ায় সুমনা বেগম। তিনি কিছু বলেন না। শুধু চুপচাপ আঁখির পিছনে দাঁড়িয়ে থাকেন। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠে এক রহস্যময় হাসি!

 

_____

 

ক্লিনিকের দোতলা করিডোর। ২০২ নাম্বার রুমে এডমিট আছে আফাজ। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ওড়না মুখে চেপে আফাজকে চুপি চুপি দেখছে সুমু।

 সকালে ঘুম ভাঙার পর সে নিজেকে আফাজের হাতে মাথা রাখা অবস্থায় দেখে। আফাজ তখন ঘুমাচ্ছিলো, সুমু তাড়াতাড়ি সেখান থেকে উঠে তখন চলে এসেছিলো। আফাজের জ্বর অনেকটা কমে গিয়েছিলো তখন। আফাজের গাঁয়ের উপর থাকা ওড়নাটা হাতে নিয়ে সে বের হয়ে এই দরজার আড়ালে দাঁড়িয়েছে, কখন আফাজের ঘুম ভাঙবে আর সে গিয়ে কথা বলবে। কিন্তু আফাজ এখনো ঘুমাচ্ছে। 

 করিডোর দিয়ে কারো হেঁটে আসার আওয়াজ পায় সুমু। তাড়াতাড়ি পিছন ফিরে দেখে একটা নার্স এদিকেই আসছে‌। সুমু সোজা হয়ে দাঁড়ায়। নার্সটা দরজার সামনে আসতেই সুমু তাকে হাত দিয়ে আটকায়, ভিতরে ঢুকতে দেয় না। নার্সটা একটু বিরক্ত হয়ে বলে,

 – কী হইলো কী ! হাত নামান‌। আমার ভিতরে যাইতে হইবো। 

 – কাল রাতে কোথায় ছিলেন ? ক্লিনিকে রুগি রেখে একদম লাপাত্তা! 

 – কেডা কইছে আমি ছিলাম না ! আ,আমি তো কাইল এই রুমেই আছিলাম। পেসেন্টের দেখা শুনা করছিলাম। 

 – কাল রাতে কে ছিলো আর কী করছে তা আমার খুব ভালোভাবে জানা আছে। (একটু থেমে) উনার জ্বর আসছে, ভিতরে গিয়ে ঔষধ খাইয়ে দিন। 

 – রুগির জ্বর আইছে কি না আইছে তা আপনি কেমনে জানলেন ! 

 – কারণ কাল রাতে আপনি না, আমিই ছিলাম। জ্বরে শরীর কতটা গরম হইছিলো জানেন ! 

 – আপনে রুগির কী হন যে আমারে কথা শুনাইতাছেন ! 

 – আমি রুগির অনেক কিছু হই। বেশি কথা না বাড়ায় ভিতরে যায় ঔষধ দেন। নাইলে একবার ক্লিনিকে কম্প্লেইন দিলে, চাকরির মাগনা টাকা খাওয়া বের হয়ে যাবে একদম! 

 – কেমন মানুষ রে বাবা ! কী সব কইতাছে এইসব ! 

বলেই নার্স রুমের ভিতরে চলে যায়। সুমু আড়াল হতে দেখতে থাকে আফাজকে। তখনই তার কানে আরো কারো জানি কথা ভেসে আসে। সে পিছনে ফিরে তাকায়। দেখে দিথী, শিউলি বেগম আর লায়লা আসছে এদিকে। সুমু তাড়াতাড়ি তার মুখ ঢেকে ফেলে ওড়না দিয়ে। আগে খালি মুখ চেপে ছিলো। এখন ঘোমটার মতো করে ওড়নাটা নিয়ে চোখ দুইটা বাদে পুরো মুখটাকেই আড়াল করে নেয় সে। দিথী, শিউলি বেগম রা সিড়ি দিয়ে উঠে করিডোর দিয়ে হেঁটে এদিকেই আসতে থাকে। সুমুও এগিয়ে যায়। তার উদ্দেশ্য তাদেরকে পাশ কাটিয়ে নিচে চলে যাওয়া। সুমু দিথী আর শিউলি বেগম দের কাছাকাছি চলে আসে। শিউলি বেগমের হাতে ছিলো টিফিন বাটি, তিনি লায়লার সাথে কি নিয়ে যানি কথা বলতে বলতে আসছিলেন। সুমু তাদের পাশ‌ কাটিয়ে হেঁটে যায়। যাওয়ার সময় তার আর দিথীর চোখাচোখি হয়। সুমু চোখ নামিয়ে নেয়। চলে যায় সামনের সিড়ির দিকে। দিথী পিছন ফিরে সুমুর যাওয়ার পানে চেয়ে থাকে। সে কিছুটা অবাকও হয়। সুমু সিড়ির কাছে যাওয়ার পর মুখ ঘুড়িয়ে করিডোরের দিকে তাকায়, দেখে শিউলি বেগম আর লায়লা ঘরের ভিতরে চলে গেলেও দিথী বাইরে দাঁড়িয়ে ঠিক তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। সুমু চকিতে মুখ ঘুরিয়ে তাড়াতাড়ি সিড়ি দিয়ে নেমে যায়। দিথীকেও রুমের ভিতর থেকে শিউলি বেগম ডাক দেন। তাই দিথীও রুমের ভিতর চলে যায়।

 

_____

 

ক্রুজ শিপের বসার প্রান্তে একলা বসে রয়েছে নিপা। মন খারাপ তার। তারা এখন সেইন্টমার্টিন দ্বীপের উদ্দেশ্য রওনা দিয়েছে। 

 

জঙ্গী সন্ত্রাসীদের গুলি করার কিছুক্ষণ পর সেখানে পুলিশ এসে উপস্থিত হয়েছিলো। জঙ্গীদের মধ্যে শুধু একজন মারা গিয়েছিল। আর বাকি সবারই হাত,পায়ে গুলি লেগেছিলো। পুলিশ তাদের আহত অবস্থায় গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। রায়হানের কাছে লাইসেন্স বন্দুক থাকায় তাকে বেশি একটা জেরা করেনি পুলিশ। বরংচ সেই জঙ্গীদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছে। রায়হান ভেবেছিলো একজন কে যে মেরেছে তার জন্য হয়তো তাকে পুলিশের সাথে যেতে হবে। কিন্তু অফিসার হারুন উর রশীদ রায়হানকে এই বিষয়ে কিছুই বলেননি। রায়হান আত্মরক্ষার্থে গুলি চালিয়েছে। আর জঙ্গীদের মারার অর্ডারই তাদের কাছে ছিলো। সেখানে তারা একজন বাদে বাকিদের জীবিত উদ্ধার করছে। তাই রায়হানকে তারা বেশি কিছু না বলেই সেখান থেকে যেতে দেয়। 

 

তখনকার পর থেকে নিপা একপ্রকার মানসিক ট্রমাতেই পৌছে গেছে বলা যায়। সে চুপচাপ। তারা সেখান থেকে হোটেলে এসে ফ্রেশ হয়ে টেকনাফে এসেছিলো। টেকনাফ থেকে ক্রুজ শিপে উঠেছে। এখনো ক্রুজ শিপেই আছে তারা। 

রায়হান পশ্চিমের ডেক থেকে হেঁটে হেঁটে নিপার কাছে আসে। রায়হান নিপার পাশে এসে দাঁড়ায়। তার কাঁধে হাত রাখে। নিপা তো হঠাৎ ভয় পেয়ে চিৎকারই করে ফেলছিলো প্রায়, তখনই রায়হান তার মুখ আলতো করে চেপে ধরে তার পাশের চেয়ারে বসে। বলে,

– আমি আমি। কোন চোর ডাকাত না। 

– এভাবে হঠাৎ করে আসো কেনো। আসার আগে তো একটু গলা ঝেড়ে আসতে পারো! 

– না মানে আমি ভাবলাম তুমি আবার কাঁদছো নাকি তাই একবারে এসে তোমার কাঁধে হাত রেখেছি। (একটু থেমে) তুমি এখনো সেই ঘটনা নিয়ে পড়ে আছো! আরে বাবা সেটাকে নিছক দুর্ঘটনা মনে করে মন থেকে উড়িয়ে দেও না। আমরা এখানে ঘুড়তে এসেছি। আনন্দ করো। 

– আমার কিচ্ছু ভালো লাগছেনা। আমাকে একা ছেড়ে দাও। 

– আমার সাথে চলো। ঐদিকে শিপের বাকি যাত্রীরা পাখিদের কত সুন্দর খাবার খাওয়াচ্ছে, দেখবে চলো‌।

– আমি যাবোনা। তুমি যাও।

– নিজে থেকে না উঠলে কোলে করে নিয়ে যাবো কিন্তু! 

– রায়হান! আমার মন চাইছেনা যেতে। 

– আরে একবার আমার সাথে এসেই দেখোনা। পাখি গুলাকে তুমিও খাবার দিও। ওরা তোমার হাত থেকেও খাবার খাবে। আসোতো আসো।

 রায়হান নিপাকে টেনে তুলে। নিপার মুড একদম অফ। নিপা গা ছাড়া ভাব করে আবার বসে পড়তে চায় তখনই রায়হান তাকে কোলে নিতে উদ্যত হয় অমনি নিপা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। হাত দিয়ে কোলে নিতে মানা করে। ওখানে নিশ্চয়ই অনেক মানুষ আছে, সবার সামনে সে লজ্জায় পড়তে চায় না। রায়হান নিপার হাত ধরে তাকে সাইড ডেকের দিকে নিয়ে যায়।

 

  এদিকটা জাহাজের ডান পার্শ্বের প্রান্ত। এই করিডোরের একপাশে কিছু রুমে যাওয়ার দরজা আরেকপাশে জাহাজের রেলিং। সেখানে দাঁড়িয়ে শিপের বেশিরভাগ যাত্রী খাবার খাওয়াচ্ছে। পাখিরা ঝাঁকে ঝাঁকে এসে রেলিংয়ের ওপাসে উড়ছে। যাত্রীদের হাত থেকে চিপস আর বিস্কুট উড়ে এসে মুখে নিয়ে নিচ্ছে। নিপা আর রায়হান সাইড ডেকে চলে আসে। সময়টা বিকেল সাড়ে তিনটা। সূর্য পুব আকাশে হেলেছে কিছুটা। আকাশে খন্ড খন্ড মেঘ আর চারপাশে নীল সমুদ্র। তার মাঝে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়তে থাকা পাখি যাত্রীদের হাত থেকে খাবার ঠোকর ঠোকর দিয়ে খাচ্ছে। রায়হান একটা চিপসের প্যাকেট কিনে নিপাকে কিছু চিপস দেয়। তাকে এগিয়ে দেয় সেই যাত্রীগুলোর সামনে। আবহাওয়া নিপার মনটাকে কিছুটা ভালো করে তুলে। সে এগিয়ে রেলিংয়ের পাশে দাঁড়ায়। ভয়ে ভয়ে হাত বাড়ায় পাখিদের উদ্দেশ্য করে। দূরে থেকে রায়হান তার ফোনের ক্যামেরা অন করে কিছু সুন্দর মুহুর্ত ফ্রেম বন্দি করতে রেডি হয়ে যায়। একটা পাখি এসে নিপার হাত থেকে এক টুকরো চিপস নিয়ে ছো মেরে উড়ে যায়। নিপা ভয়ও পায় হাসতেও থাকে। তার আনন্দ লাগছে। রায়হানও নিপার এই মুহুর্তটা ফ্রেম বন্দি করে ফেলে। নীল শাড়িতে নিপাকে দারুন মিষ্টি লাগছিলো। তখনই এক পাখি এসে নিপার হাতের উপর বসে। বসে হাতের চিপস গুলো খেতে থাকে। নিপা আনন্দ মুখ নিয়ে রায়হানকে বলতে থাকে,

– আমার হাতে পাখি বসছে ! আমার, আমার সুড়সুড়ি লাগতেছে!!

– এভাবেই থাকো! ছবি গুলা খুব সুন্দর উঠতেছে ! 

পাখিটা কিছু চিপস খেয়ে উড়ে চলে যায়। নিপা সেটাকে ধরার চেষ্টা করে কিন্তু পারেনা। নিপার হাতে চিপস কমে এসেছিলো। রায়হান প্যাকেট টা নিয়ে নিপার কাছে যায়। নিপার হাতে চিপস দেওয়ার আগে নিপার কাঁধে হাত রাখে। নিপার পাশে দাঁড়িয়ে যায়। নিপার হাসি মুখ খানা যেন কিছু বুঝে উঠার আগেই রায়হান ফোন সামনে তুলে খ্যাচাক করে একটা সুন্দর সেলফি তুলে ফেলে। পিছনে পাখির ঝাঁক,নীল সমুদ্র, আর বাদলবিলাস। সাথে নীল শাড়িতে থাকা অর্ধাঙ্গিনীর মুখে সুন্দর হাসি আর রায়হানের নীল-সাদা শার্টে জড়ানো হ্যান্ডসামনেস, সবমিলিয়ে ছবিটা যেন দারুন উঠে! নিপা আর রায়হান সময় টাকে বেশ উপভোগ করতে থাকে। জাহাজ চলে যায় এই বিশাল সমুদ্রের মাঝে ঢেউয়ের তালে তালে। 

 

___

 

নীলগিরি জঙ্গল। আকাশ কিছুটা মেঘলা থাকায় গাছপালা ঘেড়া এই জঙ্গলটা একটু অন্ধকারাচ্ছন্ন লাগছে। চারপাশে পাখি আর বয়ে যাওয়া বাতাসের কলতান। 

নয়ন দাঁড়িয়ে আছে গাছপালা ঘেড়া এই জঙ্গলটার একটা মধ্যবর্তী ফাঁকা যায়গায়। যায়গাটা দু হাত মতো ফাঁকা। তার পড়নে এখন সিভিল ড্রেস। তারমানে এখানে সে কোন পুলিশি কাজে আসেনি। সে যেন কারো অপেক্ষায় ছিলো এখানে। সারাদিন থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ায় গাছপালার পাতায় জমা পানি টোপ টোপ করে মাঝে মাঝে তার মাথার উপর এসে পড়ছে। আবহাওয়াটা দারুন ঠান্ডা। 

কারো হেঁটে আসার আওয়াজ পাওয়া যায়। নয়ন কিছুটা ভ্রু কুঁচকে চারপাশে তাকায়। তখনই দেখে এক হলুদ থ্রীপিস পড়া কেউ এদিকে আসছে। আরেকটু সামনে আসতেই মেয়েটার চেহারা দৃশ্যমান হয়। মেয়েটা সোনালী। 

সোনালী হেঁটে হেঁটে এগিয়ে আসে ফাঁকা যায়গাটায়। নয়ন তার দুই হাত পকেট থেকে বের করে। সোনালী এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে বলে,

– কী জন্য ডেকেছিস ! নতুন কোনো খবর আছে ! 

– ম্যাডাম, এইবার এমন এক জিনিস আপনার লাইগা আনছি যে আপনে দেখলেই খুশি হইয়া যাইবেন।

– কি জিনিস? 

নয়ন তার পকেটে হাত ঢুকায়। পকেট থেকে একটা কলম বের করে। এগিয়ে দেয় সোনালীর দিকে। সোনালী কলমটা হাতে নেয়। বলে,

– কী এটা ? 

– ক্যামেরা পেন ম্যাডাম! মার্ডারের রুমে পাইছি!

– কিহহ! 

– হ ম্যাডাম। ঐ রুমে এইডা ছিলো। আপনে কইছিলেন না যে কোন প্রমাণ বা কোন সন্দেহজনক কিছু পাইলে আপনারে দিয়া দিতে, আমি এরলাইগা এইডা রিয়াদ স্যার রে না দেখাইয়া ডিরেক্ট আপনার হাতে সমর্পণ করছি। 

– এটা ঐ ঘরে ছিলো ! আর আমি কি না !!!

– কী ম্যাডাম ! আপনি খুশি হন নাই! আমি ভাবলাম আপনি এইডা দেইখা খুশি হইবেন।

– মামুর ব্যাটা তুই তো আমারে মরতে মরতে বাচাইছিস। দেখিস আরো কিছু ঐ ঘরে আছে কিনা। যা পাবি একদম আমাকে এনে দিবি। 

– আইচ্ছা ম্যাডাম। আমি আইনা দিমু নে। (বিরবির করে) জুতা জোড়া যদি সুজন না পাইয়া আমি পাইতাম তাইলে ঐডাও আইনা দিতাম।

– কী বিরবির করতেছিস রে? 

 নয়ন মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলে

– না মানে ম্যাডাম, আমার বখশিশ টা ! 

– হমম, দিচ্ছি। 

সোনালি তার হাত ব্যাগ টার চেইন খুলে কলমটা ভিতরে রাখে। কিছু টাকা বের করে নয়নকে দেয়। নয়ন ভক্তি সহকারে সেগুলো গ্রহণ করে। সোনালী বলে,

– যা এখন। পড়ে কোন কাজ পড়লে আবার তোকে ডেকে নিবো।

– আইচ্ছা ম্যাডাম।

নয়ন চলে যেতে থাকে। আশপাশে পড়া টোপ টোপ পানি যেন নিরবতা ভেঙ্গে শব্দ তুলছে। নিচের মাটি কর্দমাক্ত। সোনালী তার হাত ব্যাগের চেইন লাগিয়ে দিতে থাকে। বিরবির করে বলে,

– নিশ্চিত এইটা নিপা রাখছিলো। নয়নকে যদি হাত না করতাম তাইলে আমার কী অবস্থা হইতো ! (একটু থেমে) ওরো দিন ঘনায় আসতেছে। হানিমুন মারাইতে গেছে না এখন ! আসুক খালি একবার ! ওর গোয়েন্দাগিরি আমি ছুটায় দিবো।

 

চলবে ,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

 

উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন :: ২(মুখোশ)

পর্ব:: ৬৬

লেখক :: মির্জা শাহারিয়া

 

সেইন্টমার্টিন সমুদ্র পাড়। আকাশের সূর্য খানা পশ্চিমে কিছুটা ঢলে পড়েছে। রায়হান নিপা বসেছে সমুদ্র সৈকতে থাকা প্লাস্টিক বেড গুলোয়। দুটো বেডে ভাড়া নিয়েছে তারা। উপরে ছাতাও আছে। বেড দুটো পাশাপাশি। নিপার আকাশী-নীল শাড়ি খানায় বাতাস বেশ জোড়েই লাগছে। রায়হানের গায়ে সাদা শার্ট, আর থ্রী-কোয়ার্টার প্যান্ট। মাথায় গোল কাউহ্যাট টুপি। নিপা বসে সমুদ্র সৈকতের দিকে তাকিয়ে আছে। এদিকটায় লোকের সংখ্যা একটু কম। রায়হান হেলান দিয়ে বেডে রেষ্ট নিচ্ছে। আজ সারাদিন একটু বেশিই জার্নি হয়ে গেছে। খাগড়াছড়ি থেকে কক্সবাজার, সেখান থেকে টেকনাফ, আবার সেখান থেকে জাহাজে চড়ে সেইন্টমার্টিন। 

রায়হান চোখের চশমা টা হালকা তুলে নিপাকে দেখে। নিপা একনজরে সমুদ্রের দিকে চেয়ে ছিলো। মুখে মলিন ভাব। রায়হান শোয়া হতে উঠে সোজা হয়ে বসে। চোখের সানগ্লাসটা খুলে হাতে নেয়। নিপা রায়হানের দিকে ফিরে তাকায়। বাতাসে তার চুল গুলো উড়ে খালি বারংবার মুখের সামনে চলে আসছিলো। নিপা হাত দিয়ে চুল গুলো সড়িয়ে কানের পার্শ্বে রাখে। বলে,

– ঘুমাচ্ছিলা নাকি! 

– না। এমনিই একটু গা এলিয়ে দিয়েছিলাম।

সমুদ্রের দিকে ফিরে নিপা বলে,

– খুব বাতাস করতেছে তাই না।

– সমুদ্র সৈকতে এমন একটু আধটু বাতাস থাকেই। (একটু থেমে সানগ্লাসটা শার্টে ঘষতে ঘষতে) কিছু খাবে ? 

– কী খাবো। 

রায়হান মুখ ফিরিয়ে চারপাশ দেখে। কিছুটা সামনে এক ডাবের ভ্যান দেখা যাচ্ছে। লোকজন নেই তার সামনে। শুধু বিক্রেতা আছেন। রায়হান আবার নিপার দিকে ফিরে। বলে,

– ঐযে ডাব। ডাব খাবা ? 

– নিলে নাও

– (পিছনে ফিরে) এই ডাব,,,,,,,,ডাব,,,, এদিকে আসো,,,

ডাবওয়ালা রায়হানের ডাক শুনতে পায়। সে তার ভ্যান রেখে গলায় থাকা গামছায় হাত মুছতে মুছতে রায়হানদের দিকে এগিয়ে আসে। 

  কাছে আসতেই রায়হান বলে,

– ডাব কতো ? 

– স্যার একটা ৬০ দুইটা ১০০।

– দুইটা নিলে কম কেনো ? 

– স্যার এইহানে বেশিরভাগ মানুষ জোড়ায়-জোড়ায় ঘুরতে আহে। এরলাইগা দুইডা ডাব নিলে একটু কম রাহি। 

– একটা দাও। 

– একটা নিবা ? (নিপা বলে)

– হ্যা একটা দিয়েই আমাদের হয়ে যাবে। (ডাবওয়ালার দিকে ফিরে) একটা ডাব দাও আর দুইটা স্ট্র দাও। 

– জে আইচ্ছা স্যার। 

বলেই ডাবওয়ালা চলে যায় ডাব কেটে আনতে। রায়হান নিপার দিকে ফিরে তাকায়। দেখে তার গাল গুলা লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। রায়হান মাথার টুপি টা খুলে হাতে নিয়ে বলে,

– একসাথে খাইলে, মহব্বত বাড়ে বুচ্ছো। 

নিপা কিছু বলে না। দুইহাত কোলে একসাথে করে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চুল গুলো বারবার বাতাসে উড়ে মুখের সামনে এসে পড়ছে। নিপা এবার আর চুল সড়ায় না। হাত দুটো একখানে করে বসে থাকে। সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ অবশ্য তার কানকে বেশ প্রশান্তিও দিচ্ছিলো। 

 

ডাবওয়ালা ডাব নিয়ে আসে। রায়হান টাকাটা দিয়ে ডাব হাতে নেয়। দুইটা স্ট্র দিয়েছে দোকানদার। রায়হান নিপার দিকে ফিরে বেড থেকে পা নামায়। বলে,

– এপাশে ফিরো। 

– তুমি খাও। আমি খাবো না। 

– দুইজনই খাবো। (চারপাশে দেখে) তেমন কেউ তো নাই। এপাশে ফিরো। 

নিপাকে একহাতে ধরে তার দিকে ফিরতে বলে রায়হান। নিপা লজ্জা মাখা মুখটা নিয়ে তার দিকে ফিরে। রায়হান ডাবটা তার দিকে এগিয়ে দেয়। নিপা হাতে নেয়। সে এখনো লজ্জা পাচ্ছে। রায়হান নিপাকে একটা স্ট্র মুখে নিতে বলে। নিপা কিছুটা কাচুমাচু হয়েই স্ট্র টা মুখে নেয়। ডাবের পানি খেতে থাকে। তখনই রায়হানও সামনে এগিয়ে এসে আরেকটা স্ট্র তে মুখ লাগায়। নিপা উঠে যেতে চাইছিলো তখনই রায়হান তার পায়ের মাংসপেশি ধরে উঠতে বাঁধা দেয়।

 নিপা রায়হান দুজনই একসাথে ডাবের পানি খেতে থাকে। দুইজনের চোখ একদম বরাবর। রায়হান নিপার কপালের সাথে নিজের কপাল লাগিয়ে দেয়। তাদের কিছুটা পাশ দিয়ে যাওয়া ফেড়িওয়ালাটাও যেনো কিছুক্ষণের জন্য হাঁক থামিয়ে দিয়ে তাদেরকে দেখতে থাকে। নিপা উঠে যেতে চাইছিলো। কিন্তু রায়হান তাকে যেতে দিচ্ছেনা। রায়হান ধীরে ধীরে খাচ্ছে আর নিপার চোখে তাকিয়ে আছে। নিপা বেশ লজ্জা পাচ্ছিলো এমন খোলামেলা যায়গায় একসাথে এভাবে খেতে। নিপা কিছুক্ষণ পর হঠাৎ বেশি বেশি করে টানতে থাকে। যাতে ডাবের পানিটা তাড়াতাড়ি শেষ হয় আর ও এই লাজুক অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পায়। রায়হান তো ছিলো এক ঘোরে। সোজা নিপার চোখে তাকিয়ে ছিলো। প্রেয়সীর চোখের ভাষা যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ ভাষা। এই চোখের ভাষা যেনো কেবল সঙ্গীর জন্যই লেখা!

 

  ডাবের পানি শেষ হয়ে যায়। রায়হান তো ধীরে ধীরে খাচ্ছিলো কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি কীভাবে শেষ হলো তাই সে বুঝতে পারেনা। নিপা এইবার মুখ ছাড়িয়ে নেয় স্ট্র থেকে। রায়হান স্ট্র টানতে থাকে তার বেডে বসে। কিন্তু না। ডাব একদম খালি হয়ে গেছে। রায়হান ডাবটা মুখ থেকে নামিয়ে পিছনে ফিরে ডাব ওয়ালার উদ্দেশ্য হাঁক ছাড়ে,

– এই, কী ডাব দিলি। এতো তাড়াতাড়ি শেষ! 

দূর থেকে ডাবওয়ালা বলে,

– স্যার বড় দেইখাই তো দিছিলাম। 

– এইটা বড় ? আমি চুমুক দিতে না দিতেই খালি হয়ে গেলো! 

– বাদ দাও। পরে আরো খাওয়া যাবে। (নিপা)

রায়হান নিপার দিকে ফিরে। নিপা রায়হানের মুড বদলানোর জন্য আঙ্গুল দিয়ে সমুদ্র সৈকতের ঢেউ আসা প্রান্তরটা দেখিয়ে বলে,

– চলো ওখানটাতে যাই, আমার ঢেউয়ে পা ভিজাতে মন চাইছে। 

– পড়ে যাচ্ছি। আগে আসো একটা গান ধরি। এই সুন্দর সমুদ্র তটে একটা গান না ধরলেই যেন নয়। 

– কী গান ধরবে এখন! সন্ধ্যা হয়ে আসতেছে তো। 

– সন্ধ্যাকে নিয়েই নাইলে গাই। 

রায়হান ডাব ফেলে দিয়ে তার প্লাস্টিক বেডের মাথার পাশ টা হতে ছোট্ট গিটার টা হাতে নেয়। নিপাকে বলে তার দিকে মুখ করে বসতে। নিপাও ইতস্তত বোধ না করে সেভাবেই বসে। রায়হান গিটারের তারে সুর বাঁধে। 

 

আবার এলো যে সন্ধ্যা

শুধু দুজনে,,

চলো না ঘুরে আসি অজানাতে

যেখানে নদী এসে থেমে গেছে,,

আবার এলো যে সন্ধ্যা

শুধু দুজনে

চলো না ঘুরে আসি অজানাতে

যেখানে নদী এসে থেমে গেছে,,

,

,

 

ঝাউবনে হাওয়াগুলো খেলছে,

সাঁওতালি মেয়েগুলো চলছে

লাল লাল শাড়ীগুলো উড়ছে

তার সাথে মন মোর দুলছে,,

 

ঐ দুর আকাশের প্রান্তে,

সাত রঙা মেঘ গুলো উড়ছে

ঐ দুর আকাশের প্রান্তে,

সাত রঙা মেঘ গুলো উড়ছে

 

আবার এলো যে সন্ধ্যা

শুধু দুজনে,,

,

,

 

এই বুঝি বয়ে গেল সন্ধ্যা,

ভেবে যায় কি জানি কি মনটা

পাখিগুলো নীড়ে ফিরে চলছে

গানে গানে কি যে কথা বলছে,,

 

ভাবি শুধু এখানেই থাকবো,

ফিরে যেতে মন নাহি চাইছে

আবার এলো যে সন্ধ্যা

শুধু দুজনে

চলো না ঘুরে আসি অজানাতে

যেখানে নদী এসে থেমে গেছে

চলো না ঘুরে আসি অজানাতে

যেখানে নদী এসে থেমে গেছে

আবার এলো যে সন্ধ্যা

শুধু দুজনে,,,,

 

গান ‌শেষ হওয়া মাত্র চঞ্চল গাঙচিলের মতো নিপা উঠে দৌড় দেয়। হাসতে থাকে। রায়হান নিপার হাসিখুশি মুখটা দেখেই বুঝে যায় নিপার মন আনন্দে নেচেছে। সেও গিটার টা রেখে উঠে দাঁড়ায়। দৌড়াতে শুরু করে নিপার পিছু পিছু।

 নিপা একহাত দিয়ে কোমড়ের শাড়ির গোছা ধরেছে। ছুটছে আর হাসছে। তার যেন দৌড়ে গিয়ে ঢেওয়ে পা ভিজাতে মন চাইছে। রায়হান তার পিছু পিছু দৌড়ে আসছে। তার টুপিটা হাত থেকে সমুদ্র তটেই পড়ে যায়। নিপা সমুদ্রের ঢেউয়ের কাছে এসে আড়াআড়ি ভাবে দৌড়াতে থাকে। ঢেউ গুলো এসে তার পা ভিজিয়ে দিচ্ছে। শাড়ির লম্বা আঁচল খানা হাওয়ায় উড়ছে। সমুদ্রের নরম বালুচরে রায়হানও পা ভিজায়। সে খুব জোরে দৌড়ায় না, শুধু নিপার পিছু পিছু থাকার চেষ্টা করে। হাত দিয়ে নিপাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করে। নিপা হাসছে আর দৌড়ে যাচ্ছে। আকাশের উজ্জ্বল সূর্য সমুদ্রের গভীরে অর্ধেক ডুবে গিয়েছে। পেজা তুলোর ন্যায় মেঘ তার সামনে দিয়ে ভেসে যাচ্ছে। সমুদ্র সৈকতে সেই নয়নাভিরাম দৃশ্যের সামনে দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে দুই নর-নারী। ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজতে থাকে আবার সেই গান,,

 ” আবার এলো যে সন্ধ্যা, শুধু দুজনে,,,! “

 

_____

 

সোনালী ছাতাটা অন্দরমহলের দরজার সামনে রেখে ভিতরে প্রবেশ করলো। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। রাতের আঁধার নেমেছে হলো কিছুক্ষণ। অন্দরমহলের ঝাড়বাতিটা জ্বলছে। এখানে এখন কেউ নেই। একদম ফাঁকা। সোনালী হেঁটে হেঁটে এসে মাঝখান টায় দাঁড়ায়। ভাবছে একটু উপরের তলায় যাবে। তখনই দেখে উপরের তলা থেকে নজরুল সাহেব আর শাহেদ সাহেব কথা বলতে বলতে নামছে। বিজনেস বিষয়ক কথা। সোনালী আর সেদিকটায় পা বাড়ায় না। চলে যায় রান্না ঘরের দিকে। নজরুল আর শাহেদ এসে নিচের সোফা গুলোয় বসে। 

 

সোনালী রান্না ঘরে ঢুকে দেখে সুমনা বেগম চা বানাচ্ছেন। সোনালী গিয়ে সুমনা বেগমের পাশে দাঁড়ায়। বলে,

– আঁখি কই ? 

– ও সাথীর ঘরে। সাথীর পিঠের ব্যাথা আরো বাড়ছে। 

– লাল চা না দুধ চা ? 

– লাল চা। দুধ চা রায়হান ছাড়া এই বাড়ির কেউ খায়না। 

– আমার জন্যও একটু বানাইয়ো। বাইরে বৃষ্টি হইতেছে। এইসময় গরম গরম চা হইলে বেশ‌ জমবে।

– চিনির বোয়ম টা দে।

সোনালী একটু পাশ ফিরে পিছনে যায়। থাক থেকে চিনির বোয়ম আর সাথে একটা বিষ্কুটের বোয়মও নিয়ে আসে। চিনির বোয়মটা সুমনা বেগমকে দিয়ে বিস্কুটের বোয়ম খুলে বিস্কুট খেতে থাকে। সুমনা বেগম গরম পানি চায়ের কাপে ঢালতে থাকে। সোনালী বিস্কুট খেতে খেতে বলে,

– শাহেদ আর ওর ছেলে সাদিককে বাড়ির ঐ বিষয় সম্পর্কে জানায় না কেনো ? 

– আমার শশুরই জানায় নি। আর শাহেদ তো উনার ছোট, ভিতুও। ওর দাঁড়া এইসব কাজ সম্ভব না। 

– তাইলে ওর ছেলে সাদিক, ঐটাকে তো আমরা দলে নিতে পারতাম। 

– সাদিক ওর মায়ের দিকটায় গেছে। ও এসব কাজে জড়াতে রাজি হবেনা। 

– আমার টায় চিনি কম দিয়ো। বেশি চিনি খাইলে আবার ফিগার নষ্ট হবে। 

– ইশশ্,,আসছে আমার কারিনা কাপুর রে! এতো ফিগার বানায় কী করবি! নায়িকাতে নাম দিবি নাকি। 

– তুমি বুঝবানা এইসব। নায়িকাতে নাম দিলেই নায়িকা হওয়া যায় নাকি। আমি তো হবো খলনায়িকা। একটা ভাবসাব লাগবে না! 

– কার খলনায়িকা হবি তুই ! 

– পরে শুনিও। আগে যাও চা দিয়ে আসো ওদেরকে। ইদানিং তো ফিডের ব্যবসা চাঙ্গে উঠতেছে। একের পর এক অর্ডার বাতিল হইতেছে। 

– এইটা বাতিল হইলেই কি। নিচের কাজ দিয়ে তো এইটার ৫ গুণ টাকা আসে। 

– সমাজের লোকের চোখে চশমা তো পড়াইতে হবে নাকি! ঐ চশমার জন্য হইলেও ফিডের বিজনেসে মনযোগ বাড়ানো দরকার। 

– হইছে। তোকে এইসব নিয়ে ভাবতে হবেনা। যার ব্যবসা সে ভাববে। তোর কাপটা নে। আমি বাকি গুলা ওদেরকে দিয়ে আসি। 

– যাও যাও। (মুচকি হেসে) দুধ চা চাইলে ওখানেই বের দিয়ে দিয়ো। 

– চুপ, খালি উল্টাপাল্টা কথা। ভালো হইলি না আর তুই!

সুমনা বেগম চলে যেতে থাকেন চায়ের ট্রে নিয়ে। যাওয়ার সময় মুখ ভেংচি দেন সোনালীকে। সোনালী পা তুলে সুমনার পিছনে আলতো করে লাত্থির মতোন দেয়। সুমনা বেগম রান্না ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়। সোনালী ফিরে তার কাপটা হাতে নেয়। এক ছোট্ট চুমুক দেয়। আর সাথে আনা বিষ্কিট খেতে থাকে। 

খেতে খেতে বিরবির করে বলে,

– আমি, আমি এই খাঁন বাড়ির খলনায়িকা! দিন আসুক, টের পাবা!

 

_____

 

সিড়ি দিয়ে ক্লিনিকের দোতলায় উঠলো সুমু। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। শরীর হালকা ভিজে গিয়েছে। ক্লিনিকের সামনের ছাওনির নিচে পাগল আর পাগলিকে খাবার খাইয়ে আসলো ও। কাল রাতে হনুফাকে যে মোটা কাঁথা-কম্বল আনতে বলেছিলো সেই হনুফা একটু আগে কোথাকার কোন ছোট বাচ্চার কাছ থেকে যে কাঁথা চুরি করে আনছে কে জানে। কাথায় প্রস্রাব প্রস্রাব গন্ধ লেগে ছিলো। ঐ কাঁথা আবার সুমুকে রাতে দিতে আসছিলো। কিন্তু সুমুকে ঘুমানো অবস্থায় দেখে ঐ কাঁথা নিয়ে গিয়ে পাগল পাগলিকে দিয়ে এসেছে। পাগল-পাগলিও ঐটা জড়িয়ে ধরে সারারাত ছিলো। এই নিয়ে হনুফাকে দু কথা শুনিয়ে আসলো সুমু। মন টা একটু চড়ে আছে। তবে পা উপরের করিডোরে রাখতেই সেই রৃঢ়তা যেন মলিন হয়ে যায়। আফাজকে সকালের পর থেকে আর দেখতে আসেনি সে। আফাজ নিশ্চয়ই এখন জেগে আছে। গিয়ে একবার দেখতে মন চাইছে। সুমু হেঁটে হেঁটে এগিয়ে যায় আফাজের রুমের দিকে। করিডোরের শেষ প্রান্তের খোলা জানালা দিয়ে দখিনা ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে। সুমু কিছুটা ঠান্ডা লাগতে শুরু করেছে। আফাজের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো সুমু। দরজায় পর্দা দেওয়া। পর্দাটা একটু টেনে আড়াল হতে সুমু ভিতরে নজর দেয়। দেখে আফাজ শুয়ে আছে। তবে চোখ মেলা‌। উপরের সিলিংয়ের দিকে চেয়ে আছে। চোখের কোণে পানি। সুমু বিরবির করে বলে উঠে ‘ উনি এখনো কাঁদছেন!’ 

কথাটা বোধহয় সুমুর কান পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিলো। আফাজ অব্দি সেই কথা যায়নি। আফাজের কোন নড়াচড়া নেই। যেন এক শক্ত পাথর। আর পাথর ফেটে বিষাদ সিন্ধু বেড়িয়ে আসছে।

 

 সুমু ভিতরে যাবে বলে ঠিক করে। তার মন ভিতরে যেতে উতলা হচ্ছে কেনো জানি। সুমু পা বাড়িয়ে রুমে প্রবেশ করে। আফাজ ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকায়। ঘরের মাঝে একটা লাইট জ্বলছে আজ। সেই লাইটের আলোয় আজ সে সুমুকে ভালোভাবে দেখে। মেয়েটার বয়স হবে বোধহয় ১৭ কি ১৮। গাঁয়ের রং উজ্জ্বল ফর্সা। মাথার চুল গুলো কপালের দিকে একটু কম। ছেলেদের মতো করে একপাশে কিছু চুল সেতি করা। পড়নের কাপড় টা দেখে আফাজ চিনে যায় যে এটা লায়লার কাপড়। ওড়নার কিছু যায়গায় ছোট ছোট ফুটো হয়ে আছে।

  সুমু হেঁটে এসে ঘরের মাঝখানটায় দাঁড়ায়। দুই হাত একখানে করে আঙ্গুল খোটাতে থাকে। ও একটু নার্ভাস‌। আফাজ তার ঘাড় সোজা করে আবার উপরের সিলিংয়ের দিকে তাকায়। বা হাত টা উঠিয়ে চোখের পানি মুছে। সুমু মাথা তুলে আফাজের দিকে চায়। মৃদু গলায় বলে উঠে,

– আপনার জ্বর কমেছে। 

আফাজ ঘাড় না ঘুড়িয়েই স্বাভাবিক গলায় বলে,

– কিছুটা। 

– আপনার হাতে কী হয়েছে। ড,ডান হাতটায় ব্যান্ডেজ করা যে। 

– ব্যাথা পেয়েছি। ফেটে গেছে চামড়া। 

– আমাকে চিনতে পেরেছেন! আমি, আমি ঐদিন আপনার সাথে রাস্তায় ধাক্কা খেয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। 

আফাজ সুমু কথা শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। তাকে আবার এক পলক দেখেই ঘাড় সোজা করে নেয়। ধীর সন্তস্ত গলায় বলে,

– কেনো এসেছো এখানে। 

– এ,এমনিই।

– তুমি কী ফুফুর কোন আত্মীয়। 

– কোন ফুফু।

আফাজ ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকায়। মৃদু গলায় বলে,

– তুমি এই গ্রামে কার বাসায় এসে উঠেছো। 

– আ,আমি এই গ্রামেরই মেয়ে। 

– তোমার দেহের রং, কথার ভঙিমা, কোনটাই তো গ্রামের সাথে যায়না। শহুরে ছোঁয়া তোমার গাঁয়ে বহমান। 

– ন,না মানে এই গ্রামে কয়েকদিন হলো এসেছি। 

– তাইলে যে বললে এই গাঁয়েরই মেয়ে‌। 

– আমার মা এই গ্রামের। 

– এই ক্লিনিকে কী তোমার কেউ ভর্তি আছে? 

– হ্যা। মানে না। আ,আমার কেউ ভর্তি নেই। 

– কাল আমার সেবা করেছিলে কেনো। 

কথাটা শোনা মাত্রই সুমু চকিতে মাথা তুলে তাকায় আফাজের দিকে। তার বুকের হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। সে এক ঢোক গিলে। হঠাৎ কেনো জানি তার দেহে অস্বাভাবিক পরিবর্তন সে লক্ষ্য করে। হাত দিয়ে আরেকহাতের আঙ্গুল জোড়ে জোড়ে খোটাতে থাকে। আফাজ মৃদু গলায় আবার বলে,

– তোমার মাথার ক্লিপটা বিছানাতেই পড়ে গিয়েছিলো। এই নাও। 

সুমু তার মাথায় হাত দেয়। সখের বসে তিনটে ছোট ছোট ক্লিপ দিয়েছিলো সে মাথার চুলে। সেগুলোর মধ্যে একটা বিছানাতেই কাল পড়ে গেছিলো! সুমু ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে আফাজের হাত থেকে ক্লিপ টা নেয়। নিয়ে কিছুটা পিছিয়ে আবার ঘরের মাঝখানটায় এসে দাঁড়ায়। মাথা নিচু করে থাকে। তার মাথায় কিছু আসছেনা। সে কী বলবে ভেবে পাচ্ছেনা। তার চোখ অস্থির। বুকের ভেতরটা কাঁপছে। আফাজ ধীর গলায় আবার বলে উঠে,

– এই যুগে তো কেউ স্বার্থ ছাড়া এক ফোঁটা পানিও এগিয়ে দেয়না। সেইখানে তুমি এক অপরিচিতা হয়ে কাল সারারাত আমার সেবা করলে। কী চাও তুমি আমার কাছে! 

সুমু আফাজের কথা শুনে মনে মনে বলে,

‘ যদি বলি আপনাকে,,! আপনার ভালোবাসাকে,,!’ 

আফাজ সুমুকে চুপচাপ থাকতে দেখে আবার বলে,

– চুপ করে আছো যে ! 

– ন,না মানে আমি কাল মোমবাতি নিয়ে এই করিডোর দিয়ে যাচ্ছিলাম। ত,তখন আপনার কান্নার আওয়াজ শুনে এই ঘরে আসি।

তারপর আর কিছু বলতে পারেনা সুমু। সে একদম নিশ্চুপ হয়ে যায়। আফাজও ঘাড় ঘুরিয়ে জানালার দিকে তাকায়। বাইরের ঝিরঝিরে বৃষ্টি আবহাওয়াটাকে বেশ মনমুগ্ধকর করে তুলছিল। কিন্তু তাও বিষাদের বর্ষা হিসেবে নিমে আসে আফাজের বুকে। আজ এই বৃষ্টিটা সেও উপভোগ করতে পারতো। আলিশার সাথে। আলিশা এক রংধনু হয়ে তার আকাশ রাঙিয়ে দিতো। মেঘে ঢাকা বাদল হয়ে তার ধরীত্রীতে শ্রাবণ ধারার বর্ষণ ঘটাতে পারতো। কিন্তু তা সবই এখন কল্পনা। মানুষ বোধহয় কল্পনাতেই তার পূর্নতা খুঁজে পায়। বাস্তব জীবন তো মাত্র অপূর্ণতার কান্ডারি,,,! 

দুজনে মাঝে বেশ কিছুক্ষণ নিরবতা থাকে। সুমু চুপচাপ ঘরের মাঝখানটায় দাঁড়িয়ে আছে। আর আফাজ বেডে শুয়ে আছে। বাইরের হালকা বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আর কিছু কোন আওয়াজ নেই। সুমু মুখ তুলে চেয়ে তাকায় আফাজের দিকে। আফাজ মুখ জানালার দিকে করে এখনো বৃষ্টি দেখছিলো। সুমু ভাবে এখন আফাজকে একলা ছেড়ে দেওয়া উচিত। পড়ে যখন আফাজ ঘুমাবে তখন এসে একবার দেখে যাবে। সুমু ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়ায়। তখনই আফাজের ম্লিন কন্ঠ ভেসে আসে। 

‘আমায় একটু পানি খাওয়াতে পারবে?’

সুমু সাথে সাথেই থেমে গিয়ে চকিতে ফিরে তাকায়। আফাজ জানালার দিকে মুখ করে কথাটা বলেছিলো। এখন সে ধীরে ধীরে তার মুখ ঘুড়িয়ে সুমুর দিকে ফিরে তাকায়। বলে,

‘যদি তোমার কোন দরকারি কাজ থাকে তবে যেতে পারো ‘

– না না। আমার কোন কাজ নেই। আমি এখনি পানি দিচ্ছি আপনাকে। 

সুমুর শরীর যেন প্রাণ ফিরে পায়। হন্তদন্ত হয়ে রুমে পানি খুঁজতে থাকে। তখনই সে দেখে ঘরের কোনের টেবিলটায় পানির বোতল রাখা। হয়তো এক লিটারের বোতল হবে ওটা। কালও এমন একটা বোতল থেকে পানি ঢেলে আফাজের কপালে ভেজা কাপড় দিয়েছিলো। পানির বোতল গুলো মনে হয় শিউলি বেগমরা এনে রাখেন। 

সুমু তাড়াতাড়ি পানির বোতলটা হাতে নিয়ে চলে আসে। এসে বিছানার পাশে দাঁড়ায়। আফাজ উঠে বসার চেষ্টা করে। সুমু পানির বোতলটা বিছানার পাশের টেবিলটায় রেখে আফাজের পাশে বিছানায় বসে। আফাজকে ধরে টেনে তুলে দিতে থাকে। আফাজের শরীর অনেক দুর্বল। নার্সের থেকে সে শুনেছে আফাজ খাবার খায়নি এ দুইদিন ঠিকমতো। কাল রাতে আবার জ্বরও এসেছিলো। 

সুমু আফাজকে ধরে কিছুটা উঠিয়ে মাথার বালিশটাকে বিছানার প্রান্তে সোজা করে রাখে। আফাজকে ধরে পিছিয়ে সেই বালিশে হেলান দিয়ে দেয়। আফাজের শরীর বেশ ভারি হলেও সুমুর গায়ে যেন হঠাৎ অবিনশ্বর শক্তি চলে এসেছিলো। হয়তো এটা আফাজের প্রতি তার অনুভূতির আবেশ! 

আফাজকে হেলান দিয়ে বসিয়ে দেওয়ার পর বিছানার পাশের ছোট্ট টেবিল টা হতে সুমু পানির বোতলটা নেয়। বোতলের ছিপি খুলে বোতলটা আফাজের মুখের সামনে ধরে। আফাজ নিজের সচল বাম হাতটা উঠিয়ে সুমুর হাত থেকে বোতলটা নিয়ে নিজে নিজেই পানিটা খেতে থাকে। সুমুও বোতলটা ছেড়ে দেয় তার হাতে। এতে একটু আশাহত হয় সুমু। ভেবেছিলো নিজ হাতে আফাজকে পানি খাইয়ে দিবে। কিন্তু আফাজই বোতলটা তার হাত থেকে নিয়ে নিলো। আফাজ বেশ খানিকটা পানি খেয়ে বোতল টা সুমুকে দেয়। সুমু তাড়াতাড়ি বোতলটা হাতে নেয়। ছিপি লাগিয়ে নিজের কোলেই রাখে বোতলটাকে। আফাজ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে ছিলো বিছানার অপর পার্শের জানালার দিকে। বৃষ্টি দেখছিলো সে। সুমুও আফাজকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে মনে মনে বলে,

‘ একদিন হয়তো আপনি আর আমি বৃষ্টিকে খুব, খুব কাছ থেকে উপভোগ করবো!’ 

সুমুর মুখে একটা চওড়া হাসি ফুটে উঠে। হয়তো একদিন এই ইচ্ছাটা তার পূর্নতা পাবে, নয়তো এটাও রয়ে যাবে কল্পনাতিত এক ছোট্ট সুখ হিসেবে। 

আফাজ কিছুক্ষণ পর বলে উঠে,

– আমি একটু একলা থাকতে চাই। তুমি যাওয়ার সময় দরজাটা চাপিয়ে দিয়ে যেও। 

সুমুর কানে কথাটা যাওয়ার সাথে সাথেই যেন তার মুখের চওড়া হাসি বাতাসে মিলিয়ে যায়। সে চেয়েছিলো আফাজের পাশে আর কিছুক্ষণ বসে থাকতে। কিন্তু আফাজ চাইছেনা। সুমু কিছু না বলেই বিছানা থেকে উঠে যায়। চলে যেতে থাকে। যাওয়ার সময় একটু থেমে পিছু ফিরে তাকায় সে আফাজের দিকে। শার্ট, আর কাঁথা ঢাকা নেওয়া আফাজের মাঝে সেই সাদা পান্জাবি পড়া আফাজের রক্তজবা ফুল হাতে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য কল্পনা করে। মনের সুরে তাল মিলিয়ে বিরবির করে বলে,

‘ একদিন হয়তো পুরো পৃথিবী আমাদের হবে!’ 

সুমু সামনে ফিরে। ঘর থেকে চলে যেতে থাকে। হাতে পানির বোতলটাও আছে। ঘর থেকে বের হয়ে দরজা খানিকটা টেনে দেয়। করিডোরে দাঁড়িয়ে বোতলের ছিপিটা খুলে। এই বোতলে মুখ লাগিয়ে একটু আগে আফাজ পানি খেয়েছিলো। সুমুও বোতলে চুমুক দেয়। কয়েক ঢোক পানি পান করে মুখ থেকে বোতলটা নামায়। মুখে একটা হাসৌজ্জল প্রতিরূপ ফুটে উঠে। বোতলের ছিপি টা লাগিয়ে সেটাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে বেশ মনান্দেই দৌড়ে চলে যেতে থাকে সিড়ির দিকে। তখনই সেখানে উদয় হয় হনুফা। উড়ে উড়ে যেতে থাকে সুমুর পিছনে। সুমুকে ডেকে ডেকে বলতে থাকে,

– এই এই আমাকেও পানি দে, আমারও পিপাসা লাগছে। 

সুমুর কানে হনুফার কথা পৌছালেও মস্তিষ্ক তা গ্রহণ করেনা। কারণ তার পুরো মস্তিষ্কের নিউরনে নিউরনে আফাজ নামক এক রঙিন অধ্যায় ঘুড়ছিলো। 

 

____ 

 

শাহারিয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে। মনে হয় আহনাফ ফোন দিয়েছে। বাইরে ঝুম বৃষ্টি নেমেছে এবার। সারাদিন অল্প অল্প করে বৃষ্টি হয়েছে আজ আনন্দপুরে। আকাশ সবসময় মেঘলা ছিলো। ঠান্ডাটা তাই একটু বেড়েছে বইকি। 

 

দিথী তার ঘর থেকে বেড়োলো। হাতে থাকা পায়েশের বাটিটা ডায়নিং টেবিলে রাখলো। বৃষ্টির দিকে পায়েশ, দই এসব খেতে দিথীর বেশ ভালো লাগে। তার উপর শিউলি বেগমের বানানো পায়েশ। খেতে দারুনের থেকেও দারুন। দিথী এগিয়ে যায় বেসিনে হাত ধোয়ার জন্য। হাতের তিন আঙুলে বেশ খানিকটা পায়েশ লেগেছিলো। সেগুলো চেটে খেতে যাবেই তখনই তার চোখে পড়ে শাহারিয়াকে। শাহারিয়া ফোনে কথা বলছে বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে। আকাশে ছোট খাটো একটা বিজলী চমকিয়ে উঠে। দিথী হাতের পায়েশ গুলো আর চেটে খায় না। হাত নামিয়ে এগিয়ে যায় শাহারিয়ার দিকে। মুখে মুচকি হাঁসি।

 

শাহারিয়ার পিছনে দাঁড়িয়ে কান পেতে শোনার চেষ্টা করে যে শাহারিয়া কার সাথে কথা বলছে। শাহারিয়া বাইরের দিকে মুখ করে থাকায় দিথী যে এসেছে তা সে টের পায়নি। দিথী কথা শুনতে পাচ্ছে না। সে আরেকটু কাছে যায়, তখনই তার স্পর্শ শাহারিয়ার গায়ে লাগে। শাহারিয়া পিছনে ফিরে তাকায়। দেখে দিথী দাঁড়িয়ে আছে। হাত দুটো পিছনে নিয়ে ঢুলছে আর হাসছে। শাহারিয়া ফোনের অপর প্রান্তের লোকটাকে বলে,

‘ আচ্ছা রাখ, আমি পরে তোকে কল ব্যাক করছি।’ 

শাহারিয়া ফোনটা কান থেকে নামায়। পকেটে রেখে বলে,

– তুমি? তুমি এখানে কী করতেছিলা! 

– তোমার উপর গুপ্তচর গিরী করতেছিলাম। ভাগ্যেস ফোনের অপরপার্শে আহনাফের গলা পাইছি বলে বাঁচে গেছো। নাইলে তোমাকে ধরে দিতাম একদম!

– আহনাফই ফোন দিছিলো। আফরিনের মায়ের বিষয়ে বলছিলো। (একটু থেমে) তুমি মায়ের সাথে আফাজের খাবার নিয়ে যাওনি। 

– না। মা এখনো তার ঘরে সাজতেছে। 

– মা এখন বের হবে তাতেও সাজা লাগবে! মায়ের সাজগোজ আর গেলো না!

– আচ্ছা বাদ দাও। এখন বলো বৃষ্টিতে তোমার কী কী করতে ইচ্ছে করে। 

– আমার! আমি তো ঢাকায় থাকতে খালি সারাদিন ঘুমাইতাম যখন বৃষ্টি হইতো। আর এখানে আসলেও ঘুমানোই হয়। 

– এইজন্য তো তোমাকে আমি আজ সারাদিন খুঁজে পাইনা। এতো ঘুম ক্যান তোমার! 

– বৃষ্টি আসলেই কেনো জানি ঘুম পায় খুব। (বলেই হাই তুলতে থাকে শাহারিয়া)

– হইছে ঢং বাদ দাও। তোমার ঘুম আমি ছুটাবো। (একটু থেমে) এদিকে কাল সারারাত বৃষ্টি হইছিলো। কিন্তু আমার চোখে ঘুম নাই। 

– কেন ? শরীর খারাপ করলো নাকি তোমার আবার! 

– আমার মন খারাপ। বিয়ে করছি কিন্তু ঘরে বর নাই। 

– খালি তো কালকের দিনটাই। তারপর তো আমরা চলে যাবো। তখন আর আফসোস করতে হবেনা। 

– হইছে আফসোস বাদ দাও। (হাসিমুখে) পায়েশ খাবা! 

– পায়েশ! তুমিই মনে হয় পায়েশের বাটি সাফ করে দিছো। আমার জন্য আর রাখছো কই! 

– তোমার জন্য বেশি মিষ্টি দেওয়া পায়েশ রাখছি। এখন অল্প খাও, শ্রীমঙ্গলে গিয়ে তখন বেশি বেশি খাইয়ো। 

– তুমি আর মা, তোমাদের দুইজনের মুখ আর ঠিক হইলো না। 

– মুখ ঠিক করা বাদ দাও। (হাত দুটো সামনে এনে দেখিয়ে) এই যে পায়েশ। এইটুকুই আজকে তোমার জন্য আছে। 

– তোমার আঙুলে লাগা পায়েশ আমাকে দিচ্ছো,,! কেন আমার জন্য বাটিতে একটু রাখে দিলেই তো পারতা। 

– কিন্তু তাতে তো তুমি বেশি মিষ্টি স্বাদ পাইতা না! 

– এখন তোমার আঙুল থেকে খাইলে বেশি মিষ্টি স্বাদ পাবো!

দিথী সাথে সাথে এক চোখ টিপ মেরে মাথা নাড়িয়ে হ্যা বলে। শাহারিয়া দুই হাত নিজ কোমরে দিয়ে বলে,

– এতো খুশি ক্যান‌ আজকে! 

– আগে পায়েশ খাও তারপর বলতেছি। 

দিথী তার তিন আঙুল উপরে তুলে। শাহারিয়ার মুখের দিকে এগিয়ে দেয়। শাহারিয়াও সেই তিন আঙুল ছুঁয়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। দিথী আঙুল তিনটে শাহারিয়ার মুখের সামনে নিয়ে যায়। শাহারিয়া আঙ্গুল গুলো মুখে নিতে যাবেই তখনই দিথী তার আঙ্গুল গুলো টেনে নিয়ে নিজের জিহ্বা দিতে চেটে নেয়। শাহারিয়া ভ্যাবাকচেকা খেয়ে যায়। সে কিছু বুঝে উঠার চেষ্টা করবে তখনই দেখে, দিথী তার সেই পায়েশ মাখা জিহ্বা মুখ থেকে আলতো করে বের করে শাহারিয়ার মুখের কাছে এগিয়ে আসছে। শাহারিয়ার চোখ গুলো বড় বড় হয়ে যায়। কী সাংঘাতিক বিষয়! দিথী পায়েশ মাখা আঙ্গুল গুলো তার জিহ্বা দিয়ে চেটে সেই জিহ্বা শাহারিয়ার দিকে এগিয়ে দিচ্ছে চুষে নেওয়ার জন্য! শাহারিয়া এক ঢোক গিলে। এই বৃষ্টিতে দিথী এতো গরম কেনো হয়ে গেলো! দিথী চোখ দিয়ে ইশারা করে তার জিহ্বায় নরম পরশ বোলানোর আহ্বান করে। দিথীর চাহনি দেখে যেন শাহারিয়া নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনা। তার ভিতরের পুরুষত্ব যেন দরজা ভেঙে বেরিয়ে আসতে চায়। শাহারিয়া হঠাৎ দিথী পায়েশ মাখা জিহ্বা নিজের ঠোঁটের ভিতরে নিয়ে নেয়। দুইহাত দিয়ে দিথীকে খুব জোড়ে জড়িয়ে ধরে। এই পায়েশের স্বাদ যেন অমৃত! দিথীও শাহারিয়াকে জড়িয়ে ধরে শাহায়িয়ার সাথে কো-অপরেট করে। বাইরে বিজলী চমকিয়ে উঠে। 

 

   ডেসিন টেবিলের সামনে বসে চুল আঁচড়াচ্ছেন শিউলি বেগম। বিছানায় শুয়ে আছেন মতিন মেম্বার। শিউলি বেগমকে পাশ থেকে দেখছেন তিনি। শিউলি বেগম তাকে আড় চোখে দেখে এক মুখ বাকানি দেন। দিয়ে আবার আয়না দেখে দেখে চেয়ারে বসে চুল আঁচড়াতে থাকেন। মতিন মেম্বার শোয়া হতে উঠে বসেন। চশমাটা চোখে পড়ে নেন। বসে শিউলি বেগমের দিকে তাকিয়ে বলতে থাকেন,

– ও শিউলি বেগম। আহো না ঘুমাই। 

– ঘুমাইবা না কী করবা হেইডা আমার জানা আছে। 

– হাচা কইতাছি শুধু ঘুমামু তোমারে ধইরা। কতদিন হইলা গেলো তোমারে ধইরা ঘুমাই না। 

– কতদিন আর কই হইলো। মাত্র তো ৫-৬ ডা দিন ঘুমাও নাই।

– আমার ধারে ৫ দিন ৫ বছরের লাহান কাটছে। তোমারে ছাড়া ঘুমাইতে ভালা লাগেনা গো। আহো না আইজ একলগে ঘুমাই। বাইরে কত সুন্দর বৃষ্টি পড়তাছে। একরম একটা আবহাওয়াতে আমার খুব ঠান্ডা লাগতাছে(দূই হাতে শরীর জড়িয়ে ধরে) উড়ি বাবা, কী শীত,,! আহো না শিউলি বেগম। 

– বুইড়া বয়সে ভীমরতি উডছে তোমার! আমি পারমুনা। কোলবালিশ আছে, ঐডা ধইরা ঘুমাও। 

– কোলবালিশ কী আর আমার শিউলি বেগমের লাহান নরম হইবো। আহো না ঘুমাই। 

– কইছি না পারমুনা। আমারে ক্লিনিক যাইতে হইবো আফাজের লাইগা ভাত নিয়া। তুমি চুপচাপ ঘুমাও। (একটু থেমে স্বাভাবিক গলায়) কাইলকা ২১ তারিখ। তারপরে তোমার পোলা বউমা নিয়া গেলেগা তহন আমুনে তোমার লগে ঘুমাইতে। 

– আরো ১ টা রাইত! আহা, যদি আইজকাই ২১ তারিখ হইতো। কতো ভালো হইতো। তোমারে ধইরা ঘুমায়া যাইতাম। 

– আমি যাওয়ার সময় ফুলমতিরে কইয়া যামুনে, অয় তোমারে ভাত বাইড়া দিবো। খাইয়া ডিরেক্ট হুইয়া পড়বা। 

– আইজ বউডার হাতে খানাও খাইতে পারুম না। কী অভাইগ্গা কপাল আমার! 

– হ অভাগাই। এহন চুপচাপ বই নিয়া পড়তে বহো। আমার ধারে তোমার লগে কথা কওয়ার টাইম নাই। 

বলেই চেয়ার থেকে উঠে চলে যেতে থাকে শিউলি বেগম। মতিন মেম্বার বলতে থাকেন,

– আরে যাইয়ো না গো। আরেকটু থাহো, তোমারে দেইখা পরাণ ডারে একটু জুড়াই, ও শিউলি বেগম,,,! 

 

শিউলি বেগম ঘর থেকে বাইরে চলে আসেন। মাথার চুল গুলো হাত বেনি করতে করতে এগিয়ে আসেন। তখনই তার চোখ পরে দূরে। দেখেন বারান্দায় শাহারিয়া আর দিথী চোখ বুঝে চুমুতে মেতে আছে। শিউলি বেগম বিরবির করে বলেন,

– ভিতরে এক মুরগা চেচাইতাছে, এইদিকে আরেক মুরগা-মুরগির চুমাচুমির হাট বহাইছে। আইজ এগোরেই দেখমু, কতক্ষন এমনে লাইগ্গা থাকতে পারে।

বলেই ডায়নিং টেবিলের সামনে থেকে একটা চেয়ার হাতে নেন শিউলি বেগম। টেবিলে থাকা ফ্লাক্স থেকে এক কাপে চা ঢেলে নেন। এক হাতে চা আরেক হাতে চেয়ার নিয়ে এগিয়ে যান তাদের সামনে। দুইজনেই চোখ বন্ধ করে কিস করতে থাকায় তারা শিউলি বেগমকে দেখেনি। শিউলি বেগম তাদের থেকে ২ হাত দূরে চেয়ারটাকে নিঃশব্দে রাখেন। সেটায় বসেন। পায়ের উপর পা তুলে গরম চায়ে চুমুক দেন। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। মাঝে মাঝে মৃদু বিজলী চমকিয়ে উঠছে। শিউলি বেগম চায়ে চুমুক দেন আর তাকিয়ে দেখতে থাকেন শাহারিয়া আর দিথীর গভীর চুম্বন।

 দুইজনের হাত যে কোন দেশ থেকে কোন দেশে যায় তা যেন চায়ে চুমুক দেওয়া শিউলি বেগম ছাড়া আর কারো চোখেই পড়ে না। শিউলি বেগম এবার একটু শব্দ করে চায়ে চুমুক দেন। তারপর মুখ দিয়ে মৃদু আওয়াজ বের করেন, ‘ আহহ্! চা ডা আইজ মেলা ট্যাশ করতাছে!’

হঠাৎ কথার শব্দে শাহারিয়ার চোখ খুলে যায়। তাদের থেকে দুইহাত দূরে বসা শিউলি বেগমের এক নজরে চেয়ে থাকা দেখে তৎক্ষণাৎ সে দিথীকে ধাক্কা দিয়ে তার থেকে ছাড়িয়ে নেয়। দিথী কিছুটা বিরক্ত হয়। শাহারিয়াকে বলতে থাকে,

‘ এই ছাড়লা কেনো। আমার কতো ভালো লাগতেছিলো। আসো আরো পায়েশ খাও। সব তোমার। সব খেয়ে নেও।’ 

শাহারিয়া দিথীর কথার কোন উত্তর না দিয়ে তাড়াতাড়ি নিজের ঠোট মুছে পালাবার পথ খুঁজতে থাকে। ঘরের দিকের পথে শিউলি বেগম বসা। শাহারিয়া দৌড়ে ছুট লাগায় বেসিনের পাশে গোসল খানার দিকে। দিথী শাহারিয়ার ছুটে যাওয়া দেখেও কিছু বুঝতে পারেনা। সে আধখোলা চোখ নিয়ে বিরক্তির সহীত বলতে থাকে,

‘ এই কই যাও। এখন কী গোসল করার সময় নাকি। সকালে ডাকলাম একসাথে গোসল করার জন্য, তখন তো আসলানা।’

– আম্মা জান। আমারে একটু পায়েশ দেও। আমিও খাই। 

দিথী চোখ বড় বড় করে তৎক্ষণাৎ পিছনে ফিরে তাকায়। দেখে শিউলি বেগম চেয়ারে বসে পায়ের উপর পা তুলে চায়ের কাপ নিয়ে বসে আছেন। মুখে হাসির রেখা চওড়া তার। দিথী কী বলবে, কী করবে বুঝে পায়না। হাত উঠিয়ে মাথা চুলকাতে থাকে। শিউলি বেগম সুর নিয়ে বলেন,

– আহো আম্মাজান, একলগে চা খাই।

– না মানে মা, আমি আরকি একটু,,,

– হ, একটু পায়েশ দেওয়া নেওয়া করতাছিলা আরকি।

– আর হবেনা মা। মাফ করে দাও। 

– না,না। তোমরা তো খালি পায়েশ দেওয়া নেওয়া করছো। যেহানে সেহানে তো হাত দেও নাই। 

দিথী জিহ্বা কামড়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে। কী বেইজ্জতি টাই না হইতে হইলো এখন! শিউলি বেগম চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। চায়ের কাপ নিয়ে দিথীর পাশে এসে দাঁড়িয়ে একহাতে কাপের প্রিচ ধরে আরেক হাতে চায়ের কাপ নিয়ে কাঁধ দিয়ে দিথীকে এক ছোট্ট ধাক্কা দেন। দিথী তার মাথার আউলা,ঝাউলা চুলে হাত রেখে লজ্জায় লাল হয়ে যেতে থাকে। শিউলি বেগম মুখ থেকে চায়ের কাপ নামিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলতে থাকেন,

– হইছে আর শরম পাওয়া লাগবো না। ঘরে যাইয়া তাড়াতাড়ি কাপড় বদলাইয়া লও। আফাজের ওহানে যাইতে হইবো। 

– মা সরি, আর হবেনা এরকম। 

– হ বুজ্জি বুজ্জি। এহন যাও। গিয়া রেডি হও, বাইর হওয়া লাগবো। বৃষ্টি ডা এহন একটু কমছে। নাইলে পড়ে আবার বাড়লে যাইতে পারুম না। 

– জি আচ্ছা ঠিক আছে মা। 

বলেই ঘরের দিকে ছুট লাগায় দিথী। শিউলি বেগম তা দেখেই কী হাঁসি। দিথী আর শাহারিয়ার ধরা খাওয়ার পর মুখটা মনে করে যেনো আরো হাসি পাচ্ছে শিউলি বেগমের। হাতে চায়ের কাপ আর প্রিচ নিয়ে চলে যেতে থাকেন ঘরের দিকে। এগিয়ে এসে ডায়নিং টেবিলে চায়ের কাপটা রাখেন। রেখে ঘরে ঢুকতেই যাবেন তখনই হঠাৎ কারেন্ট চলে যায়। বারান্দা, ঘর সব অন্ধকার হয়ে যায়। মতিন মেম্বার ঘর থেকে চেচাতে চেচাতে বেড়িয়ে আসতে থাকে,

– শিউলি বেগম, ও শিউলি বেগম। ঘরদোর দি সব অন্ধকার হইয়া গেলো। লাইট কোনহানে রাখছে কে জানে। শিউলি বেগম, ও শিউলি বেগম। 

বলতে বলতে বারান্দায় বের হন মতিন মেম্বার। তখনই গোসলখানার দরজা খুলে বের হয় শাহারিয়া। কারেন্ট যাওয়াতে ঐখানটাও অন্ধকার হয়ে গেছে। গোসল খানার দরজা খোলার শব্দ শুনে মতিন ভাবেন শিউলি বেগম বোধহয় ঐদিকে আছে। 

‘ শিউলি বেগম, তুমি এতো রাইতে গোসল করতে গেছো ক্যান’ 

বলতে বলতে এগিয়ে যেতে থাকেন সেদিকে। বাইরে বৃষ্টির বেগ কিছুটা বেরে যায়। মতিন মেম্বার বেশ কিছুটা এগিয়ে যান। হঠাৎ কিছু একটার সাথে উস্টা খেয়ে হড়মুড়িয়ে পড়ে যান ফ্লোরে। অমনি বিজলী চমকিয়ে উঠে।

‘মরছে মরছে মুরগাডায় মরছে’ বলেই শিউলি বেগম হাসিতে ফেটে পড়েন। তার রেখে আসা চেয়ারটার উপরে হুড়মুড়িয়ে পরে গেছে মতিন মেম্বার। শাহারিয়া তা দেখেই এগিয়ে আসে ধরতে। শিউলি বেগমের বারান্দা কাঁপানো হাসিতে দিথী,লায়লা, ফুলমতি সবাই বারান্দায় চলে আসে। ফুলমতি টর্চ নিয়ে এসেছিলো। শাহারিয়া মতিন মেম্বারকে ধরে উঠায়। শিউলি বেগম হাঁসতে হাঁসতে এগিয়ে আসেন মতিন মেম্বারের দিকে। মতিন মেম্বার বোধহয় কোমরে ব্যাথা পেয়েছেন। শিউলি বেগম তাকে ধরে সোজা করেন। হাঁসি আঁটকে রাখতে জান, কিন্তু তা মুখ ফেটে আবার বেড়িয়ে আসে। তার হাসিতে যেন বাকিদেরও হাসি পেয়ে উঠে। শাহারিয়া হাসেনা। সে তার বাবাকে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। মনে মনে বাবাকে বলতে থাকে,

‘ তোমার আর আমার, দুইজনের খবর করার জন্য এরকম একটা বউই যথেষ্ট!’ 

 

____

 

নীলগিরি জঙ্গল। বৃষ্টি ভেজা আঁধার রাতে যেনো এই জঙ্গলটাকে আরো বেশি ভয়ানক লাগে। বৃষ্টি হওয়ায় জঙ্গলের ভিতরের মাটি কাদায় মাখামাখি হওয়ার মতো অবস্থা। চারপাশ ঘন গাছপালায় ঘেড়া। এক লোক দৌড়ে ছুটে যাচ্ছে দিকবিদিক না দেখে। তার পিছু পিছু দৌড়ে আসছে কিছু বন্দুকধারীর লোক। হাতে লম্বা বন্দুক। যেমনটা রন্জু সেইদিনের ভিডিওতে জুডাসের রক্ষীদের হাতে দেখেছিলো ঠিক তেমন। অচেনা লোকটা প্রাণপনে ছুটে এই জঙ্গল থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছে। চারপাশে সুচোলো ডাল পালায় তার হাতের চামড়া ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম। তখনই এক গুলি এসে লাগে তার গায়ে। ছিটকে গিয়ে লুটিয়ে পড়ে সে মাটিতে। রক্ষীরা এসে তার গাঁয়ের উপর অনবরত গুলি করতে থাকে। লোকটা শেষ চিৎকার টাও করতে পারেনি। পুরো শরীর গুলিতে ঝাঝড়া করে দেয় রক্ষীরা। রক্তে মাটি ভিজে যায়। গুলি করার পর সেই লাশটাকে কাঁধে তুলে নেয় ওখানকারই এক রক্ষী। নিয়ে চলে যেতে থাকে জঙ্গলের আরো গভীর অংশে।

 

চলবে ,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

 

উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন:: ২(মুখোশ)

পর্ব:: ৬৭

লেখক:: মির্জা শাহারিয়া

 

(((((আজকের পর্ব টা মন দিয়ে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পড়বেন। কিছু নতুন জিনিস জানতে পারবেন))))

 

সমুদ্র তটের থেকে কিছুটা দূরে উঁচু এক যায়গায় একটা কাঠের বাড়ি ভাড়া নিয়েছে রায়হান আর নিপা। বাড়িটা এখানকার আবাসিক লোকদের। কাঠের বাড়িটার সবকিছুই কাঠের তৈরি। রায়হানদের রুমটার সাথে একটা বারান্দা-ব্যালকনিও আছে। 

 

নিপা বারান্দারি রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছে। দরজা খুলে বারান্দায় প্রবেশ করলো রায়হান। আকাশ পরিষ্কার। কিছুটা জোছনা পড়েছে। দূরের সমুদ্র সেই জোছনার আলোতে কিছুটা দৃশ্যমান। রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকা নিপাকে যেনো এক মায়াবী রাজ্যের রাজকুমারী লাগছে। খয়েরি রঙের শাড়ি। খোলা চুল কোমড় অব্দি এসে ঠেকেছে। মাঝে মাঝে বয়ে যাওয়া হালকা হাওয়ায় চুল গুলো মৃদু দোল খেয়ে উঠছে। বাড়ির পাশ থেকে কোন এক নাম না জানা ফুলের চাপা সুবাস ভেসে আসছে। চারপাশে আবহকে যেন মনকে মোহময় করে তুলছে। রায়হান দরজাটা ভিড়িয়ে দিয়ে এগিয়ে যায় নিপার কাছে। জোছনা রাতের রূপসী কণ্যার রূপ ছুঁয়ে দিতে মন চাইছে আলতো করে। নিপার পিছনে গিয়ে দাঁড়ায় রায়হান। হাত দুটো হালকা ভাবে কোমরের অংশে রেখে কাঁধে মুখ ডুবিয়ে একটা ছোট্ট চুমু খায়। নিপা রায়হানের স্পর্শ চিনতে ভুল করেনি। এই ছোঁয়া যে তার জনম, জন্মান্তরের চেনা। রায়হান তার থুতনি নিপার কাঁধে রেখে তার সাথেই দূরের সমুদ্র,আকাশে চোখ দেয়। হাত দুটো আরো এগিয়ে আনে নরম তুলতুলে পেটের মাঝে। প্রেয়সীর গাঁয়ের গন্ধ সে খুব কাছ থেকে নিতে পারছিলো। নিপা মৃদু গলায় বলে,

– আকাশ টা সুন্দর না! 

– আকাশের থেকেও আজ আমার সুবাটা বেশি সুন্দর। অনেক সুন্দর। 

বলেই নিপার ঘাড়ে আরো একটা ছোট্ট চুমু খায় রায়হান। রায়হানের গালের খোঁচা খোঁচা দাড়ি গুলো নিপার ঘাড়ে বেশ সুরসুরি দিচ্ছিলো। নিপা মৃদু হেসে বলে,

– হয়েছে ছাড়ো, আমার কাতুকুতু লাগছে। 

– তা একটু লাগলে মন্দ হয়না। 

নিপার পেট টায় আলতো করে হাত দিয়ে নিজের দেহের সাথে চেপে ধরে রায়হান। নিপা নিজেকে রায়হানের থেকে ছাড়াতে যায়। কিন্তু পারে আর কই! 

রায়হান ধীর কন্ঠে বলে,

– আল্লাহ তোমাকে কী দিয়ে বানিয়েছে বলোতো! তুমি এতো নরম কেনো! তোমার গায়ে হাত দিলেই যেন মনে হয় কোন ফুলের পাপড়ি ধরেছি। আমার একটা শিমুল তুলার কোলবালিশ ছিলো। ঐটাকেই আমি পৃথিবীর সবচেয়ে নরম ভাবতাম। কিন্তু তোমাকে কাছে পাওয়ার পর থেকে তোমার চেয়ে নরম,সফট আর কিছুই আমি এই পৃথিবীতে পাইনি। 

– এতো প্রশংসা! 

– প্রেয়সীর রুপের প্রশংসা হাজার বার করা যায়। 

– আর আমিও তোমার মতো শক্ত দেহের কাউকে দেখিনি। তুমি হাত ধরে টানলে মনে হয় এই বুঝি হাত টা কনুই থেকে ছুটে গেলো। 

– এরপর থেকে তাইলে ধীরে ধীরে টেনে তোমায় নিজের করে নিবো। 

নিপা এক ছোট্ট মুচকি হাসি দিয়ে সামনের দিকে তাকায়। সমুদ্র ঢেউয়ের কলতান শব্দ এখান থেকে শোনা যাচ্ছিলো। ঢেউয়ের সাথে আসা সাদা ফেলা গুলাও জোছনা আলোয় কিছুটা অস্পষ্ট হয়ে ধরা দিচ্ছিলো। রায়হান তার গালের সাথে নিপার গাল লাগিয়ে বলে,

– আমাকে একটা ছোট্ট সুবা দেওনা।

– এখনই! আর কয়টা মাস যাক। 

– না আমার ছোট্ট সুবা খুব তাড়াতাড়ি চাই। সারাদিন বাবা বাবা করে বাড়ি মাথায় তুলবে। আমি তার জন্য অনেক খেলনা আর চকলেট আনবো। অফিস থেকে ফিরার পর আমার কোলে দৌড়ে ছুটে আসবে। (একটু থেমে) আমার একটা ছোট্ট সুবা চাইই চাই। 

– যদি ছোট্ট রায়হান হয়! 

– না। আমার সুবাই চাই। তোমার মতো কিউট একটা সুবা। 

– তোমার মতো দুষ্টু না হলেই হয়। 

রায়হান নিপাকে ঘুড়িয়ে তার দিকে ফিরায়। তার দুই কাঁধে হাত দেয়। বলে,

– আমি দুষ্টু! 

– তা নয় তো কী। সবসময় খালি দুষ্টামি মাথায় ঘুরে তোমায়। 

– আমি আবার কী দুষ্টামি করছি। 

– তুমিই ভালো জানো। 

– নিজের বউয়ের সাথে দুষ্টুমি করবো না তো জরিনাদের সাথে করতে যাবো নাকি! 

নিপা তখনই রায়হান মুখ চেপে ধরে। সে কিছুটা অস্থীর মতো হয়ে যায়। বলে,

– আমি ছাড়া তুমি আর কাউকেও ছোবে না। 

রায়হান নিপার হাত সড়িয়ে তার কপালে কপাল লাগিয়ে মৃদু গলায় বলে,

– আমি যে শুধুই তোমাতে আসক্ত। তুমিই আমার নেশা, তুমি আমায় এক টুকরো আশা। তোমায় ছাড়া যে একমুহুর্ত থাকাও দায়! 

– বাপরে, এতো ভালোবাসা! 

– ভালো তো অনেকটা বাসি। বুক চিরে দেখাতে বললে এখনি দেখাচ্ছি! 

– না থাক। লাগবেনা। এমনিতেই তুমি আমার হিরো। 

রায়হান মুচকি হাসি দিয়ে এক নজরে তাকিয়ে থাকে নিপার দুই চোখে। এই দুই চোখ যেনো তার কাছে মায়াবী সাম্রাজ্য। রায়হান ধীর গলায় বলে,

– জানো তোমার ঐ দুই চোখ মহাবিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর নক্ষত্র! তুমি যে আমার পূর্নতা। তোমার চোখের অনন্ত মায়া আমাকে প্রভাবিত করে! 

– মায়াবিনী হতে পেরেছি তাইলে! 

– তুমি আমার মায়াবিনী, অর্ধাঙ্গিনী, স্রোতোসিনী। সব সব সব। 

নিপাকে জড়িয়ে ধরে রায়হান। নিপাও তার দু হাত দিয়ে রায়হানকে আলিঙ্গন করতে কৃপনতা করে না। রায়হান নিপার গাঁয়ের সুঘ্রাণ নিয়ে দূরের সাগর প্রান্তরে চায়। দু একটা জোনাকি পড়া উড়ছে বারান্দার রেলিং ধরে। রায়হান নিপার উষ্ণ আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয়ে দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে,

‘পূর্নিমা সন্ধায়,

তোমার রজনীগন্ধায়,

রূপসাগরের পাড়ের পানে

উদাসী মন ধায়..’

 

 নিপা রায়হানকে এভাবেই জড়িয়ে রেখে চোখ বুঁজে। রায়হানের বুকের হৃদস্পন্দন যেন নিম নিম হয়ে আসছিলো। বুকে কান রাখায় সে খুব ভালোভাবেই শুনতে পাচ্ছিলো। নিপা চোখ খুলে ফেলে। রায়হানকে ছেড়ে দেয়। রায়হান কিছুটা অবাক হয়ে বলে,

 – কী হলো! 

 – এভাবে তো সারাজীবন ধরে রাখতে পারবে, কিন্তু এতো সুন্দর জোছনা রাত, এই রাত কে আমি মিস করতে চাই না। চলো রাতের আকাশ দেখি। 

রায়হান আবার নিপার কাঁধে দু হাত রাখে। বলে,

 – রাতের আকাশ দেখে কী করবো। ঐ আকাশের চাঁদের থেকে আমার আকাশের চাঁদ বেশি সুন্দর। আমি তো আমার চাঁদ বউ টাকেই দেখবো। 

 – দেখিও। চলে তো যাচ্ছিনা কোথাও। আসো একসাথে আকাশ দেখি। 

বলেই রায়হানের হাত দুটো কাঁধ হতে নামিয়ে দিয়ে এক হাত ধরে টেনে রেলিংয়ের পাশে দাঁড়ায় দুজন। নিপা আঙুল উঠিয়ে দূরের গোলগাল চাঁদটাকে দেখাতে থাকে। রায়হান সেই চাঁদের দিকে না তাকিয়ে নিপার দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ একটা ছোট্ট চুমু দিয়ে আবার নিপার দিকেই তাকিয়ে থাকে। নিপা রায়হানের কাঁধে মেরে তাকে আকাশ দেখতে বলে,‌ তার হাত জড়িয়ে ধরে টেনে তার কাছাকাছি করে আকাশের দিকে চোখ রাখে। রায়হানও এবার জোছনা রাতের আকাশের স্নিগ্ধতায় গা ভাসায়। এরকম রাত অনেক সুন্দর সময়ের সাক্ষী হয়ে থাকে। অনেক নতুন নতুন গল্প গাঁথা যায় এই রাতের তারার মেলা দিয়ে। রায়হান খালি গলায় গান ধরে বসে। নিপা একবার রায়হানের দিকে মিষ্টি মুখে ফিরে তাকায়। আবার দূরের আকাশের দিকে চায়। 

 

ওগো তোমার আকাশ দুটি চোখে,

আমি হয়ে গেছি তারা 

ওগো তোমার আকাশ দুটি চোখে,

আমি হয়ে গেছি তারা 

 

এই জীবন ছিল,

নদীর মতো গতিহারা

এই জীবন ছিল,

নদীর মতো গতিহারা, দিশাহারা

ওগো তোমার আকাশ দুটি চোখে,

আমি হয়ে গেছি তারা

 

আগে ছিল শুধু পরিচয়,

পরে হলো মন বিনিময়

,

,

আগে ছিল শুধু পরিচয়,

পরে হলো মন বিনিময় 

শুভ লগ্নে হয়ে গেল শুভ পরিণয়,

শুভ লগ্নে হয়ে গেল শুভ পরিণয়।

 

আজ যখনই ডাকি,

জানি তুমি দিবে সাড়া

এই জীবন ছিলো,

নদীর মতো গতিহারা, দিশাহারা

ওগো তোমার আকাশ দুটি চোখে,

আমি হয়ে গেছি তারা

ওগো তোমার আকাশ দুটি চোখে,

আমি হয়ে গেছি তারা।

 

গানে নতুন করে এলো সুর,

এ যেন আগের চেয়ে সুমধুর

নিয়ে এলে আমায় তুমি আজ বহুদূর,

নিয়ে এলে আমায় তুমি আজ বহুদূর।

 

বয়ে চলেছে যে তাই,

ভালবাসার একধারা।

এই জীবন ছিলো,

নদীর মতো গতিহারা, দিশাহারা।

ওগো তোমার আকাশ দুটি চোখে,

আমি হয়ে গেছি তারা

ওগো তোমার আকাশ দুটি চোখে,

আমি হয়ে গেছি তারা

হুম…. আমি হয়ে গেছি তারা,,

 

____

 

নতুন এক সূর্যদয় এনে দিলো নতুন এক দিনের মুগ্ধতা। পাখিরা নীড় ছেড়ে উড়াল দিলো খাবারের খোঁজে। গ্রামের এক নতুন সকাল নতুন এক অনুভূতির আবেশ বয়ে আনে। 

 

সকাল ৮ টা। দিথী তার বাসার আঙিনার পেড়িয়ে বারান্দার দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। বারান্দায় কিছু মুরগি তার বাচ্চাদের দিকে খাবার খুঁজে ফিরছে। একপাশে রাখা টবের ফুল গুলো পানির ছোঁয়ায় সতেজ হয়েছে। আজ বৃষ্টি নেই। তবে কাল যা হয়েছে তা একদম প্রকৃতিকে জাগিয়ে দিয়ে গেছে। 

দিথী বারান্দার দরজা দিয়ে উপরে উঠতেই তার সাথে দেখা হয় শেফালীর। দিথী বলে,

– মা কই রে। 

– খালাম্মায় তো খালুর ঘরে। 

– নিবিড় স্কুলে গেছে ? 

– হ। একটু আগেই বাইর হইলো। 

– সামিহা, তানিয়া আপু, ওরা কই। 

– আপনার ঘরে বইয়া আছে। আমি একটু আগে নাস্তা দিয়া আইলাম। 

– আচ্ছা ঠিক আছে তুই যা। মা’কে বলিস আজ বাবাকে ডাক্তার দেখতে আসবে। ঘরের অবস্থা যেনো ঠিক ঠাক রাখে। 

– জে আইচ্ছা। 

দিথী শেফালীকে পাশ কাটিয়ে চলে যায় তার ঘরের দিকে। শেফালী দিথীকে একটু বেশি তাড়াহুড়োয় দেখে আর কিছু বলে না। ঠোঁট উল্টিয়ে চলে যেতে থাকে রান্নাঘরের দিকে।

 

   ঘরের ভিতর বিছানায় গোল হয়ে বসে একটা বই পড়ছে তানিয়া, কানিজ, আর সামিহা। দিথী ঘরে প্রবেশ করে। করে দরজা চাপিয়ে দেয়। দিথীর উপস্থিতি লক্ষ্য করে বিছানায় থাকা তিনজনই মুখ তুলে তাকায়। দিথী কিছুটা অস্থির। দিথী এসে তার পড়ার টেবিলের সামনে থাকা চেয়ার টা টেনে বিছানার সামনে বসে। বলে,

– কতদূর কি জানতে পারলে? 

– প্রায় শেষের দিকে চলে এসেছি। রক্ত আনছো? (তানিয়া)

– হ্যা। এইযে। এখানে রাশেদের টাও আছে। আয়ান হারিয়ে যাওয়ার পর থেকে সে অসুস্থ। আমাদের সাথে আজকের রাতে নীলগিরি তে যাওয়ার শক্তি, কিংবা মানসিক অবস্থা কোনটাই তার নেই। তাই মা’কে বলে তার রক্তও নিয়ে এসেছি। 

দিথী তার হাত ব্যাগ টার চেইন খুলে দুটো রক্তের সিসি বের করে বিছানায় তানিয়ার সামনে রাখে। চেইন লাগিয়ে ব্যাগ টাকে নিজের কোলে রাখে। তানিয়া বলে,

– কোন আক্রমণ হয়েছিলো নাকি এই কয়েকদিন তোমার উপর ? 

– না। কোন কিছুই হয়নি। ঐ বাড়িতে তো সাদা পাউডার ছিটিয়ে দিছো। ওরা আসলে না কিছু করবে। 

– আমাদের এখানেও কোন কিছু হয়নি। বুঝলাম না ওরা আমাদের কিছু করছেনা কেনো!

– আচ্ছা বাদ দাও। বইয়ে কী লেখা আছে। কীভাবে কী করতে হবে? 

– বইয়ে লেখা আছে আসুভে আজ রাত ঠিক ১২ টায় ঐ মেয়ে মানে সুমুর শরীরে প্রবেশ করবে। আজ কিন্তু আবার অমাবস্যা। অমাবস্যা মানেই কিন্তু সব খারাপ শক্তিদের বলয় বেড়ে যাওয়া। আমাদের কিন্তু খুব সাবধানে থাকতে হবে। 

– তা থাকা যাবে। আসুভেকে ধ্বংস করার জন্য কী কি করতে হবে ? 

– আসুভেকে সুমুর দেহে প্রবেশ করানোর জন্য তান্ত্রিক যোগ্য শুরু করবে। পুজোর আয়োজন করবে। সেই বাড়িটা কিন্ত সব খারাপ আত্মা দারা বেষ্টিত থাকবে। তাই ভিতরে যাওয়াটা একটু কঠিন হবে। রাত যখন ঠিক ১২ টা বাজবে তখন আবহাওয়া পরিবর্তন হয়ে যাবে। আসুভের কাছে ২ মিনিট সময় থাকবে সুমুর দেহে প্রবেশ করার জন্য। এই দুই মিনিটের মধ্যেই আমাদেরকে সুমুকে মেরে টুকরো টুকরো করতে হবে। তারপর তার দেহের রক্তে আংটি ডুবিয়ে সাথে তোমাদের ৪ পুনর্জন্মের রক্ত ঢেলে সেই আংটিটা দিথীকে পড়তে হবে। দিথী মধ্যাঙ্গুলিতে সেটা পড়ার পর পরই আংটি থেকে এক উজ্জ্বল আলো বেড়িয়ে আসবে। আর তখনই আংটিটাকে সেই তান্ত্রিকের দিকে তাক করে ধরতে হবে। আংটির আলো তান্ত্রিককে চিরতরে ধ্বংস করে দিবে আর সাথে সাথে আসুভেও চিরতরে মুছে যাবে ইতিহাসের পাতা থেকে। 

– তান্ত্রিককে কেনো মারতে হবে ? আমাদের তো আসুভেকে মারার কথা। (সামিহা)

– তান্ত্রিকের জীবন রেখার সাথে আসুভের জীবন রেখা জড়িত। যেটা আমরা আগে জানতাম না। এই বইয়ে (আদরি আসুভে বইটা দেখিয়ে) এই বইয়ে আগে থেকেই সবকিছু লেখা ছিলোনা। সময় যত গিয়েছে, লেখা গুলো নিজে থেকেই পাতায় ভেসে উঠেছে। যার ফলে আমরা আগে তান্ত্রিককের জীবন রেখা আর আসুভের জীবন রেখা যে একটাই তা জানতাম না। আগে জানলে তো তান্ত্রিককে মারলেই সব খেলা খতম হয়ে যেতো। 

– তান্ত্রিক তো আসুভেকে বানায়নি। তাইলে তান্ত্রিকের জীবন রেখা আর আসুভের জীবন রেখা এক কী করে হলো ? (কানিজ) 

– তান্ত্রিকের মাধ্যমেই কিন্তু আসুভে এই পৃথিবীতে আবার উন্মুক্ত হতে পেড়েছিলো ঐ বদ্ধ পাথর টা থেকে। পাথরের গাঁয়ে লেখে দেওয়া ছিলো যেই এই পাথর টা ছুবে তার সাথে আসুভের জীবন রেখা মিলিত হয়ে যাবে। আর আসুভেকে জীবন এনে দেওয়ার জন্য সে ততদিন পর্যন্ত জীবিত থাকবে যতদিন না শেষ সময়ে এই বইয়ের মাধ্যমে কেউ সম্পূর্ণ বিষয়টা জেনে যায় এবং তাকে মেরে ফেলে। 

– তারমানে আগে আমাদের সুমুকে মেরে তার রক্তে আংটি ‌ডুবিয়ে তারপর বাকিদের রক্ত মিশিয়ে তান্ত্রিককে হত্যা করতে হবে? (দিথী)

– হ্যা। এরকম টাই করতে হবে। 

– আচ্ছা আমাকে বইটা দাও। 

– কী করবা ? 

– দেও আমাকে, আমি একটু পড়ে দেখবো। 

– আমাদের সবটুকু পড়া শেষ হয়নি তো। 

– আমি বাকিটা পড়ে তোমাদের বলে দিবোনে। বইটা আমাকে দাও। 

তানিয়া বইটা বন্ধ করে তা দিথীর হাতে দিয়ে দেয়। দিথী বইটা নিয়ে চেয়ার থেকে উঠে চেয়ার টা হাত দিয়ে টেনে তার পড়ার টেবিলের সামনে রাখে। বইটা পড়ার টেবিলে রেখে চেয়ারে বসে বইটা মনযোগ দিয়ে পড়তে থাকে। তানিয়া, কানিজ, সামিহা দিথী এমন অস্থিরতার কিছুই বুঝে উঠতে পারেনা। তারা আবার নিজেদের মধ্যে কথা বলতে শুরু করে যে কীভাবে কী করবে না করবে। 

দিথী দুই হাত দিয়ে কপাল ধরে পড়ায় মনোযোগ দেয়। পুরোনো বইটার কাগজ গুলোও বেশ পুরোনো। রক্ত লাল অক্ষর গুলোকে একদম মস্তিকে খোদাই করে রেখে দেওয়াতে মশগুল হয়ে যায় সে। 

 

____

 

নীলগিরি জঙ্গলের মাঝের সেই বাড়িটা। যেটা আগে তাসনুবার শ্বশুর বাড়ি ছিলো। আকাশ পরিষ্কার হওয়ায় রোদ উঠোনে এসে পড়েছে। ঘরে তান্ত্রিক আজ রাতের পুজার প্রস্তুত নিচ্ছে। ঘরের কিছুটা সাইডে একটা টিউবওয়েল পাড় আছে। সেখান টায় সুমুকে গোসল করাচ্ছে হনুফা। কলাপাতার পর্দা দিয়ে ঘেড়া সেই টিউবওয়েল পাড়টা। চারপাশের গাছপালা থেকে নানা পাখির ডাক ভেসে আসছে। 

 

সুমুর চোখে পানি। সে কাঁদছে। তান্ত্রিককের কাছ থেকে আজ সে জানতে পেরেছে যদি আসুভে তার দেহে প্রবেশ করে ফেলে সে আর কখনো স্বাভাবিক মানুষ হতে পারবেনা। এখনকার সব ঘটনা তার মস্তিষ্ক থেকে মুছে যাবে। তার মস্তিষ্ক চলে যাবে আসুভে নামের এক খারাপ আত্মার দখলে। চিরকাল এভাবেই এই অনন্ত অসীম বিশ্বে সে এক খারাপ আত্মার দেহ হিসেবেই রয়ে যাবে। হনুফা, সুমুর মাথায় পানি ঢেলে তাকে গোসল করাতে থাকে। সুমুর বুকের ভিতর টা খাঁ খাঁ করে উঠছে। সে কী আফাজকে একবার শেষ চোখের দেখা দেখতে পারবেনা! আফাজের মায়ায় সে কেনো জড়ালো। বিচ্ছেদের সুর এতোটা কষ্টদায়ক হয়! তার ভিতর টা যে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছে। প্রথম দেখায় ভালো লাগা থেকে ভালোবাসা। সবটুকুই এক নিমিষে শেষ হয়ে যাবে! আফাজ তার প্রথম ভালোবাসা ছিলো। প্রথম আবেগ ছিলো!

সুমু হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। তার মন বলছে এক ছুটে আফাজের কাছে চলে যেতে। এই পৃথিবীর সবকিছু উপেক্ষা করে আফাজের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে চিৎকার করে বলতে ‘ ভালোবাসি, ভীষণ ভীষণ ভালোবাসি ‘ 

 

সুমুর হাউমাউ কান্না ঘর থেকে শুনতে পায় তান্ত্রিক। বেশ অবাক হন তিনি। সুমু কেনো কাঁদছে? তার তো আরো খুশি হবার কথা। সে অবিনশ্বর শক্তি পাবে। মৃত্যুকে হার মানিয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে। তাও কেনো কাঁদছে ও? 

তখনই হঠাৎ ঘরে প্রবেশ করে লায়লা। হাতে খাবারের বাটি। লায়লাকে দেখেই তান্ত্রিক বলে উঠে,

– তুই ? 

– হ আমি। খাওন নিয়া আইছিলাম সুমু আফার লাইগা। 

– সুমু গোসল খানায় আছে। গোসল করছে। 

– আইচ্ছা আমি তাইলে তারে দেইখা আহি। 

– কী দেখতে যাবি তুই ? 

– ভালো মতো গোসল করতাছে কী না। দরকার পড়লে আমি একটু শরীর ঘইসা দিমু। 

– হ্যা দে। আজকের পর থেকে আর খাবার আনতে হবে না তোকে। তুই তোর সোনাদানা আজ রাতের পর পেয়ে যাবি। 

– হাচা কইতাছেন! 

– হমম। যা গিয়ে সুমুকে ভালোভাবে গোসল করিয়ে দে। 

– আইচ্ছা। আমি অহনি যাইতাছি। 

সুমু এক ছুটে ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়। হাতের টিফিন বাটিটাও সাথে করে নিয়ে যায়।  তান্ত্রিক আবার সামনে ফিরে তার জোগাড়,যন্ত কতদূর এগুলো তা পরখ করতে থাকে। 

 

লায়লা বারান্দা থেকে নেমে এগিয়ে যায় সেদিকে। সুমুর কান্নার আওয়াজ তার কানে এসে পৌঁছায়। তবে তাতে সে কোন রিয়েক্ট করে না। কলাপাতা সড়িয়ে ভিতরে প্রবেশ করে সে। সুমুর পাশে গিয়ে বসে। সুমু লায়লাকে দেখে তাকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকে। লায়লা তৎক্ষণাৎ কিছু বলেনা। হনুফার দিকে তাকিয়ে দেখে তার মুখেও বিষন্নতার ছায়া। আজকের পর থেকে হনুফাও আসুভে আত্মার বসে চলে যাবে। সব স্বাধীনতা চলে যাবে তার। 

লায়লা সুমু্কে তার কোল থেকে উঠায়। চারপাশে তাকিয়ে দেখে কেউ আছে কি না। তারপর কিছু একটা বলা শুরু করে। 

 

_____

 

রাতুল মায়াদের রুম। রাতুল ঘরের দরজার সাইডে আয়না ঝুলিয়ে সেখানে দেখে দেখে মাথায় চুল কালো করছে। পিছনে বিছানায় বসে আছে মায়া। বাইরের আবহাওয়া এখন খানিকটা মেঘাচ্ছন্ন। একটু আগে অবশ্য ভালোই রোদ ছিলো। ঘরের পাশে নিমগাছ থাকায় ঘরটা এমনিতেই ঠান্ডা। তারউপর শীতকাল চলতেছে আবার বৃষ্টিও হচ্ছে। ঘরের অবস্থা ডিপ ফ্রিজের মতো হয়ে যাচ্ছে প্রায়। মায়া বিছানায় হেলান দিয়ে বসে মা মেলে দিয়ে আছে। তার পেট ফুলেছে বইকি। ৬ মাস চলছে। কিছুদিন পরই নতুন অতিথি আসতে চলেছে এই মাষ্টার বাড়িতে। মায়া কাঁথাটা নিজের উপর টেনে নিয়ে রাতুলকে বলে,

– রিয়াদকে সকালে নাস্তা দিছিলা ? 

– হ্যা দিছি তো। খায় তারপর থানায় গেছে। 

– আমার সারাদিন এভাবে বসে থাকতে ভাললাগে না। একটু ঘুরতেও নিয়েও যাও না‌।

– এই অবস্থায় কোথায় ঘুরতে যাবা। আর বাইরেও তো আবহাওয়া তেমন একটা ভালো না। আমাদের কুট্টুস আসুক, তারপর তিনজন মিলে একসাথে ঘুরতে যাবো। 

– হমম। ততদিন আমার এভাবে বসে থাকতে থাকতে পিঠ-কোমর এক হয়ে যাক। 

– হবেনা হবেনা। আমি আছি। মাঝে মাঝে স্কুল মাঠ থেকে ঘুড়িয়ে আনবো তোমায়। এখন তো বৃষ্টি হইছে বলে একটু কাঁদা। বৃষ্টি কমুক। রোদ যেদিন ভালো উঠবে ঐদিন নিয়ে যাবো। 

– তোমার সপ্তাহে সপ্তাহে এতো চুল কালি করতে হয় কেনো। দাড়িও এতো তাড়াতাড়ি বড় হয় যায়। 

– দাড়িটা আজকে সেভ করবো নাকি?

– করলে করো। মুখের দাড়ি তো কালো না, সাদা সাদা হয়ে বের হচ্ছে। দাড়ি রাখলে ঐটাকেও তখন কালি করতে হবে। 

– বয়স কী আর কম হইলো। চুল-টুল সব পেকে যাচ্ছে। 

– তাই বলে এভাবে! সপ্তাহে তোমার একবার করে কালি করতেই হয়। আমার বাবা এমন চুল কালি করতো সপ্তাহে সপ্তাহে। তুমিও কিনা তার জামাই হয়ে এমন সপ্তাহে সপ্তাহে কালির দোকান নিয়ে বসো। 

– তোমার বাবার বয়স কতো। 

– আমি কি সঠিক টা জানি নাকি। হবে ৪৬-৪৭। 

– তাইলে তোমার বাবা আমার থেকে ১ বছরে বড়। 

– মানে ? 

– আমার বয়স ৪৫। 

– হমম। তুমি বললা আর আমি বিশ্বাস করে নিলাম। 

– সত্যি আমার বয়স ৪৫। (পিছনে ফিরে) এইজন্য তো সপ্তাহে একবার কালি করতে হয়। 

– তাইলে আমার বয়সও ৫০। তোমার থেকে আমি ৫ বছরের বড়ো। হুঁ,,

– আরে আমি মজা করতেছিনা। সত্যি আমার বয়স ৪৫। 

– আমিও মজা করতেছিনা। আমার বয়সও ৫০। 

– তোমার তো হবে ২১ নাইলে ২২। (সামনে আয়নার দিকে ফিরে) আমার আসলেই ৪৫। তুমি চাইলে আমার বার্থ সার্টিফিকেট দেখতে পারো। 

– রাতুল তুমি সিরিয়াস! তোমার ৪৫ বছর কিভাবে হয়। তোমার বয়স তো ৩০-৩২। মজা করিওনা একদম। 

– আমি সিরিয়াসলিই বলতেছি। তোমার সাথে মজা কেনো করতে যাবো। আমার বয়স আসলেই ৪৫। 

– তোমার জন্ম সাল কতো? 

– ১২ই জুলাই ১৯৭৫। 

– রাতুল সত্যি সত্যিই তোমার ৪৫ বছর বয়স ? 

– আরে বাবা হ্যা। সত্যিই ৪৫। 

– তাইলে রিয়াদের বয়স কতো ? ওর তো ২৫-২৬ হওয়ার কথা। 

– হ্যা ওর ২৫। 

– তোমার ৪৫ ওর ২৫। মানে টা কী। দুইজনের বয়সে ২০ বছরের পার্থ্যক্য ? 

– ও আমার নিজের ভাই না। 

কথাটা শোনা মাত্রই যেন মায়া আকাশ থেকে পড়লো। তার চোখ গুলো বড় বড় হয়ে যায়। উৎসুক,উৎদিপ্ত হয়ে সে বলে,

– রিয়াদ তোমার আপন ভাই না ? 

– না। ওকে মা-বাবা এতিম খানা থেকে দত্তক নিয়েছিলো। 

– রাতুল তুমি আজকে কী মুডে আছো বলোতো? একটু আগে বললা তোমার বয়স ৪৫, এখন আরো বলতেছো রিয়াদ তোমার ভাই না। সকাল বেলা উঠে চা বেশি খেয়ে নেশা করে ফেলেছো নাকি।

– সত্যিই রিয়াদ আমার ভাই না। আমি হওয়ার পর থেকে আর মা-বাবার কোন সন্তান হয়নি। কিন্তু তারা খুব করে একটা ছেলে চাইছিলেন। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে জানায় আমার মায়ের শরীরে এক কঠিন রোগ বাসা বেঁধেছে। আগে কম ছিলো, ধীরে ধীরে বেড়ে যাওয়ার আর সন্তান নিতে পারবেন না তিনি। তাই পড়ে তখন বাবা-মা গিয়ে রিয়াদকে এতিম খানা থেকে দত্তক নিয়ে আসে। তখন রিয়াদের বয়স ৩ কী ৪ হবে। তাই ওর ছোট বেলার কথা মনে নেই। বাবা চেয়েছিলো আমাকে শিক্ষক বানাবেন আর আমার ছোট ভাইকে পুলিশ বা আর্মি। পরে মায়ের অসুখ টার জন্য আর সন্তান না নিতে পেরে রিয়াদকে নিয়ে আসেন। আর ওকে ওভাবেই গড়ে তুলেন যেন তাকে পুলিশ করতে পারেন। আমার বাবা গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তার থাকা অবস্থাতেই আমি ২২ বছর বয়সে টিচার হিসেবে স্কুলে যোগ দেই। আর তখন থেকে এখন পর্যন্ত এই স্কুলেই আছি। চাকরির বয়স আর কতো হলো (হাতের আঙ্গুলে গুনে গুনে) ২৩ বছর। ২৩ বছর হলো আমার এই চাকরির। 

– রিয়াদ জানেনা এই কথা গুলো ? 

– না। তুমি ওকে বলিও না আবার। খুব ছোট বেলায় ওকে নিয়ে আসছিলো তাই ওর এই কথা মনে নাই। ও জানে যে আমিই ওর আপন ভাই। তুমি বলতে যাইয়ো না এইসব।

– তোমার বয়সের রহস্য কি ? তুমি তো তাইলে আমার বাবার বয়সীই হলে বলা যায়। তুমি বাবার সাথে বিয়ে করলে আজ আমার মতো একটা মেয়ে থাকতো তোমার। 

– ছেলেও থাকতে পারতো। কিন্তু আগে এই বিয়ে সাদিতে আমার মন বসতো না। ভাবতাম বিয়ে করে কী হবে। এমনিই জীবন কাটায় দিবো। 

– তাইলে আমাকে কেনো বিয়ে করলা ? 

– আরে রাগ করতেছো কেনো। আগে কী আর ভালোবাসা বুঝতাম! বাবা-মা ছোট থেকে ঘর বন্দি করে মানুষ করেছে। মেয়ে মানুষ দেখলেই আগে ভয় পাইতাম। আর বিয়ে মানুষ কেনো করে তা আমি এই স্কুলে চাকরি নেওয়ার ৫ বছর পর জানতে পারছি। বাবার স্কুলে কোন মেয়ে শিক্ষক ছিলো না। স্কুল-বাড়ি ছাড়া আর কোথাও আমার পায়ের ধুলা পড়তো না। বন্ধু বান্ধব ও ছিলোনা আমার। বলতে পারো আমার বিকাশ হইছে দেরি করে। এইজন্য বিয়েটা করতে এতো দেরি হয়ে গেছে। 

– তাইলে তোমাকে দেখতে এতো কম বয়সী লাগে কেনো ? আমার তো এখনো বিশ্বাস হচ্ছেনা যে তোমার বয়স ৪৫। লাইক সিরিয়াসলি! 

– শিউলি চাচিকে দেখোনা। তারও তো বয়স হইছে। কিন্তু তাকে আর তার মেয়ে নিপাকে পাশপাশি দাঁড়ালে যে কেউ বোন ভাববে। এমনকি ঐযে শাহারিয়া আছেনা। ওকে আর ওর এই মাকে পাশপাশি দাড়ায় দিলে তুমি বলবা শাহারিয়া বড় আর শিউলি চাচি তার ছোট বোন। অনেকেরই শরীর বয়সের সাথে সাথে তাল মিলায় না। আবার অনেক কে দেখবা বয়স ২০ কিন্তু দেখতে ৪ বাচ্চার বাপের মতো লাগে। আমার খালি এই দাড়ি, চুল গুলাই বয়সের সাথে গেছে। তাছাড়া বাকি সব এখনো জোয়ানই আছে। সাথে ঐটাও। হে হে হে। 

– চুপ। আউল-ফাউল কথা খালি‌‌।

– আচ্ছা বাদ দেও এসব। গোসল করবা নাকি আজকে? বৃষ্টি তো নাই। (দরজার দিকে উঁকি দিয়ে) অবশ্য আকাশ একটু মেঘলা।

– টিউবওয়েল এর পানি অনেক ঠান্ডা। যেদিন রোদ উঠবে ঐদিন গোসল করবো। 

– আমি পানি গরম দিতেছি তাইলে। কালকেও গোসল করোনাই‌। এখন তোমাকে সর্বোচ্চ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। দুই দুই দিন গোসল না করে থাকা যাবেনা। শোনো নাই ডাক্তার আপা কী বলছিলো ? গরম পানি দিয়ে হইলেও দুইটা ডুব দেওয়ায় দিতে‌।

– এখন তুমি আবার গরম পানি করতে যাবা! 

– নিজের বউয়ের জন্যই তো করতে যাচ্ছি। এতে আরো সওয়াব বাড়বে আমার। 

– হমম। বউ না মেয়ে। সময়মতো বিয়ে করলে তো আমার বয়সী মেয়ে থাকতো একটা। 

– যা গেছে বাদ দেও না। আমি যদি না বলতাম তাইলে কি তুমি জানতে পারতা আমার বয়স ৪৫ ? বলছি, এখন এইটা নিয়ে খোটাখুটি শুরু। 

– আচ্ছা আর খোটা দিবো না। তোমার চুল কালি শেষ হইলে তারপর আমাকে নিয়ে যাইয়ো। রান্না-বান্নাও আজ বাকি। 

– আমি সুপার ম্যানের মতো সব সেকেন্ডের মধ্যে করে ফেলবো। তুমি খালি পায়ের উপর পা দিয়ে খাবা আর ঘুমাবা। 

– এরকম বর কয় জনের কপালে জুটে! 

– কিরকম।

– এইযে এতো কেয়ারিং, এতো দেখভাল করে। আমার বান্ধবী গুলার বর তো ওদের কে দিয়ে মাঠে পর্যন্ত সেচ দেওয়ায়। আর এদিকে আমি, বসে থাকে থাকে বিছানা গরম করতেছি। 

– সব ছেলেই কী এক হয় নাকি। কিছু কিছু আলাদাও হয়। 

– আর আমি সেই আলাদা স্পেশাল একজনকেই পাইলাম।

– বটে বটে। স্পেশালই পাইছো! হা হা হা। 

রাতুলের সাথে সাথে মায়াও হাঁসতে থাকে। দুইজনের মাঝে মনের মিলটা বেশ দারুন ভাবেই হয়েছে বলা যায়। বাইরের আকাশের মেঘ প্রায় কেটে গিয়েছে। রোদ পড়তে শুরু করেছে উঠোনে। আঙিনার রশিতে মেলে দেওয়া কিছু কাপড়। নিচে ৩-৪ টে হাঁস দল বেঁধে প্যাক-প্যাক করতে করতে চলে যায় পুকুরে যাওয়ার জন্য। 

 

____

 

কাঠের বাড়িটার বাইরে কিছু ছোট বাচ্চা খেলা করছে। এদিকটা সমুদ্র থেকে দূরে হলেও বালূ দিয়ে ভর্তি। ছোট বাচ্চারা ফুটবল খেলছিলো। রোদ উঠেছে বেশ। সূর্যের তেজে গাঁয়ের ঘাম ছুটে যাওয়ার উপক্রম।

 

নিপা কাপড় গুছাচ্ছে। রায়হান ঘরে প্রবেশ করলো। এগিয়ে গিয়ে বিছানায় বসলো। নিপার কাপড় গোছানো দেখতে থাকলো। নিপা ভাঁজ করা কাপড় ব্যাগে রাখতে রাখতে বলে,

– এখান থেকে কী আবার হোটেলে যাবো। 

– হ্যা। ওখান থেকে বাকি ব্যাগ নিয়ে ফিরে যাবো বাসা। দুপুরের বাস। 

– এই শার্টটায় তো কাল ময়লা ভরাইছো। এইটা কী করবো। 

– আমাকে দাও এই বাসার লোকদের দিয়ে দেই। ওরা পড়বে। 

– কত দিয়ে ভাড়া নিছো এইরুম। 

– এইটার ভাড়া বেশিই পড়ছে বলা যায়। তবে হোটেলের থেকে বেশি না। কাঠের বাসায় সমুদ্র সৈকতের পাড়ে থাকার মজা হোটেলের ইট পাথরের দেয়ালের মাঝে পাবানা। তাই এই ফ্যামিলি বাসা ভাড়া নিছি। (একটু থেমে) ওরা খাইতে ডাকতেছে। চলো গিয়ে খেয়ে নেই। তারপর বেড়োবো। 

– বাসায় ফোন দিয়ে জানাইছো? 

– আল্লাহ,,! (বলেই মাথায় হাত দিয়ে দেয় রায়হান) 

– কী হইলো। 

– আমার ফোন। 

– হ্যা ফোন। কি হইছে ঐটার।

– আমার ফোনটা আমি কোথায় ফেলে আসছি।

– হোটেলে রাখে আসছো নাকি আবার ? 

– না না। আমি ঐটা নিয়ে পাহাড়ের দিকে গেছিলাম কিন্তু,,,,,,,

– কিন্ত কি ? 

– ঐটা মনে হয়ে পাহাড়েই আছে। 

– কী বলো। তাঁবু, ব্যাগ সব তো আমাদের কাছে। (ব্যাগ গুলো দেখিয়ে) এইযে। ফোনটাও এগুলোর ভিতরেই আছে হয়তো।

– না না। ফোনটা আমার শার্টের পকেটে ছিলো। (একটু থেমে) ও ও ও। এইবার বুঝছি। 

– কী।

– আমি যখন ডিগবাজি দিয়ে এগিয়ে এসে গুলি ছুড়েছিলাম তখন হয়তো ঐটা আমার পকেট থেকে ঐ বন গুলোর মাঝের সড়ে গেছে।

– কী বলো কী! ফোন ফেলে আসছো ওখানে ? তাড়াতাড়ি চলো। ফোনটা কেউ নিয়ে যাবে নাকি আবার। তুমি তো বললা কেউ ঐ যায়গাটা চিনেনা। হয়তো কেউ নিয়ে যায় নি। চলো।

– থাক। বাদ দাও। নতুন ফোন নিয়ে নিবোনে। 

– নতুন ফোন নিবা মানে। এইটা কতো দামী ফোন ছিলো। আর সেটা না নিয়েই চলে যাবা! চলো যায় নিয়ে আসি। (ঘড়ির দিকে তাকিয়ে) বাসে উঠতে এখনো ৩ ঘন্টা সময় আছে। 

– আরে কিছু হবেনা। আরেকটা কিনে নিবো। এতো জার্নি করতে ভালো লাগে না। 

– বাসায় বাবাদের ফোন দিয়ে জানিয়ে দেও। আমার ফোন টা নাও‌।

– তোমার এই নতুন ফোনে তো আমার নাম্বার আর তোমার বাসার নাম্বার ছাড়া আর কারো নাম্বার নাই। 

– তোমার বাবার নাম্বার তোমার মুখস্থ নাই? 

– না মানে, মুখস্থ করা হয়নি আরকি।

– মানুষ না কী তুমি! আমার বাড়ির সবার নাম্বার আমার মুখস্থ। আর তুমি তোমার বাবার নাম্বার টাও মুখস্থ রাখোনাই।

– বাদ দেও। চলো খেয়ে নেই। ওরা আর কতখন ধরে খাবার নিয়ে বসে থাকবে। চলো। 

– কী রান্না করছে ? 

– সামুদ্রিক মাছ আর ওদের একটা আলাদা নিজস্ব একটা ডিশ। ঐটার নাম আমি জানিনা। তবে দেখলাম বাশের সাদা নরম অংশ দিয়ে বানানো।

– চলো, দেখি কেমন। 

– ব্যাগের চেইন লাগায় যাও। বাসায় ছোট্ট বাচ্চা আছে। এখানে আসে টানাটানি করবে। 

– তোমার মতো দুষ্ট নাকি ওরা। 

– এইযে খালি দুষ্ট, দুষ্ট বলো বলেই আমি দুষ্টামি করি।

– তাইলে এরপর থেকে ভালো বলবো। দেখি কতটা ভালো হইতে পারো। 

– ঠিক আছে দেখিও। আসো এখন। 

নিপা ব্যাগের চেইন লাগিয়ে সেটার হাতল ধরে বিছানা থেকে নিচে নামিয়ে রাখে। রায়হান বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়। নিপা ব্যাগ রেখে আসে। রায়হান তার কোমরে একহাত নিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। নিপা হাত ছাড়িয়ে ঠাঁস করে রায়হান পিঠিতে মারে। রায়হান পিঠি ঘষতে ঘষতে নিপার সাথে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। 

 

_____

 

দুপুর বেলা। মেম্বার বাড়ির আঙিনায় বসে আছেন শিউলি বেগম। একটা টুলে বসেছেন তিনি আর তার পিছনে একটা চেয়ার নিয়ে বসেছে ফুলমতি। ফুলমতি শিউলি বেগমের মাথায় তেল মালিশ করে দিচ্ছে। আকাশের রোদের ঝিলিক ভালো রকমই পড়েছে। শিউলি বেগম গোসল করে এসে প্রায় প্রতিদিন এভাবে তেল মাখিয়ে নেন চুলে। ফুলমতিও তেল দিয়ে দেয় প্রতিদিন। বাড়িতে এখন শুধু শাহারিয়া আছে। সে ঘরে কী যে করছে কে জানে‌। মতিন মেম্বার গেছেন গন্জে। লায়লাও বাড়ি নেই। দিথীও গেছে তার বাবার বাসায়। বেশ ফাঁকা আজ বাড়িটা। 

 

গেইট দিয়ে প্রবেশ করলো একটা মেয়ে। বয়স ২০ কী ২১। চোখে হালকা ফ্রেমের চশমা। পড়নে লালচে খয়রি রঙয়ের একটা থ্রীপিস। গাঁয়ের রং উজ্জ্বল ফর্সা। মুখের আকৃতি গোলাগাল। মেয়েটা হেঁটে এসে আঙিনায় দাঁড়ায়। শিউলি বেগম সেদিকে খেয়াল করেন নি। তিনি মাথা নিচু করে আধখোলা চোখে ফুলমতিকে বলছিলেন,

– এইপাশটায় একটু ভালা কইরা তেল দে। 

মেয়েটা এক হালকা মৃদু গলায় বলে উঠে,

– আসসালামুয়ালাইকুম। 

মেয়েটার গলার আওয়াজ শুনে ফুলমতি আর শিউলি বেগম সেদিক মুখ তুলে তাকায়। মেয়েটাকে আপাদমস্তক দেখে তারা। মেয়েটাকে দেখে এই গ্রামের কেউ বল তো মনে হচ্ছে না। শিউলি বেগম বলেন,

– ওয়ালাইকুমুস সালাম। 

– আচ্ছা এটাকি মেম্বার বাড়ি ? 

– হ। এইডা মেম্বার বাড়ি। আমি মেম্বারের বউ। তুমি কেডা ? কাউরে খুজতাছো ? 

– আ, আমার নাম শিমলা আক্তার মোনালিকা। 

– শিমলা মইচ! 

– না শিমলা আমার নাম। 

– কার মাইয়া তুমি ? তোমার আব্বার নাম কী ? এই গ্রামে তোমারে আগে দেখছি বইলা তো মনে হয় না। 

– জি আমি এই গ্রামে নতুন এসেছি। আমার বাবাকে আপনি চিনবেন না। উনি এই গ্রামের না। 

– ওহহ। তুমি কী আমার পোলার লগে দেহা করতে আইছো ? 

– জি আমি কারো সাথে দেখা করতে আসিনি। (একটু ইতস্তত গলায়) আমি প্রাইভেট পড়াতে চাই। এই বাড়িতে কী এমন কোন ছোট বাচ্চা বা ছেলে আছে ? 

– আমাগো বাড়িত তো কোন গুড়াগাড়া নাই। অবশ্য পোলা মাইয়া বিয়া দিছি। ওগো গুড়াগাড়া হইলে তহন পড়াইতে আইয়ো। 

– আচ্ছা তাইলে কাজের লোক, কাজের লোক লাগবে কী! আমি ঘর মোছা, কাপড় ধোঁয়া, রান্না সব পাড়ি। 

– না না। তাও লাগবো না। আমার দুই মাইয়া ফুলমতি আর লায়লা আছে। 

– আচ্ছা তাইলে বাগানের মালি! আপনাদের পিছনের বাগানের মালি হিসেবে আমাকে রাখতে পারেন। আমি বাগানের দেখাশোনা ভালো পাড়ি। 

– বাগান আমি নিজেই দেইখা রাখি। (একটু থেমে অবাক কন্ঠে) তুমি কাম খুজতাছো ক্যা। তোমারে দেইখা তো ভালো ঘরের শিক্ষিত মাইয়া মনে হইতাছে। 

– জি মানে, আমার কাজের দরকার ছিলো। যদি আমাকে কোন কাজ দিতেন, খুবই উপকৃত হতাম। 

ফুলমতি তা শুনেই শিউলি বেগমের কানের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলতে থাকে,

– চাচি, অপরিচিত কাউরে রাইখেন না। এমনিতেই গ্রামের পরিস্থিতি ভালা না। আপনি কন তারে ইসহাক চাচা নাইলে আরো কারো বাড়ি গিয়া কাম লইতে।

শিউলি বেগম ফুলমতি কথা গুলো শুনে সোজা হয়ে বসে মেয়েটাকে বলতে থাকে,

– তোমার নাম ডা জানি কী কইলা! 

– শিমলা আক্তার মোনালিকা। 

– ওহ, মোনালিকা। তুমি এক কাম করো। দক্ষিণ পাড়া চইলা যাও। একটা বড় আম বাগান পাইবা সেইহানে। আম বাগানের পাশে এক বড় বাড়ি আছে। ঐহানে গিয়া কও। ওরা তোমারে কাম দিতে পারবো। 

– জি আপনাদের এখানে কোন কাজ পাওয়া যাবে না ?

– না আমাগো বাড়িত এমনিই অনেক লোক আছে। এহন আপাতত কোন কামের লোকই লাগবো না। 

– ওহ,, আচ্ছা ঠিক আছে। (বলেই মেয়েটা চলে যেতে হবে থাকে। শিউলি বেগম হাঁক দিয়ে বলে উঠেন,

– যদি পথ ভুইলা যাও তাইলে রাস্তার যে কাউরে জিগায়া নিও তে ইসহাক চাচার বাড়ি কোনডা। ওরা দেহাইয়া দিবো। 

– জি আচ্ছা। ঠিক আছে। 

মেয়েটা মুখ গোমড়া করে চলে যেতে থাকে। যাওয়ার সময় এক ছোট্ট নজরে পুরো বাড়িটাকে আবারো ভালোভাবে পরখ করে নেয়। চলে যায় তারপর।

শিউলি বেগম সেদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে ফিরিয়ে ফুলমতিকে বলেন,

– এতো সুন্দর মাইয়া কাম খুজতে আইছিলো ক্যান! 

– আমিও তো বুঝতাছিনা। আর গ্রামে দেখছেন না একের পর এক অঘটন ঘটতাছে। এমন অপরিচিত কাউরে কাম দেওয়া ঠিক না। 

– হ। আইচ্ছা বাদ দে। তুই এহন গোসলে যা। তোর চাচায় খাইতে আইবো একটু পর। আমি এহানে বইয়া আরেকটু রোদ তাপি। দুইদিন এই মরার বৃষ্টি ডার লাইগা একটু রোদও তাপতে পারি নাই। 

– আইচ্ছা চাচি। আমি গেলাম তাইলে। তেলের বোতল ডা নিয়া যামু!

– হ নিয়া যা। আর শুন, তোর শাহারিয়া ভাই রে কইস তো গোসল দিবো নাকি। দিলে তাড়াতাড়ি গোসল কইরা উঠতে কবি। 

– আইচ্ছা চাচি ঠিক আছে। 

ফুলমতি চেয়ার থেকেই উঠে তেলের বোতল হাতে চলে যেতে থাকে। শিউলি বেগম টুল থেকে উঠে চেয়ারে বসেন। পা উঠিয়ে টুলে রাখেন। চেয়ারে হেলান দিয়ে পা নাচাতে থাকেন। গুন গুন করে গান ধরেন,,

‘ খাইরোন লো,, তোর লম্বা মাথার কেশ,

 চিরোল দাঁতে হাসি দিয়া পাগল করলি দেশ 

 খাইরোন লো,,,! হা হা হা!! আমার কোকিল কন্ঠি গান শুইনা না আবার আমার ময়না পাখিডা পুকুরে ঝাপায়া পড়ে! হা হা হা!! ‘

 

চলবে ,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

 

গল্প :: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন:: ২(মুখোশ)

পর্ব :: ৬৮

লেখক :: মির্জা শাহারিয়া

 

পড়ন্ত বিকেল। আসরের আযান হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। আকাশ কিছুটা পরিষ্কার। সূর্যের আলো তেমন একটা নেই। খাঁন বাড়ির সামনের রাস্তা। একটা সাইকেল চলে গেলো বেল বাজাতে বাজাতে। রিয়াদ বাইক নিয়ে এসে থামলো খাঁন বাড়ির বড় গেইটের সামনে। বাইকটাকে সাইডে স্ট্যান্ড করে বাইক থেকে নামলো। শরীরে পুলিশি পোশাক। বড় গেইটের সাইডে ছোট একটা গেইট আছে। যেটা দিয়ে বাড়ির লোকেরা আসা-যাওয়া করে। রিয়াদ বাইকের চাবিটা হাতে নিয়ে চলে যায় সেদিকে। 

গেইটে শব্দ করতেই গেইট খুলে দেয় দারোয়ান রহিম চাচা। রিয়াদ ভিতরে প্রবেশ করে। চারপাশ দেখতে থাকে। এই গেইট দিয়ে প্রবেশের পর কিছুটা হেঁটে ফাঁকা যায়গাটা পেড়িয়ে অন্দরমহলে যেতে হয়। রিয়াদ ভিতরে আসার পর পরই দাড়োয়ান দরজা লাগিয়ে দেয়। রিয়াদ পিছনে ফিরেই দাড়োয়ান রহিম চাচাকে দেখে। রহিম চাচা দরজা লাগিয়ে দিয়ে এসে তার চেয়ারে বসেছে। রিয়াদ এগিয়ে যায়। গিয়ে রহিম চাচার সামনে দাঁড়ায়। বলে,

– বাড়িতে এখন কে কে আছে ? 

– একটু আগেই স্যার আর সোনালী আফায় আইছে। লগে রাফসান ভাইও আছিলো। 

– স্যার টা কে ? নজরুল চাচা ? 

– হ। হেরা আইছে। শাহেদ স্যারে আহেনাই। হেয় ছাড়া বাকি সবাই বাইত্তে আছে। 

– সে কোথায়? 

– মনে তো হয় দিনাজপুরেই আছে। হেয় রাইতে বাড়ি আহে। 

– মানে প্রতিদিনই রাতে বাড়ি ফিরে ? 

– হ। রাইতে আহে প্রতিদিন। 

– তার ছেলে, সাদিক। ও কী বাসায় না বাইরে ? 

– সাদিক ভাইয়ায় বাড়িতেই আছে। 

– এর পর থেকে কে কোন সময় আসা যাওয়া করে এটার একটা লিস্ট আমাকে দিয়েন। ঠিক আছে ? 

– জে আইচ্ছা।

রিয়াদ ফিরে চলে যেতে থাকে বাড়ির অন্দরমহলের গেইটের দিকে। রহিম চাচা আবার বসে পড়েন তার চেয়ার টায়। রিয়াদ কী জানি মনে করে থেমে যায়। অবাক হয়ে পিছনে ফিরে তাকায়‌। তৎক্ষণাৎ এগিয়ে আসে আবার রহিম চাচার কাছে। রহিম চাচা রিয়াদকে দেখে আবার দাঁড়িয়ে যায়। রিয়াদ হন্তদন্ত হয়ে বলে,

– আচ্ছা যেইদিন খুন গুলা হইছিলো ঐদিন আপনি এখানে ছিলেন ? 

– হ। আমারে তো সবসময় এহানে থাকতে হয়। রাইতের বেলাও এহানে বইসা বইসা ঝিমাই। 

– সেদিন কী অপরিচিত কেউ বাড়িতে আসছিলো ? মানে এমন কেউ যাকে আপনি চিনেননা, বা এই বাড়িতে আগে আসেনি এমন কেউ ? 

– না। ঐদিন তো তেমন কেউরে আইতে দেহিনাই! 

– আচ্ছা ঐদিন দুপুর বেলা, এই ধরেন ১২ টা থেকে ২ টার মধ্যে এই বাড়িতে কে কে এসেছিলো বা কে কে বাহিরে গেছিলো সেটা মনে আছে আপনার ? একটু মনে করার চেষ্টা করেন না কে কে ঐদিন ১২ টা থেকে ২ টার মধ্যে আসা যাওয়া করছিলো? 

– নতুন কেউ তো আওয়া যাওমা করে নাই। তয় প্রতিদিনের লাহান ম্যাডাম বাড়ি আইছিলো ঐসময়। 

– কোন ম্যাডাম ? 

– সুমনা ম্যাডামে। প্রতিদিন হেয় ঐসময় এতিম খানা থেইকা বাড়ি আহে। তয়,,,

– তবে, তবে কী ? 

– তয় ম্যাডামরে ঐদিন একটু আলাদা আলাদা লাগতাছিলো।

– আলাদা বলতে ? 

– ম্যাডাম বাইরে গেলে সবসময় বোরখা পিন্ধা যায়। হেইদিনও গেছিলো, তয় বাড়ি ফিরার সময় তার পায়ে লম্বা লম্বা জুতা দেখছিলাম। আমার যতদূর মনে ফরে আফায় লম্বা জুতা পড়তো না। 

– আপনি তার চেহারা দেখেননি ? 

– চেহারা কেমনে দেখমু কন। ম্যাডামে তো মুহে কালো কাপড় দিতো বোরখার লগে। চেহারা, হাত কিছুই দেহা যাইতো না। 

– লম্বা জুতা মানে হিল জুতা ? হিল জুতার কথা বলছেন আপনি ? 

– হ। ঐ জুতা ডিরে মনে হয় হিল জুতাই কয়। 

– এই তাইলে খুনি ছিলো! আপনি কাউকে না দেখে এমনি এমনিই ঢুকতে দিয়ে দিলেন ? 

– আমি কী করুম কন। ঐসময় তো ম্যাডামের আওয়ার সময় ছিলো। আমি তো ম্যাডাম ভাইবা তারে দরজা খুইলা দিছি। 

– উফফ,, আপনাকে যে এখন আমার কী করতে মন চাচ্ছে না! 

– আমার কী দোষ। আমি তো আমার কাম ডাই করছি খালি। আমি কী আগে দেখছি নাকি যে ম্যাডামের পায়ের লম্বা জুতা। আমি তো হেয় ভিতরে আওয়ার পর দেখছি।

– হইছে থামেন। আর কথা বলে আমার মাথাডা খাইয়েন না। এরপর থেকে ম্যাডাম হোক আর যেই হোক। বোরখা পড়া যেই ঢুকতে চাইবে তার চেহারা দেখে তবে ভিতরে ঢুকতে দিবেন। বুঝেছেন? 

– জে আইচ্ছা। এরপরের থে চেহারা দেইখা ভিতরে ঢুহামু।

রিয়াদ চলে যেতে ধরে। দারোয়ানের কথা গুলা যেনো তার মাথায় রাগ চড়িয়ে দিলো। বোরখা পড়ে আসছে মানেই কী সবসময় একই মানুষ হবে নাকি। অন্য লোকও তো হইতে পারে। রিয়াদ হেঁটে হেঁটে অন্দরমহলের দরজার দিকে যেতে থাকে।

 বাড়ির বাগানের পার্শ্বে যাওয়ার দিকের দেওয়াল। আড়াল হতে দুটো চোখ সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে। রিয়াদ অন্দরমহলে ঢুকে যাওয়ার পর পরই সেই দুই চোখ আবার দেয়ালের আড়াল হতে সড়ে যায়। 

 

রিয়াদ ভিতরে আসে। অন্দর মহলের উপরের ঝাড়বাতিটা যেনো এক টুকরো অতীতকে সাক্ষী করে রয়ে গেছে। অন্দরমহলে কেউ নেই। রিয়াদ হেঁটে হেঁটে এগিয়ে গিয়ে মাঝখান টায় দাঁড়ায়। চারপাশে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে থাকে। দেয়ালে ঝুলতে থাকা রাজ চিত্রকর্ম গুলো বাড়িটাকে আরো উজ্জীবিত করে তুলেছে। সোফা গুলো সাজানো। সোফার বিপরীতে থাকা ডায়নিং টেবিল টাও পরিপাটি করে সাজানো। রিয়াদের কানে শব্দ আসে রান্না ঘরের দিক থেকে। তৎক্ষণাৎ সে ফিরে তাকায় সেদিকে। এগিয়ে যায়। রান্নাঘরের সামনে আসতেই দেখে এই বাড়ির কাজের মেয়ে আঁখি থালাবাসন ধুচ্ছে। রিয়াদ রান্নাঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলে,

– এই বাড়ির বাকি সবাই কোথায় ? 

আঁখি রিয়াদের উপস্থিতি টের পায়নি। তাই হঠাৎ কথায় সে যেন চমকে উঠে। ফিরে রিয়াদের দিকে তাকিয়ে তার নিজের বুকে থু থু দিতে থাকে। রিয়াদ বলে,

– এতো ভয় পাওয়ার কী আছে। তোমাকে তো ধরে নিয়ে যাচ্ছি না। বাড়ির সবাই কোথায় ? (চারপাশে তাকিয়ে) বাড়িটা এমন লাগছে যেনো কেউই নেই। গম্ভীর, গোমট হয়ে আছে। 

– খালাম্মায় উপরের তলায় আছে। ঘুমাইতাছে। 

– আর নজরুল চাচা ? উনি কোথায়? 

– হেয় তো বাড়ি আহেনাই। 

– বাড়ি আসেনাই মানে ? আমি তো একটু আগেই,,,,,,( কথাটা বলতে গিয়েও থেমে যায় রিয়াদ। বেশ অবাক হয় সে।) 

– খালু বাড়ি আহেনাই। রাফসান ভাইজান, সোনালী আফামণি কেউ বাড়িত নাই। শাহেদ খালুও রাতে আইবো। সাথী খালা আর সাদিক ভাইজান ঘুমাইতাছে ঘরে। ডাক দিমু তাগোরে ? 

– না থাক। ডাক দেওয়া লাগবেনা। (বিরবির করে) এই তিনজন তো বলে বাড়ি ফিরলো, তাইলে এই মেয়ে কেনো বলতেছে যে বাড়িতে আসে নাই! 

– কিছু কইলেন! 

– না, তেমন কিছুনা। আচ্ছা তোমার কী কাউকে সন্দেহ হয় ? 

– কীয়ের সন্দেহ ? 

– এইযে খুন গুলো যে হলো। এই বিষয়ে কাকে সন্দেহ হয় তোমার। 

– বাড়ির হগল মানুষই ভালা। হেরা কেন মারতে যাইবো আলিশা আফারে। সবাই উল্টা অনেক আদর করতো তারে। 

– তারমানে বলছো যে খুনি বাইরের কেউ ? 

– এতো নিষ্ঠুর কইরা খুন আমাগো বাড়ির কেউ ক্যান করতে যাইবো! 

– স্বার্থ থাকলে করতেও পারে!

– আমি ঐসব জানিনা। তয় আমার ধারে এই বাড়ির কাউরে সন্দেহ হয়না। আর গেরামের অবস্থা এমনিতেই ভালা না। এই রকম খুন খারাবি আগেও কম হয় নাই। 

রিয়াদ আর কিছু বলে না। বাড়ির সবার মেজাজই দেখি আজ একটু চড়ে আছে। সবাই যেন কোন কিছু নিয়ে বিরক্ত। রিয়াদ চলে যেতে থাকে। যাওয়ার সময় চারপাশে নজর দিয়ে অন্দরমহলকে একবার দেখে নেয়। মনে মনে বলে

‘ কিছু তো আছেই, যেটা আমার অগোচরে হচ্ছে। সেটা কী? বের করতে হবে রিয়াদ, বের করতে হবে ‘

 

_____

 

আফাজ জানালার পাশ থেকে মুখ ঘুড়িয়ে সোজা উপরের সিলিংয়ের দিকে তাকায়। বাইরে সন্ধ্যা নেমেছে। অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। এই রুমটায় সে বড়ই নিঃসঙ্গ, সাথে বুক ভরা অপূরনীয় ব্যাথা, যন্ত্রনা। সবকিছু কেমন যেন বিষাদ হয়ে তার কাছে ঠেকছে। জগতে যেন সে একদম নিঃসঙ্গ, একাকি হয়ে গেছে। মুখ ফিরিয়ে তাকায় দরজার দিকে। না, আজ সে মেয়েটা আসেনি। অন্যান্য দিন তো দরজার পর্দার আড়াল হতে বেশ উঁকি দিয়ে দেখতো তাকে। কিন্তু আজ সেই দরজার আড়ালে কারও পায়ের ছোঁয়া পড়েনি। আফাজ হয়তো এই জন্যই নিঃসঙ্গতা অনুভব করছে। তবে মেয়েটার প্রতি তার কোন টান নেই। উল্টো আরো সন্দেহ হয়। আলিশার মৃত্যুর সাথে মেয়েটা কোনভাবে জড়িয়ে নেই তো?? রইতেও পারে। এই জগতে মুখোশ চেনা যে বড়ই দায়। আফাজ আর ভাবতে চায় না। সে একটু বিশ্রাম নিতে চায়। আলিশার স্মৃতিচারণ করতে চায় স্বপ্নের রাজ্যে গিয়ে। হয়তো দেখা মিলতেও পারে কোন এক রঙিন সূর্যাস্তের! নয়তো আবার আঁধার কালোর বিচ্ছেদ যন্ত্রনা!

 

_____

 

দিথী ঘরে প্রবেশ করে। ঘরে থাকা সবাই যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঘড়িতে সময় রাত ৯ টা। আশপাশের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক বেড়েছে। আকাশ কিছুটা মেঘলা। দিথীকে ঘরে ঢুকতে দেখেই তানিয়া, সামিহা, তার দিকে এক নজর দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিতে যায় তখনই আবার অবাক হয়ে তার দিকে ফিরে তাকায়। আপাদমস্তক দিথীকে দেখে। দিথীকে আজ সম্পূর্ণ আলাদা কেউ একজন মনে হচ্ছিলো, জিন্স, টি শার্ট আর মাথার বিনুনি করা চুল। যেন কোন বিদেশী এক মেয়ের সাজে সেজেছে সে। তানিয়া তো অবাক কন্ঠে বলেই ফেলে,

– দিথী, এভাবে যাবে ? 

– হমম। তোমাদের কতদূর কী এগোলো ? 

– আমাদের কাজ প্রায় শেষ। তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম। 

– সামিহা, ওড়নাটা দে তো। 

সামিহা অবাক চোখ নিয়েই নিজের পিছন থেকে দিথীর রেখে যাওয়া ওড়নাটা তাকে দেয়। দিথী সেটা হাতে নিয়ে তার বুকের উপর দিয়ে নিয়ে গিয়ে কোমর, পিঠ পেচিয়ে এনে আবার কোমরে গুঁজে দেয়। অনেকটা গৃহিণীরা যেমন ভাবে ওড়না পেঁচিয়ে রান্না করতে যায় তেমন। সামিহা এখনো অবাক হয়েই তার দিকে তাকিয়ে ছিলো। তার কাছে যেন অচেনা,অজানা একজন লাগছিলো দিথীকে। দিথী একটা চেয়ার টেনে বসে। তানিয়া বিছানায় থাকা রক্তের শিশি গুলো তার হাতে দেয়। দিথী তা নিয়ে প্যান্টের পকেটে রাখে। তানিয়া সামিহাকে একটা ছুরি দেয়। বলে,

– এটা মন্ত্র পড়া ছুরি। কোন কালো ধোঁয়া তোমাকে আক্রমণ করতে আসলে তুমি এই ছুড়ি দিয়ে সেই কালো ধোঁয়াকে আঘাত করবে। এমন ভেবে আঘাত করবে যেনো সেটা একটা মানুষ। আর দিথী, (একটা ছুরি এগিয়ে দিয়ে) এটা তোমার। তোমার টা বেশি ধারালো। এটা দিয়েই তুমি সুমুর উপর আক্রমণ করবে। আমাদের প্ল্যান হচ্ছে আমি আর সামিহা বাকি আত্মাদের আটকাবো আর তুমি গিয়ে সুমুকে মারবে। তুমি কুংফু, কারাতে জানো। তুমি তাদের একলাই সামলাতে পারবে। আর হ্যা, ১২ টা বাজা মাত্রই তুমি আংটিটা রক্তে চুবিয়ে তান্ত্রিককের দিকে তুলে ধরবে। বুঝতে পেরেছো ? 

– ঠিক আছে। 

– বইয়ের শেষাংশে কী কী লেখা ছিলো ? সারা বিকাল ধরে তো তুমি একলাই পড়লে। আমাদেরকে তো পড়তেই দিলেনা।

– তেমন কিছু ছিলো না। মারার কথাই বলা ছিলো। আর মারার পর রক্ত মাখা আংটিটাকে আগুনে ফেলে দিতে বলছে সেখানে। 

– তাইলে আংটিটা খুলে তুমি আগুনে ফেলে দিয়ো তারপর। 

– আমার কাজ কী ? (কানিজ)

– তুই আমাদের সাথে যাবিনা। তুই বাসাতেই থাকবি। 

– কেনো ? আমিও যাই তোমাদের সাথে। 

– না। দিথী, সামিহা, আমি, আমরা এই বিষয় টার সাথে জড়িত, আমাদের কিছু হওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য, অনেকেই আছে। আমাদের আঘাত শোষণ করার ক্ষমতাও তোর থেকে বেশি। তাই তোকে নিয়ে গিয়ে রিস্কে ফেলতে চাই না আমি। তুই বাসাতেই থাক। আঙ্কেল-আন্টি আছে ওদের দেখে রাখবি। 

– আমিও ওদের সাথে ফাইট করতে চাইছিলাম। 

– বললাম না। তোর জীবনে সংশয় আছে। আমাকে বাঁচানোর জন্য আমার তুষার আছে, দিথীর আছে তার মা, সামিহার আছে তার দাদু। তোর রক্ষার জন্য কিন্তু কোন অলৌকিক শক্তি নাই‌। বিষয়টা বুঝ, ছোট না তুই। 

কানিজ আর কিছু বলেনা। মুখ গোমড়া করে বসে থাকে। দিথী গম্ভীর গলায় বলে উঠে,

– কখন বের হচ্ছি আমরা ? 

– একটু পরই। আমি বইটা আর আংটিটাকে আমার ঝোলায় নিয়ে নেই। তারপর একসাথে বেড়োবো। 

দিথী তার হাতে থাকা সেই লম্বা ছুরি টাকে দেখে। ছুরিটা আলোয় চকচক করে উঠছিলো। ছুরিটাকে তানিয়ার দেওয়া প্যাকেটে ঢুকিয়ে উঠে দাড়ায় সে। কোমরের ভাঁজে ছুরিটা প্যাকেট সহ রেখে ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়। সামিহা দিথীর যাওয়ার পানে চেয়ে থাকে। এই দিথীর আজ সকাল থেকে হলোটা কী! এতো গম্ভীর, চুপচাপ হয়ে থাকতেছে! সামিহা উঠে যায়। তানিয়া,কানিজ কে বোঝাচ্ছিলো যে বাসায় যদি কোনক্রমে কোন আক্রমণ হয় তাইলে কী করা লাগবে সেগুলো। সামিহা তাদের দিকে একবার তাকিয়েই উঠে চলে যায়। 

ঘর থেকে বেড়িয়ে দেখে দিথী বারান্দা থেকে আঙিনায় নেমেছে। উত্তরের ছোট খরের ঘর টার দিকে যাচ্ছে। সামিহাও পিছু পিছু যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। দ্রুত বারান্দা থেকে দৌড়ে গ্রিলের দরজার দিকে যায়। বারান্দা থেকে নেমে আঙিনা দিয়ে ছুট লাগায় সেই ঘরের দিকে। 

 

দিথী খরের ঘরের দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করে। দরজাটা ভিড়িয়ে দেয়। সামিহা এসে দরজার সামনে দাঁড়ায়। নিঃশব্দে দরজার ছোট্ট ফাকা অংশটা দিয়ে ভিতরে তাকায়। দেখে দিথী এক বড় কাঠের চাকু দিয়ে প্রাকটিস করছে। এমন ভাবে চাকু দিয়ে অংগভঙি করছে যেন সে অনেক জনকে মারছে। সামিহা এক নজরে তাকিয়ে থাকে সেদিকে। মনে মনে এই দিথীর সাথে তার শান্ত, সরল দিথীকে মিলানোর চেষ্টা করে। ঘরের দিথী প্র্যাকটিস করতে করতে হঠাৎ একটা সময় বলে উঠে,

– ওখানে দাঁড়িয়ে না দেখে ভিতরে আয়। আমার থেকে কিছু মুভ্স শিখে নে। 

সামিহা যেন চমকে উঠে। সে তাড়াতাড়ি সড়ে যেতে গিয়ে উঁচু কিছুটা পা আঁটকে হুড়মুড়িয়ে পড়ে যায়। দিথী ঘরের দরজা খুলে দাঁড়ায়। উপরে থেকে হাত বাড়িয়ে দেয়। বলে,

– এতো দুর্বল হইলে হবে! আরো শক্ত হইতে হবে। আঘাত করতে শিখতে হবে। উঠ। 

সামিহা দিথীর হাত ধরে না। ভয়ে ভয়ে নিজেই একলা একলা উঠতে থাকে। দিথীকে তার কেনো জানি ভয় লাগছে। দিথীর অনেক কিছুই সে এই বাড়িতে আসার পর জেনেছে। নাইলে যে কেউ বাইরে থেকে তাকে লাজুক আর শান্তশিষ্ট মেয়ে হিসেবেই জানে। দিথী একটা ছোট্ট মুচকি হাসি দিয়ে ঘরে চলে যায়। সামিহা উঠে দাঁড়িয়ে দৌড়ে ছুট লাগায় ঘরের দিকে। আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে কিছুটা। মনে হয় আজও আবহাওয়া তার অন্য রূপ নিয়ে হাজির হবে। 

 

_____

 

শাহারিয়া ঘর থেকে কানে ফোন নিয়ে বেড়িয়ে এলো। কারো সাথে কথা বলছিলো কিন্তু নেট সমস্যার কারণে কথা শোনা যাচ্ছিলো না। শাহারিয়া হ্যালো হ্যালো করতে করতে বারান্দা থেকে আঙিনার নামে। আঙিনার মাঝখান টায় গিয়ে কানে ফোন তুলে আবার হ্যালো হ্যালো করতে থাকে। কিছুটা বাতাস উঠেছিলো। আকাশও ঘন মেঘে ঢেকে যাচ্ছিলো। হঠাৎ বাড়ির কারেন্ট চলে যায়। শিউলি বেগম টর্চ নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ঘর থেকে বারান্দায় বের হন। কারেন্টের বংশকে উদ্দেশ্য করে কয়েকটা গালি ছুড়ে দেন। শাহারিয়া কান থেকে ফোনটা নামায়। কলও কেটে গিয়েছে ততক্ষণে। শিউলি বেগম টর্চ লাইট ঘুড়িয়ে শাহারিয়ার চোখে মারে। শাহারিয়া হাত উঁচিয়ে মুখের সামনে ধরে তা থেকে নিজের চোখ বাঁচানোর চেষ্টা করে। শিউলি বেগমর মুড কিছুটা চড়ে ছিলো এই অসময়ে কারেন্ট যাওয়ার জন্য। তিনি সেই সুরেই শাহারিয়াকে বলেন,

– তুই আঙিনার মধ্যে কী করোস। ঘরে আয়। 

– ফোন দিয়েছিলাম ঢাকায়। কিন্তু ফোন ঢুকলেও নেট সমস্যার কারণে কিছু শোনা যাচ্ছে না। 

– তোর শোনা লাগতো না। ঘরে আয় তুই। কারেন্টের লোকরে ফোন দে। ফোন দিয়া আমার হাতে ফোনডা দে। কারেন্টের গুষ্টি আমি আইজ উদ্ধার করমু। টিভিতে মিঠাই দেখতে বইছি আর এহনি বালের কারেন্ট ডারে যাওয়া লাগবো।

– মিঠাই আবার কেমনে দেখে। মিঠাই তো খায়। 

– আরে ছেঁড়া জী বাংলার মিঠাই নাটকের কথা কইছি। বাপের লাহান বেশি বুজোস ক্যা। তুই তাড়াতাড়ি কারেন্টের লোকরে ফোন দে। নাইলে কিন্তু আইজ বাড়িত আগুন লাগায়া দিমু। সারাদিন রাইন্ধা-বাইড়া রাইতের বেলা একটু নাটক দেখতে বইছি আর তহনই কারেন্ট ডারে যাওয়া লাগবো। কী হইলো তুই ফোন দেস না ক্যা। তাড়াতাড়ি ফোন ডা দিয়া আমার হাতে দে।  

– ট,টাকা নাই মা।

– তোর বাপের জমি বেচ। জমি বেইচা ফোনে টাকা ভর। 

– আরে আরে মা ঠান্ডা হও। পড়ে ফোনে দেখে নিও আজকের পর্ব টা। 

– আমি ফোনে দেখতে পারুম না। আমি টিভিতেই দেহুম। 

– টর্চ টা নামাও। চোখে লাগতেছে। 

শিউলি বেগম টর্চটা নিচে নামায়। শাহারিয়া বলে,

– আকাশের অবস্থা ভালো না। এইজন্য মনে হয় কারেন্ট গেছে।

– আর এই বালের আকাশ টারও দুইদিন পর পর যে কী হয়, খালি বৃষ্টি আইতেই থাহে। 

– আচ্ছা মা ঘরে যাও। কারেন্ট আসুক, তখন টিভি দেখিও। দিথী কই। সকাল থেকে দেখতেছিনা

– ঐডা গেছে তোর হউর বাড়ি। 

– মানে ? 

– অর বাপের বাড়ি গেছে,,,,,!!! (চিল্লিয়ে বলেন শিউলি বেগম)

– তাই বলে এখনো নাই। 

– আইজ ২১ তারিখ তুই জানোস না ? 

– তোমরাও কীসব কুসংস্কার নিয়ে পড়ে আছো। সকাল থেকে ও নাই। এখনো ওর কাজ শেষ হয়নাই ? 

– তুই গিয়া দেখ গা। আমারে জিগাইতাছোস ক্যা। 

– ঘরে আব্বা আছে ? 

– গেছে বাথরুমে আমার গুষ্টি উদ্ধার করতে। 

– লাইট দিয়ে আসো। 

– ঐডা অন্ধকারেই থাহুক। কতদিন ধইরা কইতাছি আইপিএস নিতে। এহন যহন লসনাই আন্ধারেই বইয়া থাক। 

– এ শিউলি বেগম, লাইট লইয়া আহো,,,,! আন্ধারে বদনা খুঁইজা পাইতাছি না,,,,,! (বাথরুম থেকে মতিন মেম্বারের আওয়াজ ভেসে আসে)

– তোমার বদনা পাওয়া লাগবো না। আইপিএস লওনাই এহন এইডা তোমার শাস্তি। 

– মশা কামড়াইতাছে গো শিউলি বেগম। আর কতহুন এমনে বইয়া থাকমু। 

– যতহুন না আমার রাগ মিটা যাইবো ততহুন ভিতরে বইয়া মশাগো লগে গল্প করো। (শাহারিয়ার দিকে ফিরে) এই তুই যা, যাইয়া তোর বউরে লইয়া আয়। 

– আর বাবা। 

– ঐডা ঐহানে মশার কামড় খাউক, তোরে যেইহানে যাইতে কইছি ঐহানে যা।

শাহারিয়া আর কিছু বলে না। যানে যে শিউলি বেগমের সাথে সে কথাতেও পারবেনা। দুঃখ তো হচ্ছে তার বাবার জন্য। এমনিতেই এখন শিউলি বেগমের মাথা চড়ে আছে। মনে হয়না মতিন রে এতো সহজে ছাড়বে। শাহারিয়া এক প্রকার দৌড়েই চলে যায় ওখান থেকে। বাথরুম থেকে শুধু মতিন মেম্বারে ডাক ভেসে আসে। আর শিউলি বেগম আঙিনায় চুপচাপ পায়চারি করতে থাকে। হালকা বাতাস উঠে। চারপাশের গাছের পাতা গুলো সেই বাতাসে নড়ে উঠে।

 

_____

 

তান্ত্রিকের বাড়িটায় আজ একপ্রকার উৎসবের আমেজ। তবে তা যে শুধু মাত্র অসুভ আত্মাদের জন্য তা বলার বাকি রাখে না। বাড়ির আঙিনায় একটা কাঠের খাট রাখা হয়েছে। সেখানে সুমুকে শক্ত করে বেঁধে শুইয়ে রাখা। তার হাত দুটো বিছানার উপরের দুই কোনে আর পা দুটো বিছানার নিচের দুই কোনের সাথে বাঁধা। তার শরীর টাকে X এর মতো খাটের উপর বেঁধে রাখা হয়েছে। সুমু তার শরীরটাকে একদমই নাড়াতে পারছে না। তার চারপাশে একে পর এক মোমবাতি রেখে গোল এক বৃত্ত তৈরি করা হয়েছে। তার বিছানার মাথার দিকটায় কিছুটা সামনে আগুনের কুন্ডলি জ্বলছে। তান্ত্রিক তার বিছানার চারপাশে গোল করে দেওয়া মোমবাতির চারপাশে ঘুরছে, মুখ দিয়ে মন্ত্র উচ্চারণ করছে। আকাশের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। সুমুর ঠিক সোজা উপরে ঘন মেঘ গোল হয়ে কুন্ডুলি পাকাতে ধরেছে। মাঝে মাঝে সেই মেঘে মৃদু বিজলি চমকিয়ে উঠছে। সুমু কাঁদছে। তার চোখের কোন দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে। সে কোন শব্দ করতে পারছেনা। তার মুখ দিয়ে কোন কথা আসছেনা। হয়তো তান্ত্রিকের কোন এক জাদুতেই তার এই অবস্থা হয়েছে। হনুফাও এখন তান্ত্রিকের বসে চলে গিয়েছে। সেও এখন নিজ জ্ঞানে নেই। এখন সে এক খারাপ আত্মায় পরিনত হয়ে গেছে। তান্ত্রিক সুমুর চারপাশে কয়েকবার প্রদক্ষীণ করে এসে আগুনের কুন্ডুলির সামনে বসে। আজ তার পোশাক-আশাকও একদম এক আসল তান্ত্রিকের মতো। লাল জামা, গলায় পুঁথির মালা। মাথার চুল ঝট করে বাঁধা। তান্ত্রিক আগুনের কুন্ডুলিতে কিছু একটা ছিটিয়ে দেয়। আগুনের শিখা লম্বা হয়ে উঠে। তান্তিক মন্ত্র পড়তে শুরু করে,

 

– নাসুবো নাসুবো ইংকাকে নাহুবো নাহুবো ইংকাকে। হে অসুভ শক্তি রা, ফিরে এসো। ফিরে এসো তোমাদের মালিক কে তার দেহে প্রবেশ করতে সাহায্য করো। এই যায়গা তোমাদের বলয়ে নিরাপদ করে ফেলো। ফিরে এসো!!! 

 

আকাশের ঘনিভূত হওয়া মেঘের কুন্ডুলি থেকে এক বিশাল কালো ধোঁয়া বেড়িয়ে আসে। এসে খুদ্র খুদ্র অংশে ভাগ হয়ে এই বাড়ির চারপাশে গোল নিরাপত্তা বলয় বানিয়ে ফেলে। তান্তিক দুই হাত উপরে তুলে আগুনকে আরো প্রসারিত হতে বলে। মুঠ করে থাকা হাত থেকে কিছু একটা আগুনে ফেলে। আগুনের শিখা আরো লম্বা হয়ে যায়। সুমু এসব দেখে খুব ভয় পাচ্ছে তার বোবা মুখ কিছু শব্দ করতে না পারলেও তার বুক কষ্টে ফেটে যাচ্ছে। সে এখান থেকে মুক্তি পেতে চায়। কিন্তু কিছুই যে সে করতে পারছেনা, কিছুই না। 

 

    জঙ্গলের মাঝের রাস্তাটা দিয়ে হেঁটে হেঁটে আসছে দিথী, তানিয়া, আর সামিহা। তারা দূর থেকে সেই বাড়ির উপর গোল হয়ে ঘুরতে থাকা ঘন মেঘের কুন্ডলি দেখতে পায়। এদিকের আবহাওয়াও ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। বাতাস বইছে। হয়তো বৃষ্টি বা ঝড় নামবে। দিথী তার হাত উঠিয়ে হাত ঘড়িতে দেখে সাড়ে ১১ টা বাজে। সময় বেশি নেই। তারা তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে। রাস্তায় পড়ে থাকা শুকনো পাতা গুলো বাতাসে এদিক ওদিক উড়ছে। আকাশে বিজলী চমকিয়ে উঠছে।

 

      শাহারিয়া প্রবেশ করে চেয়ারম্যান বাড়িতে। অর্থাৎ দিথীদের বাসায়। আকাশের অবস্থা খারাপ দেখে তার মন ভালো ঠেকছে না। দিথীর জন্য বেশ চিন্তা হচ্ছে। শাহারিয়া তাড়াতাড়ি হেঁটে এসে আঙিনায় দাঁড়ায়। দেখতে পায় একজনকে মেয়েকে। মেয়েটা বারান্দার দরজার সামনে পায়চারি করছিলো। শাহারিয়া বলে

– দিথী, না অন্য কেউ ? 

মেয়েটা পায়চারি থামিয়ে দেয়। চারপাশ অন্ধকার থাকায় মেয়েটা কিছু দেখতে পাচ্ছিলো না। তবে গলা শুনে কোন খারাপ কেউ হবে বলেও তো মনে হয় না। মেয়েটা বলে,

– আমি কানিজ, কানিজ ফাতেমা অর্দা। 

– কানিজ ? ওহ কানিজ আপু। আমি শাহারিয়া। দিথী কী ঘরে ? আমি ওকে নিতে আসছিলাম।

– না। দিথী তো নীলগিরি জঙ্গলের দিকে গেছে। 

– কি ? ও এতো রাতে জঙ্গলের দিকটায় কেনো গেছে? 

– আজ রাতে আসুভের জীবন ফিরে পাওয়ার কথা। তাই ওদেরকে আজ রাতেই কাজ সাড়তে হতো। 

– কী সব কুসংস্কার নিয়ে তোমরা পড়ে আছো। এসব কিছুরই বিজ্ঞান সম্মত উত্তর নেই। (একটু থেমে) ও নীলগিরির দিকে গেছে ? 

– হ্যা। 

– আচ্ছা আমি গেলাম।

– নীলগিরির মাঝে যে রাস্তাটা গেছে ঐখানকার পুরান বাড়িটায় গেছে। 

– পুরান বাড়িটা ? কোন পুরান বাড়ি ? 

– একটাই তো বাড়ি আছে ওখানে। 

– কিন্ত ওখানে তো এক বৃদ্ধ থাকে। আমি আর রিয়াদ একবার সেখানে গেছিলাম। 

– ওখানে বৃদ্ধ না। তান্ত্রিক আর সুমু নামের একটা মেয়ে থাকে। ঐখানেই দিথীরা গিয়েছে। 

– তারমানে বৃদ্ধটাও একটা আত্মা ছিলো! কী যে হচ্ছে এসব। আচ্ছা আমি গেলাম। 

বলেই শাহারিয়া ছুটে দৌড়ে আঙিনা থেকে গেইটের দিকে চলে যায়। কানিজ তার যাওয়ার পান থেকে মুখ ফিরিয়ে আবার বারান্দার সামনে পায়চারি করতে থাকে। তার কেনো জানি টেনশন হচ্ছে। মন বলছে কিছু একটা হবে। কিন্তু কী হবে! তাই যে তার অজানা। 

 

      দিথী, সামিহা, তানিয়া বাড়িটার কাছে চলে আসে। বাতাস এবার বেশ জোড়েই উঠেছে। আশেপাশের গাছ গুলো দোল খেয়ে একপাশ হতে অন্যপাশে যাচ্ছে। অমাবস্যার রাত হওয়ায় চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার। সেই অন্ধকারের মধ্যে হতে কিছু লাল লাল চোখ বাড়ির দিকটা হতে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। দিথী সবাইকে এলার্ট হয়ে যেতে বলে। সবাই সতর্ক হয়ে যায়। তখনই কিছু লাল চোখ ওলা প্রাণী তাদের দিকে এগিয়ে আসে। প্রাণী গুলো ছিলো কুকুরের থেকে আকারে বড়। আর হিংস্র। তবে যে এগুলোর অস্তিত্ব বাস্তব জগতে নেই এবং এগুলো যে খারাপ আত্মা সেগুলো বুঝতে বেগ পেতে হয়নি দিথীদের। দিথী তার কোমর থেকে ছুরি টা বের করে কুংফু স্টাইলে রেডি হয়ে যায়। তেড়ে যায় সেই বুনো লাল চোখা কালো রঙয়ের প্রাণী গুলোর দিকে। গিয়েই ঝাঁপিয়ে পরে। একটার চোখে ছুরি ঢুকিয়ে সেটা থেকে বের করে আরেকটার শরীরে ছুরি ঢুকায়। কনুই দিয়ে আঘাত করে একটাকে ফেলে দেয়। ছুরি টা বের করে ছুঁড়ে মারে তার দিকে তেড়ে ছুটে আসা আরেকটার দিকে। ছুরি গিয়ে তার মাথায় লাগে। অচেতন দেহ নিয়ে সেটা এসে দিথীর পায়ের সামনে ঠেকে। দিথী সেটা থেকে ছুরি তুলে নিয়ে আরেকটার কাঁধে হাত রেখে লাফিয়ে উঠে বুট জুতো পড়া পা দিয়ে আরো দুইটার মুখ বরাবর জোড়ে এক লাথি মারে। সেগুলো ছিটকে পড়ে যায়। দিথী তেড়ে যেতে থাকে বাড়িটার দিকে। পিছনে তানিয়া, সামিহা আরো কিছু ভালো আত্মারা সেই সব খারাপ আত্মাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে করে এগিয়ে আসছে। 

বাড়ির গেটের সামনে আসা মাত্রই এক কঙ্কাল এসে দাঁড়ায় দিথীর সামনে। দিথী এতে এক ফোঁটাও ভয় পায় না। উল্টো চুপচাপ তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। এবং একটা পর্যায়ে সে হেলে ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু দিথী কেনো ঝুঁকে পড়লো তা কঙ্কল টা বুঝে উঠতে না উঠতেই আরেকটা কঙ্কাল দিথীর হেলে থাকা কাঁধের সাথে ধাক্কা খেয়ে সামনের কঙ্কালের উপর এসে পড়ে। তারমানে পিছন থেকেও আক্রমণ আসছিলো, কিন্তু দিথী আগে ভাগে বুঝে ফেলায় সে হেলে যায় আর তাদের আক্রমণ তাদের উপরে গিয়েই পড়ে। দিথী পাশে পড়ে থাকা বড় এক ইট হাতে নিয়ে সাথে সাথে পিছনে ফিরে একজন মাথায় সজোরে আঘাত করে। সেটাও একটা কঙ্কাল ছিলো, যেটা দৌড়ে এসেছিলো পড়ে। কঙ্কাল টার খুলি মাঝ বরাবর ফেটে যায়‌। দিথীর ঠোঁটের কোনে এক ছোট্ট মুচকি হাসি ফুটে উঠে। তখনই তার হাত ঘড়িতে এলার্ম বেজে উঠে। এটা সে সেট করেছিলো যাতে ১২ টা বাজার যে ৫ মিনিট বাকি আছে তা বুঝতে পারে। দিথী তাড়াতাড়ি মুখ ঘুড়িয়ে দরজার দিকে ফিরে। দরজায় এক সজোরে লাথি দেয়। টিনের দরজা টা ভেঙ্গে ভিতরে গিয়ে পড়ে। তার পিছনে চলে আসে সামিহা আর তানিয়া। তারা দুজনেই হাপাচ্ছে। দিথী সামনের দিকে তাকায়। দরজা অপর প্রান্তে ছিলো অসংখ্য কালো ধোঁয়ার তৈরি মানব। সবার চোখ লাল। দিথী এক মুচকি হাসি দিয়ে বলে উঠে,

– The war has just begin,,! 

বলেই ছুরি নিয়ে এক জোড়ে চিৎকার দিতে দিতে তেড়ে যায় সেদিকে। তার পিছু পিছু দৌড়ে আসে তানিয়া আর সামিহাও। তাদের ভিতরে চলে এসেছিলো কিছু শুভ আত্মা, তাই তারাও তাদের শরীরে দারুন বল পাচ্ছিলো। দিথী দৌড়ে যেতে যেতে তার পকেট থেকে এক ছোট্ট লেজার পয়েন্টার বের করে। হাতে নিয়ে সেটাতে আঙ্গুল দিয়ে টিপে, সাথে সাথেই সেটা লেজার তলোয়ার হয়ে যায়। দৌড়ে গিয়ে সেটা দিয়ে একসাথে ৩ টা ধোঁয়া মানবের মাথা আলাদা করে দেয়। তলোয়ার ঘুড়িয়ে আরো দু জনের দেহের অর্ধেক কেটে দেয়। এই লেজার তলোয়ার দেখে সামিহা আর তানিয়া অবাক হয়েছিলো। কারণ এটা তো তাদের দেওয়া না। তাইলে এটা দিথী কোথায় পেলো। আর এটা দিয়ে সে ধোঁয়া মানব গুলাকে মারছেই বা কীভাবে! তবে এখন অতো ভাবার সময় নেই। এখন লড়ে যেতে হবে তাদের। সামিহা আর তানিয়াও তাদের হাতে থাকা ছুরি দিয়ে যতটা পারছে লড়ে যাচ্ছে। দিথী আরো ৫ জনকে একসাথে ঘায়েল করে আরেকটার কাঁধে হাত দিয়ে লাফিয়ে উঠে এক ঘুর্ণন দিয়ে চারপাশে থাকা ৩০-৪০ টা ধোঁয়া মানবকে একসাথে একদম ভস্মিভূত করে ফেলে। যায়গা ফাঁকা হয়ে যায়। দিথী উপর থেকে মাটিতে হাঁটু গেড়ে পড়ে। এক হাতে তলোয়ার। মুখ তুলে চায় সামনে। সামনে মাত্র একটা বাঁধা। এক বড় দৈত্যা দানব। দিথী এক মুচকি হাসি দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়ে পিছনে ফিরে। দৈত্যাটা দিথীকে আক্রমণ করার জন্য ছুটে আসে। দিথী এক চুলও নড়ে না। এই ফাইট টা হচ্ছিলো বাড়িতে ঢুকার গলির মাঝে। অর্থাৎ একপাশে বাড়ির দেওয়াল অন্য পাশে গাছপালা। এবং এর মাঝের গলির মধ্যে দিথীকে আক্রমণ করতে ছুটে আসছিলো দানবটা। দিথী এখনো একচুলও নড়ে না। দানব টা তার কাছে চলে এসে তাকে হাত দিয়ে আঘাত করতে যাবেই তখনই দিথী তার দুই পা দুইদিকে ফাঁক করে বসে পড়ে। দানব তাকে ছুঁতে না পেরে তার মাথার উপরে দিয়ে হাওয়ায় ভেসে যেতে থাকে। সবকিছু যেন ধীর গতির হয়ে যায়। দিথী ঠিক এই মুহুর্তেই তার লেজার তলোয়ার দৈত্য দানবের পেট দিয়ে ঢুকিয়ে মাথা দিয়ে বের করে দেয়। আর তলোয়ার টা ছেড়ে দেয়। নীল বর্ণের রক্ত বের হতে থাকে দানবের শরীর থেকে। দানব টা গতিতে থাকায় ছিটকে গিয়ে সামনে গড়িয়ে পড়ে। আর এক বিষ্ফোরণে ধ্বংস হয়ে যায়। দিথী উঠে দাঁড়ায়। তার হাত ঘড়ি উচিয়ে ধরে। দেখে ১১ টা ৬৯। ১২ টা বাজতে আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড। দিথীর পিছনে এসে দাঁড়ায় সামিহা, তানিয়া। দিথী দৌড়ে গলি পাড় করে বাড়ির আঙিনার দিকে চলে আসে। দিথীর পিছু পিছু সামিহা, তানিয়ারাও আসতে যায় তবে তারা দিথীর গতির সাথে তাল মিলাতে পারে না। কিছুটা পিছিয়ে পড়ায় আবারো তাদের উপর ধোঁয়া মানব গুলো আক্রমণ করে বসে। 

 

দিথী এসে আঙিনার দাঁড়ায়। তান্ত্রিক জোড়ে জোড়ে আগুনের সামনে বসে মন্ত্র পড়ছিলো। বিছানায় ছটফট করছিলো সুমু। তার মুখ টা দেখে যেনো দিথীর মায়া হচ্ছিলো। এক অদৃশ্য বস্তু তার মুখের উপর রাখা ছিলো। তাই সুমু বোবার মতো হয়ে গিয়েছিলে। চারপাশের অবস্থা খারাপ হয়ে উঠে। ঝড়ো বাতাস বইতে শুরু করে। যেনো কোন টর্নেডো নামছে। আশেপাশের গাছ গুলো যেন শিকড় ছেড়ে উড়ে যাবে এমন অবস্থা। দিথী শরীরেও খুব জোড়ে হাওয়া লাগছিলো। মোমবাতি গুলোর আগুন দুলছিলো তবে নিভছিলো না। তান্ত্রিকের সামনের আগুনটাও যেন নৃত্য শিল্পীর মতো নেচে উঠছিলো বাতাসে। এক বড় বাজ পড়ে জঙ্গলের কোথাও একটা। বিকট ‌শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে যাওয়ার অবস্থা। দিথী কানে হাত দেয়। তার ঘড়িতে টাইমার বেজে উঠে। ১২ টা বেজে গেছে। উপরে তাকায় দিথী। সুমুর দেহ বরাবর উপরে আকাশে তৈরি হওয়া ঘন মেঘের কুন্ডুলির মাঝ থেকে এক উজ্জ্বল কালো ধোঁয়া বের হতে থাকে। নিচে নেমে আসছিলো। সেটার আকার কতো বড় তা বর্ণনা করার মতো না। 

 

দূর থেকে জঙ্গলের মাঝের রাস্তা দিয়ে হেটে আসা শাহারিয়ার চোখের বাইরে যায়না এই দৃশ্য। দূর থেকে বেশ উজ্জ্বল লাগছিলো সেই কালো ধোঁয়া টাকে। সেটা ক্রমশ নিচে নেমে আসছিলো। শাহারিয়া তা দেখে এক ঢোক গিলে ।

 

তানিয়া চিৎকার করতে থাকে। সুমুর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দিথীকে বলতে থাকে সুমুকে মেরে ফেলতে। মেরে শরীর টুকরো টুকরো করে দিতে। দিথী সেই কথা শুনতে পায়। সামিহা আর তানিয়াকে ধোঁয়া মানব রা আটকে রেখেছিলো। দিথী তার পকেট থেকে ছুরি টা বের করে। তানিয়া বলতে থাকে। ‘ মেরে ফেলো ‌দিথী, মেরে ফেলো। এই যুদ্ধে আমাদের জয়ি হতেই হবে।’ দিথী ছুরি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। উপর থেকে নামা কালো ধোঁয়াটা প্রায় অনেকটা নেমে এসেছে আকাশ থেকে। সুমু মাথা নাড়িয়ে না করছে তাকে মারতে। তার অশ্রভরা চোখ দুটো যেন বলছে সে বাঁচতে চায়। সে বাচতে চায়। দিথী তার ছুরি টা হাতে তুলে। তুলে চোখ বন্ধ করে ফেলে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে, ‘ এই অধ্যায়ের, এখানেই সমাপ্তি হবে। এখানেই,,,! ‘ বলেই রক্তচক্ষুর মতো চোখ খুলে তাকায় সুমুর দিকে। তার আরেকটা হাত ঢুকায় তার পকেটে। সুমু মাথা নাড়িয়ে না করছিলো। দূরে থাকা সামিহা,তানিয়াদের চিৎকার ভেসে আসছিলো। দিথী যেন চলে যায় এক অন্য মুডে, তার এক বিশেষ মুডে। সব কিছুই যেন ধীর গতির হয়ে যায় মুহূর্তেই। এমনকি উপর থেকে নেমে আসা কালো ধোঁয়াটাও। আসলে সব ধীর গতীর হয়নি। দিথী সুপার ফাস্ট হয়ে গেছে। দিথী তৎক্ষণাৎ তার পকেট থেকে আংটি পড়া হাতটা বের করে। হাতের সাথে বের করা শিশি গুলো উপরে ফিকে দেয়। দিয়ে আরেকহাত দিয়ে তার হাতের আঙুলের চামড়া কেটে দেয়। যেই আঙুলে আংটি পড়া ছিলো সেই আঙ্গুলেরই চামড়া কাটে। এতে তার রক্তে আংটি ভিজে যায়। সে চোখের পলকে দৌড়ে গিয়ে সুমুর খাটে এক পা রেখে লাফ দিয়ে উপরে উঠে। উপর থেকে নিচে পড়তে থাকা কাঁচের রক্তে শিশি গুলোকে আংটি পড়া হাতটা দিয়ে মুঠ করে এক জোড়ে ঘুসি মারে। ঘুসিতে সব শিশি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। সব রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায় তার আংটি পড়া হাত। দিথী হাওয়াতেই ডিগবাজী দিয়ে নিচে নামতে থাকে। সবাই স্লো মোশনে তাকে দেখতে থাকে। দিথী তার আঙ্গুল তাক করে ধরে তান্ত্রিকের উপর। এক বড় আলোক রশ্মি সঞ্চারিত হয় আংটিতে। এক গুচ্ছ আলো একসাথে হয়ে সোজা তড়িৎ গতিতে গিয়ে মন্ত্র পড়তে থাকা তান্ত্রিকের শরীর এফোড় ওফোড় করে দেয়। তান্ত্রিক কাপতে থাকে। এমন মনে হচ্ছে যেন সে কয়েক হাজার ভোল্টের শক খাচ্ছে। এক বিরাট আলো বেড়িয়ে আসে তার বুক থেকে। তান্ত্রিক চিৎকার করতে থাকে। এক জোড়ে বড় বিষ্ফোরণ ঘটে তার শরীরের। দিথী নিচে পড়ে যায় হাঁটু গেড়ে। তান্ত্রিকের পুরো শরীর টুকরো টুকরো আতশবাজির মতো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। আকাশ থেকে নামতে থাকা কালো ধোঁয়াটাকে আকাশের কুন্ডূলি আবার শুষে নিতে থাকে। কালো উজ্জ্বল ধোয়াটা ছটফট করছিলো। যেন সে মরতে চায় না। কিন্তু সে যে আর বাঁচতে পারে না। সম্পূর্ণ কালো ধোঁয়াটাকে টেনে নেয় সেই আকাশের মেঘের কুন্ডুলি। নিঃশেষ হয়ে যায় সবকিছু। শেষ হয় আসুভে অধ্যায়ের। দিথী উঠে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। তার চোখ মুখে ফুটে উঠে এক বিজয়ের হাঁসি। পিছনে কিছুদূরে থাকা সামিহা, তানিয়াদের ছেড়ে দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায় ধোঁয়া মানব গুলো। তাদের আনন্দ উল্লাসে চারপাশ যেন পরিস্ফুটিত হয়। প্রকৃতি যেন প্রাণ ফিরে পায়। আকাশের মেঘ কেটে যেতে থাকে। হঠাৎ দিথীর চোখ বুঁজে আসতে থাকে, তার কাছে কেমন যেনো সব অন্ধকার হয়ে আসছে। ঝাপসা হয়ে আসছে। সে নিজের শরীরের বল হারায়। সে দাঁড়ানো হতে পড়ে যেতে নেয় তখনই যেন এক দমকা বাতাসের মতো এসে হাজির হয় শাহারিয়া। শাহারিয়ার কোলেই ঢলে পড়ে দিথী। চোখ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় তার। সবকিছু অন্ধকার হয়ে ঠেকে তার কাছে। দিথী জ্ঞান হারায়।

 

বেশ কিছুক্ষণ পর,,,

 

চোখের পাতা নড়ছে। আস্তে আস্তে তা খুলছে। তার চারপাশে উৎসুক হয়ে থাকা মুখ গুলো দিথীর কাছে অস্পষ্ট হয়ে ঠেকে। দিথী সম্পূর্ণ চোখ মেলে তাকাবার চেষ্টা করে। আর সবার আগেই চোখে পরে তার প্রিয়তমর মুখ। শাহারিয়া বেশ চিন্তিত ছিলো। দিথী নিজেকে আবিষ্কার করে এক নতুন ঘরে। ঘরটা ছিলো সুমুর। এই বাড়িতে সুমু যেই ঘরটায় এইকয়দিন ছিলো সেটা। দিথী উঠে বসতে চেষ্টা করে। শাহারিয়া তাকে ধরে উঠে বসাতে থাকে। দিথী কিছুটা উঠে বসে। একটু পিছিয়ে যায়। পিছনে শাহারিয়া ছিলো। সে একটু পিছিয়ে গিয়েই শাহারিয়ার কোলে আবার ঢলে পড়ে। তাকে যতটা পাড়ে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে। শাহারিয়াও দিথীর দূর্বল শরীরটাকে তার কোলে ভালো ভাবে আগলে নেয়। দিথী এতোক্ষণ শাহারিয়ার পায়ের মাংসপেশিতে মাথা দিয়ে শুয়ে ছিলো। তার পাশে উৎসুক হয়ে বসে থাকা সামিহা,তানিয়া এখন অন্য দিকে তাকিয়ে গলা ঝাড়ছে। দূরে এক বেঞ্চে বসে আছে সুমু আর হনুফা। সুমুও‌ যেন প্রতিক্ষায় ছিলো কখন দিথীর জ্ঞান‌ ফিরবে। হনুফা আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে গেছে। সে এখন আর খারাপ ধোঁয়া নয়। সে এখন ভালো সাদা ধোঁয়া। 

 

দিথী বসে থাকা শাহারিয়ার কোলে হেলান দিয়ে ছিলো। তার কেটে যাওয়া আঙ্গুলটায় শাহারিয়ার শার্টের ছেঁড়া অংশ বাঁধা। তানিয়া এবার একটু জোড়ে গলা ঝেড়ে বলে,

– বাড়ি গিয়ে সারাদিন কোলে ঘুমিয়ে থেকো। আজকের পর থেকে আর বাঁধা নেই। 

দিথী ধীর গলায় বলে,

– এই প্রথম আমি তার কোলে মাথা রেখে আছি। ওর বুকটাই তো আমার প্রধান দুর্বলতা। (বলেই আরো আগলে ধরে শাহারিয়াকে) 

– তানিয়া আপুর কাছ থেকে শুনলাম তুমি বলে দারুন ফাইট করছো আজকে! (শাহারিয়া)

– কিছুটা। 

– এইটাকে কিছুটা বলতেছো! এরকম ফাইট আমি বিদেশী মুভিতে দেখছিলাম। কিন্তু দিথী, তুমি সুমুকে না মেড়েই কীভাবে আংটিটা সচল করতে পারলে ? সুমুর রক্ত ছাড়া তো আংটিটা কাজ করার কথা না। আর তোমার রক্ত তো শিশিতেই ছিলো। তাইলে তুমি হাত কাটতে গেলা কেনো ? (তানিয়া)

দিথি একটু সোজা হয়ে বসে। তার চোখ আধখোলা। দেখে বোঝা যাচ্ছে সে খুব বেশি ক্লান্ত। তবুও সে বলতে ‌শুরু করে,

– আমার রক্তের শিশির যায়গায় সুমুর রক্তের শিশি ছিলো। 

– সুমুর রক্তের শিশি ? কে দিয়েছিলো ? 

তখনই ঘরের দরজায় কেউ কড়া নাড়ে। সুমু আর দিথী ছাড়া সবাই অবাক হয়। তানিয়া ধীর গলায় বলে,

– ক,কে ? 

– আমি। আমি লায়লা।

– লায়লা!! মানে কী!! (শাহারিয়া অবাক হয়ে বলে)

– সুমু, দরজাটা খুলে দাও। (দিথী) 

সুমু বেঞ্চ থেকে উঠে গিয়ে দরজাটা খুলে দেয়। লায়লা ভিতরে আসে। এসে দেখে দিথী বসে আছে শাহারিয়ার কোলে। ফ্লোরে তানিয়া আর সামিহাও বসে আছে। লায়লা ভিতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়। এতোক্ষণ একটা মোমবাতি তাদের আলো দিচ্ছিলো। লায়লা তার ঝোলা থেকে একটা চার্জার লাইট বের করে ঘরটাকে ফকফকা আলোয় ভরিয়ে দেয়। দিয়ে গিয়ে সুমুর পাশে বেঞ্চে বসে। তানিয়া বলে,

– লায়লা এখানে কেনো ? 

– কী রে লায়লা! সোনা দানা নিবিনা! হা হা হা! (দিথী হাসতে থাকে)

– কিসের সোনাদানা ? (তানিয়া)

– তোমাদের সব প্রথম থেকে বলতে হবে। (শাহারিয়ার দিকে ফিরে) ভাত খেয়ে আসছো ?

– আমি তোমার চিন্তায় বাচিনা, আর ভাত খাইতে যাবো। 

– খিদা লাগছে নাকি ? 

– না। কেনো? 

– তাইলে কাহিনী বলা শুরু করি। বাসায় গিয়ে একসাথে খাবো। কেমন! 

– কাহিনী আবার কী? 

– দিথী, তুমি কী কিছু আমাদের থেকে লুকাইছো ? (তানিয়া)

– অনেক কিছু লুকাইছি। কীরে লায়লা। সব বলি ? 

– হ আফা। আপনেই কন

দিথী শাহারিয়ার কারো কাছে বসে বলতে শুরু করে,

‘ সুমু নামের এই মেয়েটার যে কোন শক্তি ছিলোনা, তা আমি অনেক আগেই বুঝছিলাম। যেদিন সুমুর আসল পরিচয় আমরা পাই ঐদিনই। কারণ সুমু ধরা পড়ার পর কিন্ত কোন অলৌকিক শক্তির ব্যবহার করে কিংবা আমাদের মেরে তারপর পালায়নি। সে একটা ধোঁয়ার বল ছুড়ে দিয়ে তারপর পালিয়ে ছিলো। আমি তখন সুমুকে নিয়ে এতোটা মাথা ঘামাইনি। তারপর আসলো আহনাফ। ও যেদিন আসে ঐদিন ওর আর শাহারিয়ার উপর হনুফার আত্মা আক্রমণ করে। অবশ্য তখন হনুফা নিজের মধ্যে ছিলোনা। ও তখন তান্তিকের বসে ছিলো। তো সেদিন যখন শাহারিয়া আর আহনাফ বেঁচে যায় সেদিন আহনাফ বাড়িতে ঢুকার সময় দূরে থাকা সুমুকে দেখেছিলো। সুমু যথেষ্ট দূরে থেকে তার উপর নজর রেখেছিলো। আমি আহনাফের সাথে আলাদা কথা বলেছিলাম তার ফ্যামিলি নিয়ে। মানে ও যে আমাদের পুনর্জন্মের একজন জানার পর কথা বলেছিলাম। সেদিন এসব জানতে পারি। তারপর আমার মনে কিছূ প্রশ্ন জাগে। সুমুর যদি শক্তি না থেকে থাকে তাইলে তো সে নিশ্চয়ই মানুষ। আর তারও তো খাবারের প্রয়োজন হয়। হনুফা তাই যেখান সেখান থেকে খাবার চুরি করে এনে সুমুকে খাওয়াতো। হনুফাকে শুধু তান্ত্রিক তখনই নিজের বসে করতো যখন কারো শরীরে তাকে প্রবেশ করাতে হতো, তাছাড়া সবসময় হনুফা হাসিখুশি আর দুষ্টু মিষ্টি আত্মা হিসেবেই নিজের আত্মপ্রকাশ করতো। (একটু থেমে) একদিন হনুফা লায়লা রান্না ঘরে থাকা অবস্থায় খাবার চুরি করতে আসছিলো। তখন সে ধরা পড়ে যায়। তবে লায়লা তাকে কোন ইচ্ছাপূরণ কারী জ্বীন ভেবে তাড়িয়ে না দিয়ে তাকে আরো খাবার দেয় যাতে সে লায়লার ইচ্ছা পূরণ করে। তো লায়লা সোনার দুল, গহনা এসব পড়তে চাইতো। এই কথা সে হনুফাকেও বলে। হনুফা তেমন কিছু না বলে চলে যায়। কিন্তু লায়লা আর হনুফা এটা লক্ষ্য করেনি যে আমি তখন রান্নাঘরে আসতে গিয়ে তাদের কথা শুনে ফেলেছি। আমি তাঁরপর ভিতরে এসে লায়লাকে তেমন কিছু বলি না। শুধু বলি ঘরে আসতে, কথা আছে। আমি ঘরে চলে যাই তারপর। ও কিছু একটা কাজ সেড়ে আসতে আসতে আমি এদিকে আমার পরিকল্পনা সাজিয়ে নিলাম। আমি ভেবেছিলাম সুমু নামের মেয়েটাকে যদি কোন ভাবে বুঝিয়ে সুজিয়ে তাকে আসুভে অধ্যায় থেকে আলাদা করতে পারি তাইলে তো আমাদেরই লাভ। আসুভে তখন দেহ পেতোনা। আর সুমু নামের মেয়েটাকে পড়ে দরকার পড়লে নতুন একটা জীবনও দিতাম। সেই ভেবে আমি পড়ে ঘরে লায়লাকে বলি আমি তাকে কিছু স্বর্ণ দিবো যদি সে আমার কিছু কাজ করে দেয়। তারপর আমি সব তাকে খুলে বলি। বলি যে সুমুকে কোনভাবে বাইরের জগতে বা আমার সাথে এনে পারলে দেখা করাতে। লায়লাও সেই কাজে লেগে যায়। সে বলে তার সোনা লাগবে তাই সে তান্তিকের সাথে কাজ করবে। তান্ত্রিকও অত না ভেবে আমাকে সহজে মারতে পারবে ঠিক করে লায়লাকে দলে নিয়ে নেয়। লায়লার কাজ ছিলো আমার খাবারে বিষ দেওয়া, যা লায়লা কোনোসময়ই আমার খাবারে দেয়নি। আমি এমন ঢং করতাম যেন হনুফা বুঝে আমি আগে জেনেছি আর মন্ত্র পড়ে খেয়েছি তাই আমার কিছু হয়নি। এইতো গেলো প্রথম ভাগ। মানে সুমুর গল্পের প্রথম ভাগ। তারপর যখন একদিন লায়লার মুখ থেকে এটা জানতে পারি যে সুমু বাইরের জগতের সাথে মিলামেশা করছে, চৌরচক বাজারের দুই পাগল পাগলীকে দেখা শোনা করছে তখন থেকে বুঝতে পারি সুমু আসলেই ভালো একটা মেয়ে। সেও একদম স্বাভাবিক মানুষ, তার মন পাষন্ড না। আর তোমরা হয়তো জানো যে সুমু আমারই মেয়ে। যদিও সেটা পূর্বজন্মের। তবুও বলতে গেলে আমারই রক্তের সে। আমারও টান ‌ছিলো ওর প্রতি। ও যদি ভালো হতে চায় আমি অবশ্যই তাকে ভালো পথে ফিরিয়ে আনবো। আর তানিয়া আপু, তুমি না বলেছিলা সুমুর তো কোন টান নেই। সে কেনো ভালো জগতে ফিরবে। আমি তো সুমুর মনের অবস্থা জানতে পারতাম না। তাই লায়লাকে পাঠাই। এতোদিনে লায়লা, সুমু আর হনুফার ভালো বন্ধুও হয়ে যায়। লায়লা তারপর সেদিন ফিরে আসে সেই তথ্য নিয়ে। আর এসে আমাকে নিয়ে ঘরে চলে যায় সেসব বলতে। সুমু তার দাঁড়া বলে পাঠিয়েছিলো সে আসুভের দেহ হিসেবে থেকে যেতে চায় না। সে স্বাভাবিক মানুষ হয়ে বাঁচতে চায়। তার আরেকটা টানের দিক আমি হনুফার থেকে জানতে পারি পরে। হনুফার সাথেও আমার কাল কথা হয়েছিলো। আর সুমু কী জন্য আসুভের পথ ছেড়ে স্বাধারণ পথে ফিরে আসতে চায় তার প্রধান কারণ জানতে পারি। আর তাই সুমুকে সাহায্য করবো বলে সিদ্ধান্ত নিই।

– প্রধান কারণ টা কী ছিলো? (তানিয়া) 

দিথী সুমুর দিকে তাকায়। সুমু তাকে ইশারায় না করছিলো বলতে। দিথী চোখে চোখে তাকে আশ্বস্ত করে বলে,

– তা না হয় অজানাই থাক। পরে একদিন বলবো।

– তুই সুমুর রক্ত ছাড়া আংটি সচল করলি কিভাবে? (সামিহা)

– আমি সুমুর রক্ত নিয়েছি তো। আজ সকালে আমি তোমাদের কাছ থেকে বইটা নিয়ে কিছুক্ষণ পড়ার পর বাইরে গিয়েছিলাম মনে আছে ? তখন আমি লায়লাকে বলি সুমুর রক্ত আনতে। তাকে একটা শিশিও দিয়ে দেই আমি। লায়লা সকালের খাবার আনার নাম করে এই বাড়িতে আসে, আর দেখে সুমু গোসলখানায় কাঁদছে। সে গোসল খানায় যায়। সুমুকে সব বোঝায় আর তার থেকে রক্ত নিয়ে আসে। আর আমি তারপর আমার রক্তের শিশি টাকে সুমুর রক্তের শিশির সাথে বদলে দেই আর আংটিটা ব্যাবহার করার জন্য আমার আঙ্গুলের চামড়া কেটে আমার গরম রক্ত আর বাকি রক্ত ব্যবহার করে আংটি ‌সচল করি। 

– বইটা তুমি যে একলা নিয়ে পড়েছিলে। সেটা কেনো ? আর কী লেখা ছিলো সেই বইয়ের শেষাংশে! (তানিয়া)

– যখন তুমি বললে যে সময় যখন আসবে বইয়ে লেখা নিজে থেকে উঠে যাবে যে পরবর্তীতে কী কী করতে হবে কিংবা কী কী হবে। তো সেই হিসেবে সুমুকে যদি আমি বাঁচাতে চাই সেটা বই সমর্থন করে কী না, আসুভের সাথে সুমুর লাইফও কানেক্টেড কী না সেটা দেখার জন্যই আমি বইটা নিয়ে শেষের অংশটা একান্তে পড়েছিলাম। বইয়ের শেষে এটাই লেখা ছিলো যে সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার পরও সেই দেহ টা বেঁচে থাকবে এবং একজন মানুষ হিসেবে তার বাকি জীবন টুকু অতিবাহিত করবে। 

– আগে বলোনি কেনো তাইলে আমাদের? 

– আমি চাচ্ছিলাম বিষয়টা গোপন রেখেই সম্পন্ন করতে। যদি তান্ত্রিক কোন ভাবে যেনে যেতো তাইলে তো সব পাশার দান উল্টে যেতো‌।

– তো এখন সুমু্ কোথায় থাকবে। কার বাড়িতে উঠবে ও ? 

– ওকে তোমার বাসায় রেখে দিলে কেমন হয় ? (শাহারিয়াকে বলে দিথী)

– মা কিছু বলবে না। 

– তাইলে ও মেম্বার বাড়িতেই উঠবে। আর মাও ওকে অনেক আদর করবে। আমি মা’কে কিছু কথা বলে রাখবো। তাইলে মা আসল জিনিস টা বুঝতে পারবে, মানাও করবে না। আর কাল তো আমরা চলেই যাবো। ঘর ফাঁকা যেনো না হয় এই জন্য নতুন জোড়া কে একসাথে করে দিয়ে যাবো‌।

– নতুন জোড়া মানে ? (শাহারিয়া)

– পরে বলবো তোমাকে। কেমন!

– আচ্ছা এইযে এতো পরিকল্পনা, প্ল্যান, এতোকিছু ভাবলা কখন তুমি! 

– তোমাকে যখন জড়িয়ে ধরি তখন আমার মাথায় সব বুদ্ধি আপনা-আপনিই চলে আসে। (বলছি শাহারিয়াকে জড়িয়ে ধরে দিথী। বেঞ্চে বসে থাকা হনুফা বলে উঠে,

– দিথী আফা, আমিও আপনার জামাইকে জড়ায় ধরি! 

– তোর জন্য পাত্র দেখে রাখবোনে। ঐটাকে জড়ায় ধরিস। হা হা হা!!!

উপস্থিত সবাই হেঁসে উঠে। হনুফা লজ্জা মুখ করে সুমুর কোলে মুখ লুকায়। এক বিভীষিকাময় অধ্যায় শেষে এই হাঁসি টুকু যেন একটা প্রশান্তির হাঁসি হিসেবে ধরা দেয় তাদের কাছে। নীলগিরি জঙ্গলের মুখ থেকে মুখে যায় অন্যতম এক কলঙ্কময় অধ্যায়। সুমুর জীবনে শুরু হয় এক নতুন পথচলা! সূচনা হয় এক নতুন অধ্যায়ের! আকাশের মেঘের মতো সুমুর মন থেকেও বিষাদের ছায়া কেটে যায়। মেঘের আড়াল হতে উঁকি দেয় নতুন ইচ্ছের সূর্যদয়!! 

 

চলবে ,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

 

উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন :: ২(মুখোশ)

পর্ব :: ৬৯

লেখক:: মির্জা শাহারিয়া

 

গভীর রাত। কুয়াশাচ্ছন্ন চারপাশ। মাঝে মাঝে গুটি কয়েক হুতুম পেঁচার ডাক একসাথে শোনা যাচ্ছে। ঝিঁঝিঁ পোকারা বোধহয় ডাকাডাকি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। কুয়াশা ভেদ করে এক প্রাইভেট কার হেডলাইট জ্বালিয়ে এগিয়ে আসছে। কাঁচা রাস্তায় গাড়িটা মাঝে মাঝে কিছুটা দুলে উঠছে। খাঁন বাড়ির সামনের বড় গেইট খানার সামনে থাকা এক ইঁদুর তা দেখে ভয়ে দৌড়ে পালালো। গাড়িটা এসে থামলো খাঁন বাড়ির বড় গেইটের সামনে। হেডলাইটের আলো ছাড়া চারপাশ একদম ঘুটঘুটে অন্ধকার। অমাবস্যার রাত বলে কথা, জোছনা আজ আর ঘর থেকে বেড়োবে না। 

গাড়ির দরজা খুলে বেড়িয়ে এলো রায়হান। ড্রাইভারের দরজা খুলে একজন বেড়িয়ে পিছনে ডিক্কির দিকে চলে গেলো ব্যাগ নামাতে। নিপাও গাড়ির অপর পার্শের দরজা খুলে বেড়িয়ে এলো। প্রচন্ড শীত পড়েছে। রাত হয়তো এখন দেড় টা কী দুটো বাজবে। ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেলো তাদের। ড্রাইভার ডিক্কি থেকে তাদের ব্যাগটা নামিয়ে রায়হানের পাশে এনে রাখলো। রায়হান ভাড়া পরিশোধ করে দিলো। নিপা রায়হানের পাশে দাঁড়িয়ে তার হাত জড়িয়ে ধরে আছে। শীতের কাপড় পড়েনি সে। শুধু শাড়িতে কী আর শরীরে গরম ধরে! 

ড্রাইভার ভাড়া নিয়ে চলে যায় গাড়ির দরজার দিকে। রায়হান সামনে ফিরে বাড়ির বড় গেটের ঠিক পাশের ছোট গেইটটার সামনে এসে দাঁড়ায়। ধীর কন্ঠি এক আওয়াজে ডাকতে থাকে,

– রহিম চাচা, ও রহিম চাচা। ঘুমাইছো নাকি। একটু দরজাটা খুলোতো। আমি রায়হান। ও রহিম চাচা। 

(দরজার ভিতরের পার্শ্ব)

রহিম চাচা দরজার পাশে এক চেয়ারে বসে ঘুমাচ্ছিলেন। হঠাৎ ডাকে ধরফরিয়ে উঠে দাঁড়ান। ঘুম মাখা কাপো কাপো গলায় বলেন,

– কে কে! কে ডাকে! ‘

– রহিম চাচা, আমি। 

– আমি কে ? (দরজার দিকে ফিরে) আমি কে ? 

– আপনি তো রহিম চাচা। আমি রায়হান। দরজাটা খুলে দেন। 

– রায়হান? (হাত ঘড়ি উঠিয়ে দেখে) এতো রাইতে রায়হান বাবাজি কইত্থে আইবো?

– রহিম চাচা আমি যে আমার বউয়ের সাথে ঘুরতে গেছিলাম। ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেছে। দরজাটা খুলেন।

রহিম চাচা হাই তুলতে তুলতে দরজার হেজবল খুলতে থাকেন। কাঁচা ঘুম নষ্ট হওয়ার কারণে যে তার মুখে বিরক্তি ভাব চলে এসেছে তা আর বুঝার বাকি নেই। রহিম চাচা দরজা খুলে দেয়। রায়হান নিপার হাত ধরে ভিতরে প্রবেশ করে। রহিম চাচা দেখেন সত্যি সত্যিই রায়হান। তিনি তাড়াতাড়ি করে দরজার বাইরে থাকা ব্যাগটা ধরে ভিতরে এনে রাখেন। বলতে থাকেন,

– এ, এতো রাইতে আইলা যে বাজান।

– ফিরতে ফিরতে একটু রাত হয়ে গেলো। দুপুরে গাড়িতে উঠছিলাম তো। 

– ওহ,, বাড়ির সবাইতো ঘুমাইতাছে। 

– হ্যা জানি। আপনিও ঘুমান। অসময়ে ঘুমের ডিসটার্ব করলাম আপনার। 

– না না বাজান। সমস্যা নাই। 

রায়হান একহাতে ব্যাগের হাতল ধরে আরেক হাতে নিপার হাত ধরে চলে যেতে থাকে অন্দরমহলের দরজার দিকে। রহিম চাচা আবার তার চেয়ারে বসে পড়েন ঘুমানোর জন্য। রহিম চাচা আর রায়হানের সম্পর্ক ভালো। তাই বাড়ির বাকিদের স্যার, ভাইজান ডাকলেও রায়হানকে তিনি বাজান বলে ডাকেন।

 

অন্দরমহলের দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় নিপা রায়হান। নিপা রায়হানকে চাবি বের করতে দেখে অবাক হয়ে বলে,

– চাবি কেনো বের করতেছো! আঁখিকে ফোন দাও। ও দরজা খুলে দিবে। আর দরজা তো ভিতর থেকে লাগানো। বাইরে থেকে চাবি দিয়ে কী করবে তুমি।

– দেখতে থাকো কী করি। 

রায়হান চাবিটা হাতে নিয়ে দরজার চাবির কোঠরে প্রবেশ করিয়ে উল্টো দিকে ঘুরাতেই থাকে। একে একে তিন পাক সম্পুর্ন হয় আর তখনই দরজা খুলে যায়। নিপা অবাক নয়নে রায়হানের দিকে তাকায়। রায়হান বলে,

– এটাই হচ্ছে ট্রিক।

– কীভাবে কী করলা ? 

– বাড়ির সবার কাছেই এই চাবিটা আছে। দরজা যদি উল্টা পাশে লাগানো থাকে তাইলে বাইরে থেকে চাবি টা ঢুকিয়ে উল্টো পাশে ৩ বার ঘুড়ালে দরজা খুলে যাবে। এই নিয়মটা বাড়ির সবাই জানে। তুমি জানতেনা এখন জেনে রাখো। (একটু থেমে) চলো, বাড়ির সবার ঐদিকে অর্ধেক ঘুম দেওয়া শেষ। 

– হমম চলো। 

নিপা, রায়হান ভিতরে চলে আসে। কেউ একজন পাশ থেকে দরজার দিকে আসতে থাকে। কিন্তু নিপা রায়হানকে দেখে সে হঠাৎ থেমে যায়। তার চলার ভঙিমা আগে ছিলো স্বাভাবিক, এখন নিপা রায়হানদের দেখে সে বাড়ির দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে পরে। 

রায়হান পিছনে ফিরে দরজাটা লাগিয়ে দেয়। অন্দরমহলের মাঝের ঝাড়বাতিটার আলো এখন নিম নিম করে রাখা। অনেকটা ডিম লাইটের আলোর মতোন। তাই চারপাশ বেশ কিছুটা হলেও দৃশ্যমান ছিলো। রায়হান নিপার হাত ধরে আর ব্যাগ ধরে নিঃশব্দে হেঁটে চলে যায় সিড়ির দিকে। নিপা চারপাশ মাথা ঘুড়িয়ে দেখতে দেখতে রায়হানের সাথে চলে যায়। 

 

      উপর তলার করিডোর পেড়িয়ে ঘরের দরজার সামনে এসে ঠেকে দুজন। রায়হান তার পকেট থেকে এই ঘরের চাবি বের করতে থাকে। এই ঘরের চাবি শুধুমাত্র মাত্র তার কাছেই আছে। রায়হান চাবি দিয়ে দরজা খুলতে হবে থাকে। তার পাশে দাঁড়ানো নিপা হাই তুলছে। ঘুম পেয়েছে তার। জার্নি করে এতো রাতে ফিরা এই প্রথম হলো তার। রায়হান দরজা খুলে ফেলে। ব্যাগ টা হাতে নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে লাইট জ্বালিয়ে দেয়। নিপাও প্রবেশ করতে যাবেই তখনই তার নজর পড়ে নিচে। একটা সাদা ভাঁজ করা কাগজ পড়ে আছে দরজার ভিতরের কোনে। কেউ যেন বন্ধ দরজার নিচের ফাঁক-ফোকর দিয়ে কাগজ টা ঢুকিয়ে রেখে চলে গেছে। নিপা তৎক্ষণাৎ হেলে সেই কাগজ টা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। ভিতর থেকে রায়হানের ডাক আসে।

– কই, ভিতরে আসো। 

নিপা আর কাগজ টা খুলে দেখে না। চোখ ভালোভাবে মেলে কাগজ টা হাতে মুঠ করে ঘরে প্রবেশ করে। 

 

ঘরের সবকিছুই ঠিক তেমনটাই আছে যেমনটা ওরা যাওয়ার আগে রেখে গেছিলো। বিছানা পত্র সব গোছানো। রায়হান বিছানায় বসে পায়ের মুজা গুলো খুলতে থাকে। নিপা এসে ডেসিন টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়ায়। কানের দুল গুলো খুলে রাখতে থাকে। রায়হান মুজা খুলে সেগুলো বিছানায় রেখে বলে,

– গোসল করবা ? 

– এতো রাতে এতো ঠান্ডায় গোসল!

– এতোটা রাস্তা জার্নি করে আসলাম যে। 

– এমনি হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিবো। আমার ঘুম পাচ্ছে খুব। 

– আচ্ছা তাইলে আমি যাই, একটা ডুব দিয়ে আসি। গোসল না করলে এই শরীরে আমার ঘুম ধরবে না। 

নিপা কানের দুল খুলতে খুলতে পিছনে ফিরে বলে,

– তাড়াতাড়ি বের হবা কিন্তু। এমনিই পানি ঠান্ডা। জ্বর,সর্দি ধরবে তখন।

– খালি যাবো আর একটা ডুব দিয়েই চলে আসবো। তুমি শাড়ি পড়েই ঘুমাবা নাকি! 

– হ্যা, শাড়ি আমি সামলাইতে পারিনা আর এইটা পড়ে ঘুমাইতে যাবো। (সামনে আয়নার দিকে ফিরে) চেন্জ করে তারপর শুবো। তুমি যাও। রাত অনেক হইছে। আমার ঘুম ধরছে। 

– আচ্ছা ঠিক আছে। আর খিদা লাগছে নাকি! এখন যে খাবার গুলো নিয়ে আসলাম ঐগুলা খাও নাইলে। 

– না, এখন খাওয়ার মন নাই। ঐগুলা কাল আলিশা আর আমি ভাগ করে খেয়ে নিবোনে। তুমি যাও।

– আচ্ছা। 

রায়হান আলনা থেকে গামছাটা হাতে নিয়ে চলে যায় গোসল খানার দিকে। গোসল খানায় ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়। নিপা কানের দুল, গলার হালকা গহনা আর হাতের চুড়ি গুলো খুলে ডেসিন টেবিলের উপর রেখে বিছানায় বসে পড়ে। অনেক ঠান্ডা লাগতেছে। মন বলতেছে এখনি শুয়ে কম্বল ঢাকা নিয়ে ঘুমায় যাইতে। তখনই নিপার কাগজটার কথা মনে পড়ে। ডেসিন টেবিলের উপর কাগজ টা একটু আগে রেখেছিলো সে। বিছানা থেকে উঠে ডেসিন টেবিলের উপর থেকে কাগজ টা হাতে নেয়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কাগজ টা খুলে। সাদা কাগজের উপর কালো কালির কলম দিয়ে একটা নকশা আঁকা ছিলো। কিছু গাছ, একটা বাড়ি, একটা পুকুর, আর আশপাশ দিয়ে যাওয়ার রাস্তা গুলো। আর একটা যায়গায় লাল কালির কলম দিয়ে ছোট্ট ক্রস চিহ্ন আঁকা। নিপা সাথে সাথে মুখ তুলে আয়নার দিকে তাকায়। এটা কীসের ম্যাপ! দেখে তো মনে হচ্ছে এই বাড়িরই। কিন্তু এই লাল ক্রস দেওয়া যায়গাটা! এইটা দাঁড়া কী বুঝাইছে! আলিশার মা তাকে এই নকশাটা দিলো নাকি আবার! কিন্তু তিনি তো ঘর থেকে বের হোন না। তাইলে কী আলিশার দাঁড়া এটা আমার ঘরের দরজার নিচ দিয়ে ভিতরে ফেলে দিতে বলছেন! না, আলিশা এসব বিষয়ে জানেনা। সে তো তার মা যে ভালো তাও জানেনা। তাইলে! তাইলে কে রাখতে পারে!

রায়হান ভিতর থেকে ডাক দেয়,

– সুবা, তোমার চেন্জ হয়েছে! আমার গোসল শেষ। 

– না,,, আরেকটু দাঁড়াও। আমার হয়ে এসেছে।

বলেই নিপা কাগজ টাকে ভাঁজ করতে থাকে। এইটা নিয়ে কাল সকালে মাথা ঘামানো যাবে। এমনিতেই এতো রাস্তা বাসে এসে তার মাথা ঝিম ঝিম করতেছে। নিপা ভাঁজ করা কাগজটা তার হাত ব্যাগে রেখে হাত ব্যাগ টা ডেসিন টেবিলের ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রাখে। তাড়াতাড়ি চেন্জ করে নিতে হবে। ঘুমও ধরছে। রায়হান আবার বের হয়ে অন্য অবস্থায় দেখলে রোমান্টিক মুডে চলে গিয়ে তার ঘুমের বারোটা বাজাবে। নিপা ব্যাগ থেকে প্লাজু, থ্রী পিস বের করে শাড়ি খুলে বদলে নিতে থাকে। 

 

ব্যালকনির বাইরের প্রান্ত হতে এক হুতুম পেঁচা তাকিয়ে থাকে ঘরের দিকে। মনে হয় পেঁচাটা ছেলে পেঁচা, তাই নজর না সড়িয়ে নিপার কাপড় বদলানো দেখতেছে। আকাশের চাঁদ আজ আকাশ থেকে ছুটি নিয়ে ঘুরতে গেছে। কিছু খন্ড খন্ড মেঘ শুধু অভাগার মতো আকাশ তটে এদিকে-সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে।

 

_____

 

আরেকটা নতুন সূর্যদয়, আরেকটা নতুন সকাল। পাখিদের জন্য আবার একটি কর্মব্যস্ত দিন শুরু। অর্ধ থালার মতো সূর্য উঠে পুব আকাশে। মাঠ, ঘাট, পথ, প্রান্তর সব আলোকিত করে তুলে। কৃষকরা কাঁধে লাঙল আর গরু নিয়ে ছুট লাগায় তাদের কৃষিক্ষেতের দিকে। ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চারা দলবেঁধে স্কুলে যেতে থাকে। দু একটা সাইকেলে করে কিছু মানুষ চলে যায় তাদের কর্মস্থলে।

 

        দিথীর ঘুম ভাঙ্গে। জানালা দিয়ে এক টুকরো সোনালী আলো এসে তার মুখে যে পড়েছে। দিথীর ঘুম ঘুম চোখ দুটো মেলে যায়। পাশ থেকে চিৎ হয়ে শোয়।

কাল রাত ৩ টার দিকে বাড়ি ফিরেছিলো তারা। তানিয়া সামিহারা ওবাড়িতে চলে যায়। আর দিথী, শাহারিয়া, সুমু এইবাড়িতে চলে আসে। ভাগ্গেস শিউলি বেগম তাদের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। নাইলে সারারাত বোধহয় বাইরেই থাকতে হতো। দিথী শিউলি বেগমের সাথে না শুয়ে কাল রাতে শাহারিয়ার সাথে শুয়েছিলো। আর সুমুকে শিউলি বেগমের সাথে ঘুমোতে পাঠিয়ে দিয়েছিলো। ২১ তারিখের কাজও শেষ, তাই শিউলি বেগমও না করেন নি। দিথী, শাহারিয়া আর সুমু খেয়ে সবাই নিজ নিজ কক্ষে চলে যায় ঘুমাতে। দিথীও ঐ এক কাপড়েই এসে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। তবে তার আর শাহারিয়ার মিটআপ হয়নি। দিথী ক্লান্ত ছিলো। ও শুধু শাহারিয়াকে জড়িয়ে ধরে তার ক্লান্তি টাকে প্রশান্তির ঘুমে রূপ দিতে চেয়েছিলো। শাহারিয়াও তাকে ঠিক সেভাবেই সঙ্গ দেয়। দিথী কাল সারাটা রাত শাহারিয়ার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়েছে। অবশ্য তার মাথাটা এখন বিছানার বালিশেই। শাহারিয়া হয়তো আগে উঠে গেছে। 

দিথী চিৎ হয়ে শুয়ে চারপাশে চোখ দিতেই শাহারিয়াকে দেখতে পায়। শাহারিয়া বিছানার পায়ের দিকটায় ফ্লোরে ব্যায়াম করছিলো। কোমরের ব্যায়াম। দিথী উঠে বসে। হাই তুলতে তুলতে আড়মোরা ভাঙতে থাকে। শাহারিয়াও ব্যায়াম থামিয়ে দিয়ে পিছনে ফিরে তাকায়। দেখে দিথী উঠে গেছে। সেও এসে বিছানায় বসে। গায়ে সেন্টো গেন্জি নিচে ট্রাউজার। দিথী আড়মোরা ভেঙে সোজা হয়ে বসে। তার চোখ গুলো এখনো আলভোলা হয়ে আছে। শাহারিয়া বলে,

– ঘুম ভাঙলো তাইলে শেষ পর্যন্ত তোমার। 

– তুমি উঠে গেছো বলে ভাঙছে। নাইলে, (হাই তুলতে তুলতে) নাইলে আরো ঘুমাইতাম।

– আমি তো উঠছি সেই ভোরে। এখন কয়টা বাজে দেখছো? (ঘড়ির দিকে ফিরে) ৯ টা ১৫ বাজে গেছে। 

দিথীও ঘড়ির দিকে তাকায়। আসোলেই আজ সে বেশ বেলা করেই উঠেছে। দিথী তার গাঁয়ের কাপড় টেনেটুনে ঠিক করে মাথার উপরের দিক থেকে ওড়নাটা নিতে থাকে। শাহারিয়ার বলে,

– মা দুইবার ডাকতে এসেও ফিরে গেছে। কাল রাতে দেরি করে ঘুমাইছো। ক্লান্ত শরীর। তাই আমিও ডাকিনাই‌। 

– তোমার শরীর অনেক গরম।

– কার ? 

– তোমার। (আধখোলা চোখে মাতাল কন্ঠে বলে দিথী) 

– প্রথম ঘুমাইছো এইজন্য মনে হইতেছে। যাও এখন, ফ্রেশ হয়ে নাও। ঐদিকে নাস্তার পালা শেষ হয়ে দুপুরের খাবারের বন্দোবস্ত চলতেছে। 

দিথী তার দুই হাত বাড়িয়ে দেয়। যেন সে কোলে উঠতে চাইছে। শাহারিয়া বলে,

– এখন কোলে উঠার সময় নাকি। উঠো, মা আবার ডাকতে চলে আসবে। 

দিথী মাথা নাড়িয়ে না করে হাত দুটো তুলেই ধরে রাখে। সে কোলে উঠবেই। শাহারিয়াও আর না করেনা। বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে দিথীর কাছে এসে দাঁড়ায়। দিথী তার উপর থেকে কাঁথা সড়িয়ে রাখে। হাত দুটো এখনো উচিয়ে ধরে আছে। শাহারিয়া তাকে কোলে উঠিয়ে বিছানা থেকে নামায়‌। দিথীও কোলে উঠে দুই হাত আর দুই পা দিয়ে শাহারিয়ার শরীর পেচিয়ে ধরে। যেন কোন পোকা তার শিকারকে পেঁচিয়ে ধরছে। শাহারিয়া তাকে কোলে করে নিয়ে দরজার দিকে যায়। দিথীর ওজন খুব বেশি একটা ছিলোনা। দিথীর শারীরিক গঠন মধ্যম। লম্বাও খুব বেশি না। শাহারিয়ার গলা পর্যন্ত। ওজন হবে ঐ ৫০ এর মতো। 

শাহারিয়া দিথীকে নিয়ে দরজার সামনে এসে তাকে নামিয়ে দিতে নেয়। কিন্তু দিথী নামতে রাজি না। সে আরো জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রেখে চুপচাপ হয়ে থাকে। শাহারিয়া বলে,

– বাইরে মা-বাবা আছে বউ। তাদের সামনে এভাবে কোলে করে যাওয়া যায় নাকি! আজ তো চলে যাবো আমরা। ওখানে গিয়ে তখন সারাদিন কোলে উঠে বসে থেকো। 

দিথী কিছু বলেনা। ও নামতেই চাইছে না। শাহারিয়া আবার বলে,

– মা দেখে ফেললে তখন আরো মজা নিবে বউ। নামোনা প্লিজ। আমি তো কোথাও পালিয়ে যাচ্ছি না। ফ্রেশ হও। তখন ঘরে এসে কোলে বসে থেকো! 

দিথী এবার শাহারিয়ার কোল থেকে নামে। তার চোখের ঘুম ঘুম ভাব টা কিছুটা কেটেছে। শাহারিয়া বিছানা থেকে ওড়নাটা এনে দিয়ে তার বুকের উপর ভালোভাবে দিয়ে দেয়। বলে,

– এখন ফ্রেশ হয়ে মুখ ধুয়ে নাও। তারপর একসাথে নাস্তা খাবো। 

– তুমি নাস্তা খাওনি ? 

– না। সকালে উঠে আজকে জগিংয়ে বেড়িয়েছিলাম। একটু আগে এসে দেখি উঠোনাই। ভাবলাম একসাথে খাবো। তাই ঘরেও ব্যায়াম করতে শুরু করে দিছিলাম।

– আসো তাইলে আমার সাথে। আমি ফ্রেশ হয়ে নেই। তারপর একসাথে খাবো। 

– চলো।

দুইজনেই ঘর থেকে বেড়িয়ে চলে যায়। ঘরে শুধু পড়ে থাকে অগোছালো জড়ো হয়ে থাকা বিছানা আর বিছানার চাদর।

 

         মতিন মেম্বার বারান্দার দু’কদম সিড়ি বেয়ে নিচে আঙিনায় নামলেন। পড়নে সাদা পান্জাবি তার উপর খয়েরি কুর্তি। পায়ে চামড়ার জুতো। আকাশ আজ বেশ পরিস্কার। এইরকম সকাল স্বপ্নের চেয়েও সুন্দর। রান্না ঘরের পাশের খড়িরঘরের সাথে লাগানো কাঁঠাল গাছটায় বোধহয় পাখির বাচ্চা ফুটেছে। সকাল থেকেই পাখির কিচিরমিচির শব্দে বাড়ি মুখর। মতিন মেম্বার পিছনে ফিরে হাঁক দিয়ে বলতে থাকেন,

– শিউলি বেগম,,,, আমি গেলাম। দুপুরে খাইতে নাও আইতে পারি। তোমরা খাইয়া লইও। 

মতিন মেম্বারের ডাক শুনে শিউলি বেগমের ঘর থেকে ঘুম ঘুম চোখে বেড়িয়ে আসে সুমু। মতিন মেম্বার হাঁক দিয়ে পিছনে ফিরতে যাবেনই তখনই সুমুকে দেখে আবার দরজার দিকে তাকান। তিনি বেশ অবাকই হন। সুমুও কিছুটা ভয়ে ভয়ে ছিলো। চোখমুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে মনে হয় একটু আগেই ঘুম থেকে উঠেছে। মতিন মেম্বার মাথা চুলকাতে চুলকাতে অবাক গলায় বলেন,

– আমার শিউলি বেগম এক রাইতের মইধ্যে এতো পিচ্চি কেমনে হইয়া গেলো! না না। এইডা আমার শিউলি বেগম না। মনে হয় তো বউমা। কিন্তু আমার পোলার বউ হঠাৎ একরাইতে মাঝে এতো ফর্সা কেমনে হইয়া গেলো! পোলা কী আমার দুইডা বিয়া করলোনি আবার! 

তখনই পিছনের রান্নাঘর থেকে বেড়িয়ে আসেন শিউলি বেগম। শাড়ির আঁচল কোমরে বাধা। সেই আঁচল টা কোমর থেকে খুলে হাত মুছতে মুছতে মতিন মেম্বারের পিছনে এসে দাঁড়ান তিনি। বলেন,

– কী হইছে কী! চেচাইতাছো ক্যা!

মতিন মেম্বার পিছনে ফিরে তাকান। শিউলি বেগমকে দেখে বলতে থাকেন,

– ঐযে ঐ মাইয়ায় কেডা! আগে দেখছি বইলা তো মনে হয়না। শাহারিয়ায় নি আবার দুইডা বিয়া করলো!

– কেডা! সুমু! অয় তো আমার মাইয়া। 

– মাইয়া মানে! 

– কাইল রাইতে ডেলিভারি হইছে অর। তোমার নতুন মাইয়া।

– কী সব যাতা কইতাছো! একরাইতে মধ্যে তাইলে এতো বড় কেমনে হইলো!

– তোমার পেড যেমনে খাওনের পর হঠাৎ বড় হইয়া যায় এমনে হইছে। হা হা হা! 

– হাসি থামাও। খালি সবসময় হাহাহিহি করতেই থাহো। মাইয়াডা কেডা? (পিছনে ফিরে) এই মাইয়া, তোমার নাম কী ? কইত্তে আইছো! তোমার বাপের নাম কী ! 

– জ,জ্বী আমার নাম সুমু। সামিয়া বিনতে সুমু। 

– কইত্তে আইছো! 

শিউলি বেগম মতিন মেম্বারকে তার দিকে ফিরিয়ে বলেন,

– আমার এই পেডের থে আইছে। এহন তুমি যেহানে যাইতাছিলা যাও। অয় আমার নতুন মাইয়া। ওরে আমি আকাশের থে পাইছি। এইবার হইছে! এহন যাও। অয় আইজ থে এইবাড়িতই থাকবো। 

– থাকবো না হয় বুঝলাম। কিন্তু অর মা-বাপে যে অরে তহন খুঁইজা বেড়াইবো!

– তোমারে আমি সব পড়ে বুঝায় কমুনে। তুমি অহন যাও তো। আর হুনো হুনো। আইজ বিকালে শাহারিয়ারা চইলা যাইবো। তুমি শৈশবের হাতে খাসির মাংস কিন্না পাডায় দিবা। 

– শৈশব কই। আহেনাই এহনো অয়! 

– না। তোমার লোকের খবর আমি জানমু কেমনে। আর হুনো। তুমিও দুপুরে চইলা আইবা। আইজ সবাই একলগে খামু আমরা। পরে কহন শাহারিয়া আহে না আহে। আর শৈশবরেও আইনো। মাংস দেইখা শুইনা কিনবা। আইজ সকালে জবাই হওয়া কচি খাসিডার মাংস আনবা। বুজ্জো কী কইছি! 

– আইচ্ছা ঠিকআছে। আমি দুপুরে আইয়া পড়মুনে। তুমি ওগো সবকিছু দেইখা শুইনা গুছায়া দিয়ো। আমি গেলাম।

– হ যাও। 

মতিন মেম্বার চলে যেতে থাকেন আঙিনা পেড়িয়ে দরজার দিকে। শিউলি বেগম সুমুর দিকে ফিরে বলেন,

– উডছো। যাও যাইয়া ফ্রেশ হইয়া নাও। ঐদিকে বেসিন আছে। বাথরুমও ঐদিকেই।

– আচ্ছা। 

– আইচ্ছা তুমি যাও। ততক্ষণে আমি পায়েশ টা একটু গরম কইরা আনতাছি। 

বলেই শিউলি বেগম চলে যান রান্নাঘরের দিকে। সুমু এখনো লায়লার কাপড়েই আছে। দিথী আর শাহারিয়া চলে আসে কথা বলতে বলতে। সুমুর সামনে এসে দাড়াতেই দিথী, শাহারিয়ার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে তার দিকে তাকায়। বলে,

– কখন উঠলি!

– একটু আগেই উঠলাম আপু।

– ঘুম কেমন হইছে! মা তোর উপর আবার পা-টা তুলে দিছিলো নাকি! 

সুমু মাথা নাড়িয়ে না বলে। দিথী হাসিমুখে বলে,

– ঘুমাইলে মায়ের কোন হুঁশ থাকেনা। চল ফ্রেশ হয়ে নেই। বেলা অনেক হইলো।

সুমু মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। দিথী সুমুকে নিয়ে চলে যায় ফ্রেশ হতে। শাহারিয়া চলে যায় বারান্দার বিপরীত পার্শ্বে। অর্থাৎ ডায়নিং টেবিলের দিকে। আকাশে কিছু পাখি দল বেঁধে উড়ে চলে যায়।

 

      রান্নাঘরে রান্না করছেন শিউলি বেগম। মাটির চুলায় ভাতের হাঁড়ি বসিয়েছেন। গ্যাসের চুলাও আছে পাশের টেবিলে। তবে সেখানে শুধু তরকারি রান্না করেন। পিড়িতে বসে ভাতের চুলায় আগুন ধরিয়ে দিয়ে পাশের মাটির চুলা টায় পায়েশের পাত্র বসান। সেই সকাল সকাল রান্না করেছিলেন। এখনো দিথী, শাহারিয়া, সুমু নাস্তা করেনি। তাই আবার গরম করতে হচ্ছে। লায়লা আর ফুলমতি বাড়ির পিছনের বাগানটায় আছে। তাদেরকে গাছ গুলোতে পানি দিতে পাঠিয়েছেন শিউলি বেগম।

হঠাৎ শিউলি বেগমের পিছন উদয় হয় হনুফা। চোখ বড় বড় করে ললুভ দৃষ্টি নিয়ে শিউলি বেগমের কাঁধের পাশে মুখ এনে ধোঁয়া ওঠা পায়েশ দেখতে থাকে। শিউলি বেগমের সেদিকে খেয়াল ছিলোনা। তিনি আনমনে পায়েশ গরম করছিলেন। তখনই তার কাঁধের উপর মুখ রাখা হনুফা বলে উঠে,

– বইন, আমি একটু পায়েশ খাই! 

– পায়েশ গরম হোক আগে। তারপর। (বলেই শিউলি বেগম পিছনে ফিরে তাকান। আর অমনি হনুফাকে দেখে এক চিৎকার দিয়ে পিছনে ছিটকে পড়ে পিছিয়ে যান। হনুফাও শিউলি বেগমের চিৎকারে ভয় পেয়ে রান্না ঘর থেকে ছুটে পালিয়ে যেতে থাকে। শিউলি বেগম চিৎকার দিয়ে বলতে থাকেন,

– এই, ভূত ভূত। রান্নাঘরে ভূত আইছে।(একটু থেমে চারপাশ দেখে) এইডা কী আছিলো! কইত্তে আইলো! 

তখনই আবার শিউলি বেগমের কাঁধের পাশে হনুফা উদয় হয়। বলে,

– আমি ভূত না। আমার নাম হনুফা। হনুফা মতি। 

তখনই শিউলি বেগম আবার তার কাঁধের দিকে দেখে ভয়ে উঠে দৌড় দেন। রান্না ঘর থেকে দৌড়ে বেড়িয়ে আসেন। হনুফা শিউলি বেগমকে এতো ভয় পেতে দেখে কিছুই বুজতে পারেনা। সে দরজার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে চুলার পায়েশের দিকে তাকায়। পায়েশ দেখে তার মুখ দিয়ে যেনো লালা পড়তে থাকে।সে পায়েশের পাতিল ছুঁতে যায় অমনি তার হাতে গরম ছ্যাকা লাগে। ভয়ে ছিটকে পিছনে পড়ে যায়। দিকবিদিক না দেখে রান্না ঘর থেকে পালবার পথ খুঁজে। দরজা দিয়ে পালিয়ে যায় বাইরে। রান্না ঘরের একপাশের সব বোয়ম-টয়ম উল্টে পড়ে থাকে মেঝেতে। যেন কোন ঝড় বয়ে গেলো রান্না ঘরের উপর দিয়ে।

 

____

 

নিপা বিছানা গোছাচ্ছে। রায়হান মাত্রই বেড়িয়ে গেলো অফিসে যাওয়ার জন্য। নিজের অফিস, তাই বলে যে যখন ইচ্ছে তখন যাবে, তা না। রায়হান বেশ শৃঙ্খল ভাবেই সবকিছু মেইনটেইন করে, তা হোক ঘর, হোক বাহির। তার সময়ানুবর্তিতার প্রশংসা যেন না করলেই নয়। নিপা বিছানা গুছিয়ে চলে গেলো ঘরের কোনে রাখা ব্যাগ টার দিকে। আলিশার জিনিস গুলো গিয়ে তাকে দিয়ে আসা উচিত। আলিশাকে আজ সকাল থেকে দেখেনি নিপা। হয়তো জানেই না যে নিপারা এসেছে। নিপা ব্যাগ থেকে পুঁথির মালা, একটা গোল টুপি, আরেকটা জামা বের করে। জামাটা ঐখানকার আঞ্চলিক নারীদের পোশাক। আলিশা তো বেশ সৌখিন একটা মেয়ে। নিশ্চয়ই সে এটা পছন্দ করবে। নিপা সেগুলো হাতে নিয়ে দাড়াতেই কারো চিল্লানোর আওয়াজ পায়। নিপা ভ্রু কুঁচকে চারপাশে তাকায়‌। না আওয়াজ টা এই ঘর থেকে না। নিচের অন্দরমহল থেকে আসছে‌। গলাটাও তো রায়হানের। নিচ থেকে হট্টগোলের আওয়াজ কেনো আসছে ? কিছু আবার হইলো নাকি! নিশ্চয়ই রায়হানকে তার বাবা বকতেছে। ফোন দিছে ফোন ধরেনাই যে। নিপা তাড়াতাড়ি জিনিস গুলো বিছানায় রেখে ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়।

 

    রায়হানের চোখ রক্ত লাল, ছলছল করছে চোখগুলো। নজরুল সাহেবের সাথে সে তর্কে জড়িয়ে পড়েছে। রায়হান আবার জোড়ে চিৎকার দিয়ে বলে,

– বাসায় এতো গুলা মানুষ থাকতে কীভাবে কেউ এসে খুন করতে পারে! বাড়ির মানুষ গুলা কী ঐসময় ঘাস কাটতে গেছিলো! 

– রায়হান,, চিৎকার করিস না। বাড়িতে তখন আমি, রাফসান, শাহেদ, সাদিক কেউ ছিলাম না। আর আখিকেও অজ্ঞান করে ফেলে কাজ টা করছে। আমরা তো পরে বাসা এসে দেখি এই অবস্থা। 

– কেনো বাসায় তোমার বউ ছিলোনা? তার কানে কী একবারো আওয়াজ যায়নাই ? 

– রায়হান,,,,,! কথা ঠিক করে বল। তোর মা হয় মা!

– আমি মানি না। আমি কাউকে মা মানিনা। যে আমাকে জন্ম দিতে পারে সে কখনোই আমার পায়ে গরম লোহা বসাইতে পারে না।

– রায়হান,,,,,, চোপ। আর একটা কথাও বলবিনা তুই। 

রায়হান রক্ত লাল চোখের পানি মুছে। আবার কটমট গলায় বলে,

– আলিশাকে কে মারছে! তার মা’কে কে মারছে! 

– আমি জানিনা। আমি কিচ্ছু জানিনা। 

– কেনো জানোনা! কেনো জানোনা তুমি! (কাঁদতে কাঁদতে)  আলিশা আমার ছোট বোন ছিলো। ভাইয়া ভাইয়া ডাক দিয়ে আমার কান ঝালাপালা করে দিতো। (একটূ থেমে) তোমাকে মামা বলে ডাকতো। মামা,,,,! ছোট্ট ফুলের মতো বোনটাকে কে মারলো! তোমার কী একবারো ভিতরটা কাঁদে উঠেনি! এতোটা পাষাণ ভাবে কীভাবে আছো হ্যা! কীভাবে আছো! 

সাদিক এসে রায়হানকে ধরে। তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে সোফায় বসায়। রায়হান এখনো ছলছল রক্ত চোখ নিয়ে নজরুল সাহেবের দিকে তাকিয়ে ছিলো। 

 

   উপর থেকে সিড়ি বেয়ে নামতে নামতে সব কথা গুলো শুনে নিপা। যে যেন আরেকটু হলেই পা ফসকে গড়িয়ে পড়তো। এটা কী শুনলো সে! আলিশা মারা গেছে! আলিশা মারা গেছে ? ২ দিন আগেও তো ফুটফুটে মেয়েটা তাকে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বিদায় জানালো। একটা সুন্দর হাসি দিতে দিতে তাকে হাত নাড়লো। সেই মেয়েটা মারা গেছে! নিপার ভিতরে ভিতরে খুব কষ্ট লাগতে থাকে। ওর আলিশাকে একলা ছেড়ে যাওয়া উচিত হয়নি। কী হতো আর কয়টা দিন পর ঘুরতে গেলে! কী হতো! নিপাও কান্নায় ভেঙে পড়ে। অন্দরমহলে থাকা সোনালী যায় তার দিকে। নজরুল সাহেব এখনো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। আঁখি মুখে ওড়না চেপে কাঁদছে। তবে এখানে নেই সুমনা বেগম। তিনি যেন মনের সুখে রান্না ঘরে রান্না করছেন। এসব যেন তার কাছে ন্যাকা কান্না লাগছে। 

সোনালী গিয়ে নিপাকে ধরে। নিপা মাঝ সিড়িতেই বসে পড়ে। সোনালী তার পাশে বসে তাকে শান্ত করতে থাকে। সোনালীর মুখভঙ্গি এমন ছিলো যে সেও আঁখির মতো আলিশার মৃত্যুতে মন খারাপ করে আছে। তারও কষ্ট হচ্ছে আলিশাদের জন্য। সোনালীর অভিনয় যেন কোন পাকা অভিনেতাকেও হার মানায়। নিপা একবার ছলছল চোখ গুলো নিয়ে সোনালীকে দেখে। সোনালীকে সে চিনতো না। তবুও এই বাড়ির কোন সদস্য ভেবে সে তার কাঁধে মাথা রেখে কাঁদতে থাকে। সোনালীও তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। বলতে থাকে ‘ আর কেদোনা, পৃথিবীতে সবাই চিরকাল থেকে যায় না। আর কেদোনা। কিচ্ছু হয়নি। ‘ নিপা এইবার শব্দ করে কাঁদতে থাকে। তার মন যে আলিশার হঠাৎ মৃত্যু মেনে নিতে পারছেনা। আলিশা তার জন্যই মারা গেছে। সে নিজেকেই এর জন্য দোষী ভাবতে থাকে।

সোফা থেকে নিপার কান্না শুনে উপরে তাকায় রায়হান আর সাদিক। নিপাকে এভাবে কাঁদতে আগে কখনো দেখেনি রায়হান। হয়তো আলিশাকে তার মতোই খুব আপন করে নিয়েছিলো নিপা। আলিশা মেয়েটাই তো ছিলো পরিস্ফুটিত এক রঙিন ফুলের মতো। যে কেউ যে তার মায়ায় বিঁধে তাকে আপন করে নিতে বাধ্য। নিপা, রায়হান তো তাকে ছোট্ট আদুরে বোন হিসেবে নিয়েই এতোটা কষ্ট পাচ্ছে, সে যায়গায় আলিশাকে ভালোবাসা সেই মানুষটা! সে তো বিচ্ছেদের যন্ত্রনায় ছটফট করছে, আমৃত্যু যন্ত্রনা যে তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। বড্ড আফসোস থেকে যাবে তার, নিজ মুখে বলা ভালোবাসার কথাটা আলিশার কানে না পৌছানোর, আফসোস থেকে যাবে একটা বার সেই দুই নয়ন ছোঁয়া ভালোবাসা না পাওয়ার! ভালোবাসা মানেই কলঙ্ক বাঁধা এক মুঠোসুখ, ভালোবাসা মানেই বিষাদ ঘেরা সহিষ্ণু বিমোহুক!!

 

________

 

রিয়াদ থানা থেকে বের হয়। সে অস্থির, উৎদিপ্ত। ফোন এসেছিলো দিনাজপুর থেকে, আলিশা আর সুরাইয়া বেগমের লাশ যেই ফরেনসিক ল্যাবে রাখা হয়েছিলো সেখান থেকে নাকি কে বা কারা লাশ দুটো চুরি করে নিয়ে গেছে। লাশের সাথে থাকা কিছু এভিডেন্সও নাকি পাওয়া যাচ্ছেনা। ফরেনসিক ল্যাবের দুই ডাক্তার বাঁধা দিতে যাওয়ায় তাদেরকেও আহত করেছে দুর্বৃত্তরা।

 রিয়াদ বাইকে উঠে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাকে সেখানে যেতে হবে। খুন হওয়া লাশ চুরি হয়ে যাওয়া মানে জল অনেক দূর গড়াবে। উপরের লোক, মিডিয়া সবাই হলাও করে এটা প্রচার করবে। রিয়াদ আর এক মুহুর্তও দেরি করে না। বাইক নিয়ে সজোরে ছুটে যায়। তখনই এক এসইউভি কার সেই গ্রামের কাঁচা রাস্তা হতে তার বাইকের পিছু নেয়। গাড়ির গ্লাস গুলো কালো ছিলো, তাই ভিতরের কিছুই দেখা যাচ্ছিলো না। গাড়িটা বাইকটাকে ফলো করতে করতে চলে যায়। আকাশে আবার মেঘ জমতে শুরু করে, যেন আবার কোন অসুভ কিছুর বার্তা বয়ে আনছে! কোন খারাপ কিছু ঘটার ইঙ্গিত দিয়ে সাবধান করে দিচ্ছে কাউকে। থানার সামনের রাস্তা আবার শুনশান আর নিশ্চুপ হয়ে যায়। শুধু কাঁচা রাস্তায় রয়ে যায় বড় গাড়িটার ফেলে যাওয়া মোটা চাকার দাগ!!!

 

চলবে ,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

 

 

 

 

 

 

 

 

উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন:: ২(মুখোশ)

পর্ব :: ৭০ (১ম ভাগ)

লেখক :: মির্জা শাহারিয়া

 

দুপুর বেলা। রোদ উঠেছে আজ বেশ। আকাশে তেমন একটা মেঘের দেখাও নেই। শুধু মাঝে মাঝে হালকা একটু বাতাস বয়ে যাচ্ছে। 

ফুলমতি দুটো তরকারির বাটি হাতে আঙিনা থেকে বারান্দায় উঠলো। ডায়নিং টেবিলে খাবার সাজাচ্ছিলেন শিউলি বেগম। ফুলমতি গিয়ে বাটি গুলো টেবিলে রাখে। মতিন মেম্বার এসে বসেন চেয়ারে। শাহারিয়া, দিথী, সুমু বেসিনের দিকে হাত ধুচ্ছে। আফাজ ঘর থেকে বেড়িয়ে এসে ডায়নিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালো।

আজ সকাল ১১ টার দিকেই আফাজকে ক্লিনিক থেকে নিয়ে আসে শাহারিয়া আর শৈশব। আফাজ যে এখন পুরোপুরি সুস্থ তা নয়। ডান হাতের চোট এখনো সাড়েনি। ডান হাতটা ব্যান্ডেজ করে গলার সাথে ঝোলানো। আফাজ এখনো মানসিক দিক দিয়েও আগের মতো সুস্থ হয়ে উঠেনি। তবে উন্নতি ঘটেছে। 

শিউলি বেগম টেবিলে খাবার সাজাতে সাজাতে পিছনে ফিরে তাকান। দেখেন আফাজ রুম থেকে এসেছে। শিউলি বেগম তার পাশের চেয়ার টা টেনে বলতে থাকেন,

– এহানে বহো। তোমারে কতখোন আগে ডাইকা পাঠাইছিলাম, আর তুমি এহন আইলা। (একটু থেমে) তুমি তো খাসির মাংস পছন্দ করোনা। তোমার লাইগা পড়ে গরুর মাংস আনাইছি। 

আফাজ চেয়ারে বসে পড়ে। মাথা নিচু করে থাকে। তার মন এখনো বিষন্ন। শিউলি বেগম বাকি চেয়ার গুলোর সামনে প্লেট দিয়ে দেন। দিয়ে আফাজের প্লেট টা তুলে সোজা করেন। ভাত তুলে দিতে থাকেন। দিথী, শাহারিয়া আর সুমুও চলে আসে। দিথী শাহারিয়া বসে পড়ে। সুমু বসতেই যাবে তখনই তার চোখ পড়ে আফাজের দিকে। তার হৃদস্পন্দন যেন ক্ষানিক্ষনের জন্যও থেমে থেমে আসছিলো। আফাজ এখানে কী করছে! আফাজ কী এই বাড়ির কেউ! তাদের যে এভাবে আবার দেখা হয়ে যাবে সুমু ভাবেনি। সে আরো আজ বিকালে ক্লিনিকে যাওয়ার চিন্তা করছিলো। শিউলি বেগম সুমুকে চেয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাকে বলেন,

– আরে খাড়াইয়া আছো ক্যা। বহো‌। ঐ চেয়ারটাতেই বহো।

শিউলি বেগম কথাটা বলা শেষ করে আফাজের ভাত উঠিয়ে দিতে থাকেন। আফাজ মাথা উঁচিয়ে প্লেটের দিকে তাকায়। তখনই তার নজর পড়ে ঠিক তার সোজাসুজি টেবিলের অন্য প্রান্তে। এটা ঐ মেয়েটা না! হ্যা। ঐ মেয়েটাই। ও এখানে কী করে! আফাজ শব্দ করে বলে উঠে,

– তুমি ? 

সুমুর বুকের স্পন্দন যেন হঠাৎ করেই বেড়ে যায়। সে কী বলবে, ভেবে পায় না। তখনই শিউলি বেগম আফাজকে বলেন,

– তুমি সুমুরে চিনো!

আফাজ মুখ নামিয়ে প্লেটের দিকে তাকায়। ধীর গলায় বলে,

– হ্যা। 

– আয়হায়, তোমাগো দেহা হইলো কোনে! 

আফাজ মুখ তুলে সুমুর দিকে তাকায়। সুমুর চোখ গুলো ভয়ার্ত। কোটরে জল ছল ছল করছে যেনো। আফাজ মুখ নামিয়ে নিয়ে বলে,

– রাস্তায় দেখেছিলাম একদিন। 

– ওহহ , তাই কও। সুমু আমার মাইয়া। আমার মতোই সুন্দরীও হইছে তাই না! 

– হমম। 

শিউলি বেগম কথা বলতে বলতে শাহারিয়া আর দিথীর প্লেটের ভাত উঠিয়ে দেন। শাহারিয়া আর দিথী পাশপাশি বলেছিলো। মতিন মেম্বার এসে বসলেন শিউলি বেগমের পাশের চেয়ারটায়। টেবিলের লম্বা দুই প্রান্তের এক পাশে বসেছে সুমু আরেক পাশে আফাজ। আর আফাজের পাশে দাড়িয়ে আছেন শিউলি বেগম। তার পাশের চেয়ারে বসেছেন মতিন মেম্বার আর তারপর একটা চেয়ার ফাঁকা, পরের চেয়ার গুলোতে শাহারিয়া আর দিথী। 

ফাঁকা চেয়ারটায় এসে শৈশব বসলো। শিউলি বেগম তার পাতেও ভাত উঠিয়ে দেন। লায়লা আর ফুলমতি বাকি তরকারির বাটি গুলো এনে বাকিদের মাংস উঠিয়ে দিতে থাকে। শিউলি বেগম এক বাটি থেকে মাংস আর আলু ভাজি আফাজের পাতে উঠিয়ে নিয়ে প্লেটটা নিজ হাতে নেন। ভাত মেখে আফাজকে খাইয়ে দিতে থাকেন। আফাজের ডান হাত টা এখনো ব্যান্ডেজ করে গলার সাথেই ঝোলানো। সে তো নিজ হাতে খেতে পারবেনা। আফাজ মুখে ভাতের নলা নিয়ে মাথা নিচু করে চুপচাপ খেয়ে নিচ্ছে। বাকিরাও খাওয়া শুরু করেছে। তবে সুমু চুপচাপ। তার পাতে সব এসেছে, কিন্তু সে শুধু হাত দিয়ে ভাত নেড়েই যাচ্ছে। আর তার সামনাসামনি টেবিলের অপর প্রান্তে বসে থাকা আফাজকে দেখছে। শিউলি বেগম আফাজকে আরেক নলা ভাত মুখে তুলে দিয়েই সুমুর দিকে তাকান। সুমু তাড়াতাড়ি নজর নামিয়ে নেয়। ভাতের নলা মুখে তুলতে যায়, তখনই শিউলি বেগম বলেন,

– কী,,! তোমারেও খাওয়াইয়া দেওয়া লাগবো নাকি! 

সুমু মাথা নাড়িয়ে না বলে। দিথী সুমুর পাশে বসেছিলো। সে সুমুর পাতে আরেক টুকরো মাংস উঠিয়ে দেয়। 

শিউলি বেগম ভাত মেখে আফাজকে খাইয়ে দিতে দিতে শৈশবকে বলেন,

– কীরে, রান্ধা কেমন হইছে! 

– হ চাচি‌। (খেতে খেতে) রান্ধা অনেক ভালা হইছে। আপনে খুব ভালা রান্ধেন। 

– হ। তোর তাইলে ভালাই লাগছে। (আফাজকে আরেক নলা দিয়ে) এদিকে তোগো মেম্বার সাব, হের মনে হয় ভালা লাগে নাই। না!!

– আরে আরে না। রান্না ভালা হইছে তো। আমি তো খাইতে খাইতে দমই নিতে পারতাছিনা। তোমার রান্নার প্রশংসা যতই করমু ততই কম হইবো। 

– হ্যা মা। রান্না তোমার অনেক ভালো হইছে। (শাহারিয়া)

– হ, বুঝলাম। আমার দিন তারমানে ফুরায়া আইছে। (কিছুটা আক্ষেপের সুরে) 

– মানে! কীসের দিন ফুরায়া আইছে! (মতিন)

– আইজ সব দিথী রানছে। হের রান্না তোমাগো এতো ভালা লাগছে! আমার বেলায় কারো মুখ দিয়া কতা ফুটেনা, মনে হয় রান্ধা ছাইড়া দিয়া সন্ন্যাসী হওয়া লাগবো। 

– আরে আরে না না শিউলি বেগম। ত,তোমার রান্নাও তো ভালা হয়। আ,আমি তো এমনিই কইছিলাম। না মানে এই রান্নাও মজা হইছে। কিন্তু তোমার ডা আরো বেশি মজার। 

– তারমানে এই রান্না কম মজার হইছে! 

– হ, মানে না। মজা হইছে কিন্তু তোমার ডা তো অমৃত। ঐ রান্নার স্বাদ কী আমি ভুইলা যাইতে পারি। 

– বুজ্জো দিথী, তোমাগো মেম্বারসাব তেল দিতে ভালাই জানে। রান্না আইজ সবগুলা আমিই করছি। খালি একটু চেক দিতাছিলাম যে তুমি কার বেলা কী কও। আর দিথী আইজ চইলা যাইবো, ওরে আমি রান্না ঘরে পাঠাইতে যামু কোন দুঃখে! 

মতিন মেম্বার তাড়াতাড়ি মাথা নামিয়ে কোন মতে গিলতে থাকেন। সবার সামনে কেমন একটা অবস্থায় ফেলে দিলো তাকে! দিথী মুচকি হেঁসে তার খাবার খেতে থাকে। পাশে ফিরে সুমুকে দেখে, এখনো সে আবার ভাত নেড়ে যাচ্ছে। দিথী সুমুর হাত নাড়িয়ে বলে তাড়াতাড়ি খেয়ে নিতে। সুমু দিথীর ছোঁয়া পাওয়ার সাথে সাথে মুখ নামিয়ে নিয়ে ভাত খেতে থাকে। 

শাহারিয়া একটা মাংস তার প্লেট থেকে দিথীর প্লেটে উঠিয়ে দেয়। দিথী বলে,

– আমার আছেতো, তুমি খাও।

– মচমচে হাড় আছে ঐটায়। তোমার তো মচমচে হাড় পছন্দ। 

দিথী একটা মুচকি হাসি দিয়ে তার খাবারের দিকে তাকায়। শাহারিয়াও না, কিচ্ছু ভুলেনা। ছোট থেকে ছোট কথা গুলো পর্যন্ত ওর মনে আছে। 

 

মতিন মেম্বার খেতে খেতে মাথা উঠিয়ে দেখেন সবাই এখন চুপচাপ খাচ্ছে। আফাজও মুখে ভাতের নলা নিয়ে মাথা নিচু করে চিবোচ্ছে। মতিন মেম্বার শিউলি বেগমের দিকে মুখ বাড়িয়ে আঁ করেন। যেন শিউলি বেগম তাকে এক নলা ভাত খাইয়ে দেয়। শিউলি বেগম তা দেখেই একটা ছোটখাটো মুচকি হাসি দেন। তিনি আফাজের প্লেট থেকে একটা হাড় উঠিয়ে দিয়ে মতিন মেম্বারের মুখে দিয়ে দেন। মতিন মেম্বার ভালোভাবে দেখেননি। মুখে নিয়ে চিবোতে যাবার সময়ই তার দাঁতের মাড়ি গুলা যেন বলে উঠে ‘ ভাই, বুড়া বয়সে দাঁত গুলা তোর এমনিই পড়বে। তারপর আবার তুই হাড্ডি চাবাইতে গেলি ক্যান! ‘ 

মতিন মেম্বার সাথে সাথে মুখ পাশে ফিরিয়ে হাড় মুখ থেকে ফেলে দেন। কাশতে থাকেন। দাঁত গুলোতে ব্যাথা ধরায় দিছে রে! শিউলি বেগম হাঁসতে হাঁসতে শেষ। বাকিরা মুখ তুলে বুঝার চেষ্টা করতেছে যে, হঠাৎ হইলো টা কী এখানে! লায়লা এক গ্লাস পানি এনে মতিন মেম্বারকে দেন। মতিন মেম্বার পানি খেতে থাকেন। শিউলি বেগম আরেক নলা ভাত মতিনের মুখের দিকে এগিয়ে দিয়ে হাসিমুখে বলেন,

– আর খাইবা ভাত! নেও হা করো তোমারে খাওয়াই দেই! হা হা হা!!!

সবাই হাসতে থাকে। সবাই যেন বুঝেছে ব্যাপার টা আসলে কী হয়েছে। তবে আফাজ আর সুমু হাসেনা। আফাজ চুপচাপ মুখ নিচের দিকে করে ছিলো। আর সুমু তাকে এক নজরে দেখছিলো। হাত দিয়ে ভাত নেড়ে যাচ্ছিলো। তার যে খাবারের প্রতি খুদা নেই। তবে মনে ছিলো অন্য এক খুদা। এই খুদা তার প্রিয়জনকে দেখবার খুদা। হঠাৎ সুমুর পাশে টেবিলের নিচে উদয় হয় হনুফা। সে মাথা উঠিয়ে চারপাশ দেখে। সবাই হাসতেছে, কিন্তু সুমু সোজা সামনের ছেলেটাকে দেখছে‌। হনুফা চুপিচুপি হাত টা উঠিয়ে সুমুর পাত থেকে সব মাংস নিয়ে নেয়। নিয়েই আবার টেবিলের নিচে ডুব দেয়। টেবিলের নিচে ফ্লোরে বসে সব মাংস গুলো একসাথে মুখে পুরে দেয়। তার মুখে ফুলে যেনো টেনিস বল হয়ে যায়। মুখে মাংস চিবোতে চিবোতে হাতে লেগে থাকা ঝোল গুলো চেটে চেটে খেতে থাকে। রান্না আসলেই অনেক ভালো হয়েছে!!

 

আঙিনার কোনায় থাকা কাঁঠাল গাছ টার পাখির বাসায় মা পাখি ফিরে আসে। এসে বাচ্চাদের মুখে খাবার দিতে থাকে। আকাশের সূর্য চলে যায় এক খন্ড মেঘের আড়ালে।

 

____

 

বড় একটা ল্যাবের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে রিয়াদ আর ওসি হাফিজুর রহমান। ল্যাবের যন্ত্রপাতি সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। টেস্টটিউবের শিশি গুলো ভেঙে ফ্লোরে পড়ে আছে। কিছু রক্তও পড়ে আছে ফ্লোরে। যেই বেডে আলিশা আর সুরাইয়া বেগমের লাশ দুটো রাখা হয়েছিলো সেই বেড দুটোও উল্টে পড়ে আছে। রিয়াদ হেলে নিচের ফ্লোরে পড়ে থাকা রক্তটা আঙুল দিয়ে ছোঁয়। উঠে দাঁড়িয়ে দুই আঙুল দিয়ে রক্তটা ঘষে। তার পিছন থেকে ওসি হাফিজুর বলেন,

– ফরেনসিক দুই ডাক্তারের রক্ত এটা। খুব খারাপ ভাবে তাদের আহত করা হয়েছে। 

– রক্ত টাও একদম তাজা। (পিছনে ফিরে) নিচে সিকিউরিটি গার্ড থাকার পরও আগন্তক ভিতরে কীভাবে আসতে পারলো? 

– তাদের মুখে স্প্রে করে অজ্ঞান করা হয়েছিলো। আমরা এসে তাদের কেউ হসপিটালে পাঠায়েছি।

– লাশ তো আর হাতে করে নিয়ে যেতে পারবেনা যে কেউ! নিশ্চয়ই সাথে এম্বুলেন্স এনেছিলো ওরা। 

– হয়তোবা। 

 

রিয়াদ চারপাশ দেখতে থাকে। দেয়ালে দেয়ালে বিভিন্ন বিজ্ঞানীর ছবি ঝুলছে। বড় বড় রসায়নের চার্ট ঝুলছে। রিয়াদের চোখ যায় ঘরের কোনে। একটা সিসি টিভি ক্যামেরা লাগানো সেই কোনটায়। রিয়াদ পিছনে ফিরে বলে,

– এই ক্যামেরার ফুটেজ কোথায় পাওয়া যাবে? 

– কিন্ত ক্যামেরাতে তো গুলি করা হয়েছে। 

– হ্যা, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত সেটার সামনে এসে আগন্তুক দাড়িয়েছে আর বন্দুককের হাত তুলেছে ততক্ষণ পর্যন্ত তো কিছু সিন তো ক্যামেরায় ধরা পড়েছে! 

– হ্যা ততটুকু ফুটেজ পাওয়া সম্ভব‌। 

– এভিডেন্সও সব নিয়ে গেছে তাই না! 

– হ্যা। এভিডেন্সও কিছু পাওয়া যায়নি। তবে এই ল্যাবের কম্পিউটারে কিছু ইনফরমেশন ছিলো। 

– যেমন?

– লাশ গুলোর শরীরে আঘাত করা হয়েছে লম্বা ছুরি দিয়ে। আর খুব বেশি রক্ত ক্ষরণের কারণে ১৭ বছর বয়সী মেয়েটার মৃত্যু হয়েছে। আর,

– আর কি ?

– আর যিনি বয়স্ক ছিলেন তার রক্তে ড্রাগ পাওয়া গেছে।

– ড্রাগ ? (অবাক হয় রিয়াদ)

– হ্যা ড্রাগ। ফিলোফিসিয়াম ড্রাগ। এটা দিয়ে যেকোন মানুষের মস্তিষ্কের নিউরনে জমা থাকা ডাটা ধীরে ধীরে মুছে ফেলা যায়। এমনকি স্মৃতি শক্তি পর্যন্ত নষ্ট করে ফেলা যায় এটা প্রয়োগের মাধ্যমে। 

– এটা তো বেশ দামি একটা ড্রাগ! 

– হ্যা। এইটার অস্তিত্ব বয়স্ক মহিলার শরীরে পাওয়া গেছে। এই তথ্য গুলাই কম্পিউটারের 405 নং ফোল্ডারে ছিলো। দুর্বৃত্তরা হয়তো জানতো না এই বিষয়ে। তাই কম্পিউটার টার বেশি ক্ষতি করেনি তারা। 

– হমম। বেশ ইন্টারেস্টিং। (পায়চারি করে সামনে এগিয়ে এসে) সুরাইয়া বেগমের শরীরে ড্রাগ! তিনি কী তাইলে ড্রাগস নিতেন! কেস টা ধীরে ধীরে জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠছে! 

– উনার নাম সুরাইয়া বেগম ছিলো ? 

পিছনে ফিরে রিয়াদ। বলে,

– হ্যা। সুরাইয়া বেগম। কেনো চিনেন নাকি ? 

– না। আমার অর্ধাঙ্গিনীর নাম সুরাইয়া তো। তাই বললাম। 

– ওহহ। আচ্ছা সিসি টিভি ফুটেজ কালেক্ট করার ব্যবস্থা করেন। আমি একটু এখান টায় দেখি, কিছু পাই কিনা। 

– ঠিক আছে। আমি নিচে সিকিউরিটি রুমে আছি। কাজ শেষ হলে ওখানে চলে আসবেন।

– ঠিক আছে। 

ওসি হাফিজুর চলে যান দরজার দিকে। রিয়াদ আবার সামনের দিকে ফিরে। বিরবির করে বলতে থাকে

‘ সুরাইয়া বেগম ড্রাগ কেনো নিতো ? এই ড্রাগ নিয়েই কী কোন হেরফের হয়েছিলো, যার জেরে তাকে আর আলিশাকে খুন করা হলো! ঐদিকে ওবাড়ির রাফসানকেও তেমন একটা ভালো ঠেকছে না। এইসবের পিছনে ওর হাত থাকলেও থাকতে পারে, আবার নাও থাকতে পারে। খাঁন বাড়িতে একবার যেতে হবে। ও বাড়ির মানুষদের এতোটা স্বাভাবিক থাকা আমার সুবিধার ঠেকছে না। কিছু তো আছে, যা আমার চোখে পড়ছে না। কিন্তু সেটা কী! ‘

 

রিয়াদ ভাবতে ভাবতে পায়চারি করতে থাকে। নিচে থাকা রক্ত তার পায়ের জুতার অগ্রভাগে লাগে। সামনেই সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। রিয়াদ ভাবতে ভাবতে চারপাশে একবার নজর দিয়ে দেখতে থাকে। মেঝেতে চোখ দেয়। সুক্ষ নজরে দেখতে থাকে সবদিক। 

 

____

 

নিপা ব্যাকনিতে বসে আছে। মনে বিষন্নতা। আকাশ টাও একটু মেঘলা হয়েছে। হয়তো রাতে বৃষ্টি আসবে। ব্যালকনির দূরের গাছটাও কেমন যেনো মরার মতো দাঁড়িয়ে আছে। বাতাস নেই। চারপাশ একদম নিস্তব্ধ। নিপা তার কোল থেকে আলিশার জন্য আনা জিনিস গুলো হাতে নেয়। ভিতর থেকে কান্নারা বেড়িয়ে আসতে চাইছে। হঠাৎ করেই আলিশার এমন চলে যাওয়া, সে যেন মেনে নিতে পারছেনা। বারংবার নিজেকে দোষী ভাবছে। সুরাইয়া বেগম তাকে বলেছিলো আলিশাকে নিয়ে এ বাড়ি থেকে চলে যেতে, আলাদা থাকতে। তিনি হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন আলিশার প্রাণ সংশয় আছে। সে কেনো এই বিষয়টাকে গুরুত্বের সহীত নিলো না। নিপা হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছে। আলিশার জন্য আনা টুপিটা পাশের টেবিলে রেখে দেয়। তার মনে হঠাৎ কিছু কথার উদয় হয়। 

– আচ্ছা ঐদিন যে আমাদের কথা জানালার আড়াল থেকে শুনেছিলো সেই কী মেরেছে? কে ছিলো সেদিন জানালার বাইরে ? শাশুড়ি মা! কিন্তু তিনি কেনো ঘরের লোকেদেরই মারবেন! সুরাইয়া আন্টি আমাকে সেই কথাটা বলতে গিয়েও বলতে পারেননি। (তৎক্ষণাৎ নিপার চোখ মুখ বড় হয়ে যায়। সে যেনো কোন কিছু একটা ভেবে অনেক অবাক হয়। বিরবির করে বলে,

– আমার পেন ক্যামেরা! ঐটা তো আমি ঐদিন ঘরে রেখে এসেছিলাম আলমারিতে কী আছে সেটা দেখার জন্য। সেটায় কী খুন গুলোর ফুটেজ রেকর্ড হয়েছে! 

নিপা তৎক্ষণাৎ তার কোলের জিনিস গুলো হাতে নিয়ে পাশের চেয়ার টায় রেখে দেয়। উঠে দাঁড়ায়। দৌড়ে ব্যালকনি থেকে ঘরে আসে। তাকে গিয়ে সেই পেন ক্যামেরাটা আনতেই হবে। সেটা থেকে সে নিশ্চয়ই কিছু না কিছু পাবে। তখনই ঘরের দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করে রায়হান। নিপা দাঁড়িয়ে যায়। রায়হান ভিতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়ায়। নিপাকে অস্থির দেখে সে বলে উঠে,

– সুবা, কী হয়েছে! 

– র, রায়হান। রায়হান আমি একটু ঐ ঘরে যেতে চাই। 

– কোন ঘরে ? 

– আলিশাদের ঘরে। 

– ঐ ঘর তো তালা দেওয়া। পুলিশ আসে তারা মেরে দিয়ে গেছে। 

– তালা দেওয়া! 

– হ্যা। কেনো ? ঐ ঘরে তো এখন আমাদের কাউকেই ঢুকতে দিবেনা। তোমাকেও না। ওদের তদন্ত না শেষ হওয়া পর্যন্ত আমরা কিছু বলতেও পারবোনা। 

– তুমি কোনভাবে ঐ ঘরের যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওনা। ঐ ঘরে,,,,,,

কথাটা বলতে গিয়েও থেমে যায় নিপা। তার ফোন বাজছে। রায়হান গিয়ে বিছানা থেকে নিপার ফোনটা হাতে নেয়। নিয়ে নিপার সামনে এসে তাকে দেয়। বলে,

– তোমার ভাইয়া ফোন দিছে মনে হয়। নেও। কথা বলো। 

নিপা ফোনটা হাতে নেয়। এখন আবার তার ভাইয়া ফোন দিতে গেলো কেনো! নিপা আর সাতপাঁচ না ভেবে ফোনটা রিসিভ করে কানে তুলে। 

– ভ,ভাইয়া। আসসালামুয়ালাইকুম। 

– ওয়ালাইকুমুস সালাম। কেমন আছিস রে। 

– এ,এইতো ভাইয়া ভালো। তোমরা? 

– হ্যা আছি ভালোই। কোথায় তুই ? বাসাতে ? 

– হ্যা ভাইয়া বাসাতেই। 

– আচ্ছা তাইলে বাইরের গেটের সামনে আয়, আমি আর দিথী আসছি। তোর সাথে একটু দেখা করতাম।

– জ,জ্বী ভাইয়া আসছি। 

– আচ্ছা আয়।

নিপা কান থেকে ফোনটা নামিয়ে নেয়। রায়হান কিছুটা উৎসুক হয়ে বলে,

– কী বললো? 

– ভাইয়া নিচে আসছে। দেখা করতে।

– অন্দরমহল থেকে তো আমি মাত্রই আসলাম। তোমার ভাইয়াকে তো দেখলাম না!

– ও সরি। ভাইয়া গেটের বাইরে আছে। অন্দরমহলে আসেনি। 

– গেটের দিকে! তুমি ভিতরে আসতে বললানা,

– মাথায় ছিলোনা আমার। 

– থাকবেনা তো। চলো। 

রায়হান নিপার হাত ধরে তাকে নিয়ে যায়। যাওয়ার সময় দরজাটা টেনে দিয়ে চলে যায়।

 

       খাঁন বাড়ির গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে দিথীর সাথে কথা বলছে শাহারিয়া। আকাশ কিছুটা মেঘলা। এখন একটু ঠান্ডা বাতাসও বইছে। রাস্তা দিয়ে একট সাইকেল চলে যায়। খাঁন বাড়ির বড় গেইটটার পাশের ছোট গেইটটা খোলার আওয়াজ আসে। শাহারিয়া আর দিথী পিছনে ফিরে তাকায়। নিপা আর রায়হান বেড়িয়ে আসে। শাহারিয়ারা বড় গেইটটার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো। নিপা আর রায়হান শাহারিয়াদের সামনে আসে। নিপা শাহারিয়াকে ছোট করে জড়িয়ে ধরে। 

– কবে আসলি! 

– এইতো ভাইয়া কাল রাতে। 

– আমি আর তোর ভাবি চলে যাচ্ছি। (নিপাকে ছাড়িয়ে নিয়ে) আজ সন্ধ্যায় ট্রেন। 

– চলে যাবা! আর কটা দিন থাকতা!

– এইবার আসে মেলাদিন থাকলাম। ঐদিকে কাজ গুলো সব আহনাফকে সামলাইতে হচ্ছে, স্যার আবার শুনলে রাগ করবে। এতোদিন ছুটি কাটাইছি এই, সেই, বলবে। তাই যাইতে হইতেছে।

– আবার কবে আসবা।

– ঠিক নাই‌। কাজের চাপ বাড়লে আসা হবেনা তেমন একটা। (রায়হানের দিকে তাকিয়ে) বাড়ির খুন গুলার কোন কুলকিনারা বের হয়েছে! 

– না‌ ভাইয়া। রিয়াদ ভাই দেখতেছে। 

– নিপাকে নিয়ে সাবধানে থাকিও। গ্রামের অবস্থা দিন দিন আরো খারাপ হইতেছে। পারলে ঢাকা চলে যেও। (নিপার গালে হাত রেখে) সাবধানে থাকবি কিন্তু। আর ঘরে একলা থাকলে সবসময় দরজা লাগিয়ে রাখবি। অপরিচিত কারো গলা পেলে একদম দরজা খুলবি না। 

– ভাইয়া আমি আছি একয়দিন বাসায়। আমি ওর সাথে সবসময় থাকবো। আপনারা ভিতরে আসেন। একটু চা নাস্তা খেয়ে যান। (রায়হান)

শাহারিয়া হাত ঘড়ি উঠায়। রায়হানকে বলে,

– সময় তো বেশি একটা নাই। দিথীর বাবার বাসায় গেছিলাম। ওখানেই দেরি হয়ে গেলো। পরে কোন একদিন। 

– আবার কখন না কখন আসেন! 

– দেখা যাক। আমি তো আর হারিয়ে যাচ্ছিনা। সিলেটে আসলে আমাদের ওখানে আসিও।

– জি আচ্ছা ভাইয়া। 

– কোন দরকার পড়লে ফোন দিস। এখন নতুন জীবন শুরু করছিস। একদম ছেলে মানুষি করবি না কেমন! 

– ঠিক আছে ভাইয়া। (নিপার মন খারাপ হয়। তার চোখ কিছুটা ছলছল করছে। দিথী বলে,

– চলো তাইলে। বাসায় যায় ব্যাগ গুছাইতে হবে। 

– বনু, গেলাম হ্যা। ভালোভাবে থাকিস। রায়হান, আমার বোনটা কিন্তু এখন তোমার আমানত। যত্নে রেখো! 

– জি আচ্ছা ভাইয়া। আসসালামুয়ালাইকুম। 

– ওয়ালাইকুমুস সালাম।

শাহারিয়ারা বিদায় নিয়ে চলে যেতে থাকে। নিপা রায়হানের পাশে দাঁড়িয়ে তার হাত ধরে থাকে। তার মন যেন কেমন করছিলো। শাহারিয়া যদিও তার সৎ ভাই, তবুও সবসময় আপন বোনের মতো তাকে স্নেহ করেছে, আগলে রেখেছে। আগেও তো শাহারিয়া ঢাকা যেতো। তখন তো এতো খারাপ লাগতো না। তবে আজ কোনো লাগছে। নিপা ছলছল চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকে। 

শাহারিয়া দিথীর সাথে হেঁটে যেতে যেতে একবার পিছনে ফিরে তাকায়। নিপা আর রায়হানকে একসাথে পাশপাশি দেখে একটা ছোট্ট হাসি দেয়। তার বোনটা সুখি হোক, ভালোভাবে নতুন জীবনে স্থায়ী হোক, মন থেকে তার শুধু এটাই চাওয়া। শাহারিয়া হাত নাড়িয়ে বিদায় জানায় তাদের। সামনে ফিরে চলে যেতে থাকে। 

আকাশ আজ রঙিন হয়নি। কালো মেঘের ছায়া সাজিয়ে গর্জন করে উঠেছিলো কয়েকবার। হয়তো কারো জীবনে নামবে এমন কালো মেঘ, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী না হোক। না হোক কারো বেদনার কারণ।

 

_____

 

আহনাফ হসপিটালের রুমে প্রবেশ করে। হাতে এক গাট্টি ফাইল-পত্র। ভিতরে প্রবেশ করেই দরজাটা চাপিয়ে দেয়। পেসেন্টের বেডের দিকে চোখ দিতেই দেখে আফরিন নেই। তৎক্ষণাৎ চারপাশ দেখতে থাকে। দেখে আফরিন রুমের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা ছিলো হসপিটালের ৫ তলায়। জানালা দিয়ে নিচের রোডের ভিউ হয়তো ভালোই দেখা যায়। আহনাফ গিয়ে বেডের সামনে থাকা দুটো চেয়ারের মাঝে একটায় বসে। ফাইল গুলো বিছানার ফাঁকা যায়গাটায় রাখে। ফাইল রাখার শব্দ মৃদু হলেও তা আফরিনের কান অব্দি ঠিকই পৌছায়। আফরিন পিছনে ফিরে তাকায়। দেখে আহনাফ এসেছে। সে জানালার পাশ থেকে ফিরে হেঁটে আসতে থাকে বিছানার দিকে। এসে বিছানার পাশে থাকা আরেকটা চেয়ারে বসে। আফরিনের মা ঘুমাচ্ছিলো। আহনাফ ফাইল গুলো গুনে দেখতে থাকে। আফরিনের দিকে একবার চেয়ে আবার ফাইল গুনতে থাকে। আহনাফ বলে,

– দুপুরে নার্স আসছিলো ? 

– হ। আইছিলো। 

– আমি নার্সকে টাকা দিয়ে গেছিলাম। আজ ফিরতে একটু দেরি হতো তাই ফোন দিয়ে বলেছিলাম তোমার জন্য খাবার কিনে তোমাকে এনে দিয়ে যেতে‌। দিছিলো তো না।

– হ। দিছিলো। (একটু থেমে) এডি কী ? 

– কোন গুলো? এগুলো ? এগুলো ফাইল। কেস ফাইল। ঐ যে রন্জুর ফাইল নিয়ে বলছিলাম না ঐদিন, ঐ কেস ফাইল। (একটু থেমে) ঐদিন তো ফাইল গুলা স্যারের কেবিন থেকে আনতে পারিনি। আজ স্যারকে ফোনে বলে নিয়ে আসলাম। 

– আপনে এডি এহন মুখস্থ করবেন।

– না না। কীসের মুখস্থ। ফাইল গুলা দেখে রন্জুর করা কাজ গুলো ভালোভাবে পড়ে দেখবো। কতগুলা মেয়েকে সে কিডন্যাপ করেছে। কোথা থেকে কিভাবে করেছে এগুলোই। 

– হেয় কী মাইয়া পাচার করে! 

– মনে তো হয় তাই। কমবয়সী মেয়েদেরকে নিয়ে গিয়ে তা থেকে তো এই ব্যবসা টাই হয়। 

– ঐদিন যে সর্দারনিরে একটা গাড়ি আইয়া তুইলা নিয়া গেলো, হেইডাও কী রন্জু করছিলো? 

– আ্যঁ, তা তো সঠিক জানিনা, গাড়ির নাম্বার প্লেট ঢাকা ছিলো। আর গাড়িটাও সাধারণ মাইক্রো ছিলো। রন্জু তো সবসময় কালো রঙের মাইক্রোতে করে তার মেয়ে ধরার কাজ চালায়। বেশীরভাগ কেসে এমনি তথ্য পাওয়া গেছে। 

– গাড়ি ধুইতেও দিবার পারে। এরলাইগা হয়তো অন্য গাড়িতে কইরা নিয়া গেছিলো। 

– গাড়ি ধোঁয়া,,,,,,, হমম। কথাটা খারাপ বলোনাই। Out of the line, But right!

– কী কইলেন। আমি ইংরেজি বুঝিনা।

– মানে তুমি লাইনের বাইরে গিয়ে ভাবছো, কিন্তু সঠিক টাই ভাবছো।‌ হইলেও হইতে পারে। আচ্ছা বাদ দেও, গাড়ি নিয়ে পড়ে ভাবা যাবে। ফাইল চেক করবা! করলে নেও একটা। (আহনাফ একটা ফাইল আফরিনের দিকে এগিয়ে দেয়। আফরিন বলে,

– আমি তো ফড়ালেহা পারিনা। কহনো ইসকুলে যাইনাই।

– 1, 2 ও পড়ো নাই ? 

– না। আমাগো চাইল আনতেই নুন ফুরায়, আরো ফড়ালেহা। 

– তোমার মা সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরলেই আমি তোমাকে পড়ানো শুরু করবো। 

– আম্মায় আইজ সকালে আপনারে খুঁজছিলো। 

– খুঁজছিলো? কেনো ? 

– আমারে কয়নাই। খালি কইছিলো আপনে আছেন না নাই। 

– আজ সকালে আসতে পারিনাই। সকালে উঠে গেছিলাম কাওরান বাজার, একটা ব্যাংকের সিসি টিভি ফুটেজ আনতে। তারপর সেখান থেকে বাসা ফিরতে ফিরতে দেরি হয়ে গেছে। 

– কি আনতে গেছিলেন! 

– সিসি ক্যামেরার ভিডিও। কয়দিন আগে কাওরান বাজারের মোড়ে ৩ টা মেয়েকে অনেক গুলো টাকার সাথে কারা যেনো ফেলে গেছিলো। খুব সকাল সকাল হওয়ায় মসজিদ থেকে বেড়োনো দুই-একজন দেখছিলো। তবে পরে আর মেয়েগুলাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। একটা ব্যাংক ছিলো কিছুটা দূরে। হয়তো ঐটার সিসি ক্যামেরায় কিছু যদি ধরা পড়ে থাকে, তাই আনতে গেছিলাম। শাহারিয়া স্যারকে জানাইছিলাম। স্যারই বলছে গিয়ে ফুটেজ গুলো নিয়ে আসতে। 

– আপনার স্যার এহনো আহেনাই। 

– না। তবে আজ ফিরার কথা। (হাত উঠিয়ে ঘড়ি দেখে) আজকে রাত ৭ টার ট্রেন উনার। শ্রীমঙ্গলে কাল সকালে পৌছাবেন, তারপর ঢাকা এসে আমার কাছ থেকে ফুটেজ আর বাকি ইনফরমেশন নিয়ে যাবেন। 

– আপনেও হের লগে গোয়েন্দাতে চাখরি করেন না! 

– হ্যা। আমিও স্যারের সাথে। বলতে পারো সারের পিএস। মানে পার্সোনাল সেক্রেটারী আরকি। 

আফরিন তার মায়ের উপরে ভালোভাবে কাঁথা তুলে দেয়। দিয়ে আবার চেয়ারে বসে। তার মায়ের হাত টা কাঁথা থেকে বেড়িয়ে ছিলো। আফরিন তার মায়ের হাতে খসখসে উঠে যাওয়া চামড়া গুলো আস্তে আস্তে তুলে দিতে থাকে। আহনাফ তা একবার দেখে আবার ফাইল দেখাতে মনযোগ দেয়। একের পর এক পৃষ্ঠা উল্টিয়ে মনযোগ দিয়ে দেখতে থাকে। জানালা দিয়ে বাইরে আলো ক্রমেই নিভে আসতে থাকে। অর্থাৎ সন্ধ্যা নেমেছে। অবশ্য রুমে কয়েকটা সাদা বাল্ব জ্বলছে। বাইরের আলো কমলেও ঘরের উজ্জলতা কমেনি। আহনাফ আর আফরিন, দুইজন তাদের কাজে মনোনিবেশ করে। 

 

((( এই পর্বের ২য় ভাগের লিংক কমেন্টে দেওয়া আছে)))

 

উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন:: ২(মুখোশ)

পর্ব:: ৭০ (২য় ভাগ)

লেখক:: মির্জা শাহারিয়া

 

((( এই পর্বের ১ম ভাগের লিংক কমেন্টে দেওয়া আছে)))

 

শিউলি বেগমের রুম। ডেসিন টেবিলের আয়নার সামনে কালো বোরখা পড়ে দাঁড়িয়ে আছে দিথী। বোরখার মাঝখান টায় গাঢ় খয়রি রং। শিউলি বেগম দিথীকে হিজাব পড়িয়ে দিচ্ছেন। দিথী বোরখা পড়ার অভ্যাস নেই তেমন একটা। হিজাবও আজ সে প্রথম পড়ছে। শিউলি বেগম দিথী পিছনে দাঁড়িয়ে তার মাথায় হিজাব ঠিক মতো পড়িয়ে দিচ্ছেন। মুখে দাঁত দিয়ে চেপে রাখা সেফটিপিন টা হাতে নিয়ে হিজাবের পিছনের প্রথম জয়েন্টে লাগিয়ে দেন। বলতে থাকেন,

– ঐহানে যাইয়া একদম ঝগড়া কাচাল কইরো না। মিল্লামিশা থাইকো। শাহারিয়া যা কইবো তা হুইনো। ঐহানে তো বলে আলাদা একটা বাড়ি কিনছে হুনলাম। শাহারিয়া যহন অফিসে থাকবো তহন একলা একলা বাড়ির বাইরে যাইয়োনা। রুটিন কইরা নিবা। প্রতিদিন সকাল সকাল উঠবা আর রাইতে তাড়াতাড়ি ঘুমায়া যাইবা। পোলাডা আমার রান্না-বান্না একদম পারেনা। এরলাইগাই বিয়াডা তাড়াতাড়ি দিলাম। সকাল ১১ ডা ১২ ডার মইধ্যে রান্ধা শেষ কইরা গোসল কইরা নিবা। ঠিক আছে! 

– আচ্ছা মা। 

– শাহারিয়ার ঐহানে কিন্তু তুমি ছাড়া আর কেউ নাই। তুমিই হইলা অর সব। ঐহানে তুমিই অর বউ, তুমিই অর মা, তুমিই অর বোন, তুমিই অর বান্ধবী। অরে সঙ্গ দিয়ো। একলা একলা থাকতে থাকতে এহন দেহোনা, বাড়িত আইলে খালি ঘরে ঢুইহা থাহে। (একটু থেমে) তোমার জীবনে এহন দেইখা দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু। মাইয়াগো জীবন ৩ অধ্যায় থাহে। এক, যহন হেয় ছোট থেইকা বড় হয়। তহন হেয় থাহে কিশোরী, তারপর কুমারী হইয়া যাওনের পর হের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু। এইহানে অর পরিচয় বউ। একজন পুরুষের সঙ্গিনী। আর তারপর, জীবনের শেষ অধ্যায়, মা। এই বয়সে অয় ওর পেডের সন্তান ডিরে লালন পালন করে। পুরুষের কাম হইলো বিয়ার পর নারীর একজন উপযুগী স্বামী হইয়া উডা। তার বউ যহন প্রেগন্যান্ট হইবো, তহন তারে মানষিক দিক দিয়া সাপোর্ট দেওয়া। একটা মাইয়া যহন মা হওয়ার দারপ্রান্তে থাহে, তহন তার শারীরিক দিকের থেইকা বেশি প্রয়োজন তার মানষিক সাপোর্ট। এইসময় তার মনে অনেক ভয় জাগে, নানা চিন্তা মাথায় ঘুরে। স্বামীর ভালবাসা, আর সাপোর্ট তহন তার মনোবল শক্ত করে। তারে ভাইঙ্গা যাইতে দেয় না। তুমি এহন বউ হইছো। কয়েকদিন পর মা হইবা। শাহারিয়া অর বাপের মতোই হইছে। অয় তোমারে অনেক আগলাইয়া রাখবো। তোমারে অয় ভালোবাইসা বিয়া করছে। অয় অর ভালোবাসারে ঠিকই যত্নে রাখবো‌।

– আব্বা আপনার অনেক কেয়ার করতো, তাই না মা।

– হ, তা আর কইতে। আমি একটু অসুস্থ হইলেই পাগলের মতো হইয়া যাইতো। ডাক্তারের পর ডাক্তার আনতো।রাত যাইগা আমার পাশে বইসা থাকতো। তোমার আব্বায় এমনিতে যত কঠিন, আবার ততই নরম। 

– শাহারিয়ার কোন মেয়েলী বিষয় নিয়ে ঝামেলা আছে নাকি মা! 

– না না। অর এমন কোন কেস নাই। তারপরও, পোলা মানুষের কথা কওয়া যায় না। হেগো মন বদলাইতে সময় নিবোনা। তুমি ওরে নিজের আঁচলে বাইন্ধা রাখবা। তোমার উপর অয় সন্তুষ্ট থাকলে আর কোন মাইয়ার দিকে চোখ তুইলা তাকাইবো না। 

– আমি চেষ্টা করবো মা। 

– হ। পুরুষ মানুষ হইলো লম্বা রেসের ঘোড়া। হেগোরে একই সাথে পরিবার আর আপন মানুষ গুলারে আগলায় রাখতে হয়। শাহারিয়া যহন অফিস শেষ কইরা ক্লান্ত শরীর নিয়া বাড়ি ফিরবো, তহন তারে সাদরে গ্রহণ করবা। তার ক্লান্তি ডারে তোমার প্রশান্তির ছোঁয়া দিয়া নাই কইরা দিবা। ভালোবাসা যত দিবা, তত পাইবা। এইহানে লাভ ছাড়া ‌লস নাই। আর যহন শাহারিয়া রাইগা থাকবো তহন চেষ্টা করবা তার পছন্দের খাওন রান্না করার। অর লগে সুন্দর সুন্দর কথা কওয়ার। দেখবা রাগ গইলা পানি হইয়া গেছে। 

– ঠিক আছে মা। 

– আমার দিকে ফিরো। দেহি সামনে হিজাব ঠিক ঠাক হইছে না নাই। 

দিথী ঘুরে শিউলি বেগমের দিকে ফিরে। শিউলি বেগম মাথার হিজাব টা দেখে যেখান টায় একটু কম পড়েছে সেখান টায় টেনে টুনে ঠিক করে দিতে থাকেন। বলেন,

– ওহানে যাইয়া আবার আমাগোরে ভুইলা যাইয়োনা। শাহারিয়ারে কইয়ো তোমার আব্বার ফোনে ভিডিও কল দিতে। কথা কমুনে তহন। (একটু থেমে) মুহে ক্রিম দিবানা! 

– দিছি মা। 

– ওহহ। ভালো। তোমার আব্বারে দেখতে গেছিলা! 

– হ্যা মা। বিকালে গিয়ে আব্বার সাথে দেখা করে আসছি। নিপা আর দুলাভাইয়ের সাথেও দেখা করছি। 

– মাইয়াডারে যে কই বিয়া দিলাম। দিনে দুপুরে বাড়িতে ঢুইকা খুনি দুই দুইডা খুন কইরা গেলো। সারাদিন মাইয়াডার লাইগা চিন্তা হয়। 

– কিচ্ছু হবেনা মা। দুলাভাই আপনার ছেলের মতোই পালোয়ান। কেউকে নিপার কাছে ভিড়তে দিবেনা।

– তেমনি যেন হয় মা। (একটু থেমে হিজাব পুরোপুরি ঠিক করে দিয়ে) এহন ঠিকঠাক। মাস্ক পড়বা নাকি ? পড়লে পড়ো।

– না মা। মুখ ঘামে যায় তখন। 

– নাতি নাতনি জলদি লইয়া লইয়ো। এহন জোয়ান থাকতে থাকতেই আমরা তাইলে একটু কোলে লইয়া ঘুরতে পারমু। পরে নাইলে, কোমল আর বাতের বিষ (ব্যাথা) ধরলে আর কোলে নিয়া ঘুরা যাইবো না।

দিথী খানিকটা লজ্জা পায়। মাথা নামিয়ে নেয়। মুখে মুচকি হাঁসি। গাল গুলো লাল হয়ে গেছে। শিউলি বেগম দিথীর মুখ তুলে বলতে থাকেন,

– আয় হায়, এতো শরম পাইতাছো ক্যান! শরম তো পাইবো আমার পোলায়। তোমার যে কারেন্ট!!!! হা হা হা!!

দিথীও মুচকি হাসি হাসতে থাকে। সে একটু বেশিই আকৃষ্ট হয় বোধহয় শাহারিয়ার প্রতি। শিউলি বেগম হাসি থামিয়ে দিথীকে আয়নার দিকে ফিরিয়ে তাকে একবার দেখিয়ে নিতে থাকেন। 

শাহারিয়ার ডাক শোনা যায় বাইরে থেকে,

– মা, তোমাদের হইছে! সময় তো বেশি নাই। বের হইতে হবে।

– হ হইছে হইছে। (দিথীকে তার দিকে ফিরিয়ে) ডাকতাছে, চলো।

 

    শিউলি বেগম আর দিথী ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। বাইরে ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে ছিলো শৈশব, আর তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো শাহারিয়া। শাহারিয়ার পড়নে ফরমাল শার্ট, আর জিন্স প্যান্ট। পায়ে কালো জুতো। বেশ সুন্দর লাগছে তাকে। শাহারিয়া দিথীকে এই প্রথম হিজাব আর বোরখায় দেখলো। আরাবিয়ান মেয়েদের মতো লাগছে দিথীকে। মেয়েরা বোধহয় বোরখা আর হিজাবেই সবচেয়ে বেশি সুন্দর। শিউলি বেগম দিথীকে ছেড়ে শাহারিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়ান। শাহারিয়ার ঘোর ভাঙে। শিউলি বেগম শাড়ির আঁচলের কোনটা হাতে উঠিয়ে বলতে থাকেন,

– আবার কপালে আর ভ্রুতে পাউডার লাগায়া রাখছে। তুই বড় হইবি কবে রে শাহারিয়া। কয়দিন পর বাচ্চার বাপ হইবি, আর এহনো মুহে পাউডার টা ঠিকমতো মিশাইতে পারোস না! এদিক আয়। 

শাহারিয়া শিউলি বেগমের সামনে আসে। শিউলি বেগম উচ্চতায় শাহারিয়ার কাঁধ পর্যন্ত। হাত উঁচিয়ে শাড়ির আঁচলের কোন দিয়ে শাহারিয়ার চোখের ভ্রু আর কপালের পাউডার মিশিয়ে দিতে থাকেন। ছোট থেকেই কোথাও বেড়োতে গেলে শাহারিয়া পাউডার দিতে যাবে। আর মুখে এভাবে লাগিয়ে রাখবে। শিউলি বেগম কপাল আর ভ্রুয়ের পাউডার মুছে দেন। শার্টের কাঁধের অংশ টেনে দেন, শার্টের নিচের দিকেও হালকা টেনে টুনে দেন। বলতে থাকেন,

– টিফিন বাটিতে ভাত আছে। যাইয়া পৌঁছাইতে পৌঁছাইতে তো সকাল হইবো। রাতে খিদা লাগলে খাইয়া নিবি। ফোন দিবি মাঝে মাঝে। বাইরে গেলে তো বাড়ির কথা ভুইলাই যাস। আর মাঝে মাঝে আওয়ার চেষ্টা করবি। একবার গেলে তো ৪-৫ বছরও তোর পায়ের ধুলা পড়েনা এবাড়িত। খাওয়া-দাওয়া ঠিকঠাক মতো করবি। বউডার লগে মিল্লামিশা থাকবি। 

– আচ্ছা আচ্ছা মা সব ঠিক আছে। এখন যাই। সময় যে বেশি নাই। 

– তোরে তো ধইরা রাখমুনা। যাবিই তো। শৈশব,,,, তোর চাচায় ভ্যান অটো কিছু আনছে ? 

– চাচি বাইরে চাচা খাড়ায়া আছে। অটো আনছে।

– যা ব্যাগ টা নিয়া যা। আহো তোমারও আহো।

শৈশব ব্যাগটা নিয়ে আগে আগে চলে যায়। শাহারিয়া বারান্দা থেকে আঙিনায় নামে। দিথীকে নিয়ে তার পিছু শিউলি বেগমও আঙিনায় নামেন। চলে যেতে থাকেন। সুমু আর ফুলমতিও তাদের ঘর থেকে বের হয়ে বারান্দা থেকে আঙিনায় নেমে যেতে থাকে। লায়লা হয়তো পিছনের বাগানে আছে। আফাজ ঘরে ঘুমাচ্ছিলো। 

 

      বাড়ির গেইট দিয়ে বের হয় সবাই। তবে ফুলমতি আর সুমু বাড়ির গেটের সামনেই দাঁড়িয়ে থাকে। তারা সামনে এগোয় না। অটোর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মতিন মেম্বার বলেন,

– এতোক্ষণে তোমাগো আওয়ার সময় হইলো। সন্ধ্যা নাইমা গেছে। তাড়াতাড়ি স্টেশন যাইতে হইবো তো। 

– মাইয়া, পোলারে একটু সাজায়া দিমু না। (দিথীর দিকে ফিরে) যাও উডো।

দিথী আর শাহারিয়া গিয়ে অটোর একদম পিছনের সিট গুলোয় বসে। সেই সিট গুলোর সামনাসামনি থাকা সিট টায় মতিন মেম্বার বসেন। উপরের হাতল ধরে শৈশবকে বলেন,

– শৈশব ব্যাগটা সামনে রাখ‌‌। তুই বাড়িত থাহিস, আমি ওগোরে ট্রেনে উঠায় দিয়া আইতাছি।

– আইচ্ছা মেম্বার সাব।

শৈশব ব্যাগটা সামনের অটো ড্রাইভারের পাশে রাখে। অটো চলতে শুরু করে। দিথী আর শাহারিয়া বিদায় জানায় শিউলি বেগমকে। শিউলি বেগম মুখে আঁচল চেপে কান্নারত মুখটা ঢাকেন। হাত উঠিয়ে তাদের বিদায় জানান। শাহারিয়া তার পেটে ধরা সন্তান না হলেও শাহারিয়াকে তিনি ছোট থেকে নিজের অংশ ভেবেই বড় করেছেন। আগলে রেখেছেন। চেষ্টা করেছেন মায়ের অভাব পূরণ করার। এখন ছেলেটা বড় হয়ে গেলেও মায়াটা আগের মতোই রয়ে গেছে। 

দরজার আড়াল হতে দাঁড়িয়ে থাকা সুমু নতুন কিছুর সাক্ষি হয়। এই রকম দৃশ্য তার কাছে নিতান্তই নতুন। তবে দিথী চলে যাওয়ায় তার কিছুটা খারাপ লাগছে। নতুন বাড়িতে নতুন এক পরিবেশে সে এখন প্রায় একলাই বলা যায়। তার বন্ধু হিসেবে শুধু হনুফা আর লায়লাই আছে। তখনই সুমুর মনে পড়ে, লায়লা আর হনুফা কই!!!

 

   মেম্বার বাড়ির পিছনের ফুল বাগান। বাগানের একপাশের বসার যায়গাটায় লুডু খেলতেছে হনুফা আর লায়লা। হনুফা গুটি চালে। কৌটায় পুরে দান দেওয়ার জন্য পুটি টা লায়লাকে দেয়। লায়লা পুটি চালে। তার আসে ৩। সে চালাকি করে ৩ ঘরের যায়গায় ৪ ঘর আগায়। আর হনুফার গুটিটাকে খেয়ে দেয়। আনন্দ উল্লাস করতে থাকে লায়লা। হনুফা মুখে আঙ্গুল দিয়ে গুনতে থাকে ৩ ঘর দিলে তো তার গুটির পিছনে পড়ার কথা। তাইলে তার গুটি কেমনে খাইলো!

– বন্দু, তুমি চিটিং করছো। তোমার গুটি আমার গুটির পিছনে থাকার কথা। তুমি আমার গুটি তাইলে ক্যান খাইসো।

– না না বন্দু, আই কীয়ের চিটিং করতাম। এইডা সাইন্স। তুই সাইন্স বুঝোস না বইলা তোর গোনায় ভুল হইছে।

– না না আমি এই খেলা মানিনা। তুমি চিটিং করছো। তুমি চিটিং করছো।

– আই কোন চিটিং করিনাই। তুই ভুল গুনছোস! 

– না না এই খেলা আমি মানিনা। 

– হনুফা তোর মানাই লাগবো। এইডাই সাইন্স।

– না আমি মানি না মানি না।

বলেই লায়লার সাথে মারামারি লাগায় হনুফা। হনুফাকে লায়লা ছুঁতে পারছিলো। লায়লা হনুফার চুল ধরে টানে, হনুফা লায়লার জামা ধরে টানে। দুইজনের মাঝে কঠিন মাইর হয়। তবে তা যে শুধু মজার ছলে দুই বন্ধুর মারামারি, তা আমাদের বুঝতে বাকি রয়না।

আকাশের মেঘ গুলো হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে। সূর্য অস্ত গেছে। শুধু হালকা মৃদু দিনের আলোই কেবল অবশিষ্ট আছে। দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসে মাগরিবের আযান। রাস্তা দিয়ে মুসল্লিরা মাথায় টুপি পড়তে পড়তে হন হন করে ছুটে যায় মসজিদের দিকে।

 

____

 

রিয়াদ কাপড় ভাঁজ করছে। দিনাজপুর থেকে একটু আগেই বাসা ফিরলো। গোসল করে এসে এখনো গামছা পেঁচিয়েই আছে। মাথার চুল গুলো ভিজা, এলোমেলো। এখন আর সে কাপড় চোপড় সব বিছানায় এনে খুলে রাখে না। ভাঁজ করে আলনায় রাখে। 

পুলিশ ইউনিফর্ম টাও ভাঁজ করে গিয়ে আলনায় রেখে আসলো সে। খিদা লাগছে, দুপুরে বাইরে হালকা নাস্তা খেয়েছিলো, সেই খাওয়ায় কী এতোক্ষণ থাকা যায়! ভাইয়াকে বলে আসলো ভাত রান্না হইলে গরম গরম ভাত দিতে। তার ভাই রাতুল এখন রান্না ঘরে, রাতের খাবার রান্না করছে। 

রিয়াদ আলনা থেকে একটা লুঙ্গি হাতে নিয়ে চলে আসে বিছানার কাছাকাছি। গামছার উপরই লুঙ্গি পড়তে থাকে। দাঁত দিয়ে লুঙ্গির এক প্রান্ত চেপে ধরে ভিতরের গামছা খুলে উপর দিয়ে বের করে নেয়। ভেজা গামছাটা বিছানার কোনে রেখে লুঙ্গির গিট্টু ঠিক করে বেঁধে দিতে থাকে। হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠে। ফোনটা ছিলো বিছানার পাশের টেবিলটায়‌। রিয়াদ বিছানার কোনে রাখা গামছাটা দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে এগিয়ে যায় টেবিলের দিকে। টেবিলের সামনে এসে ফোনটা হাতে নেয়। একটা আননোন নাম্বার থেকে কল। শেষে ৯০৬। তার পরিচিত কারোর নাম্বার বলে তো মনে হচ্ছে না। রিয়াদ কল টা রিসিভ করে কানে তুলে। ওপাস থেকে একটা নমনীয় মেয়েলী কন্ঠ ভেসে আসে। 

– আসসালামুয়ালাইকুম।

– ওয়ালাইকুমুস সালাম। কে? 

– আ,আমি ইকরা। 

– ইকরা ? ও ও, ইকরা‌! কেমন আছো! 

– চিনতে পারছেন তাইলে। হ্যা আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। আপনি ? 

– আমিও ভালো আছি। আমার নাম্বার কোথায় পেলে ? 

– ফুফুর কাছ থেকে নিয়েছি। 

– চাচি দিছে? 

– হ্যা। আজ সকালে নিয়েছি। আপনি বলেছিলেন আমাকে কল দিবেন, হয়তো কেসের চাপে ভুলে গিয়েছেন। তাই আমিই দিলাম। 

– বাহ, তো আমাকে এখনো আপনি করে বলছো কেনো! তুমি করে বলো, আমি কী এখনো তোমার আপনি রয়ে গেছি? তুমি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করিনি ? 

– তা তো করেছেন। আচ্ছা তুমি করেই বলবো এরপর থেকে। 

– আঙ্কেল আংটি কেমন আছে ? সৈয়দপুর থেকে ফিরেনি ? 

– মা এখনো ফিরেনি। মামার অবস্থা বেশি একটা ভালো না। আর বাবা চট্রগ্রাম চলে গেছে। বাসায় বলতে গেলে আমি একা। আফাজ তো মনে হয় ফুফুর বাসা চলে গেছে। 

– তোমার বাবা চট্রগ্রামে, ওখানে তোমাদের আত্মীয় আছে নাকি ? 

– না না, আমাদের ট্রেডিং ব্যবসা। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে বাবার দোকান আছে। পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি আমদানি করে খোলা বাজারে বিক্রি করে। 

– ওহ। আফাজের বিষয়টা শুনো নাই ? 

– না তো। কী হইছে আফাজের ? 

রিয়াদ একটু থামে। তার উচিত না এসব এখন বলা। তখন আবার টেনশন করে যদি। রিয়াদ আবার বলে,

– না, তেমন কিছুনা। আফাজ এখানে আসছে এটা জানো কী না তাই বলছিলাম।

– হ্যা জানি। ও যাওয়ার আগে আমাকে বলে গেছিলো। কিন্তু ওর তো ২ দিন পরই ফিরে আসার কথা ছিলো। কিন্তু ৫ দিন চলে গেলো, এখনো মনে হয় ফুফুর বাড়িতে আছে। 

– হ্যা এখানেই আছে। তুমি একলা কীভাবে আছো? ভয় করেনা ? 

– তেমন একটা করেনা। মা যাওয়ার আগে বানু খালাকে বলে গেছিলেন আমাদের সাথেই থাকতে। বানু খালাই এখন আছেন। তিনিই রান্না করেন। আমাদের অনেক দিনের কাজের বুয়া উনি, খালা বলেই ডাকি আমরা সবাই। 

– ওহহ। তো কলেজ যাও না ? (বিছানায় বসে) পরীক্ষা তো আর কয়েকদিন পরেই। 

– আমাদের এদিকে ২ দিন থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। যাইতে মন চায় না। বাসা তেই পড়তে বসি। 

– ঠিক মতো পড়িও। আর দেখি আমি এই সপ্তাহে একদিন তোমাদের ওখানে ঘুরতে যাবো। 

– আসিও। রংপুর বাসস্ট্যান্ডে নেমে রিকশা নিয়ে কোতোয়ালি পাড়ায় চলে আসবা, ৪ নং রোডের ৩ নাম্বার বাড়িটায় দোতলায় আমরা ভাড়া থাকি। ‘বহুব্রীহি’ নাম বাড়িটার। সামনে লেখা আছে। তুমি আসার আগে আমাকে জানাইয়ো। 

– আচ্ছা। যাওয়ার আগে জানাবোনে। তো এখন বলো দিনকাল কেমন যায়, সারাদিন তো একলা একলা থাকতে ভাল্লাগে ? 

– লাগে কিছুটা, টিভি দেখি শুয়ে থাকি পড়ি,,,,,,,,,,,

রিয়াদ আর ইকরা কথা বলতে থাকে। দুইজনের মুখেই হাসি। ফোনে এই প্রথম আলাপা তাদের। রিয়াদ, খাঁন বাড়ির ব্যস্ততা, কয়দিন আগে পাওয়া দুইটা লাশের কেস সবমিলিয়ে একটু বেশিই ব্যাস্ত ছিলো। তবে তার মাথার ভার এখন নেমে গেছে বলা যায়। প্রিয় মানুষের সাথে সময় কাটানো, কথা বলা মস্তিষ্কে এক বিশেষ হরমোন নিঃসরণ করে। যা আমাদের আনন্দ কিংবা প্রশান্তির অনুভূতি দেয়। 

বাড়ির বাইরে থেকে জানালায় আড়ি পেতে তাদের কথা শুনতে থাকে রাতুল আর মায়া। তাদের রিয়াদ যে নতুন নতুন প্রেমে পড়ছে তা আর তাদের বুঝতে বাকি রয় না।

 

_____

 

ট্রেনের বগিতে উঠে পড়ে শাহারিয়া আর দিথী। শাহারিয়ার হাতে ব্যাগ। ট্রেন ছেড়ে দিতে আর মাত্র ২ মিনিট বাকি। মতিন মেম্বার তাদের উঠিয়ে দিয়ে পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে দিথী আর শাহারিয়াকে দেন,

– লাগবে না বাবা। তুমি এগুলা দিয়ে বাসায় মায়ের জন্য ফল কিনে নিয়ে যাইয়ো।

– তুই ধরতো। (দিথীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে) বউমা নেও। কিছু কিন্না খাইয়ো। দুইজনে মিল্লা মিশা থাইকো। আমি দেহি তোমার শাশুড়িরে লইয়া একদিন তোমাগো বাসায় আমুনে। শাহারিয়া, বউমার লগে বকাঝকা করিস না। গোয়েন্দা হইছোস সাবধানে থাকবি, খুব বেশি রিস্কের মিশনে যাইস না। জীবনের দাম টাহার থে বেশি। 

– আচ্ছা বাবা ঠিক আছে। তোমরাও ঠিক ঠাক মতো থাকিও। আর ঐযে নতুন মেয়েটা আসছে না, ওকেও নিজের মেয়ের মতোই দেখো। ওর বাবা-মা নাই। এতিম। ওকে তোমাদের কাছেই রেখো।

– আইচ্ছা ঠিক আছে। তে আমি গেলাম। তোরা পৌছাইয়া ফোন দিস।

– আচ্ছা বাবা। আসসালামুয়ালাইকুম।

– আসসালামুয়ালাইকুম আব্বা। (দিথী)

– ওয়ালাইকুমুস সালাম, ওয়ালাইকুমুস সালাম। 

মতিন মেম্বার হাত নাড়িয়ে বিদায় জানান। শাহারিয়া আর দিথীও বিদায় জানিয়ে বগির ভিতরে চলে যায়। আসলে শাহারিয়া গ্রাম থেকে একবার বাইরে গেলে ৫-৬ বছর আর সে ফিরেনা। সেই ১৭ বছর বয়স থেকে যে বাইরে পড়ালেখার জন্য গেছে তারপর একদম পড়া শেষ করে চাকরি নিয়ে তারপর ফিরছে, তারপর গেছে এই কয়দিন আগে নোমানের সিরিয়াল কিলিং কেস টার জন্য গ্রামে ফিরেছে। ওর গ্রামে আসা খুব খুবই কম হয়। এর জন্য যখন সে চলে যায় তখন তাকে এতোটা স্নেহ দিয়ে গাড়িতে উঠিয়ে দেন মতিন মেম্বার। শিউলি বেগমেরও মন কাঁদে, ছেলে এমন চাকরি করে যে হয়তো পরবর্তীতে তার সাথে আর নাও দেখা হতে পারে। মানুষের হায়াত-ময়োতের কথা তো বলা যায় না। 

দিথী, শাহারিয়া বগির কেবিন গুলার সামনে দিয়ে যেতে থাকে। তাদের কেবিন B24। কিছুটা সামনে এগোতেই তারা পেয়ে যায়। একজন ট্রেনের কর্মী ছিলো বগিতে। তিনি টিকিট চেক করে দরজা খুলে দেন। ব্যাগটা কেবিনের ভিতরে এনে দেন। কেবিনটা ৪ জনের। মানে ৪ জনকে শেয়ারে থাকতে হয়। নিচে দুই পাশে দুইটা বিছানা, ঠিক তার উপরে দুইটা বিছানা। শাহারিয়া কারো সাথে শেয়ার করতে চাইনি তাই সম্পূর্ণ কেবিনটা নিজেই ভাড়া নিয়ে নিয়েছে। এসি কেবিন, তবে ঠান্ডার সময় হিটারেরও ব্যবস্থা আছে। ট্রেনের কর্মী তাদেরকে পানির বোতল, বিছানার চাদর সহ সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে চলে যায়। শাহারিয়া একপাশের বিছানাটায় ব্যাগ টা রাখে। দিথী অপর পাশের বিছানটা অর্থাৎ হাতের ডান পাশের টায় বসে। শাহারিয়া কেবিনের দরজা লাগিয়ে দেয়। দিয়ে এসে দিথীর পাশে বসে। কেবিনের জানালা গুলো খোলা যায় না। একদম সিল করা সেগুলো। শুধু গ্লাসের এপাশ থেকে বাইরের দৃশ্য দেখা যায়‌। ট্রেন চলতে শুরু করে। ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে চলে যেতে থাকে। দিথী শাহারিয়ার পাশে বসেই জানালা দিয়ে প্ল্যাটফর্মের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই প্রথম এই গ্রাম ছেড়ে যাচ্ছে সে। নতুন জীবনের , নতুন পথচলা শুরু করতে চলেছে সে। এখন তার সবটুকুই শুধু তার স্বামী শাহারিয়া। সেই তার আনন্দ, সেই তার বেদনা। সেই তার সবকিছু। ট্রেন প্লাটফর্ম ছেড়ে বেড়িয়ে যায়। গতি বাড়ায়। বাইরে কুয়াশা পড়েছে, তবে কেবিনে গরম করছে। দিথী শাহারিয়ার দিকে ফিরে বলে,

– বোরখাটা খুলে রাখি ? 

– কেনো? 

– গরম লাগছে। এখানে তো তুমি ছাড়া কেউ নাই। দরজাও ভিতর থেকে লাগানো। আমার গরম লাগছে। 

– এসিটা ছেড়ে দেই ? 

– না না। তখন আরো বেশি ঠান্ডা লাগবে। বোরখা পড়ে আমার অভ্যাস নাই। এইজন্যই বদ্ধ কেবিনে গরম লাগতেছে। 

– আচ্ছা তাইলে খুলো। 

দিথী উঠে যায় শাহারিয়ার পাশ থেকে। শাহারিয়া তার ফোনটা পকেট থেকে বের করে ট্রেনের চার্জিং সকেটে চার্জে দিয়ে দেয়। দিথী কেবিনে মাঝে দাঁড়িয়ে বোরখা খুলতে থাকে। বোরখার নিচে থ্রী পিস ছিলো। বোরখা খুলে আরেকপাশের বিছানা, যেটায় ব্যাগটা ছিলো তার পাশে রাখে। তবে মাথার হিজাব টা খুলেনা। পরে তখন যদি হিজাব একলা একলা পড়তে না পারে! 

হিজাব মাথায় থ্রীপিস পড়ে এসে শাহারিয়ার পাশে বসে দিথী। তার বাম কাঁধে মাথা রাখে। শাহারিয়া বলে,

– ঘুম পাচ্ছে ? 

– কিছুটা।

– ঘুমাও তাইলে। আমি জেগে আছি। পৌছাইতে পৌছাইতে কাল সকাল হবে। এক ঘুমে রাত পাড় করে দিতে পারো। 

– তোমার জীবনে কোন মেয়ে এসেছিলো! (ধির গলায় বলে দিথী)

– হঠাৎ এই কথা ? 

– বলোনা। আমি তোমার জীবনে আসার আগে, কেউ কী ছিলো! (দিথী কন্ঠ ঠান্ডা। সে শাহারিয়ার কাঁধে মাথা রেখে কথা গুলো বলছে)

– টিনএইজ, মানে ১৬-১৭ বছর বয়সে মেয়েদের প্রতি আকৃষ্ট হতাম, তবে আমার কোন প্রেমিকা ছিলো না। আমি ধীরে ধীরে যতই ম্যাচিউর হয়েছি, নিজের মনে নিজে পণ করেছি কোন প্রেম করবো না। একদম যাকে বিয়ে করবো তার সাথে বিয়ের পর প্রেম করবো। তার জন্য সবটুকু ভালোবাসা, সবটুকু মায়া জমিয়ে রাখবো। 

– আমাকেও তো প্রেম করেই বিয়ে করলে।

– তোমার মধ্যে একটা আলাদা ব্যাপার আছে। হয়তো আল্লাহ তোমাকেই আমার কপালে লিখে রেখেছিলেন তাই আমি তোমাতে আকৃষ্ট হয়েছি! 

– তাইলে এখন আমি তোমার প্রেমিকা না বউ! 

– তুমি আমার দুইটাই। তুমি আমার ভালো বন্ধুও। তোমার আমার বয়সের ডিফারেন্স খুব বেশি না। এই ৫-৬ বছর। বন্ধু তো হওয়াই যায়। এমন তো না যে আমি বুড়ো আর তুমি কিশোরী! দুইজনই ম্যাচিউর হয়েছি আমরা।

– কতটা ভালোবাসো আমাকে! 

– যতটা ভালবাসা একজনের হ্রদয়ের উৎপন্ন হয়, তার চেয়েও বেশি। 

– আমি তো দেখতে ফর্সা নই। রুপও তেমন একটা নেই আমার। তোমার ভালোবাসার প্রতিদান দিতে পারবোতো!

– সুন্দরী তো নটী রাও হয়। দেহ বিলিয়ে টাকা আয় করে। তাই বলে মানুষ কী ওদের ভালোবাসে ? ব্যবহার করেই তো তাদের রাস্তায় ছুড়ে ফেলে। তোমায় আমি দেহের রং দেখে ভালোবাসিনি, তোমার নারীত্বকে ভালোবেসেছি। ভালোবাসা বুঝেনা দেহের রং, মানেনা কোন বয়সের সং। ভালোবাসা মানেই মনের আস্থা, এক বন্ধুর সাথে চলা এক আধখোলা রাস্তা! 

– গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে কাব্যের পাতায় নাম লিখাবে বুঝি! 

– নিজের মানুষটার জন্য হাজারো কাব্য রচনা করা যায়।

বলেই দিথীর দিকে ফিরে তাকায় শাহারিয়া। দিথী এখন কিছুটা লজ্জা পাচ্ছিলো। সে যে একজন নারী তা উপলব্ধি করতে পারছিলো। দিথী তার নজর নামিয়ে নেয়। শাহারিয়া একটা মুচকি হাসি দিয়ে তাকে তার বুকের সাথে জড়িয়ে নেয়। দিথীও দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে শাহারিয়াকে। দিথীর মাথায় হাত বুলিয়ে তার সাথে গল্পে মজে উঠে শাহারিয়া। দিথী তার পাশে বসে তার বুকে মাথা রেখে, আলিঙ্গন করে শাহারিয়ার গল্প শুনতে থাকে। শাহারিয়ার হৃদস্পন্দনও তার কানে আসছিলো। সে নিজেকে ভাসিয়েছিলো শাহারিয়ার ভালোবাসায়। দুইজনই মেতে উঠে প্রেমময় আলাপনে।

ট্রেন চলে যায় ঘন কুয়াশা ভেদ করে মাঠ,ঘাট, প্রান্তর দিয়ে। হুইসেল বাজিয়ে এই নিস্তব্ধ রাতের মাঝে জানান দেয় তার অস্তিত্বকে। আকাশের চাঁদ ঢাকা পড়ে যায় কুয়াশার চাঁদরে। জোছনা বোধহয় আজ কুয়াশার সাথে পালিয়ে গেছে, তাই চারপাশ খুব বেশি আলোকিত হয়নি। আঁধার ঠেলেই ট্রেন চলে যায়, ঝকঝক ঝকঝক শব্দ করে, সুদূর এক গন্তব্যের উদ্দেশ্য,,!!!

 

চলবে ,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

 

( কেমন লাগলো আজকের পর্ব টা জানাতে ভুলবেন না কিন্তু। আর গল্পের কোন বিষয় না বুঝলে বা মনে কোন প্রশ্ন থাকলে কমেন্টে করতে পারেন। আমি উত্তর দিবো। তবে ভবিষ্যতে কী হবে তা বাদে। অতীতে ঘটে গিয়েছে কিন্তু বুঝতে পারেন নি এমন কোন প্রশ্ন থাকলে বলবেন। আর অবশ্যই আজকের পর্বটা কেমন হয়েছে তা জানাতে ভুলবেন না 😊। সরি লেইট করে আপলোড দেওয়ার জন্য। কাল আর পরসুও পর্ব পাবেন ❤️)

 

 গল্প নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা করুন আমার গ্রুপে।

গ্রুপ লিংক 👇

https://www.facebook.com/groups/743016887019277/?ref=share_group_link

 

উপন্যাস :: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন :: ২(মুখোশ)

পর্ব :: ৭০ (২য় ভাগ)

লেখক :: মির্জা সাহারিয়া

 

উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন:: ২(মুখোশ)

পর্ব:: ৭১

লেখক:: মির্জা শাহারিয়া

 

শেষ রাত। এখনো ফজরের আযান দেয়নি। কিছুক্ষণ পর হয়তোবা দিবে। রায়হান ব্যালকনির গ্লাসের দরজার সামনে একহাত রেখে দাঁড়িয়ে কারো সাথে ফোনে কথা বলছে। তার গলার আওয়াজ নিম্ন। ব্যালকনির নিচ থেকে সদ্য ফোঁটা নতুন ফুলের সুবাস ব্যালকনির খোলা দরজা দিয়ে ঠান্ডা বাতাসের সাথে ভিতরে প্রবেশ করছে। এই সুঘ্রাণ অনেক গুলো আগরবাতির থেকেও তীব্র। রায়হান কিছুক্ষণ কথা বলে ফোনটা কান থেকে নামিয়ে নেয়। ফোনটা কেটে পিছনে ফিরে দেখে নিপা উঠেছে কি না। না। নিপা এখনো ঘুমাচ্ছে। তার গাঁয়ে কম্বল দেওয়া। রায়হান ফোনটা পকেটে রেখে ব্যালকনির দরজা দিয়ে বাইরে তাকায়। কিছু একটা ভাবতে থাকে। তাকে দেখে কিছুটা চিন্তিতই মনে হচ্ছে। রায়হান বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ ভাবার পর বিরবির করে নিজে নিজেই বলে উঠে,

‘ আলিশা আর ফুফুকে কারা মারলো ? এমন খুন-খারাবি, তাও আমাদের বাড়িতে! কোন কন্টাক্ট এজেন্ট ? নাকি অন্য কিছু আছে এইখুন গুলোর পিছনে ? আলিশাদের সাথে কারো কিইবা শত্রুতা থাকতে পারে ? নাকি আমাদের কমিউনিটির কেউ এই কাজের সাথে যুক্ত ? আমাকে ভয় দেখাইতে চায়! না আমাকে সাবধান করতে চায়! কোনটা ? ‘

রায়হান আবার পিছনে ফিরে নিপার ঘুমন্ত শরীরটাকে দেখে। সামনে ফিরে গ্লাসের দরজাটায় মাথা ঠুকে চোখ বন্ধ করে। তার বোধহয় কোন কিছুর জন্য চিন্তা হচ্ছে। রায়হান তার হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলে। তার রাগ হচ্ছে নিজের উপর। সে কেনো এই লাইনে আসলো! সে কী পারতোনা একজন স্বাভাবিক মানুষের মতো থাকতে! কেনো আসলো সে! রায়হান ছোট খাটো একটা ঘুষিই মেরে বসে দেয়ালে। তবে সেই ঘুষির শব্দ খুবই ক্ষিণ ছিলো। নিপা উঠেনি। রায়হান সোজা হয়ে দাঁড়ায়। চোখে কোনে আসা মৃদু জল হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে। চলে যেতে থাকে ওয়াশরুমের দিকে‌‌। ওয়াশরুমের ভিতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়। ব্যালকনির দরজা একটা কপাট খোলাই ছিলো। সেই দরজা দিয়ে ফুলের সুবাস ভরা বাতাস বয়ে এসে ঘরকে আরো ঠান্ডা করে দিচ্ছিলো। বাইরে কুয়াশা। ভোরের দিকে কুয়াশা আরো বেশি পড়ে। দূরের কোন এক মসজিদ থেকে ভেসে আসে ফজরের আযান।

 

____

 

ভোরবেলা। লতাপাতায় আচ্ছাদিত নীলগিরির ঘন গাছপালার অংশটায় এখনো খুব ভালো ভাবে আলো পড়েনি। আশপাশে কিছুটা কুয়াশা আর নিচের লম্বা লম্বা ঘাসে শিশির জমেছে। পাখি কিচিরমিচির করছে। এক গাছের ডাল থেকে অন্য গাছের ডালে উড়ে যাচ্ছে। 

একটা অর্ধগলিত লাশ পড়ে আছে এক গাছের সাথে হেলান দেওয়া অবস্থায়। মেয়েটার মুখের কিছুটা অংশ পচে গিয়েছে। মেয়েটার শরীর উলঙ্গ। পাশেই কিছুটা দূরে কিছু কাপড় পড়ে আছে। কিছুদিন আগে বৃষ্টি হওয়ায় স্যাতস্যাতে পরিবেশে লাশটা তাড়াতাড়িই পচতে ধরেছে। লাশটা দেখে এই গ্রামের কারো মনে হয়না। তবে দূরে থাকা কাদামাটির কাপড় গুলো যেন সাক্ষী দিয়ে বলছে এটা সেই মেয়ে যে বেশ কয়েকদিন আগে রাফসানের শিকার হয়েছিলো। রাফসান তাকে ধর্ষণ করে মেরে এখানে ফেলে গিয়েছিলো। মেয়েটার দেহের কিছু অংশ পচে গলে খসে পড়েছে। নাড়ি-ভুড়ি বেড়িয়ে এসেছে। বিভিন্ন কিট এসে খেতে শুরু করেছে সেই পঁচা দেহটাকে। যদি এটা ফাঁকা যায়গা হতো তাইলে এতোদিনে শকুন এই লাশ খেয়ে সাফ করে ফেলতো। কিন্তু জঙ্গলের এদিকটা ঘন হওয়ায় কিট পতঙ্গ ছাড়া আর কারোরই খাবার হিসেবে প্রাধান্য পায়নি লাশটা। 

কিছু মানুষের হেঁটে আসার পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। গাছের সুচোলো ডাল-পালা হাতের ছুরি দিয়ে কাটতে কাটতে কারা যেনো এগিয়ে আসছে। ধীরে ধীরে হালকা কুয়াশার মাঝে দৃশ্যমান হয় তারা। লোকগুলো ছিলো জুডাসের রক্ষী। পড়নে আনসারদের মতোই পোশাক তবে তার রং উজ্জ্বল বাদামী। পায়ে বুট জুতো। কাঁধে লম্বা নল ওলা রাইফেল‌। ৩ জন লোক ছিলো সেখানে। তারা সবাই মুখে রুমাল চেপে এগিয়ে আসে। লাশ থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ভেসে আসছে‌। কাছাকাছি আসতেই এই পঁচা গলা লাশ দেখে একজনের বমি পর্যন্ত চলে আসে। সাইডে গিয়ে সে বমি করে। বাকি দুজন লাশটার কিছুটা কাছে এসে লাশ টাকে দেখতে থাকে। দেখতে দেখতে একজন আরেকজনকে বলে,

– এইটা কার লাশ ? 

– বসের আদেশে মারা হইছে বলে তো মনে হইতেছে না। এই মেয়ে কে ? 

– এই মেয়ে কে তা চিন্তার বিষয় না। চিন্তার বিষয় এদিকে মানুষের চলাচল বাড়ছে। বসকে বিষয়টা জানাইতে হবে। নাইলে যে কেউ আমাদের আস্তানা খুঁজে ফেলতে পারবে। 

– হমম। 

তখনই দূরের বমি করা লোকটা তাদের ডাকতে থাকে,

– D1, D3 এদিকে আসেন। এইদিকে কিছু কাপড় চোপড় পড়ে আছে। 

– কই, চলোতো দেখি। 

দুইজন হেঁটে হেঁটে সেই আরেকজনের দিকে যায়। এদিকটা হালকা একটু ফাঁকা ছিলো। অনেক গুলো পাতার মাঝে কাঁদার দলায় আটকে থাকা কিছু জামা কাপড় খুঁজে পায় তারা। একজন এগিয়ে গিয়ে সেই জামা কাপড় কাঁদার মাঝ থেকে উঠায়। দেখে তো মনে হচ্ছে মেয়েটার কাপড়। একটা হাত ব্যাগও আছে। হাত ব্যাগ টা পিছনে আরেকজনের দিকে ছুঁড়ে দেয় সামনের জন। পিছনের লোকটা সেটা নিয়ে হাত দিয়ে উপরের কাঁদা ঝাড়ে ফেলে। চেইন খুলে। ভিতরে কিছু ভেজা কাগজ ছিলো। সাথে একটা আইডি কার্ড। দেখে মনে হচ্ছে কোন সংস্থার আইডি কার্ড। আইডি কার্ড টা বের করে হাতে নেয় লোকটা। সেখানে যা লেখা ছিলো তা পড়তে থাকে। 

‘ লয়েল লরেন্স হাসপাতাল। জোহরাতুন্নেসা মারিয়া। 1st শিফট এর নার্স। এই এইটা তো একটা নার্সের আইডি কার্ড। আর আইডি কার্ডের ছবির সাথে মেয়েটার অর্ধেক চেহারা মিলতেছে।’

সামনে থাকা দুইজন এগিয়ে আসে। এসে আইডি কার্ড টা হাতে নিয়ে দেখে। আসলেই মেয়েটা নার্স ছিলো। তবে রয়েল  লরেন্স হাসপাতাল টা তো রংপুর সদরে। এতো দূর থেকে মেয়েটা এখানে কেনো আসলো। আর কিইবা হয়েছিলো তার সাথে ? 

১ম ব্যাক্তি বলে উঠে,

– লাশ টাকে কী নিয়ে যাবো ? 

– মাথা খারাপ? ঐটা ধরতে গেলে হাড় থেকে সব মাংস খসে পড়বে। আর যে বাজে গন্ধ। নিয়ে যায় কি করবো আমরা। 

– বসের যদি দরকার পড়ে। 

– বসের মারা যাওয়া মেয়ে দিয়ে কী কাজ। বসের লাগবে জিন্দা মেয়ে। এইটাকে এখানেই রাখ। কয়দিন পর এমনিই পচে মাটিতে মিশে যাবে। 

– কবর দিয়ে দিলে কেমন হয় ? 

– তোর দিতে চাইলে তুই খুড়ে তারপর দে। ঐ লাশ ধরতে গেলেই সব মাখামাখি হয়ে যাবে। লাশের অবস্থা আরেকটু ভালো হইলে দেওয়া যাইতো। ঐটাকে ওখানেই রাখ। চল, বস রাউন্ডে পাঠাইছে, আমাদের রাউন্ড দেওয়া শেষ। বাকিরা এতোক্ষণ রাউন্ড দিয়ে ফিরেও গেছে মনে হয়। চল।

যেই লোকটার হাতে আইডি কার্ড আর ব্যাগটা ছিলো সেই লোকটা কার্ড আর ব্যাগটা লাশের গায়ে ছুড়ে মারে। সেই মৃদু আঘাতে লাশের মুখের অপর পার্শে থাকা চোখ টাও কোটর থেকে খুলে পড়ে। বেশ ভয়ঙ্করও লাগছিলো লাশটাকে দেখতে এবার। তিনজন মানুষ চলে যেতে থাকে। গাছের পাতায় জমা শিশির একসাথে জমা হয়ে পানির ফোঁটা হিসেবে লাশটার মাথায় পড়ে। পড়েই যেন তা পচে যাওয়া মাংসের ভিতরে হারিয়ে যায়। লাশের বুক থেকে হাতের দিকের পঁচা মাংসটাও খসে পড়ে যায় হাড় থেকে। চারপাশ আবার পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখর হয়ে যায়। গাছের পাতা গুলো দখিনা বাতাসে মৃদু নড়ে উঠে।

 

____

 

খাঁন বাড়ির পিছনের পুকুর। সময় এখন সকাল ৭ টা। সোনালী একলা একলা এই ঠান্ডা পুকুরের জলে গোসল করছে। একটা শাড়ির পেডিকোট তার বুক থেকে শুরু করে হাঁটু পর্যন্ত বাঁধা। তাই তার দেহটাকে কারো নজর থেকে বাঁচাচ্ছে। তবে এখানে কেউ ছিলোও না। এইসময় টায় পুকুরের দিকে কেউ আসেও না। সবাই নাস্তা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। সোনালী সাঁতার জানতো। সে সাঁতরে একপাশ হতে অন্য পাশ যাচ্ছিলো। মাঝে মাঝে ডুব দিয়ে পানির নিচে গিয়ে আবার কিছুক্ষণ পর উঠছিলো। 

ঘরের জানালা দিয়ে সবকিছু দেখে রাফসান। হাতে সিগারেট জ্বলছে। তার রুমের এই জানালা একদম পুকুর বরাবর। সম্পূর্ণ পুকুর টাই সে এখান থেকে দেখতে পারে। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিলো আর সোনালীর গোসল দেখছিলো। তার চোখে ললুভ দৃষ্টি। সিগারেটের ধোঁয়া উপরে ছেড়ে দিয়ে বিরবির করে বলতে থাকে,

– এই মেয়েটাকে নিজের বউ বানাইলেও মন্দ হয়না। এতো রুপ, এতো মোহ আর কারো শরীরে আমি পাইনাই। একটাকে তো দ্বিতীয় বারের বেশি ইউজ করার ইচ্ছাই জাগতো না। কিন্তু এই সোনালী, একে এখনো দেখে কিশোরী আর কুমারী লাগতেছে। কে বলবে এ আমার সাথে কয়দিন আগে রাত কাটাইছে। (একটু থেমে) সোনালীকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে হবে রে, বিয়ের প্রস্তাব দিতে হবে। কী নাই আমার। এই খাঁন গ্রুপের সম্পূর্ণ টাই আমার নামে আছে। বিজনেসে আর কারো ভাগ নাই। সোনালীর কী এতোটাতে পোষাবে না! (সিগারেটের ধোঁয়া উপরে ছেড়ে দিয়ে) পোষাবে পোষাবে। বাংলাদেশের অন্যতম বড় খাঁন গ্রুপের সম্পত্তির দাম তো আর কম না‌। সবটুকু দিয়ে হইলেও আমার সোনালীকেই চাই। এর প্রতি আমার দুর্বলতা কখনোই কমবে না। বউ করে নিলে তো আর বাঁধা থাকবে না। যখন মন তখনই,,,,, হি হি হা হা হা!!! তখনই হা হা হা!! 

রাফসান হাসতে থাকে। তবে তার হাসির শব্দ ঘর পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। 

সোনালী পুকুর পাড়ে ভেজা শরীরে উঠে দাঁড়ায়। ফর্সা গায়ের বরণ, মুখ দেখে যেন মনে হচ্ছে কোন নায়িকা। ভেজা চুল গুলো হাত দিয়ে কানের পাশে এনে রাখে। গোলাপি পাপড়ির মতো ভেজা ঠোঁট গুলো গুলো দেখে যে কোনো পুরুষেরই লোভ লাগবে। রাফসান যেন সোনালিকে দেখেই আরো থ হয়ে। সোনালী যেন সোনার মতোই চকচক করে উঠছিলো। সোনালী পুকুর পাড়ে উঠে পাড়ে থাকা তার শুকনো কাপড় গুলো হাতে নেয়। নিয়ে ঝাড়তে থাকে। রাফসান সিগারেট ফেলে দিয়ে জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়ায়। তার চোখ বড় বড়। মন অস্থির, উৎদিপ্ত। তখনই সোনালী ফিরে তার দিকে তাকায়। দোতলার রুমের জানালায় যে রাফসান দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে এটা যেনো সোনালী বুঝতে পেরেছিলো। সোনালী রাফসানের দিকে ফিরে এক দুষ্টু চাহনির সাথে মুচকি হাসি দেয়। রাফসান পাগলা ঘোড়ার মতো জানালার গ্রিল ধরে লাফাতে থাকে। সোনালীকে ও সামনে পেলে চাবিয়ে চাবিয়ে খেয়ে ফেললেও যেন ওর মনের তৃষ্ণা মিটবে না। সোনালী তার নিচের ঠোঁট দাঁত দিয়ে কামড়ে হাত উঠিয়ে রাফসানকে মধ্যাঙ্গুলি দেখায়। রাফসান তা দেখেই আরো বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়ে। এই উত্তেজিত রাগের উত্তেজিত না। এই উত্তেজনা পুরুষত্বের। রাফসান দৌড়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়‌। তার গন্তব্যে যে এখন পুকুর পাড়ে যাওয়া আর সোনালীকে নিয়ে পুকুরের জলে হাবুডুবু খাওয়া, তা বুঝতে আর বাকি রয়না। রাফসানের রুম নিস্তব্ধ-নিরব হয়ে পড়ে থাকে। 

 

_____

 

রাশেদ আঙিনার গামছাটা কাঁধে নিয়ে নেয়। হাতে কোদাল। পড়নে লুঙ্গি আর একটা ফুটোয় ভরা সেন্ডো গেঞ্জি। 

 

আয়ানের খোঁজ না পেয়ে রাশেদের মানুষিক অবস্থা বলার মতো না। টানা তিনদিন সে হতাশা আর বিষন্নতায় ভুগেছে। থানায় বারবার গিয়েছে আয়ানের ছোট্ট একটা খোঁজ আনার জন্য। কিন্তু পায়নি। থানার কোন লোকই তাকে আয়ানের খোঁজ দিতে পারেনি। রাশেদ এখন প্রায় হাল ছেড়েই দিয়েছে। সে যে কম চেষ্টা করেনি তা নয়। আয়ান হারিয়ে যাওয়ার পর টানা ১ সপ্তাহ সে গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে আয়ানের খোঁজ করেছে। কেউ আয়ানকে দেখেছে কী না, আয়ান কারো বাসা এসেছিলো কী না সব জানতে চেয়েছে। কিন্তু কোন খবর পায়নি। অটো ওয়ালা মঈনুল কেউ একজন মেরে পালিয়েছে। পুলিশ থাকা সত্তেও তারা সেই খুনিকে ধরতে পারেনি। সবমিলিয়ে রাশেদ এই দুদিন আগ পর্যন্ত হতাশা আর বিষাদগ্রস্ততায় ডুবে ছিলো। পরে তার সয্যাশায়ী মা-বাবার মুখের দিকে চেয়ে নিজেকে শক্ত করেছে। সে বসে থাকলে তো সংসার চলবে না। সেই কেবল এখন একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার সাথে তাকে মানসিক সাপোর্ট দিয়েছিলো শম্পা। শম্পা সেই মেয়েটা, যাকে রেলস্টেশন থেকে রাশেদ বাঁচিয়ে এনেছিলো। মেয়েটার বয়স ১৩ কী ১৪। তবে ঘরের সব কাজ নিজ হাতে সামলায়। রাশেদের বাবা-মায়ের দেখাশোনা, রান্না-বান্না সব নিজে করে। সাথে রাশেদকেও সে মানসিক সাপোর্ট দিয়েছে।

 

রাশেদ গামছা কাঁধে কোদাল নিয়ে যেতে উদ্যত হয় তখনই রান্না ঘরের দরজা থেকে তাকে পিছু ডাকে শম্পা। রাশেদ থেমে যায়‌। পিছন ফিরে তাকায়। শম্পা রান্না ঘরের দরজা থেকে নেমে তার দিকে আসতে থাকে। হেংলা পাতলা গায়ের গড়ন তার। পড়নে পুরোনো এক থ্রী পিস। 

রাশেদের সামনে এসে দাঁড়ায় শম্পা। বলে,

– আইজ আকবর চাচাগো খেতে যাইতাছেন না! 

– হ্যা। তাদের খেতে। 

– আমি খাওন লইয়া আমুনে ১১ ডা ১২ ডার দিক। আর,

– আর কি‌‌।

– চাচা চাচি গো ঔষধ ফুরায়া আইছিলো। কাইল পর্যন্ত চলবো। বিকালে ফিরা গন্জে যাইয়া ঔষধ লইয়া আইয়েন।

– ঠিক আছে। তুমি রান্না শেষ করে গোসল করে নিও। মা-বাবাকে খাইয়ে দিয়ো। আর সাথে, (একটু থেমে) আর সাথে নিজেও খেয়ে নিও। 

শম্পা মাথা নিচু করে আচ্ছা বলে। রাশেদে চলে যেতে থাকে।

 শম্পা আঙিনার মাঝে একলা দাঁড়িয়ে থাকে। রাশেদকে সে বড় ভাইয়ের চোখে দেখেনি আজো। সে রাশেদকে তার হিরো হিসেবে দেখে। তাকে সেদিন রেল স্টেশন থেকে যেভাবে ফাইট করে বাঁচিয়েছিল, তা একজন হিরোর দাঁড়াই সম্ভব বটে।

শম্বা ফিরে চলে যেতে থাকে রান্না ঘরের দিকে। ভাত হয়ে গেছে। এখন আলু সিদ্ধ আর ডাল রাধা বাকি তার। 

কাঁচা বাড়ি গুলোর মাঝে উঠোনটায় বেশ ভালোই রোদ পড়েছে। উঠোনের একপাশে মুরগি তার ছোট ছোট ছানা দের নিয়ে খাবার খুঁজতে থাকে। আশপাশের গাছপালা হতে পাখির কিচিরমিচির ডাক ভেসে আসে।

 

____

 

রিয়াদ বাইক নিয়ে এসে থামে খাঁন বাড়ির গেটের সামনে। পড়নে তার পুলিশি পোশাক। বেশ রোদ উঠেছে আজ। কাঁচা রাস্তা তপ্ত রোদে কাঠের তক্তার মতো শক্ত হয়ে গেছে। রিয়াদ বাইক টা সাইডে স্ট্যান্ড করে বাইক থেকে নামে। বাড়ির পাশের ছোট গেইট টা খোলাই ছিলো। রিয়াদ হাত ঘড়ি উঠায়। দেখে সাড়ে ১০ টা বাজে। আজ তাকে এক যায়গায় যেতে হবে‌, তাই সকাল সকালই চলে আসলো এ বাড়িতে। 

বাড়ির বড় গেইটের পাশে থাকা খোলা ছোট গেইট টা দিয়ে রিয়াদ ভিতরে প্রবেশ করে। ভিতরে ঢুকেই দেখে দাড়োয়ান রহিম চাচা চেয়ারে বসে লাঠি হাতে ঘুমাচ্ছে। রিয়াদ ভ্রু কুঁচকে তাকায়। বাড়িতে খুন হয়ে গেছে, এখন সিকিউরিটি বাড়াবে কিনা উল্টো দিনের বেলাও ঘুমাইতেছে! রিয়াদ এগিমে যায় রহিম চাচাকে ধমকিয়ে উঠানোর জন্য। তখনই কিছু একটা মনে পড়ায় সে আর এগোয় না। সামনে ফিরে চলে যায় অন্দরমহলের গেটের দিকে। 

 

       সুরাইয়া বেগমের রুমের দরজার তালা খোলার শব্দ পাওয়া যায়। কেউ একজন তালা খুলে দরজার হেজবল খুলছে। এবং দরজাটা মেলে দেয়। লোকটা রিয়াদই ছিলো। দরজার পর একটা লম্বা ফিতা টাঙানো। রিয়াদ সেই ফিতা ডিঙিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। এর আগে যতবারই সে এই রুমে তার কনস্টেবলদের সার্চ করতে বলেছিল, কনস্টেবল রা শুধু ঐ লম্বা হিল জুতা জোড়া ছাড়া আর কিছুই তাকে এনে দিতে পারেনি। রুমে টায় আরকি কিছুই নাই! রিয়াদ আজকে এইজন্য নিজেই আসছে সার্চ করার জন্য। কিছু না কিছু তো থাকবেই এই রুমে। রিয়াদ শুরু করে পড়ার টেবিল টা দিয়ে। এতো গুলা বইয়ের পাতা উল্টে দেখার মতো সময় বা ধৈর্য কোনটাই এখন তার নেই। তাই বই গুলো সড়িয়ে সড়িয়ে তার ফাঁক ফোকরে কিছু আছে কি না তাই দেখতে থাকে। কলম দানি টেবিলে উল্টিয়ে সেখানে কিছু আছে নাকি তা দেখে। টেবিল ঘড়িটাও নাড়িয়ে ঝাকিয়ে দেখে। সুরাইয়া বেগমের শরীরে ড্রাগ পাওয়া গেছে। সেই ড্রাগ তিনি ঘরের কোথায় সংরক্ষণ করতেন? নিশ্চয়ই এমন কিছুর ভিতরেই রেখেছেন যা আমাদের চোখের সামনে আছে কিন্তু আমরা সন্দেহ করবো না। রিয়াদ টেবিল ঘড়িটা রেখে পড়ার টেবিলে থাকা একটা ঝুড়ি টেবিলে উবুর করে ফেলে দেয়। সেখানে থাকা জিনিস গুলো নেড়ে চেড়ে দেখতে থাকে। না, এখানেও কিছু নেই। রিয়াদ দুই হাত কোমরে দিয়ে চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে। তখনই তার চোখ যায় আলমারির দিকে। আলমারিতে কিছু থাকলেও থাকতে পারে। সে আলমারির সামনে এসে আলমারিটা খুলে। এটা সেদিনই চাবি দিয়ে খুলে রেখে গিয়েছিলো সে। তাই আজ হাতল ধরে টানতেই আলমারির দুই কপাট খুলে যায়। রিয়াদ আলমারির ভিতরে কাপড় গুলো সড়িয়ে সড়িয়ে দেখতে থাকে। সুরাইয়া বেগম আর আলিশার কাপড় এগুলো। শাড়ি, থ্রী পিস, লেহেঙ্গ সহ আরো অনেক কাপড়। রিয়াদ সব কাপড় নেড়ে দেখার পর ভিতরে থাকা একটা ড্রয়ার খুলে। ড্রয়ারের ভিতর অনেক কাগজ পত্র রাখা। রিয়াদ ড্রয়ার টাকেই আলমারি থেকে বের করে সেটা নিয়ে বিছানায় এসে বসে। একপাশে চাদরটা উঠিয়ে দিয়ে তোষকের উপর সব উবুড় করে ঢালে দেয়। নিচে এখনো রক্তের দাগ আছে। চাদরেও রক্তের দাগ। এগুলো কিছুই পরিষ্কার করা হয়নি। যতদিন না কেস সলভ হচ্ছে এসব পরিষ্কার করাও হবেনা। 

 রিয়াদ সব নেড়ে চেড়ে দেখতে থাকে। অনেক সমিতির সঞ্চয় কাগজ, ইলেকট্রিক বিলের কাগজ সহ আরো অনেক কাগজ। তারমানে সুরাইয়া বেগম টাকা জমাতেন। নিজের মেয়ের ভালো ভবিষ্যতের জন্য যেকোন মা’ই সঞ্চয় করবে, যখন আরো তার স্বামী মৃত থাকে আর পরিবার তাকে একঘুরে করে দেয় তখন তো এটা একপ্রকার মায়ের কাছে ফরজ কাজই হয়ে দাঁড়ায়। 

 রিয়াদ সব কাগজ উল্টে পাল্টে দেখতে দেখতে একটা ছবি এলবাম পায়। বেশ পুরোনো এলবাম। ছবি গুলো রঙিন, তবে দেখে মনে হচ্ছে ১৯ দশকের দিকে তোলা। রিয়াদ ছবি গুলো উল্টে পাল্টে দেখতে থাকে। বেশির ভাগ ছবি আলিশা আর সুরাইয়া বেগমের। আর এই বাড়ির কর্তা দের। নজরুল সাহেবের যুবক কালের ছবিও আছে এতে। রিয়াদ একেকটা ছবি ভালোভাবে দেখে দেখে পাল্টাতে থাকে। তখনই একটা আলাদা ছবি সে পায়। ছবিটা উল্টো পাশে ঘুড়িয়ে এলবামে রাখা ছিলো। ছবিতে ৪ জন ছিলো। রিয়াদ ছবিটা এলবাম থেকে বের করে সোজা করে। মন দিয়ে দেখতে থাকে। তখনই সে বেশ অবাক হয়ে যায়। অবাক কন্ঠে বলে উঠে,

 – আরে, এটা এডভোকেট মশিউর রহমান না! ইনার মার্ডার কেস নিয়ে তো বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হইছিলো। আমার মনে আছে, আমি তখন কলেজে পড়তাম। ইনাকে চলন্ত ট্রেনে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিলো। উনার পাশে তো দেখি সুরাইয়া বেগম দাঁড়ানো। (ছবিটা নামিয়ে অবাক হয়ে) তাইলে কী সুরাইয়া বেগম আর ব্যারিষ্টার মশিউর স্বামী স্ত্রী ছিলেন ? (ছবিটা উঠিয়ে দেখতে দেখতে) সুরাইয়া বেগম পাশে দাঁড়ানো ৪ বছর বয়সী মেয়েটাকে তো আলিশা মনে হচ্ছে। হম, আলিশার চেহারার সাথে মিল আছে। আলিশা ছোট বেলাও সুন্দর ছিলো। (একটু থেমে) কিন্ত এটা! এটা কে ? সুরাইয়া বেগম কাকে কোলে নিয়ে আছেন ? দেখে তো দেড়-দুইয়ের মতো বয়স মনে হচ্ছে। (ছবি নামিয়ে অবাক গলায়) তাইলে আলিশারা দুইবোন ছিলো ? (ছবি উঠিয়ে) হ্যা, হ্যা। এটা মেয়েই। ছেলে না। চেহারা তো তার বাবার মতোই হয়েছে। হাতে একটা দাগও আছে। মনে হয় কাঁটা গিয়েছে বা আঘাত পাওয়ার দাগ। 

রিয়াদ ছবিটা উল্টিয়ে আবার সোজা করে। তখনই সে আবার অবাক হয়ে ছবিটা উল্টায়। ছবির পিছনে কিছু লেখা ছিলো। রিয়াদ অবাক হয়ে পড়তে থাকে,

‘ এই বাড়ির কিছু অতীত আছে, যা বংশ পরম্পরায় হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। এই অতীত কারো জন্য ভালো কিছু বয়ে আনেনি, আনবেও না। আকাশ পাতাল তো নাম মাত্র, নরক রয়েছে আমাদেরই মাঝে। খুঁজে বের করতে তো পারবে সেই, যে বুঝবে তাদের অক্ষ মতে ‘ 

রিয়াদ অবাক হয়ে সামনে তাকায়। বিরবির করে বলে,

– এই লেখার মানে কী ? এতো দেখতেছি আবার নোমানের কেসের মতো ছন্দ। তবে এই ছন্দ একটু কঠিন। সুরাইয়া বেগম এই ছন্দ লিখেছেন ? তিনি কেনো ছন্দ লিখতে গেলেন ? সরাসরিও তো লিখতে পারতেন। শাহারিয়াও বউ নিয়ে পালাইলো আর ছন্দ আসে হাজির। আমি পাগল হয়ে যাবো বাপ, এতো এতো রহস্য, ধুরর,,,,,

 

_____

 

চা বাগানের জেলা সিলেট। পাহাড়ে পাহাড়ে বাগান, গাছ সবমিলিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অন্যতম লীলাভূমি। শ্রীমঙ্গল সিলেটের একটা যায়গা। এইখানটায় মানুষের ঘরবাড়ির তুলনায় পাহাড় আর চায়ের বাগানের সংখ্যা বেশি। 

 

একটা গাড়ি ঢুকে ছোট্ট রাস্তা দিয়ে। এই যায়গাটা সমতল ভুমি থেকে ৫০ মিটার উঁচুতে। সামনেই নিরহরি বাজার। সেই বাজার থেকে যেই রাস্তাটা চলে গিয়েছে তা ধরে ৫০০-৬০০ মিটার সামনে গেলেই এই ছোট রাস্তাটা পড়ে বড় রাস্তার বা পাশে। এই রাস্তা দিয়ে যেতে হয় এখানে প্রকৃতির মাঝে বানানো একমাত্র বাড়িটায়। 

 

গাড়ি এসে থামে ‘বলাকাবিলাস’ এর সামনে। বাড়িটার নামই বলাকা বিলাস। চারপাশে গাছপালা। মাঝে সুউচু প্রাচীর ঘেরা এই বাড়িটা যেনো এক গোল সবুজ বাগান ভূমির মাঝের বৃত্ত। শাহারিয়া, দিথী গাড়ি থেকে নামে। গাড়ির ড্রাইভার রুমান তার দরজা খুলে নেমে ডিক্কি খুলতে যায়। দিথী গাড়ি থেকে নেমেই এক বিষ্ময় নজরে চেয়ে থাকে বাড়িটার দিকে। বাড়িটা খুব বেশি বড় নয়। দোতলা। শহুরে ম্যানশন বাড়ি গুলোর মতো। বাড়ির দোতলার ঠিক মাঝখানটায় একটা গোল ব্যালকনি বারান্দা। তার দুই পাশে দুই ঘরের জানালা। সেই ব্যালকনি বারান্দার নিচেই বাড়িতে প্রবেশ করার দুয়ার। বাড়িটা সম্পূর্ণ সাদা রঙের। হয়তো একয়দিনের মধ্যে রং করা হয়েছে। আকাশ টা মেঘলা। শ্রীমঙ্গলে বেশিরভাগ সময়ই বৃষ্টি হয়। শীতকাল তবুও বৃষ্টি হয়। কুয়াশা তো আছেই। 

শাহারিয়া ব্যাগ টা রুমানের কাছ থেকে নিয়ে নেয়। তাকে বলে,

– গাড়ি নিয়ে বাজারে যা, হোটেল থেকে খাবার নিয়ে আয়। আমি বিকালের দিকে বেড়োবো। 

– ঠিক আছে স্যার। 

রুমান গাড়ির ড্রাইভারের দরজা খুলে চড়ে বসে। গাড়িটাকে ব্যাকে নিয়ে চলে যেতে থাকে। 

শাহারিয়া এসে দাঁড়ায় দিথীর পাশে। দিথীর হাত ধরে বলে,

– চলো। বাড়ির সামনের ফাঁকা যায়গাটা আরো সুন্দর। 

 শাহারিয়া আরা দিথী বাড়ির প্রাচীরের গেটের সামনে আসে দাঁড়ায়। শাহারিয়া গেটে শব্দ করে। ডাক দেয়,

– বুধু চাচা। বুধু চাচা।

দরজা খুলে দেয় এক বয়স্ক লোক। শাহারিয়াকে দেখেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠে। শাহারিয়া আর দিথী ভিতরে প্রবেশ করে। 

এই গেইট থেকে বাড়ির ভিতরে ঢুকার গেইট পর্যন্ত যায়গাটার ঘাস ছেটে সাদা পথ বানানো। বাড়ির সামনের ফাঁকা যায়গাটা, অর্থাৎ বাড়ি থেকে বাড়ির প্রাচীর পর্যন্ত ফাঁকা যায়গাটায় সুন্দর সুন্দর সবুজ ঘাস গজিয়েছে। বাড়ির ডান পাশের ফাঁকা যায়গাটায় একটা দোলনা আছে। আর দোলনাটার একটু সামনেই একটা গাছ। গাছ টার নাম চেরি ব্লসম। গাছের সব গুলো পাতা গোলাপী। এই গাছ তো বিদেশী গাছ। এই গাছ এখানে কী করে! দিথী শাহারিয়ার দিকে ফিরে অবাক গলায় বলে,

– ঐটা বিদেশী গাছ না! আমি মুভিতে দেখছিলাম এমন গাছ।

– হ্যা। ঐটা জাপানি গাছ। চেরি ব্লসম। শুধু শীত কালেই এই গাছে গোলপী পাতা আসে। আর বাকি ১০ মাস কোন পাতাই ধরে না। এই গাছ থেকে সারাদিন পাতা উড়বে। আবার যতগুলো পাতা উড়বে ততগুলো রাতে গজিয়েও যাবে। একটা পাতা ধরে দেখো। ফুলের পাপড়ির মতো নরম।

দিথী উড়ে যেতে থাকা একটা পাতাকে ধরে। আসলেই এই পাতা পাপড়ির মতোই নরম। গাছটা তার কাছে অনেক সুন্দর লাগে। এই গাছ টা যেনো এই বাড়িটার সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে তুলেছে। দিথীকে নিয়ে শাহারিয়া বাড়ির দরজার দিকে এগিয়ে যায়। দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। চাবি দিয়ে বড় কাঠের দুয়ার খানা খুলে ভিতরে প্রবেশ করে। 

 

     বাড়ির নিচে ডায়নিং আর ড্রয়িং রুম। ড্রয়িং রুমে সোফা আর সিড়ি আছে‌। সেই সিড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে হয়। দোতলায় ৩ টা রুম। মাঝে একটা আর দুই পাশে দুইটা। দিথী আর শাহারিয়া মাজের রুমটাতেই ঢুকে। রুমে মাঝে একটা বেড। সাদা চাদর বিছানো তাতে। বেডের পাশের একটা ছোট্ট টেবিল। তাতে টেবিল ল্যাম্প রাখা। নিচে কার্পেট বিছানো। উপরে ছোট্ট একটা ঝাড়বাতি। দিথী রুমে এসেই চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকে। শাহারিয়া ব্যাগটা রাখে। বিছানায় গিয়ে বসে। দিথী রুম থেকে বারান্দার দরজা খুলে বারান্দায় যায়। এইটাই সেই বাড়ির মাঝের গোল বারান্দা। রেলিং গুলো ডিজাইন করা। দিথী রেলিং ধরে চারপাশে নজর দেয়। চেরি ব্লসম গাছের গোলপী পাপড়ি উড়ে যাচ্ছে। আকাশ মেঘে ঢাকা। দূরের পাহাড় গুলো দেখা যাচ্ছে। পাহাড়ের গাঁয়ে চা বাগান। কিছু ছোট্ট ছোট্ট কুঠুরিও আছে সেই বাগান গুলোর মাঝে। এখান থেকে চারপাশের প্রকৃতির দৃশ্য বেশ উপভোগ্য ছিলো। 

ঘর থেকে শাহারিয়া ডাকে,

– বউজান, ঘরে আসেন। 

দিথী ভ্রু কুঁচকায়। বউজান বলে কাকে ডাকলো ? দিথী তাড়াতাড়ি পিছনে ফিরে দরজা দিয়ে ঘরের ভিতর ঢুকে। শাহারিয়া ডেসিন টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শার্ট খুলছিলো। দিথী এসে বলে,

– এই বউজানটা কে ? 

– তুমি। তুমিই বউজান। 

– কী অদ্ভুত নাম!

– তুমিই আমার বউ, আবার তুমিই আমার জান। দুইটা একসাথে করে ডাকলাম, বউজান!

দিথী বিছানায় বসে পড়ে। বিছানা বেশ তুলতুলে। দিথী বসে লাফাতে লাফাতে বলে,

– অনেক নরম তাই না! 

– হ্যা। গোসল করবানা! ঐযে ঐদিকে গোসল খানা। যাও গিয়ে গোসল করে নাও। 

– গোসল কী আমি একলা করবো নাকি। (দাঁড়িয়ে শাহারিয়ার পিছনে টুকি দিয়ে) তোমাকে সাথে নিয়ে করবো! হি হি হি।

– হিজাব টা খুলে রাখো। পড়ে ভিজে গেলে খুলতে পারবানা।

– তুমি খুলে দেও। 

বলেই দিথী এসে শাহারিয়ার সামনে দাঁড়ায়। শাহারিয়া দিথীর হিজাবের পিন গুলো খুলে খুলে ডেসিন টেবিলে রাখে। দিথী হিজাব খুলে ফেলে। মাথার চুল গুলো মেলে দিয়ে ঝাড়তে থাকে। শাহারিয়া তার শার্ট খুলে বিছানার একপাশ টায় রাখে। দিথী তার বোরখা খুলে ফেলে। খুলে সেটা ফ্লোরে ফেলে দিয়ে শাহারিয়ার পিঠিতে লাফ দিয়ে চড়ে বসে। শাহারিয়ার গলা ধরে ঝুলে থাকে। শাহারিয়া টাল সামলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। বলে,

– এভাবে হঠাৎ করে কেউ চড়ে! আরেকটু হইলেই দুইজন ধপাস করে পড়ে যেতাম। 

– চলো চলো গোসলে চলো। আজ আর কেউ নাই বাঁধা দেওয়ায়। একসাথে দুইজন গোসল করবো। 

– আজ আমার বোধহয় আর রক্ষে নাই! 

– নাইই তো। চলো চলো। 

শাহারিয়া মানিব্যাগটা বিছানায় রেখে দিথীকে পিঠে নিয়েই চলে যায় গোসল খানার দিকে। দিথীর মুখে হাসি। শাহারিয়া কবিতা কাটতে কাটতে ঢুলে ঢুলে তাক নিয়ে গোসল খানায় চলে যায়। যদিও আবহাওয়া ঠান্ডা। তবুও এখন তাদের কাছে গোসল টা উষ্ণ ধারা। এই উষ্ণ ধারার প্রবাহ এতোটাই গরম যে তা আর বর্ণনাতিত না!!!

 

_____

 

গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে শম্পা। এখানকার আকাশ আবার রৌদ্রজ্জ্বল। মেঘের ছিটেফোঁটাও নেই। দূরে মাঠে কিছু লোক কাজ করছে। সেখানে রাশেদও আছে। শম্পা রাশেদের জন্য খাবার নিয়ে যাচ্ছে। ছোট গামলায় ভাত, তার উপরের বাটিতে ডিম ভাজি, আলুর ভর্তা, ডাল আর দু-তিনটে কাঁচা মরিচ। গামলাটার উপর তরকারির বাটি গুলো রাখা। গামছা দিয়ে সেই গামলা বেঁধে একহাতে কোমরের সাথে ধরেছে। আরেক হাতে একটা স্টিলের জগ আর মগ ধরেছে। যেনো কোন বউ তার কৃষক স্বামীর জন্য জমিতে ভাত নিয়ে যাচ্ছে। শম্পা মুখে ক্লান্তির ছাপ নেই। মুখ টা মলিন, স্বাভাবিক। পড়নে এখনো সেই পুরোনো থ্রি পিস টাই।

সেই রাস্তার আরেক পাশ থেকে হেঁটে আসছে রিয়াদ। পড়নে কালো পাঞ্জাবি। দেখে মনে হচ্ছে কোথাও একটা যাচ্ছে সে। মাঝে মাঝে ঘড়ি উঠিয়ে সময় দেখছে আর হাঁটছে। তার মধ্যে তেমন একটাও ব্যস্ততা নেই। স্বাভাবিক গতিতেই হাঁটছে। বাইক নিয়ে বেড়োয়নি আজ। বাইক বাসায় রেখে এসেছে। 

শম্পা আর রিয়াদ প্রায় সামনাসামনি কাছাকাছি চলে আসে। শম্পা আর পাঁচটা ছেলে দেখলে যেমন স্বাভাবিক থাকে তেমনি আছে। রিয়াদকে সে দেখে আবার সামনের পথের দিকে নয়ন ঘুড়িয়েছে। তবে রিয়াদ শম্পাকে দেখে একটু অবাকই হয়। মেয়েটাকে আগে এই গ্রামে দেখেছে বলে তো মনে হয়না। গায়ের রং দেখে তেমন গরীব ঘরেরও মনে হয়না, তবে গাঁয়ের পুরোনো থ্রীপিস তো বলছে অন্য কথা। রিয়াদের সামনাসামনি আসতেই শম্পাকে রিয়াদ থামায়। শম্পা একটু অবাক হয়েই রিয়াদের দিকে তাকায়। রোদ পড়ছিলো তার মুখে। তাই চোখ গুলো একটু সরু সরু করেই তাকায়। রিয়াদ বলে,

– তুমি এই গ্রামের কেউ না হরিশপুরের কেউ ? 

– আমি এই গেরামেই থাহি। 

– আগে তো কখনো দেখিনি তোমায় ? 

শম্পা নিজের নজর নামিয়ে নেয়। ধীর গলায় বলে,

– আমি ২ সাপ্তা আগেই এই গেরামে আইছি।

– কার বাসায় আসছো ? 

শম্পা মুখ তুলে তাকায়। বলে,

– উনার বাসায়।

– উনি কে ? 

– র, রাশেদ। রাশেদ নাম হের।

– রাশেদের বাসায় আসছো ? তুমি ওর কোন আত্মীয়? 

– জে মানে না। (মাথা নিচু করে ধীর গলায়) আমারে হেয় আশ্রয় দিছে।

রিয়াদ কিছু একটা বলতেই যাবে তখনই শম্পা যেই হাতে গামছা বাঁধা ভাতের গামলাটা কোমরের সাথে ধরে ছিলো সেই হাত টার দিকে তাকায়। রিয়াদ অনেক অবাক হয়। তার চোখ মুখ বড় বড় হয়ে যায়। অবাক কন্ঠে বলে,

– এই দাগ! এই দাগ কীসের ? 

– কোনডা? এইডা ? এইডা আমার ছুডু বেলায় হইছিলো। কেমনে হইছিলো তা জানিনা, তয় কেউ কয় জন্ম দাগ, কেউ কয় ছোট বেলায় কাইট্টা গেছিলো হেই দাগ। 

রিয়াদ ২ পা পিছিয়ে দাঁড়ায়। এক ঢোক গিলে। বড় বড় চোখ নিয়ে সামনে তাকায়। বলে,

– এই দাগ তো আমি ছবিতে আলিশার ছোট বোনের হাতে দেখছিলাম! 

 

চলবে ,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

 

( শম্পাই তাইলে আলিশার ছোট বোন? সে কীভাবে বেঁচে গিয়েছিল? কী হতে চলেছে এরপর? গল্প নিয়ে আপনার মূল্যবান মতামত জানাতে ভুলবেন না। সরি লেইট করে আপলোড করার জন্য 😓 কালও পর্ব পাবেন ❤️)

 

 গল্প নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা করুন আমার গ্রুপে।

গ্রুপ লিংক 👇

https://www.facebook.com/groups/743016887019277/?ref=share_group_link

 

উপন্যাস :: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন :: ২(মুখোশ)

পর্ব :: ৭১

লেখক :: মির্জা সাহারিয়া

 

উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন:: ২(মুখোশ)

পর্ব:: ৭২

লেখক :: মির্জা শাহারিয়া

 

– এই দাগ! এই দাগ কীসের ? 

– কোনডা? এইডা ? এইডা আমার ছুডু বেলায় হইছিলো। কেমনে হইছিলো তা জানিনা, তয় কেউ কয় জন্ম দাগ, কেউ কয় ছোট বেলায় কাইট্টা গেছিলো হেই দাগ। 

রিয়াদ ২ পা পিছিয়ে দাঁড়ায়। এক ঢোক গিলে। বড় বড় চোখ নিয়ে সামনে তাকায়। বলে,

– এই দাগ তো আমি ছবিতে আলিশার ছোট বোনের হাতে দেখছিলাম! 

– আলিশা কেডা? 

রিয়াদ শম্পার দিকে তাকায় বলে,

– আলিশাকে তুমি চিনোনা ? 

– না তো। এই নামে কাউরে চিনি বইলা তো মনে হইতাছে না।

– ত, তোমাকে রাশেদ তার বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছে ? 

শম্পা মাথা নিচু করে। ধীর গলায় বলে,

– হ। আমি হের বাইত্তেই থাহি। 

– তার আগে তুমি কোথায় থাকতা ? তোমার বাবা-মা ? ওরা কোথায় ? 

শম্পা মাথা উঠিয়ে কিছুটা লেগে আসা গলায় বলে,

– আমি দিনাজপুর রেইল ইস্টিশনে থাকতাম মায়ের লগে। আমার মায়ে পাগলি ছিলো। দুইজন মিল্লা ভিক্ষা কইরা খাইতাম। (মাথা নামিয়ে) ১ মাইস আগে আমার মায়ে ট্রেনে কাটা পইড়া মইরা যায়। আমার বাপ কেডা আমি জানতাম না। তারপর থে একলা একলাই ইস্টিশনে থাকতাম। একদিন কিছু খারাপ পোলা আমারে বাজে কথা কইয়া আমারে ধইরা তুইলা নিতে চাইছিলো, হেইসময় উনি আইয়া আমারে বাঁচান। (একটু থেমে) আর আমারে হের বাড়ির আইনা থাকতে দেন। 

– উনি কে ? রাশেদ ? 

– হ। 

– কিন্তু এই দাগ, এই দাগ ভুল হতেই পারেনা। একদম এই দাগই আমি আলিশার ছোট বোনের হাতে দেখেছি। তোমার বয়সও আলিশার ছোট বোনের মতোই হওয়ার কথা। কিন্তু তুমি রেলস্টেশনে কীভাবে বড়ো হলে ? 

– আপনের কথা আমি কিছুই বুঝতাছিনা। এই দাগ আমার ছুডু বেলার থেই আছিলো। এই দাগ দেইখা আপনি এমন কেন করতাছেন ? 

রিয়াদ শম্পার কথাকে প্রাধান্য না দিয়েই বিরবির করে বলতে থাকে,

– এযে আলিশার বোন এটা কিভাবে প্রমাণ করবো ? ডিএনএ টেস্ট? হ্যা হ্যা। ও যদি আলিশার বোন হয় তাইলে ওর ডিএনএ আর আলিশাদের ডিএনএ ম্যাচ করবে। কিন্তু বডি তো চুরি হয়ে গেছে। তাইলে! 

– কি কইতাছেন বিরবির কইরা‌। আমারে যাইতে দেন। হেয় আমার লাইগা অপেক্ষা করতাছে। সকালে কিচ্ছু খাইয়া বাইর হয়নাই। আপনের লগে কথা কইতে কইতে আমার ভাত সব ঠান্ডা হইয়া যাইবো। আমি গেলাম। 

– দাঁড়াও দাঁড়াও দাঁড়াও। (শম্পাকে থামিয়ে) ত, তোমার একটা চুল আমাকে ছিঁড়ে দাও। 

– চুল! ক্যান, চুল ছিঁড়া দিমু ক্যান! আপনে চুল দিয়া কী করবেন ? 

– কাজ আছে। তুমি একটা চুল ছিঁড়ে দাও। নাইলে দাঁড়াও আমিই একটা ছিঁড়ে নিচ্ছি। 

– খারান খারান। আপনে কেডা। আপনারে আমি চিনিনা জানিনা, আমারে ছুইতে আইবেন না। 

– আরে আমি এই গ্রামের থানার ওসি। আমার নাম রিয়াদ। আমি এই চুল নিয়ে কী করেছি তা একদিন তোমাদের বাসা গিয়ে বলে আসবো। তুমি শুধু আমাকে একটা চুল দেও।

– আমার দুই হাতই তো বন্ধ।

– গামলাটা আমার হাতে দেও। 

বলেই রিয়াদ শম্পার হাত থেকে গামলাটা নিয়ে নেয়। শম্পা কিছুই বুঝতে পারছিলো না। কী হচ্ছে, কেনো হচ্ছে আর কেনই বা কেউ একজন তার চুল চাইছে। শম্পা তার আরেক হাতের জগ টা নিচে রেখে তার মাথা থেকে একটা চুল ছিঁড়ে রিয়াদকে দেয়। রিয়াদ সেটা নেয়। রিয়াদের হাত থেকে শম্পা গামলাটা নিয়ে নেয়। হেলে নিচে রাখা পানির জগ টাও নিয়ে নেয়। রিয়াদ হন্তদন্ত হয়ে বলে,

– আমি যে তোমার চুল নিয়েছি তা আপাতত রাশেদকে বলোনা। আমি একদিন তোমাদের বাসা যেয়ে সব তোমাদের খুলে বলবো। ঠিক আছে ? 

শম্পা আর কিছু বলেনা। হ্যা সূচক মাথা নাড়ায়। রিয়াদ চলে যায় শম্পার পাশ দিয়ে। হাতে থাকা চুল টা পেচিয়ে তার পান্জাবির সাইড পকেটে যত্নের সহিত রাখে। শম্পা পিছনে ফিরে রিয়াদের যাওয়ার পানে একবার দেখে। তারপর ঠোঁট উল্টে আবার সামনে ফিরে। চলে যেতে থাকে খাবার নিয়ে এই তপ্ত রোদের মাঝে। 

 

_______

 

সুমু গোসলখানা থেকে বেড়োলো। গাঁয়ে নতুন কাপড়, মাথায় ভেজা চুল। এই প্রথম কোন গোসলখানায় ঝড়না দিয়ে গোসল করলো সে। মুখে শুভ্রতার ছোঁয়া যেন তাকে নতুন করে জীবিত করে তুলেছে। হাতে থাকা গামছাটা দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে হেঁটে যেতে থাকে বারান্দা দিয়ে। মুখ মলিন। মুখে হাসি নেই। এখনও সে এইবাড়ির সাথে নিজেকে ভালোভাবে মানিয়ে নিতে পারেনি। সে একটু ইনট্রোভার্ট টাইপের বলা যায়। একলা থাকতে বেশি পছন্দ করে। 

বারান্দার দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় সুমু। আঙিনার মাঝখান টায় শিউলি বেগম বসে আছেন। আর তার মাথায় তেল দিচ্ছে ফুলমতি। রোদ উঠেছে আজ ভালো রকমই। সুমু বারান্দা থেকে আঙিনায় নামে। গিয়ে আঙিনার রশিতে ভেজা গামছাটা মেলে দেয়। তাকে দেখেই শিউলি বেগম বলে উঠেন,

– গোসল হইছে তোমার!

– জ্বী আন্টি। হয়েছে। 

– আন্টি কারে কও! আমি তোমার আন্টি লাগিনি! 

– স,সরি। আসলে আমার মাথায় আর কিছু আসছিলো না। 

– আমারে চাচি নাইলে মা কইতে পারো। যেইডা ইচ্ছা আরকি। (পিছনে বসে থাকা ফুলমতিকে বিরবির করে) তুই যা। গিয়া গোসল ডা দিয়া আয়। দুপুর হইয়া আইছে ভাত খাইতে হইবো, খিদা লাগছে। 

– জে আইচ্ছা চাচি। 

ফুলমতি মোড়া থেকে উঠে হাতের তেলের বোতলটা মোড়ায় রেখে চলে যায়। শিউলি বেগম টুল থেকে উঠে মোড়ায় থাকা তেলের বোতলটা হাতে নিয়ে মোড়ায় বসেন। সুমুকে ডাকতে থাকেন,

– আহো, এদিকে আহো। 

সুমু ধীর পায়ে এগিয়ে যায় সেদিকে। শিউলি বেগম তাকে তার সামনে থাকা টুল টায় বসতে বলেন। সুমু একটু ইতস্তত বোধ করছিলো। শিউলি বেগম আবার বলেন,

– আরে আমি তোমারে খাইয়া ফেলমুনা তো।‌ বহো বহো।

সুমু ধীর পায়ে এসে শিউলি বেগমের সামনে থাকা টুল টায় বসে। শিউলি বেগম মোড়াটাকে একটু টেনে সুমুর পিঠের কাছাকাছি হয়ে বসে। সুমুর খোলা চুল গুলো নিজের পায়ের রানের উপর নিয়ে বলেন,

– তোমার চুল গুলা অনেক লম্বা। যত্ন নিয়ো। আমি তেল মাখায়া দেই! 

– জ,জী দেন। 

শিউলি বেগম তার কোলে থাকা তেলের বোতলটা খুলে হাতে হালকা তেল নেন। মাথার চুল গুলো ভেজা ছিলো তাই চুল গুলো নিজের দুই পায়ের রানের উপর মেলে দিয়ে মাথার মাঝের সিতি টায় তেল দিয়ে দিতে থাকেন। আস্তে আস্তে মাসাজ করে দেন। সুমুর বেশ ভালোই লাগছিলো। আরামে চোখ যেন বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। শিউলি বেগম হাসি মুখে বলেন,

– আরাম লাগতাছে না! 

– হ্যা। ভালো লাগছে। 

– তেল ডার বাস(গন্ধ) ও সুন্দর। তোমার চাচায় দিনাজপুর থেইকা আনছে। 

– সকালে যিনি পান্জাবি আর কুরতা পড়ে বের হলেন উনি ? 

– হ। আমার বুইড়া জামাই হা হা হা!! 

সুমু একটা স্মাইলি ফেইস করে। শিউলি বেগম আবার বলেন,

– দিথীর কাছ থে আমি সবকিছু শুনছি। তুমি আমাগোরে নিজের আপন কেউ ভাবতে পারো। আমরা কেউ তোমার কোন ক্ষতি চাইমুনা। (একটু থেমে) তোমার আগের জন্মে নাম নূপুর ছিলা তাই না! 

– হ্যা। নূপুর।

– তোমাগো ঐ বাড়ির বুড়া ডা তাইলে,

– তান্ত্রিক। বয়স্ক লোকের ছদ্মবেশে থাকতেন। 

– আমার বাজান আর রিয়াদ একবার নোমানের কেসের সময় ঐ বাড়িত গেছিলো বলে। তহন ঐ বুইড়া তান্তিকরে দেখছিলো। হেরা কী আর জানতো তান্তিকই আসল কলকাঠি নাড়তাছে।

– হমম।

– শাহারিয়া বাড়ি আইয়া এইসব নিয়া আলোচনা করছিলো। হেইসময় হুনছিলাম। (একটু থেমে) আফাজরে ভালোবাসো! 

হঠাৎ এই কথার জন্য যেনো সুমু অপ্রস্তুত ছিলো। তার বুক যেন‌ লাফিয়ে উঠেছে কথাটা শুনে। সে হঠাৎ কী উত্তর দিবে ভেবে পায় না। শিউলি বেগম আবার বলেন,

– ভয় পাইয়োনা। আমি কাউরে কমুনা। আফাজের বিষয়ডা দিথী আমারে কইয়া গেছে। তুমি আসলেই আফাজরে ভালোবাসো কিনা তাই জিগাইতাছি। সত্যিই ভালোবাসো! 

সুমু মৃদু মাথা ঝাঁকিয়ে হ্যা বলে। শিউলি বেগম সুমুর মাথায় তেল মালিশ করতে করতে বলেন,

– আফাজের মনের অবস্থা এহন ভালা না। এহন তার মনে শুধু ঐ মাইয়া ছাড়া আর কিছুই নাই। তুমি চাইলেও হঠাৎ কইরা তার মন ঘুরাইতে পারবানা। তুমি চেষ্টা করো তার বন্ধু হওয়ার। যাইচা যাইচা ওর লগে কথা কবা। একদম ডরাইবা না। আফাজ তো আর তোমারে বকা দিবো না। তুমি অর আস্তে আস্তে ভালো বন্ধু হও। অরে মানসিক দিক দিয়া সাপোর্ট দেও। আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হইলে তহন বন্ধু থেইকা বর কইরা ফেইলো কেমন! 

বলেই শিউলি বেগম মৃদু হাসেন। সুমু লজ্জা পায়। সে চুপচাপ থাকে। শিউলি বেগম হাতে আরেকটু তেল নেন। হাসি থামিয়ে সুমু্র চুলের অগ্রভাগের দিকে মাখিয়ে দিতে থাকেন। সুমুর কাছে বিষয়টা বেশ ভালো লাগে। যেন তার মা তার মাথায় তেল দিয়ে দিচ্ছেন। সুমু একটা ম্লিন হাসি দিয়ে দূরের আকাশের দিকে তাকায়। পেঁজা তুলোর মত মেঘ উড়ে যাচ্ছে। আকাশ টা আজ বেশ সুন্দরই লাগছে তার কাছে। হয়তো এই আকাশ টা রঙিন করার মানুষটাও একদিন তাকে আদর করে মাথায় তেল দিয়ে দিবে!!!

 

____

 

নিপা সাথী বেগমের রুমে প্রবেশ করে। সাথী বিছানায় বসে জানালার দিকে এক পানে চেয়ে ছিলেন। বাইরের পুকুরে রোদ পড়েছে। গাছ গুলোও বাতাসে মৃদু নড়ে উঠছে। নিপা ঘরে ঢুকে একটু গলা ঝেড়ে বলে,

– আসবো!!

সাথী বেগম যেন চমকে উঠে পিছনে তাকান। দেখেন নিপা। তিনি বুকে হাত দিয়ে বলেন,

– ভয় পাওয়ায় দিছিলা একদম! আসো। 

নিপা ঘরে ঢুকেই আসবো বলেছিলো। সাথী অত কিছু খেয়ালই করেননি। হয়তো তিনি অন্যমনস্ক ছিলেন। নিপা এসে বিছানায় বসে। হালকা রোদ পড়েছিলো বিছানায়। সময়টা দুপুর। কিছুক্ষণ আগেই যোহরের আযান দিয়েছে। নিপার দিকে মুখ করে বসেন সাথী। কোলে মাথার বালিশ রাখা। নিপা বলে,

– এই প্রথম এই ঘরে আসলাম। আপনি নাকি অসুস্থ।

– মেরুদন্ডের হাড় ভেঙেছিলো আমার ৪ মাস আগে। এখন কিছুটা জোড়া লেগেছে, তবে একয়দিন থেকে ব্যাথা বাড়ছে একটু। রায়হান বাইরে গেছে ? 

– না। ও গোসলে। আমি ভাবলাম আপনার সাথে কখনো দেখা করতে আসা হয়নি তাই একটু দেখা করে আসি। 

– আমিই তোমার ওখানে যাইতে চাইছিলাম। কিন্তু ব্যাথা বাড়ায় আর একয়দিন বিছানা থেকে একদম নামতে পারিনি। সাদিক টাও সারাদিন ওর আব্বুর সাথে অফিসে থাকে। একলা একলা কোথাও যেতেও পারিনা। 

– আচ্ছা আপনি কি ঐদিন কোন আওয়াজ বা চিৎকার শুনেছিলেন? 

সাথী বেগম হঠাৎ এই কথায় একটু ইতস্তত বোধ করেন। এক ঢোক গিলেন। বলেন,

– ক,কোনদিন ? 

– যেদিন আলিশা আর সুরাইয়া বেগম খুন হয়েছিলো, সেদিন! আপনার সামনের করিডোরেই তাদের রুম। আপনি কোন চিৎকার বা কথা শুনতে পাননি ? 

– আ,আমি। আমি ঐসময় ঘুমাইছিলাম। ত, তেমন কোন আওয়াজ পাইনি। 

– আমার কেনো জানি মনে হচ্ছে আপনি কিছু আমার থেকে লুকাচ্ছেন! 

কথা শুনেই সাথী বেগমের বুকটা যেন লাফিয়ে উঠলো‌। তিনি ঘামছেন। গলায় ঢোক গিলেন। নিপা আজ প্রথম তার সাথে দেখা করতে এসেছে আর এসেই এমন জেড়া করা শুরু! বিষয় টার জন্য সাথী বেগম একদমই অপ্রস্তত ছিলেন। নিপা সাথী বেগমকে চুপ থাকতে দেখে আবার বলে,

– আপনি ঐদিন আলিশা আর সুরাইয়া আন্টির গলা ছাড়া আর কার গলা শুনেছিলেন! 

– ব,বউমা। দাঁড়াও আমি তোমাকে একটা জিনিস দিচ্ছি। 

বলেই কোলের বালিশ টা সড়িয়ে রেখে বিছানা থেকে নামতে উদ্যত হন সাথী। তিনি ব্যাথা পাচ্ছিলেন তাই নিপা তাকে নামতে সাহায্য করে। সাথী বেগম বিছানা থেকে নেমে দূরের একটা টেবিলের দিকে যান। টেবিল টা ঘরের কোনে রাখা। তিনি সেখানে থাকা একটা ঝুড়ি নিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে আসেন বিছানার কাছে। নিপা অবাক হয়ে খালি দেখছে সাথী বেগম কী কী করছেন। 

সাথী বেগম ঝুড়ি টা এনে বিছানার উপর রাখেন। নিজেও উঠে বসেন। ঝুড়িটায় কিছু একটা খুঁজতে থাকেন তিনি। নিপা বসে বসে একবার ঝুড়ির দিকে দেখছে একবার সাথী বেগমের দিকে দেখছে। সাথী বেগম ঝুড়ি টা বিছানার উপরেই উল্টিয়ে দেন। নিপা কিছুটা পিছিয়ে বসে। সাথী ঝুড়ি থেকে একটা বাঁধা পলিথিনে কিছু একটা বের করেন। করে নিপার দিকে দেন। নিপা অবাক চোখে খালি দেখছিলো। পলিথিন টা হাতে নেয় সে। সাথী বাকি জিনিস গুলো আবার ঝুড়িতে উঠিয়ে রাখতে থাকেন একে একে। নিপা বাঁধা পলিথিন টা ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে দেখে বলে,

– এটা কী ? 

– খুলে দেখো। 

নিপা পলিথিনের বান টা খুলতে থাকে। খুলে দেখে ভিতরে এক ভাঙা মোবাইল। নিপা ভাঙা মোবাইল টা বের করে। বেশ দামী মোবাইল মনে হচ্ছে। টাচ ফেটে দুইভাগ, মাদারবোর্ড, ব্যাটারী সব আলাদা হয়ে গেছে। সাথী বেগম মাথা না উঠিয়েই বলেন,

– এইটা আমি রায়হানের জানালার নিচে বাড়ির বাইরের দিকটায় পেয়েছিলাম। রায়হানকে দিবো দিবো করে আর দেওয়া হয়নি। সিম, মেমরি কার্ডও আছে। রায়হানের লাগতে পারে এগুলো। তুমি গিয়ে ওকে দিয়ে দিয়ো। 

– এটা রায়হানের ফোন ? 

– হ্যা। ওর ফোন। তুমি ঘরে গিয়ে ওকে দিয়ে দিয়ো। 

নিপা ভাঙা ফোনটা ভালোভাবে দেখে। ফোনের অবস্থা দেখে তো মনে হচ্ছে অনেক জোড়ে আছাড় মেরে ভাঙা হয়েছে। রায়হান এমন ভাবে কেনো ভাঙলো ফোনটা ? 

সাথী বেগম ঝুড়িটা নিয়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ান। ঝুড়িটা গিয়ে ঘরের টেবিলের কোনে রেখে আসেন। নিপা ফোনটা নিয়েই বিছানা থেকে উঠে যায়। তার মাথা থেকে যেনো একটু আগের ঘটনাটা প্রায় চলেই গিয়েছে। নিপা হনহন করে ঘর থেকে বেড়িয়ে চলে যায়। টেবিলের দিকে দাঁড়িয়ে থাকা সাথী বেগম আড়চোখে তার চলে যাওয়াটাকে দেখে। তিনি যেনো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। 

 

_____

 

ইকরা বিছানায় শুয়ে শুয়ে ফেসবুকে স্ক্রল করছে। এটা তার ঘর। বিছানায় একটা বড় টেডি মানে পুতুল রাখা। বিছানার চাদরে, কোলবালিশে কার্টুনের ছবি। দেয়ালে দেয়ালে বিভিন্ন কার্টুনের ছবি টাঙানো। ইকরা কার্টুনের ক্যারেক্টার গুলো বেশ পছন্দ করে। যেই যেই কার্টুন গুলা তার ভালো লাগে সেগুলো দিয়েই সে ঘর সাজিয়ে ফেলে।

 ইকরা শোয়া হতে উঠে বসে। বাসায় সে আর বানু খালা ছাড়া কেউ নেই। তাই প্লাজু আর টি শার্টই পড়ে আছে। ইকরা ফোনের দিক থেকে নজর না উঠিয়ে হাঁক দিয়ে বলে উঠে,

– খালা,,,! মা ফোন দিছিলো তোমার ফোনে ? 

তার ঘরের পরের ঘরটা ডায়নিং রুম। সেই রুম থেকে একটা বয়স্ক মহিলার কন্ঠ ভেসে আসে,

– না খালাম্মা, তোমার মায়ে ফোন দেয় নাই। নুডুলস দিমু, নুডুলস খাইবা ? 

– একটা ম্যাগি করে দেও। ভাত খাইতে ইচ্ছা করেনা আজকে।

– দুপুরে খালি নুডুলস খাইয়া থাকবা! তোমার মায়ে শুনলে তো বকবো। 

– মা কে আমি বলবোনা। তুমি ম্যাগি করে দাও। আজ ভাত খাইতে মন চাচ্ছেনা।

– আইচ্ছা ঠিক আছে। 

 

ইকরা আবার ফোনে ফেসবুকে স্ক্রল করতে থাকে। একলা একলা বাড়িতে এই ফোন আর টিভিই তার সম্বল। হঠাৎ তার ফোনে ফোন আসে। ইকরা উপর থেকে নটিফিকেশন নামিয়ে দেখে রিয়াদ ফোন দিয়েছে। ইকরা বেশ অবাক আর তার সাথে আনন্দিতও হয়। তাড়াতাড়ি উঠে সোজা হয়ে বিছানায় বসে। কল টা রিসিভ করে কানে তুলে। ওপাস থেকে ইকরার কন্ঠ ভেসে আসে।

– হ্যালো, ইকরা! 

– হ্যা বলো। 

– কী করো। 

– এইতো বাসায় বসে আছি। তুমি এইসময় ফোন দিলা যে! (গোমড়া মুখে) প্রতিদিন তো এইসময় তোমার কেস থাকে, আজ নাই! 

– আছে, কিন্ত আজ ঐসব বাদ। তুমি এখন কোথায়? 

– আমি ? আমি তো বাসায়। কেনো ? তুমি আসবা নাকি আজকে ? 

– জানালার সামনে এসে দাঁড়াও। 

– জানালা?

ইকরা তাড়াতাড়ি করে বিছানা থেকে নামে। জানালার সামনে এসে পর্দা সড়িয়ে নিচের দিকে তাকায়। দেখে রিয়াদ তাদের বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। একহাতে কিছু ব্যাগ আর একহাতে কানে ফোন ধরে রয়েছে। ইকরা রিয়াদকে দেখে অনেক অবাক হয়। সাথে দাড়ুন খুশিও হয়। সে এক লাফ দিয়ে উঠে। আনন্দিত গলায় বলে,

– তুমি! আমার তো বিশ্বাসই হইতেছে না। দাঁড়াও দাঁড়াও আমি এখনি নিচে আসতেছি। 

বলেই তাড়াতাড়ি বিছানার কাছে এসে ওড়নাটা হাতে নিয়ে দৌড়ে ছুট লাগায় নিচে যাওয়ার জন্য। তার মুখে হাসি যেন আর ধরে না!!

 

      রিয়াদকে ধরে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে ইকরা। সে অনেক অনেক খুশি। রিয়াদ চারপাশ দেখতে দেখতে বিছানার সামনে এসে দাঁড়ায়। ইকরা রিয়াদের হাত ছেড়ে দিয়ে তাকে আনন্দে জড়িয়ে ধরে। আবার ছেড়ে দিয়ে উৎফুল্ল গলায় বলতে থাকে,

– তুমি আসছো আমার এখনো বিশ্বাস হইতেছে না। একদম সারপ্রাইজড হয়ে গেছি আমি। 

– সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্যই তো না বলে আসছি। এই নেও। (রিয়াদ তার সাথে আনা কিছু শপিং ব্যাগ ইকরাকে দেয়। ইকরা হাতে নিয়ে অবাক সুরে বলে,

– এগুলা কী ? 

– দেখোইনা খুলে। 

বলেই রিয়াদ বিছানায় বসে পড়ে। ইকরাও বিছানায় বসে শপিং ব্যাগের ভিতর হাত ঢুকায়। ভিতর থেকে বের করে এক নীল শাড়ি। তার চোখ মুখ সব যেন চাঁদের মতো বড় বড় হয়ে উঠেছিলো। মুখের হাসি যেন বাঁধ মানেনা। 

– এ,এটা আমার জন্য!

– তো কী আমাকে পড়তে বলতেছো! তোমার জন্যই আনছি। বাকি গুলাও দেখো! 

– আরো আছে! 

ইকরা শাড়িটা বিছানায় আস্তে করে রেখে দিয়ে আবার ব্যাগে হাত ঢুকায়। একমুঠো রঙিন রেশমী চুড়ি বের করে। ইকরা খুশিতে রিয়াদের দিকে চায়। রিয়াদ মুচকি হাসি দেয়। ইকরা সেগুলো বের করে রাখা শাড়ির উপর রেখে ব্যাগে আবার হাত ঢুকায়। এক ঝোড়া কানের ঝুমকা, মাথার কাঁটা-ক্লিপ, গোলাপী লিপস্টিক, আর কাজল বের করে। সাথে একটা মেহেদীও‌ ছিলো। ইকরা যেন খুশিতে আত্মহারা। এতো এতো কিছু রিয়াদ তার জন্য এনেছে! নীল রং পছন্দ তার, সেই নীল রঙের শাড়ি আর রেশমি চুড়ি এনেছে। ইকরা আবার রিয়াদকে জড়িয়ে ধরে। আবার ছেড়ে দিয়ে আনন্দ, উৎদিপ্ত মুখে বলে,

– এতো কিছু সব আমার জন্য! 

– হ্যা হ্যা সব তোমার। এখন যাও, এগুলো পড়ে রেডি হয়ে নাও, আজ ঘুরতে বেড়োবো।

– সত্যি! আমি,আমি এখনি পড়ে আসতেছি এগুলো। (বলেই শাড়িটা হাতে নিয়েই বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়। তখনই রিয়াদের কাছে এসে তার গালে একটা ছোট্ট চুমু দিয়ে বলে) উম্মাহ,,, এই নেও তোমার গিফট! 

– হায়!!! মেরা দিল খুস হুয়া!!! হা হা হা!!

রিয়াদ আর ইকরা দুজনেই হাঁসতে থাকে। ইকরা হাঁসতে হাঁসতে চলে যায় আলমারির দিকে। সেখান থেকে তার সাদা রঙের একটা ব্লাউজ বের করে নেয়। নীল শাড়ির সাথে সাদা ব্লাউজ মানাবে ভালো। ব্লাউজ নিয়ে দৌড় লাগায় ওয়াশরুমের দিকে চেন্জ করে নেওয়ার জন্য। ইকরার এমন ছেলে মানুষী দেখে রিয়াদ বেশ আনন্দ পাচ্ছিলো। ইকরা ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা লাগাবার আগ মুহুর্তে আরেকটা উড়ন্ত চুমু দেয় রিয়াদের দিকে। রিয়াদ সেই উড়ন্ত চুমু হাত দিয়ে ধরে তার বুকে লাগিয়ে নেয়।চোখ বুঝে ফেলে। ইকরা তা দেখে হাসতে থাকে। ভিতরে ঢুকে ওয়াশরুমের দরজা লাগিয়ে দেয়। রিয়াদের মুখের হাসৌজ্জলতা এখনো কমেনি। ইকরাকে এতো খুশি সে আগে কখনো দেখেনি। সে ভেবেছিলো আরো কি কি আনা যায় ইকরার জন্য, কিন্তু এগুলো ছাড়া আর কিছুই তার মাথায় আসছিলো না। তাই এগুলা নিয়েই চলে এসেছে। অনেক হয়েছে কেস আর রহস্য, এবার একটু নিজের মতো করে নিজের মানুষটার সাথে সময় কাটানো যাক!! রিয়াদ চারপাশ ঘুরে ঘুরে ইকরার রুম টা দেখতে থাকে। মেয়েটা বোধহয় খুব বেশি কার্টুন দেখে। এইজন্য ঘর এসবের ছবি দিয়ে ভরে রেখেছে। বিছানায় একটা টেডি বেয়ারও পায় রিয়াদ। বিছানায় শুয়ে পড়ে বুকের উপর নেয় সেই টেডি টাকে। বলতে থাকে,

– ও, তাইলে ম্যাডামের টেডিও পছন্দ! এরপর তাইলে আসার সময় বড় দেখে একটা টেডি আনতে হবে। 

বলেই নাক দিয়ে টেডির পেটে গুঁতোগুতি করতে থাকে রিয়াদ। রিয়াদের এই রূপ টা হয়তো এই প্রথম দেখা গেলো। সবসময় কেস নিয়ে দৌড়াইতে দৌড়াতেই হয়তো এই আবেগ টা তার মনের ঘরে সুপ্তই থেকে গিয়েছিলো। এখন তার একটা মানুষ হইছে, মানুষ টার মুখে হাসি দেখলেই যে তার অনেক অনেক ভালো লাগে!!!

 

_____

 

শাহারিয়া আর দিথী ডায়নিং টেবিলে বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছে। গোসল করে এসেই তারা খেতে বসেছে। ড্রাইভার রুমানকে আগেই খাবার আনতে পাঠিয়েছিলো শাহারিয়া। তাই তাদের গোসল করা হতে হতেই খাবার চলে এসেছে। 

ডায়নিং রুমটাও যথেষ্ট সাজানো গোছানো। মাঝের বড় ডায়নিং টেবিল টা গ্লাসের। মাঝে কিছু ফল ঝুড়িতে রাখা। কাঁচের গ্লাস, কাঁচের জগ সব সাজিয়ে রাখা। একসাথে ৮ জন খেতে পারবে এই টেবিলটায়। রুমের কোন গুলোয় আর্টিফিসিয়াল টব আর গাছ রাখা। উপরের সিলিং থেকে কিছু আর্টিফিসিয়াল ফুল ঝুলছে। বেশ সুন্দর লাগছে‌।

 

দিথী, শাহারিয়া পাশাপাশিই খেতে বসেছে। দিথী ভেজা চুল গুলো পিঠে মেলে দেওয়া। পড়নে থ্রি পিস। শাহারিয়ার পড়নে ফরমাল টি শার্ট। দিথী খেতে খেতে তরকারি বাটিটা টেনে বলে,

– মাংস দিবো আর! 

– এগুলাই হবে। তুমি নিলে নাও। এটা বাড়িতে রান্না করা খাবার। নির্ধিদায় যত ইচ্ছা খেতে পারো। 

– কার বাড়িতে রান্না করা! 

– রুমান, ঐযে ড্রাইভারটা দেখলানা, ওর মা রান্না করছে। এই সামনেই একটা গ্রাম আছে, সেখানেই থাকে ওরা। 

– গাড়িটা তোমার? 

– হ্যা। একটাই গাড়ি আমার। ঢাকায় থাকতে নিছিলাম। তোমাকে নিয়ে একদিন লং ড্রাইভে বেড়োবো কেমন!

– তুমিও গাড়ি চালাতে পারো ? 

– হ্যা। তুমিও পাড়ো নাকি? 

– পারি কিছুটা। শিখেছিলাম আগে।

– পানির জগ টা একটু এদিকে দেও তো।

দিথী পানির জগটা হাতে নিয়ে শাহারিয়ার গ্লাসে পানি ঢেলে দেয়। দিথী বলে,

– ঝাল হইছে না খুব! 

– হমম। ঝাল লাগতেছে। এতো ঝাল খাওয়ার অভ্যাস নাই আমার। 

– তাইলে পানি খাওয়া লাগবেনা। (শাহারিয়ার হাত ধরে) এইটা খাও। 

বলেই শাহারিয়ার ঠোঁটে একটা ছোট্ট চুমু খায় দিথী। শাহারিয়া যেন হকচক খেয়ে যায়। দিথী হঠাৎ তাকে চুমু খাবে সে কল্পনাও করেনি। দিথী চুমু দিয়ে আবার ঠিক করে বসে নিজের খাবার খেতে থাকে। শাহারিয়া এখনো অবাক চোখে দিথীর দিকে তাকিয়ে আছে। দিথী বলে,

– ঝাল কমেনাই! 

– হ,হ্যা। কমবে না আরো। যেই মিষ্টি দিছো, কোন ঝালই টিকতে পারবেনা।

– তাইলে এখন খাওয়া শুরু করো। এমন ভাবে অবাক হইলা যেনো কোন ভূত তোমাকে চুমু দিছে। 

শাহারিয়া সামনে ফিরে। বলে,

– মাঝে মাঝে তো মনে হয় তুমি জীন পরী। এতো এতো রোমান্স তোমার কীভাবে আসে! 

– পড়ে বোঝাবোনে কীভাবে আসে। ভাজি নিবা! 

– না থাক। ভাজি টা তেমন ভালো লাগে নাই। 

– আমারও। আচ্ছা রাতে কী রান্না করবো। এই বাড়িতে ফ্রিজ কোথায়? 

– ও তোমাকে তো কিচেন দেখাইতেই ভুলে গেছি। এই রুম থেকে বেড়িয়ে হাতের ডান পাশে কিচেন। ওখানে সব আছে। আর কী খাবা, ফ্রিজে তো কিছু নাই। আজকে আনতে হবে।

– মাছ আনিও। মাংস খাইতে খাইতে মুখ ধরে গেছে। 

– ছোট মাছ না বড় ?

– বড় গুলাই আনিও। ছোট মাছ বাছার সময় নাই। 

– আমি তাইলে মাছ কিনে রুমানের দাঁড়া পাঠায় দিবো। সাথে তরি-তরকারি কী নিবো ? 

– ফুলকপি নিও, সাথে গাজর, আলু, টমেটো, এগুলাই। 

– আমি খেয়ে নামাজ পড়ে বেড়োবো। তুমি ঘুমাইলে ঘুমাইয়ো, নাইলে টিভি দেখিও। ড্রয়িং রুমে টিভি আছে। 

– কই যাবা তুমি ? 

– সিলেট শহরে। ওখানে যেই সিবিআইয়ের শাখা অফিস টা আছে ওখানে। একয়দিন তো কাজে একদমই মন দেওয়া হয়নাই। আহনাফ কী পাইলো না ‌পাইলো এইসব যায় দেখতে হবে। 

– আহনাফ আসছে নাকি ওখানে? 

– না ও ফ্যাক্স করে পাঠাইছে রিপোর্ট গুলা। ঐগুলাই আনতে যাবো। এশার আগেই বাসা চলে আসবো। তুমি চিন্তা করিও না। 

– আচ্ছা বাইরে যেই বুড়োটা ছিলো, উনি খাবেন না ? 

– রুমান ওকেও খাবার দিয়ে গেছে। উনি দরজার পাশেই বসে খাচ্ছেন হয়তো। 

– উনি কী একলা ? মানে উনার ফ্যামিলি নাই ?

– আছে। উনিও রুমান যেই গ্রামে থাকে ওখানকারই স্থানীয়। কেনো? 

– উনাকে বাদ দিয়ে দাও।

– বাদ দিয়ে দিবো! 

– হ্যা।

– কেনো ? 

– এইবাড়িতে তুমি আমি ছাড়া আর কেউ থাকবেনা।

– এই বাড়িতে তো উনি থাকেন না। গেটের পাশে যে একটা কুঠুরি আছে, ওখানে থাকেন উনি।

– তারপরও, বাদ দিয়ে দাও। রাতের বেলা আজব আজব শব্দ শুনে তখন ভয় পাবেন।

– কোন শব্দ? এখানে তো ভূত-তুত নাই। 

– তুমি জ্বীন, আমি পরী। আমাদের দুইজনের শব্দেই ভয় পাবে। 

– তোমার কথার মাথা-কল্লা কিছুই বুঝতেছি না। 

– এই রাতের বেলা কী মন ভরে একটু চিৎকারও করতে পারবোনা হ্যা! উনি থাকলে আমার মনে একটা খুদ থাকবে, উনি শব্দ শুনে, চিৎকার শুনে কী ভাববেন না ভাববেন এসব। তুমি,তুমি বাদ করে দাও। এতো বুঝাইতে পারবোনা।

শাহারিয়া মুখের ভাত গুলো না চিবিয়েই গোল গোল চোখ করে থ হয়ে দিথীর দিকে তাকিয়ে থাকে। এইটা মেয়ে না অন্য কিছু, কী জিনিস বিয়ে করলো ও!! রাত বিরাতের চিৎকার যেনো না শুনে এইজন্য বাড়ির দারোয়ানকে তাড়ায় দিতে বলতেছে!! 

– এভাবে তাকায় আছো কেনো! আমার মুখে কী সোনা লাগে আছে নাকি! 

– তোমার মুখে সোনা লাগে আছে কী না জানিনা কিন্তু আমার কপাল টা যে সোনা দিয়ে গড়া তা এখন বুঝতে পারতেছি! 

– মানে! 

– কিছুনা। 

বলেই শাহারিয়া মুখের ভাত চিবোতে চিবোতে প্লেটের দিকে মুখ করে। একটু পর ধীর গলায় বলে,

– পরে তখন একলা একলা তুমি বাসায় থাকবা, আর আমি বাইরে। তোমার কিছু একটা হয়ে গেলে! দাড়োয়ানটা থাকুক। 

– না থাকবেনা। কে আসবে হ্যা! যেই আসবে আমার কিছু করতে ওরে আমি কাটে কুচি কুচি করে রান্না করে গরুর মাংস বলে তোমাকে খাওয়ায় দিবো। আমাকে চিনেনা! আমার বলে ক্ষতি করতে আসবে হুঁ!!

– বুঝলাম,

– কী ? 

– তুমি একটা কঠিন জিনিস! 

– জিনিস কী হ্যা! মাল বলো মাল! হা হা হা!!! একদিন ড্রাইভার রুমানকে বলিও (ভঙ ধরে) মাল টাকে গাড়িতে তোল! হা হা হা!!

শাহারিয়া আর কিছু বলেনা। চুপচাপ প্লেটের দিকে মুখ করে ভাত গিলতে থাকে। এই দিথীটা যেন শিউলি বেগমের লাইট ভার্সন। এই দুইজনের মুখ আর বাইডেনের সুখ, কখন যে ছুটা শুরু করবে কেউ ধরতেই পারবে না! 

 

   শাহারিয়ার খাওয়া শেষ হয়ে যায়। সে এটো প্লেট নিয়েই টেবিল থেকে উঠে যায়। দিথী খাওয়া এখনো শেষ হয়নি। সে আস্তে ধীরে আরাম করে খাচ্ছিলো। শাহারিয়ার ঐ গোল গোল চোখ ওলা অবাক মুখ টা মনে পড়তেই দিথী হেঁসে উঠে। মুখটা দেখার মতো ছিলো। সেও মনে হয় একটু বেশিই বলে ফেলছে। নিজেই নিজের মাথায় মারে দিথী। বেশি দুষ্ট হয়ে গেছে ও!!!

 

____

 

টিউলিপ বোটানিক্যাল গার্ডেন। আকাশ মেঘলা করেছে। হয়তোবা বৃষ্টি নামবে। বাতাস করছে বেশ ভালোই। সময়টা বিকেলের কাছাকাছি। আশপাশে বেশ অনেকেই ঘুরাঘুরি করছে। এদিকটায় একটা লম্বা বড় রাস্তার মতো আছে। রাস্তার সাইড ধরে অনেক গুলো ছোট ছোট দোকান বসেছে। তবে অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ দোকানের সংখ্যা কম। আজ সকাল থেকেই হালকা বৃষ্টি হয়েছিলো। তাই লোকজনও কম এসেছে।

 

রিয়াদ আর ইকরা একটা ফুলের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ইকরার পড়নে নীল শাড়ি, ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপস্টিক, কানে ঝুমকা ঝুলছে, হাতে রেশমি চুড়ি। মাথার চুল খোঁপা করে বাঁধা, চোখে হালকা কাজল। দারুন সুন্দরী লাগছে তাকে। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে রিয়াদ। কালো পাঞ্জাবিতে তাকে ইকরার পারফেক্ট সঙ্গিই লাগছে বটে!!

ফুলের দোকান থেকে ইকরাকে একটা বেলি ফুলের হাতমালা কিনে হাতের চুড়ির সামনের অংশে পড়িয়ে দেয় রিয়াদ। একটা হলুদ গাঁদা ফুল ইকরার খোঁপায় পড়িয়ে দেয়। ইকরা বলে সে এক গুচ্ছ কদম ফুলও নিবে। তাও নিয়ে দেয় তাকে রিয়াদ। ফুল কিনার পালা শেষ। ইকরা রিয়াদকে নিয়ে যেতে থাকে হাওয়াই মিঠাইয়ের স্টলের দিকে। সেখানে ভিড় তেমন একটা ছিলোই না। ইকরা রিয়াদকে নিয়ে সেখানে এসে দাঁড়িয়ে হাওয়াই মিঠাই খেতে চায়। রিয়াদও দুটো হাওয়াই মিঠাই নেয়। পলিথিন সড়িয়ে ছোট্ট ছোট্ট করে হাওয়াই মিঠাই ছিড়ে ইকরাকে খাইয়ে দিতে থাকে। ইকরার মুখে হাসি। আলতো করে মুখে নিয়ে রিয়াদকেও সে তার টা থেকে ছিঁড়ে খাইয়ে দেয়। বাতাস করছিলো বেশ। আকাশের অবস্থাও ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে। ইকরা রিয়াদকে নিয়ে চলে যায় হাওয়াই মিঠাইয়ের পাশে থাকা আইসক্রিমের স্টলের দিকে। আইসক্রিম খাওয়ার বাহানা ধরে রিয়াদের কাছে। রিয়াদ হাসি মুখে ইকরার এই আবদার টাও পূরণ করে। ইকরার পছন্দ অনুযায়ী তাঁকে একটা কোণ আইসক্রিম কিনে দেয়। বেশ ঠান্ডা বাতাস বইছিলো তাও ইকরার ইচ্ছে টাকেই রিয়াদ প্রাধান্য দিয়ে তাকে আইসক্রিম কিনে দেয়। ইকরা আইসক্রিম খুলে খেতে থাকে। তার ঠোঁট মেখে যায় আইসক্রিমের অংশ দিয়ে। রিয়াদ আলতো করে ইকরার ঠোঁট থেকে আইসক্রিম আঙুলে নিয়ে নিজের মুখে ঢুকিয়ে নেয়। ইকরা রিয়াদকে তার আইসক্রিমটা থেকে কিছুটা খেতে বলে, রিয়াদ না করে। ইকরা তাও তার মুখের দিকে আইসক্রিম টা বাড়িয়ে দেয়। রিয়াদ একটা ছোট্ট বাইট নেয়। ইকরা মুচকি হাসে। রিয়াদ যে পাশটায় খেয়েছে সেও সে পাশটায় কামড় দেয়। রিয়াদ আইসক্রিম থেকে একটু ক্রিম আঙ্গুলে নিয়ে ইকরার নাকে লাগিয়ে দেয়। হাসতে থাকে। ইকরা চোখ সরু সরু করে তাকায়। আবার আইসক্রিম খেতে থাকে। খাওয়া শেষ হতে না হতেই ঝুম বৃষ্টি নামে। চারপাশে লোকজন দৌড়ে রাস্তার সাইডে থাকা ছাওনি গুলার নিচে দাঁড়াতে থাকে। রিয়াদও ইকরার মাথার উপর একহাত দিয়ে তাকে নিয়ে ছুটে যায় ছাউনির দিকে। ইকরাও ছোট বেলার মতো দৌড়ে রিয়াদের সাথে ছাউনির দিকে যায়। সে বেশ আনন্দ পাচ্ছিলো। রিয়াদ আর ইকরা এসে ছাওনির সামনের দিকটাতেই দাঁড়ায়। বেশ ভালোমতোই বৃষ্টি নেমেছে। বাতাস বইছে। মাঝে মাঝে আকাশ গর্জন করে উঠছে। বৃষ্টির হালকা ঝাপটা কখনো কখনো এসে রিয়াদ ইকরার উপরও পড়ছে। রিয়াদ ইকরাকে তার বুকের একপাশের সাথে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে ছিলো। ইকরা রিয়াদ বুকে একহাত দিয়ে কী যেনো আর্ট করছিলো। আর্ট করতে করতে রিয়াদের পাঞ্জাবির বোতাম গুলো নেড়ে নেড়ে দেখছিলো।

 বৃষ্টির বেগ কিছুটা কমে। তবে এতোটাও কমেনি যে বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে হাঁটা যাবে। হঠাৎ ইকরা রিয়াদের বুক থেকে মাথা উঠিয়ে তাকে বলে,

– এই এই, চলোনা বৃষ্টিতে ভিজি! 

– না না, ঠান্ডা লাগে যাবে তখন তোমার।

– আরে একদিনই তো ভিজবো, চলোনা চলোনা! 

– কিন্তু,,,,,

রিয়াদকে আর কিছু বলতে দেয় না ইকরা। রিয়াদের হাত ধরে ছাউনি থেকে নেমে যায়। রিয়াদও কিছু বলার সুযোগ পায় না। ইকরা রিয়াদকে নিয়ে এসে একদম রাস্তার মাঝ বরাবর দাঁড়ায়। এই রাস্তা এমনি এই উদ্যানের মাঝে হাঁটার বড় রাস্তা। এটা দিয়ে কোন গাড়ি চলাচল করেনা।

ইকরা রিয়াদকে তার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে উপরের দিকে মুখ করে। বৃষ্টির বেগ হালকা কমে যায়। তবে তা দেহকে ভিজিয়ে দেওয়ার জন্য আর নতুন কাব্যের সূচনা করার জন্য যথেষ্ট ছিলো। ইকরা উপরে মুখ করে চোখ বন্ধ করে। এক হাতে গুচ্ছ কদম ফুল আর আরেক হাত দুই পাশে মেলে দিয়ে বৃষ্টির ধারাকে উপভোগ করতে থাকে। বৃষ্টির ফোঁটা এসে তার চোখের বন্ধ পাতায় পড়ে, গালে পড়ে, গড়িয়ে গাল বেয়ে নিচে পড়ে যায়। তার সামনে দাঁড়ানো রিয়াদ দুই হাত নিজের কোলে একসাথে করে। দেখতে থাকে ইকরাকে এক নতুন রূপে, নতুন আঙ্গিকে!! তার মুখে ফুটে উঠে এক সুন্দর হাসি। 

ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজতে থাকে গান, ‘ এক গুচ্ছ কদম হাতে, ভিজতে চাই তোমার সাথে!!! ‘

 

____

 

নিপা বিছানায় বসে তার ফোন সুইচ অফ করছে। ঘরে এখন সে ছাড়া আর কেউ নেই। রায়হান একটু নিচে যাবে বললো। এই সুযোগে নিপা একটা কাজ করতে চায়। সে রায়হানের যেই ভাঙা ফোনটা সাথীর কাছ থেকে পেয়েছে সেই ফোনের সিম আর মেমরি কার্ড নিজের ফোনে লাগিয়ে দেখতে চায়। এমনিতে ও রায়হানের ফোন ধরেনা, তবে আজ কেনো জানি তার মন এই সিম আর মেমরিতে কি আছে তা দেখতে চাইছে।

নিপা ফোন অফ করে সিম ইজেক্টর দিয়ে ফোনের সিম কার্ড ট্রে বের করে। সেখানে আগে থেকেই তার একটা জিপি সিম ছিলো। সে আরেকটা সিমের যায়গায় রায়হানের ভাঙা ফোন থেকে পাওয়া রবি সিমটা বসায়। মেমরি কার্ডের যায়গায় মেমরি কার্ড বসায়। সিম কার্ড ট্রে টা সাবধানে তার ফোনের ভিতরে ঢুকায়। দরজার দিকে চেয়ে দেখে রায়হান আসলো কী না। না রায়হান আসেনি। নিপা ট্রে টা সম্পূর্ণ ঢুকিয়ে ফোনটার পাওয়ার বাটন চেপে সুইচ অন করে।

ফোনটা অন হয়। ডিসপ্লেতে উঠে “Realme” লেখা লোগো। ফোনটা খুলে যায়। নিপা তাড়াতাড়ি কলার সেটিংসে যায়। এই সিম দিয়ে রায়হান কার সাথে কথা বলেছে না বলেছে তা দেখতে। কিন্তু না। রায়হানের সিমটা অফ বলছে। কলার লিস্টে শুধু তার সিমের কল লিস্ট। সে রায়হানের সিমটা দিয়ে কল দিয়ে চেক করতে চায়, তখনই একটা মেয়েলী কন্ঠে ভেসে আসে। বলে যে, এই সিমটার নাম্বার তুলে নেওয়া হয়েছে। মানে আরকি এই সিমের নাম্বার অন্য কার্ডে চালু, তাই এই কার্ড দিয়ে ফোন যাচ্ছে না, কলার লিস্টও ফাঁকা। নিপা ভাবে যে মেমরিতে হয়তো কিছু থাকতে পারে। নিপা ফোনের ফাইল ম্যানেজারে ঢুকে। মেমরিটা ৬৪ জিবি। এর মাঝে ১০ জিবি ফুল। এই ১০ জিবি কী কী রাখছে রায়হান! 

নিপা মেমরির ভিতরে ঢুকে। দেখে বিভিন্ন ফাইল রাখা। বেশিরভাগই ভিডিও। তাদের কম্পানির যেই বিজ্ঞাপন ভিডিও বেড়িয়েছে সেগুলো। নিপা ভিডিও ফোল্ডার থেকে বের হয়ে ফটোস এ ঢুকে। সেখানেও তার ছবি আর রায়হানের ছবি ছাড়া আর ছবি নেই। এগুলা সেই ছবি যেগুলা সে মাঝে মাঝে রায়হানকে হোয়াটসঅ্যাপে দিতো, আর দেখা হলে তুলতো। মাত্র ৪৯ টা ছবি। আর কোন ছবি নাই। নিপা সেই ফোল্ডার থেকে বেড়িয়ে অডিও ফোল্ডারে যায়। সেখানে বেশ কিছু ফোন রেকর্ডিং রাখা। 

‘ কল রেকর্ডিং! দেখিতো রায়হান কার কার সাথে কথা বলতো! ‘

বলেই নিপা রেকর্ডিং চালূ করে দেয়। একটা মেয়ে আর রায়হানের কথা বার্তা। মেয়েটা রায়হানকে কোন কাজ সম্পর্কে বলছিলো। হঠাৎ দরজা খুলে ঘরে প্রবেশ করে ফেলে রায়হান। 

 

চলবে ,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,,

 

( কী হতে চলেছে এরপর? নিপার কৌতুহলই কী তার সংসারের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে? গল্প নিয়ে গঠনমূলক মন্তব্য করুন। আমি রিপ্লাই দেওয়ার চেষ্টা করবো ❤️)

 

 গল্প নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা করুন আমার গ্রুপে।

গ্রুপ লিংক 👇

https://www.facebook.com/groups/743016887019277/?ref=share_group_link

 

উপন্যাস :: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন :: ২(মুখোশ)

পর্ব :: ৭২

লেখক :: মির্জা সাহারিয়া

 

উপন্যাস:: গ্রামের নাম আনন্দপুর

সিজন :: ২(মুখোশ)

পর্ব:: ৭৩

লেখক :: মির্জা শাহারিয়া

 

(১৮+ এলার্ট)

 

‘ কল রেকর্ডিং! দেখিতো রায়হান কার কার সাথে কথা বলতো! ‘

বলেই নিপা রেকর্ডিং চালূ করে দেয়। একটা মেয়ে আর রায়হানের কথা বার্তা। মেয়েটা রায়হানকে কোন কাজ সম্পর্কে বলছিলো। হঠাৎ দরজা খুলে ঘরে প্রবেশ করে ফেলে রায়হান। নিপা চমকে উঠে। হাত থেকে তার মোবাইল টা ছিটকে ফ্লোরে পড়ে যায়। ফোনের ডিসপ্লে ফেটে যায়। ফোন সুইচ অফ হয়ে সাউন্ড আসা বন্ধ হয়ে যায়। নিপা ভয়ার্ত চোখ নিয়ে একবার ফোনের দিকে তাকায়, তারপর ফিরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রায়হানের দিকে তাকায়। এক ঢোক গিলে। রায়হান এখনো ঠাঁয় দরজা ধরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো। সে যেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলো না ভিতরে কী হচ্ছে। নিপা ঘামছে। ভয়ে গলা শুকিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। রায়হান বিছানার দিকে এগিয়ে আসে। নিপার বুকের ঢুকপুকানি বেড়ে যায়। রায়হানের চাহনিটা এখন এমন লাগছিলো যে নিপা কোন বড়সড় অপরাধ করে হাতেনাতে ধরা পড়েছে। রায়হান নিপার সামনে এসে দাঁড়ায়। নিপার ভয়ার্ত মুখটা একবার দেখে ফ্লোরে পড়ে যাওয়া ফোনটা উঠায়। উঠিয়ে দেখতে থাকে। টাচ মাঝ দিয়ে ফেটে গেছে। ফোনটাও অফ হয়ে গেছে। রায়হান ফোনটা হাতে নিয়ে নিপাকে অবাক গলায় বলে,

– ফোনটা পড়লো কীভাবে! 

– এ,এমনিই হাত। হাত ফসকে পড়ে গেলো। 

– তুমি এতো ভয় পাচ্ছো কেনো? (চারপাশে নজর ঘুড়িয়ে) ভূত-তুত দেখে ফেলেছো নাকি! ঘরে তো ভূত নাই। এতো ঘামতেছো কেনো ? 

– ক,কই। কই ঘামতেছি। (বলতে বলতে মুখের ঘাম হাত দিয়ে মুছে নিপা) 

– সুবা, কোন সমস্যা ? তুমি এমন করছো কেনো ? 

– ন,না। কোন সমস্যা না। আমি,আমি ঠিক আছি। 

তখনই রায়হানের নজর যায় বিছানার দিকে। নিপার পাশে কিছু ভাঙা মোবাইলের টুকরো পড়ে আছে। রায়হান নিপার পাশে বসে ভাঙা মোবাইলের টুকরো গুলো হাতে নেয়। নিপা ভয়ে অন্য পাশে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। কোন অজানা ভয় তাকে ঘিরে রেখেছে, বারবার মনে হচ্ছে ও কোন স্পর্শকাতর যায়গায় হাত দিয়ে ফেলেছে। রায়হান ভাঙা মোবাইলের টুকরো গুলো হাতে নিয়ে বলে,

– এটা তো আমার মোবাইল! কোথায় পেলে এটা! 

– ন,নিচে। নিচে বাগানে। 

– বাগানে ? ওহ,, হয়তো ব্যালকনি থেকে যে পড়ে গেছিলো ঐ মোবাইল টা। নিচে নামে পড়ে আর খোঁজা হয়নি। (একটু থেমে) আচ্ছা বাদ দেও। নিচে আঁখি বিকালের নাস্তা বানাচ্ছে। তুমি কী নাস্তা খাবা ? নুডুলস করতে বলবো না পাস্তা ? 

– য,যেকোন একটা। 

– হ্যা, তো কোনটা। তোমার এখন কোনটা খেতে মন চাচ্ছে? আমি নিচে গিয়ে আঁখিকে ঐটাই বলবো রাঁধতে। 

– ন,নুডুলস। নুডুলস ই বলো। 

– আচ্ছা ঠিক আছে। আর তোমার ফোনটা মনে হয় আর অন হবেনা। রাতে নতুন ফোন এনে দিবো। চলো এখন, নিচে কেউ নাই, বাবা, ভাইয়ারা আসতে রাত হতে পারে। আমরা গিয়ে ডায়নিং টেবিলেই খেয়ে নেই। 

– আ, আচ্ছা ঠিক আছে। 

– চলো। 

রায়হান বিছানা থেকে উঠে ভাঙা ফোনের টুকরো গুলো বিছানায় থাকা পলিথিন টায় ঢুকিয়ে বাঁধে। নিপার হাত ধরে তাকে বিছানা থেকে উঠিয়ে নিয়ে যেতে থাকে তার সাথে। নিপা বলে,

– এইটা কোথায় নিয়ে যাচ্ছো ? 

– বাইরে ফেলে দিবো। ভাঙাচোরা জিনিস ঘরে রাখতে নাই, তাইলে বলে অভাব-অনটন বাড়ে। মানে লোকের মুখে শোনা কথা আরকি। চলো। 

রায়হান নিপার হাত ধরে দরজার দিকে চলে যায়, যাওয়ার সময় নিপার ফোনটা বিছানায় ছুড়ে ফেলে নিপাকে নিয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়। নিপা বাধ্যের মতো চুপচাপ রায়হানের সাথে যাচ্ছিলো। মনে মনে ভাবছিলো,

” আমি কী মিছে মিছেই রায়হানদের উপর সন্দেহ করছি! ঐ মেয়েটা হয়তো এ বাড়িরই কেউ। রায়হানের উপর এই বিশ্বাসটা অন্তত আমার আছে যে ও অন্য কোন মেয়েতে আসক্ত হবে না।” 

করিডোর থেকে সিড়ির দিকে চলে যায় দুজন। নিপা নিজেকে স্বাভাবিক করে নিতে থাকে। একটু আগে কিচ্ছু হয়নি তার সাথে, কিচ্ছু হয়নি!

 

____

 

সন্ধ্যা বেলা। এখনো ঝিড়ঝিড়ে বৃষ্টি পড়ছে। রিকশায় রিয়াদ আর ইকরা বাসার দিকে রওনা দিয়েছে। দুইজনেই ভিজে চুপচুপ। বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তায় গাড়ি-ঘোড়াও তেমন একটা নেই। দু’পাশের দোকান পাট গুলোও বন্ধ। এদিকটা শহরাঞ্চল। তাই মাঝে মাঝে দু একটা মোটরসাইকেলকে রাস্তা দিয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে। আকাশ মাঝে মাঝে গর্জন করে উঠছে। রিকশার হুড খোলা। ইকরাই হুড খুলে রাখতে বলেছে। এতোক্ষণ ভিজেছে, আরেকটু নাহয় জিজলো। চলন্ত রিকশায় ঠান্ডা বাতাস এসে দু’জনেরই শরীর শিউরে তুলছে। ইকরার ঠোঁট মৃদু কাঁপছে। সে রিয়াদের এক হাত জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রেখে আছে। হাতে এখনো সেই গুচ্ছ কদম ফুলের তোড়াটা। সেটাও কিছুটা ভিজে গেছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বৃষ্টি কণা এখনো কদমের গাঁয়ে লেগে আছে। ইকরার চোখ মুখ সাদাটে বর্ণ ধারণ করেছে। সারা বিকেল টাই তারা বৃষ্টিতে ভিজেছিলো। রিয়াদ বলে উঠে,

– বেশি ঠান্ডা লাগছে! 

– ন,না। ত, তেমন বেশি না।

– আগেই বলেছিলাম বৃষ্টিতে ভিজলে ঠান্ডা লাগবে, এখন যদি জ্বর আসে! 

– তুমি তো আছো। জ্বর আসলে আসুক, আমি থোরাই জ্বরকে ভয় পাই! 

– পুলিশকে তো ভয় পেতে! আর এখন দেখো, পুলিশের সাথেই প্রেম করছো। 

– স,সব পুলিশ আর তুমি কী এক! তুমি তো,তুমি তো স্পেশাল। আমার জন্য স্পেশাল।

– তোমাদের বাড়ির রোডে চায়ের দোকান আছে ? 

– ছোট্ট একটা চায়ের টং আছে। ক, কেনো? 

– তাইলে রিকশা থেকে নেমে সেখানে দুইজন গরম গরম চা খাবো। শরীরে একটু গরম ধরবে।

– তুমি থাকলে আমার আর চা লাগবেনা। তুমিই আমার গরম চা, তুমিই আমার হিটার!

– বাহ, প্রিয়জনের প্রয়োজন হতে পেরেছি তাইলে! 

– প্রয়োজন টা ক্ষণস্থায়ী থাক, প্রিয়জনটা চিরকাল রয়ে যাক!

– হমম, ঠিক আছে। চিরকাল রয়ে যাবো। কিন্তু ম্যাডাম, আজ যে আমাকে চলে যেতে হবে। বাসায় তো জানে আমি এখনো কেসের পিছনে দৌড়াইতেছি। 

– বাসায় ফোন দিয়ে বলো কেস বলছে ওর সাথে আজকে রাতে তোমাকে থাকতে‌। 

– না না, আমি এখন তোমার সাথে থাকতে পারিনা। আমরা এখনো আনম্যারিড। এখন একসাথে থাকা অসম্ভব। 

– কিছু হবেনা। বানু খালাকে আমি অন্য ঘরে থাকতে বলবো। 

– ইকরা! মার খাবা কিন্তু! বলছি না এখন একসাথে থাকা যাবেনা। আমি কী হারিয়ে যাচ্ছি নাকি। (একটু থেমে) তোমার মা-বাবা আসুক, আমি ভাইয়াকে নিয়ে আসবো একদিন। তখন কথা পাকাপাকি হলে বিয়ে করে সারাদিন আমার সাথে থাকিও। কিন্তু এখন, একদমই না।

ইকরা কিছুটা বাহানার সুরে বলে,

– আজ রাতে যদি আমার জ্বর আসে, তখন আমাকে কে দেখবে! 

– তোমার বানু খাল দেখবে! উনিতো কোথাও চলে যাচ্ছেন না। 

– তুমি তাইলে চলেই যাবা।

– ভাইয়া,ভাবি চিন্তা করবে আমি না ফিরলে। তুমি মন খারাপ করিও না। আমি আবার আসবো। (একটু থেমে) এটাই তোমাদের রোডের চায়ের দোকান না! এই মামা এখানেই দাঁড়ান। (ইকরার দিকে ফিরে) এটাই তো ? 

– হুমম।

– তাইলে নামো। গরম চায়ে চুমুক দিলে ঠান্ডা কাটে যাবে। সামনেই তো তোমাদের বাসা। হেঁটে হেঁটেই যাওয়া যাবে। 

ইকরা রিকশা থেকে নামে। রিয়াদও নেমে রিকশাওলাকে ভাড়া পরিশোধ করে দেয়। রিকশা ওলা মামা চলে যায় তার রিকশা নিয়ে। 

আকাশের বৃষ্টি এখন থেমেছে। তবে মেঘের ঘনঘটা বলছে আরো বৃষ্টি নামানোর জন্য তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে। রিয়াদ আর ইকরা চায়ের টংয়ের সামনে দাঁড়ায়। দোকানে কোন কাস্টমার ছিলো না। রিয়াদ টং দোকান থেকে দুটো চা নেয়। এখানে আবার মাটির ভাঁড়ে চা দেয়। রিয়াদ একটা ইকরাকে দেয়। ভালোই ধোঁয়া উঠছিলো চা থেকে। দুজনেই চায়ে ছোট্ট চুমুক দেয়। গপ্পের ঝুড়ি বের করে বসে দুজন। কথার মাঝে মাঝে হাসতেও থাকে। এই বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় ধোঁয়া উঠা মাটির ভাঁড়ে চা, হালকা ঠান্ডা বাতাস, আর একজন নিজের মানুষ, আহা! আহা! আর কি চাই!!

 

_______

 

শাহারিয়ার গাড়ি এসে থামলো বাড়ির মেইন গেটের সামনে। মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে শ্রীমঙ্গলে। মাঝে মাঝে ইয়া বড় বড় বিজলী চমকিয়ে উঠছে। শাহারিয়ার ফিরতে ফিরতে বেশ দেরি হয়ে গেলো। বলেছিলো এশার আগেই ফিরবে। কিন্ত না, ফিরতে ফিরতে রাত ৯ টা পাড় হয়ে গেলো। এরকম ঝড়বৃষ্টির রাতে বাড়িতে দিথী একা, আবার ভয় পাচ্ছে নাকি কে জানে! দাড়োয়ানটাকে বিকেলে অফিসে যাওয়ার সময়ই চলে যেতে বলেছিলো শাহারিয়া। তাই দাড়োয়ান টাও নেই। 

ড্রাইভার রুমান ছাতা হাতে ড্রাইভিং সিট থেকে বের হয়। বের হয়ে ঘুরে এসে গাড়ির অপর প্রান্তে এসে শাহারিয়ার দরজাটা খুলে দেয়। ছাতাটা শাহারিয়ার হাতে দিয়ে দেয়। শাহারিয়া গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ায়। গাড়ির ভিতরে বসে যা আন্দাজ করেছিলো এই বৃষ্টি তো তার চেয়েও বেশি জোরে পড়ছে। শাহারিয়া রুমানকে জোরে জোরে বলে,

– তুই গাড়ি নিয়ে ফিরে যা। কাল সকালে ফোন দিবো। তখন চলে আসিস।

– আচ্ছা স্যার। ঠিক আছে।

রুমান গাড়ির ড্রাইভারের পাশের দরজার দিকে চলে যায়। শাহারিয়া ছাতা হাতে বাড়ির খোলা মেইন গেইট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। বাড়িটাকে এখান থেকে দেখতে যেনো কোন ভূতুড়ে বাংলো মনে হচ্ছে। বাড়িতে কারেন্টও নেই। বৃষ্টি হলে কারেন্টের আর খবর পাওয়া যায় না। শাহারিয়া হেঁটে হেঁটে ঘাসের মাঝের সাদা অংশটা দিয়ে বাড়ির দরজার দিকে যেতে থাকে। বৃষ্টির বেগ অনেক বেশি ছিলো। দমকা হাওয়ায় তার শরীরে বৃষ্টির ঝাপটা এসে লাগছিলো। সাদা ফরমাল শার্টটা কিছু যায়গায় ছোপ,ছোপ পানি লেগে ভিজেও যায়। এক হাতে অফিস ব্যাগ, আরেক হাতে ছাতা। শাহারিয়া দ্রুত পা চালিয়ে বাড়ির দরজা দিকে যায়।

 

   দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করে। হাতের ছাতাটা বন্ধ ঘরে ঘরের কোনে রাখে। দরজাটা খোলাই ছিলো।  শাহারিয়া ভিতরে ঢুকে দেখে চারপাশ ঘোর অন্ধকার। শুধু মাঝে মাঝে বিজলী চমকে উঠলে সেই আলো জানালার গ্লাস দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করছে। দিথী নিশ্চয়ই ঘরের কোণে চুপচাপ বসে আছে। একলা মেয়েটা এরকম অন্ধকার বাড়িতে একা। শাহারিয়ার উচিত ছিলো আরো তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরা। শাহারিয়া দরজা লাগিয়ে দিয়ে হেঁটে হেঁটে সামনে আগায়। রুমটা ড্রয়িং রুম। শাহারিয়া ডাকতে থাকে,

– বউজান,,,, বউজান,,,, আমি আসছি। সরি লেইট করার জন্য। তুমি কি উপরের ঘরে আছো! বউজান,,,,

তখনই হঠাৎ নুপুরের শব্দ ভেসে আসে উপর থেকে। শাহারিয়া সিড়ির দিকে তাকায়। সিড়ি দিয়ে উপর থেকে নেমে আসছিলো দিথী। পড়নে হালকা লাল শাড়ি, হাতাকাটা ব্লাউজ। দুইহাত দিয়ে সামনে একটা লম্বা মোমবাতি ধরে আছে। ধীরে ধীরে সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসছে। শাড়ির আঁচলটা হাওয়ায় মৃদু উড়ছে। শাহারিয়া দিথীকে এমন ভাবে দেখে থ হয়ে যায়। দেখে মনে হচ্ছে যেনো এক ভূতুড়ে বাংলোতে এক অশরীরী প্রেতাত্মা উপর থেকে নিচে নামছে। দিথীর পায়ের নুপুরের শব্দ এই নিস্তব ঘরে প্রতিফলিত হচ্ছে। ঘরে ঠান্ডা বাতাসের সাথে একটা সুঘ্রাণ ভেসে আসতে থাকে। এক চাপা ফুলের ঘ্রাণ। দিথী নেমে এসে শাহারিয়ার সামনে দাঁড়ায়। বাইরে এক বড় বিজলী চমকিয়ে উঠে। কাঁচের জানালা দিয়ে সেই আলো খানিকক্ষণের জন্য ঘরকে আলোকিত করে চলে যায়। দিথী মুখ তুলে তাকায় শাহারিয়ার দিকে। চোখে হালকা কাজল দিয়েছে। মাথার চুল গুলো খোলা, মৃদু হাওয়ায় সেগুলো দুলছে। হাতে লাল চুড়ি। কোমরে ঝুলছে রুপালি বিছা। মোমবাতির আলোয় দিথীর শ্যাম সুন্দর মুখ খানা হ্রদয় জুড়িয়ে দেওয়ার মতো। শাহারিয়া আধভেজা শরীরে দিথীর সামনে থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের মধ্যে পিনপন নিরবতা।

 শাহারিয়া তার ঘোর কাটিয়ে তুলে নিরবতা ভেঙে বলে,

– ত, তুমি! স,সরি আসতে একটু লেইট হয়ে গেলো। 

– একটু না শাহারিয়ার সাহেব, আপনি অনেক টা লেইট করে ফেলছেন! 

– ন,না মানে স,সরি। আর হবেনা এমন লেইট। (একটু থেমে) ত,তোমার জন্য একটা জিনিস এনেছি। 

বলেই হাতের ব্যাগটা নিয়ে পাশের বড় টেবিল টায় রাখে শাহারিয়া। ব্যাগের চেইন খুলে কিছু একটা বের করতে থাকে। ভয়ে যেন তার শরীর কাঁপছে। দিথীকে বাড়িতে এসে সে এভাবে দেখবে কখনো ভাবেনি। ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট বক্স বের করে। বক্স নিয়ে এসে দিথীর সামনে দাঁড়ায়। দিথী এখনো আগের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলো। যেনো কোন ভয়ংকর সুন্দরী নারীর মুর্তি দাড়িয়ে আছে শাহারিয়ার সামনে। শাহারিয়া ছোট বক্সটার কভার খুলে ফেলে দেয়। ভিতরে ছিলো একটা রিং বক্স। শাহারিয়া সেটা খুলে দিথীর দিকে এগিয়ে দেয়। বলে,

– এটা তোমার জন্য। আমার এক কলিগ তার বউয়ের জন্য ডায়মন্ড রিং নিচ্ছিলো, আমি ভাবলাম তোমার জন্যও একটা নেই। তোমার তো আংটি অনেক পছন্দ। তার থেকে আমার টা বেশি বড়। ৮ ক্যারেটের। ডায়মন্ড নেকলেস এই শোরুমে ছিলোনা, নাইলে ওটাও আনতাম। ঢাকা গেলে তোমার জন্য সেটা নিয়ে আসবো। 

দিথী শাহারিয়ার হাতে থাকা রিং বক্সটার দিকে তাকায়। রিংটা বেশ সুন্দর। মোমবাতির আলো সেটায় পড়ে চিকচিক করে উঠছিলো। দিথী রিং থেকে নজর উঠিয়ে শাহারিয়ার দিকে তাকায়। শাহারিয়ার যেনো সেই দুই চোখের চাহনি দেখে গলা শুকিয়ে আসছিলো। ভিতর থেকে কথা বেড়োচ্ছিলো না। তারপরও খুব কষ্টে কাপো কাপো গলায় বলে উঠে,

– এ,এইটা কিনতেই দেরি হয়ে গেছিলো। দ,দাঁড়াও আমি তোমায় পড়িয়ে দিচ্ছি। 

বলেই দিথীর এক হাত ধরে সেটায় বক্সটা দিয়ে দিতে যায়, অমনি দিথী হাত টেনে নেয়। শাহারিয়া অবাক হয়। দিথী কী খুশি হয়নি ? দিথী এখনো আগের চাহনিতেই তাকিয়ে ছিলো। শাহারিয়া বুঝে উঠতে চেষ্টা করে আসলে দিথী তার চাহনী দিয়ে কী বলছে? তখনই তার মাথা খুলে যায়। ও বুঝতে পারে আংটিটা দিথী পড়িয়ে নিতে চাচ্ছে। শাহারিয়া রিং বক্স থেকে আংটিটা বের করে। বক্সটা ফেলে দেয়। আংটিটা নিয়ে দিথীর সামনে এক হাঁটু গেড়ে বসে। দিথী এবার নিজে থেকেই তার এক হাত বাড়িয়ে দেয়। আরেক হাতে তার মোমবাতি ধরা। সেই আলোয় চারপাশ খানিকটা আলোকিত হয়েছে। শাহারিয়া দিথীর হাতে আংটিটা পড়িয়ে দেয়। নিজের ভয় টুকু দূড়ে সড়িয়ে রেখে স্বাভাবিক গলায় বলে,

‘আই লাভ ইউ বউজান,,! তুমি আমার জীবনের,প্রথম ও শেষ ভালোবাসা। তোমার মাঝে তাইতো আমার,জীবনের শত আশা..!’ 

বলেই দিথীর হাতের উল্টো পিঠে একটা চুমু খায়। দিথীর চোখ যেনো বুজে আসছিলো হাতে পড়া সেই উষ্ঠদ্বয়ের ছোঁয়ায়। চারপাশ মোহময় হয়ে উঠে। হাওয়ায় ভাসতে থাকা চাপা ফুলের সুবাস আরো তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। শাহারিয়া উঠে দাঁড়ায়। তার চোখে এখন ভয় কিছুটা কম। দিথী চোখ মেলে শাহারিয়ার দিকে তাকায়। ধীর গলায় বলে,

– তুমি জানো আমি কখন থেকে তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম! তুমি আসবে বলে গোলাপ গাঁথায় কত শত আবেগ জমিয়ে রেখেছিলাম! এতো দেরি কেনো করলে! 

– রাস্তায় কিছুটা জ্যাম ছিলো। আর, এটা কিনতে কিনতেও দেরি হয়ে গিয়েছিলো। সরি, এরপর থেকে আর দেরি হবেনা। 

– আমায় কেমন লাগছে! 

– একদম সদ্য ফোঁটা নতুন গোলাপের পাপড়ির মতো সুন্দর! 

– এই সৌন্দর্যটাকে ছুঁয়ে দেও! নিজের করে নাও! 

– ক,কিন্ত! 

– আজ কোন কিন্ত নয়। এই বৃষ্টি ভেজা রাত, এই মোহময় আবহ, সব আজ আমাদের এক করে দিতে চাইছে! তুমি কেনো বিমুখ হচ্ছো! 

– আ,আমার। আমার কথাটা তো শো,,,,,,

 দিথী শাহারিয়ার মুখ তার হাত দিয়ে আলতো করে চেপে ধরে। মাথা নাড়িয়ে না সূচক ইঙ্গিত দেয়। মলিন গলায় বলে,

– আজ কোন বাক্য নয়, কোন কাব্য নয়। আজ শুধু তুমি আমার, আম