১.

চলন্ত ট্রেনে লিরার লেবার পেইন উঠলো।অথচ তার বাচ্চা প্রসবের ডেইটের এখনো সতেরো দিন বাকি।সে ব্যথায় কুঁকড়ে রোদ্দুর হিমের হাঁটু চেপে বলল,

 

‘হিম!যতদ্রুত সম্ভব ডাক্তার নিয়ে আসো।আমি মরে যাচ্ছি!’

 

লিরার এক হাত তার শ্বাশুড়ি মা ধরে আছে।খসে পড়া আরেক হাত তার শ্বশুর মশাই ধরলো।রোদ্দুর তাদের ফ্রন্ট সিটে বসে ছিল।সে বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়লো।চিন্তিত কন্ঠে বলল, 

 

‘চলন্ত ট্রেনে ডক্টর পাব কোথায় ভাবী?আবার গাইনী বিশেষজ্ঞ লাগবে।তুমি তো বিপদে ফেলে দিলে ভাবী।শুধু বিপদ না!যাকে বলে মহাবিপদ!মহাসাগর,মহাবিশ্ব, মহাসচিব যেমন, তেমনি মহাবিপদ!’

 

রোদ্দুরের একমাত্র জননী হাজেরা বেগম মুখ থমথমে করে বললেন,

 

‘অযথা ক্যাঁচাল পারবি না হিম।ডাক্তার ধরে নিয়ে আয় তো!’

 

‘কত করে বললাম, আমাকে প্রাইভেট মেডিকেলে ডাক্তারি পড়াও।শুনলে না তো?এখন এই ক্রিটিক্যাল মোমেন্টে দেখিয়ে দিতাম রোদ্দুর হিমের খেল!’

 

রোদ্দুরের বাবা উসমান আলী অনবরত দোয়া দরুদ পড়ে লিরার মাথায় ফু দিচ্ছেন।কিন্তু তাতে তেমন কাজ হচ্ছে না।লিরার অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছে।উসমান আলী তৃতীয় বারের মতো লিরার মাথায় আল্লাহর কালাম পড়া ফু দিয়ে সামান্য থুথু ছিটালেন।তারপর রোদ্দুরের দিকে ভয়ানক চোখ করে গম্ভীর কন্ঠে বললেন, 

 

‘বেকু্ব!আমার চোখের সামনে থেকে দূর হ!তোর মুখ দেখতে চাই না।’

 

‘তোমাদের এই মহাবিপদে রেখে আমি কোথায় যাব বাবা?আমার যে মহাহৃদয়!তুমি বরং আমার মুখ দেখতে না চাইলে আমার মুখের দিকে তাকিও না।সিম্পল!’

 

উসমান আলী বাজখাঁই গলায় বললেন,

 

‘আর দুই মিনিট যদি সামনে খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে থাকিস,তাহলে তোকে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দিব!ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে না পারলে আমি বাকি জীবনটা ছাগলের মতো ম্যাঁ ম্যাঁ করে কাটানোর শপথ করলাম!আমি হলাম ওয়ান ওয়ার্ড ম্যান!”

 

অবস্থা বেগতিক দেখে হাজেরা বেগমের কপাল কুঁচকে গেল।তিনি কঠোর গলায় বললেন,

 

‘হিম!তুই এক্ষুণি কেবিনের বাইরে যা।সারা ট্রেনে খোঁজ নে। দেখ,কোনো ডাক্তার পাস কি না!’

 

লিরা ব্যথায় কুঁকড়ে উঠছে বার বার।অস্পষ্ট ভাবে কিছু একটা বলছে।দেখেই বোঝা যাচ্ছে কি পরিমাণ কষ্ট হচ্ছে।রোদ্দুর দুঃখীত মনে তিনবার বলল, 

 

‘আহারে!আহারে!আহারে!’

 

তারপর সান্ত্বনার সুরে বলল, 

 

‘সন্তান জন্ম দেয়া কি কষ্টকর কাজ ভাবী!ভাগ্যিস মেয়ে হয়ে জন্ম হয়নি।তুমি টেনশন করো না।আমি ফু দিয়ে ডাক্তার সাথে নিয়ে আসছি।একটু কষ্ট করো আমার লক্ষী ভাবী!’

 

সে ঝড়ের বেগে কেবিনের বাইরে এলো।বাইরে থেকে কেবিনের দরজা টেনে দিল।পাশাপাশি টু সিটার প্রথম শ্রেণীর স্লিপিং বার্থ টিকেট সংগ্রহ করা ছিল।কথা ছিল একটাতে হাজেরা বেগম আর লিরা যাবে।আরেক টাতে রোদ্দুর আর উসমান আলী যাবে।কিন্তু ট্রেন মাঝপথে আসার পর অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে লিরার লেবার পেইন উঠে গেছে।

 

রোদ্দুর পাশের কেবিনটাতে ঢুকল।ফোনটা পকেট থেকে বের করে তার বড় ভাইকে ফোন করতে নিয়ে শেষমুহূর্তে সিদ্ধান্ত পাল্টাল।এ অবস্থায় ভাই তো কিছু করতে পারবে না।একটা জিনিস বাদে।সেটা হলো টেনশন!সে ফোনটা ব্যাগের চিপায় রেখে কেবিন থেকে বের হলো।চলন্ত ট্রেনে প্রচুর ফোন চুরি হয়।আগে থেকে সাবধানতা অবলম্বন করা ভালো।

 

ট্রেনের এক হাত করিডোর ধরে উঠানামার দরজার কাছে এলো রোদ্দুর।এসি করা বগি হওয়ায় বেশি মানুষ নেই।বন্ধ দরজার কাছে চারজন পুরুষ আর দুইজন বয়স্কা মহিলা উদাস ভঙ্গিতে বসে আছে ।রোদ্দুরকে দেখে তারা একটু ঘাবড়ে গেল।তাদের ভয়মিশ্রিত চোখের দিকে চেয়ে রোদ্দুর প্রশ্রয়ের হাসি হাসল।কিন্তু কারো মুখোভঙ্গির কোনোরূপ বিক্রিয়া ঘটলো না।ফলে পরিবর্তন সাধিতও হলো না।

 

এদের ভাব ভঙ্গি দেখে বোঝা যাচ্ছে কেউ পেশাদার ডাক্তার নয়।তবুও রোদ্দুর একবার জিজ্ঞেস করলো,

 

‘আপনাদের মধ্যে কেউ ডাক্তার আছে?আমার কাছের একজনের লেবার পেইন উঠেছে।’

 

লোকগুলো উত্তর দিল না।তবে ক্রমেই তাদের চোখে মুখে বিরক্তি ফুটে উঠছে।হয়তো এরা লেবার পেইন কি সেটাই জানে না!

 

রোদ্দুর আর সময় ব্যয় করলো না।সামনে এগিয়ে গিয়ে পরবর্তী বগিতে জিগ্যেস করল।কিন্তু কোনো ডাক্তার খুঁজে পেল না।তার পরের বগিতে ভীড়ের জন্য ঢুকতে পারলো না।সে উল্টো ঘুরে তাদের বগিতে এলো।এনাউন্সমেন্ট রুমটা খুঁজে বের করতে হবে।সেখানে মাইক্রোস্পিকারে ঝরঝরে কন্ঠে বলতে হবে,

 

‘সম্মানিত যাত্রীবিন্দু!খুবই দুঃখের সহিত জানানো যাচ্ছে যে আমাদের এই চলমান ট্রেনে একটা নারীর লেবার পেইন উঠেছে।তিনি প্রচন্ড কষ্ট পাচ্ছেন।কোনো ডাক্তার যদি থেকে থাকেন তাহলে অতিসত্বর এসি বগির ১৩ নাম্বার কেবিনে যোগাযোগ করুন।জানেনই তো!জান বাঁচানো ফরয।তাই দ্রুত যোগাযোগ করুন।’

 

এ ছাড়া আর উপায় নেই!কিন্তু সাদা পোশাকের কোনো এটেনডেন্ট চোখে পড়ছে না।তারা সাহায্য করতে পারতো।রোদ্দুর চিন্তিত মুখে কেবিনের দিকে এগোল।দরজা টেনে খোলার আগেই লিরা ভাবীর চিৎকার ভেসে এলো।হাজেরা কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বলছেন,

 

‘বউ মা!আর একটু সহ্য করো।আর দুইটা স্টেশন পর ট্রেন থামবে।তখন ব্যবস্থা নিব।’

 

তার বাবা উসমান আলী থমথমে গলায় বললেন,

 

‘হাজু এক কাজ করি।ইমার্জেন্সি চেইন টেনে ট্রেন থামিয়ে দেই!কি বলো?’

 

রোদ্দুরের বাবা তার মাকে আদর করে হাজু বলে ডাকে।হাজেরা থেকে হাজু।ক্লাস সেভেনে থাকতে সে একবার মাকে হাজু বলেছিল, তার মা তেরো ঘন্টা ভাত দেইনি।কত বৈষম্য!মেনে নেয়া যায়?আলবাত মেনে নেয়া যায় না।কিন্তু সে ভালো ছেলে বলে মেনে নিয়েছে!

 

বাবার চেইন টেনে ট্রেন থামানোর আইডিয়াটা রোদ্দুরের পছন্দ হয়েছে।পুরো হুলস্থুল একটা কান্ড হবে।সবাই জানবে নবজাতক একজন পৃথিবীতে আসছে।নবজাতকটির সারাজীবন বলে বেরানোর মতো চমৎকার একটি গল্প হবে।বুড়ো বয়সে নাতি-নাতনীদের পাশে বসিয়ে বলবে,”জানিস আমার জন্মের সময় কি হয়েছিল?ট্রেনের মধ্যে মাঝ জঙ্গলে মায়ের ব্যথা শুরু হলো।কোথাও ডাক্তার পাওয়া যাচ্ছিল না।আমার কাকু কি করলো জানিস?ইমার্জেন্সি চেইন টেনে ট্রেন থামিয়ে দিল।বুঝলি কাকু খুব সাহসী ছিলেন।কাকুর মতো মানুষ এক পিসই হয়।কাকু তো………”

 

সে কেবিনে ঢোকার আগে তার মা চেঁচিয়ে বাবাকে বললেন,

 

‘তোমার যতসব গাঁজাখুরি কথা।চেইন টেনে এই মাঝ জঙ্গলের ভেতর ট্রেন থামিয়ে কোন মহান কাজ করবে শুনি?তার চেয়ে এখানে বসে না থেকে ট্রেনে খোঁজ করো কোনো ডাক্তার পাও কি না!’

 

মায়ের কথা বাবা কখনো অগ্রাহ্য করে না।তার মানে বাবা এখন কেবিন থেকে বের হবে।তার আগেই রোদ্দুরকে সরে পড়তে হবে।

 

সে দ্রুত করিডোর ধরে সামনে এগোল।বুফে কারের দিকে গিয়ে দেখা যাক কাউকে পাওয়া যায় কি না।তাছাড়া তার টেনশনে প্রচন্ড চা পিপাসা পেয়েছে।পরপর তিন কাপ চা না খেলে মাথার জ্যাম ছাড়বে না!

 

‘হোয়াট ননসেন্স!’

 

মেয়েলি একটা রাগী কন্ঠ রোদ্দুরের কানে এসে বাজলো।সামনে তাকাতে তার চোখ ছানাবড়া।তার সামনে সাক্ষাৎ ডানা কাটা পরী দাঁড়িয়ে আছে।রাগী পরী।যার বিরক্তিতে কপালে দুটো ভাঁজের সৃষ্টি হয়েছে।সেই ভাঁজ দুটো যেন সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।পরীটা চোখ তুলে তাকাল।

 

সঙ্গে সঙ্গে রোদ্দুরের ভেতর স্লথ গতিতে ঝড়ো হাওয়া বয়ে গেল।তার বুক ধড়ফড় করছে।গলা শুকিয়ে আসছে।শরীর একদম ছেড়ে দিয়েছে।হাত পা অসাড় হয়ে আসছে।হার্টের প্রতিটি বিটে যেন তুমুল বেগে শব্দ সৃষ্টি হচ্ছে।সে বুকের বাঁ পাশে হাত চেপে বিড়বিড় করে বলল,

 

‘ও মাই গড!’

 

ততক্ষণে মেয়েটা জামা ঝেরে বিরক্তি ঝরা কন্ঠে বলে উঠলো, 

 

‘পেছন থেকে পুলিশ ধাওয়া করেছে?চোরের মতো দৌঁড়াচ্ছেন কেন?টেন মিনিটস দাঁড়িয়ে থেকে চা কিনলাম আর আপনি?টু সেকেন্ডসে সেটা ঢেলে দিলেন?’

 

রোদ্দুরের টনক নড়লো।তার সামনের পরীটার বিরক্তির কারণ বুঝতে পারলো।অসাবধানতাবশত মেয়েটার সাথে তার ধাক্কা লেগেছে।যার কারণে তার হাতের ওয়ান টাইম চায়ের গ্লাস ছলকে সব চা ঢেলে গেছে।মেয়েটাকে রোদ্দুরের মনে ধরেছে।শুধু ধরেনি,সুপার গ্লুর মতো আটকে গেছে।

 

রোদ্দুর কন্ঠে মধু ঢেলে বলল, 

 

‘মন প্রাণ ঢেলে স্যরি বলছি।আমি এক্ষুণি আপনাকে বিশ কাপ চা দিচ্ছি!’

 

‘লাগবে না।এই চোখ দুটো দেখে চলার জন্য দিয়েছে।নেক্সট টাইম থেকে তার যথাযথ ব্যবহার করবেন।’

 

রোদ্দুর মন্ত্র মুগ্ধের মতো মেয়েটার দিকে চেয়ে আছে।কন্ঠে ভালোবাসা নিবেদন করে বলল,

 

‘আমি তো তাই করছি।চোখের যথাযথ ব্যবহার করছি।’

 

মেয়েটার চোখের দৃষ্টি শকুনের মতো তীক্ষ্ণ হলো।এক পলক রোদ্দুরের পা থেকে মাথা পর্যন্ত পরখ করে বিড়বিড় করে বলল,

 

‘সাইকো!’

 

মেয়েটা চলে যেতে উদ্যত হতেই রোদ্দুরের মনে পড়লো মেয়েটার নাম তো জানা হলো না?ম্যারিড কি না সেটাও জানতে হবে।সরাসরি জিগ্যেস করবে?নিশ্চিত বলবে না।সে হঠাৎ এক গাল হেসে বলল, 

 

‘আরে ম্যাডাম আপনি!আপনাকে স্যার ডাকছে?’

 

রোদ্দুর স্পষ্ট বুঝতে পারছে মেয়েটার ভ্রু যুগল কুঁচকে যাচ্ছে।সে কুঁচকানো চোখে মুখে বলল,

 

‘কোন স্যার?’

 

‘হে হে হে!আপনার হাজব্যান্ড!ওদিকে দাঁড়িয়ে দেখলাম।আমাকে বললো আপনাকে ডেকে দিতে।তাড়াহুড়ো করে আসতে ধাক্কা লেগে গেল।স্যরি ফর দ্যাট!’

 

‘আপনি আমার এটেনশন পাওয়ার চেষ্টা করছেন সেটা বেশ বুঝতে পারছি।তার জন্য এত মিথ্যে বলতে হবে?ফর ইউর কাউন্ড ইনফরমেশন, আমি আনম্যারিড!গুড বায়!’

 

মেয়েটা ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই রোদ্দুর ঝটপট বলল, 

 

‘কিন্তু আমি তো মিথ্যে বলছি না ম্যাডাম।আ’ম ড্যাম সিউর!একটা টাক মাথার মোটাসোটা লোক আপনাকেই ডাকছে।আপনার নাম বন্যা না?আপনার হাজব্যান্ড আদর করে ব্যাঙ বলে ডাকে।পানিতে যার বসবাস।’

 

‘বন্যা আমাদের বাসার কাজের মেয়েটির নাম।১৯৮৮ সালের বন্যায় তার জন্ম বলে বন্যা নাম রেখেছে তার মা!আমার বাবা শর্ট ফর্মে তাকে বন বলে ডাকে।আমি অহি!অজান্তা অহি!আই উইশ,আমাদের আর দেখা না হোক!’

 

রোদ্দুরকে পরম হেলাফেলা করে পাশ কাটিয়ে অহি নামক মেয়েটা এগিয়ে গেল।রোদ্দুর এক দৃষ্টিতে সেদিকে চেয়ে রয়েছে।সে মুচকি হেসে মনে মনে বলল, 

 

‘অজান্তা,আমার বোকা পরী!শুধু আই কেন?চোখ, নাক, কান, যকৃত,ফুসফুস, হার্ট সব উইশ করবে যে আমাদের আবার দেখা হবে।’

 

অহি রোবটের মতো মেপে মেপে পা ফেলে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।কিছুদূর এগিয়ে যেতে রোদ্দুরের মস্তিষ্ক খোলাসা হলো।অহি নামক মেয়েটারর গায়ে তো সাদা এপ্রোন।তার মানে নিশ্চিত ডাক্তার।ধুর!ভাবীর কথা বেমালুম ভুলে গেছে।

 

সে এক দৌঁড়ে অহির কাছে গিয়ে সাদা এপ্রোনের নিচের অংশ টেনে ধরলো।হড়বড় করে বলল,

 

‘ডক্টর!মিস অজান্তা অহি!আমার লেবার পেইন উঠেছে।প্লিজ, বাঁচান ডক্টর!’

 

(চলবে……)

 

#গল্পের_নাম: || হ-য-ব-র-ল ||

#লেখনীতে: অজান্তা অহি (ছদ্মনাম) 

#পর্ব______০১

 

আসসালামু আলাইকুম।🤎গল্পটি অনেক বড় করার ইচ্ছে আছে।দেখা যাক কেমন রেসপন্স আসে।ইহা চলবে কি?🐍

 

#গল্পের_নাম:|| হ-য-ব-র-ল ||

#লেখনীতে:অজান্তা অহি (ছদ্মনাম) 

#পর্ব_______০২

 

অহি বিস্ফারিত নয়নে রোদ্দুরের পেটের দিকে তাকালো।চোখ সরিয়ে এপ্রোনের নিচের অংশ হাত থেকে একটানে ছাড়িয়ে নিল।বিস্ময় মাখা গলায় বলে উঠলো,

 

‘কি উঠেছে?’

 

‘লেবার পেইন ডক্টর!প্লিজ একটু হেল্প করুন।’

 

‘লেবার পেইন কখন উঠে জানেন?’

 

রোদ্দুর কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো।পরক্ষণে দুহাতে নিজের পরণের মেরুন রঙের শার্টটার কলার উঁচু করলো।গুটানো হাতায় আরেক বার ছুঁয়ে দিল।ডান হাতে মাথার পরিপাটি চুলগুলো আরেকবার ব্রাশ করে বলল, 

 

‘অজান্তা,আপনি কিন্তু আমায় আন্ডারস্টিমেট করছেন।আমি কে সে বিষয়ে আপনার কোনো আইডিয়া আছে আপনার?নাহ!নেই!আমি হলাম এই পৃথিবীর সবচেয়ে হার্ড সাবজেক্ট।আমাকে ধারণ করা এত সহজ নয়।সূত্রের সহজ ও বিকল্প পদ্ধতি অনুসিদ্ধান্তের মতো আমার একটা সহজ রূপ আছে।সেটা হলো আমি একজন সফল সফটওয়্যার ইন্জিনিয়ার।চুয়েট থেকে থার্ড ডিভিশনে পাস করেছি।এই রোদ্দুর হিমের কাজ পছন্দ না বলে কোনো জব করছি না।’

 

‘রোদ্দুর হিম,রাইট?লেবার পেইন কখন উঠে বলেন।আমি জানি না,জানতে চাই!’

 

‘হে হে হে!ডেলিভারি পেইন।’

 

অহি নিজের মুখে হাত রাখলো।স্বাভাবিক কন্ঠে বলল, 

 

‘তাহলে কোন যুক্তিতে বলছেন আপনার লেবার পেইন উঠেছে?আপনি মা হতে চলেছেন?’

 

রোদ্দুর অবাক কন্ঠে বলল, 

 

‘মিস অজান্তা অহি।আপনি কি মানসিক ভাবে সুস্থ?আমার তো মনে হচ্ছে না।আমি মা হবো কেন?বিয়েই তো করিনি!তাছাড়া বিয়ে করলে বড়জোর বাবা হবো!মা তো হবে আপনার মতো কোনো নারী!’

 

‘তাহলে বললেন যে আপনার লেবার পেইন উঠেছে?’

 

‘নাউজুবিল্লাহ!আমি তো বললাম আমার ভাবীর লেবার পেইন উঠেছে।আপনি ভুল শুনেছেন।তাই বলে এতটা ভুল?আচ্ছা,বাদ দিলাম।আপনি প্লিজ এবার আমার সাথে আসুন!’

 

অহি সন্দেহের দৃষ্টিতে রোদ্দুরের দিকে তাকালো।ছেলেটাকে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।চাল -চলন,কথাবার্তা ভয়ানক সন্দেহজনক।সে আর মাথা ঘামাল না।রোদ্দুরকে সম্পূর্ণ ইগনোর করে সামনে এগিয়ে যেতে রোদ্দুর আবার সাদা এপ্রোণের নিচের অংশ টেনে ধরল।অহি বিরক্তি নিয়ে বলল,

 

‘আপনি তো ভারী অসভ্য।টানাটানি করছেন কেন?ছাড়ুন বলছি!’

 

রোদ্দুর চোখে মুখে অসহায়ত্ব ফুটিয়ে বলল,

 

‘ভাবীর অবস্থা ক্রমেই খারাপ হয়ে যাচ্ছে।আমার একটিমাত্র ভাইয়ের এই একটিমাত্র বউ।আপনি প্লিজ আসুন।এই একটু দূরে ১৩ নাম্বার কেবিনে পেশেন্ট।’

 

‘আমি আপনার কথা বিশ্বাস করি না।আপনি একটা কিন্তু-পার অর্থাৎ বাটপার।বুঝতে পেরেছেন?’

 

‘আমি সত্যি বলছি ডক্টর।এবার কিন্তু আপনাকে জোর করে নিয়ে যাব।’

 

অহি বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল।সে না গেলে তুলে নিয়ে যাবে?এই ভরা ট্রেনে,আনুমানিক ৭০০ যাত্রীদের মাঝে থেকে তাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছে?সে এক ঝটকায় এপ্রোন টেনে ঘুরে দাঁড়াল।

 

রোদ্দুর লম্বা একটা দম নিল।থুথু ছিটিয়ে বুকে ফু দিল।সে এখন সাংঘাতিক একটা কর্ম করবে।খুবই সাংঘাতিক!ট্রেনের লম্বা করিডোরের দুই পাশে সে নজর বুলাল।কাউকে চোখে পড়ছে না!

 

অতঃপর সে দ্রুত কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে হ্যাঁচকা টানে অহিকে নিজের দিকে ঘুরাল।অহির বিস্ময় মিশ্রিত মুখের দিকে না তাকিয়ে এক ঝটকায় তাকে কোলে তুলে নিল।তারপর দিল ভৌ দৌঁড়।মনে মনে উল্টো কাউন্ট শুরু করলো।তার হিসেব মতে মেয়েটার বিস্ময় ভাব কাটতে ১০ থেকে ১২ সেকেন্ড লাগবে।তারপর সে চিৎকার করবে।তার চিৎকার করার আগেই লিরা ভাবীর কেবিনে পৌঁছাতে হবে।কেবিনে পেশেন্ট দেখে এই মেয়ের সব ভুল ভেঙে যাবে।

 

সে মনে মনে কাউন্ট ডাউন শুরু করলো,

 

‘এইট,সেভেন,সিক্স,ফাইভ,ফোর,থ্রি,টু……..’

 

কেবিনের দরজা খোলার আগেই ঠাস করে রোদ্দুরের গালে চড় পড়লো।থাপ্পড় খেয়ে ভয়ানক চমকে উঠল সে।বিস্ফারিত নয়নে তার দুহাতের মাঝে শায়িত অবস্থায় থাকা অহির দিকে তাকালো।অহির চোখ দিয়ে আগুনের হল্কা বের হচ্ছে।যার একটুখানি আঁচে রোদ্দুরের ভেতরটা পুড়ে ছারখার হয়ে গেল।নিজেকে সামলে ছাড়া ছাড়া ভাবে বলল,

 

‘অজান্তা,আপনি আমার কোলে উঠে থাপ্পড় মারলেন?’

 

‘তাছাড়া কি করবো?বাবু বাবু বলে গলা জড়িয়ে ধরবো?এক্ষুণি নিচে নামান বলছি!’

 

‘নেহায়েত আমার হাত দুটো বন্দী বলে বেঁচে গেলেন।না হলে আপনার গালেও দুটো পড়তো!থাপ্পড় নয়,চুমু!’

 

বলে রোদ্দুর অপেক্ষা করলো না।হাত দুটো ঢিলে করে ছেড়ে দিতে অহি ভয়ার্ত চেহারায় গলা জড়িয়ে ধরলো।শেষ মুহূর্তে রোদ্দুর ধরে ফেলল।তার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা হাসিটুকু সারা মুখে বিস্তৃত হলো।সে এক পায়ে কেবিনের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।অহিকে নামিয়ে দিয়ে এক নিঃশেষে বলল,

 

—‘মা,ভাবী!ডক্টর নিয়ে এসেছি।আমি বাইরে অপেক্ষা করছি।কিছু লাগলে অবশ্যই জানাবে।’

 

রোদ্দুর দ্রুত বাইরে বের হয়ে দরজা টেনে লাগিয়ে দিল।দরজার সাথে পিঠ লাগাতে তার হাত পা নিস্তেজ হয়ে আসল।শ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে।সে বুকে হাত চেপে পা টান টান করে ফ্লোরে বসে পড়লো।চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ সময় নিয়ে ফুসফুস ভরে শ্বাস নিল!মেয়েটাকে কোলে তোলার পর থেকেই তার দম বন্ধ হয়ে আসছিল।কি এক অসহ্যকর ছোঁয়া।দম বন্ধ করা অনুভূতি!মেয়েটাকে ছুঁয়ে দেয়ার পরো সে যে বেঁচে আছে এই অনেক।

 

‘আপনি কি অসুস্থ?’

 

রোদ্দুর মাথা তুলে তাকিয়ে দেখলো সাদা পোশাকের এটেনডেন্ট!বাম হাতে একটা নোটপ্যাড,ডান হাতে কালো কলম।কলমের হেড নেই।সে ছন্নছাড়া দৃষ্টি মেলে বলল,

 

‘অামাকে কি দেখে অসুস্থ মনে হচ্ছে ব্রাদার?’

 

‘এভাবে পা ছড়িয়ে বসে আছেন কেন?এখানে বসে থাকা যাবে না।এগুলো নিয়ম বর্হিভূত।স্পেশাল কেবিন এগুলো।সরে যান!’

 

রোদ্দুর উঠে দাঁড়ালো।এটেনডেন্টের দিকে চেয়ে বলল, 

 

‘ব্রাদার,এই দুটো কেবিনে আমি পরিবার নিয়ে যাচ্ছি।’

 

‘তাহলে বাইরে কেন এভাবে?’

 

লোকটার দৃষ্টি সরু হচ্ছে।রোদ্দুর হেলাফেলা করে কিছু বলার চেষ্টা করতে কেবিনের দরজা একটুখানি খুলে গেল।ভেতরে অহির ভয়ার্ত মুখ দেখা গেল।সে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল,

 

—‘মি. রোদ্দুর!এই বরাবর যান!গিয়ে ১৯ নাম্বার কেবিনে নক করুন।মধ্য বয়স্কের এক লোক বের হবে।আমার বাবা উনি।উনাকে গিয়ে বলুন যে,আমার ডাক্তারি ব্যাগটা এক্ষুণি দরকার!দিতে নিমরাজি হলে বাবাকে সাথে করে নিয়ে আসবেন।দ্রুত যান!’

 

রোদ্দুর মাথা নেড়ে ছুট লাগাল।অহি এটেনডেন্টের দিকে চেয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল, 

 

‘একটা ঘটনা ঘটে গেছে।এই কেবিনে একজন অন্তঃসত্ত্বা মেয়ে যাচ্ছিল।আকস্মিক ভাবে তার ডেলিভারি পেইন উঠেছে।রোগীর পানি ভাঙা শুরু হয়ে গেছে।মিনিট বিশেকের মধ্যে বাচ্চা হবে।আপনি কি এই রুমের এসিটা বন্ধ করে দিতে পারবেন?’

 

এটেনডেন্ট মাথা চুলকে বলল, 

 

‘ম্যাডাম,এটা সরকারি ট্রেন।কোনো জিনিসের ইয়ত্তা নেই।ট্রেনের বেশকিছু কেবিনের রিমোট কন্ট্রোল নেই।অটো চলে।তবুও আমি ব্যবস্থা করছি।’

 

লোকটা চলে যেতে অহি দরজা আটকে দিল।সে এগিয়ে গিয়ে লিরা নামক মেয়েটাকে ফ্লোরে আধ শোয়া করে রাখলো।ডেলিভারিতে তেমন জটিলতা দেখা যাচ্ছে না।তবুও তার হাত পা কাঁপছে।গলা শুকিয়ে আসতে চাইছে।সে মনকে নিয়ন্ত্রণ করার চাবিকাঠি মস্তিষ্ককে দিয়ে দিল।ঝরঝরে গলায় বলল,

 

‘আন্টি, কিছু এক্সট্রা কাপড় বের করুন।’

 

হাজেরা পাশ থেকে লাগেজ টেনে তার বেশকিছু নতুন শাড়ি বের করে দিল।পানির বোতলটা পাশেই ছিল।অহি সেটার মুখ খুলে রাখলো।কেবিনের দরজায় টোকা পড়ছে।সে এক হাত বাড়িয়ে নিজের কালো চামড়ার ব্যাগটা ভেতরে টেনে নিল।প্রয়োজনীয় জিনিস বের করে লিরার পা উঁচু করে ধরলো।

 

লিরার চোখ মুখ ব্যথায় নীল হয়ে গেছে।মুখ দিয়ে অস্ফুট শব্দ করছে।নিজেকে ভেঙ্গে চূড়ে নতুন করে গড়ছে যেন।হঠাৎ এক আর্তচিৎকার দিয়ে নিস্তেজ হয়ে গেল সে।

 

প্লাসেন্টার সঙ্গে শিশুর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে।এখনো নিঃশ্বাস প্রশ্বাস নেয়া শুরু হয়নি।অহি শিশুটির পিঠে ছোট্ট একটা থাবা দিল।তৎক্ষনাৎ শিশুটি কাঁদতে শুরু করলো।যেন তেন কান্না নয়,গগনবিদারী চিৎকার।তার ফুসফুস সচল হয়েছে,মারাত্মক সুন্দর পৃথিবীতে সে প্রবেশ করলো।কত না বিস্ময় তার চোখে! 

 

খুশিতে অহির চোখ ভিজে উঠলো।তার ইন্টার্নসহ দেড় বছরের ডাক্তারি জীবনে এত খুশি কোনোদিন হয়নি।অপার আনন্দ নিয়ে সে শিশুটিকে বলল,

 

‘অনিন্দ্য সৌন্দর্যের এই পৃথিবীতে তোমায় স্বাগতম লিটল এঞ্জেল।ওয়েলকাম!’

 

২.

 

উসমানী আলী বেকায়দায় পড়েছেন।এই মুহূর্তে তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মনে হচ্ছে।ভেতরে ভেতরে ছটফটের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন তিনি কিন্তু কিছু করতে পারছেন না।চোখের সামনে যেন সর্ষে ফুল দেখছেন।তিনি ঝপ করে বুফে কারের বেঞ্চে বসে পড়লেন।

 

তার মূলত দুটো সমস্যা দেখা দিয়েছে।প্রথম সমস্যা হলো ওযু করার পানি পাচ্ছেন না।লিরার একটা ফুটফুটে মেয়ে হয়েছে।লিরাও সুস্থ আছে।সেই উপলক্ষে তিনি শোকরানা নামায আদায় করবেন,অথচ অযুর পানি মিলছে না।দুপুরের দিকে বিমানবন্দর স্টেশন থেকে অযু করে তিনি ট্রেনে উঠেছিলেন।তাদের উদ্দেশ্য খুলনা!পথিমধ্যে তিনি অযুর কথা ভুলে রোদ্দুরকে মনে মনে বিশ্রী ভাষায় গালি দিয়েছেন।গালি দেওয়ার পরো অযু থাকার কথা না!

 

দ্বিতীয় সমস্যা হলো ট্রেন চলছে এলোমেলো গতিতে সর্পপদক্ষেপ অনুসরণ করে।কখনো উত্তর দিকে তো কখনো দক্ষিণ দিকে।একটু পর পর বাঁক ঘুরছে।কিন্তু কিবলা হলো পশ্চিম দিকে।এখন তার মনে খটকা লাগছে কোন দিক হয়ে নামায আদায় করবেন!

 

মনে মনে নিজেকেও জঘন্য একটা গালি দিলেন তিনি।এই বিষয়ে আগে থেকে হাদিস জেনে রাখা উচিত হলো।অথবা মসজিদের বড় ইমামের থেকে জেনে স্মরণে রাখা উচিত ছিল।এতবড় উচিত কাজ না করার জন্য নিজেকে ঠাস করে থাপ্পড় মারতে ইচ্ছে করছে।

 

‘আরে উসমান আলী যে!চা খাচ্ছেন নাকি?’

 

উসমান আলী চোখ তুলে তাকিয়ে দেখলেন তার চেয়ে একটু বয়স্ক এক লোক কিছুটা কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।লোকটির মুখ হাসিহাসি।মাথার সম্পূর্ণ চুল সাদা।গায়ে ধবধবে সাদা পাজামা পাঞ্জাবি!তাকে অনেকটা মুনী ঋষিদের মতো লাগছে।এই লোকটিকে তিনি চিনেন।লিরা মায়ের চিকিৎসা করা সেই ডাক্তার মেয়েটির বাবা জনাব লুৎফর রহমান ইনি!তিনি মুখে জোরপূর্বক হাসি টেনে বললেন,

 

‘চা আমি পছন্দ করি না।বসে বসে আরাম করছি।’

 

লুৎফর রহমান এসে উসমান আলীর পাশে বসলেন।এক কাপ চা হাতে নিয়ে বললেন,

 

‘আপনাকে দেখে তো মনে হচ্ছে না বসে থেকে আরাম পাচ্ছেন ভাইসাহেব!’

 

‘তা ঠিক বলেছেন।আরাম পাচ্ছি না!’

 

‘লুডু খেলবেন?’

 

উসমান আলী ভয়াবহ ভাবে চমকে উঠলেন।অভ্যাসবশত মাথাটার টুপিতে হাত ছুঁইয়ে দেখলেন ঠিক আছে কি না!কি সর্বনেশে কথাবার্তা!তিনি গলার স্বর উঁচিয়ে বললেন,

 

‘কি খেলবো?’

 

‘লুডু!আপনাদের গন্তব্য খুলনা।আমাদেরও।খুলনা পৌঁছাতে এখনো অনেক সময় লাগবে।চলুন,সময় কাটা্নোর জন্য কয়েক দান লুডু খেলি!’

 

‘আপনি চলন্ত ট্রেনে লুডু কোথায় পেলেন?’

 

লুৎফর রহমান চায়ের কাপে পর পর কয়েক চুমুক দিলেন।মুখ দিয়ে সুখানুভূতির শব্দ করে বললেন,

 

‘আমার মেয়ে অহির কাজ!যেকোনো জার্নিতে সে লুডু নিয়ে যাবে এবং বাপ মেয়ে সমস্ত পথে কয়েক দফা লুডু খেলা তার অভ্যাস।তা খেলবেন ভাই সাহেব?’

 

উসমান আলী উত্তর দিলেন না।তার গা ম্যাজ ম্যাজ করছে।পাশের এই বুড়োটাকে অসহ্য লাগছে।একে অবশ্য বুড়ো বলা চলে না।কারণ সে নিজেও বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন!ফুটো বেলুনের মতো একের পর এক বছরগুলো চুপসে যাচ্ছে।পাশের ভদ্রলোককে বুড়ো বলার জন্য তিনি মনে মনেই তওবা কাটলেন।

 

৩.

 

রোদ্দুর গভীর আগ্রহ নিয়ে ধারালো কিছু খুঁজছে।এই মুহূর্তে ছুরি টাইপের ধারালো কিছু তার খুবই প্রয়োজন।তবে মানুষ খুন বা কাউকে আঘাত করার জন্য নয়!নিজেকে আঘাত করার জন্য।ডক্টর অজান্তা অহি তাকে একদমই পাত্তা দিচ্ছে না।তার থেকে পাত্তা আদায় করার জন্য এই মুহূর্তে তার নিজেকে একটু রক্তাক্ত করা প্রয়োজন।

 

নিজের ব্যাগটা সে উল্টে পাল্টে ফেললো।ধারালো কিছু চোখে পড়লো না।ভীষণ মর্মাহত হলো সে।কিছুক্ষণ ইতি উতি করতে ব্যাগের ছোট্ট চেইনে থাকা রেজারের দিকে তার নজর পড়লো।খুশিমনে সেটা হাতে নিয়ে ডান হাতের শাহাদাত আঙুলের ডগার কাছে নিল।সঙ্গে সঙ্গে তার বুকের ভেতর ছ্যাৎ করে উঠলো।এভাবে ভালো ত্বক কেটে ফেলবে?সে তো ব্যথা একদম সহ্য করতে পারে না।কি মুশকিল!

 

কিন্তু অহির পাত্তা তার চাই-ই চাই!চোখ বন্ধ করে সে আঙুলের ডগায় একটা টান দিল।অতঃপর রেজারটা ঢিল দিয়ে ফেলে রেখে অহির কেবিনের দিকে ছুট লাগাল।

 

কেবিনের দরজা টেনে চিড়বিড় করে বলল, 

 

‘অজান্তা, আমার হাত উড়ে গেছে।কব্জি থেকে খসে পড়েছে।মরে গেলাম!’

 

(চলবে……’

 

গল্পটি কিছুটা সামাজিক এবং রোমান্টিক ক্যাটাগরির হবে।বেশকিছু পর্ব ট্রেনে ঘটবে।আবার চলন্ত ট্রেনে শুরু হয়ে চলন্ত ট্রেনেই শেষ হতে পারে।পাশে থাকার জন্য ধন্যবাদ সবাইকে।🤎

 

#গল্পের_নাম:|| হ য ব র ল ||

#লেখনীতে: অজান্তা অহি (ছদ্মনাম) 

#পর্ব______০৩

 

‘অজান্তা,আমার হাত উড়ে গেছে।কব্জি থেকে খসে পড়েছে।মরে গেলাম!’

 

অহি সবেমাত্র বোতল খুলে পানি মুখে দিয়েছিল।রোদ্দুরের এমন চিৎকারে তার কাশি উঠে গেল।পানি ছড়িয়ে ছিটিয়ে যা তা অবস্থা!মুখে হাত রেখে কাশি দিতে রোদ্দুর তড়িঘড়ি করে এগিয়ে গেল।চিন্তিত কন্ঠে বলল, 

 

‘অজান্তা,ঠিক আছো তুমি?শ্বাস নাও!লম্বা করে শ্বাস নাও।’

 

রোদ্দুর ভয়ে ভয়ে বাম হাতটা অহির মাথার উপর রাখলো।সঙ্গে সঙ্গে অহি হাত সরিয়ে দিল।নিজেকে ধাতস্থ করে বোতলের ছিপি খুঁজলো।আশপাশে চোখে পড়লো না।হয়তো ছিটকে কোথাও পড়েছে!সে বোতলটা কাত করে রেখে বিরক্ত গলায় বলল,

 

‘এমন তর্জন গর্জনের মানে কি?’

 

রোদ্দুরের মনে পড়লো হঠাৎ!সে সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে বলল,

 

‘ডক্টর, আমার ডান হাতের আঙুল কেটে গেছে।রক্তে পুরো পৃথিবী ভেসে গেল।প্লিজ, কিছু একটা করুন!’

 

অহির কপাল কুঁচকে গেল।রোদ্দুর ডান হাত বাড়িয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে।তার দু চোখ বন্ধ।মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট!অহি মুখ থেকে চোখ সরিয়ে হাতের দিকে তাকালো।সবগুলো আঙুল অক্ষত মনে হচ্ছে।রক্ত তো দূরের কথা,কাঁটা ছেঁড়ার চিহ্ন পর্যন্ত চোখে পড়ছো না।সে আরেক নজর গভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল, 

 

‘আপনার রক্তে পুরো পৃথিবী ভেসে যাচ্ছে, অথচ আমি ভাসছি না কেন?এক ফোঁটা রক্ত তো চোখে পড়ছে না।’

 

‘সে কি!প্রচন্ড জ্বালাপোড়া করছে।শাহাদাত আঙুলের অস্তিত্ব টের পাচ্ছি না।ওটা কি ছিঁড়ে পড়ে গেছে অজান্তা?’

 

‘জ্বি না!আঙুল আঙুলের জায়গাতেই আছে।আপনি এবার আসতে পারুন।’

 

রোদ্দুর আশাহত গলায় চোখ খুলল।সন্দেহ নিয়ে আঙুল টা চোখের সামনে নিল।সত্যি তো!ব্লাড বের হচ্ছে না।একটুখানি কেটে সাদা ত্বক বের হয়েছে শুধু।রক্তনালি পর্যন্ত পৌঁছায়নি।সে মনে মনে নিজেকে জঘন্য একটা খালি দিল।সত্যিই বেকুব সে।সামান্য হাত ঠিক মতো কাঁটতে পারলো না!সে বিড়বিড় করে বলল, 

 

‘ছি!রোদ্দুর হিম,শেইম অন ইউ!’

 

অহির অগোচরে সে চোখ বন্ধ করে হাতের আঙুলে দিল চাপ!সে এখন টিপে রক্ত বের করবে!একটুপর হাতটা পরখ করে রক্তের অস্তিত্ব দেখেই ধপ করে অহির পাশে বসে পড়লো।হাতটা অহির দিকে দিয়ে বলল,

 

‘অজান্তা,এই দেখো কতখানি কেটে গেছে।তুমি এত নিষ্ঠুর কেন?এই ক্ষতটুকু সারতে কম সে কম এক বছর সময় লাগবে।এই এক বছর আমার আঙুলের দায়িত্ব কে নিবে?তুমি!তুমিই এর চিকিৎসা করবে!’

 

‘আপনি আমাকে তুমি তুমি করে কেন বলছেন মি. রোদ্দুর হিম?’

 

রোদ্দুর কোনো কথা খুঁজে পেল না।অহি দরজার দিকে তাকালো।দরজা খোলা!রুমের এসি বন্ধ।মোখলেসুর রহমান নামের সেই এটেনডেন্টটা ১৩ নাম্বার কেবিনের এসি বন্ধ করতে গিয়ে সমস্ত ট্রেনের স্পেশাল কেবিন গুলোর এসি বন্ধ করে দিয়েছে।এতক্ষণ শীতের জন্য কেবিনে থাকা যাচ্ছিল না।যার দারুন শীত নিবারণের জন্য সে এতক্ষণ এপ্রোন পড়ে ছিল।এখন আবার গরমে থাকা যাচ্ছে না।এপ্রোনটা গায়ে থেকে খুলতে নিতে রোদ্দুরকে দেখে থেমে গেল অহি।

 

এক পলক তার দিকে চেয়ে বলল, 

 

‘বেরিয়ে যান রুম থেকে!’

 

রোদ্দুরের গলা খুশখুশ করছে।অহিকে ইমপ্রেস করার জন্য যত ধরনের কথা সাজিয়ে রেখেছিল সব ভোলাটাইলের মতো নিঃশেষ হয়ে গেছে।সে আর কথা খুঁজে পাচ্ছে না।তাছাড়া মেয়েটার থেকে এতটা দূরত্ব বজায় রাখার পরো বুকের ভেতর ঝড় উঠে গেছে।সে লম্বা করে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,

 

‘অজান্তা,তোমায় তুমি করে বলাতে রেগে গেছ?’

 

‘এটা কি রাগার জন্য যথেষ্ট নয়?’

 

‘অবশ্যই যথেষ্ট।অতিরিক্ত তুচ্ছ কারণে তোমার রেগে যাওয়ার অধিকার আছে।কিন্তু একটু শোনো!তোমায় ‘মাই ডেয়ার’ টাইপ ভাবি।সেজন্য তুমি করে বললাম।তুমিও আমায় তুমি করে বলতে পারো!এই তোমার সাদা এপ্রোন ছুঁয়ে বলছি, আমি রাগ করবো না।’

 

রোদ্দুর হাত বাড়ানোর আগেই অহি উঠে দাঁড়ালো।সরে গিয়ে দরজা দিয়ে বাইরে উঁকি দিল।বাবা আসছে না কেন?বাবা আসলে এই আপদটা বিদেয় হয়!

 

রোদ্দুর কাঁটা আঙুলের দিকে তাকালো।আঙুলটার জন্য তার ভীষণ মায়া হচ্ছে।এত ত্যাগ স্বীকার করার পরো পাত্তা পেল না।আহারে!

 

‘আঙুল কেটেছে কিভাবে?’

 

আচমকা অহির প্রশ্নে ঘাবড়ে গেল রোদ্দুর।অহির দৃষ্টি কেবিনের বাইরের করিডোরে।রোদ্দুর আগ্রহ নিয়ে অহির দিকে চেয়ে বলল, 

 

‘রেজারে কেটে গেছে।ইনফেকশন হতে পারে।কিছু একটা দাও না!’

 

‘আঙুলে কি দাঁড়ি গজিয়েছিল?রেজারে কাটবে কিভাবে?’

 

রোদ্দুর উত্তর দিতে পারলো না।কি মুশকিল!মেয়েটা তো তার থেকে এক ধাপ উপরে।কি করে একের পর এক কথার প্যাঁচে ফেলাচ্ছে!

 

অহি দরজা থেকে সরে এসে নিজের ব্যাগ খুলল।তুলোতে একটু এন্টিসেপ্টিক লাগিয়ে সামনে রাখলো।একটা ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ বের করে রোদ্দুরের দিকে বাড়িয়ে দিল। এক পলক তাকিয়ে অন্য দিকে চোখ সরিয়ে নিল।হতাশ সুরে বলল, 

 

‘তুলো দিয়ে পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে নিন।’

 

রোদ্দুরের বুক জমিনে সুখপাখিরা নৃত্য শুরু করলো।আহা কি সুখ!সে অহির দিকে তাকিয়ে লাজুক হাসলো।কম্পমান হাতটা বাড়িয়ে ব্যান্ডেজ হাতে নিল।তুলো হাতে নিয়ে বলল,

 

‘এভাবে চিকিৎসা করো অজান্তা?পেশেন্টের প্রতি এত অবহেলা?তোমায় সার্টিফিকেট কে দিয়েছে?তুমি তো পেশেন্টকে সুস্থ করার বদলে মেরে ফেলবে।তুমি নিজ হাতে একটু ব্যান্ডেজ করে দাও!’

 

‘আপনার ক্ষত এতটা গভীর নয় যে আইসিইউ তে ভর্তি করতে হবে।নিজ হাতে সেবা করতে হবে।’

 

রোদ্দুর মনে মনে বলল, 

 

‘উপরের ক্ষতটা দেখছো,ভেতরের ক্ষতটা কেন দেখছো না অজান্তা?কি দুঃখ!’

 

বাম হাত দিয়ে কাঁটা জায়গায় তুলো চেপে বলল,

 

‘অজান্তা,তোমার ব্যাপারে আমি ডিটেইলসে একটু স্টাডি করতে চাই।একটু সাহায্য করবে?’

 

‘জ্বি না!’

 

কাঠ কাঠ গলায় উত্তর দিল অহি।উত্তর দিয়ে দেরি করলো না।সে কেবিনের বাইরে চলে গেল।রোদ্দুর ঝটপট ব্যান্ডেজ লাগিয়ে পিছু নিল।কাছাকাছি গিয়ে বলল,

 

‘কোথায় যাচ্ছো অজান্তা?’

 

অহি বিরক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো।হাত উঠিয়ে বলল,

 

‘কানের কাছে অজান্তা অজান্তা বলে ঘ্যানর ঘ্যানর করবেন না তো!বিরক্ত লাগে।আমার নাম কি আমি জানি!ওয়েট,আপনি আবার পিছু নিচ্ছেন কেন আমার?পুরো কেবিন ছেড়ে দিয়ে আসলাম তাতে হচ্ছে না?’

 

‘ডক্টর আমার আঙুলের ভেতর ব্যথা করছে।’

 

‘করুক!প্রয়োজনে ঠাডা পড়ুক!আমাকে আর জ্বালাবেন না।আমি এখন লিরা আপুর কেবিনে ঢুকবো।’

 

রোদ্দুর সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল,

 

‘লিরা আপু নয় অজান্তা!লিরা ভাবী বলে ডাকবে।’

 

অহির ভ্রু যুগল কুঁচকে গেল।কিছুক্ষণ মৌন থেকে গটগট করে এগিয়ে গেল।

 

রোদ্দুর সিদ্ধান্ত হীনতায় ভুগছে।অহির পিছু পিছু যাবে নাকি অন্য কিছু করবে?এই মেয়ে কি কোনোদিন একটু মিষ্টি করে কথা বলবে না?কিছুক্ষণ ভেবে চিন্তে সে লিরা ভাবীর কেবিনের দিকে পা বাড়াল।কয়েক পা এগুতেই পেছন থেকে পুরুষালী একটা কন্ঠ কানে আসলো।

 

‘হেই ইয়াং পুরুষ!’

 

রোদ্দুর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।ঘুরে দাঁড়িয়ে মুখে হাসি ফুটাল।লুৎফর রহমান চায়ের কাপ হাতে সাগ্রহে এগিয়ে আসছে।তার মুখটা হাসি হাসি।ছোট বাচ্চাদের পছন্দের খেলনা দিলে যতটা খুশি হয়,ততটা খুশি মনে হচ্ছে।এই মানুষটাকে সে চেষ্টা করছে এভয়েড করে চলার।কিন্তু হিতে বিপরীত হচ্ছে।যেখানেই যাচ্ছে, এর সাথে দেখা হচ্ছে।

 

লোকটা প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত কথা বলে।একটা অতিরিক্ত মেনে নেয়া যায়,অতিরিক্ত স্কয়ার মেনে নেয় যায়, কিন্তু অতিরিক্ত কিউব কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না।হবু শ্বশুর মশাই বলে সে মেনে নিচ্ছে।

 

‘ইয়াং পুরুষ, কোথায় যাচ্ছো?’

 

লুৎফর রহমান কাছে এগিয়ে এসেছেন।রোদ্দুর মুখে জোরপূর্বক হাসি টেনে বলল,

 

‘কোথাও না আঙ্কেল।এমনিতে করিডোরে হাঁটাহাঁটি করছি।’

 

‘এমনিতে তো কোনো কিছু ঘটে না পৃথিবীতে।এমনি বলতে কোনো ওয়ার্ড বিজ্ঞানের ভাষায় খুঁজে পাবে না তুমি।নিউটনের ক্লাসিক্যাল মেকানিক্স বলে কার্যকারণ ছাড়া পৃথিবীতে কিছু ঘটে না অর্থাৎ তুমি যে করিডোর ধরে হাঁটাহাঁটি করছো তারও উপযুক্ত কারণ আছে। এই যে আমি চা খাচ্ছি তারও কারণ আছে।’

 

‘জ্বি,ঠিক বলেছেন।’

 

লুৎফর রহমান এক চুমুক চা মুখে দিয়ে মাংস কামড়ানোর মতো কামড়ে কামড়ে খেলেন।তারপর বললেন,

 

‘এসো কেবিনে বসি।অহি নেই ভেতরে!’

 

নিতান্ত অনিচ্ছায় রোদ্দুর লুৎফর রহমানের পিছু পিছু কেবিনে ঢুকল।গিয়ে অহি যে জায়হাটাতে বসেছিল সেখানে বসলো।লুৎফর রহমান ব্যাগ থেকে সিগারেট বের করে ধরালেন।এক টান দিয়ে বললেন,

 

‘এতক্ষণ এসি থাকার কারণে সিগারেট ধরাতে পারছিলাম না।এসি বন্ধ হয়ে গিয়ে ভালোই হয়েছে।কি বলো?’

 

‘জ্বি, ভালো হয়েছে।’

 

‘তুমি একটা সিগারেট খাবে?’

 

‘না!’

 

‘আমার সাথে ফর্মালিটিজের দরকার নেই ইয়াং পুরুষ।নো নিড!এখন আমরা লুডু খেলবো।’

 

রোদ্দুর হকচকিয়ে গেল।সাথে নিশ্চিত হলো যে মানুষটার মাথায় গোলমাল আছে।সে টেনশন বোধ করছে।লুৎফর রহমান লুডু বের করেছে।সে আয়েশ নিয়ে তার গুটির কালার এক করছে।সবগুলো গুটি নিয়ে তিনি রোদ্দুরের পাশে বসে পড়লেন।রোদ্দুর ঘুরে বসলো।

 

লুৎফর রহমান সিগারেটে একটা টান দিয়ে চাল দিলেন।প্রথমবার ছক্কা উঠলো না।তিন উঠলো।তিনি সোৎসাহে বললেন,

 

‘আমি দীর্ঘ দিন ধরে গবেষণা করে একটা জিনিস বের করেছি ইয়াং পুরুষ!সেটা হলো লুডু খেলা শুরু করলেই পর পর তিন দান তিন উঠবে আমার।চতুর্থ বারে গিয়ে ছক্কা বা অন্য কিছু উঠবে।তুমি আমার কথা মিলিয়ে নিয়ো।’

 

রোদ্দুর মাথা নাড়লো এবং কিছুক্ষণ পর অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো যে লুৎফর রহমানের পর পর তিনবার তিন উঠেছে!এটাকে নিছক কাকতালীয় বলে সে এড়িয়ে গেল।একটুপর উসখুস করে জিগ্যেস করলো,

 

‘আঙ্কেল খুলনা কার বাসায় যাচ্ছেন আপনারা?’

 

লুৎফর রহমান নিজের গুটি চালিয়ে বললেন,

 

‘আমার নিজের বাসায়।অহি কলেজ লাইফ থেকে ঢাকাতে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে।মেডিকেলে পড়েছে।কয়েক মাস হলো ইন্টার্ণি শেষ করেছে।আমি কলেজ টিচার ছিলাম।সাত বছর হলো রিটায়ার করেছি।আর কোনো ছেলেপুলে নেই।যক্ষের ধন এই একটা মেয়ে।ওকে নিতে ঢাকা এসেছিলাম।তা তোমরা খুলনা কোথায় যাচ্ছো?’

 

‘অামরা ঢাকাতে স্থানীয়।বড় ভাবীর বাবার বাড়ি খুলনা।সেখানে যাচ্ছিলাম।আসলে বড় ভাবীর দাদী হঠাৎ করে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছে।তাকে দেখতে যাচ্ছিলাম।আমরা দুই ভাই শুধু।বড় ভাই আর বাবা বিজনেসের দেখাশোনা করে।আমি দুই বছর হলো ইন্জিনিয়ারিং এ পড়াশোনা শেষ করেছি।এখন ফুড ব্লগিং নিয়ে কাজ করছি।আমার বাবার রেস্টুরেন্টের বিজনেস!’

 

ফুড ব্লগিংয়ের ব্যাপারটা রোদ্দুর মিথ্যে করে বলল।আজকাল বেকার মানুষ কেউ পছন্দ করে না।শুরুতেই সে বেকার বললে তার সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ করবে ইনি!রোদ্দুর আরো কিছু বলতে চাইলো।কিন্তু বুঝতে পারলো লুৎফর রহমানের আগ্রহ নেই।তাই সে থেমে গেল।সে চুপ করতে লুৎফর রহমান মুখ খুললেন।রোদ্দুরের পাকা গুটি শেষ মুহূর্তে খেয়ে দিয়ে প্রসন্ন হেসে বললেন,

 

‘ট্রেনে একটা সমস্যা হয়েছে বুঝলে?’

 

‘কি সমস্যা?’

 

‘এই ট্রেনে একজন সেলিব্রিটি মানুষ যাচ্ছে।ইয়াং জেনারেশনের মধ্যে যাকে নিয়ে সবসময় তুমুল হইচই আর বাড়াবাড়ি রকমের আদিখ্যেতা হয়।’

 

‘কার কথা বলছেন আঙ্কেল?’

 

‘আরে চিত্র নায়িকা পলি মজুমদার!’

 

রোদ্দুর চমকে উঠলো।পলি মজুমদার উঠতি একজন নায়িকা।গ্ল্যামার দুনিয়ায় তার নাম ডাক প্রচুর।তার একটা ছবির বাজেট শুনে যে কেউ হিমশিম খাবে।এই কিছুদিন আগে মুক্তি পাওয়া তার নয় নাম্বার ছবিটি রাতারাতি ফেমাস হয়ে গেছে।সে কিছু বলার আগেই লুৎফর রহমান বললেন,

 

‘তাদের একটা ছবির কিছু অংশ ট্রেনঘটিত। রাতের বেলা শুটিংয়ের জন্য এই ট্রেনে যাচ্ছে।এখনো শ্যুট করেনি।করবে!কিন্তু একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে।এসি বগির প্রতিটি কেবিনের এসি বন্ধ হয়ে গেছে।গরমে নায়িকার অবস্থা নাজেহাল।শুরু করেছে চিল্লাফাল্লা।প্রযোজক,ক্যামেরাম্যান,স্টাফ সবার অবস্থা খারাপ!’

 

রোদ্দুর খেলায় আর আগ্রহ পাচ্ছে না।অহির খোঁজ নিতে হবে।শ্যুটিংয়ের কিছু দৃশ্য দেখতে মন চাচ্ছে।সে এলোমেলো ভাবে খেলে গেল।কিছুক্ষণের মধ্যে জয় হলো লুৎফর রহমানের!লুৎফর রহমান মন খুলে হাসছে।রোদ্দুরের মুখেও হাসি ফুটে উঠলো।মানুষটার হাসি দেখতে তার ভালো লাগছে!

 

৪.

 

অহি এটেনডেন্টকে বলে সিট চেঞ্জ করেছে।চেঞ্জ করেছে বলতে নন এসি বগিতে পাশাপাশি দুটো সিট খালি ছিল।সেটাতে গিয়ে বসেছে।কেবিনে থাকা যাচ্ছে না।একটুপর পর রোদ্দুর নামক ছেলেটা বিনা বাধায় কেবিনে যাতায়াত করছে।তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে!ইতোমধ্যে তার বাবার সাথে ভাব জমিয়ে ফেলেছে।

 

জানালা ঘেঁষে বসে অহি হাঁফ ছাড়লো।বাইরে সন্ধ্যা নেমে গেছে অনেক ক্ষণ হলো।তবে অন্ধকার পুরোপুরি গ্রাস করেনি।সে জানালার কার্নিশে মাথা রাখলো।হিম শীতল বাতাস এসে ভেতরটা নাড়িয়ে দিচ্ছে।তার ভালো লাগছে!প্রচুর ভালো লাগছে।

 

ধপ করে পাশের খালি সিটে কারো বসার আওয়াজ হলো।অহি বিরক্তি নিয়ে তাকাতে চমকে গেল।রোদ্দুর এসে বসেছে।তাকে এত ভীড়ের মধ্যে খুঁজে বের করলো কি করে?তাকে আরেক দফা অবাক করে ঝরণার মতো বিরামহীন ধারায় বলল,

 

‘অজান্তা,আমি তো সেলিব্রিটি হয়ে যাব।ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছি।আমায় এখন টিভিতে দেখাবে।’

 

‘মানে?’

 

‘আজ রাত ন’টায় সামনের স্টেশনে ট্রেন থামবে।সেখানে ছবির শ্যুটিং হবে।নায়িকা হলো পলি মজুমদার।সেখানে একটা অংশে আমি অভিনয় করবো।ডিরেক্টর আমার আগ্রহ দেখে খুশি হয়েছেন।প্রথমে তিনি আমাকে ছোট্ট একটা রোল দিয়েছিল।নায়িকার পাশ দিয়ে হেঁটে যা-ওয়া।এখন একটা বড় রোল পেয়েছি।স্টেশনে নায়িকা সানগ্লাস চোখে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে।তার পাশের ট্রলিটা নিয়ে আমি দৌঁড় শুরু করবো।নায়িকা পেছন পেছন দৌঁড়াবে।হঠাৎ করে আমি ফ্লোরে পড়ে যাব।এর মধ্যে নায়িকা আমাকে ধরে ফেলবে এবং চুরি করার অপরাধে একটা থাপ্পড় দিবে।’

 

‘আপনি সত্যি সত্যি চোরের ভূমিকায় অভিনয় করবেন এবং থাপ্পড় খাবেন?

 

(চলবে)

 

#গল্পের_নাম:|| হ-য-ব-র-ল ||

#লেখনীতে:অজান্তা অহি (ছদ্মনাম) 

#পর্ব______ (০৪+০৫)

 

‘রোদ্দুর হিম,আপনি কি সত্যি সত্যি চোরের ভূমিকায় অভিনয় করবেন এবং থাপ্পড় খাবেন?’

 

রোদ্দুর প্রফুল্ল চিত্তে বলল,

 

‘ক্ষতি কি!আগেই লাফ দিয়ে তো নারকেল গাছে উঠা যায় না!আগে কচু গাছে উঠতে হয়,ডালিম গাছে উঠতে হয়,আম গাছে উঠতে হয়।তারপর নারকেল গাছ!কি বলো?’

 

‘কিছু বলি না।গেট আউট!এক্ষুণি আমার সিট ছাড়ুন!’

 

‘এমন করছো কেন অজান্তা?’

 

অহি জোড় গলায় বলল,

 

‘আমি আপনার মুখ দেখতে চাই না!’

 

‘এত হ্যান্ডসাম একটা মুখ তুমি দেখতে চাও না অজান্তা?কি দুঃখ!আমি এক্ষুণি এসিড ঢেলে মুখ পুড়িয়ে ফেলবো।তোমার কাছে এসিড হবে?’

 

অহি হতাশ!হতাশের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে সে।এই ছেলের পিছু ছাড়াতে চাইলে টোটালি ইগনোর করতে হবে।সে আর কথা বাড়াল না।চুপ করে সিটে মাথা এলিয়ে চোখ বন্ধ করলো।

 

অহির এমন চুপ হয়ে যাওয়াতে রোদ্দুর চমকিত হলো।সে বেশ আয়েস নিয়ে অহির দিকে ঘুরে বসলো।গালে হাত রেখে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অহির মুখের দিকে চেয়ে রইলো।

 

কিছুক্ষণ পর অহি বিরক্তি নিয়ে এক চোখ খুললো।উদ্দেশ্য রোদ্দুরের কর্মকান্ড পরখ করা!চোখ খুলতে বুকের ভেতর ধ্বক করে উঠলো।রোদ্দুর অনেকটা কাছে চলে এসেছে তার!রোদ্দুরকে এভাবে ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে অস্বস্তিতে ভরে গেল!হিমশিম খেয়ে দু চোখ খুললো সে।রোদ্দুরের চোখ দুটোর সাথে চোখ পড়তে তার ভেতরে কেমন একটা অজানা স্রোত বয়ে গেল।ভেতরে কিছু একটার পরিবর্তন হলো।সেই কিছু একটা যে কি তা বোঝার আগেই রোদ্দুরের কাঁধে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।তোতলানো স্বরে বলল, 

 

‘ক-কি করছেন?’

 

রোদ্দুর যেন নিজের মাঝে ফিরলো।আড়মোড়া ভেঙে একটা লম্বা হাই তুলল।হেলাফেলা স্বরে বলল, 

 

‘কিছু করছিলাম নাকি?’

 

অহি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল।এলোমেলো দৃষ্টিটা রোদ্দুরের উপর থেকে সরিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে নিক্ষেপ করলো।মুখটা জানালার কার্নিশে রাখতেই মুখে অযাচিত হাসির বন্যা বয়ে গেল।তার হার্টবিট বেড়ে গেছে।বুকের দুই ইঞ্চি নিচে থাকা মন নামক বস্তুটার নড়নচড়ন টের পাচ্ছে।অবাক হয়ে লক্ষ্য করছে যে, রোদ্দুর হিম নামক এই ঝামেলাটাকে তার ভালো লাগছে,তার পাগলামি ভালো লাগছে,খাপ ছাড়া কথা ভালো লাগছে,সব ভালো লাগছে।তার দীর্ঘ ২৬ বছরের জীবনে কোনো ছেলেঘটিত বিষয় ঘটেনি।ছোটবেলা থেকে ভীষণ পড়াকু মেয়ে বলে ছেলেরা একটু দূরে দূরেই থাকতো।এই প্রথম একটা ছেলে তাকে এতভাবে ডিস্টার্ব করছে।তার মনে হলো,এরকম নিশুতি রাতে,কারো কাঁধে মাথা চেপে,কারো আঙুলের ভাঁজে আঙুল রেখে ট্রেন জার্নি করার জন্য হলেও একটা নিজের মানুষ চাই!খুব আপন মানুষ চাই।হৃদয়ের খুব কাছে যার বসবাস হবে!

 

পাশের সিট থেকে কোনো আওয়াজ আসছে না।রোদ্দুর কথা বলছে না কেন?অহি আস্তে করে মাথা তুলে আড়চোখে একবার তাকাল।দেখলো রোদ্দুর ঘুমিয়ে পড়েছে। 

 

ওড়নাটা ঠিক মতো গলায় জড়িয়ে অহি সোজা হলো।এতটা সময় ধরে উপরে অনেক স্ট্রং থাকলেও ভেতরে ভেতরে লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল সে।ঠিকমতো রোদ্দুরের দিকে লজ্জায় তাকাতে পারেনি!

 

সে সিটে মাথা রেখে রোদ্দুরের ঘুমন্ত মুখের দিকে অপলক চেয়ে রইলো।ছেলেটা ঠিকই বলেছে।এমন হ্যান্ডসাম মুখের দিকে কেউ তাকিয়ে না থেকে পারবে না!

 

ফর্সা ত্বক, কুঞ্চিত ভ্রু যুগল,খাড়া নাক,পাতলা ঠোঁট,খোঁচা খোঁচা দাড়ি,গালের একপাশে টোল খাওয়া অনিন্দ্য সুন্দর মুখোশ্রী!মাথার চুলগুলো এলোমেলো বাতাসে অগোছালো হয়ে আছে।পরণে মেরুন রঙের শার্টের উপর কালো ব্লেজার দেখা যাচ্ছে!অহির হার্টবিট দ্বিগুণ বেড়ে গেল।না চাইতেই মন দরজায় ইচ্ছেরা কড়া নাড়লো।একবার রোদ্দুরের চুলগুলো ছুঁয়ে দেয়ার ইচ্ছে, তো একবার গালে হাত ছোঁয়ার ইচ্ছে!ইচ্ছেদের পাত্তা দিল না সে।দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।

 

ঠোঁট কামড়ে সে হাসি থামানোর চেষ্টা করছে।মনের ভেতর নতুন অনুভূতির জোয়ার।সে জোয়ারে পাল তোলা নৌকার মতো ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে সূদূরে।রোদ্দুর হিমের গন্তব্যে!

 

অহি আবার মুখ ঘুরিয়ে রোদ্দুরের দিকে তাকালো।কি অদ্ভুত মানুষের অনুভূতি।মাত্র চার-পাঁচ ঘন্টার মতো ছেলেটার সাথে তার পরিচয়।তার পাগলাটে আচরণের সাথে পরিচয়! অথচ এই মুহূর্তে তাকে সবচেয়ে আপন মনে হচ্ছে। সবচেয়ে কাছের মনে হচ্ছে।মনে হচ্ছে এর বসবাস হৃদয়ের খুব কাছে!এই যে মানুষটা তার পাশে বসে গভীর ঘুমে,এই ঘুমকেও তার হিংসে হচ্ছে।

 

মেডিকেলের দ্বিপক স্যার একবার সাইকোলজি নিয়ে কথা বলেছিল।কথা বলেছিল মানব মন নিয়ে।বলেছিল, মানব মন বড় অদ্ভুত!এর উপর ফিজিক্সের সূত্র খাটে না!খাটে না মডার্ণ সাইন্স বা ওল্ড সাইন্স।এর সমীকরণ গুলো বড় বিচিত্র।যা যন্ত্রপাতিতে ধরা ছোঁয়ার বাইরে।একটু খেয়াল করলেই বুঝতে পারবে,তোমার পায়ে পা ফেলে দীর্ঘ একটা পথ পাড়ি দেয়া মানুষটার প্রতি তোমার আলাদা কোনো অনুভূতি জন্মাবে না।বছরের পর বছর একত্রে চলাফেরা করেও তার মায়ায় জড়াবে না।আবার হুট করে মাত্র কয়েক সেকেন্ড বা কয়েক মিনিটের ব্যবধানে একটা মানুষের প্রতি অদ্ভুত ফিলিংস জন্মাবে।তাকে বড্ড কাছের মনে হবে,আপন মনে হবে!তাকে নিয়ে ভাবনা সাজাতে ভালো লাগবে।এসব ব্যাপার সাইন্সের সূত্র দিয়ে বোঝানো মুশকিল!

 

অহি বড় করে দম নিল।সে কি সত্যি সত্যি অনুভূতির জালে ফেঁসে গেল?হয়তো!এত সুখ সুখ কেন অনুভূতি হচ্ছে?সে ঠোঁটের কোণে অথই হাসি নিয়ে রোদ্দুরের কাছাকাছি এগিয়ে এলো।

 

ট্রেনের আশপাশের যাত্রীদের দিকে এক পলক চেয়ে সে ডান হাতটা উঁচু করলো।খুব সাবধানে সে হাতটা রোদ্দুরের মাথার চুলে রাখলো।তার চোখে মুখে ভয়ের ছাপ ফুটে উঠলো।যদি রোদ্দুর জেগে যায়?কি উত্তর দিবে?

 

তার ভাবনার মাঝে সমস্ত বগির কারেন্ট বন্ধ হয়ে গেল।হয়তো সম্পূর্ণ ট্রেনেই!চারিদিক থেকে তুমুল হইচই এ কান ঝালাপালা অবস্থা।সে তুমুল হল্লা রোদ্দুরের কানে যেতে সে অস্ফুট একটা শব্দ করলো।এক ঝটকায় অহিকে জড়িয়ে ধরে কম্পমান কন্ঠে বলল, 

 

‘অজান্তা,কি হয়েছে?ক-কি হয়েছে?ডা-ডাকাত পড়েছে নিশ্চয়ই!’

 

রোদ্দুরের শরীর থরথর করে কাঁপছে।ভয়ে নাকি অন্য অনুভূতিতে তা অহি বুঝতে পারছে না।সে স্পষ্ট সুর তুলে বলল, 

 

‘আপনি কি ভয় পাচ্ছেন?’

 

রোদ্দুর উত্তর দিল না।তবে তার হাত দুটো আরো শক্ত হয়ে আসলো।অহির চোখ দুটো অন্ধকারে বড় বড় হয়ে গেল।জীবনে প্রথম কোনো পুরুষের এতটা কাছাকাছি এসে দমবন্ধ অবস্থা।সব কথার খেই হারিয়ে ফেললো যেন।এলোমেলো সুরে কোনো রকমে বলল,

 

‘ছাড়ুন!দূরে যান।প্লিজ!’

 

রোদ্দুর ছাড়লো না।আরো গভীর ভাবে জড়িয়ে নিল।দেড়-দুই মিনিটের মাথায় সমস্ত বগি আলোকিত করে লাইট জ্বলে উঠলো।রোদ্দুর ঝট করে অহিকে ছেড়ে আশপাশে নজর বুলাল।অহি ঝিম মেরে বসে আছে।আস্তে আস্তে নিজেকে গুটিয়ে নিল।

 

রোদ্দুর বুকে হাত চেপে বিড়বিড় করে কিছু একটা বললো।তারপর টেনে টেনে বলল, 

 

‘অজান্তা,আর ভয় নেই!কারেন্ট চলে এসেছে।ভয় পেও না।’

 

অহি চমকে রোদ্দুরের মুখপানে তাকাল।সে ভয় পেয়েছিল নাকি?কই!নাতো!ভয় যা পেয়েছিল সেটা তো রোদ্দুরের আচমকা স্পর্শে।সে গম্ভীর কন্ঠে বলল, 

 

‘আপনার কি মনে হয় অন্ধকার আমি ভয় পাই?মৃত মানুষের হার্ট,ফুসফুস,কিডনি, হাড়গোড় আর কঙ্কাল নিয়ে রাতের পর রাত জেগে পড়েছি।কখনো কখনো ঘুম থেকে উঠে দেখেছি হাতে মৃত মানুষের চোখ!মর্গে মানুষ কেটেছি!এসব করার পরও আপনার মনে হয় আমি কারেন্ট চলে গেলে ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যাব?’

 

রোদ্দুর মিইয়ে গেল।অহিকে সে কি করে বলবে যে আচমকা হইচই এ সে নিজেই ভয় পেয়ে গেছিল।ভয় পেয়ে একমাত্র অবলম্বন অহিকে জড়িয়ে ধরেছিল!

 

সে হাঁসফাঁস করতে বাচ্চা একটা ছেলে এসে তাকে উদ্ধার করলো।পানির বোতল এগিয়ে দিয়ে বলল, 

 

‘পানি লাগবো আপনাগো?’

 

রোদ্দুর টাকা বের করে বাচ্চাটির হাতে গুঁজে দিল।বিনিময়ে একটা পানির বোতল নিল।বোতলের ছিপি খুলে অহির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, 

 

‘পানি খাও অজান্তা।’

 

অহি নির্দ্বিধায় পানির বোতল হাতে নিল।বোতল উঁচু করে কয়েক ঢোক পানি খেল।খোলা বোতলটা রোদ্দুরের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, 

 

‘আমার বাবা কোথায় জানেন?’

 

‘হুঁ জানি!আমার বাবার সাথে লুডু খেলছে।আঙ্কেলই তো বললো যে তুমি এখানে আছো এবং তোমাকে দেখেশুনে রাখতে বলেছে।’

 

শেষের কথাটি লজ্জা মিশ্রিত কন্ঠে বললো রোদ্দুর।বলেই সে এক চুমুকে সম্পূর্ণ বোতল খালি করে ফেলল।

 

মিষ্টি একটা মহিলা কন্ঠ বেজে উঠলো।মিহি সুরের ঝংকার তুলে কথা বলছে।কিছুক্ষণের মধ্যে ট্রেন স্টেশনে থামবে।কয়েক মিনিটের যাত্রা বিরতি!

 

রোদ্দুর অহির দিকে চেয়ে বলল, 

 

‘অজান্তা,আমায় উঠতে হবে।এই স্টেশনে শ্যুটিং হবে!তুমি কি যাবে আমার সাথে?’

 

‘না!’

 

‘ঠিক আছে।ইয়ে মানে তুমি না গেলেই আমার জন্য সুবিধা।আশপাশে তুমি থাকলে আমি লজ্জা পাব।’

 

‘আমাকে দেখে লজ্জা পাওয়ার কি আছে?’

 

রোদ্দুর তার উত্তর দিল না।উপদেশ দেয়ার ভঙ্গিতে বলল,

 

‘অজান্তা,জানালা দিয়ে প্রচুর বাতাস আসছে।জানালার সিট ছেড়ে এপাশে এসে বসো।আর এখানে ঘুমিয়ে পড়ো না।মা তোমায় দেখা করতে বলেছে।একটুপর কেবিনে যেও!আমি আসছি!আর এটা গায়ে দাও!’

 

অহিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে রোদ্দুর গায়ের ব্লেজারটা খুলে ফেলল।অহির পাশের সিটে রেখে হাত নেড়ে বগি থেকে বের হলো।

 

৫.

 

স্টেশনে ট্রেন থেমেছে।প্রচুর মানুষ ছোটাছুটি করছে।এসি বগির সামনে আরো বেশি ভিড়!চিত্র নায়িকা পলি মজুমদারকে পাবলিক প্লেসে দেখার লোভ সামলাতে পারছে না কেউ। সাথে ফ্রি তে শ্যুটিং দেখার পর্বটা কেউ মিস করতে চায় না।সেজন্য উপচে পড়া ভিড়!

 

স্টাফের লোকজন লাইট,ক্যামেরা,যন্ত্রপাতি ঠিকঠাক করছে।তাদের থেকে কয়েক হাত দূরে চেয়ারে বিরস মুখে বসে আছে ডিরেক্টর আলতাব মৃধা!চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ!ইনিও একজন নামকরা ডিরেক্টর।তার ছবি মানেই হিট!

 

সাদা পোশাকের এটেনডেন্ট মোখলেছুর রহমান এসে বিনিত কন্ঠে বলল, 

 

‘স্যার,চা বা কফি জাতীয় কিছু পান করবেন?’

 

আলতাব মৃধা বিরক্তি নিয়ে  বললেন, 

 

‘আপনাদের তো বললাম এনাউন্সমেন্ট করে দিন যে ট্রেনে কিছু টেকনিক্যাল ত্রুটি দেখা দিয়েছে।ঠিক করতে আধ ঘন্টা সময় লাগবে।এ সময়ে কেউ বাইরে বের হবেন না।কিন্তু আপনারা কি করলেন?এই ট্রেন থেকে সবাই এসে ভিড় জমাচ্ছে সাথে আশপাশের আত্মীয় স্বজনকে ফোন দিয়ে আসতে বলছে।কি বিদঘুটে পরিস্থিতি!’

 

মোখলেছুর রহমান বিনীত স্বরে মাফ চাইলেন।তারা তাদের চেষ্টার ত্রুটি করেননি।কিন্তু পাবলিক ঠিক টের পেয়ে গেছে।এরা বাঙালি জাত!ছুঁচো জাত!গন্ধ শুকে বলে দিতে পারে কোথায় কি ঘটছে।

 

মোখলেছুর রহমান বিদায় হতে আলতাব মৃধা উঠে দাঁড়ালেন।স্টাফকে ধমকে ধামকে কাজ তাড়াতাড়ি করতে বললেন।প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পলি মজুমদার এসে হাজির হলো।তার মেক-আপ কমপ্লিট!একজন স্টাফ এসে চেয়ার এগিয়ে দিল।নায়িকা চেয়ারে বসতে পাবলিক দের মধ্যে হুল্লোড় পড়ে গেল।সেই চেঁচামেচি ছাপিয়ে কেউ একজন বলল,

 

‘স্যার আমি হাজির!’

 

আলতাব মৃধা তাকিয়ে দেখলেন রোদ্দুর নামের সেই ছেলেটা।এত সুন্দর মুখোশ্রীর একটা ছেলে চোরের ভূমিকায় অভিনয় করবে বলে তিনি কিছুটা ব্যথিত হলেন।তার এই ছবির নায়কের চেয়ে এই ছেলের চেহারা সুরত সুন্দর।তিনি পকেট থেকে সিগারেট বের করে বললেন,

 

‘লাইটার হবে?’

 

‘স্যার আমি সিগারেট খাই না।তবে আপনি চাইলে লাইটার যোগাড় করে দিতে পারি!’

 

‘থাক,লাগবে না।রিহার্সেল করেছ তো?’

 

‘জ্বি স্যার!’

 

শ্যুটিং শুরু হয়ে গেছে।চারিদিকে পিনপতন নিরবতা।এর মধ্যে আলতাব মৃধা চেঁচিয়ে বললেন,

 

‘সবাই রেডি?’

 

সবাই একসঙ্গে মাথা নাড়তে তিনি বললেন,

 

‘লাইট,সাউন্ড,রোল….’

 

পলির মুখের উপর এসে আলো পড়লো।সঙ্গে সঙ্গে আলতাব চিৎকার করে বললেন,

 

‘স্পিড,অ্যাকশন!’

 

রোদ্দুর চুপিচুপি এসে পলির পাশে থেকে ট্রলি নিয়ে দিল ভো দৌঁড়।পেছন পেছন পলি দৌঁড়াচ্ছে।ওর পিছে পিছে স্ক্রিপ্ট হাতে ছুটছে প্রম্পটার।মৃদুস্বরে ডায়লগ মনে করিয়ে দিচ্ছে।শ্যুটিং স্পটের দৃশ্য যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।দূর থেকে সেই দৃশ্য দেখে অহি মনে মনে ভাবলো,রোদ্দুরের মতো এত নিঁখুত অভিনয় কেউ করতে পারবে না!

 

৬.

 

ট্রেন চলছে মৃদু ঝংকার তুলে।লিরা আপুর কেবিন থেকে বের হয়ে অহি নিজের কেবিনের দিকে এগোল।রোদ্দুরের পরিবারের প্রতিটি মানুষ তাকে এতটা আপন করে নিয়েছে যে সে কেমন ঘোরের মধ্যে চলে যাচ্ছে।এত ভালো মানুষ হয়?একটা পরিবারের সবাই একত্রে কি করে এতটা ভালো হয়?

 

প্রসন্ন চিত্তে সে দরজা টেনে নিজের কেবিনে ঢুকলো।সঙ্গে সঙ্গে তার পিলে চমকে উঠলো।রোদ্দুর গালে হাত রেখে বসে আছে।অহি বিস্মিত কন্ঠে বলল, 

 

‘আপনি?’

 

রোদ্দুর দুঃখী কন্ঠে বলল, 

 

‘অজান্তা,আমার গাল দুটো ব্যান্ডেজ করে দাও!এক গালে তুমি থাপ্পড় মেরেছো,আরেক গালে পলি মজুমদার।তোমার টাতে ব্যথা পাইনি।কিন্তু ওই বেহায়া মেয়ে এমন জোরে থাপ্পড় মেরেছে যেন এটা শ্যুটিং নয়।আমি সত্যি সত্যি ওর ট্রলি চুরি করেছি।তুমিই বলো!এত বদমাইশ মেয়ে হয়?’

 

(চলবে)

 

#গল্পের_নাম:|| হ-য-ব-র-ল ||

#লেখনীতে: অজান্তা অহি (ছদ্মনাম) 

#পর্ব______০৬

 

অহি এগিয়ে এসে আলতো করে ডান হাতটা রোদ্দুরের গালে রাখলো।হালকা করে স্পর্শ করে বলল, 

 

‘কোন গালে থাপ্পড় মেরেছে?’

 

রোদ্দুর বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে।এ কোন অহিকে দেখছে সে?নিজে থেকে ছুঁয়ে দিচ্ছে!এত মায়া জড়ানো কন্ঠে কথা বলছে।সে নিজের বাম হাতটা উঁচু করে তার গাল স্পর্শ করা অহির হাতের উপর হাত রাখলো।অহির যেন ঘোর কাটলো।দ্রুত নিজের হাত সরিয়ে নিল।এক পলক এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল,

 

‘থাপ্পড়ই তো মেরেছে।চাকু টাকু মেরে তো দেয়নি।এত উতলা হচ্ছেন কেন?

 

‘অজান্তা,তুমি একবার আমার মুখের দিকে তো তাকাও!গাল লাল হয়ে গেছে।’

 

অহির ভেতরটা অস্থিরতায় টইটম্বুর হয়ে যাচ্ছে।সে অগোছালো দৃষ্টি মেলে একবার রোদ্দুরের দিকে তাকালো। রোদ্দুরের কাকুচক্ষু জলের মতো স্বচ্ছ গভীর দৃষ্টি বুকের কোথাও তোলপাড় সৃষ্টি করলো।সে দ্রুত অন্য দিকে ঘুরে দাঁড়াল।পাশের সিটের ব্যাগ গুলো সরিয়ে নিজের কালো চামড়ার ব্যাগটা বের করলো।তরল জাতীয় একটা ওষুধ বের করে লম্বা করে শ্বাস নিল।

 

রোদ্দুর হঠাৎ পেট চেপে বলল,

 

‘অজান্তা,পেট শূন্য কুয়ো হয়ে গেছে।ক্ষুধায় মরে গেলাম।’

 

‘আমাকে কেন বলছেন?আমি কি করতে পারি?’

 

‘অনেক কিছুই করতে পারো।একটু ক্ষুধা নিবারণের মেডিসিন দাও!’

 

অহি ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ছাড়লো।উত্তর দিল না।একটুপর ঘুরে রোদ্দুরের দিকে এগিয়ে গেল।নিজেকে সামলে বেশ স্বাভাবিক ভাবে রোদ্দুরের পাশে বসে পড়লো।হাতের ডগায় একটু মেডিসিন লাগিয়ে বলল,

 

‘মুখটা এদিকে ঘুরান তো!’

 

রোদ্দুর মুখ ঘুরাতে অহি আঙুলের ডগা দিয়ে রোদ্দুরের মুখের দুই গালে তরল মেডিসিন লাগিয়ে দিল।গম্ভীর কন্ঠে বলল, 

 

‘জ্বালাপোড়া কমেছে?একটু ঠান্ডা ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে?’

 

রোদ্দুর হাঁ করে তাকিয়ে আছে।তার চোখ দুটো কোটর থেকে বের হবে যেন!অহির এত কেয়ারিং বিহেভ তার হজম করতে কষ্ট হচ্ছে।মনে হচ্ছে জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছে সে।কাত ঘুরলেই স্বপ্ন ভেঙে যাবে।এই কেবিন,এত নিশুতি রাত,এই যে পাশের এই লক্ষীমন্ত্র মেয়ে সব মিলিয়ে যাবে।সে চোখ খুলে দেখবে নিজের রুমে শুয়ে আছে এবং এতক্ষণ গভীর কোনো স্বপ্ন দেখছিল।

 

এসবের কিছুই হলো না।স্বপ্ন ভাঙলো না।অহির বিরক্তিকর কন্ঠ কানে বাজলো।কাঠ কাঠ গলায় বলছে,

 

‘এভাবে সাপের মতো তাকিয়ে থাকেন কেন?ছোবল মারবেন?’

 

রোদ্দুর ডানে বায়ে মাথা নেড়ে না জানাল।মিনমিন গলায় বলল,

 

‘ছোবল তো আপনি মেরেছেন ডক্টর!ছোবল মেরে ভেতরে প্রেমের বিষ ঢুকিয়ে দিয়েছেন।এখন আপনার থেকে দৃষ্টি সরালে চোখ জ্বালা করে!’

 

‘কি?’

 

অহির দৃষ্টি সরু হতে রোদ্দুর উঠে দাঁড়ালো।খুকখুক করে কেশে বলল,

 

‘অজান্তা,কথা বলতে পারছি না।গালে টান লাগে!’

 

‘কথা বলতে বলেছে কে?’

 

‘কিছু খেতেও তো পারবো না।ডান হাত আঘাতপ্রাপ্ত।আবার মুখও!অন্য কোনো ভাবে খাবার শরীরে প্রবেশ করানো যায় না অজান্তা?’

 

‘আমার জানা নেই!’

 

‘চলো, আমাদেন কেবিনে।মা ডাকছে তোমায়।’

 

অহি কপাল কুঁচকে বলল, 

 

‘আমি কিছুক্ষণ আগে দেখা করেছি।কথা হয়েছে।আবার কেন ডাকবে?’

 

‘আরে তুমি চলো তো!এবার আমার সাথে চলো।ভাবীর মেয়েকে দেখবে না?’

 

‘দেখেছি।ওর নাম কি ঠিক করেছেন?’

 

‘করিনি।বাসায় গিয়ে গ্রান্ড সেলিব্রেশন করে নাম ঠিক করা হবে।সবাই সবার পছন্দের নাম একটা করে ছোট্ট কাগজে লিখবে।এটা ভাঁজ করে একটা বোয়ামে রাখা হবে।সেখান থেকে একটা বের করে তাতে যে নাম লেখা থাকবে সেটা ফাইনাল নাম হবে।আপাতত সবাই যার যা  খুশি তাই বলে ডাকছে।যেমন ধরুন,আমি মনে মনে তাকে রূপচাঁদা বলে ডাকছি!’

 

‘কিহ!রূপচাঁদা?’

 

‘হুঁ।তোমার বাবা নামফি বলে ডাকছে।আমার মা ভানু বলে ডাকছে।আরো অনেকে অনেককিছু বলে ডাকছে।’

 

অহির নিজেকে বড্ড ক্লান্ত লাগছে।স্লিপিং বার্থ কেবিনের টিকেট কেটেছিল ঘুমানোর জন্য।অথচ আজকের এই ট্রেন জার্নিতে ঘুম বাদে বাকি সব হয়েছে।সে সূক্ষ্ম একটা হাই তুলে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।খোলা দরজা আরো একটু খুলে বলল,

 

‘আপনি এবার আসতে পারুন,রোদ্দুর হিম!’

 

রোদ্দুর আশাহত হয়ে বের হলো।কেবিনের বাইরে পা রেখেই সে অহির নীল রঙের ঝুলন্ত ওড়নার নিচের অংশ হাতের মুঠোয় পুড়ে নিল।

 

ওড়নায় টান পড়তে অহি চমকে রোদ্দুরের হাতের দিকে তাকালো।ওড়না ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল, 

 

‘আপনি একটা কিন্তু-পার!ওড়না ছাড়ুন!’

 

রোদ্দুর নিচের দিকে তাকিয়ে অনুরোধের স্বরে বলল, 

 

‘প্লিজ আসো না অজান্তা!’

 

রোদ্দুরের কন্ঠস্বর অহির বুকের গহীনে গিয়ে বিঁধলো যেন।হার্টবিট বেড়ে গেল।সে ঠোঁট কামড়ে বলল,

 

‘ওড়না ছাড়ুন!আমি আসছি!’

 

রোদ্দুরের মনের আকাশটা যেন মেঘমুক্ত হয়ে গেল।সে ঝলমলে হাসি হেসে ওড়না ছেড়ে দিল।অহি কেবিন থেকে বের হয়ে দরজা টেনে দিল।

 

৭.

 

রোদ্দুর এই মুহূর্তে বসে আছে পলি মজুমদারের সামনে।তার পাশের সিটে হাত পা এলিয়ে বসে আছে ডিরেক্টর আলতাব মৃধা!

 

পলি মজুমদার ঘন ঘন মাথার চুল নাড়াচাড়া করছে।টিস্যু দিয়ে নাক আর কপালের ঘাম মুছছে।দেখেই বোঝা যাচ্ছে নিজেকে যথাসম্ভব স্মার্ট আর গর্জিয়াস রূপে প্রেজেন্ট করতে চাচ্ছে সে।

 

রোদ্দুর মিনিট দশ পনেরো হলো এভাবে বসে আছে।তাকে জরুরি তলব করে ডিরেক্টর আলতাব মৃধা ডেকে পাঠিয়েছিল।এখানে আসার পর আলকাব মৃধা তাকে বলেছে যে, সে নয়!তার সাথে কথা বলবে পলি মজুমদার।সে অনেক ক্ষন হলো পলি মজুমদারের সামনে বসে আছে।কিন্তু নায়িকা মাথার চুল নাড়াচাড়া বাদে আর কিছুই বলছে না।

 

নিজের ভেতরের চাপা রাগটা নিয়ন্ত্রণ হারাতে বসেছে যেন।রোদ্দুর এই মেয়েটাকে কেন জানি সহ্য করতে পারছে না।মেয়েটটির গলা চেপে উপরে তুলে ট্রেনের জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলার গোপন ইচ্ছেটা সে দীর্ঘ শ্বাস রূপে বের করে দিল!

 

আলতাব মৃধা নিরবতা সহ্য করতে না পেরে মুখ খুললেন।পেছন ঘুরে এক স্টাফকে রাগান্বিত স্বরে বললেন,

 

‘চোখে দেখিস না?সব বলে দিতে হবে?তিন কাপ চা দিয়ে যা!’

 

স্টাফদের মধ্যে নড়ন চড়নের হিড়িক পড়ে গেল।পলি মজুমদারও মুখ খুলল।রোদ্দুরের দিকে চেয়ে বলল, 

 

‘আপনার বায়োডাটা ইতোমধ্যে আমি মুখস্থ করে ফেলেছি।আপনি কি সত্যি আর্টিস্ট হিসাবে নিজের ক্যারিয়ার গড়তে চান?গ্ল্যামার দুনিয়ায় আসতে চান?’

 

রোদ্দুর সিরিয়াস মুখে বলল,

 

‘হ্যা,চাই!’

 

‘বেশ!ভেবে বলছেন তো?ফিল্ম ইন্ড্রাস্ট্রি তে একবার ঢুকলে আর কিন্তু বের হওয়ার অপশন নেই।সেকেন্ড থট?’

 

রোদ্দুর বেশ কনফিডেন্স নিয়ে বলল,

 

‘আমি আর্টিস্ট হতে চাই!’

 

‘ঠিক আছে।এবার আপনাকে আমরা অনেক বড় একটা অপরচুনিটি দিবো।আলতাব ভাইয়ের সাথে আমি কথা বলেছি।এর পরবর্তী মুভিতে হিরোর রোলে আপনি অভিনয় করবেন।হিরোইন আমি!সাথে কো-এক্টর হিসেবে থাকবে শাওন!রাজি?’

 

রোদ্দুর যেন আসমান থেকে পড়লো।এ কি শুনলো সে?চোর থেকে সরাসরি নায়ক?এটা তো মুভিতে দেখেছে শুধু!সে সিউর হওয়ার জন্য বলল,

 

‘আর একটু বুঝিয়ে বলুন।’

 

পলি মিষ্টি করে হাসলো।সে আর কিছু বললো না।এবার কথা বলল আলতাব মৃধা।রোদ্দুরের দিকে চেয়ার টেনে এগিয়ে এসে বলল, 

 

‘তোমার এক্টিং আমরা দেখেছি।অত্যন্ত নিঁখুত অভিনয় তোমার।তোমার শরীরে যেন আর্টিস্টের রক্ত মিশে আছে।আনবিলিএভল!আমার নেক্সট মুভিতে একটা নতুন মুখের প্রয়োজন ছিল।তোমার মতো এত সুদর্শন ছেলে মেইন লিডে অভিনয় করলে মুভি হিট!তাছাড়া তোমার মধ্যে সততার একটা ব্যাপার স্যাপার আছে।তুমি কোনো কাজকে ছোট মনে করো না।তোমার চিন্তা ধারণা এমন থাকলে তোমান ক্যারিয়ার উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো।তাই আমি অনেক ভেবে চিন্তে তোমার চোরের রোলটা বাদ দিয়েছি।অন্য কেউ করবে সেটা।তুমি হিরো হিসেবে কিছুদিনের মধ্যে নতুন ছবির শ্যুটিং শুরু করবে।’

 

রোদ্দুরের সামনে চা রাখা হয়েছে।সে যেন নিজের মধ্যে নেই।চারপাশ কেমন অচেনা মনে হচ্ছে।পানি পিপাসা পাচ্ছে।কোনো রকমে চায়ের কাপ হাতে তুলে তাতে চুমুক দিল।অন্য মনস্ক ভাবে চুমুক দিয়েই চায়ের তাপমাত্রা টের পেল।পিচ করে সব চা মুখ থেকে ফেলে দিল।হাত দিয়ে মুখে হাওয়া করতে করতে বলল,

 

‘শিট!!ঠোঁট পুড়ে গেল!’

 

পলি মজুমদার চিন্তিত মুখে একটা টিস্যু এগিয়ে দিল।রোদ্দুর কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল।টিস্যু দিয়ে মুখ মুছে দুজনকে উদ্দেশ্য করে বলল, 

 

‘আমি রাজি আপনাদের প্রস্তাবে।আমি ভীষণ খুশি হয়েছি।আমাকে এই সুযোগ করে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ।আমি খবরটা সবাইকে জানিয়ে আসি।’

 

সবাইকে বিদায় জানিয়ে রোদ্দুর বের হলো।তার মাথা ঝিম ঝিম করছে।এত বড় একটা সংসাদ যেন সব অগোছালো করে দিচ্ছে।তার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না সে মুভিতে অভিনয় করবে!

 

বুফে কারের বেঞ্চে অহির বাবাকে দেখা যাচ্ছে।রোদ্দুর মুখ আড়াল করে তাকে সাবধানে পাশ কাটিয়ে করিডোরে আসলো।অহির কেবিনের দরজায় টোকা দিল।ভেতর থেকে অহির মিহি সুর ভেসে এলো।ঘুমজড়ানো কন্ঠে বলল, 

 

‘বাবা,ভেতরো এসে ঘুমিয়ে পড়ো!’

 

রোদ্দুর দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।কেবিনে লাইট জ্বলছে।সাদা আলোর ঝলকানি!সেই আলোর প্রায় সবটা অহির মুখের উপর গিয়ে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।তাকে এই রোদ্দুরের কাছে আলোর বহর মনে হচ্ছে।যে তার অন্ধকার জীবনে আলোর মশাল হাতে পথ দেখাচ্ছে।এই মেয়েটার সব শুভ তার জন্য।এই মেয়েটা আস্তো একটা মায়ায় মোড়ানো ভালোবাসা!

 

রোদ্দুরের বুকের ভেতর ভালোবাসার ঢেউ খেলে গেল যেন!তার দৃষ্টি মিশে আছে অহির মুখপানে। অহির মাথার চুলগুলো সিটের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বন্ধ চোখের পাপড়ি গুলো যেন স্বগর্বে দাঁড়িয়ে আছে।পাতলা ঠোঁট তাকে টানছে!কাছে টানছে চুম্বকের মতো!

 

রোদ্দুর ক্ষীণ সুরে পা ফেলে এলোমেলো গতিতে অহির কাছে গেল।অহি পাতলা কম্বল গায়ে জড়িয়ে পা ভাঁজ করে শুয়ে আছে।সে এগিয়ে গিয়ে অহির মাথার কাছে নিচে বসে পড়লো।

 

খুব কাছে কারো অস্তিত্ব অনুভব করতে অহির শরীরের ভেতরের দিয়ে শীতল রক্তস্রোত বয়ে গেল।ধপ করে চোখ খুলে রোদ্দুরকে খুব কাছাকাছি দেখতে পেল।কয়েক সেকেন্ড সে মুখের দিকে চেয়ে এক লাফে উঠতে নিল।কিন্তু পারলো না।

 

জোর পূর্বক উঠার চেষ্টা করতে রোদ্দুর দু কাঁধ চেপে অহিকে শুইয়ে দিল।অগোছালো কন্ঠে বলল, 

 

‘অজান্তা,আমার ঠোঁট পুড়ে গেছে।চিকিৎসা দাও!’

 

(চলবে)

 

#গল্পের_নাম:|| হ-য-ব-র-ল ||

#লেখনীতে: অজান্তা অহি (ছদ্মনাম) 

#পর্ব_______০৭

 

‘অজান্তা,আমার ঠোঁট পুড়ে গেছে।চিকিৎসা দাও!’

 

রোদ্দুরের দ্বিধাহীন কন্ঠ শুনে অহির চোখ দুটো যেন ছানাবড়া হয়ে গেল।এরকম একটা কথা তবুও কেমন সাবলীল ভাবে বলছে।এই ছেলেকে সে হাড়ে হাড়ে চিনে গেছে।বুক চিঁড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার।কোন দুঃখে যে সে ডাক্তারি পড়তে গেছিল!

 

‘কি হলো অজান্তা?জ্বালাপোড়া করছে তো!’

 

অহি রোদ্দুরের হাত দুটো সরিয়ে উঠার চেষ্টা করলো।পারলো না।বিরক্তি নিয়ে বলল,

 

‘কাঁধ ছাড়ুন!উঠতে দিন!’

 

‘আগে তুমি ঠোঁটের চিকিৎসা দাও!’

 

‘এইবার কিন্তু ঘুষি খাবেন বলছি।ছাড়ুন!’

 

রোদ্দুর ছাড়লো না।অহি ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ছাড়লো।এই ছেলের সাথে সংসার করতে গেলে যে তাকে কতরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।সর্বোপরি তার ডাক্তারি জীবনের দফারফা হয়ে যাবে।একের পর এক অজুহাতে শুধু চিকিৎসা চাইবে।আজ হাত কেটে গেছে, কাল পা কেটে গেছে, পরশু জ্বর বাঁধিয়েছে,তরশু আঙুল পুড়ে ভস্ম হয়ে গেছে ইত্যাদি।কে যে তাকে ডাক্তারি পড়ার পরামর্শ দিয়েছিল!

 

সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে একবার রোদ্দুরের ঠোঁটের দিকে তাকালো।গলার স্বর নামিয়ে বলল,

 

‘ঠোঁট পুড়েছে কিভাবে?’

 

‘অন্যমনস্ক হয়ে গরম চায়ে চুমুক দিয়েছিলাম।’

 

রোদ্দুরের হাত ঢিলে হয়ে এলো।অহি এক লাফে উঠে বসলো।হাতের ব্যান্ড খুলে মাথার খোলা চুল পেঁচিয়ে বলল, 

 

‘এক কাজ করুন।অন্যমনস্ক হয়ে আরেক কাপ ধোঁয়া উঠা গরম চায়ে চুমুক দিন।ঠিক হয়ে যাবে।’

 

রোদ্দুর ধপ করে উঠে দাঁড়ালো।গলা উঁচিয়ে বলল, 

 

‘তুমি চিকিৎসা দিবে কি না সেটা বলো।’

 

‘কি চিকিৎসা দিবো বলুন। শুনি!’

 

‘ডক্টর তুমি না আমি?আমায় জিগ্যেস করছ কেন অজান্তা?আমি হলাম পেশেন্ট।মানে রোগী!আর তুমি ডাক্তার!চিকিৎসা তুমি দিবে।’

 

‘আমি আপনাকে চিকিৎসা দিতে পারবো না।’

 

‘চিকিৎসা দিবে না মানে?ডক্টর হয়েছ কি গরুর ঘাস কাটার জন্য?তোমার সব সার্টিফিকেট আমি পুড়িয়ে ফেলবো।’

 

অহির হাসি পাচ্ছে খুব!তবুও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে বেশ স্বাভাবিক রইলো।চোখ সরু করে বলল, 

 

‘পুড়িয়ে ফেলুন না!বারন করেছে কে।’

 

রোদ্দুর এলোমেলো ভাবে কিছুক্ষণ কেবিনে হাঁটাহাঁটি করলো।তারপর অহির সামনে দাঁড়িয়ে পড়লো।কিছুক্ষণ অহির মুখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো।তারপর   ডান হাতের আঙুল উঁচিয়ে বলল, 

 

‘তুমি ভয়ংকর নিষ্ঠুর!ঠোঁট পোড়ার সাথে সাথে তোমার প্রতি আমার সব অনুভূতি পুড়িয়ে ফেললাম অজান্তা।এই মুহূর্ত থেকে তোমার প্রতি আমার সব ফিলিংসে ফোসকা পড়ে গেল।আমি আর তোমায় ভালোবাসি না।’

 

‘এত দ্রুত ভালোও বেসে ফেলেছিলেন মি. রোদ্দুর হিম?আপনার ফিলিংস তো দেখি মডার্ণ সাইন্সকেও হার মানাবে।’

 

‘চুপ!এই মুহূর্ত থেকে তোমার সাথে আমার সব সম্পর্ক শেষ।অল অভার!আমি চলে যাচ্ছি।’

 

যাচ্ছি বলেও রোদ্দুর যাচ্ছে না।এই মানুষটা এত্তো ফানি!রেগে গিয়ে তাকে আরো ফানি লাগছে।অহি ঠোঁট টিপে হেসে বলল, 

 

‘যাচ্ছি বলেও যাচ্ছেন না কেন?’

 

রোদ্দুর আর অপেক্ষা করলো না।গটগট করে কেবিন থেকে বের হয়ে গেল।সে চলে যেতে অহি ফিক করে হেসে ফেলল।সে বেশ বুঝতে পারছে আজকের পর থেকে তার জীবনটা অন্য রকম হয়ে গেল।আজকের পর থেকে বাকি জীবন টা রোদ্দুর তার ভালোবাসার খুঁনসুটি আর পাগলামিতে ভরিয়ে রাখবে সবসময়।কিছুক্ষণ পর সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।টানা দরজায় হাত রেখে বন্ধ করতে শেষ মুহূর্তে রোদ্দুর ধরে ফেলল।অহি কপাল কুঁচকে বলল, 

 

‘আবার কি চাই?’

 

রোদ্দুর কাঠ গলায় জবাব দিল,

 

‘কি চাই মানে?আমার জিনিস নিতে এসেছি।ব্লেজার ফেরত দাও!’

 

অহি দ্রুত গিয়ে ব্যাগের চেইন টেনে ব্লেজার বের করলো।রোদ্দুরের দিকে ছুঁড়ে মেরে বলল,

 

‘এই নিন!’

 

রোদ্দুর এক হাতে ব্লেজার চেপে ধরে রাগান্বিত চোখে অহির দিকে চেয়ে রইলো।সে দৃষ্টিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে অহি দরজা বন্ধ করতে নিল।শেষ মুহূর্তে রোদ্দুর আবার পা দিয়ে বাঁধা দিল।অহি বিস্ময় নিয়ে তাকাতে বলল,

 

‘আমাকে খেয়ে ছেড়ে দিবে তা তো হবে না অজান্তা?’

 

‘অ্যা?আপনাকে কখন খেলাম আবার?’

 

‘পানি!পানি খেয়েছ।আমার টাকায় কেনা পানি খেয়েছ।পানি ফেরত দাও!হাবিজাবি পানি হলে চলবে না।আমার চাই মিনারেল ওয়াটার।’

 

অহি রোদ্দুরের শেষ কর্মকান্ড দেখতে চাচ্ছে।আরো কি কি পাগলামি করে তার যবনিকা টেনে ছাড়বে।সে প্রায় দৌঁড়ে গিয়ে সিটের পাশ থেকে পানির বোতল এনে রোদ্দুরের দিকে বাড়িয়ে দিল।বলল,

 

‘এবার বিদেয় হন!’

 

রোদ্দুর বিদেয় হলো না।কয়েক সেকেন্ড দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থেকে আচমকা অহিকে ঠেলে সরিয়ে কেবিনে ঢুকে পড়লো।

 

ট্রেন ঝিকঝিক শব্দ তুলে এগিয়ে চলেছে।লোহায় লোহায় টক্কর লেগে সৃষ্ট শব্দটা ইতোমধ্যে গানের সুর নিয়েছে যেন।দীর্ঘক্ষণ শোনার ফলশ্রুতিতে অহির মনে হচ্ছে সে চমৎকার একটা সুর শুনছে।ট্রেন মৃদু কাঁপছে।সেই কাঁপুনির সাথে পাল্লা দিয়ে অহির বুকটাও দুরুদুরু কাঁপছে। নিজেকে ধাতস্থ করে সে বলল,

 

‘ভেতরে এলেন কেন?আবার কি চাই?আরো কিছু পাবেন?’

 

রোদ্দুর আড়চোখে অহির দিকে তাকালো।কিন্তু ঘুরে দাঁড়াল না।হাতের ব্লেজার চেপে ধরে বলল, 

 

‘আমি আর কিছু পাব না।তুমি পাবে!’ছ’ বগিতে অন্ধকারে ভয় পেয়ে তোমায় জড়িয়ে ধরেছিলাম।এবার তুমি আমায় একবার জড়িয়ে ধরো।শোধ বোধ হয়ে যাবে।আমি কারো কাছে ঋণী থাকতে চাই না।’

 

‘কিহ!’

 

রোদ্দুর ঘুরে দাঁড়াল।অহির অস্থিরতা মাখা মুখের দিকে চেয়ে বলল, 

 

‘আমি এখনো শেষ করিনি।তোমায় কোলে তুলে ১৮ নাম্বার কেবিন থেকে ১৩ নাম্বার কেবিনে নিয়ে গেছি।এত কষ্ট করতে হবে না তোমার।তুমি শুধু আমায় কোলে তুলে এই কেবিনে একটা চক্কর দিবে।পারবে না?’

 

অহি ছিটকে দু পা পিছিয়ে গেল।অগোছালো ভাবে বলল,

 

‘আপনি একটা আজব প্রাণী!’

 

‘আজব হলেও আমি একটা প্রাণী।তোমার মতো নিষ্ঠুর উদ্ভিদ নই।আমার প্রাণ আছে!তুমি একটা প্রাণহীন,হৃদয়হীন ইউক্যালিপটাস!’

 

অহি মৃদুস্বরে হেসে ফেলল।রোদ্দুরকে থামিয়ে দিতে হবে।নইলে ননস্টপ বকবক করতে থাকবে।সে কয়েক পা এগিয়ে রোদ্দুরের কাছাকাছি দাঁড়াল।খুব কাছে দাঁড়িয়ে ডান হাতটা রোদ্দুরের বুকে চেপে ধরলো।

 

রোদ্দুর অস্থিরতা নিয়ে তাকাল অহির দিকে।তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেছে।শরীরের কাঁপুনি টের পাচ্ছে।অহিকে এত কাছে অনুভব করে অস্থিরতা বেড়ে চলেছে যেন।গলা শুকিয়ে আসছে।অহির নরম হাতের নিচের হার্টটা ছিটকে বের হয়ে আসতে চাইছে যেন।সে ছটফট করতে করতে বলল, 

 

‘ও মাই গড!ক-কি করছ কি, অজান্তা?’

 

অহি বাম হাতে রোদ্দুরের হাত চেপে ধরলো।ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে বলল, 

 

‘এত ভয় কেন পাচ্ছেন?চিকিৎসা দিতে চাচ্ছি।ঠোঁটের!’

 

‘চিকিৎসা লাগবে না।আমি সুস্থ।একদম সুস্থ।’

 

হড়বড় করে বলে রোদ্দুর এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। পিছিয়ে যেতে ফ্লোরে থাকা ব্যাগের সাথে লেগে উল্টে পড়ে গেল।অস্ফুটস্বরে মৃদু আর্তনাদ করে মাথা চেপে ধরলো।সিটের কর্ণারে লেগে মাথা ঠুকে গেছে।

 

অহি হন্তদন্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,

 

‘ব্যথা পেয়েছেন?কোথাও লেগেছে?’

 

অহি কাছে এগিয়ে যেতে রোদ্দুর বাম হাত উঁচিয়ে বলল, 

 

‘কাছে আসবে না অজান্তা।একদম কাছে আসবে না বলছি!’

 

অহি বারণ শুনলো না।এগিয়ে গিয়ে রোদ্দুরের হাত সরিয়ে মাথায় আস্তে করে চাটি মারলো।রোদ্দুরকে আরেক দফা লজ্জার সাগরে চুবিয়ে মারতে সে রোদ্দুরের কপালে চুমু খেল।

 

৮.

 

হাজেরা বেগম নুডলসের বাটি অহির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, 

 

‘ছোট বৌমা।তুমি বেশি করে খাও!’

 

অহি অস্বস্তি নিয়ে বাটিটা হাতে নিল।রোদ্দুরের মা তো তার আর রোদ্দুরের ব্যাপারে কিছুই জানে না।অথচ কোন এক অদ্ভুত কারণে তিনি প্রতিটা কথার সাথে সাথে ছোট বৌমা, ছোট বৌমা শব্দটি যুক্ত করছেন

তাকে বৌমা বলে ডাকছেন।অহি ভুলটা শুধরে দিল না।ডাকুক না!কিছু ভুল ভালো লাগার জন্ম দেয়।এই মানুষটাকেও সে প্রচন্ড রকমের ভালোবেসে ফেলেছে।

 

সে চামচের ডগায় পেঁচিয়ে কিছুটা নুডলস মুখে পুড়লো।চিবোতেই তার স্বাদটা টের পেল।এতকাল যাবত বাইরের যাচ্ছে তাই খাবার খেয়ে মুখ পঁচে গেছে।মনে হচ্ছে বহুদিন পর এত সুস্বাদু খাবার খাচ্ছে।সে দ্রত অর্ধেক বাটি খালি করে বলল,

 

‘আন্টি আপনার রান্নার হাত চমৎকার।’

 

হাজেরা বেগমের মুখে হাসি ফুটে উঠলো।রান্না নিয়ে কেউ প্রশংসা করলে তার ভীষণ ভালো লাগে।তিনি অহির মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,

 

‘আরো অনেক খাবার আছে।ধীরে সুস্থে খাও।অনেক দূরের পথ সেজন্য খাবার রান্না করে নিয়ে এসেছি।তাছাড়া বড় বৌমার এখন ঘন ঘন খাওয়া প্রয়োজন।’

 

অহির ভেতরটা প্রশান্তিতে ভরে গেল।বোতল খুলে একটু পানি খেল।খোলা দরজা দিয়ে একবার বাইরে তাকাল।রোদ্দুরকে চোখে পড়ছে না।হয়তো লিরা ভাবীর কেবিনে!

 

হাজেরা বেগম অহির প্লেটে কষানো মাংস তুলে দিয়ে বলল, 

 

‘ছোট বৌমা!শুনলাম হিম নাকি ছবিতে অভিনয় করবে?’

 

‘হ্যাঁ,আন্টি।ঠিকই শুনেছেন!’

 

‘তোমার শ্বশুর মশাই রাজি তো?উনি হ্যাঁ বলে দিয়েছে?’

 

অহি মাথা নেড়ে স্মিত হাসলো।আশ্যস্তের সুরে বলল, 

 

‘হ্যাঁ,আন্টি।আপনি চিন্তা করবেন না একদম।’

 

অহির খাওয়া শেষে দুজন একত্রে বক্সে খাবার গুছিয়ে রাখলো।হঠাৎ রোদ্দুর দরজার বাইরে থেকে বলল,

 

‘অজান্তা,তোমায় লিরা ভাবী ডাকে।’

 

হাজেরা বেগমের সম্মতি নিয়ে অহি কেবিনের বাইরে এলো।বাইরে থেকে দরজা টেনে লিরা ভাবীর কেবিনের দিকে পা বাড়াতে রোদ্দুর ওড়নার নিচের ঝুলন্ত অংশ টেনে ধরলো।অহি সকৌতুকে বলল,

 

‘সমস্যা কি?’

 

রোদ্দুর এলোমেলো সুরে বলল, 

 

‘বুকে ব্যথা করে অজান্তা।’

 

‘করুক!আরো কত রকমের অসুখ করবে এখন আপনার!আপনার কোনো চিকিৎসা আমি করছি না।’

 

অহি ওড়না টেনে ছাড়িয়ে এগিয়ে গেল।কয়েক পা যেতে আবার হাতে টান অনুভব করলো।তার মুখে হাসি ফুটে উঠলো।হাসিটুকু নিমেষে শুষে নিয়ে রোদ্দুরের কম্পনরত হাতের দিকে এক পলক তাকাল।হঠাৎ পেছন থেকে কেউ বিস্ময়মিশ্রিত কন্ঠে বলে উঠলো,

 

‘একি!তুমি আমার মেয়ের হাত ধরে টানাটানি করছ কেন?ওর হাতটা কি টানাটানির বস্তু?দড়ি পেয়েছ নাকি?ছাড়ো বলছি!বেয়াদব ছেলে।’

 

অহি রোদ্দুর দুজন চমকে তাকিয়ে দেখলো লুৎফর রহমান কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে।তার পাশে টুপি পরিহিত রোদ্দুরের বাবাও কৌতূহল নিয়ে চেয়ে আছে।

 

(চলবে)

 

গতকাল গল্প পোস্ট করতে চেয়েছিলাম।কিন্তু লেখার পরে ডিলিট হয়ে গেছে।দেড় ঘন্টা ঝিম মেরে বসেছিলাম!আজ আবার নতুন করে লিখেছি।রাতে নতুন পর্ব পোস্ট করবো।

 

#গল্পের_নাম:|| হ য ব র ল ||

#লেখনীতে:অজান্তা অহি (ছদ্মনাম) 

#পর্ব_______০৮  (শেষ পর্ব)

 

লুৎফর রহমানের এক ধমকে রোদ্দুর ঝড়ের বেগে অহির হাত ছেড়ে দিল।কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আড়চোখে এক পলক অহির দিকে তাকালো।অহি ধীরপায়ে এগিয়ে এসে বলল, 

 

‘বাবা,তোমার হাতে সিগারেট কেন?আজ টোটাল কয়টা খেলে?’

 

লুৎফর রহমান ধপ করে নিভে গেলেন।হাতের সিগারেটটা ফেলে দিয়ে পায়ের জুতার সাহায্যে নিভিয়ে ফেললেন।তিনি শরীরে কেমন দুলুনি অনুভব করছেন।মেয়ের ধমকে নাকি ট্রেন বাঁক নেয়ার কারণে বুঝতে পারছেন না।গলা ঝেরে তিনি বললেন,

 

‘অহি মা!রোদ্দুর নামক ছেলেটা কি জোরপূর্বক তোমার হাত ধরেছিল?’

 

‘হাত ধরেছিল বাবা।কিন্তু জোরপূর্বক নয়!’

 

‘মানে?’

 

‘মানে হাত ধরার ব্যাপারটা মিউচুয়াল ছিল।আমিও ধরেছিলাম বাবা!’

 

‘সে কি!কেন?জার্নিতে আধা পরিচিত হওয়া একটা ছেলের হাত কেন ধরবে তুমি?’

 

অহি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো।লুৎফর রহমান আর উসমান আলী ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে উত্তরের অপেক্ষা করছে।অহি এক পলক রোদ্দুরের দিকে তাকালো।রোদ্দুরের মুখ রক্তশূণ্য ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।

 

অহি স্পষ্ট সুর তুলে বলল, 

 

‘বাবা,আমি আধা পরিচিত এই ছেলের হাতটা সারাজীবনের জন্য ধরতে চাই।’

 

আর কেউ মুখ খুলল না।কোনো কথা হলো না।ট্রেনের হুইসেল বাদে চারিদিক নিস্তব্ধ!অহি ভয়ে ভয়ে বাবার মুখের দিকে তাকাতে তিনি ফিক করে হেসে দিলেন।পাশ থেকে তার হাসিতে সামিল হলেন উসমান আলী! 

 

অহি আর রোদ্দুর সন্দেহ নিয়ে তাকাতে উসমান আলী হাসতে হাসতে বললেন,

 

‘আমরা তোমাদের এই প্রস্তাবে ভীষণ খুশি হয়েছি গো মা!জীবনে প্রথমবার হিম একটা ভালো কাজ করলো।আসলে আমি নিজেই তোমার বাবাকে প্রস্তাব করেছিলাম তোমাকে বাড়ির ছোট বৌ করার জন্য।তোমার বাবা দ্বিধাদ্বন্দে ভুগছিল।আশা করি সব দ্বিধা কেটে গেছে।তাই না ভাইসাহেব?’

 

লুৎফর রহমান হেসে বললেন,

 

‘জ্বি বেয়াই সাহেব!’

 

তারপর আর কথা হলো না।লুৎফর রহমান এগিয়ে গিয়ে মুচকি হেসে রোদ্দুরের পিঠ চাপড়ে দিল।উসমান আলীকে ইশারা করে দুজন ১৯ নাম্বার কেবিনে ঢুকলো।

 

অহি বাবার গমনপথের দিকে চেয়ে কৃতজ্ঞতার হাসি হাসলো।ঘুরে দাঁড়িয়ে রোদ্দুরের দিকে তাকালো।রোদ্দুরের মুখোভঙ্গি এখনো স্বাভাবিক হয়নি।অহি এগিয়ে গিয়ে বলল,

 

‘এভাবে আর দাঁড়িয়ে থাকবেন?’

 

‘অজান্তা,ওনারা যা বললো তা কি সত্য?আমি কী জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছি?’

 

রোদ্দুরের বিস্ফারিত দৃষ্টি দেখে অহি মাথা নাড়লো।রোদ্দুরের হাতে এক টান মেরে বলল,

 

‘এবার ”ছ” বগিতে আমার পাশে বসে স্বপ্নের বাকি অংশটা দেখবেন।চলুন!’

 

৯.

 

ট্রেন ছুটে চলেছে অবিরাম গতিতে।একের পর এক স্টেশন পেরুতে পেরুতে ক্লান্ত এখন সে।আর কিছুটা পথ পেরুলেই শেষ স্টেশন।ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনা,নতুন অভিজ্ঞতা,ভালো লাগা,খারাপ লাগা,সুখস্মৃতি, দুঃখস্মৃতি সহ অসংখ্য টুকরো টুকরো ঘটনার সাক্ষী হয়ে সবাই শেষ গন্তব্যে নেমে যাবে।এই গন্তব্যে দীর্ঘ সময়ের ট্রেন ভ্রমণের সমাপ্তি ঘটবে।শুরু হবে নতুন গন্তব্য।জীবন থেমে থাকে না।এ যে ফরএভার ট্রেন!এর শেষ গন্তব্য মৃত্যু।মৃত্যুতে এই ছুটে চলা ট্রেনের চিরসমাপ্তি ঘটবে।

 

ছুটন্ত এই ট্রেনে পরিচয় হওয়া দুজন মানব-মানবী ছুটে চলেছে নিজ গন্তব্যে।রাতের আঁধারে “ছ” বগির জানালার ধারে বসে দুজন নিশ্চুপ অন্ধকার অবলোকন করছে।কাঁধে মাথা রেখে ট্রেন ছুটে চলার শব্দের সাথে একে অপরের নিঃস্তব্ধতাকে গুণে চলেছে যেন।একে অপরের শ্বাস প্রশ্বাস গুণে চলেছে।একে অপরের হাতের ভাঁজে থাকা হাত তারা ছাড়বে না।এই হাত ধরেই তারা ট্রেনের শেষ স্টেশন পেরিয়ে ভালোবাসা নামক নতুন স্টেশনে পা রাখবে।

 

১০.

 

#পরিশিষ্ট:

 

টানা সাতবারের মতো অহিকে ফোন করে পেল না রোদ্দুর।অহি তার ফোন তুলছে না।বেলকনি থেকে রুমে ঢুকে ফোনটা বিছানায় ছুঁড়ে মারলো সে।এই মেয়ে তাকে ভেবেছে কি?এত অবহেলা কেন করবে?সবসময় নিজের মর্জি মতো কেন চলবে?

 

সে চেঁচিয়ে তার পিএ ইউনুসকে ডাকলো।অল্প বয়স্ক এক ছেলে তৎক্ষনাৎ রুমে ঢুকে বলল,

 

‘ইয়েস স্যার!’

 

‘তোমাদের ম্যাডাম এখন কোথায় থাকতে পারে কোনো আইডিয়া আছে?’

 

‘স্যার,হসপিটালে থাকার সম্ভাবনা বেশি।’

 

‘কি!এত রাতে হসপিটালে কেন থাকবে?’

 

‘ম্যাডামের প্রতি বুধবার রাতে হসপিটালে ডিউটি থাকে।আজ তো বুধবার!ভুলে গেছেন নিশ্চয়ই।তবে বাসাতেও থাকতে পারে।কেন স্যার?আপনি যাবেন?’

 

রোদ্দুর দেয়ালঘড়ির দিকে তাকালো।দশটার উপরে বাজে।রাত বেশি না হলেও তাকে শাওয়ার নিতে হবে।বাইরে থেকে মাত্র সে ফ্ল্যাটে ফিরেছে।নিজের দিকে এক পলক চেয়ে সে হুকুমের স্বরে বলল, 

 

‘ইউনুস,এক কাজ করো!আমি শাওয়ারে ঢুকবো।মোটামুটি দু ঘন্টার মতো সময় লাগবে।এর মধ্যে তুমি আর ড্রাইভার গিয়ে অহিকে নিয়ে আসবে।আসতে রাজি না হলে ভয় দেখিয়ে জোর করে তুলে নিয়ে আসবে।’

 

ইউনুস চমকে বলে উঠলো,

 

‘স্যার, এত রাতে ম্যাডামকে তুলে নিয়ে আসবো?’

 

‘এত অবাক কেন হচ্ছো?আমার বউকেই তো তুলে নিয়ে আসতে বলছি।অন্য কেউ তো নয়!বিয়ে করা বউ আমার।যদিও পারিবারিক ভাবে মিডিয়া থেকে লুকিয়ে বিয়ে করেছি তবুও তুমি তো জানো।তাহলে সমস্যা কোথায়?পারবে না?’

 

রোদ্দুরের বিরক্তি ঝরা কন্ঠে ইউনুস ভড়কে গেল।বেশ কনফিডেন্স নিয়ে বলল,

 

‘পারবো স্যার!আমি এক্ষুণি যাচ্ছি।’

 

 ইউনুস ঝড়ের বেগে রুম ত্যাগ করলো।রোদ্দুর দরজার দিকে এক পলক চেয়ে ঝপ করে বিছানায় শুয়ে পড়লো।আর্টিস্ট হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করার পর থেকে সবসময় তাকে ব্যস্ত থাকতে হয়।ওদিকে অহি তার ডাক্তারি পেশা নিয়ে ব্যস্ত।বিগত দেড় বছরে তাদের দুজনের কদাচিৎ দেখা হতো।

 

অথচ রোদ্দুর অহিকে না দেখতে পেয়ে সারাক্ষণ হাঁসফাঁস করতো।চোখের সামনে অহির চেহারা ভাসতো সবসময়।কোনো কাজ মন বসে না,শ্যুটিং এ মনোযোগ নেই!এসব থেকে রক্ষার জন্য আজ সতেরো দিন হলো সে অহিকে বিয়ে করেছে।কিন্তু বিয়ের পর থেকে অহি তাকে আরো বেশি করে ইগনোর করা শুরু করেছে।কাছে বসছে না,দুটো কথা বলছে না, একটু ছুঁয়ে দিচ্ছে না!আবার বিয়ের দুদিন পরেই সে নিজের ফ্ল্যাটে চলে গেছে।

 

অহি তার বাবা-মাসহ এখন হসপিটালের কাছাকাছি একটা ফ্ল্যাটে থাকে।রোদ্দুর দুদিন শ্যুটিংয়ের ফাঁকে সে ফ্ল্যাটে গেছে।হসপিটালে গেছে দুদিন।সব জায়গা গিয়ে দেখে অহি লাপাত্তা।অহি যেন তার সাথে লুকোচুরি খেলছে।ধরা দিব দিব করে কিছুতেই ধরা দিচ্ছে না!

 

গায়ের ঘর্মাক্ত শার্টটা একবার নাকে শুঁকে রোদ্দুর বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লো।ওয়াশরুমে ঢুকে মন কিছুটা হালকা হলো।শাওয়ারের সবকিছু একদম রেডি!

 

শাওয়ার শেষ করে শুধু টাওয়াল পড়ে ওয়াশরুম থেকে বের হলো রোদ্দুর।মনটা ফুরফুরে হয়ে গেছে অনেকটা!মাথার ভেজা চুলগুলো হাত দিয়ে ঝাড়া দিয়ে সামনে এগোতে অহিকে চেয়ারে বাঁধা অবস্থায় দেখে চমকে উঠলো।পরক্ষণে নিজের উদাম গায়ের দিকে নজর পড়তে লজ্জায় কুঁকড়ে গেল।একটানে টাওয়াল খুলে গায়ে পেঁচিয়ে বলল,

 

‘অজান্তা,তুমি কিছু দেখোনি, রাইট?’

 

অহির ভ্রু কুঁচকে গেল।এই ছেলে গাধাদের কোন স্তরে পড়ে?কোমড় থেকে টাওয়াল খুলে গায়ে পেঁচাচ্ছে?এদিকে নিচে যে পুরাতন ঢাকার সদরঘাট!সে চোখ সরিয়ে চেঁচিয়ে বলল,

 

‘কিছুু কাপড় অন্তত পড়ুন!নাকি আর্টিস্টদের রাতের বেলা উন্মুক্ত শরীরে থাকতে হয়?’

 

রোদ্দুর নিচের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট শব্দ করলো।’প্রেম প্রেম পাগলামি’ ছবির শুটিংয়ের সময় ভিলেনকে যে গালিটা দিয়েছিল,মনে মনে নিজেকে সেই জঘন্য গালিটা দিল।অতঃপর মিনমিন করে বলল,

 

‘অজান্তা তুমি যা ভাবছ বিষয়টা তেমন নয়।এই দেখো,আমি আন্ডারওয়্যার পড়েছি।’

 

অহি চোখ বন্ধ করে ফেলল।একে বলা আর না বলা সমান কথা।তার জাস্ট চিন্তাতে আসে না এমন একটা হাঁদারাম টাইপের ছেলে কি করে সিনেমার হিরো হয়!সে চোখ তুলে দেখলো রোদ্দুর তড়িঘড়ি করে ওয়াশরুমে ঢুকেছে।খুব তাড়াতাড়ি সে ওয়াশরুম থেকে বের হলো এবং  অহি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো যে রোদ্দুর থ্রি কোয়ার্টার প্যান্টের সাথে উল্টো করে ফতুয়া পড়েছে।সে ঘাটতে গেল না।হতাশ সুরে বলল, 

 

‘হাত পায়ের বাঁধন খুলুন।ব্যথা পাচ্ছি।’

 

রোদ্দুরের খেয়ালে এলো অহি চেয়ারে বাঁধা।সে একছুটে এগিয়ে গিয়ে অহির হাত পায়ের বাঁধন খোলার চেষ্টা করলো।পায়ের রশিটা খুব তাড়াতাড়ি খুলতে পারলো। কিন্তু হাতের গিঁট খুলতে পারলো না।অসহায় চোখে অহির দিকে চাইতে বুকের বাঁ পাশে ব্যথা শুরু হলো তার।নিজেকে সামলে মুখটা নিচু করে দাঁত দিয়ে গিঁট খোলা শুরু করল।অহি মুখ ঘুরিয়ে বলল, 

 

‘গিঁট খুলতে বলেছি।হাতে চুমু খাওয়ার পারমিশন দেইনি!’

 

রোদ্দুরের ছটফটানি ভাব আরো বেড়ে গেল।গিঁট খুলতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে সে আরো আষ্টেপৃষ্ঠে গিঁট দিয়ে ফেলল।অপরাধীর মতো মুখটা কাঁচুমাচু করে অহির দিকে তাকাল।অহি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

 

‘সিনেমার নায়িকাদের যখন ভিলেন আটকে রাখে তখন তো দুই সেকেন্ডে সব বাঁধন খুলে তাকে রক্ষা করেন।আমার বেলা সব অগোছালো কেন?’

 

রোদ্দুর রশি খুলতে সক্ষম হলো না।দ্রুত উঠে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে কেচি নিয়ে এলো।রশি কেটে অহিকে মুক্ত করে বলল,

 

‘ইয়ে মানে ডক্টর অজান্তা অহি।ভেরি স্যরি।আমার এসিস্ট্যান্টকে শুধু বলেছিলাম,শাওয়ার শেষ করে যেন আমি অজান্তাকে দেখতে পাই।আসতে না চাইলে প্রয়োজনে তুলে আনবে।আমি ধারণা করিনি তারা আমার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে।সত্যি সত্যি তোমায় জোর করে তুলে নিয়ে আসবে।খুবই দুঃখীত।’

 

‘যদিও না আসতে না চাওয়ার অভিনয় করেছি,তবুও আমি স্বইচ্ছায় না এলে কারো ক্ষমতা ছিল না নিয়ে আসার!তা এই মাঝরাতে আমায় তুলে নিয়ে আসার কারণ কি?কি করবেন আমাকে দিয়ে?’

 

রোদ্দুরের বুকের ভেতর ১০ নাম্বার বিপদ সংকেত দেখা দিল।হার্ট বুক ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে।ডান হাতটা বুকের বাঁ পাশে চেপে ধরে বিড়বিড় করে বলল,

 

‘ও মাই গড!এতরাতে অজান্তা আর আমি একঘরে!কি হবে এবার?কি করবো ওকে দিয়ে?’

 

অহির কপালে ফুটে উঠা সূক্ষ্ম ভাঁজের দিকে চোখ পড়তে সে ফ্যাকাসে ভাবে হেসে বলল, 

 

‘হে হে হে!ইয়ে মানে কফি!তোমার হাতের এক কাপ কফি খাওয়ার জন্য তুলে নিয়ে এসেছি।’

 

অহি একটা নিঃশ্বাস ছাড়লো।রোদ্দুরের মিথ্যা গুলো এতো খাপছাড়া হয় যে বুঝতে দু সেকেন্ড সময় লাগে না।সে চেয়ার ছেড়ে উঠে রোদ্দুরের রুমের সর্বত্র নজর বুলাল।এই ফ্ল্যাটে সে এর আগে আরো কয়েক বার এসেছে।দিনে, রাতে নয়!রোদ্দুর আর্টিস্ট হওয়ার পর থেকে আলাদা ফ্ল্যাট নিয়ে থাকে।এখানে ডিরেক্টর, স্টাফের লোকজন প্রায়ই নানারকম চুক্তি নামা নিয়ে আসে।তার কর্মজীবনের সবকিছু এই ফ্ল্যাটে।সময়, সুযোগ পেলেই রোদ্দুর তাদের নিজস্ব ফ্ল্যাটে গিয়ে বাবা-মায়ের সাথে থাকে।

 

পেছন থেকে কেউ জড়িয়ে ধরতে অহির ঘোর কাটে।ঘোর কাটতে পেটের কাছে রোদ্দুরের কম্পমান হাতদুটো ছাড়ানোর চেষ্টা করল।কিন্তু রোদ্দুর ছাড়লো না।অহি রুদ্ধ কন্ঠে বলে উঠলো,

 

‘আপনি আমায় আর আগের মতো ভালোবাসেন না।’

 

‘কে বলেছে ভালোবাসি না?এই দেখো অজান্তা।তোমায় ছাড়া আমি নিঃশ্বাস নিতে পারি না।দম বন্ধ হয়ে আসে।সবকিছু ফাঁকা ফাঁকা লাগে।একমাত্র তোমার কাছে এলে বুকে সুখের ব্যথা শুরু হয়,নিজেকে বড্ড বেশি অগোছালো মনে হয়।একমাত্র তোমায় ছুঁয়ে দিলে অনুভূতির জোয়ারে ভেসে যাই,অজানা ভয় আর লজ্জায় কুঁকড়ে যাই।আমার সব অনুভূতি যে অজান্তা অহি নামক মেয়েটির জন্য।’

 

চোখের পানিতে অহির গাল ভিজে উঠলো।রোদ্দুর তাকে ঘুরিয়ে স্বযত্নে গাল মুছে দিল।বাইরে থেকে বন্ধ করা দরজার দিকে এক পলক চেয়ে অহির গায়ের সাদা এপ্রোণ খুলে ফেলল।ওড়নায় হাত দিতেই অহি খপ করে হাত ধরে ফেলল।চমকে বলে উঠলো,

 

‘কি করছেন?’

 

‘তোমার গরম লেগেছে নিশ্চয়ই।সেজন্য সরিয়ে ফেলছি!’

 

‘এত ঠান্ডা আবহাওয়ায় গরম কেন লাগবে?তাছাড়া এসি চলছে।আমার তো শীতে জবুথবু অবস্থা।’

 

রোদ্দুর কেঁদে দিয়েছে প্রায়!এই মেয়েকে আর কি করে বুঝাবে সে!এর বেশি বুঝানো তার পক্ষে সম্ভব নয়!সে অসহায় মুখ করে ঘুরে দাঁড়াতে অহি  একটানে ফের নিজের দিকে ঘুরাল।মুচকি হেসে উঁচু হয়ে রোদ্দুরের মুখের সর্বত্র এলোপাথাড়ি চুমু খেল!

 

মাঝরাতে অহিকে বুকে জড়িয়ে রোদ্দুর তার পিএ ইউনুসকে লম্বা একটা মেসেজ লিখলো।যার সারমর্ম এই যে,সে আর সিনেমা জগতে কাজ করবে না।শখের বশে তিনটে ছবি করেছে।তার চতুর্থ ছবি “হ-য-ব-র-ল” এর টিজার বের হয়েছে।ইতোমধ্যে সেটা সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।অনেক টাকাও ইনকাম করেছে।আর  মুভি টুভিতে কাজ করবে না।এখন সে বউ নিয়ে দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়াবে।ঘোরাঘুরি শেষ হলে ফুড ব্লগিং দিয়ে শুরু করে বাবার বিজনেসে হাত দিবে।তার জীবনের এখন একটাই লক্ষ্য।সেটা হলো সুযোগ পেলেই বউয়ের আঁচল ধরে পেছন পেছন ঘুরঘুর করা আর ডাক্তার বউয়ের কাছে নানাবিধ রোগের চিকিৎসা নেয়া!অজান্তা অহি আর তার পরিবারকে ঘিরে বেড়ে উঠা তার একান্ত ছোট্ট পৃথিবী ভয়ানক সুন্দর যে!এর বাইরে তার কিছু চাই না!চাই না!

 

*সমাপ্ত*

 

আসসালামু আলাইকুম।গল্পটি দুটো পদ্ধতিতে শেষ করা যেত।চলন্ত ট্রেনে শেষ না করলে অনেক বড় হয়ে যেত,সেজন্য চলন্ত ট্রেনে শেষ করে দিয়েছি।কেউ বকা দিবেন না আমায়।আগামীকাল থেকে “পরিশিষ্ট ২” শুরু করবো ইনশাআল্লাহ।শেষটা খাপছাড়া হয়েছে হয়তো!ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইলো।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।