কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি 

পর্ব ১

রুকসাত জাহান 

 

আশিকের মেজাজ খারাপ হচ্ছে, ইদানীং রোজ রোজ অফিস যাওয়ার আগে এই এক কাহিনী। পূর্ণা বাথরুমে ঢুকে বসে আছে। একে তো উঠবে সাড়ে সাতটার পর এরপর বাথরুমে ঢুকে আরো পনেরো বিশ মিনিট নষ্ট করবে। নিজের বাসা হলে কিচেনে কিছু গরম করে খেয়ে নিতো আশিক। কিন্তু  শ্বশুর বাড়িতে এখনো আশিক ঠিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। তাছাড়া কিচেনে কাজের মহিলা কাজ করছে। তাকে বলে নাস্তা করলে দেখা যাবে পূর্ণা উল্টো রাগ করেছে। আশিকের সব কিছু পূর্ণা নিজের হাতে করতে চায়, সকালে নাস্তার রুটি থেকে রাতে ঘুমানের আগে গরম দুধ, সব কিছু ও নিজে তদারকি করে।

 

এমনিতে পূর্ণা সবসময় ভীষন খেয়াল রাখে ওর।

কিন্তু গত কিছু দিন ধরে রোজ সকালে এমন করছে।

আবার যদি আশিক না খেয়ে বের হয়, তাহলে আরেক অশান্তি করা শুরু করে। ইদানীং রোজ সকালে দেরি করার ফলে প্রায়ই অফিসের গাড়ি মিস হচ্ছে। এরপর রিকসা বা সিএনজিতে অফিস যেতে হচ্ছে। 

আশিকের অফিস মহাখালী। ফার্মগেটের কাছে পশ্চিম রাজাবাজারে স্ত্রী পূর্ণার বাবা চারতলা বিল্ডিং করেছেন। বিয়ের পর আশিক এই বাড়িতেই থাকে এখন। রোজ সকাল আটটার ভেতর নাস্তা সেরে মেইন রোডে এসে দাঁড়ায়। কলাবাগান, ধানমন্ডি বত্রিশ, আর পান্থপথ হয়ে বাকি কলিগদের তুলে গাড়ি আসে এই রোডে, আশিক গাড়িতে উঠলে ফার্মগেট হয়ে রওনা দেয় মহাখালীর দিকে।

 

আশিক, পূর্ণার বিয়ের সাত মাস চলছে। আগে আশিক মহাখালী আবাসিক এলাকায় অন্য অবিবাহিত কলিগের সাথে বাসা শেয়ার করে থাকতো। কিন্তু বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে উঠেছে। আসলে বলা যায় উঠতে বাধ্য হয়েছে। আশিকের শ্বশুর মারা গিয়েছেন দুইবছর আগে। শ্বশুর মারা যাওয়ার এগারো মাস আগে, এক এক্সিডেন্টে প্যারালাইজড হয়ে শাশুড়িও হুইল চেয়ারে আটকা পড়েছেন। হাঁটাচলা করতে পারেন না এখন। পূর্ণার ভাই নেই, পিঠাপিঠি ছোটবোনের নাম পল্লবী। পল্লবী এমবিবিএসে পড়ছে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে, ভীষণ ভালো ছাত্রী। পড়ালেখার সুবিধার জন্য  ঢাকার ভেতর বাসা হওয়ার পরও হোস্টেলে উঠেছে। ছুটিছাটায় বাসায় আসে, অন্য সময় হলেই থাকে। পূর্ণা অবশ্য মধ্যম মানের ছাত্রী, তেজগাঁও কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স শেষ করেছে। মাস্টার্সের প্রস্তুতি নিচ্ছে এখন।

 

বিয়ের সময়ই এ কথা পরিষ্কার করে জানতো আশিক যে বিয়ের পর পূর্ণাদের বাড়িতেই থাকতে হবে।

পূর্ণার বাবা জয়নুল আবেদীন সাহেব তার চাচার বন্ধু ছিলেন। পূর্ণার সাথে আশিকের বিয়েটা চাচাই দেন।

যদিও ঘরজামাই হতে হবে, এই বিষয়টা চিন্তা করে আশিক শুরুতে বিয়েতে না করতে চেয়েছিলো।

কিন্তু আশিকের চাচা অন্তত একবার মেয়ের সাথে দেখা করে সিদ্ধান্ত নিতে বলেন। মা সুস্থ  আর বাবা জীবিত থাকলে হয়তো পূর্ণার পরিবার আশিকের সাথে মেয়ের বিয়ের কথা চিন্তাও করতো না। নাহ, আশিক ছেলে ভালো, ঢাকা ভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছে, 

কেমিস্ট্রির ছাত্র ছিল। এখন ভালো চাকরি করছে। কিন্তু আশিক অনাথ, চাচা চাচী ছাড়া আর আপন কেউ নেই, বলার মতো পারিবারিক কোন সহায় সম্পদও নেই। পূর্ণার মা হাসনাহেনা বেগম মেয়ের জন্য ভালো পরিবারের এমন কোন ছেলেই খুঁজছিলেন যে বিয়ের পর তাদের সাথে থাকবে। শুধু মেয়ের জামাই না, পূর্ণা আর পল্লবীর অভিভাবকও হবে। তাই তিনি স্বামীর বন্ধু হাসান সাহেবকে মেয়ের জন্য একটা ভালো ছেলে দেখে দিতে বলেন। হাসান সাহেব তখন নিজের ভাতিজা আশিকের কথা জানান। আশিকের যেহেতু বাবা মা কেউ বেঁচে নেই, তাই বিয়ের পর আশিক ওনার ছেলের মতোই হবে, এমনটাই আশা করে রাজি হয় হাসনাহেনা বেগম। 

 

কার এক্সিডেন্টে যখন বাবা মা মারা যায়, আশিক তখন সবে দশম শ্রেণির ছাত্র। এরপর বলতে গেলে চাচা চাচীর আশ্রয় আর সাহায্যে এতদূর এসেছে আশিক। চাচার দুই মেয়ে, বয়সে আশিকের কয়েক বছরের ছোট। কমবয়সী ছেলে মেয়ে একসাথে এক বাসায় রাখা ঠিক হবে না ভেবে, চাচা চাচী ওর থাকার ব্যবস্থা করেন মেসে। আশিক বুঝতো ব্যাপারটা। আর তাই সব সময় চাচাতো বোন দিশা এবং দীপ্তি থেকে একটু দূরত্ব বজায় রেখে চলতো। ছুটির সময় ছাড়া যখন তখন চাচার বাড়িতে খুব একটা যেতো না। তবে চাচা চাচীর প্রতি আশিক কৃতজ্ঞ, অন্তত তারা আর্থিক ভাবে তাকে কখনো কষ্টে পড়তে দেননি। এই স্বার্থপর দুনিয়ায় এটুকুই বা কয়জন করে! তাছাড়া চাচা চাচী হিসেবে যতটুকু স্নেহ করা দরকার, তাও তারা দিয়েছেন। তাই সেই চাচা যখন নিজের বন্ধুর মেয়ের সাথে আশিকের বিয়ে দিতে চান, আশিক সরাসরি না করতে পারে না।

 

সিদ্ধান্ত নেয় পূর্ণার সাথে দেখা করবে। পরে না হয় বুঝিয়ে বলবে যে সে একটা আলাদা সংসার চায়,

আশ্রিত জীবন না। নিজে একটা সংসারের চালক হতে চায় আশিক। বাবা মা মারা যাওয়ার পর যে নিঃসঙ্গতার দেয়াল ওকে ঘিরে রেখেছে, সেই দেয়াল কোন রমনীর ভালোবাসা এসে ভাঙুক, এই চাওয়া তার দীর্ঘদিনের। কিন্তু নিজেকে গড়তে এত বেশি মগ্ন ছিল যে ভার্সিটি লাইফে কখনো প্রেমে জড়ানো হয়নি তার।

প্রেম যে মনের দুয়ারে কড়া নাড়ে নি, তা নয়। তবে সসম্মানে সে তা ফিরিয়ে দিয়েছে। সে সময় শুধু নিজের পায়ে দাঁড়ানো ছাড়া আর কিছু তার মাথায় ছিল না।

 

চাচার ঠিক করা নির্দিষ্ট দিনে আশিক পূর্ণার সাথে দেখা করে পান্থপথের টংঘর রেস্টুরেন্টে। পান্থপথ সিগন্যালের কাছে ছোট একটা রেস্টুরেন্ট, তবে আশেপাশের স্টুডেন্ট আর ব্যাচেলরদের কাছে বেশ জনপ্রিয়, কারণ রকমারি চায়ের আয়োজন রয়েছে এখানে। জায়গাটা অবশ্য পূর্ণাই ঠিক করেছে। তবে শুরুতে আশিকের মনে হচ্ছিল খুব কোলাহলময়, বিয়ে জাতীয় আলোচনার উপযুক্ত নয়। হয়তো অচেনা ছেলের সাথে নিরিবিলি কোথাও বসতে পূর্ণার অস্বস্তি লাগছিলো, তাই এই জায়গা ঠিক করেছে। তবে কিছুক্ষণ পর এই কোলাহল, এই হৈচৈ, কিছু যেন আর আশিককে স্পর্শ করলো না। পূর্ণার সাথে কাটানো সেই  চল্লিশ মিনিটে আশিক তার সিদ্ধান্ত বদল করে। এত মিষ্টি একটা মেয়েকে তো আর ফেরানো যায় না!

 

টলমলে চোখ, মিষ্টি হাসি, আর সুন্দর মুখে বসে থাকা একটা চাপা বিষন্নতা, সবকিছু যেন ভীষণ ভাবে টানলো আশিককে। নিজের মতো পূর্ণাকেও তার এক নিঃসঙ্গ মানুষ মনে হলো। যে মানুষের ভীরে থেকেও একা। এরপর খুব দ্রুত ছোটখাটো আয়োজনে বিয়ে হয়ে যায় তাদের। বিয়ের পর আশিক পূর্বের কথা অনুযায়ী শ্বশুর বাড়িতে থাকতে শুরু করে।

 

বিয়ের পরের দিনগুলো যেনো স্বপ্নের মতো কেটেছে।

এত যত্ন আর ভালোবাসা আশিক আগে কোনদিন পায়নি। আশিকের পুরনো ক্ষতগুলোর মলম হয়ে যেন জীবনে এসেছে পূর্ণা। সকালে চুড়ির রিনিঝিনি শব্দে যখন ঘুম ভাঙতো, নিজেকে পরিপূর্ণ সুখী একজন মানুষ মনে হতো আশিকের। শাড়ি পরা নারী আশিকের ভীষণ ভালো লাগে, একদিন কথায় কথায় বলেছিল পূর্ণাকে। এরপর থেকে সব ছুটির দিনে বাসায় শাড়ি পরে পূর্ণা। আশিকের প্রিয় খাবার, আয়রন করা কাপড়, সব কিছু নিজের হাতে রেডি করে পূর্ণা। আপাতদৃষ্টিতে তাদের সোনার সংসার বলা চলে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ধ্যান ভাঙে আশিকের, নাহ আর অপেক্ষা করলে আজও গাড়ি মিস হবে।

“পূর্ণা আমি গেলাম, অফিসে খেয়ে নেবো।”

 

পূর্ণা বাথরুম থেকে বের হওয়ার আগেই দরজা খুলে বের হয়ে যায় আশিক। পূর্ণাও সাথে সাথে বের হয়ে আসে, কিন্তু ততক্ষণে ছুটা কাজের খালা সদর দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। পেছন পেছন গেট পর্যন্ত গিয়েও আশিককে পায় না পূর্ণা। পল্লবী রুমেই ছিলো। ছুটি চলছে বলে ইদানীং বাসাতেই তার বেশি থাকা হয়।পুরো ঘটনায় সে নিরব দর্শক। সে জানে এখন বাসায় ফিরে পূর্ণা তোলপাড় করে ফেলবে। হয়তো কাজের খালার কাজই চলে যাবে। গত সাত মাসে চারজন সহযোগী খালা পরিবর্তন হয়েছে। আগে ওদের একটা বাঁধা মেয়ে ছিল শেফালী। শেফালী,  হাসনাহেনা বেগমের দেখাশোনা করার পাশাপাশি ঘরের টুকটাক কাজও করতো। পূর্ণার বিয়ের কিছু দিন আগে হঠাৎ শেফালীকে বাদ দেওয়া হয়েছে। পূর্ণা নাকি এখন মাস্টার্সে ভর্তি হবে না, তাই নাকি সে একাই মায়ের দেখাশোনা করতে পারবে!

 

পল্লবী বোঝে পূর্ণার কিছু সমস্যা হচ্ছে, তবে সচেতন ভাবেই হোক আর অবচেতন ভাবেই হোক, এর পিছনে কিছুটা হাত হয়তো হাসনাহেনা বেগমেরও আছে।

পূর্ণা উপরে উঠে এসেছে, তবে বিস্ময়কর ভাবে কোন হৈচৈ করলো না। শান্ত ভাবে রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়, এমনকি আশিককে পর্যন্ত কল দেয় না। আশিক অফিসে আসার পথে বারবার ফোন চেক করেছে, কিন্তু পূর্ণার কোন ম্যাসেজ বা কল আসেনি দেখে সে নিজেও অবাক হয়। এর আগে যে দুইদিন সে এমন হঠাৎ বের হয়েছে পূর্ণা রীতিমত ঝগড়া করেছে তার সাথে।

 

“কেন না খেয়ে বের হলে? কী এমন অফিসের তাড়া?

কেন অপেক্ষা করলে না?”

 

এমন সব বিব্রতকর প্রশ্নে আশিকের মেজাজ খারাপ করে দেয়। প্রতি পাঁচ মিনিট অন্তর ফোন আর ম্যাসেজের জ্বালায় অস্থির হয়ে গিয়েছিল আশিক।

শেষে বিরক্ত হয়ে ফোন বন্ধ করলে হয় আরেক বিপদ, 

অফিসের রিসিপশনে বারংবার কল করতে থাকে পূর্ণা।

অফিসের কলিগরা অবশ্য তার বৌ ভাগ্যে ঈর্ষাতুর।

তারা নাকি কেউ কেউ সকালের নাস্তা টা বাইরেই সারে,

কেউ নিজে গরম করে খায়।কারও কারও স্ত্রী নিয়মিত গরম নাস্তা টেবিলে হাজির করে ঠিক, কিন্তু কোনদিন না খেয়ে আসলে এত অস্থির হয় না। নিজ হাতে স্বামীর কাপড় আয়রন করে না, না খেয়ে বসে থাকে না,

প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় ফোন করে না।

 

আশিক ওদের কিভাবে বোঝাবে এই ভালোবাসা এখন ওর গলার ফাঁস হয়ে গিয়েছে। আসলে পূর্ণা খুব লক্ষী একটা মেয়ে। বেশিরভাগ পুরুষ মনে মনে যেমন স্ত্রী আশা করে ঠিক তেমনই। বিয়ের পর শুরুতে তাই সে প্রচন্ড সুখী একজন মানুষ ছিল। কিন্তু যতদিন যাচ্ছে আশিকের নিজেকে খাঁচায় বন্ধী এক পাখির মতো লাগে।

 

(চলবে)

 

কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি 

পর্ব ২

 

গাড়ি চলতে শুরু করেছে। আশিক চোখ বন্ধ করে নিজের অবস্থা চিন্তা করে। পূর্ণাকে কষ্ট দিতে ভালো লাগে না ওর। কিন্তু পূর্ণাও কেন বোঝে না যে ওর এই অতিরিক্ত যত্ন, জবাবদিহিতায় আশিকের হাসফাঁস লাগে। ঠিক যেন সোনার খাঁচায় বন্দী পাখির মতো।

 

পরিষ্কার পানি, খাদ্য, থাকার জন্য ঝকঝকে সোনার খাঁচা, সব থাকে পাখির। থাকে না শুধু স্বাধীনতা। আশিক কী পরবে, কী খাবে, কোথায় যাবে, কতক্ষণ থাকবে সব পূর্ণা নিজে ঠিক করতে চায়। কোন কিছু তার ইচ্ছের বাইরে হলে কেমন অস্থির হয়ে যায়। বিয়ের পর পূর্ণার এইদিকটা বুঝতে সময় লেগেছিল। পূর্ণার বাসায় থাকা শুরু করলেও ঘরজামাই ধরনের অস্বস্তিতে তখনও ভুগতে শুরু করেনি আশিক। কারণ পূর্ণা অসম্ভব খেয়াল রাখতো তার, শাশুড়ি মা আদর করতেন, শালীর সাথেও সম্পর্কটা সহজ ছিল। ছুটিরদিনগুলো নিয়মিত বাইরে ঘুরতে যেত, আর চেষ্টা করতো মাসে অন্ততঃ একবার চাচার বাসায় যাওয়ার। চাচা চাচী না চাইলেও নিজের বেতনের একটা অংশ সে চাচীর হাতে দিত। একসময় এই দিনটার জন্য সে সবসময় অপেক্ষা করেছে। তাই সামর্থ হওয়ার পর সে ছেলের মতো চাচার পাশে থাকবে ঠিক করেছিল।

 

এখন আশিক বিবাহিত, বৌ নিয়ে যখন চাচার বাসায় যায় তারা খুশিমনে ওদের গ্রহণ করেন। পূর্ণাকে যথেষ্ট আদর দিতেন। আশিক ভাবতো পূর্ণা নিশ্চয়ই খুশি হয় যে শ্বশুর শাশুড়ি জীবিত না থাকলেও তাদের পক্ষ থেকে আদর ভালোবাসাটা চাচা শ্বশুর চাচা শাশুড়ি দিচ্ছেন। চাচাতো বোন দিশা আর দীপ্তিও ভাই ভাবিকে পেয়ে ভীষণ খুশি হতো। তবে ধীরে ধীরে আশিক বুঝতে পারে পূর্ণা ঐ বাড়িতে আর যেতে চাইছে না। যাওয়ার কথা বললেই তার মাথা ব্যথা না হয় জ্বর জ্বর লাগা শুরু হতো। এমন না যে টাকা দিতে আটকানোর জন্য এসব করছে। আশিক দেওয়ার আগেই মাসের পাঁচ তারিখের মধ্যে চাচার নাম্বারে পূর্ণা নিজে টাকা বিকাশ করে দিত। বাড়ি ভাড়ার টাকা থেকে দুইবোনকে কিছু কিছু টাকা শ্বাশুড়ি  হাসনা বেগম নিয়মিত হাত খরচ হিসেবে দেন। সেই টাকা থেকেই পূর্ণা আগে আগে বিকাশ করে দেয় চাচাকে। 

 

কয়েকমাস পর চাচা নিজেই আশিককে ফোন দিয়ে টাকা দিতে নিষেধ করে দেন। কেননা আগে ব্যাপারটা আন্তরিকতার ছিলো, কিন্তু এখন এভাবে বিকাশ করা চাচা চাচীর কাছে অস্বস্তিকর লাগতে শুরু করেছে।

ওনারা নিজেদের টাকার লোভী ভাবতে চান না।

আশিক যখন নিজে এসে টাকা দিত তখন ওকে নিজেদের ছেলে ভেবে নিতেন, এখন পূর্ণা বিকাশ করায় তা কেমন অপমান লাগে। এ নিয়ে পূর্ণা আর আশিকের প্রথম মনোমালিন্য হয়। 

 

“পূর্ণা, চাচী তোমাকো ফোন দিয়েছিলেম?”

 

“হ্যাঁ।”

 

“কী বললেন?”

 

“তেমন কিছু না।”

 

“সেই কিছু নাই টা বা কী, তাই জানতে চাই।”

 

“ঐ তো ওনাদের বাসায় যেতে বললেন।”

 

“তুমি কী বলেছ?”

 

“বলেছি তুমি অফিস করে ক্লান্ত থাকো। সপ্তাহে একদিন একটু রেস্ট নাও।”

 

“আর কিছু বলোনি?”

 

“আর কী বলবো!”

 

“টাকার কথা কিছু বলেছ?”

 

“খারাপ কিছু বলিনি আশিক। বলেছি টাকার কথা ভাবতে না, আমি বিকাশ করে দেব।”

 

“এই কথা কেন বলতে গেলে! ওনারা কী কোনদিনও আমার কাছে টাকা পয়সা চেয়েছেন? তেমন লোভী মানুষ হলে আমার দায়দায়িত্বই নিতেন না। এই আশায় ওনারা আমাকে দেখাশোনা করেননি যে আমি ওনাদের টাকাপয়সা দিয়ে সাহায্য করবো।”

 

“তা হবে কেন! কিন্তু মূলত তুমি তো এইজন্যই যেতে যেন ওনাদের হাতে টাকা দিতে পারো। তো এখন যেহেতু টাকা পৌঁছানোর বিকল্প মাধ্যম আছে, তখন ওনাদের বাসায় এত যাওয়ার কী প্রয়োজন!”

 

“পূর্ণা, আমি ওনাদের সাথে দেখা করতে যাই। শুধু টাকা দেওয়া উদ্দেশ্য না। তোমার ভালো না লাগলে যেও না। আমি আমার মতো যাব।”

 

“তা তো যাবাই। কমবয়সী সুন্দরী কাজিনদের সাথে আড্ডা দিতে ভালো লাগে।”

 

“মানে? দিশা আর দীপ্তির কথা বলছো? ওরা আমার ছোটোবোন। আড্ডা দিলে সমস্যা কই? ওরা তোমার সাথেও আড্ডা দেয়। দেয় না?”

 

“কাজিন আর বোন এক না। একটা সময় পর কাজিন, শালী, দেবর এদের সবার কাছ থেকে একটা দূরত্ব রাখতে হয়।”

 

আশিক বোঝে অবিবাহিত দুই চাচাতো বোন থাকায় পূর্ণা আশিককে ঐ বাসায় যেতে দিতে চায় না। কিন্তু প্রচন্ড অভিমান হয় আশিকের। পূর্ণাকে ছাড়াই সে একদিন চলে যায় চাচার বাসায়, সারাদিন সেই বাসাতেই কাটায়। কিন্তু শাশুড়ির জরুরি ফোন পেয়ে সন্ধ্যায় তড়িগড়ি করে ফিরে আসে। বাসায় এসে তার জন্য এক বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। পূর্ণা ঘুমের ঔষধ খেয়েছেিল একটি দুটি না, পুরো বিশটি। বাসার অন্য কেউ শুরুতে বুঝতে পারেনি, ভেবেছে পূর্ণা ঘুমাচ্ছে। যখন বুঝতে পারে, তখন কান্না কাটি আর হৈচৈ পড়ে যায়। এই অবস্থা দেখে পাগল পাগল লাগে আশিকের, সামান্য ব্যাপারে কেউ এমন করতে পারে, তা আশিকের ধারণারও বাহিরে। এরপর পূর্ণাকে হাসপাতালে নেওয়া, স্টোমাক ওয়াশ করা,

এসব করার ফাঁকে চাচার কানেও খবর চলে যায়।

 

চাচা চাচী কী বুঝলেন জানে না আশিক, তবে তারপর তারা স্পষ্টই আশিককে বাসায় আসতে নিষেধ করে দেন। এ ঘটনা মাত্র দুইমাস আগের। এরপর থেকে এত ভয় পেয়েছে আশিক, পূর্ণার মতো শান্ত মেয়ের এমন অদ্ভুত জিদের কারণ বোঝে না ও। আশিককে নিয়ে একটা অবসেশনে ভুগছে যেন পূর্ণা। পারলে আশিককে সারা দুনিয়া থেকে সে আড়াল করে রাখে। নিজের বোনের সাথেও আশিকের মেলামেশা পছন্দ করে না।

আশিক যখন চায়, পূর্ণা কাছে আসার আবদারে সাড়া দেয়। রাত দুটো বাজেও যদি যদি মনমতো কিছু  খেতে চায়, পূর্ণা বানিয়ে দেবে কোন রকম বিরক্তি ছাড়া। কিন্তু আশিক যদি কলিগদের সাথে বাইরে খেতে যায়, তবেই ও পাগলামি শুরু করে। না খেয়ে থাকবে, বারবার ফোন দেবে। পূর্ণার ভালেবাসার অত্যাচারে অতিষ্ঠ এখন আশিক। এই যে একমাত্র শ্যালিকা পল্লবী, ওর সাথেও যখন তখন কথা বলতে পারে না আশিক। পূর্ণার সদা জাগ্রত চোখ ওকে বিব্রত করে রাখে।

কলেজ বন্ধ বলে পল্লবী বাসায় থাকায়, ড্রয়িং রুমে টিভিও দেখা হয় না এখন। পূর্ণা রুমেই নতুন টিভি সেট করে দিয়েছে। এমনকি পল্লবী খাওয়ার আগে বা পরে আশিকের জন্য খাবার টেবিল সাজায় পূর্ণা।

 

আগে রিসার্স পেপারের কাজে ঢাকার আশেপাশে ফিল্ডে গিয়ে এক দুই দিন থাকতো আশিক। এখন তাও পারে না। যত রাতই হোক ঢাকায় ব্যাক করতে হয়। না হয় সারারাত একটু পর পর ভিডিও কল করে পূর্ণা। না নিজে ঘুমায়, না আশিককে ঘুমাতে দেয়। অন্য কলিগরা বিরক্ত হয়, পরেরদিন অফিসে এসে হাসাহাসি করেন।

 

দুই একজন আশিকের চারিত্রিক সমস্যা আছে বলে সন্দেহ করেন, ভাবেন তাই হয়তো আশিকের বৌ এমন করে। যদিও বাকিরা সমর্থন করেন না, চারিত্রিক সমস্যা থাকলে তো তারা আগেই টের পেতেন। শ্যালিকা পল্লবীও বোনের বিষয়টা বোঝে, তাই যতক্ষন বাসায় থাকে, দুলাভাইকে এড়িয়ে চলে। এই ব্যাপারগুলো আশিকের কাছে অপমানজনক লাগে। অথচ পূর্ণার কাছে যেন এটাই স্বাভাবিক। 

আজ ঝোঁকের বশে আশিক অফিসের জন্য বের তো হয়েছে, কিন্তু এখন কেমন ভয় ভয় লাগছে। কিন্তু কী করবে, ইদানীং রোজ সকালে পূর্ণা গাড়ি মিস করায়।

আশিকের ধারণা এটা পূর্ণা ইচ্ছাকৃত করায়।

 

পূর্ণা একটা বাঁধা কার বা সিএনজি  ঠিক করতে চাইছিল আশিকের জন্য। অন্য কলিগদের সাথে একই গাড়িতে আসা যাওয়া করা ওর পছন্দ না। আর না হয় পূর্ণা চায় আশিক চাকরি ছেড়ে দিক। ওদের এই চারতলা বাড়ির অর্ধেক তো পূর্ণাই পাবে, বাবার রেখে যাওয়া ফিক্সড ডিপোজিট আছে, টুকটাক অন্য সম্পদ আছে, অযথা আশিক চাকরি করার কী দরকার, এটাই যুক্তি পূর্ণার।

 

এমন অযাচিত আবদারে আশিকের বিপন্ন লাগে। এখন তার মনে হয়, সেদিন বিকেলে সেই টলমলে চোখ, আর মায়াবী চেহারার প্রেমে পড়া তার ভীষণ ভুল হয়েছে। নাহ্, সে এখনো পূর্ণাকে আগের মতোই ভালোবাসে, কিন্তু পূর্ণার এই সন্দেহ প্রবণতা,এই পজেসিভ ভালোবাসা, এসবে এখন তার দমবন্ধ লাগে।

ভালোবাসা তো নির্মল বাতাসের মতো হওয়া উচিত।

ভালোবাসায় মুক্তি আর বিশ্বাস থাকতে হয়, এই সহজ জিনিসটা পূর্ণা কেন বোঝে না।

 

অফিসে নির্বিঘ্নে পৌঁছে হাফ ছেড়ে বাঁচে আশিক।কিছুক্ষণ পর কাজে এমন ডুবে যায় যে পূর্ণাকে নিয়ে করা দুশ্চিন্তা মন থেকে উবে যায়। তাছাড়া তেমন কিছু হলে শ্বাশুড়ি বা পল্লবী ফোন দিতো নিশ্চয়ই। সেদিনের ঘটনার পর থেকে সবাই পূর্ণাকে চোখে চোখে রাখে।মনটা একটু হালকা হয় আশিকের, হয়তো পূর্ণা ম্যাচিউর হচ্ছে সময়ের সাথে সাথে। আশিকের রুমে লারা এসেছে, জরুরি কিছু কাগজপত্র নিয়ে। লারা আর আশিক একসময় ক্লাসমেট ছিলো, সেই সূত্রে তাদের বন্ধুত্ব। 

 

লারা এতদিন দেশের বাইরে ছিল। স্বামীর সাথে বনিবনা না হওয়ায় দেশে ফিরে এসেছে। এখানেই জয়েন করেছে। কথায় কথায় লারার দুর্ভাগ্য নিয়ে কথা বলেছিল একদিন পূর্ণার সাথে। লারার জন্য খুব সমবেদনাই দেখিয়েছিল পূর্ণা। কাজ শেষ হওয়ার পর আশিকের রুমে এক কাপ চা নিয়ে বসে লারা, তার মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করানোর ব্যাপারে আশিকের সাথে একটু পরামর্শ করতে চায়। আর তখনই ঝড়ের মতো আগমন পূর্ণার! পূর্ণাকে অফিসে দেখে আশিক ভয় পেয়ে যায়। পূর্ণা স্বাভাবিক ভাবেই লাঞ্চ বক্সটা আশিকের টেবিলে রাখে। এরপর লারার সাথে পরিচিত হয়, “আপনি নিশ্চয়ই লারা আপু?”

 

লারা তো আর এত কিছু জানে না, সে বন্ধু-পত্নী রূপে দেখছে পূর্ণাকে। হাসিমুখে পূর্ণার সাথে কথা বলতে থাকে লারা।

 

(চলবে)

 

কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি 

পর্ব ৩

 

আশিক ভেতরে ভেতরে আতংকে অস্থির হয়ে যায়। লারা অবশ্য পূর্ণার মানসিক অস্থিরতার ব্যাপারে কিছুই জানে না। তাই স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলতে থাকে। আশিক লারাকে তাড়া দেয়,

“লারা, তোর ফাইলটা আমি দেখে রাখবো। আর লামিয়া মামনীর স্কুলের ব্যাপারেও খোঁজ নেব। তোর দেরি হচ্ছে না? চাইলে উঠতে পারিস।

 

পূর্ণা বাঁধা দিয়ে বলে,

 

“লারা আপুর দেরি হলে আপুই উঠবেন। এতক্ষণ গল্প করছিলে তখন দেরি হচ্ছিল না। আর আমি আসতেই আপুকে ভাগিয়ে দিচ্ছ কেন বলতো?

 

“আরে না পূর্ণা,আমি মাত্রই আসলাম। আর আসলেই উঠবো। মেয়েটার স্কুলের ব্যাপারে খোঁজ খবর নিতে হবে।”

 

তারপর আশিকের দিকে ফিরে বলে,

 

“Thanks a lot দোস্ত। এখানে আসার পর থেকে তোর কাছে যতটা সাহায্য পেয়েছি, নিজের আত্মীয় স্বজন হলেও এতটা করতো না। আর হ্যাঁ বাসাটা কিন্তু খুব ভালো হয়েছে। লামিয়ার খুব পছন্দ হয়েছে। পূর্ণা তুমি খুবই লাকি মাশাল্লাহ। “

 

আশিক ফ্যাকাসে মুখে মাথা নাড়ে। আজ না জানি পূর্ণা কী সিনক্রিয়েট করে!

 

“জ্বি আপু, আমি আসলেই লাকি। আমার স্বামীকে সবাই এত পছন্দ করে। বিশেষ করে তার নারী ভক্তের শেষ নাই।”

 

“হা হা! কন্যা রাশির ছেলেদের মনে হয় নারী ভক্ত বেশি থাকে। তবে ভার্সিটিতে কিন্তু ওকে এমন ছুপা রুস্তম মনে হয়নি। শান্ত শিষ্ট ছেলে ছিল। এখন তো দেখি এই কর্পোরেট কোম্পানিতে সে চটপটে তরুণ কর্মকর্তাদের একজন।”

 

“আমারও ওর চরিত্রের এই দিক অজানা ছিল আপু। আমিও জানতাম ও সহজ সরল একজন। এখন দেখি একই অঙ্গে কত রূপ।”

 

“মানে?”

 

“দুষ্টুমি করলাম আপু। বাসা নিয়েছেন নাকি আপু? আঙ্কেল আন্টির সাথে থাকছেন না?”

 

“আমার আব্বা আম্মা আসলে আমার এভাবে চলে আসার ব্যাপারটা একদম নিতে পারছেন না। জানো তো আমি রাগ করে চলে এসেছি। ওনারা তাই আমার উপর রাগ করে আছেন। ওনাদের সাথে থাকলেই বারবার ফিরে যেতে চাপ দিবেন। তাই আপাততঃ মেয়েকে নিয়ে ছোটো একটা বাসায় উঠতে চাইছিলাম। কিন্তু নিরাপত্তা একটা বড়ে ইস্যু জানো তো।”

 

“তা তো অবশ্যই। আপনি একা একজন। চাইলে আমাদের বাসায় উঠতে পারতেন লারা আপু। আমাদের নিজেদের বিল্ডিং। আপনার জন্য একটা ফ্ল্যাট খালি করে দিতাম।”

 

“নাহ্। আর প্রয়োজন নেই। বাসা পেয়েছি। এই তো অফিসের কাছেই। আশিকের চাচা যে বিল্ডিং এ থাকেন সেখানেই। আশিক নিয়ে ওনাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। খুবই আন্তরিক মানুষ। লামিয়া তো ওনাদের পেয়ে সেই খুশি। ওনাদের মেয়ে দু’জনই খুবই মিশুক।”

 

“বাহ্ আপু। আসলেই ওনারা খুব ভালো। ভালোই হলো আপনি ওনাদের সাথে উঠছেন। আশিকও নিশ্চিন্ত হলো। আচ্ছা আপু আমি আজ উঠি। বাসায় আসবেন কিন্তু।”

 

এভাবে হাসিমুখে লারার সাথে পূর্নাকে কথা বলে বিদায় দেখে বুকের উপর থেকে পাথরটা যেন নেমে যায় আশিকের। নিঃশ্বাস ছাড়ে স্বস্তির।

 

“ও কী পূর্ণা! লাঞ্চ বক্স নিয়ে যাচ্ছ যে?”

 

“এটা তো আর লাগবে না আপু। আপনারা নিশ্চয়ই বাইরে লাঞ্চ করবেন।”

 

“আরে নাহ। আমি তো যাচ্ছি। বরং তুমি আর আশিক চাইলে বাইরে লাঞ্চ করতে পারো। লাঞ্চ বক্সটা চাইলে আমাকে দিতে পারো। আমার দুপুরের খাবার হয়ে যাবে। এমনিতেও তোমার রান্না কিন্তু দারুণ। মিস করতে চাই না।”

 

বলে হাসে লারা।

 

“আপনি আমার রান্না কবে খেলেন আপু?”

 

“এই যে তুমি লাঞ্চ বক্স দাও না। কত যত্ন করে খাবার দাও মাশাল্লাহ। এমনি এমনি কী আর আশিককে লাকি বলি! কত গুণবতী বৌ।”

 

“গুণ কে ভালোবাসে আপু? গুণবতী বৌয়ে মানুষের মন ভরে না। আচ্ছা আমি উঠি।”

 

আশিক তাড়াতাড়ি বলে ওঠে,

 

“বসো পূর্ণা। লাঞ্চ করবো একসাথে। এই ফাইলটা রেখেই উঠছি। চলো ক্যাপ্টেনসে যাই। প্লিজ।”

 

“আরে পূর্ণা বসো তো। এই লাঞ্চ বক্স আমি নিলাম। তুমি আজ আশিকের সাথে লাঞ্চ করে আসো। এত সুন্দর করে কেউ আমাকে প্লিজ বললে না করতে পারতাম না।”

 

“তাই? আচ্ছা আমি প্লিজ বলছি আপু। চলুন আপনিও আমাদের সাথে একসাথে লাঞ্চ করবেন।”

 

“আজ না পূণা আরেকদিন। উঠি হ্যাঁ।”

 

“আপু যাওয়ার আগে একটা প্রশ্ন করতে পারি? একটু ব্যক্তিগত। কিন্তু আমার জানা প্রয়োজন।”

 

“হ্যাঁ বলো।”

 

লারা পূর্ণার কথা বলার ধরনে একটু অবাক হয়।

 

“লারা আপু, আপনি স্বামীকে ছেড়ে এসেছেন কেন?

আশিকের সাথে কি আপনার সম্পর্কটা শুধুই বন্ধুত্বের? না এর বাইরেও কিছু আছে? থাকলে বলতে পারেন। আমি আপনাদের মাঝে বাঁধা হবো না।”

 

আচমকা এমন প্রশ্নে লারার মুখের রঙ পরিবর্তন হয়ে যায়, নিজেকে সামলে নিয়ে উত্তর দেয়, 

“না পূর্ণা, আশিক শুধুই আমার ক্লাসমেট আর বন্ধু। আমার হ্যাসবেন্ড বরং আমার ভালোবাসার মানুষ ছিল,

কিন্তু বিয়ের পর আমাদের বনিবনা হচ্ছিল না। ওর বেশকিছু অভ্যাস আছে যা আমার পছন্দ না। এগুলো নিয়েই সমস্যা। ওকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য আমি এখানে মেয়েকে নিয়ে চলে এসেছি। কিন্তু এখনো আমি ওকেই ভালোবাসি। আশিকের সাথে আমার বন্ধুত্বের বাইরে অন্য কোন সম্পর্ক নেই পূর্ণা।”

 

“বন্ধু আমাদেরও আছে আপু। কিন্তু কী জানি এমন বন্ধুত্বগুলো বুঝি না। কেমন জানি গাছেরটাও খাওয়া, তলারটাও কুড়ানো। নিজের স্বামীকে ভালোবাসেন, তাকে ধরে রাখতে, শিক্ষা দিতে এখানে এসে আরেকজনের স্বামী নিয়ে মজেছেন। ছিঃ!”

 

“পূর্ণা! এসব কী কথা বলছো! একটা শিক্ষিত মেয়ে হয়ে এত নিচু তোমার ভাবনা! আশিক আমি আজ উঠি। যা করেছিস তার জন্য ধন্যবাদ। তবে আমি তোর চাচার বাসায় উঠছি না।”

 

নিজেকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রেখেই নিচু গলায় বলে লারা। অফিসে, পাবলিক প্লেসে তামাশা করতে চায় না। এখানে কোন তামাশা হলে কালি ওর গায়েই বেশি ছিটবে। আশিকও পূর্ণার এই হঠাৎ আক্রমণাত্মক আচরণে ভীষণ বিব্রত হয়, এই ভয়ই সে মনে মনে পাচ্ছিল। কিন্তু পূর্ণাকে তার থামাতেই হবে, “

 

“পূর্ণা এসব কী উল্টোপাল্টা বলছ? মাথা ঠিক আছে তোমার? তুমি আসলে এইটা সন্দেহপ্রবণ সাইকো। স্যরি লারা তুমি কিছু মনে করো না। পূর্ণার মাথা ঠিক নেই”

 

আশিকের কথায় তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে পূর্ণা, চিৎকার করে বলে,

 

“আমি সাইকো! আমার মাথা ঠিক নাই! আর তুমি ঠিক? তোমরা সবাই ঠিক। নির্লজ্জ, চরিত্রহীন এই মহিলার জন্য তুমি আমাকে সাইকো বলো! বন্ধুত্ব শেখাও আমাকে! অবশ্য আমার স্বামীরই চোখ খারাপ। অন্যের কথা কী বলবো। ঘরের কাজের মেয়ে থেকে শুরু করে শ্যালিকা, কাজিন, কলিগ সবার দিকে নজর। কপালদোষে আমিও এমন স্বামীই পেলাম!”

 

অফিসের লোকজন উঁকিঝুকি মারতে শুরু করেছে। আশিকের মনে হচ্ছে ধরণী দ্বিধা হও! লারাও হতভম্ব হয়ে গিয়েছে। এমন কিছু হবে তা তার ধারণায়ও ছিল না। তাহলে পূর্ণা আসা মাত্র বের হয়ে যেত। তবু পূর্ণাকে শান্ত করার চেষ্টা করে।

 

“পূর্ণা, প্লিজ শান্ত হও। তুমি কী বলছো তুমি নিজেও জানো না। আশিক আর আমার পাশাপাশি তুমি নিজের সম্পর্কও শেষ করছো। দেখ সবাই দেখছে, শুনছে। কী ভাবছে সবাই! তুমি যা ভাবছো, তা ভুল। আমাদের মাঝে এমন কিছু নাই। আজকের পর থেকে আমি আশিকের সাথে আর কোন যোগাযোগ করবো না। তুমি নিশ্চিত থাকো। প্লিজ পূর্ণা, শান্ত হও।”

 

“আপনি যোগাযোগ না রাখলেও আশিক ঠিকই রাখবে। আশিক কিন্তু আপনাকে বেশ পছন্দ করে। বাসায় গেলে শুধু আপনার গল্প। আপনার একাকিত্ব নিয়ে তার খুব চিন্তা। দেখেন না আপনার সাথে এক গাড়িতে আসার জন্য সকালে নাস্তা না করেই বের হয়ে যায়।”

 

হাসতে হাসতে বললেও পূর্ণার চোখে পানি।

 

“ধরনী দ্বিধা হও! দ্বিধা হও!”

 

মনে মনে জপে আশিক। এইজন্য রোজ সকালে পূর্ণা এমন করে,ওর ধারণা আশিক লারার সাথে গাড়িতে যায়, তাই গাড়ি মিস করতে চায় না!

 

“পূর্ণা তুমি ভুল বুঝছ। আশিক তোমাকে খুব ভালোবাসে, আর তুমিও বাসো। কিন্তু সম্পর্কে বিশ্বাস খুব জরুরি পূর্ণা। আচ্ছা আমি উঠি আশিক।”

 

লারা চলে গেলে আর একটা কথাও বলে না আশিক।

 

“পূর্ণা বাসায় চলো, আমিও যাবো তোমার সাথে।”

 

(চলবে)

 

কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি 

পর্ব ৪

 

অফিসে বলে পূর্ণাকে নিয়ে বাসায় আসে আশিক। অফিসে ভালোই একটা তামাশা হলো। স্যারের কাছে যখন জরুরি প্রয়োজনে বাসায় যেতে হচ্ছে বলতে যায় আশিক, তখন এইচআর অফিসার নিয়াজ আহমেদ  আশিককে বলেন,

 

“আশিক, বাসায় যেতে চাইছো যাও। তবে ঘরের সমস্যা ঘরেই সমাধানের চেষ্টা করো। বাসাবাড়ির সমস্যা অফিসে টেনে আনলে তো হলো না।”

 

“স্যার, আই এম রিয়েলি স্যরি স্যার। আর কখনোই এমন হবে না। পূর্ণা একটু অসুস্থ স্যার।”

 

“তোমার ওয়াইফ অসুস্থ, না তুমি পরকীয়া আসক্ত। এগুলো তোমার পার্সোনাল বিষয়। অফিসের কাজে তোমার পার্সোনাল বিষয় কোন ব্যাঘাত ঘটালে অফিসও সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিবে। আর তাছাড়া এসব কোন ভালো উদাহরণ নয়। তোমাকে সবাই একজন দক্ষ, স্মার্ট ছেলে হিসেবে জানে। বৌ থাকার পরও এসব বান্ধবী রাখা তোমার সাথে মানায় না। ভালোও না।”

 

“স্যার বিশ্বাস করেন, এসব ভুল বোঝাবুঝি। লারা আমার শুধুই বন্ধু।”

 

“বন্ধু হলেই ভালো। বান্ধবী হলেও তোমার ব্যাপার। কিন্তু এই যে তোমার বৌ আর বান্ধবী মিলে অফিসে সিনক্রিয়েট করলো, সেটা কিন্তু ভালো ব্যাপার না। এমনিতেই তোমার ওয়াইফ নাকি রিসেপশনে যখন তখন ফোন করে তুমি কোথায় আছ জানতে চায়। হুটহাট অফিস চলে আসে। এগুলো কিন্তু কাজের পরিবেশ নষ্ট করে। সবসময় ওয়াইফ অসুস্থ বলে পাশ কাটানো যায় না। আগুন না লাগলে ধোঁয়াও ছড়ায় না। যা রটে কিছুটাতো বটেই। তোমার বান্ধবী নাকি স্বামীকে ছেড়ে দিয়েছে। তুমিও নাকি তোমার স্ত্রীকে ছাড়ছো! বিয়ে হলো কয়দিন। এখনই এসব!”

 

এত ছোটো আশিক জীবনেও হয়নি। বুঝতেই পারছে অফিসে ওর চরিত্র নিয়ে কানাঘুঁষা হচ্ছে।

 

গাড়িতে বসে একটা কথাও বলেনি পূর্ণার সাথে। না রাগরাগি না অভিমানের কথা। গত কয়েকমাসে অভিমান, বিরক্তিতে টুকটাক তর্কে জড়ালেও আজ যেন সমস্ত কথা শেষ হয়ে গিয়েছে। বাবা মা না থাকার জন্য একাকিত্বের কষ্টটাও মনে হয় এই তীব্র অপমানের জ্বালার মতো ছিল না। এখন কষ্টের সাথে সাথে মনটাও কেমন তিতা হয়ে আছে। বিতৃষ্ণা লাগছে পাশে বসে থাকা রমণীকে। পূর্ণার ভালোবাসার নাগপাশে হাসফাঁস লাগছে।

 

“আশিক, অফিসে সমস্যা হয়েছে? তোমাকে খারাপ কিছু বললে চুপ করে শুনবা না। চাকরি করতে তো তুমি বাধ্য না। চাকরি ছেড়ে দাও। আশিক?”

 

“পূর্ণা, আমাকে মাফ করা যায় না? প্লিজ। আমাকে একটু চুপ করে বসে থাকতে দাও।”

 

“তুমি আমার উপর রেগে আছ? আমার জায়গায় তুমি হলে কী করতে? আমি যদি আমার পুরানো প্রেমিকের সাথে এভাবে ধরা পড়তাম? অথচ আমি এখনো আমাদের ঘর বাঁচাতে চাইছি।”

 

“ফর গড সেক পূর্ণা! লারা আমার পুরানো, নতুন কোন প্রেমিকা না। তুমি যে একটা মানসিক সমস্যায় ভুগছো এটা বুঝতে পারছো না! আমি চাকরি ছেড়ে দেব? কেন ছেড়ে দেব? যেন তুমি আমাকে বাসায় বন্দী করে ফেলতে পারো! আমি একজন সুস্থ সবল শিক্ষিত পুরুষ পূর্ণা। আমাকে এভাবে অপদস্ত করে, গৃহবন্দী করে ফেলে তোমার কি লাভ হবে? আমাকে একক ভাবে পাবে এমনটা ভাবছো? ভুল। 

বরং তখন আমি নিজেও তোমার মতো মানসিক রোগী হয়ে যাব। কাউকে ভালোবাসার মানে তাকে এভাবে নজরবন্দী করে ফেলা না। কিন্তু এসব কিছুই তোমার মাথায় ঢুকছে বলে মনে হচ্ছে না। তুমি নিজের একটা ইলিউশনের জগতে বাস করছো।”

 

“আশিক, আই অ্যাম স্যরি। আমি আজ বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি তাই না। আর করবো না এমন। তুমি এমন কঠিন কঠিন কথা বলো না প্লিজ।”

 

আশিক কিছু না বলে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে। পূর্ণা কাঁদতে থাকে। পূর্ণার কান্না দেখে আশিকের কেন জানি আরও বেশি বিরক্ত লাগে। মনে মনে কঠিন একটা সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এখন না বাসায় গিয়ে শাশুড়ির সামনে গিয়ে বলবে ঠিক করে।

 

ড্রয়িং রুমে শাশুড়ি আর শ্যালিকা বসে আছে। পূর্ণা থেকে থেকে কেঁদেই চলেছে। আজ বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে তা এখন বুঝতে পারছে। কিন্তু আশিক এভাবে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে এটা সে কোনদিন ভাবেনি। আশিক কাপড় গুছিয়ে ব্যাগটা এনে রাখতেই হাসনা হেনা বেগম হুইলচেয়ার নিয়ে এগিয়ে আসেন।

 

“বাবা তুমি আমার ছেলের মতো তাই বলছি, পূর্ণা ভুল করেছে, বাড়াবাড়ি করেছে তা ঠিক। কিন্তু  তুমিও কেনো বিয়ের পর অন্য মেয়েদের সাথে সম্পর্ক রাখবে?

পূর্ণা কোন দিকটা খেয়াল রাখে না তোমার। তাও বারবার মেয়েটাকে কষ্ট দাও।”

 

শাশুড়িকে মায়ের মতোই সম্মান করে আশিক। নিজের পঙ্গুত্ব আর স্বামীর মৃত্যু ওনাকে অনেক ভেঙে দিয়েছে বোঝে আশিক। এর আগে যেবার পূর্ণা ঘুমের ঔষধ খেয়েছিল, মেয়ের চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তিনি। আশিকের কাছে কথা আদায় করেছিলেন যে আশিক পূর্ণার সম্পূর্ণ খেয়াল রাখবে। আশিক চেষ্টাও করেছে। কিন্তু দিনদিন তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। 

 

 “আম্মু, আমার কারও সাথে কোন অবৈধ সম্পর্ক নেই। আর কোনদিন এসব সম্পর্কে জড়ানোর কথা ভাবতেও পারি না। এই বিশ্বাসটা কি আপনার আর পূর্ণার আমার উপর রাখা উচিত না? অফিসের কলিগ থেকে শুরু করে শ্যালিকা, চাচাচো বোন থেকে শুরু করে ঘরের কাজের সহকারী, সবাইকে নিয়ে পূর্ণা ইনসিকিউরড। এমনকি কোন ছেলেবন্ধুর সাথে আড্ডা দেওয়া, ফোনে কথা বলা পর্যন্ত পূর্ণা সহ্য করতে পারে না। বিয়ের পর আমার সমস্ত স্বাধীনসত্ত্বা কি আমি হারিয়ে ফেলেছি?”

 

হাসনা হেনা বেগম চুপ করে থাকেন। মেয়ের এই অতিরিক্ত পাগলামির কারণ তিনি জানেন, কিন্তু জামাইয়ের সামনে তা বলতে বাঁধে।

 

“আম্মু পূর্ণা আমার সর্বোচ্চ খেয়াল রাখে, ওকে নিয়ে আমার অন্য কোন অভিযোগ নেই। সত্যি বলছি আমার জীবনে ও ছাড়া আর কোন মেয়ে নেই। কিন্তু এই সন্দেহবাতিক মনোভাব, আর নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়ার মানসিকতা আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আমার কোন বন্ধু বান্ধবের সাথে ফোনে কথা বলতে গেলেও পূর্ণা চেক করে। আমার ফেসবুক পাসওয়ার্ড নিয়ে অসংখ্য বন্ধু বান্ধবকে আনফ্রেন্ড করেছে। এসব কিছু আমি মেনে নিলেও আজকের বিষয়টার পর আমি আর নিতে পারছি না। ভাবতে পারছেন আমি অফিসে মুখ দেখাবো কী করে? আমি আসি। প্লিজ আম্মু আমাকে থাকার জন্য জোর করবেন না। একটা বিরতি প্রয়োজন আমার।”

 

পূর্ণাকে রেখেই আশিক বের হয়ে আসে। মনটা চুরমার হয়ে যাচ্ছে। কী হতো পূর্ণা যদি একটু স্বাভাবিক হতো!

তার জীবনে ভালোবাসা এসেও কেনো হারিয়ে যায় বারবার। পূর্ণাকে পেয়ে তো সে সুখী ছিল। কিন্তু দিনের পর দিন এই পাগলামিও তো মেনে নেওয়া যায় না। আপাততঃ হোটেলে ওঠে আশিক। বাসা খুঁজবে, না মেসে উঠবে ঠিক করতে পারেনি। অফিস থেকে তিনদিন ছুটি নিয়েছে। কলিগদের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে ইচ্ছে করছে না। 

 

(চলবে)

 

কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি 

সমাপ্তি পর্ব

 

গত কয়েকদিনে অসংখ্য ফোন আর ম্যাসেজ করেছে পূর্ণা, কিন্তু আশিকের মনটা বিতৃষ্ণায় ভরে ছিল। তাই ফোন রিসিভ করেনি। ম্যাসেজগুলোর শুরুতে ছিল ক্ষমা চাওয়া, তারপর ফিরে আসার অনুরোধ, আর শেষদিকে অভিযোগ। 

 

আশিক কিছুদিন হোটেলে ছিল। চাচা চাচী ফোন করেছিলেন তাদের বাসায় যাওয়ার জন্য। কিন্তু আশিক যায়নি। কয়েকদিন পর একটা মেসে উঠেছে। সেখানেই চাচা চাচী আসেন দেখা করতে। আশিকের শাশুড়ি ওনাদের জানিয়েছেন আশিকের বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার ঘটনা। তবে তিনি এর জন্য অনেকাংশে আশিককেই দায়ী করেছেন। তার মতে আশিক বিয়ের পর বন্ধু বান্ধবের সাথে এত যোগাযোগ রাখা, পূর্ণার অপছন্দের পরও লারার  সাথে কথা বলা এসবের কী দরকার ছিল! সেইজন্যই তো পূর্ণা নিজেকে সামলাতে পারেনি। আর তাই সেদিন অফিসে এমন সিনক্রিয়েট করে ফেলেছে। আশিকের চাচা বলেন,

 

“আশিক, এটা কী সমাধান হলো? তুমি মেসেই থাকবা? বৌ মাফ চাইতেছে, মাফ করে সব ঠিক করে নাও বাবা।”

 

“চাচা, ও মাফ চাইছে অফিসে সিনক্রিয়েট করার জন্য। কিন্তু এখনো ও এটাই ভাবছে লারার সাথে আমার অনৈতিক সম্পর্ক আছে। আমি অন্য মেয়েদের দিকে খারাপ নজর দেই। আপনাকে বোঝাতে পারবো না চাচা, আমার মানসম্মান কিছু বাকি রইলো না। যখন নিজের স্ত্রী এমন অভিযোগ করে, তখন মানুষ এটাই সত্য বলে ভাবে। আমি কাওকো বোঝাতে পারবো না যে আমার চরিত্রের এমন কোন ত্রুটি নেই। ও আমাকে চরমভাবে অসম্মানিত করেছে। এবং ভবিষ্যতেও করবে। কারণ এখনো ও ভাবে ও যা ভাবছে তাই ঠিক।”

 

“আমি বেয়াইনকেও এটাই বলেছি। তিনি বুঝতে পারছেন যে তার মেয়েটা অতিরিক্ত সন্দেহ করে। কিন্তু ওনার মতে তুমি চাইলে এটা মানিয়ে নিতে পারবে। তোমাকে তাই অনুরোধ করেছেন।”

 

“আমাকে ফোন দিয়েছিলেন চাচা। আমাকে তিনি বাড়ি ভাড়ার একটা অংশ দিবেন। সম্পদের কিছু অংশ দিয়ে দিবেন। এসব বলেছেন। চাচা আমি সম্পদ পাব, টাকা পাব এই লোভে কি বিয়ে করেছি বলেন তো? আমি জীবনে শান্তি চেয়েছি। কিন্তু ওনারা মা মেয়ে আমাকে এইসব প্রস্তাব দিয়ে বরং ছোটো করছেন। আমাকে বলছেন চাকরি ছেড়ে দিতে। আমাকো বলেন এইসব কোন সুস্থ আব্দার?  আমি একটা শিক্ষিত ছেলে, সক্ষম ছেলে। আমি কেন সব ছেড়ে শাশুড়ি আর স্ত্রীর হাতের পুতুল হবো? কেন ওদের ইশারায় আর টাকায় আমায় জীবন কাটাতে হবে?”

 

“তোমার কথা যুক্তিযুক্ত। আমি পূর্ণার মায়ের সাথে কথা বলবো। ওনাকে বলবো যে সংসার করতে হলে পূর্ণা নিজের পাগলামি পেছনে ফেলে সংসার করবে আর দশটা মেয়ের মতো। না হলে তুমি বিকল্প ব্যবস্থা নিবে। আর ওনারও মেয়ের সংসারে অতিরিক্ত দখল দেওয়ার মানসিকতা বদলাতে হবে। আশিক আমি দুঃখিত বাবা। তোমাকে এমন একটা সম্পর্কে আমিই এনে ফেললাম। আসলে আমি কখনোই বুঝিনি এই শান্তশিষ্ট মেয়েটার এমন কেন সমস্যা আছে। তবে তুমি ওর ফেন ধরে কথা বলে নিও। শুনলাম অসুস্থ হয়ে গিয়েছে। খাওয়া দাওয়া করে না।”

 

আশিক মাথা নেড়ে সায় দেয়। চাচাকে আর বলে না যে পূর্ণার নাম্বারও ব্লক লিস্টে দিয়ে রেখেছে। শাশুড়ির নাম্বারও। কারণ পূর্ণা ঐ ফোন থেকেও ফোন করে। পল্লবীর নাম্বার ব্লক করেনি। কারণ পল্লবী ফোন দেয় না। ওর ফোন পূর্ণাও হাতে নেয় না। এছাড়া আননোন সকল নাম্বারও ব্লক অপশন দেওয়া। যেন পূর্ণা কোন নাম্বার থেকে কল করতে না পারে। আশিক চাকরিও ছেড়ে দিবে। অফিসে ওকে নিয়ে ফিসফাস হয়। ওর অস্বস্তি লাগে। দোষী নয়, এমন মানুষই বুঝবে নির্দোষ কাউকে দোষী করা হলে কেমন লাগে। পূর্ণার জন্য তাই কোন মায়া অনুভব করতে গিয়েও করে না আশিক।

 

***

মধ্যরাতে হঠাৎ ফোন বেজে ওঠে। 

আশিক ফোন হাতে নিয়ে দেখে স্ক্রিনে ভেসে আছে শ্যালিকা পল্লবীর নাম। পল্লবীর ফোন দেখে একটু চিন্তায় পরে যায় আশিক। এই কয়দিনে আর সবাই কল দিলেও পল্লবী দেয়নি। দুলাভাই থেকে একটু দূরত্বই বজায় রাখে পল্লবী।

 

“হ্যালো। কে পল্লবী, না পূর্ণা?”

 

“আমি ভাইয়া।”

 

“কী ব্যাপার পল্লবী? এত রাতে?

 

” স্যরি ভাইয়া। কল দেব দেব করেও সাহস করতে পারছিলাম না। তাছাড়া জানি আপনি আমাদের উপর বিরক্ত। তাই আপনাকে ঠান্ডা হওয়ার সময়ও দিতে চাইছিলাম। কিন্তু এখন মনে হয় কথা বলার সময় হয়েছে।”

 

“কী ব্যাপার বলো তো?”

 

“ভাইয়া, কোথাও একটু দেখা করতে পারবেন প্লিজ, শুধু দশ মিনিট সময় নেব।”

 

“তোমার বোন জানলে তোমার চুল ছিঁড়বে। আর আমাকে আরেক দফা বেইজ্জত করবে। একা কোথাও দেখা করতে পারবো না। কথা যা বলার সবার সামনে বলবে।”

 

“সবার সামনে বলা সম্ভব না ভাইয়া। প্লিজ। আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন। আপনাকে কারও কাছে আর ছোটো করবো না।” 

 

“আচ্ছা আমি জানাবো। পূ্র্ণা আসবে তোমার সাথে? বা মা?”

 

“না, কেউ না। আমি একাই আসবো।”

 

“ওকে।”

 

****

নর্থ এন্ড ক্যাফে রোস্টার, খুব প্রিয় কফিশপ পূর্ণার। ছুটিরদিনগুলোর বিকেলটা আগে এখানেই কাটাতো আশিক আর পূর্ণা। আজ সেখানেই পল্লবীকে আসতে বলেছে আশিক। নিরিবিলি ছিমছাম পরিবেশে কথা বলাটা সহজ হবে। 

 

“দেখা করার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ ভাইয়া।”

 

“পল্লবী, আমি এখন তোমাদের বাড়িতে ফিরতে চাই না। আমার আসলে ঘরজামাই হওয়াটাই ভুল হয়েছে। “

 

পল্লবী কফিতে আলতো চুমুক দেয়। গলাটা হালকা কেশে পরিষ্কার করে নেয়।

 

“সমস্যাটা ঘরজামাই হওয়াতে না ভাইয়া। আপনি ভাবছেন আপু আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়,

ব্যাপারটা আসলে তা নয়। আমাদের পরিবারের কিছু নোংরা অতীত আপনাকে জানানো দরকার, তাহলে হয়তো আপনি আপুর মানসিক অবস্থাটা বুঝতে পারবেন। আর সেই জন্য আজ আমার এখানে আসা।”

 

একটানা কথা গুলো বলে চুপ করে পল্লবী। আশিক অবাক হলেও ওকে কথা গুলো শেষ করার সময় দেয়।

 

“ভাইয়া আপনি জানেন না, আমার আব্বুর একটা দ্বৈত  জীবন ছিল। সমাজের সবার থেকে আব্বু এই দ্বৈত সত্ত্বা আড়ালে রাখতেন। বহুগামী পুরুষ ছিলেন তিনি। তার নানা অবৈধ সম্পর্ক আমাদের সংসারে সবসময় টানাপোড়েন নিয়ে হাজির হতো। সমস্যাটা প্রথম আম্মুর নজরে আসে যখন আম্মু দ্বিতীয়বার প্রেগন্যান্ট হয়। অর্থাৎ আমি গর্ভে থাকাকালীন সময়ে। ছোটো একটা বাচ্চা মেয়ে আর দ্বিতীয় প্রেগন্যান্সির চাপে আম্মু অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তখন আমাদের গ্রাম সম্পর্কের এক ফুপুকে নিয়ে আসেন দাদী। একসময় আম্মু আবিষ্কার করেন আব্বুর সাথে ঐ মহিলার একটা অবৈধ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। সেসময় দাদী আম্মুকে বলেন যে আম্মু আব্বুর দেখাশোনা করতে পারছে না বলেই আব্বু এমন করেছেন। অর্থাৎ আব্বুর অপরাধেও আম্মুই দায়ী হোন। যাই হোক সেই মহিলাকে বাড়ি পাঠিয়ে সে যাত্রায় সংসার রক্ষা হয়।”

 

আশিক হাঁ করে পল্লবীর গল্প শুনছে। কফিতে চুমুক দিয়ে আবার কথা শুরু করে পল্লবী।

 

“দ্বিতীয়বার আব্বুর সম্পর্ক ধরা পড়ে অফিসের কলিগের সাথে। এবং সেসময় আপু অনেকটাই বিষয়গুলো বুঝতে শুরু করেছিল। সেই মহিলাকে বিয়ে করতে মরিয়া হয়েছিল আব্বু। নানা বাড়ির হস্তক্ষেপে তা হয় না। নানা আব্বুকে অনেক টাকাপয়সাও দিয়েছিলেন যেন সংসারে সতীন না আনেন। আব্বু বিয়ে করেননি ঠিকই। তবে সেই টাকার অনেকাংশ নাকি ঐ মহিলাকে পেছু ছাড়াতেই গিয়েছে। “

 

“তারপর।”

 

“তারপর আর কী। আসলে আম্মুকে কখনো শান্তিতে ঘর সংসার করতে দেখিনি আমরা। আড়ালে আবডালে এসব চলছিলই আব্বুর। বিয়ে করেননি ঠিক। তবে নিজেকে শোধরানোর চেষ্টাও করেননি। আম্মুর জীবনটা ভীষণ মানসিক কষ্টে কেটেছে। কিন্তু সবাই আম্মুকেই ধৈর্য ধরতে বলতো। স্বামীকে আঁচলে বাঁধার পরামর্শ দিতো। বলতো আম্মুরই ভুল। আম্মু শুরু থেকেই চোখে চোখে রাখলে আব্বু অন্য মহিলাতে আসক্ত হতেন না। আম্মু আব্বুর চাহিদা পূরণে ব্যর্থ ছিল এমনটাও শুনতে হতো।”

 

পল্লবীর গল্পের সাথে সাথে যেন পূর্ণার মনোজগৎটা একটু একটু করে পরিষ্কার হতে থাকে আশিকের কাছে। পূর্ণা সেই আচরণগুলোই করেছে, যা ও ছোটোবেলা থেকে শুনে এসেছে। স্বামীকে আঁচলে বাঁধা, নজরে রাখা। এসবকিছুর ভিত তৈরি হয়েছে সেই ছোটোবেলায়

 

“ভাইয়া, কিছু ভাবছেন?”

 

“নাহ। তুমি বলো।”

 

“তারপর যখন সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে আম্মু প্যারালাইজড হলেন, আব্বুর এই স্বেচ্ছাচারিতা বেড়ে গেল বহুগুণ। কমবয়সী এক মেয়েকে বাড়ির কাজ দেখাশোনার কথা বলে বাড়িতে নিয়ে আসেন। আমরা সব বুঝতাম কী হচ্ছে, কিন্তু আব্বুকে আটকাতে পারতাম না, ভীষণ বদরাগী ছিলেন। আম্মু রাত দিন শুধু নিজের মৃত্যু কামনা করতো সেইসময়। এই অসুস্থ পরিবেশ থেকে বের হওয়ার জন্য আমি নিজেকে পড়ালেখার জগতে আবদ্ধ করে ফেলি। সরকারি মেডিকেলে সুযোগ পাই, ঢাকায় বাসা হওয়ার পরও হলে উঠি আমি। কিন্তু আপুতো বের হতে পারেনি। পিঠাপিঠি বোন আমরা, আমার উচিত ছিল আপুর কথা ভাবা, তা না করে নিজে পালিয়ে বেঁচেছি। দিনের পর দিন অসুস্থ পরিবেশ, মায়ের কান্না এগুলো আপুর মানসিক অবস্থা একদম ভঙ্গুর করে দিয়েছে। তারপর একদিন হঠাৎ আব্বু স্ট্রোক করেন। ম্যাসিভ এট্যাক ছিল, আব্বু বাঁচেনি। আব্বুর মৃত্যুর পর ঐ মেয়েকে টাকা পয়সা দিয়ে বিদায় করা হয়।”

 

অকপটে স্বীকার করে যাওয়া পারিবারিক গোপন ইতিহাস অবাক করে আশিককে। এই সাত মাসে কখনো পূর্ণা এসব নিয়ে কিছু বলেনি। আশিককে চুপচাপ দেখে আবার কথা শুরু করে পল্লবী। জানে না ভাইয়া তার বোনের কষ্টটা বুঝতে পারবে কি না, তবে আজ এসব বলা ভীষণ দরকার। 

 

“আমার বোনটা আপনাকে সত্যি খুব ভালোবাসে ভাইয়া। আমি বোন হয়ে বোনের পাশে দাঁড়াইনি, ফলাফল আজ ও এমন হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এখন ওর জগত ও আপনার মধ্যে খুঁজে নিয়েছে। আপনি ওর হাত ছাড়বেন না প্লিজ। ওকে সুস্থ করে তুলুন ভাইয়া। ছোটবোন হিসেবে আমার অনুরোধ। প্লিজ ভাইয়া।”

 

****

প্রচন্ড জ্বর পূর্ণার। গতকাল থেকে বলতে গেলে প্রায় অচেতন। হাসনা হেনা বেগমের অসহায় লাগে। নিজে জীবনে কোনদিন সংসারে সুখ শান্তি পাননি। মেয়েকে সবসময় তাই স্বামীকে চোখেচোখে রাখতে বলতেন, তিনি কি ভুল করেছিলেন! 

আসলেই তো যে খারাপ হবে, তাকে কি চোখে চোখে রাখা যায়?

 

সারাজীবন তো তিনি স্বামীকে চোখ হারিয়েছেন, 

কী লাভ হয়েছে তাতে? স্বামী স্বাভাবিক ভাবে দ্বিতীয় বিয়ে করলেও হয়তো তিনি এত কষ্ট পেতেন না। কিন্তু সমাজে ভালো স্বামীর তকমা ঝুলিয়ে সারাজীবন লোকটা শুধু ওনাকে মানসিক অশান্তি দিয়ে গিয়েছেন। এখন মেয়েটার ভাগ্যও কি এমনই হবে? 

 

এমনই এলোমেলো ভাবনায় মশগুল ছিলেন হাসনাহেনা বেগম। হঠাৎ আশিককে রুমে ঢুকতে দেখে অবাক হয়ে যান। পেছন পেছন পল্লবীও আসে।

 

 “আম্মু ভাইয়া আর আপুকে একটু একা ছেড়ে দাও। চলো আমরা অন্য রুমে যাই।”

 

কথা না বাড়িয়ে মেয়ের সাথে হুইলচেয়ার ঠেলে বের হয়ে যান হাসনাহেনা বেগম। জলপট্টি দেওয়ার রুমালটা হাতে তুলে নেয় আশিক, চোখ মেলে আশিককে দেখে স্বর্গীয় হাসি ফুটে ওঠে পূর্ণার মুখে।

 

***

পূর্ণা আর আশিক বসে আছে মনোরোগ বিশেষজ্ঞে দিলারা জামানের চেম্বারে। নিয়মিত কাউন্সিলিং এ আসছে পূর্ণা আর আশিক। নিজেদের মরিচা ধরা দাম্পত্য জীবন এখন অনেকটা সুস্থির। ভালোবাসা তাদের আগেও ছিল, এখনো আছে। তবে এখন সেই গলায় চেপে রাখা ফাঁসটা আর নেই। আশিক আর নিজের সুস্থ সুন্দর দাম্পত্য জীবনের জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে রাজি হয়েছিল পূর্ণা।

 

কাউন্সিলিং শেষে আশিকের কাঁধে মাথা রেখে বাড়ি ফিরছে পূর্ণা। ইতোমধ্যে লারার সাথে কথা বলে ক্ষমা চেয়েছে। লারাও বলেছে ও সব কিছু ভুলে গিয়েছে। পূর্ণার মানসিক অবস্থাটা খুলে বলেছিল আশিক। অফিস ছাড়েনি আশিক। ছাড়লে ফিসফাসগুলোই সত্য হয়ে থাকতো। স্বাভাবিক ভাবেই সবার মুখোমুখি হয়েছে মনে সাহস রেখে। এখন আর পুরানো কথা তোলে না কেউ। 

 

সিগন্যাল পড়লে আশিক আর পূর্ণা যে রিকশায় বসে আছে তা থামে। এক পথশিশু এগিয়ে আসে বেলীফুলের মালা নিয়ে। দশটি মালাই কিনে নেয় আশিক।

 

“এত মালা দিয়ে কী হবে আশিক?”

 

দুষ্টু হাসি খেলে যায় আশিকের মুখে, 

 

“আমার জন্য কাঁচা ফুলের মালা দিয়ে সাজবে তুমি।ফুলকুমারি শরীর থেকে বেলীফুলের সুবাস নেব।”

 

একটা আলতো ঘুষি মারে পূর্ণা, তবে চোখেমুখে উপচে পড়ছে হাসি, স্রষ্টার কাছে আর চাওয়ার কিছু নেই ওর।ফিসফিস করে আশিককে বলে “ভালোবাসি তোমায়, খুব খুব ভালোবাসি।”

 

(সমাপ্তি)

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।