#মেঘের_শহর

#পর্ব_১

Saji Afroz

.

আমি কি ছেলে থেকে মেয়ে হয়ে গেলাম!

ঘুম ভাঙার পরে বিস্ফোরিত চোখে নিজের বুকের উপর হাত বুলাতে বুলাতে প্রকান্ড একটা চিৎকার দিয়ে উঠে জিকো। সাথে সাথেই নিজের মুখ দুহাত দিয়ে চেপে ধরে সে। কন্ঠটাও যে একদম মেয়েদের মতো বের হলো গলা দিয়ে! এটা কোনো দুঃস্বপ্ন নয় তো! ভাবতে ভাবতে সে দৌড়ে চলে যায় বেসিনের আয়নার সামনে। জিকোর অভ্যেস ছিল খালি গায়ে ঘুমানো। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাতেই বড়সড় একটা ঝাটকা খায় সে। মাথায় লম্বা চুল গজিয়েছে। খোঁচা খোঁচা দাড়ি গুলো ও গায়েব। বুকেও কোনো লোম দেখা যাচ্ছেনা। তার বদলে সৃষ্টি হয়েছে উঁচু সুঢৌল মাংসপিণ্ড! 

কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমা হচ্ছে তার। কাঁপা কাঁপা হাতে ট্রাউজারের ফিতা খুলে নিচের দিকে তাকায় জিকো। দ্বিতীয়বারের মতো আরো একবার চিৎকার করে উঠে… 

” হোয়াট দ্যা……”

জিকো পুরোদস্তুর একটা মেয়ে মানুষে পরিণত হয়ে গেছে। একজন ছেলের কোনো বৈশিষ্ট্য ই তার ভিতরে পরিলক্ষিত নয়।

বিবস্ত্র অবস্থায় চুলের ভিতরে দুহাত ঢুকিয়ে বাথরুমের ফ্লোরে বসে পরে সে।

নিজের পুরুষত্ব নিয়ে কত গর্ব ছিল তার!!

কিন্তু হঠাৎ কি কারণে এক রাতেই তার দেহে এমন আমূল পরিবর্তন ঘটলো!

গতরাতে বন্ধুদের সাথে আড্ডা শেষে মদ খেয়ে ঢলতে ঢলতে কোনোভাবে বাসায় ফিরেই পরিহিত জামা ও স্যান্ডো গেঞ্জি খুলে বিছানায় গা এলিয়ে ঘুমিয়ে পড়ছিলো সে। ও হ্যাঁ, বাসায় ফেরার রাস্তায় কিছু হয়েছিল কি না মনে করতে পারছে না সে । 

প্রচন্ড পরিমান মানসিক চাপে মাথা ঘামতে ঘামতে বমি চলে আসে তার।

হঠাৎ চোখ যায় পাশেই থুবড়ে পরে থাকা সাদা ট্রাউজারের দিকে। হাঁটুর একটু উপরের দিকে রক্তের গাঢ় খয়েরী দাগ চটচটে হয়ে লেগে আছে।

নিজের শরীরের সব জায়গা ভালোভাবে খতিয়ে পর্যবেক্ষণ করে দেখে জিকো। না, কোথাও কোনো কাটাছেঁড়ার দাগমাত্র নেই। রক্তের ব্যপারটা ব্যখ্যা করার ট্রাই করে সে লজিক দিয়ে। মেয়েদের পিরিয়ড হয়, সেই রক্ত না তো! পরে নিজেই বুঝতে পারে, না তেমন কিছু নয়। তাহলে রক্তের দাগ নিশ্চয়ই হাঁটুর একটু উপরে থাকতো না। অন্য কোথাও থাকতো। 

আর বেশি প্রেসার নিতে পারেনা জিকোর মস্তিষ্ক। বাথরুমের ফ্লোরেই জ্ঞান হারায় সে।

.

.

রবিবার বিকেল থেকেই আকাশের মুখটা ভার। শুরু হয়েছে মুষলধারে বৃষ্টি। রাতভর ভিজেছে “আনন্দ নগর” নামের এ শহরটি। 

আজ সকাল থেকেও তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। পানি জমতে শুরু করেছে রাস্তাঘাটে। সাথে ঝড়ো হাওয়া আর শিরশিরানি ঠান্ডা তো আছেই। 

বৃষ্টি থামার কোনো নামও নেই! এই বৃষ্টির মাঝেও ভার্সিটিতে না এসে থাকেনি হুরায়রা। এই মেয়েটি একটা দিনের জন্য ক্লাসে আসেনি এমনটা হয়নি কখনো। ঝড়, তুফান যাই হোক না কেনো! তাকে দেখা যায় ক্লাসে উপস্থিত। বর্তমানে ভার্সিটির সেরা ছাত্রীদের মাঝে একজন হুরায়য়া। দেখতে বেশ সুন্দরী। তার সৌন্দর্য্যের ধারে কাছেও কেউ নেই এই ভার্সিটির৷ তাকে দেখলেই যে কারো চোখের পলক সহজে আর পড়তেই চায়না। প্রেমের প্রস্তাব অহরহ পেতেই থাকে সে। তাই হুরায়রা কে অনেক মেয়েই হিংসার চোখে দেখে। 

হুরায়রার মুখে সবসময় অদ্ভুত এক হাসি লেগেই থাকে। কিন্তু সে কারো সাথে খুব একটা মিশতে চায়না। বর্তমানে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী, কিন্তু তার কোনো ভালো বন্ধু নেই। ক্লাসের শুরু থেকে অনেক ছেলে মেয়েই তার সাথে বন্ধুত্ব করতে চেয়েছে। সে দু’একটা কথা বলেই চুপচাপ হয়ে যায়। এতে তারা বুঝতে পারে, তাদের সাথে কথা বলতে হুরায়রা আগ্রহী নয়। সেই থেকে হুরায়রার সাথে প্রয়োজন ছাড়া কেউ নিজ থেকে কথা বলতে আসে না। 

.

.

জানালাটা খুলে বাইরে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির ফোঁটা নিয়ে খেলা করছে সাইয়ারা।

আজ ভার্সিটিতে না গিয়ে ভালোই লাগছে তার। এতক্ষণ সে কাঁথা মুডি দিয়ে ঘুমিয়ে ছিল। ঘুম থেকে উঠে গরম গরম খিচুড়ি খেয়েছে। এখন সে বৃষ্টির ফোঁটা নিয়ে খেলছে। কত ভালোই না লাগছে! এভাবে যদি প্রতিটা দিন বৃষ্টি হত, মন্দ হত না। ভেবেই ফিক করে হেসে ফেললো সে।

হঠাৎ তার কানে চেঁচামেচির শব্দ ভেসে আসলো। এই শব্দ তার অচেনা নয়। পাশের বাসার অন্তরা আহম্মেদের চেঁচামেচির শব্দের সাথে অভ্যস্ত সে। কিছু হলেই এই মহিলা চেঁচিয়ে নিজের বাড়ি সহ আশেপাশের বাড়িও মাথায় তুলে ফেলেন। তবে তার চেঁচামেচির শব্দে কেউ বিরক্ত হয়না। হয়তোবা শুনতে শুনতে অভ্যাস হয়ে গেছে নয়তোবা আনন্দ নগরের মানুষজন একটু বেশিই ভালো তাই!

.

সাইয়ারা এখানে খালার বাসায় থাকে। তার মা বাবা থাকেন গ্রামে। পড়াশোনার জন্যই আসা হয়েছে আনন্দ নগরে। সেও অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী।

দু’বছর হয়েছে সে এখানে এসেছে। এই দু’বছরে অন্তরা আহম্মেদের সাথে তার একটা ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। 

সাইয়ারার বারান্দা থেকে অন্তরা আহম্মেদের বাসার উঠোন টা ভালো ভাবেই দেখা যায়। শব্দ শুনে সে বুঝতে পারলো, তিনি এখন উঠোনে আছেন। তাই সাইয়ারা দৌড়ে বারান্দায় এল। 

অন্তরা আহম্মেদ তার ছেলের সাথে চেঁচামেচি করছেন। তার ছেলের নাম মেঘ। পুরো নাম মেঘ আহম্মেদ। 

মেঘ বাড়িতে ফিরেছে সবেমাত্র দুদিন হলো। সে এই দেশের সবচেয়ে ভালো প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা শেষ করে এসেছে। পড়াশোনার চাপে বাড়িতে খুব একটা আসতো না। তাই এবার যখন ছেলেকে এতদিন পরে কাছে পেয়েছেন, আদর যত্নে কোনো কমতি রাখছেন না তিনি। 

আজ মেঘ এই বৃষ্টির মাঝেও বাড়ির বাইরে যেতে চাচ্ছে বন্ধুদের সাথে। যা একেবারে পছন্দ হয়নি অন্তরা আহম্মেদের। তাই তিনি মেঘের সাথে চেঁচামেচি করে ভেতরে থাকতে বলছেন। এদিকে মেঘও মায়ের কথা না শুনে তাকে নানাভাবে মানিয়ে বের হবার চেষ্টা করতে লাগলো। 

তাদের অবস্থা দেখে বারান্দা থেকে চেঁচিয়ে সাইয়ারা বলল-

আন্টি? আজ আপনি বিরিয়ানি রান্না করেন। যদি মেঘ ভাইয়া বের হয় তবে তাকে দিবেন না। আমিই এসে খেয়ে নিব।

.

সাইয়ারার দিকে ভ্রু-জোড়া কুচকে মেঘ তাকালো। তারপর মায়ের কাছে জানতে চাইলো সে কে। এই দুই বছরে দুইবার সাইয়ারার সাথে তার দেখা হয়েছে। তবুও মেঘের সাইয়ারার কথা মনে নেই৷ অবশ্য না থাকাটাই স্বাভাবিক। মনে থাকার মতো কোনো কারণও তো নেই!

অন্তরা আহম্মেদ হেসে সাইয়ারার পরিচয় দিলো মেঘের কাছে। মেঘ তার দিকে তাকিয়ে বলল-

বিরিয়ানির দাওয়াত রইল। এসে খাবো একসাথে।

.

কথাটি বলেই মেঘ এক দৌড়ে বাড়ির বাইরে চলে গেল। অন্তরা আহম্মেদ রাগে গজগজ করতে থাকলে সাইয়ারা বলল-

চিন্তা করবেন না আন্টি। উনি নিশ্চয় ফুটবল খেলতে গেছে। বৃষ্টির দিনে যদি ছেলেরা ফুটবল না খেলে, তবে মাঠের অপমান হবে তো!

.

সাইয়ারার কথা শুনে হেসে বললেন তিনি-

বিরিয়ানি খেতে আসিস দুপুরে।

.

.

অনেকদিন পর বন্ধুদের সাথে বৃষ্টির দিনে শহরে হাঁটতে বেরিয়েছে মেঘ। বৃষ্টি তার ভীষণ প্রিয়। তাই বৃষ্টি হলেই ভিজতে ভুলে না সে!

.

“আনন্দ নগর” এটা যেন মেঘের প্রাণের শহর। এ শহরের প্রতিটি অলিগলি তার চেনা। কতটা দিন প্রাণের শহরটা থেকে দূরে ছিল ভাবতেই বুকের ভেতর হু-হু করে উঠলো।

.

বন্ধুদের সাথে হাঁটতে হাঁটতে আনন্দ নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে এল সে। 

তার ইচ্ছে ছিল নিজের শহরের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। কিন্তু তার মায়ের ইচ্ছে ছিল, তার ছেলে দেশের সবচেয়ে ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়বে। মায়ের ইচ্ছে পূরণ করতেই তাকে পাড়ি জমাতে হয়েছিল ভিন্ন শহরে। 

.

মাঝেমধ্যে এখানে আসা হলেও এই বিশ্ববিদ্যালয় এ আসেনা অনেকদিন। তাই আজ যখন হাঁটতে হাঁটতে পাশেই চলে এল, ভেতরে যাওয়ারও ইচ্ছে হলো। বন্ধুদের বললে তারাও রাজি হয়। একসাথে সবাই প্রবেশ করে “আনন্দ নগর বিশ্ববিদ্যালয়” এ। 

.

ঘুরেফিরে সবটা দেখতে লাগলো মেঘ। অনেকদিন পর নিজের শহরের বিশ্ববিদ্যালয় দেখে মনটা খুশিতে ভরে গেল। মনে মনে ভেবে নিলো সে, যদি পারে পেশা হিসেবে এই বিশ্ববিদ্যালয় এর শিক্ষকতা করা বেছে নিবে। বন্ধুদের কথাটি জানাতে তারা তার সিদ্ধান্তে খুশি হলো। 

হঠাৎ বৃষ্টি বেড়ে যায়। সবাই একটা ভবনের নিচে আশ্রয় নেয়। হঠাৎ মেঘ খেয়াল করলো, একটি রমনী ছাতা হাতে মাঠের মাঝখান থেকে হেঁটে যাচ্ছে। মেয়েটির পরণে আকাশী রঙের একটি সালোয়ার কামিজ । দূর থেকে তার মুখটা বোঝা না গেলেও, কোমর সমান চুল ঠিকই বোঝা যাচ্ছে। 

বৃষ্টির সাথে সাথে বাতাস হওয়াতে মেয়েটির ছাতা সামলাতে কষ্ট হচ্ছে। আচমকা বাতাসের ঝাপটায় ছাতাটি তার হাত থেকে উড়ে যায়। তখনি তার চেহারা টা দেখতে পায় মেঘ। 

মেয়েটির চেহারার দিকে চোখ পড়তেই মেঘের ভেতরে তোলপাড়া করা ঝড় শুরু হয়। এই যেন ভালোলাগার এক ঝড়! এত সুন্দরী মেয়ে তাদের আনন্দ নগরে থাকে! জানা ছিল না তার। সে অপলক দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইল।

ছাতার পেছনে ছুটতে ছুটতে ছাতাটি ধরতে পারলো মেয়েটি। কিন্তু ছাতা ভেঙে গেছে দেখে হতাশও হলো। বাধ্য হয়েই বৃষ্টির মাঝে ভিজতে ভিজতে হাঁটতে শুরু করলো মেয়েটি। যেন তার খুব তাড়া আছে, এখুনি বাড়ি পৌঁছতে হবে।

বন্ধুদের মাঝ থেকে দৌঁড়ে মেয়েটির পাশে এল মেঘ। তার পিছুপিছু হাঁটতে হাঁটতে থামতে বললেও থামলো না মেয়েটি। তাই মেঘ তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লো। দুজনের চোখাচোখি হতেই মেয়েটি চোখ সরিয়ে ফেললো। কিন্তু মেঘ সরালো না। তার ইচ্ছে করছে মেয়েটির চোখের মাঝে হারিয়ে যেতে।

মেয়েটির ডাকে ঘোর কাটলো মেঘের। 

সৃষ্টিকর্তা কি সব কিছু এই মেয়েটিকেই দিয়ে দিয়েছেন! মেয়েটির কণ্ঠস্বর এতই মিষ্টি যে, তার কথা যেন একনাগাড়ে অন্ততকাল শুনলেও বিরক্তবোধ হবে না কারো। মেঘ নিজের ছাতাটি এগিয়ে দিয়ে তাকে নিতে বলল। মেয়েটি ভ্রু জোড়া কুঁচকে বলল-

অপরিচিত একজনের কাছ থেকে ছাতা কেনো নিব আমি? আর তাছাড়া আপনিই বা কেন দিচ্ছেন?

-একই শহরের মানুষ আমরা। অপরিচিত কিভাবে হই বলুন? আমাদের পরিচয় তো একটাই, আনন্দ নগরের নাগরিক । তো একজন বিপদে পড়লে অন্যজন কি সাহায্য করবে না? বলুন?

-তাই বলে নিজে ভিজে অন্যকে সাহায্য করছেন?

-আমার বন্ধুদের সবার কাছেই ছাতা আছে। আমার সমস্যা হবে না। আপনি সময় নষ্ট না করে এটা নিন। ভালোই বৃষ্টি হচ্ছে।

.

ওদিকে মেঘের বন্ধুরা তার কান্ড দেখে হাসতে লাগলো। বুঝতে পারলো মেঘ মেয়েটিকে ভালোলাগার ঘোরে কেনো সাহায্য করতে গিয়েছে। কিন্তু বন্ধুমহলের মাঝে রাব্বি এটা পছন্দ করলো না। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।

.

কিছুক্ষণ ভেবে মেয়েটি বলল-

এক শর্তে নিব। ছাতাটি আবার ফেরত নিতে হবে।

-তাতো অবশ্যই।

.

হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে মেয়েটি বলল-

দিন। আর কাল ঠিক এই সময়ে এখানে ছাতাটি ফিরিয়ে দিতে আসব।

-আচ্ছা।

.

ছাতা নিয়ে মেয়েটি চলে যেতে থাকলো। মেঘের ডাকে থেমে পেছনে ফিরলো সে।

মেঘ বলল-

ধন্যবাদ না বলুন, নাম টা তো বলে যান?

.

মনভোলানো এক হাসি দিয়ে মেয়েটি বলল-

হুরায়রা!

.

হুরায়রা আবারো হাঁটতে শুরু করলো। তাকে যতক্ষণ দেখা যায়, মাঠের মাঝখানে ঠিক ততক্ষণই দাঁড়িয়ে ছিল মেঘ। এরপর বন্ধুদের কাছে ফিরে এলে তারা তাকে নিয়ে মজা করতে থাকলো। কিন্তু রাব্বি কিছু বললো না। গোমড়া মুখে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মেঘ জানতে চাইলো তার কি হয়েছে। 

অন্যরা তখন জানালো, রাব্বি মেয়েটিকে পছন্দ করতো। কিন্তু মেয়েটি তাকে পাত্তা দেয়নি। শুধু রাব্বি কেনো, কোনো ছেলেকেই সে পাত্তা দেয় না। 

এটা শুনে বেশ খুশি হলো মেঘ। 

তার বন্ধু ইমাদ বলল-

খুশি হচ্ছিস? খুব কম ছেলেই আছে প্রথম দেখায় ওর প্রেমে পড়েনি। কিন্তু মেয়েটা কাউকেই গুরুত্ব দেয় না। তার কোনো বান্ধবীও নেই।

-দরকার কি! ওর বন্ধু, বান্ধবী, বয়ফ্রেন্ড, হাসবেন্ড সবই আমি হব।

.

এবার মুখ না খুলে পারলো না রাব্বি। 

সে বলল-

সবাই প্রথমে এমনটা ভাবে। পরে কিছুই হতে পারে না।

.

মৃদু হেসে মেঘ বলল-

এতদিন মেঘ তো ছিল না! এখন মেঘ এসেছে। মেঘের শহর অপেক্ষা করছে হুরায়রার জন্য। যেখানে তার আসতেই হবে!

.

.

বাড়ির সামনে ভিক্ষুক এসেছে বলে অন্তরা আহম্মেদ বাইরে এলেন থালা হাতে নিয়ে। অসহায়দের প্রতি তার মায়া বেশি কাজ করে। তাদের সাহায্য করতে ভালোবাসেন তিনি।

এই বৃষ্টির দিনেও খালি হাতে ফিরে যেতে দেননি ভিক্ষুক কে।

ভিক্ষুক চাল নিয়ে চলে যেতেই তিনি খেয়াল করলেন, একটি মেয়ে তার বাড়ির সামনে হেঁটে চলে যাচ্ছেন।

তার বাড়ির সামনে কত মানুষই হেঁটে যায়। এতে তার কোনো অসুবিধে নেই বা থাকার কথাও নয়। কিন্তু এই মেয়েটির হাতের ছাতা দেখে সে চমকে উঠল। এই ছাতাটি তার ছেলের। কিন্তু ছাতাটি মেয়েটির কাছে কিভাবে এল!

অন্তরা আহম্মেদ মেয়েটির উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে বললেন-

এ মেয়ে থামো বলছি?

.

মেয়েটি থামলো না। তা দেখে তিনি রেগেমেগে বললেন-

আমার ছেলের ছাতা চুরি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? থামো বলছি! থামো!

.

এবার মেয়েটি দ্রুত হেঁটে চলে গেল। কিন্তু চেঁচামেচি থামালেন না অন্তরা আহম্মেদ। উঠোনে এসেও তিনি মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে চেঁচাতে লাগলেন।

.

তার কণ্ঠস্বর শুনে বারান্দায় এসে সাইয়ারা বলল-

কি হলো আন্টি?

-একটা মেয়ে আমার ছেলের ছাতা নিয়ে গেল!

-মেঘ ভাইয়ার ছাতা?

-হ্যাঁ। সকালে যেটা নিয়ে সে বাইরে গেল।

-একই রকমের আরেকটি ছাতাও হতে পারে এটি।

-ছেলেবেলা থেকেই মেঘ বৃষ্টির দিনে যতবার বের হয়, ছাতা হারিয়ে আসে। তাই মনে হচ্ছে আমার…

.

তাকে থামিয়ে সাইয়ারা বলল-

কি? এই মেয়েটিকে দিয়ে দেয় সবসময়? 

.

সাইয়ারার কথা শুনে মুখটা বাঁকিয়ে তিনি বাড়ির ভেতরে যেতে যেতে বললেন-

না, এই মেয়েটি চুরি করে।

.

.

বন্ধুদের সাথে অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরি করে বাড়িতে ফিরে এল মেঘ। ভেতরে প্রবেশ করতেই তার মা জানতে চাইলো, ছাতা কোথায়।

মেঘ মুখটা ফ্যাকাসে করে রাখলে তিনি বললেন-

আমি জানি কোথায়।

-কোথায়?

-একটা মেয়েকে দিয়েছিস।

.

চোখ জোড়া বড়বড় করে মেঘ বলল-

তুমি কি করে জানলে?

-মানে! তুই তাহলে ছাতা হারাস না। সেই ছোট থেকেই মেয়েদের দিয়ে বেড়াতিস? 

-এমন টা নয় মা। কখনো দিইনি কাউকে। তবে আজই দিলাম একটা মেয়েকে। আসলে আমার বন্ধুদের কাছে তো ছাতা ছিল। তার কাছে ছিল না। 

-জনসেবা করবি ভালো কথা৷ ওমন অসভ্য মেয়েকে হেল্প করতে গেলি কেনো?

-অসভ্য?

-হু! কত ডাকলাম তাকে। সে শুনলোই না।

-মেয়েটি এদিকে গিয়েছে?

-হ্যাঁ। আমি তো ছাতা দেখেই চিনেছি, ওটা তোর। সে আমাকেই বললেই হত, তার বিপদের কথা!

.

মেঘ হেসে বলল-

যদি চোর ভেবে ধোলাই দিতে? তাই হয়তো কথা বলেনি।

-ওহ! এটা তো ভেবে দেখিনি।

-দেখো। আমি ফ্রেশ হতে গেলাম।

.

.

ভেজা কাপড় বদলে গোসল সেরে ডাইনিং টেবিলে খেতে আসলো মেঘ। সাইয়ারা কে দেখলো, তার মা ও বোনের সাথে বকবক করছে। তাকে দেখে হ্যালো বলল সে। সাইয়ারা মুচকি হেসে বলল-

বিরিয়ানি খেতে চলে আসলাম।

-ভালো করেছেন।

-তুমি করে বলবেন। আমি ছোট আপনার।

-আচ্ছা। 

-তা খেলা কেমন খেললেন?

-কিসের খেলা?

-ওমা আপনি ফুটবল খেলতে গেলেন না?

-না তো!

-তবে?

-ঘুরতে।

-তা কোথায় কোথায় ঘুরলেন?

-বেশি কোথাও না। আনন্দ নগর ভার্সিটিতে গিয়েছিলাম।

-তাই! ওখানেই আমি পড়ি।

-আচ্ছা! কোন ডিপার্টমেন্টে?

.

এই কথায় সেই কথায় সাইয়ারার সাথে বেশ আড্ডা জমে উঠল। মেঘ বুঝতে পারলো, সাইয়ারা কথা বলতে পছন্দ করে। এবং অনেক মজার মজার কথাও বলে। মাঝেমধ্যে মেয়েটির সাথে আড্ডায় বসাই যায়।

.

.

ডাক্তার ইসরাকের সামনে বসে আছে জিকো। বেশকিছুক্ষণ ধরেই তিনি জিকো কে চেম্বার থেকে বেরুতে বলছেন, কিন্তু সে বসেই আছে।

একপর্যায়ে বিরক্ত হয়ে তিনি বললেন-

আপনি আগেও একজন মেয়ে ছিলেন এখনো মেয়েই আছেন। কেনো আমার সময় নষ্ট করছেন এসব উদ্ভট কথাবার্তা বলে?

.

কান্নাজড়িত কণ্ঠে জিকো বলল-

আমি মিথ্যে বলছি না। বিশ্বাস করুন! 

.

জিকোর দিকে ভালোভাবে তাকিয়ে ডাক্তার ইসরাক বললেন-

আপনার আমার কাছে না, মানসিক ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত। উনিই আপনার সঠিক চিকিৎসা করতে পারবে।

.

ডাক্তার ইসরাকের কথা শুনে হতাশ হলো জিকো। তাকে পাগল ভাবলেন তিনি! কেনো বিশ্বাস করছেন না, কাল রাতেও সে ছেলেই ছিল!

.

চলবে

.

#পর্ব_২ : 

https://www.facebook.com/778643512491017/posts/1114672525554779/?app=fbl

 

ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে এসে রাস্তায় উদ্দেশ্যহীনভাবে এলোপাতাড়ি হাঁটতে থাকলো জিকো। একসময় ক্লান্ত হয়ে একটা পার্কের মধ্যে ঢুকে পড়লো সে। বৃষ্টি হবার কারণে মানুষেরা আজ এদিকে আসছে না। তাই পার্কটা আজ বেশ ফাঁকা। বসার জন্য সে জায়গা খুঁজতে থাকলো। সবখানেই ভিজে একাকার হয়ে আছে। চোখ যায় তার একটা কংক্রিটের ছাতার দিকে। সেদিকে এগিয়ে গিয়ে তার নিচে ধপাস করে বসে পড়লো জিকো।

বৃষ্টি থেমেছে কিছুক্ষণ হলো। আবহাওয়া এখনো ঠান্ডা। তবুও জিকো দরদর করে ঘামছে। তার পরিহিত পাঞ্জাবি তে ঘামের দাগ লেগে আছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামও জমেছে। পাঞ্জাবির হাতা দিয়ে কপালের ঘামটা মুছে নিলো সে। এরপর ছাতাটার গায়ে হেলান দিয়ে চোখটা বুজে নেয়৷ একটু ঘুমের তার ভীষণ প্রয়োজন। যদি ঘুম থেকে উঠে দেখে সবটা স্বপ্ন!

.

.

বিকেলে ছাদে হাঁটাহাঁটি করা সাইয়ারার ছোটবেলার অভ্যাস। আজও সে ছাদে হাঁটছে। সাথে কানে এয়ারফোন গুজে গান শুনছে সে।

তার আকাশ দেখতে ভালো লাগে। মেঘলা আকাশ তার ভীষণ প্রিয়। আজও আকাশ মেঘলা। গাছ-গাছালির ফাঁকে যতদূর দৃষ্টি যায়, দেখা যাচ্ছে মেঘ আর মেঘ! 

আকাশের দিক থেকে দৃষ্টিটা সরিয়ে আশেপাশে তাকায় সাইয়ারা। পাশের বাসার ছাদে মেঘকে দেখতে পায় সে। আকাশের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেঘ। 

কান থেকে এয়ারফোনটা খুলে সাইয়ারা বলল-

আমার খুব ভালো লাগে মেঘ কে।

.

বাড়ি দু’টি পাশাপাশি হবার কারণে এক ছাদ থেকে সহজেই অন্য ছাদে পার হওয়া যায়। প্রায় সময় সাইয়ারা পার হয়ে ছাদে শুকোতে দেওয়া, অন্তরা আহম্মেদের আচার চুরি করে খেয়ে আসে। পরে অবশ্য তা জানিয়ে দেয়। তবুও চুরি করে খাওয়ার মজাই যেন আলাদা!

.

সাইয়ারার কথা শুনে হকচকিয়ে গেল মেঘ। সে বলল-

মানে?

-কি মনে করেছেন? আপনাকে ভালো লাগে বলেছি? আমার আকাশের মেঘ দেখতে ভালো লাগে বললাম।

.

মেঘ হেসে বলল-

ও তাই বলো!

.

সাইয়ারা রেলিং পার হয়ে মেঘের কাছে আসলো।

মেঘ বলল-

আরে আমিই নাহয় পার হতাম!

-আমার অভ্যেস। তা কেমন কাটছে দিন?

-ভালোই।

-এতদিন অন্য শহরে ছিলেন, এখন এখানে এসে মিস করছেন না ওই শহর কে?

-মিস করতাম নিজের শহর কে। তবে ওই শহরের জন্য যে মায়া নেই এমনটাও নয়। 

-ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি? দেশের বাইরে যাবেন?

-মা তোমাকে বলেছে কি, আমাকে দেশের বাইরে পাঠাতে আগ্রহী তিনি?

-হ্যাঁ। কত ব্রিলিয়ান্ট আপনি! আর আমার এই ভার্সিটিতে চান্স পেতেই খবর হয়ে গেছে।

-কেমন লাগে আনন্দ নগর ভার্সিটি?

-ভালোই। তবে আমার না এত পড়াশোনা করার ইচ্ছে নেই।

-কেনো?

-টুকটাক করলেই তো হয়! নিজের বাচ্চা পড়ানো যায় মতো। আমার ভবিষ্যতে চাকরি করার ইচ্ছে নেই। বাবার জন্যই পড়তে হচ্ছে।

.

সাইয়ারার কথা শুনে হেসে ফেললো মেঘ। 

সাইয়ারা বলল- 

ফ্রি আছেন?

-আছি। কেনো?

-আমাকে চটপটি খাওয়াবেন আপনি।

-এখন?

-হ্যাঁ। পাশেই একটা ছোটখাটো রেস্টুরেন্ট আছে। আমি তো প্রতিদিন খাই। এক প্লেট মাত্র ত্রিশ টাকা।

.

সাইয়ারার দিকে ড্যাবডেবে চোখে তাকিয়ে আছে মেঘ। সে হাত নেড়ে বলল-

হ্যালো? ওমন ভাবে কি দেখছেন? খাওয়ানোর কথা বলতেই ভয় পেয়ে গেলেন তো? খাওয়াতে তো আপনাকে হবেই।

.

এক প্রকার জোর করেই মেঘ কে নিয়ে বাড়ির বাইরে এল সাইয়ারা। দুজনে কথা বলতে বলতে রাস্তায় হাঁটতে লাগলো। হঠাৎ মেঘ তার এলাকার এক বন্ধুকে দেখে ডাকলো। যার নাম নোবেল। সে মেঘকে দেখে হাসলেও, সাইয়ারা কে দেখে মুখটা ফ্যাকাসে করে ফেললো। এক ধরনের ঘৃণার চোখে তাকিয়ে থাকলো তার দিকে। সাইয়ারা কে নিয়ে মেঘ তার পাশে এগিয়ে আসলো। দুজনে কুশল বিনিময় করে একে অপরের হালচাল জানতে চাইলো।

সাইয়ারা মুখ ঘুরিয়ে তাকিয়ে রইল অন্যদিকে। 

মেঘের কানের কাছে নোবেল তার মুখটা এনে ফিসফিস করে বলল-

এত বিশ্রি একটা মেয়ের সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছিস কেনো তুই?

.

সাইয়ারা কে বিশ্রি বলেছে শুনে অনেকখানি অবাক হলো মেঘ। তার গায়ের রঙ শ্যামবর্ণের হলে কি হবে? চেহারাটা ভারী মিষ্টি। চুলগুলো লম্বা তবে কোঁকড়া। হাসিখুশি প্রাণবন্ত একটা মেয়ে সাইয়ারা। অতি সুন্দরী তাকে বলা যায় না, কিন্তু বিশ্রিও বলা যায় না!

মেঘ ধীর কণ্ঠে বলল, এসব কি বলছে সে। মেয়েটি শুনলেও বা কি মনে করবে!

.

নোবেল জানায়, বিশ্রি কে বিশ্রি না বলে কি করবে!

মেঘ বুঝতে পারলো না কোনদিকে এই মেয়েটিকে তার বিশ্রি মনে হচ্ছে! তাই তাকে এই কথাটি সে জিজ্ঞাসা করলো। 

সে বলল-

কালো কুচকুচে, দাঁত গুলো হলুদ, উপরের দুটো দাঁত তো নেইও, মাথায় কোনো চুল নেই এমন একটা মেয়ে বিশ্রি নয়! এটা কিভাবে বলছিস তুই?

.

নোবেলের কথা শুনে বিস্ময়ের শেষ পর্যায়ে চলে গেল মেঘ। সে তার হাত ধরে তাকে একটু দূরে সরিয়ে এনে বলল-

তোর মাথা গেছে নিশ্চয়! মেয়েটি মোটেও ওমন নয়। কত মিষ্টি একটা মেয়ের বর্ণনা তুই এত বাজেভাবে দিলি। সমস্যা কি তোর?

.

এবার নোবেল চেঁচিয়ে বলে উঠল-

কিসব বলছিস মেঘ? আমি ভেবেই পাচ্ছি না ওমন কুৎসিত একটা মেয়েকে তুই মিষ্টি কিভাবে বলতে পারছিস!

.

সাইয়ারার কানে কথাটি যেতেই সেদিকে দ্রুত হেঁটে গেল সে। তাকে দেখে নোবেল কে যেতে বলল মেঘ। কিন্তু সাইয়ারা তাকে ছাড়ার পাত্রী নয়। সে তাকে একের পর একের পর নানারকম প্রশ্ন করে যাচ্ছে।

সে কোন দিক থেকে দেখতে কুৎসিত, কেনো এমন বলল, তার কি সমস্যা ইত্যাদি ইত্যাদি। 

একপর্যায়ে দুজন বেশ কথা কাটাকাটি করতে শুরু করলো। নোবেল সেই তখন থেকেই বলে যাচ্ছে, কুৎসিত কে সে কুৎসিত ই বলবে।

.

এবার সাইয়ারা বেশ রেগে গেল। পায়ে থাকা স্যান্ডেল টা খুলতে লাগলো সে। তা দেখে নোবেল দৌড় দিলো। সাইয়ারা স্যান্ডেল হাতে তার পিছু নিলো।

মেঘও ছুটতে লাগলো তাদের পেছনে। মেঘ হোচট খেয়ে রাস্তায় পড়ে গেলে সাইয়ারা থেমে যায়। সে ছুটে মেঘের কাছে আসে। কোথাও ব্যথা পেয়েছে কি না জানতে চায়। মেঘ হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে আগে উঠাতে বলে তাকে। মেঘ কে উঠতে সাহায্য করলো সাইয়ারা। এরপর পেছনে ফিরে বলল-

চলে গেল শয়তান টা!

.

এদিকে রাস্তায় কাদা থাকার কারণে মেঘের পোশাকে কাদা লেগে গেছে। সে পকেট থেকে রুমাল বের করে মুছতে মুছতে বলল-

বাদ দাও এসব। এখন স্যান্ডেল টা হাত থেকে সরাও। পায়ের জিনিস পায়েই মানায়।

.

সাইয়ারা স্যান্ডেল পায়ে পরে নিলো। আশেপাশে মানুষ জড়ো হয়ে গেছে। তারা জানতে চাইলো, কোনো সমস্যা হয়েছে কি না।

সাইয়ারা সকলের উদ্দেশ্যে জানতে চাইলো, সে কি দেখতে কুৎসিত কি না। সকলে একইসাথে না বলল। একটা ছেলে তো সুযোগ পেয়ে বলেই ফেলল, সাইয়ারা কে তার ভীষণ ভালো লাগে। কতদিন যাবৎ চেষ্টা করছে মনের কথা জানাতে।

.

এসব দেখে হাসি থামাতে পারছে না মেঘ। সে সাইয়ারার হাত ধরে তাকে টানতে টানতে সেখান থেকে সরে আসে।

সাইয়ারা বলল- 

দেখেছেন? সকলে আমাকে সুন্দরী বলছে। আর ওই বাজে ছেলেটা আমাকে কুৎসিত বলল! বিশ্বাস করুন, তার সাথে কোনো শত্রুতাও নেই আমার।

-কে কি বলল তাকে কি এসে যায়? তুমি তো জানোই তুমি কেমন।

-আপনি বলুন। কেমন দেখতে আমি?

-অনেক মিষ্টি একটা মেয়ে। এবার চলো চটপটি খেতে। যদিও আমার জামা ময়লা হয়ে আছে, তবুও তোমার জন্য যাচ্ছি।

.

মেঘের কথা শুনে সাইয়ারার মনে আনন্দের দোলা দিয়ে উঠল। অদ্ভুত এক ভালো লাগা কাজ করছে তার মনে। মেঘের সঙ্গ পেয়ে এত বেশি ভালো কেনো লাগছে তার!

.

.

চুলোয় রান্না বসিয়েছে হুরায়রা। রাতের ও কাল দুপুরের রান্না সেরে রাখবে সে। প্রতিদিন এমনটায় করে। 

চুলোর আঁচটা কমিয়ে নিজের রুমে এল সে। জানালার পাশে এসে বাইরের প্রকৃতি উপভোগ করতে লাগলো। ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে বাইরে। ইচ্ছে করছে ছাদে উঠে হাঁটতে। চুলোয় রান্না থাকায় ইচ্ছেটা দমিয়ে রাখলো সে। রান্না শেষ হলেই না হয় যাওয়া যাবে।

জানালার সাথে আঁটকে রাখা ছাতাটির দিকে নজর পড়লো তার। মনে পড়ে গেল সেই ছেলেটির কথা। যে তাকে ছাতাটি দিয়েছিল। লম্বাচওড়া, ফর্সা, গোলাপি ঠোঁটের অধিকারী ছেলেটিকে দেখে বেশ ভদ্রই মনে হয়েছে তার। তার নামটি জানা হলো না। মাঝেমাঝে কি যে করে না সে! একটা ছেলে বিপদের সময়ে সাহায্য করতে এল, ধন্যবাদ তো দিলোই না নামটাও জিজ্ঞাসা করলো না সে। এটা একেবারেই ঠিক হয়নি।

এসব ভেবে নিজেই অবাক হলো হুরায়রা। সে আগে কখনো কোনো ছেলে কে নিয়ে এত ভাবেনি। এই ছেলেটিকে নিয়ে কেনো ভাবছে?

নাহ, তাকে নিয়ে ভাবারও কিছু নেই। কালই ছাতাটি ফিরিয়ে দিবে সে। 

পরক্ষণে হুরায়রার মনে পড়লো, কাল তার ক্লাস নেই। মনে পড়তেই নিজের উপরে রাগ হতে লাগলো। বন্ধের দিনে ছাতা দেয়ার জন্য তার বেরুতে হবে। এর চেয়ে বিরক্তিকর আর কি হতে পারে!

.

.

মেঘ এক বাটি চটপটি খেতে খেতে বেশ কয়েক বাটি খেয়ে ফেলেছে সাইয়ারা। 

মেঘ নিজের পকেটে হাত দিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে, কত টাকা আছে এখন। হুট করে বেরিয়েছে সে। টাকা নেওয়া হয়নি। সাইয়ারা বলেছে এক প্লেট ত্রিশ টাকা। একশো টাকা তো তার পকেটে থাকবেই, এই ভেবে বের হয়েছে সে। কিন্তু এই মেয়ে এক বসাতেই যে এত বাটি চটপটি খাবে, এটা তার জানা ছিল না।

সাইয়ারার ডাকে মেঘ বলল-

হু বলো?

-মজা না চটপটি?

-হ্যাঁ।

-আজকালের ছেলে রা মেয়েদের মন একেবারেই বুঝে না। কিসব দিয়ে প্রপোজ করতে আসে।

-কিসব?

-এই যে ফুল, কার্ড, চকোলেট। 

-আমি তো জানি এসবেই মেয়েরা ইমপ্রেস হয়।

-অন্যান্য মেয়েরা হতে পারে। তবে আমি হই না।

-তাই! তা কি দিলে তুমি রাজি হবে?

-এক বাটি চটপটি। 

.

সাইয়ারার কথা শুনে না হেসে পারলো না মেঘ। মেঘের হাসি মাখা মুখের দিকে তাকিয়ে, সাইয়ারার ঠোঁটের কোণেও হাসি ফুটে উঠলো। মেঘ জানতে চাইলো, সে আর চটপটি খাবে কি না। সাইয়ারা না বললে তারা উঠে পড়ে। মেঘ পকেটে হাত দিলে সাইয়ারা বলল-

টাকা দিতে হবে না।

-কেনো?

-তাদের কাছে টাকা পাই আমি। আগের বার যখন এসেছিলাম ভাংতি ছিল না বলে দিতে পারে নি।

-কিন্তু তুমি যে আমাকে খাওয়াতে বললে?

-সেটা তো পরীক্ষা করে দেখেছি, আপনি কিপটে কি না।

.

কথাটি বলে বেরিয়ে পড়লো সাইয়ারা। মৃদু হেসে তার পিছু নিলো মেঘ।

.

.

কারো ডাকে ঘুমটা ভেঙে গেল জিকোর। চোখজোড়া কচলাতে কচলাতে সামনে থাকা ব্যক্তিটির দিকে দৃষ্টি দিলো সে। মাঝবয়সী একটি লোক ভ্রু জোড়া কুচকে দাঁড়িয়ে আছে। জিকো জানতে চাইলো সে কি বলতে চায়ছে। লোকটি বলল-

সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে মা৷ বাড়ি চলে যাও। এই সময়ে এখানে একা একা ঘুমিয়ে থাকা নিরাপদ নয়।

.

লোকটির মুখে মা ডাক শুনে সব মনে পড়ে গেল জিকোর। অন্ধকার নামেনি এখনো। কিন্তু তার চারপাশ টা অন্ধকার মনে হচ্ছে। তার মানে সে স্বপ্ন দেখেনি!এসব সত্যি। এবং সে সত্যিই মেয়ে হয়ে গেছে!

নিশ্চুপ জিকো কে দেখে লোকটি আবারো বলল-

তোমাকে কেমন যেন লাগছে। সব ঠিক আছে কি?

-আমাকে দেখে কি আপনার মেয়ে মনে হচ্ছে? আমি তো ছেলে।

.

লোকটি ঠাট্টার সুরে হেসে বলল-

আমাকে দেখে কি তোমার পাগল মনে হচ্ছে? 

.

কথা বাড়ালো না জিকো। উঠে পড়লো সে। এভাবে বসে থাকলে চলবে না। ডাক্তার ইসরাক তার সমস্যার কোনো সমাধান করতে পারেনি তো কি হয়েছে, অন্য কোনো ডাক্তার নিশ্চয় পারবে।

.

.

বাড়ির সামনে চলে আসলো সাইয়ারা ও মেঘ।

মেঘকে ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় জানিয়ে বাড়িতে ঢুকে গেল সাইয়ারা। 

মেঘ ঢুকতে যাবে ঠিক তখনি পাড়ার এক বড় ভাই এর ডাকে থেমে গেল সে।

বড় ভাইটি তার পোশাকে কাদা লেগে আছে কেনো জানতে চাইলে মেঘ বলল-

সে অনেক কথা। তোমার কি অবস্থা বলো?

.

তার দিনকাল কেমন কাটছে তা বলতে থাকলো সে। কথার একপর্যায়ে জানলো, তাকে একটি কুৎসিত চেহারার মেয়ে বিরক্ত করছে অনেকদিন যাবত। 

তা শুনে মেঘ বলল-

আল্লাহ এর সৃষ্টি কখনো কুৎসিত হয় না। তাকে তোমার পছন্দ নয়। এটা বলতে পারো।

.

বড় ভাইটি জানায়, মেয়েটিকে দেখলে সেও কুৎসিত ই বলতো। কালো কুচকুচে দেখতে, হলুদ হলুদ দাঁত, কয়েকটি দাঁত নেই, মাথায় চুলও নেই খুবই বাজে অবস্থা !

.

মেঘ বলল-

মেয়েটি তোমায় ভালোবাসে?

-সে বলছে আমি তার পেছনে ঘুরেছি অনেকবার। সে আমার প্রেমে পড়ে গেছে। তাই এখন আমার পেছনে ঘুরছে। কিন্তু এমন একটা মেয়ের পেছনে আমি কেনো ঘুরব বল ভাই?

-চিন্তার বিষয়।

-যাক, আমি আসি এখন। কাজ আছে একটা।

.

সে চলে যেতেই কিছুক্ষণ আগের ঘটনা মনে পড়ে গেল মেঘের। একটু আগেই তো সাইয়ারা কে নোবেল কুৎসিত বলে গেল। ঠিক এভাবেই তার বর্ণনা দিয়েছে সে। 

দুইজনই কি একই মেয়ের বর্ণনা দিলো? কিন্তু কেনো? সাইয়ারা তো দেখতে মোটেও কুৎসিত নয়।

তাহলে তারা এমন বলছে কেনো!

চলবে

.  

#পর্ব_২

#মেঘের_শহর

Saji Afroz

 

.

পর্ব_১

https://www.facebook.com/778643512491017/posts/1113172589038106/?app=fbl

.

#পর্ব_৩

 

https://www.facebook.com/778643512491017/posts/1117007265321305/

 

#মেঘের_শহর

#পর্ব_৩

Saji Afroz

.

মিন্নী ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে বাগানের দিকে হাঁটতে যায়। এই বাগান ঘিরে শত স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ছোট বেলায় ভাই এর সাথে এখানে খেলাধুলা করে সময় কাটাত। আর এখন ঘুম ভাঙলেই হাঁটতে আসে সে।

বাগানটিতে নানাধরণের ফুল ও ফলের গাছে ভরে আছে। সে হেঁটে হেঁটে স্মৃতি চারণ করতে লাগলো।

আগে কত মধুর ছিল সময় গুলো। আর এখন? ভাই এসেছে বেশ কয়েকদিন হয়ে গেল। কিন্তু একসাথে বসে দুই মিনিট কথাও বলেনি তারা। 

এসব মনে পড়তেই মিন্নীর মনটা খারাপ হয়ে গেল।

ধীরপায়ে এগিয়ে গেল সে ভাই এর রুমের দিকে।

.

মেঘ কে বেঘোরে ঘুমোতে দেখে সে আর ডাকল না। বাড়িতে আসলেই ঘুম থেকে উঠতে উঠতে তার বেলা গড়িয়ে যায়।

মিন্নীরও ক্লাসের সময় হয়ে এসেছে। সে দরজাটা ঠেলে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যায়। ফিরে এসেই নাহয় কথা বলা যাবে।

.

সাইয়ারা বিছানায় আধশোয়া হয়ে সমরেশ মজুমদারের কালবেলা উপন্যাসটি পড়ছে। এটি তার প্রিয় উপন্যাস। সময় পেলেই সে উপন্যাসটির কয়েক পাতা হলেও পড়তে চেষ্টা করে। যতবার পড়ে ততবার যেন চরিত্রগুলোকে নতুনভাবে আবিষ্কার করে সে। 

আর ভাবে, কবে আসবে তার জীবনে এমন একজন? যে তাকে ভালোবাসার সাগরে ডুবিয়ে রাখবে!

.

.

বাড়ির সব কাজ শেষে ছাতা হাতে বেরিয়ে পড়ল হুরায়রা। আজ ছেলেটিকে ছাতা ফিরিয়ে দেয়ার জন্যই ভার্সিটিতে যেতে হচ্ছে তার। নাহলে বাসায় বসে বসে অনেক কিছু পড়া হয়ে যেত। 

ক্লাস না থাকলে সময় টিকে কাজে লাগায় সে। অহেতুক অন্য কাজে সময় নষ্ট করে পড়াশোনার ক্ষতি করতে পছন্দ করে না হুরায়রা।

.

.

মেঘ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। রাতে ঠিক মতো ঘুম হয়নি তার। বারবার হুরায়রার মুখটা চোখের সামনে ভেসে আসছিল। শেষ রাতের দিকে চোখ লেগে আসে তার। এখন তার মা এসে সাধের ঘুম ভাঙায়।

আড়মোড়া ভেঙে পাশ ফিরে মায়ের দিকে তাকিয়ে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বিরক্তি নিয়ে বলল-

এত ডাকছ কেনো মা? কি হয়েছে?

-কি আর হবে! তুই তো এমনিতেই এখানে এলে দেরীতে উঠিস। কিন্তু কাল রাতে যে বললি তাকে তাড়াতাড়ি ডেকে দিতে, তাই তো ডাকছি!

.

মায়ের কথা শুনে এক লাফে বসে পড়ল মেঘ। এইরে!

আজ তার হুরায়রার সাথে দেখা করার কথা। আর সে কি না এখনো ঘুমোচ্ছে!

দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে সময় দেখে নিলো মেঘ।

নাহ, খুব বেশি দেরী হয়নি। তাড়াহুড়ো করে উঠে সে ওয়াশরুমের দিকে ছুটে গেল। 

ওয়াশরুম থেকে ফিরে এসে তৈরী হয়ে নিলো সে।

ড্রয়িংরুমে আসতেই দেখলো, তার মা টেবিলে খাবার সাজিয়ে বসে আছে।

কিন্তু তার হাতে সময় নেই। দেরী করলে যদি হুরায়রা কে না পাওয়া যায়! কাল থেকে তাকে দেখার জন্য মনটা অস্থির হয়ে আছে মেঘের।

অন্তরা আহম্মেদ তাকে খেতে বসতে বললে সে পরে খাবে জানায়। পরে খাওয়ার কারণ জানতে চান। মেঘ জানায় সে এখুনি একটা কাজ সেরে ফিরে আসবে।

সকালের নাস্তা করা ছাড়াই সে বাইরে যাবে শুনে অন্তরা আহম্মেদ রেগে যান। 

মায়ের অভ্যাস সম্পর্কে অবগত মেঘ। এখুনি তিনি চেঁচামেচি করে মেঘকে আটকানোর চেষ্টা করবেন। এতে তার সময় নষ্ট হবে। তাই মেঘ আর এক মুহুর্তও না দাঁড়িয়ে দৌড়ে বেরিয়ে যায়। তার পেছনে অন্তরা আহম্মেদ ও ছুটে এল। মেঘের সাথে কি আর তিনি ছুটে পারবেন?

উঠোনে এসেই থেমে গিয়ে চেঁচামেচি করতে লাগলেন।

এদিকে উপন্যাস পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছিল সাইয়ারা। অন্তরা আহম্মেদের চেঁচামেচি শুনে বারান্দায় এসে বলল-

আজ আবার কি হলো আন্টি?

-ছেলেটা নাস্তা না করেই বেরিয়ে গেল। যেখানে যাবে যাক, নাস্তাটা করতে পারবে না?

.

দুষ্টু একটা হাসি দিয়ে সাইয়ারা বলল-

এখন থেকে নাস্তা কেনো? দুপুর ও রাতের খাবারও বাইরে খাবেন তিনি।

-কেনো?

-বুঝছ না? ছেলে বড় হয়েছে৷ মায়ের সাথে আর কতদিন খাবে?

-কার সাথে খাবে?

-এখন গার্লফ্রেন্ডের সাথে আর পরে বউ এর সাথে।

.

কপালে চিন্তার ভাজ পড়ল অন্তরা আহম্মেদের৷ সাইয়ারার খুব হাসি পাচ্ছে। এই মহিলা টা কারণে অকারণে চেঁচামেচি করলেও ভালো মনের মানুষ। আর খুব সহজ সরলও বটে!

.

কিছুক্ষণ নীরব থেকে চিন্তিত স্বরে তিনি বললেন-

এখানে এসেছে বেশিদিন হচ্ছে না। এর মাঝেই প্রেমিকা জোগাড় করে ফেলেছে?

-তোমার ছেলে কত হ্যান্ডসাম! যেকোনো মেয়েই তো তার সাথে প্রেম করতে রাজি হয়ে যাবে। আর ভালো লাগার বিষয়টায় অন্যরকম। সময় লাগে না কি! কখন কাকে ভালো লেগে যায় বলা মুশকিল।

-তোকে কিছু বলেছে?

-নাহ! তবে বুঝেছি।

-কি?

-ছাতা যাকে দিয়েছে তার সাথেই প্রেম চলছে তোমার ছেলের।

.

অন্তরা আহম্মেদ কিছু বললেন না। দ্রুত পায়ে হেঁটে সে বাড়িতে ঢুকে পড়ল। তার এমন অবস্থা দেখে হেসে ফেললো সাইয়ারা। সে জানে, অন্তরা আহম্মেদ প্রেমে বিশ্বাসী নয়। তাই তাকে রাগানোর জন্যই মজা করলো সে। এবার মেঘ আসলে তার উপরে ঝড় বয়ে যাবে, ঝড়!

.

.

কালই বৃষ্টি ছিল আর আজ এত গরম পড়ছে! 

বাসায় থাকতে সেটা টের পায়নি হুরায়রা। এখন মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অস্বস্থি লাগছে তার। হুরায়রায় চোখেমুখে গরমের হলকা এসে লাগছে। সে মুখটাকে বাঁচাতে দু’কদম পিছিয়ে আসে। 

এভাবে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে ঘেমে ভিজে একাকার হয়ে যাবে সে৷ তাই হুরায়রা পাশের ভবনের নিচে এসে দাঁড়াল।

একটু পরেই মেঘ এল। হুরায়রা কে দেখতে না পেয়ে হতাশ হলো সে। তার দেরী হবার কারণে সে কি চলে গেল কি না ভাবছে মেঘ।

নিজের উপর রাগ হচ্ছে তার৷ কেনো যে তাড়াতাড়ি ঘুমটা ভাঙলো না!

-শুনছেন?

.

পেছনে ফিরে হুরায়রা কে দেখে স্বস্তির একটা নিশ্বাস ফেললো মেঘ। তার দিকে ছাতাটি এগিয়ে দিলো হুরায়রা। ছাতাটি নিয়ে মেঘ তাকে ধন্যবাদ জানালো। হুরায়রা চলে যেতে চাইলে তাকে আটকে মেঘ একসাথে কফি খাওয়ার প্রস্তাব দিলো। হুরায়রা রাজি না হলে মেঘ বলল-

আমার থেকে নাইবা খেলেন। কিন্তু আপনার আমাকে খাওয়ানো উচিত৷ কাল আপনাকে ছাতা দিয়ে সাহায্য করেছিলাম কিন্তু আমিই।

.

হুরায়রা ভ্রু কুচকালে মেঘ তার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে অন্যদিকে তাকালো। হুরায়রা ধীর কণ্ঠে বলল-

চলুন।

.

হুরায়রা হাঁটতে লাগলো। তার পিছু নিলো মেঘ।

ভার্সিটি থেকে কিছুটা দূরে রাস্তার ধারে বড় একটি আম গাছের নিচে এসে থামলো হুরায়রা। এতক্ষণ দুজনে কোনো কথা বলেনি। মেঘের কথা বলতে ইচ্ছে হলেও কি বলবে ভেবে পাচ্ছিলো না।

হুরায়রা কে থামতে দেখে সেও থামলো৷ আশেপাশে নজর বুলালো। এদিক টায় এসেছে বেশ কয়েকবছর হচ্ছে। জায়গাটা বেশ নিরিবিলি। তবে এখন কয়েকটা ছোট ছোট চায়ের দোকান চোখে পড়লো তার। একটু দূরেই কাশবন দেখা যাচ্ছে। মেঘ জানে, কাশবনের মাঝে ছোট ছোট রাস্তা বিভিন্ন দিকে চলে গেছে। কাশবনের পরে রয়েছে একটি নদী। যেটি ‘আনন্দ নদী’ নামে পরিচিত৷ বিকেল হলেই সেখানে মানুষের ঢল নামে।

হুরায়রা বলল-

করিম চাচার হাতের বানানো চা এই শহরের সবচেয়ে বেস্ট চা। একবার খেলে কফি টফি খেতে ইচ্ছে করবে না। সাথে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তো আছেই। টঙের দোকানে বসে এক কাপ চা চলবে?

.

মৃদু হেসে মেঘ বলল-

দৌড়বে।

.

টঙের দোকানের সামনেই দুটো বেঞ্চ রাখা আছে। মেঘ এসে বসলো। হুরায়রা তার পাশে বসলো না। পাশের বেঞ্চটিতে বসে করিম চাচা কে দুকাপ চা বানাতে বললো।

আমগাছের উপরে অসংখ্য পাখি এসে ভিড় করেছে। তাদের কলকাকলিতে চারপাশটা হয়ে আছে মুখোরিত। হুরায়রা সেদিকে তাকিয়ে আছে।

এই সুযোগটা হাত ছাড়া করলো না মেঘ। পা থেকে মাথা পর্যন্ত সে হুরায়রা কে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো। 

হালকা সবুজ রঙের সালোয়ার কামিজে পরণে তার, কোনো সাজগোছ নেই, কোমর সমান লম্বা খোলা চুলগুলো বাতাসে উড়ছে তার। এতেই কতই না ভালো লাগছে তাকে! ঠিক যেন এই শহরের রাণী সে।

আমগাছ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে টঙের দোকানের দিকে তাকায় হুরায়রা। 

করিম চাচা কাপে চা ঢালতেই তার কাছে এগিয়ে গেল মেঘ। দুকাপ চা নিয়ে হুরায়রার পাশে এসে তার হাতে দিলো। তার পাশেই বসে অপরটিতে চুমুক দেয়। 

কিছুটা বিরক্ত হলো হুরায়রা। তার পাশে বসার জন্য মনে মনে মেঘকে বকা দিতে লাগলো। মেঘ যথেষ্ট দুরত্ব বজায় রেখে বসেছিল তবুও ব্যাপারটি পছন্দ হলো না তার। সে আরো দূরে সরে বসলো।

চায়ে চুমুক দিয়ে স্বাদ নিয়ে তৃপ্তির অভিব্যক্তি ছেড়ে মেঘ বলল-

বাহ! দারুণ তো!

.

হুরায়রা বলল-

করিম চাচার হাতে জাদু আছে।

-এখন থেকে এখানে এসেই চা খেয়ে যাব।

.

হুরায়রা কিছু না বলে কাপে আরেকবার চুমুক দিলো। 

মেঘ বলল-

পরিবারে কে কে আছে আপনার?

-মা, বাবা, আমি, ছোট বোন।

-ঠিক আমার মতো! তবে…

-কি?

-আমার বাবা নেই। কয়েকবছর হলো তিনি একটা এক্সিডেন্টে মারা গিয়েছেন।

.

মুখটা মলীন হয়ে গেল মেঘের। তার মুখের দিকে তাকাতেই হুরায়রার মনে অজানা এক মায়ার সৃষ্টি হলো। 

ছেলেটি নিশ্চয় তার বাবা কে ভীষণ ভালোবাস তো। তাই তো বাবার কথা বলতেই মুখটা ওমন হয়ে গেছে।

চা টা শেষ করে হুরায়রা বলল-

কষ্ট পাবেন না। এই সুন্দর পৃথিবীটা সবাইকে ত্যাগ করতে হবে একদিন। কেউ আগে করবে কেউ পরে। এটাই তো জগতের নিয়ম!

-হ্যাঁ, এটাই চরম সত্যি। কিন্তু প্রিয় মানুষ হারানোর ব্যথা টা তো সহজে যায় না। যে যাওয়ার সে চলেই যায়। আমাদের দিয়ে যায় একরাশ কষ্ট!

.

দুজনেই চুপচাপ৷ 

নীরবতা ভেঙে হুরায়রা বলল-

আপনার নাম?

-মেঘ। মেঘ আহম্মেদ।

.

মেঘ নামটা শুনে হুরায়রার মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। 

বেঞ্চের উপরে কাপটা রেখে সে বলল-

মেঘ! এই নামটা আমার বেশ পছন্দের।

-তাই বুঝি?

.

মেঘের সাথে আরো কিছুক্ষণ এখানে বসতে ইচ্ছে করলেও সে বসলো না৷ কিছু একটা ভেবে বসা থেকে উঠে সে করিম চাচার কাছে এসে চায়ের দাম দিলো।

মেঘ তাকে দিতে বারণ করলেও সে শুনলো না৷ মেঘের পাশে এসে বলল-

খাওয়ানোর কথা আমারি ছিল। চলুন যাওয়া যাক।

-বেশ তো লাগছিল এখানে।

-তবে আপনি থাকুন। আমার যেতে হবে।

.

হুরায়রা দ্রুত গতিতে হাঁটা শুরু করলো। হঠাৎ এই মেয়ের কি হলো বুঝতে পারলো না মেঘ। চুপচাপ দাঁড়িয়ে হুরায়রার পথের দিকে তাকিয়ে রইলো সে।

.

.

একটু পর পর সাইয়ারা জানালায় উঁকি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে মেঘ এসেছে কি না। বেশ কয়েকবার বারান্দায় ও ছাদে গিয়েছিল সে। ছাদের রেলিং পার হয়ে সোজা অন্তরা আহম্মেদের বাড়ির ভেতরেও গিয়েছে একবার। কিন্তু মেঘ কে দেখতে পায়নি।

মেঘের নামে তার মায়ের কাছে কানভারী করেছে সাইয়ারা। আজ নিশ্চয় মেঘের উপরে সুনামি চলবে।

উফফ কখন যে আসবে মেঘ, আর সাইয়ারা মজা উপভোগ করবে! ভাবতে ভাবতে অস্থির হয়ে যাচ্ছে সে।

.

কাল বেশ কয়েকজন ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল জিকো। তারা কেউই তার সমস্যাটি বোঝার চেষ্টাও করেনি। কেউ কেউ তাকে চরম অপমানও করেছে পাগল বলে। 

হতাশ হয়ে বাসায় ফিরে এসেছিল সে। সেই থেকে পেটে কিছু পড়েনি তার। 

মদও ছঁুয়ে দেখেনি। বিছানার পাশে বসে সারারাত চোখের পানি ফেলেছিল। 

সকাল সকাল চোখটা লেগে এসেছিল তার। কখন যে ঘুমে তলিয়ে গেল বুঝতেই পারেনি।

তাই এত বেলা হয়ে গেল, তবুও তার ঘুম ভাঙেনি।

হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ জিকোর কানে ভেসে এল। 

ঘুম থেকে উঠে দরজা টা খুলে তার প্রিয় বন্ধুর মোখলেস এর দেখা পেল সে। 

দরজা খুলতেই মোখলেস বলল-

কি ব্যাপার জিকো, এতক্ষণ কেনো লাগলো দরজা খুলতে?

.

বন্ধুর মুখে নিজের নাম শুনে খুশির সীমা রইলো না জিকোর! মোখলেস তাকে চিনতে পেরেছে। তার মানে সে কি ঠিক হয়ে গেছে? দৌড়ে সে আয়নার পাশে এল নিজেকে দেখার জন্য।

.

চলবে

.

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।