–  শাড়ি না পরতে পারলে পরার কি দরকার তাই তো বুঝি না, এখন খোলা শাড়ি নিয়ে র‍্যাম্প ওয়াক করবে নাকি?

 

সাফওয়ানের কথায় মেজাজ তুঙ্গে উঠে যায় আয়াতের। এই লোকের সমস্যা কি এইটা আজ অবদি বুঝতে পারে না আয়াতের। যখনই কোনো একটা অপ্রীতিকর সিচ্যুয়েশনে পরবে সেইখানে লোকটা হাজির হবে নয়তো উনার সামনেই কোনো না কোনো অপ্রীতিকর সিচ্যুয়েশন ঘটবে। একে হিলে বেঁধে শাড়ির কুচি খুলে গেছে, উপর থেকে এনার বাক্যির শেষ নেই। দাঁতে দাঁত চেপে বলতে লাগলো,

– সাফওয়ান ভাই আসলে কি বলুন তো, আমি বিয়ে থেকে পালানোর সময় ভাবি নি আমাকে ওয়ার্ল্ড রেস চ্যাম্পিয়নশিপে নিজের নামের পতাকা উড়াতে হবে!! আগে জানলে শাড়ি না উসাইন বোল্টের কস্টিউম পড়ে আসতাম।

– মুখ তো কেঁচির মতো চলে, তা তোমার বাবার সামনে মুখটা চালালে হয়তো এভাবে পালাতে হতো না!

– চালিয়েছিলাম, বিনিময়ে বা গালে থাপ্পড় আর সাত দিন রুমে আটকে রেখেছিলো।

– তোমার শাড়ির কুঁচি ঠিক হইলে কি আমরা যাইতে পারি?? তোমার বাবার বডিগার্ডরা আসলো বলে।

 

আয়াত আর কোনো কথা বললো না, বলে না কথায় কথা বাড়ে। আর এই লোকটার সাথে কথা বলতে গেলে শুধু যে কথায় কথা বাড়বে সেটা নয়, সকাল হয়ে যাবে অথচ তর্ক শেষ হবে না। শেষমেশ দেখা যাবে বাবার বডিগার্ডরা সত্যি চলে আসবে। এখন তাড়াতাড়ি কোনো ট্রান্সপোর্ট ধরে কাজী অফিস যেতে হবে। এক ঘন্টা আগেও আয়াত একরকম ভেবেছিলো কিন্তু পুরো উল্টো কাহিনী ঘটে গেলো, যাকে দু চোখে সহ্য হয় না তার সাথেই এখন পালাতে হচ্ছে।

 

এক ঘন্টা আগে,

ক্রমাগত ইফাদকে ফোন দিয়ে যাচ্ছে আয়াত। ফোন ধরা তো দূর, খালি ওয়েটিং বলে যাচ্ছে ফোন অপারেটরের মহিলাটি। হাতে সময় খুব কম, আর চার ঘন্টা পর আয়াতের বিয়ে। একটা বলদের সাথে, রামিম সাহেব অর্থাৎ আয়াতের বাবার বন্ধুর ছেলের সাথে। অনেকবার রামিম সাহেবকে বুঝাতে চেয়েছে আয়াত কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হয় নি। আয়াত রামিম সাহেবকে জানিয়ে দিয়েছে, বিয়ে করলে ইফাদকেই করবে। ও বাদে কাউকে সে বিয়ে করবে না। কিন্তু রামিম সাহেবের এক কথা, উনি বেকার ছেলের সাথে মেয়ের বিয়ে দিবেন না। দরকার হলে ড্রাইভারের সাথে বিয়ে দিতেও রাজী। ইফাদ গ্রাডুয়েশনের পর বেকার বসে আছে তিন বছর, সারাদিন ক্লাব, পাবে বন্ধুদের সাথে টাকা উড়ানোই ইফাদের একমাত্র কাজ। তার কথা তার বাবার এতো টাকা যে সে সারাজীবন বেকার থাকলেও কিচ্ছু যায় আসবে না। আয়াত এবং ইফাদের রিলেশন প্রায় চার বছর হতে চললো, যতবার ই তাকে বিয়ের কথা বলে সে এড়িয়ে যায়। আয়াত তাকে বলতে বলতে মুখ ব্যাথা করে ফেলেছে অথচ তার কোনো হেলদুল নেই। আজ আয়াতের বিয়ে অথচ ছেলেটার কোনো পাত্তাই নেই। টানা বিশ বার ফোন দেওয়ার পর শেষমেশ ফোনটা তুললো ইফাদ, বিরক্তির সাথে বললো,

– কি ব্যাপার? এতো ফোন দিতে হয়? কথা বলছিলাম তো বেবি।

– রাখো তোমার বেবি, ইফাদ আজকে আমার বিয়ে। তোমার কি কিচ্ছু যায় আসে না? আমি সেদিন ই তোমাকে বলে দিয়েছিলাম বাবা সিরিয়াস। তুমি যদি কিছু না করো এবার সত্যি ই আমাকে হারিয়ে ফেলবে। তুমি কি সত্যি আমাকে ভালোবাসো? ইফাদ এখনো যদি কিছু না করো আর চার ঘন্টা পরে আমার বিয়ে হয়ে যাবে। তখন চাইলেও কিছু করার থাকবে না।

– তুমি এটা এখন বলছো? তুমি ই তো আমার সাথে এতোদিন যোগাযোগ করো নি

– আজ সাত দিন পর আমি আমার ফোন পেয়েছি, তুমিতো একবারও আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করো নি। এখন তোমাকে ডিসিশন নিতে হবে হয় আমাকে এখান থেকে পালিয়ে নিয়ে বিয়ে করবে নয়তো আমি ওই বলদকেই বিয়ে করে ফেলবো।

– ঠিক আছে, আমি ব্যবস্থা করছি।

 

ফোনটা রেখে কান্নায় ভেঙে পড়লো আয়াত। ভালোবাসা কতোটুকু অসহায় করে তুলতে পারে তার প্রমাণ হাতেনাতে পাচ্ছে। দরজায় কড়া নাড়লে, চোখ মুখ মুছে দরজা খুলে দেয় আয়াত। দরজা খুলতেই তানি ভেতরে ঢুকে। তানি আয়াতের বেস্টি, তানিকে পেয়ে জড়িয়ে ধরে চোখে পানি ছেড়ে দিলো আয়াত।

– তানি, আমি কি করবো?

– আমি তোকে অনেক আগ থেকেই বলেছি এই ইফাদ ছেলেটা তোকে ঝুলিয়ে দিবে, দেখলি তো?

– ও বললো ব্যবস্থা করছে।

– এখন রেডি হয়ে নে, আমাদের পার্লার যেতে হবে। আন্টি আমাকে পাঠালেন।

– দোস্ত, আমি ওই বলদাকে বিয়ে করবো না।

– বারবার বলদা বলদা কেনো বলছিস, ছেলেটার নাম হাবিব। স্ট্যাবলিসড ভদ্র ছেলে, ইফাদের চেয়ে হাজারো গুন বেটার।

– আমি পারবো না হাবিব টাবিবকে বিয়ে করতে, ইফাদ একটা ব্যবস্থা ঠিক করবে দেখিস।

– দেখা যাক। এখন চল

 

আধা ঘন্টা পর,

পার্লারে যাবার পর ইফাদের ফোন আসে আয়াতের মোবাইলে। ফোন রিসিভ করতেই ইফাদ জানায়,

– আয়াত, আমি সাফওয়ানকে পাঠাচ্ছি। এখন কোথায় আছো?

– তুমি আসবে না?

– আমি একেবারে কাজী অফিসে যাবো। ওখানে আমার শ্বশুরের কিছু স্বাস্থ্যবান বডিগার্ড আছে। সাফওয়ানকে সন্দেহ করবে না।

– আচ্ছা, আমি গুলশান একের এক পার্লারে আছি। আমি ঠিকানা এস.এম.এস করে দিচ্ছি।

 

মিনিট পনেরো পর সাফওয়ান এসে হাজির পার্লারের গেটে। বন্ধুত্বের খাতিরে এই জটের মধ্যে সাফওয়ানকেও জড়াতে হলো। আয়াত আর সাফওয়ানের মাঝে ছত্রিশের আকড়া, যদি আয়াত বলে ডান তো সাফওয়ানকে বাম বলতেই হবে। আয়াত যতটা এলোমেলো সাফওয়ান ততোটা গুছানো। যতবার তারা মুখোমুখি হয়েছে ততোবার ই একটা ওয়াল্ড ওয়ারের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অবশেষে তানির সাহায্যে কোনোমতে সাফওয়ান আয়াতকে নিয়ে পালাতে সক্ষম হয়। এখন আসি বর্তমানে।

 

বর্তমান,

রাত ৮.৩০টা,

মিরপুর ২ এর কাজী অফিসের সামনে বিগত এক ঘন্টা যাবৎ দাঁড়িয়ে আছে সাফওয়ান এবং আয়াত। গুলশান থেকে সরাসরি মিরপুর চলে আসে তারা, যাতে বডিগার্ডদের হাতে না পরতে হয়। অথচ এখনো ইফাদের কোনো খোঁজ নেই। বাহিরের বেঞ্চিতে বসে ঝিম ধরে বসে আসে আয়াত। সাফওয়ান ক্রমান্বয়ে ফোন করে চলেছে ইফাদকে অথচ তার ফোন বেজেই চলেছে, কেউ রিসিভ করছে না। একটা বড় নিশ্বাস ফেলে আয়াতের পাশে গিয়ে বসে সাফওয়ান। মেয়েটার মুখটা চুপসে গেছে, যেখানে কিছুক্ষণ আগেও ঝগড়া যাচ্ছিলো অথচ এখন চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে আছে। সারাদিন কিছু পেটে পড়েছে কিনা সন্দেহ। সাফওয়ান পাশে বসতেই বলে উঠে,

– সাফওয়ান ভাই, আমি কি কোনো ভুল করে ফেলেছি?

– কেনো বলোতো?

– এই দেখুন না, বাবা-মার সম্মান জ্বলাঞ্জলি দিয়ে ভালোবাসাকে পেতে চলেছিলাম। কি হলো? সেও আমাকে মাঝ রাস্তায় একা করে দিলো

– আচ্ছা আমিতো কথা বলেছি, উনারা আর আধা ঘন্টা খোলা রাখবেন বলেছেন। আর না হলে কাল বিয়েটা করে নিও। ইফাদকে আমি চিনি, ও ঠিক চলে আসবে।

– শান্তনা দিচ্ছেন?

– উহু, ও আর যাই করুক তোমাকে ঠকাবে না।

 

সাফওয়ানের কথায় মলিন হাসি হাসে আয়াত। মেয়েটার হাসিটা দেখে সাফওয়ানের হৃদয় কিঞ্চিত কম্পন দিয়ে উঠে। পুনরায় ইফাদকে ফোন দিতে থাকে সাফওয়ান।

 

রাত ১১টা,

ইফাদের ফোন বন্ধ আসছে, কাজী অফিস বন্ধ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাফওয়ান আয়াতকে বলে,

– আয়াত আমার মনে হয় তোমার বাড়ি যাওয়া উচিত। তোমার বাবা-মা হয়তো পাগল প্রায় হয়ে তোমাকে খুজছেন।

– আপনি বাড়ি চলে যান, ইফাদ এখনো আসতে পারে।

– পাগলামি করো না, বাড়ি যাও ( খানিকটা রেগে)

– বাবা খুন করে ফেলবেন আমায়, আমার বাবার রাগ সম্পর্কে আপনার ধারণা নেই।

– আচ্ছা, উনি ইফাদকে অপছন্দ কেনো করেন?

– বাবা ড্রাইভারের সাথেও আমাকে বিয়ে দিতে রাজী কিন্তু বেকার ছেলেকে নিজের মেয়ে জামাই সে কিছুতেই করবেন না। মার জন্য টেনশন হচ্ছে না জানি চিন্তায় বেহুশ হয়ে যাচ্ছে।

– তাহলে এখন কোথায় যাবে?

– জানি না, তানির বাসায় যেতে পারবো না। রাতে ওর অহেতুক একটা ঝামেলা হবে, এর থেকে আমি একটা হোটেলে থেকে নিবো। দেখি সকালে কি করা যায়।

– আর ইউ শিউর?

– হুম।

 

একটা সস্তা হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তারা। এতো রাতে কোনো ভালো হোটেলে যাবার মতো ওয়ে নেই সাথে টাকাও। শুধু যাতায়াতের টাকা, ভোটার আইডি আর কিছু ডকুমেন্টস বাদে আর কোনো টাকা নিয়ে বের হয় নি আয়াত। মনটা খচখচ করছে সাফওয়ানের; মেয়েটাকে এভাবে হোটেলে একা ফেলে যেতেও মন সায় দিচ্ছে না তার। হোটেলের ভেতর যেতে নিলেই সাফওয়ান হাত টেনে ধরে আয়াতের। পিছনে ফিরে চোখে চোখ রাখতেই দৃঢ় কন্ঠে সাফওয়ান  বলে উঠে,

– আমি ব্যাচেলর থাকি, এক রুমের চিলেকোঠা। কিন্তু এই হোটেলের থেকে মাচ মাচ বেটার। ইফ ইউ ওয়ান্ট ইউ ক্যান কাম উইথ মি। আমি নিচে বিছানা করে শুতে পারবো। এসব হোটেলে থাকাটা সুবিধার হবে না। প্লিজ কাম

– না না, একজন ছেলের সাথে রাতে আমি থাকতে পারবো না। 

 

আয়াতের অস্বস্তি দেখে শান্ত গলায় সাফওয়ান বলে,

– ইউ ক্যান ট্রাস্ট মি। দরকার হলে আমি ছাদেই থাকবো। শুধু ল্যান্ড লর্ডকে নিয়ে একটু সমস্যা, আই উইল হ্যান্ডেল। রাত অনেক হয়েছে, বাড়ি পৌছাতে পৌছাতে সাড়ে বারো তো বাজবেই। ঐ মোটা ষাড় ঘুমিয়ে যাবে ততক্ষণে। চলো, প্লিজ

 

অবশেষে আয়াত রাজী হলো, সোডিয়ামের লাইটে পাশাপাশি হেটে চলেছে আয়াত-সাফওয়ান। দুজনের গন্তব্য এক কিন্তু লক্ষ্য আলাদা। রেললাইনের দুটো আলাদা লোহার লাইনের মতো পাশাপাশি হেটে যাচ্ছে তারা। জানে না কেউই আগামীতে কি তাদের জন্য অপেক্ষা করছে! রাস্তার পাশের খড়কুটোহীন মানুষেরা বস্তা পেতে ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে তো আরেকদল মানুষ রাত জেগে চেঁচিয়ে সবাইকে শান্তনা দিচ্ছে, “ঘুমিয়ে পড়ো আমরা জেগে আছি”। রিক্সা না পেয়ে প্রচুর হাটতে হচ্ছে তাদের। হিল পড়ে পায়ে ঠসা পড়ে গেছে আয়াতের। আর না পেরে হিল খুলে ফেললো সে, নিচে জিন্স থাকায় শাড়িটা খানিকটা উপরে তুলে নিলো। হঠাৎ পেছন থেকে দুজন টহল পুলিশের বাঁশির শব্দ এবং চিৎকারে ভয়ে জমে গেলো তারা। না জানি কি বিপদ আসতে চলেছে। পুলিশদের একজন চেঁচিয়ে যাচ্ছে,

– এই এতো রাতে কি আকাম করতেছো, এই দাঁড়াও?

 

ভয়ে সাফওয়ানের ডান হাত আকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে পড়লো আয়াত। ধীর গলায় বলতে লাগলো,

– এখন কি হবে? সারা রাত থানায় কাঁটাবো নাকি?

– কিচ্ছু হবে না, তুমি চুপ থাকবে তাহলেই হবে।

 

পুলিশেরা তাদের কাছে এসেই……

 

চলবে

 

মধুরেণ সমাপয়েৎ 

সূচনা পর্ব

মুশফিকা রহমান মৈথি

 

মধুরেণ সমাপয়েৎ

২য় পর্ব

 

পুলিশেরা তাদের কাছে এসেই একজন  সাফওয়ানের ঘাড় চেপে ধরলো। আরেকজন রুক্ষ ফ্যানফ্যানে গলায় বললো,

– রাত বাজে ১১.৪৫, এই রাতে এমনে ঘুরতেছো কেন? নষ্টামির জায়গা পাও না, না?? দুইটা ডান্ডা খাইলে সব পিরিতি বাইর হইয়ে যাবে।

– আপনারা আমার কথা বুঝার ট্রাই করেন, আসলে হয়েছে কি…(সাফওয়ান)

– চুপ, আব্দুল এগোরে এখনই থানায় নিতে হইবো।

 

থানার কথা শুনেই আয়াতের হাত পা ঠান্ডা হতে লাগলো। হড়হড় করে বলতে লাগলো,

– থানায় কেনো? আমরা তো বাসার দিকে যাচ্ছি। ঘুরতে বেড়িয়ে ছিলাম; রিক্সা না পাওয়ায় দেরি হয়ে গিয়েছে। ট্রাস্ট আস আমরা কোনো নষ্টামি করতেছি না।

– ওই মাইয়া, তুমি রাত  ১১.৪৫টায় বিয়ার শাড়ি পইড়া ঘুরতে বাইর হইছো?

– না মানে…

– আচ্ছা আমাদের ছেড়ে দেবার জন্য মালপানি কতো নিবেন?(সাফওয়ান)

– দেখছোস শফিক, আমাদের ঘুষ দেয়, কত্তোবড় সাহস! এইবার এগোরে থানায় নিতেই হইবো চল।

 

রাত ১২.১৫টা,

থানায় ইন্সপেক্টরের সামনে বসে আছে সাফওয়ান এবং আয়াত। একটু পর পর অগ্নিদৃষ্টি দিচ্ছে আয়াত সাফওয়ানকে। তখন ওয়াকি টকিতে কথা বলে ওদের থানায় নিয়ে আসে কন্সটেবল শফিক এবং আব্দুল। ইন্সপেক্টর মেহরাব হাতের তর্জনি দিয়ে টেবিলে ক্রমাগত টকটক শব্দ করে যাচ্ছেন সাথে একবার আয়াতের দিকে আর একবার সাফওয়ানের দিকে তাকাচ্ছেন। গলা ঝেড়ে এবার বললেন,

– কেস কি? এতো রাতে বাইরে কি করছিলেন আপনারা?

– স্যার নষ্টামি করতেছিলো, বললাম না হাতে নাতে ধরছি উপরে ঘুষ দেবার চায়!(আব্দুল)

– তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি আব্দুল?? না তো, একটু ঠান্ডা থাকো। হুম বলে মি.

– জ্বী সাফওয়ান, সাফওয়ান ইসলাম। আসলে হয়েছে কি……

– আমরা পালিয়ে বিয়ে করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু কাজী অফিস বন্ধ থাকায় বিয়ে করতে পারি নি। (আয়াত)

 

আয়াতের কথা শুনে হতবাক হয়ে আয়াতের দিকে তাকায় সাফওয়ান। এই মেয়ে তাকে একটা ঝামেলায় ফেলবে। অবশ্য এটা নতুন না, এর আগেও মেয়েটা এভাবেই ঝামেলায় ফেলেছে। আয়াতের হাতে চিমটি কাটতেই আয়াত উহ করে চেঁচিয়ে উঠে,

– উফ, উনারা পুলিশ, উনাদের কাছে লুকিয়ে লাভ নেই। উনারা আমাদের হেল্প করতে পারবে। আসলে হয়েছে কি স্যার, আমরা দুজন দুজনকে খুব ভালোবাসি কিন্তু আমার বাবা ওর প্রফেশন আর গরিবীর জন্য ওকে মেনে নেন নি। আজ আমাকে একটা বলদের সাথে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছিলো। তাই আমি পালিয়ে আসি। আমার বাবাকে চিনবেন রামিম রহমান, রিটায়ার্ড মেজর জেনারেল। আমি তার একমাত্র মেয়ে। সাফওয়ান তো অনেক গরীব তাই বাবা ওর সাথে আমার বিয়ে দিবেন না। এই যে দেখুন আমার ভোটার আইডি সব আছে, আমরা আজই বিয়ে করতাম।

 

সাফওয়ান হা করে আয়াতের অভিনয় দেখে যাচ্ছে। জাতীয় পুরস্কার বিজয়ী অভিনেত্রীর মতো অভিনয় করছে মেয়েটি, কি নিপুন ভাবে কাঁদছে। ইন্সপেক্টর সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে বললো,

– তাহলে আপনি কন্সটেবলদের ঘুষ কেনো দিতে চেয়েছেন?

– উনারা আমার কোনো কথা শুনতেই রাজী ছিলেন না। আর সত্যি বলতে এতো রাতে, আমরা অনেক ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। উপরে আমাদের বিয়ে হয় নি। একটা কনে কে বিয়ে থেকে পালিয়ে নিয়ে এসেছি। আই থিংক ইউ ক্যান আন্ডারস্ট্যান্ড। আমি খুবই সতর্ক নাগরিক, আয়াত না থাকলে আমি এমনটা কোনোদিন করতাম না।

– আচ্ছা আচ্ছা, আপনাদের নাম, ঠিকানা দিয়ে যান। আমি কন্ট্যাক্ট করবো। আর যদি এটা প্রমাণ হয় যে আপনারা মিথ্যা বলছেন তাহলে আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না।

– কোথায় লিখবো?(আয়াত)

– আব্দুল, উনাদের সব ঠিকানা নিয়ে বাড়ি পৌছে দাও, এই রাতে ট্রান্সপোর্ট পাবেন না। আর সাফওয়ান সাহেব আপনার অফিসের ঠিকানাটাও দিয়ে যাবেন। যদি এই রাতে কাজী পাওয়া যেত আমি নিজেই আপনার বিয়ে দিয়ে দিতাম।

 

নিজের মাথা চাপরাতে ইচ্ছে করছে সাফওয়ানের, এই আয়াতের জন্য কি এক ঝামেলায় না পড়লো। মিথ্যে তো বলে দিলো কিন্তু এখন এই মিথ্যে ধরা পড়লে যে কি ঝামেলা পোহাতে হবে আল্লাহ জানে। উপরে রামিম রহমানের মেয়ে, তিনি একজন রিটায়ার্ড আর্মি অফিসার; শহরে উনার চেনা জানার শেষ নেই। এক রাতে তার জীবনে এতোটা উতার চড়াই এর মুখোমুখি হতে হবে কে জানতো! আর এদিকে ইফাদের ফোন এখনো বন্ধ। ইফাদ কেয়ারলেস, কিন্তু এতোটা যে নিজের গার্লফ্রেন্ডকে বাড়ি থেকে পালিয়ে অন্যের ঘাড়ে ঝুলিয়ে দিয়ে এখন নিজে লাপাত্তা। কাধে ভারী ভারী অনুভব হলে পাশে তাকিয়ে দেখে আয়াত তার কাধে মাথা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছে। মেয়েটাকে বড্ড ক্লান্ত লাগছে, সারাদিন কম ধকল তো যায় নি। রাতের আলো আঁধার খেলায় আয়াতের মুখটা কোনো শিল্পকর্ম থেকে কম লাগছে না। খুব যত্নে নিপুন শিল্পকর্ম। এলোকেশি, চন্দ্রমার ন্যায় মুখখানা, উপরে গোলাপের পাঁপড়ির ন্যায় ঠোঁটখানা যে কাউকে আকর্ষন করবে। সবচেয়ে বেশি আকর্ষনীয় ঠোঁটের নিচে ছোট তিলটি, যেন নজর ফোঁটা। অজান্তেই আপন মনে তাকিয়ে রয়েছে সাফওয়ান তার দিকে। কন্সটেবল আব্দুল জোরে ব্রেক কষলে সাফওয়ানের হুশ ফিরে, নিজের কাজে নিজেরই বিরক্ত লেগে গেলো। কি করছিলো সে, আয়াত ইফাদের আমানত, যতই সুন্দরী হোক না কেনো তার প্রতি অন্যরকম অনুভূতির জন্ম দেওয়াই পাপ। নিজেকে নিজে শান্ত করার জন্য মনে মনে বলতে লাগলো,

 

– আয়াত একটা চালতা ফিরতা ঝামেলা, ওর মধ্যে ভালো লাগার কিছুই নেই। মনে নেই, একবার তোর এক্সিবিশন ওর জন্য নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। ওর জন্য আজকে তোর থানায় যেতে হইছে। সাফওয়ান, ওকে ইফাদের হাতে তুলে দিলেই তোর কাজ শেষ; সো নো মোহিত হওয়া হওয়ি। তুই একজন আর্টিস্ট তাই তোর ওকে দেখে ভালো লেগেছে এটাই। আর কিচ্ছু না।

 

পানের পিকটা ফেলে আব্দুল বিরক্ত কন্ঠে বলে উঠলো,

– এখানে বইসে রাত কাঁটাইবেন?? নাকি যাইবেন ও। আইয়া পড়ছে আপনার বাসা।

– ধন্যবাদ। এই আয়াত, এই আয়াত উঠো। বাসা এসে গেছে।

 

আয়াতকে নাড়াচড়া দেয়ার পর অবশেষে বিরক্তি এবং ঘুমঘুম গলায় বলে উঠে,

– কি হইছে, আরেকটু ঘুমাইতে দেও। তুমিও ঘুমাও

– ধুর, উঠো না। বাসা চলে আসছে তো।

 

কে শুনে কার কথা আয়াত তো বেঘোরে ঘুম। উপায়ন্তর না পেয়ে আয়াতকে কোলে করে নিয়ে উঠা লাগলো সাফওয়ানের। দোয়া পড়তে পড়তে পাঁচতলায় উঠলো সে, বাড়িওয়ালা দেখলে একটা কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। যদিও ঘড়ির কাঁটা ২ টার ঘরে এসে পড়েছে। তবুও বলা যায় না, ওই লোকের ভরসা নেই। কোনোমতে আয়াতকে নিচে বসিয়ে দরজার লক খুলে সে। একটা মেয়েকে কোলে নিয়ে পাঁচতলা উঠা চারটে খানি কথা না, যদিও আয়াতের ওজন তুলার মতো তাও। আয়াতকে বেডে শুইয়ে ফ্রেশ হতে চলে গেলো সাফওয়ান। আজকে দিনটা খুব ধকলের ছিলো। দুপুরের পর থেকে খাবারের কনাও পেটে পড়ে নি। কালকে সকাল ৮টায় অফিস আছে, এখন না ঘুমালে কালকে জম্বি হয়ে যেতে হবে। ফ্রেশ হয়ে একটা নীল থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট আর কালো টিশার্ট পড়ে নিলো সাফওয়ান। আয়াত বেঘোরে ঘুমাচ্ছে, ওর উপর হাতি হাটলেও টের পাবে কিনা সন্দেহ। অবশ্য মেয়েটিও না খাওয়া। অনেকবার সেধেছিলো সাফওয়ান কিন্তু খায় নি। ওর উপর কতোটা প্রেসার যাচ্ছে, সেটা না বললেও বুঝতে বাকি নেই সাফওয়ানের। চঞ্চল মেয়েটি নিজের কষ্টগুলো হাসির মাঝে লুকিয়ে রেখেছে। বাবা-মাকে না বলে ভালোবাসার খাতিরে ছুটে এসেছে কিন্তু সেই ভালোবাসাও কথা রাখে নি।

 

রুমে একবিন্দু জায়গা নেই শোয়ার, সাফওয়ানের পেন্টিং আর ক্যানভাসে ফ্লোর ভর্তি। শরীর ভেঙ্গে যাচ্ছে এখন এগুলো গুছানো একটা এভারেস্ট অভিযানের কাজ হবে, তাই উপায়ন্তর না পেয়ে ছাদে চলে যায় সে। আজ রাত নির্ঘুমই কাটবে, বোঝা যাচ্ছে। বেনসন ধরিয়ে বাহিরে নজর দিলো সে, খারাপ স্বভাবের এই একটাই আছে তার; সিগারেট খাওয়া। নিকোটিন সব খারাপের মধ্যে একটি ভালো কাজ ও করে তা হলো স্নায়ু শান্ত করে। আর আর্টিস্ট মানুষদের এটা খুব দরকার। সাফওয়ানের জীবনটা খুব এলোমেলো, আয়াত যেন এই এলোমেলো জীবনে আরো ঝড় এনে দিয়েছে। আর্টিস্ট হবার ঘর ছেড়ে শহরে আসে সে। কিন্তু অভাবের শহরে শখের দাম নেই। পড়াশুনায় ভালো হওয়ায় একটা সতেরো হাজারের চাকরি ম্যানেজ তো হয়ে গেছে। কিন্তু সতেরো হাজারে ঢাকা শহরে কি হয়! সকাল আটটা থেকে রাত সাতটা অবধি চাকরি করে এসে রাতে নিজের কল্পনার দুনিয়াতে তুলি ঘোরায় সে। দুই তিনটা আর্ট গ্যালারিতে আঁকাও দিয়েছে, তাতে বেশি একটা লাভ হয় নি। একবার তো এক্সিবিশন ও পেয়েছিলো কিন্তু ঐ আয়াতের জন্য সব আর্টগুলো নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। তারপর থেকে মেয়েটাকে সাফওয়ানের সহ্য হয় না। অতীতের পাতা উল্টাতে উল্টাতে কখন সকাল হয়ে গেছে খেয়াল ই নেই সাফওয়ানের।

 

সকাল ৬টা,

রুমের দিকে হাটা দেয় সাফওয়ান। চিলেকোঠা আর ছাদ পাশাপাশি, একটা দরজা দিয়েই ঢোকা যায়। দরজাটা খুলতেই মূহুর্তে শিরদাঁড়া দিয়ে শীতল রক্ত বয়ে গেলো সাফওয়ানের। ধড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিলো সে। অয়ায়াত তখন……………

 

চলবে

 

মুশফিকা রহমান মৈথি

 

মধুরেণ সমাপয়েৎ

৩য় পর্ব

 

দরজাটা খুলতেই মূহুর্তে শিরদাঁড়া দিয়ে শীতল রক্ত বয়ে গেলো সাফওয়ানের। ধড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিলো সে। আয়াত তখন বেঘোরে ঘুম; শাড়ি এলোমেলো, আঁচলের কোনো হদিস নেই, সাদা ধবধবে পেটটা উন্মুক্ত। মেয়েটা এতো কেয়ারলেস কিভাবে হতে পারে, ঘুমে কারো শাড়ি এতোটা এলোমেলো হয়ে যেতে পারে! দরজাটা আটকিয়ে পুনরায় ছাদে চলে এসেছে সাফওয়ান। চোখ বন্ধ করলে এখনোও আয়াতের প্রতিচ্ছবি ভাসছে, এই প্রথম কোনো নারীকে এতোটা কাছ থেকে দেখেছে সে। এতো সুন্দর নারীও হতে পারে? যেনো ভাস্করের নিপুন হস্তের শিল্পকর্ম। মাঝে মাঝে ছেলেদের পক্ষেও নিজেকে আটকানো কঠিন হয়ে পড়ে। আর সবথেকে আকর্ষনীয় ছিলো নাভির পাশের গাঢ় তিলটি, যেকোনো ছেলের মাথা ঘুরানোর জন্য সেটা যথেষ্ট। ছাদের পানির নলটি ছেড়ে মাথা ঢুকিয়ে বেশ কিছুক্ষণ বসে রইলো সাফওয়ান। একেই সকাল, উপরে কালকে রাতে বেশ শিশির পড়েছিলো, পানিটা বেশ ঠান্ডা। এখন এই ঠান্ডা পানি থ্যারাপি ই তাকে কুচিন্তা থেকে রক্ষা দিতে পারবে। বেশকিছুক্ষণ পর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো সাতটা বাজতে চলেছে। মাথা ভেজানোর কারণে অর্ধেক শরীর এমনিতেই ভিজে গেছে। এবার ভেতরে যেতেই হবে, এখন না বের হলে অফিসের লেট হয়ে যাবে। মিনিট বিশেক জোরে জোরে কড়া নাড়লে আয়াতের সাড়া পায় সে। বেশ দৃঢ় কন্ঠে বলে,

– আঁচলটা ঠিক করো, আমি ভেতরে আসছি।

 

সকাল সকাল এমনিতেই ঝটলা পেকে থাকে আয়াতের মাথা, উপরে মনে হচ্ছে মাথায় কেউ হ্যামার দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ তবলা বাজিয়েছে। আশেপাশের দৃশ্য দেখে হাবলার মতো বেশকিছুক্ষণ বসে ছিলো সে। কাল রাতে পুলিশের গাড়িতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলো; তারপর কিছু মনে নেই তার। চোখটা চারিদিকে ঘুরালে খেয়াল করে পুরানো একটি স্টোর রুমের মতো ঘরের চৌকির মতো বেডে বসে আছে সে, রুমের দেয়ালের রঙ খসে গেছে; লাস্ট হয়তো তিন বছরর একবার ও রং করা হয় নি। তারমানে এটা সাফওয়ানের চিলেকোটার রুম। এবার ধীরে ধীরে বাস্তবে ফিরে আয়াত; বুঝতে পারে রাতে সাফওয়ান এখানেই তাকে নিয়ে এসেছিলো। রুমটা খুব ছোট; এক পাশে একটা থার্ড হ্যান্ড স্টিলের আলমারি, তার পাশে একটা কম দামী ছোট্ট টেবিল তাতে রঙ, তুলি, স্কেচবুক এলোমেলো করে পড়ে রয়েছে। ঘরে দক্ষিণ দিকে বেশ বড় জানালা। জানালা দিয়ে আকাশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সাথে গাড়ির হর্ণ ও শোনা যাচ্ছে মানে বাড়িটা রোডের খুব কাছে। সারা ঘর অগোছালো, কিন্তু নোংরা নয়। ফ্লোরে সাফওয়ানের পেন্টিং এবং ফাঁকা ক্যানভাস ভর্তি। জানালার ঠিক পাশে একটা ঘুন ধরা আলনা আছে তাতে সাফওয়ানের নোংরা কাপড় রাখা। ঘরটা পর্যবেক্ষন শেষ হলে শুনতে পায় সাফওয়ান কড়া নেড়েই যাচ্ছে। সাফওয়ান যখন কথাটা বলে তখন নিজের দিকে তাকিয়ে নিজেই লজ্জা পেয়ে যায় সে। রাতে অস্বস্তির জন্য কখন আঁচল খুলে ফেলেছিলো খেয়াল ই নেই তার। কোনো মতে শাড়িটি দিয়ে নিজেকে পেঁচিয়ে সাফওয়ানকে ভেতরে আসতে বলে সে। সাফওয়ান একবার ও আয়াতের দিকে না তাকিয়েই আলমারির কাছে চলে যায়। শার্ট, প্যান্ট বের করে ওয়াশরুমে ছুট লাগানোর সময় পিছন থেকে আয়াত ডাকলে বাধ্য হয়ে আয়াতের দিকে তাকায় সে,

– আমাকে আপনার একটা টিশার্ট দিবেন? আমার কাছে পড়ার মতো কোনো জামা নেই শাড়ি বাদে।

– আলমারি খোলাই আছে, নিয়ে নিও। আমার লেট হচ্ছে।

 

বলেই ওয়াশরুমে ঢুকে ধাম করে দরজা লাগিয়ে দিলো সাফওয়ান। এলোমেলো চুল, ঘুম ঘুম চাহনি আর লাল হয়ে থাকা গাল দেখে কয়েকবার হার্টবিট মিস হয়েছে সাফওয়ানের। এই মেয়েকে খুব দ্রুত ইফাদের হাতে তুলে দিতে হবে। নয়তো পাগল হয়ে যাবে সাফওয়ান।

 

সকাল ১১টা,

আয়াত জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, মনটা তার ভালো নেই। তানির কাছে সকালে ফোন দিয়েছিলো। তানির কাছ থেকে জানতে পারে রামিম সাহেব তাকে অনেক কথা শুনিয়েছেন। তিনি তানির সামনেই বলে দিয়েছেন,

– আয়াতকে সামনে পেলে এর শেষ দেখে নিবো

 

আয়াতের মা শারমিন বেগমের শরীরটা নাকি ভালো নেই। মেয়ে নিখোঁজ দেখে প্রেসার লো হয়ে দু-তিন বার অজ্ঞাব হয়েছেন। ছুটে যেতে ইচ্ছে করছে মায়ের কাছে, কিন্তু নিজের কর্মফল যে নিজেকে ভোগ করতে হচ্ছে। ইফাদের আশায় ঘর ছেড়ে আসার সময় একবার ও কল্পনা করে করে নি আজ ভালোবাসার শাস্তি এভাবে পেতে হবে তাকে। ইফাদের ফোন এখনো বন্ধ, ইফাদের কিছু বন্ধু-বান্ধবদের নাম্বার সাফওয়ানের কাছ থেকে নিয়ে রেখেছিলো। তারা কেউ জানে না ইফাদ কোথায়!

– আচ্ছা ইফাদের কোনো বিপদ হয় নি তো? বাবা ওর কোনো ক্ষতি করে নাই তো? ধুর আর ভাবতে পারছি না। একবার ইশরাতের সাথে কথা বলতে পারলে হয়তো জানতে পারতাম কিন্তু ওর নাম্বারটাও বন্ধ। উফফ এই ভাই বোন নিজের ফোনটা কেনো বন্ধ করে রেখেছে। আমি এখন কি করবো? তানির বাসায় যেতে পারবো না; বাবা তানির বাসার সামনে পাহাড়া লাগিয়েছে। সাফওয়ান ভাইকে জ্বালানোর কোনো মানে হয় না। কিন্তু কোথায় যাবো আমি?

 

জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করে যাচ্ছে আয়াত। সামনে যে ডেড এন্ড; যাওয়ার পথটুকু খুঁজে পাচ্ছে না। বুকের বা পাশে চিনচিনে ব্যাথা চোখে নোনা জলের আবির্ভাব ঘটাচ্ছে বারংবার। সাফওয়ান মাঝে এক বার ফোন দিয়ে খোঁজ নিয়েছে যে সে খেয়েছে কিনা। সে বন্ধু হিসেবে তার দায়িত্বের অধিক পালন করে যাচ্ছে। আর অসহায়ের মতো আয়াত তার সাহায্য নিয়ে যাচ্ছে। চোখ মুছে দৃঢ় পরিকল্পনা করলো সে। এবার কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে আয়াতের, খুব কঠোর। সোজা ইফাদের বাড়ি যেয়ে উঠবে সে। তাতে তার পরিবারের লোকেরা রাগ করলেও কিছু করার নেই। তারপর ইফাদকে মুখের উপর জিজ্ঞেস করবে সে কি তাকে বিয়ে করবে কি না। এই পরিকল্পনা আজকের মধ্যেই বাস্তবায়ন করতে হবে। কিন্তু হাতে টাকা নেই; ইফাদদের বাসায় যেতে হলেও ৬০০-৭০০ টাকা লাগবে সি.এন.জি তে। সেই টাকাটা হাতে নেই। সাফওয়ান আসলে তাকে পরিকল্পনার কথাটি জানাতে হবে। পাশের দোকান থেকে পরোটা, ডাল দিয়ে গেছে সাফওয়ান। ডাল ঠান্ডা হয়ে গেছে আর পরোটা শক্ত। কিন্তু পেটের ইঁদুরদের এইটা দিয়েই শান্ত করতে হবে। যে মেয়ে সামান্য ঠান্ডা পানি আঙ্গুলে ছোয়াতে পারে না আজ সে ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করেছে। ব্রেড জ্যাম আর ব্লাক কফি ব্যাতিত যার নাস্তা হয় না, আজ তৈলাক্ত চুপচুপে পরোটা আর ঠান্ডা পানির মতো ডাল খেতে হচ্ছে। জীবন কতোকিছু শিখায়!!

 

বিকেল ৫টা,

সারাদিন শুধু সাফওয়ানের পেন্টিং দেখেই দিন কেটেছে আয়াতের। ইফাদের ম্যাসেঞ্জার, ওয়াটস অ্যাপে ভয়েজ ম্যাসেজ দিয়েছে বেশ কিছু কিন্তু লাভ হয় নি। কেঁদে কেঁদে মাথা ধরে আসলে ছাদের রাখা সাফওয়ানের ছোট স্টবে প্রথম কফি বানানোর ট্রাই করেছে; ফলাফল হাতে দু তিনটা ফোস্কা পড়েছে। কিন্তু কফি সে বানানো শিখে গেছে। সাফওয়ানকে অনেকবার বলেছে তার পোর্ট্রেইট ড্র করতে; কিন্তু লোকটা মুখের উপর বলে দিয়েছে তার চেহারা ক্যানভাসে তোলার যোগ্য নয়। কফি হাতে জানালায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখতে যখন ব্যস্ত আয়াত তখন ক্রমাগত দরজায় কড়া নাড়ে কেউ। দরজা খুলতেই হুরমুড় করে একটি মেয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে, মেয়েটির হাতে একটি পিয়াজুর বাটি। এভাবে ঘরে ঢুকে পড়ায় অবাকের সর্বোচ্চ পর্যায়ে চলে যায় আয়াত। মেয়েটি উচ্চতায় আয়াতের সমান, গোলগাল মুখ, চুল একপাশে বেনুনি করা। দেখে মনে হচ্ছে কলেজে পড়ে। মেয়েটি আশেপাশে চোখ ঘুরিয়ে আয়াতের দিকে নজর দেয়। চোখে একরাশ কৌতুহল আর অপছন্দের আভা নিয়ে মাথা থেকে পা অবধি চোখ বুলায় সে। আয়াত তখন সাফওয়ানের একটা টিশার্ট আর ট্রাউজার পড়েছিলো; টিশার্ট টা বেশ বড়, গলাটা বেশ নেমে যাচ্ছে। কিন্তু উপায় নেই, বিয়ের শাড়ি, আর জিন্স বাদে পরিধানের কোনো কাপড় তার নেই। কর্কশ কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়ে মেয়েটি আয়াতকে,

 

– কে তুমি? সাফওয়ান ভাইয়ার জাম পরে আছো কেনো?

– আ……আমি

– কি আমি আমি? কি হলো বলো?

– তোমাকে বলবো কেনো? আগে তুমি বলো তুমি কে?

– আমি মায়া, এই বাড়ি আমার বাবার। তুমি কে? বলো নয়তো বাবাকে বলে দিবো।

– আমি সাফওয়ানের স্ত্রী।

 

এই মূহুর্তে মাথা একেবারে ফাঁকা হয়ে যায় আয়াতের। দুম করে মনে যা এসেছে তাই বলে দেয় সে। মেয়েটি প্রথমে হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে, পরে কান্না কান্না মুখ করে দৌড়ে চলে যায় রুম থেকে। ঘটনার আকর্ষিকতায় কিছুই মাথায় ঢুকছে না আয়াতের। মেয়েটি ঝড়ের গতিতে এলো আবার টর্নেডোর গতিতে চলে গেলো। হচ্ছে টা কি!!

 

রাত ৮টা,  

আজ বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে গেছে সাফওয়ানের। না জানি আয়াত একা একা কি করছে? সকালের পর থেকে কথাই হয় নি। প্রথমে ভেবেছিলো দরজা বাহিরের থেকে আটকে যাবে পরে ভাবলো অজান্তে বিপদ আসলে আয়াত বের হতে পারবে না। আর মোটা ষাড় উপরে আসবে না রাতের আগে, সে জানে সাফওয়ানের অফিস টাইম। কিন্তু মায়াকে নিয়ে একটু চিন্তা থেকে যায় মেয়েটি ধুমধাম চলে আসে। রাস্তায় আসার পথে কিছু কম দামী থ্রিপিস, লেডিস গেঞ্জি আর রাতের খাবার কিনে বাড়ির দিকে রওনা দেয় সাফওয়ান। বাড়িতে এসে সিড়িঘর থেকেই খুব সোরগোল শুনা যাচ্ছে। ভালো করে খেয়াল করলে বুঝতে পারে শব্দগুলো তার রুম থেকেই আসছে। দ্রুত পাঁচ তলায় এসে দেখে দরজা হা করে খোলা। ভেতরে যেয়ে যেনো মাথার উপর বাজ ভেংগে পড়ে সাফওয়ানের। ঘরের ভেতরে ঢুকতেই দেখে…………

 

চলবে

 

মুশফিকা রহমান মৈথি

 

মধুরেণ সমাপয়েৎ

৪র্থ পর্ব

 

ভেতরে যেয়ে যেনো মাথার উপর বাজ ভেংগে পড়ে সাফওয়ানের। ঘরের ভেতরে ঢুকতেই দেখে বিল্ডিং এর সব মহিলা সিনিয়র সিটিজেন সেখানে উপস্থিত। মোটা ষাড় অর্থাৎ বাড়িওয়ালা আবুল কালাম আজাদ সাহেব এবং আর দুজন পুরুষ বেডে বসা। আয়াত তাদের সামনে দাঁড়ানো। গম্ভীর মুখে আজাদ সাহেব কাপে চুমুক দিচ্ছেন। আলমারির পাশে মায়া মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয়। এখন সাফওয়ানের মাথায় রীতিমতো ঘুরপাক খাচ্ছে একটাই চিন্তা, এতোরাতে বাড়ি ছাড়া হলে কোথায় যাবে!! ভীড় ঠেলে আয়াতের কাছে যেতেই এক মহিলা কর্কশ কন্ঠে বলে উঠলো,

– তোমার দ্বারা এমন কিছু আমরা কিছুতেই আশা করি নি সাফওয়ান। ভেবেছিলাম তুমি একটা ভালো ছেলে। 

 

সাফওয়ান একটা ঢোক গিলে বলে,

– কি হয়েছে আন্টি, কি করেছি আমি??

 

আজাদ সাহেব এবার উঠে দাঁড়িয়ে সাফওয়ানের সামনে এসে গলা খাকাড়ি দিয়ে বললেন,

– আমি আশা করি নাই তুমি এমন কাজ করবা, ভাবছিলাম তুমি আমার ছেলের মতো। কিন্তু বউমারে ঘরে আনছো অথচ আমাদের একবারও জানাইলা না। সে তো মায়া আসছিলো বইলে আমি জানতে পারছি। মেয়েটার একটা জামাও নাই, ও তোমার জামা পড়ে আছে। দুপুরে পরোটা আর ডাল খাইছে। আমাকে বললে খাবার পাঠায়ে দিতাম। যাক গে, বউমা তুমি কিন্তু সংকোচ করবা না। তোমার এই আজাদ চাচা আছেন, তুমি আমার কাছে মায়ার মতোই। তাই কোনো অসুবিধাতে আমাকে স্মরণ করবা। সাফওয়ান আসছে, আমরা এখন যাই। চলেন আপনারা।

– জ্বী চাচা (আয়াত)

– আর সাফওয়ান বিয়েটিয়ে করছো, এখন আর একা না তুমি। তোমার ঘরে একটা বউ আছে, তাই এখন থেকে দায়িত্ববান পুরুষ হইতে চেষ্টা করো। ব্যাচেলার জীবন কিন্তু শেষ। 

 

আজাদ সাহেবের কথা মাথার উপর দিয়ে গেলো সাফওয়ানের। হা করে একবার আয়াতের দিকে আর একবার বাকিদের দিকে দেখছিলো। আয়াত ইনাদের কি এমন বললো সবাই আয়াতকে এতোটা স্নেহ করছে। উপরে মোটা ষাড় যে কিনা সাফওয়ানের সাথে সারাটাক্ষণ ভাড়া ভাড়া করে মাথা খারাপ করে দেয়, সে আয়াতকে বউমা বউমা করে তুলো তুলো করছেন। আয়াতের পরনে একটা নীল জামদানি শাড়ি, যা আয়াতের নয়। তার মানে বিল্ডিং এর একজন আন্টি পরতে দিয়েছেন। হচ্ছে টা কি!!

 

আন্টিরা সবাই আয়াতকে নতুন সংসারের যাবতীয় টিপস দিয়ে যাচ্ছেন। সাফওয়ান ফ্রেশ হয়ে সাদা টিশার্ট আর নেভী থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পড়ে নিলো। আন্টিরা যাবার পর আয়াত যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। দরজা লাগিয়ে পেছনে ফিরতে দেখে সাফওয়ান তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুল মুছে যাচ্ছে। ভেজা চুলগুলো কপালে লেপ্টে আছে, টিশার্টটা বুকের সাথে যেন মিশে আছে। ছয় ফিট লম্বা, সুঠাম দেহী পুরুষ, থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পড়ায় পায়ের খানিকটা দেখা যাচ্ছে, ভেজা পায়ের পশম গুলো লেপ্টে আছে। না চাইতেও চোখ তার দিকেই আটকে আছে, ছেলেটার মধ্যে কি যেন একটা আছে। 

– এভাবে দেখলে তো নজর টিকা দিয়ে হাটতে হবে। 

 

সাফওয়ানের কথায় হুশ ফিরে আয়াতের। সঙ্গে সঙ্গে অন্য দিকে চোখ সরিয়ে নেয়। লজ্জায় মাথাকাটা যাবার মতো অবস্থা। মনে মনে বললো,

– আল্লাহ, মাটি টা ফাঁক করো ঢুকে যাই। 

 

আয়াতের কাজে সাফওয়ানের খুব হাসি পাচ্ছে। টেবিলে রাখা ব্যাগটা এগিয়ে দিয়ে বললো, 

– এখানে কিছু জামা কাপড় আছে। আর খাবার নিয়ে এসেছি। আচ্ছা তুমি বিল্ডিং এর লোকদের কি এমন বলেছো যে তারা তোমায় মাথায় তুলে রেখেছে? 

– ও, ওইটা। আসলে হয়েছে কি…

 

দেড় ঘন্টা আগে,

মায়া চলে যাবার পর থেকে একা একা বোর হচ্ছিলো আয়াত। তাই  ঘুমিয়ে পড়েছিলো সে। হঠাৎ খুব জোরে দরজা ধাক্কা দিলে লাফ দিয়ে উঠে সে, মনে হচ্ছিলো ঘরে ডাকাত পড়েছে। ধীর পায়ে দরজা খুলতেই হুড়মুড়িয়ে এক দল মহিলা আর ৩ জন মধ্যবয়স্ক পুরুষ ঢুকে পরলো। আকর্ষিত ভাবে এতো মানুষ ঘরে ঢুকে পড়ায় আয়াত ভয়ে শিটিয়ে যায়। সবাই তাকে মাথা থেকে পা অবধি এমন ভাবে দেখছেন যেন একটা চিড়িয়াখানার জন্তু দেখছে। তাদের মধ্য থেকে মায়া সামনে এসে একজন মোটা ভুড়ি এবং রাজকীয় গোঁফধারী পুরুষকে বলতে লাগলো,

– এই যে, সেই চোর। বলেছি না সাফওয়ান ভাইয়ের কাপড় পড়ে আছে। আবার বলছে সাফওয়ান ভাইয়ের স্ত্রী। 

– হয়েছে, এবার তুমি চুপ করে থাকতে পারো। 

 

তাদের কথোপকথনে বুঝতে বাকি রইলো না ইনিই বাড়িওয়ালা। এই লোকটাকেই সাফওয়ান মোটা ষাড় বলে। মানুষটার চেহারা একটু ষাড়ের মতোই। গোলগাল মুখ, রাগী রাগী চোখ, ঠোঁটের উপরে রাজকীয় গোঁফ। মানুষটার উচ্চতা খুবই কম কিন্তু বিশালাকার দেহ; দেহ না ভুড়ি। লোকটি এগিয়ে এসে আয়াতের সামনে দাঁড়ান। তারপর রাগী কন্ঠে বলেন,

– তুমি কে? এখানে কি করো?

– আ…আমি

– কি আমি?? আমি কি

– আ…আমি সা…সাফওয়ানের ব…বউ

– তোতলা নাকি?

– ন….না

– আমি তো জানি সাফওয়ান অবিবাহিত, ব্যাচেলর। কবে হলো তোমাদের বিয়ে। 

– আংকেল, আসলে আমরা কালকে পালিয়ে বিয়ে করেছি। 

– হ্যা?

– জ্বী, পালিয়ে বিয়ে করেছি। আসলে আমাদের সম্পর্ক চার বছরের, বাবা কাল জোর করে আমার বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। সাফওয়ান তো ভালো চাকরি করে না, তাই সাফওয়ানকে মেনে নেন নি আংকেল। কি করবো বলুন উপায় ছিলো না আমাদের। তাই আমরা পালিয়ে বিয়ে করেছি। আমার কাছে কোনো কাপড় ও নেই তাই সাফওয়ানের কাপড় পড়েছি। আমি বাধ্য করেছিলাম সাফওয়ানকে, এখানে সাফওয়ানের কোনো দোষ নেই। 

 

বলেই কান্না করতে লাগলো আয়াত। আয়াতের কান্না রামিম সাহেব ব্যতীত যে কোনো মানুষকে গলিয়ে দেবার ক্ষমতা রাখে। আজাদ সাহেব আয়াতের মাথায়ে হাত রেখে নরম স্বরে বলেন,

– কিন্তু মা, কাজটি কি তুমি ভালো করছো? তোমার মা-বাবা কতোই না কষ্ট পেয়েছেন বলো।

– আংকেল যদি আমার হাতে উপায় থাকতো আমি কি এরকম করতাম বলুন। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস বাবা-মা ঠিক একদিন আমায় বুঝবে দেখবেন। 

 

বলতে বলতে গলা ধরে এসেছে আয়াতের। আসলেই কি রামীম সাহেব বুঝতে পারবে তাকে! যদি রামীম সাহেব নিয়ে দেবার জন্য এতোটা অস্থির না হতেন তবে কি আজ এভাবে পালিয়ে আসতে হতো তাকে!

– মা, তুমি আমার সাথে আসো আমার একটা শাড়ি আছে ওইটা পড়বে। নতুন বউ, এভাবে টিশার্ট পড়া মানায় না। 

 

এক আন্টির কথায় ধ্যান ভাঙ্গে আয়াতের। তারপর আন্টি আয়াতকে শাড়ি পড়িয়ে দেন, আয়াত সবার জন্য কফি বানায়। একটা আড্ডার আমেজ তৈরি হয়। মায়া মুখ কালো করে একজায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে। আয়াতের বুঝতে বাকি নেই মেয়েটা তাকে চরম অপছন্দ করে। ঢাকার ব্যাতিব্যস্ততার মাঝে কোনো অপরিচিত মানুষও এতোটা আন্তরিক হতে পারে এটা যেনো কল্পনার বাহিরে আয়াতের জন্য। মানুষগুলোকে মিথ্যে বলতে একদম ভালো লাগছে না তার। কিন্তু করার ও কিছু নেই; নয়তো সাফওয়ানকে ঘর ছাড়া হতে হবে।

 

ফ্লাসব্যাক শেষ হলে দেখে সাফওয়ান হা করে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তুড়ি দিয়ে হাত নাড়িয়ে বলে,

– কি হলো, এভাবে ক্যাবলাকান্ত এর মতো কি দেখছেন?

– তুমি অভিনেতা হলে কিন্তু ভালো নাম কামাতে পারতে।

– তা তো আমি জানি।

– কিন্তু মিথ্যে কথা না বললেই পারতে।

– কি করবো বলুন! আপনার প্রেমিকা পুরো আটঘাট বেধে এসেছিলো। আপনার সুপ্ত প্রেমকে কলি থেকেই উঠিয়ে ফেলার জন্য সরি। বাট আই হ্যাড নো চয়েজ।

– কিহহ! কিসের প্রেমিকা, ও আমার কেউ লাগে না।

– ন্যাকা, যেন কিছু বুঝে না। ওখানে কেউ না থাকলে আমাকে কাঁচা চিবিয়ে খেতো।

– আজিব, আমি তো ব্যাচেলর তাই না? সত্যি সত্যি বিয়ে করলে এ বাড়িতে তুলবো কিভাবে?

– বিয়ে করে বউকে নিয়ে এই চিলেকোঠায় উঠবেন নাকি?? আর উঠলেও বলবেন আমি দা নিয়ে আপনাকে দৌড়ানি দিয়েছিলাম, আমাকে তালাক দিয়ে দিয়েছেন। 

– ধন্য তুমি, ইফাদের সত্যি কপাল পুড়েছে।

 

ইফাদের কথা শুনতেই উজ্জ্বল মুখটা মিয়ে গেলো আয়াতের। সাফওয়ান আয়াতের মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছে ইফাদের খোঁজ এখনো পায় নি। আয়াতের মন ভালো করতে বললো, 

– আমি আজকে গ্রিল নিয়ে এসেছি। ভালো খেতে, এখনো গরম আছে চলো খেয়ে নেই। 

– আমার খিদে নেই

– এই দেখো, আমি এতোদিন একা একা খেয়েছি। আজ তুমি আছো, আমি চাই না একা একা খেতে। চলো না প্লিজ

 

সাফওয়ানের জোড়াজুড়িতে না পেরে শেষমেশ খেতেই হলো আয়াতকে। খাওয়া দাওয়া শেষে আয়াত বেডে আর সাফওয়ান নিচে বিছানা বিছিয়ে শুয়ে পড়লো। সারাদিনের ক্লান্তি আর কালরাত না ঘুমানোর জন্য সাফওয়ান শুতেই ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেলো। কিন্তু আয়াতের চোখে যেন ঘুম নেই। মনে যেনো ঝড় বয়ে যাচ্ছে। এপাশ ওপাশ ফিরে যখন ঘুম আচ্ছিলো না তখন উঠে ছাদে চলে যায় সে। ফোনে ইফাদের নাম্বার ডায়াল করতেই ফোনটি অন পায়। বেশকিছুক্ষণ বাজার পর কেউ ফোনটি রিসিভ করে। আয়াত হ্যালো বলতেই শুনতে পায়………

 

চলবে

 

মুশফিকা রহমান মৈথি

 

মধুরেণ সমাপয়েৎ

৫ম পর্ব

 

বেশকিছুক্ষণ বাজার পর কেউ ফোনটি রিসিভ করে। আয়াত হ্যালো বলতেই শুনতে পায় একজন মহিলা কন্ঠ। অপরপাশের মানুষটি বলে,

– হ্যালো, কাকে চান?

– আমি আয়াত, আপনি কে বলছেন?

– আপনি কি প্যাশেন্টের কেউ হোন?

– প্যাশেন্ট মানে?

 

কাঁপা কাঁপা গলায় প্রশ্ন করে আয়াত, তখন অপরপাশ থেকে শুনতে পায়,

– আমি মেডিক্যাল হাসপাতাল থেকে বলছি, মোবাইলটি প্যাশেন্টের সাথে পাওয়া গেছে কিন্তু উনার যা অবস্থা তাই আমি ই মোবাইলটা আমার কাছে রেখেছি। 

– প্যাশেন্ট বলতে? কি হয়েছে ওর?

– উনি একটা ছোট এক্সিডেন্ট করেছেন; দুটো বোন ফ্রাকচার হয়েছে। আজ দুদিন হয়েছে উনি এখানে এডমিট, উনার সাথে কোনো আত্নীয় বা পরিবারের কেউ আসেন নি। আমি আজকে মোবাইলটা অন করলাম যাতে কেউ ফোন করলে জানাতে পারি।

– এটা কোন মেডিক্যাল?

– ঢাকা মেডিক্যাল

– ও ভালো আছে তো?

– হ্যা, টেনশনের কোনো কারণ নেই, এক মাসের মধ্যে নরমাল হয়ে যাবে। 

– ঠিক আছে,ও কি ঘুমোচ্ছে?

– হ্যা। উনার তো রেস্ট দরকার।

– বেশ, আমি কাল সকালেই আসবো আপনি ফোনটা রিসিভ করবেন প্লিজ। 

– আচ্ছা।

 

ফোনটা রেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে সে, যেটার ভয় পাচ্ছিলো ঠিক সেটাই হয়েছে। ইফাদ এতো বড় একটা বিপদে ছিলো। আর সে কিনা জানতোই না। কি ভুলটাই না বুঝেছিলো। সকাল হতেই ঢাকা মেডিক্যালে যেতে হবে নয়তো সত্যি দেরি হয়ে যাবে। সারারাত দুশ্চিন্তাতেই কাটিয়ে দিলো, ঘুম যে টুকু এসেছিলো তাও পালিয়ে গেছে, না জানি ইফাদকে কি অবস্থায় দেখবে। 

 

সকাল ৫টা,

আযানের সাথে সাথেই ঘুম ভেঙ্গে গেলো সাফওয়ানের। চোখ খুলতে বেডের দিকে চোখ পড়তেই দেখলো আয়াত নেই। এক লাফে শোয়া থেকে উঠে বসলো, আশেপাশে চোখ ফিরিয়ে দেখলো না মেয়েটি নেই। ব্যাতিব্যস্ত হয়ে খুজতে লাগলে দেখতে পেলো, দরজার ফাঁক দিয়ে নীল শাড়ির আচল দেখা যাচ্ছে। তারমানে আয়াত ছাদে রয়েছে, মেয়েটি কি তবে রাতে ঘুমোয় নি? ধীর পায়ে ছাদের দিকে এগিয়ে গেলে দেখতে পায় বিষন্ন চিত্তে বাহিরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে আয়াত। সূর্যের প্রথম কিরণে দীপ্তময়ী মুখটা যেনো বুকে যেয়ে লাগার ক্ষমতা রাখে, চুলগুলো হাওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে আপন মনে উড়ছে। গ্রিক গোডেস Aphrodite কেও হার মানাবে এই মানবীর সৌন্দর্য। নিজেকে সামলে গলা খাকাড়ি দিয়ে জিজ্ঞেস করে,

– সারারাত কি চোর পাহারা দিচ্ছিলে?

– ইফাদ হাসপাতালে।

– কিহ!!!

– কাল রাতে ওর ফোনে ফোন দিয়েছিলাম।

 

ভারাক্রান্ত গলায় রাতের নার্সের সাথে কথোপকথন সম্পূর্ণ বিস্তার ভাবে বললো সাফওয়াকে। চিন্তায় ভ্রু কুচকে আসে সাফওয়ানের। তাহলে ইফাদকে ভুল বুঝেছিলো এই দু দিন? আয়াতের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, 

– ৭টার মধ্যে রেডি হয়ে নাও, মেডিকেলে যেতে আধা ঘন্টা লাগবে জ্যাম এ না পড়লে। মুখটা ভালো করে ধুয়ে নিও। এরকম জম্বি লুক দেখলে ভয় পাবে ইফাদ

– সাফওয়ান ভাই

আয়াত চেঁচিয়ে এলোপাথাড়ি মারতে লাগলো সাফওয়ানকে।

 

সকাল ৮টা, 

জেনারেল ওয়ার্ডের সামনে দাঁড়িয়ে আছে আয়াত এবং সাফওয়ান। নার্স এই রুমের পথ দেখিয়ে চলে গেছেন। বেড নাম্বার ১৩ এর সামনে দাঁড়িয়ে আসে তারা। ইফাদ তখন কাঁথা মুরি দিয়ে শুয়ে আছে।

পিঠের দিক থেকে মুখ দেখা যাচ্ছে না। চোখে পানি নিয়ে আস্তে করে পাশে বসে ইফাদের। কাথা না সরিয়ে বলতে লাগলো,

– তুমি এতোটা কেয়ারলেস কেনো? তোমার কিছু হলে আমার কি হতো? কখনো কি আমার কথা ভাববে না? আমাদের তো সেদিন বিয়ে করার কথা ছিলো। জানো আমি লাল বেনারসি পড়ছিলাম। ঠিক তুমি যেমনটা পছন্দ করো তেমন ভাবে সেজেছিলাম অথচ দেখো কি হয়ে গেলো! কথা বলবে না আমার সাথে? ওগো

 

আয়াতের কথাগুলো শুনে অজান্তেই বুকের বা পাশে তীক্ষ্ণ ব্যাথা অনুভূত হতে লাগলো সাফওয়ানের। এমন তো হবার কথা ছিলো না, তাহলে কেনো এমনটা হচ্ছে? দ্বিধা দন্দে জর্জরিত সাফওয়ান ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে গেলো, দম বন্ধ লাগছিলো ওই মূহুর্তে তার। 

 

অপরদিকে, কথাবার্তা শেষে আয়াতের আকুতি মিনুতিতে পাশে শোয়া লোকটির ঘুম ভেঙে যায়, কাঁথাটা সরিয়ে বলে, 

– ওগো কবে বিয়ে করবে আমায়?

কাঁথা সরানোর পর রীতিমত শক খায় আয়াত। চিকন, ছিপছিপে বডির একটি লোক সেখানে শুয়ে আছে। মুখভর্তি দাঁড়ি, চোখের নিচের কাঁটা ঘা যেনো তার কুকামের সাক্ষী দিচ্ছে।

– কে আপনি?

– আমি শওকত

– ইফাদ কোথায় তাহলে?

– আমি কি জানি?

– একমিনিট, নার্স, নার্স। কোথায় আপনি?

 

নার্স দৌড়ে এলে জিজ্ঞেস করে, 

– কি হয়েছে?

– এটা আমার ইফাদ না?ইফাদ কোথায়?

– মানে?

– মানে যার ফোন দিয়ে আপনার সাথে আমার কথা হয় উনি কোথায়?

– ইনি ই তিনি, ইনার কাছেই আমি ফোনটা পেয়েছি। 

– আর ইউ শিওর?

– হ্যা।

 

এবার তেড়ে এসে শওকতের কলার চেপে জিজ্ঞেস করে আয়াত,

– এই ফোন আপনার কাছে কিভাবে এলো? বলেন, নয়তো পুলিশে দেবো।

 

ওয়ার্ডের ভেতরে সোরগোলে সাফওয়ান দৌড়ে ভেতরে যায়। সেখানে যেয়ে দেখতে পায় আয়াত রীতিমত একটা রোগা পটকা লোককে গলা ধরে ঝাকাচ্ছে। তাড়াতাড়ি আয়াতকে সেখান থেকে সরিয়ে আনে সাফওয়ান। নয়তো দেখা যেতো লোকটা ওখানেই অক্কা পেতে হতো।

 

সকাল ৯.৩০

একটা নাস্তার দোকানে মুখোমুখি বসে নাস্তা করছে সাফওয়ান এবং আয়াত। কারো মুখে কোনো কথা নেই, সাফওয়ান আপন মনে পরোটা, ডাল খেয়ে যাচ্ছে। আর আয়াত শুধু পরোটা নাড়াচড়া করছে। শওকত মোবাইলটা সিএনজিতে করে ইফাদের মিরপুর থেকে উত্তরা যাবার পথে পকেট থেকে চামেচুমে চুরি করে নেয়। অনেক আকুতি করে ইফাদের সাথে একই সিএনজিতে উঠেছিলো সে। ইফাদ নেমে যাবার পর ভেবেছিলো চোরাই বাজারে বিক্রি করলে ভালো দাম পাবে, কিন্তু সেটা হবার আগেই রাস্তা পার হতে গিয়ে বাইকের নিচে চাপা পড়ে হাড় ভেঙ্গে মেডিক্যালে ভর্তি হয়। কাহিনী শুনার পর থেকে মুখটা শূকিয়ে গেছে আয়াতের। তারমানে ইফাদ তার বাসার দিকে যাচ্ছিলো। কিন্তু প্রশ্ন হলো ইফাদ মিরপুর এসেও কেনো আবার তার বাসার দিকে রওনা দিয়েছিলো। এই দুইদিন সে একবার ও খোঁজ ও নেয় নি আয়াতের। সাফওয়ান বেশকিছুক্ষণ ধরে আয়াতের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, শুকনো ফ্যাকাসে মুখটা দেখতে একদম ভালো লাগছে না তার। হুট করে একজনকে ফোন করে জানিয়ে দিলো,

– ভাই আজকে শরীরটা ভালো নেই, আজ অফিসে আসতে পারবো না। খুব জ্বর। একা মানুষ কেউ দেখাশোনার ও নেই।

-……………

– আচ্ছা, আচ্ছা। রাখি। 

ফোনটা রেখেই আয়াতকে বললো,

– বাসে চড়তে পারো?

– কেনো?

 

অবাক হয়ে আয়াত প্রশ্ন করলে উত্তরে সাফওয়ান বলে,

– উত্তরা যাবো, হাতে দুশো টাকা আছে। এসি বাসে নিতাম, কিন্তু আবার ফেরত বাসায় যেতে হবে তো। তাই বলছি, যাবে খাটাড়া বাসে?

– হুম, চলুন। আমার কোনো সমস্যা নেই।

 

উৎসাহিত হয়ে বললো আয়াত। যেই ভাবা সেই কাজ, বিল দিয়ে মোড়ে যেয়ে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়ানোর পর বাস আসলো। ধাক্কাধাক্কি করে কোনোমতে একটা সিট যোগাড় করে দিলো আয়াতকে সাফওয়ান। গন্তব্য এখন ইফাদের বাসা।

 

বিকেল ৫টা,

বাড়ির পথে রওনা দিচ্ছে আয়াত এবং সাফওয়ান। আয়াতের চোখ থেকে না চাইতেও পানি পড়ছে। সাফওয়ান যাতে না দেখে তাই লুকিয়ে অন্যদিকে ফিরে পানিফেলছে সে। প্রথমে ইফাদের বাড়ি গিয়েছিলো, বাড়িতে তালা মারা। আশেপাশের লোকেরা জানে না তার কোথায়, গতকাল সকালে নাকি ফুল ফ্যামিলি ব্যাগ বস্তা বেধে চলে গিয়েছে। প্রথমে অনেকবার ইসরাতকে ফোন করার চেষ্টা চালিয়ে কিন্তু ফলাফল শূন্য। তারপর সাফওয়ান তাকে বলে বাড়ি ফিরে যেতে। খুব সাহস করে শারমিন বেগমকে ফোন লাগায় সে। কিন্তু ভাগ্য এতোটাই খারাপ ফোনটা রামিম সাহেব ধরেন,

– হ্যালো কে বলছেন?

– ব…বাবা আমি আয়াত

– আপনি ভুল নাম্বারে ফোন করেছেন, আমি আয়াত নামের কাউকে চিনি না

– প্লিজ, বাবা কথাটা শোনো, প্লিজ

– ………

– হ্যালো, হ্যালো বাবা, হ্যালো

 

রামিম সাহেব ঠাস করে ফোন কেটে দেন, এখন আর কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে পুনোরায় রওনা দিচ্ছে সাফওয়ানের চিলেকোঠায়।

 

সিড়ি বেয়ে উঠতেই সাফওয়ানের পা আটকে যায়। নিজের ঘরের দরজার সামনে আজাদ সাহেবের সাথে একজন মহিলা আর পুরুষকে দেখে মাথা যেনো ফাঁকা হয়ে যায়। সাফওয়ানকে থেমে যেতে দেখে আয়াত ও অবাক হয়। আজাদ সাহেব তাদেরকে সিড়িতে দেখেই বলে উঠেন,

– ওই যে সাফওয়ান আর বৌমা চলে এসেছে।

 

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নারী তখন……………

 

চলবে 

 

মুশফিকা রহমান মৈথি

 

মধুরেণ সমাপয়েৎ

৬ষ্ঠ পর্ব

 

আজাদ সাহেব তাদেরকে সিড়িতে দেখেই বলে উঠেন,

– ওই যে সাফওয়ান আর বৌমা চলে এসেছে।

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নারী তখন এগিয়ে এসে সাফওয়ানের সামনে এসে দাঁড়ায়। ঠাস করে সাফওয়ানের গালে থাপ্পড় লাগিয়ে দেয় এবং বলে, 

– এতো বড় হয়ে গেছো যে বাড়িতে না জানিয়ে বিয়ে অবধি করে ফেলছো? বাহ!! এটা তোমার থেকে আশা করি নি সাফওয়ান। ইচ্ছে করছে

– সোহাগ থামো, কি করছো? ওর ওয়াইফ পাশে। আমরা ভেতরে যেয়ে কথা বলি। চলো

 

পুরুষটি মহিলাটিকে কোনোমতে শান্ত করে থামালো। অবস্থা বেগতিক দেখে আজাদ সাহেব ও দাঁড়ালেন না। সাফওয়ান একটা ঢোক গিলে বললো,

– আপা ভেতরে যায়ে কথা বলি প্লিজ?

– কথা বলার মতো কোনো পরিস্থিতি রাখছো? তাই তো বলি এক সপ্তাহ হয়ে গেছে বাসায় পা রাখো না কেনো তুমি?

– প্লিজ, দুলাভাই বোঝান না

– সোহাগ ভেতরে চলো, আমরা ভেতরে যেয়ে কথা বলি। প্লিজ, সিন ক্রিয়েট করো না।

 

বিকেল ৬টা, 

মুখোমুখি বসে রয়েছে আয়াত এবং সোহাগ। সাফওয়ানের মুখে সব শুনে ভ্রু কুচকে তাকালো আয়াতের দিকে। আয়াত মাথা নিচু করে বসে রয়েছে। একটা বড় নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো,

– এই মেয়েটাকে নিজের বাড়ি কোন আক্কেলে রাখলি তুই?? প্রবলেম হয়েছে আমাকে বলতে পারতি। আমার বাসায় থাকতো। এমন প্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেমেয়ে বিনা বিয়েতে একরুমে থাকাটা কি খুব ভালো দেখায়?

– আপা, পরিস্থিতি এমন ছিলো যে তোমাকে জানানোর সময় পায় নি। এখন রাত ১.৩০টায় তোমার বাড়িতে ওকে নিয়ে কিভাবে যেতাম বলো। উপর থেকে প্রতিদিন নতুন ঝামেলা। 

– কিন্তু তুমি তো অবুঝ নও সাফওয়ান! একটা মেয়ে তোমার বাড়িতে আছে, ওকে তো ওর বাড়ি ফিরতে হবে। তখন লোকে নানা কথা বলবে। তখন সেটা হ্যান্ডেল কিভাবে করবে? আর ইফাদের খোঁজ ও তো জানো না। 

– সোহাগ, শান্ত হও

– রবিন একটা কথাও বলবা না, ওকে প্রশ্রয় দিতে দিতে এই অবস্থা করেছো তোমরা। তুমি আর মার প্রশ্রয়ে ও আজকে ঘর ছেড়েছে।

 

সোহাগ, সাফওয়ানের বড় বোন। সাফওয়ানের থেকে ৪ বছরের বড় সে। ছোটখাটো গোলগাল মানুষটি সবদিকে ঠিক থাকলেও মাথাটা খানিকটা গরম। হাতের তুরির সাথে সাথে মাথাটা তার গরম হয়ে যায় তার। রবিনের সাথে বিয়েটা হয়েছিলো আজ থেকে ছয় বছর আগে। এখনো বাচ্চা হয় নি তাদের৷ রবিন খুবই শান্তশিষ্ট একজন পুরুষ। সোহাগকে অসম্ভব ভালোবাসে সে। কিন্তু সোহাগের রাগকে প্রচুর ভয় পায়। সাফওয়ান অনেক চেষ্টা করেও যখন সোহাগকে থামাতে পারছেনা তখন আয়াত শান্ত এবং ধরা গলায় বলে, 

– আপা, আমার যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। আমার এক বান্ধবীর বাসায় থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বাবা তাকে এতোটা অপমান করেছে যে সে আমার সাথে কথাও বলতে চাচ্ছে না। বাবাকে ফোন করলে বাবা ফোন কেটে দিচ্ছেন। আপা আমি কি করবো বলুন? আমার কাছে টাকাও নেই। কোনো হোটেলে থাকার মতো। 

– ইফাদ এতোটা কেয়ারলেস কিভাবে হতে পারে। একটা মেয়ের ইমোশন নিয়ে এভাবে খেলার আগে ওর একবার বিবেকে বাধলো না। 

– আপা শান্ত হও, বিপি বাড়িয়ে ফেলবে তো (সাফওয়ান)

– রাখ তোর বিপি, মেয়েটার মুখ দেখেছিস। ইশ বেচারি। শোনো আয়াত তোমার এই বোন আছে, তুমি কিচ্ছু চিন্তা করো না। কে বলেছে তোমার কেউ নেই, তুমি আমাদের সাথে খুলনা যাবে। সেখান থেকে আসার পর আমি নিজে আংকেলের সাথে কথা বলবো। 

 

না চাইতেই আয়াতের চোখ ভিজে আসে৷ নিজের কোনো ভাই বোন না থাকার কারণে বড় বোনের কমতিটা সবসময় খলতো আয়াতের কাছে। আজ যেন সেই জায়গাটা পূরণ হয়েছে সোহাগের জন্য। জড়িয়ে ধরে সোহাগকে। তাদের এই মধুর মিলন দেখে সাফওয়ান এবং রবিন হতবাক। এই না সোহাগ মাথা গরম করে অস্থির করে ফেলছিলো সবাইকে। অথচ এখন আবহাওয়া কি শীতল কি মধুর। 

 

রাত ১০টা,

নিজ হাতে আজ রান্নাবান্না করেছে সোহাগ। তাকে সাহায্য করেছে আয়াত। খাওয়া দাওয়া শেষে লুডু খেলার তাল তুললো রবিন। রবিন খুব মজার মানুষ। আয়াতের সাথে খুব ভাব হয়েছে তার। লুডু খেলার তাল তুলায় আয়াত ও নেচে উঠে। তারা যখন লুডু খেলায় ব্যস্ত তখন সাফওয়ান আর সোহাগ ছাদে গিয়ে দাঁড়ায়। সাফওয়ান সোহাগকে জিজ্ঞেস করে,

– আপা, তুমি আমার চিলেকোঠায় ভুলেও পা রাখো না, আজ কি মনে করে?

– সুহানার বিয়ে করেছে বাবা। 

– কবে বিয়ে?

– সামনের সপ্তাহে। মা খুব কান্না করছিলো। বলেছে তোকে না নিয়ে যাতে বাড়ি না ফিরি। আমাদের একমাত্র ভাই তুই, ওর বিয়েতে তুই থাকবি না না কিভাবে হয়।

– বাবা কি বলেছে?

– তার শেষ কথাছিলো, এখন কি আমার সাফওয়ানের পা ধরতে হবে আমার মেয়ের বিয়েতে আনানোর জন্য?

– বুঝলাম, কবে যাচ্ছি? 

– কাল বিকেলের বাসে। ভাগ্যিস টিকিট কাটিনি, নয়তো আয়াতের জন্য টিকিট কাটতে সমস্যা হয়ে যেত।

– আয়াত ও যাবে নাকি?

– ওকে কোথায় রেখে যাবি?

– বাবাকে হ্যান্ডেল করতে পারবে তো।

– সেটা আমি বুঝে নিবো। এখন চল ওখানে যেয়ে দেখি কি করছে ওরা।

 

সারারাত লুডু, আড্ডাতে কাটলো তাদের। কয়েক মূহুর্তের জন্য সকল চিন্তা যেন উবে গিয়েছিলো আয়াতের। ছোটবেলা থেকে ঢাকা থেকে বের হয় নি সে। যখন খুলনা যাবার তাল উঠেছে সেও একপায়ে রাজী খুলনা যাবে তাই। সাফওয়ান শুধু ফাঁকতালে আয়াতকেই দেখছে। মুক্তোর মতো হাসিটা তীর্যক তীরের মতো বুকে যেয়ে লাগছে। সাফওয়ানের মুগ্ধ চাহনি সোহাগে চোখ এড়ালো না। 

 

পরদিন বিকেল ৫.৩০টা, 

অফিস থেকে ছুটি নিয়ে আজ তাড়াতাড়ি বাসায় এসেছে। একটা ব্যাগ কিনে এসেছে আয়াতের জন্য যাতে সেটায় আয়াতের জামাকাপড় গুছাতে পারে। আজাদ সাহেবকে বলে ৪টার দিকে গাবতলির দিকে রওনা দেয় তারা। জ্যাম কম থাকায় দেড় ঘন্টায় পৌছেও যায়। বিকেল ৬টার বাস, সোহাগরা অনেক আগেই এসে পড়েছে। বাসে উঠে প্রথম গোল লাগলো কিভাবে বসবে! সোহাগদের পুরো পরিবার যাচ্ছে, শ্বশুর-শাশুড়ি, সোহাগের দুই দেবর, তাদের ওয়াইফ এবং বাচ্চারা। রবিনের বাসার সবাই জানে, আয়াত সুহানার বান্ধবী। ভাগ্যক্রমে আয়াত আর সাফওয়ান পাশাপাশি বসলো। সোহাগ যদিও বারবার আয়াতের পাশে বসতে চাইছিলো কিন্তু রবিন জিদ করায় সেটি আর হয়ে উঠলো না।  কেনো জানে আজ বারংবার চাচ্ছিলো যাতে আয়াতের পাশেই যেন সে বসতে পারে। আজকাল মেয়েটিকে বড্ড বেশি ভালো লাগতে শুরু করেছে। আগেও যে এমনটা হতো না তা নয়। কিন্তু আগে যতবার এই খেয়াল মাথায় এনেছে, ততবার বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে নিজের সুপ্ত আশাকে ধামাচাপা দিয়ে দিতো। কিন্তু আজকাল বেহায়া মনটাকে নিয়ে যেন একদম পেড়ে উঠছে না। 

 

রাত ১২টা,

ফেরির জন্য দাঁড়িয়ে আছে বাসটি। বিগত দুই ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে, এখনো সিরিয়াল পায় নি। এদিকে বাসের সবাই ঘুমে বিভর। বাসের হালকা ঝাকুনিতে ঘুম ভেঙ্গে গেলো আয়াতের। একটা সুন্দর মিষ্টি গন্ধ নাকে এসে লাগছে, কানে কিছু বিট হবার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে দেখে সে সাফওয়ানের বুকের উপর ঘাপটি মেরে ঘুমিয়ে রয়েছে। সাফওয়ানের হার্টবিটের শব্দ স্পষ্ট শুনছে, যখনই সাফওয়ানের কাছে আসে এই মাতাল করা মিষ্টি গন্ধটা সে পায়। হয়তো তার পার্ফিউমের গন্ধ। লোকটাকে কোনোকালে সহ্য হতো না আয়াতের, অথচ আজ এই লোকটাই বড্ড ভরসার জায়গা। এই লোকটা না থাকলে, আজ কোথায় থাকতো কে জানে? আস্তে করে উঠে যেতে নিলে সাফওয়ানের ঘুম ভেঙ্গে যায়। উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করে,

– কিছু লাগবে?

– উহু

– তাহলে?

– ঘুম ভেঙ্গে গেছে, ফেরিতে উঠবে হয়তো বাস। আর কতোক্ষণ? 

– সকালের মধ্যে পৌছে যাব

– ওহ

– ঘুমিয়ে পড়ো

– হুম

 

বলেই চোখ বন্ধ করে নিলো; বেশকিছুক্ষণ পর ঘুমের সাগরে তলিয়ে পড়লো আয়াত। 

 

সকাল ১১টা,

সাফওয়ানের বাড়ির সামনে সবাই। রীতিমতো মুখ হা হয়ে আছে আয়াতের। বিশাল বাংলো টাইপ দো তালা বাড়ি। খুলনার নামকড়া চাল ব্যবসায়ী নিজাম উদ্দিন চৌধুরীর ছেলে সাফওয়ান। আয়াতের হা করা মুখটি বন্ধ করে দিয়ে সাফওয়ান বলে,

– মুখখোলা রাখলে মাছি ঢুকে যাবে। 

– আপনি তো বলেছেন, আপনার আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। তাহলে এসব কি?

– আমি তো বলি নি আমার বাবার আর্থিক অবস্থা ভালো নয়, বলেছি আমার আর্থিক অবস্থা তো ভালো নয়। এসব বাবার, আমার নয়। 

– ভাগ্যিস আপনার সাথে বাবার কোনোদিন যোগাযোগ হয় নি। মাথায় করে রাখতো আপনাকে।

– তাই বুঝি? তাহলে শ্বশুর আব্বাকে বলে সত্যি সত্যি বিয়েটা সেড়ে নেই?

 

বলেই টিপ্পনী কেটে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ভেতরের দিকে রওনা দিলো সাফওয়ান। ভেতরে যেতে না যেতেই একটি মেয়ে দৌড়ে এসে সাফওয়ানকে জড়িয়ে ধরলো। ঘটনার আকর্ষিকতায় সবাই অবাক হয়ে গেলো। মেয়েটি তখন সাফওয়ানকে ছেড়ে সামনে দাঁড়িয়ে বলে…….

 

চলবে

 

মুশফিকা রহমান মৈথি

 

মধুরেণ সমাপয়েৎ

৭ম পর্ব

 

ভেতরে যেতে না যেতেই একটি মেয়ে দৌড়ে এসে সাফওয়ানকে জড়িয়ে ধরলো। ঘটনার আকর্ষিকতায় সবাই অবাক হয়ে গেলো। মেয়েটি তখন সাফওয়ানকে ছেড়ে সামনে দাঁড়িয়ে বলে,

– তোমাকে কত মিস করেছি জানো ? একটা যোগাযোগ করলে কি হতো?

– অন্না, তুই বড় হয়েছিস। এখন তুই আর বাচ্চা নেই। সবাই দেখতেছে।

– তো? বিয়ে ত করলে তোমাকেই করবো তাই না? কে দেখছে তাতে আমার কিছুই যায় আসে না।

– তোর মত মেয়েকে আমি বিয়ে করবো কে বলেছে তোকে?

– মানে? আমার মতো মেয়ে মানে?

– আমি না বাল্যবিবাহের পক্ষপাতী না, এখন ছাড় আমাকে। আর একবার ধারে কাছে আসবি ত দেখিস কি করি।

 

বলেই অন্নার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় সাফওয়ান। মেয়েটা এক নাম্বারের চিপকু। সম্পর্কে তার ফুফাতো বোন। এখনও কলেজের গন্ডি পার হয় নি অথচ বিয়ে স্বপ্ন বুনছে। অন্নার এমন সাফওয়ানের সাথে ঢলাঢলি আয়াতের বিরক্ত লাগছে। দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করছে। সুহানার সাথে সোহাগ আয়াতের পরিচয় করিয়ে দিলো। সুহানাকে সব খুলে বলতেই এক লাফে বলে উঠলো,

– সত্যি করে বলতো আপু তুমি সত্যি সত্যি দাদাকে পছন্দ করো না?

– মানে?

– মানে দেখো আমার দাদাভাইটা ফুল একটা প্যাকেজ, ইনকাম কম কিন্তু মানুষটা ভালো। একটু রাগী কিন্তু ভালো শিল্পী। দেখতেও খারাপ না। তোমার সাথে কিন্তু খারাপ মানাবে না। আমি বলি কি ইফাদ ভাইকে ছেড়ে দাদাভাইকে বিয়ে করে নেও। এই দুই দিনে কি আমার ভাইটাকে একটু ও ভালো লাগে নি?

– সাফওয়ান ভাই আর আমি?? অসম্ভব। আমার জীবনে ইফাদ না থাকলেও উনি আর আমি সম্ভব ই না। সারাটাক্ষন উনার সাথে আমার ছত্রিশের আকড়া লেগে থাকে। জানো একবার শখ করে বলেছিলাম আমার একটা ছবি একে দিতে। সে বলে কিনা আমার ছবি ক্যানভাসে তোলার অযোগ্য।

– ধুর, ওকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না।

 

আয়াতের এখানে বেশ লাগছে। সাফওয়ানদের একান্নবর্তী পরিবার। লোকে লোকে ভরপুর। সাফওয়ানের মা সেলিনা বেগম খুবই নরম কিসামের মহিলা। এত আদুরে মানুষ ও হয় তাকে না দেখতে ,মনেই হতো না। আসার পর থেকে আয়াতের যত্নে কোনো কমতি রাখেন নি। সাফওয়ানের বাবার সাথে এখনো পরিচয় হয় নি। সাফওয়ানের দিদুন এখনো বেঁচে আছেন, হোসনেয়ারা বেগম। প্রচন্ড দাপটে মহিলা, সোহাগ আর তার স্বভাব পুরো এক। এছাড়া সাফওয়ানের দুই চাচা এবং এক ফুপু ও এখানেই থাকেন। সাফওয়ানের ফুপু নিপা বেগম বিধবা, অন্না খুব ছোট থাকতেই তার বাবা মারা যায় তখন থেকে নিপা বেগম এবং অন্না এখানে থাকেন। নিপা বেগম প্রচুর খিটখিটে স্বভাবের একজন সারাক্ষন সবার কিছু না কিছু ভুল ধরবেই সে। সাফওয়ানের চাচীরা এক এক জন এক এক রকম। একজন সারাক্ষন রান্নাঘরে দিন কাটায় তো আরেকজন ড্রেসিং টেবিলের সামনে। সাফওয়ানের অন্না বাদেও চার জন কাজিন ও রয়েছে, সব স্টুডেন্ট। মোটামুটি একটা বিশাল পরিবার, সবাই নিজাম সাহেবকে জমের মতো ভয় পায়। চার বছর আগে, সাফওয়ানের গ্রাডুয়েশন যখন শেষের পথে তখন নিজাম সাহেবের ইচ্ছা ছিলো সাফওয়ান যাতে ব্যবসার হাল ধরে। কারণ বাড়ির সব ছেলেদের মধ্যে সাফওয়ান ই বড় কিন্তু সাফওয়ানের ইচ্ছে ছিলো আর্টিস্ট হওয়া। ব্যাবসাতে বসে নিজের স্বপ্নকে জ্বলাঞ্জলি দিবে না বিধায় সে সেদিন ঘর ছেড়েছিলো। সুহানা যখন সাফওয়ানের এই বাড়ি ছাড়ার গল্পটি বলছিলো আয়াতকে তখন আয়াতের নজর ছিলো উঠানে বসে আড্ডারত সাফওয়ানের দিকে। লোকটার প্রতি সম্মান যেনো আরো বেড়ে গেলো আয়াতের। 

 

দুদিন পর,

সন্ধ্যা ৭টা,

আজ সুহানার হলুদ। আয়াতের কাছে পড়ার মতো কিছু ছিলো না বলে সোহাগের একটি কাঁচা হলুদ জামদানী শাড়ি তাকে পড়িয়ে দেয় সোহাগ। ঘন কালো চুল গুলো খোঁপা করে তাতে বেলী ফুলের মালা পড়িয়ে দেয়। হালকা সাজে আয়াতকে যেনো সদ্য ফুটোন্ত হলুদ গোলাপ লাগছিলো। হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হবে তাই সব মেয়েরা টেবিল সাজাতে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো। সেলিনা বেগমের হাতে যে অনেক কাজ, এখনো ফলের ডালা সামনে যায় নি। কিন্তু মেয়েগুলোও হয়েছে এমন যে তাদের খুজে পাওয়া ভার। অগত্যা সামনে আয়াতকে পাওয়ায় আয়াতের হাতে ফলের ডালা দিয়ে বললেন,

– মা, এটা একটু স্টেজে রেখে আয় তো।

– আচ্ছা, আন্টি।

– এর পর আমার সাথে এসে একটু হলুদের ডালাও নিতে হবে, দেখ না সব গুলো সাজতে বসছে। যেনো মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতায় যাবে। তোকে মাশাল্লাহ কি সুন্দর লাগছে না সেজে। তুই আমাকে একটু সাহায্য কর মা। আর বেশি সময় ও নেই।

– আচ্ছা আন্টি। তুমি টেনশন করো না। 

 

বলেই ফলের ডালা হাতে নিয়ে নিলো আয়াত। বলে তো দিয়েছে ডালা নিয়ে যাবে কিন্তু এত ভারী ডালা তার একার পক্ষে নেওয়া অসম্ভব। খুব কষ্টে স্টেজ অবধি নিতে নিতেই যখন ডালা পড়া পরা ভাব ওমনি কেউ এক জন এসে ডালাটি ধরে নেয়। সেই পরিচিত মিষ্টি গন্ধ, মানুষটি আর কেউ না সাফওয়ান। হলুদ পাঞ্জাবী, কালো মুজিব কোর্টে আর সাদা চুড়িদারে তাকে বেশ মানিয়েছে। হাতে কালো ঘড়ি, চুল গুলো কপাল ঢেকে দিয়েছে। যেকোনো মেয়েকে ফ্লাট করার ক্ষমতা রাখে সে। আয়াতের হাত থেকে ডালা নিয়ে নিজেই রেখে দেয় স্টেজের টেবিলে। পরমূহুর্তে বলে,

– যা পারো না, শুধু শুধু ভাব নিয়ে সেটা করার কি আছে?

– আমি তো তাও কাজ করার চেষ্টা তো করছি, আপনার হবু বউ অন্নার মতো আটা ময়দা সুজি ঘষাঘষি তো করছি না।

– এই মুখে মুখে তর্ক করবা না। কোথায় হেল্প করেছি, ধন্যবাদ দিবে তা নয়। 

– বেশ করেছি, কিসের হেল্প বলুন তো। সারাক্ষন ঠেস দিয়ে কথা বললে সেটাকে হেল্প বলে না আর যাই বলুক!

– তুমি আস্তো একটা ঝগরুটে।

– এখন আমি তো ঝগরুটে হবোই; আসলে কি বলুন তো আপনার অন্না আছে না?

– এই কি অন্না অন্না লাগিয়েছো, ও আমার ফুফাতো বোন। 

– তাই বুঝি! ন্যাকা। 

 

বলেই সেখান থেকে চলে যায় আয়াত। ইচ্ছে করে সাফওয়ানের সাথে বাধালো সে, আসার পর থেকে একবারো আয়াতের খোঁজ নেয় নি সে উপর থেকে যখন তার সাথে কথা বলতে গিয়েছে আয়াত পিছনে লেগেই ছিলো। আর সাফওয়ান তাকে প্রশ্রয় দিয়ে গেছে। যদি তার অন্নার প্রতি দরদ ই না থাকে তবে কেনো কিছু বলছে না মেয়েটিকে। মনে মনে হাজারো বকাঝকা করেই যাচ্ছে সাফওয়ানকে। রান্নাঘর থেকে হলুদের ডালাটা নিয়ে না দেখে আপনমনে হাটতে হাটতে কখন যে নিপা বেগমের সাথে ধাক্কা লেগে যায় সেদিকে খেয়ালই নেই আয়াতের। এদিকে ধাক্কা খেয়ে তার হাতে থাকা হলুদের ডালা নিচে পড়ে যায়; সব হলুদ নিচে পড়ে একাকার হয়ে যায় সাথে নিপা বেগমের শাড়িতে খানিকটা হলুদ পড়ে। এমনেই নিপা বেগমের মেজাজ তিরিক্ষি থাকে উপরে উনার শাড়ী নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আরো মেজাজ  বিগড়ে যায় তার। ফোসফোস করে বলে উঠেন,

– এই মেয়ে কানা নাকি তুমি? দেখে চলতে পারো না

– সরি আন্টি, আমি সত্যি দেখি নি।

– তোমার জন্য আমার শাড়ী তো নষ্ট হলোই সাথে সব হলুদ নষ্ট হয়ে একাকার অবস্থা। এই মেয়ে তোমার জন্য এখন আমার ভাতিজীর হলুদটা লন্ডফন্ড হয়ে যাবে। অলুক্ষনে মেয়ে

– আন্টি, আমি এখনই হলুদের ব্যবস্থা করতে বলছি।

– হ্যা নিপা, সামান্য হলুদ ই তো। আরো হলুদ আছে রান্নাঘরে। তুমি ড্রেস বদলে নাও, শুধু শুধু সিন বানিয়ো না। হলুদ শুরু হবে। আয়াত তুমি আমার সাথে আসো মা। (সেলিনা বেগম)

– কি বলেন ভাবী, সামান্য হলুদ। এই মেয়ের জন্য আমার এতো সুন্দর শাড়িটা নষ্ট হয়ে গেলো তার বেলায়? তুমি এই মেয়েটার দোষটা দেখছো না, একটা বাহিরের মেয়ের সামনে আমাকে বলছো আমি সিন বাণাচ্ছী? 

– আন্টি দোষ আমি করেছি, ক্ষমাও চাচ্ছি। তাহলে কেনো অহেতুক আন্টিকে কথা শুনাচ্ছেন

– মুখে মুখে তর্ক করে যাচ্ছো, এই শিক্ষা দিয়েছে তোমার বাবা-মা এই শিক্ষা দিয়েছে?

 

বাবা মা তুলে কথা বলার পর আয়াত আর নিজেকে আটকে রাখতে পারলো না, যেই কিছু একটা বলতে যাবে অমনি পাশ থেকে সাফওয়ান বলে উঠলো,

– ফুপি, আয়াতের মা-বাবা তাকে শিক্ষা দিয়েছে বিধায় সে এতোক্ষন নিজের দোষ না থাকা সত্ত্বেও তোমার কাছে ক্ষমা চেয়ে গেছে। একে ওর হাতে হলুদের ডালা ছিলো তবুও তুমি ওর সামনে দিয়ে হাটছিলে। ও যদি না দেখে থাকে তুমিও কিন্তু ওকে দেখো নি। তাহলে ওর যদি দোষ থাকে তবে তোমারো আছে। আর আজ সুহানার হলুদ জেনেও তুমি সিন ক্রিয়েট করছো, মা এটা তোমাকে বলার পর তুমি উলটো মাকে কথা শুনাচ্ছো। তাহলে বেশি দোষটা কার বলো?

– আজকাল বাহিরের মেয়ের জন্য আমাকে তোরা কথা শুনাচ্ছিস বেশ আমি থাকবোই না এই হলুদে।

 

বলেই নিপা বেগম যেতে লাগলে নিজাম সাহেব সেখানে উপস্থিত হয়। নিজাম সাহেবকে সবাই জমের মতো ভয় পায়। উনার এক হুংকার ই সব ঠান্ডা করার জন্য যথেষ্ট। উনাকে দেখে সাফওয়ান আর কথা বাড়ায় না কারণ সে জানে তার কোনো কথা তার বাবার পছন্দ নয়। তখন নিপা বেগম তার কাছে এসে সব বললে সে বলেন…………

 

চলবে

 

মুশফিকা রহমান মৈথি

 

মধুরেণ সমাপয়েৎ

৮ম পর্ব

 

নিজাম সাহেবকে সবাই জমের মতো ভয় পায়। উনার এক হুংকার ই সব ঠান্ডা করার জন্য যথেষ্ট। উনাকে দেখে সাফওয়ান আর কথা বাড়ায় না কারণ সে জানে তার কোনো কথা তার বাবার পছন্দ নয়। তখন নিপা বেগম তার কাছে এসে সব বললে সে বলেন,

– তোমার বয়স তো কম হয় নি নিপা, যাও শাড়ি বদলে আসো। আর সেলিনা তোমার সময় জ্ঞান সে কমে গেছে সেটা আমার জানা ছিলো না। ৮ টা বাজতে পনেরো মিনিট বাকি, পনেরো মিনিটে অনুষ্ঠান শুরু হওয়া চাই আমার। 

– ভাইজান আপনি

– যা বলার হলুদের অনুষ্ঠানের পর শুনবো।

 

নিজাম সাহেবের হুংকার যেনো ঔষধের মতো কাজ করেছে। নিপা বেগম ফোস ফোস করতে করতে ভেতরে চলে গেলেন। নিজাম সাহেবের চেহারাটাই পুরোনো দিনের দারোগা টাইপ। উনি আয়াতকে যখন দাঁড়াতে বলে এগিয়ে গিয়ে তার সামনে দাঁড়ালেন, আয়াত ভয়ে ঢোক গিলা শুরু করলো। আয়াতের ভয় সাফওয়ানের চোখ এড়ালো না। যে বাবার সাথে বিগত চার বছর কথা বলে নি আজ আয়াতের জন্য বাবার পুনরায় আয়াতের সামনে দাঁড়ালো সে। ধীর কন্ঠে বললো,

– আব্বা, ওর দোষ নেই। ইচ্ছে করে ফুপির গায়ে হলুদ ফেলে নি।

– তোমার থেকে আমার বয়স এবং অভিজ্ঞতা ত্রিশ বছর বেশি তাই তোমার কাছে শুনতে হবে না কি ভুল কি ঠিক। আর আমি ওর সাথে কথা বলতে চাচ্ছি। তোমার সাথে না

– কিন্তু……

– ইটস ওকে সাফওয়ান ভাই, জ্বী আংকেল বলুন( কাঁপা স্বরে আয়াত )

– তুমি কি সুহানা বান্ধবী?

– জ……জ্বী, কেনো?

– কিভাবে বন্ধুত্ব ওর সাথে?

– কলেজের মাধ্যমে, ওর সাথে এক কলেজে অনার্স করেছি।

– তাহলে তুমি আমার মেয়ের মতো, এখন যা ঘটেছে এটা এই বাড়ির হরহামেশার কাহিনী। নিপার কথায় কিছু মনে করো না। ওর মেজাজটা একটু খিটখিটে। এমনি মানুষ ভালো। তোমার সাথে আমার পরিচয় হয় নি, তোমার নাম জানে কি?

– আয়াত 

– বাহ সুন্দর, বাবা কি করেন?

– বাবা রিটায়ার্ড মেজর জেনারেল।

– আর্মি নাকি? আমার বেশকিছু বন্ধু আছে আর্মিতে; তারাও রিটায়ার্ড করেছেন। কাল বিয়েতে আসবেন। যাক তোমার কোনো সমস্যা হলে সেলিনাকে জানিয়ো। আর নিপা র কথায় কিছু মনে করো না।

– জ্বী আংকেল আপনি টেনশন করবেন না।

 

নিজাম সাহেব কথা বলে চলে যাবার পর যেনো সাফওয়ান আর আয়াত হাফ ছেড়ে বাঁচলো। ভেবেছিলো নিজাম সাহেবের হাতে এই বুঝি ধরা খেলো। নিজাম সাহেব এতো ভালো ব্যবহার করবেন এটা যেনো কল্পনার বাহিরে। সাফওয়ান যেই না আয়াতকে কিছু বলতে যাবে অমনি ভেঞ্চি কেটে হাটা দিলো সে। 

– যা বাবা, আমি কি করলাম?

 

হতবাক দৃষ্টিতে আয়াতের যাবার পথে তাকিয়ে থাকলো সাফওয়ান। এই মেয়ের কখন কিসের মুড হয় সেটা হয়তো সে নিজেও জানে না। 

 

রাত ৩টা, 

অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে রাত বারোটার উপর বেজে গিয়েছিলো। তারপর সব গুছাতে গুছেতে দেড়টা বেজে গেছে। তাই যে যেখানে জায়গা পেয়েছে ঘু্মিয়ে পড়েছে। খুব ক্লান্ত লাগছে আয়াতের, মেজাজটাও ভীষন খারাপ, অন্না মেয়েটা সাফওয়ানের পিছন ই ছাড়ে নি। সারাক্ষন চুইংগামের মতো লেগে ছিলো। সাফওয়ানের ও দোষ ছিলো এতো সাজের ঘটার কি ছিলো। ধূর, এখন ঘুমানো দরকার, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ঘুমাবে কোথায়? সোহাগ আপু বললো সুহানার রুমে যেতে কিন্তু সুহানার রুমে শ্বাস ফেলবার জায়গাটুকু নেই। এখন? আচ্ছা ছাদের গেলে তো মন্দ হয় না। ধীর পায়ে বালিশ হাতে রওনা দিলো আয়াত, গন্তব্য ছাদ। সাফওয়ানদের ছাঁদটি বেশ বড়। মাজা অবধি রেলিং, একপাশে ফুলের টবের সারি। গোলাপের গন্ধে ম ম করছে ছাদটি। অন্যপাশে বিশাল দোলনা। দোলনায় বালিশটা রেখে রেলিং এর দিকে চলে যায় সে। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে ইচ্ছে হছে তার। গাড়ি ঘোড়ার কৃত্তিম শহরে পাওয়া গেলেও এই মুক্ত বাতাসটা পাওয়া যায় না। নীরবতার আকাশটা আজ জোৎস্নায় আলোকিত। 

– তুমি এখানে কি করছো?

 

হুট করে কারোর কথা শুনে আৎকে উঠলো আয়াত। বাড়ির প্রতিটা জীব ঘুমন্ত। এই মাঝ রাতে কারোর ছাদের আসার কথা না। পেছনে ফিরে যেন বুকে ডেউ খেলে যায় আয়াতের। চাঁদের আলোতে তুলি হাতে পুরুষটিকে ঠিক যেন গ্রিক দেবতা জিউসের ন্যায় লাগছে। এতো সুন্দর পুরুষ হয় বুঝি! সাদা পাঞ্জাবি, তাতে রঙের লেগে আছে। চুলগুলো বাতাসের উম্মাদনায় দোলা খাচ্ছে, সামনে দাঁড়ানো পুরুষটি যে আর কেউ নয়, সে যে সাফওয়ান। লোকটার প্রতিটা কাজ আজকাল উম্মাদনার পরশ দিচ্ছে আয়াতকে। আয়াতকে হাবলার মতো হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে অনেকটা অস্বস্তির মাঝে পড়ে যায় সাফওয়ান। তুরি দিয়ে তাকে পুনরায় জিজ্ঞেস করে,

– এতো রাতে এখানে কি করছো?

– হ্যা?

– কি হ্যা? ঘুমাও নি কেনো?

– ওহ

 

এবার কাছে যেয়ে ঝাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,

– এই মেয়ে নেশা করছো নাকি? হ্যা, ওহ কি হইয়েছে? এভাবে কি দেখে যাচ্ছো?

– আপনাকে দেখছি

 

মুখ ফসকে বলে নিয়ে জিব কেটে বসে। তারপর সামলে নিয়ে বলে, 

– না মানে, আপনাদের ছাদ দেখছি

– এতোরাতে?

– তো কি করবো?আপনার বউ অন্না বারবার গায়ে পা তুলে আমার ঘুম ভেঙে দিয়েছে। তাই ছাদের এসেছি। আপনি কি করছেন শুনি?

– আমার রুমে সব মামারা ঘুমোচ্ছে, তাই ছাদে এসেছি কাজ করতে।

– ছবি আঁকছিলেন বুঝি?

– না তুলি হাতে মাটি খুড়ছিলাম

– এভাবে বলেন কেনো? সোজা প্রশ্নের সোজা উত্তর দিলে কি হয় আপনার?

– সকালে উঠে যদি তোমাকে আর আমাকে একসাথে এখানে দেখে বুঝতেছো কি হবে?

– আমি ভোরে চলে যাবো

– আহারে কি ভোরে উঠা মানুষ আমার!

– তাহলে আপনি চলে যাবেন

– কি বুদ্ধি!

– আই নো। আচ্ছা কি আঁকছিলেন?

– দেখানো যাবে ন, সিক্রেট

– আহ, সাফওয়ান ভাই দেখান না।

– উফফ জিদ করো না, এখনো কমপ্লিট হয় নি। কমপ্লিট হলে তোমাকে প্রথম দেখাবো।

– সত্যি তো? প্রমিস?

– প্রমিস।

 

বলে আয়াতকে কোনোমতে সামাল দিলো সাফওয়ান। আয়াত ও আর জিদ না করে যেয়ে দোলনায় গিয়ে বসলো। পেন্টিংটা ঢালা দিয়ে, হাত ধুয়ে আয়াতের পাশে গিয়ে বসে সে। 

– সাফওয়ান ভাই, ভালোবাসায় বিশ্বাস ভাংগার কষ্টটা খুব দুঃসহনীয়। আচ্ছা আপনি কোনোদিন কাউকে ভালোবাসেন নি?

 

উদাশ চিত্তে শান্ত গলায় প্রশ্ন ছুড়ে দেয় আয়াত। 

– হঠাৎ আজ এই প্রশ্ন

– এমনি, শুনেছি কষ্ট না পেলে শিল্পী হওয়া যায় না; কথাটার যথার্থতা পরীক্ষার বৃথা চেষ্টা বলতে পারেন

– আমি ভালো শিল্পী নই। এবার বুঝে নাও

– আমি বাড়ি ফিরে যাবো সা্ফওয়ান ভাই।

– হঠাৎ?

– ইফাদ কথা রাখে নি, তাই বলে দেউলিয়ার ঘুরার মানে হয় না। বাবা মারবেন, বকবেন মেনে নিবো। বাবা হয়তো এখন রেগে আছেন, হয়তো থাকবেন। কিন্তু দোষ তো আমার তাই না? আমি যদি নিজের দোষ মেনে ক্ষমা চেয়ে নেই আমার মনে হয় উনি ক্ষমা করে দিবেন। 

– যাক ঘটে সুবুদ্ধির উদয় হয়েছে। বেশ আর তো তিনদিন এরপর তোমাকে বাসায় দিয়ে আসবো তাহলে।

– থ্যাংক উ, আপনার কাছে সারা জীবন কৃতজ্ঞ থাকবো। এই ছয়দিন আমার জীবনে শ্রেষ্ঠ ছয় দিন। এই ছয়টা দিন না থাকলে আপনাকে হয়তো সারাজীবন অসহ্যের কাতারেই রাখতাম। 

– তাই বুঝি? আমাকে এতো অসহ্য লাগতো তোমার?

– তাই নয় কি? আপনি বলেন এই চার বছর আপনার সাথে আমার পরিচয় একবার ভালো ব্যবহার করেছেন? অন্নার সাথে এর চেয়ে মিষ্টি করে কথা বলেন আপনি?

– হিংসা হচ্ছে বুঝি?

– বয়েই গেছে।

 

খুনসুটিতে কখন যে সকাল হয়ে গেছে টের পায় নি তারা, ভোরের প্রথম কিরনে মুগ্ধ নয়নে আয়াতের দিকে তাকিয়ে আছে সাফওয়ান। এতোটা স্নিগ্ধ মেয়েটাকে সারাজীবন নিজের কাছে রেখে দিতে ইচ্ছে করছে। আয়াত উঠে নিচের দিকে চলে যাবার সময় পিছু ডাকে সাফওয়ান। শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করে,

– তুমি কি এখনো ইফাদের জন্য অপেক্ষায় আছো?

– জানি না, আজকাল তার আনাগোনা আমার হৃদয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। তাকে নিয়ে কোনো স্বপ্ন বুনে না ভাবনারা। হয়তো অপেক্ষার প্রহর আর গুনতে চায় না বেহায়া মনটা। 

– যদি কেউ নতুন করে বন্ধ হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ে তবে?

– এবার আর অন্ধ হয়ে দরজা খুলবো না। কাঠ খড় পুড়াতে হবে কিন্তু।

– তাহলে কড়া নাড়ার সুযোগ দিচ্ছো?

– বাবার হৃদয়ের দরজায় কড়াটা আগে নাড়তে হবে। বাবা দরজা খুলে আমন্ত্রণ জানালে আমার কোনো সে নেই।

– যাহহ যা একটু বন্ধুরা চান্স নিতো তাও হবে না।

– হাহাহা, থাকেন আমি যাই

 

বলেই রুমের দিকে হাটা দিলো আয়াত। আর তার যাওয়ার পানে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সাফওয়ান।

 

দুই দিন পর, 

আজ সুহানার বিয়ে, কমিউনিটি সেন্টারে বিয়েটা হবে। সাফওয়ানের অন্যান্য কাজিনদের সাথে আয়াত ও লাইনে দাঁড়িয়েছে বরের গেট ধরতে। নিজাম সাহেব প্রচুর নামীদামী লোকদের একজন বিধায় আত্নীয়ের এবং গেস্টের অভাব নেই। সবাইকে গোলাপ জলের ছিটা দিয়ে বরণ করছে আয়াতরা। হুট করে একজন গেস্টের দিকে গোলাপ জল ছিটাতেই হাত আটকে গেলো তার। গেস্টটিও আয়াতকে নিপুন সূক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষন করে যাচ্ছে। আয়াতের চোখে পানি ছলছল করছে, এভাবে তার সাথে দেখা হবে এ যেনো মানতে পারে নি সে। মনের অজান্তেই মুখ ফসকে বেড়িয়ে গেলো আয়াতের,

– বাবা…………

 

চলবে

 

মুশফিকা রহমান মৈথি

 

মধুরেণ সমাপয়েৎ

৯ম পর্ব

 

মনের অজান্তেই মুখ ফসকে বেড়িয়ে গেলো আয়াতের,

– বাবা, তুমি এখানে?

 

রামিম সাহেব কড়া নজরে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। তার চোখে কৌতুহলের ছাপ ফুটে উঠেছে। এতো মেহমানের মাঝে নিজের রাগ ও প্রকাশ করতে পারছেন না। শারমিন বেগম দৌড়ে এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন, এক সপ্তাহ মেয়েকে না দেখে অস্থির মনটা আজ শান্ত করছেন। আয়াত ও মাকে কাছে পেয়ে পাগলের মতো কাঁদছেন। মা-মেয়ের এমন মিলন সবার চোখ এড়ালো না। সাফওয়ানের পরিবারের লোকেরা কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কিন্তু অনুষ্ঠান বিধায় কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ পাচ্ছেন না। রামিম সাহেব উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

– তুমি এখানে কি করছো? আমি তো ভেবেছিলাম ওই লাফাঙ্গার সাথে পালিয়ে আমার মুখে চুন কালি লেপে দিতে বিয়ে টিয়ে করে ফেলেছো। কিন্তু এখানে তোমাকে দেখবো তা আশা করি নি। তা কোথায় তোমার গুনধর বয়ফ্রেন্ড কাম হাসবেন্ড। 

 

আয়াতের মুখে যেন তালা পড়ে গেলো, কি বলবে বুঝেই পাচ্ছিলো না, অমনি পেছন থেকে সাফওয়ান আয়াতের নাম ধরে ডেকে উঠে। কাছে এসে ধীর কন্ঠে বলে উঠে, 

– স্টেজের কাছে যাও, মা তোমাকে খুজছে।

– ওহ তাহলে এই সেই ছেলে? 

 

কড়া কন্ঠে প্রশ্নটি ছুড়ে দেন রামিম সাহেব। সাফওয়ান হতবাক দৃষ্টিতে রামিম সাহেবের দিকে একবার, আরেকবার আয়াতের দিকে তাকাচ্ছে। মনে হাজারো প্রশ্নরা ভিড় করছে। আয়াতকে ইশারা করলে আয়াত ইশারাতেই জানায় বাবা-মা। সাফওয়ান পারলে সেখান থেকে দৌড় মারে, কিন্তু আয়াতের মুখের দিকে তাকিয়ে ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। রামিম সাহেব এগিয়ে এসে সাফওয়ানের সামনে দাঁড়িয়ে ধীর কন্ঠে বললেন,

– তোমাকে দেখে ভদ্র বাড়ির ছেলে মনে হচ্ছে, কিন্তু তুমি এমন একটি কাজ করার আগে একবারো এটা ভাবলে না একটা পরিবারের কতোটা অসম্মান হয় যখন বিয়ের কনে বিয়ে থেকে পালিয়ে যায়। যাক গে, আমার মেয়ে তো আমার কথা একবার ভাবলোও না পালিয়ে আসলো তোমার সাথে, তা সুখে রাখতে পারছো তো তাকে। না কি এখনো তোমার বাবার টাকাতেই খায়াচ্ছো তাকে?

– আংকেল আমার কথা একটি বার শুনুন। 

– কি শুনবো? সেদিন তোমার মেয়ে তোমার মুখে চুনকালি মেখে এমন চলে যাবে তারপর আমি তোমার কথা শুনবো। শারমিন চলো, আমি নিজামকে পরে সব বুঝিয়ে বলবো।

– …………

 

রামিম সাহেবের চোখ ছলছল করছে, শারমিন বেগমের হাত ধরে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন তখন নিজাম সাহেবের মুখোমুখি হন তিনি। সাফওয়ানের যা ভয় ছিলো সেটাই হয়েছিলো, একে তার কোনো কথা রামিম সাহেব শুনতে রাজি নন। উপরে তিনি নিজাম সাহেবের বন্ধু মহলের একজন। যদি নিজাম সাহেবের কানে একবার যায় যে সে তার বন্ধুর মেয়েকে নিয়ে পালিয়েছে খুব বড় ঝামেলা হয়ে যাবে। উপরে রামিম সাহেব ভাবছেন সাফওয়ান ই সে যার জন্য তার মেয়ে পালিয়েছে। কপালে ঘাম জমতে শুরু হয়েছে তার। এখন কি করবে তার জানা নেই। আয়াতের দিকে তাকালে দেখতে পায় তার চোখে অশ্রুরা ভিড় করেছে, ছলছল নয়নে দাঁড়িয়ে আছে সে। সাফওয়ান শিওর সে সামনের আসন্ন বিপদকে দেখতে পাচ্ছে না। একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলে আয়াতের হাত নিজের হাতের মুঠোতে নিলো সে। যা হয়ে যাক এই মেয়েটাকে আর কষ্ট পেতে নিবে না সে। 

 

রাত ১২টা,

বসার রুমে মুখ শক্ত করে বসে আছেন নিজাম সাহেব। অন্য সোফায় রামিম সাহেব এবং শারমিন বেগম বসা, সেলিনা বেগম একেই মেয়েকে বিদায় দিয়ে দুঃখের ভেতরে আছেন। এক কোনায় সাফওয়ান আয়াতের হাত নিজ হাতে মুঠো করে দাঁড়িয়ে আছে। রামিম সাহেব যখন নিজাম সাহেবকে সবখুলে বলেন তখন অনুষ্ঠানের খাতিরে ওই মূহুর্তে তিনি মৌনতা বজায় রাখেন। আর রামিম সাহেবের কাছে অনুরোধ করেন যাতে তিনি আজ রাত এখানেই থাকেন। ব্যাপারটার খোলসা না হওয়া অবধি রামিম সাহেবের যাওয়াটা ঠিক দেখাবে না। আয়াত এর মাঝে রামিম সাহেব এবং শারমিন বেগমের সাথে হাজারো বার কথা বলার চেষ্টা করে কিন্তু ফলাফল শুন্য। নিজাম সাহেব এবার একটু নড়েচড়ে বসে সাফওয়াঙ্কে জিজ্ঞেস করেন,

– তুমি কি এই মেয়েকে পার্লার থেকে নিয়ে পালিয়েছিলে?

– জ………জ্বী বাবা

– তোমরা কি বিয়ে করেছো?

– বাবা, আগে আমাদের পুরো কথা টা শুনেন

– বিয়ে করেছো কি না? (চিৎকার করে)

– না 

– অথচ একসাথেই থাকতে

– জ্বী

– ছি ছি এই শিক্ষা আমি তোমাকে দিয়েছি? ঢাকায় যেয়ে এই উন্নতি হয়েছে তোমার?

– আংকেল সাফওয়ান ভাই এর দোষ নেই। ওর সাথে আমি পালিয়েছি কিন্তু ও আমার সাথে পালায় নি।(আয়াত)

– এই মেয়ে তুমি চুপ থাকো আমি আমার ছেলের সাথে কথা বলছি। আর কি আবল তাবল বলছো তুমি?

– আপনি আমার উপর চিল্লান, ওকে বকছেন কেন? ও কি করেছে?

– তুমি একে দোষ করেছো উপরে সাফাই গাইছো।

 

রামিম সাহেব নিজাম সাহেবকে শান্ত করতে বললেন, 

– শান্ত হ। তোর ছেলের প্রতি আমার কোন আপত্তি ছিলো না, শুধু বেকার বিধায়।

– কে বেকার? আমার ব্যবসায় যোগ দিবে না বলে ঘর ছেড়েছে ৪ বছর। আর্টিস্ট হবে। সামান্য একটা চাকরি করে ঢাকায়। আর আর্ট করে ছবি বেঁচে খায়। 

– তাহলে আয়াত যে বলতো সে কাজকাম করে না

– হয়তো এসব আমার মতো তার ও চোখে কাজের পর্যায়ে পড়ে নি। 

– তাহলে তো কথাই নেই। দেখো ওরা একে অপরকে যেহেতু ভালোবাসে, এক সাথে এক সপ্তাহ আছে। তাই ওদের বিয়েটা করে দেওয়াই বেটার।

 

রামিম সাহেবের ৩৬০ ডিগ্রি এংগেলের পল্টি আয়াত এবং সাফওয়ানের বজ্রপাত ঘটালো। নিজাম সাহেব আমতা আমতা করে বললেন, 

– কিন্তু তোর তো ওকে অপছন্দ।

– ছিলো, এখন নেই। ছেলে স্বাবলম্বী, আমার মেয়েকে ভালোবাসে আর কি চাই আমার?

– দুই পরিবারের সম্মানের ব্যাপার, ঠিক আছে তাহলে সামনের শুক্রবার এদের বিয়ের আয়োজন করি?

– এতো দ্রুত? আমি তো

– আরে একটা বিয়ের লোকজন তো আছেন ই আর তুই ও লোকজন ডেকে নে। পরে ঢাকা আবার অনুষ্ঠান করে নিস।

 

সাফওয়ান তাদের গাড়ি থামাতে বাধ সাধলেও লাভের লাভ কিছুই হয় না। এখন সব উপর ওয়ালার উপর ছেড়ে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। রামিম সাহেব আয়াতের মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে আদর করেলেন,  পরে সাফওয়ানকে জড়িয়ে ধরলেন। দুই পরিবার বিয়ের কথায় খুব খুশী। আয়াতের নিজের চুল ছিড়তে মন চাইছে, কেনো সাফওয়ানের সাথেই বডিগার্ডদের সামনে পালাতে হলো। আর এখন যদি তারা বলে কাহিনী আসলে ঠিক তার উলটো তাহলে ঝামেলা বাড়বে বই কমবে না। 

 

রাত ৩.৩০টা, 

ছাদে একমাথা হতে অপর মাথা পায়চারী করে যাচ্ছে আয়াত, সাফওয়ানের আসার কথা অথচ সে এখনো আসছে না; ইচ্ছে করছে ছাদ থেকে লাফ দিতে। এমন ডেড এন্ডে এসে পৌছেসে যে এর আগের পথের কোনো হদিস তার কাছে নেই। কাধে কারোর স্পর্শ পেতেই লাফিয়ে উঠে সে। পেছনে ফিরে দেখে মুখ কাচুমাচু করে দাঁড়িয়ে আছে সাফওয়ান। রাগী কন্ঠে বলে উঠে, 

– এই আপনার আসার সময় হলো?

– কি করতাম? কাজিনরা ছাড়ার নাম নিচ্ছিলো না

– জানি জানি, আপনার অন্না তো মরা কান্না লাগিয়েছে। এখন মেইন পয়েন্টে আসি, কি প্লান?

– কিসের?

– এই বিয়ে ভাঙার?

– আই ডোন্ট নো।

– মানে? আপনি না জানলে কে জানবে? কি দরকার ছিলো ওই সময়ে বাবার সামনে আসার?

– এটা মোটেও আমার দোষ না। আমি তো নাহয় বাবাকে কি বলবো বুঝছিলাম না, কিন্তু তোমার? তুমি কেনো তোমার বাবাকে বুঝালে না?

– আপনার কি দরকার ছিলো ঢাকায় যেয়ে স্বাবলম্বী হবার?

– ও এখন দোষ আমার? ওকে ফাইন যা একটু ভেবেছিলাম বিয়েটাকে কেচিয়ে দেবার চেষ্টা করবো এখন মনে হচ্ছে অযথা

– না না, যাবেন না। সরি সরি এবার বলুন কি প্লান?

– প্লান আপাতত এইটাই যে আমাদের বিয়ে করতে হবে

– কিহহহ

– হুম, তারপর ছয়মাস পর আমরা ডিভোর্স আপিল করবো। দেখো বিয়ে আমাদের এমনেও করতে হবে ওমনেও। তাই অহেতুক কষ্ট না করে ট্রায়াল ম্যারেজ করে নেই। আর দেখো এই উপায়ে আমাদের পরিবারের মানুষগুলো ও খুশী। কতোদিন পর তোমার বাবা-মা তোয়াকে কাছে টেনে নিয়েছে বলো

– পরে ডিভোর্সে ফ্যামিলি রাজি না হলে?

– আরে ছয়াস বহুত সময়, কিছু একটা প্লান করে নিবো নো টেনশন। বিয়েতে চিল করো

– এটাই এখন সবচেয়ে বড় টেনশন। আপনার ফুপু পারলে আমাকে চিবিয়ে খায় আর অন্না ও তো বিয়ের দিন না বিশ খাইয়ে দেয়। উফফফফ

– আয়াত সত্যি সত্যি বিয়েটা করলে কি খুব খারাপ হবে?

– মানে? 

 

সাফওয়ান তখন আয়াতের কাছে এসে ওর মুখটা হাত দিয়ে আলতো করে ধরে। তারপর ধীর গলায় বলে,

– দেখো তোমায় কোন আচ লাগতে দিবো জীবনে, সুখে রাখার সব রকম চেষ্টা আমি করবো। একটাবার বিশ্বাস করে দেখো।

 

আয়াত হা করে সাফওয়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, লোকটা সত্যি বলছে? কি হচ্ছে এসব? ঠিক তখন ই পিছন থেকে………………….

 

চলবে

 

মুশফিকা রহমান মৈথি

 

মধুরেণ সমাপয়েৎ

১০ম পর্ব

 

সাফওয়ান তখন আয়াতের কাছে এসে ওর মুখটা হাত দিয়ে আলতো করে ধরে। তারপর ধীর গলায় বলে,

– দেখো তোমায় কোন আচ লাগতে দিবো জীবনে, সুখে রাখার সব রকম চেষ্টা আমি করবো। একটাবার বিশ্বাস করে দেখো।

 

আয়াত হা করে সাফওয়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, লোকটা সত্যি বলছে? কি হচ্ছে এসব? ঠিক তখন ই পিছন থেকে হাসির আওয়াজ শুনতে পায় সাফওয়ান। তাড়াতাড়ি আয়াতকে ছেড়ে একটু দূরে দাঁড়ায় সে। আয়াত ও খানিকটা অস্বস্তির মাঝে পড়ে যায়। পেছন থেকে সাফওয়ানের কাজিনরা ফাজলামির স্বরে বলতে থাকে,

– ভাই এক সপ্তাহ ওয়েট কর, বুঝতেছি তোর সইতেছে না। কিন্তু ঘরে সিনিয়র সিটিজেনের অভাব নাই। আমাদের বদলে তারা দেখলে আরেকটা দক্ষযজ্ঞ বাধায় দিবে।

– ওদের হয়ে গেলে যা না, আয়াতের সাথে আমার কথা আছে।

 

প্রচন্ড বিরক্তিস্বরে সাফওয়ান বলে উঠে। কাজিনদের ভেতর প্রণয় নামের ছেলেটি তখন বুকে হাত দিয়ে মজার ছলে বলতে থাকে,

– আহারে, আমাদের সেলিম আনারকলি; এই জালিম দুনিয়া তাদের ভালোবাসার পথে বাধা হয়ে গেছে। এজন্য বলে প্রেমেরই নাম বেদনা।

– থাপড়া না খাইতে চাইলে ভাগ এখান থেকে। আমি ১০ অবধি গুনবো।

– থাক, আপনি রুমে যান। কালকে আবার সুহানার বউভাত; এখন না ঘুমালে পরে কালকে কষ্ট হবে। আমি রুমে যাচ্ছি। (আয়াত)

– ঠিক আছে।

 

 সাফওয়ানের সাথে কথা বলে আয়াত নিচে নেমে যায়। রুমে শ্বাস ফেলানোর মতো জায়গা নেই, কিন্তু কিছু করার নেই এখানেই ঘুমাতে হবে আয়াতের। সারারাত এপাশ ওপাশ করেই কাটালো সে। ঘুমের ছিটা বিন্দু ও আসলো না চোখে। মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তখন সাফওয়ানের কথাটা কি সে সিরিয়াসলি বলেছে নাকি কাজিনরা চলে আসাতে কথা ঘুরাবার জন্য বলেছে! উফফ আর ভাবতে পারছে না। বিয়েটা হয়তো সত্যি করতে হবে।

 

তিন দিন পর,

বিকেল ৪টা,

হলুদের শপিং এ সাফওয়ানের পুরো পাল্টনের সাথে আয়াত এবং শারমিন বেগমও বেড়িয়েছেন। শুধু অন্না এবং নিপা বেগম আসেন নি, নিপা বেগমের আয়াতকে কিছুতেই পছন্দ না আর অন্না সেতো তার এতো বছরের ক্রাশ কাম লাভের বিয়ে হয়ে যাওয়ার দুঃখে বাঁচছে না। এই তিনদিন এক মূহুর্তের জন্য সাফওয়ান এবং আয়াত একে অপরের সাথে কথা বলতে পারে নি। যেটুকু পেরেছে সেটা শুধু ফোনে। তাও সাফওয়ানের ফোন তার কাজিনদের হেফাজতেই ছিলো। আয়াতের মাথায় জট লেগে আছে; ইচ্ছে হচ্ছে সাফওয়ানের মাথা ফাটিয়ে দিতে কেনো তার মোবাইল কাজিনদের কাছে রাখতে হবে। ঘর তো নয় মনে হচ্ছে জেলার সব লোক এসে হাজির হয়েছে। দোকানে সকলে শাড়ি সিলেকশনে যখন ব্যস্ত তখন আয়াত এক কোনায় বসে তার ভবিষৎ নিয়ে চিন্তা করতে ব্যস্ত। কেনো যেনো সবকিছু এলোমেলো লাগছে। সাফওয়ানকে যে তার জীবনসঙ্গী হিসেবে অপছন্দ এমন কিছু না; এই শপিং,হলুদ,কাবিন এই ব্যাপারগুলো মন্দ ঠেকছে না কিন্তু মনটা বড্ড অশান্ত হয়ে আছে। এমন তো হবার কথা ছিলো না। ঘটনাগুলো খুব দ্রুত ঘটছে। সাফওয়ানের প্রতি এলোমেলো অনুভূতির অস্তিত্বগুলো তাকে বারবার শিহোরিত করছে। এই অস্তিত্বগুলোর নাম তার অজানা। একে এই অজানা অনুভূতিগুলো তাকে গ্রাস করছে উপর থেকে ভয় হচ্ছে যদি পুনরায় বিশ্বাসের বদলে অবিশ্বাস এসে ধরা দেয় তখন নিজেকে সামলানো খুব কষ্টদায়ক হয়ে পড়বে। কাধে কারো স্পর্শ পেলে মাথা তুলে তাকায় সে, সাফওয়ান তার সামনে কৌতুহলী দৃষ্টি নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আয়াতের ছলছল নয়ন সাফওয়ানের বুকে চিনচিমে ব্যাথার সৃষ্টি করছে। কেনো জানে এই মেয়ের কান্না সাফওয়ানের মাঝে অসহায়ত্বের অনুভূতি জাগায়। কিছুতেই নিজেকে ঠিক রাখতে পারে না তখন। কিছু বলতে যাবে তার আগেই সেলিনা বেগম আয়াতকে ডেকে উঠে, শাড়ির সিলেকশনের জন্য তার মতামত যে দরকার। বেশ কিছু শাড়ি একেরপর এক তার উপর ট্রায়াল করিয়ে শেষমেশ একটি কাঁচা হলুদ শাড়ি সিলেক্ট করা হলুদের জন্য। এবার বিয়ের শাড়ির পালা, ভারী ভারী কাতান, বেনারসি একত্র করা হয়েছে। আয়াতের ধৈর্যের বাধ ভাঙ্গতে লেগেছে। এমনি ভারী কিছু তার ভালো লাগে না; উপর থেকে এখানে আরদ লাগিয়েছে জমকালো শাড়ির। তখন একয়াতি সিম্পল লাল টকটকে শাড়ির উপর মিহি কাজের একটি শাড়ি এগিয়ে দিলো। শাড়িটি দেখে সেলিনা বেগমের প্রথম বাক্য,

– এটা তো অনেক সিম্পল রে সাফু, তোর এটা ভালো লেগেছে?

– আমার বউ তো, সিম্পলের মধ্যেই গরজিয়াস। আর ওর ওজন দেখছো, তুলোর সাইজের এক রত্তি মেয়ে এই ভারী শাড়ির নিচে ভেটকে পড়ে থাকবে। আমার তখন বউ শাড়িতে খুজা লাগবে। এটাই ঠিক আছে; আয়াত এইটা পড়ে আসো তো।

 

 মনে মনে বেশ শান্তি লাগছে আয়াতের; শাড়িটা আয়াতের ও বেশ ভালো লেগেছিলো কিন্তু মুরুব্বিদের সামনে হবু বউ পক পক করবে টিক মানাবে না। আয়াত যখন শাড়িটি পড়ে সামনে আসে; মুখ যেনো হা হয়ে যায় সবার। উজ্জ্বল লাল রঙে মেয়েটিকে অপ্সরার চেয়ে কম লাগছে না। গায়ের রঙের সাথে রংটি মিশে আছে। এতো সাধারণ শাড়ি ও যে কাউকে এতোটা সুন্দরী করে তুলতে পারে তা আয়াতকে না দেখলে বুঝার উপায় ছিলো না। সাফওয়ানের চোখ আয়াতের মধ্যে আটকে গেছে। শাড়িটাতে আয়াতকে মানাবে এটা তার কল্পনায় ছিলো, কিন্তু এতোটা অপরুপ লাগবে এটা কল্পনার বাহিরে ছিলো; যেনো ফুটন্ত লাল গোলাপ তার সামনে দাঁড়ানো। সবার মিটিমিটি হাসি আর খোঁচার জন্য তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিলো সে। এখনও হার্টবিট বেড়েই র‍য়েছে তার। সাফওয়ানের চোখে আয়াতের প্রতি অনুভূতিগুলো একজন মানুষের সুক্ষ্ণ চোখ এড়ালো না।

 

রাত ১০টা,

খাবারের পরে ছাদের কোনায় দাঁড়িয়ে আছে সাফওয়ান। পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে বিয়ে তো করছে কিন্তু ইফাদ নামক বাধাটা এখনো রয়ে গেছে। ইফাদের ফোন অফ, যোগাযোগের উপায় পাচ্ছে না। বন্ধুদের জানিয়ে দিয়েছে যাতে ইফাদের খোঁজ পেলে তাকে জানানো হয়। এতো দ্রুত এতো কিছু হচ্ছে আয়াতের উপর কতোটা মানসিক চাপ পড়ছে সেটা সাফওয়ানের অজানা নয়। ছাদের কোনায় দাঁড়িয়ে হাজারো প্রশ্নের উত্তর খুজতে ব্যস্ত তখন পেছনে কারোর উপস্থিতি অনুভব করে সে। পেছন ফিরতেই দেখে রবিন দাঁড়িয়ে রয়েছে তার সামনে। মুচকি হেসে প্রশ্ন করলো,

– কিছু বলবেন দুলাভাই?

– পরসু তো শালামশাই এর হলুদ, তিন দিন বাদ বিয়ে; আয়াতকে বলেছো কতোটা ভালোবাসো?

– ভালোবাসা মানে? কি যে যা তা বলছেন দুলাভাই; এটা পরিস্থিতির টানাপোড়নের কারণে করতে বাধ্য হচ্ছি।

– আসলেই কি তাই শালামশাই? বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে তুমি একটু ও ভালোবাসো না আয়াতকে! চোখ বন্ধ করলে মেয়েটা তোমার ভাবনায় বিচরণ করে না, মেয়েটার চোখের পানি তোমাকে একটু ও বিচলিত করে না?

– এটা স্বাভাবিক নয় দুলাভাই? মেয়েটা আমাকে ভরসা করে; ওর ভালোমন্দের খবর রাখাটা আমার দায়িত্ব।

– সত্যি কি তাই সাফওয়ান? আচ্ছা এটা কেনো মনে হচ্ছে তুমি তাকে ভালোবাসো না?

– কারণ এক বা দুই সপ্তাহ একসাথে থাকলে কারোর প্রতি মায়া জন্মাতে পারে ভালোবাসা নয়। ইটস জাস্ট ইনফ্যাচুয়েশন।

– মায়া না থাকলে কারোর প্রতি ভালোবাসা জন্মায়? আচ্ছা সোহাগ আর আমার কাহিনীতেও কি তুমি ইনফ্যাচুয়েশনের থিওরি দিবে? একবার দেখায় ওর প্রতি ভালোলাগা তৈরি হয় তারপর ভালোবাসা, আজ ওর সাথে ছ বছর ধরে সংসার করছি; এখনো ওকে ততোটাই ভালোবাসি। এটাও কি মায়া? শালামশাই ভালোবাসা বলো কিংবা ভালোলাগা সবকিছুতেই মায়াটার গুরুত্ব অনেক বেশি। একটা থাকে শর্ট টাইম একটা সময়ে কেটে যায়, আরেকটা হলো গভীর মায়া যার গন্তব্য ভালোবাসা, বিশ্বাস, সম্পর্ক। আমার যা বলার বলা হয়ে গেছে, তুমি নিজের অন্তরাত্নাকে জিজ্ঞেস করো আয়াতের প্রতি মায়াটা ঠিক কেমন?

 

কথাগুলো চুপচাপ সাফওয়ান শুনছিলো; রবিনকে এজন্য সাফওয়ানের খুব বেশি ভালো লাগে কারন সঠিক সময়ে সঠিক উপদেশ দেওয়াটা লোকটির বড় গুন। আয়াত নামক নারীটি সাফওয়ানের প্রতিটি চিন্তায় বিচরণ করে; তার হাসি, ছেলেমানুষী সাফওয়ানকে আনন্দ দেয়; সারাক্ষন মেয়েটির আশেপাশে থাকলে মানসিক প্রশান্তি লাগে; মনে হয় যেনো অপূর্ণ হৃদয় পূর্ণতা পাচ্ছে, তার চোখের পানি সাফওয়ানের ভেতরে রক্তক্ষরণ করতে সক্ষম। এই অনুভূতি গুলো কি শুধুই মায়া? মনের এই এলোমেলো ভাবনাগুলোকে সাজাতে পারছে না সাফওয়ান। এখন মনকে শান্ত করতে হলে একটি ঔষধ আছে তা হলো পেইন্টিং। নিজের এলোমেলো চিন্তাগুলি কাগজে তুলতে পারলে হয়তো মন শান্ত হবে!

 

অপরদিকে,

সুহানার রুমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে রয়েছে আয়াত। অনেকক্ষন পর নিরবে একটু নিজের জন্য সময় পেয়েছে; এতোক্ষন আত্নীয়াদের ভেতর থাকতে থাকতে যেনো দম বন্ধ হয়ে আসছিলো তার।

– কফি?

 

পাশ ফিরে তাকালে দেখে সোহাগ আর সুহানা দাঁড়িয়ে রয়েছে। মুচকি হেসে তাদের হাত থেকে কফি নিলো আয়াত। পিনপতন নীরবতা, বাড়িতে আয়াত এবং সাফওয়ান ব্যাতীত এই তিনটা মানুষ তাদের সম্পর্কের সত্যতাটা জানে। আয়াতের নিজের কাছেই প্রচুর অস্বস্তি লাগছে। ফট করে সুহানা বলে উঠে,

– ইফাদ ভাইয়ের সাথে তোমার রিলেশনটা কিভাবে শুরু হয়েছিলো আয়াত আপু?

 

সুহানার প্রশ্নে প্রথমে খুব অপ্রীতিকর অবস্থায় পরে যায় আয়াত। তারপর ধীর কন্ঠে বলতে থাকে,

– ইফাদ আমার সিনিয়র ছিলো, ওর সাথে প্রথম দেখা আর্ট গ্যালারির সামনে। আমার এক বন্ধুর দুলাভাই আর্ট গ্যালারির ম্যানেজমেন্টে ছিলেন। তখন এক্সিবিশন দেখবো বলে সবাই একসাথে গিয়েছিলাম। আরো একটি কারণ ছিলো সেটা হলো সাফওয়ান ভাইয়ের এক্সিবিশন দেখা। উনার ছবিগুলো যখন ফেসবুকে দিতো আমি পাগলের মতো ফলো করতাম। উনি যে আমাদের ক্যাম্পাসের এটা আমার জানাইছিলো না। তারপর কি! এক্সিবিশনে গেলাম। সেদিন ছিলো ২৫শে বৈশাখ; গ্রীষ্মের ফাটা দুপুরে প্রিয় আর্টিস্টের এক ঝলক দেখতে যাওয়া; কিন্তু ভাইয়ের যা পার্ট সে আমাদের সামনেই আসলেন না। বলেন উনি নাকি ছোটখাটো আর্টিস্ট। তুমি বলো সুহানা উনি কি ছোটমোটো আর্টিস্ট কি ট্যালেন্টেড। উনার সুবাদেই ইফাদের সাথে দেখা। সাফওয়ান ভাইয়ের সাথে পরিচিত হবার লোভে ইফাদের সাথে পরিচিতি, ফ্রেন্ড না উনার। তারপর দেখা হতো, কথা হতো। আমাকে সাফওয়ান ভাইয়ের ডিটেইলস বলতো, এভাবেই ভালোলাগা, তারপর ভালোবাসা, রিলেশন।

– তুমি কি ইফাদ ভাইকে ভালোবাসতে নাকি দাদাভাইকে?

 

সুহানার প্রশ্নে থতমত খেয়ে যায় আয়াত। কি উত্তর দিবে তা জানা নেই তার। বেশকিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে বলে,

– আমি ইফাদকে ভালোবাসতাম

– তুমি আমাকে কনভিন্স করছো নাকি নিজেকে

– সাফওয়ান ভাইকে আমার আর্টিস্ট হিসেবে ভালো লাগে, থাকে না পছন্দের আর্টিস্ট, নায়ক, গায়ক।

– সত্যি কি তাই আয়াত?(সোহাগ)

– তোমরা আমাকে কনফিউস কেনো করছো?

– তুমি ইফাদ আর সাফওয়ানের মাঝে কনফিউজ কেনো হচ্ছো আয়াত। নিজের মনকে জিজ্ঞেস করো, এই চার বছরে ইফাদ তোমার ফিলিং, তোমার ভালোলাগাগুলোকে কতোটা দাম দিয়েছে? তোমাদের রিলেশনে কমিটমেন্ট ব্যাপারটা কি সত্য ছিলো? আর তোমারো কি ইফাদকে ইফাদ হিসেবে ভালো লাগতো? নাকি সাফওয়ানের বন্ধু হিসেবে? এখনো দেরি হয় নি আয়াত নিজেকে প্রশ্ন করো। কাকে তুমি ভালোবাসো? কাকে তুমি বিশ্বাস করো? কার সাথে থাকলে তোমার মনে হবে তোমার কাছে সারা পৃথিবী রয়েছে? তোমার এই মনটা সব কিছু বলে দিবে তোমাকে।

 

সোহাগের কথাগুলো প্রচন্ড ভাবাচ্ছে আয়াতকে। বেডে এপাশ অপাশ করতে করতে আর না পেরে ছাদের উদ্দ্যেশে রওনা দেয় আয়াত। দরজা খুলে সিড়িতে যেতেই মনে সে যেনো হাওয়ায় ভাসছে। কিছুক্ষণ করে খেয়াল করে দেখে কেউ তাকে কোলে করে ছাদের সিড়ি বাইছে। রাতের অন্ধকারে লোকটির মুখ দেখতে পাচ্ছে না আয়াত। ছাদে নিয়ে লোকটি তাকে কোল থেকে নামালে আয়াত দেখতে পায়……………

 

চলবে

 

মুশফিকা রহমান মৈথি

 

মধুরেণ সমাপয়েৎ

১১তম পর্ব

 

দরজা খুলে সিড়িতে যেতেই মনে সে যেনো হাওয়ায় ভাসছে। কিছুক্ষণ করে খেয়াল করে দেখে কেউ তাকে কোলে করে ছাদের সিড়ি বাইছে। রাতের অন্ধকারে লোকটির মুখ দেখতে পাচ্ছে না আয়াত। ছাদে নিয়ে লোকটি তাকে কোল থেকে নামালে আয়াত দেখতে পায় পুরো ছাদ জোৎস্নায় আলোকিত। ফুলের মিষ্টি গন্ধ, জ্যোৎস্নার মাতাল করা পরিবেশে ভেতরের সত্ত্বাটাও বারংবার উম্মাদনায় মেতে উঠে। আরো মাতাল করে তুলছে পাশে থাকা মানুষটি; মানুষটি যে আর কেউ নয় সাফওয়ান। তার শরীরের মাতাল করা গন্ধটি আয়াতকে জানান দিয়েছে মানুষটি যে সে। জ্যোৎস্নার আলোতে মানুষটিকে একটি জীবন্ত নেশার স্তুপ মনে হচ্ছে; লোকটির সবকিছুতেই মাতাল করে দেবার ক্ষমতা রাখে। 

– এমনভাবে হা করে থাকলে মাছি ঢুকে পড়বে তো

 

সাফওয়ানের কথায় বেশ লজ্জা পেয়ে গেলো আয়াত। প্রচন্ড কাটা ভাষায় বললো,

– রাত বিরাতে মানুষকে ধুমধাম কোলে নিয়ে নিচ্ছেন, কিডন্যাপ করে ছাদে আনছেন; মতলব কি শুনি?

– ইচ্ছে হলো, বলা তো যায় না দেখা যাবে রাতের অন্ধকারে ধুপধাপ করে পড়ে দাঁত ভেঙে ফেলবে। আমি কিন্তু বাবা ফোকলা বউ বিয়ে করবো না। 

– বয়েই গেছে আপনাকে বিয়ে করতে আমার। 

– চেষ্টা করে দেখো, আমি আটকাবো না। তবে বিয়ে তো আমাকেই করতে হবে।

 

মুচকি হেসে ছাদের রেলিং এ গিয়ে বসে সাফওয়ান। আয়াতের কাছে আজ যেনো অন্য সাফওয়ান উপস্থিত। লোকটার মাঝে কি এমন আছে যা চুম্বকের ন্যায় আকর্ষন করে তাকে। নীরব রাতে মৃদু হাওয়ায় জ্যোৎস্না বিলাস বুঝি এমনই হয়। নীরবতা ভেঙে আয়াত বলে উঠে, 

– সাফওয়ান ভাই, সেদিন বলেছিলেন

 

কথাটি শেষ হতে না হতেই হ্যাচকা টানে আয়াতকে নিজের কাছে নিয়ে আছে সাফওয়ান। ঠোঁটে হাত দিয়ে বলে, 

– হুশ, বড্ড বেশী কথা বল। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শুনতে পাচ্ছো? রাতের নীরবতার সাক্ষ্ণী দিচ্ছে তারা। আজ যদি একটু বেহায়া হই, তুমি কি রাগ করবে? 

 

সাফওয়ানের দিকে একরাশ বিষ্ময় নিয়ে চেয়ে আছে আয়াত। আজ তার চোখে নেশা কাজ করছে; এ যেনো অন্য সাফওয়ান। সাফওয়ানের চোখে তাকাতেও ভয় হচ্ছে তার, এ চোখে যে হাজারো ভালোবাসা, মায়া, প্রণয়ের নেশা। আয়াতকে ভাসিয়ে তলিয়ে দিতে সক্ষম এই চোখের ঘোর। সাফওয়ানের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়াতে চাইলে সে কারো কাছে টেনে নেয় তাকে। কানে মুখ লাগিয়ে ধীর নেশা কন্ঠে বলে, 

– একটা গোপন কথা আছে শুনবে?

 

সাফওয়ানের চোখে চোখ রেখে ঘোরের মধ্যে উত্তর দেয় আয়াত,

– বলুন

 

আরো নেশাযুক্ত কন্ঠে বলে উঠে সাফওয়ান,

– এই বেহায়া আমি যে তোমার প্রেমে পড়ে গেছি গো। কখন, কিভাবে জানি না; তবে আমার প্রেম প্রেম জেগেছে। বিয়ের পর হয়তো ভালোবাসাটাও হয়ে যাবে।

– আপনি জানেন তো কি বলছেন?

– জানতাম না, এখন জানি। 

– আমার যে আর প্রেমের উপর ভরসা হয় না সাফওয়ান ভাই, আমি যে বড্ড এলোমেলো হয়ে রয়েছি। আমার এলোমেলো জীবনকে সাজিয়ে দিতে পারবেন কি? আমি আপনার জীবনে কি মেল খাই?

– জীবন তো তোমার যেমন এলোমেলো আমারও যে একই রকম। একে অপরেরটা নাহয় সাজালাম। এবার তোমায় ভালোবাসতে হবে না, শুধু আমায় ভালোবাসার অধিকারটা দিও।

 

বলে চোখের সামনের চুলগুলো সরিয়ে দিলো। আজ সাফওয়ানের চোখে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে আয়াতের। বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছে লোকটিকে। জ্যোৎস্নার আলোতে আয়াতে মুখখানি একটুকরো চাদের ফালি লাগছে সাফওয়ানের কাছে, যার চোখে, ঠোঁটে আফিমের চেয়েও মারাত্নক নেশা। দু হাতে আলতো করে মুখটি ধরে নিজের আরো কাছে নিয়ে আসে, আয়াতের কাঁপাকাপা ঠোঁট যেনো আরো ঘোরের মাঝে ফেলে দিচ্ছে তাকে। আজ একটু বেহায়া হতে কি খুব দোষ হবে! দুই ওষ্ঠযুগলের মাঝের দূরুত্ব মিটিয়ে নিজের পিপাসা মিটাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সাফওয়ান। নিজের ঠোঁটের উপর আরেক জোড়া উত্তপ্ত ঠোঁটের ছোঁয়া পেতে অজানা আবেশে নিজেকে হারিয়ে ফেলে আয়াত। অজান্তেই হাতজোড়া সাফওয়ানকে আকড়ে ধরে। অজান্তেই চোখ বেয়ে নোনাজলের আগমণ ঘটে। আজকের রাত্রি যেনো সাফওয়ান এবং তার অনুভূতিগুলোর মিশ্রণের সাক্ষ্ণী। 

 

কিছুসময় পর সাফওয়ানের ঠোঁট তার ঠোঁট জোড়াকে ছেড়ে দিলে আয়াতের হুশ ফিরে। এতোক্ষণ যেনো একটি ঘোরে মাঝে ছিলো সে, ঘোর কেটে যেতেই আবারো হাজারো প্রশ্নের ভিড় জমে আয়াতের মনে। আবেশের বশে ভুল করছে নাতো সে? এক মূহুর্ত দেরি না করে দৌড়ে বেরিয়ে যায় সে। সাফওয়ান হতভম্ব চোখে তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকে। 

 

দুদিন পর, 

সকাল ১১টা, 

হলুদের অনুষ্ঠান ধুমধাম করে অনুষ্ঠিত হবার পর এখন অপেক্ষা কালকের বিয়ের। এই দুইদিন আয়াত না পারতে সাফওয়ানের সামনে আসে নি। সাফওয়ান হাজারোবার তার সামনে যাবার চেষ্টা করছে কিন্তু তাতে লাভ হয় নি। অনুতাপ এবং একরাশ অভিমানে ভেতরটা তীব্র আগুনে দদ্ধ হচ্ছে সাফওয়ানের। তবে কি আয়াত এখনো ইফাদকেই ভালোবাসে। এখনো সে ইফাদের অপেক্ষায় আছে? তবে সাফওয়ানের ভালোবাসার সামান্যতম মূল্যটি তার কাছে নেই? প্রণয়ের ডাকে সাফওয়ানের হুশ ফিরে,

– তোকে বড়মা, নিচে যেতে বলছে তো।

– এখন কেনো?

– আরে কে জানে এসেছে তোকে খুজছে। যা না

– আচ্ছা, বেশি বকিশ না। 

 

নিচে যেতেই দেখে সেলিনা বেগমের সাথে হাসি মুখে একটি ছেলে কথা বলছে। ছেলেটির পিট তার দিকে, তাই মুখটি দেখতে পাচ্ছে না। সাফওয়ান নিচে নামতেই সেলিনা বেগম বলে উঠেন,

– সাফওয়ান চলে এসেছে

 

ছেলেটি পেছন ফিরতেই আকাশটা ভেঙ্গে পড়ে সাফওয়ানের। সামনে দাঁড়ানো শ্যাম বর্ণের, লম্বা, চিপচিপে গড়নের ছেলেটি যে আর কেউ নয় ইফাদ। মুচকি হেসে টিটকারির ছলে বলে উঠে, 

– বিয়ে করছিস দাওয়াত ও দিলি সাফওয়ান, এই বুঝি আমাদের বন্ধুত্ব।

 

বেলা ১২টা, 

মুখোমুখি বসে আছে আয়াত এবং ইফাদ। আজ দুই সপ্তাহ পর ইফাদকে দেখছে সে, একরাশ ঘৃণা আয়াতের চোখে ফুটে উঠেছে। কোথায় ছিলো সে যখন সারারাত কাজী অফিসের বাহিরে এক কাপড়ে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে? কোথায় ছিলো সে যখন পুলিশের থানায় জেলে যাবার ভয়ে মিথ্যে বলতে হচ্ছিলো? কোথায় ছিলো সে যখন বাবা তার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলো, থাকার জায়গা নিয়ে চিন্তা করতে হতো তাকে। এখন যখন মনটাকে স্থির করে ফেলেছে, এখন কেনো তার আগমণ ঘটলো? 

– আয়াত, তুমি নাকি আমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবে না? তা এখন কি করছো, দুই সপ্তাহে ভালোবাসা উবে গেলো? আরে বাবা একটা জমির কাজে ইমিডিয়েটলি সিলেটে বাবার সাথে যেতে হয় আমাকে। মোবাইল হারিয়ে যাওয়ার জন্য কন্ট্যাক্ট করতে পারছিলাম না, তাড়াহুড়ো করে ফিরে এসেছি তোমার জন্য। এসে শুনছি সাফওয়ানের গলায় ঝুলে গেছো তুমি। এই তোমার লয়ালিটি? এই তোমার ভালোবাসা?

– মুখ সামলে কথা বলো ইফাদ, এতোদিন পর আমি কেমন আছি না জিজ্ঞেস করে তুমি আমার কাছে জবাবদিহিতা চাইছো?

– কি সামলাবো? আমার জিএফ আমার বন্ধুকে কাল বিয়ে করতে যাচ্ছে আর আমি কিনা এখানে তোমার সাথে প্রেমালাপ করবো? আচ্ছা কেমন আছো?

– তুমি কি আদৌও জানো এতোদিন আমরা কিসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম? তুমি কি আদৌ জানো আমি তোমাকে খুজতে তোমার বাসা অবধি পর্যন্ত গিয়েছিলাম? ইসরাতকে পাগলের মতো ফোন করেছি, তোমার বন্ধুদের। যে চোর ফোন চুরি করেছে সে হসপিটালে ভর্তি ছিলো, তাকে তুমি ভেবে দৌড়ে গিয়েছি। এখন তুমি কিনা আমার লয়ালিটি নিয়ে প্রশ্ন করছো? কি রাইট আছে তোমার। আমি লয়াল নই, রাস্তার মেয়ে, যে কিনা যখন যে পুরুষ পাই তার গলায় ঝুলে পড়ি।

 

কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলতে লাগলো আয়াত। ইফাদ তখন আয়াতকে জড়িয়ে ধরে শান্ত কন্ঠে বলতে লাগলো, 

– জানো তো কতোটা ভালোবাসি তোমায়, সাফওয়ান যদিও আমাকে সব বলেছে তবুও তোমাদের বিয়ের কথাটা শুনে পাগল পাগল লাগছিলো। সরি বাবু, আর হবে না সরি।

 

এই দৃশ্যটি একজনের চোখ এড়ালো না। সেদিন রাতের উত্তর আজ তার কাছে পরিষ্কার। শুধু দুজন প্রেমিক প্রমিকার মাঝে তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে কি লাভ। সাফওয়ান আর দাঁড়িয়ে সেখান থেকে প্রস্থান করে। 

 

বিয়ের দিন,

সন্ধ্যা ৭টা, 

বর বেশে স্টেজে বসে র‍্যেছে সাফওয়ান। ইফাদ বিয়েতে উপস্থিত, কিন্তু কালকের দুপুরের পর আর সাফওয়ান তার সামনে যায় নি। বুকের ব্যাথাগুলো তীব্র হয়ে যাচ্ছে তাকে দেখলে। কাজী সাহেব তার কাছে বিয়ের সব কথা বলে জিজ্ঞেস করে,

– আপনি কি এই বিয়েতে রাজী, রাজী থাকলে বলুন কবুল

 

তখন…………

 

চলবে 

 

মুশফিকা রহমান মৈথি

 

মধুরেণ সমাপয়েৎ

১২তম পর্ব

 

কাজী সাহেব তার কাছে বিয়ের সব কথা বলে জিজ্ঞেস করে,

– আপনি কি এই বিয়েতে রাজী, রাজী থাকলে বলুন কবুল

 

তখন প্রণয় কানে কানে এসে কিছু একটা বলে সাফওয়ানকে। প্রণয়ের কথাটা শুনেই সাফওয়ান বলে উঠে,

– সত্যি?

– হু, মাত্র সুহানা বললো

 

কাজী সাহেব পুনরায় একই কথাই বললেন,

– আপনি কি এই বিয়েতে রাজী, রাজী থাকলে বলুন কবুল

 

মুচকি হেসে সাফওয়ান বলে উঠে,

– কবুল

 

সবাই একসাথে “আলহামদুলিল্লাহ” বলে উঠে। ইফাদ এক কোনায় দাঁড়িয়ে ম্লান হাসি হেসে বেরিয়ে যায়। রাতের একা আকাশে আজ তাকে একাই হাটতে হবে। নিজের সামান্য দায়িত্বহীনতার জন্য সবচেয়ে দামী জিনিস যে হারিয়ে ফেলেছে সে। আয়াতের প্রতি তার ভালোবাসাতে বুঝি অনেক বড় ফাঁক থেকে গেছে, তাইতো আজ সে অন্য কারোর হয়ে গেছে। সেদিন তাই স্পষ্ট তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলো আয়াত।

 

সেদিন,

– জানো তো কতোটা ভালোবাসি তোমায়, সাফওয়ান যদিও আমাকে সব বলেছে তবুও তোমাদের বিয়ের কথাটা শুনে পাগল পাগল লাগছিলো। সরি বাবু, আর হবে না সরি।

 

নিজের থেকে ইফাদকে সরিয়ে একটু দূরে দাঁড়ায়, ইফাদের চোখে চোখ রেখে বলে,

– সেদিন যখন আমার তোমাকে সব থেকে বেশি দরকার ছিলো তুমি তখন আমার পাশে ছিলে না ইফাদ, ফোন হারিয়েছিলো কিন্তু পৃথিবীর উপর থেকে ফোন তো শেষ হয়ে যায় নি। অথচ তুমি আমাকে একটা বার জানাও নি। আমি পাগলের মতো তোমায় খুজেছি। আমি তোমাকে দোষ দিবো না ইফাদ। তোমার সাথে সেই মূহুর্তে যেটা জরুরি মনে হয়েছে তুমি করেছো। কিন্তু আমি তোমায় আর ভালোবাসি না ইফাদ। এতোদিন আমি কনফিউশানে ভুগেছি কেনো আমি বারবার সাফওয়ান ভাই এর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছি। আজ আমার কাছে সেটা পানির মতো পরিষ্কার। আমি তাকে ভালোবাসি, প্রচুর ভালোবাসি। থ্যাংক উ আমার সামনে আবার আসার জন্য। নয়তো আমি নিজের মনকে বুঝতেই পারতাম না। ভাবতাম, ভুল করছি; কনফিউজড থাকতাম। কিন্তু আজ আমার কনফিউশান ক্লিয়ার হয়ে গেছে। থ্যাংক উ। তুমি অনেক ভালো একটা মানুষ; আজ যদি তোমার সাথে আবার জড়িয়ে পড়তাম তবে সেটা তোমার বা আমার কারোর জন্যই ভালো হতো না। কারণ আমি তোমার স্বচ্ছ থাকতাম না। আমার মনে তো এখন অন্য কারোর রাজত্ব। আমাকে ক্ষমা করে দিও ইফাদ। আই এম সরি। আই এম সরি। কিন্তু আমি সাফওয়ান ভাইকে ভালোবাসি। প্রচুর ভালোবাসি, সরি।

 

বর্তমান,

ইফাদের চোখ বারবার ভিজে যাচ্ছে। সে যে আজ নিঃস্ব, তবে একটাই সান্তনা আয়াত তাকে ঠকায় নি। তার কাছে নিজেকে স্বচ্ছ রেখেছে। এখন মন তো কখন কাকে নিজের সিংহাসনে বসিয়ে দেয় কেউ জানে না!

 

রাত ১২টা, 

খুব তোড়জোড় করে শেষমেশ বাসর ঘরে ঢুকার সুযোগ পেলো সাফওয়ান। ঘরে ঢুকে দেখলো, মোমের আলোয় ঘরটাকে নতুন বউ এর নেয় সাজানো হয়েছে। খাটটা পুরো সাদা আর লাল গোলাপের মোড়া, এর মাঝে লাল শাড়ি পড়ে ঘোমটা দিয়ে এক রূপবতী বসা। চাদের আলো জানালার ফাক দিকে ঘরে ভেতর উপসে পড়ছে। রুপবতীটি যে সাফওয়ানের মায়াবতী। যার নেশায় আজকাল সে মত্ত থাকে। ধীর পায়ে আয়াতের পাশে গিয়ে বসে। সাফওয়ানের উপস্থিতি আয়াতের হার্টবিট বাড়িয়ে তুলছে। দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে তার। আলতো করে তার হাতে নিজের হাত রেখে মজার ছলে সাফওয়ান বলে,

– ইফাদ, চলে গিয়েছে। ভেবেছিলাম তুমি হয়তো ওর সাথেই চলে যাবে। সমস্যা নেই আমি একটা লয়ারের সাথে কথা বলে ছ মাস পর আমাদের ডিভোর্সের ব্যাবস্থা করে ফেলবো

-………

 

আয়াতকে চুপ থাকতে দেখে আলতো হাতে ঘুমটা সরায় সাফওয়ান। দু হাতে আয়াতের মুখ আলতো করে ধরে উচু করে সে। আয়াতের চোখে পানি চিকচিক করছে। আয়াতের চোখে চোখ রেখে শান্ত কন্ঠে বলে উঠে,

– তুমি তো এটাই চেয়েছিলে, তবে আজ চোখে পানি যে?

– আপনি কি সত্যি বুঝেন না? নাকি বুঝেও না বুঝার ভান করেন? 

 

কাঁপা কাঁপা গলায় আয়াত বলে উঠে।

– কি বুঝবো? তুমি যদি বুঝিয়ে না বলো বুঝবো কিভাবে? 

– সব কিছু বলে বুঝাতে হয়। 

– হয় বই কি! কিছু জিনিস বলে করে বুঝাতে হয়। এতোদিন তো তুমি যা বলেছো আমি তাই বুঝেছি। দেখো না বিয়ে ভাঙ্গার কথা বলেছো, আমি সেটার চেষ্টা করেছি। ঢাকা যেয়েই উকিলের সাথে….

 

কথাটা শেষ না হতেই সাফওয়ানের ঠোঁট জোড়া চেপে ধরলো নিজ ঠোঁট জোড়া দিয়ে। ঘটনার আকর্ষিকতায় সাফওয়ানের মাথা পুরো ফাঁকা হয়ে গেছে। আয়াতের পক্ষে এমন একটা সাংঘাতিক কাজ করা সম্ভব এ যেনো ধারণার বাহিরে ছিলো সাফওয়ানের। বেশকিছুক্ষণ পর সাফওয়ানের ঠোঁট জোড়াকে মুক্তি দেয় আয়াত। শাড়ির আঁচলটা মাজায় বেধে সাফওয়ানের কলার চেপে ধরে রাগী গলায় বলে,

– আরেকবার যদি ডিভোর্সের কথা শুনেছি তো দেখবেন আমি করি। ফাজলামি পাইছেন? এতো যখন আমাকে অপছন্দ তাহলে সেই রাতে কেনো আমাকে বলেছিলেন ভালোবাসি? ইফাদের সাথে চলে গেলে খুশি হতেন বুঝি। আপনি কি ভেবেছেন এতো সহজে আপনাকে মুক্তি দিবো। সারাজীবন এভাবেই আমাকে সহ্য করতে হবে। আর মরে গেলে ভুত হয়ে আপনার ঘাড়ে চেপে বসবো কিন্তু আমার থেকে আপনার নিস্তার নেই। 

 

বলতে বলতেই চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে আয়াতের। প্রচুর কান্না পাচ্ছে তার। লোকটা এমন কেনো? যদি দূরে ঠেলে দেবার ইচ্ছা ছিলো তবে কেনো কাছে টেনে নিয়েছে। সাফওয়ান মুচকি হেসে হ্যাচকা টানে তাকে বুকে আগলে ধরলো; কানে মুখ লাগিয়ে বললো,

– এবার নিজ ইচ্ছায় আমার কাছে এসেছো। এবার যদি তুমি চাইলেও আমি তোমাকে ছাড়বো না। এইভাবে শক্ত করে নিজের কাছে রেখে দিবো। 

– সত্যি? তাহলে এতোক্ষণ যে

– ওইটা একটা ছোট্ট শাস্তি ছিলো, আমাকে এই তিনদিন কষ্ট দেওয়ার জন্য। আমি তো সত্যি সত্যি বিয়েটা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম; কিন্তু আজ যখন প্রণয় কানে কানে বললো, তুমি নিজ থেকে ইফাদকে ফিরিয়ে দেবার কথা সুহানাকে জানিয়েছো আমার ওশান্ত মন শান্ত হয়ে গিয়েছিলো। তাই দেরি না করে কবুলটা বলে দিয়েছি। 

– আপনি খুব খারাপ। 

– এখনো তো কিছুই দেখাই নাই এখনই খারাপ হয়ে গেলাম? 

– আমি কিচ্ছু দেখবো না

– তা বললে তো হবে না এখন সে অনেককিছু দেখার বাকি রয়েছে

– কি?

– আসো আমার সাথে।

 

বলেই কোলে তুলে নিলো আয়াতকে। সাফওয়ানের রুমের ভেতরে একটি ছোট স্টোর রুমের মতো জায়গা রয়েছে যেখানে সাফওয়ান বাসায় থাকতে ড্রয়িং করতো; যাকে সে তার কল্পনারাজ্য বলে। তার সকল সৃষ্ট সকল শিল্প সেখানে মজুত। আয়াতকে কোলে করে তার কল্পনারাজ্যে নিয়ে যায় সে। একটি চেয়ারে তাকে বসিয়ে সামনে থাকা সকল ড্রয়িং বোর্ডের উপর থেকে কাপড় সরিয়ে দেয়। আয়াতের চোখ যেন বিশ্বাস করতে চাচ্ছে না। সব গুলো ক্যানভাসে তার পোর্ট্রেইট। রংতুলির আচড়ে আকা এক একটি জীবন্ত আয়াত তার সামনে। অজান্তেই নোনা জলের ভিড় জমেছে চোখে তার। এখনই চোখগুলো তাদের মুক্তি দিবে যেনো। ধরা গলায় বলে উঠে,

– আপনি তো বলেছিলেন আমার চেহারা ক্যানভাসে তুলার যোগ্য নয়। 

– নয় ই তো, তাই তো শুধু ক্যানভাসেই থাকবে এই চিত্র।

– তাই বুঝি?

– হু, তাই তো। এই সারপ্রাইজটা তোমাকে দেওয়ার ছিলো

 

বলে আয়াতের কপালে উষ্ণ ঠোঁটের পরশ দেয়। 

– আজ রাতে তোমাকে ভালোবাসার অধিকার দিবে আয়াত?

– আমি তো মানা করি নি। 

– তবে একটু বেহায়া হতে দোষ নেই বলো। 

 

বলেই পুনরায় কোলে তুলে নেয় আয়াতকে। আয়াতকে বিছানায় শুইয়ে রুমের মোম গুলি নিভিয়ে দেয় সে। রাতের নীরবতা, চাদের কালো সাক্ষ্ণী হলো তাদের মধুর মিলনের। কিছু আর্তনাদ, কিছু উষ্ণ নিঃশ্বাসের মধ্য দিয়ে সুখ কুড়াতে ব্যস্ত তারা। আজ তাদের ভালোবাসা পূর্ণতা পেলো। 

 

তিন বছর পর,

হাসপাতালের ওপারেশন থিয়েটারের বাহিরে পায়চারি করছে সাফওয়ান। টেনশনে শ্বাস আটকে যাচ্ছে তার। আয়াত এবং তার পরিবারের সবাই সেখানে উপস্থিত। বারবার সান্তনা দিচ্ছেন রামিম সাহেব। কিন্তু কিছুতেই সাফওয়ানকে শান্ত করতে পারছেন না তিনি। আজ যে আয়াতের ডেলিভারি, এক ঘন্টা হয়ে গেছে এখনো কোনো খবর নেই। এমনিতেই আয়াতের অবস্থা সিরিয়াস ছিলো, আর্লি লেবার পেইন উঠেছে মাত্র সাত মাস চলছে প্রেগ্ন্যাসির। ভয়ে গলা শুকিয়ে যাচ্ছে সাফওয়ানের। থিয়েটারে ঢুকার আগে আয়াত বলেছিলো,

– যদি এবার ফিরে না আসি, তবে জেনে রেখো খুব ভালোবাসি তোমায়। 

 

কথাটা মনে করতেই চোখ ভিজে আসছে সাফওয়ানের। ঠিক তখনই ডক্টরের আগমণ ঘটে, ছুটে গিয়ে কাছে যেতেই প্রথম প্রশ্ন ছিলো,

– আয়াত কেমন আছে ডক্টর?

– কংগ্রেচুলেশন, আপনার জমজ মেয়ে হয়েছে।

– আচ্ছা, আয়াত কেমন আছে?

– নার্স মেয়েদের নিয়ে আসছেন, আপনার মেয়েরা প্রিম্যাচ্যুর কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছে।আপনি কি খুশি নন মি. সাফওয়ান?

– আরেহহ ধুর, আমার ওয়াইফ কেমন আছে সেটা বলেন? দম আটকে যাচ্ছে আমার।

– আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছেন, একটু উইক। এক সপ্তাহ রেস্ট করতে হবে। 

 

ভয়ে ভয়ে ডাক্তার বলে কথাগুলো। আয়াত ঠিক আছে শুনতেই সাফওয়ান খেয়াল করলো, ডাক্তার বলেছিলো তার মেয়ে হয়েছে তাও জমজ। খুশিতে পাগল প্রায় হয়ে গেছে সে। নার্স যখন মেয়েদের নিয়ে এসেছে, সাফওয়ানের কাছে মনে হয়েছে ছোট দুইটো আয়াত তার কাছে নিয়ে এসে নার্স। দুজনকে একসাথে কোলে নিয়ে নিলো সে। মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব থেকে সুখী ব্যক্তি সে। 

 

তিন ঘন্টা পর,

আয়াতের জ্ঞান ফিরলে দেখে সবাই ঝুকে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। সবার মাঝে সে তার সাফওয়ানকেই খুজে যাচ্ছিলো। ধীর কন্ঠে শারমিন বেগমকে জিজ্ঞেস করে,

– সা…সাফ…ওয়ান

– ওইযে আসছে। 

 

সবার পেছন থেকে সাফওয়ান বেরিয়ে এলো, নার্সরা একে একে দুই মেয়ে আয়াতের পাশে রাখে। আয়াতের চোখে পানি চিকচিক  করছে। ভেবেছিলো হয়তো এই খুশি তার দেখা হবে না। সবাই রুম থেকে বেরিয়ে গেলে সাফওয়ান আলতো হাতে আয়াতকে উঠে বসিয়েছে। বাচ্চাগুলোর একজনকে আয়াতের কোলে দিয়ে আরেকজনকে নিজের কোলে নেয় সে। আয়াতের পাশে বসলে আয়াত ধীরে তার মাথাটা সাফওয়ানের কাধে এলিয়ে দেয় আর বলে,

– কার মতো হয়েছে বলো তো?

– তোমার মতো, থ্যাংক ইউ ফিরে আসার জন্য।

– আল্লাহ চেয়েছেন তাই ফিরে আসতে পেরেছি, তুমি খুশি তো। 

– খুব খুব খুশি। তবে আমরা আর এই বাচ্চা নেওয়ার কথা ভাববো না। 

– কেনো?

– আমার দম বন্ধ লাগছিলো তোমাকে ছাড়া। যদি কিছু হয়ে যেতো? আমি কি করতাম তখন? পাগল হয়ে যেতাম সত্যি বলছি।

– তুমি সত্যি পাগল। 

– ওদের নাম কি রাখবে?

– ভাবি নি

– আমি বলি আল্পনা এবং কল্পনা

– ধুর এই আধ্যাত্মিক নাম আমি রাখবো না।

– কেনো সুন্দর তো

– না বলেছি, মানে না

– আমি ওদের বাবা

– তো?

– মানে কি!!

 

এভাবেই আবার খুনসুটিতে মেতে উঠলো আয়াত এবং সাফওয়ান। তাদের জীবনে এই অধ্যায়ের মধুরেন সমাপয়েৎ ঘটেছে। তাদের ভালোবাসার মধুরেন সমাপয়েৎ ঘটেছে। থাকুক তারা তাদের মতো সুখে আজীবন

 

||সমাপ্ত||

 

মুশফিকা রহমান মৈথি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।