রাশিয়ার ইয়েকাতেরিনবার্গ শহর যেন আজ বৃষ্টিতে ভাসছে। এ বছরের ভিতর এই প্রথম এত ভারী বৃষ্টি হলো। গত বেশ কয়েকদিন ধরেই চলছে একটানা বৃষ্টিপাত। রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে বৃষ্টির জলে। বাহির জগতে মানুষের চলাচলও লঘু হয়েছে এর দরুণ। 

ঘড়ির কাঁটা জানান দিচ্ছে এখন মাঝরাত। বাইরে মানুষের চলাচল নেই। এই তীব্র নিশুতি বৃষ্টির রাতে সবাই-ই দরজায় খিল এঁটে ঘুমিয়ে গেছে। হয়তো কদাচিৎ দুই-তিনজন এখনও আছে বাইরে। হেসেতু নামের মেয়েটাও তাদেরই অন্তর্গত। 

হেসেতু একটা রেস্তোরাঁয় কাজ করে। সন্ধ্যা থেকে তার কাজ শুরু হয়ে পাঁচ ঘণ্টা যাবৎ চলে। কিন্তু আজ সে ভুল বশত দুটো প্লেট ভেঙে ফেলেছে। যার কারণে রেস্তোরাঁর মালিক এত রাত পর্যন্ত কাজ করিয়েছে তাকে। 

রেস্তোরাঁর মালিক একজন মোটাসোটা আফ্রিকান মহিলা। মহিলাকে হেসেতুর কখনোই পছন্দ হয়নি। মহিলার ব্যবহারের কারণে সে অনেকবার চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কথা চিন্তা করেছে। কিন্তু অন্যত্র চাকরি না হওয়ার কারণে সে চাকরিটা ছাড়তে পারছে না। হেসেতু অনাথ। নিজের যাবতীয় চাহিদা নিজের অর্জিত অর্থ দ্বারাই সম্পূর্ণ করতে হয়। কাজটা ছেড়ে দেওয়া তার জন্য অনেক কঠিন ব্যাপার এজন্য। আজ অবশ্য সে কাজেই আসতে চাচ্ছিল না, বৃষ্টির কারণে। এত বৃষ্টি শুরু হয়েছে! দুর্ভাগ্যবশত কোনো গাড়িও পায়নি। অগত্যা পায়ে হেঁটেই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে। 

হেসেতুর মাথার উপর কালো ছাতা। বৃষ্টির পানি ছাতায় পড়ে গড়িয়ে যাচ্ছে। হাঁটার কারণে ছলাৎ ছলাৎ একটা শব্দ হচ্ছে পানিতে। নিজ এলাকার মধ্যে ঢুকে পড়েছে সে। সরু একটা গলি পার হয়ে যাচ্ছে। হৃৎপিণ্ডটা লাফাচ্ছে দ্রিমদ্রিম করে। গত দুই মাসে মোট ছয়জন মানুষ খু’ন হয়েছে এলাকার ভিতর! খু’নের ধরন একই। বলা হচ্ছে এটা কোনো সিরিয়াল কি’লারের কাজ। পুলিশ তদন্ত চালাচ্ছে। হেসেতুর নেত্রপটে ভাসতে লাগলো মৃত লা’শ গুলোর ছবি। প্রতিটা লা’শের মাথা থেঁ’তলানো। পুরো শরীর ক্ষ’ত-বি’ক্ষত করা হয়েছে ধারালো অস্ত্র দ্বারা। মাথা থেকে কান দুটো কে’টে নেওয়ার ফলে কান অদৃশ্য! বুকের বাঁ পাশে, ঠিক যেখানে হৃৎপিণ্ড সেখান বরাবর ধা’রালো অ’স্ত্র চালানো হয়েছে অনেকবার। হাত-পায়ের ন’খ গুলোও উ’ঠিয়ে নেওয়া হয়েছে! হেসেতুর পুরো শরীরে বিজলি চমকানোর মতো ভয় চমকে উঠলো। এখন যদি তার উপরও হা’মলা করে সেই খু’নি? আশেপাশে একটা মানুষেরও অস্তিত্ব নেই। সে চিৎকার করলে কেউ দেখতেও আসবে না। না, তাকে যত দ্রুত সম্ভব বাড়িতে পৌঁছতে হবে। হেসেতু পায়ের গতি দ্রুত করলো। অল্পতেই সে পার হয়ে এলো অনেকটা পথ। কিন্তু হঠাৎ অদ্ভুত কিছু অনুভব করায় জমে গেল বরফের ন্যায়। মনে হলো সে দাঁড়ানো মাত্র পিছনে পানিতে যে শব্দটা হচ্ছিল সেটাও থেমে গেছে। হেসেতুর শিরদাঁড়া বেয়ে ভয়ের শৈত্য ধারা গড়িয়ে পড়লো। থরথর করে কাঁপতে লাগলো তার শরীর। পিছনে কারো উপস্থিতি অনুভব করতে পারছে। কেউ একজন আছে পিছনে। আর তার ধারণা এটা ওই খু’নিটা! তাকেও খু’ন করতে এসেছে! ভয়ের ঝটিকা তীব্র হয় হেসেতুর। চোখ বেয়ে জল গড়ায়। সে ভয়ে এতটাই আড়ষ্ট যে সামান্যতম পিছন ফেরার শক্তিটুকু খুঁজে পেল না। সাহসের স্থিতি ভয়ে শুকিয়ে মরুভূমির রূপ ধারণ করেছে। 

কিছু সময় ওভাবেই কাটলো। পিছনে আর কোনো শব্দ হলো না। পিছনের মানুষটা একটু নড়েনি পর্যন্ত। 

কিছু সময় পর হেসেতু ভীত হৃদয়ে আস্তে করে মাথা ঘুরিয়ে তাকালো। আর ঠিক তখনই রেইনকোট পরা লোকটা হাতের হাতুড়িটা দিয়ে আ/ঘা/ত করলো হেসেতুর মা’থায়! যন্ত্রণা আর ভয়ে চিৎকার করে হেসেতু পড়ে গেল গলির রাস্তায়। পানিতে ঝপ করে শব্দ হলো একটা।

লোকটা এগিয়ে এসে হা’তুড়ি দিয়ে একের পর এক আ’ঘা’ত করতে শুরু করলো হেসেতুর মাথায়! 

হেসেতুর শরীর নেতিয়ে পড়তে বেশি সময় নিলো না। প্রথমে অসহ্য আঘাতে চিৎকার করলেও বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না সে চিৎকার। ক্ষণিকের ভিতরই তার চিৎকার করার শক্তিও লোপ পেল। থে’তলে গেছে মাথা! চোখ, নাক, ঠোঁট সর্বত্রই হা’তু’ড়ির বাড়ি লাগার কারণে গভীর জ’খ’ম সৃষ্টি হয়েছে। এই মুহূর্তে ওর মুখ দেখলে ভয়ে হৃৎপিণ্ড নড়ে উঠবে যে কারোর। 

স্ট্রিট লাইটের আলো ঝাপসা হলেও তাতে দেখা গেল পানির বর্ণ লাল রূপ ধারণ করেছে। ধীরে ধীরে লাল রংটা আরও বিস্তৃত হলো। 

রেইনকোট পরিহিত লোকটার হা’তুড়ির জো’রালো বাড়িটা আবারও গিয়ে লাগলো হেসেতুর মা’থায়!

হেসেতুর শরীর নিথর। যদিও নিথর শরীর থেকে প্রাণ পাখিটা তখনও উড়াল দেয়নি। তবে ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে জীবনের প্রহর!

 

_______________________________________________

 

[সেন্ট পিটার্সবার্গ, রাশিয়া; ২০২১ সাল।]

 

সাদা ওয়েডিং ড্রেস পরিহিত মেয়েটার দু চোখে প্রতারণার অশ্রু ছলছল করছে। তার বিশ্বস্ত পুরুষটা তার সাথে এত বড়ো প্রতারণা করলো? এভাবে ঠকালো তার বিশ্বাস, ভালোবাসাকে? 

 

তারাস নাতালিয়ার দুই হাত আঁকড়ে ধরে ব্যাকুল কণ্ঠে বললো,

“এটা বিশ্বাস করো না নাতালিয়া। এটা ফেইক। এটা অবশ্যই ফেইক।”

 

“আমি তোমাকে সত্যিই ভালোবেসেছিলাম তারাস।” নাতালিয়ার চোখ বেয়ে জল নেমে গেল, “কিন্তু তুমি আমাকে মিথ্যা বলেছো। যে সম্পর্কের ভিতর মিথ্যা থাকে সেই সম্পর্ক কোনোদিনও সুখী হয় না।”

 

নাতালিয়া তারাসের হাত ছাড়িয়ে দিলো। তারাস হাতটা ধরে রাখতে চেয়েও পারলো না। নাতালিয়া ফিরে এলো যেখানে কিছুক্ষণ পরই তার আর তারাসের বিয়ে হতো। নাতালিয়া তার বাবা ইমমানুইলকে বললো,

“ফিরে চলো পাপা। আমি এই বিয়ে করবো না!”

 

অল্পক্ষণের মধ্যেই চার্চ ফাঁকা হয়ে গেল। তারাস শত বলেও নাতালিয়া আর ওর পরিবারকে মানাতে পারলো না। এক পর্যায় সে ক্লান্ত হয়ে হাল ছেড়ে দিলো। চার্চে তারাস আর তার গোটা কতক বন্ধু রয়েছে এখন। তারাসের মা-বাবা কেউ উপস্থিত নেই। তারা থাকে মস্কোতে। কথা ছিল বিয়ের দুইদিন পর সে আর নাতালিয়া মস্কোতে গিয়ে মা-বাবার আশীর্বাদ গ্রহণ করবে এবং ওখানে থাকবে কিছুদিন। কিন্তু সবকিছু এখন ভেঙে গেছে। তারাসের প্রচণ্ড ক্ষোভে চিৎকার করতে ইচ্ছা হলো। 

তারাসের সবচেয়ে কাছের বন্ধু লিওনিদ এসে নিচু স্বরে বললো,

“জেনোভিয়া পার্কিং সাইডে আছে।”

 

তারাসের দু চোখ হঠাৎ রাগে আগুনের মতো দীপ্তি ছড়ালো। ক্ষুব্ধ চৈতন্যে দাঁতে দাঁত চেপে উচ্চারণ করলো,

“নেপোসলুশনায়া দেভোচকা!”  

 

সে দ্রুত গতিতে বেরিয়ে গেল চার্চের ভিতর থেকে। চার্চের লনটা বিশাল। সবুজ ঘাসে আবৃত। বিশাল লনটার একপাশে রয়েছে পার্কিং সাইড। ওখানে মাত্র চারটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। তার ভিতর থেকে জেনোভিয়ার গাড়িটা খুঁজে বের করতে তারাসের কোনো প্রকার কষ্টই হলো না। সে এগিয়ে এসে প্রচণ্ড এক আ’ঘাত করলো জেনোভিয়ার গাড়িতে।

“বেরিয়ে এসো।” চেঁচিয়ে বলে উঠলো জেনোভিয়াকে।

 

জেনোভিয়া বের হলো না। গাড়ির কাচটা নেমে গেল নিচে। ভিতরে দেখা গেল নীলাভ রঙের পোশাক পরিহিত একটা মেয়ে বসে আছে। চেহারা তার উজ্জ্বল ফরসা এবং গোলাকৃতির। মাথায় একটা হেয়ার ব্যান্ড। কাঁধ বেয়ে সোনালি চুলগুলো সামনে নেমে এসেছে। নীল চক্ষুদ্বয় তারাসের উপর আবর্তিত। তারাসকে গভীর চোখে দেখছে সে। তারাসের পরনে বিয়ের স্যুট। চুলগুলো পরিপাটি করে আঁচড়ানো। ফ্রেশ সেভিং করা মুখটা আজ বেশিই উজ্জ্বল এবং সুন্দর দেখাচ্ছে। বিয়ে বলে কি তারাস বেশি সুন্দর হয়ে গেছে? ভাবলো জেনোভিয়া। এও ভাবলো, তারাস আগে থেকেই বেশ সুন্দর ছিল, বিয়ের দিনে এত সুন্দর হওয়ার কোনোই প্রয়োজন ছিল না। যে সুন্দর তার আরও বেশি সুন্দর কেন হতে হবে? 

 

“কী কী বলেছো তুমি নাতালিয়াকে?” ভীষণ রেগে বললো তারাস, “তোমার আর আমার ভিতর এখনও রিলেশনশিপ চলছে? যে রিলেশনশিপ চার মাস আগেই ভেঙে গেছে সেই রিলেশনশিপ? আর কী বলেছো? তোমার গর্ভে আমার আমার সন্তানের অস্তিত্ব? সিরিয়াসলি? ভুয়া প্রেগন্যান্সির রিপোর্ট দেখিয়েছো তুমি ওকে? কেন করেছো এসব? আমার বিয়ে ভাঙার কী কারণ? আমার সুন্দর জীবন অসুন্দর করার লক্ষ্যে কেন নেমেছো তুমি?” চিৎকার করে জানতে চাইলো তারাস।

 

“আমাদের বিচ্ছেদ ঘটেছে চারমাস আগে। অথচ তুমি নাতালিয়ার সাথে পাঁচ মাস যাবৎ সম্পর্কে আছো। এর মানে এক মাস তুমি আমার সাথেও সম্পর্ক রেখেছো, নাতালিয়ার সাথেও রেখেছো…”

 

জেনোভিয়া আরও কিছু বলার আগেই তারাস বললো,

“না আমি রাখিনি। তোমার সাথে আমি সম্পর্ক রাখিনি। তোমার সাথে আনুষ্ঠানিক ব্রেকআপের আগেই আমি দুইমাস ধরে তোমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ রেখেছিলাম। সুতরাং বলা যায় আমাদের বিচ্ছেদ ঘটেছে ছয়মাস আগে, যার আনুষ্ঠানিক ভাবে বিচ্ছেদের বয়স চার মাস।”

 

“সেটাই তো, চারমাস কেন? যদি তুমি আমার সাথে থাকতে এতই অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে তখন তোমার আরও আগেই বলা উচিত ছিল আমাকে। কিন্তু তুমি নাতালিয়ার সাথে একমাস প্রেম করার পর আমার সাথে ব্রেকআপ করেছিলে। ওটাই তোমার ভুল। আর ভেবে নাও এটাই তোমার ভুলের শাস্তি।”

 

“হ্যাঁ ভুল। আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুল তো তোমার মতো পাগল একটা মেয়ের সাথে প্রেম করেছিলাম!”

 

তারাস আর কিছু বলতে চাইলো না। সে জানে জেনোভিয়াকে বেশি কিছু বলে লাভ নেই। সে চার্চে প্রবেশ করার উদ্দেশ্যে যখন এক পা সামনে এগোলো তখনই জেনোভিয়া বললো,

“আসলে আমি তোমার বিয়ে কেন ভেঙেছি জানো?” 

তারাস দাঁড়ালো।

“কারণ আমি এটা সহ্য করতে পারছিলাম না। আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি। সেদিন যখন বলছিলে আমাদের সম্পর্কটা তুমি আর সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাও না, তখন আসলে আমাদের সম্পর্কটা থেমে যায়নি, থেমে গিয়েছিল আমার হৃৎস্পন্দন। আর আজ আমি এটা না করলে হয়তো চিরতরেই আমার হৃৎস্পন্দন থেমে যেত। আমি দুঃখিত এটার জন্য যে, আমি ভালোবাসি তোমাকে!”

 

তারাসের হৃদয় সহসা অদ্ভুত কম্পনে কম্পিত হলো। যে কম্পনে হৃদয় কোমল হলো, চোখে জমাট বাঁধলো নীর। সে পিছন না ফিরে বললো,

“যা করেছো তাতে আমার উচিত ছিল তোমাকে গ্রেফতার করা, কিন্তু করুণা করে তোমাকে ছেড়ে দিয়েছি। আর দাঁড়িয়ে থেকো না, আমি এতটা ভালো নাও থাকতে পারি।”

 

তারাস পিছনে গাড়ি চলে যাওয়ার শব্দ শুনতে পেল। তাকিয়ে দেখলো চার্চ এরিয়া থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে জেনোভিয়ার গাড়ি। হয়তো মেয়েটা তার কথা শোনেনি। তারাস দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বললো,

“আমি নাতালিয়াকেও ভালোবাসি না, আর তোমাকেও না!”

 

‘নাতালিয়াকেও ভালোবাসি না’ বলার সময় যতটা দৃঢ় শোনালো তারাসের কণ্ঠ, ‘তোমাকেও না’ বলার সময় সেই দৃঢ়তা যেন ততটাই নড়ে উঠলো। কণ্ঠের মতো তার হৃদয়েও দৃঢ়তা নেই, নড়বড়ে। 

 

___________________

 

ছেলেটার নাম বেনিম কক্স। বয়স আঠাশ। চুল এবং চোখের রং উভয়ই গাঢ় কালো। ওর ত্বকের রং খুবই উজ্জ্বল। চেহারায় সৌন্দর্যের উজ্জ্বল প্রভা প্রজ্বলিত। চোখে কোনো সমস্যা নেই, তবুও ওকে সব সময়ই গোল ফ্রেমের চশমা পরে থাকতে দেখা যায়। এমনিতেই আলাভোলা দেখতে, চশমা পরার কারণে যেন আরও বেশি আলাভোলা লাগে। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। ওদের পৈতৃক নিবাস আমেরিকায়। আগে ইয়েকাতেরিনবার্গে থাকতো। কিন্তু সে শহর ছেড়ে এখন সেন্ট পিটার্সবার্গ এসেছে। এখানে বাবা রিচার্ড কক্স একটা দোকান কিনেছে। এই দোকানটাকেই নিজের ব্যবসায়ের মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলবে। এটা একমালিকানা ব্যবসা। এক মালিকানা ব্যবসায় কোনো ঝামেলা নেই। লাভ হলেও সম্পূর্ণ লাভের অংশ নিজের, আর ক্ষতি হলেও সেই ক্ষতির দায়ভার নিজেকেই পোহাতে হয়। বেনিমের এই বিষয়টা খুব পছন্দ। অন্যের সাহায্য ছাড়া যেকোনো কাজেই অনেক আনন্দ এবং তৃপ্তি লুকিয়ে থাকে। তবে বেনিম এই শহরে কী কাজ করবে তা এখনও ঠিক করেনি। তবে ঠিক করে ফেলবে। 

 

গাড়ি এসে দুই তলা খয়েরি রং করা বাড়িটার সামনের রাস্তায় থামলো। রিচার্ড কক্স আর বেরি উইলো নেমে গেলেন গাড়ি থেকে। বেনিমও নামলো। ট্রাক থেকে জিনিসপত্রগুলো নামিয়ে ভিতরে নিয়ে যেতে হবে। ট্রাকের ড্রাইভারও সাহায্য করছে কাজে। 

বেশিরভাগ জিনিসপত্রই ইতোমধ্যে ভিতরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। গোটা কতক বক্স আছে শুধু। বেনিম বইপত্রর বক্সটা উঠিয়ে নিয়েছিল হাতে। এর মাঝেই ঘটলো একটা দুর্ঘটনা। জিন্স, শার্ট পরা একটা মেয়ে দৌড়ে আসছিল এদিকেই। বেখেয়াল হয়ে দৌড়ানোর ফলে মেয়েটার ধাক্কা লাগলো বেনিমের হাতের বক্সটার সাথে। বক্সটা বেনিমের হাত ফসকে পড়ে গেল রাস্তায়। বেনিমের মস্তিষ্ক দপদপ করে জ্বলে উঠলো রাগে। সে চকিতে সামনে তাকালো মেয়েটার দিকে। মেয়েটা ঘটনার আকস্মিকতায় ক্ষণ কালের জন্য দাঁড়িয়ে গেল। বেনিমের চোখে শান্ত অথচ ক্ষিপ্র দৃষ্টি। মেয়েটাকে বললো,

“বক্সটা উঠিয়ে দাও।”

 

পিছন থেকে একটা মহিলার রুক্ষ কর্কশ স্বর ভেসে এলো তখনই। মেয়েটা সেদিকে তাকালো। মহিলাটা তেড়ে আসছে। মেয়েটা আবারও দৌড় দিলো সামনের দিকে, বেনিমকে বক্সটা না উঠিয়ে দিয়েই। 

বেনিম বক্সটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল অনেক সময়। ভাবলেশহীন।

 

“অন্তত স্যরি বলা উচিত ছিল মেয়েটার।”

বিড়বিড় করলো বেনিম।

 

___________________

 

গাড়ির সামনে হঠাৎ কোত্থেকে একটা মেয়ে চলে এলে অপ্রস্তুত ভাবে গাড়িতে দ্রুত ব্রেক কষলো রোমেরো। আতঙ্কে তার সাদা মুখ আরও সাদা হয়ে উঠলো। নিঃশ্বাস পড়তে লাগলো ভারী। মেয়েটা যদি তার গাড়ির নিচে চাপা পড়তো? তার গাড়ির চাকার নিচে চা’পা পড়ে যদি মেয়েটার হা’ড় ভাঙতো? যদি এই মুহূর্তে র’ক্তের স্রোত বয়ে যেত রাস্তায়? যদি খু’নের দায়ে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতো? ওহ ঈশ্বর! চোখ বন্ধ করে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিলো রোমেরো। চোখ মেলে দেখলো মেয়েটাও ভয়ে জমে গেছে। একটু নড়নচড়ন নেই মেয়েটার। 

হঠাৎ কোত্থেকে একজন মহিলা এসে মেয়েটাকে হাত দিয়ে মা’রতে শুরু করলো। মেয়েটা মহিলাকে বলতে লাগলো,

“ব্যথা পাচ্ছি মামা। মেরো না। আমি নিজ থেকে যাইনি বারে। বিশ্বাস করো। এনি আমাকে নিয়ে গিয়েছিল। বিশ্বাস করো তোমার এই লক্ষ্মী মেয়েটাকে।” মেয়েটার গলায় মিনতির সুর।

 

রোমেরো দারুণ বিরক্ত। তার রাস্তা আটকে মা-মেয়ে মিলে এ কেমন সার্কাস শুরু করেছে? সে মা-মেয়েকে শাসানোর জন্য নামলো গাড়ি থেকে। দুজনকে ডেকে বললো,

“এই, সমস্যা কী তোমাদের? আমার পথ আটকে কেমন নাটক শুরু করেছো? পথ ছাড়ো। নয়তো দুজনকে গাড়ি দিয়ে রাস্তার সাথে পি’ষে দিয়ে চলে যাব!”

 

রোমেরো গাড়িতে উঠে বসলো। সে গাড়ি স্টার্ট দিলেই মা-মেয়ে দুজনই দৌড়ে রাস্তার পাশে সরে গেল। 

 

রোমেরো বিরক্তির সুরে বললো,

“পাগল মানুষজন!”

 

নির্দিষ্ট স্থানে এসে গাড়ি থামালো রোমেরো। তার পাশের সিট, পিছনের সিট এবং গাড়ির ডিকি সব পূর্ণ জিনিসপত্রে। আজ সে নতুন বাসায় উঠবে। এই শহরেও সে নতুন। আগে ইয়েকাতেরিনবার্গ শহরে থাকতো। কিন্তু শহরটার প্রতি তার বিতৃষ্ণা জমে গিয়েছিল। বলা বাহুল্য যে, প্রায় অনেক স্থানেই সে এক বছরের বেশি থাকতে পারেনি। এক বছরেই তার বিতৃষ্ণা চলে এসেছে। তবে ইয়েকাতেরিনবার্গ শহরের প্রতি বিতৃষ্ণাটা একটু আগেভাগেই এসেছে। মোটে দশ মাস থেকেছিল সেখানে।

রোমেরো একবার ভিতরে ঢুকে দেখলো বাড়িটার। সে অনলাইনে বাড়িটা দেখেছিল। আর অনলাইনেই বাড়িটা ছয় মাসের জন্য ভাড়া নিয়েছে। একটা বেডরুম, লিভিংরুম, কিচেন, ওয়াশরুম ব্যতীত আর কিছু নেই। থাকারই বা কী দরকার? একজন মানুষের থাকার জন্য এই যথেষ্ট। রান্নাঘরে চুলা, ওভেন, ফ্রিজ সবই আছে। যদিও ফ্রিজও পাবে এটা সে আশা করেনি। ভেবেছিল ছবিতে বেকারই ফ্রিজ দেখাচ্ছে। কিন্তু না, তারা ওর ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করেছে।

বাইরে চলে এলো রোমেরো। আশপাশটায় চোখ বুলালো। রাস্তার দুই পাশেই বাড়ি। তার বাড়িটার বাম পাশে একদম পাশাপাশি আরও দুটো বাড়ি আছে। বাড়ি তিনটার ভিতর দূরত্ব খুবই সীমিত। কাঠের বেড়া ছাড়া আর কিছু নেই বাড়ি তিনটাকে আলাদা করার। বাড়ি তিনটার রং এক হলে ভালো হতো, ভাবলো রোমেরো। কিন্তু রং ভিন্ন। তার বাড়িটা বাদামি, ভিতরের বাড়িটা সাদা আর তার পরের বাড়িটা খয়েরি রঙের। বাড়ি তিনটার সামনে রাস্তার ওপারে আরও একটা বাড়ি রয়েছে সাদা রঙের। আরও বেশ কিছু বাড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এপাশে-ওপাশে। সেগুলো কিছুটা দূরবর্তী। গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল সে। আগের বাসা থেকে সবকিছু আনেনি আজকে সাথে করে। টুকিটাকি যা পেরেছে নিয়ে এসেছে। কাল অথবা পরশু গিয়ে বাকিগুলো নিয়ে আসবে।

জিনিসপত্রগুলো ঘরের ভিতরে নিয়ে আসতে গিয়ে রোমেরো অনুভব করলো এগুলো খুবই ভারী। সে ভিতরে বয়ে আনতে আনতে ক্লান্ত হয়ে গেল। সহসা সে দেখতে পেল মাঝখানের সাদা বাড়িটার সামনে কালো ট্রাউজার আর সাদা টি-শার্ট পরা সোনালি চুলের একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে সরল মনে মেয়েটার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে বললো,

“হেই, আমাকে এগুলো ভিতরে নিয়ে যেতে সাহায্য করো।”

 

জেনোভিয়ার কানে কথাটা আসা মাত্র সে সচকিত হলো। সে এতক্ষণ ধরে ভাবছিল, অবাকও হচ্ছিল। তার বাড়ির দু পাশের দুটো বাড়িই এতদিন ধরে খালি পড়ে ছিল। কিন্তু দুটো বাড়ি একই সাথে বিক্রি হয়ে গেছে। আর আজ একই দিনে ক্রেতারা বাড়িতে উঠেছে। উঠেছে তাও আবার প্রায় একই সময়ে। এক ক্রেতারা একটু আগে এসেছে, আর আরেক ক্রেতা তার ঠিক একটু পরে এসেছে। বিষয়টা খুবই আজব লাগছিল জেনোভিয়ার কাছে। এর মাঝে শুনতে পেল শেষে আসা ছেলেটা তাকে ডেকে কথাটা বলেছে। 

জেনোভিয়া তাকালো ছেলেটার দিকে। ছেলেটার মাথায় কালো চুল। চেহারার গঠনও আকর্ষণীয়। কালো প্যান্ট আর টি-শার্ট গায়ে। দু চোখে সাহায্যকামী দৃষ্টি। 

জেনোভিয়া কাঠ গলায় বললো,

“আমি তোমার কাজের মেয়ে নই।”

বলেই ভিতরে চলে গেল সে।

 

ওদিকে রোমেরো তাজ্জব হয়ে গেছে। এত বাজে ব্যবহার? সে এখন মেয়েটার নতুন প্রতিবেশী। প্রতিবেশীর প্রতি প্রতিবেশী সদয় থাকবে এটাই তো হওয়া উচিত। কিন্তু এই মেয়ে বাজে ব্যবহার করে চলে গেছে। পৃথিবী থেকে যে মানবতা উঠে গেছে তার জলজ্যান্ত উদাহরণ রোমেরো আরও একবার পেল। 

 

(চলবে)

 

______________

 

 রঙিলা রাতের কালো অশ্রু

লেখা: ইফরাত মিলি

পর্ব: ০১

 

 রঙিলা রাতের কালো অশ্রু (০২) 

লেখা: ইফরাত মিলি

___________________

 

“এই যে, আমি কি তোমাকে কোনো প্রকার সাহায্য করতে পারি?”

 

পিছন থেকে কথাটা এলো। কিঞ্চিৎ অবাক হলো রোমেরো। কথাটা কি তাকে বলেছে কেউ? কিন্তু এটা তো অসম্ভব। সে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে পৃথিবীর বুক থেকে মানবতা বিলীন হয়ে গেছে। যার নিদর্শন সে এই একটু আগেই পেয়েছে। কিন্তু এখন কেউ যেচে এসে তার সাহায্য করতে চাইছে এটা সত্যিই সে মানতে পারছে না কিংবা বিশ্বাস হচ্ছে না তার। প্রথমে ভাবলো এটা কেবলই ভ্রম। কিন্তু পিছনে তাকিয়ে গোল চশমা চোখের ডেনিম জিন্স শার্ট পরিহিত ছেলেটাকে দেখে চমকে গেল। কেউ কি সত্যিই তার সাহায্য করতে চাইছে?

 

“না দরকার নেই, আমি নিজে করে নিতে পারবো। ধন্যবাদ।”

একজনের কাছ থেকে বাজে ব্যবহার পেয়ে রোমেরোর মন সায় দিলো না আর কারো কাছ থেকে সাহায্য নিতে।

 

ছেলেটা বললো,

“কিন্তু আমার কোনো সমস্যা ছিল না তোমাকে সাহায্য করতে।”

 

রোমেরো চমকে উঠলো। মনে হলো এই ছেলেটার ভিতর কিছুটা মানবিকতা আছে। রোমেরোর ইচ্ছা করছে এখনই হাতের ব্যাগটা ছেলেটার হাতে তুলে দেয়। কিন্তু আবার নৈতিকতা দেখাতে গিয়ে বললো,

“না এইটুকু কাজ আমি নিজেই করে নিতে পারবো।”

 

“ঠিক আছে যেমন তুমি চাও।”

 

ছেলেটা আর যেচে এগিয়ে এলো না সাহায্য করতে। রোমেরো আহত হলো। ছেলেটা আর একবার যদি সাহায্য করার কথা বলতো সে অবশ্যই ছেলেটার সাহায্য গ্রহণ করতো। কিন্তু…

রোমেরো তার কাপড়ের ব্যাগটা ভিতরে নিয়ে যেতে যেতে ভাবলো,

‘পৃথিবী থেকে আসলেই মানবতা উঠে গেছে। বললাম সাহায্য চাই না, আর অমনি সাহায্যের হাত গুটিয়ে নিলো?’

 

ব্যাগটা ভিতরে রেখে বাইরে এসে দেখলো চশমা পরা ছেলেটা তখনও দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখেই বললো,

“আমিও নতুন এসেছি।” খয়েরি রঙের বাড়িটার দিকে অঙ্গুলি করলো, “ওই বাড়িটা কিনেছি আমরা। আমার নাম বেনিম কক্স। আমি আনন্দিত তোমার মতো একজন সমবয়সি প্রতিবেশী পেয়ে। নিশ্চয়ই আমরা একে অপরের ভালো প্রতিবেশী হবো।”

ছেলেটা কথাগুলো হাস্য মুখে বললো।

 

রোমেরো যদি এখন একটু না হাসে তাহলে বড্ড বেমানান দেখায়। সৌজন্য স্বরূপ সেও হাসলো। বললো,

“আমি রোমেরো। তোমার সাথে পরিচিত হয়ে ভালো লাগছে।”

 

বেনিম আর কিছু বললো না। এক টুকরো সরল হেসে চলে গেল। রোমেরো তাকিয়ে রইল ওর যাওয়ার পথে। এই শহরে কতদিন থাকতে পারবে সে বিষয়ে সন্দিহান সে। জানে না প্রতিবেশী হিসেবে বেনিম কক্স কেমন হবে। মোটামুটি ভালোই হবে মনে হচ্ছে। কিন্তু একটু আগে দেখা মেয়েটা প্রতিবেশী হিসেবে খুবই বাজে!

 

_______________

 

তারাস একজন সাব ইন্সপেক্টর। যদিও ইন্সপেক্টর হওয়া তার স্বপ্ন ছিল না। সে চাইতো একজন ডাক্তার হতে। কিন্তু তার বাবার স্বপ্নের কারণে তার ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নে ভাটা পড়ে। কারণ বাবা চাইতেন তার ছেলে আইন নিয়ে পড়ুক। দেশের বিভিন্ন অপরাধীদের গ্রেফতার করে তাদের শাস্তির দিকে ধাবিত করুক। তারাস যেদিন বাবার এই চাওয়া সম্পর্কে জানতে পারলো সেদিনই নিজের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়েছে। কারণ বাবা যেহেতু চায় সে একজন ইন্সপেক্টর হোক, সেহেতু তাকে তাই হতে হবে। সেটা স্বেচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায়।

বর্তমানে তারাস ছুটিতে ছিল বিয়ে উপলক্ষ্যে। কিন্তু যেহেতু গতকাল তার বিয়ে সম্পন্ন হয়নি সেহেতু বাড়িতে বেকার বসে থাকাকে যুক্তিসংগত মনে করেনি সে। তাই সকাল সকালই চলে এসেছিল থানায়। কিন্তু এসে সে বেশ ঝামেলায়ই পড়েছে। যে দেখছে সেই টিটকারি মারছে তার বিয়ে ভেঙে যাওয়া নিয়ে। সিনিয়র আর জুনিয়র নেই, সবাই মজা করছে। 

‘নাতালিয়ার সাথে তো তোমার বিয়ে ভেঙে গেছে, তা জেনোভিয়াকে কবে বিয়ে করছো?’

‘শুনলাম জেনোভিয়ার গর্ভে না কি তোমার সন্তান? এটা কি আসলেই সত্যি?’

এরকম প্রশ্ন করে করে মাথা খাচ্ছে সবাই তারাসের। তারাস এক এক করে সবাইকে বোঝাতে বোঝাতে ক্লান্ত এবং বিরক্ত। জেনোভিয়ার গর্ভে তার সন্তান এই কথাটা সবাই কীভাবে জেনে গেছে বুঝতে পারছে না! জেনোভিয়া এই মিথ্যা কথাটা কেবল নাতালিয়াকে বলেছিল যাতে সে এই বিয়েটা ভাঙতে সক্ষম হয়। নাতালিয়া ব্যতীত কে শুনেছিল জেনোভিয়ার বলা এই কথাটা? কে কথাটা পুলিশ স্টেশনের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে তার সর্বনাশ করতে চাইছে? একবার যদি এই কথাটা মিডিয়ার কানে পৌঁছায় তখন কী হবে? আতঙ্কে বিস্ফোরিত হয়ে উঠলো তারাসের চক্ষুদ্বয়। সে টের পাচ্ছিল, সে যদি আর কিছুক্ষণ এখানে থাকে তাহলে উন্মাদ হয়ে যাবে। তাই সে অতি সত্বর বেরিয়ে গেল থানা থেকে। 

 

রোদ খেলা করছে ভূপৃষ্ঠে। খিলখিলিয়ে হাসছে যেন। সকালের দিকে রোদের এমন মিষ্টি হাসি ছিল না। হঠাৎ করেই হেসে উঠেছে। এ হাসি তেজহীন, কোমল। কোনো উষ্ণতা নেই।

থানার একদম কাছেই মাতভেই নিকোলায়ের বাসা। মাতভেইয়ের একটা কুকুর আছে। যেটার সাথে তারাসের খুব ভাব। কুকুরটা দূরেই বসে ছিল। আকারে ওটা অনেক বড়ো। বাদামি পশমে ঢাকা শরীর। তারাসকে দেখেই লেজ নাড়তে নাড়তে চলে এলো কাছে। তারাস গায়ে হাত বুলিয়ে দিতেই ওটা আবার দৌড়ে পালালো।

তারাসের জেনোভিয়ার ডগটার কথা মনে পড়লো। জেনোভিয়া আদর করে ডগটার নাম রেখেছিল ‘জুরা’। জুরার সাথেও তারাসের খুব ভাব ছিল। কিন্তু মনিবের সাথে তারাসের দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ায় জুরাও যেন তারাসের কাছ থেকে নিজেকে দূরে করে নিয়েছে। 

তারাস আর বসে থাকলো না, গাড়িতে চড়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলো। পথিমধ্যে কোথাও ব্রেক নিলো না। 

 

দুই বেডরুম, কিচেন, ওয়াশরুম আর ফিনিশড বেজমেন্টের বাড়িটা সাদা আর খয়েরি রং মিলিয়ে। রাস্তার একদম কাছেই বাড়িটা। বলা যায় রাস্তার পাশ ঘেঁষেই দাঁড়িয়ে আছে ওর বাড়িটা। এটা ভাড়া বাড়ি। 

দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলো তারাস। প্রথমে লম্বা সময় নিয়ে শাওয়ার নিলো। তারপর চলে এলো কিচেনে। হালকা কিছু খাবার বানিয়ে নেবে এখন। ফ্রিজ থেকে কিছু সবজি বের করে নিলো। ধুয়ে নিয়ে চপিং  বোর্ডে টুকটুক শব্দ করে কাটতে লাগলো। এরই মধ্যে কলিং বেলের শব্দ ভেসে এলো কানে। সবজি কাটা রেখে দরজা খুলতে গেল সে। খুলতে গিয়েও কী ভেবেই আবার খুললো না। ডোর ভিউতে উঁকি দিয়ে দেখলো জেনোভিয়া দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। সটান হয়ে দাঁড়িয়ে গেল তারাস। জেনোভিয়া এখানে কেন? কালকে তার বিয়ে ভেঙে দিয়েও মেয়েটার ভিতর কি অনুশোচনা হচ্ছে না? তারাস দরজা খুললো না। দরজার এপাশ থেকে বললো,

“চলে যাও। আমি দরজা খুলবো না।”

 

“তাহলে কি আমি নিজ থেকে খুলে ভিতরে ঢুকবো? তোমার দরজা খোলার উপায় আমার কাছেও আছে।” বাইরে থেকে প্রত্যুত্তর দিলো জেনোভিয়া।

 

“তুমি কি চোর? আমি চাইছি না তুমি ভিতরে প্রবেশ করো‍, তারপরও তুমি জোর করে প্রবেশ করতে চাও? আমি যতই চাইছি তোমাকে গ্রেফতার করবো না, তুমি যেন ততই গ্রেফতার হতে মরিয়া। প্লিজ চলে যাও। তোমার সাথে আমার আর সম্পর্ক নেই!”

 

জেনোভিয়া কষ্ট অনুভব করলো। সে তারাসকে এতটা ভালোবাসে আর তারাস কি না তাকে বুঝতেই চায় না? মেঘ সরে রোদ উঠে আবারও মেঘে ঢেকে যাওয়ার মতো নীরব কষ্টগুলো নীরবই পড়ে রইল জেনোভিয়ার। বললো,

“খাবার নিয়ে এসেছিলাম। রেখে যাচ্ছি।”

 

জেনোভিয়া খাবারের বক্সটা নিচে নামিয়ে রাখা দিলেই তারাস বললো,

“রাখবে না।” 

 

থেমে গেল জেনোভিয়া।

 

“তুমি কখনোই ভালো রাঁধুনি ছিলে না। আর এখন যখন আমাদের মাঝে কোনো সম্পর্ক নেই, সেহেতু তোমার রান্না এখন আরও ভালো লাগবে না আমার।”

বলে দরজার কাছ থেকে সরে এলো তারাস। কিচেনে ঢুকে সবজি কাটতে লাগলো, যেটা সে জেনোভিয়া আসার আগে থেকে করছিল। 

 

জেনোভিয়ার দু চোখে বিন্দু বিন্দু জল। তার কাচের মতো স্বচ্ছ মনটা অভিমানের কালো ছায়ায় ঢেকে গেল। হঠাৎ কোত্থেকে একগুচ্ছ রাগও এসে গেঁথে গেল তার বক্ষে। সে এতটাই অভিমানিনী আর রাগান্বিত হলো যে, খাবারের বক্সটা তারাসের বাসার সামনে ছুঁড়ে ফেললো। বক্স থেকে খাবার ছিটকে পড়লো বাইরে। জেনোভিয়া আর এক মুহূর্ত স্থির থাকলো না ওখানে। 

 

________________

 

শপটার নাম ‘বারবারা’। শপের মালিকের স্ত্রীর নাম ছিল বারবারা। তার নামেই নামকরণ করা হয় শপের। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, বারবারা বেচারা স্বামী গ্লেভকে ছেড়ে প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়েছে।

এই শপে প্রবেশ করলেই পলিনার এই ঘটনাটা সম্পর্কে মনে পড়ে যায়। তবে এ কথা সত্য যে গ্লেভ তার স্ত্রীকে আসলেই বড্ড বেশিই ভালোবাসতো, এমনকি এখনও বাসে। আর তাই তো স্ত্রী প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়ে যাওয়ার পরও গ্লেভ শপের নাম পরিবর্তন করেনি। 

পলিনা চকলেট স্টোরে এসে খুঁজে খুঁজে তার প্রিয় চকলেটগুলো ট্রলিতে ফেলছে। তার বেশিই প্রিয় মিল্ক চকলেট। 

চকলেট বাছাইয়ের কাজ শেষে যখন সে ট্রলি ধরে অন্যদিকে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো, তখন আচমকা সে আবিষ্কার করলো একজন ছেলে তার সামনে স্থির মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে। পলিনা ভয়ই পেয়ে গেল। কারণ ছেলেটা কখন এসে দাঁড়িয়েছে সে একদম টের পায়নি। কোনো শব্দ করেনি ছেলেটা। তার আশপাশ এতই নীরব ছিল যে মনে হচ্ছে ছেলেটা বোধহয় নিঃশ্বাসও ফেলেনি একবার। নিঃশ্বাস ফেললেও হয়তো পলিনা শুনতে পেতো। 

 

ছেলেটা একগাল হেসে বললো,

“প্রিভিয়েত! আমি বেনিম কক্স। আমাদের একদিন রাস্তায় দেখা হয়েছিল। তুমি আমার হাত থেকে একটা বক্স ফেলে দিয়েছিলে। তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে আমাকে?”

 

পলিনা বললো,

“দুঃখিত! আমি মনে করতে পারছি না।”

 

“পাঁচদিন পূর্বে, খয়েরি রঙের বাড়িটার সামনে, লাল রঙের ডোরাকাটা শার্ট পরা ছিলে তুমি, আমার হাতের বক্স রাস্তায় ফেলে দিয়েছিলে, আসলেই মনে নেই তোমার?”

 

পলিনা ইতস্তত করে বললো,

“আমার এমন কিছুই মনে পড়ছে না, দুঃখিত!”

 

বেনিম তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টির ঝলকে এক নিমিষে দেখে নিলো পলিনার চোখে মিথ্যা ভাসছে। মেয়েটা কি চিনতে পেরেও বলছে চিনতে পারছে না? বেনিমের রাগ হলো। বেনিম জানে তার রাগ অত্যন্ত বাজে। তাই সে সচরাচর কম রাগতে চায়। সে মেয়েটার চোখে স্থির চেয়ে থেকে বললো,

“আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে সেদিনের জন্য স্যরি বলবে। আমি তোমাকে বক্সটা উঠিয়ে দিতে বলা সত্ত্বেও তুমি সেটা না উঠিয়ে দিয়েই চলে গিয়েছিলে। কিন্তু তুমি এখন আমাকে চিনতেই পারলে না! এটা খুব দুঃখের বিষয়!”

 

বেনিম সোজা বেরিয়ে গেল শপ ছেড়ে। মুখে বিড়বিড় করে শুধু একটা কথাই আওড়াতে লাগলো,

‘ও আমাকে চিনতে পারলো না। ও আমাকে ভুলে গেছে। কীভাবে ভুলে যেতে পারে?’

 

সারাটা পথ বেনিমের মনে এই ব্যাপারটাই ঘুরলো।

 

বেরি উইলো একটা শার্টের বোতাম লাগাচ্ছিলেন সোফায় বসে। এ কদিনেই তিনি বাড়িটাকে সাজিয়ে ফেলেছেন। এতে অবশ্য রিচার্ড আর বেনিমেরও সহযোগিতা ছিল। বাড়িটাকে ইতোমধ্যেই কেমন আপন আপন মনে হচ্ছে তার।

বেনিম বাইরে থেকে ফিরেই ছোটো বাচ্চাদের মতন মায়ের কোলে মাথা রেখে গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়লো সোফায়। বলতে লাগলো,

“মেয়েটা আমাকে চিনতে পারেনি মামা! ও আমাকে চিনতে পারেনি। ও আমাকে ভুলে গেছে মামা। মনে রাখেনি আমাকে। ও ভুলে গেছে।”

 

অজানা আশঙ্কায় বেরি উইলোর বুকের ভিতরটা ঠকঠক করতে লাগলো। কপালে দেখা দিলো বিন্দু বিন্দু ঘাম। ভয়ে ভয়ে সে হাত রাখলো ছেলের মাথায়। কাঁপা স্বরে জানতে চাইলো,

“কার কথা বলছো বেনিম?”

 

“ওই মেয়েটা মামা। বাদামি চুল, ধূসর চোখ, চোখের নিচে যে মেয়েটার তিল আছে ওই মেয়েটা। মেয়েটা আমাকে চিনতে পারেনি। এত তাড়াতাড়ি ও আমাকে ভুলে গেছে? আমি তো ভুলে যাইনি। তাহলে ও আমাকে কেন ভুলে গেল? কেন ভুলে গেছে আমাকে? কেন চিনতে পারেনি? ও কেন রাগিয়ে দিলো আমাকে?”

 

তীব্র কণ্ঠে জানতে চেয়ে কেঁদে উঠলো বেনিম। ওকে এই মুহূর্তে একটা বাচ্চা মনে হচ্ছে। কাঁদতে কাঁদতে মাকে বললো,

“ও আমাকে কেন রাগিয়ে দিলো মামা? আমি রাগতে চাই না। তবুও ও কেন রাগিয়ে দিলো আমাকে? কেন চিনতে পারলো না? কেন ভুলে গেল? কেন?”

 

বেনিম আরও প্রখরভাবে কেঁদে উঠলো। অন্যদিকে বেরি উইলোর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এসেছে। কোন মেয়ের কথা বলছে বেনিম? 

 

_______________

 

পলিনা একটু অহংকারী প্রকৃতির। মানুষজনের সাথে মিশতে খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। কেউ যেচে এসে সখ্যতা গড়তে চাইলে তাও ওর অপছন্দনীয়। বেনিমের ব্যাপারটাও পছন্দ হয়নি ওর। ও ছেলেটার হাত থেকে বক্স ফেলে দিয়েছিল বলে ছেলেটা আজ দৌড়ে ওর সাথে কথা বলতে এসেছে? আবার যাওয়ার সময় কী বলে গেল? স্যরি বলা উচিত ছিল ওর? উটকো মানুষজন! আর সেদিন বক্সটা উঠিয়ে দিতে বলেছিল বলেই কি ওর উঠিয়ে দিতে হবে? ও কি বেনিমের দাস? দিনটাই কেমন খারাপ বানিয়ে দিলো বেনিম ছেলেটা!

 

রোমেরো মেয়েটাকে দূর থেকেই লক্ষ করে চললো। মেয়েটাকে সে এর আগে দেখেছে। মেয়েটা রোমেরোকে অতিক্রম করে সামনে চলে গেল। পিছন থেকে ডাকলো রোমেরো,

“এই…”

 

কেউ ডাকায় দাঁড়ালো পলিনা। ডাক অনুসরণ করে পিছনে তাকালো। 

রোমেরো বললো,

“সেদিন তোমাকে তোমার মা ওরকমভাবে মেরেছিল কেন?”

 

পলিনা ভ্রু কুঞ্চিত করে বললো,

“তুমি কে?”

 

রোমেরো বিস্মিত। পলিনার দিকে এগিয়ে এসে বললো,

“আমি জানতাম না মেয়েদের স্মৃতি শক্তি এতটা খারাপ হয়। আমাকে মনে নেই? সত্যি মনে নেই? এটা আমি, আর একটু হলেই যার গাড়ির নিচে চা’পা পড়ে ক’বরে থাকতে এখন।”

 

“স্যরি আমার মনে নেই, আমি চিনতে পারছি না।”

 

পলিনা বেনিমের মতো করেই রোমেরোকেও এড়িয়ে গেল। আজকের দিনটায় কী হচ্ছে তার সাথে? দুয়েক ঘণ্টা আগেই একটা উটকোকে পার করে এলো, একটু সময় বাদেই আরও একটা উটকো এসে জুটেছে! ভেবেছিল বেনিম উটকোটার মতো এ উটকোটাকেও এড়িয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে, কিন্তু এ উটকোটা সহজে পিছু ছাড়লো না। 

রোমেরো দৌড়ে এসে পলিনার পথ রোধ করে দাঁড়ালো।

“ভারি কৌতুকবাজ মেয়ে তো তুমি! চিনতে পেরেও না চেনার ভাণ করছো কেন? চিনতে পারলে কি আমি বলবো আমাকে তোমার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ব্রেকফাস্ট করাও? আমি শুধু জানতে চেয়েছি তোমার মা কেন মেরেছিল তোমাকে?”

 

পলিনাও বিরক্ত হয়ে বললো,

“আরে আজব! বলছি আমি তোমাকে চিনতে পারছি না, তারপরও কেন এত এত কথা বলছো তুমি?”

 

রোমেরো কিছু বলা দিয়ে আবার থেমে গেল। বড়ো করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে চুপ রইল ক্ষণকালের জন্য। তারপর জিজ্ঞেস করলো,

“তুমি আর তোমার মা সেদিন বারে যাওয়া নিয়ে কিছু বলছিলে। কোন বারে যাও তুমি? বারটা কোথায়?”

 

পলিনা অবাকের চোখে দেখলো, সে কোন বারে যায় এটা জেনে ছেলেটা কী করবে? এবার আরও বিরক্তবোধ করলো পলিনা। অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করলো,

“গায়ে পড়া স্বভাব!”

তারপর হনহনিয়ে হাঁটা শুরু করলো।

 

কথাটা অস্ফুট স্বরে বললেও রোমেরো শুনতে পেল। শুনে মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল তার। মস্তিষ্কের ভিতর তিড়িং করে নেচে উঠলো ক্রোধ সমষ্টি। গায়ে পড়া স্বভাব? মেয়েটা তাকে গায়ে পড়া স্বভাবের বললো? এত স্পর্ধা? সে পলিনার যাওয়ার পথে পলকহীন দৃষ্টে চেয়ে থেকে বললো,

“তোমার বলার দরকার নেই, আমি নিজেই খুঁজে নিতে পারি অ’সভ্য মেয়ে!”

 

________________

 

মায়ের কোল থেকে ওঠার পর থেকেই বেনিম চুপচাপ হয়ে গেছে। যা দেখে বেরি উইলোর ভয় ভারী থেকে আরও ভারী হচ্ছিল। যখন বেনিম এরকম চুপচাপ হয়ে যায়, মুখ গম্ভীর করে রাখে, তখন তিনি খুব ভয় পান। এমন চুপচাপ থাকা যে ভালো না।

দিন যত রাতের দিকে এগোচ্ছিল বেরি উইলোর ভয় তত বাড়ছিল। আর রাত যত বাড়ছিল সে তত ভয়ে কাঁপছিল। 

বেরি উইলো জানে, মুখের কথা থেমে গেলেও বেনিমের অন্তরের কথারা থেমে নেই।

 

বেনিম নিত্যদিনের মতো স্বাভাবিক ভাবেই মা’র সাথে বসে ডিনার করলো। বাবা কিছু প্রয়োজনে ইয়েকাতেরিনবার্গ গেছে।

ডিনারের পর বেনিম নিজের রুমে চলে গেল। রাতে ডিনারের পর সে এক ঘণ্টা যাবৎ ছবি আঁকে। তারপর ঘুমিয়ে যায়।

 

বেরি উইলো ঔষধের বক্স থেকে ঘুমের ঔষধ আর পানি নিয়ে বেনিমের ঘরের দিকে চলতে লাগলেন। বেনিমকে এই ঘুমের ঔষধটা মাঝেমধ্যে দিতে হয়। না হলে তার ছেলেটা ভালোভাবে ঘুমাতে পারে না। তিনি চান না তার ছেলের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটুক। তার ছেলে নিশ্চিন্তে না ঘুমালে তিনিও যে নিশ্চিন্তে দু চোখের পাতা এক করতে পারেন না, রিচার্ডও পারে না। 

বেরি উইলো দোতলায় বেনিমের রুমে এসে ঢুকলেন। বেনিমের টেবিলের উপর একটা বাতি জ্বলছে। বেনিমের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন বেনিম চমৎকার একটা ছবি আঁকছে। ছবিতে একটা ছোটো ছেলে তার মা’র কোলে শুয়ে আছে। বেরি উইলো জানে এই ছবিটা বেনিম মায়ের প্রতি ভালোবাসা থেকেই অঙ্কন করেছে। বেনিম তাকে খুব ভালোবাসে। আর তিনিও বেনিমকে অত্যধিক ভালোবাসেন। দুই হাতের বেষ্টনে বেনিমের গলা জড়িয়ে ধরে বেনিমের কপালে স্নেহের চুমু খেয়ে বললেন,

“চমৎকার এঁকেছো বেনিম।” বলে আবারও চুমু খেলেন কপালে, “ঔষধটা খেয়ে নাও এখন।”

 

বেনিম হাসলো। স্বচ্ছ হাসি। মাঝে মাঝে এত স্বচ্ছ হাসে ও যা দেখলে নয়ন, প্রাণ দুই-ই জুড়িয়ে যায়। বেনিম মায়ের সামনেই ঔষধ খেয়ে নিলো। যদিও সে জানে না এটা কীসের ঔষধ। মা মাঝেমধ্যে হুটহাট করে ঔষধ নিয়ে এসে খেতে বলে। মাকে এখন আর জিজ্ঞেস করে না কীসের ঔষধ খেতে দিচ্ছে। আগে জিজ্ঞেস করতো, আর মা প্রশ্নটা এড়িয়ে চলতো। বেনিম আর কিছু না জানলেও এটুকু ঠিকই জানে যে, মা যা কিছু করে তা সবই তার ভালোর জন্যই। হয়তো তার কোনো সমস্যা আছে, যেটা সে জানে না, কিন্তু মা ঠিকই জানে। মায়েরা আসলে সন্তানের সবকিছুই জানতে পারে।

 

“শুভ রাত্রি!” বলে বেরি উইলো বেরিয়ে গেলেন।

 

বেনিম আর ছবি আঁকলো না। ওয়াশরুমে গেল দ্রুত। 

ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে সোজা বিছানায় শুয়ে পড়লো গায়ে কম্বল টেনে। ঘুম ঘুম আবেশ নেমে এলো চোখে।

 

________________

 

আকাশে ঘন কালো মেঘ। পলিনার মনে হচ্ছে বৃষ্টি নামবে। বৃষ্টি নামলেই ভিজে যাবে সে, কারণ তার কাছে ছাতা নেই আর রেইনকোটও নেই। ঘড়িতে আরও একবার সময়টা দেখে নিলো। রাত দুইটা। আজও সে মাকে ফাঁকি দিয়ে বারে গিয়েছিল। এখানকার দুটো বারই অনেক রাত অবধি খোলা থাকে। খদ্দেরও আসে ব্যাপক পরিমাণ।

পলিনা আজ নিজ থেকে বারে যায়নি। তার বান্ধবী এনি তাকে কল দিয়ে ডেকেছিল। গতবার যে মা কী করে টের পেয়ে গিয়েছিল সেটাই ভাবছে পলিনা। এবারও যদি টের পেয়ে যায় তবে নির্ঘাত খবর আছে তার। মা একদমই পছন্দ করে না বারে গিয়ে মদ্য পান করাকে। কারণ, পলিনার বাবা অতিরিক্ত মদ পান করার কারণেই কঠিন রোগ হয়েছিল তার। তারপর সে মারা যায়। এ কারণেই পলিনার মা মদ্য পানকে ঘৃণা করে।

পলিনার পা ফেলার ধরন টালমাটাল। কারণ সে কিছুটা নেশাগ্রস্ত। আজকে সে আগের তুলনায় কমই মদ পান করেছে, তবুও নেশালো ভাবটা চলেই এসেছে তার মাঝে। পিছনে হঠাৎ একটা শব্দ হলো। শব্দটা কানে আসতেই দাঁড়িয়ে গেল পলিনা। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকালো। স্ট্রিট লাইটের আলোয় যতদূর চোখ গেল সবই শূন্য দেখতে পেল। মানুষ তো দূর, অন্য কোনো প্রাণীরও অস্তিত্ব নেই। পলিনা আবারও হাঁটতে লাগলো। ক্ষণকাল বাদে আবারও একটা শব্দ হলো। আবারও দাঁড়িয়ে গেল সে। তার মস্তিষ্ক এবার সচকিত হয়ে উঠলো। দাঁড়িয়ে গেল দু কান। এবার তার মনে হচ্ছে সে একা না, আরও কেউ আছে এখানে। পলিনা চকিতে পিছন ফিরলো। না, রাস্তা শূন্য। পলিনার হঠাৎ ভয় করছে। শব্দটা অহেতুক আসছে না নিশ্চয়ই। কেউ ইচ্ছাকৃত ভাবে আওয়াজ করছে আড়ালে লুকিয়ে। তাকে ভয় দেখাচ্ছে। কিন্তু তাকে কেউ কেন ভয় দেখাবে? সত্যিই ভয়টা ধীরে ধীরে গাঢ় হয়ে উঠছে। শব্দটা আবারও হলো, আগের চেয়ে জোরে। পলিনার হৃৎপিণ্ড ধক করে উঠলো। দিকশূন্য হয়ে দৌড়াতে শুরু করলো সে। ভীষণ ভয় হচ্ছে!

ভালোই ছুটছিল পলিনা। দ্রুত বাড়ি ফেরার জন্য সোজা রাস্তা ছেড়ে অন্য শর্টকার্ট রাস্তা ধরেছে। কিন্তু যখন বাম দিকে মোড় নিলো তখনই একটা হা’তু’ড়ির বাড়িতে ছিটকে পড়ে গেল সে। মাথা ফে’টে র’ক্তও ছিটকে পড়লো! ব্যথায় আর্তনাদ করলো পলিনা। দুই হাতে চেপে ধরলো মাথা। র’ক্তে ভিজে গেল হাত। লাইটের আলোয় দেখতে পেল কালো ক্যাপ মাথায় একজন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। পলিনা লোকটার মুখ দেখার চেষ্টা করলো। কিন্তু তীব্র যন্ত্রণায় তার দৃষ্টি ঝাপসা। তাছাড়া লোকটার মাথায় ক্যাপ এবং মুখে মাস্ক থাকায় চেহারা ঢাকা পড়েছে। দু চোখে মৃ’ত্যু দেখতে পাচ্ছে পলিনা! মৃ’ত্যু যেন ডাকছে তাকে। কিন্তু সে মরতে চায় না। বাঁচতে চায়। বাঁচতে চায় সে! পলিনা শক্তি সঞ্চয় করে টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালো। ছুটতে চেয়ে সামনে পা বাড়ালেই পিছন থেকে আবার একটা হা’তুড়ির বা’ড়ি এসে লাগলো তার মাথায়! রাস্তার উপর উপুড় হয়ে পড়ে গেল সে। লোকটা হা’তুড়ি দিয়ে অনবরত আ’ঘা’ত করলো মাথায় ও শরীরে।

পলিনা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও তাতে লাভ হলো না। ব্যথায় বার বার কষ্ট জর্জরিত চিৎকার করলো সে। কিন্তু কে শুনবে তার এই ক্ষীণ চিৎকার? এখানের আশেপাশের বাড়িগুলো এখন পরিত্যক্ত। এক বাড়িতে শুধু এক বৃদ্ধা বাস করে। কিন্তু সে বৃদ্ধা রাতে ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমায় বলে ভূমিকম্প হলেও সে টের পাবে না।

পলিনার শরীরের শক্তি ধীরে ধীরে শূন্যের কোঠায় এসে ঠেকলো। কোনো রকম তার প্রাণটা এখনও ঝুলে আছে বক্ষৎপঞ্জরে। লোকটা খুব নিকটে দাঁড়ানো। পলিনা অতি কষ্ট করে লোকটাকে কোনো রকমভাবে বলার চেষ্টা করলো,

“পি-প্লি…জ…মে…রো…না…”

 

লোকটার পাষণ্ড বুক একটুও বিচলিত হলো না। সে পা দিয়ে জোরে কয়েকবার আ’ঘা’ত করলো পলিনার পে’টে। 

পরপরই পলিনার মুখের সর্বত্র পড়তে লাগলো এলোপাতাড়ি হা’তুড়ির বাড়ি। যা সহজে থামলো না। বী’ভৎস রূপে পরিণত হলো পলিনা। চোখ, মুখ, নাক কোনো কিছু পার্থক্য করা যাচ্ছে না। হা’তু’ড়ির আঘাতে ওর পুরো মুখ, মাথা থে’তলে গেছে। র’ক্তে ভেসে যাচ্ছে রাস্তা। লোকটা এক হাত আঁকড়ে ধরলো পলিনার। টেনে নিয়ে যেতে লাগলো ওকে। একটা কালো গাড়ির কাছে এসে থামলো সে। পলিনাকে গাড়ির ডিকিতে তুলে ডিকি বন্ধ করে দিলো। 

গাড়ি নিয়ে যেতে লাগলো নিজ গন্তব্যের দিকে। ঠোঁট কুঞ্চিত করে বাঁশির মতো তীক্ষ্ণ শব্দ দ্বারা সুন্দর একটা সুর তুললো। তারপর নিজ সৃষ্ট একটা গান গাইলো গুনগুন করে,

‘This night is mine,

It’s just me. 

I am the king of the black night.

I love warm b’lood and human screams!

O … O … O …

I am the king of darkness!’

 

(চলবে)

 

 রঙিলা রাতের কালো অশ্রু (০৩)

লেখা: ইফরাত মিলি

___________________

 

পুলিশের গাড়ি দুটো সাইরেন বাজাতে বাজাতে প্রবেশ করলো এলাকার মধ্যে। পিছনে একটা ফরেন্সিকেরও গাড়ি ঢুকলো। বেনিম বাসার সম্মুখে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে পুলিশের এত হন্তদন্ত হয়ে আগমনকে দেখছিল। কী হলো এলাকার ভিতর? বেনিম জানে না কী হয়েছে, তবে সে এটুকু বুঝতে পারছে বড়ো কোনো ক্রাইম হয়েছে। আর সবচেয়ে বড়ো ক্রাইম তো মা’র্ডা’র!

মা’র্ডারের কথা মনে হতেই বেনিমের বক্ষস্থল কেঁপে উঠলো। কেউ মা’র্ডা’র হয়েছে?

শুধু বেনিমই নয়, তার দুই প্রতিবেশী,  জেনোভিয়া আর রোমেরোও তার মতো মা’র্ডা’রে’র কথাই ভাবছিল পুলিশের গাড়িগুলোর দিকে চেয়ে। যদিও অন্য কোনো ক্রাইমও হতে পারে।

 

বেরি উইলো বেনিমের পাশ কাটিয়ে যাওয়া দিলেই বেনিম বললো,

“কোথায় যাচ্ছ মামা?”

 

“এই সামনেই যাচ্ছি। তুমি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকো। ওদিকটায় ভুলেও যেয়ো না। ঠিক আছে?”

 

বেরি উইলো দ্রুত পায়ে নেমে গেলেন রাস্তায়। তিনি প্রাণপণে চাচ্ছেন তার মনে যে আশঙ্কা হচ্ছে সেটা যেন সত্যি না হয়। পুলিশ যেখানে এসেছে সেই ঘটনাস্থলে গিয়ে কোনো মেয়ের লা’শ যেন তাকে না দেখতে হয়। হে ঈশ্বর! সহায় থাকো।

 

জেনোভিয়া দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে। একবার কি সে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখবে? এখান থেকেই দূরে লাল-নীল বাতির পুলিশের গাড়িগুলো দেখা যাচ্ছে। তারাসও ঘটনাস্থলে এসেছে হয়তো। তারাস আসলে নিশ্চয়ই তাকে ওখানে দেখে খুশি হবে না। না হোক খুশি। সে কি এখন তারাসের খুশি মতো চলবে? তারাসের কাছে তো সে বিরক্তিকর মানুষ। সেও চায় তারাস তাকে দেখে বিরক্ত হোক। পাশের বাড়ির নতুন প্রতিবেশী মহিলাটিকে ঘটনাস্থলের দিকে যেতে দেখে জেনোভিয়াও পা বাড়ালো।

 

ফরেনসিকের গাড়ি, পুলিশের গাড়িগুলো  রাস্তায় দাঁড় করানো। একাধিক মানুষের কণ্ঠস্বর মিলেমিশে কোলাহল সৃষ্টি করেছে। ক্যামেরার ক্লিকের শব্দ শোনা যাচ্ছে। ফটো তোলা হচ্ছে মৃ’ত দেহের। বাড়িটার চারপাশে প্রবেশ নিষিদ্ধ টেপ লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় লোকজনেরা দাঁড়িয়ে আছে প্রবেশ নিষিদ্ধ এরিয়ার বাইরে। সবার মুখ চিন্তাগ্রস্ত, কারো কারো মুখে দুঃখেরও প্রলেপ দেখা যাচ্ছে।

পলিনার মৃ’ত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করছে তারা। 

জেনোভিয়া ভিড়ের কাছাকাছি এসে দেখলো একটা ছেলে রাস্তার পাশে বমি করছে। দৃশ্যটা দেখে কেমন গা গুলিয়ে উঠলো তার। ছেলেটাকে চিনতে পারলো সে। এই ছেলেটাই তার কাছে এখানে আসার প্রথম দিন সাহায্য চেয়েছিল। তার প্রতিবেশী।

 

একজন মহিলার কান্নার সুর করুণ করে তুলেছে পরিবেশ। এটা পলিনার মা। আপনজন বলতে একমাত্র মেয়েই ছিল তার। মেয়ে হারিয়ে বেচারি নিঃস্ব হয়ে গেছে।

তারাস ঘটনাস্থলের এদিক-ওদিক ঘুরে ঘুরে পর্যবেক্ষণ করছে। মেয়েটার মৃ’তদেহ দেখে তার মন আপনা থেকেই গা’লি দিয়ে চলছে খু’নিকে। থেঁ’তলানো এবড়োখেবড়ো র’ক্তা’ক্ত মাথাটা দেখে শিরশির করে উঠেছিল তার শরীর। আর সে খু’নিটার কাজ দেখে শিহরিত। তার ভাবতে কষ্ট হচ্ছে যে খু’নি খু’ন করে লা’শটা ভিক্টিমের বাসার সামনেই ফেলে রেখে গেছে। লা’শের অবস্থা দেখে আর এই ঘটনাস্থলটা দেখে কিছুতেই মনে হচ্ছে না যে খু’নটা এখানে বসে হয়েছে। খু’নটা অবশ্যই অন্য জায়গায় বসে হয়েছে। খু’নি ঝুঁকি নিয়ে ভিক্টিমের বাড়ির সামনে লা’শ রেখে গেল কেন? যেখানে বসে খু’ন করেছে সেখানেই ফেলে রাখতে পারতো। 

 

পলিনার লা’শ দেখে দুই পা পিছিয়ে গেল জেনোভিয়া। হৃৎস্পন্দন চমকে গিয়ে থমকে গেল। দু চোখে আতঙ্ক অবিন্যস্ত ভাবে ছড়িয়ে গেছে তার। এত বী’ভৎস!  ঘৃণায় গা ঘিনঘিন করে উঠলো। 

 

উপস্থিত ভিড়টার মধ্যে বেনিমকেও দেখা গেল। মা বলেছিল এদিকটায় না আসতে, কিন্তু কী যেন একটা আকর্ষণ তাকে চুম্বকের মতো টানছিল। আর তাই তো সে পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে উপস্থিত হয়েছে এখানে। বেনিম প্রবেশ নিষিদ্ধ এরিয়ার বাইরে দাঁড়িয়ে ভিতরে পলিনার লা’শটা দেখতে পেল। লা’শটা এখন গাড়ির ভিতর নিয়ে যাওয়ার জন্য জমিন থেকে তোলা হচ্ছে। লা’শের অবস্থা এত বী’ভৎস যে তা দেখে বেনিমের নাড়িভুঁড়ি সব বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইলো। সে এক মুহূর্ত সহ্য করতে পারলো না। দৌড়ে চলে এলো রাস্তার কর্ণারে। দুই হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। বমি করে দিলো গড়গড় করে।

জেনোভিয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল বেনিমের দিকে। এক তো সে এমন বী’ভৎস লা’শ দেখে স্তব্ধ হয়ে গেছে, তার উপর এখানে এসে দুজনের বমি করা দেখে তার শরীরটাও এখন কেমন করছে। মনে হচ্ছে অসুস্থ হয়ে পড়ছে সে।

 

বেরি উইলোর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে এমনভাবে বিমূঢ় হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। নিজের মনের সাথে তিনি চিৎকার করে বলছিলেন, ‘কেন মেয়েটার ম’রতে হলো? কেন?’

এরই মাঝে বেনিমকে দেখতে পেলেন। বেনিম এক পলক লাশটা দেখেই দৌড়ে গেল রাস্তার কর্ণারে। বমি করে দিলো। 

বেরি উইলোও ছুটে এলেন ছেলের কাছে। বেনিমের পাশে বসে বেনিমের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন,

“কেন এসেছো এখানে? আমি আসতে নিষেধ করেছিলাম তো।”

 

বেনিম প্রচণ্ড ভয়ে মাকে আঁকড়ে ধরলো। কাঁপতে কাঁপতে বললো,

“এটা সেই মেয়েটা মামা। মেয়েটা ম’রে গেছে মামা। ওকে খুব কষ্ট দিয়ে মা’রা হয়েছে! মেয়েটার নিশ্চয়ই খুব কষ্ট হচ্ছিল এত কষ্ট ভোগ করতে!”

 

জেনোভিয়া তাকিয়ে আছে মা-ছেলের দিকে। বেনিমের অবস্থা দেখে তার মনে হলো বেনিম খুব ভীতু একটা ছেলে। মাকে যেমনভাবে ভয়ে আঁকড়ে ধরলো তাতে বেনিমকে ছোট্ট বাচ্চাদের মতো মনে হচ্ছিল। অথচ এই বয়সি ছেলেদের ভিতর থাকা চাই সাহস আর উদ্যম। অথচ ছেলেটা তার চেয়েও খুব বেশিই ভীতু। সে লা’শ দেখে প্রচণ্ড ভয় পেলেও কাউকে ভয়ে আঁকড়ে ধরেনি, বী’ভৎস লা’শটা দেখে বমিও করে দেয়নি। তারাস কাছে থাকলে হয়তো ভয়ে তারাসের বুকে মুখ লুকাতো, বমি করে নষ্ট করে দিতো তারাসের ইউনিফর্ম। 

বেনিমের মা বেনিমকে নিয়ে এখান হতে প্রস্থান করলো। 

জেনোভিয়া তাকালো রাস্তার অন্যপাশে। রোমেরো এখনও জায়গাটাতে বসে আছে কপালের দুই পাশ দুই হাতে চেপে ধরে। জেনোভিয়া মনে মনে ভাবলো, আর এই একটা ভীতু ছেলে! জেনোভিয়া এখন বুঝতে পারছে ছেলেটা কেন বমি করছিল। বেনিমের মতো এই ছেলেটাও সহ্য করতে পারেনি লা’শের এত বী’ভৎস রূপ। বেনিম আর এই ছেলেটা একই রকম ভীতু। জেনোভিয়া ভীষণ অবাক হলো। দুটো মানুষের এত নিদারুণ মিল কীভাবে হয়?

 

“এখানে কী করছো তুমি? বাসায় যাও।”

তারাসের কণ্ঠ শুনতে পেয়েই জেনোভিয়া চকিতে তাকালো। দেখলো তারাস ভ্রুকুটি করে তার দিকে চেয়ে আছে। 

জেনোভিয়ার ইচ্ছা করছিল কাঠ কাঠ কণ্ঠে বলে, ‘আমার যেখানে ইচ্ছা আমি সেখানে যাব, তোমার কী তাতে? তোমার এখন আর কিছুই বলার নেই!’

কিন্তু সে এমন একটা মুহূর্তে কিছু বলতে পারল না। আর পলিনার লা’শ দেখে সে ভীষণ ভয়ও পেয়েছে। জেনোভিয়া কোনো দ্বিরুক্তি না করে দৌড়ে বাসার দিকে যেতে লাগলো।

তারাসের হঠাৎ চোখ পড়লো রাস্তার পাশে বসে থাকা ছেলেটার দিকে। ছেলেটা বমি করছে না কি?

 

________________

 

বেরি উইলো বাইরে স্বাভাবিকতা দেখালেও তার হৃৎপিণ্ডটা কাঁপছে। থরথর করে কাঁপছে। মেয়েটার বীভৎস লা’শ বার বার ভেসে উঠছে নেত্রপটে। বাইরে যে বেরি উইলো একেবারে স্বাভাবিক দেখাতে পারছে নিজেকে সেটা নয়। তার চেহারা ঘেমে উঠছে। মুখে ঝাপসা করে ছড়িয়ে পড়েছে ভীত ছায়া। তবে তিনি স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছেন। বেনিমকে সোফায় বসিয়ে দিয়ে বললেন,

“তুমি এখানে বসো। আমি ফ্রেশ ড্রিংক বানাচ্ছি তোমার জন্য।”

 

বলে বেরি উইলো চলে গেলেন। কিন্তু কিচেনে গেলেন না। দৌড়ে উঠে এলেন দোতলায়। হন্তদন্ত হয়ে ঢুকে পড়লেন বেনিমের রুমে। বাথরুমে রাখা ঝুড়িটার ঢাকনা খুললেই সেখানে বেনিমের কালো রঙের গেঞ্জি দেখা গেল। তিনি ঝুড়ি থেকে তুললেন গেঞ্জিটা। এখানে বেনিমের প্যান্টও আছে। ভয়ে খাঁচা ছেড়ে প্রাণ বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো বেরি উইলোর। হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে ক্রন্দনের সুরটাকে আটকালেন তিনি। ঘূর্ণিঝড় শুরু হলো তার মাথায়। ক্ষণকাল স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, তারপর গেঞ্জি আর প্যান্ট নিয়ে দৌড়ে গেলেন নিজের রুমে। 

খাটের নিচে গেঞ্জি আর প্যান্টটাকে ছুঁড়ে রেখে আবার দৌড়ে এলেন নিচে নামার জন্য। 

বেরি উইলো শব্দ না করে নিচে নামছিলেন। বেনিম দেখার আগেই ঢুকে পড়তে চাইছিলেন কিচেনে। কিন্তু বেনিমের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় এত সজাগ যে সবকিছুই অনুমান করতে পারলো সে। তাৎক্ষণিক সে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকালো। সিঁড়ির শেষ ধাপটায় থমকে গেলেন বেরি উইলো। 

বেনিম বললো,

“আমার ফ্রেশ ড্রিংকস মামা?”

 

ভীষণ ভীত থাকা অবস্থাতেও হাসলেন বেরি উইলো। বললেন,

“এইতো দিচ্ছি।”

 

________________

 

সম্প্রতি ঘটা মা’র্ডা’র কেসটার তদন্ত শুরু হয়ে গেছে। তদন্তের মূল দায়ভারটা পড়েছে বিশেষিত কয়েকজনের উপর। তারাসও তার অন্তর্গত। তারাসের মাথায় বর্তমানে যে প্রশ্নটা ঘুরছে সেটা হচ্ছে, তারা যে ঘটনাস্থল থেকে লা’শটা উদ্ধার করেছে সেটা তো খু’নের ঘটনাস্থল নয়। খু’নি খু’নটা অন্যত্র বসে করে লা’শটা ওখানে রেখে গিয়েছিল। তাহলে খু’নটা কোথায় বসে হয়েছে? খু’নির কি খু’ন করার জন্য সিক্রেট কোনো প্লেস ছিল? না কি খু’নটা সে উন্মুক্ত কোনো স্থানে বসে করেছে?

কলপিনোতে বিশ-পঁচিশ বছরের মধ্যে এমন নৃ’শংস ভাবে কোনো খু’ন হয়নি। এমনকি প্রতিবেশী পৌর শহরেও এমন খু’নের খবর পাওয়া যায়নি। 

 

লিওনিদ এতক্ষণ থানার বাইরে ছিল। এসে খবর দিলো,

“খু’নের ঘটনাস্থল হয়তো পেয়ে গেছি।”

 

______________

 

পুলিশের গাড়িটা এসে থামলো গলির ভিতর। নেমে পড়লো সবাই। রাস্তায় র’ক্ত দেখা যাচ্ছে! একটা জায়গাজুড়ে বিস্তৃত সেই র’ক্তের দাগ। আর সেখান থেকে র’ক্তের একটা লেপন রাস্তা ধরে ক্রমশ এগিয়ে গেছে সামনে। কিছুটা দূর এসে থেমেছে সেই লেপন। এর মানে কি লা’শটাকে টেনে আনা হয়েছে এই পর্যন্ত? তাতেই লম্বা একটা লাইন সৃষ্টি হয়েছে র’ক্তের? কিন্তু এই পর্যন্ত এসে থেমে গেল কেন লাইনটা? তার মানে খু’নি লা’শটাকে আর সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়নি। লা’শটা এখান থেকে কিছুতে তোলা হয়েছিল।

গাড়ি! গাড়িতে করে খু’নি লা’শটা ভিক্টিমের বাসার সামনে রেখে এসেছিল? আচ্ছা, কেউ কি ওই সময় এলাকার ভিতর গাড়ি ঢুকতে দেখেনি? পলিনার এলাকার  মানুষজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে।

 

তারাস এবার এই ছোটো গলির বাড়িগুলোর দিকে তাকালো। খুব একটা বাড়িঘর নেই। যা আছে তাও কেমন জীর্ণশীর্ণ। 

লিওনিদ তারাসকে বাড়িগুলোর দিকে তাকাতে দেখে বললো,

“বাড়িগুলো পরিত্যক্ত। কেউ থাকে না।”

 

তারাস অবাক হয়ে তাকালো,

“কেউ থাকে না?”

 

“কিছুদিন আগেও থাকতো, কিন্তু বর্তমানে থাকে না।”

লিওনিদ একটু দূরের বাড়িটা দেখিয়ে বললো,

“ওই বাড়িটায় একজন বৃদ্ধা থাকে শুধু।” 

 

“জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে তাকে? খু’ন সম্পর্কিত কিছু জানে?”

 

“গিয়েছিলাম বৃদ্ধার কাছে, কিন্তু বৃদ্ধা কিছু বলতে চাইলো না। বললো পরে থানায় আসবে। ম্যাক্সিম তাতে সায় দিয়েছে। আমরা আর কিছু বলিনি।”

লিওনিদ ক্ষণকালের বিরতি পালন করে বললো, 

“দুঃখের বিষয় এলাকায় কোনো সিসি ক্যামেরা নেই, আশেপাশের এলাকা গুলোয়ও নেই। থাকলে আমাদের এগোতে সুবিধা হতো।”

 

“হুম, খু’নিকে ধরা সহজ হতো। এখন ব্যাপারটা কঠিন।”

 

খু’নের ঘটনাস্থলে একটা মোবাইল পাওয়া গেল। মোবাইলটা একেবারে রাস্তার পাশে পড়ে ছিল। মোবাইলটা বন্ধ। ধারণা করা হলো এটা পলিনার মোবাইল। আর কিছু পাওয়া গেল না। 

থানায় ফিরে যাওয়ার সময় ভিক্টিমের এক প্রতিবেশী ফিওদোর এসে বললো, পলিনা গতরাতে বারে গিয়েছিল তার বান্ধবী এনির সাথে। দুজনকে বারে বসে মদ্য পান করতে দেখেছে সে।

 

পুলিশের অনুমান বার থেকে ফেরার পথেই খু’নি পলিনার উপর আক্রমণ করে।

বারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে আনুমানিক দেড়টার দিকে বার থেকে বের হয়েছে পলিনা।

 

_______________

 

পরের দিন পলিনার এলাকায় গিয়ে মানুষজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো তারা রাত দেড়টা কিংবা দুইটার দিকে কোনো গাড়ি প্রবেশ করতে দেখেছে কি না, বা  পলিনাদের বাড়ির সামনে কোনো গাড়ি দেখেছে কি না। সবার কাছ থেকে এক উত্তরই এলো। এত রাতে কেউই খেয়াল করেনি। 

তারাসের খুব রাগ লাগলো, হতাশ বোধও হলো। একটা খু’নি গাড়িতে লা’শ নিয়ে এলাকায় ঢুকে পড়েছে, আর একটা মানুষও সেটা দেখতে পেল না?

 

সন্দেহভাজন হিসেবে তিনজনের উপর পুলিশের চোখ আটকেছে। তারা হচ্ছে, পলিনার বান্ধবী এনি, পলিনার প্রাক্তন প্রেমিক বরিস, এবং এলাকার ভিতর পাওলো নামের একজন উদ্ভট ছেলে। যে বেশির ভাগ সময় নেশাগ্রস্ত থাকে। আর নেশাগ্রস্ত থাকা অবস্থায় মেয়েদের ডিস্টার্ব করে বেড়ায়। এর জন্য তাকে গ্রেফতারও করা হয়েছিল। 

তিনজনকেই ইতোমধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তিনজনই বলছে তারা খু’ন করেনি, এ খু’নের ব্যাপারে তারা কিছু জানে না। এটা স্বাভাবিক, খু’ন করলেও খু’নি এটাই বলবে সে খু’ন করেনি। তবে তারাসের মনে হচ্ছে না যে এরা কেউ খু’ন করেছে। সে এই কথাটা কেসের প্রধান ভারপ্রাপ্ত ইন্সপেক্টর ফেলিনকে বলেছিল। ফেলিন শুনে বললো,

“তুমি এতটা শিওর কীভাবে হচ্ছ? এদের খু’ন করার যুৎসই কারণ আছে। পলিনার প্রেমিক বরিস, যার সাথে পলিনা দুই মাস আগে ব্রেকাপ করেছিল। ব্রেকআপ করার কারণে পলিনার উপর ক্ষুব্ধ ছিল তার প্রেমিক। সে এই ব্রেকাপ মেনে নেয়নি। হতেই পারে ক্ষুব্ধতায় পাগল হয়ে বরিস নিজের প্রাক্তন প্রেমিকাকে খু’ন করেছে। মানুষ রেগে গেলে অনেক সময় মনুষ্যত্ব হারিয়ে পাগলের মতো হয়ে যায়, জানো না সেটা? তুমি জেনোভিয়াকে জিজ্ঞেস করে দেখো, তুমিও তো জেনোভিয়ার সাথে ব্রেকআপ করেছিলে। আমি নিশ্চিত জেনোভিয়াও একটা সময় রাগের মাথায় তোমাকে খু’ন করার কথা ভেবেছিল। কিন্তু ওর ভাবনাটা জোড়ালো ছিল না বলে আজ তুমি বেঁচে আছো। তুমি জেনোভিয়াকে জিজ্ঞেস করে দেখো বিষয়টা সম্পর্কে।”

 

তারাস বিরক্ত হয়ে বললো,

“এই ব্যাপারটায়ও জেনোভিয়াকে টানছেন? প্লিজ, কথার মাঝখানে জেনোভিয়ার নামটা নেওয়া বন্ধ করেন। আর জেনোভিয়া তেমন মেয়ে না যে আমাকে খু’ন করার কথা চিন্তা করবে। এমনটা আপনি করতে পারেন। আপনি হয়তো স্যানলিনাকে খু’ন করার কথা ভেবেছিলেন।”

 

ফেলিন অবিশ্বাস্য গলায় বললো,

“কী বললে? আমি? আমি স্যানলিনাকে খু’ন করার কথা ভেবেছিলাম? অসম্ভব, আমি ওকে খুব ভালোবাসতাম। আমার জীবনের বিনিময়েও ওর গায়ে একটা ফুলের টোকা লাগতে দিতাম না। ও যখন আমার সাথে ব্রেকআপ করে টমকে বিয়ে করলো, তখন আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম, কিন্তু ওর প্রতি আমার বিন্দু পরিমাণ রাগ হয়নি। প্রকৃত ভালোবাসলে ভালোবাসার মানুষটার সাথে রাগ করা যায় না। হ্যাঁ, অভিমান করা যায়। আমি ওকে এতই ভালোবাসতাম যে ও আমার সাথে ব্রেকআপ করার পরও আমি ওর বিয়েতে গিয়েছিলাম ওকে দেখার জন্য। আর তুমি এত বড়ো একটা কথা বলতে পারলে আমাকে?”

 

ফেলিনের চোখে পানি এসে গেল স্যানলিনার কথা মনে পড়ায়। চোখ মুছে নিলো সে। হঠাৎ গলার সুর পরিবর্তন করে বললো,

“কিন্তু বরিস পলিনাকে ভালোবাসেনি। ওর পলিনাকে খু’ন করার সম্ভাবনা ৭০%।”

 

“৭০ নয় ৪০।”

 

“তুমি বেশি বোঝো।” রাগলো ফেলিন।

 

তারাস হেসে বললো,

“আর আপনি বোঝেনই না।”

 

ফেলিন বললো,

“এনিরও খু’ন করার জন্য একটা স্বচ্ছ কারণ আছে। ওর খু’ন করার সম্ভাবনা ৮০%। ওই তো রাতে পলিনাকে বারে ডেকেছিল। কেন ডেকেছিল? যাতে মেয়েটাকে মাতাল বানিয়ে মা’রতে সুবিধা হয়।”

 

“আমার সেটা মনে হয় না। পলিনা সুন্দর হওয়ার জোরে এনির জায়গায় চাকরিটা পেয়েছিল বলে এনি ওকে মা’রতে পারে না। এটা সামান্য ব্যাপার।”

 

“পারে। তুমি পৃথিবীর হালচাল কিছুই বোঝো না। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ও মানুষকে উন্মাদ করে তোলে। তাদের কাছে আসলে এটা ক্ষুদ্র বিষয় নয়, তাদের কাছে বিষয়টা বড়ো। আমরা সাধারণ জনগণ এটাকে ক্ষুদ্র হিসেবে ধরি।”

 

তারাস ফেলিনের কথার প্রত্যুত্তর করলো না। বেশ কিছু সময় নীরবতার পর বললো,

“পলিনাকে খু’ন করার বেশি সম্ভাবনা পাওলোর। পলিনাকেই বেশি ডিস্টার্ব করতো ও। বাজে ভাবে ডিস্টার্ব করতো।”

 

“কিন্তু ও যে বললো ও সেদিন পিটারগোফ ছিল।”

 

“সন্দেহভাজনদের সাক্ষ্য অনুযায়ী তো তাহলে আর দুজনও ছিল না পলিনার কাছে। মিথ্যা বলা অপরাধীদের স্বভাব।”

 

“আমি ভালো করেই জানি সেটা। আর এই ডায়লগটা তুমি আমার কাছ থেকেই শিখেছো। সুতরাং আমার ডায়লগ আমাকে ফিরিয়ে দিয়ে তুমি নায়কভাব নিয়ো না।”

 

তারাস হাসলো। ফেলিন মানুষ হিসেবে অমায়িক। 

কক্ষের ভেজানো দরজা খুলে সাব ইন্সপেক্টর মাইক প্রবেশ করলো।

 

“পাওলোর বিষয়ে ইনফরমেশন পাওয়া গেছে।” বলতে বলতে এগিয়ে এলো মাইক।

“ও সত্যি বলেছে। ও তখন পিটারগোফের একটা ক্লাবে ছিল। আমার এক বন্ধু ওখানকার ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর। ও আমাকে সিসিটিভি ফুটেজের ভিডিয়ো পাঠিয়ে সাহায্য করেছে।”

 

“বাকি দুজনের ব্যাপারে কিছু জানতে পেরেছো?” ফেলিন প্রশ্ন করলো।

 

“তাদের ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া হয়নি এখনও।”

 

“তাহলে নাও তাড়াতাড়ি। এভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে হবে না। দুটো দিন পার হয়ে যাচ্ছে অথচ আমরা…”

ফেলিন কথা শেষ করলো না। বিরক্তি ছড়ালো আনন জুড়ে।

 

“ঠিক আছে, আমি খোঁজ নিচ্ছি।”

মাইক বেরিয়ে গেল কক্ষটি থেকে। 

 

তারাস চেয়ারে বসে ছিল, সেখান থেকে উঠে বললো,

“আমার পেট সম্পূর্ণ খালি। কিছু খাবার খাওয়া জরুরি।”

 

“আমিও কিছু খাইনি।”

 

“এ কথা বলে লাভ নেই। আমি নিজের রুবল খরচ করে কেবল নিজেই খাবো।”

 

“তো খাও, আমি কি বলেছি আমি তোমার রুবল নিয়ে খরচ করবো?”

 

তারাস মুচকি হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল। ফেলিন একজন অমায়িক মানুষ হওয়ার পাশাপাশি মজার মানুষও।

 

__________________

 

বিকেলের আলো মরে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। বেনিম ওর দোতলার বেডরুমের জানালার কাছে বসে আছে। সোনালি রোদ্দুর ওর সুন্দর মুখ খানিতে পড়ে নাচছে। মাথায় কাল থেকে একটা শব্দই চরকির মতো ঘুরছে ওর। সেটা হলো, ‘খু’ন’! ক্রমে ক্রমে মানসপটে ভেসে উঠছিল মেয়েটার বীভৎস লা’শ। মেয়েটার মাথা থেঁ’তলানো ছিল। সারা মুখের এমন অবস্থা ছিল যা থেকে ওটা পলিনা কি না সেটা বিবেচনা করাই দায় ছিল। সারা শরীরও ছিল ক্ষ’ত-বি’ক্ষত। এমন নৃ’শংস ভাবে কে মা’রলো মেয়েটাকে?

পুলিশ কি তদন্ত করছে না? কত সময় লাগবে তাদের খু’নিকে ধরতে? বেনিমের মনে হচ্ছে শীঘ্রই তারা খু’নিকে ধরতে সক্ষম হবে না। আদৌ ধরতে পারবে কি না সে বিষয়ে সে সন্দিহান। কারণ যে খু’ন করেছে সে খুব সেয়ান। বেনিম মেয়েটার আ’ঘা’ত গুলো তখন অতটা দেখার সুযোগ পায়নি। কিন্তু পরে নিউজে ছবি দেখেছে। আ’ঘাত গুলো দেখে বোঝা যাচ্ছিল খু’নি অত্যন্ত দক্ষশীল। আ’ঘাত গুলো পাকাপোক্ত হাতের ছিল। এই দিক দিয়ে আবার খু’নিটার প্রশংসাও করতে ইচ্ছা হয়। বেনিম একটা কথা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে, যে-কোনো কাজই দক্ষতার সাথে পাকাপোক্ত হাতে করা উচিত। অনেকে আছে যারা খু’ন করে ঠিকই, কিন্তু তাদের খু’নের ধরন, অ’স্ত্র চালানো অপক্ক। নিপুণতা থাকে না। দক্ষতার সাথে সম্পূর্ণ হওয়া যেকোনো কাজই ভালো লাগে। হোক সেটা খু’ন।

বেনিমের হঠাৎ মনে হলো সে একটু বেশি বেশিই ভাবছে। ভাবনাচিন্তা তো থাকবে পুলিশদের। সে কেন ভাবছে? আর ভাববে না। উঠে দাঁড়ালো বেনিম। দোতলা থেকে নিচে নামলো। দরজা খুলে বেরিয়ে এলো বাইরে। সূর্যের ম্লান আলো সব যেন তাদের দোর গোড়ায় এসেই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে।

রাস্তার ওপাশে চোখ পড়তেই দেখলো গাছের ছায়ায় বেঞ্চিতে বসে আছে একটা মেয়ে। অন্যমনস্ক মেয়েটা। হাতে কুকুরের বেল্ট ধরে আছে। মেয়েটার পায়ের কাছে বসে আছে সাদা আর বাদামি রঙের একটা কুকুর। কুকুরটা খুব সুন্দর দেখতে।

 

জেনোভিয়া এই এলাকায় অনেক বছর যাবৎ আছে। এর আগে কখনও এমন খু’নের ঘটনা ঘটেনি। তবে একটা খু’ন হয়েছিল দেড় বছর আগে। লোকটাকে গু’লি করে মা’রা হয়েছিল শত্রুতার বশে। কিন্তু এত নির্মম ভাবে খু’ন… গা শিরশির করে উঠলো জেনোভিয়ার। ভয়ে সে ঘুমাতে পর্যন্ত পারেনি রাতে। 

পলিনা মেয়েটার সাথে তেমন বন্ধুত্ব ছিল না তার। সাধারণ সৌজন্যতাও ছিল না তাদের মাঝে। এত বছরের মাঝে খুব কমই কথা হয়েছিল। আসলে পলিনা মেয়েটা  শৌখিন ছিল না। যে সকল মানুষ শৌখিন নয় তাদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা যায় না। তবে সে কষ্ট পাচ্ছে পলিনার মৃ’ত্যুতে। মেয়েটার সাথে কথা না হলেও রোজ একবার হলেও চোখের দেখা হতো। 

মনটা ক্রমশ অন্ধকারপূর্ণ এক অনুভূতিতে তলিয়ে যেতে লাগলো জেনোভিয়ার।

 

“পলিনার কথা ভাবছো?”

 

প্রশ্নটায় জেনোভিয়া প্রায় চমকে উঠলো। বেঞ্চের অপর দিকে নতুন প্রতিবেশী ছেলেটা কখন এসে বসেছে টের পায়নি। 

ছেলেটা তার গোল ফ্রেমের কাচ ডিঙিয়ে তাকালো জেনোভিয়ার দিকে।

 

“ওর কথা ভাবছো?” আবারও প্রশ্ন করলো বেনিম।

 

জেনোভিয়া টের পেল তার কিছুটা অস্বস্তি বোধ হচ্ছে। অস্বস্তি বোধটাকে গিলে নিয়ে বললো,

“হ্যাঁ, আসলে ওর খু’নের ঘটনাটা যাচ্ছে না আমার মাথা থেকে। কত নির্মম ভাবে মা’রা গেল ও!”

 

“হুম, অত্যন্ত নির্মম ছিল!” দুঃখ জড়িত দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলো বেনিম। 

“আমি চাই খু’নিটা দ্রুত ধরা পড়ুক। ওর মতো খু’নির বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। মৃ’ত্যুদণ্ডই ওর একমাত্র প্রাপ্য।”

একটু বিরতি নিয়ে বললো,

“যাই হোক, আমাকে কি চিনতে পেরেছো? আমি…”

 

“বেনিম কক্স।” বেনিমের মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বললো জেনোভিয়া, “তোমার মা’র সাথে একবার আলাপ হয়েছিল আমার। সে তোমার ব্যাপারে বলেছে আমাকে।”

 

“ও আচ্ছা।” হেসে বললো বেনিম, “আর তুমি?”

 

“আমি জেনোভিয়া।” নিজের বাসার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললো, “এই বাড়িটা আমার।”

 

বেনিম একটু চমকানো গলায় বললো,

“আমাদের পাশেই থাকো, অথচ কি না এই সাত দিনেও আমাদের দেখা হয়নি?”

 

“আমি দেখেছি তোমাকে। তুমি হয়তো কখনও লক্ষ করোনি আমাকে।”

 

“হ্যাঁ আমি দেখিনি।” বেনিম আশেপাশে তাকিয়ে বললো,

“এলাকাটা ভালোই। সবাই অত্যন্ত মিশুক। কিন্তু হুট করে একটা মা’র্ডার কেমন আঁধার ছড়িয়ে দিয়ে গেছে। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি যেন এমন কোনো ঘটনা আর না ঘটে।”

 

বেনিম তাকালো জেনোভিয়ার দিকে। জেনোভিয়ার গলার লকেটটা সহসা তার নজরে পড়লো। কিছুটা সরু হলো বেনিমের দৃষ্টি।

 

___________________

 

সন্ধ্যার আকাশে গোলাপি, বেগুনি রঙের ছটা। মৃদু সমীরণে গাছের পাতা দুলছে। থানার ভিতরটা শান্ত। যে যার কাজ করছে। ফেলিন ভাবছিল মা’র্ডা’র কেসটা নিয়ে। কে করতে পারে খু’নটা? তার সন্দেহ পলিনার প্রেমিক আর না হলে এনি খু’নটা করেছে। কিন্তু এত নৃ’শংস ভাবে খু’ন করা কি ওই দুই জনের পক্ষে সম্ভব? না কি খু’নি বাইরের কেউ? মস্তিষ্কে গভীর চাপ পড়তে চিনচিনে ব্যথা সৃষ্টি হচ্ছে। 

ডিজিটাল ফরেন্সিকের রিপোর্ট থেকে দেখা গেছে গত দুইদিনে পলিনার মোবাইলে এনি ব্যতীত আর কেউ কল করেনি। দুই দিন আগে পলিনার প্রেমিক বরিস কল দিয়েছিল। অগণিতবার কল দিয়েছিল, অনেক ম্যাসেজও আছে। প্রত্যেকটা ম্যাসেজেই সে পলিনার সাথে সমঝোতা করার কথা বলেছে। সম্পর্কটা আবার আগের মতো করার কথা বলেছে। কিন্তু পলিনা ওর কোনো কল রিসিভ করেনি কিংবা ম্যাসেজেরও উত্তর দেয়নি। ফেলিনের সন্দেহ বরিসের উপরই বেশি। পলিনা বরিসের কথার গুরুত্ব দেয়নি বলে বরিস রেগে গিয়ে হয়তো খু’নটা করেছে।

 

লিওনিদের কণ্ঠে ফেলিনের ধ্যান ভাঙে,

“সেই বৃদ্ধা এসেছে। বলছে সে পলিনার খু’নটা হতে দেখেছে।”

 

(চলবে)

 

 রঙিলা রাতের কালো অশ্রু (০৪) 

লেখা: ইফরাত মিলি

__________________

 

মিসেস বেলকাকে জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষে নিয়ে আসা হয়েছে। তার সম্মুখের চেয়ারে বসে আছে ফেলিন। ফেলিনের পাশে দাঁড়িয়ে আছে তারাস আর লিওনিদ। 

জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষের বাইরে থানার প্রধান ও আরও দুইজন ইন্সপেক্টর দাঁড়িয়ে আছে। ভিতরে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হবে। ক্যামেরা প্রস্তুত করে নেওয়া হলো। সাক্ষ্য রেকর্ড করা হবে। 

 

ফেলিন বৃদ্ধাকে জিজ্ঞেস করলো,

“তো আপনি মা’র্ডারটা হতে দেখেছেন?”

 

বৃদ্ধার বয়স ষাটোর্ধ্ব। শরীরের চামড়া কুঁচকে গেছে। মুখে কুঁচকানো চামড়ার ভাঁজ। দেহখানি শুকনো। মাথার কাঁচা-পাকা চুলগুলো ববকাট দেওয়া। পরনে গোলাপি আভার গাউন। তিনি সতর্কপূর্ণ কণ্ঠে বললেন,

“হ্যাঁ, ঘটনাটা ঘটেছে ঠিক আমার বাসার সামনে। আমি সে রাতে আমার বোনের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে ফিরতে অনেক রাত হয়। এরপর ঘুমানোর প্রস্তুতি নিতে নিতে আরও রাত হয়ে যায়। ঘুমের ওষুধটা কেবল খেয়েছিলাম, এর মাঝেই রাস্তায় কার যেন চিৎকার শুনতে পেয়ে আমি দৌড়ে আমার বেডরুমের জানালায় এসে দাঁড়ালাম। দেখতে পেলাম একটা মেয়েকে কে যেন মা’রছে। আমি এত ভয় পেয়েছিলাম যে চিৎকার পর্যন্ত করতে পারিনি, কিংবা পুলিশকে জানানোর কথাও সে সময় আমার মাথায় আসেনি।”

 

“কিন্তু আপনি পরেও পুলিশদের কিছু জানাননি। আপনি যে খু’নটা হতে দেখেছেন সেটা আরও আগেই আমাদের ইনফর্ম করা উচিত ছিল। কেন করেননি?”

 

“আমি ভয় পেয়েছিলাম। যদি খু’নি জানতে পারে আমি আপনাদেরকে ইনফরমেশন দিয়েছি তাহলে যদি ও আমাকে খু’ন করে? এই ভেবে আমি প্রথমে নিশ্চুপ ছিলাম। কিন্তু আমার মানবতা আমাকে শান্তিতে থাকতে দিচ্ছিল না। তাই আমি পুলিশকে জানানোর সিদ্ধান্ত নিই। জা’নো’য়া’র খু’নিটার উপযুক্ত শাস্তি হওয়া উচিত।” জোরালো হয়ে উঠলো বৃদ্ধার কণ্ঠস্বর। 

 

ফেলিন বেশ আশা নিয়ে বললো,

“আপনি খু’নিকে দেখেছেন?”

 

বৃদ্ধার মুখ হঠাৎ কেমন শুকিয়ে এলো।

“রাস্তায় ভালো আলো ছিল না। আর আমার চোখেও সমস্যা আছে। মুখ দেখিনি।”

 

ফেলিন হতাশার নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো।

“বডি তো দেখেছেন। খু’নি ছেলে না মেয়ে?” ফেলিনের প্রশ্ন।

 

বৃদ্ধার মুখ এবার আরও শুকিয়ে গেল। 

“সেটাও বলতে পারবো না। বললাম না আমার চোখে সমস্যা আছে। বোঝা যাচ্ছিল না খু’নি ছেলে না মেয়ে।”

 

বৃদ্ধাকে আরও অনেক ভাবে জিজ্ঞাসা করেও লাভ হলো না। কোনো ইনফরমেশনই দিতে পারলো না সে। সবাই আশার আলো দেখতে পেয়েছিল বৃদ্ধার কারণে, কিন্তু বৃদ্ধার সাক্ষাৎকার গ্রহণের পর সে আশা ভিত্তিহীন হয়ে পড়লো। রাগে ফেলিনের মাথা ফে’টে যাচ্ছে। যখন শুনলো বৃদ্ধা খু’নটা হতে দেখেছে আনন্দে গদগদ হয়ে উঠেছিল সে। মনে হচ্ছিল খু’নিকে সহজেই ধরতে পারবে। কিন্তু কে জানতো বৃদ্ধার সাক্ষ্য সম্পূর্ণ অকেজো হবে? বৃদ্ধা খু’নি ছেলে না মেয়ে সেটাই বলতে পারছে না। উনি না কি আবার খু’নটা হতে দেখেছে! এ দেখা না দেখার সমান।  

 

________________

 

উজ্জ্বল দীপ্তি জ্বলছে। সেই দীপ্তিতে এখন দেখা যাচ্ছে রোমেরোর লিভিংরুমটা। এ ঘরে রয়েছে একটা মাত্র সোফা, সোফার সামনে একটা ছোটো টেবিল, দেওয়াল ঘেঁষে আছে একটা বুক শেলফ। সোফার সম্মুখের দেওয়াল ঘেঁষে আছে একটা স্ট্যান্ড। ওটা টিভি রাখার স্ট্যান্ড। বেশ বড়োসড়ো একটা টিভি রাখা ওটার উপর। খুব সামান্য জিনিসই আছে লিভিংরুমে। কিন্তু একজন মানুষের বসবাসের জন্য এই ঢের সম্পদ। ঘরটাকে একা একা গুছাতে অনেক সময় এবং শ্রম গিয়েছে তার। তবে এর ফলে পেয়েছে গোছানো একটা ঘর। এটা তাকে আনন্দ দেয়। সোফার সামনের টেবিলটার উপর এই মুহূর্তে চারটা জিনিস আছে। দুটো মদের বোতল, একটা মোবাইল, আর একটা নোট প্যাড। সন্ধ্যা থেকে গান লেখার চেষ্টা করছিল। কোনো মতে চারটা লাইন লিখতে সক্ষম হয়েছে। এরপর মস্তিষ্ক সামনে চলতেই চাইলো না। লেখার মাঝে হঠাৎ মনে পড়লো বিশ দিন আগে দেখা সুন্দরী মেয়েটার কথা। না, ওই মেয়ে আর একটা শব্দও বের হতে দিলো না তার মাথা থেকে। সে টুক করে বেডরুমে গিয়ে ল্যাপটপটা নিয়ে এলো। ম্যাসেঞ্জারে ঢুকে নক করলো আনাস্তাসিয়া নামের মেয়েটাকে। 

 

‘ইসপাকোইনোই নোচি! কেমন আছো?’

লিখে পাঠালো রোমেরো।

 

মেয়েটার থেকে একটু পরেই উত্তর এলো,

‘আমি ভালো আছি। তোমার কী খবর?’

 

এভাবে টুকটাক কথাবার্তা চলতে লাগলো দুজনের মাঝে। প্রায় ত্রিশ মিনিট ধরে দুজন একে অপরের সাথে কথা বললো। প্রথম দেখার দিনই দুজনের মাঝে বন্ধুত্ব হয়েছিল। তারপর থেকে একটু একটু করে কথাবার্তাও শুরু হয়। রোমেরো মেয়েটাকে অনেক বার বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে সে মেয়েটার প্রতি আগ্রহী। সে বরাবর চেষ্টা করেছে বন্ধুত্ব থেকে সম্পর্কটা আরও কিছুটা বিশেষ করতে। কিন্তু মেয়েটা সেসব বুঝতেই চায় না। আজও চেষ্টা করেছিল সে, কিন্তু মেয়েটা বুঝলো না সেসব। আর যদি বুঝেও থাকে তাহলে হয়তো পাত্তা দিলো না। রোমেরো হতাশ হয়ে আবারও শুভরাত্রি জানিয়ে ল্যাপটপ অফ করে রাখলো। মদের একটা বোতল সে খালি করেছিল অনেক আগে, যে সময় গান লেখার চেষ্টা করছিল। অন্যটাও প্রায় শেষ করে ফেলেছে আনাস্তাসিয়ার সাথে কথা বলার সময়। যেটুকু ছিল তলানিতে সেটুকু এক চুমুকে শেষ করলো। শরীরটা এলিয়ে দিলো সোফার সাথে। টেবিল থেকে নোটপ্যাডটা হাতে নিয়ে গানের যে চার লাইন লিখেছিল সেটা শব্দ করে পড়লো,

‘একটা গ্রীষ্ম, একটা দিন, একটা ঘণ্টা, একটা মিনিট, একটা সেকেন্ড, আমি তোমার কথা ভেবে পার করি।

তোমার সোনালি চুলে আমার আঙুল গুলো হারিয়ে যায় অচেতন খেয়ালে। 

আমার দৃষ্টিও বারংবার ছুটে চলে যায় তোমার দৃষ্টিতে।

ওই মায়াবী দৃষ্টিতেই করেছো আমাকে বন্দি।’

 

বিরক্তিতে মনটা একেবারে জীর্ণশীর্ণ হয়ে গেল রোমেরোর। এ কেমন আজেবাজে কথা লিখেছে সে! পৃষ্ঠাটা একটানে ছিঁড়ে ফেললো। তারপর কয়েক টুকরো করে ফেলে দিলো ফ্লোরে। 

 

রোমেরো গান ভালোবাসে। ছোটো বেলা থেকে গান প্রিয় তার। ছোটো বেলায় যখন অপরের গান শুনতো তখন ভাবতো, যদি এমন সুন্দর কিছু আমিও সৃষ্টি করতে পারি? এই ভাবনা থেকেই শুরু হয়েছিল তার গান লেখা এবং গানে সুর প্রদান। যখন ষোলো বছর বয়স তখন বাবা ছেলের গানের প্রতি ভালোবাসা লক্ষ করে একটা ভায়োলিন কিনে দিয়েছিল। রোমেরো একজন জার্মান লোকের কাছ থেকে ভায়োলিন বাজানো শিখেছিল। কিন্তু ভায়োলিন তার ভালো লাগতো না। এরপর সে একটা গিটার কেনে। গিটার বাজানোটা সে একা একাই রপ্ত করেছিল। এ যাবৎ অনেক গান সে লিখেছে। তার যে দক্ষতা তাতে সে চাইলে একজন বিখ্যাত গায়ক এবং গান লেখক অনায়াসে হয়ে যেতে পারতো। গান রেকর্ডের প্রস্তাবও এসেছিল। কিন্তু সে করেনি। কেন করেনি এ প্রশ্নের একটাই উত্তর, তার ভালো লাগেনি তাই করেনি। 

রোমেরো জীবনে একজন গার্লফ্রেন্ডের প্রয়োজন অনুভব করছে। তার একজন গার্লফ্রেন্ড প্রয়োজন। আনাস্তাসিয়া তো তাকে বোঝারই চেষ্টা করছে না। যদি আনাস্তাসিয়া তাকে বুঝতো, তার প্রেমিকা হতে ইচ্ছুক হতো, তাহলে সে আনাস্তাসিয়াকে ইয়েকাতেরিনবার্গ থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গ নিয়ে আসতো। দুজন একসাথে থাকতো, ঘুরতো, ভালোই কাটতো সময়। আনাস্তাসিয়ার যদি কখনও মনে হতো সে রোমেরোর সাথে থাকতে চায় না, তাহলে রোমেরো তার প্রতি কোনো অভিযোগ না করে তাকে চলে যাওয়ারও সুবিধা দিতো। কারণ এটা রোমেরোর সাথে প্রথমবার নয়। সে এই অভিজ্ঞতার সাথে পূর্ব পরিচিত। অতীতে তার তিনজন গার্লফ্রেন্ড ছিল। কেউই তার সাথে বেশি দিন থাকেনি। প্রত্যেকে বেইমানের মতো চলে গেছে। রোমেরো জানে না এর কারণ কী। সে সুন্দর, ভদ্র, শিক্ষিত এবং প্রচুর অর্থও আছে তার। তবুও কেন গার্লফ্রেন্ডরা তাকে ছেড়ে যায়?

অতীতের কথা মনে করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো রোমেরো। তার বেদনা জর্জরিত অতীতের কথা স্মরণকালে হঠাৎ পলিনার কথা মনে পড়লো। পলিনা মেয়েটা তার গার্লফ্রেন্ড হিসেবে কেমন হতো? সৌন্দর্যের দিক দিয়ে বলতে গেলে দুজনকে ভালোই মানাতো, কিন্তু ব্যবহারের দিক দিয়ে মেয়েটা খুবই বাজে ছিল। না, একদমই মানাতো না দুজনকে। রোমেরোর ধারণা এই শহরের একটা মেয়েও ভালো না, এদের ব্যবহার সুন্দর নয়। এদের ভিতর মানবতার বীজ অঙ্কুরিত হয়নি। এই শহরে কতদিন যে থাকতে পারবে সে বিষয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগছে সে। থাক, পলিনার কথা বাদ দিক। মৃ’ত মেয়েটার কথা মনে না করাই ভালো। একটা মেয়েকে নিয়েও তার এই মুহূর্তে ভাবা উচিত নয়। কিন্তু রোমেরোর ভাবনা তো সমাপ্তি টানলো না। সোনালি চুলের মেয়েটার কথা মনে পড়লো, এখানে আসার পর প্রথম যার থেকে বাজে ব্যবহার পেয়েছিল। মেয়েটাকে চেনা চেনা লাগছিল। মনে হচ্ছিল এর আগে কোথাও দেখেছে। কিন্তু কোথায়? যদি নাই দেখে থাকবে তাহলে শুধু শুধু এরকম মনে হতে যাবে কেন?

 

________________

 

লা’শ! চোখের পর্দায় একটা বী’ভৎস লা’শের ছবি ঝিরঝির করে ভাসছে। ঘুমের ভিতরই ছটফট করতে লাগলো জেনোভিয়া। সে সহ্য করতে পারছে না ওই লা’শের দৃশ্য। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। ধড়ফড় করে উঠে বসলো জেনোভিয়া। ভারী নিঃশ্বাস পড়ছে। ঘাম ফুটে উঠতে লাগলো চামড়া ফুঁড়ে। গায়ের স্লিভলেস গেঞ্জিটা ভিজে গেছে ঘামে। শ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে তার।

ধীরে ধীরে ধাতস্থ হয়ে এলো জেনোভিয়া। শুয়ে পড়লো আবারও। বড়ো করে নিঃশ্বাস ফেলতে লাগলো। সে যে বী’ভৎস লা’শটা দেখেছে সেটা পলিনার নয়। তার খুব আপন একজন মানুষের! কিন্তু সে লা’শটার অবস্থাও পলিনার লা’শের মতোই ছিল। মাথা থেঁ’তলানো, র’ক্ত মাখা! জেনোভিয়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। নয়ন নীর ঝরলো চোখ থেকে। ওই মানুষটা যদি এখন বেঁচে থাকতো তাহলে জীবনটা আরও বেশি সুন্দর হতো। ভয়ে দুরু দুরু বুক নিয়ে রাত জাগতেও হতো না। জেনোভিয়া বিড়বিড় করে বললো,

“তোমায় মিস করছি!”

 

(চলবে)

 

 রঙিলা রাতের কালো অশ্রু (০৫)

লেখা: ইফরাত মিলি

___________________

 

[১৮ জানুয়ারি, ২০১৩; মস্কো, রাশিয়া]

 

প্রকৃতির কোনো রং নেই। সব সাদা-কালো। ন্যাড়া গাছগুলোর মাথায় বরফ ঘাপটি মেরে আছে। কখনও সেই বরফ ভেঙে পড়ছে ডাল থেকে। বরফের পুরুত্ব অনেক। রাস্তা থেকে বরফ অপসারণ না করা হলে জেনোভিয়া হয়তো কোমর পর্যন্তই ডুবে যেত বরফে। 

তেরো বছরের কিশোরী জেনোভিয়ার পরনে ভারী মোটা শীতের জ্যাকেট। হাতে হাত মোজা। কান দুটো আর মাথাটাকে শীত থেকে বাঁচাতে টুপি পরেছে। পায়ে স্নো বুট। পিঠে ব্যাগ। বন্ধুদের সাথে বেরিয়েছিল রাতের শহর দেখতে। মেলা বসেছে আজকে শহরের সবচেয়ে বড়ো মার্কেটটায়, দেখতে না গেলে হয়? 

এখনও স্নো ফল হচ্ছে। শীতে শহরটা বরফেই ঢাকা থাকে। বরফ ঢাকা শহরের তীব্র শীতকে পাশ কাটিয়ে মানুষ তার কর্ম চালিয়ে যায় নিত্য রুটিনে। 

বাস থেকে নেমে আর কোনো গাড়ি নেয়নি জেনোভিয়া। বাস স্ট্যান্ড থেকে তার বাড়ি  পনেরো মিনিটের পথ। বাস স্ট্যান্ড থেকে বাসা পর্যন্ত তার পায়ে হেঁটে যাওয়ারই অভ্যাস। বাসে বসে মাকে কল করেছিল। কিন্তু মা কল রিসিভ করেনি। হয়তো সারাদিন কাজ করে এসে ঘুমিয়ে পড়েছে। মা অনেক খাটে। বাবা নেই যে জেনোভিয়ার। মাকেই সব দিকটা সামলাতে হয়। জেনোভিয়ার বাবা ছিল একজন মদে আসক্ত লোক। বছরের বারোটা মাসই সে নেশাগ্রস্ত থাকতো। আগে কাজকর্ম করলেও যে সময় থেকে মদে পুরোপুরি ভাবে আসক্ত হয়ে গেল সেই থেকে ছেড়ে দিলো কাজকর্ম। পরিবর্তে ঘরের টাকা নিয়ে অপচয় করতো মদের পিছনে। এসব আর সহ্য হয়নি জেনোভিয়ার মায়ের। সে জেনোভিয়াকে নিয়ে সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে চলে আসে মস্কো শহরে। বাবা এখন আর বেঁচে নেই। একদিন মাতাল অবস্থায় রেল লাইনে কাটা পড়েছে! সেন্ট পিটার্সবার্গে শুধু দাদি আছে এখন। মা দাদিকে মস্কো নিয়ে আসতে চেয়েছিল, কিন্তু সে সেন্ট পিটার্সবার্গ ছাড়তে পারেনি। ওই শহর তার খুব আপন। ওখানেই যে তার স্বামী-সন্তানের সব স্মৃতি। 

 

আর মাত্র তিন মিনিটেই বাড়ি পৌঁছে গেল জেনোভিয়া। বাড়ির সামনের বরফ সরানো হয়নি। গাড়িটা বরফে ঢেকে গেছে। চারপাশ থেকে গাড়িটাকে চেপে ধরেছে বরফের দল। জেনোভিয়া বরফের উপর পা ফেলে দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। নক করতে গিয়ে দেখলো দরজা খোলা। অবাক হলো সে। মা কখনও দরজা খোলা রাখে না। ভুলে খুলে রেখেছে না কি? জেনোভিয়া দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে ডাকলো,

“মামা।” 

 

কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। পুরো বাড়ি অন্ধকারে ঢেকে আছে। একটা লাইটও জ্বালানো নেই। জেনোভিয়ার কাছে অস্বাভাবিক ঠেকছে পরিবেশটা। সে আবার উচ্চৈঃস্বরে ডাকলো,

“মামা!”

 

নিস্তব্ধতা কানে তালা লাগিয়ে দিচ্ছে। পিঠের ব্যাগটা খুলে মোবাইল বের করলো জেনোভিয়া। ফ্লাশ লাইট জ্বেলে সুইচ বোর্ডের কাছে গিয়ে বাতি জ্বালানোর জন্য সুইচ চাপলো, কিন্তু বাতি জ্বললো না। হচ্ছেটা কী? বাসার ইলেক্ট্রিসিটিতে প্রব্লেম হয়েছে? জেনোভিয়া আর সুইচ চাপাচাপি করলো না। মাকে ডাকতে ডাকতে পায়ে পায়ে এগিয়ে চললো সামনে। আর কয়েক পা এগোতেই ফ্লাশ লাইটের আলোয় এমন দৃশ্য দেখলো যে তাতে ওর হাত কেঁপে মোবাইল পড়ে গেল, মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো চিৎকার। দুই কদম পিছনে ছিটকে এসে পড়ে গেল জেনোভিয়া। চোখে-মুখে অবিশ্বাস্য আতঙ্ক, উদ্বেগ। বড়ো বড়ো চোখে সে সামনে মেঝেতে চেয়ে আছে।  মুখ ফুটে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো, ‘মামা’ শব্দটি।

 

মেঝেতে পড়ে আছে ক্রিস্টিনা। মেঝে ভাসছে র’ক্তে। ক্রিস্টিনার র’ক্ত! তার মাথা র’ক্তা’ক্ত, ক্ষ’ত-বি’ক্ষত! পেটে, বুকে, হাতে, গলায় অজস্র গভীর ক্ষ’ত দেখা যাচ্ছে। জেনোভিয়া চিৎকার করে ডেকে উঠলো, “মামা!”

 

ক্রিস্টিনার শরীর একটু নড়ে উঠলো। জেনোভিয়া হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে এলো মায়ের কাছে। মায়ের মুখমণ্ডল স্পর্শ করে বললো,

“কী হয়েছে মামা?” জেনোভিয়ার কপোল বেয়ে জলের ধারা কলকল করে গড়িয়ে পড়ছে, “কীভাবে হলো এসব? মামা!”

 

ক্রিস্টিনা কিছু বলতে পারলো না। গলা দিয়ে গড়গড় মতন একটু আওয়াজ বের হলো শুধু। জেনোভিয়া মায়ের র’ক্তা’ক্ত দেহে হাত বুলিয়ে বললো,

“মামা আমার ভয় করছে, ওঠো প্লিজ। মামা… কোত্থেকে কী হলো?”

 

হঠাৎ পিছন থেকে পুরুষালি কণ্ঠের গান ভেসে এলো। দু কান সজাগ হয়ে উঠলো জেনোভিয়ার। হিম হয়ে গেল শরীরের র’ক্ত। বুকের ভিতর হাতুড়ি পেটার শব্দ হচ্ছে। জেনোভিয়া আস্তে করে মাথা ঘুরিয়ে তাকালো। নজরে পড়লো একজন মানুষের অবয়ব। কিন্তু মানুষটাকে দেখতে পেল না। সারা ঘর অন্ধকার। স্ট্রিট লাইটের আলো একটু-আধটু ভিতরে ঢুকে পড়েছে খোলা জানালা টপকিয়ে। সেটুকুতেই যা দেখা যাচ্ছে তাই দেখতে হচ্ছে। জেনোভিয়ার শরীর কাঁপছে ভয়ে। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠস্বরে জানতে চাইলো,

“কে আপনি?”

 

মানুষটা বাতাসের মতো দ্রুত বেগে এগিয়ে এসে টুপি সহ আঁকড়ে ধরলো জেনোভিয়ার চুল। মেঝের সাথে মা’রাত্মক ভাবে আ’ঘাত করলো ওর মা’থা। ব্যথায় তীব্র আর্তনাদ করলো জেনোভিয়া। মানুষটা ওর মা’থা পা দিয়ে চে’পে ধরলো মে’ঝের সাথে। রাগে কটমট করে বললো,

“এত তাড়াতাড়ি বাসায় আসার কী প্রয়োজন ছিল? কেন বিরক্ত করলে আমার কাজের সময়? মায়ের সাথে সাথে তোমারও কবরে যাওয়ার শখ হয়েছে তাই না?”

 

লোকটা আরও জোরে চেপে ধ’রলো জেনোভিয়ার মা’থা। মেঝে থেকে ব্যাটটা হাতড়ে উঠিয়ে তা দিয়ে কয়েকবার আ’ঘা’ত করলো মা’থায়। নেতিয়ে পড়লো জেনোভিয়ার শরীর। প্রাণ শিখাটা নিভুনিভু করছে। বুজে আসছে চক্ষুদ্বয়। কানে আসা শব্দে সে বুঝতে পারলো লোকটা তার মাকে আবারও আ’ঘাত করছে। শরীরটাকে কোনো রকম টেনে নিয়ে এগিয়ে গেল সে। হাত রাখলো লোকটার পায়ে। লোকটা অনবরত আ’ঘা’ত করেই চলছিল ক্রিস্টিনাকে। থেমে গেল। জেনোভিয়ার দিকে চেয়ে বললো,

“আবারও বিরক্ত করছো?”

 

লোকটা ব্যাট দিয়ে আরও দুইবার আ’ঘাত করলো জেনোভিয়াকে। জেনোভিয়া তবু পা ছাড়লো না। জড়িয়ে ধরে রাখলো।  চোখ খুলে তাকাতে পারছে না সে। ব্যথায় অবশ শরীর। কেটে কেটে খুব কষ্ট করে বললো,

“প্লিজ…আ…আমার মামাকে…মে’রো না। তুমি আমায়…মে’রে ফেলো। প… প্লিজ আমার…মামা…কে আর মে’রো…না। তাকে…বাঁচতে দাও!”

 

জেনোভিয়ার কথায় অলৌকিক ভাবে লোকটার মন হঠাৎ নরম হয়ে উঠলো। মেয়েটা নিজের প্রাণ ভিক্ষা না চেয়ে মায়ের প্রাণ ভিক্ষা চাচ্ছে?

মা! শব্দটা হঠাৎ আপ্লুত করে তুললো লোকটাকে। সেও তো তার মাকে অত্যন্ত ভালোবাসে। তার মা তার পৃথিবী। লোকটা হাঁটু ভেঙে বসলো। জেনোভিয়ার মাথায় হাত রেখে বললো,

“আমি তোমাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি ছোট্ট মেয়ে, তোমার মাকে নয়। কারণ সে ইতোমধ্যে ম’রে গেছে। আর যদি নাও মারা যেত তাও আমি মে’রে ফেলতাম।”

 

বলেই উঠে দাঁড়িয়ে ব্যাটটা দিয়ে বাড়ি মা’রলো ক্রিস্টিনার মা’থায়। একবার…দুবার…তিনবার….মা’রতেই থাকলো। এদিকে জেনোভিয়া আর কিছু বলার শক্তি পাচ্ছে না। শুধু নিভুনিভু চোখে তাকিয়ে রইল। 

লোকটা একসময় হাঁপিয়ে গিয়ে থেমে গেল। হাত থেকে ফেলে দিলো ব্যাট। জেনোভিয়াকে গ্রাহ্য করলো না আর। দরজার দিকে এগোতে লাগলো। পায়ের নিচে কিছু একটা পড়ে মৃদু আওয়াজ করলো। লোকটা পা সরিয়ে মেঝে থেকে হাতে তুলে নিলো একটা লকেট নেকলেস। সাথে করে নিয়ে আসা ক্ষীণ আলোর লাইটটা জ্বালিয়ে লকেটটা খুলে দেখতে পেল ক্রিস্টিনা আর শিশু জেনোভিয়ার ছবি। সে লকেটটা নিয়ে জেনোভিয়ার কাছে এলো। অন্ধকারে যেমন জেনোভিয়া লোকটার মুখ দেখতে পায়নি, তেমনি লোকটাও জেনোভিয়ার মুখ দেখতে পায়নি, আর পাচ্ছেও না। সে জেনোভিয়ার হাতে লকেটটা গুঁজে দিয়ে বললো,

“ভালোভাবে বেঁচে থাকো। আমাদের আর দেখা না হোক।”

 

__________________________________________________

 

[বর্তমান সময়, ২০২১। সেন্ট পিটার্সবার্গ, রাশিয়া]

 

পরের দিন সন্ধ্যায়ও রোমেরোর মাথায় একই চিন্তার আগমন ঘটলো। কোথায় দেখেছে মেয়েটাকে? রোমেরো মস্তিষ্ক খাটিয়ে অনেক ভাবার চেষ্টা করলেও কিছুতেই মনে পড়লো না কোথায় দেখেছে। সে এবার উঠে বসলো। একটু দৌড়াতে বের হলে কেমন হয়? আগে যখন  ইয়েকাতেরিনবার্গ থাকতো রোজ নাইট জগিং করতো। রোমেরোর পরনে বাদামি রঙের হাফপ্যান্ট আর কালো রঙের স্লিভলেস টি-শার্ট। এই পোশাকেই সে বাইরে বের হলো। 

বাইরের পরিবেশটা এ সময় দারুণ। ঝিরিঝিরি সমীরণে কাঁপছে বৃক্ষপত্র। শীতও লাগছে না, গরমও লাগছে না। শান্তি শান্তি একটা অনুভূতি। রাস্তায় আলো খুব একটা নেই। একেকটা স্ট্রিট লাইট একটা থেকে অন্যটা অনেক দূরবর্তী। তাও প্রায় অনেকটাই নষ্ট।

 

“গরিব এলাকা!” অস্ফুট স্বরে বললো রোমেরো। কিছুটা তুচ্ছ ভাব শোনালো তার কথা।  

 

সাদা বাড়িটা অতিক্রম করে আসার সময় সিঁড়িতে একজন তরুণকে বসা দেখতে পেল রোমেরো। এ আবার কে? অমানবিক মেয়েটার প্রেমিক? না কি ভাই? না কি স্বামী? না কি বন্ধু?

 

রোমেরোর যখন চোখ পড়েছিল তারাসের উপর, তারাসেরও তখন রোমেরোর উপর চোখ পড়েছিল। এর আগে মাত্র কিছু সময়ের জন্য সে দেখেছিল রোমেরোকে। তবুও চিনতে কষ্ট হলো না। এটা সেই বমি করা ছেলেটা।  

 

কিছু একটা তার সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেছে বুঝতেই দাঁড়িয়ে গেল রোমেরো। তাকিয়ে দেখলো আসলেই একটা মেয়ে তার সাথে ধা’ক্কা খেয়ে রাস্তায় পড়েই গেছে একদম। রোমেরো ব্যতিব্যস্ত হয়ে মেয়েটাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলো। 

“আমি দুঃখিত!” মেয়েটাকে উঠতে সাহায্য করার সময় বললো রোমেরো, “আপনি কি বেশি আঘাত পেয়েছেন?”

 

মেয়েটা উঠে দাঁড়ানোর পর রোমেরোর দিকে তাকাতেই রোমেরো দেখতে পেল এটা সেই মেয়ে। সেই অমানবিক মেয়ে।

রোমেরো বুঝতে পারলো এই অমানবিক মেয়েটাকে দুঃখিত বলে সে ভুল করেছে। এমন মানুষদের দুঃখিত বললে এরা নিজেকে খুব বড়ো বলে মনে করে। মনে মনে ভীষণ লজ্জিত বোধ করলো রোমেরো। এমন একটা মেয়েকে কেন দুঃখিত বলতে গেল? অবশ্য আগে যদি দেখতো এই মেয়েটা তাহলে দুঃখিত বলার জায়গায় মেয়েটাকে ভালো করে কয়েকটা কথা শুনিয়ে দিতো। 

 

জেনোভিয়ার মুখটা বিরক্তিতে কুঁচকে গেছে। সে ভীষণ বিরক্ত গলায় বললো,

“তুমি কি অন্ধ?”

 

রোমেরোর কানে বজ্রপাত হলো। এত বড়ো কথা? তাকে অন্ধ বলার অধিকার মেয়েটাকে কে দেয়? রাগের শিখাটা দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো অন্তঃপুরে। বললো,

“না আমি অন্ধ নই। সৃষ্টিকর্তা আমাকে দেখার ক্ষমতা দান করেছেন। তবে তুমি অন্ধ কি না বুঝতে পারছি না। আমাকে ধাক্কা মা’রলে কেন?”

 

“আমি ধাক্কা মে’রেছি?” অবাক গলায় বললো জেনোভিয়া, “তুমি ধাক্কা মে’রেছো আমাকে!”

 

“আমি কাউকে ধাক্কা মা’রিনি। আমি শুধু দৌড়াচ্ছিলাম। তুমি আমাকে ধাক্কা মা’রতে এসে পড়ে গেছো।”

 

জেনোভিয়া অবাক। এ কেমন আজব মানুষ? বলছে ধাক্কা দিতে এসে নিজে পড়ে গেছে? আরে এই অপরিচিত, মাত্র কয়েক দিন ধরে দেখা ছেলেটাকে ধা’ক্কা মারার কী কারণ থাকতে পারে ওর? মানছে ছেলেটা ওকে ইচ্ছাকৃতভাবে ধা’ক্কা দেয়নি, রাস্তায় বাঁক ছিল, আর ছেলেটা দৌড়াচ্ছিল বলে ভুল করে ধাক্কাটা লেগেছে। কিন্তু ছেলেটা সে কথা না বলে উলটো ওর ঘাড়েই দোষ চাপিয়ে দিচ্ছে! জেনোভিয়া জানে এরকম মানুষজনের সাথে কথা বলা সময় নষ্ট করা ছাড়া আর কিছুই নয়। সে তার ডগ জুরাকে নিয়ে জায়গাটা থেকে প্রস্থান করতে করতে রোমেরোকে শুনিয়েই বললো,

“চুরি করতে গিয়ে দৌড়ানি খাবে, আর সেই দৌড়ানিতে মানুষ মে’রে রেখে যাবে রাস্তায়। বিরক্তিকর!”

 

কথাটা শোনা মাত্র মারাত্মক এক বি’স্ফোরণ ঘটলো রোমেরোর মাঝে। রেগে আগ্নেয়গিরি হয়ে গেল সে। মেয়েটা তাকে চোর বললো? তার মতো এত সৎ নিষ্ঠাবান চরিত্রের মানুষকে চোর বলার স্পর্ধা কীভাবে করতে পারে? রোমেরো হুংকার ছেড়ে বললো,

“কী বললে তুমি?”

 

মেয়েটা থামলো না বলে রোমেরো দৌড়ে এসে তার পথ আটকালো।

 

“এইমাত্র কী বললে?” রাগে লাল হয়ে গেল রোমেরো, “চোর বললে আমাকে? তুমি দেখেছো আমাকে চুরি করতে? কী চুরি করেছি আমি? মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার সাজা কী জানো?…”

 

“তুমি জানো?” রোমেরোর কথার মাঝে পালটা প্রশ্ন করলো জেনোভিয়া।

“মিথ্যা অপবাদ দেওয়া বন্ধ করো। আমার প্রেমিক একজন সাব ইন্সপেক্টর। জেলে যাওয়ার শখ করো না।”

 

রোমেরো হেসে ফেললো। বিদ্রুপ করা হাসি। ব্যঙ্গোক্তি করে বললো,

“ও, তাহলে ওই ছেলেটা তোমার প্রেমিক? সেদিনের সেই ইন্সপেক্টর? এত স্মার্ট, সুদর্শন একটা ছেলে, যে কি না সাব ইন্সপেক্টর, সে তোমার মতো একটা মেয়ের সাথে প্রেম করে? আশ্চর্য তো!” হঠাৎ ভাবুক গলায় বললো, “আমাদের দেশের ছেলেদের চয়েজ কি খারাপ হয়ে যাচ্ছে দিন দিন? জানি না, তবে তোমার প্রেমিকের চয়েজ আসলেই খারাপ। উচিত তোমার সাথে ব্রেকআপ করে চয়েজ ভালো করা।”

 

রোমেরো আর কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করলো না, যা বলেছে তাই যথেষ্ট। মনে প্রশান্তি অনুভব করলো। প্রশান্তি ভরা মনে দৌড়ে চলে গেল সামনে। 

জেনোভিয়া গেল না। যেতে পারলো না। রোমেরোর শেষ কথাটা তুমুল ঝড় সৃষ্টি করলো তার মাঝে। 

‘উচিত তোমার সাথে ব্রেকআপ করে চয়েজ ভালো করা।’

এই কথাটা কেন বললো ছেলেটা? তারাসের সাথে কি তাকে আসলেই বেমানান লাগে? এ জন্যই কি তারাস…

মন খারাপের কালো মেঘটা আরও কালো হয়ে উঠলো। জেনোভিয়া আর দাঁড়িয়ে থাকলো না। ভয় করছে। রাতের বেলা বাইরে হাঁটতেও ভয় হয় এখন। 

জেনোভিয়া দ্রুত পা চালিয়ে এলো। 

বাড়িতে এসে দেখলো তারাস বসে আছে তার ঘরের সিঁড়িতে। জেনোভিয়ার হৃদাকাশের কালো মেঘ কেটে গিয়ে কৌমুদী ছড়িয়ে পড়ে। সে দৌড়ে এসে দাঁড়ায় তারাসের সামনে।

“তুমি কখন এসেছো?” উৎফুল্ল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো জেনোভিয়া। 

 

“দেরি হলো কেন ফিরতে? তোমার গাড়ি কোথায়? এলাকার ভিতর খু’ন হয়েছে আর তুমি রাতের বেলা বাইরে ঘুরছো? তাও আবার গাড়ি ছাড়া!”

 

“গাড়িটা সমস্যা করেছে। গ্যারেজে দিয়েছি। কাল অথবা পরশুর ভিতর পেয়ে যাব।” 

জেনোভিয়া সিঁড়ি ভেঙে উঠে দরজার তালা খুলে বললো,

“ভিতরে এসো।”

 

তারাস গম্ভীর কণ্ঠে বললো,

“আমি তোমার বাড়িতে থাকতে আসিনি।”

 

“তাহলে আমাকে দেখতে এসেছো?”

 

“না, একদমই না।” উঠে দাঁড়ালো তারাস। “হাত পাতো।”

 

জেনোভিয়া কোনো বাচ্য উচ্চারণ না করে হাত পাতলো। সঙ্গে সঙ্গে ওর হাতের উপর একটা নেকলেস রাখলো তারাস। অন্যদিকে দৃষ্টি সরিয়ে ইতস্তত কণ্ঠে বললো,

“এটা আমি দিয়েছি ভেবো না। সাবিনা আমাকে এটা দিতে বলেছে তোমাকে।”

 

জেনোভিয়া হাসছে। ইদানীং তারাস এত মিথ্যা বলা শুরু করেছে! মিথ্যা কথাগুলো তাকে কষ্টও দেয় আবার মাঝে মাঝে হাসায়ও। সে আচমকা ঠোঁট ছোঁয়ালো তারাসের গালে। 

তারাস এমন ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিল না। সে চমকে উঠলো। জেনোভিয়ার দিকে তাকিয়ে গাল মুছতে মুছতে বললো,

“বে’য়াদব মেয়ে!” 

তারাস এমন ভাব করছে যেন সে পারলে ঘষতে ঘষতে চামড়াই উঠিয়ে ফেলবে। কড়া গলায় বললো,

“আমাদের মাঝে এখন আর কিছু নেই। সেটা মনে রেখে আমার থেকে দূরে থাকো।”

 

জেনোভিয়া তারাসের চোখে স্থির দৃষ্টি রেখে বললো,

“আমি জানি না কেন তুমি আমার থেকে দূরে সরে গেছো, কেন নাতালিয়ার সাথে সম্পর্ক গড়েছিলে, কেন ওকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে। তবে একটা কথা আমি স্পষ্ট জানি। তোমার মনে এখনও আছি আমি।”

 

নীল চোখের তারায় ভেসে উঠলো স্বচ্ছ বারি। ওই চোখে তাকিয়ে তারাসের মন কেমন করলো। তাকিয়ে থাকতে পারলো না বেশি সময়। সে দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে নেমে গেল। ভুল করে ফেলেছে। কী দরকার ছিল লিওনিদ ওর গার্লফ্রেন্ডকে গিফট দিচ্ছে দেখে নিজেরও গিফট দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করা? জেনোভিয়া তো তার গার্লফ্রেন্ড নয় এখন আর। সে নিজে সম্পর্কটা শেষ করে দিয়েছিল। সে তো জেনোভিয়াকে ভুলে থাকতে চায়। জেনোভিয়ার থেকে দূরে থাকতে হবে তাকে। কারণ সে কাউকে কথা দিয়েছে। 

 

“ডিনারটা করে যেতে পারো।”

 

জেনোভিয়ার কণ্ঠস্বরে থামলো তারাস। না ফিরেই প্রত্যুত্তর দিলো, 

“আমি খেতে আসিনি। আর বলেছিলাম না তুমি একজন ভালো রাঁধুনি নও? তোমার রান্না ভীষণ বাজে!”

 

তারাস স্থির পা দুটোকে চালিয়ে নিয়ে চলে গেল। অবিশ্বাস্য চোখে ওর যাওয়ার পথে নির্নিমেষ তাকিয়ে রইল জেনোভিয়া। সে একটা উন্নত রেস্তোরাঁর শেফ, আর তারাস বলছে সে ভালো রাঁধুনি না? আজব তারাস!

 

জেনোভিয়ার বাসা থেকে তারাস সোজা থানায় চলে এলো। ইউনিফর্ম পরে বের হয়ে আসতেই বুঝতে পারলো পলিনার খু’নের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে কাউকে। নতুন কাকে পেল ফেলিন? 

এসে দেখলো আবারও এনিকে আনা হয়েছে। দেখে হতাশ হলো সে। কেউ কি নেই যে এই কেসের ব্যাপারে সাহায্য করতে পারে? এ পর্যন্ত যাদের কাছেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে তা থেকে খু’নি পর্যন্ত পৌঁছানোর রাস্তার হদিস পাওয়া যায়নি। কাউকে চূড়ান্তভাবেও সন্দেহ করা যাচ্ছে না। ভাসা ভাসা একটা সন্দেহ ঘুরে বেড়াচ্ছে। 

 

________________

 

বাড়ির সামনে দশ-বারো ফুট এরিয়া নিয়ে ছোটো লন। লনে আছে বেশ কিছু ফুল গাছ এবং ঔষধি গাছ। আছে ছোট্ট একটি বেঞ্চ।

এক্সারসাইজের সরঞ্জাম নিয়ে এক্সারসাইজ করছে জেনোভিয়া। ওর পরনে স্লিভলেস টি-শার্ট আর প্যান্ট। উভয়ই দেহের সাথে আঁটোসাঁটো হয়ে আছে। ঘামে ভিজে গেছে গোলাপি টি-শার্টটা। চুল পনিটেল করে উপরের দিকে বাঁধা। দরদর করে ঘাম ঝরছে শরীর থেকে। 

 

রোমেরো দৌড়াতে বের হয়েছিল। সাদা বাড়িটার সামনে একটা সুন্দর মেয়ের এক্সারসাইজ করার দৃশ্য আকর্ষিত করলো তাকে। থেমে গেল সে। রোমেরোর দৃষ্টি মেয়েটার ঘর্মাক্ত মুখে। মুখটা পরিচিত। দীর্ঘ সময় ধরে এই মুখটাকে চেনে এমন মনে হচ্ছে। কিন্তু মেয়েটাকে তো সে চেনে অল্প কিছুদিন হলো। মেয়েটার নাম পর্যন্ত জানে না। 

জেনোভিয়ার দৃষ্টি পড়লো হঠাৎ ভাবনা নিমজ্জিত রোমেরোর উপর। রোমেরো হকচকিয়ে যায়। অপ্রস্তুত গলায় প্রশ্ন করে বসে,

“কাক ভাজ জাতুভ?” (তোমার নাম কী?)

 

জেনোভিয়া উত্তর না দিয়ে বললো,

“এটা তোমার জানার মতো প্রয়োজনীয় কোনো বিষয় নয়। দয়া করে নিজের প্রয়োজনের দিকে হাঁটো।”

 

অন্য সময়ের মতো রোমেরো আজ রেগে গেল না। রাগের পরিবর্তে তার ঠোঁটে চমৎকার হাসি প্রস্ফুটিত হলো। জানালো,

“আমার নাম রোমেরো। আমি এক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ঘুমন্ত অংশীদার হিসেবে আছি। আগে ইয়েকাতেরিনবার্গ থাকতাম। কিন্তু স্থানটা ভালো না লাগার কারণে নতুন শহরে এসেছি। তোমার জন্ম কি সেন্ট পিটার্সবার্গেই?”

 

“সেটাও তোমার জানার বিষয় নয়।” জেনোভিয়ার কাছ থেকে কোনো রকম গ্রাহ্য পেল না রোমেরো। জেনোভিয়া এক্সারসাইজের সরঞ্জাম নিয়ে ভিতরে চলে গেল। পিছন পিছন ওর কুকুর জুরাও গেল। 

রোমেরো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবলো, মেয়েটাকে কোথায় দেখেছি?

 

“প্রিভিয়েত!” পাশ থেকে শব্দটা আসায় রোমেরো তাকালো সেদিকে। হেসে প্রত্যুত্তর দিলো। 

 

“আমি একটা রেস্তোরাঁয় যাচ্ছিলাম সকালের নাস্তা করতে। তুমি কি আমার সাথে যোগ দেবে? একাকী আমি খাবারগুলো উপভোগ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবো না।” বেনিম বললো। 

 

রোমেরোর আসলে বাইরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা ছিল না এই মুহূর্তে। সে ঘরেই নিজের ব্রেকফাস্ট তৈরি করে নিতো। কিন্তু বেনিম এমনভাবে বলায় না করতে পারলো না। হেসে বললো,

“হুম, যাওয়াই যায়।”

 

________________

 

রিচার্ড কক্স ইয়েকাতেরিনবার্গ থেকে ফিরেছেন আজ সকালে। যা আনা বাকি ছিল সব এনেছেন। দোকানটাকে এবার সাজাতে হবে। বিকেল থেকে তিনি কাজ করলেন দোকানে। একাই করলেন। বেনিম সাহায্য করতে চাইলে তিনি বললেন, দরকার নেই। বেনিম তাও কিছুটা সহযোগিতা করে বাড়ি ফিরলো। 

প্রকৃতি কালো হতে শুরু করেছে। বাড়িই ঢুকে যাচ্ছিল বেনিম, কিন্তু রাস্তায় জুরাকে দেখে থামলো। দু ঠোঁটে হাসি খেললো তার। সে পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে বসলো জুরার কাছে। কী কোমল, নম্র প্রাণীটা! ওর গায়ে হাত বুলালো বেনিম। ছোটো ছোটো লোমে ঢাকা কোমল শরীর কুকুরটার। আদর করতে করতে বললো,

“নাম কী তোমার?”

 

বাক্’হীন পশুটা উত্তর দিলো না। 

 

“বয়স কত তোমার?” কথা না বলতে পারা প্রাণীটাকে আবারও প্রশ্ন করলো বেনিম। 

 

“ওর বয়স দেড় বছর।”

 

পিছনে মেয়ে কণ্ঠটা শুনে দাঁড়িয়ে গেল বেনিম। দেখলো জেনোভিয়া এসে দাঁড়িয়েছে পিছনে। 

 

“ওকে দেখে আরও ছোটো মনে হয়।” হাসার চেষ্টা করলো বেনিম।

 

জেনোভিয়া একটু সৌজন্য কণ্ঠে বললো,

“আমার বাসায় চলো না। এক কাপ কফি খাবে।”

 

“আজ নয়, অন্য একদিন। রাত হয়ে আসছে। মামা আমাকে ঘরে না দেখতে পেলে চিন্তা করবে।”

 

বেনিমের চোখ পড়লো জেনোভিয়ার গলার লকেটে। তার চোখ বার বার মেয়েটার গলার লকেটটায় কেন চলে যায়? বেশি ভাবলো না বেনিম, চলে গেল। 

 

জেনোভিয়ার মনে বিস্ময়ের মেঘ। রাত হয়ে আসছে বলে ঘরে ফিরতে হবে? না হলে মামা চিন্তা করবে? এই বয়সের ছেলে রাতে বাইরে থাকলে কী সমস্যা? ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরাও অনেক রাত অবধি ঘোরাঘুরি করে। আর এখনও রাত হয়নি তার আগেই বেনিম ঘরে চলে গেল। জেনোভিয়ার মনে পড়লো বেনিম খুব ভীতু। আর ভীতু বলেই হয়তো ওর মা চিন্তা করবে। যেহেতু এলাকার ভিতর একটা নৃ’শংস হ’ত্যাকাণ্ড ঘটেছে। আর বেনিম তো বাচ্চা স্বভাবেরও। কিন্তু একটু আগে যখন কথা বললো মোটেই ওকে বাচ্চা মনে হচ্ছিল না। ছেলেটা ঠিক বাচ্চা স্বভাবের নয়, কখনো কখনো সেরকম হয়ে যায়। 

 

(চলবে)

 

 রঙিলা রাতের কালো অশ্রু (০৬) 

লেখা: ইফরাত মিলি

___________________

 

ফেলিন এক প্রকার বিরক্ত কেসটা নিয়ে। এমন কিছু নেই যাতে তারা আসল ক্রিমিনালকে ধরতে পারে। কোনো প্রমাণ নেই, কিছু নেই। সে আসলেই প্রচণ্ড বিরক্ত।আজ পুরো পাগলের মতো করছে ফেলিন। কেসের দায়িত্বপ্রাপ্ত সবাইকে ডেকে বললো,

“এই কেসটা ক্লোজ করা যাক, হুহ? এই কেস নিয়ে বেশি ঘাঁটতে গেলে আমি পাগল হয়ে যাব। আমি কিছুতেই পাগল হতে চাই না, বন্ধ করে দেওয়া যাক এই কেস।”

 

টিমের সবাই শান্ত, স্থির চাহনিতে তাকিয়ে রইল ফেলিনের দিকে। সবার দৃষ্টির চাহনি এক। কেউ কিছু বললো না, করলো না, একটু নড়লোও না। একটা নির্দিষ্ট সময় পর সবাই-ই দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে চলে গেল। ফেলিন কাঁদবে, না হাসবে বুঝতে পারলো না। দুটোরই রিয়‍্যাকশন মিলে একাকার হয়ে গেল তার ভিতরে। 

 

“আমাকে পাত্তা না দিয়ে চলে গেছো?” বললো ফেলিন, “ঠিক আছে চালাও তদন্ত। এখন তো আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি, কিছুদিন পর তোমরাও পাগল হবে। অপেক্ষা করো।”

 

____________________

 

[১ মাস পর। গ্রীষ্মের ২৯ তম দিন।]

 

“আরে মিষ্টি ছেলে, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ!” 

বেনিমের গালে পরশ বুলিয়ে আদর করলেন বৃদ্ধা বেলকা। 

বেনিমদের দোকান থেকে বৃদ্ধা কেনাকাটা করার পর বেশ ভারী হয়ে গিয়েছিল বাজারের থলে দুটো। ভারী থলে বহন করতে কষ্ট হচ্ছিল বৃদ্ধার। বেনিম তা লক্ষ করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যাগ দুটো বহন করে বৃদ্ধার বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে সে। 

বৃদ্ধা খুশি হয়েছে বেনিমের এমন নৈতিকতা সম্পন্ন কাজে। তিনি খুশি হয়ে প্রশংসার সুরে বললেন,

“চমৎকার ছেলে তুমি!”

 

বেনিম লজ্জিত ভঙ্গিতে একটুখানি হাসলো। 

 

“আমাকে এখন যেতে হবে। আপনার দিনটি শুভ কাটুক।” বৃদ্ধাকে বিদায় জানিয়ে চলে গেল বেনিম। 

 

বেলকা আপন মনে বললেন,

“লক্ষ্মী ছেলে! আমার ছেলেরা এমন হলে নিশ্চয়ই আমার আজ একা থাকতে হতো না!”

 

_________________

 

দিনের আলো পালিয়েছে রাত জাগিয়ে দিয়ে। মিষ্টি ফুলের সুগন্ধ বাতাসে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে রোমেরোর ঘরের ভিতর। তার ঘরে কেবল লিভিংরুমেই বাতি জ্বলছে। বাকি সব তলিয়ে আছে অন্ধকারে।

অন্ধকার! অন্ধকার মানুষের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। যার কিছু নেই তার অন্ধকার আছে। অন্ধকারে বসে মানুষ ভাবে, পায় মুক্তির দিশা। অন্ধকারে বসে মানুষ কাঁদে, হালকা করে বুকের ব্যথা। অন্ধকার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু! খুব!

সোফায় শুয়ে আছে রোমেরো। টেবিলের উপর মোবাইলটা বাজছে। আনাস্তাসিয়া কল দিয়েছে। রোমেরো কল রিসিভ করার কোনো প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে না। কে কল দিয়েছে তা দেখারও প্রয়োজন অনুভব করছে না। তার কালো চোখ জোড়া দিয়ে ক্ষণকাল পরপর গড়িয়ে পড়ছে উষ্ণ জলের ধারা। বুকের ভিতর চিনচিন করছে ব্যথা। আজ অনেকদিন পর তার আবার মনে পড়লো ওকে। ওর কথা মনে পড়লেই তার বুকে ব্যথার সৃষ্টি হয়, চোখ থেকে জল ঝরে। রোমেরো উঠে বসলো। বেডরুমে গিয়ে নিয়ে এলো গিটারটা। বুকের ব্যথা কমাতে সে গান গায়। এটা তার অনেক পুরোনো অভ্যাস। 

 

_______________

 

জেনোভিয়ার হাতে বই। বইটা রান্নাবান্না সংক্রান্ত। রেস্টুরেন্টে সে মাঝে মাঝে নতুন খাবার রান্না করে প্রশংসায় ভাসে। প্রশংসা পেতে ভালোই লাগে তার। শুধু তার নয়, প্রশংসা পেতে সবাই ভালোবাসে। আর সেটা যদি হয় নিজের কর্মক্ষেত্রে তাহলে তো সেটা আরও বেশি আনন্দ দেয়। বর্তমানে জেনোভিয়া যে রান্না সম্পর্কে পড়ছিল এটা তৈরি করা হয় কাঁকড়া দিয়ে। রেসিপির সাথে খাবারটার পরিবেশিত একটা ছবিও আছে। মনে মনে ঠিক করলো আগামীকাল সে এই রেসিপি বানিয়েই খাওয়াবে সবাইকে। যদি রেসিপিটা প্রধান শেফের পছন্দ হয় তবে এই খাবারটা স্থায়ীভাবে খাবারের মেন্যুতে যুক্ত হবে। এ যাবৎ জেনোভিয়ার বানানো দুটো খাবার মেন্যুতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এর মাঝে একটা খাবারের রেসিপি জেনোভিয়া সম্পূর্ণ নিজের দক্ষতায় বানিয়েছে।

 

হঠাৎ কানে গিটারের শব্দ আসায় জেনোভিয়ার মনোযোগ সেদিকে ছুটলো।  শুধু গিটারের সুরের শব্দই নয়, একজন পুরুষের কণ্ঠও সেই সুরের সাথে ভাসতে ভাসতে তার ঘরে এসে কড়া নেড়েছে। জেনোভিয়া কিছুক্ষণ শোনার পর বুঝতে পারলো সুরটা পাশের বাসা থেকে আসছে। রোমেরো নামের ছেলেটার বাসা থেকে। সুরটায় আর গানের কণ্ঠটায় অদ্ভুত একটা আকর্ষণ আছে। জেনোভিয়াকে গভীরভাবে আকর্ষিত করলো ওই সুর আর গানের কণ্ঠ। সে ঘর থেকে বের হলো। সম্মোহিত হয়ে ঢুকে পড়লো পাশের বাড়িতে। গানটা রোমেরোই গাইছে কি না দেখবে। 

দরজার পাশের জানালায় এসে দাঁড়ালো জেনোভিয়া। এখান থেকে সোফাটা সরাসরিই দেখা যাচ্ছে। দেখতে পাচ্ছে রোমেরোর চোখের পাতা বন্ধ। চোখ বন্ধ করে গান গাইছে। জেনোভিয়া ওখানটায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে ছিল দেড় মিনিট। হয়তো আরও বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকতো। কিন্তু রোমেরোর চেঁচিয়ে ওঠা কণ্ঠটা তাকে আর দাঁড়াতে দিলো না। 

 

চোখের পাতা খুলেই জানালায় চোখ পড়লো রোমেরোর। কেউ দাঁড়িয়ে আছে বুঝতে পেরেই চেঁচিয়ে বললো,

“কে ওখানে?”

 

জেনোভিয়া দ্রুত সরে পড়লো। রোমেরোও ছাড়বার পাত্র নয়। সে দৌড়ে এসে দরজা খুলে বাইরে নামলো। দেখতে পেল টি-শার্ট আর শর্টস পরা একটা মেয়ে দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। 

 

“দাঁড়াও।” মেয়েটাকে থামতে বললো রোমেরো। 

 

দাঁড়ালো জেনোভিয়া। নিজেকে খুব বড়ো একজন অপরাধী মনে হচ্ছে এখন। কেন অন্য একজনের বাড়িতে এমনভাবে ঢুকলো সে? কেন অগোচরে জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখলো? এই ছেলে এমনিতেই অদ্ভুত। পুলিশের কাছেও কমপ্লেইন করতে পারে। ইশ, জরিমানার স্বীকার হতে চায় না একেবারেই। 

 

“এদিকে তাকাও।” রোমেরোর নির্দেশ। 

 

নিজেকে বলির পাঠা মনে হচ্ছে জেনোভিয়ার। সে ঘুরলো রোমেরোর দিকে। 

 

“ঠিকই ধরেছিলাম…” এগিয়ে আসতে আসতে বললো রোমেরো, “এটা তুমি ছাড়া কেউ নয়। কেন আমাকে চোরের মতো লুকিয়ে দেখলে? আসল চো’র তো তুমি। সেদিন আমাকে চো’র বললে কেন?”

 

আসলেই জেনোভিয়ার চুরি করতে এসে ধরা খাওয়ার মতো অনুভূতি হচ্ছে। সে যদি এখানে না আসতো, ছেলেটাকে এমনভাবে  না দেখতো, তাহলে কি এমন পরিবেশের সৃষ্টি হতো? দম বন্ধ হয়ে আসছে জেনোভিয়ার। বললো,

“আসলে গিটারের সুরটা ভালো লেগেছিল, তাই ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে শুনছিলাম।”

 

“শুধু শুনছিলে? দেখছিলে না আমাকে?”

 

জেনোভিয়া একটু হকচকিয়ে গেল। ছেলেটা এমন প্রশ্ন করছে কেন? মেজাজটা বিগড়ে দিচ্ছে ধীরে ধীরে। কাঠ গলায় বললো,

“আমি চোখ বন্ধ করে ছিলাম না।”

 

রোমেরো হাসলো। 

“আজ বুঝতে পারলাম আমি কতটা সুন্দর। মেয়েরা আমাকে দেখলে চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে না। নির্লজ্জের মতো আমার অগোচরে আমাকে দেখে।”

 

“আশ্চর্য! সাধারণ একটা বিষয়কে এত ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কীসব বলছো?”

 

রোমেরো আবারও হাসলো। জানতে চাইলো,

“নাম কী?”

 

“জেনোভিয়া।”

 

“বয়স?”

 

জেনোভিয়া সন্দেহপ্রবণ চোখে তাকিয়ে বললো,

“বেশিই জানার ইচ্ছা প্রকাশ করছো।”

 

জেনোভিয়া যেতে উদ্যত হলো। রাস্তায় পা রাখতেই রোমেরো বললো,

“আমাকে তো আজ চোরের মতো অগোচরে দেখেছো, এমনভাবে তোমায় কবে দেখবো? আমিও কি তোমার মতো তোমার ঘরের জানালায় উঁকি মারবো?”

 

রাগান্বিত চোখে রোমেরোর দিকে তাকালো জেনোভিয়া। বললো,

“এমন করলে তোমাকেই মে’রে ফেলবো।”

 

রোমেরো অন্যরকম হয়ে গেল হঠাৎ। কেমন শান্ত চোখ, শান্ত কণ্ঠে বললো,

“মরে গিয়েও মা’রবে?”

 

“কী?” দুই ভ্রুর মধ্যস্থলে ভাঁজ পড়লো জেনোভিয়ার। 

 

“তোমার কোনো বোন আছে?”

 

“না।” 

 

“তোমার মা কোথায়?”

 

প্রশ্নটায় ধাক্কা খেলো জেনোভিয়া। রোমেরো হঠাৎ এসব প্রশ্ন করছে কেন? 

 

জুরা ডেকে উঠলো বাড়ির সামনে। জেনোভিয়ার বিস্মিত দৃষ্টি জোড়া সরে গেল রোমেরোর উপর থেকে। সে দ্রুত পায়ে চলে গেল রোমেরোর বাড়ি থেকে নিজ বাড়ি। জুরাকে নিয়ে ঘরে ঢুকে রোমেরোর দৃষ্টির আড়াল হলো। 

রোমেরো বিড়বিড় করে বললো,

“কেউ কেউ মরে গিয়েও মরে না, হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকে। কিন্তু তুমি কি জেনোভিয়ার চেহারা আঁকড়ে ধরেছো বাঁচার জন্য?”

 

রোমেরো দেখলো জেনোভিয়া আবার বাইরে এসেছে। জুরার খাবারের থালাটা ভিতরে নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো।

রোমেরো জেনোভিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো,

“তোমার জন্য কাঁদতে হলো আজ। তোমার জন্য মনে করতে হলো ওকে। নিজের চেহারায় কেন পুষে রেখেছো ওকে? ভালো করোনি মেয়ে!”

 

_______________

 

খু’নের একমাস চারদিন পেরিয়ে গেছে। এখনও কিছুই রফাদফা করতে পারেনি পুলিশ। কেসটা ঝিমিয়ে পড়েছে। নতুন করে সন্দেহভাজন খুঁজে বের করা যায়নি। পুরাতন সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধেও প্রমাণ নেই। ফেলিন ঠিকই বলেছিল। এই কেসের তদন্তে পাগল হয়ে যেতে হবে। 

আজ তারাসের ছুটির দিন। আজকের দিন কীভাবে কাটাবে কোনো পরিকল্পনা নেই। এখন সকাল নয়টা। বাইরে রোদের প্রখরতা বেড়েছে। পোশাক পরিবর্তন না করেই বাইরে বের হলো তারাস। একটা পাতলা সাদা টি-শার্ট আর হাফপ্যান্ট তার শরীরে। রোদ গায়ে পড়তেই মনে হলো তার চামড়া ঝলসে যাচ্ছে। এত তেজ আজ রোদের! কিছু অল্প বয়সি ছেলেমেয়েরা সাইকেল নিয়ে ছুটে গেল সামনে দিয়ে। 

এই মুহূর্তে তারও সাইক্লিং করার শখ চেপে বসলো। কিন্তু এই রোদে সে তার সুন্দর ত্বক পুড়িয়ে কয়লা বানাতে চাইছে না। বাড়ি থেকে বের হয়ে তিন মিনিট হাঁটার পরই আদ্রিকের খাবারের দোকানটা চোখে পড়ে। সেখানে ঢোকার পরিকল্পনা করছিল তারাস। আদ্রিকের দোকানটার সামনে রাস্তার ঠিক বিপরীতে আছে একটা মদের দোকান। দিনের বেলায়ও সেখানে খদ্দের লেগে থাকে আঠার মতো। দুটো মাতাল লোক দোকান থেকে বের হয়ে একে অন্যের সাথে মা’রা’মা’রি শুরু করেছে। সেদিকেই কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তারাস।

হঠাৎ কোত্থেকে একটা মেয়ে এসে দাড়ালো তার সামনে। আড়াল হয়ে গেল মাতাল লোক দুটো। তারাস চোখ তুলে মেয়ে মুখটা দেখলো। তার সামনে নাতালিয়া দাঁড়িয়ে আছে। 

নাতালিয়াকে দেখে একটু অপ্রস্তুত হলো তারাস। বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর এতদিনে সে নাতালিয়ার সাথে দেখা করেনি। আসলে বিয়ে ভেঙে যাওয়ার জন্য তো সে কষ্ট পায়নি। এমনকি নাতালিয়ার কথা তার মনেও ছিল না। নাতালিয়ার মাথায় লাল টুপি। পরনের লাল জামাটা হাঁটুর উপর পর্যন্ত। মুখে মেকআপের প্রলেপ দেখা যাচ্ছে। 

 

“নাতালিয়া!” আলতো করে নামটা উচ্চারণ করলো তারাস।

 

নাতালিয়ার দু চোখে স্পষ্ট ঘৃণার ঝিলিক। তার দু চোখের ওই ঘৃণার দাপটে দুমড়ে-মুচড়ে গেল তারাস। নাতালিয়া ঝট করে কিছু একটা গুঁজে দিলো তারাসের হাতে। 

তারাস মুঠো খুলে দেখলো সেখানে একটা রিং চিকচিক করছে। এটা সে নাতালিয়াকে দিয়েছিল। নাতালিয়ার মুখপানে চাইলো সে। নাতালিয়া চোখের ঘৃণার সাথে সাথে কণ্ঠের ঘৃণা দিয়েও এবার পি’ষে দিলো তারাসকে,

“তোমার মতো ছেলেকে বিয়ে করা আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুল হতো। ভাগ্যিস জেনোভিয়া আমাকে থামিয়ে দিয়েছিল। ওর প্রতি কৃতজ্ঞ আমি।”

 

নাতালিয়া তার হাই হিলে গটগট শব্দ তুলে দ্রুত তারাসের চোখের সীমানা অতিক্রম করে চলে গেল। 

তারাস দাঁড়িয়ে রইল মূর্তির মতো। হাতের রিংটার দিকে তাকিয়ে রইল নিষ্পলক। গভীর চিন্তায় আচ্ছাদিত হলো। আচ্ছা, তার আঙুলের রিংটা কোথায় যেটা নাতালিয়া তাকে দিয়েছিল? 

তারাস ভেবে দেখলো তার মনে নেই। সর্বনাশ হয়ে যাবে! নাতালিয়া তাকে রিং ফেরত দিয়ে গেছে, এখন সেও যদি রিং ফেরত দিতে না পারে তাহলে এই লজ্জিত মুখ কোথায় লুকাবে? 

আদ্রিকের দোকানে আর ঢুকলো না তারাস, বাড়ির দিকে ছুটলো ব্যস্ত পায়ে।

দরজা খুলে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে শুনলো ভিতরে মোবাইল বাজছে। এই মুহূর্তে তার খেয়াল এলো সে মোবাইল বাসায় ফেলে রেখে গিয়েছিল। দৌড়ে এসে কল রিসিভ করলো সে। কলে যে সংবাদটা পেল তাতে মোমবাতি নিভে যাওয়ার মতো করে নিভে গেল তার মুখ। কান থেকে মোবাইলটা নামিয়ে রেখে কাপবোর্ডের দিকে গেল। এখনই মস্কো যেতে হবে তার।

 

(চলবে)

 

 রঙিলা রাতের কালো অশ্রু (০৭) 

লেখা: ইফরাত মিলি

___________________

 

লোকটার নাম রাজুমিখিন। এলাকায় তার আগমন ঘটেছে বারো দিন হলো। লোকটাকে আজব ধরনের মনে হয় জেনোভিয়ার। লোকটা কথা বলে না, সব সময় কেমন বিজন রাত্রির মতো চুপচাপ। লোকটার সাথে প্রথম দেখা হয়েছিল রেস্তোরাঁয়। জেনোভিয়ার কর্মক্ষেত্র যেটা । তিন তলা বিল্ডিংটার পুরোটাই রেস্তোরাঁর অন্তর্গত। উপরের দুটো ফ্লোর কাস্টমারদের সেবায় নিয়োজিত থাকে, আর নিচ তলায় রান্নাবান্না, বিশ্রাম নেওয়ার রুম। জেনোভিয়ার উপর তলায় যাওয়া হয় না তেমন, যাওয়ার প্রয়োজনও পড়ে না। কিন্তু সেদিন দুজন স্টাফ কম থাকায় সে সাহায্য করেছিল বাকি স্টাফদের। সেদিন লোকটা রেস্তোরাঁর সকল মানুষকে উপেক্ষা করে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। জেনোভিয়ার অস্বস্তি হচ্ছিল খুব। লোকটা চেনে বলে কি এরকমভাবে তাকিয়ে আছে? অস্বস্তিবোধ নিয়ে কাজ করে যাওয়া কঠিন। জেনোভিয়া অবশেষে লোকটার দিকে এগিয়ে যেতে বাধ্য হলো।

 

“আপনাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি? আপনার আর কিছু প্রয়োজন?” একজন  

ওয়েটারের মতোই বিনয়ী কণ্ঠে শুধালো জেনোভিয়া। 

 

লোকটা চেয়ে রইল জেনোভিয়ার দিকে। কীয়ৎক্ষণ পর কিছু না বলেই উঠে চলে গেল অর্ডারকৃত খাবারের দাম রেখে, বিল কাগজ ছাড়াই। সমস্যা কী লোকটার? সেদিন লোকটার চলে যাওয়ার পথে চেয়ে প্রশ্নটা ভেবেছিল জেনোভিয়া। আর আজও একই প্রশ্ন ভাবছে। সমস্যা কী লোকটার? এরকম ভাবে তাকিয়ে আছে কেন? 

 

বাড়ির সামনের লনে এক্সারসাইজ করছে জেনোভিয়া। যেটা সে নিত্যদিন করে। আজকে বেশ কিছু সময় ধরে লক্ষ করছে রাজুমিখিন নামের লোকটা তাকে দূর থেকে দেখছে। কতক্ষণ ধরে এরকম ভাবে দেখছে জানে না। হয়তো অনেকক্ষণ যাবৎ দেখে চলেছে। প্রথমে গ্রাহ্য না করে এক্সারসাইজ করে গেলেও পরবর্তীতে আর পারলো না। অস্বস্তিবোধ কাঁটার মতো খোঁচাচ্ছে। জেনোভিয়া ভিতরে চলে গেল। মনিবের পিছন পিছন জুরাও সুবোধ বালকের মতো ঘরে ঢুকলো। 

 

লোকটা তো বিরক্ত করে তুলছে! একদিন সরাসরি গিয়ে লোকটার কাছে জিজ্ঞেস করা উচিত তার সমস্যা কী এবং সে কেন ওরকমভাবে তাকিয়ে থাকে। আজ একদিন নয়, এর আগেও দেখেছে জেনোভিয়া। মনের ভিতর এই বিষয়টা নিয়েই কিছুক্ষণ বকবকানি চললো তার।  তারপর ঢুকলো শাওয়ার নিতে। শাওয়ারে বেশি সময় ব্যয় করলো না। চুল মুছতে মুছতে বের হলো সে। পরনে এখন একটা সাদা ঢিলেঢালা টপস আর জিন্স শর্টস। তোয়ালেটা চেয়ারের উপর ছুঁড়ে মারলো। 

চুল মুছেও লাভ হয়নি, সোনালি চুলগুলো সিক্ত। সিক্ত চুল বেয়ে পানি পড়ছে চুইয়ে চুইয়ে। ভিজে যাচ্ছে টপস। 

এখন একটু কিচেনে উঁকি দেওয়া প্রয়োজন। সকালে সাধারণত এক কাপ কফি, দু পিস পাউরুটি আর একটা ডিম পোচ খায় জেনোভিয়া।

জেনোভিয়া ডিম পোচ করলো। চুলোতে কফির জন্য দুধ গরম হচ্ছে এখন। অন্যদিকে সে কফি পাউডার গলিয়ে নিচ্ছে। 

 

“শুনছো, তোমার কুকুরটা না একদম কথা শোনে না।” আচমকা পিছনে শোনা গেল একজনের কণ্ঠস্বর। 

চমকে উঠলো জেনোভিয়া। অকস্মাৎ কণ্ঠস্বরে সে ভয় পেয়ে গেছে। হাত ফসকে পড়ে গেল চামচ। চকিতে পিছন ফিরে তাকালো। চমকানো গলায় বললো,

“তুমি? আমার বাড়িতে প্রবেশ করেছো কেন?”

 

রোমেরো কিচেনের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। জেনোভিয়া যতটা চমকিত সে ঠিক ততটাই শান্ত। 

 

“ঘরের দরজা খুলে রাখলে প্রতিবেশী তো ঢুকে পড়বেই ঘরে।” বললো রোমেরো।

 

“দরজা খোলা পেলেই ঢুকে পড়বে? এটা কি মগের মুল্লুক? আমি পুলিশকে ইনফর্ম করবো, কেউ একজন আমার অগোচরে আমার ঘরে ঢুকেছে!”

 

রোমেরো হতাশার দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করে বললো,

“আমি একজন প্রতিবেশী। একজন প্রতিবেশীর উচিত আরেকজন প্রতিবেশীর প্রতি সদয় থাকা। কিন্তু তুমি আমার সাথে কেবল বাজে আচরণ করছো। আমি লিভিংরুমে বসছি, দয়া করে আমার জন্যও এক কাপ কফি বানিয়ে নিয়ে এসো।”

 

রোমেরো দোরগোড়া হতে প্রস্থান করলো।

জেনোভিয়া কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। ছেলেটা এরকমভাবে তার বাড়িতে ঢুকে পড়েছে কোন সাহসে? আবার নিজ থেকেই কফি চাচ্ছে। আশ্চর্য! জেনোভিয়ার ভিতরকার অবিশ্বাসের পরিপন্থি দীর্ঘশ্বাসের রূপ হয়ে বেরিয়ে এলো। কফি বানালো দুই কাপ। যেহেতু ছেলেটা নিজ থেকে চেয়েছে, সুতরাং তাকে কফি না দিয়ে কীভাবে পারবে?

 

লিভিংরুমে এসে দেখলো ঠিকই বসে আছে রোমেরো। ওর হাতে জেনোভিয়ার প্রিয় একটা রান্না বিষয়ক বই। জেনোভিয়ার উপস্থিতি টের পেয়ে বইটা রেখে দিলো রোমেরো। 

জেনোভিয়া রোমেরোর হাতে কাপ তুলে দিতেই রোমেরো ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলো,

“ইচপাসিবা!”

 

জেনোভিয়া রোমেরোর আসনকৃত সোফার পাশের সোফায় বসলো। রোমেরো শুকনো কণ্ঠে বললো,

“শুধু কফি দিলে?”

 

আচ্ছা ঝামেলায় পড়েছি, মনে মনে বলে উঠে দাঁড়ালো জেনোভিয়া। কিচেনে গিয়ে ব্রেকফাস্টের জন্য রাখা দুই পিস পাউরুটি এনে দিলো রোমেরোর সামনে। 

রোমেরো কিন্তু পাউরুটি ছুঁয়েও দেখলো না, শুধু কফির কাপেই চুমুক দিলো। 

 

“অনুমতি ব্যতীত বাড়ির ভিতর ঢুকলে কেন?”

 

“প্রতিবেশী তাই।”

 

“প্রতিবেশী বলে যা খুশি তাই করবে? অনুমতি ছাড়া যেকোনো কিছু করাই অন্যায়।”

 

“ঠিক আছে, শোধ নিয়ে নিয়ো। কখনো আমার ঘরের দরজা খোলা পেলে ঢুকে যেয়ো ঘরে। আমি কিন্তু তোমার মতো এত প্রশ্ন করবো না যে, কেন তুমি আমার ঘরে ঢুকেছো?”

 

জেনোভিয়া আর কিছু বললো না।

রোমেরো আড়চোখে দেখতে লাগলো জেনোভিয়াকে। জেনোভিয়ার চুল, চোখ, ঠোঁট, নাক, চিবুক সবকিছু চোরা চাহনিতে দেখে নিলো পরখ চোখে। না, অতটাও মিল নেই। তবে অনেকটাই ওর মতোই দেখতে লাগছে। চুলের রং, চোখের রং, গায়ের রঙে মিল।

 

জেনোভিয়া হঠাৎ লক্ষ করলো রোমেরো তাকে আড়চোখে দেখছে। 

“কী দেখছো এমন করে?” সরাসরি প্রশ্নটা করে আঘাত হানতে চাইলো জেনোভিয়া। 

 

কিন্তু রোমেরো তাতে অপ্রস্তুত হলো না, চমকে গেল না। তার চোখে এখন চোরাদৃষ্টি নেই, প্রকাশ্যেই দৃষ্টি আটকে আছে শুভ্র, কোমল মেয়ে মুখে। বললো,

“তোমার চুল, চোখ, নাক, ঠোঁট, ভ্রু সবকিছু দেখছি। তোমার পুরো মুখটাই মুখস্থ করার চেষ্টা করছি।”

 

জেনোভিয়া বিস্মিত কণ্ঠে বললো,

“মানে? দেখছো কেন আমাকে এরকমভাবে?”

 

রোমেরো আচমকা নিজের আসন ছেড়ে দিয়ে জেনোভিয়ার কাছে এসে বসলো। এত দ্রুত ও নিজের স্থান পরিবর্তন করলো যে, জেনোভিয়া এটার জন্য প্রস্তুতই ছিল না। চমকে উঠলো জেনোভিয়া।  রোমেরোর চোখের দৃষ্টি তার চোখে ন্যস্ত। শান্ত দৃষ্টি রোমেরোর। শান্তর মাঝেই কেমন আবার অদ্ভুত! বিষণ্ণতা! 

 

“তুমি প্রায় ওর মতো দেখতে। তোমার চেহারাটা অদ্ভুত মিল বহন করে ওর  চেহারার সাথে।”

 

জেনোভিয়ার চোখে ভয়, বিস্ময় মিশ্রিত চাহনি। ছেলেটা বলছে কী এসব আবোল-তাবোল? 

জেনোভিয়া হঠাৎ খেয়াল করলো রোমেরো তার খুব নিকটে বসে আছে। কিছুটা ঝুঁকেই আছে তার দিকে। জেনোভিয়া ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে বললো,

“নিজের আচরণ সংযত রাখো।”

 

রোমেরো হাসলো। হাসি দীর্ঘায়িত হলো প্রায় কয়েক সেকেন্ড। তারপর সে অন্য সোফায় চলে গেল। কিছুটা অবাক কণ্ঠে বললো,

“তোমার সমস্যা কী জেনোভিয়া? তুমি তো সকলের সাথে ভালো ব্যবহার করো, তাহলে আমার সাথে এত বাজে কেন তোমার ব্যবহার? বেনিমকে তো তুমি নিজ থেকে কফি খাওয়ার নিমন্ত্রণও জানিয়েছিলে, আর আমার নিজ থেকে চেয়ে খেতে হলো। একটু ভালো আচরণ আমার সাথেও করো। তাহলে দেখতে পাবে আমিও ভীষণ ভালো।”

উঠে দাঁড়ালো রোমেরো, “যাচ্ছি আমি। শুধু শুধু তোমাকে জ্বালাতন করলাম এসে। এমন জ্বালাতন পারলে আমাকেও একদিন করো। তোমার মতো জ্বালা নয়, ভালো লাগা অনুভব করবো তাহলে।”

রোমেরো আবারও তার মিষ্টি হাসি উপহার দিলো। যেতে যেতে থামলো হঠাৎ। পিছন ফিরে জিজ্ঞেস করলো,

“এই, আমার সাথে স্কেটিং করবে?”

 

জেনোভিয়া কিছু বললো না। কিচেনের দিকে চলে গেল। 

প্রথমটায় এমন উপেক্ষা মানতে কষ্ট হলো রোমেরোর। রাগে রক্তিম হয়ে উঠলো মুখ। পরে ধীরে ধীরে কেটে গেল সেই রাগের প্রভাব। হাসি ঝরলো অধর কোণে। বাইরে বেরিয়ে শান্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো,

“তোমাকে মিস করছি দিনা!”

 

_________________

 

হাসপাতালের জানালা দিয়ে উদাসী দৃষ্টি ছুটে গেছে অজানা উদ্দেশ্যে। জানালা গলিয়ে ঢুকেছে গ্রীষ্ম রোদের তাপ।

তারাস ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে এখানে অনেকক্ষণ হলো। বেডে শুয়ে আছে তার মা। স্ট্রোক করেছিল সে। মাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েই বাবা তাকে কল দিয়েছিল। একটা কলেই ছুটে এসেছে মস্কোতে। তখনও জানতো না মায়ের কী হয়েছে, বাবা শুধু বলেছিল মা অসুস্থ তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। 

ঘাড় ঘুরিয়ে বেডে তাকালো তারাস। মা ঘুমাচ্ছে। এগিয়ে এলো সে। মায়ের হাতটা হাতে তুলে নিয়ে চুমু খেলো। হাত বুলালো মাথায়।

 

রুমের দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করলেন লসিফ।

“কিছু খেয়েছো?” প্রশ্ন করলেন তারাসকে।

 

“খাইনি এখনও।”

 

“এসো তাহলে।”

 

বলেই আবার বেরিয়ে গেলেন লসিফ।

তারাসও দরজা টেনে বেরিয়ে গেল।

হাসপাতালের কাছেই রয়েছে একটা রেস্তোরাঁ। সেখানেই ঢুকলো বাবা-ছেলে। লসিফের বয়স আটান্ন। বেশ লম্বাটে মানুষ। লম্বায় তারাসকেও ছাড়িয়ে গেছে। দেহ সুঠাম। তারাস যেন বাবার কাছ থেকেই সৌন্দর্য ধারণ করেছে। চেহারায় অবশ্য মিল নেই। নাকটার দিকে তাকালে আবার মনে হয় নাকটা যেন আজবভাবে মিলে গেছে।

মেনু কার্ড দেখে খাবার অর্ডার দিলেন লসিফ। আসতে সময় লাগবে ঢের।

 

“আমি তোমার এই কাজটায় মোটেও খুশি হইনি তারাস।” লসিফ বললেন গম্ভীর কণ্ঠে।

 

“কোন কাজ?”

 

“নাতালিয়াকে আমি ভালো করে চিনি। ও বিয়ে ভেঙে চলে গিয়েছিল ঠিকই কিন্তু পরে ওকে একটু বোঝালেই ও বুঝতো। কিন্তু তুমি ওকে বোঝানো তো দূর, ওর সাথে একবার এমনিও একটু দেখা করোনি। এর কারণ? ওই মেয়েটার জন্যই তো করোনি, তাই না?” লসিফ জেনোভিয়াকে উদ্দেশ্য করলেন।

 

“না, ওর জন্য না। নিজেই যাইনি। কারণ এটা করতে মন থেকে সায় পাচ্ছিলাম না।”

 

“সেটাই তো, পাচ্ছিলে না কেন? কারণ তোমার মনে তো নাতালিয়া নয়, জেনোভিয়া আস্তানা গেড়ে আছে।”

 

তারাস নীরব রইল। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর বলে উঠলো,

“হ্যাঁ নাতালিয়া নয়, জেনোভিয়া…জেনোভিয়া আছে আমার মনে। এটা আমার দোষ নয় যে আমি ওকে ভুলতে পারছি না, এটা আমার মনের দোষ। পারলে আমার মনকে শাস্তি দাও। দয়া করে এই বিষয়ে আমাকে শাস্তি দেওয়া বন্ধ করো।”

 

লসিফ শান্ত রইলেন। এটা তো স্পষ্টই প্রমাণ করে যে তারাস জেনোভিয়াকে শুধু ভুলতে পারেনি এটাই নয়, বরং ও জেনোভিয়াকে আগের মতোই ভালোবাসে! লসিফের ভিতরে ক্ষোভের সৃষ্টি হলো। এত বোঝানোর পরও কি না ছেলেটা বুঝছে না!

 

“যখন নাতালিয়া বিয়ে ভেঙে চলে যাচ্ছিল তখন আমি ওর দুই হাত ধরে ওকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু ও বোঝেনি। ও বলেছিল, যে সম্পর্কে মিথ্যা থাকে ওই সম্পর্ক কখনও সুখী হয় না। আসলেই তো তাই। আমার আর নাতালিয়ার সম্পর্কের মাঝে কোনো সত্য কি ছিল? আমি কি কখনও ওকে এক সেকেন্ডের জন্যও ভালোবেসেছি মন থেকে? তবুও ওকে বিয়ে প্রায় করেই ফেলেছিলাম! বিয়ে ভাঙার মুহূর্তে ওর হাত ধরে বুঝিয়েছিলাম। অতটুকুই যথেষ্ট ছিল। আমি আর পারবো না কিছু করতে।”

 

“অবশ্যই করবে। এখান থেকে ফিরে গিয়ে ওর সাথে দেখা করবে।”

 

তারাস দুই পাশে মাথা নাড়িয়ে বললো,

“পারব না পাপা।”

 

“বেশ, তুমি যদি না পারো তাহলে আমি কথা বলবো নাতালিয়ার সাথে। আর জেনোভিয়ার সাথেও বলবো।”

 

“না পাপা।” ঘোর বিরোধী কণ্ঠে বললো তারাস, “জেনোভিয়ার সাথে কিছু বলবে না, আর না তো নাতালিয়ার সাথে। তুমি যা বলেছিলে আমি সেগুলো পালন করেছি। জেনোভিয়ার থেকে দূরে থাকছি, নাতালিয়ার সাথে প্রেম করেছি, বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি! কিন্তু এখন যখন একটা গণ্ডগোল হয়েছে, আমি বলবো বিষয়টাকে তার নিজ গতিতে ছেড়ে দিতে। দয়া করে আর নতুন কিছু সৃষ্টি করো না।”

 

তারাসের কণ্ঠ থেমে এলো। কিছুক্ষণ পর বললো,

“হয়তো আমি জেনোভিয়ার থেকে দূরে থাকতে পারবো, ভুলেও থাকতে পারবো, কিন্তু…কিন্তু আমার কষ্ট হবে। আমি এখনও কষ্ট পাচ্ছি!”

 

তারাসের চোখে জল দেখা গেল। ও আর বসে থাকতে পারলো না। চলে গেল বাইরে।  আসলে সে ভুলতেই পারবে না জেনোভিয়াকে! জেনোভিয়াকে ভোলা সম্ভব নয় তার পক্ষে। আর না তো ভুলে থাকার নাটক করা সম্ভব। 

রেস্তোরাঁর বাইরে এসে প্রাণ খুলে শ্বাস গ্রহণ করলো তারাস। তার জায়গায় অন্য কোনো ছেলে হলে হয়তো বাবার কথার প্রতিবাদ করতো। প্রতিবাদ করে প্রেমিকা নিয়েই থাকতো। কিন্তু সে? সে মা-বাবার কথা মেনে নিয়ে কি না প্রেমিকাকে ত্যাগ করেছে, যে প্রেমিকাকে সে খুব বেশি ভালোবাসতো! আসলে তাকে এমনই তৈরি করা হয়েছে, মা-বাবার বাধ্য। ছোটো বেলা থেকে সে এমন ভাবেই তৈরি হয়ে উঠেছে। খুব শাসনে। মা-বাবা যখন যেটা বলেছে সেটা তার করতে হয়েছে। 

 

_________________

 

শহরের বুকে এখন রাত্রি। প্রাকৃতিক আলো নিভে যাওয়ায় জ্বলে উঠেছে কৃত্রিম আলোর ফোয়ারা। থানায় চলছে কিছু মানুষের যাতায়াত। বরিসের গাড়িটা এসে থামলো রাস্তার এক কর্ণারে। ড্রাইভিং সিট থেকে নামলো বরিস। ঢুকলো থানার ভিতর। 

 

ফেলিন পুরোনো কাগজপত্র ঘাঁটার জন্য কাগজপত্র রাখার যে নির্দিষ্ট কক্ষ আছে সেখানে উপস্থিত। একটা তাক থেকে কিছু ফাইল নামালো। ধুলো পড়ে আছে ফাইলের উপরে। টেবিলের উপর রেখে ঝাড়া দিলো ধুলোবালি। সম্প্রতি আসা একটা চুরির কেসের জন্য তাকে ফাইলগুলো ঘাঁটতে হবে। তার যতদূর মনে পড়ে এমন চুরির ঘটনা এর আগেও ঘটেছিল। আসলেই ঘটেছিল কি না নিশ্চিত হওয়ার জন্যই পুরোনো ফাইল ঘাঁটবে। 

মাইককে উঁকি দিতে দেখা গেল দরজায়। 

 

“স্যার!”

 

মাইকের ডাক শুনেও ওর দিকে তাকালো না ফেলিন। ফাইলের উপর নজর রেখে বললো,

“বলো মাইক।”

 

“বরিস এসেছে।”

 

“কোন বরিস?”

 

“পলিনার বয়ফ্রেন্ড।”

 

“কোন পলিনা?”

 

মাইক ফোঁস করে নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো। এটা নয় যে ফেলিন ভুলে গেছে, অন্য কাজে মন বলে তার কথাকে এ মুহূর্তে আমলে নিচ্ছে না। মাইক বললো,

“মাথা থেঁ’ত’লা’নো ওই বী’ভৎস লা’শটার কথা কি আপনি ভুলে গেছেন?”

 

ফেলিনের টনক নড়লো। চকিতে দৃষ্টি ফেললো মাইকের মুখে। না সে ভোলেনি। স্পষ্ট মনে আছে পলিনার কেসটার কথা। ওই কেসটা তো তাকে পাগলই বানিয়ে ফেলছিল প্রায়। 

 

“কে এসেছে?” জানতে চাইলো ফেলিন।

 

“বরিস, পলিনার বয়ফ্রেন্ড।”

 

“কেন এসেছে?”

 

“পলিনার খু’নের ব্যাপারে কথা বলতে চায়।”

 

ফেলিন টেবিলে দুই হাত ঠেকিয়ে টেবিলের দিকে ঝুঁকে ছিল। চকিতে সোজা হয়ে দাঁড়ালো সে। খু’নের ব্যাপারে কী বলতে এসেছে বরিস? ফেলিনের মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো আবারও সেই কেসটা। 

 

(চলবে)

 

 রঙিলা রাতের কালো অশ্রু (০৮)

লেখা: ইফরাত মিলি

___________________

 

ফেলিন বরিসের সাথে কথা বলতে যেতে উদ্যত হলেই মাইক তাকে নিরাশ করে বললো,

“বরিস এ ব্যাপারে আপনার সাথে কথা বলতে চায় না।”

 

ফেলিনের পা দুটো স্থির হয়ে গেল। অবাক চোখে চেয়ে বললো,

“আমার সাথে কথা বলতে চায় না তো কার সাথে বলতে চায়?”

 

“আপনার সাথে বলতে চায় না কারণ আপনি ওকে খু’নি ভেবে অনেক বকাবকি করেছিলেন অতীতে। এমনকি ওকে আটচল্লিশ ঘণ্টার জন্য থানায় আটকেও রেখেছিলেন।”

 

“বেশ করেছিলাম।” গলায় জোর খাটালো ফেলিন, “কী নিশ্চয়তা আছে যে ওই ব্যাটা খু’ন করেনি?” একটু বিরতি নিয়ে বললো, “লিওনিদকে পাঠাও আমার বদলে। কথা বলে দেখুক কী বলতে এসেছে।”

 

“ঠিক আছে স্যার।”

 

মাইক ফেলিনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে লিওনিদের কাছে এলো। 

লিওনিদ তার ডেস্কে বসে ব্যস্ত ছিল তার বোনের সাথে কথা বলতে। মাইক এলে সে মোবাইলে কথার সমাপ্তি ঘটালো। মাইক ওকে বরিসের কথা জানালো। কিছুক্ষণ পর বরিসকে পাঠানো হলো লিওনিদের কাছে। 

 

“হ্যাঁ কী বলতে চাও খু’ন সম্পর্কে, বলো।” বরিসের কাছে জানতে চেয়ে বললো লিওনিদ। 

 

বরিস কথাটা বলতে কিছুটা ইতস্তত করলো। তারপর বললো,

“আমার মনে হয় পলিনাকে এনি মে’রেছে!”

 

“কেন মনে হয় এরকম?”

 

“আসলে পলিনার খু’নের কয়েকদিন আগে আমি এনির সাথে দেখা করেছিলাম। এটা বলতে যে, ও যেন আমার কথা পলিনাকে বুঝিয়ে বলে, আমি পলিনাকে এখনও ভালোবাসি। কিন্তু ও আমার কথা শুনে বলেছিল, পলিনার সাথে আমার যেহেতু ব্রেকআপ হয়ে গেছে সুতরাং আমি আবার কেন ওর কাছে ব্যাক করবো? এনি আসলে আমাকে ওর নিজের দিকে আহ্বান করেছিল। ও সেদিন পলিনার ব্যাপারে আজেবাজে কথা বলেছিল আমাকে। আসলে ও উপরে উপরে পলিনার সাথে ভালো মানুষি দেখাতো, কিন্তু ভিতরে অপছন্দ করতো পলিনাকে। ওদের দুজনের সম্পর্ক ভালো ছিল না।”

 

“খু’নের এক মাস পার হওয়ার পর এই কথা বলছো? এর আগে বলোনি কেন যে ওদের ভিতর সম্পর্ক ভালো ছিল না?”

 

“আসলে পলিনার মা’ও তো পুলিশকে জানায়নি এ ব্যাপারে, তাই ভেবেছিলাম আমার জানানো উচিত হবে কি না। কিন্তু মনে হলো আমার জানিয়ে দেওয়া উচিত আপনাদের।”

 

“আর জানাতে গিয়ে এক মাস পার করে দিলে?” 

 

বরিসের সাথে কথা বলা শেষ করে ফেলিনের কাছে এলো লিওনিদ। ফেলিনকে জানালো কী কী কথা হয়েছে। 

 

“তো ও বলছে এনি মে’রেছে?”

 

“হ্যাঁ।”

 

“এনি কোথায়? ওকে ডাকো থানায়।”

 

“ও তো কিছুদিন পূর্বেই ডাচায় থাকতে গিয়েছে। আমাদের জানিয়েছিল এ ব্যাপারে।”

 

“ফোন করে আসতে বলো। খু’নের সন্দেহভাজন কেন এখানে-সেখানে ঘুরবে?”

 

“ঠিক আছে, ওকে ডাকবো।”

 

লিওনিদ চলে গেলে ফেলিনের মস্তিষ্ক ডুবলো একরাশ চিন্তার কালো জলে। এনিই কি খু’ন করলো পলিনাকে? ফেলিনের সন্দেহের তিরটা জোরদার হয়ে ঘুরে গেল এনির দিকে, যেটা আগে তাক করা ছিল বরিসের উপর।  

 

_______________

 

মিষ্টি রোদ্দুরের দাপাদাপি চলছে পার্ক জুড়ে। আজ রোদে উষ্ণতা নেই তেমন। গোলাপ ফুলের গন্ধ ভাসছে বাতাসের সাথে। কী মিষ্টি সেই গন্ধ! মন ভরিয়ে তোলে অজানা-অচেনা অহেতুক এক ভালো লাগায়। 

একটা বেঞ্চ, যেটা এখন তারাসের দখলে। সেটার সামনে কতকটা সমতল ভূমি, তার পরই আছে নীল জলে টলমলে এক হ্রদ। হ্রদের পানিতে গোসল করছে কিছু কিশোর ছেলে। ওদিকে বোট নিয়ে ঘুরছে এক দম্পতি। পার্কের অন্য স্থানগুলোও মানুষের সমাগমে মুখরিত। পার্কের আনাচে-কানাচে বসে বইয়ে মুখ ডুবিয়ে আছে নানা বয়সি মানুষ। কেউ কেউ সেল ফোনেও বই পড়ছে। তরু ছায়ায় বসে আছে এক বৃদ্ধা। সোয়েটার বুনছে। তার পাশেই খেলা করছে তার ছোট্ট নাতনি। তারাসের আসনকৃত বেঞ্চটা থেকে একটু দূরের একটা বেঞ্চে বসে আছে তিন বান্ধবী। তাদের হাতে চিপস আর আইসক্রিম। নিজেদের মাঝে কথা বলতে বলতে তারা তা খাচ্ছে। প্রত্যেকেই ব্যস্ত আছে কিছু না কিছু নিয়ে। তবে তারাস বসে আছে নির্বিকার হয়ে। সে কিছুই করছে না। মস্কো থেকে ফিরেছে গতকাল। থানায় গিয়েছিল আজ। গিয়ে দেখলো এনিকে আটক করা হয়েছে। ফেলিন না কি নিশ্চিত হয়ে গেছে এনিই পলিনার খু’নি। ফেলিনকে দেখে তারাস অবাক হয়। কিছুদিন আগেও মানুষটার সন্দেহের তালিকায় বরিসের নামটা সবচেয়ে বেশি জ্বলজ্বল করছিল, আর এখন? সে সেই বরিসের কথা শুনেই এনিকে খু’নি হিসেবে চূড়ান্ত করে ফেলেছে। তবে তারাসের সন্দেহও যে কিছুটা প্রবল হয়নি এনির প্রতি এটা বলা যায় না। এনির সাথে পলিনার সম্পর্ক অতটা ভালো ছিল না, কিন্তু হঠাৎ করে এনি পলিনার প্রতি খুব বেশি আন্তরিকতা দেখাতে শুরু করে। কিন্তু কেন? ফেলিনের ধারণা এনি ঘনিষ্ঠ হয়ে পলিনাকে মা’রতে চেয়েছিল, এতে মা’রতে সুবিধা হয়। কিন্তু এনির বক্তব্য অনুযায়ী ও পলিনার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এর জন্য করেছে যে, যাতে ও পলিনাকে এক সময় ওই চাকরিটা ছেড়ে দিতে বলতে পারে। যদি পলিনা ওটা ছেড়ে দিতো তাহলে ও যেতো পলিনার পরিবর্তে। এখন আসল কারণ কোনটা? এনিকে দেখে সাধারণ মানুষ মনে হয়। কিন্তু খু’নিকে আদৌ সাধারণ মনে হয় না। যে খু’ন করেছে নিশ্চয়ই সাধারণ কেউ নয়। আবার এটাও সত্যি যে কখনো কখনো সাধারণের মাঝেই লুকিয়ে থাকে অসাধারণ, অকল্পনীয় সত্তা। যা আমাদের চিন্তা ধারার চেয়ে পুরোপুরি ভিন্ন। হয়তো এনির ক্ষেত্রেও সেটাই। আবার হতে পারে খু’নি ভিন্ন কেউ। হয়তো বরিস, আর একেবারেই যদি ভিন্ন ভাবে ভাবা হয় তাহলে খু’নি সন্দেহভাজনদের বাইরের কেউও হতে পারে। সবই সম্ভব। এই পৃথিবীতে আসলে অসম্ভব বিষয় খুব কম। 

ম্যাসেজ আসার শব্দটা এই নিয়ে তিনবার হলো। দুই বারই নির্বিকার ছিল তারাস। কিন্তু তৃতীয় বার মোবাইল বের করলো পকেট থেকে। তিনটাই জেনোভিয়ার ম্যাসেজ। 

প্রথম ম্যাসেজ, ‘তুমি মস্কো থেকে ফিরেছো, আর আমাকে জানাওনি?’

দ্বিতীয় ম্যাসেজ, ‘কেমন আছো? তোমাকে এ কদিনে এত এত ম্যাসেজ, কল দিয়েছি অথচ তুমি কোনো সাড়াই দাওনি। কেন? একবার শুধু মস্কোতে আছি লিখেই দায় সারলে। তোমার উচিত ছিল না তুমি এসেছো সেটা আমাকে জানানো?’

তৃতীয় ম্যাসেজ, ‘আমি আগামীকাল তোমার ডিউটি শেষ হলে তোমার বাসায় যাব।’

 

ম্যাসেজ তিনটা পড়ে তারাস বিরক্তির সুরে বিড়বিড় করলো,

“পাগল মেয়ে!”

তারপর একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল মোবাইল স্কিনে। হঠাৎই হাসলো। না, জেনোভিয়া তো নয়, পাগল সে। খুব বড়ো পাগল! এমন পাগল যে নিজেই নিজেকে বুঝতে পারে না। সে খুব করে চায় জেনোভিয়ার কাজে বিরক্ত হতে। মনকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে সে বিরক্ত হয়ও। কিন্তু তারপর? বিরক্তর মাঝেও আবার সে কেমন যেন বিরক্ত হয় না। এটা জেনোভিয়াকে ভুলতে না পারার উদাহরণ। যখন একটা মানুষের থেকে মন উঠে যায় তখন মানুষটার সব কাজকর্মই বিরক্ত লাগে, কিন্তু জেনোভিয়ার কোনো কাজই তো প্রাকৃতিক ভাবে বিরক্ত লাগে না তার। কারণ জেনোভিয়া তো এখনও তার মনে আছে। 

উঠে দাঁড়ালো তারাস। চারিদিকের ঝামেলা মাঝে মাঝে ভীষণ অসহ্য লাগে তার। তখন ইচ্ছা হয় খুব দূরে কোথাও চলে যায়। নির্জন কোনো দ্বীপে। তবে একা না, জেনোভিয়া থাকবে তার সাথে। কিন্তু সেটা সে কখনোই পারবে না। এমন কিছু শুধু ভাবাই যায় আর কল্পনা করা যায়। বাস্তবতায় এমন কিছুর প্রাধান্য খুব একটা নেই। 

 

পার্ক থেকে বের হলো তারাস। পার্ক থেকে বেরিয়েই যে রাস্তাটা আছে সেটা নিরিবিলি। তবে এই নিরিবিলি রাস্তাটায় আজ অনেক মানুষের বিচরণ। নানা বয়সের মানুষ বেরিয়েছে সামোকাত আর স্কেটিং করতে। এরা প্রত্যেকে সামোকাত আর স্কেটিংয়ে পারদর্শী। অতীতে একসাথে কত স্কেটিং আর সামোকাত করেছে সে আর জেনোভিয়া। সেসব এখন কেবলই স্মৃতি। সুন্দরতম স্মৃতি। যা আজীবন বুকে ধারণ করে রাখতেও বিন্দু মাত্র কষ্ট হবে না। 

 

হঠাৎ কেউ একজন প্রবল ভাবে ধা’ক্কা মা’রলো তারাসকে। তারাস উপুড় হয়ে পড়ে গেল রাস্তায়। ধাক্কা মারা লোকটাও ছিটকে পড়লো একটু দূরে। 

নিম্নমুখী হয়ে পড়ায় তারাসের মুখে খুব লাগলো। উঠে বসলো সে। আঁচড় লেগেছে এক গালে। সেখানটা রক্তিম হয়ে গেছে র’ক্তে। ব্যথা পাওয়া স্থানে আঙুল স্পর্শ করলো তারাস। তাকালো একটু দূরে পড়া ছেলেটার দিকে। ছেলেটার পায়ে স্কেটিং শু। হয়তো নিজের গতিবিধ ঠিক রাখতে না পারার কারণে এসে ভুলবশত ধাক্কাটা মেরে বসেছে। তারাস তাকে গিয়ে উঠতে সাহায্য করলো।

 

“ঠিক আছো তুমি?” তারাস প্রশ্ন করলো ছেলেটাকে। 

 

বেনিম অবাক চোখে চেয়ে আছে। যেখানে তার গিয়ে সাহায্য করার কথা সেখানে উলটো তাকেই সাহায্য করা হচ্ছে! বেনিমের ব্যাপারটা ভালোও লাগলো আবার খারাপও লাগলো। সে পড়েছে বলে তাকে কেন সহানুভূতি দেখানো হচ্ছে? উলটো সে ফেলে দিয়েছে বলে তাকে এখন ঝাল ঝাল কয়েকটা কথা শোনানো উচিত ছিল। তাই নয় কি?

 

বেনিম স্কেটিং শু জোড়া খুলে ফেলেছে। 

“হ্যাঁ আমি ঠিক আছি। তুমি ঠিক আছো?” প্রশ্নের উত্তর দিয়ে প্রশ্ন করে তারাসের অবস্থা যাচাই করতে চাইলো বেনিম। 

 

“হ্যাঁ, আমিও ঠিক আছি।” 

 

বেনিম তারাসের মুখে তাকিয়ে গালের  ক্ষতটা দেখে বললো,

“মিথ্যা বলছো কেন? তুমি তো ঠিক নেই।”

 

“না, এটা তেমন কোনো ব্যাপার নয়।” ক্ষ’ত স্থানটা স্পর্শ করে বললো তারাস, “এমন ঘটনা অনেক ঘটেছে। এমন আঘাত স্বাভাবিক আমার সাথে।”

 

“কিন্তু আমার কাছে স্বাভাবিক নয়। তোমাকে হসপিটালে নিয়ে যাই?”

 

তারাস অবাক হলো। সাধারণ একটুখানি চোট লেগেছে তাতে ছেলেটা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছে? সে হাসার চেষ্টা করে বললো,

“এটা তো সামান্য একটু আঘাত। এটা নিয়ে এত ব্যাকুল হতে হবে না তোমাকে।”

 

“তোমাকে চেনা চেনা লাগছে।” চোখ খানিক সরু করে তারাসের দিকে চেয়ে থেকে বললো বেনিম, “তোমায় কোথায় যেন দেখেছি। তুমি…তুমি সেই পুলিশ নও?”

 

তারাস মাথা নেড়ে সায় জানালো,

“হ্যাঁ আমিই সেই।”

 

“তুমি কি জেনোভিয়ার প্রেমিক?” 

 

তারাস হকচকিয়ে গেল বেনিমের প্রশ্নে। বেনিম এটা কীভাবে জানে? জেনোভিয়া বলেছে কি? মেয়েটা এ কথা মানুষকে বলে বেড়াচ্ছে কেন? এখন তো তাদের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটে গেছে! তারাস স্পষ্ট কণ্ঠে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করলো,

“না, আমি ওর প্রেমিক নই।”

 

 “ও আচ্ছা। তাহলে তুমি কি ওর হাসব্যান্ড?”

 

তারাসের কাশি শুরু হওয়ার উপক্রম হলো। বলছে কি বেনিম? হাসব্যান্ড? জেনোভিয়া কি বেনিমকে বলেছে সে ওর হাসব্যান্ড? তারাস না বোধক কিছু বলতে উদ্যত হয়েছিল, এর মাঝেই বেনিম বললো,

“সেদিন ওর ঘরের সামনে তোমাকে বসা দেখেছিলাম। ও তোমার গালে চুমু খেয়েছিল সেটাও দেখেছি।”

 

তারাসের কাশি এবার সত্যি সত্যি শুরু হতে যাচ্ছিল। সামলে নিলো কোনো রকম।  বেনিম এটাও দেখে ফেলেছে? লজ্জায় মুখ লাল হয়ে উঠলো তারাসের। মেয়েটা কেন বিচ্ছেদের পরেও হুট করে অমন উন্মুক্ত স্থানে তার গালে চুমু খেতে গেল? আর কেনই বা মানুষজন দেখলো সেটা? মেয়েটাকে কড়া শাসন করতে হবে! সে বেনিমের ভুল ভাঙিয়ে বললো,

“আমি জেনোভিয়ার হাসব্যান্ড নই, আর প্রেমিকও নই। আমাদের অনেক আগে ব্রেকআপ হয়ে গেছে।”

 

“ও…” আননে দুঃখের ছাপ এনে বললো বেনিম, “আমি ভেবেছিলাম তোমরা এখনও একটা সম্পর্কের ভিতর আছো। হয়তো তোমাদের বিচ্ছেদটা কিছুটা অন্য রকম।” মৃদু হাসলো বেনিম। অতঃপর বললো,

“আমার সাথে কফি পান করবে?”

 

ছেলেটা ইতোমধ্যে অনেক কিছু বলে ফেলেছে। ওদের বিচ্ছেদটা শক্তপোক্ত নয় এ ব্যাপারেও সন্দেহ প্রকাশ করেছে। এ ছেলের সাথে এই মুহূর্তে কথা বলা অনুচিত মনে করলো তারাস। সে ব্যস্ত কণ্ঠ সচল করলো,

“আমার এখন থানায় যেতে হবে। দুঃখিত! পরে কোনো একদিন একসাথে বসা যাক?”

 

তারাস চলে যেতে উদ্যত হলেই বেনিম তার একটা হাত ধরে ফেললো। 

চমকে দাঁড়িয়ে গেল তারাস। পিছনে তাকালে তার চোখ পড়লো বেনিমের চোখে। শান্ত, ভাবহীন চোখের দৃষ্টি বেনিমের। কেমন যেন নিথর! অন্ধকার কূপের মতো গভীর! 

 

“আমার সাথে কফি পান করতে কি তোমার আপত্তি? তোমার কি মনে হয় আমার সাথে কফি পান করলে তোমার সময় নষ্ট হবে?” 

 

তারাসের মাঝে বিস্ময়ের ছায়া পড়েছে। এ মুহূর্তে সে বেনিমকে বুঝে উঠতে পারলো না। এই মুহূর্তটার জন্য যেন বেনিম কোনো মোমের পুতুল হয়ে গেছে। যার চোখের তারা নিশ্চল। তারাসকে নির্বাক করে দিলো ওই চোখ। অনেকক্ষণ কিছু বলতে পারলো না তারাস। বুঝতে পারলো না কী বলা উচিত। অবশেষে বললো,

“ঠিক আছে, একসাথে বসা যাক কোথাও।”

 

বেনিমের ওষ্ঠর দ্বি প্রান্ত প্রশস্ত হলো। ওর মাঝ থেকে কেটে গেল গম্ভীরতা। আবারও হয়ে উঠলো সরল একটা চরিত্র। যাকে কীয়ৎক্ষণ পূর্বেও অসরল মনে হচ্ছিল।

 

_______________

 

জেনোভিয়ার ছুটির দিন আজ। সপ্তাহে একদিন সে কাজে যায় না। তারাসের ডিউটি শেষ হতে এখনও প্রায় কয়েক ঘণ্টা বাকি। জেনোভিয়া তারাসকে ম্যাসেজে গতকাল জানিয়েছিল সে আজ ওর বাসায় যাবে। গেলে তো আর সে খালি হাতে যাবে না। অবশ্যই কিছু রান্নাবান্না করে সাথে নিয়ে যাবে। সে যে একজন শেফ। রান্না করতে ভীষণ ভালোবাসে। রান্না করে মানুষকে খাওয়াতেও ভালোবাসে। তবে তার মনঃক্ষুণ্ণ, কারণ তারাস তার কোনো ম্যাসেজের রিপ্লাই দেয়নি। এত অবহেলা করছে তারাস তাকে? জেনোভিয়ার মন খারাপ হয়। 

আজ নতুন কিছু তৈরি করবে সে। এমন মজাদার খাবার তৈরি করবে যা খেয়ে তারাস যেন তার প্রশংসা করতে বাধ্য হয়।

জেনোভিয়া তার প্রিয় রান্না বিষয়ক বইটা হাতে তুলে নিলো। এ পাতা ও পাতা উলটে যখন পছন্দসই একটা রেসিপি খুঁজছিল তখন বইয়ের ভিতরে লুকায়িত ছবিটা বিগলিত হয়ে পড়লো জেনোভিয়ার কোলে। ছবিটা হাতে তুললো সে। বিস্ময়ে ভ্রু কুঞ্চন হলো ছবিটা দেখে। এই ছবি তার বইয়ের ভিতর এলো কীভাবে? 

ছবিতে দেখা যাচ্ছে দুজন ছেলে-মেয়েকে।  ছেলেটা রোমেরো। মেয়েটাকে চেনে না জেনোভিয়া। মেয়েটা সামনে দাঁড়ানো, রোমেরো পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে আছে মেয়েটাকে। দুজনের ঠোঁটেই হাসি ল্যাপটানো। কে হয় মেয়েটা? রোমেরোর স্ত্রী? প্রেমিকা? না কি বন্ধু? 

ছবিটা দেখে মনে হচ্ছে না যে মেয়েটা বন্ধু। স্ত্রী অথবা প্রেমিকা রূপেই মেয়েটা বেশি মানানসই হবে। কিন্তু এটা তার বইয়ের ভিতর এলো কীভাবে? 

জেনোভিয়ার মনে পড়লো সেদিন রোমেরো এই বইটা ধরেছিল। তখনই কি রেখে গেছে ছবিটা? কিন্তু এটা কেন রেখে গেল তার বইয়ের ভিতর? 

জেনোভিয়া বিষয়টা নিয়ে চিন্তায় ডুবে রইল বেশ কিছুক্ষণ। রোমেরো কেন রেখেছে এটা তার বইয়ের ভিতর? কোনো উত্তরই খুঁজে পেল না সে। 

জেনোভিয়া ছবিটা হাত থেকে নামিয়ে রাখতে গেলেই তার চোখ আটকালো মেয়েটার উপর। তাকিয়েই রইল মেয়েটার দিকে। চমকালো জেনোভিয়া। 

 

(চলবে)

 

 রঙিলা রাতের কালো অশ্রু (০৯)

লেখা: ইফরাত মিলি

___________________

 

জেনোভিয়া ছবিটা খুব কাছে এনে তীক্ষ্ণ চোখে অবলোকন করলো। না ঠিকই দেখছে। কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব? মেয়েটা কি আসলেই তার মতোই দেখতে কিছুটা? এমনটা আদৌ হয়? বিস্ময়ের পালা একটু একটু করে গহীন হতে লাগলো। 

জেনোভিয়ার মস্তিষ্কের অর্ধভাগ ডুবে গেল চিন্তায়। মনে পড়ে যায় সেদিনের কথা।

‘তুমি প্রায় ওর মতো দেখতে। তোমার চেহারাটা অদ্ভুত মিল বহন করে ওর  চেহারার সাথে।’, সেদিন বলেছিল রোমেরো। সে সময় জেনোভিয়া বুঝতে পারেনি কথাটার মানে, কিন্তু এখন হয়তো সে মানেটা ধরতে পেরেছে। রোমেরো কি এই মেয়েটার কথা বলেছিল? এই মেয়েটার মতো দেখতে সে, এটাই বুঝিয়েছিল? কিন্তু ছবিটা তার বইয়ের ভিতর রেখে গেল কেন? কী কারণ এর? মেয়েটা কে হয় রোমেরোর? ভাবতে ভাবতে যন্ত্রণা ধরে গেল মাথায়। চিন্তাটা ঠেলে-ঠুলে মন থেকে তাড়াতে চাইল। সিদ্ধান্ত নিলো কাল সকালে এ ব্যাপারে রোমেরোর সাথে কথা বলবে। কিন্তু এ সিদ্ধান্তে সে দৃঢ় হতে পারলো না। মনের ভিতর বিষয়টা নিয়ে খচখচানি চলছে। ব্যাপারটা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সে শান্তি পাবে না। 

ঘর থেকে বের হলো জেনোভিয়া। রোমেরোর ঘরে আলো জ্বলছে। হয়তো ঘরেই আছে রোমেরো। সে চলে এলো রোমেরোর বাড়ির সীমানায়। 

দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। নক করতে যাবে তার আগেই খুলে গেল দরজা। অবাক হলো জেনোভিয়া। 

নেত্রপটে বিস্ময় ভিড় হওয়া জেনোভিয়ার দিকে তাকিয়ে হাসলো রোমেরো। 

 

“জানতাম আসবে। কিন্তু এত দেরি করে আসলে কেন?”

 

জেনোভিয়ার বিস্ময় গভীর হলো,

“তুমি জানতে আমি আসবো?”

 

“জানবো না কেন? আমিই তো তোমায় আসতে বাধ্য করলাম। ছবিটা তো আমিই রেখে এসেছিলাম।”

 

দরজা থেকে সরে গেল রোমেরো। জেনোভিয়াকে ভিতরে আসার আমন্ত্রণ করলো,

“ভিতরে এসো প্রতিবেশী। তোমার আগমনে খুশি হয়েছি।”

 

রোমেরোর ওষ্ঠ কোণে হাসি। ওর আচরণে অবাক হচ্ছিল জেনোভিয়া। সে ইতস্তত মনে ভিতরে প্রবেশ করলো। চোখের সামনে মাঝারি আয়তনের লিভিং রুম দেখতে পাচ্ছে। জেনোভিয়ার চোখ আটকালো সোফার সামনের টেবিলে। সেখানে একটা মদের বোতল রাখা। রোমেরো কখন যেন সেদিকে এগিয়ে গেছে। হাতে মদের বোতলটা উঠিয়ে বললো,

“খাবে?”

 

হঠাৎ এই প্রশ্নে হকচকিয়ে গেল জেনোভিয়া। তটস্থ কণ্ঠে উত্তর দিলো,

“না।”

 

“বেশ, আমি তোমার জন্য কফি নিয়ে আসছি।”

বলে বোতলটা নিয়ে কিচেনে চলে গেল রোমেরো। 

 

এখানে বসে থাকতে অস্বস্তি হচ্ছে জেনোভিয়ার। লিভিংরুমটাকে দেখছে নিঃশব্দে। একটা মাত্র সোফা, একটা ছোটো টেবিল, একটা বুক শেলফ, একটা টিভি ব্যতীত আর কিছু নেই। বুক শেলফের এক তৃতীয়াংশ জায়গাই বইয়ে ঠাসা। বোঝা যাচ্ছে রোমেরো খুব বই পড়ুয়া।

কিছুক্ষণ পরই ফিরে এলো রোমেরো। ছোটো টেবিলের একটুখানি অংশ বাদ পড়লো না, সব পূর্ণ করে ফেললো খাবারের প্লেট রেখে। কফির সাথে ছয় ধরনের খাবার পরিবেশন করেছে রোমেরো। 

জেনোভিয়ার চক্ষু চড়কগাছ! এত খাবার কেন নিয়ে এসেছে?

 

“তুমি আসবে বলে আজ অনলাইনে অর্ডার করেছিলাম খাবার গুলো।”

 

“কীভাবে জানতে আমি আজ আসবো?” বিস্ময়াবিষ্ট কণ্ঠে প্রশ্ন করলো জেনোভিয়া।

 

“শুধু আজ নয়, গত দুদিন ধরে তোমার জন্য খাবার অর্ডার করেছি। কখন এসে পড়ো এর তো কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। আমি তো তোমার মতো নই যে শুধু এক কাপ কফি দিয়েই দায়িত্ব সারবো।”

 

অপমানে জেনোভিয়ার মুখখানি শুকিয়ে গেল। ছেলেটা কি তাকে নিভৃতে নিভৃতে অপমান করতে চাচ্ছে?

 

“এখন বলো কী জানতে চাও।” 

 

রোমেরোর কণ্ঠ শুনে তাকালো জেনোভিয়া। চমকানো গলায় বললো,

“বুঝলে কীভাবে যে আমি কিছু জানতে এসেছি?”

 

“ছবিটা যে আমিই রেখে এসেছিলাম।”

 

জেনোভিয়া একটুকালের জন্য নীরব রইল। তারপর জানতে চাইলো,

“কেন রেখে এসেছিলে?” 

 

“তোমার মতো একটা মেয়ে আছে এটা তোমার জানা উচিত নয়?”

 

জেনোভিয়া কিছু না বলে আবারও কিছুক্ষণের জন্য নীরব রইল। 

 

“মেয়েটা কী হয় তোমার?” প্রশ্ন করলো জেনোভিয়া। 

 

“তুমি কে হও আমার?” 

 

জেনোভিয়া চমকে উঠলো। এটা কেমন প্রশ্ন? 

 

রোমেরো আবারও বললো,

“তুমি আমার কে হও? আমি তোমাকে কেন বলতে যাব মেয়েটা আমার কে? এটা জানতে চাওয়ার অধিকার তোমার আছে?”

 

জেনোভিয়া অপ্রস্তুত হয়ে গেল এরকম কথায়। খানিকক্ষণ ইতস্তত করার পর বললো,

“আমি শুধু জানতে…”

 

“আমি বলবো না।” বলে উঠলো রোমেরো, “এটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।”

 

“যখন বলবেই না কিছু তখন ছবিটা কেন রেখে এসেছিলে?” রেগে গেল জেনোভিয়া, “আমার আসলে ভুল হয়ে গেছে এখানে আসা।” 

বসা থেকে উঠলো জেনোভিয়া। এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে না থেকে বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে। সে অবাধ একটা কৌতূহল নিয়ে এসেছিল, কিন্তু রোমেরো তাকে নিরাশ করলো। আরে যখন কিছু বলবেই না তুমি, তখন ছবিটা কেন রেখে এসেছিলে? 

 

জেনোভিয়ার পিছন পিছন রোমেরোও এসে দাঁড়িয়েছে দোরগোড়ায়। 

জেনোভিয়া লনে নেমে গেছে ইতোমধ্যে। রোমেরো ডাকলো,

“শোনো।”

 

দাঁড়াবে না। কখনও আর কথাও বলবে না।   দেখা হলেও মুখ ফিরিয়ে নিয়ে চলে যাবে। মনে মনে ভাবলো জেনোভিয়া। কিন্তু সে ভাবনা আর স্থির রয় না, দাঁড়িয়ে যায় সে। পিছনে ফিরে তাকায় রোমেরোর দিকে। 

রোমেরো চাঁদের আলোয় দেখতে পায় জেনোভিয়ার ঈষৎ রাগান্বিত মুখ। কী মায়াবী মুখটা! এমন একটা মুখ কতই না আপন ছিল তার। এমন একটা মুখে কতই না ওষ্ঠ চুমু ছিল তার! অতীতের কথা ভাবতে ভাবতে কষ্টে বুক ভার হয়ে আসে রোমেরোর। সে কাটিয়ে ওঠে বুক ভার হওয়ার বিষয়টা। চাঁদের আলোয় দৃশ্যমান জেনোভিয়ার মুখখানিতে চেয়ে থেকে বললো,

“মানুষ যা একবার হারিয়ে ফেলে তা আর ফিরে পায় না। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আমি কিছু ফিরে পেয়েছি। তোমার কি মনে হয় না, তুমি কিছুটা ওর মতোই দেখতে?” 

 

জেনোভিয়া অবাক চোখে নিষ্পলক তাকিয়ে রয়। রোমেরো কি কিছু হারিয়েছে? তার মতো দেখতে মেয়েটাকেই কি হারিয়ে ফেলেছে? তাহলে ফিরে পেয়েছে বলতে কী বোঝালো? আর শেষে অমন প্রশ্নই বা করলো কেন?  জেনোভিয়ার বক্ষস্থল কেঁপে ওঠে। রোমেরোর ফিরে পাওয়া জিনিসটা কি সে?  সে কিছুটা ওই মেয়ের মতো দেখতে বলে কি তাকে হারানো জিনিসের ফিরে পাওয়া রূপ হিসেবে ধরছে রোমেরো? 

জেনোভিয়া আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। দৌড়ে চলে গেল তার নিজের ঘরে। 

 

জেনোভিয়ার পলায়নের দৃশ্য অবলোকন করে হাসলো রোমেরো। ঘরে এসে দরজা বন্ধ করলো। চোখ বন্ধ করে আয়েশ করে শুয়ে পড়লো সোফায়। মানসপটে ভাসতে লাগলো কীয়ৎক্ষণ আগে চন্দ্র প্রভায় দৃষ্ট জেনোভিয়ার মুখচ্ছবি। মৃদু হাসির ছায়া পড়লো তার দু ঠোঁটে। কিন্তু হঠাৎই তার হাসি বিলীন হলো। মানসপট থেকে সরে গেছে জেনোভিয়ার মুখচ্ছবি। তার জায়গায় ফুটে উঠেছে জেনোভিয়ার মতোই আরেকটা মুখ। ওটা জেনোভিয়া নয়। দিনা। যে কিছুটা জেনোভিয়ার মতো দেখতে। যার চুল, চোখ, গায়ের রং জেনোভিয়ার মতো। এই ছবিটা সেই মেয়ের, দিনার। ওর মুখটা বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারলো না রোমেরো। মৃদু একটা কাঁপন হলো শরীরে, আর সাথে সাথে মুদিত চক্ষু জোড়া মেলে ফেললো সে। নিঃশ্বাস ভার হলো। নেত্র খসে গড়িয়ে পড়লো উষ্ম জল।

 

________________

 

গতকাল তারাসের বাসায় যাওয়ার কথা থাকলেও যেতে পারেনি জেনোভিয়া। রোমেরোর ওখান থেকে ফেরার পর চিন্তায় নিমজ্জিত ছিল সে। ভুলেই গিয়েছিল তার তারাসের বাসায় যাওয়ার কথা ছিল। অবশ্য তার যাওয়া না যাওয়াতে তারাসের কিছু এসে যায় না। জেনোভিয়ার নিজেকে নিজের পাগল মনে হচ্ছে। গতকাল রাতে কী যে ভেবেছিল আহাম্মকের মতো! কিন্তু ওই মেয়েটা হারিয়ে গেছে কীভাবে? মেয়েটা কি রোমেরোর প্রেমিকা? ওদের কি ব্রেকআপ হয়ে গেছে? ভাবতে ভাবতে এগোচ্ছিল জেনোভিয়া। তার গাড়িটা নষ্ট হয়ে গেছে। একেবারে অকেজো এখন ওটা। গ্যারেজে দিয়ে আসার পর ঠিক হওয়ার বদলে আরও নষ্ট হয়ে গেছে। গাড়িটার জন্য খুব কষ্ট লাগে তার। ওটা তার মায়ের গাড়ি ছিল। একটা মাত্র গাড়ি ছিল সেটাও নেই এখন। নতুন গাড়ি যে কিনবে সে অর্থও নেই তার। সে এখন রেস্তোরাঁয় যাচ্ছে। তার ডিউটি শুরু হয় বিকেল থেকে। কিন্তু আজ অন্য ফিশ শেফ ডেনিল অসুস্থ থাকার কারণে উপস্থিত হতে পারেনি, তাই ওর পরিবর্তে তাকে যেতে হবে। 

গ্রীষ্মকাল বলে পর্যটকদের ভিড় বেড়েছে সেন্ট পিটার্সবার্গে। রেস্তোরাঁয়ও আগের তুলনায় বেশি কাস্টমার আসে এখন। সকাল বেলা তিন ঘণ্টা লাইব্রেরিতে কাজ করে জেনোভিয়া। কিন্তু আজ রেস্তোরাঁয় যেতে হবে বলে লাইব্রেরির মালিককে ফোন দিয়ে ছুটি চেয়ে নিয়েছে। লাইব্রেরির মালিকটি ভালো। ছুটি চাইলে ছুটি পাওয়া যায়। জেনোভিয়ার চোখ পড়লো বেনিমদের উঠোনে। বেরি উইলো গাছের চারা রোপন করছেন। বেনিম দাঁড়িয়ে আছে পাশে। জেনোভিয়া উচ্চৈঃস্বরে বললো,

“শুভ সকাল!”

 

বেরি উইলো আর বেনিম দুজনই তাকালো জেনোভিয়ার দিকে। আর দুজনই মিষ্টি হেসে প্রত্যুত্তর দিলো,

“শুভ সকাল!”

 

“কাজে যাচ্ছ না কি?” জিজ্ঞেস করলেন বেরি উইলো। 

 

“হ্যাঁ।” সহাস্যে উত্তর দিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলো জেনোভিয়া।

 

বেনিম বললো,

“মামা, আমি ওর সাথেই দোকানে যাই?”

 

বেরি উইলো বললেন,

“ওর সাথে কেন যেতে হবে? একা চলে যেয়ো।”

 

বেনিমের মন খারাপ হলো অসম্মতি পেয়ে। বেরি উইলো তা লক্ষ করে আর সম্মতি না দিয়ে পারলেন না।

“ঠিক আছে যাও তাহলে।”  

বেরি উইলো ছেলেকে খুব ভালোবাসেন। ছেলের মন খারাপি সহ্য করতে পারেন না। 

 

বেনিম হাসলো। সে খুব খুশি হয়েছে মায়ের সম্মতি পেয়ে। দৌড়ে রাস্তায় উঠলো। জেনোভিয়াকে ডাকলো উচ্চরবে,

“জেনো।”

 

দাঁড়ালো জেনোভিয়া। 

বেনিম দৌড়ে এসে জেনোভিয়ার সঙ্গ নিলো। 

“আমি দোকানে যাব। একসাথে যাওয়া যাক?”

 

“অবশ্যই, কেন নয়?”

 

একসাথে হাঁটতে আরম্ভ করলো ওরা। কিছুক্ষণ হাঁটার পর বেনিম বললো,

“একটা কথা বলি?”

 

“হ্যাঁ বলো।”

 

“তোমাকে সুন্দর লাগছে!”

 

প্রশংসা পেয়ে হাসলো জেনোভিয়া। কিঞ্চিৎ লজ্জাও পেল। বললো,

“ধন্যবাদ।”

 

বেনিম দোকানের কাছ থেকেই বিদায় নিলো। জেনোভিয়াকে আরও অনেক দূর হেঁটে যেতে হবে। জেনোভিয়ার যাওয়ার পথে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ভিতরে প্রবেশ করলো বেনিম। দোকানটা বেশি বড়ো নয়। মাঝারি আকারের। 

বেনিম কাউন্টারের কাছে এসে দেখতে পেল বৃদ্ধা বেলকা বসে আছে। রিচার্ড কক্সের সাথে গল্প করছে সে। 

বেনিমকে দেখে বৃদ্ধা বললেন,

“আরে তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।” 

 

বৃদ্ধা বেনিমকে ওদের দোকানের পাশের একটা খাবারের দোকানে নিয়ে এলেন। মুরগির মাংসের একটা খাবার অর্ডার করলেন তিনি। 

খাবার এসে গেলে বৃদ্ধা খেতে খেতে জানতে চাইলেন,

“আজ রাতে তুমি ফ্রি আছো?”

 

“হুম, কেন বলুন তো?”

 

বৃদ্ধা ঠোঁটে প্রসন্ন হাসি ফুটিয়ে বললেন, 

“কেন আবার? আমার বাড়িতে ডিনারের জন্য আমন্ত্রণ রইল তোমার।”

 

বেনিমও বৃদ্ধার আন্তরিকতায় খুশি হয়ে হাসলো। আবার কিছুটা চিন্তিত ভঙ্গিতে বললো,

“হঠাৎ কেন ডিনারের জন্য নিমন্ত্রণ করছেন?”

 

“হঠাৎ ভাবছো কেন? তোমাকে খুব পছন্দ আমার। তোমাকে ছেলের মতো ভালোবাসি। অনেক দিন যাবৎই ভাবছিলাম তোমাকে নিমন্ত্রণ করবো।”

 

“ও আচ্ছা।”

 

“আসবে তো তুমি?”

 

“নিশ্চয়ই। আমি আমার এক বন্ধুকে সাথে নিয়ে যাব।”

 

“ঠিক আছে। তোমরা আসলে আমি খুবই খুশি হবো।” বৃদ্ধার ওষ্ঠাধরে আনন্দিত হাসি। 

 

বৃদ্ধার সাথে সাথে বেনিমও হাসলো। যদিও তার হাসতে ইচ্ছা করলো না। তার ভিতরে চিন্তা। আসলেই কি বৃদ্ধা তাকে খাবারের জন্যই নিমন্ত্রণ করছে? না কি এর পিছনে অন্য কোনো কারণ আছে? সহসা বেনিমের মনে পড়ে গেল পলিনার খু’নটা তো বুড়ির বাড়ির সামনেই হয়েছিল। ওই জায়গাটা নির্জন, পরিত্যক্ত!

 

(চলবে)

 

 রঙিলা রাতের কালো অশ্রু (১০) 

লেখা: ইফরাত মিলি

___________________

 

[বসন্তকাল, ২০১৮ সাল। সেন্ট পিটার্সবার্গ।]

 

তারাস বসে আছে। তার গায়ে পুলিশের ইউনিফর্ম। মুখে শান্ত রূপ। চোখ জোড়া টেবিলের উপর কাগজপত্র দেখতে ব্যস্ত। সে কাগজপত্রের উপর চোখ বুলাতে বুলাতেই সামনে বসা মেয়েটিকে প্রশ্ন করলো,

“মারলে কেন ছেলেটাকে?” 

 

জেনোভিয়া চোখ তুলে তাকালো। তার মেজাজ অত্যন্ত খারাপ। কপালে বিরক্তির কুঞ্চন। আজ সকাল সকাল তাকে থানায় ডেকেছে পুলিশ। কারণ? কারণ হলো সে একটা ছেলেকে ঘু’সি মে’রে নাক থেকে র’ক্ত বের করে দিয়েছে। ছেলেটা তার নামে কেইস করে গেছে আরও কিছু মিথ্যা মারের গল্প শুনিয়ে। সে তিরিক্ষি কণ্ঠে বললো,

“আপনি কি বোকা মিস্টার? ছেলেটা আমাকে আজেবাজে কথা বলছিল। আমি কি ওর সেসব কথা সহ্য করবো? ধরুন একটা মেয়ে আপনাকে ওরকম কথা বলছে, আপনি সহ্য করতেন?”

 

উদাহরণ টানায় বিষয়টা একদম ভালো লাগলো না তারাসের। সে গম্ভীর গলায় জবাব দিলো,

“উদাহরণ টানা বন্ধ করো। ছেলেটা যদি তোমাকে সত্যিই ইভটিজিং করে থাকে তাহলে তোমার উচিত ছিল পুলিশকে জানানো। পুলিশ যা শাস্তি দেওয়ার দিতো। তুমি তাকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার রাখো না। ছেলেটার কেস করার কারণ যথার্থ। তোমাকে এর জন্য শাস্তি ভোগ করতে হবে।”

 

“শাস্তি?” অবাক হলো জেনোভিয়া, “আমাকে শাস্তি দেবেন আপনারা? অথচ ও আমার সাথে যে অসভ্যতামি করেছে ওর কোনো শাস্তি হবে না? কেমন আইন আপনাদের? ন্যায় বিচারের নামে অন্যায় বিচার করছেন আপনারা!”

 

“আমাকে ন্যায়-অন্যায় শেখাতে এসো না। আইন পড়ে তবেই এই জায়গায় এসেছি।”

 

“এইগুলো পড়েছেন আইনে? নির্দোষকে শাস্তি দাও আর দোষীকে ছেড়ে দাও?  আপনি পুলিশ নামের কলঙ্ক!”

 

জেনোভিয়ার কথার ধারে দু কান কাঁপলো তারাসের। রাগে রক্তিম হলো মুখ। দাঁতে দাঁত চেপে বললো,

“মেপে কথা বলো মেয়ে।”

 

“মেপে কথা বলবো কেন? আপনি আসলেই একজন পুলিশ নামের কলঙ্ক! পুলিশরা কিছু পারে না শুধু নির্দোষকে শাস্তি…” 

জেনোভিয়া কথা শেষ করতে পারে না, তারাস তার আগেই চেয়ার থেকে উঠে এসে ওর একহাত শক্ত মুষ্টিতে চে’পে ধরে। ওকে আর কোনো প্রকার কথা বলার সুযোগ না দিয়ে টেনে নিয়ে যায় লকআপের দিকে। লকআপের দরজা খুলে ওকে ঠেলে ভিতরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। 

ঘটনার আকস্মিকতায় বিমূঢ় হয়ে গেল জেনোভিয়া। 

“এই মিস্টার, এটা কী করলেন? বন্দি করলেন কেন আমাকে?”

 

“পুলিশের সাথে বেয়াদবি করার অপরাধে তোমাকে গ্রেফতার করা হলো।”

 

“মানে? কার সাথে বেয়াদবি করেছি আমি?…”

 

জেনোভিয়া আরও নানান কথা বললো। তারাস সেসবে কর্ণপাত না করে আবার ফিরে এলো নিজের চেয়ারে। জেনোভিয়া বকবক করেই চললো। 

এখন আর তেজ নেই জেনোভিয়ার গলায়। আছে করুণ অভিব্যক্তি, কণ্ঠে কাতরতা, মিনতির সুর। 

 

সময় যেতে লাগলো। একের পর এক অনুরোধ-বিনয় ভেসে আসছে লকআপ থেকে। 

‘মিস্টার, দয়া করে ছেড়ে দিন। আর কখনও করবো না এমন।’

‘পৃথিবীর সবচেয়ে সাধু সমাজ হচ্ছে পুলিশ সমাজ। সবচেয়ে সাধু মানুষ তারা। তাদের কারণে পৃথিবী থেকে অন্যায়ের পরিমাণ লোপ পেয়েছে। পুলিশ সাহেব, প্লিজ ছেড়ে দিন।’

এমন নানাবিধ কথা বলে সে তারাসকে মানানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু তারাস একবার তাকাচ্ছেও না তার দিকে।

রাগে ভিতরটা ফুলছে জেনোভিয়ার। মনে মনে গালি দিচ্ছে। এমন একগুঁয়ে পুলিশ সে তার জীবনে আর দেখেনি। 

থানার অন্যান্য কয়েকজন পুলিশ জেনোভিয়াকে লকআপে বন্দি দেখে বললো,

“একি…এই বাচ্চা মেয়েটাকে বন্দি করেছো কেন?”

 

তারাস অবাক হয় ওদের কথায়। এই মেয়ে বাচ্চা? সে মেয়েটাকে বাচ্চা ভাবার কোনো কারণ পেল না। 

 

ধৈর্য ধারণ করতে গিয়ে পাগল হয়ে গেল জেনোভিয়া। দাঁড়িয়ে, বসে, হেঁটে কোনোটাতেই শান্তি পাচ্ছে না। ওদিকে তার কাজের সময় অতিক্রম হয়ে যাচ্ছে। দিনে মোট তিনটা পার্টটাইম জব করে সে। একটা চাকরির সময় অতিক্রম হয়ে গেছে এর মধ্যে। আরেকটা অতিক্রম হচ্ছে। সে এবার ভীষণ রাগলো। চেঁচিয়ে বললো,

“এই, ছেড়ে দিন আমায়। আমি তিনটা পার্টটাইম জব করি। তিনটার সময়ই চলে যাচ্ছে! কাজে ফাঁকি দেওয়ার নামে যদি আমার বেতন থেকে রুবল কেটে নেওয়া হয় তবে কি আপনি আপনার বেতন থেকে তা পরিশোধ করবেন? বলা তো যায় না, শেষমেশ যদি আমাকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করে তখন? তখন কি আপনি পদ ত্যাগ করে আমাকে আপনার পদে বসিয়ে দেবেন? ছেড়ে দিন। চাকরি না করলে খাবার জুটবে না আমার কপালে। আমি না খেয়ে মরতে পারবো না।”

 

তারাস নির্বিকার ভাবে একবার তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে নিলো। 

অনেকক্ষণ ধরে বকবক করতে করতে গলা ব্যথা হয়ে গেল জেনোভিয়ার। লোকটা এত পাষাণ? ঘৃণার চোখে তারাসের দিকে চেয়ে ভাবলো সে। কিছুক্ষণের জন্য জেনোভিয়া গলাটাকে বিরতি দিলো। তার বকবকানিতে থানার মানুষ কি অতিষ্ঠ হচ্ছে না? অতিষ্ঠ হয়ে ছেড়ে দিতে পারে না তাকে? এও ভাবলো জেনোভিয়া। 

 

তারাসের জন্য কফি আর দুই পিস কারি ব্রেড দিয়ে গেল এক জুনিয়র পুলিশ। যা দেখে জেনোভিয়ার শোচনীয় অবস্থা হলো। তার পেট ডেকে উঠলো খাদ্য চেয়ে। 

তারাস কফিতে চুমুক দেওয়ার সময় লক্ষ করলো জেনোভিয়া লকআপের ভিতর থেকে কেমন লোভাতুর চোখে চেয়ে আছে। তারাস বললো,

“চেয়ে থেকে লাভ নেই। এ খাবার পুলিশদের জন্য, আসামিদের জন্য নয়।”

 

জেনোভিয়ার শুকনো মুখ আরও শুকিয়ে গেল। বললো,

“সকাল থেকে কিছু খাইনি। আপনি একজন অভুক্ত মানুষের সামনে বসে কীভাবে খাদ্য গ্রহণ করতে পারেন? দিন, এক পিস ব্রেড আমাকেও দিন।” 

 

তারাস শুধু হাসলো মেয়েটার কথা শুনে, কিছু বললো না। একটা মানুষ এত নির্দ্বিধায় খাবার চাইতে পারে কীভাবে?

 

কোনো খাবারই জুটলো না জেনোভিয়ার কপালে। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। সেই সকাল থেকে সে বন্দি। আর ধৈর্য ধরে থাকতে পারে না জেনোভিয়া। চ্যাঁচামেচি শুরু করে দেয়। 

ফেলিন থানায় ঢোকা মাত্রই শুনতে পায় চ্যাঁচামেচির শব্দ। সে এতক্ষণ যাবৎ থানার বাইরে ছিল। 

 

“কে চিল্লাচ্ছে?” বলতে বলতে ভিতরে আসলো ফেলিন। জেনোভিয়া তাকে দেখে থেমে গেল। ফেলিনও জেনোভিয়াকে দেখে দাঁড়িয়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ জেনোভিয়ার দিকে চেয়ে থাকার পর চোখ সরিয়ে নিয়ে রাগ ঝাড়লো সকলের উপর,

“এত সুন্দর মেয়েটাকে লকআপে ভরেছে কোন বেকুব?”

 

তারাসের কানে কথাটা আসা মাত্র কান খাড়া হয়ে যায়। অন্যদিকে জেনোভিয়ার ওষ্ঠাধরে প্রস্ফুটিত হয় হাসি। ফেলিনকে দেখে মনে হচ্ছে এই লোকটার মাধ্যমে সে ছাড়া পাবে। জেনোভিয়া সুযোগ পেয়ে গলা সচল করলো,

“দেখুন না স্যার, আমাকে বিনা দোষে বন্দি করে রেখেছে!”

 

“বিনা দোষ?” তেড়ে এলো তারাস, “তুমি পুলিশের সাথে বেয়াদবি করেছো। এটা তোমার অনেক বড়ো দোষ।”

 

ফেলিন জেনোভিয়ার দিকে তাকালো। জেনোভিয়া শশব্যস্ত হয়ে দুই পাশে মাথা নেড়ে বললো,

“মিথ্যা কথা।”

 

“আমি মিথ্যা বলছি? তুমি মিথ্যা বলছো।” বললো তারাস। 

 

ফেলিন বুঝতে পারলো কে মিথ্যা বলছে। কিন্তু বুঝেও সে সত্যবাদীর পক্ষ নিলো না। উলটো সত্যবাদীকেই বললো,

“তুমি সামান্য একটা অপরাধের জন্য মেয়েটাকে লকআপে ভরেছো কেন তারাস? তোমার বুদ্ধি-শুদ্ধি সব লোপ পেয়েছে না কি?”

 

ফেলিন ছেড়ে দিলো জেনোভিয়াকে। জেনোভিয়া আন্তরিকতার সাথে ফেলিনকে ধন্যবাদ জানিয়ে দৌড়ে পালালো এখান হতে। 

থানা থেকে বেরিয়ে যখন দৌড়ে পালাচ্ছিল তখন হঠাৎ এক কণ্ঠস্বর থামিয়ে দিলো তাকে।

“দাঁড়াও।”

 

জেনোভিয়া দাঁড়ালো। পিছন ফিরে তারাসের দিকে তাকালো সে। বদ পুলিশটা আবার কী চায়?

তারাস একটা কারি ব্রেড এগিয়ে দিয়ে বললো,

“নিয়ে যাও এটা।”

 

জেনোভিয়া একবার তারাসের হাতের কারি ব্রেড, আরেকবার তারাসকে দেখলো। 

“আমি কি ভিক্ষুক?” জেনোভিয়ার কণ্ঠে রাগ ঝরলো, “ভিক্ষা দিচ্ছেন আমায়?”

 

বলে গটগট করে হেঁটে গেল সে। 

কিছুদূর গিয়ে আবার আচমকা পিছনে দৌড়ে ফিরে এসে ছোঁ মেরে কেড়ে নিলো তারাসের হাতের কারি ব্রেড, অতঃপর আবার দৌড়ে চলে গেল।

 

তারাস দাঁড়িয়ে রইল বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে। এই মেয়েটা আসলে কী? মানুষ? না কি অন্যকিছু? 

 

________________________________________________

 

[বর্তমান সময়, ২০২১ সাল।]

 

বৃদ্ধার নিমন্ত্রণ গ্রহণ করে ঠিকই বেনিম রাতে এলো। একা আসেনি, সাথে আছে তার বন্ধু রোমেরো। তাদের সম্পর্ক অতটা ঘনিষ্ঠ নয়, তবে বেনিম মনে করে রোমেরো তার বন্ধুর কাতারেই পড়ে। রোমেরো তাকে বন্ধু ভাবে কি না জানে না। হয়তো ভাবে। সেজন্যই হয়তো যখন সে বৃদ্ধার নিমন্ত্রণের কথা জানিয়েছিল তখন আপত্তি করেনি রোমেরো। 

বৃদ্ধা ওদের দুজনকে হাসি মুখে ভিতরে নিয়ে এসে বসতে দিলো। 

রোমেরো এদিক-ওদিক তাকিয়ে ঘরটা দেখছে। বাইরে থেকে দেখেই বুঝেছিল বাড়িটা বিশাল। ভিতরে প্রবেশ করে সে আসলেই চমকালো। এত বড়ো ঘর!  আসবাবপত্রে আভিজাত্যের ছাপ। বোঝাই যায় বৃদ্ধা অনেক ধনী। ভেবেছিল বাড়িতে বৃদ্ধার সাথে বৃদ্ধার স্বামী, ছেলে-মেয়ের সাথে দেখা হবে। কিন্তু বৃদ্ধা ব্যতীত আর কাউকে দেখা গেল না। 

 

“আপনি কি একা থাকেন?” রোমেরোর মুখ দিয়ে প্রশ্নটা বেরিয়েই পড়লো টুপ করে। 

 

বৃদ্ধা সহাস্যে মাথা দুলালো। যার অর্থ, ‘হ্যাঁ’।  

 

“ভয় করে না?” জানতে চাইলো রোমেরো, “তিন বছর আগে মস্কোতে একটা খু’ন হয়েছিল, জানেন? এক বৃদ্ধা মহিলাকে খু’ন করা হয়েছিল! সেই বৃদ্ধা মহিলাও আপনার মতো একা একা থাকতো একটা বিশাল বাড়ি নিয়ে। খু’নি বৃদ্ধা মহিলাকে খু’ন করে ঘরের সমস্ত মূল্যবান সম্পদ নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। গুজব আছে যে সেই খু’নি বর্তমানে ফিনল্যান্ডে অবস্থান করছে।”

 

বৃদ্ধার মুখশ্রী থেকে হাসি সরলো না। কিছু না বলেই সে গিয়ে কিচেনে ঢুকলো।

বেনিমের মনে হলো বুড়িটা যেন একটু বেশিই হাসে। অযথাই এত বেশি হাসা ঠিক নয়। দেখতে বিরক্ত লাগে! 

 

“তুমি কি কিছুটা বেশিই বলে ফেললে না?” রোমেরোকে বললো বেনিম। 

 

“বেশি বলেছি? তেমন তো মনে হচ্ছে না। কী নিশ্চয়তা আছে বুড়ির জীবনের? একা বাড়িতে থাকে, আশেপাশের বাড়িগুলোও পরিত্যক্ত। বুড়ি মারা যাওয়ার সময় চিৎকার করলেও কেউ শোনার থাকবে না!”

 

কাঁটা দিয়ে উঠলো বেনিমের শরীর। রোমেরো যখন কথাগুলো বলছিল বেনিমের মনশ্চঃক্ষ তখন কল্পনা করছিল ওই বিভীষিকাময় মুহূর্তর। খু’নাখু’নির কথা সে শুনতে পারে না। ভয় হয়। সে খুব ভয় পায় মানুষের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগকে, মানুষের উষ্ণ র’ক্তকে।

 

বৃদ্ধার আলতো কণ্ঠস্বর ভেসে এলো কিচেন থেকে। 

বৃদ্ধার সাড়া পেয়ে ওরা দুজনই কিচেনে গেল। 

কিচেনে এসে দুজনের চক্ষুই চড়কগাছ হলো। এত খাবার? দুজনেই বৃদ্ধার দিকে সন্দেহের চোখে তাকালো। ওদের বিশ্বাস হচ্ছে না এই বৃদ্ধা এতসব খাবার তৈরি করেছে নিজ হাতে। বেনিম অন্তরের বিস্ময়কে হালকা করতে প্রশ্ন করলো,

“এতসব খাবার কি আপনি বানিয়েছেন?”

 

বৃদ্ধা লজ্জিত মুখে হাসলেন। 

“না না, আমি বানাইনি। আমি বয়স্ক মানুষ, এত খাবার বানানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার বোনের মেয়ে এসে সাহায্য করে গেছে আমাকে।”

 

“ওহ।”

 

বেনিম আর রোমেরো নিজেদের আসন গ্রহণ করলো। খেতে খেতে কথা হলো তিনজনের। বৃদ্ধার ব্যাপারে জানতে পারলো ওরা। বৃদ্ধার স্বামী মারা গেছে আজ থেকে এগারো বছর আগে। বৃদ্ধার দুজন ছেলে আছে। দুজনই বিদেশে বসত গড়েছে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে। দেশে যে তাদের বৃদ্ধা মা একা পড়ে আছে সেদিকে তাদের কোনোই ভ্রুক্ষেপ নেই।

 

খাওয়া শেষে বৃদ্ধা দুটো মদের বোতল দিলো ওদের সামনে। আসনের স্থান পরিবর্তন হয়েছে ওদের। কিচেন থেকে আবারও ফিরে এসেছে বসার ঘরে। বেলকা চলে গেলেন ফ্রিজ থেকে বরফ আনার জন্য। 

 

রোমেরোর অধিক মদ্যপান করার অভ্যাস আছে, কিন্তু বেনিম তার বিপরীত। সে মদ খেতে পারে না খুব একটা। দুই-তিন সিপের বেশি তার গলা দিয়ে নামতে চায় না। 

রোমেরো বোতলের মুখ খুলে তিনটা গ্লাসে মদ ঢাললো। বুড়িকে যত দেখছে ততই অবাক হচ্ছে। বুড়ি হয়ে গেলেও আসলে একে বুড়ি বলা যায় না। রোমেরোর তো হঠাৎ মনে হলো সে যদি বুড়ির সাথে মদ পানের প্রতিযোগিতা করে তাহলে বোধহয় সে হেরে যাবে। 

 

বেনিম দুই চুমুক খেয়ে আর খেতে পারলো না। জোর করে খেতে চাইলে বমি হয়ে পেটের যাবতীয় খাদ্যঅংশ বেরিয়ে যাবে বাইরে। তবে বৃদ্ধা আর রোমেরো থামাথামির নাম নিলো না। 

রোমেরো এক সময় বৃদ্ধার কাছে জানতে চাইলো,

“শুনেছিলাম আপনি পলিনা মেয়েটার খু’নের ব্যাপারে সাক্ষী দিয়েছেন। আপনি কি দেখেছিলেন খু’নিকে?”

 

“আমার চোখে সমস্যা। দূরের জিনিস ভালো দেখতে পাই না। খু’নির মুখ দেখার ভাগ্য হয়নি। যদি দেখতে পেতাম তাহলে জা’নোয়ারটাকে পুলিশে ধরিয়ে দিতাম। ওর মতো জা’নোয়ারের ফাঁসি হওয়া উচিত। ওর বেঁচে থাকার অধিকার নেই।”

 

বেনিম বললো,

“ফাঁ’সি দেওয়া হলে এক নিমেষেই ওর শাস্তি শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু এত সহজে খু’নির শাস্তি শেষ হওয়া উচিত নয়। ওকে আস্তে আস্তে কষ্ট দিয়ে মা’রা উচিত। ফাঁ’সি দেওয়ার রায় হলে খু’নি কিছুতেই চাইবে না ম’রতে, কিন্তু ওকে এমন শাস্তি দেওয়া উচিত যাতে ও নিজ থেকেই ম’রে যাওয়ার কথা ভাবে। এটাকেই বলে শাস্তি।”

 

বেনিমের কথাটা বৃদ্ধা বেলকার খুব মনে ধরলো। বললেন,

“ঠিক বলেছো বুদ্ধিমান ছেলে!”

 

বেনিম প্রশংসা পেয়ে হাসলো।

 

বৃদ্ধা বললেন,

“এভাবেই শাস্তি হওয়া উচিত। কত বড়ো জা’নোয়ার হলে কেউ এত নির্মম ভাবে মা’রতে পারে কাউকে! বে*ন্মা শালা! এমন সন্তান যে মা পেটে ধরেছে সেও নিশ্চয়ই জা’নোয়ার। ওর মা এখনও বেঁচে আছে কী করে। ওর মায়ের তো উচিত ম’রে যাওয়া! জা’নোয়ারের সন্তান জা’নোয়ার!” 

 

রোমেরো আর বৃদ্ধার কথাগুলো সহ্য করতে না পেরে বললো,

“আমার মনে হয় আপনি একটু বেশিই বলে ফেলছেন বেলকা। অন্যায় যে করেছে তাকে গালাগালি করুন, তার মাকে টানবেন না। মা যেরকম হয় সন্তান সেরকম হয় না, সন্তান যেরকম হয় মা সেরকম হয় না। আপনি নিজের ছেলেদের কথা ভাবুন। আপনার ছেলেরা কি আপনার মতো?”

 

রোমেরোর কথাগুলোয় বৃদ্ধা বেশ সংকোচে পড়ে গেলেন।

 

বেনিমও বৃদ্ধার বিপক্ষে কথা বললো,

“পৃথিবীর সব সন্তানরা তার মাকে ভালোবাসে। যদি জা’নোয়ারটা জানতো আপনি ওর মাকে এমন কথা বলেছেন তাহলে নিশ্চয়ই পলিনার চেয়ে আপনার মৃ’ত্যু আরও ভয়াবহ হতো! মাকে নিয়ে কখনও কিছু বলা ঠিক নয়। মা হচ্ছে সন্তানদের কাছে স্বর্গ স্বরূপ! আপনি ভুল করেছেন বেলকা। ভুল করা ভালো নয়।”

 

পরিবেশটা অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে বুঝতে পেরে বেলকা হেসে পরিবেশ হালকা করতে চাইলেন। 

“আরে তোমরা এত রেগে গেছো! হুম আমার ভুল হয়েছে। আর এমন ভুল করবো না।”

 

“ভুল তো করেই ফেলেছেন, করবো না বলে কী লাভ এখন? প্রথমেই আপনার সাবধান থাকা উচিত ছিল।” বললো বেনিম।

 

বৃদ্ধার বাসায় আর এক মুহূর্ত বসে থাকতে ভালো লাগছিল না রোমেরোর।

 

“বেনিম, আমাদের এখন যাওয়া উচিত।” দাঁড়িয়ে গিয়ে বললো রোমেরো। 

বেনিমও দাঁড়ালো। হাসলো একটু। বৃদ্ধার সাথে করমর্দন করে বললো,

“নিমন্ত্রণ করার জন্য ধন্যবাদ। খাবার সুস্বাদু ছিল। আপনার রাতটা শুভ কাটুক। শুভ রাত্রি!”

 

সৌজন্যতার পাঠ চুকিয়ে চলে গেল ওরা। বেনিম বাসায় ফিরলেও রোমেরো ফিরলো না। বললো,

“মিউজিক ইন্সট্রুমেন্টসের দোকানে একটু কাজ আছে আমার, আমি পরে ফিরবো। তুমি বাসায় চলে যাও।”

 

“ঠিক আছে তাহলে।” 

 

বেনিম একাই ফিরলো। বাড়িতে ঢোকা মাত্রই মা এসে দাঁড়ালো সামনে। 

বেরি উইলোর চক্ষু সিক্ত। মনে হচ্ছে কাঁদছিলেন। তিনি বেনিমকে বললেন,

“কোথায় গিয়েছিলে?”

 

“একজন আমাকে ডিনারে নিমন্ত্রণ জানিয়েছিল, সেখানেই গিয়েছিলাম আমার বন্ধুকে নিয়ে।”

 

“বন্ধু?” একটু অবাক কণ্ঠে বললেন বেরি উইলো। তারপর কান্না কান্না কণ্ঠে বললেন,

“এরকমভাবে রাত্রি বেলা আর কখনও কোথাও যাবে না মামাকে না জানিয়ে। ঠিক আছে?”

 

বেনিম মাকে জড়িয়ে ধরে বললো,

“কোথাও যাব না না জানিয়ে। ভালোবাসি মামা!”

 

তারপর সোফার দিকে তাকালো, সেখানে রিচার্ড কক্স বসে আছেন। বেনিম বললো,

“সেই যে বৃদ্ধা আসে আমাদের দোকানে, সে যেন আর কখনও না আসে পাপা। তার আগমন পছন্দ হবে না আমার।”

 

বেনিম উপরে চলে গেল। 

বেরি উইলো অবাক হয়ে তাকালেন রিচার্ড কক্সের দিকে। রিচার্ড কক্স বললেন,

“হয়তো সাধারণ কিছু ঘটেছে।”

 

তিনি বসা থেকে উঠে বেরি উইলোর কাছে এলেন। বেরি উইলোর কপালে চুম্বন এঁকে দিয়ে বললেন,

“চিন্তা করো না বেরি। কালকে আমরা পরিবারের সবাই মিলে পার্কে ঘুরতে গেলে কেমন হয়? না কি ডাচায় থাকতে যেতে চাও? গ্রীষ্মে ঘোরাঘুরি না করলে জীবনযাপন বড্ড বেমানান লাগে।”

 

বেনিম এমনি সময় নিচে টিভির সাউন্ড পেলেই এসে মা-বাবার সাথে বসে টিভি দেখে। কিন্তু আজ নামলো না। বাইরে থেকে এসে সেই যে উপরে চলে গেল তারপর আর বেরি উইলো দেখতেই পেল না ওকে। হয়তো ঘুমিয়েছে। পর মুহূর্তেই আবার মনে হলো আসলেই ঘুমিয়েছে তো? 

বেরি উইলো টিভি বন্ধ করে উপর তলায় উঠলেন। বেনিমের রুমের দরজা খুলে অবাক হলেন তিনি। বেনিম নেই। 

 

“আমি এখানে।”

 

পিছন থেকে আসা কথাটায় চমকে উঠলেন বেরি উইলো। তাকিয়ে দেখলেন তার পিছনেই দাঁড়িয়ে আছে বেনিম। ছেলেটা এত নিঃশব্দে চলাচল করে কীভাবে? মাঝে মাঝে ওর হাঁটার যেন বিন্দুমাত্র শব্দ হয় না। বেরি উইলো বললেন,

“ঘুমাওনি কেন এখনও?”

 

বেনিম উত্তর না দিয়েই রুমে ঢুকলো। রুমের জানালাটা খুলে দেখলো বাইরের কী অবস্থা। ভারী বর্ষণ হচ্ছে। বর্ষণের সাথে সাথে বাতাস বইছে দ্রুত বেগে। জানালা বন্ধ করে দিলো সে। 

বেরি উইলো দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন। বেনিম মায়ের দিকে চেয়ে বললো,

“বৃষ্টি খুব সুন্দর মামা। বৃষ্টি আসলে কী জানো? বৃষ্টি হচ্ছে আকাশের কান্না। আকাশের কান্নার চেয়ে মানুষের কান্না আরও বেশি সুন্দর।”

 

বেরি উইলো অবাক হয়ে শুনলেন বেনিমের কথাগুলো। 

বেনিম অন্যদিকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে বললো,

“ওই বুড়িরও কান্না করা উচিত, কারণ ও ভুল করেছে।”

 

“কী বললে?” বেরি উইলো স্পষ্ট শুনতে পেলেন না বেনিমের কথা। 

 

বেনিম এগিয়ে এলো। মায়ের দুই হাত নিজের হাতে এনে বললো,

“আমি তোমার লক্ষ্মী ছেলে তাই না মামা?”

 

বেরি উইলো একটু হেসে বললেন,

“হুম তুমি আমার লক্ষ্মী ছেলে।”

 

“তুমি আমায় জন্ম দিতে পেরে ধন্য, তাই না?”

 

“অবশ্যই।”

 

বেনিম মায়ের হাতে চুমু খেলো। তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,

“আজ আমাকে ঔষধ খেতে দেবে না মামা?”

 

ভয় বাড়ি খেলো বেরি উইলোর হৃৎপিণ্ডের সাথে। দু চোখে প্রদর্শিত হলো আতঙ্ক।

 

বেনিম বললো, 

“আমার ভিতরটা কেমন যেন করছে মামা! দম বন্ধ বন্ধ লাগছে। অস্বস্তি লাগছে। আমি অশান্তবোধ করছি। আমার কী হলো মামা?”

 

বেরি উইলো হাসার চেষ্টা করলেন। বললেন,

“কিছু হয়নি আমার লক্ষ্মী ছেলে। ঘুমিয়ে পড়লেই ঠিক হয়ে যাবে সব। তুমি বসো। আমি ওষুধ নিয়ে আসছি।”

 

________________

 

বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ক্রমশ আরও ভারী হয়ে উঠছে বৃষ্টি। বাতাসের তেজও মন্দ নয়। বৃদ্ধা বেলকা ঘুমায়নি এখনও। হাতে তার দুই ছেলের ছবি। বুকটা হাহাকার করছে একরাশ কষ্টে। কীভাবে তার ছেলেরা তাকে ভুলে গেল এরকম ভাবে? ছোটো বেলায় যে ছেলেরা সারাক্ষণ সাথে সাথে ঘুরতো সেই ছেলেরাই আজ কত দূরে! চোখ বুজে ফেললো বৃদ্ধা। চোখ বেয়ে নেমে গেল নোনা জল। বেনিম আর রোমেরো বাসায় আসায় সে আজ ছেলেদের অভাবটা আরও তীব্র ভাবে উপলব্ধি করছে। সে হাত বুলালো ছেলেদের ছবির উপর। শূন্যতায় পুরো বুকটাই ফাঁকা লাগছে। 

কলিং বেলের শব্দে বৃদ্ধার চোখ চলে গেল দরজার বন্ধ কপাটের গায়ে। কে এসেছে এ সময় তার বাড়িতে? হাতের ছবি রেখে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। দরজার কাছে গিয়ে বাইরের আগন্তুককে জিজ্ঞেস করলেন,

“কে?”

 

“এটা আমি।”

 

“তুমি?” বৃদ্ধা একটু অবাক হলেন, “আবার এসেছো কেন?”

বলতে বলতে দরজা খুললেন তিনি। কালো রেইনকোট পরা আগন্তুককে বললেন,

“কিছু কি ফেলে রেখে গেছো?”

 

“হুম।”

 

“কী?”

 

“জীবন্ত আত্মা, যেটার মৃত থাকা উচিত।”

 

আগন্তুক বৃদ্ধাকে আর কিছু বলবার কিংবা ভাববার সময় দিলো না, বৃদ্ধার চুলের মু’ঠি আঁকড়ে ধরে বৃদ্ধাকে আ’ছড়ে ফেললো ফ্লোরে। ফ্লোরে পড়ে বৃদ্ধা প্রচণ্ড ব্যথা পেলেন। ব্যথায় বিজাতীয় শব্দ বের হলো তার মুখ দিয়ে। 

 

_________________

 

জানালার কপাটটা বাতাসে বারবার খুলছে আর বন্ধ হচ্ছে। যার কারণে অসহ্য একটা শব্দ সৃষ্টি হয়েছে। এই অসহ্য শব্দটা ঘুম ভাঙিয়ে দিলো জেনোভিয়ার। জেনোভিয়া উঠে বসলো। সে এখন সোফায়। কাজ থেকে ফিরে আবার একটানা বাড়ির কাজ করতে করতে ঘুম পেয়ে বসেছিল। ঘুমিয়েও পড়েছিল। জানালাটা বন্ধ করে দিলো সে। জুরাকে ডাকলো। 

“জুরা।”

 

সাড়া পেলো না কোনো। জেনোভিয়া কিচেন আর বেডরুমও খুঁজে এলো। কিন্তু জুরাকে দেখতে পেল না। এ সময় তার হঠাৎ মনে পড়লো জুরাকে সে বাইরে খাবার খেতে দিয়েছিল। তারপর কি ঘরে এনেছিল জুরাকে? 

জেনোভিয়া দৌড়ে গিয়ে দরজা খুললো। দেখতে পেল জুরা দরজার পাশে দেয়াল ঘেঁষে বসে আছে। জুরাকে কোলে তুলে নিলো আদুরে ভঙ্গিতে। বেখেয়ালে সে কীভাবে জুরাকে বাইরে রেখে ঘরের ভিতর ঘুম দিলো? বৃষ্টির ছিটকে আসা ফোঁটায় জুরার শরীরটা কেমন স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে গেছে। জেনোভিয়া কণ্ঠ করুণ করে  বললো,

“আমি দুঃখিত জুরা!”

 

জুরাকে নিয়ে ভিতরে ঢুকতে গিয়েও  আবার দাঁড়ালো জেনোভিয়া। রাস্তায় চোখ পড়তেই বাইরে তার জ্বালিয়ে রাখা লাইটের আলোতে দেখতে পেল একজন রেইনকোট পরা লোক তার বাড়ির সম্মুখের রাস্তা অতিক্রম করে যাচ্ছে। একটু লক্ষ করার পর বুঝতে পারলো এটা রাজুমিখিন। এত রাতে তীব্র বৃষ্টির ভিতর লোকটা গিয়েছিল কোথায়? 

 

(চলবে)

_____________

 

বি. দ্র. গল্পটা ২০২১ সাল নিয়ে লেখা। এটা বর্তমান সময়। ২০২১ সাল ব্যতীত অতীতের দৃশ্য দেখানোর আগে উপরে সময়কাল লিখে দিই আমি। কেউ বর্তমান কাল আর অতীত কালের দৃশ্য একসাথে গুলিয়ে ফেলবেন না। ২০২১ সাল ব্যতীত যে সালেরই দৃশ্য দেখানো হোক না কেন ওটা অতীত, পূর্বে ঘটে গেছে এমন কাহিনি।

 

 রঙিলা রাতের কালো অশ্রু (১১)

লেখা: ইফরাত মিলি

___________________

 

অন্তরীক্ষের ক্রন্দন বিরতিহীন। তীব্র থেকে তীব্র হচ্ছে তার সুর আর মাত্রা। মনে হচ্ছে যেন এক রাতেই ভাসিয়ে নিয়ে যাবে শহরটাকে। বৃষ্টির ঝাঁঝালো শব্দ বাড়ির ভিতরে ঢুকতে বাধা পাচ্ছে দেওয়াল আর বন্ধ দরজা-জানালার জন্য। তীব্র শব্দটা ক্ষীণ শোনাচ্ছে বাড়ির অন্তঃপুরে।

বেরি উইলোর ঘুমটা ভেঙে গেল সহসা। বাইরের ঝড়ের তেজ সম্পর্কে অনুমান করতে পারলেন। গায়ের উপর থেকে সরিয়ে দিলেন রিচার্ড কক্সের হাত। তারপর নামলেন বিছানা থেকে। গলাটা তিক্ত তিক্ত লাগছে। ভেজানো দরজায় টান দিতেই মৃদু শব্দ করে খুলে গেল দরজা। 

তাদের রুমের বাইরে দরজার কাছেই রয়েছে লিভিংরুমের বাতির সুইচ। সেটা চেপে দিলেন। জ্বলে উঠলো লিভিং রুমের আলো। বেরি উইলো এবার কিচেনের দিকে অগ্রসর হলেন। যেতে যেতে পায়ের নিচটা সিক্ত অনুভব হলো তার। ফ্লোরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। ফ্লোরে পানি দেখে চমকে উঠলেন তিনি। পানি কেন ফ্লোরে? সদর দরজার দিকে তাকালেন দ্রুত। দরজা ভেজানো। ক্ষণিকের জন্য বন্ধ হয়ে এলো তার নিঃশ্বাস। চক্ষু দাঁড়িয়ে গেল। ভয়, আতঙ্ক, উদ্বেগ চোখে! 

ছুটে এসে ব্যস্ত হাতে দরজা বন্ধ করলেন। হৃৎপিণ্ডের দ্রুত চলাচলের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন তিনি। ভয়! গভীর ভয় দানা বাঁধতে শুরু করেছে তার বুকে। 

বেরি উইলো ত্রস্ত পায়ে দৌড়ে দোতলায় উঠে এলেন। দরজার পাল্লায় ঠ্যালা লাগতেই খুলে গেল দরজা। বাতি জ্বালানো মাত্রই চোখ ফেললেন বিছানায়। বেনিম সুবোধ বালকের মতো চাদরে শরীর ঢেকে ঘুমিয়ে আছে। তবু শান্ত হতে পারলেন না তিনি। ছুটে গেলেন ওয়াশরুমে। 

ঝুড়ির ঢাকনা সরিয়ে ভিতরে রেইনকোট দেখে হাতে তুলে নিলেন সেটা। 

রেইনকোটের গায়ে পানি দেখে আঁতকে উঠলেন। ডান হাতে চেপে ধরলেন মুখ। খুব কষ্টে কান্না আটকালেন। কাঁপতে লাগলেন থরথর করে। ওয়াশরুম থেকে বাইরে তাকালে বেনিমের খাট দেখা যায়। সেদিকে তাকালেন তিনি। বেনিম ঘুমিয়ে আছে। ঘুমন্ত নিষ্পাপ মুখটার দিকে তাকিয়ে ভাবলেন, বেনিমকে তো তিনি ঘুমের ঔষধ খাইয়েছিল। ও তো ঘুমিয়ে আছে। হ্যাঁ, বেনিম ঘুমিয়ে ছিল। ও জাগেনি। 

বেরি উইলোর সারা শরীর কাঁপছে। তিনি রেইনকোটটা নিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেলেন বেনিমের রুম থেকে। যাওয়ার আগে লাইট অফ করতে ভুললেন না। 

 

নিজেদের বেডরুমে এসে তবেই পা দুটোকে ক্ষান্ত দিলেন বেরি উইলো। বিছানায় বসে রিচার্ড কক্সকে ধাক্কা দিতে দিতে ডাকলেন,

“রিচার্ড, ওঠো রিচার্ড। রিচার্ড!”

 

রিচার্ড কক্স চোখ মেলে তাকালেন। তার চোখে নিদ্রার রেশ। বেরি উইলোকে অশান্ত, ভয় আক্রান্ত দেখে শঙ্কিত মনে উঠে বসলেন তিনি। 

“কী হয়েছে?”

 

বেরি উইলোর শরীর এখনও কাঁপছে। কাঁপা কাঁপা স্বরে বললেন,

“বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, দরজা খোলা, ফ্লোরে পানি, বেনিম ঘুমিয়ে আছে, রেইনকোটের গায়ে পানি!”

 

রিচার্ড কক্স প্রথমটায় অবাক হন। তারপর হঠাৎই তার চোখের দৃষ্টি হয়ে আসে শান্ত, শীতল। যেমন শীতল একখণ্ড বরফ। তিনি শুয়ে পড়েন আবারও। দু চোখের পাতা বন্ধ করে বললেন,

“ঘুমিয়ে পড়ো বেরি। রাত জাগা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।”

 

__________________

 

জেনোভিয়ার মা ক্রিস্টিনা মারা যাওয়ার পর মস্কো শহরে ভীষণ একা হয়ে পড়েছিল জেনোভিয়া। মা মারা যাওয়ায় কতটা আঘাত লেগেছিল হৃদয়ে, কত কষ্টে যে সেই আঘাত কাটিয়ে উঠেছে তা আজও  দুঃস্বপ্নের মতো লেপটে আছে তার স্মৃতির দেওয়ালে। আঘাত কাটিয়ে উঠতে পারলেও ক্ষতর চিহ্ন আজও তির্যক। জেনোভিয়া অনেকদিন যাবৎ মস্কোর হসপিটালে ভর্তি ছিল। কারণ তার মাথায় লাগা আঘাতও কম গুরুতর ছিল না। সুস্থ হওয়ার পর একটা আত্মঘাতী ভয় তাকে সর্বক্ষণ ঘিরে রাখতো। সেদিন রাতের সেই ভয়ংকর মানুষটাকে খুব ভয় পায় সে। এমনও অনেক রাত আছে যে ওই ভয়ংকর মানুষটার কথা মনে পড়লে তার দু চোখের পাতা মিলিত হয়নি। মনে ঘাপটি মেরে ছিল ভয়। অন্ধকারের মতো গাঢ় সেই ভয়। 

যখন সে একলা ছিল মস্কো শহরে, যখন ভয়, শূন্যতা তার খুব আপন সঙ্গী হলো, তখন একজন বৃদ্ধা মহিলা তার হাতটা আঁকড়ে ধরতে সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে গিয়েছিল মস্কো শহরে। পুলিশের তত্বাবধান থেকে তাকে নিজের সাথে করে সেন্ট পিটার্সবার্গ নিয়ে আসে সেই বৃদ্ধা মহিলা। ওটা ছিল জেনোভিয়ার দাদি। দাদির সাথে সেন্ট পিটার্সবার্গে মন্দ কাটছিল না সময়। ধীরে ধীরে জীবন স্বাভাবিক হয়ে উঠছিল। কিন্তু চার বছর পর দাদিও চলে যায় তাকে একা করে। ভীষণ জ্বর উঠে একদিন হঠাৎই মারা যায় সে। জেনোভিয়া মেনে নেয়, এটা তার নিয়তি। নিয়তিকে উপেক্ষা করা যায় না। দাদি চলে যাওয়ার পর জীবনে এসেছিল তারাস। তারাস! এটা ওই মানুষটা, যার জন্য পুরো হৃদয় উজাড় ছিল। আজও আছে। জানে না তারাস হঠাৎ কেন দূরে সরে গেল! কিন্তু যত দূরেই হোক তারাস, জেনোভিয়া জানে সেই তারাসই আবার তার খুব কাছে। সে তো জানে তারাসের হৃদয়ে এখনও তার স্থাপন আছে। এটা বরাবরই ছিল। আর এটা জানতো বলেই তারাসের বিয়ে থামিয়েছিল সে। তারাস যদি সত্যিই মন থেকে দূরে সরে যেত তার থেকে, তাহলে কখনও বিয়ে ভাঙতে যেত না সে, আর না তো বার বার তারাসের কাছে ছুটে যেত। তারাসও কি তার কাছে ছুটে আসে না? হাসলো জেনোভিয়া। বেখেয়ালি কণ্ঠে বললো,

“ছুটে তো সেই আসোই, তাহলে কেন আবার দূরে থাকার অভিনয়?”

 

পায়ে তুলতুলে কিছুর স্পর্শ পেয়ে ভাবনা কাটলো জেনোভিয়ার। দেখলো জুরা তার পায়ের কাছে এসে বসেছে। বুঝতে পারলো জুরাকে এখন খাবার দেওয়া প্রয়োজন। সে জুরার জন্য খাবার এনে দিলো। 

বিকেলে কাজে যাওয়ার আগে একবার তারাসের বাসায় যাওয়ার পরিকল্পনা আছে তার। মনে পড়লো বাড়ির পিছনে আপেল গাছটায় ভালো আপেল ধরেছে।  লাল হয়েছে অনেকটার শরীর। এক ব্যাগ আপেল দিয়ে আসবে সে তারাসকে। জেনোভিয়া ঝুড়ি নিয়ে ব্যাক ডোর দিয়ে বাইরে বের হলো। বাড়ির পিছনেও ছোটো একটুকুনি লন। তারপরের পিছন দিকটা জঙ্গলময়। জঙ্গলের ভিতরটা বেশ সুন্দর। বুনো ফুল, পাখির কলকাকলি, মুক্ত বাতাস, সব মিলিয়ে মনোরম! শহরের বুকে মন ভালো করা একখণ্ড বন। জেনোভিয়া ছুটির দিনে মাঝে মাঝে জঙ্গলের ভিতর গিয়ে বসে থাকে। ভালো লাগে বসে থাকতে। পাখিরা দূর করে দেয় তার একাকিত্ব। 

 

বাড়ির পিছনের লনে আছে বেশ কিছু ফলমূলের গাছ। সব গাছ দেখে সে স্বাভাবিকই ছিল, কিন্তু আপেল গাছে চোখ পড়তেই চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেল তার। এসব কী? কোথায় গেল সব পক্ব আপেল? স্তম্ভিত চোখে চেয়ে রইল জেনোভিয়া। গাছে একটাও লাল আপেল নেই। যা আছে সব সবুজ। ওগুলো মিষ্টি নয়, টক। কোথায় গেল আপেলগুলো? জেনোভিয়া কিছুই ভাবতে পারছে না। গাছটার দিকে চেয়ে রইল বিস্মিত চোখে। 

 

“তুমি কি এগুলো খুঁজছো?”

 

দূরের স্বরটা কানে আসা মাত্র রোমেরোর লন সাইড এরিয়ায় তাকালো জেনোভিয়া। রোমেরো লনে একটা চেয়ারে বসে আছে। ওর হাতে আপেল। আপেল খাচ্ছে। জেনোভিয়ার আপেল দেখা মাত্রই মনে হলো ওগুলো তো তার গাছের আপেল। তার মানে কি রোমেরো তার গাছের আপেল চুরি করেছে? রাগে ভিতরটা ক্রোধান্বিত হয়ে উঠলো জেনোভিয়ার।

“তুমি আমার গাছের আপেল চুরি করেছো? এত স্পর্ধা তোমার?”

 

“আমি কি তোমার প্রতিবেশী নই? তুমি কি আমার প্রতিবেশী নও?”

 

“কথার মাঝে বার বার প্রতিবেশী প্রসঙ্গ টানা বন্ধ করো। আমি বড়ো বিরক্ত বোধ করি।” রোমেরো চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। জেনোভিয়া বলে চললো, “এটা ঠিক যে তুমি আমার প্রতিবেশী, কিন্তু তাই বলে তুমি আমার সবকিছুতে হস্তক্ষেপ করার অধিকার রাখো না।”

 

“রাখি।” বলতে বলতে এগিয়ে এলো রোমেরো। জেনোভিয়ার সামনে দণ্ডায়মান হয়ে বললো, “অবশ্যই রাখি অধিকার। আমি তোমার উপরও অধিকার রাখি।”

 

রোমেরোর চোখ জোড়া কী গভীর! ওই চোখে চেয়ে নিঃশ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসে জেনোভিয়ার। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না। চোখ সরিয়ে নেয়। অতঃপর আবারও তাকায়।

“এরপর আমার কোনো সম্পত্তি স্পর্শ করার আগে ভালো করে ভেবেচিন্তে নেবে।” বললো জেনোভিয়া, “আমার প্রেমিক একজন সাব ইন্সপেক্টর। কথাটা আবারও স্মরণ করিয়ে দিলাম।”

 

জেনোভিয়া দাঁড়ালো না আর। দ্রুত পদে হেঁটে ঘরে ঢুকে অদৃশ্য হলো। 

 

রোমেরোর ঠোঁটে রঙ্গ হাসি। মেয়েটাকে রাগিয়ে সে খুব আনন্দ পেয়েছে। দিনা তো এমন ছিল না। ও ছিল শান্ত, মিষ্টি মেয়ে! কিন্তু এই মেয়ে মিষ্টি অথচ আবার তেঁতো! তবে তেঁতো ভাবটা মিষ্টি ভাবের চেয়ে বেশি ভালো লাগছে। মেয়েটার হাসিও নিশ্চয়ই চমৎকার। তাহলে কান্না কেমন? কান্নাটা নিশ্চয়ই আরও চমৎকার। হৃদয় জুড়ানো!

রোমেরো নিজের চিন্তাভাবনায় নিজেই হেসে ফেললো। সঙ্গতিক মনে নিজেকে বললো, ‘ওহ রোমেরো, তুমি পাগল হয়ে গেছো, পাগল! মেয়েটা তোমার পাগলামি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।’

 

_________________

 

কালো জর্জেটের পোশাকটা হাঁটুর উপর পর্যন্ত পড়ে। খুব প্রিয় পোশাক জেনোভিয়ার। দাদি যে বছর মারা গিয়েছে সে বছরই কিনে দিয়েছিল পোশাকটা।

জেনোভিয়ার সোনালি চুলগুলো বিনুনি করা। মুখে কোনো প্রসাধনীর প্রলেপ নেই। পায়ে একজোড়া সাদা কেডস। কাঁধে ঝুলছে ছাই রঙা একটা ব্যাগ। সে নিজের কর্মক্ষেত্রের দিকে যাত্রা শুরু করেছে। সাথে আছে বেনিম। বড়ো রাস্তায় ওঠার পর পুলিশের গাড়িগুলো ক্ষিপ্র হয়ে ছুটে গেল ওদের পাশ কাটিয়ে। দাঁড়িয়ে পড়লো ওরা। চলন্ত গাড়ির ছুটে চলার দিকে চেয়ে বেনিম বললো,

“আবার কিছু ঘটলো না কি?”

 

পেট্রোল কার গুলোর দিকে চেয়ে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল জেনোভিয়া। অন্যমনা হয়ে বললো,

“মাঝে মাঝে পুলিশের গাড়িগুলোর এমন ক্ষিপ্র গতি আমি ভয় পাই!”

 

পুলিশের গাড়ি এসে থামলো বৃদ্ধা বেলকার বাড়ির সামনে। পুলিশদের দেখেই এগিয়ে এলো বৃদ্ধা বেলকার বোনের মেয়ে। সে-ই পুলিশদের ইনফর্ম করেছে। 

পুলিশ ভিতরে প্রবেশ করলো। দুর্গন্ধে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে সবার। তারাস অনেক আগেই রুমালে নাক চেপে নিয়েছে। বৃদ্ধা বেলকার লা’শ দেখেই শরীরে কেমন ঝাঁকি খেলো তার। লা’শের উপর, আশেপাশে মাছি ভনভন করছে। নাকে রুমাল চেপেও গন্ধ থেকে নিস্তার পাওয়া যাচ্ছে না। তারাসের বমি বমি পেল। বৃদ্ধার লা’শের দিকে তাকিয়ে ভাবলো, এটা আসলেই বৃদ্ধা বেলকা তো?

বোঝারই বা উপায় কী? মাথা র’ক্তাক্ত, চূর্ণবিচূর্ণ! এমন অবস্থা যা দেখলে শরীরে কাঁপন হয়। এত নির্মমভাবে করা হয়েছে আ’ঘাত গুলো! মনে মনে খু’নির প্রতি রাগ, ঘৃণা আর ভিক্টিমের প্রতি কষ্টে অদ্ভুত এক অনুভূতির সৃষ্টি হয় তারাসের মাঝে। বৃদ্ধার কষ্টের কথা চিন্তা করে শিহরিত হয় সে।  কেবল মাথা নয়, শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে গভীর জ’খম। ছু’রি দিয়ে বার বার আ’ঘাত করা হয়েছে বৃদ্ধার শরীরে। ছু’রিটা লা’শের পাশেই পড়ে আছে! ফ্লোর থেকে ছু’রিটা তুলে নিলো তারাস। ছুরিতে র’ক্ত মাখা। খু’নি এবার খু’নের অ’স্ত্র ফেলে রেখে গেল? লা’শের একটু দূরেই পড়ে আছে লোহার তৈরি ব্যাট জাতীয় একটা বস্তু। সেটাতেও র’ক্ত। বোঝা যাচ্ছে এটা দিয়েই বৃদ্ধার মাথায় আ’ঘাত করা হয়েছে। 

তারাস বৃদ্ধার আঙুলের দিকে তাকিয়ে অবাক হলো। বৃদ্ধার আঙুলে ন’খ নেই!

 

ইতোমধ্যে পুরো বাড়িটা প্রবেশ নিষিদ্ধ টেপে ঘিরে ফেলেছে পুলিশ। ফরেন্সিকের গাড়িটা আসতে একটু সময় লেগেছে। তবে সবাই এটা বুঝতে পারলো খু’নিকে ধরা এবার সহজ হবে। কারণ আগের বার খু’নটা হয়েছিল রাস্তায়। সেখানে কোনো প্রমাণ ছিল না। আর এবার খু’নের অ’স্ত্রও আছে পুলিশের কাছে। এছাড়াও বুড়ির বাড়ির সামনে রাস্তায় একটা সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছিল পলিনার মা’র্ডারের পর। সেটায়ও নিশ্চয়ই খু’নির ছবি উঠেছে। ফেলিন লা’শটা পর্যবেক্ষণ করতে করতে বললো,

“খু’নি একজন বামহাতি।”

 

লিওনিদ ফরেন্সিকের একজনের সাথে কথা বলছিল। ফেলিনের কথায় অবাক হয়ে তাকিয়ে বললো,

“কীভাবে বুঝলেন?”

 

“শরীরের ক্ষ’তগুলোর দিকে ভালোভাবে তাকাও।”

 

তারাস ও লিওনিদ একই সাথে তাকালো। আসলেই। একজন ডানহাতি ব্যক্তির করা আঘাতের চেয়ে আঘাত গুলো ভিন্নতর। ছু’রির ক্ষত গুলো দেখে অনুমান করা যাচ্ছে খু’নি একজন বামহাতি। তারাস বললো,

“এবার তো তাহলে খু’নিকে ধরা সহজ হবে।”

 

“হুম।” মাথা নাড়লো ফেলিন, “তারাস, সিসিটিভি ফুটেজ চেক করো।”

 

“ইয়েস স্যার।”

 

(চলবে)

 

 রঙিলা রাতের কালো অশ্রু (১২)

লেখা: ইফরাত মিলি

___________________

 

বৃদ্ধা বেলকা ছিল পলিনার কেসের একমাত্র সাক্ষী। একজন সাক্ষীর হঠাৎ খু’ন হওয়া সাধারণ ব্যাপার নয়। বৃদ্ধার খু’ন নিশ্চয়ই পলিনার কেসের সাথে সম্পর্কযুক্ত। এদিক থেকে বলা যায় পলিনার খু’নি আর বৃদ্ধার খু’নি একজনই। তাছাড়া পলিনার লা’শটারও মাথা থেঁ’তলানো ছিল, আর বৃদ্ধারও তাই। যদিও বৃদ্ধার শরীরে আরও আঘাত ছিল। পুরো শরীর ছিল ছু’রির আঘাতে ক্ষ’ত-বি’ক্ষত এবং হাত-পায়ে ন’খও ছিল না! তবুও মনে হচ্ছে এটা একজন লোকেরই কাজ। 

খু’নি কেন মারলো বৃদ্ধাকে? বৃদ্ধার কি মনে পড়েছিল পলিনার মা’র্ডারের রাতের কিছু? যেটা কেসে এগোতে সাহায্য করতো?

না কি বৃদ্ধাকে মা’রার কারণ ভিন্ন?

অনেক প্রশ্ন ঘুরঘুর করছে, কিন্তু উত্তর নেই। 

এনির উপর যে সন্দেহের পর্দা ছিল তা পুরোপুরি সরে গেছে। কারণ বৃদ্ধা যখন খু’ন হয়েছে তখন এনি জেলে বন্দি ছিল। পুলিশের সন্দেহ জোরালো ভাবে ঘুরে গেছে এখন বরিসের উপর। বরিস কেন অযথাই এক মাস পর এসে বলেছিল এনি খু’ন করেছে? ও একজন ঠান্ডা মাথার খেলোয়াড়! নিজের জায়গায় এনিকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে। আর পলিনার কেসের একমাত্র সাক্ষী বৃদ্ধা বেলকাকেও পৃথিবীর বু’ক থেকে স’রিয়ে দিয়েছে। হ্যাঁ পুলিশের ধারণা ঠিকই ছিল, বরিসের উপর সন্দেহ হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু সমস্যা বাধলো খু’নি বামহাতি হওয়ায়। বরিস তো বামহাতি নয়, ডানহাতি। এমন কোনো রেকর্ড নেই যাতে ওকে বামহাতি মনে হওয়া সম্ভব। 

বরিসের পর সন্দেহের তালিকায় ছিল সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়া ছয় ব্যক্তি। কিন্তু তাদের ভিতরও কেউ বামহাতি নেই। 

তাহলে কি খু’নি বাইরের কেউ?

 

পুলিশ ভেবেছিল তারা এবার খু’নিকে ধরতে সফল হবে। কিন্তু খু’নি খুব চতুর। সে জানতো বুড়ির বাড়ির সামনে সিসি ক্যামেরা আছে। আর তাই তো সে বৃদ্ধার বাড়িতে প্রবেশের আগে ক্যামেরাটা নষ্ট করে দিয়েছে। 

যেদিন বৃদ্ধার মৃ’ত্যু হয়েছে সেদিন বৃদ্ধার বাসায় মোট পাঁচজন লোক গিয়েছিল। দুপুরে গিয়েছিল জেনোভিয়া, বিকেলের শেষ ভাগে বৃদ্ধার বোনের মেয়ে ইনা, রাতে রোমেরো আর বেনিম, তারপর রোমেরো আর বেনিম চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর গিয়েছিল রাজুমিখিন। 

বৃদ্ধা সবাইকেই বাইরে পর্যন্ত এসে হাসি মুখে সৌজন্যতার সাথে বিদায় দিয়েছে, যা দেখা গেছে সিসি ক্যামেরায়। 

রাজুমিখিন বৃদ্ধার থেকে বিদায় নেওয়ার কীয়ৎক্ষণ পরই সিসি ক্যামেরাটা বন্ধ হয়ে গেছে। তার মানে খু’নি ওই সময়ই নষ্ট করে দিয়েছে ক্যামেরাটা। 

খু’নের দিন বাদে বাকি দিনগুলোর সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে দেখা গেছে বৃদ্ধার বাড়িতে তেমন কেউ আর যায়নি। ইনা গিয়েছিল কয়েকবার, বৃদ্ধার বোন একবার, আর জেনোভিয়াও ওই দিন বাদে এর আগে একবার গিয়েছিল। 

জেনোভিয়া গিয়েছিল দেখে তারাসের খুব রাগ হয়েছে। পাগল মেয়েটা বৃদ্ধার বাসায় গিয়েছিল কেন? গিয়ে শুধু শুধু সন্দেহের তালিকায় উঠে আসার কী দরকার ছিল? এরই মাঝে ফেলিনের সাথে তারাসের একবার ঝগড়া হয়েছে। ফেলিন জেনোভিয়াকেও সন্দেহ করছে এই বিষয়টা একদম মানতে পারেনি তারাস। এই নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়েছে দুজনের। ফেলিন একপর্যায়ে বলেছে, 

“আবেগপ্রবণ হয়ে চিন্তা করো না তারাস, আইনের দৃষ্টিতে বিবেচনা করে দেখো। আইন কাউকে সন্দেহ করতে ছাড়ে না। আর পৃথিবী খুব আজব একটা ক্ষেত্র। এখানে কে কেমন সেটা বোঝা বড়ো কঠিন। যাকে তুমি দেখবে সহজ-সরল, এমনও হতে পারে যে সেই আবার ভংয়কর!”

 

ফেলিনের ওই কথার পর আর কিছু বলেনি তারাস। মনে মনে হাজারো কথা শুনিয়েছে জেনোভিয়াকে। সরাসরি যে কথা শোনাবে সে সুযোগ পায়নি কাজের চাপে। 

 

ফিঙ্গার প্রিন্টের রিপোর্ট অনুযায়ী ছু’রিতে কেবল বৃদ্ধা আর ইনার হাতের ছাপ পাওয়া গেছে। আর লোহার ব্যাট জাতীয় বস্তুটায় কেবল বৃদ্ধার একার হাতের ছাপ পাওয়া গেছে। এটা দিয়ে বোঝা যাচ্ছে যে খু’নি তার হাত কিছুর আবরণে ঢেকে রেখেছিল বস্তুগুলো স্পর্শ করার সময়। চালাক খু’নি এই জন্যই খু’নের অস্ত্র গুলো ফেলে রেখে গেছে। এছাড়াও ঘরের অন্যান্য বস্তুতে সিসি ক্যামেরায় দেখা ছয়জন লোকের হাতের ছাপ ছাড়া সপ্তম কোনো ব্যক্তির হাতের ছাপ পাওয়া যায়নি।

 

প্রথমেই জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য ডাকা হয়েছিল বৃদ্ধার বোন আর বোনের মেয়েকে। দুজনই কেঁদেকেটে সারা করলো থানায় এসে। ইনা বললো, ঘটনার দিন খালা তাকে বাড়িতে ডেকেছিল রান্না করে দেওয়ার জন্য। রোমেরো আর বেনিমের জন্য নানান ধরনের খাবার তৈরি করেছিল সেদিন। রান্না করে দেওয়ার পর সে চলে গিয়েছিল। এমনিতেও সে প্রায়ই এসে রান্নাবান্না আর টুকটাক কাজ করে দিয়ে যেত। খালা অনেক স্নেহ করতো তাকে।

পলিনার কথা জিজ্ঞেস করায় মা-মেয়ে দুজনেই জানালো তারা পলিনা নামের কাউকে চেনে না, শুধু নাম শুনেছে আর মেয়েটা খু’ন হয়েছে এ ব্যাপারে জানে। খালার বাসায় কোনোদিন দেখেনি পলিনাকে।

এই দুজনকে সন্দেহ করা যায় না। কারণ পলিনাকে খু’ন করার কোনো কারণই নেই দুজনের। কিন্তু বৃদ্ধাকে খু’ন করার কারণ আছে অবশ্য। বৃদ্ধার সম্পত্তি গ্রাস করার একটা মন বাসনা এদের থাকতে পারে। কিন্তু আদৌ তেমনটা মনে হয় না। কারণ পলিনার খু’ন আর বৃদ্ধার খু’ন সম্পৃক্তযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। 

রোমেরো আর বেনিমকেও সন্দেহ করা যায় না। পলিনা যখন খু’ন হয় তখন ওরা এলাকায় নতুন এসেছে। পলিনার সাথে ওদের তেমন দেখা হয়নি, কথা হয়নি। এক কথায় পরিচয়টুকুও হয়নি ওদের। ওরা কেন অযথাই মা’রতে যাবে পলিনাকে? বৃদ্ধাকেই বা মা’রবে কেন? কোনো কারণ নেই বৃদ্ধাকে মা’রার। 

আর রাজুমিখিনকে তো সন্দেহ করাই ভুল। কারণ সে সেন্টপিটার্সবার্গ এসেছে পলিনার খু’নের পর।

 

বেনিম আর রোমেরোর বক্তব্য অনুযায়ী ওরা রাতে ডিনার করতে গিয়েছিল বৃদ্ধার বাড়িতে, কারণ বৃদ্ধা নিমন্ত্রণ করেছিল। ডিনার করে ওরা চলে যায়। এরপর ওরা আর কিছু জানে না। বেনিম আরও বলেছে, বৃদ্ধা ওকে অনেক পছন্দ করতো, স্নেহ করতো। বেনিমের পাশাপাশি ইনার কাছ থেকেও শুনেছে এ ব্যাপারে। 

রাজুমিখিন গিয়েছিল টাকা পরিশোধ করতে। বৃদ্ধার কাছ থেকে কিছুদিন পূর্বে সে টাকা ধার নিয়েছিল। 

আর জেনোভিয়া গিয়েছিল কিছু মাফিন কেক দিয়ে আসতে। বৃদ্ধাই না কি তাকে বলেছিল কেকের কথা। মানে বৃদ্ধা অর্ডার দিয়েছিল কেক।

 

সবকিছু শুনে আর দেখে পুলিশ কতৃপক্ষ পড়েছে মহা ঝামেলায়। তাদের দৃষ্টি কোণ থেকে কেউই সন্দেহজনক নয়, আবার সবাইই সন্দেহজনক। আর সবথেকে বড়ো কথা হলো খু’নি বামহাতি। এখন এমন লোকের সন্ধান করতে হবে যে লোক বামহাতি। কিন্তু যাদের উপর সন্দেহ তারা তো কেউই বামহাতি নয়। তাহলে খু’নি কি আসলেই বাইরের কেউ?

পুরো ব্যাপারটা গোলমেলে হয়ে গেছে এখন। কেসটা নিয়ে ভাবতে গেলেই মাথায় যন্ত্রণা ধরে যাচ্ছে। ফেলিনের অবস্থা এখন পাগলপ্রায়। পলিনার খু’নের কেসেই তার পাগল হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল,  এবার তো কেস আরও সাংঘাতিক রূপ ধারণ করেছে। কাউকে সন্দেহের তালিকায় রাখা কঠিন, আর সন্দেহ না করে থাকাও কঠিন!

 

________________

 

কেস নিয়ে চিন্তা করতে করতে মাথাটা ব্যথায় ধরে এলো তারাসের। গতরাত সে সহ আরও বেশ কয়েকজন থানায় যাপন করেছে। ঘুমাতে পারেনি। আজকে আবার পুরো দিন কাজ করতে করতে শরীর বড্ড ক্লান্ত হয়ে এসেছে। সে হাই তুলতে তুলতে এগিয়ে গেল লিওনিদের দিকে। 

লিওনিদ বসে বসে ঠান্ডা পানীয় পান করছিল আর কেস সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখছিল। তারাস কোনো উক্তি উচ্চারণ না করেই পানীয়র বোতলটা কেড়ে আনলো। বোতলটা নিয়ে ফিরে এলো আবার নিজের চেয়ারে।

 

লিওনিদ তারাসকে পর্যবেক্ষণ করে বললো,

“তোমার অবস্থা খারাপ মনে হচ্ছে। বাসায় গিয়ে বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন তোমার।” 

 

তারাস লিওনিদের কথায় কর্ণপাত করলো না। পানীয়র বোতলে চুমুক দিয়ে আপন মনে বললো,

“মেয়েটাকে নিষেধ করেছিলাম রাতের বেলা একা বাইরে ঘুরতে, মেয়েটা কি আমার কথা শুনছে?”

 

“ওর তো খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই তোমার কথা মতো ঘরে বসে থাকবে।” তারাসের প্রশ্নটা লিওনিদের জন্য না হলেও জবাবটা লিওনিদ দিলো।

 

তারাসের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো রাগে। ক্ষোভের সাথে বললো,

“মেয়েটা একদম কথা শোনে না!”

 

“তোমার মতো, তুমি যেমন তোমার মনের কথা শোনা না।” এবারও ওর কথার জবাব দিলো লিওনিদ।

 

লিওনিদের কোনো কথাই যেন তারাসের কানে আসেনি। সে আছে নিজের খেয়ালে। একরাশ ক্ষোভ সঙ্গে নিয়ে সে দ্রুত পদে বেরিয়ে গেল থানা থেকে। 

নিজের গাড়ি নিয়ে সোজা চলে এলো জেনোভিয়ার রেস্তোরাঁয়। ঘড়িতে সময় দেখলো। জেনোভিয়ার কাজের সময় এখনও শেষ হয়নি। ত্রিশ মিনিট পর শেষ হবে। শহরে নৃ’শংসভাবে দুটো মা’র্ডার হলো, মেয়েটার কি একটু ভয়ডরও করছে না তাতে? কাজে না আসলে কী হবে ওর? ও কি না খেয়ে মরবে? না, একদমই কথা শোনে না মেয়েটা। মনে মনে খুব বিরক্তবোধ করলো তারাস। 

রেস্তোরাঁর ভিতরে ঢুকলো না সে, গাড়ি নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইল। কাস্টমার যাচ্ছে-আসছে। 

পঁয়ত্রিশ মিনিট পর জেনোভিয়াকেও দেখা গেল। দুজন সহকর্মীকে হাসি মুখে বিদায় জানিয়ে যখন রাস্তায় পা রাখলো তখনই তারাসের গাড়িটা চোখে পড়লো তার। দাঁড়িয়ে গেল জেনোভিয়া। 

জেনোভিয়া তাকে দেখেছে বোঝা মাত্রই গাড়ি থেকে নামলো তারাস। 

“তোমাকে বলেছিলাম না রাতের বেলা বাইরে বের হবে না? তারপরেও কাজে এলে কেন? আমি তো বলেছিলাম, তোমার  যদি টাকার দরকার হয় তাহলে আমি তোমাকে টাকা দেবো। তারপরেও কেন এলে?” 

 

জেনোভিয়া কিছু বলতে উদ্যত হলেই তারাস বলার সুযোগ না দিয়ে বললো,

“গাড়িতে গিয়ে বসো।” ওর কণ্ঠ গম্ভীর। 

 

জেনোভিয়া কিছুক্ষণ নীরব চেয়ে রইল তারাসের দিকে। মনের কোথাও একটা ভালোলাগা প্রভাত কিরণের মতো হেসে উঠলো। তাকে নিয়ে তারাসের এমন উদ্বিগ্নতা বেশ ভালো লাগলো তার। সে কিছু না বলে গাড়িতে গিয়ে বসলো। তারাসও এসে গাড়ি স্টার্ট করলো। জেনোভিয়ার ওষ্ঠকোণে মৃদু হাসির নিবিড় বিচরণ। 

 

“ডিউটি শেষ?” হঠাৎ প্রশ্ন জেনোভিয়ার। 

 

“না।”

 

“ডিউটি ফেলে রেখে আমাকে নিতে এলে যে?” 

 

“তুমি হলে খু’নের সন্দেহ ভাজন, আমার মনে হচ্ছে তুমি যেকোনো সময় পালিয়ে যেতে পারো, সেজন্য তোমাকে পাহারা দিতে এসেছি।”

নড়বড়ে মিথ্যা কথাটা বলে ভালো করেছে বলে মনে হলো না তারাসের। আসলেই ভালো করেনি, মেয়েটা হাসছে! অপমানবোধ হলো তারাসের। রাগও হলো। একে তো মেয়েটা কথা শোনেনি, এখন আবার তার কথা শুনে হাসছেও!

 

পথিমধ্যে আর কোনো কথা হলো না দুজনের। নীরব সারা পথ। আর হৃদয়েও শব্দহীন স্নিগ্ধ, মিষ্টি অনুভূতির বিচরণ। জেনোভিয়ার বাসার সামনে এসে যখন গাড়ি থামলো ততক্ষণে ঘুমিয়ে গেছে জেনোভিয়া। তারাস ডাকতে গিয়েও আবার থামলো। মেয়েটার যেখানে-সেখানে হুটহাট ঘুমিয়ে যাওয়ার স্বভাব পরিবর্তন হয়নি! এটা কি কোনো ঘুমানোর সময় বা স্থান? সে খুব বিরক্ত হলো। কিন্তু জেনোভিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ধীরে ধীরে তার নেত্রপট থেকে কেটে গেল বিরক্তির মেঘ। হঠাৎ মনে হলো এই মেয়েটাকে সে অত্যন্ত ভালোবাসে! এই মেয়েটাকে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারবে না সে, থাকার অভিনয়ও করতে পারবে না। কেমন সম্মোহিত হয়ে পড়তে শুরু করলো তারাস। আর সেটা উপলব্ধি করেই সে চোখ সরিয়ে নিলো অন্যদিকে। তবে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে সে বেশিক্ষণ দৃষ্টি স্থির রাখতে পারল না। অবাধ্য চোখ জোড়া আবারও জেনোভিয়ার ঘুমন্ত মুখখানিতে লুটাপুটি খেলো। 

মনে আর দ্বিধা রাখলো না তারাস। নিদ্রাতুর জেনোভিয়ার এক হাত নিজের হাতের মুঠোয় বন্দি করলো। সস্নেহে আলতো চুমু আঁকলো জেনোভিয়ার কপালের পার্শ্বে।

আর ঠিক তখনই জেনোভিয়া চোখের পাতা খুললো। জেনোভিয়া বিস্মিত নয়, লজ্জিত নয়, অপ্রতিভও নয়। শান্ত। 

তবে তারাস খুব হকচকিয়ে গেল। মুহূর্তেই ছেড়ে দিলো জেনোভিয়ার হাত। অন্যদিকে চোখ সরিয়ে নিলো দ্রুত। কাজটা কী করলো সে? লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছা করছে। মনে মনে নিজেকে নিজে ভর্ৎসনা করলো। 

ক্ষণকাল পর কর্ণদ্বারে বেজে উঠলো জেনোভিয়ার শান্ত কণ্ঠ,

“ঘুমিয়েছি ভেবে ভুল করলে তুমি।”

 

তারাস জেনোভিয়ার দিকে তাকাতে পারছে না। কাজটা একদমই অনুচিত হয়েছে। লজ্জায় তো জীবনই বিসর্জন দিতে ইচ্ছা করছে এখন। সে জেনোভিয়ার দিকে তাকালো না। দৃষ্টি অন্যদিকে রেখে দরজা খুলে দিয়ে বললো,

“নেমে যাও।”

 

জেনোভিয়া মুচকি হাসলো। অধর কোণে হাসি ধরেই নেমে গেল গাড়ি থেকে। 

তারাস দ্রুত পালিয়ে গেল। 

জেনোভিয়ার ঠোঁট থেকে হাসি মুছছেই না। রোমেরো কখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে তাও খেয়াল করলো না। 

 

“পাগলের মতো হাসছো কেন?”

 

রোমেরোর কথায়ও সম্বিৎ ফিরলো না তার। সে বেখেয়ালি চিত্তের অবুঝ মেয়ে এখন। যার মাঝে ভালোবাসা, ভালোলাগার মিশ্রণে কিম্ভূত অনুরণন সৃষ্টি হয়েছে। সেই অনুরণনের জোয়ার ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাকে। সে ঠোঁটের হাসি আরও প্রশস্ত করে বললো,

“কারণ আমি পাগল হয়ে গেছি।”

বলেই প্রায় দৌড়ে গিয়ে ঘরের তালা খুললো জেনোভিয়া। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো। ওর দুয়ারের বন্ধ কপাটে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল রোমেরো। মেয়েটা সত্যিই পাগল হয়েছে না কি?

 

_________________

 

থানার ভিতর না কি গাছ থাকা প্রয়োজন। অক্সিজেন গ্রহণ না কি সহজ হবে তাহলে। এ কথা বলেই ফেলিন সকাল বেলা তিনটা টব নিয়ে এসেছে থানার ভিতর। লোকটা মাঝে মাঝে বাচ্চাদের মতো কাণ্ড করে। এমন বাচ্চা স্বাভাবের, প্রাক্তন প্রেমিকার কথা মনে পড়লে যে কাঁদে, তার মতো মানুষ ইন্সপেক্টর হলো কীভাবে এটাই ভাবে বাকি সবাই। 

ফেলিন এখন বৃদ্ধার বাড়ির সামনের সিসিটিভি ফুটেজ দেখছে। এ নিয়ে কতবার যে দেখলো তার হিসেব নেই। মনে হচ্ছে এই ফুটেজ দেখেই সে খু’নি কে তা বের করে ফেলবে। আসলে সিসিটিভি ফুটেজ দেখা অযথাই সময় নষ্ট করা ছাড়া আর কিছু নয়। 

 

মাইক ল্যাপটপ নিয়ে দৌড়ে এলো তারাসের দিকে।

 

“তারাস, তারাস এটা দেখো।” বলতে বলতে ল্যাপটপটা তারাসের সামনে রাখলো সে।

 

তারাস ল্যাপটপে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকালো।

“এই লোকটা কে?” প্রশ্ন করলো মাইককে। 

 

“একজন খু’নি! তোমার মনে নেই ইয়েকাতেরিনবার্গের কথা?”

 

তারাস প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকালো। 

 

মাইক বললো,

“ইয়েকাতেরিনবার্গে দুই মাসে মোট সাতটা খু’ন হয়েছিল। আর এই লোকই খু’ন করেছিল। বর্তমানে এই লোক পলাতক। তাকে এখনও খোঁজা হচ্ছে। আর এর সাতটা খু’নের ধরন একই ছিল। এই খু’নি হা’তুড়ি দিয়ে মাথা থেঁ’তলে দিতো, শরীর ছি’ন্ন-ভিন্ন করতো ছু’রি দিয়ে, ন’খ উপড়ে ফেলতো, কান কে’টে ফেলতো!”

 

“হঠাৎ তুমি আমাকে ইয়েকাতেরিনবার্গের মা’র্ডার কেসের কাহিনি শুনাচ্ছ কেন?” 

 

“তুমি বুঝতে পারছো না? আমার সন্দেহ হয়। আমার সন্দেহ হচ্ছে ইয়েকাতেরিনবার্গের এই খু’নিই সেন্ট পিটার্সবার্গে এসেছে। আর এই যে দুটো খু’ন তা এই খু’নিই করেছে।”

 

এতক্ষণে তারাসের টনক নড়লো। চোখ দুটো স্ফীত হয়ে উঠলো তার। বেশ কিছু সময় নির্বাক তাকিয়ে রইল মাইকের দিকে। তারপর চোখ সরিয়ে নিয়ে মাইকের কথাটা ভেবে দেখে আবার তাকালো। 

“ইয়েকাতেরিনবার্গে কবে এরকম খু’ন হয়েছিল?” 

 

মাইক মনে করার চেষ্টা করে বললো,

“এটা ঘটেছিল ২০২০ সালের জুন-জুলাই মাসে।”

 

“কেন খু’ন করেছিল সে?”

 

“এটা একটা সিরিয়াল মা’র্ডার কেস ছিল। খু’নির খু’ন করার কোনো কারণ খুঁজে বের করতে পারেনি।”

 

“খু’নি কি বামহাতি?”

 

“সেটা তো আমি জানি না। তবে মনে হচ্ছে ইয়েকাতেরিনবার্গের খু’নি আর সেন্ট পিটার্সবার্গের খু’নির মাঝে সাদৃশ্য আছে। দুজন একই ব্যক্তি হতে পারে। খু’নের ধরন তো একই রকম। মাথা থেঁ’তলানো আর বৃদ্ধার হাত-পায়ে তো নখও ছিল না। তাহলে কি এটা হওয়া খুব অস্বাভাবিক?”

 

তারাস উঠে দাঁড়ালো। যেতে উদ্যত হলেই মাইক বললো,

“কোথায় যাচ্ছ?”

 

“স্যারের সাথে কথা বলে দেখি এটা নিয়ে…” 

 

মাইকের কিছু বলার অপেক্ষা করলো না তারাস। ফেলিনের কাছে চলে গেল। ফেলিন মনোযোগ দিয়ে শুনলো সব কথা। দুজন একই সাথে বসে পুরোনো সংবাদ গুলোও ঘেঁটে দেখলো ইয়েকাতেরিনবার্গের। 

তারাস তেমন কিছু জানতো না ইয়েকাতেরিনবার্গের খু’ন সম্পর্কে। শুধু একবার শুনেছিল সাতটা খু’ন হয়েছে, আর যে সময় পুলিশ নিশ্চিত হয়েছিল খু’নি কে তখনই খু’নি পালিয়ে যায়। এত মাসেও খু’নিকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। 

 

ফেলিন সবকিছু ভেবেচিন্তে বললো,

“মাইকের ধারণা ঠিক আছে। হতেই পারে ইয়েকাতেরিনবার্গের খু’নি আর সেন্ট পিটার্সবার্গের খু’নি একজনই। এটা একটা সিরিয়াল কি’লারের কাজ। যাদের সন্দেহ করেছিলাম তারা তো কেউ খু’নি নয়। ইশ, দেখেছো অবস্থা! বাইরের একটা সিরিয়াল কি’লার আমাদের নাজেহাল করে ছাড়লো! লিওনিদ কোথায়? ওকে বলো ইয়েকাতেরিনবার্গের থানায় যোগাযোগ করতে।”

 

________________

 

শেষ প্রান্তের একটা টেবিল ঘিরে বিপ্রতীপ হয়ে বসে আছে বেনিম আর জেনোভিয়া। ওরা এখন যে রেস্তোরাঁয় বসে আছে এটা জেনোভিয়ারই কর্মস্থল। এখন দুপুর ক্ষণ। বেনিম নিজ থেকে নিয়ে এসেছে জেনোভিয়াকে। নিজের কর্মস্থলে বসে বেনিমের সাথে খাবার খেতে কিছুটা সংকোচ হচ্ছে জেনোভিয়ার। কাজের ফাঁকে ফাঁকে কর্মীরা ওদেরই দেখছে। 

ভেরা নামের একজন মেয়ে কর্মী তো খাবার সার্ফ করার সময় জেনোভিয়াকে একটা মারাত্মক প্রশ্নই করে বসলো,

“এটা কি তোমার নতুন প্রেমিক জেনোভিয়া?”

 

জেনোভিয়া শশব্যস্ত হয়ে মেয়েটার ভুল ভাঙাতে বললো,

“না, ও আমার বন্ধু এবং প্রতিবেশী। আর তারাস আর আমার মাঝে এখনও সবকিছু ঠিক আছে।”

 

শেষের কথাটা শুনে ভেরা ঠোঁটে বিদ্রুপ হাসি টানলো। যেন এটা কোনো মজার কথা। যেতে যেতে আবারও পিছন ফিরে হাসলো একইভাবে। 

ভেরার এমন হাসি দেখে জেনোভিয়ার যে পরিমাণ রাগ হচ্ছিল, ইচ্ছা করছিল একটা থা’প্পড় বসিয়ে দেয় ভেরার গালে।

বেনিম আজব ভাবে জেনোভিয়ার ইচ্ছাটা ধরে ফেললো, আর বললো,

“মা’রার ইচ্ছা হলে মে’রে দাও, শুধু শুধু আক্রোশ পুষে লাভ কী যদি তার প্রকাশই না ঘটাও?” 

 

জেনোভিয়া চমকে তাকায় বেনিমের দিকে।  বেনিম বুঝলো কীভাবে? জেনোভিয়া হাসার চেষ্টা করে বললো,

“কী বলছো? আমি ওকে মা’রার কথা কেন চিন্তা করবো?”

 

বেনিম ধীর হাসলো,

“সত্যিই এমন কিছু চিন্তা করোনি?”

 

প্রশ্নটার জবাবে কিছু বলতেই পারলো না জেনোভিয়া। অস্বস্তিবোধ হচ্ছে তার। আর কিছু না বলে খাবারে মনোনিবেশ করলো সে। ডিম আর সবজির তৈরি খাবারের এক টুকরো অংশ সসে ডুবিয়ে মুখে পুরলো।

বেনিমও আর আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে গেল না। দুজনেই নীরবে খাচ্ছে। 

খেতে খেতে বেনিম জেনোভিয়ার দিকে তাকালো। চোখ গেল জেনোভিয়ার গলায় ঝুলতে থাকা লকেটে। ঠোঁটের বাম কোণ কিঞ্চিৎ চওড়া হলো ওর। হাসির ধরন অত্যন্ত নিবিড়। যেন এক টুকরো বরফ খণ্ডে হঠাৎই হাওয়া লেগেছে। জেনোভিয়ার গলার লকেটে স্থির চোখ রেখে মনে মনে বললো,

‘সেই ছোট্টো মেয়ে, এত ভালোভাবে বড়ো হলে?’

 

(চলবে)

 

 রঙিলা রাতের কালো অশ্রু (১৩) 

লেখা: ইফরাত মিলি

___________________

 

অনলাইন খবর আর পত্রিকার পৃষ্ঠায় একটা আকর্ষণীয় হেডলাইন দেখা যাচ্ছে, ‘ধরা দিলো ইয়েকাতেরিনবার্গের সিরিয়াল কি’লার…’

 

খু’নি নিজে এসে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। এমন ঘটনা বিরল আর খুবই চমকপ্রদ। খবরটা বাইরে ছড়িয়ে পড়লেই বেশ সাড়া ফেললো দেশজুড়ে। 

সেন্ট পিটার্সবার্গের পুলিশ যোগাযোগ করেছিল ইয়েকাতেরিনবার্গের পুলিশের সাথে। আর যোগাযোগ করে তারা জানতে পারলো ইয়েকাতেরিনবার্গের সেই সিরিয়াল কি’লার নিজ থেকে থানায় এসে ধরা দিয়েছে। আর ধরা দিয়েছে বৃদ্ধা বেলকার খু’নের আগে। ইয়েকাতেরিনবার্গের পুলিশ সংগঠন বিষয়টা চেপে রেখেছিল কিছুদিন। যে কারণে দেশব্যাপী তখনও এটা নিয়ে হৈ হুল্লোড় লাগেনি। কিন্তু যখনই এটা মিডিয়ার কানে গেল একেক পর এক নিউজ হতে লাগলো। অনলাইন, টেলিভিশন, পত্রিকা কোনো মাধ্যম বাদ গেল না খবর প্রচার করতে। 

বেনিম তেমনই একটা নিউজ এখন নিজের মোবাইলে পড়ছে। 

 

সিরিয়াল কি’লারের নাম নেস্তর। ২০২০ সালে সে ইয়েকাতেরিনবার্গের পৌর শহরের একটা এলাকায় নৃ’শংস খু’নের মধ্য দিয়ে জন্ম দিয়েছিল এক হৃৎকাঁপানো আতঙ্ক। সেই আতঙ্ক চলছিল জুন-জুলাই সম্পূর্ণ মাস জুড়ে। এরপরই পুলিশ কতৃপক্ষ সিরিয়াল কি’লারকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। কিন্তু তারা নেস্তরকে ধরতে পারেনি। তার আগেই ও পালিয়ে যায়। অনেক খুঁজেও ওর হদিস পায়নি কেউ। সবাই ওকে খুঁজে পাওয়ার আশাই ছেড়ে দিয়েছিল প্রায়। কিন্তু এত মাস পর নেস্তর নিজেই এসে ধরা দেবে এটা কি কেউ ভেবেছিল? তাও আবার অনুশোচনায় ভুগে? তবে আজব বিষয় এটা যে নেস্তর ইয়েকাতেরিনবার্গে খু’ন করেছে সাতটা, কিন্তু ও নিজের বক্তব্যে বার বার বলছে ও খু’ন করেছে ছয়টা। শেষে যে মেয়েটা খু’ন হয়েছিল হেসেতু নামের, সেই মেয়েকে না কি ও খু’ন করেনি। কিন্তু পুলিশ আর বিশ্বাস করেনি ওর কথা। তাদের ধারণা মিথ্যা বলছে নেস্তর। সাতটা খু’নই করেছে ও। কিন্তু ছয়টা খু’নের কথা স্বীকার করে একটা খু’নের কথা অস্বীকার করার ব্যাপারটা একটু খটকা লাগছে। তবে সে খটকা বেশি প্রাধান্য কুড়াতে পারেনি। এমনিতেই কেসটাকে ক্লোজ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল কেসের ভারপ্রাপ্ত ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর। যখন সুযোগ এলো তখন সে এই ছোটোখাটো একটা বিষয়কে নিয়ে মাথা ঘামিয়ে নতুন ঝামেলার সৃষ্টি করতে সম্মত হলো না। 

 

নিউজে নেস্তরের একটা খু’ন অস্বীকার করার খবরটুকু পড়ে বেনিম ভাবাবেগবর্জিত গলায় বললো,

“খু’ন না করা সত্ত্বেও কেন সেই খু’নের দায় পড়বে ঘাড়ে? আজব! লোকটা তো বলছে ছয়টা খু’নই করেছে। সাতটা খু’নের অপবাদ কেন দেওয়া হলো?”

 

_________________

 

আজ সকালে আবার এক আজব বিষয় প্রত্যক্ষ করলো জেনোভিয়া। সে এক্সারসাইজ করছিল, রাজুমিখিন দূর থেকে দেখছিল তাকে, ঠিক সেদিনের মতো। জেনোভিয়া বিষয়টা লক্ষ করার পর আর বেশিক্ষণ থাকতে পারেনি বাইরে। একটা বিষয় কিছুতেই বোধগম্য হচ্ছে না তার, লোকটা কেন এরকম ভাবে দেখে তাকে? 

লোকটাকে ইদানীং ভয় লাগে জেনোভিয়ার। এমন করে কারো নজরদারি করা মোটেই ভালো ব্যাপার নয়। এমনিতেই সে কিছুটা ভয়ের মধ্য দিয়ে দিন পার করছে। দুটো খু’ন ঘটেছে শহরে। খু’নি কে তা এখনও অজানা। ইয়েকাতেরিনবার্গের খু’নিই খু’ন দুটো করেছে ভাবা হলেও খু’নির আত্মসমর্পণ করার খবরের পর সে ভাবনা অর্থহীন এখন। পুলিশ এখন সন্দেহজনক বামহাতি মানুষের সন্ধান করছে। কিন্তু কোনো বামহাতি লোকও পাচ্ছে না। তারা ধারণা করছে খু’নি লুকিয়ে আছে। হয়তো সে নিজেকে আড়াল করে রাখছে মানুষের থেকে। তাই সাধারণ মানুষের ভিড়ে তার সন্ধান করে সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। 

জেনোভিয়ার রাজুমিখিনকে সন্দেহ হয়। কারণ বৃদ্ধা যেদিন মারা গেল, আর যে সময়ে মারা গেল, ঠিক তার কিছুক্ষণ পরই সে রাজুমিখিনকে রেইনকোট পরে কোথাও থেকে ফিরতে দেখেছিল। ওই সময়ই কেন ফিরেছিল লোকটা? কোথা থেকে ফিরেছিল? 

জেনোভিয়া তারাসকে বিষয়টা জানাতে চেয়েও এখনও পর্যন্ত জানায়নি। তবে খুব শীঘ্র জানিয়ে দেওয়া উচিত বোধ হয়। 

জেনোভিয়ার মাথায় হঠাৎ একটা চিন্তা ঝলকে উঠলো। আচ্ছা, যদি রাজুমিখিন সত্যিই খু’নি হয় তাহলে? লোকটা তার উপর নজর রাখছে, তার মানে কি লোকটার পরবর্তী শিকার সে? হৃৎপিণ্ডটা প্রচণ্ড ভয়ে ধাক্কা খেলো জেনোভিয়ার। ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে এলো অন্তর। কিন্তু সে কেন শিকার হতে যাবে? লোকটার কী ক্ষতি করেছে সে? পলিনা আর বৃদ্ধাই বা কী করেছিল? জেনোভিয়ার মনে হলো এই খু’নগুলো হওয়ার যুৎসই কোনো কারণ নেই হয়তো। যুৎসই নয়, আদৌ কোনো কি কারণ ছিল? 

বসে থাকলে হবে না আর। তৈরি হয়ে বের হতে হবে। জেনোভিয়া টিভি বন্ধ করে বেডরুমে ঢুকলো। কাপবোর্ড খুঁজে প্যান্ট আর শর্ট টপ বের করলো। পোশাক চেঞ্জ করার পর এসে দাঁড়ালো আয়নার সামনে। চেহারাটা পাণ্ডুর দেখাচ্ছে। আজ হালকা মেকআপ ঘঁষে নিলো মুখে। সহজ একটা হেয়ার স্টাইল করলো। আয়নায় একবার আগাগোড়া দেখে নিলো নিজেকে, সব ঠিক আছে কি না। সব ঠিক আছে। একজোড়া জুতো পায়ে গলিয়ে নিয়ে দরজার দিকে এগোলো সে। 

দরজা খুলেই থমকে গেল। একগাদা আবর্জনা (বিভিন্ন খাবারের খালি প্যাকেট, কলার খোসা, পানীয়র বোতল ইত্যাদি) তার দরজার সামনে। তার বাসার সামনে কে রেখে গেছে এসব? একটু ক্ষণ চিন্তা করার পর জেনোভিয়া বুঝতে পারলো কার কাজ এগুলো। রাগে তার ভিতরে বিস্ফোরণ হলো। একবার আড়চোখে তাকালো রোমেরোর বাড়ির দিকে। তারপর আবর্জনাগুলো ডিঙিয়ে নেমে গেল। 

লম্বা পা ফেলে হেঁটে প্রবেশ করলো রোমেরোর বাড়িতে। ওর ঘরের দরজায় বিকট শব্দে ঘা বসালো। 

 

“বেরিয়ে এসো অ’সভ্য। তোমার সাহস কী করে হলো এটা করার? বের হও। এই অসভ্য! দরজা খোলো। বেরিয়ে এসো এখুনি।”

 

অনেকক্ষণ যাবৎ দরজা ধাক্কানোর পর ওপাশ থেকে দরজা খুললো অভ্যন্তরীণ ব্যক্তি। ঘুম ঘুম চোখে এসে দাঁড়ালো জেনোভিয়ার সামনে। ওর মাঝে নিদ্রালু ভাব। চোখই খুলতে পারছে না ভালো করে। 

“কী হয়েছে? ষাঁড়ের মতো চ্যাঁচাচ্ছ কেন?” নিদ্রালু ভাবের কারণে রোমেরোর কণ্ঠ লঘু শোনালো।

 

ষাঁড়ের মতো কথাটা শুনে জেনোভিয়া আরও ক্রোধান্বিত হলো। তর্জন করে বললো,

“অসভ্য ছেলে! আমার বাড়ির সামনে ময়লা ফেলেছো কেন? এত স্পর্ধা কোথায় পাও?”

 

রোমেরো আগের মতো গলায় বললো,

“ও এই ব্যাপার? আমি কী করবো?  আশেপাশে কোথাও ডাস্টবিন পেলাম না, তাই…”

 

“তাই আমার বাড়িটাকে ডাস্টবিন মনে হলো?” রোমেরোর মুখ থেকে কথা কেড়ে আনলো জেনোভিয়া, “তোমার সমস্যা কী বলো তো? আমার সাথে এরকম শুরু করেছো কেন? কেন জ্বালাতন করছো আমাকে? একদিন হুট করে ঘরে ঢুকে গেলে, একদিন আপেল চুরি করলে, আর আজ ময়লা ফেলে রেখে এসেছো! কেন করছো এরকম? বন্ধ করো এসব। আমাকে জ্বালানো বন্ধ করো।” 

 

“যদি না করি?” বাঁকা প্রশ্ন রোমেরোর, ” কী করবে তাহলে?”

 

জেনোভিয়া কিছু বলতে চেয়ে উদ্যত হলেই রোমেরো ওকে থামিয়ে দিয়ে বললো,

“মিষ্টি করে কথা বলো আমার সাথে, আমি যেমন তোমার সাথে মিষ্টি ঠিক তেমন।” রোমেরোর কণ্ঠে আদেশের সুর। সে যেন মিষ্টি করে কথা বলতে আদেশ করছে জেনোভিয়াকে। 

জেনোভিয়া অবিশ্বাস্য চোখে চেয়ে রইল। ছেলেটা তার সাথে আদেশের সুরে কথা বলছে কোন অধিকারে? জেনোভিয়া লক্ষ করলো রোমেরোর চোখে অদ্ভুত একটা কর্তৃত্বের ছাপ তার প্রতি। প্রায় কিছুক্ষণ কিছু বলতে পারলো না জেনোভিয়া। অতঃপর খানিক কঠিনতা গলায় পুষে বললো,

“ফিরে যদি এমন কিছু করো তাহলে আর তোমাকে নিষেধ করতে আসবো না, ডিরেক্ট পুলিশে ইনফর্ম করবো।”

 

“ঠিক আছে, আর করবো না এমন। আর তোমার ঘরের সামনের ময়লাও পরিষ্কার করে দেবো। এখন তুমি আমার গৃহে প্রবেশ করো দয়া করে।” দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে প্রবেশ করতে অভ্যর্থনা জানালো রোমেরো। 

 

জেনোভিয়ার পুরো মুখে গাঢ় বিরক্তি সেঁটে আছে। সে রোমেরোর অভ্যর্থনায় সাড়া দিলো না, ঘুরে দাঁড়ালো যাওয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু এক পা সম্মুখে এগোতে পারলো না, একচুল নড়তেও পারলো না, তার আগেই ত্বরিত গতিতে ওর এক হাত ধরে ফেললো রোমেরো। সাথে সাথে পিছন ফিরলো জেনোভিয়া। অবাক চোখের দৃষ্টি। 

 

রোমেরোর দু চোখ স্থির, শান্ত। ঠোঁটে গাম্ভীর্য। ধীরপ্রশান্ত কণ্ঠে বললো,

“বললাম তো ঘরে প্রবেশ করতে। তারপরও চলে যেতে চাও কেন? আমি তো তুমি নই। আমি প্রতিবেশীর যত্ন নিতে জানি।”

বলে এক হ্যাঁচকা টানে জেনোভিয়াকে ঘরের মধ্যে নিয়ে এলো রোমেরো। 

 

“আরে!” আকস্মিক ঘটনায় শব্দটা মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল জেনোভিয়ার। 

 

রোমেরো জেনোভিয়াকে সোফায় বসিয়ে দিয়ে বললো,

“আমি কিছু খেতে দিচ্ছি তোমাকে।”

বলে আর অপেক্ষা করলো না, চলে গেল। কিচেন থেকে ফিরে এলো এক বাটি চিপস আর একটা মদের বোতল নিয়ে। বাটিটা টেবিলে রেখে মদ ঢাললো গ্লাসে।

 

“পান করো।” গ্লাসটা জেনোভিয়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো রোমেরো। 

 

“খাবো না।”

 

রোমেরো জেনোভিয়ার গা ঘেঁষে বসে পড়ে বললো,

“ঠিক আছে আমি খাই তাহলে।” 

 

জেনোভিয়া দূরে সরে গেল। 

রোমেরো গ্লাসের তরলটুকু এক চুমুকে শুষে নিয়ে নামিয়ে রাখলো গ্লাসটা। জেনোভিয়ার দিকে তাকিয়ে দেখলো জেনোভিয়া অস্বস্তিতে কুঁকড়ে আছে। রোমেরো হেসে বললো,

“বাঘ কেন বিড়ালের মতো করছে?”

 

জেনোভিয়া তাকালো ওর দিকে। ঝট করে রেগে গেল। উঠে দাঁড়িয়ে বললো,

“এরপর থেকে আমাকে আর প্রতিবেশী ভাববে না।”

 

“তাহলে কী ভাববো?” ভাবুক গলায় বললো রোমেরো, “ঘরের মানুষ? নিজের অতিশয় আপন মানুষ?” 

 

জেনোভিয়ার বক্ষস্থলে হঠাৎ ভিন্ন রকম কাঁপন হলো। মনে হলো এখানে আর এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকা অনুচিত। 

 

“আমি চলে যাচ্ছি।” কথাটা বলে যাওয়ার জন্য ঘুরবে জেনোভিয়া তার আগেই রোমেরো বললো,

“হুম যাও। আমি তো আটকে রাখছি না তোমাকে। না কি তুমি আমাকে ছেড়ে যেতে চাও না?”

 

জেনোভিয়া বিস্মিত চোখে তাকালো। রোমেরোর ওষ্ঠ প্রান্তে দুষ্টু হাসির বিচরণ। বললো,

“ইচ্ছা হলে থেকে যাও। আমার ঘরে যথেষ্ট জায়গা আছে তোমাকে রাখার।”

 

না, আর এক মুহূর্ত না। জেনোভিয়া দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল রোমেরোর ঘর থেকে।

রোমেরোর মুচকি হাসি আরও প্রশস্ত হলো। দৃঢ় কণ্ঠে বললো,

“মেয়েটা খুব শীঘ্রই আমার প্রেমে পড়বে!”

 

_________________

 

[০৯ এপ্রিল, ২০১৮ সাল; কাজান শহর।]

 

সুন্দর একটি সকাল। এক ছটা সোনা রঙের রোদ্দুর পরশ বুলিয়েছে ওদের গায়ে। ওরা বসে আছে রাস্তার ধারের ম্যাগনোলিয়া গাছের নিচে অবস্থিত একটি বেঞ্চে। গাছটায় অসংখ্য ম্যাগনোলিয়ার উপস্থিতি এখন। দু-চারটা ফুল গাছ খসে জমিনে লুটিয়েছে। কালো পিচের রাস্তা দিয়ে কিছুক্ষণ পরপর চলে যাচ্ছে সাইক্লিস্টদের সাইকেল। রাস্তার ওপারে একটা বেঞ্চিতে বসে আছে এক কিশোর ছেলে। তার মুখ বইয়ে ডোবানো। রোমেরো দূর থেকেও বইয়ের নামটা পড়তে পারলো। এটা একটা অনুবাদ বই। ব্রিটিশ রাইটারের লেখা। রোমেরো পড়েছে। 

দিনার কণ্ঠে ধ্যান ভাঙলো রোমেরোর, 

“তুমি কি জানো রোমেরো, আমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস কী?”

 

রোমেরো আড়চোখে দেখলো দিনাকে। ওর মুখে রোদের খেলা চলছে। সোনালি চুলগুলো চিকচিক করছে রোদে। 

রোমেরো একটু ভেবে বললো,

“তোমার বাড়ি?”

 

“উহুঁ, ভুল। আমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস হচ্ছে তোমার কাঁধ। এটা সবচেয়ে প্রিয় এবং বিশ্বস্ত। আমার কী মনে হয় জানো? পৃথিবীর সবকিছু আমাকে ছেড়ে চলে গেলেও তোমার কাঁধে আমার ঠাঁই চিরন্তন। আর তোমার কাঁধে চিরন্তন ঠাঁই মানে তো তুমিও চিরকালীন আমার।”

 

রোমেরো দিনার নরম হাতটা নিজের হাতে তুলে নিয়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে বললো,

“হুম, অবশ্যই। তুমি সেই মেয়ে যাকে আমি অত্যধিক ভালোবাসি!”

 

দিনা হাসলো। রোমেরোর মুখের এই কথাটা তার সারাজীবনে শোনা শ্রেষ্ঠ কথা। 

আসলেই রোমেরো তাকে অনেক ভালোবাসে। এটা সে খুব সহজে, কিন্তু খুব গভীরভাবে অনুভব করতে পারে। এমন কাউকেই সে জীবনে প্রত্যাশা করতো। আর খুব তাড়াতাড়ি সে এমন কারো দেখা পেয়েছে। 

 

“চলো বিয়ে করে ফেলি।” 

 

হঠাৎ বলা দিনার কথাটায় চমকায় রোমেরো।

“সত্যিই?”

 

দিনা রোমেরোর কাঁধ থেকে মাথা সরিয়ে নিলো। যে রিংটা সে এতক্ষণ যাবৎ হাতে নিয়ে বসে ছিল সেটা পরিয়ে দিলো রোমেরোর আঙুলে। 

রোমেরো অবাক। অবাক হয়ে তাকালো দিনার দিকে। 

 

“আমি তোমার স্ত্রী হতে প্রস্তুত।” বললো দিনা, “তুমি কি প্রস্তুত?”

 

রোমেরো বিমূঢ় হয়ে চেয়ে রইল। এক সেকেন্ড, দুই সেকেন্ড…কেটে গেল পাক্কা বিশটা সেকেন্ড। তারপরই হঠাৎ রোমেরো দিনার ঠোঁটে প্রগাঢ় চুম্বন আঁকলো। 

 

_________________

 

[বর্তমান সময়। ‘আভেতলা’ রেস্তোরাঁর সামনে।]

 

জেনোভিয়ার কাজ শেষ হয়েছে আরও বিশ মিনিট আগে। বিশ মিনিট ধরে সে অপেক্ষা করলো তার সামনে কোনো গাড়ি থামার। কিন্তু কোনো গাড়িই থামলো না। একটা থামলো তাও প্রত্যাশিত গাড়িটা নয়। সে গাড়ি থেকে তারাস নামেনি, নেমেছে অন্য কেউ। গাড়ি থেকে নামা মেয়েটা রেস্তোরাঁর ভিতর ঢুকলো। 

জেনোভিয়া নিরাশ মনে অপেক্ষা করতে লাগলো। অপেক্ষা করেও যখন তারাসের দেখা মিললো না তখন একাই পথ চলতে শুরু করলো। জেনোভিয়া এখন বাসে যাতায়াত করে। যে বাসে সে যেত সে বাসটা আরও আগেই চলে গেছে। পরবর্তী বাসের জন্য আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো তার। বাস এসে গেলে উঠে পড়লো বাসে। যাত্রী অত্যন্ত কম। জেনোভিয়া মাঝ বরাবর একটা সিটে বসলো। 

তারাস আসলো না কেন আজ? ভাবলো সে। পর মুহূর্তে আবার ভাবলো, তারাস তো তাকে প্রতিদিন বাসায় পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নেয়নি। সুতরাং সে প্রতিদিন তারাসের থেকে এই সেবা পাওয়ার আশা করতে পারে না। 

সে যে বাস স্টপেজে নামলো সেখানে কেবল আর একজন ব্যক্তি নামলো। তবে দুজনের গতিপথ দুইদিকে। 

জেনোভিয়া এলাকার রাস্তা ধরলো। বুকের ভিতরে ভয়ের ঘণ্টি বাজছে তার। 

চলতে চলতে বার বার পিছনে ফিরে দেখলো সে। যদি তার পিছনেও সেই ভয়ংকর লোকটা থাকে? 

পথটুকু ভালোয় ভালোয়ই শেষ করলো। তবে আসল বিপত্তির দেখা মিললো বাড়িতে এসে। দরজা খুলতে গিয়ে দেখলো দরজা আগে থেকেই খোলা। কিঞ্চিৎ ফাঁক হয়ে আছে। ভয়ে হাত-পা জমে গেল জেনোভিয়ার। ভয় ছোবল মা’রলো হৃৎপিণ্ডে। তার ঘরের দরজা খোলা কেন?  তার স্পষ্ট মনে আছে সে যাওয়ার আগে অবশ্যই দরজায় ভালোভাবে তালা দিয়ে গিয়েছিল। 

জেনোভিয়ার মস্তিষ্ক কাজ করতে চাচ্ছে না। অন্ধকার হয়ে আসছে দু চোখের দৃষ্টি। কাঁপা কাঁপা হাতে দরজার গায়ে মৃদু ঠ্যালা দিলো সে। কপাটটা আরও বেশি ফাঁক হয়ে গেল। পুরো ঘর ঘুটঘুটে অন্ধকারে নিমজ্জিত। প্রতিদিন কাজ থেকে ফিরে দরজা খুলে সে ঘর অন্ধকারই দেখতে পায়। কিন্তু কখনও সেই অন্ধকারকে ভয় লাগেনি। কিন্তু আজ… 

দুই পা পিছিয়ে এলো জেনোভিয়া। ভয় লাফাচ্ছে বুকের খাঁচায়। এই অন্ধকার আজ ভীষণ ভয়ের সৃষ্টি করছে। জেনোভিয়া ভিতরে প্রবেশ না করেও অনুভব করতে পারছে ভিতরে একজন অবস্থান করছে এই মুহূর্তে। আর যার অবস্থান সে নিতান্তই সাধারণ মানুষ নয়। ভয়ংকর! খুব ভয়ংকর মানুষ! 

জেনোভিয়া দৌড়ে বাড়ি থেকে দূরে সরে এলো। রাস্তায় উঠে ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে ত্রস্ত হাতে ডায়াল করলো তারাসের নাম্বারে। তারাসের মোবাইল সুইচ অফ! জেনোভিয়ার মাথার রগ ছিঁড়ে যেতে চাচ্ছে দিশেহারায়। সে উপায় না পেয়ে লিওনিদকে কল দিলো। প্রথম কলটা রিং হয়ে কেটে গেল, দ্বিতীয় কলও তাই। 

কী হলো সবার? কোথায় গেছে সবাই? দিগভ্রান্তের মতো করতে লাগলো জেনোভিয়া। 

দূর থেকে রোমেরো ওকে এমন করতে দেখে আর স্থির দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। সে গিয়েছিল বাজারের দিকটায়। ফেরার পথে জেনোভিয়াকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে উদ্‌ভ্রান্তের মতো করতে দেখে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে বললো,

“কী হয়েছে?”

 

জেনোভিয়ার শরীর ভয়ে কাঁপছে সামান্য। এমনকি তার গলাও কম্পমান। সে ভয়ে ভয়ে জবাব দিলো,

“আ-আমার ঘরে কেউ আছে!”

 

রোমেরো ভ্রু কুঁচকে অবাক গলায় বললো,

“কে আছে?”

 

“আমি জানি না। আমি রেস্তোরাঁ থেকে ফিরে দরজা খোলা পেয়েছি। আর সারা ঘর অন্ধকার। আমার ধারণা এটা ওই ব্যক্তি।”

 

রোমেরো বুঝতে পারলো কোন ব্যক্তির কথা বলছে জেনোভিয়া। সে বললো,

“পাগলের মতো কীসব বলছো! চলো আমি গিয়ে দেখছি।”

 

ভীতু ছেলের মুখে এমন সাহসপূর্ণ কথা আশা করেনি জেনোভিয়া। সে রোমেরোকে একজন ভীতু ছেলে বলে জানতো। রোমেরো জেনোভিয়ার বাড়িতে প্রবেশের জন্য পা বাড়ালেই জেনোভিয়া ওর হাত টেনে ধরলো।

“যেয়ো না।”

 

রোমেরো থামলো। একবার জেনোভিয়া আর একবার হাতের দিকে তাকালো। জেনোভিয়া রোমেরোর যে হাতটা ধরেছিল, সেই একই হাত দিয়ে রোমেরো উলটো জেনোভিয়ার হাতটা আঁকড়ে ধরলো।

“চলো।”

 

জেনোভিয়ার নিষেধ না শুনে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলো রোমেরো। প্রবেশের পর সে হাত ছেড়ে দিলো। অন্ধকার ঘরে একমাত্র আলোর উৎস হিসেবে রোমেরোর মোবাইলের ফ্লাশ লাইট জ্বলছে এখন। যার আলো খুব অল্পই আলোকিত করছে অন্ধকার ঘরটাকে। রোমেরো সুইচবোর্ড লক্ষ করে এগিয়ে যাচ্ছিল সামনে, হঠাৎই কানে এলো জেনোভিয়ার ভয়ার্ত গলার স্বর। পা দুটো থেমে গেল। চকিতে পিছনে ঘুরলো রোমেরো। মোবাইলের ফ্লাশ লাইট ফেলতে ভুলে গেল সে। তবে সে ঝাপসা আলো-অন্ধকারেও সামনের দৃশ্যটা আবিষ্কার করতে পারছে। জেনোভিয়া তার থেকে পাঁচ-ছয় কদম পিছনে। জেনোভিয়ার পিছনে আরও একজন মানুষের অবয়ব। 

 

(চলবে)

 

 রঙিলা রাতের কালো অশ্রু (১৪)

লেখা: ইফরাত মিলি

___________________

 

কাঁধে কারো উষ্ণ নিঃশ্বাস পড়ার অনুভূতি হলো। কানের কাছে ফিসফিস করে উঠলো একটা কণ্ঠস্বর,

“জেনোভিয়া!”

 

ভয়ে হৃৎপিণ্ডটা ধাক্কা খেলো পাঁজরের হাড়ের সাথে। ভয়ার্ত মৃদু শব্দটা বেরিয়ে এলো কণ্ঠ বিগলিত হয়ে। বেশ কিছুক্ষণ জেনোভিয়া ভয়ে জমে রইল বরফের মতো। অতঃপর অবাক হয়ে বললো,

“সাবিনা?”

 

পিছনে তাকালো জেনোভিয়া। 

পেছনের মানুষটা খিলখিল করে হেসে উঠলো। যেনতেন হাসি নয়, গা দোলানো হাসি। হাসতে হাসতে সে গিয়ে লাইট অন করলো। সঙ্গে সঙ্গে আলোকিত হয়ে উঠলো ঘর। সাবিনা জেনোভিয়ার দিকে ফিরে বললো,

“প্রিভিয়াত জেনোভিয়া!”

 

“এটা কেমন মজা সাবিনা?” গম্ভীর হয়ে বললো জেনোভিয়া, “আর একটু হলেই ভয়ে আমার হার্ট অ্যাটাক হতো!”

 

সাবিনা জেনোভিয়ার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বললো,

“আমি তো তোমাকে ভয়ই দেখাতে চেয়েছিলাম। ইশ, আমার ভাবতে কষ্ট হয় তুমি এতটা ভীতু!” 

মুখ টিপে হাসলো সাবিনা। হঠাৎ চোখ পড়লো রোমেরোর উপর। এতক্ষণ সে রোমেরোকে খেয়াল করেনি। দেখতে পেল একজন সুদর্শন যুবক হাঁ হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ঠোঁট থেকে হাসি সরে গেল সাবিনার। জেনোভিয়াকে অবাক গলায় প্রশ্ন করলো,

“ও কে?”

 

“পাশের বাড়িতে থাকে।”

 

“ও…” নিরাশ গলায় উচ্চারণ করলো সাবিনা, “আমি ভেবেছিলাম হয়তো তোমার সুবুদ্ধি উদয় হয়েছে। তারাসকে বাদ দিয়ে নতুন কাউকে নিয়ে ভাবছো। কিন্তু তোমার দ্বারা কিছু সম্ভব নয়।”

 

সাবিনা সহাস্য বদনে এগিয়ে এলো রোমেরোর দিকে। করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো,

“আমি জেনোভিয়ার বন্ধু হই। আমার নাম সাবিনা সিসিলা।”

 

রোমেরোর অসন্তুষ্ট দৃষ্টি একবার সাবিনার হাতে আর একবার সাবিনার মুখে আবর্তিত হলো। না, জোর করেও সে খুশি হতে পারলো না।

“তোমার কাজে খুশি হলাম না।” শীতল স্বরের কথাটা সাবিনার উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দিলো রোমেরো। করমর্দন না করেই  দ্রুতপায়ে স্থান ত্যাগ করলো সে।

 

সাবিনা কুটিল চোখে চেয়ে রইল রোমেরোর যাওয়ার পথে। আনমনে বললো,

“সুদর্শন ছেলেদের অহংকার বেশি! আমার বিশ্বাস হচ্ছে না এত খারাপ ব্যবহার করে গেছে আমার সাথ!” জেনোভিয়ার উদ্দেশ্যে বললো, “তোমার প্রতিবেশী খুব খারাপ জেনোভিয়া।”

 

“তুমিও অত্যন্ত খারাপ! এখানে দুই দুইটা মা’র্ডার হয়েছে, বুঝতে পারছো বর্তমান পরিস্থিতিটা কত ভীতিকর?”

গাম্ভীর্য ভরাট গলায় কথাগুলো বলে বেডরুমের দিকে পা বাড়ালো জেনোভিয়া।

সাবিনা সদর দরজা বন্ধ করে জেনোভিয়ার পিছন পিছন এসে বললো,

“আমি কী করেছি? আমি তো শুধু মজা করছিলাম তোমার সাথে। তুমি এতটা রেগে গেলে কেন?”

 

জেনোভিয়া ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেললো বিছানায়। মৃদু শব্দ হলো ওটা পড়ার। সাবিনার দিকে ঘুরে বললো,

“তোমার ধারণা আছে কত ভয় পেয়েছি আমি? আর খোলা দরজা, অন্ধকার ঘর আমায় কী স্মরণ করিয়ে দেয় জানো?” জেনোভিয়ার চোখে হঠাৎ অশ্রু দেখা দিলো। দু চোখ বন্ধ করে দুই পাশে মাথা নাড়তে নাড়তে বললো,

“থাক, বাদ দাও।” চোখ মেলে আবার বললো,

“এসেছো কখন?”

 

সাবিনার মন খারাপ হলো। জেনোভিয়াকে কষ্ট দেওয়া তার উদ্দেশ্য ছিল না। সে সাধারণ একটু ভয় দেখাতে চেয়েছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সে ভুল করেছে। এটা নিয়ে কথা বলে পরিবেশ অস্বস্তিকর করতে চাইলো না সে।

“সন্ধ্যায় এসেছি।”

বলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল সাবিনা। যেতে যেতে বললো,

“রাতের খাবারটা আমি বানাই আজকে।”

 

______________

 

বজ্রপাত হওয়ার বিকট শব্দ হলো। ক্ষণিকের জন্য আলোকিত হয়ে উঠলো অন্ধকার গলিটা। বৃষ্টি ঝরছে। বাতাসের দমকায় বৃষ্টির ফোঁটাগুলো সরল অবস্থা থেকে বক্র হয়ে পড়ছে। রেইনকোট পরা লোকটা একের পর এক আ’ঘাত করছে বেনিমের মাথায়। মনে হচ্ছে শরীর থেকে মা’থাটা অদৃশ্য করে দেবে, রাস্তার সাথে মি’শিয়ে দেবে মস্তক নামক অঙ্গটি। বেনিম এখন আর শব্দ করছে না। হয়তো ওর বক্ষৎপঞ্জর থেকে প্রাণ বিহঙ্গ উড়ে গেছে ইতোমধ্যে। বেনিমের থেকে কিছুটা দূরে পড়ে আছে আরেকটা লা’শ। ওটা লিওনিদের। লিওনিদের শরীরে অসংখ্য ছু’রির আ’ঘাত আর মাথা র’ক্তাক্ত, ক্ষ’ত-বি’ক্ষত। বন্ধুর এমন গতিক দেখে কষ্টে জখম হচ্ছে তারাসের হৃৎপিণ্ড।

তারাসের হাতে রি’ভলভার। বৃষ্টিতে চোখ মেলে ভালো করে তাকাতে পারছে না সে। রি’ভলভারটা তাক করা খু’নির উপর। যে খু’নি এখন বেনিমের মাথা পি’ষ্ট করতে ব্যস্ত। তারাসের হাত কাঁপছে। দুই হাত দিয়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো রি’ভলভারটা। কম্পিত স্বরে খু’নিকে বললো,

“স্…স্টপ জেনোভিয়া। ওকে আ’ঘাত করা বন্ধ করো। নাহলে আমি তোমাকে শু’ট করতে বাধ্য হবো!”

 

আ’ঘাত করার জন্য উঁচিয়ে ধরা হাতটা থেমে গেল। আঘাত না করেই নিচু হয়ে এলো হাতটা। তির্যক চোখে তারাসের দিকে তাকালো জেনোভিয়া। দৃষ্টি জ্বলন্ত। 

তারাস কিছু বলার অথবা ভাবার সময় পেল না, শুধু দেখলো জেনোভিয়া বাতাসের বেগে ছুটে আসছে তার দিকে। আর তারপরই অনুভব করতে পারলো একটা হা’তুড়ির বাড়ি এসে লেগেছে তার মা’থায়। মাথা থেকে র’ক্ত ছিটকে বেরোলো তারাসের।

বিকট চিৎকার করে পড়ে গেল সে। কপালে আর শরীরের হাড়ে অনুভব করলো প্রচণ্ড ব্যথা। ব্যথায় বুজে আসলো চোখ। দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে। 

ধীরে ধীরে যখন ব্যথা উপশম হলো তখন পিটপিট করে চোখ মেলে তাকালো তারাস। ঘরের সিলিং দেখতে পাচ্ছে। সে বুঝতে পারলো সে জেনোভিয়ার করা হা’তুড়ির আঘাতে রাস্তায় পড়ে যায়নি, স্বপ্ন দেখতে দেখতে খাট থেকে ফ্লোরে পড়ে গেছে। 

উঠে বসলো তারাস। মাথায় লেগেছে খুব। ব্যথা স্থানে আলতো পরশ বুলালো। মনে মনে ভাবলো, কী রোমাঞ্চকর স্বপ্ন! সে বিশ্বাস করতে পারছে না এমন লোমহর্ষক একটা স্বপ্ন দেখেছে সে। শরীরের লোম দাঁড়িয়ে আছে এখনও। লক্ষ করে দেখলো গায়ের গেঞ্জিটাও ভিজে গেছে ঘামে। খুবই লোমহর্ষক ছিল! আর জেনোভিয়া তো…না, ওকে নিয়ে এখন কিছু ভাবতে পারছে না। ফ্লোর থেকে বিছানায় উঠে বসলো সে। বালিশের পাশ থেকে মোবাইলটা হাতে নিয়ে অন করলো। কালকে রাতে সেই যে মিটিংয়ের আগে মোবাইল সুইচ অফ করেছিল আর অন করেনি। লিওনিদকে কল দিলো। 

পনেরো সেকেন্ড রিং বাজার পরই রিসিভ হলো কল। তারাস হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,

“ঠিক আছো তুমি?”

 

“হ্যাঁ, আমি ঠিক আছি। হঠাৎ এ কথা জিজ্ঞেস করছো কেন? আর তোমার কী হয়েছে?”

 

“আমি ঠিক আছি। সবকিছুই ঠিক আছে।  থানায় দেখা হবে। রাখছি।”

 

লিওনিদের কিছু বলার অপেক্ষা না করে কল কেটে দিলো তারাস। বেডরুম থেকে বেরিয়েই টি-টেবিলে চোখ গেল তার। বিস্ময়ের হাওয়া লাগলো দু চোখে। 

এগিয়ে এলো টেবিলের দিকে। একটা ঝুড়ির ভিতর তিন রকম খাবারের বক্স, কিছু ফুল, আর একটা ছোটো চিরকুট পেল। চিরকুটটা হাতে তুলে নিলো সে।

 

‘শুভ সকাল আমার ভালোবাসা!’

 

লেখাটা পড়ে হাসলো তারাস। না, মেয়েটাকে গ্রেফতার না করে পারবে না সে। মেয়েটা কখন তার বাড়িতে প্রবেশ করলো? আর কখনই বা চুপিসারে এসব রেখে চলে গেল? চাবি আছে বলে এভাবে যখন তখন তার ঘরে ঢুকে যেতে পারে না। তারাস এবার একটু কঠিন সাজার চেষ্টা করলো। মুছে ফেললো হাস্যভাব। চেষ্টা করলো রাগতে। মুখ কালো বানালো। হাতের মুঠোয় চেপে ধরলো চিরকুটটা।

“ভালোবাসা না ছাই!” বলে রাগের সহিত ফ্লোরে ছুঁড়ে মারলো চিরকুটটা। হনহন করে হেঁটে গেল পাঁচ কদম। তারপরই আর পারলো না। আবার ফিরে এসে হাতে তুলে নিলো চিরকুট। মুচড়ে যাওয়া চিরকুটের ভাঁজ খুলে আবারও ফুলের মাঝে ঝুড়িতে রেখে দিলো যত্ন করে।

 

__________________

 

দরজায় ঠকঠক শব্দ হচ্ছে। কানে হালকা করে ঠকঠকানির আওয়াজটা এলে রিমোট হাতে নিয়ে টিভির ভলিউম কমালো সাবিনা। দরজা খুলে দেখতে পেল একজন চমশা পরা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। তার চেহারা দর্শন করেই সাবিনার ভিতরটা কেমন আনচান করে উঠলো। এত সুদর্শন ছেলে! সাবিনার মনে হলো এত সুদর্শন ছেলে সে এর আগে কখনও কোথাও দেখেনি। সে মুগ্ধ চোখে বোকার মতো চেয়ে রইল। তার এই দৃষ্টিতে অস্বস্তিবোধ করলো ছেলেটা। জিজ্ঞেস করলো,

“জেনোভিয়া আছে বাসায়?”

 

সাবিনার ধ্যান ভাঙলো। নিজেকে সংযত করে মাথা দুলিয়ে বললো,

“হুম আছে।”

 

“আমি ওর সাথে দেখা করতে এসেছি।”

 

“আমি ডেকে দিচ্ছি ওকে।”

 

সাবিনা দৌড়ে চলে গেল। জেনোভিয়া লাইব্রেরি থেকে ফিরে এক ঘণ্টার জন্য ঘুমিয়েছিল। সাবিনা ওকে ক্রমাগত ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে তুললো।

“জেনোভিয়া ওঠো। তোমার বয়ফ্রেন্ড এসেছে। ওঠো জেনোভিয়া।” ব্যস্ত হয়ে বললো সাবিনা।

 

জেনোভিয়া ঘুম ভাঙা চোখে তাকালো,

“কে এসেছে?”

 

“তোমার বয়ফ্রেন্ড।”

 

দ্রুত উঠে বসলো জেনোভিয়া।

“তারাস এসেছে?”

 

“তারাস নয়, তোমার বর্তমান প্রেমিক।”

 

জেনোভিয়া ভ্রু কুঁচকালো, 

“সে আবার কে?”

 

“চশমা পরা সুদর্শন ছেলেটার কথা বলছি। আমি ভাবতে পারছি না এত সুন্দর একটা ছেলেকে কোথায় পেলে তুমি?” সাবিনার ঠোঁটে উপচে পড়া হাসি। 

 

চশমা পরা শুনে জেনোভিয়া বুঝতে পারলো বেনিমের কথা বলছে। 

জেনোভিয়া নামলো বিছানা ছেড়ে। এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বললো,

“ও আমার প্রেমিক নয় গাধা। আমার প্রতিবেশী।”

 

সাবিনা যেন কথাটা শুনে খুশিতে আত্মহারা হলো,

“তাই? ও তোমার প্রেমিক নয়? ওহ জেনোভিয়া কী বলছো? ও সত্যিই তোমার প্রেমিক নয়?” 

খুশিতে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললো সাবিনা। তারপর আবার হাত সরিয়ে বললো,

“গতরাতে যাকে দেখেছিলাম সেও চমৎকার ছিল। আর এখন যাকে দেখলাম সে তো আরও বেশি চমৎকার। এত চমৎকার ছেলেদের বসবাস তোমার আশেপাশে, অথচ তুমি এখনও…”

 

জেনোভিয়া সাবিনার সব কথা না শুনে বেরিয়ে গেল। লিভিংরুমে এসে দেখলো বেনিম এখনও দরজার ওখানে দাঁড়িয়ে আছে। জেনোভিয়া এগিয়ে গেল। 

বেনিম একবার ভালো করে দেখে নিলো জেনোভিয়াকে। নিদ্রালু চোখ, এলোমেলো চুল, কুঁচকানো টি-শার্ট…

 

“ঘুমাচ্ছিলে? আমি কি বিরক্ত করলাম এসে?”

 

জেনোভিয়া হেসে বললো,

“মোটেই না। ভিতরে এসো।”

 

বেনিমও মৃদু হাসি উপহার দিয়ে অভ্যন্তরে প্রবেশ করলো। বাইরে থেকে দেখতে বাড়িটাকে ছোটো মনে হয়। কিন্তু লিভিং রুমটা যথেষ্ট বড়ো। পুরোনো আমলের কিছু আসবাবপত্র দেখা যাচ্ছে। পুরোনো হলেও সব চকচকে। বোঝা যায় জেনোভিয়া এগুলোর খুব যত্ন নেয়। টিভিটা কম শব্দে চলছে। তেমন বড়ো নয় ওটার আকার। সোফার পাশের টেবিলের উপর কিছু বইপত্র দেখা যাচ্ছে। দেওয়ালের সাথে একটা শোকেস। শোকেসের ভিতর কিছু জিনিস সাজিয়ে রাখা আছে সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য। এক ঝলকে পুরো ঘরটা দেখে নিলো বেনিম। জেনোভিয়া ওকে সোফা দেখিয়ে দিয়ে বললো,

“ওখানটায় বসো। আমি এখুনি আসছি।”

 

কিছুক্ষণ পর ফিরে এলো জেনোভিয়া। ওর চোখে নিদ্রালু ভাব নেই। হয়তো পানির ঝাপটা মেরে ঘুমটাকে তাড়িয়েছে। বেনিম খুশি হলো না ব্যাপারটায়। জেনোভিয়ার নিশ্চয়ই আরও কিছুক্ষণ ঘুমানো প্রয়োজন ছিল। না ঘুমালেও ঘুম ঘুম ভাবটাকে ওর তাড়িয়ে দেওয়া একেবারেই অনুচিত হয়েছে। 

 

জেনোভিয়া বেনিমের হাতে কফির কাপ তুলে দিলো। তখনই বেনিমের চোখ পড়লো জেনোভিয়ার গলার লকেটে। মাথাটা চিনচিন করে উঠলো। জেনোভিয়াও বসলো বেনিমের থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখে। 

বেডরুমের দরজা থেকে উঁকি দিচ্ছে সাবিনা। বেনিম সেদিকে না তাকিয়েও এটা বুঝতে পারলো আর ভীষণ বিরক্তবোধ করলো। মেয়েটাকে প্রথম দেখায়ই তার ভালো লাগেনি। ‘বিরক্তিকর মেয়ে!’ মনে মনে বিড়বিড় করলো বেনিম। 

 

“হঠাৎ আমার বাসায় আসলে যে?”

 

বেনিম কফির কাপটা দেখিয়ে বললো,

“এক কাপ কফি পাওনা ছিল যে।”

 

জেনোভিয়া হেসে বললো,

“পাওনা বুঝে নিতে এসছো?”

 

“অনেকটা সেরকমই।”

 

কাপে চুমুক দিতে দিতে টেবিলের উপর  জেনোভিয়া ও তার মায়ের একই সঙ্গে একটা ফ্রেমবন্দি ছবিতে চোখ পড়লো বেনিমের। সেদিকে গভীর চোখে চেয়ে থেকে বললো,

“ছোটো বেলায়ও তুমি অনেক সুন্দর ছিলে জেনো।”

এরপর একটু থেমে আবার বললো,

“তোমার মাও কিন্তু দেখতে খুব সুন্দর। উনি কোথায়?” প্রশ্নটা জেনোভিয়ার দিকে চেয়ে করলো। 

 

মায়ের প্রসঙ্গ ওঠায় হালকা মন খারাপের ব্যথা আঁকড়ে ধরলো জেনোভিয়ার বুক। ক্রমাগত চোখের পলক পড়তে আরম্ভ করলো। বললো,

“মামা মারা গেছে!”

 

বেনিমের মুখ দুঃখে তিমিরাচ্ছন্ন হলো। লঘু স্বরে বললো,

“আমি দুঃখিত তোমাকে দুঃখজনক স্মৃতি মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য!”

 

“না, কোনো ব্যাপার নয় এটা। আমি এমনিতেও মামার কথা সব সময় স্মরণ করি।”

 

“ভালো মেয়ে তুমি। মামাকে অনেক ভালোবাসো। আমিও আমার মামাকে অত্যন্ত ভালোবাসি। যারা মাকে ভালোবাসে তাদেরও ভালোবাসি আমি।”

 

নীরবতায় কাটলো কয়েক মিনিট। তারপর বেনিম জিজ্ঞেস করলো,

“যে মেয়েটাকে দেখেছিলাম সে কে?”

 

“আমার বন্ধু। অতি প্রিয় এবং একমাত্র বন্ধু।” 

 

জেনোভিয়া সাবিনাকে ডাকলো। বেনিমের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো ওকে। কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে চলে এলো বেনিম। রোদের তেজ মন্দ নয় এখন। আবহাওয়া উষ্ণ করে রেখেছে। রোদের আলোয় চিকচিক করছে সবকিছু। 

জেনোভিয়ার বাড়ি থেকে বেরিয়ে বেনিম দেখতে পেল রোমেরো রাস্তার ধারে গাছের ছায়ায় বেঞ্চিতে বসে আছে। সে হাঁটতে হাঁটতে সেদিকে গেল। কিছু না বলেই বসলো রোমেরোর পাশে। রোমেরো তখন বললো,

“মেয়েটা যখন নিদ্রালু চোখে আর এলোমেলো চুলে তোমার সামনে এসে দাঁড়ালো, নিঃসন্দেহে তখন ওকে ভীষণ সুন্দর লাগছিল!”

 

“তুমি কি ওর প্রেমে পড়েছো?” বেনিমের কণ্ঠে বিস্ময়। 

 

রোমেরো শান্ত দৃষ্টি ফেললো বেনিমের মুখে। 

“পড়তে পারি না?”

 

বেনিম হাসলো। বাড়ির লনে তাকিয়ে বললো,

“মামা একা একা কাপড় মেলছে। আমি গিয়ে তাকে সাহায্য করি।” 

যেতে উদ্যত হয়ে আবার থেমে বললো,

“আজ রাতে আমার বাড়িতে খেতে এসো, আমন্ত্রণ রইল।” 

 

বলে বেনিম মাকে ডাক দিয়ে মায়ের দিকে এগিয়ে গেল। ভেজা কাপড়গুলো মেলে দিতে লাগলো মায়ের সাথে। সেদিকে প্রশান্ত মনে তাকিয়ে রইল রোমেরো। 

 

________________

 

লোকটার নাম পাভেল। বয়স সত্তর বছর পেরিয়েছে। এমন একটা দিন নেই যে দিনটায় তাকে বারে দেখা যায় না। মদ তার বড়ো প্রিয় জিনিস। একটা দিন এই প্রিয় জিনিসটার স্বাদ গ্রহণ না করলে তার ভিতরটা শান্ত হতে চায় না। বড়ো অশান্তি হয় মনে। গ্লাসে অবস্থানরত মদটুকু গলায় ঢেলে নিলো পাভেল। 

এই বারটি বড়ো শান্ত ধরনের। কয়েক জন খদ্দেরের নিবিড় কথাবার্তা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো কিছুর শব্দ নেই। জায়গাটা কিছুটা গুমোট গুমোটও। মোট বারোটা টেবিল আছে এখানে। খদ্দেরের পরিমাণ এ সময় বেশি নয়। রাতে খদ্দেরের সংখ্যা বাড়বে। দিনের কালেও দোকানের সব লাইট গুলো জ্বলছে। 

পাভেলের কানে ভেসে আসছে তার পাশের টেবিলে বসে থাকা দুজন খদ্দেরের কথাবার্তা। মহিলা আর পুরুষটা খু’ন নিয়ে কিছু বলছে নিজেদের ভিতর। 

পাভেল বেশ কৌতূহলী হয়ে শুনলো তাদের কথোপকথনগুলো। খু’নি বামহাতি, দুজনের কথোপকথন দ্বারা এই বিষয়টা সম্পর্কে অবগত হলো সে। আরও অবগত হলো পুলিশ না কি এখন বামহাতির সন্ধান করছে। পাভেল মনে মনে কিছুক্ষণ যাবৎ তিরস্কার করলো খু’নিকে। তারপর আবারও মদ পানে মনোযোগ দিলো। গ্লাস ধরতে গিয়ে সে হঠাৎ লক্ষ করলো সে বাম হাত দিয়ে গ্লাস ধরেছে। টনক নড়লো তার। সে বাম হাত ব্যবহার করছে কেন? বেশ কিছুক্ষণ সে বিষয়টা নিয়ে চিন্তায় মগ্ন রইল। তারপর ভুলে গেল বিষয়টা। আবারও পানে মনোযোগী হলো। কিন্তু বারের বিল মিটিয়ে যখনই সে দরজা খুলে বের হলো, তখন আবারও তার খেয়াল হলো সে বাম হাতে দরজা খুলেছে এবং বন্ধ করেছে। আরও বেশ কিছু কাজ করতে গিয়ে পাভেল দেখলো সে ক্রমাগত তার বাম হাতই ব্যবহার করছে। কিন্তু কেন সে তার বাম হাত ব্যবহার করছে? ডান হাত কেন নয়? মাতাল পাভেল বিষয়টা বুঝেই উঠতে পারছে না। পাভেলের সহসা মনে হলো সে আসলে একজন বামহাতি। আর তার মনে পড়ে গেল এখানকার যে খু’নি সেও একজন বামহাতি। তবে কি খু’নগুলো সে করেছে? পাভেলের মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে ভয়ংকর চিন্তাটা।

 

(চলবে)

 

 রঙিলা রাতের কালো অশ্রু (১৫)

লেখা: ইফরাত মিলি

___________________

 

পাভেল বুঝতে পারে খু’নগুলো সেই করেছে। ভয়ে আত্মা শুকিয়ে যায় তার। এখন কী হবে? পুলিশ যদি কোনো ক্রমে এই গোপন সত্যিটা জেনে যায় তাহলে তো বাকি জীবনটা অন্ধকার কারাগারে কাটাতে হবে তাকে। না না এটা সে কিছুতেই পারবে না। পাভেল হুডিটা মাথায় টেনে নিলো। গরমের ভিতরও সে শীতকালীন পোশাকই পরে। মাতাল মানুষ হয়ে এই এক সুবিধা, তার অত গরম-ঠান্ডা পার্থক্য করার অনুভূতি হয় না। 

মানুষের থেকে মুখ আড়াল রেখে কোনো রকমে বাড়ি এসে পৌঁছলো সে। সে একজন বামহাতি, একজন খু’নি, এসব ভেবে ভেবে ক্রমে ক্রমে শিহরিত হচ্ছে! সে কীভাবে এত জঘন্য কাজ করেছে? ঘেন্নায় বুক ভরে আসছে নিজের প্রতি। ঘরের জিনিসপত্র সব ব্যাগে ভরতে আরম্ভ করলো। এখনই এ শহর ছেড়ে বহুদূরে চলে যেতে হবে। সে ধরা পড়তে চায় না। কিছুতেই ধরা পড়তে পারবে না। সে একজন বামহাতি, একজন খু’নি। সে ব্যতীত আর কেউ বামহাতি নেই। তারমানে তো সেই খু’নি। হ্যাঁ, সে নিশ্চিত একজন খু’নি। এতে কোনো সন্দেহ নেই। এখনই পালাতে হবে। দুটো বড়ো বড়ো ব্যাগে জামাকাপড়, কিছু রুবল, আরও কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে সে বেরিয়ে পড়লো। 

 

অন্ধকার রাত্রি। পরিবেশ গুমোট। মেঘলা মেঘলা ভাব। একটা গাড়ি কি সে পাবে? কিছুদূর হেঁটে আসার পর একটা ট্যাক্সি পেল। সেটাতেই উঠে বসলো সে। ট্যাক্সি ছেড়ে দিলো। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো পাভেল।

 

_________________

 

তিনটা গলুবস্ত‍্যের বাটি টেবিলে। তিনজনই তীব্র খুদায় গপাগপ করে খাচ্ছে গলুবস্ত্য (এটা একটা রাশিয়ান খাবার)। সকালের হালকা নাস্তার পর আর কিছুই পড়েনি তাদের পেটে। আজ সারাটা দিন ব্যয় করেছে একজন লুটেরার পিছনে। অবশেষে সক্ষম হয়েছে সেই লুটেরাকে পাকড়াও করতে। লোমোনোসোভ শহরে গিয়ে ধরতে হয়েছে ব্যাটাকে। গলুবস্ত‍্যের শেষ অংশটা মুখে পুরে চিবানো কালে ‘আনা’ নামের নতুন পুলিশ ডিপার্টমেন্টে যোগ দেওয়া মেয়েটা এসে সামনে দাঁড়ালো। সে দৌড়ে এসেছে বোঝা যাচ্ছে। সবাই বুঝতে পারলো জরুরি তলব হবে নিশ্চয়ই।

 

“কী হয়েছে?” জানতে চাইল তারাস।

 

“পলিনা আর বেলকার খু’নি ধরা পড়েছে।”

 

কথাটা শোনার জন্য তিনজনের কেউই প্রস্তুত ছিল না। মুখের অভ্যন্তরীণ গলুবস্ত‍্য গিলতে ভুলে গেল তিনজন। কিছুক্ষণ সবিস্ময়ে তাকিয়ে রইল আনার মুখের দিকে। তারপর ত্রস্ত হাতে পানির বোতল থেকে পানি খেয়ে গলুবস্ত‍্যের মূল্য টেবিলের উপর রেখে তিনজনই দৌড়ে বেরিয়ে গেল। আনাও ছুটে গেল ওদের পিছন পিছন। 

খাবারের দোকানটা থানা থেকে পায়ে হেঁটে তিন-চার মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত। ওরা দৌড়ে আসার কারণে সময় আরও অল্প লাগলো। ফেলিন সহ আরও কয়েকজনকে একসাথে বসা দেখে থামলো ওরা। ফেলিনের সামনে বসে আছে একটা লোক। এটাই খু’নি। খু’নি একজন বয়স্ক লোক। 

 

পাভেলকে জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষে নিয়ে আসা হয়েছে। ভিতরে ফেলিন আর লিওনিদ অবস্থান করছে পাভেলের সাথে। কক্ষের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে তারাস, মাইক সহ আরও উচ্চ পদস্থ পুলিশ অফিসার। কাচের ভিতর দিয়ে ভিতরের অবস্থা দেখতে পাচ্ছে। তারাস চেয়ে আছে পাভেলের দিকে। লোকটা মাতাল। 

 

“আপনি নিজ থেকে এসে সারেন্ডার করলেন কেন?” পাভেলের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলো ফেলিন।

 

পাভেল বললো,

“কারণ আমার অনুশোচনা হচ্ছিল। প্রথমে আমি চেয়েছিলাম পালিয়ে যাব। এমনকি আমি সেই উদ্দেশ্যে ট্যাক্সিতেও উঠে পড়েছিলাম। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর আমার বিবেক জাগ্রত হলো। আমি অনুশোচনাবোধ করতে শুরু করলাম। আমার মনে হলো এই জঘন্য কাজের জন্য আমার শাস্তি পাওয়া উচিত। আর তাই আমি যে ট্যাক্সিতে করে পালিয়ে যাওয়ার চিন্তা করেছিলাম, সেই ট্যাক্সি ঘুরিয়েই থানায় চলে এসেছি।”

 

ফেলিন মাথা নাড়লো। 

“কিন্তু আপনি এমন নৃ’শংস ভাবে খু’নগুলো কেন করলেন? কী ক্ষতি করেছিল তারা?”

 

“দেখুন, আমি নিজ থেকে ধরা দিতে এসেছি এটাই অনেক। এত প্রশ্নের জবাব আমি দিতে পারবো না।”

 

ফেলিন আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না। কিছুক্ষণ মৌন হয়ে রইল। 

পাভেল বললো,

“আচ্ছা এখানে কি মদ পাওয়া যাবে?”

 

ফেলিনের চোখ স্ফীত হয়ে উঠলো। থানার ভিতর মদ? 

পাভেল লিওনিদকে বললো,

“আমার একটু পান করা প্রয়োজন। আমার জন্য একটু মদের ব্যবস্থা করুন।”

 

লিওনিদ অথবা ফেলিন কেউই কিছু বলতে পারলো না। থানার ভিতর এর আগে কেউ এরকমভাবে মদ খেতে চায়নি।

কিছুক্ষণ বাদে পাভেল আবার বললো,

“আচ্ছা আমাকে যে সেলে রাখা হবে সেখানে কি আমি কম্বল আর বালিশ পাবো?”

একটু পর আবার জানতে চাইলো,

“আচ্ছা আমাকে কি সাইবেরিয়া পাঠানো হবে? আমি সাইবেরিয়া যেতে পারবো না। কিছুতেই সাইবেরিয়া যাব না আমি।”

তীব্র অভিমানে গাল ফোলালো পাভেল।

 

ফেলিন ঘেমে উঠছে। এমন খু’নি তো দূর, এমন চোরও সে এর আগে দেখেনি। সে জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ থেকে বের হলেই তারাস বললো,

“আপনার কি মনে হয় এই লোক খু’নি? লোকটা তো মাতাল। একটা মাতাল লোক কীভাবে এত বিচক্ষণ ভাবে খু’ন করতে পারে?”

 

ফেলিন বিরক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।

“তুমি সব সময় অতিরিক্ত চিন্তা করো তারাস। এই লোক যদি খু’ন নাই করবে তাহলে কেন সে খু’ন করেছে এ কথা স্বীকার করলো? নিজে নিজে এসে কেন ধরা দিলো? পাগলেও নিজের ভালো বোঝে, আর এই লোক তো পাগল নয়, মাতাল।”

 

“কিন্তু…”

 

ফেলিন তারাসকে থামিয়ে দিয়ে বললো,

“আর সবচেয়ে বড়ো কথা হলো লোকটা বামহাতি। তুমি কি ভুলে গেছো বৃদ্ধার খু’নি একজন বামহাতি ছিল? আর আমি শুনেছি লোকটা তার ছেলেকে খু’ন করেছে।”

 

“আমিও শুনেছি। ওটা একটা ভুলবশত করা কাজ ছিল। সে রেগে গিয়ে আ’ঘাত করেছিল তার ছেলেকে। তারপর কিন্তু সে হাসপাতালেও নিয়ে গিয়েছিল। হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় তার ছেলে মারা যায়।”

 

“খু’নিদের ব্যাপারে কতটুকু জানো তুমি? আমি একশ ভাগ নিশ্চিত এই লোকটাই খু’ন করেছে। হয়তো ইয়েকাতেরিনবার্গের সিরিয়াল কি’লারের কাছ থেকে সে অনুপ্রেরণা পেয়েছে। ইয়েকাতেরিনবার্গের কি’লার নিজে এসে ধরা দিয়েছিল, সেজন্য অনুপ্রাণিত হয়ে সেও এসে ধরা দিয়েছে। লোকটা যেখানে নিজে খু’ন করার কথা স্বীকার করেছে সেখানে আমাদের কোনো প্রকার সন্দেহ থাকতেই পারে না। লোকটা একজন বামহাতিও। আমরাও একজন বামহাতিকেই খুঁজেছিলাম।” 

 

ফেলিন পুলিশ সুপারের সাথে কিছু একটা নিয়ে আলাপ করতে চলে গেল। সেখান থেকে ফিরে উচ্চ রবে ডাকলো আনাকে,

“আনা!”

 

আনা ডাক শুনে দৌড়ে এলো।

 

“সাংবাদিকদের সাথে যোগাযোগ করো। আগামীকাল সকালে তারা যেন একবার থানায় আসে।”

 

__________________

 

অপরাহ্নের দুর্বল আলো ও তার সাথে দুটো প্রজাপতি খোলা জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়েছে। পিছনের জানালাটা দিয়ে ঢুকছে হাওয়ার পাল। জানালার পর্দাটা উড়ছে। টিভি চলছে পরিমিত শব্দে। টিভিতে দেখাচ্ছে আকর্ষণীয় খবর। সেন্ট পিটার্সবার্গের কলপিনো পৌর শহরে দুটো নৃ’শংস খু’নের অপরাধী ধরা পড়েছে। খু’নির নাম পাভেল। বয়স সত্তর পার হয়েছে। কিছুদিন পর তার বিচারের কার্যক্রম শুরু হবে। 

শহরের মানুষ এমন নিউজ দেখার পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। কিন্তু এমন কেউ কেউ আছে যারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করেনি। রোমেরো টিভির দিকে অপলক চেয়ে থেকে বললো,

“তুমি কি আসলেই খু’নি?”

 

কিছুক্ষণ যাবৎ টিভিতে বিভিন্ন নিউজ দেখলো সে। তারপর টিভি বন্ধ করে বাইরে বের হলো। সূর্যের আলো ছুঁয়ে দিলো তাকে। চোখ বুজে এলো আলোর শাণিত আক্রমণে। 

থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট আর সাদা সামার টি-শার্ট গায়ে রোমেরোর। গলায় একটা কী লকেট ঝুলছে। এলাকার রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটা দোকানে এসে ঢুকলো সে। কোল্ড ড্রিংকসের একটা বোতল নিয়ে বেরিয়ে এলো। হাঁটতে হাঁটতে চলে এলো আরও কতকদূর। সামনে চোখ পড়তেই দৃষ্টি আটকালো তার।  

 

“দেখো, তোমার বয়ফ্রেন্ড গতরাতে আমার কাছে ছিল না। আমি নিজের বাড়িতে ছিলাম। তুমি ভুল বুঝছো। আমাদের মাঝে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে, কিন্তু এর বেশি কিছু না। অযথাই ভুল ভাবছো, ভুল বুঝছো।”

 

ভেরা কুটিল হেসে বললো,

“আমি তোমাকেও চিনি আর মাকারকেও ভালো করে চিনি। ও তো একটা চরিত্রহীন। একটা মেয়ে নিয়ে ও খুশি থাকতে পারে না, অনেকগুলো লাগে। আর তুমি? সেদিনও একটা ছেলেকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে খেতে গেলে। এখন আবার মাকারের সাথে এসব। তারাসের সাথে ব্রেকআপ হয়ে গেছে বলে তুমি একজনের পর একজনকে ধরবে এখন? মাকারকেই পেলে তুমি? আমি নিশ্চিত তোমরা দুজন গতরাতে একসাথে ছিলে।”

 

জেনোভিয়া রেগে গেল ভীষণ,

“না জেনে আজেবাজে মন্তব্য করবে না ভেরা। সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ তুমি। নিজের মুখকে সামলাও। আমি ওর সাথে ছিলাম না, কত বার বলবো এটা? আমি নিজের বাড়িতে ছিলাম, আমার বন্ধু সাবিনার সাথে।”

 

“আমি মোটেই বিশ্বাস করি না এটা। কী ভেবেছো তুমি? আমি অবুঝ? আমি তো তোমাদের লক্ষ করেছি। তোমাদের দুজনের মাঝে স্বাভাবিক কিছু চলছিল না। তোমরা একে অপরের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছিলে। আর এখন তো…”

পুরো কথা শেষ করলো না ভেরা। ঘৃণায় মুখ বিকৃত করলো। 

দ্বন্দ্ব লেগে গেল দুজনের মাঝে। ভেরার দৃঢ় বিশ্বাস তার প্রেমিক মাকার আর জেনোভিয়া গতরাতে একসাথে ছিল। কিন্তু জেনোভিয়া ছিল না মাকারের সাথে। কিন্তু সে কথা বিশ্বাসই করতে চাইছে না ভেরা। দ্বন্দ্বের এক পর্যায়ে ভেরা জেনোভিয়াকে চ’ড় মা’রতে উদ্যত হলো। কিন্তু মারার আগেই পিছন থেকে ওর হাতটা ধরে ফেললো কেউ। ভেরা আর জেনোভিয়া দুজনই অবাক হয়ে তাকালো। 

রোমেরোকে দেখতে পেয়ে আরও অবাক হলো জেনোভিয়া। 

ভেরার হাত ছেড়ে দিলো রোমেরো। এত জোরে হাতটা চেপে ধ’রেছিল যে ব্যথায় অন্য হাত দিয়ে হাতটা চেপে ধরলো ভেরা। রোমেরোর উপর অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো,

“তুমি কে?”

 

রোমেরো জেনোভিয়ার পাশে এসে দাঁড়ালো। বললো,

“গতরাতে ও তোমার বয়ফ্রেন্ডের সাথে ছিল না। এটা হওয়া অসম্ভব। কারণ, গতরাতে আমরা দুজন ছিলাম একসাথে। আমি ওর নিউ বয়ফ্রেন্ড।”

 

জেনোভিয়া বিস্মিত আঁখি জোড়া মেলে চেয়ে রইল। বলছে কী ছেলেটা?

 

ভেরা বেক্কল বনে গেল। 

“ওর নিউ বয়ফ্রেন্ড তুমি? আসলেই তোমার সাথেই ছিল ও?” ভ্রু কুঁচকে অবাক কণ্ঠে বললো সে। 

 

“কেন? তোমার সন্দেহ হয়?” ভেরার দিকে এক পা এগিয়ে এলো রোমেরো, “তাড়াতাড়ি চলে যাও এখান থেকে। নয়তো মিথ্যা দোষারোপ করার দায়ে তোমার নামে থানায় মামলা দায়ের করতে যাব।”

 

ভেরা ভয় পেয়ে গেল। সে সত্যিই ভেবেছিল জেনোভিয়া মাকারের সাথে ছিল গতরাতে। কিন্তু এই ছেলেটা এসে তো কাহিনি পুরো উলটো করে দিলো। ভেরা আর দাঁড়িয়ে না থেকে দ্রুত পায়ে প্রস্থান করলো। 

রোমেরো তাকালো জেনোভিয়ার দিকে। দেখলো জেনোভিয়া কেমন করে যেন তার দিকে তাকিয়ে আছে। 

 

“কী?” জানতে চাইলো রোমেরো।

 

“মিথ্যা বললে কেন? আমি তোমার সাথে ছিলাম গতরাতে? তুমি আমার নিউ বয়ফ্রেন্ড?”

 

“তোমাকে বাঁচানোর জন্যই তো বললাম।”

 

“আমি নিজেকে নিজে রক্ষা করতে পারি। কারো দরকার নেই আমাকে রক্ষা করতে আসার। ভুল ও ছিল, আমি না।”

 

“আমি ওর হাতটা না ধরলে এতক্ষণে তোমার গালটা লাল হয়ে যেত।” 

 

“হতো না। কারণ ওর হাতটা আমার গালে এসে লাগার আগেই হা’তটা ভে’ঙে গুঁড়িয়ে দিতাম আমি। এমনিতেই ওকে খুব করে মা’রতে ইচ্ছা করছিল। সুযোগও ছিল মা’রার। তুমি এসে সুযোগটা নষ্ট করে দিলে!”

অসন্তুষ্ট গলায় কথাগুলো বলে হাঁটতে আরম্ভ করলো জেনোভিয়া। 

 

রোমেরো মনে মনে বললো,

‘সাংঘাতিক মেয়ে!’

পরিশেষে সেও হাঁটতে শুরু করলো। 

থেমে গেল জেনোভিয়া। পিছনে রোমেরোও থেমে গেল। সহসা পিছন ফিরে তাকালো জেনোভিয়া। রোমেরো হকচকিয়ে গেল।

 

“আমার পিছন পিছন আসছো কেন?” বললো জেনোভিয়া।

 

“তোমার জন্য কি আমি হাঁটতেও পারবো না?”

 

জেনোভিয়া চোখ সরিয়ে আনলো। হেঁটে গেল কয়েক পা। রোমেরোও হাঁটতে শুরু করেছিল, জেনোভিয়া থামায় সেও থামলো আবারও। জেনোভিয়া এবার রোমেরোর দিকে এগিয়ে এলো। রোমেরোর পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললো,

“একসাথে যাওয়া যাক।”

 

রোমেরো হাঁ হয়ে তাকিয়ে রইল। 

 

জেনোভিয়া বললো,

“কী হয়েছে?” 

 

“ভাবছি।”

 

“কী?”

 

“তোমার সাথে যাওয়া উচিত হবে কি না।”

 

“ঠিক আছে আমার সাথে এসো না।”

বলে হাঁটতে লাগলো জেনোভিয়া। 

রোমেরো দৌড়ে এসে সঙ্গ নিলো। ওরা একইসাথে পাশাপাশি এগিয়ে চললো সামনে। পিছনে পড়ে রইল ওদের অতিক্রম করে যাওয়া পথটুকু। 

 

“আমরা কি বন্ধু হচ্ছি?” বললো রোমেরো।

 

______________

 

সারা পথে ভয় করেনি জেনোভিয়ার। কিন্তু বাস থেকে নামার একটু পরই তার ভয় করতে শুরু করেছে। আজ যেন এলাকাটা বেশিই নিঝুম হয়ে গেছে। মানুষজন চলাচল করছে না তেমন। জেনোভিয়ার মনে পড়লো আজ রাতে কনসার্ট হচ্ছে পার্কের পাশে। এমনকি সেখানের মৃদু শব্দও ভেসে আসছে কানে। হয়তো সবাই কনসার্টের ওখানে জড়ো হয়েছে। তাই রাস্তায় তেমন চলাচল নেই কারো।  জেনোভিয়ার হৃৎপিণ্ডটা লাফাচ্ছে। তার যেমনটা অনুভব হচ্ছে তাতে সে প্রচণ্ড ভীত। এমন অনুভূতি আর কখনো হয়নি এর আগে। কিন্তু আজ হচ্ছে। মনে হচ্ছে সে একা নয়, পিছনে রয়েছে আরও একজন মানব। তাকেই অনুসরণ করছে। আচমকা পিছনে একটি শব্দ হলো। সঙ্গে সঙ্গে পা দু খানি থেমে গেল জেনোভিয়ার। পিছনে তাকালো, কিন্তু চোখে পড়লো না কাউকেই। কেউ নেই। জেনোভিয়ার ভীত মনোবল তবু সাহস খুঁজে পেল না। তার বার বার মনে হচ্ছে কেউ আছে। শব্দটা হলো কীসের? ঝাপসা আলো-আঁধারে আশপাশ দেখে নিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলো জেনোভিয়া। পিছনে এবার জোরে একটা শব্দ হলো। কেঁপে উঠলো জেনোভিয়ার শরীর, থেমে গেল পায়ের চলন। এবার আর পিছন ঘুরলো না সে। একটা দৌড় কি দেবে? না দৌড়াবে না, কিন্তু তাকে দ্রুত যেতে হবে। জেনোভিয়া যত দ্রুত সম্ভব পা ফেলতে লাগলো। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারলো না এরকম ভাবে হেঁটে। কিছুদূর হাঁটার পরই থেমে গেল। শরীর যেন হঠাৎই দুর্বল হয়ে এসেছে। এটা ভয়ের ফল। জেনোভিয়া স্পষ্ট অনুভব করতে পারলো সে থামার সাথে সাথে পিছনেও এক জোড়া চরণ থেমে গেছে। আর চরণ জোড়া তার থেকে বেশি দূরে নয়, তার খুব কাছে। জেনোভিয়ার মনে হচ্ছে এটা সেই লোক। কিন্তু সে তো শুনেছে ধরা পড়েছে লোকটা। নিজ থেকে গিয়ে ধরা দিয়েছে। তাহলে তার পিছনে কে? অন্য কেউ? না কি আসল লোকটা ধরা পড়েনি? আতঙ্কে সাদা হয়ে যায় জেনোভিয়ার মুখ। চোখ বিস্ফোরিত। লোকটা তার খুব কাছেই দাঁড়িয়ে আছে। লোকটার উষ্ণ নিঃশ্বাস এসে লাগছে ঘাড়ে। ভয়, তবুও লোকটাকে দেখার তিয়াস অধীর। ধীরে ধীরে পিছন ফিরে তাকায় জেনোভিয়া। 

 

(চলবে)

 

 রঙিলা রাতের কালো অশ্রু (১৬)

লেখা: ইফরাত মিলি

___________________

 

প্রথম ক্ষণটায় হৃৎপিণ্ড গলার কাছে উঠে আসে জেনোভিয়ার। ভয়ের অসুর হাত খা’বলে ধরে তার নরম হৃৎপিণ্ড। কিন্তু সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো, যখন দেখলো পিছনের এই মানব তার পরিচিতজন। হাত-পা ক্লান্তিতে ভেঙে আসতে চাইছে এখন। জেনোভিয়া বুকের উপর এক হাত রেখে সামান্য ঝুঁকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো।

 

“এরকম করছো কেন?” বললো রোমেরো।

 

জেনোভিয়া চোখ তুলে চাইলো। দু চোখ রোষপূর্ণ। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আক্রোশে দুই হাত দিয়ে মৃদু ধাক্কা মা’রলো রোমেরোর বুকে।

“দিইয়াভল মালচিক!” রাগে শব্দ দুটো ওষ্ঠ বিগলিত হয়ে বেরিয়ে গেল, “আমাকে মা’রতে চাইছিলে?”

 

“কী আশ্চর্য! মা’রতে চাইবো কেন তোমাকে? এমন জঘন্য চিন্তা আমি আমার মস্তিষ্কে আনতে পারি না।”

 

“আমার পিছন পিছন আসছিলে কেন?”

 

“তোমাকে সুরক্ষা দিচ্ছিলাম, যাতে পথেঘাটে কোনো বিপদ না হয়।”

 

“আর একটু হলেই আমি প্রায় চিৎকার করে ফেলছিলাম। খুব ভয় পেয়েছি। আমি তো ভেবেছিলাম…” পুরো কথা শেষ করলো না জেনোভিয়া। আবারও স্বস্তি মূলক নিঃশ্বাস ফেললো।

জেনোভিয়া কথা শেষ না করলেও রোমেরো বুঝতে পারলো জেনোভিয়া কী বলতে চাইছিল। ও বললো,

“সিরিয়াসলি? ভেবেছিলে তোমার পিছনে সেই ভয়ংকর খু’নিটা আছে? তুমি কি নিউজ দেখোনি? সে তো ধরা দিয়েছে।”

 

“তোমার চেয়ে বেশি খবরাখবর রাখি আমি।”

বলে হাঁটতে শুরু করলো জেনোভিয়া। আসলেই সে ভীষণ ভয় পেয়েছিল। ভালো যে এটা রোমেরো ছিল। 

 

আসার পথে রোমেরো নানান কথা বললেও জেনোভিয়া আর নিজের ওষ্ঠাধার পৃথক করলো না একবারের জন্যও। 

বাড়ি পৌঁছে প্রথমেই শাওয়ার নিলো সে। বাড়িতে আজ সে একা। একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য ডাক পড়ায় সাবিনা চলে গেছে দুপুরে। আসবে আবার কয়েকদিন পর। প্রতি গ্রীষ্মেই সাবিনা আসে তার বাড়িতে। অনেকদিন একসাথে কাটায় তারা। তখন একাকীত্ব বোধটা তাকে ছেড়ে পালায়। তারাস, সাবিনা আর জুরা, এরাই জেনোভিয়ার সমস্ত ভালোবাসা জুড়ে আছে। আর আছেই বা কে তার? যাকে ভালোবাসবে?

 

ঘরের বাইরে আউটডোর সিঁড়িতে এসে বসেছে জেনোভিয়া। তার সাথে আছে জুরা। মনিবের উষ্ণ কোলে আরামে বসে আছে। জেনোভিয়ার দৃষ্টি শূন্য। সে অন্যমনস্ক। এনার্জি ড্রিংকসের বোতলে চুমুক দিচ্ছে একটু পর পর। আর মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। কেউ একজন বসলো তার পাশে। অনুভব করতে পারলো জেনোভিয়া। কিন্তু তাকালো না। না তাকিয়েই যখন বুঝতে পারছে কে এসেছে তখন শুধু শুধু তাকিয়ে লাভ কী? কোনো লাভ নেই। যে কাজে লাভ হয় না সে কাজ করলো না জেনোভিয়া। 

আগন্তুক চুমুক দিয়েছে তার ভদকার বোতলে। এটাও না তাকিয়েই বুঝতে পারলো জেনোভিয়া। আগন্তুক আর সে দুজনেই ক্ষণকাল সময় বসে রইল চুপচাপ। চারিপাশ এত নিস্তব্ধ যে এই নিস্তব্ধ ভঙ্গ করাও যেন অন্যায় হবে। কিন্তু আগন্তুক সেই অন্যায়টা করেই ফেললো,

“তোমার কি মন খারাপ?”

 

‘আমার মন কি খারাপ?’ নিজের মনকে নিজে প্রশ্ন করে জেনোভিয়া। মনে হয় তার মন খারাপ নয়, আবার মনে হয় তার মন খারাপ। মাঝে মাঝে জেনোভিয়ার মনে হয় তার বিষণ্ণতার রোগ আছে। কিন্তু একটু পরই লক্ষ করে সে তো সুস্থ।

 

“মন খারাপ নয়। আমি ভালো আছি।” প্রশ্নের উত্তর দিয়ে অলস ভঙ্গিতে বোতলে চুমুক দিলো জেনোভিয়া। তার দৃষ্টি অন্যত্র, আর আগন্তুকের গভীর দৃষ্টিজোড়া তার উপর স্থির। কী কোমল ওই চোখের চাহনি! কত মায়াশীল! রোমেরো ভাবছে, কেন এই মুখটা কিছুটা ওই মুখটার মতো দেখতে? কেন হৃদয়ের অনুভূতি পুরোনো দিনের মতো করছে? সে তাকিয়ে রয় অপলক। কিন্তু মেয়েটা একবারও তাকায় না। ও উদাসীন বসে আছে। 

রোমেরো পকেট থেকে একটা হেয়ার ব্যান্ড বের করলো। কিছু না বলে, অনুমতি না নিয়েই হাত বাড়ালো জেনোভিয়ার সোনালি চুলে। বেঁধে দিতে লাগলো খোলা চুল।

 

“আরে, কী করছো?” অকস্মাৎ রোমেরোর কাজে চমকে যায় জেনোভিয়া, “আমার চুল স্পর্শ করেছো কেন?”

 

চুল বাঁধা হয়ে গেলে হাত নামিয়ে আনলো রোমেরো। জেনোভিয়ার বিস্ময়ান্বিত চোখের দিকে চেয়ে বললো,

“এটা আমি ওর জন্য কিনেছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য, এটা ওকে দেওয়ার আগেই ও হারিয়ে গেল।” 

রোমেরো হাসলো। কষ্টের নীর এসে ভিড় করলো দুচোখে। এতই টলমলে ভাব যে গড়িয়েও পড়লো তা। অন্যদিকে চোখ সরিয়ে নিয়ে চোখ মুছলো সে। তারপর বললো,

“ওকে দেওয়ার ভাগ্য হয়নি বলে তোমাকে দিচ্ছি। তোমরা দুজন এক না হও, দেখতে তো কিছুটা এক।”

 

রোমেরো এ কথা বলার পর চুপ হয়ে গেল। কথা বললো না অনেক সময়। 

জেনোভিয়া শুধু তাকিয়ে রইল ওর দিকে। তার এখন কী বলা উচিত রোমেরোকে? এভাবে কাঁদতে দেখবে রোমেরোকে এটা একদমই আশা করেনি সে।

 

“হারিয়ে গেছে মানে?” জানতে চাইলো জেনোভিয়া, “কীভাবে হারিয়ে গেছে?”

 

“জানি না। একদিন রাতে ও বাড়িতে ফিরলো না। আমি সারারাত ওর ফেরার অপেক্ষা করলাম। কিন্তু ও ফিরলো না। শুধু ওই রাতেই নয়, ও আর কখনোই ফিরলো না। না রাতে, না দিনে।”

 

“ও কি মারা গেছে?”

 

“যখন ওই রাতে ও ফিরলো না, ওকে ফোনেও পেলাম না, পরদিন পরিচিত স্থান গুলোয় গিয়েও যখন ওর খোঁজ পেলাম না তখন আমি পুলিশ স্টেশনে ছুটে গেলাম। মিসিং রিপোর্ট করলাম। পুলিশ তদন্ত করলো, কিন্তু ওর কোনো খোঁজই পাওয়া গেল না। পুলিশ ওকে মৃ’ত ভেবে নিলো। আমিও তাই ভাবলাম। আর কী-ই বা ভাববো? ও নিজের মৃ’ত্যুর আগ পর্যন্ত আমার সাথে থাকার অঙ্গীকার করেছিল। যদি মারাই না যাবে তাহলে ও আমার সাথে নেই কেন? ও বেঁচে থাকলে ও এখন আমার পাশে বসা থাকতো। ওর আঙুলগুলো আমার আঙুলের মাঝে থাকতো। ওর মাথা আমার কাঁধে…” বলতে বলতে কণ্ঠ হঠাৎ থেমে গেল রোমেরোর। দুটো ভারী উষ্ণ স্রোত নেমে গেল গাল বেয়ে।

 

জেনোভিয়ার চোখও কখন যে ভারী হয়ে উঠলো জলে তা টের পেল না সে। বুকের ভিতর তিরতির করে কাঁপতে লাগলো একটা সূক্ষ্ম কষ্টের রেখা। মন খারাপের ছাপ পড়েছে তার সারা মুখে।

“এটা ভীষণ দুঃখজনক!” বললো জেনোভিয়া, “আমি স্যরি।”

একটু পর আবার বললো,

“ও কি তোমার স্ত্রী ছিল?”

 

রোমেরো হাসলো একটু,

“স্ত্রী নয়, তবে হওয়ার কথা ছিল। দেড় মাস পর বিয়ে হওয়ার কথা ছিল আমাদের। তুমি জানো আমার কোনো গার্লফ্রেন্ডই আমার সাথে এক-দুই মাসের বেশি থাকেনি। এক-দুই মাস পরেই আমার প্রতি তাদের অনীহা চলে আসতো। কিন্তু ও ভিন্ন ছিল। ও সবচেয়ে দীর্ঘ সময় থেকেছে আমার সাথে। আমাদের সম্পর্কের পাঁচ মাস চলছিল তখন। আর এই পাঁচ মাসেই আমরা বিয়ের সিদ্ধান্ত পর্যন্ত নিয়ে ফেলেছিলাম।” বলতে বলতে আবার কেঁদে ফেললো রোমেরো, “আমার জীবনে আসলে সুখ নামক জিনিসটা কখনও দীর্ঘস্থায়ী হয় না। আমি আমার জীবনে খুব একা। ঘরের বাইরে যেমন আমার কোনো সঙ্গী নেই, তেমনি ঘরের ভিতরেও আমি সঙ্গীহীন!” কথাটা বলার পর রোমেরো থেমে রইল কীয়ৎক্ষণ। হঠাৎই আবার কী মনে করে তাকালো জেনোভিয়ার দিকে।

“তুমি কি আমার সঙ্গী হবে জেনোভিয়া? ঘরের বাইরের এবং আমার ঘরেরও?”

 

রোমেরোর কথায় জেনোভিয়ার হৃৎপিণ্ড ধক করে উঠলো। নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল সে। বিস্ফোরিত চোখে চেয়ে রইল রোমেরোর দিকে। অপলক দৃষ্টি! না, বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলো না সে। রোমেরোর চোখে এত গভীরতা, এত কাতরতা যে ওর দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। জেনোভিয়া জুরাকে নিয়ে দ্রুত ঘরে চলে এলো। দরজা বন্ধ করতেই জোরে জোরে লাফাতে শুরু করলো হৃৎপিণ্ডটা। হাত-পা কাঁপতে লাগলো। এটা কী হচ্ছে তার সাথে? জেনোভিয়া বুকের উপরে থাকা টি-শার্টের আবরণ এক হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো। সামান্য একটা কথায় তার বুকের মধ্যিখানটা এরকম করবে কেন? সে চোখ বুজে ফেললো। তারাসকে স্মরণ করার চেষ্টা করছে। হ্যাঁ, এই তো। এই তো তার মানসপটে একটা সুদর্শন মুখ ভেসে উঠেছে। এই মানুষটাকে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। তারাস! তার ভালোবাসা!

অসহ্য একটা ছটফটানির সৃষ্টি হলো অন্তঃকরণে। সে দাঁড়িয়ে শান্তি পেল না, বসে শান্তি পেল না, শুয়ে শান্তি পেল না। তারাসকে এই মুহূর্তে একবার দেখা অতীব জরুরি। জেনোভিয়া জুরাকে ঘরে রেখে বেরিয়ে পড়লো দরজা লক করে। 

ভাগ্য আজ যেন অনেক ভালো আচরণ করলো তার সাথে। একটা ট্যাক্সি পেয়ে গেল সহজেই। ট্যাক্সিতে উঠে লিওনিদকে কল করলো। কলটা রিসিভ হলো বেশ সময় নিয়ে। অতঃপর ওপাশ থেকে লিওনিদের ঘুমু ঘুমু কণ্ঠস্বর শুনতে পেল,

“হ্যালো!”

 

“তারাস কি এখন থানায় আছে?”

 

“জেনোভিয়া? না ও থানায় নেই। আমি আর ও এখন যে যার বাড়িতে আছি।”

 

“ঠিক আছে, ধন্যবাদ আপনাকে।” বলেই কল কেটে দিলো জেনোভিয়া। 

কোনো এক ঘূর্ণিঝড় যেন শুরু হয়েই থেমে গেল এমন মনে হলো লিওনিদের।

 

তারাসের বাড়িতে চলে এলো জেনোভিয়া। দরজা ধাক্কাধাক্কি করলো না। যদি তারাস এখন ঘুমিয়ে থাকে তাহলে? সে তারাসের ঘুম ভেঙে দিতে চায় না। চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঘরে ঢুকলো শব্দহীন পায়ে। ঘরের লাইটগুলো জ্বলছে। তার মানে কি জেগে আছে তারাস? অবশ্য ও ঘুমিয়ে গেলেও লাইটগুলো জ্বালিয়েই রাখে। 

বেডরুমে গিয়ে ঢুকলো জেনোভিয়া। তারাস নিজের বিছানায় আছে এখন, ঘুমাচ্ছে। সে তারাসের কাছে এসে বসলো। তাকিয়ে রইল ঘুমন্ত তারাসের দিকে। তারপর তারাসের পাশে যে একটুখানি জায়গা অবশিষ্ট ছিল শুয়ে পড়লো সেখানে। আজ রাতে বাড়ি ফিরবে না সে।

 

__________________

 

ঘুম ভাঙার পর তারাস আবিষ্কার করলো তার পাশে একটা মেয়ে শুয়ে আছে। শুধু শুয়ে নয়, ঘুমিয়ে আছে। মেয়েটা জেনোভিয়া। আর সে জেনোভিয়াকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। প্রথমে ভাবলো এটা নিছকই স্বপ্ন। কিন্তু যখন বুঝতে পারলো সে জাগ্রত এবং এটা বাস্তব, সে ধরফড়িয়ে উঠে বসলো। এমনভাবে উঠলো যে সে ওঠার কারণে জেনোভিয়া খাট থেকে পড়ে গেল ফ্লোরে। ফ্লোরে পড়ে গিয়ে ঘুম ভাঙলো জেনোভিয়ার। ব্যথায় আর্তনাদ করলো সে।

 

“তু…তুমি এখানে কেন? তোমার সাহস তো কম নয় আমার পাশে শুয়ে ছিলে! তুমি আবার চোরের মতো ঢুকেছো আমার বাড়িতে!”

 

জেনোভিয়া উঠে বসলো।

 

তারাস বললো,

“যার সাথে আমার ব্রেকআপ হয়ে গেছে সেই মেয়ের পাশে শুয়েই আজ সারারাত ঘুমিয়েছিলাম আমি? ছি ছি এই কথা যদি আমার বন্ধুরা জেনে যায় কী হবে তাহলে?”

তারাস অগ্নি দৃষ্টি ফেললো জেনোভিয়ার উপর, “তুমি কী বলো তো? তোমাকে কত বার বলেছি যে আমার থেকে দূরে থাকো। কথা শোনো না কেন তুমি?” 

 

তারাস নামলো বেড থেকে। জেনোভিয়ার কাছে এসে বললো,

“চাবি দাও। এক্ষুনি আমার ঘরের চাবি দিয়ে দাও আমাকে।”

 

“উহুঁ দেবো না।”

 

“দেবে না মানে?” চোখ গরম করলো তারাস, “এক্ষুনি দাও।”

 

“না।”

 

জেনোভিয়া চাবি দিতে অস্বীকৃতি জানালে তারাস জোর করে জেনোভিয়ার কাছ থেকে চাবি কেড়ে আনলো। মেয়েটার কাছে তার ঘরের চাবি আছে বলে যাচ্ছেতাই করবে মেয়েটা? না, একদম মানা যায় না এমন জুলুম। উচিত ছিল ব্রেকআপের সাথে সাথে চাবি নিয়ে নেওয়া।

 

“আর কখনও যদি এমন করেছো তাহলে আমি তোমাকে গ্রেফতার করতে বাধ্য হবো।” জেনোভিয়াকে শাসালো তারাস, “অনেক বুঝিয়েছি ভালোয় ভালোয়, কিন্তু   তুমি তো যতক্ষণে আইনের আওতায় না আসবে ততক্ষণে শুধরাবে না।”

হঠাৎ মনে পড়েছে এমন ভঙ্গিতে বললো,

“ও ভালো কথা, তোমাকে না বলেছি রাতের বেলা বাইরে ঘুরঘুর করবে না? তারপরেও কাল এত রাতে বেরিয়েছো? কোন সাহসে একা একা এখানে এসেছো? বড্ড বেশি ঘোরাঘুরি করছো তুমি। না আসলেই তোমাকে যত দ্রুত সম্ভব জেলে ঢুকানোর ব্যবস্থা করতে হবে।”

 

“অসম্ভব, আমি কিছুতেই জেলে গিয়ে থাকতে পারবো না।”

 

“তুমি তো থাকবেই, সাথে তোমার মাথার শয়তান পোকাটাও থাকবে। আর তুমি এসেছো কেন? সাহসই বা হলো কী করে আমার পাশে শুয়ে ঘুমানোর? আবার ঘুমের মাঝে আমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়েছিলে। কত নির্লজ্জ তুমি! আমাদের ব্রেকআপ হয়ে গেছে সেটা কেন ভুলে যাও?”

 

“আমি জড়িয়ে ধরে শুয়েছিলাম তোমায়?” অবাক হয়ে বললো জেনোভিয়া।

 

“নয়তো কি আমি?” 

কাজটা নিজে করেও গলায় এত বিকট জোর রাখলো তারাস তাতে মনে হলো সত্যিই সে নয়, জেনোভিয়া তাকে জড়িয়ে ধরে শুয়েছিল। তারাস আর কিছু না বলে ওয়াশরুমে ঢুকলো। মেয়েটা কেন করলো এরকম? বাড়িতে ঢুকেছে চোরের মতো সেটা সে মেনে নিয়েছে, কিন্তু তার পাশেই কেন ঘুমিয়ে পড়তে হবে? ওর যদি এতই ঘুমানোর জায়গার অভাব পড়ে তাহলে অন্য বেডরুমটায় গিয়ে ঘুমাতো। সে কি নিষেধ করতো? কিন্তু জেনোভিয়া যেটা করেছে একদম মানতে পারছে না।

 

ভেবেছিল ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে দেখবে জেনোভিয়া চলে গেছে। কিন্তু কিচেনে এসে দেখলো জেনোভিয়া পেলমেনি বানানোর বন্দোবস্ত করছে। একটি পাত্রে ময়দা, ডিম, লবণ নিয়ে উষ্ণ গরম পানি দিয়ে মাখছে।

 

“তুমি এখনও যাওনি?”

 

“ভাবলাম যাওয়ার আগে তোমার জন্য ব্রেকফাস্ট তৈরি করে দিয়ে যাই।”

 

তারাস তড়িৎ পায়ে এগিয়ে এলো। জেনোভিয়ার কাছ থেকে ময়দার পাত্রটা কেড়ে এনে বললো,

“আমি নিজের ব্রেকফাস্ট নিজে তৈরি করতে জানি।”

 

বলে সে হাত ধুয়ে ময়দা মাখতে শুরু করলো। জেনোভিয়া হাসছে মিটিমিটি। মানুষটার রাগ যে কৃত্রিম তা সে ভালোই জানে। বললো,

“একসাথে তৈরি করা যাক। যেমনটা আমরা অতীতে করতাম।”

 

“কাজের মাঝে অতীত টানার চেষ্টা করবে না।”

 

“করবো।” বলতে বলতে এক চিমটি শুকনো ময়দা ছিটিয়ে দিলো তারাসের মুখে। 

তারাস রেগে আগুন হয়ে তাকালো।  

এ রাগও কৃত্রিম, ভালো করে জানে জেনোভিয়া। সে মুচকি হেসে অন্যদিকে সরে গেল। অন্য একটি পাত্রে গোরুর মাংসের কিমা, পেঁয়াজ কুচি, লবণ, গোলমরিচের গুঁড়ো, সয়াসস মেখে পুর তৈরি করতে লাগলো।

ময়দা বেলার কাজটা তারাসই করলো। পাতলা করে বেলে গোল আকৃতির কেটে নিয়ে একেকটার মাঝে পুর ভরে পেলমেনি বানিয়ে নিলো কতকগুলো। তারপর চুলোয় ফুটন্ত পানিতে পেলমেনি গুলো দিয়ে সেদ্ধ করে নিলো। 

পরিবেশনের কাজটা করলো জেনোভিয়া। পানি ঝরিয়ে পেলমেনি গুলো প্লেটে তুলে সাওয়ার ক্রিম, পার্সলে কুচি এবং লেবুর রস ছড়িয়ে পরিবেশন করলো সে। 

খেতে বসলো দুজন একসাথে। তারাস 

জেনোভিয়াকে একবারও চলে যেতে বললো না। এমনকি তার মাঝে এখন কৃত্রিম রাগও নেই। 

জেনোভিয়া একটা পেলমেনিতে কামড় দিয়ে বললো,

“বিকেলে পার্কে ঘুরতে গেলে কেমন হয়?”

 

“আমার সময় নেই।”

 

“মিথ্যা কথা। আমি অপেক্ষা করবো তোমার জন্য।”

 

“সে তোমার ইচ্ছা।” কাঁধ ঝাঁকিয়ে এমনভাবে বললো তারাস, যেন সে সত্যিই আসবে না। কিন্তু জেনোভিয়া নিশ্চিত তারাস আসবে। 

 

“জুরাকে রেখে এসেছো কেন?”

 

“জুরা এখন আর তোমাকে পছন্দ করে না। তোমার বাড়িতেও আসতে চায় না। এমনকি আমার আগমনও পছন্দ করে না ও।”

 

“বাহ্, জুরাও ভালোটা বোঝে আর জুরার মনিব কি না বোঝে না?”

 

জেনোভিয়া কিছু না বলে হাসলো শুধু।

_________________

 

জুরা জেনোভিয়ার দরজা খোলারই অপেক্ষায় ছিল। জেনোভিয়া দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতেই জুরা দৌড়ে এলো তার কাছে। জেনোভিয়া ওকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করলো। খাবার খেতে দিলো ওকে। 

 

সদর দরজা খোলা ছিল। সেখান থেকে বেনিমের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো হঠাৎ,

“কারো মৃ’ত্যুর খবর কি পেয়েছো জেনো?”

 

জেনোভিয়া চমকে উঠে তাকালো। বেনিম কখন এসেছে? আর কী বললো ও? মৃ’ত্যুর খবর? জেনোভিয়া অবাক হয়ে বললো,

“কার মৃ’ত্যুর খবর পাবো?”

 

“যাকে মা’রার অদম্য ইচ্ছা তোমার মনে লুকিয়ে ছিল।”

 

(চলবে)

 

 রঙিলা রাতের কালো অশ্রু (১৭)

লেখা: ইফরাত মিলি

___________________

 

থ হয়ে কিছুক্ষণ বেনিমের দিকে তাকিয়ে রইল জেনোভিয়া। তার বুকে বিস্ময়ান্বিত চিন্তার মেঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে। কাকে মা’রার অদম্য ইচ্ছা তার মনে? নিজের মনকে প্রশ্নটার সম্মুখে এনে দাঁড় করালো জেনোভিয়া। আতঙ্ক জড়িত কণ্ঠে বেনিমকে বললো,

“কী বলছো এসব? কাকে মা’রার অদম্য ইচ্ছা আমার মনে?”

 

বেনিম মুচকি হাসলো।

“কথাটা তুমি অস্বীকার করতে পারবে না জেনো। আমি সেই মেয়েটার কথা বলছি। ওর নাম ভেরা। গতরাতে হাইওয়েতে এক্সিডেন্ট হয়েছে। ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু তেরো মিনিট পর মা’রা যায় ও।”

 

জেনোভিয়ার হৃৎপিণ্ড কাঁপলো ঝমঝম করে। দু চোখে প্রতীয়মান হলো বিস্ময়, ত্রাস। ভেরা মারা গেছে? কথাটা যেন বিশ্বাস হতে চায় না জেনোভিয়ার। একদিন আগেও মেয়েটা তার সাথে ঝগড়া করলো, মেয়েটার তখনকার চেহারাখানি এখনও স্পষ্ট মনে আছে তার। এতটুকু সময়ের ব্যবধানে মেয়েটা মা’রা গেল? এক্সিডেন্ট করে? 

 

“তুমি কীভাবে জানলে এত কিছু?” বেনিমকে প্রশ্ন করলো জেনোভিয়া। 

 

“গতরাতে মামার মাইগ্রেনের ব্যথা উঠেছিল। তাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম। তখনই দেখলাম হন্তদন্ত হয়ে একটা মেয়েকে হাসপাতালের ভিতরে ঢুকাচ্ছে নার্সরা। স্বেচ্ছাসেবকদের কাছ থেকে জানতে পারলাম হাইওয়েতে এক্সিডেন্টের ফলে গুরুতর আহত হয়েছে। আর সকালে খবর পেলাম মেয়েটা মা’রা গেছে।” বেনিম বলতে বলতে মুখ আঁধার করে ফেললো, “মেয়েটার জন্য খারাপ লাগছে!”

তারপর হঠাৎ জেনোভিয়ার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,

“তোমার কষ্ট লাগছে জেনো?”

 

জেনোভিয়া কিছু না বলে হতবুদ্ধির মতো তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎই দৌড়ে গেল বেডরুমে। কল দিলো রেস্তোরাঁর একজন সিনিয়র শেফকে। যার সাথে তার ভালো সম্পর্ক রয়েছে। জানতে পারলো ঘটনা আসলেই সত্যি। সত্যিই মা’রা গেছে ভেরা! কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল জেনোভিয়া। ভেরার মুখটা কেবল মনে পড়ছে। কেমন ছিল এক্সিডেন্টের পর ভেরার মুখশ্রী? নিশ্চয়ই র’ক্তে রঞ্জিত ছিল! ভয়ংকর দেখাচ্ছিল ওকে তখন! জেনোভিয়ার শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে। 

 

__________________

 

মেয়েটার কাণ্ডজ্ঞান নেই! এখানে এসে বসে রয়েছে কি এক মিনিট আর দুই মিনিট হয়েছে? পাক্কা দশটা মিনিট কেটে গেছে। আচ্ছা, পার্কে আসার কথা কি সে বলেছিল না কি মেয়েটা বলেছিল? তারাস লক্ষ করছে তার ধৈর্য নামক জিনিসটা একটু একটু করে ভাঙতে ভাঙতে শেষ হওয়ার পথে এখন। না, আর চার মিনিট। আর মাত্র চার মিনিট অপেক্ষা করবে সে, এর মাঝেও যদি মেয়েটা না আসে তাহলে সে সত্যি সত্যি চলে যাবে। 

চার মিনিট অপেক্ষা করতে হলো না, দুই মিনিট বসে থাকার পরই জেনোভিয়ার দেখা মিললো। তারাসের মনে হলো এই দুই মিনিট অপেক্ষা করতেই দুই ঘণ্টা অপেক্ষা পরিমাণ কষ্ট হয়েছে তার। 

 

“সেই তো এলে, তাহলে আসবে না এরকম একটা ভাব কেন করেছিলে?” 

 

জেনোভিয়ার কথা কানে এলেই পাশ ফিরে তাকালো তারাস। চমকে ওঠার ভাণ করে বললো,

“তুমি?” বলেই বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেল সে,

“তুমি এখানে এসেছো কেন? শহরে কি এই একটাই পার্ক?”

 

জেনোভিয়া তর্জনী দিয়ে তারাসের কপালে গুঁতো দিলো। পিছনের দিকে হেলে গেল তারাসের মাথা। 

জেনোভিয়া বললো,

“অভিনয় বন্ধ করো। তুমি কি জানো না, তুমি অভিনয়ে বাজে?” 

 

জেনোভিয়া জুরাকে নিয়ে সামনে হেঁটে গেল। পার্কের বেশ কিছু স্থলে মানুষের অল্প বিচরণ চোখে পড়ছে। লেকের পাড়ে তৈরি মাচায় বসে বড়শি ফেলে মাছ ধরছে দুজন ব্যক্তি। সম্পর্কে দুজন বন্ধু হবে হয়তো, ধারণা করলো জেনোভিয়া। মাচায় উঠে এসেছে সে। তারাসও এসেছে সাথে। তারাস প্রথমেই এগিয়ে গেল মাছ শিকারি মানুষ দুটোর দিকে। সৌজন্যমূলক কিছু বাক্য আদানপ্রদান হলো তাদের মাঝে। জেনোভিয়া একবার ওদের দিকে তাকিয়ে আবার অন্য দিকে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। লেকের পানির রং স্বচ্ছ নীল। গ্রীষ্মের দিন হওয়ায় অনেকেই সাঁতার কাটছে। পার্কে এসে সাঁতার কাটার মাঝে আলাদা আনন্দ আছে। গত বছরেও জেনোভিয়া সাবিনা আর তারাসের সঙ্গে সুইমিং করেছে অনেকবার। এখানে সুইমিং করার পর পোশাক পরিবর্তন করার জন্য কক্ষের ব্যবস্থা রয়েছে। জেনোভিয়া জুরাকে মাচার ছাউনির শক্ত ধাতব খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রেখে মাচার প্রান্ত সীমানায় এসে দাঁড়ালো। তারাসও এসে দাঁড়িয়েছে পাশে। বাতাসে কীসের যেন সুবাস! এটা কি বাতাসে? না কি মন থেকে নির্গত হচ্ছে এই সুগন্ধি? জেনোভিয়া উপলব্ধি করছে, তার ভারাক্রান্ত মন হালকা হয়ে উঠেছে। প্রকৃতি এমন এক ক্ষেত্র যে এটা মানুষের মনঃরূপ পরিবর্তনেও ভূমিকা রাখে। জেনোভিয়া নীল জলের উপর রোদের নৃত্য দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,

“চলো সুইমিং করি।”

 

কথাটা কানে আসা মাত্রই তারাস রগরগে কণ্ঠে বলে উঠলো,

“আমি কি পাগল? তোমার সাথে সাঁতার কাটবো কেন? বাচ্চাদের মতো আবদার করা বন্ধ করো।”

 

তারাস জেনোভিয়াকে উপেক্ষা করে চলে যেতে পা বাড়ালো। কিন্তু কয়েক কদম এগিয়ে এসেই হঠাৎ থেমে গেল তার চরণদ্বয়। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকালো।  জেনোভিয়া মুখ গোমড়া করে একই স্থানে দাঁড়িয়ে আছে। তারাস ওর মুখ দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু জানে জেনোভিয়ার মুখটা এখন গোমড়া হয়ে আছে। হৃদয়ের অদ্ভুত কার্যকলাপের আশঙ্কা উপলব্ধি করছে  তারাস। কিন্তু সে তা বন্ধ করতে ব্যর্থ। বলা ভালো সে বন্ধের চেষ্টা করতেই ব্যর্থ। সে উপেক্ষা করতে পারলো না গোমড়ামুখো মেয়েটিকে। হৃদয়ের অদৃশ্য কোনো শক্তি তাকে জেনোভিয়ার দিকে টেনে নিয়ে গেল। সে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলো জেনোভিয়াকে। 

“চলো সাঁতার কাটি।” বলেই মাচা থেকে লাফ দিলো পানিতে। পানিতে ঝপ করে শব্দ হলো। প্রথমে দুটো শরীরই ডুবে গেল জলের ভিতর। একটু পর আবার জল ফুঁড়ে শরীর দুটো জেগে উঠলো।

জেনোভিয়া হাঁপাচ্ছে। এমন কিছু ঘটার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না। যে কারণে তারাস যখন তাকে নিয়ে লাফিয়ে পড়লো লেকের জলে তখন তার হৃৎপিণ্ডটা গলার কাছে উঠে এসেছিল। আর তাই একটা আতঙ্কিত শব্দ তার গলায়ই আটকা পড়ে রয়।

 

তারাসের মুখে আলতো হাসি। এমন মিষ্টি হাসি বহুদিন পর ওর মুখে দেখতে পাচ্ছে জেনোভিয়া। তারাসের হাসির দিকে তাকিয়ে থেকে সে ধীরে ধীরে ধাতস্থ হয়ে এলো। তার ঠোঁটেও দৃশ্যমান হলো স্নিগ্ধ হাসির উপস্থিতি। ঠোঁটে হাসি, চোখে গভীরতা দুজনারই। দুই জোড়া চোখ প্রায় অনেকটা ক্ষণ মিলিত হয়ে রইল। অতঃপর সহসা দুই হাত দিয়ে তারাসের মাথা কাছে টেনে আনলো জেনোভিয়া। কপালে কপাল মিলিয়ে চোখ বন্ধ করলো। অবসন্ন কণ্ঠে বললো,

“সব অভিনয় বন্ধ করা যাক, হুহ? আমার ভালো লাগে না। সত্যিই ভালো লাগে না এসব! প্লিজ!”

 

__________________

 

নিজস্ব একটা বাড়ি, একটা গাড়ি খুব প্রয়োজন। নিজস্ব বাড়ি থাকলেও জেনোভিয়ার এখন আর কোনো গাড়ি নেই। একটা গাড়ি আসলেই প্রয়োজন তার। আর তাই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে একটা গাড়ি কেনার জন্য সে মাসিক আয় থেকে আলাদা কিছু অর্থ জমাবে। জানে একটা গাড়ি কেনার অর্থ জমাতে তার দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হবে। যত সময়ই লাগুক, চেষ্টা করবে সে। চেষ্টা কখনও বিফলে যায় না। হয়তো যে উদ্দেশ্যে চেষ্টা করা হয় সেটা অর্জিত হয় না কখনো কখনো। কিন্তু চেষ্টার একটা না একটা ফল পাওয়াই যায়। 

চায়ের কাপ নিয়ে সোফায় এসে বসলো জেনোভিয়া। জুরাও লাফ দিয়ে সোফায় উঠে জেনোভিয়ার গা ঘেঁষে বসলো। সাবিনার সাথে ফোনে কথা হলো প্রায় চল্লিশ মিনিটের মতো। একটা বিষয়ও সে বলতে ভুললো না। রোমেরোর কথা, তারাসের কথা, ভেরার কথা, সব জানালো সাবিনাকে। কখনো বিস্ময়, কখনো মিষ্টতা, কখনো দুঃখ প্রকাশ পেল তার কণ্ঠে। কথা তখনও শেষ হয়নি, দরজায় হঠাৎ কারো হস্ত আঘাত শুনতে পেল জেনোভিয়া। সে পরে আবার কল ব্যাক করবে বলে লাইন কেটে দিলো। 

দরজা খোলা মাত্রই আগন্তুক ঢুকে পড়লো ঘরের ভিতর। জেনোভিয়া দেখারও সুযোগ পেল না আগন্তুক কে। আগন্তুককে দেখতে পিছনে তাকালো সে। রোমেরো ততক্ষণে সোফায় বসে পড়েছে। 

 

“তোমার এরকম আচরণ আমি পছন্দ করি না।” খানিক বিরক্ত গলায় বললো জেনোভিয়া, “তুমি কি বন্ধ করতে পারো তোমার এরকম আচরণ?”

 

রোমেরো হাস্য মুখে বললো,

“কিন্তু আমার ভালো লাগে তোমার সাথে এরকম আচরণ করতে। তুমি আমার ঘরের মানুষ। ঘরের মানুষের সাথে যে আচরণ করবো বাইরের মানুষের সাথে কি তা করা যাবে? বাইরের মানুষ কি আর সহ্য করবে যেমন তুমি সহ্য করছো?”

 

“তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে, আমি তোমার ঘরের মানুষ নই।”

 

রোমেরো দুর্বোধ্য হেসে বললো,

“ঠিক তাই, তুমি আমার ঘরের মানুষ নও, তুমি আমার মানুষ।”

 

জেনোভিয়া অসহায় চোখে কিছু সময় চেয়ে রইল। সে বুঝতে পারছে রোমেরোর ব্যাপারটা। রোমেরোর দিকে এগিয়ে এসে বললো,

“দেখো, তারাসের সাথে সবকিছু ঠিক আছে আমার। আমি ওকে ভীষণ ভালোবাসি। আমি একটা মুহূর্ত ওকে ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারি না।”

 

“সেটা তোমার ব্যাপার, এটা আমার সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়।” অত্যন্ত সহজ গলায় বললো রোমেরো। 

আর জেনোভিয়া অবাক হয়ে চেয়ে রইল ওর দিকে। 

চায়ের কাপে চোখ পড়লো রোমেরোর।

“এটা কি আমার জন্য?” চায়ের কাপ উদ্দেশ্য করে বললো জেনোভিয়াকে। 

 

“না, এটা আমার পান করা।”

 

রোমেরো হাসলো,

“তাহলে তো এটা অবশ্যই আমার।”

বলে চায়ের কাপটা হাতে তুলে নিলো। আবারও একবার তাকালো জেনোভিয়ার দিকে। অধর কোণে অদ্ভুত হাসি ঝরে ওর। চুমুক দিলো চায়ের কাপে। চোখ-মুখ খিঁচে ধরলো সাথে সাথে। তারপর চোখ মেলে বললো,

“এত চিনি কেউ দেয় চায়ে?”

 

জেনোভিয়া হতভম্ব হয়ে গেল। রোমেরো এই এঁটো পাত্রের চা খেলো কেন? আর ‘এত চিনি’ মানে? চিনি তো ঠিকঠাকই ছিল। বরং সে স্বাভাবিকের চেয়ে চিনি আরও কিছুটা কম খায়। তাহলে রোমেরো বলছে কী? 

 

“চায়ে সঠিক পরিমাণ চিনিই আছে।” বললো জেনোভিয়া।

 

“তাই?” রোমেরো যেন ভারি অবাক হলো, “তাহলে আমার এমন কেন মনে হচ্ছে যে তুমি পুরো চিনির প্যাকেটই এই এক চায়ের কাপে ব্যবহার করেছো?” 

রোমেরো কয়েক সেকেন্ড অবুঝ বালকের মতো মুখ করে রইল। তারপর সহসা বললো, “হয়তো তোমার ঠোঁট চিনির প্যাকেটের চেয়েও বেশি মিষ্টি।” 

বলতে বলতে ওর ঠোঁটে মিষ্টি হাসি ঝুলে পড়লো। 

 

অন্যদিকে জেনোভিয়ার ভিতরে রাগ, বিরক্তির মিশ্রণ ঘটে অদ্ভুত পরিস্থিতির  সৃষ্টি হলো। আর এক মুহূর্ত সে সহ্য করতে পারছে না রোমেরোর উপস্থিতি। বলে উঠলো,

“তুমি চলে যাও।”

 

রোমেরো সোফা ছেড়ে উঠলো না। তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে রইল। তারপর হঠাৎ এত দ্রুত গতিতে জেনোভিয়ার সামনে এসে দাঁড়ালো যে জেনোভিয়ার হৃৎপিণ্ড আঁতকে উঠলো। সে জেনোভিয়ার চোখে পলকহীন অনমনীয় চোখে চেয়ে থেকে বললো, 

“তোমাকে যতটা সহজ মনে হয় তুমি আসলে ততটাই কঠিন।”

 

জেনোভিয়া নির্বাক বিস্ময়াবিষ্ট চোখে চেয়ে আছে। এই ছেলেটা অদ্ভুত! ভাবলো জেনোভিয়া। এত অদ্ভুত যে এই অদ্ভুত বিষয়টাকে নিয়ে ভাবাও যায় না। ছেলেটা কী বলতে কী বলে, কী করতে কী করে, কী ভাবতে কী ভাবে, বুঝে ওঠা যায় না। 

রোমেরো চলে যেতে নিয়েও দরজার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো আবার। কণ্ঠটা আগের তুলনায় ছোটো করে বললো,

“ওহ, যা বলতে এসেছিলাম সেটাই তো বলা হয়নি। শুনেছি ভেরা নামের একটা মেয়ে এক্সিডেন্টে মা’রা গেছে। এটা তো সেই মেয়েটা, যেই মেয়েটা তোমাকে চ’ড় মা’রতে চেয়েছিল, না?”

 

জেনোভিয়ার ভিতরকার পরিস্থিতি রূপ পরিবর্তন করলো। তার মস্তিষ্ক জুড়ে আবারও ভেসে উঠলো ভেরার মৃ’ত্যুর ঘটনা। রোমেরো ভেরার মৃত্যুর ব্যাপারে কী বলতে চায়? কিছু প্রশ্ন, কিছু কৌতূহল, কিছু বিস্ময়, উঁকি দিলো জেনোভিয়ার হৃৎগগনে।

 

“পুলিশ বলছে এটা একটা স্বাভাবিক এক্সিডেন্ট।” রোমেরোর কণ্ঠ শোনা গেল ফের, “বলছে একটা ট্রাক ভেরার গাড়িকে ধাক্কা মে’রেছে। আর এখন সেই ট্রাকটি নিখোঁজ। পুলিশ ভাবছে ভয় পেয়ে ট্রাকের ড্রাইভার ট্রাক নিয়ে পালিয়ে গেছে। ধাক্কাটা না কি ইচ্ছাকৃত ছিল না, দুর্ঘটনাবশত হয়েছে। কিন্তু আসলেই কি তাই?” গাঢ় প্রশ্নবিদ্ধ কণ্ঠ রোমেরোর, “আমার একদমই মনে হচ্ছে না ট্রাক চালক ভুল করে ধা’ক্কা মে’রেছে ভেরার গাড়িতে। আর আমার এটা মনে হচ্ছে যে, ওই ট্রাকের ড্রাইভার…” বলতে গিয়ে হঠাৎ থামলো রোমেরো। 

 

জেনোভিয়ার ভিতরটা উত্তেজক হয়ে উঠেছে। অবাধ কৌতূহলের ঢেউ উথলে উঠছে তার বক্ষ তীরে। 

রোমেরো জেনোভিয়ার উত্তেজিত, কৌতূহলী দৃষ্টি জোড়ায় তাকিয়ে মনে মনে কুটিল হাসে। তারপর শীতল গলায় বললো,

“ওই ট্রাকের ড্রাইভার তুমি ছিলে, তাই না জেনোভিয়া?”

 

(চলবে)

 

 রঙিলা রাতের কালো অশ্রু (১৮)

লেখা: ইফরাত মিলি

___________________

 

জেনোভিয়ার কর্ণদ্বয় বজ্রাহত হলো। পাথরের মতো রুক্ষ ও শীতল হয়ে এলো শরীর। হৃৎপিণ্ডে চললো একটানা আতঙ্কের লাফালাফি। রোমেরোর কথাটা বুঝে উঠতে তার সময় লাগেনি, কিন্তু ওর কথাটা ধারণ করতে বড্ড সময় ও শ্রম লাগছে। রোমেরো কি তাকে সন্দেহ করছে? বক্ষ সুতোয় টান পড়ে জেনোভিয়ার, হাঁসফাঁস করে ওঠে সে। স্বর বেরোতে চায় না গলা দিয়ে, তবু সে শব্দগুচ্ছকে অতি কষ্টে কণ্ঠ নিঃসৃত করলো,

“তুমি কী বলার চেষ্টা করছো? ভেরার মৃ’ত্যুটা স্বাভাবিক নয়? ওকে আমি মে’রেছি? তুমি কি এটাই ভাবছো?”

 

রোমেরো চোখের পলক ফেলে না, চেয়ে রয় কিছু কাল। অতঃপর প্রগাঢ় কণ্ঠে বললো,

“মানুষ কোনো কিছু ভালো বুঝতে পারে কখন জানো? যখন ওটা সম্পর্কে সে আগে থেকেই অবগত থাকে। তুমিও কি তাই? আগে থেকেই সব জানতে? এজন্যই এত তাড়াতাড়ি সব বুঝে গিয়েছো?” 

 

রোমেরো সত্যিই সন্দেহ করছে! জেনোভিয়া অসহনীয় যন্ত্রণায় পিষ্ট হতে লাগলো অভ্যন্তরে। সন্দেহ অত্যন্ত খারাপ জিনিস! সন্দেহ প্রকৃত অপরাধীর জীবন নাশ করে, আর যে অপরাধ করেনি তাকেও ছাড় দেয় না। জেনোভিয়া বললো,

“তুমি আমাকে সন্দেহ করছো! কিন্তু এটা ঠিক না। আমার মনে হয় না আমি এই সন্দেহের তালিকায় থাকতে পারি। আমি কাউকে মে’রে ফেলার কথা কীভাবে চিন্তা করতে পারি? অসম্ভব এটা। কাউকে মে’রে ফেলা তো দূর, আমি কাউকে মে’রে ফেলার চিন্তাও করিনি কোনোদিন। এই জঘন্য কাজ আমি কখনও করতে পারি না।” 

 

“গতরাতে আমি তোমাকে বাইরে বের হতে দেখেছিলাম। ভেরার মৃত্যুর সময়ের সাথে তোমার বাইরে বের হওয়ার সময়ের অনেকটাই মিল।”

 

“গতরাতে আমি আমার প্রেমিকের বাসায় গিয়েছিলাম। আমি ওখানে ছিলাম রাতে।” 

 

“মানছি তুমি ওখানে ছিলে। কিন্তু এমনও তো হতে পারে যে, তুমি ভেরার গাড়িকে ধা’ক্কা দেওয়ার পর তোমার প্রেমিকের বাড়িতে গিয়েছিলে।”

 

“আশ্চর্য! কীসব বাজে বকছো তুমি! আমি ভেরাকে কেন মা’রতে যাব?”

 

“সেটা তো তুমি ভালোভাবেই জানো জেনোভিয়া। ভেরা ওর প্রেমিককে জড়িয়ে তোমাকে বাজে ভাবে অপবাদ দিয়েছিল। তোমাকে মা’রতে পর্যন্ত নিয়েছিল। তুমি অপমান, রাগ, ঘৃণায় ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছিলে ওর প্রতি। সেই রাগ, ঘৃণার বশেই হয়তো করেছো এটা।”

 

কণ্ঠের শেষ জোর টুকুও কেঁড়ে নিলো রোমেরো। নেতিয়ে পড়লো জেনোভিয়া, ঠিক যেমন উদ্ভিদপত্র নুয়ে পড়ে কিংবা ভেঙে যায় পরিবেশ প্রতিকূলের চাপে। রোমেরো তাকে এভাবে সন্দেহ করছে? ওই সামান্য একটুখানি ঝগড়াঝাঁটির জন্য সে কারো প্রাণ কে’ড়ে নেবে এমন পাশবিক নয় তার মন। কিছু না করা সত্ত্বেও কেন সন্দেহের তিরটা তার দিকেই ঘুরলো? বৃদ্ধা বেলকা যখন মারা গিয়েছিল তখনও তার উপর সন্দেহের দৃষ্টি রাখা হয়েছিল। আর এবার ভেরার মৃত্যু স্বাভাবিক দুর্ঘটনায় হয়েছে, পুলিশ এটা বলার পরও তাকে কেউ সন্দেহ করছে! রোমেরো এমনভাবে কথাগুলো বলছে জেনোভিয়ার মনে হচ্ছে আসলেই ভেরার মৃ’ত্যুটা স্বাভাবিক নয়। ওকে পরিকল্পনা মাফিক খু’ন করা হয়েছে। আর সেই খু’নি সে! শেষ ভাবনাটায় জেনোভিয়ার অন্তঃকরণ ছলকে উঠলো। কানে বাজলো আবারও রোমেরোর কণ্ঠস্বর,

“চিন্তা করো না। কাউকে বলবো না এটা সম্পর্কে। ভেরার বিষয়গুলো শুধু তোমার আর আমার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকবে।”

 

খোলা দরজা ডিঙিয়ে চলে গেল রোমেরো। কিন্তু সে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করে দিয়ে গেছে জেনোভিয়ার মনে তা সারা রাত ধরেও শেষ হলো না। না, জেনোভিয়া খু’ন করেনি ভেরাকে। কিন্তু সত্যিই কি ভেরার মৃত্যু স্বাভাবিক দুর্ঘটনা? এমনও তো হতে পারে অন্য কেউ ভেরাকে খু’ন করেছে। কিন্তু কে সে? দুশ্চিন্তায় সারা রাত নিদ্রাহীনতায় কাটলো জেনোভিয়ার। 

রাত যখন গভীর হলো তখন আরও একটা স্মৃতি তাকে খুব করে জ্বালাতন করতে শুরু করলো। সে স্মৃতি নির্মম, বী’ভৎস, করুণ, হৃদয় চূর্ণকারী! জেনোভিয়া বার বার মায়ের ক্ষ’তবি’ক্ষত মুখটা দেখতে পেল মনশ্চঃক্ষে। 

 

___________________

 

দিনগুলো ভালো কাটছে এখন। তারাসের সাথে জেনোভিয়ার সম্পর্ক আগের চেয়ে অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। একটু একটু করে অভিনয় ভুলতে শুরু করেছে তারাস। 

অনেকদিন হয়ে গেছে বেনিমকে নিয়ে বেরি উইলোর মাঝে ভয়াবহ ভয় আর দুশ্চিন্তা বাসা বাঁধেনি। যদিও সে সব সময়ই তটস্থ থাকে বেনিমকে নিয়ে। 

রোমেরো জেনোভিয়াকে সন্দেহ করেছিল বটে, কিন্তু আস্তে আস্তে সে সন্দেহ এখন বিলীন হয়ে গেছে। তবে ভেরার মৃ’ত্যু নিয়ে জেনোভিয়াকে কয়েকদিন খুব দুশ্চিন্তায় রেখেছিল রোমেরো। দুশ্চিন্তায় জেনোভিয়া ঠিকমতো খেতে পারেনি, ঘুমাতে পারেনি। বিষণ্ণ সময় পার করছিল। কয়েকদিন কেমন যেন অপরিচিত ঠেকছিল রোমেরোর আচরণ। তারপর হঠাৎ একদিন রোমেরো এসে বলেছে, সে মজা করেছে ওর সাথে। সে বিশ্বাস করে ও এমন জঘন্য কাজ করতে পারে না। সেই থেকে জেনোভিয়া একটু স্বস্তি পেয়েছে। তবে ভেরার মৃ’ত্যু সত্যিই স্বাভাবিক ছিল, না পরিকল্পিত ছিল এটা অমীমাংসিত। পুলিশ ট্রাকটা খুঁজে পায়নি। তবে পুলিশের ধারণা এটা স্বাভাবিক দুর্ঘটনা।

জেনোভিয়া মাঝে মাঝে ভাবে, ভেরার মৃ’ত্যু স্বাভাবিক ছিল না কি অস্বাভাবিক? কিন্তু সে এটার উত্তর পায় না। তবে এটা ভেবে সে নিশ্চিন্ত বোধ করে যে, পুলিশ ভেরার মৃ’ত্যুকে অস্বাভাবিক ভাবেনি। যদি ভাবতো তাহলে হয়তো তার উপরও সন্দেহ বস্তুটা গেঁথে যেত। যখন একজনের সন্দেহের দৃষ্টি পড়ে, তখন এটা ভাইরাসের মতো আচরণ করে। একজনের থেকে এই সন্দেহটা আরও মানুষের ভিতর ছড়িয়ে পড়ে।

থানার মানুষ গুলোও ভালোই দিন কাটাচ্ছিল। নতুন আর কোনো খু’নের ঘটনা ঘটেনি। এমনকি অন্য কোনো বড়ো অপরাধও সংঘটিত হয়নি। সবাই এখন মেনে নিয়েছে পাভেলই খু’নি, কারো মনে সন্দেহ নেই আর। কিন্তু হঠাৎ একদিন একটা কল এলো। কলার জানালো, একটা মা’র্ডার হয়েছে। আনা উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে গেল,

“মা’র্ডার? কোথায় হয়েছে?”

 

কলার লোকেশন বলার পরই আনা ব্যস্ত ভঙ্গিতে দৌড়ে এসে ফেলিনকে সংবাদটা দিলো। ফেলিনের সাথে তখন তারাস উপস্থিত ছিল। স্থানের নাম শুনে চমকে উঠলো সে। এটা তো জেনোভিয়ার এলাকা! ওখানে আবার কে খু’ন হলো? থানা থেকে কয়েকজন পুলিশ হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে পড়লো। পুলিশ পেট্রোল কার দুটো এগিয়ে চললো জেনোভিয়াদের এলাকার দিকে। 

এলাকার রাস্তায় ঢুকতেই কলারের দেখা মিললো। একটা মোটাসোটা ছেলে। বয়স পনেরো-ষোলোর বেশি হবে না। গায়ের রং উজ্জ্বল। ওর চলার গতিতে শরীরের মাংসপেশি নড়ে ওঠে। ছেলেটা বললো,

“আমার সাথে আসুন।” 

 

পুলিশ ছেলেটাকে অনুসরণ করলো। এলাকার আরও কিছুটা অভ্যন্তরে প্রবেশের পরে থামলো তারা। 

রাস্তার পাশে একটা মাঝারি আকারের কালো ব্যাগ। ছেলেটা সেদিকে অঙ্গুলি করে বললো,

“ওটার ভিতর লা’শ আছে।”

 

সবাই অবাক হলো। এই ব্যাগের ভিতর কীভাবে লা’শ থাকতে পারে? সবাই প্রশ্নবিদ্ধ চোখে ছেলেটার দিকে তাকালো।

 

“গিয়ে চেক করুন।” তারাসকে উদ্দেশ্য করে বললো ছেলেটা। 

 

তারাস আবারও ব্যাগটার দিকে চাইলো। এটার ভিতর একটা মানুষের দেহ থাকা সম্ভব নয়। খু’নি কি এবার ভিক্টিমের শরীরের অ’ঙ্গপ্ৰত্যঙ্গ গুলো কে’টে টু’করো টু’করো করেছে? ব্যাগ খোলা মাত্রই কি তার ভিতর মানুষের শ’রীরের টু’করো অংশ দেখতে পাবে? আবারও কি এক নতুন খু’নির আবির্ভাব ঘটলো? 

তারাস গ্লাভস পরে নিলো হাতে। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল ব্যাগের দিকে। ব্যাগটা খোলা মাত্র একটা পাশবিক দুর্গন্ধ নাকে ধাক্কা খেলো। নাক চেপে ধরলো তারাস। ভিতরটা দেখে চমকালো সে। আরও ভালো করে দেখতে গিয়ে দেখলো ভিতরে একটা বিড়াল। একটা র’ক্তাক্ত বিড়াল! তারাস বিস্মিত চোখে নিজের ছোটো দলটার দিকে তাকালো। 

সবাই প্রশ্নবিদ্ধ চোখে চেয়ে আছে। তারাস বললো,

“এটা একটা বিড়াল!”

 

হতভম্ব হয়ে গেল সবাই। ছেলেটার দিকে তাকালো এক দৃষ্টিতে। তারাসের ইচ্ছা করলো ছেলেটার গালে মুষ্টিবদ্ধ শক্ত হাতের একটা ঘু’সি বসিয়ে দেয়। তারা কী ভেবে এত ব্যস্ত হয়ে ছুটে এলো, অথচ এটা কি না একটা বিড়াল! তারাস মুখে চাপা রাগ চেপে বললো,

“এই ছেলে, তুমি কি আমাদের সাথে মজা করলে?”

 

“মজা কেন মনে হচ্ছে? একটা মানুষের খু’নই খু’ন, আর একটা বিড়ালের খু’ন খু’ন নয়? ভালো করে দেখুন, কেউ একজন বিড়ালটাকে হ’ত্যা করেছে।”

 

তারাস আবার তাকালো ব্যাগের ভিতর। হুম, বিড়ালটাকে কেউ একজন হ’ত্যা করেছে। কিন্তু কেন? বোঝা যাচ্ছে অনেক বার ধা’রালো অ’স্ত্র চালানো হয়েছে বিড়ালটার গায়ে। একটা বিড়ালের সাথে কার কী শত্রুতা ছিল? প্রথমে মানুষ খু’ন হলো, আর এখন এই বিড়ালটা! হচ্ছে কী আসলে? 

 

বিড়ালের মালিক ওই এলাকারই একজন বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলা ছিল। যখন সে জানতে পারলো তার প্রিয় পোষা প্রাণীটাকে কেউ হ’ত্যা করেছে তখন খুব কাঁদলো সে। তারাসের বারংবার একটা কথা মনে হতে লাগলো, এই প্রাণীটার মৃ’ত্যুই শেষ মৃত্যু নয়, এরপর হয়তো আরও প্রাণীর মৃ’ত্যু ঘটবে এমন নির্মমভাবে!

 

__________________

 

গিটারের সেই মিষ্টি সুর বাজছে আবারও। এই সুরে একটা জাদু আছে। শুনলে মন আনচান করে জেনোভিয়ার। আজকের সুরটা এমন মনে হচ্ছে যেন এই সুরটা তার জন্যই বাজানো হচ্ছে। আর আজকের সুরটা খুব কাছেও মনে হচ্ছে। জেনোভিয়া দরজা খুললেই এক পাল হাওয়া ছুটে এসে ছুঁয়ে দিলো তাকে। সোনালি চুল গুলোয় হালকা দোল লাগলো। লাইটের আবছা আলোয় দেখতে পেল তার লনের বেঞ্চে বসে আছে রোমেরো। জেনোভিয়াকে দেখা মাত্রই গান গাইলো ও,

“Oh my love!

I can’t sleep without seeing your face.

I can’t sleep unless I dream of you.

oh my love!

I became obsessed with you.

You are the rainbow of my heart.

You are the solace of my lips…”

 

জেনোভিয়া মোহনিয়া হয়ে শুনতে লাগলো রোমেরোর চমৎকার গানের গলা। এত সুন্দর কেন এই ছেলেটার গান? জেনোভিয়া বিমুগ্ধ হয়ে তাকিয়েই রইল আর তাকিয়েই রইল। 

এক সময় গিটারের সুর থেমে গেল, আর রোমেরোর গলাও। জেনোভিয়া তখনও মোহাবিষ্টের মতো চেয়ে আছে। রোমেরো বললো,

“এমন দৃষ্টিতে চেয়ে থেকো না, তোমার দৃষ্টি আমার হৃদয়কে আলোড়িত করছে।”

 

ঘোর কাটলো জেনোভিয়ার। অপ্রস্তুত হয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। ও আর তাকালো না রোমেরোর দিকে। রোমেরোও চলে গেল কিছু না বলেই। 

 

__________________

 

আজ জেনোভিয়ার জন্মদিন। প্রতি জন্মদিনেই জেনোভিয়া প্রতিবেশীদের জন্য কিছু খাবার তৈরি করে। এবারও করলো, পিয়েরোগি। সাবিনা আর জেনোভিয়া দুজন মিলে তৈরি করেছে। অতঃপর তা প্রতিবেশীদের মাঝে বিতরণ করলো। রোমেরোর বাড়িতে যখন পিয়েরোগি দিতে গেল তখন রোমেরোকে বাড়িতে পেল না। রোমেরোকে দেখতে পেল বেনিমদের বাসায় এসে। বেনিম, রোমেরো আর বেরি উইলো মিলে দুরাক খেলছে। জেনোভিয়া আর সাবিনার হঠাৎ আগমন তাদের অবাক করলো। বেরি উইলো খেলার আসর ভেঙে উঠে দাঁড়ালেন। ওদের দিকে এগিয়ে এসে হাস্য বদনে বললেন,

“কী ব্যাপার? আজ দুটো চাঁদের একই সঙ্গে আগমন ঘটলো যে আমার বাড়িতে?”

 

জেনোভিয়া প্রথমে রোমেরোকে দেখে অবাক হয়েছিল। পরে মনে পড়লো রোমেরোর এখানে থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। বেনিম আর রোমেরো দুজন খুব ভালো বন্ধু। সে রোমেরোর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বললো,

“আজ আমার জন্মদিন। আমার জন্মদিনে আমি খাবার তৈরি করে প্রতিবেশীদের মাঝে বিতরণ করে আনন্দ পাই।”

 

“ওহ, জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা তোমায়! দয়া করে ভিতরে এসো।” বেরি উইলো ওদের ভিতরে আসার আমন্ত্রণ জানালো। 

দুজনই ঘরের ভিতর প্রবেশ করলো বেরি উইলোর আমন্ত্রণে। 

বেরি উইলো রোমেরো আর বেনিমের উদ্দেশ্যে বললো,

“আজ জেনোভিয়ার জন্মদিন, ওকে শুভেচ্ছা জানাও ছেলেরা।”

 

ওরা দুজন একই সাথে সমস্বরে বলে উঠলো,

“শুভ জন্মদিন জেনোভিয়া!”

 

জেনোভিয়া প্রত্যুত্তরে হাসলো। 

বেরি উইলো বললেন,

“ছেলেরা তোমরা এখন বাইরে যাও।”

 

বেনিম আর রোমেরো কেউ কোনো টু শব্দ না করেই বাইরে চলে গেল। বেরি উইলো জেনোভিয়াদের বসতে বললেন। 

তারপর কিচেনে চলে গেলেন তিনি।

সাবিনা টেবিলের উপর একটা ড্রয়িং খাতা দেখতে পেল। খাতার উপরে বেনিমের নাম লেখা, ‘বেনিম কক্স’। খাতাটা হাতে তুলে নিলো সাবিনা। জেনোভিয়া বললো,

“কী করছো? অন্যের জিনিসে হাত দিয়ো না।”

 

“অন্যের জিনিস? শোনো, ভবিষ্যতে সে আমার প্রেমিক হবে, সুতরাং এটা আমার জন্য অন্যের জিনিস নয়।”

 

বলেই সে প্রথম পাতাটি উলটালো। এ পাতায় কিছু বিখ্যাত লেখকদের উক্তি দেখতে পেল। পরের পাতা উলটাবে এর আগে বেরি উইলো এসে খাতাটা ছোঁ মেরে নিয়ে নিলেন। এমন ঘটনায় দুজনেই বাকহারা হয়ে গেল। 

বেরি উইলোর কপালে ঘাম জমেছে। তার মাঝে এই মুহূর্তে আবারও জন্ম নিয়েছে ভয়। ভীত সন্ত্রস্ত মনেও তিনি হাসার চেষ্টা করলেন। 

“আমার বেনিমের আঁকা ছবি দেখবে?”

 

বেরি উইলো খাতার পৃষ্ঠা উলটে একটা ছবি বের করে জেনোভিয়ার পাশে বসলেন। ছবিটা ওদের দেখিয়ে বললেন,

“দেখো কত সুন্দর ছবি আঁকে আমার ছেলে।” বলে ছবিটার গায়ে স্নেহের পরশ বুলালেন। ওই পরশ এত গভীর যেন হৃদয়ের সমস্ত ভালোবাসা পরশের সাথে ঢেলে দিয়েছেন। 

জেনোভিয়া আর সাবিনা দুজনই বোকা বনে গেছে। এটা সুন্দর ছবি? বাচ্চাদের অঙ্কনের চেয়েও বাজে দেখাচ্ছে। এটা সুন্দর ছবি হয় কীভাবে? এত বাজে চিত্রাঙ্কন এর আগে কখনও দেখেনি জেনোভিয়া। সাবিনা জেনোভিয়ার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললো,

“এটা যদি সুন্দর ছবি হয় তাহলে বাজে ছবি কোনটা?”

 

বেরি উইলো খাতার পৃষ্ঠা গুলো উলটাচ্ছেন আর গভীর মমত্ববোধে হারাচ্ছেন। নিজে দেখার ফাঁকে ফাঁকে জেনোভিয়াদেরও ছবি গুলো দেখাচ্ছেন। তবে কিছু ছবি তিনি এড়িয়ে যাচ্ছেন। ওই ছবি গুলো তো এই মেয়ে দুটোর সামনে প্রকাশ করা যাবে না। 

বাচ্চারা যেমন পেন্সিল টেনে কোনো কিছু আঁকার চেষ্টা করে, বেনিমের অঙ্কন গুলো সেরকম। দেখে মনে হচ্ছে ছোট্ট কোনো বাচ্চার আঁকা ছবি এগুলো। তবে বেনিম ছবির মধ্যে কী প্রকাশ করতে চেয়েছে সেটা বোঝা যাচ্ছে। কোনোটায় দেখা যাচ্ছে একটা ছোটো ছেলে তার মায়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। কোনোটায় দেখা যাচ্ছে একটা ছেলে তার মায়ের কোলে শুয়ে আছে। কোনোটায় আবার বেনিম নিজেকে তার মা-বাবার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছে। ছবির সাথে তারিখ লেখা। এটা বর্তমান বছরেরই ড্রয়িং খাতা। মাঝে মাঝে বেরি উইলো দু-তিনটা পৃষ্ঠা একসাথে উলটায়। জেনোভিয়া অথবা সাবিনা এই বিষয়টি খেয়াল করেনি। 

বেরি উইলো ছবিগুলো দেখার সময় শুধু ছেলের প্রশংসা করছিলেন। খাতাটা এবার রেখে দিলেন তিনি। তারপর হঠাৎ আইসক্রিমের দিকে খেয়াল করে বললেন,

“খাচ্ছ না কেন? গলে যাবে তো আইসক্রিম।”

 

জেনোভিয়া ও সাবিনা দুজনই আইক্রিমের ছোটো বাটি দুটো হাতে তুলে নিলো। মুখে দিয়ে দেখলো এই আইসক্রিমের স্বাদ  অতুলনীয়। খেতে খেতে জেনোভিয়ার চোখ গেল একটা ফ্রেম বন্দি ছবির উপর। ছবিটা দেওয়ালে লাগানো। পুরোনো দিনের ছবি। ছবিতে বেরি উইলো আর রিচার্ড কক্সকে দেখা যাচ্ছে। আরও দুজনকে দেখা যাচ্ছে বেরি উইলো আর রিচার্ড কক্সের কোলে। দুটো ফুটফুটে বাচ্চা। এর ভিতরে একটা বেনিম, সহজেই ধারণা করতে পারলো জেনোভিয়া। কিন্তু অপর বাচ্চাটা কে? বেনিমের কি আরও ভাই-বোন রয়েছে? জেনোভিয়া বিষয়টা সম্পর্কে জিজ্ঞেস না করে পারলো না। 

“ওই ছবিটায় যে বাচ্চা দুটো দেখা যাচ্ছে তার মাঝে একজন তো বেনিম, তাই না?”

 

বেরি উইলো মৃদু হেসে বললেন,

“হ্যাঁ, আমার লক্ষ্মী ছেলে। আমার কোলের বাচ্চাটা বেনিম। বাচ্চাকালেও চমৎকার দেখতে ছিল ও, তাই না?”

 

“হ্যাঁ তা তো বটেই।” সাবিনা জবাবটা দিলো।

 

জেনোভিয়া জিজ্ঞেস করলো,

“অপর বাচ্চাটা কে?”

 

জেনোভিয়ার প্রশ্নে বেরি উইলোর মুখ ঘন কালো হয়ে গেল। মন মিশে গেল দুঃখের ঝরনায়। চোখে বেদনার নীর জমলো। তিনি জানালেন,

“ওটা আমার বড়ো ছেলে। বেঁচে নেই! আট বছর বয়সেই মারা গেছে ও!”

 

জেনোভিয়া এমন একটা উত্তর গ্রহণের জন্য প্রস্তুত ছিল না। তার হৃদয়েও ক্লেশের দোল লাগলো। আননে আঁধার ছড়িয়ে বললো,

“আমি ভীষণ দুঃখিত! আমি আপনাকে অতীত স্মরণ করিয়ে কষ্ট দিতে চাইনি। দুঃখিত আমি!”

 

বেরি উইলো কান্না চাপার চেষ্টা করলেন,

“তুমি কেন দুঃখিত বলছো? দুঃখিত বলার কিছু নেই। মাঝে মাঝে ওকে আমি নিজ থেকেই স্মরণ করি। ভাবী, যদি ও বেঁচে থাকতো তাহলে আমার ঘরটা আরও ভরপুর থাকতো।” বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন বেরি উইলো। 

 

রোমেরো আর বেনিম ঘরে প্রবেশ করেছিল। দরজা থেকে তিন কদম ভিতরে প্রবেশ করেই দাঁড়িয়ে যায় দুজন। বেরি উইলোর কথা শুনে এবং কান্না দেখে রোমেরোর চোখের কোল ছাপিয়ে জল নেমে যায়। সে ভারাক্রান্ত গলায় বেনিমকে বললো,

“তোমার একজন বড়ো ভাই ছিল বেনিম, সেটা বললে না তো!”

 

বেরি উইলো জেনোভিয়া, সাবিনা ও রোমেরোকে ডিনারের দাওয়াত দিলেন তার বাড়িতে। 

ওরা কেউই বেরি উইলোর কথা অমান্য করলো না। ডিনারের জন্য তিনজনই এলো রাতে। রোমেরো এরই মাঝে বেনিমের পরিবারের সাথে অনেক ফ্রেন্ডলি হয়ে গেছে। যেন এ ঘরটা ওরও। তবে জেনোভিয়া আর সাবিনা কিছুটা সংকোচ বোধ করছিল। 

খাবারের পর মদ্যপানের ব্যবস্থা করা হলো। কম-বেশি পান করলো সবাই, তবে বেনিম আর জেনোভিয়া পান করলো না। সবচেয়ে বেশি পান করলো সাবিনা। 

বেনিম খুব বিরক্তবোধ করছিল সাবিনার উপস্থিতিতে। মেয়েটাকে একদম সহ্য করতে পারে না সে। মেয়েটা কেমন এক চোখে তাকায় তার দিকে। তার গা জ্বলে যায়। বেনিমের আর বসে থাকতে ভালো লাগছিল না এখানে, তাই সে উপরে চলে গেল। রিচার্ড কক্স অনেক আগেই চলে গেছেন নিজের রুমে। লিভিংরুমে ছিল শুধু জেনোভিয়া, সাবিনা, রোমেরো আর বেরি উইলো। রোমেরো বেরি উইলোর কাছে বরফ চাইলে বেরি উইলো বরফ আনতে গেলেন কিচেনে। 

সাবিনা উশখুশ করছে। বেনিম কেন চলে গেল? তার একদম ভালো লাগছে না।  রোমেরোকে বললো,

“ও চলে গেল কেন? ওকে ডেকে আনো প্লিজ!”

 

রোমেরো সাবিনার কথায় গুরুত্ব দিলো না। নির্বিকার ভাবে মদের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বললো,

“তুমি যখন এত করে ওর উপস্থিতি চাইছো তখন তুমিই ডেকে আনো।”

 

“আমি?” সাবিনা ঠোঁট উলটে ভাবলো কীয়ৎক্ষণ, তারপর বললো, “ঠিক আছে, আমি ওকে ডেকে আনছি।”

 

সাবিনা উঠে দাঁড়ালে জেনোভিয়া ওর হাত টেনে ধরলো। সাবিনার চোখের পাতা দুলছে। নেশাগ্রস্ত হয়ে গেছে ও। এমতাবস্থায় ওকে কোথাও যেতে দেওয়া উচিত নয়। জেনোভিয়া বললো,

“কোথাও যেতে হবে না, এখানে বসো।”

 

রোমেরো বাধা দিয়ে বললো,

“ওকে যেতে দাও।” 

 

জেনোভিয়া সাবিনার হাত ছাড়লো না, সাবিনা ওর হাত ছাড়িয়ে চলে গেল। 

একা হয়ে গেল জেনোভিয়া। 

রোমেরো মদ পান করেই চলেছে। মাঝে মাঝে আবার ব্রেক নিচ্ছে কিছু সময়ের জন্য। খেতে খেতে জেনোভিয়াকে দেখছে, হাসছে। জেনোভিয়া অস্বস্তি বোধ করছে। বেরি উইলো আসছে না কেন এখনও? বরফ নিয়ে আসতে এত সময় লাগে? 

 

“তোমার প্রাক্তন প্রেমিক কি তোমাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানায়নি?” প্রশ্ন করলো রোমেরো। 

 

এই প্রশ্নে ভীষণ বিরক্ত হলো জেনোভিয়া। বিরক্ত হওয়ার কারণ হলো, ‘প্রাক্তন প্রেমিক’ কথাটা। তারাস তার প্রাক্তন নয়, কখনও ছিল না। তারাস সব সময় তার কাছে বর্তমান ছিল। জেনোভিয়া কিছু বলতে যাবে এর মাঝেই ওপর তলা থেকে সাবিনার চিৎকার ভেসে এলো। ওর চিৎকারে দাঁড়িয়ে গেল জেনোভিয়া। কিচেন থেকে ছুটে এলেন বেরি উইলো। এসে দেখলেন এখানে শুধু জেনোভিয়া আর রোমেরো আছে, সাবিনা নেই। ভয়ে তার ভিতরটা ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলো। ভীত চোখে উপর তলায় তাকালেন। রোমেরো দৌড়ে গেল সিঁড়ির দিকে। দ্রুত পায়ে উপরে উঠে গেল ও।

দেখতে পেল করিডোরে পড়ে আছে সাবিনা। ওর পাশে দাঁড়িয়ে আছে বেনিম। 

 

(চলবে)

 

 রঙিলা রাতের কালো অশ্রু (১৯)

লেখা: ইফরাত মিলি

___________________

 

মাথার পিছনে হাত রাখতেই হাতে তরল পদার্থের উপস্থিতি টের পাওয়া গেল। আঁতকে উঠলো সাবিনা,

“র’ক্ত!”

 

“আমি চিৎকার শুনে ছুটে এসেছি। এসে দেখি ও পড়ে আছে।” রোমেরোকে বললো বেনিম। 

রোমেরো চোখ সরু করলো। বেনিমের কথা তার ঠিক বিশ্বাস হলো না। বিশ্বাস করবে কী, বেনিম সত্যি কথা বলেছে কি? ধীরে ধীরে চোখ থেকে আতঙ্ক কাটলো রোমেরোর। সিঁড়ির ধাপে ধুপধুপ শব্দ হলো কারো ব্যস্ত পায়ে উঠে আসার। 

জেনোভিয়া আর বেরি উইলো এসে দাঁড়াতেই বেনিম রুমে চলে গেল। 

বেরি উইলো ছেলের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার দু চোখ ভয়ে স্ফীত। জেনোভিয়া সাবিনার পাশে বসে উৎকণ্ঠা হয়ে বললো,

“কী হয়েছে তোমার?” 

 

সাবিনা নিজের হাত দেখিয়ে বললো,

“র’ক্ত!”

 

জেনোভিয়া শিউরে উঠলো। সাবিনাকে ভালোভাবে লক্ষ করে বুঝতে পারলো র’ক্ত সাবিনার মাথা থেকে নির্গত হয়েছে। মাথা ফে’টে গিয়েছে একটুখানি। সে সাবিনাকে উঠে বসতে সাহায্য করলো। 

 

“পড়লে কীভাবে?” জিজ্ঞেস করলো জেনোভিয়া। 

 

সাবিনার চোখ নিভুনিভু। সে জানে না কীভাবে পড়ে গিয়েছে। নেশাগ্রস্ত থাকার ফলে অত কিছু খেয়াল হয়নি তার। 

 

“হয়তো আমার হাঁটার গতি ঠিক ছিল না।” অনুমানের উপর ভিত্তি করে বললো সাবিনা। 

 

“আমি আসতে বারণ করেছিলাম। পড়ে গিয়ে মাথাটা ফা’টালে তো!” জেনোভিয়ার মুখটা করুণ দেখাচ্ছে প্রিয় বান্ধবীর ব্যথায়। সাবিনার থেকেও বেশি কষ্ট যেন তার হচ্ছে। রোমেরোর ব্যাপারটা ভালো লাগলো না। সে ব্যাপারটা হালকা করতে বললো,

“তোমার বান্ধবীকে কি হাসপাতালে নিয়ে যাব?”

 

বেরি উইলো বললেন,

“হাসপাতালে যাওয়ার দরকার পড়বে না, ঘরে ফার্স্ট এইড বক্স আছে। ওকে নিচে নিয়ে এসো, ওর মাথায় ব্যান্ডেজ করে দিই।”

 

বেরি উইলো নিচে নেমে এলেন। রিচার্ড কক্সকে দেখতে পেলেন প্রশ্ন মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। বেরি উইলো কাছে এলে প্রশ্ন করলেন,

“কী হয়েছে?”

 

বেরি উইলো না বোধক মাথা নাড়লেন। একটু পর দেখতে পেলেন সাবিনাকে নিয়ে উপর থেকে নিচে নামছে জেনোভিয়া আর রোমেরো। সাবিনার হাতে র’ক্ত দেখে রিচার্ড কক্স বললেন,

“ওহ মাই গড! হলো কীভাবে এসব?”

 

“নেশাগ্রস্ত, পড়ে গিয়ে মাথা ফা’টিয়েছে।” জবাব দিলো রোমেরো। 

 

বেনিমদের বাড়ি থেকে ব্যান্ডেজ করে বাড়ি ফিরলো সাবিনা। জেনোভিয়া ওকে বিছানায় শুইয়ে দিলো। ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে জেনোভিয়ার শরীর। সেও শুয়ে পড়লো সাবিনার পাশে। কিছু অভিমানী চিন্তা মস্তিষ্ক খোঁচাতে শুরু করলো। হৃদাকাশে মেঘের আড়াল থেকে চাঁদের মতো উঁকি দিচ্ছে তারাসের চিন্তা। আজ তার জন্মদিন, অথচ তারাস কি না তাকে শুভেচ্ছা জানায়নি! রাত বারোটা বাজতে বেশি সময় বাকি নেই। তারপর অন্য একটা দিনের শুরু। আর তারাস তাকে এখনও অবধি শুভেচ্ছা জানালো না? এরকমটা তো হওয়ার কথা ছিল না। কেন তাকে শুভেচ্ছা জানালো না তারাস? ভুলে গেছে দিনটার কথা? ভাবতে ভাবতে চোখ লেগে এলো ঘুমে। ক্ষণকাল পর ঘুম ভেঙে গেল। দরজায় করাঘাতের শব্দ তার ঘুম ভেঙে যাওয়ার কারণ। এ সময় কে নক করছে? জেনোভিয়ার বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা করলো না। সে অলস হয়ে শুয়ে রইল। কীয়ৎক্ষণ পর আবারও শব্দ হলো দরজায়। অসময় বিরক্তকারী লোকটার উপর মনে মনে রোষ পোষণ করলো জেনোভিয়া। চুলগুলো দুই হাতের সাহায্যে ঠিক করে নেওয়ার চেষ্টা করে বেডরুম থেকে বের হলো। সদর দরজা খুলে যারপরনাই অবাক হলো সে। কোথাও কেউ নেই। শব্দ হলো কীসের তাহলে? জেনোভিয়া কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে দরজা বন্ধ করতে উদ্যত হলো। আর তখনই তার চোখ পড়লো দরজার সামনে থাকা ছোটো বক্সটায়। এবার আরও অবাক হলো সে। এটা কে রেখেছে? জেনোভিয়া হাতে তুলে নিলো বক্সটা। বক্সটার গায়ে একটা চিরকুট। 

 

‘শুভ জন্মদিন!

যার সাথে তুমি থাকতে পছন্দ করো, তার সাথেই ভবিষ্যতের প্রতিটা দিন ভীষণ সুন্দর কাটুক তোমার।’

 

চিরকুটের লেখাটা পড়ে মৃদু হাসি ছুঁয়ে দিলো জেনোভিয়ার ঠোঁটের কোণ। বুঝতে বাকি নেই এগুলো কে রেখেছে এখানে। আশপাশে আবার চোখ বুলালো একবার। না, কাউকেই নজরে পড়ছে না। জেনোভিয়া বললো,

“লুকিয়ে থেকে লাভ নেই, আমি জানি তুমি এখানেই আছো।”

 

তারাস চমকে উঠলো। সে এই মুহূর্তে ঘরের পাশে আড়ালে অবস্থান করছে। মেয়েটা বুঝলো কীভাবে এখানে আছে সে? তারাসের বুক চিরে হতাশার নিঃশ্বাস বেরোয়। মেয়েটার থেকে কখনও কিছুই লুকাতে পারে না সে। ধরা পড়ে যায় প্রতিবার। জেনোভিয়ার প্রতি অনুভূতি সৃষ্টি হওয়ার শুরুর দিকটা মনে পড়ছে তার। তখন প্রায়ই তার দেখা হতো জেনোভিয়ার সাথে। নতুন একটা পার্ট টাইম জবের জন্য থানার সামনে দিয়েই যাতায়াত ছিল জেনোভিয়ার। সেও জেনোভিয়াকে দেখার জন্য থানার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতো। কিন্তু কখনও বুঝতে দিতো না এটা। তবুও মেয়েটা কীভাবে যেন টের পেয়ে যায় বিষয়টা। আর টের পেয়েই একদিন জিজ্ঞেস করেছিল,

‘আপনি কি আমার প্রেমে পড়েছেন মিস্টার?’

 

তারাস সেদিন হতবুদ্ধি হয়ে চেয়ে থেকেছিল জেনোভিয়ার দিকে। তারপর কিছু না বলেই এক প্রকার পালিয়ে  গিয়েছিল। ওই ঘটনার পর মেয়েটা তাকে রোজ নিয়ম করে জ্বালাতে শুরু করলো। বার বার এই বিষয়টা নিয়ে খোঁচাতে থাকে।  কিন্তু বিষয়টা যে আসলেই সত্যি সেটা সে একটা বারের জন্যও স্বীকার করেনি। আর তাই একদিন জেনোভিয়া বলেছিল, ‘প্রেমে পড়ে থাকলে এখনই স্বীকার করুন। নয়তো পরে যখন স্বীকার করবেন তখন কিন্তু আমি আপনাকে গ্রহণ করবো না।’

 

মেয়েটা সব বুঝে যেত, তখনও আর এখনও। তারাস অতীতের ডায়ারি বন্ধ করে জেনোভিয়ার কথার জবাব দিলো,

“ভুল ভাবছো তুমি, আমি এখানে নেই।” 

 

জেনোভিয়া হাসলো,

“তাই? তাহলে কথা বললো কে আমার সাথে? তারাসের প্রেতাত্মা?”

 

তারাস আড়াল থেকে বেরিয়ে আসলো। তারাসকে দেখা মাত্র প্রশান্ত হলো জেনোভিয়ার চোখ জোড়া। বললো,

“পুরো দিনে আমি যতটুকু খুশি ছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশি খুশি এখন। তোমাকে ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়েছিলাম, আর ঘুম ভেঙে তোমাকেই দেখতে পেলাম। এত দেরি করে এলে কেন? আসবে না ভেবেছিলে?”

 

“সেরকম কিছু ভাবীনি আমি।”

 

“তাহলে দেরি কেন?”

 

“পুলিশ আমি? না কি তুমি? পুলিশের মতো জেরা করা বন্ধ করো।”

 

“বেশ। এখন দয়া করে আমার গৃহে প্রবেশ করো। তোমাকে কোলে করে ঘরে ঢুকানোর মতো শক্তি আমার নেই। সুতরাং নিজ থেকেই প্রবেশ করো।”

 

“পাগল!”

 

“লজ্জা করে না এই পাগল মেয়েটাকেই ভালোবাসো?”

 

“বাসি না।” বলেই ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলো তারাস। জেনোভিয়া ওকে বসতে বলে কিচেনে চলে গেল। 

যখন ফিরলো তখন ওর দু হাতেই খাবারের প্লেট। প্লেটগুলো তারাসের সামনে রাখতেই তারাস বললো,

“আমি খাবো না এসব।”

 

“জোর করে খাওয়াবো।”

 

“তুমি আমাকে জোর করতে পারো না।”

 

“আমি তোমার ভবিষ্যৎ স্ত্রী। এখন যদি এইটুকু জোর না খাটাতে পারি, তাহলে তোমার স্ত্রী হবো কীভাবে?”

 

“আমি কি বলেছি আমি তোমাকে বিয়ে করবো?”

 

“করবে না?” পালটা আ’ক্রমণ চালালো জেনোভিয়া। 

 

তারাস অপ্রস্তুত হলো। কিছু না বলে খেতে আরম্ভ করলো সে। এড়িয়ে গেল জেনোভিয়ার প্রশ্ন। 

 

___________________

 

সাবিনার ঘুম ভাঙেনি। জেনোভিয়া জেগে গেছে তার নিত্য রুটিন মাফিক। এবার কিছুক্ষণ এক্সারসাইজ করবে। তারপর গোসল আর ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়বে কাজে। দরজা খুলতেই দেখলো লনে রাজুমিখিন দাঁড়িয়ে আছে। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল জেনোভিয়া। এতদিন লোকটা শুধু দূর থেকেই দেখতো, আর আজ একেবারে ঘরের সামনে? জেনোভিয়া অবাক। লোকটা তার বাড়ির লনে দাঁড়িয়ে আছে কেন? 

দোরগোড়া পেরিয়ে বাইরে পা রাখলো জেনোভিয়া। রাজুমিখিনের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বললো,

“শুভ সকাল! আপনি এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? কিছু বলতে চান?”

 

রাজুমিখিনের দৃষ্টি অনড়। সে নিষ্পলক চেয়ে রইল অনেকক্ষণ। অতঃপর বললো,

“আপনার নাম জেনোভিয়া। আপনি আভেতলা রেস্তোরাঁয় কাজ করেন। একজন ফিস শেফ। বাড়িতে একাই থাকেন। কিন্তু কয়েকদিন যাবৎ একটা মেয়েও থাকছে আপনার সাথে। মেয়েটা আপনার বান্ধবী। আমি কি সবকিছু ঠিক বলেছি?” 

 

জেনোভিয়া হতভম্ব হয়ে গেল। লোকটা কে? হঠাৎ এসব বলছে কেন তার কাছে? কেনই বা নজর রাখতো?

 

“আমি রাজুমিখিন।” বললো সে, “মস্কো  থেকে এসেছি। আমার বিয়ে হয়েছিল ২০১৯ সালে। আমার স্ত্রী আমাকে ডিভোর্স দিয়েছে। সে এখন অন্য কারো সাথে তার নতুন জীবনের সূচনা ঘটিয়েছে। এখন আমি ভাবছি, আমারও কি তাই করা উচিত নয়? যেটা সে করেছে?”

 

জেনোভিয়া একের পর এক অবাক হচ্ছে। লোকটা এসব কথা তাকে শোনাচ্ছে কেন? জেনোভিয়া স্বাভাবিক গলায় বলার চেষ্টা করলো,

“সে যদি নতুন জীবন শুরু করে তাহলে আপনিও পারবেন।”

 

“হ্যাঁ, আর এজন্য আমার আপনাকে প্রয়োজন।”

 

চমকে উঠলো জেনোভিয়া। আকাশ স্পর্শ করলো তার বিস্ময়,

“আমাকে মানে?”

 

রাজুমিখিন একটা আংটি উঁচিয়ে ধরলো জেনোভিয়ার সামনে। 

“আপনি কি আমার স্ত্রী হবেন?”

 

জেনোভিয়ার কর্ণদ্বার ঝিম মেরে গেল। বাক হারালো সে। শুধু দু চোখে বিস্ময়ের ধারা নিঃসৃত হচ্ছে। অনেকটা সময় সে বলতে পারলো না কিছুই। অবশেষে তীব্র রাগ ও বিরক্তির রূপ ধারণ করে তার কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এলো কথাটি,

“কী বলছেন এসব?”

 

___________________

 

মেয়েটা ক্ষণকাল পর পর তাকাচ্ছে, হাসছে। ওর হাসির মাঝে অদ্ভুত মিষ্টতা প্রকাশ পাচ্ছে। মেয়েটার চোখেও কী মিষ্টি হাসি। মেয়েটা নিজেও মিষ্টি। ওর পরনের কালো জামাটা হাঁটু পর্যন্ত থেমে গেছে আর নিচে নামেনি। পায়ে একজোড়া কালো জুতো। যার পিছনভাগ উঁচু। বাদামি চুলগুলো মাঝে মাঝে উড়ছে বাতাসে। এইতো আবারও…

মেয়েটা এই মাত্রই তাকিয়েছিল আবার। হেসেছিল। অদ্ভুত মিষ্টি হাসি! কিন্তু এই মিষ্টি হাসি বিষাক্ত করে তুলছে বেনিমকে। মেয়েটা অসহ্য! ভীষণ অসহ্য! এরকম করে কেন তাকায়? কেন হাসে? কেন বিরক্ত করছে তাকে? 

 

বেনিমের থেকে কতকটা দূরেই দাঁড়িয়ে আছে সাবিনা। অদ্ভুত মিষ্টি হাসির মেয়েটা সাবিনাই। একটা মেয়ের সাথে বাক্যালাপ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে খোলা উইন্ডোর কাছে। বেনিম বসে আছে টেবিলে। রেস্তোরাঁয় এই মুহূর্তে মানুষের আগমন মাঝামাঝি পর্যায়ে আছে। এখন বিকেলের শেষভাগ। বেনিম একদৃষ্টেই তাকিয়ে আছে সাবিনার দিকে। তার দৃষ্টি ভাবশূন্য। মনে পড়ে গেল গতকালকের কথা। গতকাল রাতে সে মেয়েটার প্রতি এতটাই বিরক্ত এবং ক্ষুব্ধ অনুভব করেছিল যে মেয়েটার মাথায় আ’ঘা’ত করে ওকে ফেলে দিয়েছিল। এমনটা সে করতে চায়নি, কিন্তু কী করবে, মেয়েটার ভাবসাবে প্রচণ্ড বিরক্ত হচ্ছিল সে। আচ্ছা, রোমেরো কি বুঝতে পেরে গেছে যে সাবিনাকে সে ফেলে দিয়েছিল? কী জানি! হতাশার দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললো বেনিম। রোমেরো এই শহরের মাঝে তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ এবং একমাত্র বন্ধু। সে চায় না রোমেরো তার প্রতি অসন্তুষ্ট হোক। না, তাহলে সত্যিই নিজেকে অপরাধী মনে হবে! মুখটা হঠাৎ আঁধারে ছেয়ে গেল বেনিমের। সে নিজেকে নিজে বোঝাতে চেষ্টা করলো, সে যা করেছে তাতে কোনো ভুল ছিল না। 

 

“রোমেরো!” বেনিম হঠাৎ রোমেরোকে ডাকলো। রোমেরো তার সামনের চেয়ারে বসে আছে। মিষ্টি স্বাদের একটা পানীয় পান করছিল। 

 

“তুমি কি কোনো কারণে অসন্তুষ্ট আমার উপর?” বললো বেনিম।

 

“আমি তেমনটা কেন বোধ করবো?”

 

বেনিম হাসলো। যাক, নিশ্চিন্ত হলো সে। কিন্তু রোমেরো আরেকটা কথা বলে তার হাস্য মুখ গম্ভীর করে দিলো,

“তবে অন্য একজনের প্রতি আমি অসন্তুষ্ট।”

 

বেনিম জিজ্ঞাসু চোখে তাকালো। রোমেরো অন্যমনা হয়ে পড়লো কিছু সময়ের জন্য। তারপর হঠাৎ হেসে দিয়ে বললো,

“আমি ভেবেছিলাম জেনোভিয়ার প্রেমিক ওকে উইশ করবে না, কিন্তু গতরাতে সে এসেছিল। উইশ করেছে। আজ সকালে আবার দেখলাম রাজুমিখিন নামের যে লোকটা আছে সে জেনোভিয়াকে স্ত্রী বানানোর জন্য প্রস্তাব রেখেছে।”

রোমেরো হাসতে লাগলো। হাসতে হাসতে বললো,

“না, বিষয়টা মানতে পারলাম না।”

 

(চলবে)

 

 রঙিলা রাতের কালো অশ্রু (২০)

লেখা: ইফরাত মিলি

___________________

 

“আপনি বলেছিলেন আপনার প্রেমিক আছে এবং আপনি তাকে খুব শীঘ্রই বিয়ে করবেন। কিন্তু আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম আপনার প্রেমিকের সাথে আপনার বিচ্ছেদ ঘটেছে অনেক আগে।”

 

জেনোভিয়ার রাগ মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো। লোকটাকে সকাল বেলা সবকিছু বুঝিয়ে বলেছে। কিন্তু এখন সন্ধ্যাবেলা সে আবার এসেছে এসব বলতে? তারাসের সাথে তার বিচ্ছেদ হয়েছে? কখন হয়েছে? কখনও হয়নি। যা হয়েছিল তা ছিল স্বল্পস্থায়ী একটু ঝামেলা। কিন্তু এখন তারাস আগের মতো হতে শুরু করেছে। কদিন পর ঠিকই তাদের ভিতরের ঝামেলা পুরোপুরি ঘুঁচে যাবে এবং তারা একটা সময় বিয়েও করবে। 

 

“আপনি আবার এসেছেন এসব বলতে?” জেনোভিয়ার কণ্ঠে স্পষ্ট রাগ আর বিরক্তির আভাস, “আমার যা বলার আমি সকাল বেলাই আপনাকে বলে দিয়েছি। এত মেয়ে থাকতে আপনি আমাকে কেন পছন্দ করলেন? আর কী বললেন? আমার প্রেমিকের সাথে আমার বিচ্ছেদ ঘটেছে? ভুল ভাবছেন আপনি। হয়তো কিছুদিন আমাদের সম্পর্কটা একটু অন্যরকম চলছিল, তার মানে এটা নয় যে আমাদের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটে গেছে। আমাদের সম্পর্ক ঠিক আছে। এটা সত্যিই যে আমরা বিয়ে করবো। আর আমাদের বিয়েতে অবশ্যই আমন্ত্রণ জানাবো আপনাকে।”

 

রাজুমিখিন শান্ত। এরকম পরিস্থিতিতে লোকটার এত শান্ত আচরণ জেনোভিয়াকে অবাক করছে। রাজুমিখিন প্রায় মিনিট আড়াইয়ের মতো নীরবতা পালন করলো। এতটুকু সময় সে ভাবনার পিছনে ব্যয় করেছে। বললো,

“ঠিক আছে, মানছি আপনার কথা। কিন্তু কখনও যদি মনে হয় আপনি আমার প্রস্তাবে রাজি হবেন, তাহলে বিষয়টা তখন আমায় নির্দ্বিধায় জানাতে পারবেন।” একটু থেমে আবার বললো,

“তবে মিথ্যা বলে কি ভালো করলেন? আপনার প্রেমিকের সাথে আপনার সত্যিই বিচ্ছেদ ঘটেছে। এটা সত্যি।”

 

জেনোভিয়া উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠলো,

“আজব! কবে, কখন, কীভাবে বিচ্ছেদ ঘটেছে? আপনি দেখেছিলেন? এত বেশি বোঝেন কেন?”

 

রাজুমিখিন আলতো হাসলো। তারপর কিছু না বলেই চলে গেল।

 

ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে এলো সাবিনা।

“এটা তুমি কী করলে জেনোভিয়া? লোকটাকে মিথ্যা বললে? তোমার আর তারাসের মাঝে তো…”

 

“তারাস আর আমার সম্পর্ক এখন স্বাভাবিক।”

 

“মিথ্যা বলছো তুমি। তুমি কিন্তু ভুল করছো। তারাসের প্রতি অন্ধ ভালোবাসা নিয়ে তুমি সব ভালো ছেলেগুলোকে হারাচ্ছ। এটা ঠিক নয়।”

 

“কোনটা ঠিক কোনটা বেঠিক এ বিষয়ে আমার যথেষ্ট জ্ঞান আছে সাবিনা। বরং তোমার সেই জ্ঞান নেই। তোমার যদি এই লোকটাকে ভালো লেগে থাকে তাহলে তুমি গিয়ে তাকে বিয়ে করো।”

 

“বেশ, খুব ভালো আমার কোনো জ্ঞান নেই। তোমার জ্ঞান নিয়ে তুমি থাকো।  তোমার বাড়িতে থাকবো না, সকাল হলেই চলে যাব।”

বলেই সাবিনা হনহন করে হেঁটে গিয়ে বেডরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো।

 

জেনোভিয়া বললো,

“চলে গেলে এখনই যাও, রাতটুকু থাকার দরকার কী? তাও আবার আমার বেডরুম আটকিয়ে?” 

জেনোভিয়া জানে বেডরুমের দরজা আজ সারারাত ধরে বন্ধ থাকবে। সাবিনা এমনই, ছোটোখাটো বিষয়ে রেগে যায়, অভিমান করে। 

 

_________________

 

লোকটা জেনোভিয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে? না প্রেমের? তারাসের মাথার শিরা দপদপ করছে। এক মুহূর্ত সুস্থির থাকতে পারছে না সে। যদি আজ সে জেনোভিয়ার বাড়িতে যাওয়ার কথা চিন্তা না করতো তাহলে তো বিষয়টা সম্পর্কে একদমই অজ্ঞ থাকতো। লোকটা বলে কি না তার আর জেনোভিয়ার বিচ্ছেদ হয়ে গেছে? কবে বিচ্ছেদ হলো? ওটাকে কি বিচ্ছেদ বলে? ওটা তো নামমাত্র বিচ্ছেদ ছিল। যার কোনো মূল্য নেই। একটা মূল্যহীন বিষয়কে নিয়ে মানুষ এখন জ্বালাতন করছে। একদম মানা যায় না এটা।

তারাসের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে উঠলো বিষয়টা। লোকটা কি আবারও কিছু বলতে আসবে জেনোভিয়াকে? কেন আসবে? বিষয়টা কিছুতেই মানতে পারবে না সে। লোকটাকে কিছু বলতে না পেরে শান্তিও আসছে না মনে। জেনোভিয়া বলার পরও লোকটা বিশ্বাস করেনি যে তাদের মধ্যে সব ঠিক আছে এখন। না, জেনোভিয়াকে আবার বিরক্ত করার আগে তার কিছু বলতে হবে লোকটাকে। বলতে পারলে শান্তিও আসবে মনে। নিজের ভাবনা মাড়িয়ে চললো না তারাস। সে বেরিয়ে পড়লো গাড়ি নিয়ে। লোকটাকে চেনে সে। বৃদ্ধা বেলকার কেসের সময় চিনেছে তাকে। বাড়ি কোথায় তাও জানে। 

 

রাজুমিখিন দরজা খুলে প্রথমে পুলিশ দেখে ঘাবড়ে গেল। অপ্রস্তুত হয়ে বললো,

“কী হয়েছে?”

 

তারাস রাজুমিখিনের দিকে একহাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো,

“আমি তারাস। আমাকে হয়তো আপনার মনে আছে। আমাদের এর আগে দেখা হয়েছিল থানায়।”

 

রাজুমিখিন একটু হেসে বললো,

“হ্যাঁ, আমি চিনি আপনাকে।”

 

“আচ্ছা। এটা কি জানেন আমি জেনোভিয়ার প্রেমিক?”

 

রাজুমিখিন আবার হাসে,

“জানি।” তারপর তারাসকে ঘরের ভিতরে ঢোকার আমন্ত্রণ জানিয়ে বললো,

“দয়া করে ভিতরে এসে বসুন।”

 

বলে রাজুমিখিন নিজেই ঘরে ঢুকলো। 

“বসুন।” তারাসকে বসতে বলে নিজেও বসলো, “এখন বলুন, কোন ব্যাপারে কথা বলতে এসেছেন?”

 

“যা বলার জেনোভিয়াই আপনাকে বলে দিয়েছে, কিন্তু দেখলাম আপনি সেসব বিশ্বাস করেননি। ওর প্রতিটা কথাই সত্যি। ওর সাথে আমার আসলে প্রকৃত বিচ্ছেদ ঘটেনি। আমাদের সম্পর্ক এখন ঠিক আছে। সুতরাং ওর সাথে যে বিষয়ে আপনার কথা হয়েছে সে বিষয়ে ওকে আর কিছু না বললে খুশি হবো।”

 

“ঠিক আছে, আপনার কথাও মানলাম। কিন্তু আপনি কি তাকে বিয়ে করবেন? ভালোবাসেন তাকে?”

 

প্রশ্ন দুটোয় বক্ষদ্বার কম্পিত হলো তারাসের। প্রথমে কিছুটা সংশয়, তারপর সে দৃঢ় গলায় স্বীকার করলো,

“হ্যাঁ ওকে বিয়ে করবো। আর অবশ্যই ভালোবাসি। ও সেটা ভালো করেই জানে।”

 

“ভালোবাসেন?” ব্যঙ্গাত্মক গলায় বললো রাজুমিখিন, “ভালোবাসলে অন্য একজনকে বিয়ে করতে গিয়েছিলেন কেন?”

 

তারাসের মাঝে রাগ, বিরক্তি এসে জায়গা দখল করে নিতে লাগলো। সে কিছু বলতে পারল না, তার আগে রাজুমিখিন বিদ্রুপ হেসে বললো,

“আপনি জেনোভিয়াকে ভালোবাসেননি, ভালোবাসেন না।”

 

তারাসের রাগটা বেড়ে গেল তরতর করে। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো। সে জেনোভিয়াকে ভালোবাসে কি না সেটা সে আর জেনোভিয়া জানলেই চলবে। এই লোকটা এসব বলার কে? লোকটাকে সে ভালোভাবে বুঝাতে আসছে বলে লোকটা যা তা বলার অধিকার রাখে না। আর সে  কেন নাতালিয়াকে বিয়ে করতে চেয়েছিল তা সে কাউকে বলতে চায় না। সে চায় না কেউ জানুক সে এখনও তার বাবার কথায় উঠবস করে। তারাস খুব কষ্টে নিজের রাগকে সংবরণ করে বললো,

“বিয়ে করতে গিয়েছিলাম, বিয়ে তো আর করিনি। কেন বিয়ে করতে গিয়েছিলাম সেটা আমার ব্যাপার। সেটা নিয়ে আপনার মাথা না ঘামালেও চলবে। আর জেনোভিয়াকে ভালোবাসি না কি বাসি না সেটা নিয়েও আপনার মাথা ঘামানোর দরকার নেই, সেটা জেনোভিয়া বুঝবে। আপনার মতো একজন মানুষ অবিশ্বাস করলেও জেনোভিয়া অবিশ্বাস করবে না। ও বিশ্বাস করলেই ওকে ভালোবেসে সন্তুষ্ট অনুভব করবো। অন্য কারোর বিশ্বাসে সন্তুষ্ট হওয়ার প্রয়োজন পড়বে না।”

 

তারাস উঠে দাঁড়ালো।

“ভালো থাকবেন। আশা রাখি জেনোভিয়ার সাথে আর কখনও কিছু বলতে যাবেন না ব্যাপারটা নিয়ে।” 

বলে বেরিয়ে এলো তারাস। আর থানায় গেল না সে। বাসায় চলে এলো। ডিউটির সময় শেষ হতে এখনও অনেক দেরি। হোক গে দেরি। সে এই মুহূর্তেই তার ডিউটির ইতি টেনে দিয়েছে আজকের মতো। তার মেজাজটা বিগড়ে আছে। মস্তিষ্কে আধিপত্য গড়ে তুলেছে ক্রোধ শিখা। জ্বলছেই শিখাটা। নিভুনিভু করতে করতে আবার জ্বলে উঠছে। লোকটা তার ভালোবাসায় সন্দেহ প্রকাশ করে? এতটা সাহস কোথায় পায় সে?

 

___________________

 

জরুরি সেবার গাড়িটা এসে থেমেছে রাজুমিখিনের বাড়ির সম্মুখে। হন্তদন্ত হয়ে দুজন মানুষ ছুটে গেল ভিতরে। কিছুক্ষণ পর র’ক্তাক্ত শরীরের একজন মানুষকে নিয়ে বেরিয়ে এলো তারা। ওটা রাজুমিখিন। এমনভাবে কে মা’রলো তাকে? রাত থেকে সে র’ক্তাক্ত শরীর নিয়ে পড়ে ছিল ঘরের ফ্লোরে। আজ ডেলিভারি বয় তার পার্সেল পৌঁছে দিতে এসে দেখতে পেল সে পড়ে আছে। মেঝেতে র’ক্ত, পরনের পোশাকে র’ক্ত, মাথায় র’ক্ত। দেখে সঙ্গে সঙ্গে জরুরি সেবায় কল দেয় ডেলিভারি বয়।  

 

থানায় রাজুমিখিনের উপর হা’মলার খবরটা পৌঁছলো একটু দেরিতে। খবরটা শুনে বেশ কিছুক্ষণ তাজ্জব হয়ে বসে রইল তারাস। 

থানা থেকে দুজন পুলিশকে পাঠানো হলো হাসপাতালে। রাজুমিখিন এখন চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছে। ওর জ্ঞান কখন ফিরবে বলা যাচ্ছে না। ওর জ্ঞান ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে সবাইকে। 

কয়েকজন পুলিশ রাজুমিখিনের বাড়ি প্রদর্শন করলো। কিন্তু কিছুই পাওয়া গেল না যাতে বোঝা যায় ওর উপর কে হা’মলা চালিয়েছে। 

 

দরজার কিঞ্চিৎ ফাঁকাংশ দিয়ে তারাস তাকিয়ে আছে রাজুমিখিনের দিকে। রাজুমিখিনের মাথায় ব্যান্ডেজ, হাতে ব্যান্ডেজ। অজ্ঞান শুয়ে আছে বেডে। মা’রলো কে ওকে? 

 

____________________

 

সাবিনা সত্যিই চলে গেছে জেনোভিয়ার বাড়ি থেকে। সকালে যখন জেনোভিয়ার ঘুম ভাঙে তখন থেকেই সাবিনাকে দেখতে পায়নি। তবে সে জানে, সাবিনা মা অথবা বাবার কাছে যায়নি। এই পৌর শহরেই জেনোভিয়ার বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে সাবিনার একটা বাড়ি আছে। সাবিনার বাবা সাবিনার নামে লিখে দিয়ে গেছে বাড়িটা। সাবিনা সেখানেই গেছে এখন। প্রত্যেক গ্রীষ্মেই যখন সাবিনা সেন্টপিটার্সবার্গ আসে তখন নিজের বাড়িতেও কিছুদিন থাকে। 

এই মুহূর্তে জেনোভিয়ার মস্তিষ্কে সাবিনার চিন্তা ঘুরছে না, তার চিন্তা অন্য কিছু নিয়ে।  আলসে দৃষ্টি জোড়া হ্রদের জলে নিবদ্ধ নিষ্পলক। আজকের দিনটার কথা ভাবছে আর কিছু ভালো লাগছে না ধরনের অনুভূতি হচ্ছে। এ বছর এত ঘটনা ঘটলো যে সবকিছু দেখতে দেখতে মনের মধ্যে একটা ভীতি ছায়া ঢুকে গেছে তার। সকল মা’রামারি, খু’নাখু’নির অবসান ঘটে গেছে ভেবেছিল, কিন্তু আজ রাজুমিখিনের ওই অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে কোনো কিছুরই অবসান ঘটেনি। সকাল বেলা ওরকম কিছু দেখবে কোনো কল্পনাও করেনি। ভাগ্যিস লোকটা বেঁচে আছে। প্রথম দেখে মনে হয়েছিল মা’রা গেছে। কে মা’রলো রাজুমিখিনকে? কারো সাথে কি তার শত্রুতা আছে? না কি কেউ ক্ষুব্ধ হয়ে মা’রলো? কী জানি! জেনোভিয়া কিছু ভেবে উঠতে পারছে না ঠিকঠাক। 

রোমেরো সাইক্লিং করছে। জেনোভিয়ার সামনে দিয়ে ইতোমধ্যে পাঁচবার যাওয়া আসা করেছে সে। জেনোভিয়াকে একবার বলেছিল,

“এই, আমার সাইকেলের পিছনের সিটটা কিন্তু খালিই পড়ে আছে, তুমি চাইলেই কিন্তু সিটটা দখল করতে পারো। আমি কিছু মনে করবো না।” 

 

জেনোভিয়া ওঠেনি ওর সাইকেলে। পরে যখন জেনোভিয়ার সামনে দিয়ে আবার যাচ্ছিল তখন দেখলো ওর সাইকেলের পিছনে বেনিম। বেনিমকে কোথায় পেয়েছে? সে যেখানে যায় বাকি সবাইও কি সেখানে যায়? না কি বাকি সবাই যেখানে থাকে সে সেখানে এসে পড়ে? জেনোভিয়া জানে না। আজকের দিনটায় কিছু ভাবতেও ক্লান্ত লাগছে। ভীষণ ক্লান্তি! ঘুম ঘুম পাচ্ছে, তবু ঘুমাতেও আলসেমি। 

এরমধ্যে সাইকেল থেকে একটা আইসক্রিম ছুঁড়ে মা’রলো রোমেরো। আইসক্রিমটা জেনোভিয়ার গায়ে এসে পড়ে জামায় লেপটে গেল অনেকখানি। তা দেখে সাইকেলের চাকা দুটো রুদ্ধ হয়ে গেল। জেনোভিয়া অগ্নি চোখে তাকালো রোমেরোর দিকে। রোমেরো বললো,

“দুঃখিত! আমি তোমাকে খেতে দিয়েছিলাম, তোমার জামাকে তো দিইনি।”

 

জেনোভিয়ার এতটাই রাগ হলো যে সে আইসক্রিমটা উঠিয়ে রোমেরোর দিকে ছুঁড়ে মা’রলো। রোমেরোর টি-শার্টের উপর আইসক্রিম পড়ে নোংরা হয়ে গেল টি-শার্টটা। এই ঘটনায় মোটেই খুশি হলো না বেনিম। সে জেনোভিয়াকে কিছু বলতে উদ্যত হলেই রোমেরো তার একটা হাত ধরে ফেললো। যার অর্থ, ‘থামো বেনিম’।

থেমে গেল বেনিম। রোমেরোর মুখে রাগ, বিরক্তি থাকার বদলে হাসি। সে হাস্যমুখে জেনোভিয়াকে বললো,

“যখন তুমি রাগ করো, তখন তুমি আমার দৃষ্টিতে একজন খু’নি হয়ে যাও। তোমার মাঝে একটা খু’নি রূপ দেখতে পাই আমি।”

 

রোমেরোর কথা শুনে তাজ্জব বনে গেল জেনোভিয়া। ভ্রু কুঁচকে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল ওর দিকে। 

রোমেরো নামলো সাইকেল থেকে। জেনোভিয়ার সামনে এসে দাঁড়িয়ে ওর চোখে চোখ রেখে বললো,

“রাগী চোখ দিয়ে তো আমায় খু’ন করো, কিন্তু রেগে গিয়ে এই হাত দিয়ে কাকে মা’রো?” জেনোভিয়ার দুই হাত নিজের দুইহাতে উঠালো রোমেরো। 

জেনোভিয়া রোমেরোর চোখে তাকিয়ে বিমূঢ় হয়ে পড়লো। সেই সন্দেহের চোখ রোমেরোর! রোমেরোর চোখে সন্দেহ ভাসছে। সন্দেহটা কি তার উপর? 

“তুমি আবার সন্দেহ করছো আমাকে?”

 

“ওকে তো তুমিই মে’রেছো, তাই না?”

 

জেনোভিয়া রোমেরোর হাত থেকে নিজের হাত সরিয়ে আনলো। কাঠিন্য কণ্ঠে বললো,

“কিছু না করা সত্ত্বেও বার বার আমাকে সন্দেহ করা বন্ধ করো।”

 

“ও তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল, তুমি ওর প্রতি রাগান্বিত ছিলে। তুমি ওকে মা’রতেই পারো। এতদিন কিছু হলো না ওর, কিন্তু যেই তুমি ওর প্রতি রাগান্বিত হলে তখনই ওর এই অবস্থা হলো। আমার সন্দেহ অস্বাভাবিক কিছু নয় জেনোভিয়া।”

 

জেনোভিয়া একবার বেনিমের দিকে তাকালো, তারপর আবার রোমেরোর দিকে তাকিয়ে বললো,

“ওর সামনে এসব বলার কি প্রয়োজন ছিল?”

 

“ও আমার বন্ধু।”

 

জেনোভিয়া হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে বললো,

“আমি কিছু করিনি। আমি তার প্রতি রাগ ছিলাম সেটা ঠিক। কিন্তু তাই বলে…

তুমি শুধু শুধু আমাকে পেরেশান করে তুলছো এসব বলে, আর কোনো কারণ নেই তোমার।”

 

“ভালো যে রাজুমিখিন বেঁচে আছে, না হলে আমি সত্যিই এবার পুলিশকে বিষয়টা জানিয়ে দিতাম।”

 

জেনোভিয়ার হৃৎপিণ্ড ধক করে উঠলো। আবারও সন্দেহ! সেই মারাত্মক সন্দেহটা আবারও তার উপর ছায়া ফেলেছে! সে রোমেরোকে দৃঢ়তার সাথে জানালো,

“আমি ওকে মা’রিনি।”

 

_________________

 

রাজুমিখিনের জ্ঞান ফিরলো দুই দিন পর। খবর পেয়েই থানা থেকে তারাস আর মাইককে নিয়ে ছুটে এলো ফেলিন। কয়েকদিন যাবৎ কোনো কেস নেই হাতে, নতুন একটা কেস তৈরি হওয়ায় ফেলিনকে খুব উৎফুল্ল দেখাচ্ছে। তবে তার এই উৎফুল্ল কতদিন থাকে তা বলা মুশকিল। সে রাজুমিখিনকে প্রথমে এসেই জিজ্ঞেস করলো,

“আচ্ছা বলো, সেদিন যে তোমাকে মে’রেছিল সে কে? তুমি চেহারা দেখেছিলে? তুমি কি বলতে পারবে কে ছিল সে? দয়া করে আমাদের বলো, যাতে আমরা তাকে ধরতে পারি। বলো।”

 

রাজুমিখিনের চোখ পিটপিট করছে। ভালো করে চোখ মেলতে পারে না সে। পিটপিটে চোখে তারাসের দিকে তাকালো। হঠাৎ ভয়ে হৃৎপিণ্ড কেঁপে উঠলো রাজুমিখিনের। চোখ সরিয়ে আনলো তাৎক্ষণিক। অন্য দিকে চোখ সরিয়ে নিয়ে চোখ খিঁচে ধরে তারাসের দিকে আঙুল নির্দেশ করে বললো,

“সে মে’রেছে।”

 

(চলবে)

 

 রঙিলা রাতের কালো অশ্রু (২১)

লেখা: ইফরাত মিলি

___________________

 

কয়েকটা অবাক চক্ষু ঘুরে গেল তারাসের দিকে। সবাই বিদ্যুৎ চমকানোর মতো চমকে উঠলো। তারাস নিজেও কম অবাক নয়। রাজুমিখিন তার দিকে আঙুল তুলেছে কেন? চোখে-মুখে গভীর বিস্ময়ের খাদ প্রস্ফুটিত তারাসের। ফেলিন অবাক চক্ষু জোড়া সরিয়ে এনে রাজুমিখিনের দিকে তাকালো। 

“ওর দিকে আঙুল তুলেছো কেন? ও মে’রেছে তোমাকে?”

 

রাজুমিখিন হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে বললো,

“হ্যাঁ।”

 

সবার অভ্যন্তরে স্পর্শি বিস্ময় নড়েচড়ে ওঠে আরও তুমুল বিস্ময়ের ঝড়ে। ভেঙে ভেঙে পড়তে থাকে সে বিস্ময়। ফেলিন তারাসের মুখের দিকে চাইলো। তারাস হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে রাজুমিখিনের দিকে। এমন কিছু শোনার জন্য সে একদম প্রস্তুত ছিল না। অবিশ্বাসের স্বরে বললো,

“কী বললে?” 

 

রাজুমিখিন মুখ ফিরিয়ে চাইলো তারাসের দিকে। তারাসের দিকে চেয়ে দৃঢ়তার সাথে ফেলিনের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে বললো,

“স্যার সেই মে’রেছে আমাকে।” 

 

তারাস মিথ্যা অপবাদে রেগে গেল। রাজুমিখিনের দিকে এগিয়ে এসে বললো,

“মাথা ঠিক আছে তোমার? আমি মে’রেছি?”

 

রাজুমিখিন ফেলিনকে বললো,

“স্যার সে একটা খু’নি। আমাকে মে’রেছে। প্লিজ গ্রেফতার করুন তাকে।” 

 

ফেলিন হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। তারাস ফেলিনের হতভম্ব মুখের দিকে তাকিয়ে ঢিমে গলায় ডাকলো,

“স্যার!”

 

___________________

 

“আপনি আমাকে অবিশ্বাস করছেন স্যার? আমি মা’রি’নি ওকে। আমি কেন মা’রতে চাইবো ওকে?” আকুল কণ্ঠে বললো তারাস।

 

“কারণ ও জেনোভিয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল।”

 

“আপনি রাজুমিখিনের কথা বিশ্বাস করছেন? আমি যদি ওকে মা’রতাম তাহলে কি আমার সেটা মনে থাকতো না? আমি ওকে মা’রিনি।”

 

“তাহলে ও তোমার নাম কেন বললো? সত্যি করে বলো তো, তুমিই মা’রোনি তো?”

 

তারাস ফেলিনের চোখে সন্দেহের ছায়া দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত কিছু বলতে পারলো না। সহসা বললো,

“আমি বুঝতে পারছি ও কেন এমন করেছে। জেনোভিয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে আমি ওর সাথে কথা বলেছিলাম, যেটা ওর পছন্দ হয়নি। এজন্য হয়তো মিথ্যা কথা বলে আমাকে ফাঁসাচ্ছে।”

 

“কিন্তু ও মা’র তো খেয়েছে সত্যিই। কে মা’রলো তাহলে?”

 

“কে মে’রেছে জানি না, কিন্তু আমি মা’রিনি। ও মিথ্যা বলেছে।”

 

ফেলিন তারাসের কথায় কর্ণপাত করলো না। মাইককে ডেকে বললো,

“শোনো মাইক, রাজুমিখিনের বক্তব্য যেন ঘুণাক্ষরেও সাংবাদিক পর্যন্ত না পৌঁছায়। জোরদার ভাবে নজর রাখো।”

 

তারাসের মেজাজ চড়ে গেল। প্রায় চেঁচিয়ে উঠলো সে,

“আপনি এমন আচরণ করছেন যেন আমি সত্যিই রাজুমিখিনকে মে’রেছি! আমি মা’রিনি।”

 

“হতে পারে জেনোভিয়াকে প্রোপোজ করেছে বলে রাগে দিগ্‌বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে তুমি ওকে মে’রেছো।”

 

“না আমি তা করিনি।”

 

“তোমার কাছে প্রমাণ আছে এ ব্যাপারে?”

 

ফেলিনের প্রশ্নে ফাটা বেলুনের মতো নিভে গেল তারাস। মাথা নাড়লো দুই পাশে। ফেলিন বললো,

“দেখো আমি নিশ্চিত নই তুমি মে’রেছো কি মা’রোনি। কিন্তু রাজুমিখিনের বক্তব্য যদি মিডিয়ার কান অবধি যায়, বুঝতে পারছো কী হবে তাহলে?”

 

তারাস মাথায় দুই হাত দিয়ে অসহায় ভাবে মাথা নুইয়ে ফেললো। সে বুঝতে পারছে কী হবে। রাজুমিখিনের এই বক্তব্য প্রচার হলে তার জীবনে মন্দ কিছু ঘটে যাবে। ভেনিইয়ামিনের কথা মনে আছে তার। যার কি না ভিক্টিমের মিথ্যা সাক্ষ্যর কারণে জীবন বরবাদ হয়ে গিয়েছিল। তার সাথেও কি এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনা আছে?  

তারাসের ভিতরকে অসহায়ত্ব দুর্বল করে দিচ্ছে। খুব যন্ত্রণা হচ্ছে মস্তিষ্কে। রাজুমিখিনকে অন্য কেউ মে’রেছে অথচ তার নাম বলছে! হঠাৎ এত শত্রুতা করছে রাজুমিখিন? 

 

ফেলিন কিছুটা অভয় দিয়ে বললো,

“শোনো তারাস, চিন্তা করার কিছু নেই। যদি মে’রেও থাকো তাহলেও চিন্তা করার কিছু নেই। ব্যাপারটা আমি বাইরে প্রকাশ হতে দেবো না।”

 

তারাস ফেলিনের দিকে তাকালো। ফেলিনের দু চোখে এখনও সেই অবিশ্বাসের পর্দাটা তিরতির করে কাঁপছে। ফেলিন বিশ্বাস করছে না তাকে! ফেলিনের ধারণা সেই মে’রেছে রাজুমিখিনকে। কিন্তু সে কেন মা’রতে চাইবে? রাজুমিখিন জেনোভিয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল বলে? সে তো বাচ্চা নয় যে রেগে গিয়ে রাজুমিখিনকে মে’রে র’ক্তাক্ত করবে। এটা ঠিক যে তার রাগ হয়েছিল, কিন্তু সে মা’রেনি। কিন্তু এ কথা বললে মানুষ বিশ্বাস করবেই বা কেন? ভিক্টিমের কথার উপর তো আর কোনো কথাই থাকতে পারে না। তারাস চোখ বুজে ফেললো। বিনা অপরাধে এমনভাবে ফেঁসে যাবে তা কোনোদিন আশা করেনি। 

 

“বাড়িতে গিয়ে বিশ্রাম নাও, আর ডিউটি করার দরকার নেই।”

 

ফেলিনের অনুমতি পাওয়ার পর আর থানায় থাকলো না তারাস। এমনিতেও তার পক্ষে থানায় বসে থাকা সম্ভব ছিল না। শরীরটা বড্ড দুর্বল লাগছে। সেই সাথে প্রচুর রাগও হচ্ছে রাজুমিখিনের উপর। 

 

__________________

 

রোমেরোর গিটারের টুংটুং আওয়াজটা থেমে গেল। উচ্চরবে ডাকলো সে,

“জেনোভিয়া, তুমি রাগ করেছো?”

 

কিচেন থেকে কোনো শব্দ শোনা যায় না। এবারও উত্তর দিলো না জেনোভিয়া। রোমেরো এমন উপেক্ষা পেয়ে অধৈর্য হয়ে উঠলো। নিজ দায়িত্বে ভুল সংশোধন করে বললো,

“আমি ভুল করেছি তোমাকে আবারও সন্দেহ করে। এটা ভীষণ অন্যায় হয়েছে আমার। তুমি চাইলে এর জন্য শাস্তি প্রয়োগ করতে পারো। জেনোভিয়া!”

 

না মেয়েটা আগের মতোই নীরব। গ্যাসের চুলা অন করে প্যানে তেল ঢাললো সে। তেল গরম হলেই একটা ডিম ছেড়ে দিলো তাতে। 

রোমেরো অধৈর্য হয়ে লিভিংরুম থেকে কিচেনে চলে এলো এবার। এসেই গ্যাসের চুলাটা বন্ধ করে দিয়ে বললো,

“এত অগ্রাহ্য করো না। আমার সহ্য ক্ষমতা কম। আমার ধৈর্য্যের পরীক্ষা নিয়ো না।”

 

জেনোভিয়া বিস্ময়াভিভূত। রোমেরোর আচরণ মাঝে মাঝে ভীষণ অন্যরকম হয়ে ওঠে। ভীষণ স্পর্ধা যুক্তও হয় ওর কাজ! এই মুহূর্তে ওর করা কাজটাকে কী বলবে জেনোভিয়া? অন্তর লালিত ক্রোধান্বিত শিখাটা একটু দর্প পেয়েই জ্বলতে আরম্ভ করলো। বললো,

“তুমি কি আমার থেকে দূরে থাকতে পারো না?”

 

“আমরা তো প্রতিবেশী, বন্ধু, তাই না?”

 

“না, আমরা নই।”

 

রোমেরোর আনোন খানিতে আঁধার আচ্ছাদিত হলো। বেশ গম্ভীর গলায় বললো,

“তাহলে নিশ্চয়ই আমরা শত্রু। চলো মে’রে ফেলি একে অপরকে।”

কথাটা বলেই জেনোভিয়ার সামনে থাকা চা’কুটা উঠিয়ে জেনোভিয়ার গলায় ধরলো। হেসে বললো,

“মা’রি?”

 

“মজা বন্ধ করো।”

 

“আমি সিরিয়াস।”

 

জেনোভিয়া রোমেরোর হাত থেকে চা’কুটা নিয়ে ফেলে দিলো। রোমেরোকে ঠেলে কিচেন থেকে বের করে দিয়ে বেশ বিরক্তি ঝরিয়েই বললো,

“দয়া করে নিজের বাড়িতে যাও। আমার বাড়িতে আর এসো না।”

 

“আমার বাড়িটায় যে আমি খুব একা। অমন একাকীত্ব নিয়ে থাকা যায়? তুমি কি আমার ঘরের মানুষ হবে? আমিও ঘরকুনো হয়ে যেতাম তাহলে।”

 

জেনোভিয়া অল্পক্ষণ চেয়ে রইল। বোঝার চেষ্টা করলো রোমেরোকে। অতঃপর বেশ শান্ত গলায় বললো,

“আমি অন্য কোনো ঘরের মানুষ।”

বলেই দরজা থেকে সরে এলো। 

 

রোমেরো আর কিছু বললো না। আলতো ঠোঁট টেনে হেসে বেরিয়ে এলো। বাইরে বেরিয়ে রোদের পরশ পেয়ে খানিকটা বিরক্তি আধিপত্য গড়লো তার মনে। যেখানে সে আকাশের গম্ভীর রূপকে মিস করছে, সেখানে বৃষ্টি তাকে ছুঁয়ে না দিয়ে কি না রোদ ছুঁয়ে দিচ্ছে? আ’ঘাত করলে যদি আকাশ কান্না করতো তাহলে আকাশের বুক ক্ষ’তবি’ক্ষত করে দিয়ে বৃষ্টি নামাতো সে। নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়ে আবার গতিপথ পরিবর্তন করে বেনিমদের বাড়িতে চলে এলো রোমেরো। 

 

বেনিম মায়ের মাথা আঁচড়িয়ে দিচ্ছে। অতি সযত্নে কাজটা করছে সে। এমন মমতাময়ী কাজ যেন আর হয় না। মায়ের মাথায় পরম ভালোবাসায় চুমু খেয়ে বললো,

“আমার মায়ের মতো আর কেউ শ্রেষ্ঠ নয়।”

 

সদর দরজা পেরিয়ে অভ্যন্তরে ঢোকার সময় বেনিমের কথাটা শুনতে পেয়ে রোমেরো হেসে বললো,

“আমার মা’ও কিন্তু কম শ্রেষ্ঠ নয়।”

 

বেনিম আর বেরি উইলো রোমেরোর দিকে তাকালো। বেনিমের পাশের আসন গ্রহণ করলো রোমেরো। বেরি উইলো বললেন,

“আজ আমরা পার্কে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছি। তুমিও কি আমাদের সাথে যোগ দিতে চাও রোমেরো?”

 

“আপনি বললে কি না করি আমি?” বললো রোমেরো।

 

বেরি উইলো হাসলেন। হাত বাড়িয়ে রোমেরোর গালে হাত বুলিয়ে আদর করে বললেন,

“বেনিমের মতো তুমিও লক্ষ্মী!”

 

__________________

 

আজকের দিনটা বাকি দিনগুলোর চেয়ে ভীষণ অন্যরকম কেটেছে তারাসের। কেউই যে তার কথা বিশ্বাস করেনি সেটা আজ ভালোভাবে বুঝতে পেরেছে। সবাই কমবেশি সন্দেহ করছে এখন। একজন সিনিয়র তো বলেই ফেললেন,

“কাজটা তুমি ঠিক করোনি তারাস। তোমার সাথে সাথে পুরো পুলিশ সমাজ লাঞ্ছিত হবে এবার।”

 

এই লোকগুলোকে কে বোঝাবে সে মা’রেনি! বিষয়টা অসহ্যকর হয়ে উঠেছে এখন। কাছের মানুষ গুলোও কেমন যেন বিশ্বাস করতে চাচ্ছে না তার কথা। ডিউটি শেষ করে বাড়ি ফিরে তারাস ঠিক ভূত দেখার মতোই চমকে উঠলো। তার ঘরের দরজার সামনে বসে আছে একটি মেয়ে। মেয়েটি আর কেউ নয়, নাতালিয়া। সেদিন যদি জেনোভিয়া ঝামেলা না করতো তাহলে এই মেয়েটাই এখন তার স্ত্রী থাকতো! ভাগ্যিস সেদিন বিয়েটা হয়নি। কথাটা মনে পড়ায় ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানালো তারাস। নাতালিয়ার দিকে এগিয়ে এসে শুধালো,

“তুমি এখানে?”

 

তারাসের কণ্ঠ শুনে চোখ তুলে তাকালো নাতালিয়া। তারাস আরও চমকে উঠলো, এ কী, মেয়েটার চোখে কি জল? খানিক অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো সে। কী হচ্ছে বুঝতে পারছে না। 

নাতালিয়া উঠে এলো। দু হাতের বন্ধনে তারাসকে জড়িয়ে ধরে বললো,

“আমি দুঃখিত। তোমাকে বোঝা উচিত ছিল আমার। ভুল করেছি আমি।”

 

তারাস স্তব্ধ হয়ে গেল। কিছু মুহূর্ত কিছু ভাবতে পারলো না সে। শুধু শুনতে পেল মাথার ভিতর ভোঁ ভোঁ শব্দ করে কী যেন একটা ওড়াউড়ি করছে।

 

_________________

 

প্রায় দেড় ঘণ্টার মতো সময় জুড়ে বাবার সাথে কথা বললো তারাস। স্বাভাবিক কথাবার্তা নয়, সহজ ভাষায় বলতে গেলে দেড় ঘণ্টার এই পুরোটা সময় বাবা-ছেলের মাঝে তুমুল ঝগড়ার তাণ্ডব বয়ে গেছে। নাতালিয়াকে মানিয়েছে তারাসের বাবা। বাবা যে এমন কিছু করবে এই ভয় কখনও করেনি তারাস। তার অনুমতি না নিয়ে নাতালিয়ার সাথে কেন কথা বলতে গেল বাবা? যে বাবার সাথে কখনও উঁচু গলায় কথা বলার সাহস হয়নি সেই বাবার সাথে সব কথা আজ চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলেছে! নাতালিয়ার সাথে রুক্ষ ব্যবহার করেনি তারাস। করা উচিতও হতো না। নাতালিয়ার কী দোষ? দোষ তো তার বাবার। বাবা কেন নাতালিয়াকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে তার কাছে পাঠালো? 

ফোন কাটার পরও রাগে এক খণ্ড আগ্নেয়গিরি হয়ে বসে রইল তারাস। তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় তার তার চোখ ফেটে জল চলে এলো। তার জীবনটা কখনও তার নিয়ন্ত্রণে চলে না। সে যেমন চায় তার জীবন কখনও সেরকম আচরণ করে না তার সাথে। যতই সে সুন্দরভাবে জীবনযাপন করতে চায় ততই সে অসুন্দর জীবনের আরও গভীরে প্রবেশ করে যায়।

 

ঠকঠক করে শব্দ শোনা গেল দরজায়। চোখ মুছে নিলো তারাস। জীবনটার প্রতি বড্ড অনীহা এসে গেছে তার। কোনো কিছু সহ্য করাও ভীষণ কঠিন হয়ে পড়ছে তার কাছে। সহ্য ক্ষমতা কমে গেছে। এখন মাঝে মাঝে যখন খুব ঝামেলাময় লাগে পৃথিবীটাকে, তখন সবকিছু ছেড়েছুড়ে চলে যেতে ইচ্ছে হয়। অসময় বিরক্তকারী মানুষটার উপর অন্য সময়ে যে পরিমাণে ক্ষুব্ধ হতো, আজ তার চেয়ে দ্বিগুণ ক্ষুব্ধ হলো তারাস। সে দরজা খুলে দিলো।

জেনোভিয়া এসেছে। জেনোভিয়ার মুখে চঞ্চলতা ছিল, কিন্তু তারাসকে দেখেই পলায়ন করলো সে চঞ্চলতা। সে এক ঝলক দেখেই বুঝতে পেরেছে তারাস ঠিক নেই।

তারাস দরজা খুলে দিয়েই সরে এসে বসলো সোফায়। জেনোভিয়া তারাসের পিছন পিছন এসে উৎকণ্ঠা হয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“তুমি ঠিক আছো?

 

জেনোভিয়া তারাসের পাশে বসলো। তারাসের চোখ লাল বর্ণ ধারণ করেছে। চোখের পাতায় রাজ্যের ক্লান্তি। মুখটা পাণ্ডুর লাগছে।

 

“তুমি কি অসুস্থ?” জেনোভিয়ার কণ্ঠ আরও উৎকণ্ঠিত শোনালো, “আমি কি কোনো ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করবো? তুমি কিছু খাবে?”

 

তারাস জেনোভিয়ার হাত ধরে বললো,

“আমাকে বিয়ে করতে তোমার আপত্তি আছে জেনোভিয়া?”

 

“তোমার কি মনে হয় না প্রশ্নের উত্তরটা তুমি নিজেই জানো?”

 

তারাস হাসলো। টেবিল থেকে মোবাইলটা নিয়ে কল করলো নাতালিয়ার কাছে। কল রিসিভ হলেই বললো,

“দুঃখিত নাতালিয়া, বিনা দোষেই তোমাকে বার বার কষ্ট দেওয়ার জন্য। দুঃখিত আমি,  আমি কখনও ভালোবাসিনি তোমাকে। আমার পক্ষে আর সম্ভব নয় বাবার কারণে তোমার সাথে জোর করে একটা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা। আমি জেনোভিয়াকে ভালোবাসি।”

 

জেনোভিয়া মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল। অতর্কিতে তার মনে হলো জীবন এতও সুন্দর হতে পারে? জেনোভিয়ার চোখ অশ্রু টলমল হলো।

 

(চলবে)

__________________

 

ভীষণই সাদামাটা একটা পর্ব।

 

 রঙিলা রাতের কালো অশ্রু (২২)

লেখা: ইফরাত মিলি 

___________________

 

রাজুমিখিনের সুস্থ হতে প্রায় এক মাস লেগে গেল। তবে তারাসের মনের ভিতরটা সুস্থ হলো না। রাজুমিখিনকে কে মে’রেছে তা খোলাসা হয়নি। কেসটা এগোয়নি বেশিদূর। তবে রাজুমিখিনের সেই বক্তব্যের কারণে অনেকেই তারাসকেই সন্দেহ করছে এখনও। যার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে তারাস বিড়ম্বনা অনুভব করছে। কিন্তু জীবন এমনই। কিছু কিছু দোষারোপ আসবে। সেই দোষারোপ যে মিথ্যা সেটা প্রমাণ করারও কোনো দলিল থাকবে না। কিন্তু তাই বলে মানসিক ভাবে ভেঙে পড়লে চলবে না। মনকে শক্ত রাখাই মানুষের সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধ। আর যে এই যুদ্ধ করতে পারে সে সুখী মানুষ। 

 

সদ্যই তারাসের মা কল করেছিল। তারাসকে ডেকেছিল মস্কোতে, কোনো এক মেয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু তারাস মাকে জানিয়ে দিয়েছে জানুয়ারির এক তারিখে জেনোভিয়া আর সে বিয়ে করবে। কথাটা শুনে মা কান্নাকাটি শুরু করেছে। বাবাও রাগারাগি করেছে খুব। তবে তারাস এখন ওসব গ্রাহ্য করে না। সে এখন মানে, ভালো থাকতে হলে নিজের সিদ্ধান্তের উপর দৃঢ় থাকতে হবে। 

হঠাৎ আওয়াজে তারাসের ধ্যান ভাঙলো। তাকিয়ে দেখলো লিওনিদ। 

লিওনিদ বললো,

“খেতে চলো।”

 

“আসছি।”

 

লিওনিদ চলেই যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎই ডেস্কের উপর থেকে ঘড়িটা তুলে বললো,

“ওয়াও! জেনোভিয়ার জন্য কিনেছো? কোন শপ থেকে?”

 

“কেন তুমিও তোমার গার্লফ্রেন্ডকে গিফট করতে চাও?”

 

“হুম।”

 

“তাহলে বলবো না। খেতে চলো।”

বলে তারাস উঠে পড়লো চেয়ার ছেড়ে।

 

লিওনিদ তারাসের পিছন পিছন যেতে যেতে বললো,

“এটা ঠিক নয়। তুমি কিন্তু আমার দেখাদেখি অনেক গিফট দিয়েছো জেনোভিয়াকে। তারাস…”

 

ফেলিন তারাস আর লিওনিদকে দেখে বললো,

“কোথায় যাচ্ছ তোমরা?”

 

লিওনিদ বললো,

“আপনি কি চান আমরা মরে যাই?”

 

“এই প্রসঙ্গ কেন তুললে?”

 

“তো? কিছু না খেলে তো মরেই যাব তাই না?”

 

“ম’রে গেলে যাও, কিন্তু মরার আগে প্লিজ একটা উপকার করে দিয়ে যাও।”

 

“কী উপকার?”

 

ওদের আর খাওয়া হলো না। ফেলিন সুযোগ বুঝে কাজ চাপিয়ে দিয়েছে। লিওনিদ গাড়িতে উঠে বললো,

“যেখানে যাই হোক না কেন আমাদেরই কেন পাঠানো হয়? আর কেউ কি নেই?”

 

তারাস বললো,

“তোমার কী মনে হয়, ব্যাগটার ভিতর কী আছে আসলে?”

 

“জানি না। হয়তো কোনো পচা মাছ। ছি শেষমেশ পচা মাছের জন্য জন্য যাচ্ছি?”

 

তারাস হেসে ফেললো,

“থামো লিওনিদ।” পর মুহূর্তেই তার ঠোঁট থেকে হাসি মুছে গেল,

“আচ্ছা যদি ব্যাগের ভিতর সত্যিই মানুষের বডির পি’স পাওয়া যায়? তাহলে কী হবে?”

 

“কী আর হবে? ফেলিন স্যার আবারও কিছু দিনের জন্য পাগল হয়ে যাবে।”

 

রেস্টুরেন্টের নাম দেখে লিওনিদ বললো,

“স্টপ, আমরা এসে গেছি।”

 

তারাস একবার চোখ বুলালো নেমপ্লেটে। তারপর রেস্টুরেন্টের সামনে তাকিয়ে ছোটো মতোন একটা জটলা দেখতে পেল। ওরা নামতেই একজন এগিয়ে এসে বললো,

“আসুন স্যার, দেখুন ওই ব্যাগটায়।”

 

ওরা দেখলো কালো একটা ব্যাগ, মাঝারি আকৃতির। একজন বয়স্কা মহিলা আর্তনাদ করে উঠলো,

“হায় ঈশ্বর! না জানি কী আছে ব্যাগের ভিতর। কোনো মানুষের…”

 

লিওনিদ বিরক্ত হয়ে বললো,

“আমাদের দেখতে দিন আগে, তারপর মন্তব্য করুন।”

 

লিওনিদ এগিয়ে গেল। ভ্যাপসা দুর্গন্ধ আসছে ভিতর থেকে। নাক চেপে ব্যাগের বন্ধ মুখ খুলতেই দুর্গন্ধটা আরও প্রখর হলো। দূরে সরে এলো লিওনিদ। তারাস জিজ্ঞেস করলো,

“কী আছে?”

 

“বিড়াল।”

 

“কী?”

 

“আমি বুঝতে পারছি না বিড়ালগুলো কে মা’রছে? তোমার মনে আছে এর আগেও আমরা একটা মৃত বিড়াল পেয়েছিলাম? এই বিড়ালটাকে একবার দেখো।” 

লিওনিদ আবারও এগিয়ে এসে ব্যাগের ভিতরটা ভালো করে দেখলো।

“বিড়ালটাকে কেউ কে’টে টু’করো টু’করো করেছে!”

 

তারাস ফেলিনকে ফোন করে জানালো ঘটনা সম্পর্কে। সব শুনে ফেলিন বললো,

“ঠিক আছে, তোমরা ফিরে এসো।”

 

“বিড়ালের ব্যাপারটার কী হবে স্যার?”

 

“এখন বিড়াল নিয়েও তোমাদের হৈ-হুল্লোড় করতে হবে?”

 

“কিন্তু এরকমভাবে কে মা’রলো সেটা…”

 

“তর্ক করো না। ফিরে আসতে বলেছি ফিরে এসো।”

 

__________________

 

“তোমার জন্য রান্না করে রাখবো। তাড়াতাড়ি আসবে। ঠিক আছে? বাই।”

 

জেনোভিয়ার ফোনে কথা বলাও শেষ হলো আর বাসও থামলো। বাস থেকে নেমে এলাকার রাস্তা ধরলো সে। স্ট্রিট লাইটের নিয়ন আলো তাকে সাদরে পথ চিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এখানে লাইটের অবস্থা ভালো, কিন্তু তার বাড়ির ওদিকটায় লাইটের অবস্থা তেমন ভালো নয়। ওগুলোয় আলো কম, অনেকগুলো লাইট আবার নষ্ট। লাইটগুলো ঠিক করার জন্য কোনো উদ্যোগও গ্রহণ করছে না কেউ। জেনোভিয়ার মনে হলো লাইটগুলো দ্রুত ঠিক করে ফেলা দরকার। কিন্তু তার মনে হওয়ায় কী যায় আসে, এও ভাবলো জেনোভিয়া।

 

শুনসান রাস্তা। জনমানব চোখে পড়ছে না। দুয়েকটা বাড়ির জানালায় তাকালে একটা-দুটো মুখ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু কিছুদূর হেঁটে আসার পর তাও আর দেখা গেল না। জেনোভিয়ার হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে হলো সে যে স্থানে আছে সেখানে সে ব্যতীত আর কোনো মানুষ বাস করে না। সে কি পৃথিবীর বাইরের কোনো গ্রহে আছে? জেনোভিয়া নিজের ভাবনায় অপ্রসন্ন হলো। একা একা হাঁটলে এমন অদ্ভুত সব চিন্তাই তার মস্তিষ্কে ঘুরপাক খায়। না জুরাকে সাথে নিয়ে আসা উচিত ছিল। আজ কেন যে বাড়িতে রেখে আসলো ওকে! হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একবার পিছনে তাকালো জেনোভিয়া। নিতান্তই অকারণে। কিন্তু এই অকারণই ভয়ংকর কারণ রূপে বাড়ি খেলো তার হৃ’ৎপিণ্ডের সাথে। জেনোভিয়া পিছনে তাকিয়ে দেখতে পেল তার থেকে অনতিদূরে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে আছে বললে ভুল হবে, বরং বলা ভালো জেনোভিয়া তাকানো মাত্র লোকটা থেমে গেছে। লোকটা কি অনুসরণ করছে তাকে? জেনোভিয়ার শ্বাসনালি চেপে ধ’রলো ভয়ের অদৃশ্য সত্তা। সে দ্রুত পায়ে হাঁটতে আরম্ভ করলো। পিছনে লোকটাও হেঁটে আসছে। তার পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছে জেনোভিয়া। লোকটা যেন তার সাথে পাল্লা দিয়ে হাঁটছে। জেনোভিয়া হাঁটতে হাঁটতে পিছন ফিরে দেখলো লোকটার গতি খুবই দ্রুত। হয়তো এখনই ধরে ফেলবে তাকে। ভয়ে বুকের ভিতর হা’তুড়ি পিটছে। জেনোভিয়ার পায়ের গতি হাঁটা থেকে দৌড়ে রূপান্তর হলো। পিছনের লোকটাও যে দৌড়ে আসছে তাকে ধরার জন্য তা বুঝতে বিন্দুমাত্র কষ্ট হলো না। মেইন রোড থেকে গলির রাস্তায় ঢুকে পড়লো জেনোভিয়া। মোবাইল বের করে তারাসকে কল দিতে চাইলো, কিন্তু সেই সুযোগ আর হলো না। ততক্ষণে লোকটা তার খুব কাছে এসে গেছে। লোকটা জেনোভিয়ার চু’ল আঁকড়ে ধরে প্রায় ছুড়ে ফেললো রাস্তায়। ব্যথা পেয়ে চিৎকার করলো জেনোভিয়া। দুই হাত দিয়ে মাথা চে’পে ধরলো। হয়তো মাথা ফে’টে গেছে তার। লোকটা এগিয়ে এলো। লা’থি মা’রলো জেনোভিয়ার পেটে। প্রায় কয়েকটা লা’থি। জেনোভিয়ার দম বন্ধ হয়ে এলো। ভয়, কষ্টে তার চোখ দিয়ে অনর্গল জল গড়িয়ে পড়ছে। ব্যথায় নীল হয়ে গেছে মুখ। এটাই কি মৃত্যুক্ষণ? মাথার ভিতরটা নীরব হয়ে আসছে জেনোভিয়ার। তার মস্তিষ্ক কি নিজ কার্য থামিয়ে দিচ্ছে? সে কি এখনই মারা যাবে? মুখে কিছু একটার বা’ড়ি লাগলো। ফরসা চামড়া লাল হয়ে গেল বাড়ি লাগার কারণে। নাক দিয়ে র’ক্ত পড়তে লাগলো। জেনোভিয়া আর কিছু ভাবতে পারছে না, শুধু টের পেল নৃ’শংস ব্যক্তিটা আবারও একবার আ’ঘাত করেছে তার মাথায়। সম্পূর্ণ নেতিয়ে পড়লো জেনোভিয়ার শরীর। দু চোখে আঁধার নামবে এক্ষুনি। কিন্তু পুরোপুরি আঁধার নামার আগেই একটু দূর থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠের ডাক ভেসে এলো,

“জেনোভিয়া!” 

 

কেউ একজন ডাকলো এইমাত্র। ওই একটুখানি ডাকেই জেনোভিয়ার বুকের মাঝে বাঁচার আলোটা জ্বলজ্বল করে উঠলো। বন্ধ চোখের পাতা খুললো খুব কষ্টে। নিভুনিভু চোখের তারায় ফুটে উঠলো একটি পরিচিত মুখ। রোমেরো দৌড়ে আসছে তার দিকে।

রোমেরো এসে কাছে বসতেই জেনোভিয়া তার নিভে যাওয়া গলায় কোনো রকমভাবে বললো,

“প্লিজ সাহায্য করো!” 

 

কিন্তু সে কথা শুনতে পেল না রোমেরো। ওই নিভে যাওয়া কণ্ঠস্বর শুনতে পাওয়ার কথাও নয়। 

 

___________________

 

“কি আবারও হা’মলা? কোথায়?” ফেলিনের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর থানার সকলের মনোযোগ কাড়তেই সক্ষম হলো।

 

“ওহ আমি পাগল হয়ে যাব। হ্যাঁ আসছি। হ্যাঁ এক্ষুনি আসছি আমরা।” ফেলিন কল কেটে দিয়ে সকলের উদ্দেশ্যে বললো,

“আবারও একটা হা’মলার ঘটনা ঘটেছে। আমাদের যেতে হবে। তৈরি হও সবাই।” 

বলেই ফেলিন আগে আগে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। পিছন পিছন বেরিয়ে এলো আরও কয়েকজন। ড্রাইভিং সিটে উঠে বসলো তারাস। হা’মলার স্থানের সম্পর্কে শুনে ছোটোখাটো একটা ঝটকা লাগলো তার। ওটা তো জেনোভিয়ার এলাকা। 

 

ঘটনাস্থলে ইতোমধ্যে জরুরি সেবার এম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে আছে। ভিক্টিমকে ওঠানো হচ্ছে এম্বুলেন্সে। গাড়ি থেকে বের হয়েই দৃশ্যটা দেখতে পেল তারাস। আর যখনই ভিক্টিমের মুখটা দেখলো তখনই থমকে গেল তার পৃথিবী। শূন্য হয়ে এলো মাথার ভিতরটা। দৃষ্টি জোড়াও রুদ্ধ হয়ে গেল। 

 

__________________

 

“আমি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম। আর তখনই দেখলাম একজন জেনোভিয়াকে মা’রছে। এটা দেখে আমি চিৎকার করলাম।” 

 

ফেলিন বললো,

“তো তুমি চিৎকার করেছো বলেই লোকটা পালিয়ে গেছে?”

 

রোমেরো হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো। 

 

“মুখ দেখেছিলে হা’মলাকারীর?”

 

“মুখে মাস্ক পরা ছিল।”

 

“লোকটার সম্পর্কে কিছু বর্ণনা দিতে পারবে?”

 

রোমেরো ভেবে বললো,

“উম… লোকটা প্রায় ছয় ফুট দুই ইঞ্চির মতো লম্বা হবে। শুকনো শরীর ছিল। আর হ্যাঁ, সে বাম হাত দিয়ে মে’রেছিল।”

 

রোমেরোর শেষ কথায় সকলের চোখই স্ফীত হয়ে উঠলো। একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো সবাই। ফেলিন বললো,

“কী? তুমি শিওর? হা’মলাকারী নিজের বাম হাত ব্যবহার করেছিল?”

 

“হ্যাঁ, আমি স্পষ্ট দেখেছি।” 

 

ফেলিন নির্বাক হয়ে গেল। বৃদ্ধা আর পলিনার খু’নিও তো বামহাতি ছিল। তাহলে কি সেই খু’নিই জেনোভিয়ার উপর হা’মলা চালিয়েছে? কিন্তু সেই খু’নের দায়ে তো এখন পাভেল বন্দি। পাভেল তো নিজের মুখে স্বীকার করেছিল সে খু’নি। কী হচ্ছে এসব? ফেলিনের কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠলো। 

 

“আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন স্যার?”

 

“না। তুমি যেতে পারো।”

 

“ধন্যবাদ।”

 

রোমেরো বাইরে বের হয়ে তারাসের খোঁজ করলো। মাইক জানালো তারাস হাসপাতালে আছে। কথাটা শুনে ভালো লাগলো না রোমেরোর। বললো,

“তাকে বলবেন তার এত হাসপাতালে থাকার দরকার নেই। পুলিশ হিসেবে যতটুকু কাজ ততটুকুই যেন করে। অতিরিক্ত কাজের জন্য তাকে কি মাইনে দেওয়া হবে?”

 

“আপনি বোধহয় জানেন না যে জেনোভিয়া ওর…”

 

“আমি জানতে আগ্রহী নই। ধন্যবাদ।” 

বলে রোমেরো থানা থেকে বের হয়ে গেল। 

 

_________________

 

নিস্তব্ধ একটা ঘর। শুধু সেই নিস্তব্ধতার বুক চিরে ভেসে আসছে বাঁশির সুরের মতো ধারালো একটি সুর। এটা বাঁশি দিয়ে সৃষ্ট কোনো সুর নয়। তাহলে? সুরটা কীসের?কেউ একজন ঠোঁটের সাহায্যে এই সুর সৃষ্টি করেছে। বেরি উইলো সুর অনুসরণ করে উপরের তলার একটা রুমের দরজায় এসে দাঁড়ালেন। জানালার সামনে চেয়ারে বসে আছে সেই ব্যক্তি যে কি না এই সুর সৃষ্টি করে চলেছে। বেরি উইলো মানুষটার পিছন দিকটা দেখতে পাচ্ছে। এই সুরে অদ্ভুত কিছু আছে। এই সুর শুনলেই বেরি উইলোর বুকের ভিতরটা কাঁপে। অসহ্য একটা সুর। তার দু কান সহ্য করতে পারে না এই সুর। সেই মানুষটার দিক থেকে এবার ভেসে এলো সুরেলা কিছু গানের কথা,

‘This night is mine,

It’s just me. 

I am the king of the black night.

I love warm b’lood and human s’creams!

O…O…O…

I am the king of d’arkness…’

 

বেরি উইলোর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। ডান হাতটা মৃদু কাঁপছেও তার। এই গান তার মস্তিষ্ককে বিকল করে দিতে চায়। দুই কান চেপে ধরতে ইচ্ছা হয় বেরি উইলোর। এই গান সে অতীতেও কখনও সহ্য করতে পারেনি, আর এখনও না। গানের কণ্ঠ এখনও সচল। বেরি উইলো দুর্বল পা ফেলে এগিয়ে এলেন জানালার ধারে। যেখানে গান গাওয়া মানুষটা বসে আছে। বেরি উইলো দেখতে পেলেন মানুষটার বাম হাতের পেন্সিলটা হার্ডবোর্ডের উপর বিরতিহীনভাবে দাগ কাটছে। আর সেই দাগে ফুটে উঠেছে অদ্ভুত একটা চিত্র। একটা মানুষের আকৃতি আর একটা হাতুড়ি। যদিও অঙ্কন খুবই বাজে, কিন্তু ফুটিয়ে তোলা চিত্র দুটো বুঝতে বেরি উইলোর সমস্যা হলো না। বেরি উইলো আতঙ্কে এক পা দূরে সরে এলেন। আর তখনই থেমে গেল অঙ্কন শিল্পীর পেন্সিল। চকিতে সে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো বেরি উইলোর দিকে। 

 

(চলবে)

 

 রঙিলা রাতের কালো অশ্রু (২৩)

লেখা: ইফরাত মিলি

___________________

 

“ড্রয়িংটা সুন্দর না মামা?”

 

বেনিমের প্রশ্নে সম্বিৎ ফেরে বেরি উইলোর। সে ঠোঁট টেনে কৃত্রিম হাসার চেষ্টা করে। এগিয়ে এসে বেনিমের বাম হাত থেকে পেন্সিলটা নিয়ে ডান হাতে দিয়ে বললেন,

“তুমি কি শুধু তোমার ডান হাতটা ব্যবহার করতে পারো না সোনা?”

 

“সৃষ্টিকর্তা আমাকে দুই হাত সমানভাবে ব্যবহারের ক্ষমতা দান করেছেন। সৃষ্টিকর্তার এই দানকে আমার অবহেলা করা উচিত নয়। উচিত?”

 

বেরি উইলো না বোধক মাথা নেড়ে বেনিমকে জড়িয়ে ধরেন। দুই নেত্র বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রুধারা। বললেন,

“তোমার এই ক্ষমতাকে লুকিয়ে রাখা উচিত বেনিম।”

 

___________________

 

“আপনাকে দেখে ভীষণ ক্লান্ত মনে হচ্ছে মি. তারাস। আমার মনে হয় আপনার চলে যাওয়া উচিত।”

 

রোমেরোর কথায় তারাস পাশ ফিরে তাকালো ওর দিকে। রোমেরো বললো,

“তাছাড়া আপনি একজন পুলিশ। কাজকর্ম ফেলে এখানে বসে থাকলে চলবে না আপনার। নিজের দায়িত্ব পালন করতে হবে। আপনাকে তো থানায় প্রয়োজন হতে পারে। শুনেছি স্থানীয় একটা শপে না কি ডা’কাতি হয়েছে। ওখানেও তো আপনাকে প্রয়োজন হতে পারে।”

 

তারাস রোমেরোর থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে এনে জেনোভিয়ার দিকে তাকালো। জেনোভিয়ার মুখ ক্লান্ত, ফ্যাকাশে। ওর অবস্থা তত মারাত্মক নয়। মাথায় আর পেটে আ’ঘাত পেয়েছে। আ’ঘাতগুলো গভীর নয় বলে সেরে উঠতে কম সময় লাগবে। জেনোভিয়া বললো,

“আমি ভালো আছি। তুমি যাও।”

 

রোমেরোও তাল মিলিয়ে বললো,

“হ্যাঁ, আপনি যান। আমি খেয়াল রাখবো জেনোভিয়ার।”

 

তারাসের ইচ্ছা হচ্ছে না চলে যেতে, কিন্তু তার যাওয়া উচিত। কাজ ফেলে বসে থাকলে হবে না। জেনোভিয়াকে কে মে’রেছে তাও তো খুঁজে বের করতে হবে। তারাস জেনোভিয়ার গালে চুমু খেয়ে বললো,

“তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠো আমার ভালোবাসা।”

 

তারাসের আবেগ মিশ্রিত কথা জেনোভিয়ার চোখে জল এনে দিলো। তারাস আরও একবার চুমু খেয়ে চলে গেল। যাওয়ার সময় রোমেরোকে বলে গেল,

“ওর যত্ন নিবেন। আমি সাবিনাকে পাঠিয়ে দেবো শীঘ্রই। তখন আপনাকে আর কষ্ট করতে হবে না।”

 

রোমেরোর বলতে ইচ্ছে হয়েছিল,

‘কোনো সাবিনা-টাবিনাকে পাঠানোর দরকার নেই। আমার মানুষের জন্য কষ্ট করার জন্য আমিই যথেষ্ট।’

কিন্তু সহসা তার মনে পড়লো, জেনোভিয়া তার মানুষ নয়। জেনোভিয়া তারাসের মানুষ। তার মানুষের নাম ছিল দিনা। রোমেরো প্রত্যুত্তরে শুধু হাসলো। 

 

“ধন্যবাদ।” জেনোভিয়ার কণ্ঠস্বরে ওর দিকে তাকালো রোমেরো। জিজ্ঞেস করলো,

“কীসের জন্য?”

 

“তোমার জন্যই তো বেঁচে আছি। তুমি যদি তখন না আসতে হয়তো এখন মৃ’ত থাকতাম!”

 

রোমেরো জেনোভিয়ার পাশে এসে দাঁড়ালো। জেনোভিয়ার একহাত ধরে বললো,

“মরবে না তুমি, আমি বাঁচাবো তোমাকে।”

 

অদ্ভুত কিছু ছিল রোমেরোর কথায়। অভয় পেল জেনোভিয়া, সকল চিন্তাও কেটে গেল। 

রোমেরো বললো,

“তুমি কি এরপর থেকে আমার সাথে একটু ভালো আচরণ করবে? তোমার আচরণ কিন্তু খুবই বাজে।”

 

জেনোভিয়া এই মুহূর্তেও হেসে ফেললো রোমেরোর কথা শুনে। রোমেরোও হাসলো। হঠাৎ বললো,

“আচ্ছা যে তোমার উপর হা’মলা করেছে তাকে কি চিনতে পেরেছো?” 

 

এই একই প্রশ্ন তারাসও করেছিল। জেনোভিয়া তারাসকে দেওয়া উত্তরটাই রোমেরোকেও দিলো,

“না। সে মুখে মাস্ক আর মাথায় ক্যাপ পরা ছিল। আমি মুখ দেখতে পাইনি। সে সম্পূর্ণ কালো পোশাক পরা ছিল।”

 

“স্বাভাবিক। খু’নিরা হয়তো কালো রং বেশি পছন্দ করে।”

 

“জেনোভিয়া!” বিকট এক ডাক ভেসে আসে দরজার কাছ থেকে। জেনোভিয়া আর রোমেরো একই সঙ্গে তাকালো। দেখলো সেখানে দুঃখী মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাবিনা। সাবিনা এবার দৌড়ে ভিতরে ঢুকলো। রোমেরো যে দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করলো না সে। দৌড়ে এসে রোমেরোকে প্রায় ধা’ক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে রোমেরোর স্থান দখল করে দাঁড়ালো। রোমেরো অবাক হয়ে দেখলো ওকে, আর ভাবলো, পাগল না কি? 

 

সাবিনা আসায় জেনোভিয়া রোমেরোকে বাড়িতে যাওয়ার জন্য বললো। 

রোমেরো প্রথমে আসতে চাইছিল না, পরে কী ভেবেই আবার চলে এলো। এখন রাত অনেক। অন্ধকার রাস্তা দিয়ে আসার সময় রোমেরোর ভয় ভয় করছিল। কেন যে এখানকার স্ট্রিট লাইটগুলো ঠিক নেই! বেনিমের বাড়ির সম্মুখ থেকে আসার সময় হঠাৎ বেনিমের ডাক শুনতে পেল,

“রোমেরো!”

 

রোমেরো থামলেই বেনিম দৌড়ে এলো ওর কাছে। 

“কোথায় গিয়েছিলে তুমি? আমি তোমাকে অনেকবার খুঁজেছি। কিন্তু তুমি তোমার বাড়িতে ছিলে না।”

 

“হাসপাতালে ছিলাম।”

 

বেনিম উৎকণ্ঠা হয়ে বললো,

“কেন? কী হয়েছে তোমার?”

 

“আমার না, জেনোভিয়ার। তুমি বোধহয় শোনোনি, জেনোভিয়ার উপর অ্যা’টাক হয়েছে!”

 

“কী?” চমকে উঠলো বেনিম, “কীভাবে?”

 

“জেনোভিয়া কাজ শেষ করে করে বাড়ি ফিরছিল, পথে আ’ক্রমণ করা হয়। জেনোভিয়া মাথায় এবং পেটে আ’ঘাত পেয়েছে।”

 

বেনিমের হৃৎপিণ্ড কেঁপে ওঠে আতঙ্কে,

“ওহ ঈশ্বর! এখন কেমন আছে জেনো?”

 

“হুম, ভালো। সুস্থ হতে বেশি সময় লাগবে না।”

 

বেনিমের মুখখানি দুঃখের ছায়ায় ছেয়ে গেছে। জানতে চাইলো,

“কে মে’রেছে ওকে?”

 

“তা কারোরই জানা নেই। তবে তদন্ত করা হবে।” রোমেরো থেমে গিয়ে আবার হঠাৎ বললো,

“একটা কথা কি জানো বেনিম, জেনোভিয়াকে যে মে’রেছে সে নিজের বাম হাত ব্যবহার করেছিল। এর মানে সে একজন বামহাতি। বেলকার খু’নিও তো বামহাতিই ছিল। আমার মনে হয় পলিনা আর বেলকার খু’নি হিসেবে যে প্রিজনে আছে সে আসলে প্রকৃত খু’নি নয়।”

 

“হয়তো। আমার অনেক আগেই সন্দেহ হয়েছিল। ওরকম বৃদ্ধ মাতাল একজন মানুষ কীভাবে অমন নৃ’শংস খু’ন করতে পারে? আমার মনে হয় সে ভুল ব্যক্তি।”

 

“কিন্তু সে নিজেই তো স্বীকার করেছিল।”

 

“লোকটা একটা মাতাল ছিল। মাতাল লোকের কথা কতটুকু সত্যি?”

 

“সে সময় না হয় মাতাল ছিল, কিন্তু সে এখনও তো কিছুই বলছে না।”

 

“সে হয়তো ভাবছে মাতাল থাকা অবস্থায় সে সত্যিই খু’ন করেছে।”

 

রোমেরো ভেবে দেখলো বেনিমের কথা। আসলেই কি তাই? হতে পারে। রোমেরো হেসে বললো,

“যাই হোক, আমার একটু ঘুমানো দরকার। ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। তোমার সাথে পরে আবার কথা হবে। গুড নাইট মাই ফ্রেন্ড।”

 

“গুড নাইট।”

 

বেরি উইলো বেনিমকে বাড়ির ভিতর না দেখে চিন্তিত বোধ করলেন। লিভিংরুমেই তো ছিল বেনিম, কোথায় গেল? দরজা খোলা দেখে প্রচণ্ড ভয় পেলেন তিনি। ব্যাকুল কণ্ঠে ডেকে উঠলেন,

“বেনিম!”

 

কোনো সাড়া নেই। তিনি ব্যাকুলতা ভরা কণ্ঠে ডাকতে ডাকতে সদর দরজায় এসে দাঁড়ালেন। বেনিমও ততক্ষণে কাছাকাছি এসে গেছে। বেরি উইলো উদ্বিগ্ন গলায় বললেন,

“কোথায় গিয়েছিলে?”

 

“এই তো সামনেই ছিলাম। কথা বলছিলাম রোমেরোর সাথে।”

 

বেরি উইলো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। 

“ভিতরে এসো।”

বলে বেরি উইলো বেনিমকে টেনে ভিতরে নিয়ে এসে দরজা দিলেন। বেনিম বললো,

“জেনো অসুস্থ মামা।”

 

“কী হয়েছে ওর?”

 

“ওকে কেউ মে’রেছে।”

 

বেরি উইলোর চরণ দুটো থমকে গেল। শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল হিম স্রোতধারা। বেরি উইলো কিছু জানতে না চাইলেও বেনিম নিজ থেকেই বললো,

“কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরছিল, তখনই ঘটনাটা ঘটে। মাথায় আর…”

 

“ঘুমাতে যাও বেনিম…” বেনিমের কথার মাঝেই রোবটের মতো অনুভূতিহীন কণ্ঠ শোনা যায় বেরি উইলোর, “আমি তোমার জন্য ঔষধ নিয়ে আসছি।”

 

বেনিম আচমকা কেঁদে ওঠে। ওর দু চোখ বেয়ে একের পর এক গড়িয়ে পড়ে নোনা জল। বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ফুলিয়ে বললো,

“ওকে কে মা’রলো মামা? ও আমার সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশী। কে মা’রলো ওকে? ওকে এরকম ভাবে মা’রা উচিত হয়নি।”

 

বেনিম একটানা কিছুক্ষণ কাঁদলো। চোখের পানি টপটপ করে নেমে গেল দুই কপোল বেয়ে। কিন্তু হঠাৎই থেমে গেল ওর কান্না। ঠোঁটে ভয়ংকর হাসি ফুটিয়ে বললো,

“কে মা’রলো ওকে? ওকে মা’রা উচিত হয়নি।”

বলে আবারও হাসলো। ওই হাসির ধরন অসহনীয়। বেনিম ঘুরে দাঁড়ানোর পরই বেরি উইলো চোখের পাতা বন্ধ করে ফেললেন।

 

__________________

 

রাত্রি গভীর। কিন্তু ঘুম নেই চোখের পাতায়। চিন্তিত মন বড়ো উচ্চাটন তারাসের। জেনোভিয়া ঘুমাচ্ছে। ওর মাথায় হাত বুলালো সে। পাছে আবার ঘুম ভেঙে যায় এই ভেবে আবার হাত সরিয়ে নেয়। জেনোভিয়ার সাথে একমাত্র সে-ই আছে এখন। সাবিনাকে পাঠিয়ে দিয়েছে। যদিও সাবিনা যেতে চাচ্ছিল না। সাবিনা তাকে বাসায় যেতে বলেছিল। সে বলেছে,

“আজ তুমি যাও, আমি থাকি। কাল না হয় তুমি থাকবে।” 

 

সাবিনা এই কথায় সম্মত হয়ে চলে যায়। জেনোভিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তারাসের দু চোখ সিক্ত হয়ে ওঠে। এটা হয়তো স্বাভাবিক। প্রিয় মানুষের এমতাবস্থায় যে কেউই কষ্ট পাবে। তারাস দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বুক হালকা করার চেষ্টা করে। কিন্তু মস্তিষ্ক হালকা হয় না। সেই একই প্রশ্নের ঘুরপাক। কে করলো জেনোভিয়ার সাথে এমন? কারো সাথে জেনোভিয়ার শত্রুতা তো নেই। তাহলে এমন বাজে কাজটা কে করলো? তারাসের মাথায় এর আগে যে ব্যাপারটা আসেনি এবার কিছুক্ষণ ভাবার পরই হঠাৎ রাজুমিখিনের কথা স্মরণে এলো তার। এটা কি রাজুমিখিনের কাজ? মস্তিষ্ক সজাগ হয়ে ওঠে তারাসের। রাজুমিখিন জেনোভিয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয় জেনোভিয়া। এর মানে রাজুমিখিন অপমানবোধ করে। অপমানবোধ থেকেই কি ও জেনোভিয়ার সাথে এটা করেছে? তাছাড়া এতদিন কিছুই হলো না জেনোভিয়ার, যেই কি না রাজুমিখিন সুস্থ হলো তারপরই কেন এটা হলো? তাহলে কি রাজুমিখিনই সেই হা’মলাকারী? রাজুমিখিন কি বামহাতি?  যদি রাজুমিখিনই জেনোভিয়াকে মে’রে থাকে তাহলে কি পলিনা আর বেলকার খু’নিও ও? কিন্তু ওই দুটো খু’নের কথা তো পাভেল স্বীকার করেছিল। হয়তো মিথ্যা বলেছিল পাভেল। হ্যাঁ, তার পাভেলের কথা বিশ্বাস হয়নি। এখন তো মনে হচ্ছে খু’নি হিসেবে যাকে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে সে আসলে খু’নি নয়। তারাস তাৎক্ষণিক কল করলো লিওনিদকে। লিওনিদ বোধহয় ঘুমাচ্ছে। এজন্যই ঘুম থেকে উঠে কল রিসিভ করতে সময় লাগলো। 

“কে?” 

 

“আমি তারাস। দয়া করে একটু সাহায্য করো লিওনিদ। তুমি কি কাইন্ডলি রাজুমিখিনের ব্যাপারে খোঁজ খবর নিতে পারবে? ও আগে কোথায় ছিল, কী করতো, পরিবারে কারা আছে, সবকিছুর ব্যাপারে আমার জানাটা খুব প্রয়োজন। প্লিজ, তুমি একটু রাজুমিখিনের ব্যাপারে আমাকে জানাও।”

 

“কথার মাঝে দম নিচ্ছ না দেখছি। হঠাৎ ওর ব্যাপারে এত কিছু জানতে চাইছো কেন?”

 

“কারণ আমার মনে হচ্ছে জেনোভিয়ার উপর হা’মলাকারী রাজুমিখিন। আর আমার এটাও মনে হচ্ছে যে, পলিনা আর বৃদ্ধার খু’ন রাজুমিখিন করেছে।”

 

“কী বলছো?”

 

“দয়া করে একটু খোঁজ নাও।”

 

“এত রাতে ঘুম ভাঙিয়ে দিয়ে কাজ চাপিয়ে দিচ্ছ?”

 

“একটা খু’নিকে চিহ্নিত করার চেয়ে তোমার ঘুম বড়ো?”

 

“অবশ্যই, ঘুম আর খাওয়া ছাড়া মানুষের জীবনে আর কিছুই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। বাকি সবকিছুই এই দুটো জিনিস যাতে ভালো হয় তার জন্য করা।” 

 

“ফালতু প্যাচাল রেখে যা বলেছি তাই করো।”

 

“একটু আগেও তো অনুরোধ করছিলে, এখন আদেশ করছো?”

 

“যা তোমার মনে হয়।” তারাস কল কেটে দিলো। জানে লিওনিদ এমন করলেও রাজুমিখিনের ব্যাপারে খোঁজ ঠিকই নেবে। সত্যিই যদি এটা রাজুমিখিন হয় তাহলে পুলিশ গিয়ে ওকে ধরার আগে সে নিজে গিয়ে জেনোভিয়ার মা’র গুলো ফিরিয়ে দিয়ে আসবে।

 

__________________

 

এই শহরে আর থাকা যাবে না। এই শহর তাকে আশানুরূপ কিছুই দেয়নি। যা দিয়েছে তা সবই ছিল মন্দ। আজ বিকেলেই এই শহর ছেড়ে চলে যাবে। রাজুমিখিন নিজের ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিচ্ছে। এরই মধ্যে শুনতে পেল তার ঘরের মূল ফটকে কারো হাতের টোকা পড়ছে। অসময়ে কে এলো বিরক্ত করতে? রাজুমিখিনের মেজাজ এমনিতেই চটা, দরজা খুলতে গেল তিরিক্ষি মেজাজ নিয়ে। কিন্তু দরজা খুলেই পুলিশ দাঁড়ানো দেখে তার তিরিক্ষি মেজাজ চুপসে গেল। শান্ত গলায় বললো,

“কী ব্যাপার আপনারা?”

 

তারাস হেসে বললো,

“নিয়ে যেতে এলাম আপনাকে।”

 

“কোথায়?” অবাক হয়ে জানতে চাইলো রাজুমিখিন।

 

লিওনিদ হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দিলো রাজুমিখিনের হাতে। রাজুমিখিন চমকে উঠে বললো,

“কী ব্যাপার হ্যান্ডকাফ পরাচ্ছেন কেন? আমি কি আসামি?”

 

লিওনিদ বললো,

“কতদিনই বা নিজের পরিচয় লুকিয়ে রাখতে পারবেন রাজুমিখিন?”

 

রাজুমিখিনের বিস্ময় ভরা চোখ দুটো থেকে থেকে স্ফীত হচ্ছে। বুকের ভিতর চলছে ভয়ের লাফঝাঁপ। এরা কীভাবে জেনে গেল সত্যিটা?

 

(চলবে)

 

 রঙিলা রাতের কালো অশ্রু (২৪)

লেখা: ইফরাত মিলি

___________________

 

“তুমি কি শিওর, তারাসই তোমাকে মে’রেছিল?”

 

“আমি শিওর না।” বললো রাজুমিখিন, “কিন্তু আমার মনে হচ্ছে সেই মে’রেছে। সে ছাড়া কে মা’রবে? আমি ভালো ছেলে, আমার সাথে কারো দ্বন্দ্ব নেই।”

 

ফেলিন রাজুমিখিনের মাথায় চাট্টি মা’রলো। ব্যথা পেয়ে মৃদু আর্তনাদ করলো রাজুমিখিন। 

 

“তুমি যে কতটা ভালো ছেলে তা আমরা জানি। এই নিয়ে কতবার করেছো এমন?” ফেলিনের প্রশ্ন।

 

“তেরো বার।”

 

“জেলে গিয়েছো কতবার?”

 

“দুই।”

 

“এত মেয়ে থাকতে জেনোভিয়াকে কেন টার্গেট করলে?”

 

“দেখুন আমার কাজের কিছু রুলস আছে। আমি এমন মেয়েদের সাথে জা’লিয়াতি করি যারা একা কিংবা তাদের পরিবারের সদস্যরা দুর্বল, বৃদ্ধ থাকে। এতে করে ঝামেলায় পড়তে হয় না। থানা, পুলিশ কম হয় এমন হলে। তাদের পটাতেও ঝামেলা হয় না।”

 

“জেনোভিয়া পটে গেলে কী করতে?”

 

“যেটা আমার কাজ। ওর অর্থ-সম্পদ নিয়ে চম্পট দিতাম।”

 

তারাস আর মেজাজ সংযত রাখতে পারলো না। সে কক্ষের এক কোণায় নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ ছুটে এসে এক হাতে রাজুমিখিনের চুল আঁকড়ে ধরে গালে কয়েকটা চ’ড় বসিয়ে দিয়ে বললো,

“জেনোভিয়ার সাথে এমন করতে চেয়েছিলি এত সাহস তোর?”

 

ফেলিন কড়া গলায় আদেশ করলো,

“তারাস ছাড়ো ওকে।”

 

তারাস সংযত হলো। রাজুমিখিনকে ছেড়ে দিয়ে আবারও নিজের পূর্ব স্থানে ফিরে গেল সে। রাজুমিখিন নিজের নাকে হাত দিচ্ছে বার বার। দেখছে র’ক্ত বের হচ্ছে কি না। না র’ক্ত তো বের হচ্ছে না, তবে তার গাল দুটো অসম্ভব লাল হয়ে গেছে। রাজুমিখিন ফেলিনের উদ্দেশ্যে বললো,

“দেখলেন কেমন ডা’কাতের মতো আচরণ তার? সেই আসলে আমাকে মে’রেছিল, আমি এবার শিওর।” 

 

ফেলিন ওর কথায় গুরুত্ব না দিয়ে বললো,

“তুমি বোধহয় কোথাও যাওয়ার পায়তারা করছিলে? কোথায় যেতে চেয়েছিলে?”

 

“যেহেতু এখানে কিছুই হলো না তাই ঠিক করেছিলাম কাজানে যাব। কিন্তু আপনার পুলিশরা সব নষ্ট করে দিলো। নিশ্চয়ই কাজানের মেয়েরা এখানকার মেয়েদের মতো আমাকে হতাশ করতো না।”

 

রাজুমিখিনের কথায় ফেলিনের দাঁত লেগে এসেছিল রাগে, কিন্তু সে নিজেকে শান্ত রেখে বললো,

“জেনোভিয়াকে তুমি মে’রেছো?”

 

রাজুমিখিন চমকে উঠলো,

“জেনোভিয়া মা’রা গেছে?”

 

“মারা যায়নি তবে মা’রা যেতো তোমার কারণে।”

 

“আমার কারণে কেন? আমি তো ওর সাথে কিছুই করিনি।”

 

“পলিনা আর বেলকার খু’নও কি তুমি করেছো?”

 

“কীসব পাগলামির কথা! আমি খু’ন করবো কেন ওদের? আমি জা’লিয়াতি করি সেটা ঠিক আছে, কিন্তু খু’ন করার মিথ্যা অপবাদ দেবেন না দয়া করে। খু’নের মতো এত জঘন্য কাজ আমি করতে পারি না। ভাবতেও পারি না আমি এটা।”

 

ফেলিন তারাসের দিকে তাকালো। তারাস বললো,

“আমার মনে হয় না সে খু’ন করেছে।”

 

“হ্যাঁ আমি করিনি। আপনারা তো বলেছিলেন খু’নি বামহাতি। আমি তো বামহাতি নই। আর ওদের খু’নিকে তো আপনারা ধরেছেন। ওনাকে তো যাবজ্জীবনও দেওয়া হয়েছে। তাহলে এই প্রসঙ্গ টেনে আমাকে খু’নি বানানোর চেষ্টা করছেন কেন?”

 

“তুমি ডানহাতি?” প্রশ্ন করলো তারাস। 

 

“অবশ্যই।”

 

তারাস হঠাৎ নিজের বুলেটহীন পি’স্তলটা ছুঁড়ে মারলো রাজুমিখিনের মুখ বরাবর। সে আশা করেছিল রাজুমিখিন হয়তো ডান হাত দিয়ে পি’স্তলটা ধরবে। কিন্তু ডান-বাম কোনো হাত দিয়ে পি’স্তলটা ধরলো না সে। ডান হাত যদিও একটু উঁচিয়ে ধরেছিল, কিন্তু পি’স্তলের আঘাতটা রুখতে পারলো না। মুখের উপর গিয়েই পড়লো পি’স্তলটা।

রাজুমিখিন চেয়ার থেকে পড়ে গেল। আঘাতে নয় ভয়ের কারণে পড়ে গেছে। রাজুমিখিন কাঁদো কণ্ঠে বললো,

“এটা কেমন ব্যবহার? আপনারা তো এমন করছেন যেন আমি একশ-দুইশ খু’ন করেছি। কিন্তু আমার অপরাধ তো সামান্য। এর জন্য না আমার ফাঁ’সি হবে, আর না যাবজ্জীবন হবে। এমনকি বেশিদিনের জন্য জেলে থাকতেও হবে না। তাহলে এমন করছেন কেন?”

 

ফেলিন বললো,

“আজকের দিনটা তোমাকে এখানে রাখা হবে শুধু। কাল সকালেই অন্য থানায় পাঠিয়ে দেওয়া হবে। যে থানায় তোমার নামে কেস করা হয়েছিল।”

 

“সেই ভালো। এই জ’ঘন্য শহর ছেড়ে আমিও চলে যেতে চাই।”

 

রাজুমিখিনের কথা আর কর্ণধারে প্রবেশ করছে না তারাসের। সে ভাবছে অন্য কথা। রাজুমিখিন খু’ন করেনি, তারাসের বিশ্বাস পাভেলও খু’নি নয়। তার ধারণা পলিনাকে যে খু’ন করেছে সেই একই খু’নি জেনোভিয়ার উপর হা’মলা করেছে। আর সেই খু’নি মুক্ত। এমনকি তারা জানে না কে এই খু’নি। খু’নি পর্যন্ত যাওয়ার কোনো ক্লুও নেই। যে কেস ক্লোজ হয়ে গেছে আসলে সে কেস ক্লোজ হয়নি। কেস এখনও ওপেন। সামনে কি আবারও ঘটবে সেই নৃ’শংস খু’ন? কাঁটা দিয়ে ওঠে তারাসের শরীর। সে ভাবে খু’নি হয়তো খুব দূরের কেউ আর নয়তো খুব কাছের কেউ। তারাসের চোখ হঠাৎ ফেলিনের উপর ন্যস্ত হয়। কাছের মানুষদের ভিতর এই মুহূর্তে ফেলিন সবচেয়ে বেশি কাছে আছে। কত হবে তার আর ফেলিনের দূরত্ব? বেশি হলে দশ পা। কাছে থাকা এই কাছের মানুষটাকেও কি তার সন্দেহ করা উচিত?  

তারাসের চোখে হঠাৎ অদ্ভুত একটা দৃশ্য ভেসে ওঠে। তার পরিচিত মুখগুলো তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। কী কুৎসিত ওদের হাসি! এগুলো সব খু’নির মুখ। হ্যাঁ এরা সবাই খু’নি। তারাসের বুক ধড়ফড় করতে থাকে। কপালে ফুটে ওঠে ঘাম। তার মনে হয় এই শহরের সবাই খু’নি। মানসিক বিকারগ্রস্ত খু’নি। শুধু এদের মাঝে সে আর জেনোভিয়াই একমাত্র সুস্থ। এমনকি তার সবচেয়ে নিকটতম বন্ধু লিওনিদ, সেও স্বাভাবিক কেউ নয়। তারাস অনুভব করে তার মাথার ভিতরটা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। ক্রমশই দুর্বল হয়ে আসছে শরীর। ঘাম ঝরছে কপাল বেয়ে। দম বন্ধ হয়ে আসছে। না এখানে আর এক মুহূর্তও থাকতে পারবে না সে। তারাস দ্রুত বেরিয়ে যায় কক্ষ থেকে। থানা থেকেই বেরিয়ে যেতে হবে তার। মুক্ত অক্সিজেন নিতে হবে। 

তারাসকে দেখে অস্বাভাবিক লাগছে। ঘামছে, চেহারায় কেমন ভয়, হাঁটার ধরনও ত্রস্ত। কেউ একজন হুট করেই তারাসের হাত ধরলো। তারাস তাকিয়ে দেখলো এটা লিওনিদ।

 

“কী হয়েছে তোমার? তোমাকে ঠিক লাগছে না।” চিন্তিত শোনালো লিওনিদের গলা।

 

“প্লিজ আমার হাত ছাড়ো।” কথাটা বললো তারাস। কিন্তু ওর গলায় কেমন যেন ভয়ের ছাপ ছিল। হাত ছাড়িয়ে নিয়ে চলে গেল তারাস। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারলো না, থানার বাইরে এসেই পড়ে গেল। লিওনিদ শুনতে পেল বাইরে একটা শব্দ, ছুটে এলো সে। দেখতে পেল তারাস পড়ে আছে। তারাস চোখ বুজে যাওয়ার আগে ঝাপসা দৃষ্টিতে লিওনিদকে দেখতে পেল। লিওনিদ কিছু বলছে তাকে, কিন্তু সে শুনতে পাচ্ছে না। তারাসের হঠাৎ মনে হলো, এটা কি আসলেই তার বন্ধু? না কি অন্যকেউ? এটা কি এমন কেউ যাকে সে কখনও চিনতো না? তারাসের চোখের কোল বেয়ে একটা উষ্ণ অশ্রু ধারা নেমে যায়। আর তার চোখ জোড়াও বুজে যায়। 

 

_________________

 

একাধিক মানুষের কথাবার্তা। কেমন হিমেল হিমেল হাওয়া। সাগরের ঢেউয়ের শব্দ। তারাস বুঝতে পারলো তার শরীরের উপর একরাশ মৃদু উষ্ণ রোদ্দুরও খেলা করছে। কোথায় আছে সে? সে কি কোনো সমুদ্রের তীরে আছে? তারাস ভীষণ পুলকিত হয়ে ওঠে। সে কি বীচের বালুর উপরে চাদর বিছিয়ে শুয়ে আছে? সে কখন বীচে এলো? তারাসের ঠোঁটের কোণে প্রাঞ্জল হাসি ফোটে। তবে চোখ মেলে সে ভীষণই হতাশ হলো। কোথায় সাগর, কোথায় রোদ্দুর, আর কোথায় বালির উপর বিছানো চাদর? সে তো শুয়ে আছে থানার একটা বেঞ্চিতে। আর সে যে মানুষজনের কথাবার্তা শুনতে পেয়েছিল তা বীচে ঘুরতে যাওয়া পর্যটকদের নয়, তারই পুলিশ বন্ধুগণের। ফেলিন ওর উপর খানিক ঝুঁকে পড়ে বললো,

“ব্যাপার কী তোমার? অজ্ঞান হয়ে গেলে কেন?”

 

“আমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম?” অবাক হলো তারাস।

 

উঠে বসতে গিয়ে মাথায় ব্যথা অনুভব করলো। মাথায় হাত দিয়ে বললো,

“কেউ কি আমার মাথায় বা’ড়ি দিয়ে অজ্ঞান করে দিয়েছে?”

 

লিওনিদ বললো,

“তুমি একাই পড়ে গেছো পাগল।” 

 

তারাস একবার সবার দিকে তাকালো। তার ঠোঁটের কোণে নিবিড় হাসি। এই মানুষগুলোর সম্বন্ধে একটু আগে কী বাজে চিন্তাই না করেছে সে! তারাস হঠাৎ মনে পড়া গলায় বললো,

“হাসপাতালে কে আছে এখন?”

 

ফেলিন বললো,

“চিন্তা করো না, মাইক আছে। আমরা কাণ্ডজ্ঞানহীন নই যে জেনোভিয়ার সুরক্ষা সম্পর্কে উদাস থাকবো।”

 

“ধন্যবাদ স্যার।” কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো তারাস। 

 

__________________

 

বেনিম চশমা মুছে নিচ্ছে। চশমাটায় কোনো সমস্যা নেই, তাও অযথাই কতক্ষণ হলো সে ওটাকে মুছছে। সাবিনা আরও একবার চেষ্টা করলো আপেলের টুকরোটা বেনিমের মুখে পুরে দেওয়ার, কিন্তু বেনিম তার আগেই তার হাত ধরে ফেললো। আপেলের টুকরোটা নিয়ে বললো,

“ধন্যবাদ। আমাকে আর দিতে হবে না। আপনি খান।”

 

বেনিম বিরক্ত হয়েই আপেলের টুকরোটা পাশে রেখে দিলো। সাবিনা আপেল কে’টে একটু পরপর তাকে খেতে দিচ্ছে। মেয়েটার হাবভাব একদম ভালো লাগছে না তার।

রোমেরো বুঝতে পারছে বেনিম প্রচণ্ড বিরক্ত হচ্ছে সাবিনার কারণে। বেনিমকে নিজের চেয়ে মাত্র এক মাসের ছোটো ভাবতে রোমেরোর ভীষণ অবাক লাগে। এই বয়সের ছেলে হয়েও কি না মেয়েদের ব্যাপারে আগ্রহী নয় বেনিম, বরং মেয়েদের এমন আচরণে বিরক্ত বোধ করছে। রোমেরোর মনে হলো বেনিম খুব সৎ। ওর মতো যদি সেও সৎ হতে পারতো জীবনে কিছু কষ্ট কম আসতো। রোমেরো গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। দিনার কথা খুব গাঢ়ভাবে মনে পড়ে গেল তার। দিনার কথা মনে পড়লেই ভীষণ আবেগী হয়ে যায় সে। সব সময়ের মতো আজও চোখে জল ভাসলো। সবার অগোচরেই সেই জল মুছে নিলো সে। মন হালকা করতে জেনোভিয়াকে বললো,

“আমি কি তোমাকে আপেল কে’টে দেবো?”

 

“ধন্যবাদ, প্রয়োজন নেই।”

 

কলের শব্দ হলো। বেনিমের মোবাইল বাজছে। বেরি উইলো কল দিয়েছে।

 

“হ্যাঁ মামা বলো।”

 

“কোথায় তুমি?”

 

“হাসপাতালে আছি।”

 

“কেন?”

 

“জেনোভিয়াকে দেখতে এসেছি।”

 

“ওকে তোমার না দেখতে গেলেও হবে। ওর থেকে দূরে থাকো। বাবার দোকানে চলে এসো এখুনি।”

 

“ও কে মামা।” নিস্তেজ গলায় বললো বেনিম। এরপর কল কেটে বললো,

“আমাকে যেতে হবে গাইস। মামা আমার জন্য অপেক্ষা করছে।”

 

বেনিম উঠে দাঁড়ালেই রোমেরো বললো,

“আমি কি তোমাকে পৌঁছে দেবো?”

 

“দরকার নেই, আমি একা যেতে পারবো।”

 

বেনিম সবাইকে বিদায় জানিয়ে চলে গেল।  সাবিনাও হঠাৎ দাঁড়িয়ে গিয়ে বললো,

“আমারও যেতে হবে। খাবার দিতে হবে জুরাকে।”

 

জেনোভিয়া কিছু বললো, কিন্তু তা না শুনেই চলে গেল সাবিনা। 

 

“তোমরা বিয়ে করছো কবে?” হঠাৎ প্রশ্নটা করলো রোমেরো।

 

“জানুয়ারিতে।”

 

“বিয়েতে আমাকে ইনভাইট করবে?”

 

“অবশ্যই, কেন নয়? তুমি এখন আমার বন্ধু, আমার প্রতিবেশী। তোমার জন্যই তো বেঁচে আছি। তোমাকে বিয়েতে ইনভাইট না করে কী করে পারি?”

 

“কিন্তু আমি চাইবো না তুমি আমাকে ইনভাইট করো। আমাকে ইনভাইট করবে না প্লিজ। তোমাকে দেখলেই মনে হয় তুমি দিনা। যখন তোমাকে বউ সাজে দেখবো তখন মনে হবে দিনা অন্য কারো জন্য বউ সেজেছে। ওর তো আমার জন্য বউ সাজার কথা ছিল। তাহলে আমি এই দৃশ্য কীভাবে সহ্য করবো?”

 

জেনোভিয়ার মন সহসা খুব বেশি খারাপ হয়ে গেল। ক্ষুদ্রশ্বাস ত্যাগ করে বললো,

“ঠিক আছে, ইনভাইট করবো না। কিন্তু তোমার বিয়েতে আমাকে অবশ্যই ইনভাইট করো।”

 

রোমেরো হেসে বললো,

“ইনভাইট? পারলে তো তোমাকেই বিয়ে করে নিতাম।” একটুক্ষণ থেমে বললো,

“তারাসকে বিয়ে না করলে হয় না?”

 

“হয় না। ওকে ছাড়া আমার জীবন চলবে না।”

 

“জীবন চলে যায়।” 

 

রোমেরোর কথার মাঝেই দরজায় চোখ পড়লো জেনোভিয়ার। যেখানে তারাস এইমাত্র এসে দাঁড়িয়েছে।

 

________________

 

গোসল সেরে বাইরে বের হলো সাবিনা। বেনিমদের উঠানে চোখ পড়লেই দৃষ্টি জোড়া আটকে গেল তার। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল সেদিকে। 

বেনিম চেয়ারে বসে ছবি আঁকছে। সাবিনা চুপিচুপি এসে বেনিমের পাশে দাঁড়ালো। বেনিম কী যে আঁকছে কিছুই বুঝতে পারছে না সে। এটা কি একটা ঘর? সাবিনা প্রথমে একটা বিষয় খেয়াল করেনি, কিন্তু যখন খেয়াল হলো বেনিম বাম হাত দিয়ে ছবি আঁকছে তখন একটু অবাকই হলো সে। সাবিনার যতটুকু মনে পড়ে সে এর আগে বেনিমকে ডান হাতই ব্যবহার করতে দেখেছে। তার দেখায় কি ভুল ছিল? সাবিনা বিস্ময়ে প্রশ্ন করে ফেললো,

“তুমি বামহাতি?”

 

সাবিনা ভেবেছিল বেনিম টের পায়নি সে এসেছে, তাই হয়তো হঠাৎ কণ্ঠ শুনে চমকে উঠবে। কিন্তু বেনিম তার দিকে বেশ শান্ত ভাবে তাকালো। আসলে ঠিক শান্ত নয়, নিশ্চল। কর্কশ কণ্ঠে বললো,

“আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে প্রশ্ন করা আমি অপছন্দ করি।”

 

বলে রাগে পেন্সিল দিয়ে জোরে দাগ কাটতে লাগলো সে। পেন্সিলটা প্রথম চাপেই ভেঙে গেল। তবু থামলো না বেনিম। সাবিনা অবাক হয়ে গেল বেনিমের এমন কাণ্ড দেখে। সে বেনিমকে আর কিছু বলতেও ভয় পেল। 

 

(চলবে)

 

 রঙিলা রাতের কালো অশ্রু (২৫)

লেখা: ইফরাত মিলি

___________________

 

বেনিমের আচরণ কী অদ্ভুত ছিল! ছেলেটাকে তো এরকম করতে দেখেনি কখনও। তাহলে আজ হঠাৎ কী হলো ওর? কী জানি কী হয়েছে, তবে সাবিনা খুবই ভয় পেয়ে গিয়েছিল। আচ্ছা ও কি লেফট হ্যান্ডেড? না কি এমনিতেই বাম হাত ব্যবহার করেছে? বাম হাত ব্যবহার করে ছবি আঁকে বলেই কি ওর অঙ্কন এত বাজে? ভাবনাটার সমাধান করতে পারছে না সাবিনা। হাসপাতালে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে সে। একটা লাল রঙের ড্রেস পরেছে। পায়ে উঁচু হিল জোড়া পরে জুরাকে নিয়ে বাইরে বের হয়েই ভারি বিস্মিত হলো সাবিনা। উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে বেনিম। বেনিমের চেহারাটা কিছুক্ষণ আগের চেয়ে এখন বড্ড আলাদা। ওর দু চোখে নিশ্চলতা নেই এখন, আছে নমনীয়তা। আগেকার সেই সহজ-সরল ছেলেটিকে দেখতে পাচ্ছে সে। তিন ধাপের সিঁড়িটা ভেঙে নেমে এলো সাবিনা। 

বেনিম বিনীত কণ্ঠে বললো,

“আমি দুঃখিত, তখন তোমার সাথে ওরকম করার জন্য। প্লিজ কিছু মনে করো না।”

 

সাবিনার ঠোঁটে সহসাই মিষ্টি হাসি ফুটলো। বেনিমের উপর সে রাগ করেনি, অভিমানও করেনি, শুধু একটু অবাক হয়েছিল। কিন্তু বেনিমের এই কথায় আগের সবকিছুই ভুলে সে। বললো,

“তোমার দুঃখিত বলার প্রয়োজন নেই। আমি কিছুই মনে করিনি। ইট’স অল রাইট।”

 

“কোথায় যাচ্ছ?”

 

বেনিমের প্রশ্নটি শুনে আনন্দিত হলো সাবিনা। তার মনে হলো বেনিম এর আগে এত সুন্দর করে কখনও কথা বলেনি তার সাথে। আর সাবিনা এটাও খেয়াল করলো যে বেনিম তাকে তুমি বলে সম্বোধন করছে। সে সহাস্য বদনে বললো,

“হাসপাতালে যাচ্ছি।”

 

“ওহ। ফিরবে কখন?”

 

“কাল সকালে আসবো।”

 

“আচ্ছা। আমি তোমাকে মিস করবো।” 

 

বেনিমের মুখ থেকে এই কথাটা শোনার জন্য সাবিনা প্রস্তুত ছিল না। বেনিম তাকে মিস করবে? এটা কি সত্যি? সাবিনা যেমনি খুশি হলো তেমনি আবার অবাকও হলো। অবাক চক্ষু জোড়া দিয়ে সামনের অদ্ভুত মানুষটাকে কয়েক মুহূর্ত দেখলো নিষ্পলক।

 

___________________

 

রাত হয়ে গেছে। থানার ভিতরে কিছু নিয়ে কথা হচ্ছে উচ্চরবে। ফেলিনের গলাটাই সবচেয়ে জোরে শোনাচ্ছে।

 

“চুপ করো তারাস। এই ব্যাপারে আর একটা কথাও বলো না। আমি তোমাকে চুপ করতে বলছি।”

 

“কিন্তু যদি পাভেল খু’ন না করে থাকে আমরা কীভাবে পারি তাকে শাস্তি দিতে? একজন নিরপরাধ…”

 

“তুমি কি বোকা? আমরা যদি এখন বলি পাভেল খু’নি নয় তাহলে এটা আমাদেরই বদনামের কারণ হবে। তুমি কি বুঝতে পারছো না? আমি চাই না আমাদের টিমের কোনো রকম বদনাম হোক। আর পাভেল যে খু’নি না তার নিশ্চয়তা দিচ্ছ কীভাবে? অন্য কোনো খু’নি কি খুঁজে পেয়েছি আমরা?”

 

তারাস কিছু বলতে চাইছিল, কিন্তু তাকে চোখের ইশারায় চুপ করতে বললো লিওনিদ। ফেলিন বললো,

“পাভেল তো কাউকে কিছু বলছে না। সে এটাও বলছে না যে সে নিরপরাধ। তাহলে তোমার সমস্যা কী? ও কি তোমার বাবা, যে তুমি ওর শাস্তি সহ্য করতে পারছো না? পাভেলের ব্যাপারে আমরা আর কোনো কথা বলবো না বুঝেছো? আমরা পাভেলকে বলিনি মিথ্যা বলতে, ও নিজে এসে সারেন্ডার করেছে। ওর স্বীকারোক্তির পরে আর কোনো কথা থাকতে পারে না কারো।”

 

তারাস বললো,

“আপনি অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছেন স্যার। জয়েন হওয়ার প্রথম দিকে আপনাকে অন্যরকম দেখেছি। অকুতোভয় ছিলেন। কিন্তু এখন কেমন যেন…জানি না কেমনই যেন হয়ে গেছেন।”

 

“তুমি কি আমাকে অপমান করার চেষ্টা করছো?”

 

“না তো, আমি শুধু বিষয়টা ভেবে দুঃখবোধ করছি।”

 

তারাস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে গেল। ফেলিন দাঁড়িয়ে রইল বিমূঢ় হয়ে। তারাসের সাহস হয় কীভাবে তার সাথে এরকম করে কথা বলার? সে কি সবাইকে বেশি লাই দিয়ে ফেলছে? 

 

বাইরে মৃদু ঠান্ডা হাওয়া বইছে। থানার ভিতরে থাকলে বোঝা যায় না বাইরের পরিবেশটা এখন কী রকম রয়েছে। ভিতরে সব সময়ই কেমন বন্ধকর একটা অবস্থা বিরাজ করে। অথচ এর বাইরেটা কত সুন্দর। জীবনটাও সুন্দর হয়ে উঠছিল, কিন্তু জেনোভিয়ার সাথে ঘটা ঘটনাটা হঠাৎ করেই আবার সব এলোমেলো করে দিলো। তারাস বেশ কিছু বিষয় নিয়ে ঘেঁটেছে, কিন্তু এতে করে সে কিছুই বুঝতে পারছে না। কে করতে পারে এমন? ভাবনার মাঝেই ম্যাসেজ আসার শব্দ শুনতে পেল সে। সাবিনার থেকে ম্যাসেজ এসেছে। 

ম্যাসেজটা হলো,

‘আমি বাড়ি চলে যাচ্ছি।’

 

সাবিনা বাড়ি যাচ্ছে? কিন্তু ওর তো সকাল পর্যন্ত থাকার কথা। তারাস একেবারেই জেনোভিয়াকে একা রাখতে চায় না। হ্যাঁ পুলিশ পাহারায় আছে, কিন্তু তারা রুমের বাইরে থাকে। তাদের দিয়ে বিশেষ একটা উপকার হয় না। আর সাবিনা হঠাৎ চলে গেল কেন?

 

_____________________

 

আজ সাবিনা অনেক রান্না করছে। চার ধরনের রান্না ইতোমধ্যে কমপ্লিট করে ফেলেছে সে। এখন উখা রান্না করছে। উখা হলো প্রাচীন রাশিয়ান স্যুপ। এই খাবার তৈরির জন্য তাজা মাছের প্রয়োজন হয়। উখা শুধুমাত্র মাটি বা এনামেল দিয়ে তৈরি নন-অক্সিডাইজিং পাত্রে রান্না করা হয়। রান্না যখন প্রায় শেষ তখন ঘরের দরজায় কারো নক করার শব্দ শোনা গেল। বেশ উৎফুল্ল হলো সাবিনা। ওই তো এসে গেছে সে। যার জন্য জেনোভিয়াকে একা ফেলে চলে এসেছে ও। চুলার আঁচ কমিয়ে দিয়ে দরজা খুলতে গেল সাবিনা। আগন্তুককে মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে বললো,

“আমি তোমার অপেক্ষাই করছিলাম। আমি খুব খুশি যে তুমি এসেছো। দয়া করে ভিতরে এসো।”

 

এটা সাবিনার বাড়ি। প্রথমে ভেবেছিল জেনোভিয়ার বাড়িতেই রান্না করে একসঙ্গে খাবে। কিন্তু অতিথির ইচ্ছায় সাবিনা নিজের বাড়িতেই নিমন্ত্রণ করেছে। সাবিনার রান্না এখনও বাকি তাই সে অতিথিকে বসিয়ে রেখে কিচেনে ছুটে গেল।

 

বিশ মিনিট পর টেবিলে সব খাবার সাজিয়ে রাখছে সাবিনা। খাবারের ঘ্রাণে ঘর ভরে উঠেছে। তার অনাহুত অতিথি ঘরের আশেপাশে দেখতে দেখতে বললো,

“তোমার বাড়িটা বেশ ভূতুড়ে ধরনের সাবিনা। আশপাশটা বড়োই নিস্তব্ধ। এখানে একা থাকতে ভয় করে না?”

 

“উহুঁ, মোটেই না। তাছাড়া আমি এখানে খুব কমই থাকি। কলপিনো আসলে জেনোভিয়ার বাড়িতেই বেশি থাকা হয়।”

 

“ভালো। জেনোভিয়ার বান্ধবী বলেই তোমার সাথে পরিচয় হলো। আমার মনে হয় এটা আমার সৌভাগ্য।”

 

সাবিনা হাসলো। তারপর জানতে চাইলো,

“তুমি কি খাবারের সাথে সস পছন্দ করবে?”

 

“হ্যাঁ, সেটা হলে ভালো হয়।”

 

“ঠিক আছে, আমি নিয়ে আসছি।”

 

সাবিনা কিচেনে গিয়ে দই দিয়ে এক ধরনের সস তৈরি করলো। একটা বাটিতে দই নিয়ে তার ভিতর লেমন জুস, আর কিছু পার্সলে কুচি দিয়ে একটু নাড়তেই তৈরি হয়ে গেল সসটা। সে সসের বাটিটা নিয়ে ফেরত এসে দেখতে পেল অনাহুত অতিথি লোকটি হাতে গ্লাভস পরছে। কিঞ্চিৎ অবাক হলো সাবিনা।

“হাতে গ্লাভস পরছো কেন তুমি?”

 

লোকটা বেশ স্বাভাবিক কণ্ঠে উত্তর দিলো,

“আমি চিহ্ন রাখতে পছন্দ করি না।”

 

“মানে?” সাবিনার কাছে অস্বাভাবিক লাগছে ব্যাপারটি। 

 

লোকটা উঠে এলো। টেবিল থেকে একটা প্লেট তুলে তা দিয়ে আ’ঘাত করলো সাবিনার মুখে। এতই আকস্মিক ঘটনাটা ঘটে গেল যে সাবিনা কিছু বোঝার সুযোগ পেল না। ফ্লোরে পড়ে গিয়ে মাথা আর কানে প্রচণ্ড ব্যথা পেল। ভয়ার্ত চোখে চাইলো লোকটার দিকে।

“কী করছো তুমি?” 

 

লোকটা পা দিয়ে গলা পি’ষে ধ’রলো সাবিনার। সাবিনার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো। সে গলা থেকে পা’টা সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলো, কিন্তু লোকটার শক্তির কাছে তাকে অসহায় মনে হলো বড্ড। প্লেট দিয়ে আবার আ’ঘাত করা হলো সাবিনার মাথায়। প্লেট ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। মাথা গড়িয়ে র’ক্ত নামতে শুরু করলো এবার। চুলের মু’ঠি ধরে সাবিনাকে টেনে তুললো সে। এরপর দেওয়ালের কাছে গিয়ে ওর মা’থাটা দেওয়ালের সাথে বা’ড়ি দিলো। তরল র’ক্ত ধারা বের হতে লাগলো সাবিনার মুখ, নাক দিয়ে। লোকটা ওকে ছেড়ে দিলেই ও পড়ে গেল ফ্লোরে। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে ওর। এমন কিছু ওর সাথে ঘটতে পারে এটা ও আগে কখনও কল্পনাও করেনি। মনে হচ্ছে মরে যাবে। তীব্র ব্যথায় হঠাৎ চি’ৎকার করলো সাবিনা। লোকটা আবারও ওর গ’লা পা দিয়ে চে’পে ধরে হুংকার করে উঠলো,

“চোপ!”

 

এরকমভাবে মে’রে মোটেই শান্তি পাচ্ছে না সে। ভারী কোনো কিছু প্রয়োজন তার, যেটা দিয়ে মা’রতে সুবিধা হবে। এবং যেটা দিয়ে ওর মাথা পুরোপুরি থেঁ’তলে দেওয়া যায়। চেহারার বদলে যাতে থেঁ’তলানো মাংসই দেখা যায় শুধু। লোকটা এমন কিছুরই সন্ধান করতে লাগলো। কিন্তু হতাশার বিষয় এটা যে সে মনের মতো তেমন কোনো বস্তুই পেল না। শেষমেশ চেয়ারের একটা পায়া ভেঙে নিলো। এটা বেশ মজবুত। মনে হচ্ছে কাজে দেবে। সে সাবিনার কাছে ফিরে এলো। কিন্তু সাবিনাকে আগের জায়গায় দেখতে পেল না। একটু দূরেই দরজার কাছে দেখা যাচ্ছে ওকে। লোকটা মনে মনে খুব বাজে একটা গা’লি দিলো। 

সাবিনা একটা রুমের ভিতর ঢুকতে চাইছে। লোকটা দৌড়ে এগিয়ে গেল ওর দিকে, কিন্তু ওকে ধরতে পারলো না, তার আগেই ও রুমের ভিতর ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো। লোকটা ভেবেছিল সাবিনা এমন কিছু করতে পারবে না, কিন্তু বাঁচার আশায় মানুষ নিজের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়াই করে চলে। 

সাবিনার বুকের ভিতরের হৃৎপিণ্ডটা ভয়ে লাফাচ্ছে। এই রুমের ভিতর ঢুকতে অনেক কষ্ট হয়েছে ওর। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। হাত-পা কাঁপছে ভয়ে। দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি নেই। ও দরজার কাছ থেকে সরে দেওয়াল ঘেঁষে বসলো। দরজায় আ’ক্রোশপূর্ণ ধাক্কা পড়ছে। সেই সাথে লোকটা কিছু বলছে ওকে। সাবিনা কী করবে বুঝতে পারছে না। ও লোকটার থেকে পালিয়ে এই রুমে ঢুকেছে ঠিকই, কিন্তু এখানে ও কতটুকু নিরাপদ? একটা কাঠের দরজা, এই দরজা ভেঙে গেলেই বোধহয় ওর মৃ’ত্যু নিশ্চিত! সাবিনা ভয়ে, যন্ত্রণায়, হতাশায় কাঁদতে লাগলো। বিছানার উপর ওর মোবাইলটা পড়ে রয়েছে। সাবিনা কষ্ট করে সেদিকে এগিয়ে গেল। দিকশূন্য হয়ে কল করলো জেনোভিয়াকে। ওদিকে দরজার বাইরে কী হচ্ছে সাবিনা জানে না। তবে ধারণা করলো, হয়তো লোকটা দরজা ভা’ঙার চেষ্টা করছে। যা উপলব্ধি করে আরও মিইয়ে গেল ও। জেনোভিয়া কল রিসিভ করলেই সাবিনা কাঁদতে কাঁদতে বললো,

“ওর থেকে দূরে থেকো জেনোভিয়া। ওর থেকে দূরে থেকো। ওকে যেরকম দেখছো আসলে ও…”

 

জোরে একটা শব্দ হলো, হৃৎপিণ্ড ধক করে উঠলো সাবিনার। শব্দটা হলো দরজা খোলার। সাবিনার ভয়ার্ত দৃষ্টি দরজায় দাঁড়ানো মানুষটার দিকে। তার দু চোখে ক্রোধের দীপশিখা। জেনোভিয়া কিছু বলে চলেছে কিন্তু তা শ্রবণ হচ্ছে না সাবিনার। ও ভয়ে স্তব্ধ। লোকটা দাঁত কিড়মিড় করে রাগের সাথে উচ্চারণ করলো,

“বাস্টা*!”

বলেই দৌড়ে এসে হাতে থাকা চেয়ারের পায়া দিয়ে সাবিনার মাথায় আ’ঘাত করলো। চিৎকার করে পড়ে গেল সাবিনা। ওর হাতের মোবাইল ছিটকে গেল দূরে।

জেনোভিয়া সাবিনার চিৎকার শুনে আরও ভয় পেয়ে গেছে। এবং সে উৎকণ্ঠা হয়ে সাবিনাকে ডেকে জানতে চাইছে কী হয়েছে ওর।

 

লোকটা পায়াটা দিয়ে একের পর এক আ’ঘাত করলো সাবিনাকে, এবং বললো,

“অ’সভ্য নোংরা মেয়ে! সহজ মৃ’ত্যু চাস না? কী চাস? কঠিন মৃ’ত্যু দিই?”

 

লোকটার এবার খেয়াল হলো সাবিনার মোবাইলটার দিকে। জেনোভিয়ার উৎকণ্ঠা কণ্ঠস্বর এখনও শোনা যাচ্ছে। বড়ো বিরক্ত হলো সে। এগিয়ে গেল মোবাইলের দিকে। চেঁচিয়ে বললো,

“চুপ কর শু*রের বাচ্চা!”

 

বলে তীব্র রাগে মোবাইলটা উঠিয়ে আ’ছাড় মা’রলো। ভেঙে গেল মোবাইলটা। সে এবার সাবিনার দিকে তাকালো। ওর দিকে এগিয়ে গেলেই কোনো রকম ফিনফিনে কণ্ঠে সাবিনা বললো,

“এমন কেন করছো তুমি? দয়া করে মে’রো না। কৃপা করো। মে’রো না। একটু দয়া করো।”

 

লোকটার প্রাণ জুড়ালো সাবিনার কথায়। যখন কেউ এরকম করুণ কণ্ঠে নিজের প্রাণ ভিক্ষা চায় সেই দৃশ্য যে কতটা সুন্দর এটা না দেখলে বোঝা যায় না। এ যেন অমৃত বাণী। সে খুব পছন্দ করে মানুষের প্রা’ণ ভিক্ষা চাওয়াকে। কিন্তু প্রা’ণ ভিক্ষা দিতে সে অপছন্দ করে। বললো,

“আমি দুঃখিত! তোমাকে দেখলেই খু’ন করার নেশা চেপে বসতো আমার মস্তিষ্কে, আর যখন আমি সত্যিই কাজটি করতে চলেছি তখন আমি এটা থেকে পিছিয়ে যেতে পারি না। আমি তোমাকে মিস করবো। গুড বাই।”

 

লোকটা চেয়ারের পায়া দিয়ে এবার নিজের সর্বশক্তি দিয়ে আ’ঘাত করলো সাবিনার মুখে।

 

____________________

 

তারাস ডাক্তারের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। ফিরে এসে রুমের বাইরে থেকেই শুনতে পেল জেনোভিয়া উত্তেজিত গলায় ‘হ্যালো হ্যালো’ বলছে। সে ভিতরে ঢুকতেই জেনোভিয়া জোরে কাঁদতে শুরু করলো। বললো,

“প্লিজ একবার সাবিনার বাড়িতে যাও। ও এইমাত্র আমাকে কল করেছিল। ওর কিছু একটা হয়েছে। কার কথা যেন বলছিল, আমি বুঝতে পারিনি। হঠাৎ করে ওর চিৎকার শুনতে পেলাম। কেউ একজন ওর বাড়িতে প্রবেশ করেছে, আমি তার কণ্ঠ শুনেছি। প্লিজ তুমি যাও।” 

জেনোভিয়া কথাগুলো বললো কোনো ব্রেক না নিয়ে। কান্নার জন্য ওর কথা জড়িয়ে আসছিল।

 

তারাস বললো,

“কী হয়েছে একটু খুলে বলো।”

 

“আমি জানি না। তুমি যাও প্লিজ। মনে হচ্ছে ও বিপদে আছে!”

 

তারাস জানে না কী হয়েছে, কিন্তু জেনোভিয়ার অবস্থা দেখে বুঝতে পারছে বিষয়টা হালকা করে দেখার মতো কোনো বিষয় নয়। তারাস দৌড়ে বেরিয়ে গেল। গাড়িতে উঠে কল করলো ফেলিনকে। একা তো যেতে পারে না। যদি ঘটনা আসলেই বিপজ্জনক হয় তাহলে আরও লোক লাগবে সাথে। কী হয়েছে সাবিনার?

 

____________________

 

“বেনিম কোথায়?”

 

“ঘরেই আছে।” 

 

“তাহলে ডেকে দিন। আমি রেস্টুরেন্টে খেতে যাচ্ছি, শুনেছি কোনো এক সেলিব্রেটিও খেতে আসবে ওখানে।” হাসি হাসি মুখে বললো রোমেরো।

 

বেরি উইলো গম্ভীর গলায় বললেন,

“বেনিম এই রাত্রি বেলা কোথাও যাবে না।”

 

“আমি যাব।” বেরি উইলোর পিছন থেকে কণ্ঠস্বরটি শোনা যায়। বেনিম মায়ের পাশ কাটিয়ে প্রায় দৌড়ে এসে দাঁড়ালো রোমেরোর পাশে, রোমেরোর হাত ধরে। যেন আজ সে যেকোনো মূল্যে গিয়েই ছাড়বে। রোমেরো বললো,

“ডোন্ট ও্যরি, আমি আছি বেনিমের সাথে, সুতরাং আপনাকে ভয় করতে হবে না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।”

 

বেরি উইলোর সামনে দিয়েই ওরা একসাথে চলে এলো। রাস্তায় পা রাখলো কেবল, এর মধ্যেই একটা পুলিশের গাড়ি ছুটে চলে গেল ওদের সামনে দিয়ে। ওরা দুজনে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। দুজনের মনে একই প্রশ্ন, পুলিশ কেন? আবার কোথায় কী হলো?

 

(চলবে)

 

 রঙিলা রাতের কালো অশ্রু (২৬)

লেখা: ইফরাত মিলি

___________________

 

ঘরের ফ্লোর এবং দেওয়ালের র’ক্ত বাতাসে জমাট বেঁধে গেছে। বাতাসে ভাসছে কেমন একটা গন্ধ। র’ক্তের গন্ধ! তারাসের বুকের ভিতর দ্রিমদ্রিম শব্দ হচ্ছে। ঘরের অবস্থা দেখে যা বোঝার সে বুঝে ফেলেছে ইতোমধ্যে।

বেডরুমের দরজা বন্ধ। বন্ধ দরজায় র’ক্তের ছাপ। ওদিকে এগিয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু মন থেকে বাধা আসছে। রুমের ভিতরের দৃশ্যটা আদৌ সহ্য যোগ্য হবে কি না জানে না। মন খুবই দুর্বল অনুভব করছে। তাও সে ওদিকে এগোলো। দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই আরও জোরে লাফাতে শুরু করলো হৃৎপিণ্ড। তারাস চোখ খিঁচে ধরে দরজায় ঠ্যালা মা’রলো। মৃদু আর্তনাদ করে খুলে গেল দরজা। চোখ খুললো তারাস। এক পলক দেখলো কেবল, চোখ বন্ধ করে ফেললো আবার। মাইক তারাসকে দরজা থেকে সরিয়ে দিয়ে ভিতরে তাকালো। 

 

“ওহ মাই গড!” মুখ দিয়ে কথাটা বেরিয়ে এলো মাইকের। সে ভিতরে প্রবেশ করলো।  ভালো করে লক্ষ করলো সাবিনার দেহখানি। দেখে তার হঠাৎ পলিনার কথা স্মরণ হলো। সাবিনারও মাথা থেঁ’তলানো। যদিও পলিনার মতো অত বেশি থেঁ’তলানো নয়। তবে চেহারা দেখে চেনা দায় এটা কে। এ রুমটা যেন র’ক্তে ভাসছে। কিছু র’ক্ত এখনও তরল। মাইক পালস চেক করলো। মৃত! সে ফেলিনকে কল করে ঘটনা সম্পর্কে অবগত করলো। 

 

তারাস স্তব্ধ হয়ে গেছে। শূন্য হয়ে আসছে তার মস্তিষ্ক। কিছু ভাবতে পারছে না। এটা কী হলো? সাবিনা…তারাসের বাম চোখ বেয়ে জল গড়ালো এক ফোঁটা। জেনোভিয়াকে কী বলবে সে? তারাসের বড্ড হাঁসফাঁস লাগতে লাগলো। 

 

তারাস আর মাইকের সাথে অন্য আরও একজন এসেছে। তার নাম ভাসিলি। ভাসিলি ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। টেবিলের উপর অনেক খাবার। সাবিনা কি কেবল নিজের জন্য এত খাবার তৈরি করেছে? তাও আবার এত পরিমাণ? পরিমাণটা একটু বেশি। দুজন অনায়াসে খেতে পারবে এই খাবার। ভাসিলি বললো,

“আমার মনে হয় মেয়েটা কাউকে নিমন্ত্রণ করেছিল। টেবিলে খাবার সাজানো।”

 

মাইক বেডরুম থেকে বেরিয়ে এলো ভাসিলির কথা শুনে। টেবিলে সাজানো খাবার পর্যবেক্ষণ করে সেও ভাসিলির কথায় সহমত হলো। হ্যাঁ কাউকে হয়তো নিমন্ত্রণ করেছিল সাবিনা। তার প্রথমেই যেটা মনে হলো, নিমন্ত্রণ পাওয়া সেই অতিথিই সাবিনাকে খু’ন করেনি তো? হতে পারে এটা, আবার নাও হতে পারে। যদি নিমন্ত্রণ পাওয়া অতিথিই এমন করে থাকে তাহলে তো সে সাবিনার পরিচিত। আর যদি সেই লোক খু’নি নাও হয় তাহলেও এটা খুঁজে বের করতে হবে কাকে নিমন্ত্রণ করেছিল সাবিনা।

 

রোমেরো আর বেনিম তখনও রাস্তায়। ওদের পাশ কাটিয়েই একটা দ্রুতগামী পুলিশের গাড়ি সাই করে চলে গেল। রোমেরো দাঁড়িয়ে গেল তাৎক্ষণিক। তার মনে হচ্ছে বড়ো কিছু ঘটেছে ওদিকটায়। সে আর রেস্টুরেন্টে যাওয়ার মন পাচ্ছে না, তার মন আকর্ষিত হচ্ছে পুলিশের ছুটে যাওয়া গাড়িটায়, কী হয়েছে তা জানতে। একটু আগেও তারা একটা পুলিশের গাড়ি যেতে দেখেছে, এখন আবার আরেকটা যাচ্ছে। নিশ্চয়ই ছোটোখাটো কোনো বিষয় না। 

 

“দাঁড়িয়ে পড়লে কেন?” 

 

অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল রোমেরো, বেনিমের কথায় সম্বিৎ ফিরলো। বললো,

“ব্যাপারটা সুবিধার মনে হচ্ছে না আমার। হয়তো বড়ো কিছু ঘটেছে। আমি একবার গিয়ে দেখতে চাই।”

 

“কী দরকার? চলো যেখানে যাচ্ছিলাম সেখানে যাই।”

 

রোমেরো একটু বেশিই কৌতূহলী। সব সময়ই ও এমন। বললো,

“আমার একবার ব্যাপারটা দেখতেই হবে।”

 

বলে আর বেনিমের দিকটা বিবেচনা করলো না সে, দৌড়ে ছুটতে লাগলো সেদিকে, যেদিকে পুলিশের গাড়িগুলো ছুটে গেছে। বেনিম পিছন থেকে ডাকলো,

“রোমেরো!”

 

রোমেরো দাঁড়ালো না। বেনিম কী করবে বুঝতে পারছে না। সেও কিছু ভেবে না পেয়ে রোমেরোর পিছন পিছন দৌড়ে চলতে লাগলো। বেনিম জানে সে ওখানে গেলে মামা একদমই খুশি হবে না। কিন্তু তার নিজেরও কৌতূহল হচ্ছে বটে। 

 

দৌড়াতে দৌড়াতে হাঁপিয়ে গেছে রোমেরো। বেনিমও তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সেও হাঁপাচ্ছে। অনেকটা পথ দৌড়ে এসেছে তারা। পুলিশের গাড়ি দুটো এখানে দাঁড়ানো দেখেই বুঝতে পেরেছে যা ঘটার এখানেই ঘটেছে। একটা পুরোনো ধাঁচের বাড়ি। বাড়ির সামনে রোমেরো আর বেনিম ব্যতীত আরও কিছু লোকজন দাঁড়িয়ে আছে। এরা সবাই এলাকার বাসিন্দা। পুলিশরা কাউকে বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছে। কী ঘটেছে বাড়ির ভিতরে? বাড়িটা কার? রোমেরো জানে না বাড়িটা কার। বেনিম হঠাৎ বলে উঠলো,

“এটা তো সাবিনার বাড়ি।”

 

রোমেরো অবাক হয়ে তাকালো। 

“সাবিনার?”

 

“হ্যাঁ, আমি একদিন হাঁটতে হাঁটতে এদিকটায় চলে এসেছিলাম। তখন সাবিনাকে বাড়ির ভিতরে দেখেছিলাম।”

 

পরিচিত মানুষের বাড়ি শুনে রোমেরো হঠাৎ ভয় পেল। সাবিনার কিছু হয়নি তো? বাড়ির ভিতর থেকে হঠাৎ কারো কান্নার শব্দ ভেসে এলো। কে কাঁদছে? রোমেরো আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না, সে পুলিশের নির্দেশ অমান্য করেই ঢুকে পড়লো বাড়ির ভিতর। বেনিম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। একজন পুলিশ রোমেরোকে ভিতরে দেখে বললো,

“আপনি ভিতরে ঢুকেছেন কেন? বাইরে যান।”

 

রোমেরো বললো,

“এই বাড়িটা আমার পরিচিত একজনের। কী হয়েছে এখানে?”

 

লোকটা কিছু বলার আগেই রোমেরোর চোখ পড়লো দেওয়ালে, এরপর ফ্লোরে। আঁতকে উঠলো সে,

“র’ক্ত?”

 

ওই রুমে লোকজন দেখে রোমেরোও গিয়ে উঁকি মারলো। তার দৃষ্টি প্রথমেই পড়লো গিয়ে সাবিনার মৃ’ত দেহের উপর। দুই পা পিছনে সরে এলো রোমেরো। হৃৎস্পন্দনের গতি বেড়ে গেল ওর। এইমাত্র কী দেখলো? 

আবারও তাকালো রোমেরো। ওটা কার মৃ’তদেহ? সাবিনার নয়তো? 

 

সাবিনার মৃ’তদেহের পাশেই বসে রয়েছে জেনোভিয়া। খুব কাঁদছে। আজ সন্ধ্যা পর্যন্তও সাবিনা তার সঙ্গে ছিল। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কীসব ঘটে গেল! জেনোভিয়ার মনে হচ্ছে তার হৃৎপিণ্ড কে’টে কয়েক টুকরো হচ্ছে। কেন হলো এমনটা? তার প্রিয়, আপন মানুষ বলতে তো মাত্র দুটো মানুষই ছিল। তারাস আর সাবিনা। কেন তার আপন মানুষের এই ক্ষুদ্র তালিকা থেকে একটা জীবন খসে পড়লো? আপন মানুষটার এত নির্মম মৃ’ত্যু জেনোভিয়া কিছুতেই মানতে পারছে না।

লিওনিদ এসে জেনোভিয়াকে উঠানোর চেষ্টা করলো। জেনোভিয়া নিজেই অসুস্থ। এরকমভাবে কাঁদলে ওর অবস্থা আরও খারাপ হবে। সে তো আনতেই চায়নি জেনোভিয়াকে, কিন্তু জেনোভিয়া তবুও এলো। 

 

“জেনোভিয়া ওঠো। শান্ত হও প্লিজ।” লিওনিদ ওকে হাত ধরে উঠানোর চেষ্টা করলেই ঝাড়া দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিলো জেনোভিয়া। 

“এটা হতে পারে না।” বলতে শুরু করলো জেনোভিয়া, “ও যখন হাসপাতাল থেকে চলে আসছিল তখনও ও স্বাভাবিক ছিল, হাসিখুশি ছিল। এতটুকু সময়ের মধ্যে কী হয়ে গেল এসব? আমি এটা বিশ্বাস করতে পারছি না। ওর কিছু হয়নি। ও কীভাবে ম’রতে পারে? ও বলেছিল আমি সুস্থ হয়ে গেলে সমুদ্রে ঘুরতে যাব আমরা। অনেক শপিং করবো। আমাদের তো সেসব কিছুই করা হয়নি। তাহলে ও কীভাবে ম’রতে পারে?”

 

“ও মারা গেছে!” বললো লিওনিদ।

 

জেনোভিয়া দুই পাশে মাথা নেড়ে বললো, “না।” 

তারাস দূরে দূরে ছিল এতক্ষণ। এই প্রথম সে জেনোভিয়ার কাছে এলো। জেনোভিয়ার পাশে হাঁটু মুড়ে বসে আলতো স্বরে ডাকলো,

“জেনোভিয়া!”

 

জেনোভিয়া তারাসের ডাক শুনতে পেল না। চোখ অন্ধকার হয়ে আসছে ওর। মাথায় অসহ্য ব্যথা। কান্নার ফলে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছে ও। শরীরে বিন্দুমাত্র শক্তি নেই এখন। নেতিয়ে পড়লো শরীর।

তারাস লিওনিদকে বললো,

“ওকে প্লিজ হাসপাতালে নিয়ে যাও।”

 

_____________________

 

সাবিনার খু’ন নিয়ে আবারও নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। সবার কাছে যেটা বেশি কৌতূহলের বিষয় সেটা হচ্ছে, সাবিনার খু’নের ধরন পলিনার খু’নের মতো ছিল। অন্য কোনো ধরন নয়, সেই মাথা থেঁ’তলানো একই ধরন। তারাস এবার পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েছে পলিনার খু’নি আসলে মুক্ত। পলিনার খু’নিই সাবিনাকে খু’ন করেছে। কিন্তু ফেলিন সে কথা মানতে নারাজ। সে মনে করে পলিনা আর বেলকার খু’নি পাভেল। সাবিনার খু’নি অন্য কেউ। খু’নের ধরন এক কেন এই প্রশ্নের উত্তরে সে বলেছে, 

“হতেই পারে খু’নের ধরন এক। হয়তো সাবিনার খু’নি পলিনার খু’নিকে অনুকরণ করেছে। তাই বলে এটা ভাবার দরকার নেই যে পলিনা আর সাবিনার খু’নি একজন।”

 

কিন্তু তারাস সে কথা মানতে পারছে না। তার কেবলই মনে হচ্ছে পলিনার খু’নি, বৃদ্ধা বেলকার খু’নি, সাবিনার খু’নি আর জেনোভিয়ার উপর যে হা’মলা করেছিল সে একই ব্যক্তি। জানে না তার ভাবনা কতটা সঠিক। তবে তার মনে হয় এটাই সঠিক। কিন্তু এই খু’নি পর্যন্ত কীভাবে পৌঁছবে? সে আগে একটা কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতো যে, খু’নি খু’ন করলে নিজের কোনো না কোনো চিহ্ন ফেলে যায়। কিন্তু তারা প্রত্যেকটা ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণ করেও এমন কোনো চিহ্ন পায়নি। এ কেমন চতুর খু’নি? 

সাবিনার পরিচিত যেসব মানুষ ছিল সবার সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। তাদের কাউকেই না কি সাবিনা সেদিন নিমন্ত্রণ করেনি। কিন্তু তাদের কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। সাবিনা তো পরিচিতদের মধ্যেই কাউকে নিমন্ত্রণ করেছে। আর যেহেতু কেউ স্বীকার করেনি যে সাবিনা তাকে নিমন্ত্রণ করেছে, সুতরাং এটা ভেবে নেওয়া যায় যে সাবিনা যাকে নিমন্ত্রণ করেছিল সেই হচ্ছে খু’নি। এর মানে খু’নি সাবিনার পরিচিত ছিল। এর মানে খু’নি দূরের কেউ নয়। প্রথমে সাবিনার প্রাক্তন প্রেমিককে সন্দেহ করা হলেও তার সাথে কথা বলে এবং তার ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে তেমনটা মনে হয়নি। খু’নগুলো যেন প্রায় কারণহীন। কেন ম’রতে হলো সাবিনাকে? সাবিনা এমন একটা মেয়ে ছিল যার সাথে শত্রুতা থাকতে পারে না কারো। বড্ড সরলমনা, মিশুক ছিল ও। পলিনা আর বৃদ্ধা বেলকাকেই বা কেন খু’ন করা হয়েছিল? খু’নের কারণও উদ্ধার করা যায়নি। খু’নি কি উদ্দেশ্যহীনভাবে খু’ন করছে? এর মানে কি খু’নি মেন্টালি…ইয়েস, এটা হতেই পারে। হতেই পারে খু’নি একজন সাইকো। আর এই সাইকো হয়তো দূরের কেউ নয়, কাছের। যাকে হয়তো সাধারণ মানুষের ভিড়ে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তার শীঘ্রই একবার জেনোভিয়ার সাথে কথা বলতে হবে।

 

_________________

 

দুই সপ্তাহ কেটে গেছে। কিন্তু দুই সপ্তাহ আগের সেই রাত্রিটা এখনও কী ভীষণ তরতাজা। তরতাজা ওই স্মৃতিটা জেনোভিয়াকে বড্ড কষ্ট দেয়। এমন একটা দিন নেই যে দিনটায় সাবিনার কথা মনে পড়ে না তার। সাবিনার সাথে কাটানো মুহূর্ত গুলো ভীষণ ব্যথার সৃষ্টি করে বুকে। দুই সপ্তাহ ধরে জেনোভিয়া কেবল ভেবে চলেছে সাবিনার কথাগুলো,

‘ওর থেকে দূরে থেকো জেনোভিয়া। ওর থেকে দূরে থেকো। ওকে যেরকম দেখছো আসলে ও…’

 

কার কথা বলেছিল সাবিনা? কার থেকে দূরে থাকতে বলেছে? সাবিনার কথা থেকে বোঝা যায় লোকটা জেনোভিয়ার খুব কাছের কেউ। যার সাথে তার নিত্য কিংবা প্রায়ই দেখা সাক্ষাৎ হয়। কাছের কোন মানুষটা আছে যে এমন? তাকে যেরকম ভাবা হয় আসলে সে সেরকম নয়, এটা কে হতে পারে? জেনোভিয়ার কাছের মানুষজন বলতে তারাস, লিওনিদ, কর্মস্থলের বন্ধুরা আর রোমেরো, বেনিম আছে। এরা ছাড়া জেনোভিয়ার তেমন কারো সাথেই তেমন একটা সম্পর্ক নেই। এদের কারোর কথাই কি বুঝিয়েছে সাবিনা? জেনোভিয়ার সবচেয়ে কাছের মানুষ হচ্ছে তারাস। তারাসের সাথেই সে সবচেয়ে বেশি থাকে। তাহলে কি এটা তারাস হতে পারে? জেনোভিয়ার বুক ধক করে উঠলো। এটা কী ভাবছে সে? এটা কীভাবে তারাস হতে পারে? কিছুতেই সম্ভব না এটা। লিওনিদ! লিওনিদ হতে পারে? জেনোভিয়া মনে করার চেষ্টা করলো ফোনে কার গলা শুনতে পেয়েছিল সে। খু’নির গলা সে শুনতে পেয়েছিল। আর  পরিচিত মনে হচ্ছিল কণ্ঠস্বরটা। মনে হচ্ছে ওটা লিওনিদের ছিল না। উহুঁ ওটা রোমেরোর গলাও না। কর্মক্ষেত্রের বন্ধুদের ভিতর কি কারো কণ্ঠস্বর ছিল ওটা? জেনোভিয়ার মাথায় আবারও সেই অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। ওলটপালট হতে শুরু করেছে মস্তিষ্ক। কখনও সে নিজের ভাবনা সম্পূর্ণ করতে পারেনি। তার আগেই প্রচণ্ড মাথা ব্যথায় কাতর হয়ে যায়। দুই হাতে মাথা চেপে ধরলো। রোমেরো কিচেন থেকে বের হয়ে দেখলো জেনোভিয়া কেমন ছটফট করছে। রোমেরো এখন প্রায় সব সময়ই জেনোভিয়ার সাথে থাকে। তারাস কাজ ফেলে জেনোভিয়ার দেখাশোনা করতে পারে না, তাই এই কাজটা রোমেরো করে। হাসপাতালেও দেখাশোনা করেছে, আর এখন বাড়িতেও। তারাস জেনোভিয়াকে নিজের বাড়িতে রাখতে চেয়েছিল। জেনোভিয়ার ব্যাপারে খুব চিন্তিত ছিল সে। কিন্তু জেনোভিয়া তারাসের বাড়িতে থাকতে চায়নি। তারাসের বাড়িতে থাকা মানে ভয় পেয়ে পালিয়ে যাওয়ার মতো। জেনোভিয়া পালাতে চায়নি। সবে দুদিন হলো সে বাড়িতে আছে। 

 

“কী হয়েছে?” উৎকণ্ঠা হয়ে বললো রোমেরো, “পানি খাবে?”

 

জেনোভিয়া না বোধক মাথা নাড়লো। হঠাৎ বাইরে থেকে কারো উচ্চৈঃস্বর শুনতে পেল জেনোভিয়া।

 

“আমি যাচ্ছি কিন্তু।”

 

জেনোভিয়ার দুই কান দাঁড়িয়ে গেল। এই কণ্ঠস্বর… 

জেনোভিয়ার আচমকাই মনে হলো মোবাইলে যে কণ্ঠস্বর শুনেছিল তা এইমাত্র কথা বলা মানুষটারই। জেনোভিয়া রোমেরোর দিকে তাকিয়ে বললো,

“আমি জানি সাবিনাকে কে মে’রেছে!”

 

(চলবে)

 

 রঙিলা রাতের কালো অশ্রু (২৭)

লেখা: ইফরাত মিলি

___________________

 

মোবাইলে শুনতে পাওয়া কণ্ঠস্বরটা বার বার বাজছে জেনোভিয়ার কানে। সে এইমাত্র বাইরে থেকে শুনতে পাওয়া কণ্ঠস্বরটা মোবাইলে শোনা কণ্ঠের সাথে মেলানোর চেষ্টা করছে। মিল কি আছে? ঠিক বুঝতে পারছে না। কিন্তু তার কেবলই মনে হচ্ছে এই কণ্ঠের মানুষটাই ছিল সেদিন সাবিনার বাড়িতে। জেনোভিয়া কিছু না ভেবেই আচমকা রোমেরোর দিকে চেয়ে বললো,

“আমি জানি সাবিনাকে কে মে’রেছে!”

 

জেনোভিয়ার কথার পর সব কেমন থমকে গেল মনে হলো। ভ্রু জোড়া কুঁচকে ফেললো রোমেরো। চোখ দুটো সরু হয়ে উঠলো ওর। বিস্ময়াপন্ন গলায় বললো,

“কী?”

 

জেনোভিয়া জানে না তার এটা বলা কতটুকু ঠিক হবে। সে এইমাত্র যার কণ্ঠ শুনলো সেটা বেনিমের। বেনিমের কণ্ঠই যে সেদিন শুনেছিল ফোনে, আর বেনিমই যে মে’রেছে, এটা জেনোভিয়া নিশ্চয়তার সাথে বলতে পারবে না। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তার মনে এখন কেবল বেনিমের কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে। অথচ এতদিন তার এ কথা মনে হয়নি। কিন্তু একটু আগে বেনিমের কথা শুনে হঠাৎ তার মনে হলো এটা বেনিম। জেনোভিয়া ইতস্তত গলায় বললো,

“হয়তো এটা বেনিম ছিল!”

 

রোমেরো যেন আহাম্মক হয়ে গেল। বললো,

“বেনিম? তুমি কি পাগল হয়েছো? এটা কীভাবে বেনিম হতে পারে? ও কি সেরকম ছেলে?”

 

“কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আমি ফোনে যে কণ্ঠস্বর শুনেছিলাম ওটা বেনিমের!”

 

“ওহ জেনোভিয়া পাগল হয়ো না। ওটা কীভাবে বেনিম হতে পারে! বেনিমকে তো তুমি ভালো করেই চেনো। আমিও চিনি। আমরা দুজনই ভালো করেই জানি বেনিম কী রকম ছেলে। অবশ্য তোমার চেয়েও আমি ভালো জানি ওকে। কারণ ও আমার বন্ধু। ও তো ভীষণই ভালো একটি ছেলে। খুবই নম্র। আর খুব ভীতু প্রকৃতির। এজন্য ওর মা ওকে রাতে কোথাও একা বের হতে দেয় না পর্যন্ত। আর তুমি বলছো ও খু’ন করেছে?”

 

“হ্যাঁ আমি জানি বেনিম কেমন। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে…”

 

“তোমার মনে হচ্ছে, তুমি শিওর তো না। এটা বেনিম হতেই পারে না। তুমি ভুল ভাবছো। ওর মতো একজনকে কীভাবে সন্দেহ করতে পারলে? ওকে সন্দেহ না করে যদি আমাকে সন্দেহ করতে তাও সেটা মেনে নেওয়ার যোগ্য হতো। কিন্তু তুমি ওকে সন্দেহ করছো। আমার মনে হয় এটা মেনে নেওয়ারও যোগ্য নয়। বেনিম আর খু’ন তো রাতের আকাশে সূর্য ওঠার মতো ব্যাপার।”

 

“সাবিনা আমাকে বলেছিল একজনের কাছ থেকে দূরে থাকতে। হয়তো ও আমাকে বলতে চেয়েছিল তাকে যেরকম দেখেছি আসলে সে তেমন না। তাহলে হতেই পারে আমরা বেনিমকে যেমন দেখছি আসলে ও তেমন না।”

 

“শুধু বেনিমের কথা বলছো কেন, এমনই যদি হয় তাহলে তো বলা যায় তুমি আমাকে যেরকম দেখছো আমি আসলে তেমন নই। আমি তোমাকে যেরকম দেখছি আসলে তুমি সেরকম নও। তারাসকে আমরা যেমন ভাবী ও তেমন নয়। এ কথা সবার বেলায় প্রযোজ্য হতে পারে। বরং বেনিমের থেকে কথাটা তারাসের ক্ষেত্রে বেশি মানানসই মনে হচ্ছে।”

 

তারাসের কথা শুনে জেনোভিয়ার বুকের ভিতরটা হঠাৎ থমকে গেল। সে বিস্ময় অতিভূত কণ্ঠে বললো,

“কী বলতে চাইছো?”

 

“আমি এটাই বলতে চাইছি যে খু’নি বেনিম হওয়ার চেয়ে তারাসের হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।”

 

“কোন ভিত্তিতে এই কথা বলছো তুমি?”

 

“বলবো না কেন? সাবিনা তোমাকে একজনের কাছ থেকে দূরে থাকতে বলেছে, যে কি না সাবিনার খু’নি। এখন বলো তো, তোমার সবচেয়ে আপন মানুষটা কে? নিশ্চিত এটা তারাস। ভবিষ্যতে তুমি ওকে বিয়ে করে ওর সাথে থাকবে। তাহলে সাবিনা ওর কথা না বলে আর কার কাছ থেকে দূরে থাকতে বলবে তোমাকে? হুহ? বলো।”

 

জেনোভিয়ার মাথার ভিতর কেমন ওলটপালট অবস্থার সৃষ্টি হলো রোমেরোর কথা শুনে। অতিরিক্ত চাপ তার মস্তিষ্কের জন্য সহন যোগ্য নয়। কিন্তু সব ভাবনা একসঙ্গে জট পাকিয়ে এলোমেলো করে দিচ্ছে তাকে। জেনোভিয়ার মাথার শিরা দপদপ করছে। এটা তারাস? না এটা হতেই পারে না। জেনোভিয়া নিজের মনকে দৃঢ় রাখতে চাইলো, কিন্তু বিশ্বাসের খুঁটিটা কেমন নড়বড় করছে। সে কি তারাসকে সন্দেহ করতে চলেছে? এটা কীভাবে পারবে সে? জেনোভিয়ার মনে পড়লো সে যখন সাবিনার সাথে কথা বলছিল তারাস তখন হাসপাতালে ছিল। না এটা তারাস হতে পারে না। জেনোভিয়া বললো,

“এটা তারাস হতে পারে না। কিছুতেই না। কারণ তারাস সে সময় হাসপাতালে ছিল।”

 

রোমেরো হাসলো। বললো,

“কখনো কখনো কিছু ব্যাপার এমন হয় জেনোভিয়া, আমরা যা দেখতে পাই আসলে তা কিছুই না, কিন্তু যা আমরা দেখতে পাই না বা জানি না সেসব কিছুই সত্যি। আমাদের অগোচরে অনেক কিছু ঘটে যায়, কিন্তু আমরা গোচর বিষয়গুলো দিয়ে অগোচরের রহস্য ভেদ করতে চাই। কিন্তু আমাদের মনে রাখা উচিত, সব সময় আমাদের অবগত বিষয়গুলো আদৌ অগোচরে ঘটমান ঘটনার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হয় না।”

 

জেনোভিয়া কিছু বুঝতে পারলো না। আরও বেশি এলোমেলো হয়ে গেল ওর মস্তিষ্ক। 

 

রোমেরো আরও বললো,

“তুমি আসলে যা দেখেছো তা আসলে ভুল, যা দেখোনি তাই ঘটেছে, তাই সত্যি। দৃষ্টিগোচর বিষয় দিয়ে বিবেচনা করো না। তোমার অগোচরে অনেক অসম্ভব ব্যাপার সম্ভব হতে পারে।”

 

এর মানে? তারাস যে হাসপাতালে ছিল এটা বিশ্বাস করা উচিত নয়? জেনোভিয়ার মনে হচ্ছে সে পাগল হয়ে যাবে। যথেষ্ট হয়েছে, সে আর কিছু ভাবতে পারছে না।

রোমেরোও বুঝতে পারলো জেনোভিয়াকে এ নিয়ে আর কিছু বলা উচিত হবে না। মেয়েটা অতিরিক্ত চিন্তা করতে গিয়ে আরও অসুস্থ হয়ে যাবে। বললো,

“আমার যেতে হবে।”

 

“কোথায়?”

 

“কিছু কেনাকাটা আছে। খুব শীঘ্রই ফিরে আসবো। তুমি এসব নিয়ে চিন্তা করো না এখন। নিজের খেয়াল রেখো।”

রোমেরো মৃদু হেসে বিদায় নিলো।

 

জেনোভিয়ার দুর্বল মস্তিষ্ক আরও দুর্বল হয়ে পড়লে এক সময় ঘুমিয়ে গেল জেনোভিয়া। 

 

__________________

 

তারাস কয়েকজন মানুষের খোঁজ নিতে শুরু করেছে। কাজটা একা করছে সে। গোপনীয় না হলেও এই কাজের ব্যাপারে সে অন্য কাউকে কিছু বলেনি। কিন্তু কয়েকজন জেনে গেছে ব্যাপারটা। মানুষগুলোর ব্যাপারে তদন্ত করছে মূলত সাবিনার জেনোভিয়াকে ফোনে বলা কথাগুলোর ভিত্তিতে। কিন্তু এই তদন্তের কাজটা তারাস ঠিক ভাবে করতে পারছে না। কারণ সারাদিন সে খুব ব্যস্ত থাকে। তাকে প্রায় সারাদিনই কাজের উপর রাখে ফেলিন। যে কাজ কোনো কাজের না এমন কাজও করতে দেয়। তারাস বুঝতে পারছে না ফেলিন এরকম কেন করছে। কাজের চাপে জেনোভিয়ার সাথেও দেখা সাক্ষাৎ করার খুব একটা সুযোগ পায় না সে। কয়েকটা রাত তাকে থানাতেই থাকতে হয়েছে। জেনোভিয়া এখন ভীষণ একা, পুরোপুরি সুস্থও হয়নি, ওকে সময় দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এখন সে সবচেয়ে কম সময় দিচ্ছে। আর সে একদমই পছন্দ করে না জেনোভিয়ার সাথে রোমেরোর এত বেশি সময় কাটানো। কিন্তু সে রোমেরোকে নিষেধও করতে পারবে না। কারণ ওই ছেলেটা এখন তার দায়িত্ব পালন করে দিচ্ছে। যেটা তার করার কথা সেটা এখন ওই ছেলেটা করছে। ছেলেটার প্রতি তার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। 

 

তারাস একটা জিনিস বুঝতে পারছে না, সে এই মুহূর্তে যে কাজটা করছে তা কীসের জন্য প্রয়োজন। দশ মিনিট আগে ফেলিন তাকে এই কাজটা দিয়ে গেছে। তেরো বছর আগের হ’ত্যাকাণ্ডের মামলার সাক্ষীর তালিকা দিয়ে ফেলিন কী করবে? তারাস জানে ফেলিন কিছুই করবে না। এটা খামোখা। এই মামলার অপরাধীকে মৃ’ত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছিল। এ মামলা বন্ধ হয়ে যায় অনেক আগে। এই হ’ত্যাকাণ্ডের সাথে তো বর্তমানের কোনো যোগসূত্র নেই। ফেলিন বর্তমানের হ’ত্যাকাণ্ডের উপর তদন্ত না করে এসব কী শুরু করেছে? ফেলিনকে কোনো কেসেই এমন উদাসীন দেখা যায়নি, কিন্তু এই কেসটা নিয়ে সে যেন সিরিয়াসই না। 

তারাস ঘড়িতে সময় দেখলো। সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। জেনোভিয়া রোজ সন্ধ্যায় তাকে কল করে। আজ করলো না কেন? বিষয়টা আশ্চর্যজনক ঠেকলো। ওর কিছু হলো না তো? তারাস এক মুহূর্ত দেরি না করে কল করলো। পনেরো সেকেন্ড রিং হওয়ার পর রিসিভ হলো কল। তারাস অন্য কিছু না বলে প্রথমেই বললো,

“তুমি ঠিক আছো? কল করোনি কেন?”

 

তারাসের কণ্ঠ শুনে জেনোভিয়ার কান্না পায়। তার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে তারাসও তার সন্দেহের তালিকাভুক্ত! এখন হঠাৎ তার কেমন ভয়ও লাগছে তারাসকে। কেঁদেকেটে অনেক কিছু বলতে ইচ্ছা করলো তারাসকে। কিন্তু সেসব কিছুই বলতে পারলো না সে। বললো,

“ভুলে গিয়েছিলাম, দুঃখিত। আমি ঠিক আছি।”

 

তারাস যেন এতক্ষণে স্বস্তি পেল। বললো,

“আমি কি আসবো তোমার বাড়িতে?”

 

“না, প্রয়োজন নেই। কোনো সমস্যা হলে আমি তোমাকে কল করবো। চিন্তা করো না।”

 

“আমি চিন্তা করবো না, আমার চিন্তা হবে।”

 

“আচ্ছা। রাখছি।”

 

“রাখবে? আমরা কি কিছু সময় কথা বলতে পারি না?”

 

“আমার আর কিছু বলার নেই।”

 

“আমার বলার আছে।”

 

“বলো তাহলে।”

 

বলার বদলে চুপ হয়ে গেল তারাস। কয়েকটা নীরব সেকেন্ড, তারপর বললো,

“ইয়ে তেহবিয়াহ লুব্লু!” (আমি তোমাকে ভালোবাসি)

 

জেনোভিয়ার চোখ দিয়ে এবার সত্যি সত্যি অশ্রু নামলো। সত্যিই কি তাই? তারাস তাকে ভালোবাসে? না কি এটা অভিনয়? জেনোভিয়া কল কেটে দুই হাঁটুতে মুখ গুঁজে কাঁদতে লাগলো। মনে মনে বলে গেল,

‘আমি চাই আমি তোমাকে যেরকম জানি তুমি মানুষটা তেমনই হও। আমি সেই তারাসকে চিনি যে আমাকে অত্যধিক ভালোবাসে, যাকে আমি বিশ্বাস করি। আমি সেই তারাসের মাঝে অন্য কিছু দেখতে চাই না।’

 

জেনোভিয়ার কান্নার শব্দ ওর ঘরের দেওয়াল ভেদ করে বাইরে পর্যন্ত শোনাচ্ছে। কিন্তু অন্য ঘরের দেওয়াল ভেদ করে অন্য কোনো ঘরে প্রবেশ করতে পারছে না। জুরা মনিবের দিকে নির্নিমেষ চেয়ে আছে। ও হয়তো বুঝতে পারছে ওর মনিব খুব কষ্টে আছে এখন। 

তার একজন আপন মানুষ হারিয়ে গেছে, অন্য আপন মানুষটাকে সে এই হারিয়ে যাওয়া মানুষটার জন্য সন্দেহ করছে। সে একদম চাচ্ছে না তারাসকে সন্দেহ করতে। কিন্তু তার মন বার বার বলছে, কাউকে বিশ্বাস করো না। কে ছিল সেই অমানুষ? যে তার প্রিয় বান্ধবীকে এরকমভাবে তার থেকে চিরতরে বিচ্ছিন্ন করে দিলো? জেনোভিয়ার কষ্ট আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো। তার আবারও মনে পড়লো বেনিমের কথা। মোবাইলে শোনা ওই কণ্ঠস্বর কার ছিল? ওটা কি বেনিমের ছিল না? 

 

জেনোভিয়া ঘুমানোর চেষ্টা করে, কিন্তু নানান চিন্তা আর ভয়ে সে ঘুমাতে পারে না।    তার সারারাত কাটে বুকের ভিতর দুরুদুরু আওয়াজে। 

 

_________________

 

রোমেরো ব্রেকফাস্ট করেছে রিচার্ড কক্সের বাড়িতে। জেনভিয়াকেও এখান থেকে ব্রেকফাস্ট দিয়ে আসা হয়েছে। ব্রেকফাস্টের পর এ বাড়িতেই আছে রোমেরো। বেনিম চিপস খাচ্ছে। মাঝে মাঝে বেরি উইলোকেও খাইয়ে দিচ্ছে। বেনিম এক সময় বললো,

“তুমি শ্রেষ্ঠ মামা। তোমার মতো শ্রেষ্ঠ মেয়ে আর কেউ নেই। বাকি সব মেয়ে ন’র্দমার কীট!”

 

মোবাইলে ভিডিয়ো দেখছিল রোমেরো, বেনিমের কথা কানে আসায় ওর দিকে চোখ তুলে তাকালো। বেনিম হঠাৎ রোমেরোর দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গাত্মক কণ্ঠে বললো,

“তুমি আবার মাইন্ড করো না রোমেরো। আমি জানি তুমি জেনোভিয়াকে পছন্দ করো। কিন্তু আমি এটা না বলে পারলাম না, জেনোভিয়াও একটা ন’র্দমার কী’ট।”

 

রোমেরো কিছু সময় নীরব তাকিয়ে রইল বেনিমের দিকে। বেনিমকে বোঝার চেষ্টা করলো। তারপর হাসলো এক সময়। বললো,

“মেয়েদের এত অপছন্দ করো বেনিম?”

 

(চলবে)

 

 রঙিলা রাতের কালো অশ্রু (২৮)

লেখা: ইফরাত মিলি

___________________

 

আজ সকালে রোমেরোর হঠাৎ মনে হয়েছিল জেনোভিয়ার সন্দেহই ঠিক। তারা বেনিমকে যেরকম ভাবছে বেনিম হয়তো তার চেয়ে ভিন্ন। মেয়েদের প্রতি বেনিমের এত ক্ষোভ প্রকাশের সময় বেনিমকে সত্যিই অন্যরকম মনে হয়েছিল। তাছাড়া রোমেরো একটা বিষয় ভেবে দেখেছে, যারা খু’ন হয়েছে তারা প্রত্যেকে মেয়ে ছিল। তাহলে এটা কি হতে পারে বেনিমই খু’নি? প্রশ্নটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না, রোমেরো হেসেই উড়িয়ে দিলো। জেনোভিয়ার মতো তার মাথাও খারাপ হয়েছে না কি? 

রোমেরো বের হয়েছিল স্থানীয় একটা ক্লাবের মালিকের সাথে কথা বলার জন্য। যেখানে আজ রাতে তার গান গাওয়ার কথা। কিন্তু ঘর থেকে বের হয়ে তারাসকে দেখতে পেয়ে তার আর ক্লাবে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা চললো না। 

তারাস জেনোভিয়ার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়ানো। নক করার অল্প ক্ষণের মধ্যেই দরজা খুললো জেনোভিয়া। 

 

“শুভ বিকাল।” হাস্য মুখে বললো তারাস। 

 

জেনোভিয়ার ঠোঁটে হাসির রেখা দেখা গেল না। তার মনে দুশ্চিন্তা, আবার তারাস আসায় কেমন ভালোও লাগছে, দুই মিলে তার অনুভূতিটা অন্য রকম। তারাসকে কি তার ঘরে ঢুকতে দেওয়া উচিত? যদি তারাস সাবিনার খু’নি হয়? 

জেনোভিয়া মনের সব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে বললো,

“ভিতরে এসো।”

 

তারাস ঘরে ঢুকলো। তারাসের মনে হলো জেনোভিয়ার ঘরটা খুব পালটে গেছে। কেমন অগোছালো সবকিছু। সে জেনোভিয়ার দিকে তাকালো, জেনোভিয়াকেও অগোছালো মনে হচ্ছে। যে মেয়েটা সব সময় পরিপাটি থাকতো সেই মেয়েটার বড়োসড়ো পরিবর্তন হয়েছে। চুল অগোছালো, চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল, চেহারার যাচ্ছেতাই অবস্থা!

 

জেনোভিয়া বললো,

“বসো। আমি তোমার জন্য চা বানাই।”

 

“কোনো দরকার নেই। বরং তুমি কিছু খেতে চাইলে বলো, আমি তৈরি করে দিচ্ছি কিংবা অর্ডার করে আনবো।”

 

“তুমি আমার ঘরের অতিথি। তোমায় অবশ্যই আপ্যায়ন করবো আমি।”

 

জেনোভিয়ার কথায় একটু অবাক হলো তারাস। অতিথি? জেনোভিয়া তার ক্ষেত্রে কখনও ‘অতিথি’ শব্দটা ব্যবহার করেনি। জেনোভিয়া আরও বললো,

“তাছাড়া আমি এখন অসুস্থ নই। কিছুদিন পর একদম সুস্থ হয়ে যাব।”

 

বলে কিছু শোনার অপেক্ষা না করে কিচেনে চলে গেল সে। ফিরলো অনেক দেরি করে। চায়ের কাপটা তারাসের হাতে দিয়ে বললো,

“ঘরে চিনি নেই। দুঃখিত চিনি ছাড়া চা খেতে দিচ্ছি তোমাকে।”

 

“না সমস্যা নেই।”

 

তারাস এক চুমুক খেলো। তার মনে হলো খুবই বাজে স্বাদ। জেনোভিয়া জিজ্ঞেস করলো,

“ভালো হয়নি?”

 

তারাস হেসে বললো,

“অবশ্যই ভালো হয়েছে।”

 

তারাস ভেবেছিল জেনোভিয়া হয়তো এবার একটু হাসবে, কিন্তু ওর মুখে গাঢ় কালো মেঘের ছায়া। ওই মেঘ ভেদ করে এক টুকরো হাস্য কিরণ কিছুতেই দেখা গেল না। জেনোভিয়া তারাসের পাশের সোফায় বসলো। তারাস ভেবেছিল সে আর চা পান করবে না। কিন্তু তবুও সে জেনোভিয়াকে খুশি করতে বিস্বাদ চায়ের আরও খানিকটা পান করলো। 

জেনোভিয়া তারাসের দিকে পলকহীন চেয়ে আছে। বুকের ভিতর কোমল একটা অনুভূতির কম্পন তার। এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে কেন সে তারাসকে সন্দেহ করেছিল? এই সরল মুখের পিছনে কোনো রকম অন্য রূপ থাকতে পারে না। সে খুব কাছ থেকে চেনে এই মানুষটাকে। এর মাঝে অন্যরকম কিছু থাকতে পারে না। সাবিনার সাথে তো এটা কিছুতেই করতে পারে না তারাস। কারণ সাবিনা যেমন তার বন্ধু ছিল তেমনি তারাসেরও ভালো বন্ধু ছিল। না তারাসকে সন্দেহ করা খুব বড়ো অন্যায় হয়ে গিয়েছে। কীভাবে সন্দেহ করতে পারলো তারাসকে? বুকের ভিতরটা অপরাধবোধে মুষড়ে পড়ছে জেনোভিয়ার। 

তারাস জেনোভিয়াকে নির্নিমেষ চেয়ে থাকতে দেখে বললো,

“তুমি ঠিক আছো?” 

 

জেনোভিয়া ‘না’ বোধক মাথা নেড়ে বললো,

“উহুঁ, আমি ঠিক নেই।” 

 

জেনোভিয়া তারাসের পাশে গিয়ে বসলো। তারাসকে জড়িয়ে ধরে ওর বুকে মাথা রেখে কেঁদে উঠলো হঠাৎ।

“আমার কাছ থেকে সবাই হারিয়ে গেছে। আমার মা, দাদি, সাবিনা এরা সবাই। একমাত্র তুমিই আছো আমার। প্লিজ আমাকে আগলে রাখো। কখনও হারিয়ে যেয়ো না আমার থেকে। আমি একা হয়ে যাব। আমি মরে যাব।” 

 

জেনোভিয়ার হঠাৎ বলা কথাগুলোয় দু-একটা কষ্টের আঁচড় অতর্কিতে দাগ কেটে দিলো তারাসের মানসপটে। সে জেনোভিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,

“আমি সব সময় আছি তোমার পাশে। তোমার কোনো কিছু চিন্তা করার দরকার নেই, তোমার চিন্তা করার জন্য আমি আছি।”

 

জেনোভিয়া মাথা তুলে তারাসের দিকে তাকালো। তারাসের দু চোখের দিকে তাকিয়ে একটা ব্যাপার নিশ্চিত হলো সে। তারাসকে সে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করতে পারে। 

তারাস জেনোভিয়ার মাথায় চুমু খেয়ে বললো,

“হয় আমি তোমাকে তোমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আগলে রাখবো, নয় আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আগলে রাখবো।”

 

জেনোভিয়ার কালো মেঘে ঢাকা মুখে হাসি ফুটলো এবার। তবে তা খুবই মলিন। সে আবারও মাথা এলিয়ে দিলো তারাসের বুকে।

 

জানালা দিয়ে ওদের দেখছিল রোমেরো। ঠোঁটের বাম কোণ ঈষৎ প্রশস্ত করে হাসলো সে। যেন তাচ্ছিল্য করলো তারাস, জেনোভিয়াকে। তারপর সরে গেল ওখান থেকে। উঠান পেরিয়ে রাস্তায় উঠতেই বেনিম কোত্থেকে এসে যেন হাজির হলো সম্মুখে। বললো,

“কী দেখলে রোমেরো? দেখে কেমন অনুভূতি হচ্ছে তোমার?”

 

রোমেরো কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো,

“আমি অনুভূতি শূন্য। ওদের দেখে কোনো কিছুই অনুভব হয়নি আমার। তুমি অযথাই ভুল কিছু ভেবো না।”

 

“তুমি মানো না জেনোভিয়া আসলেই একটা ন’র্দমার কীট?”

 

রোমেরো ওর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বললো,

“তুমি আমাকে বিরক্ত করছো বেনিম। তুমি এখন এখান থেকে চলে গেলেই খুশি হই।”

 

“কিন্তু আমি তোমাকে বিরক্ত করতে ভালোবাসি।” হাসি হাসি মুখে বললো বেনিম।

 

রোমেরো সত্যিই বিরক্ত হয়ে চলে যেতে লাগলো। বেনিম দৌড়ে গিয়ে প্রায় লাফিয়ে গলা জড়িয়ে ধরলো রোমেরোর। 

রোমেরো বললো,

“আরে ছাড়ো, আমার গলা ছিঁ’ড়ে যাবে।”

 

বেনিম ছেড়ে দিলো। রোমেরো মা’রবে এমন ভাবে হাত উঁচিয়ে ভয় দেখালো বেনিমকে। বেনিম হাসতে হাসতেই দূরে সরে গেল। তার ঠোঁট থেকে হাসি সরছেই না। সে একই রকম হাসি মুখে বললো,

“আমার মনে হয় না আমি তোমার গলা ছিঁ’ড়তে পারবো, তার আগে হয়তো আমার দেহ থেকে গলা অদৃশ্য হয়ে যাবে।” 

 

“বাড়িতে গিয়ে ঘুমাও দুষ্টু ছেলে।”

 

“দুষ্টু নই, লক্ষ্মী ছেলে।”

 

রোমেরো সত্যিই বেনিমের সাথে আর কথা বলতে আগ্রহী নয়। বেনিম যেহেতু যাচ্ছে না সেহেতু রোমেরো নিজেই ওর কাছ থেকে দূরে চলে গেল। সত্যিই কি তার তারাস আর জেনোভিয়াকে একসাথে দেখে কোনো রকম অনুভূতি হয়নি?

 

__________________

 

সাবিনার মা-বাবার সাথে আরও একবার কথা বলতে তাদের বাড়িতে গিয়েছিল পুলিশ। সাবিনার ব্যাপারে আরও ভালো করে সবকিছু জানতে। সাবিনার মা-বাবার ডিভোর্স হয়েছে অনেক আগে। সাবিনা একা থাকতো। যদি কখনো ইচ্ছা হতো তাহলে কিছুদিন গিয়ে বাবার বাড়িতে থাকতো, আবার কিছুদিন মায়ের বাড়িতে। ওর মা-বাবা এখন নিজেদেরও দোষী মনে করছে। তারা মনে করেন, যদি তারা মেয়ের সাথে থাকতো তাহলে হয়তো মেয়ের সাথে এমন কিছু ঘটতো না। 

পুলিশ জেনোভিয়ার সাথেও পুনরায় একবার আলোচনা করেছে। জেনোভিয়ার পরিচিত মানুষদের তালিকা নিয়েছে। কারণ সাবিনার মৃত্যুর আগের সেই ফোন কলের দ্বারা এ কথা স্পষ্ট যে, খু’নি সাবিনা এবং জেনোভিয়া উভয়ের পরিচিত। জেনোভিয়াকে প্রশ্ন করা হয়েছিল,

‘আপনি কি কাউকে সন্দেহ করছেন?’

 

জেনোভিয়ার একবার মনে হয়েছিল বেনিমের নামটা বল দেবে। বলা উচিত, সে বেনিমকে সন্দেহ করছে। কিন্তু জেনোভিয়া বললো না। বেনিমকে নিয়ে রোমেরো আর জেনোভিয়ার মাঝে কথা হয়েছিল পূর্বে। রোমেরো বন্ধু হিসেবে এখন এতই ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে যে জেনোভিয়া ওর সাথে প্রায় সব বিষয়ে আলোচনা করে। জেনোভিয়া পুলিশকে জানানোর ইচ্ছা পোষণ করলে রোমেরো বলেছিল,

‘এটা ঠিক হবে না জেনোভিয়া। তুমি তো নিশ্চিত নও। বেনিমকে সন্দেহ করার কোনো যুক্তিগত কারণও নেই তোমার। তোমার কেবল মনে হচ্ছে এটা বেনিম হতে পারে। কিন্তু যদি এটা ও না হয়? একজন সহজ-সরল নির্দোষ মানুষের উপর শুধু শুধু খু’নের অপবাদ পড়বে। শুধু শুধু কষ্ট পাবে। আর যদি ও জানতে পারে ওর নাম আমরা পুলিশের কাছে বলেছি তাহলে আমাদের সাথে ওর সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে যাবে। ও আমার খুব ভালো বন্ধু, তাই আমি চাই না এমনটা হোক।’

 

রোমেরোর এই কথার পর জেনোভিয়া নিজেও ভেবে দেখলো এটা করা ঠিক হবে না। সে কোন ভিত্তিতে বেনিমকে সন্দেহ করছে? কণ্ঠস্বর? কণ্ঠস্বরটা পরিচিত মনে হয়েছিল, কিন্তু ওটা বেনিমের নাও হতে পারে। যেখানে কিছু শিওর নয়, সন্দেহের কারণও নড়বড়ে, সে কথা পুলিশকে কীভাবে বলবে? তাই আজ পুলিশ যখন সেধে জিজ্ঞেস করলো, জেনোভিয়া তখন না বোধক মাথা নাড়লো। পুলিশরা প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নোট করে নিয়ে গেল। এই কেস নিয়ে কম ঘাঁটা হচ্ছে। অথচ এই কেস নিয়ে সবার বেশি উদগ্রীব থাকা উচিত। কিন্তু কেসের ভারপ্রাপ্ত প্রধান অফিসারই কেসের প্রতি উদাসীন আচরণ করছে। তবে তারাস থেমে নেই, সে যাদের খোঁজখবর নিতে শুরু করেছিল তা নিচ্ছে।  হয়তো কেসটা কোনো গতি পাবে এর ফলে। তারাস ভীষণ ক্ষুব্ধ ওই জঘন্য লোকটার উপর, যে কি না এত নৃ’শংসভাবে খু’নগুলো করেছে। যেদিন সে চিহ্নিত করতে পারবে খু’নি কে, সেদিন হয়তো তার খুব করে ইচ্ছা করবে খু’নিটাকে গু’লি করে মা’রতে। তারাস সেই মুহূর্তের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে ধৈর্য প্রার্থনা করছে। 

 

________________

 

কোথায় গেল ও? জেনোভিয়া তন্নতন্ন করে খুঁজেছে সারা বাড়ি। কোথাও নেই ও। এলাকার আরও কয়েকটা বাড়ি খুঁজেছে, পথেঘাটে খুঁজেছে, কিন্তু কোথাও নেই। জেনোভিয়ার শরীর কাঁপছে। এরকম তো কখনও হয়নি। ও কখনও বাড়ি থেকে অন্য কোথাও চলে যায়নি একা একা। বড়ো জোর রাস্তা পর্যন্ত ছিল ওর যাতায়াত। কিন্তু আজ কোথায় চলে গেল? ভয় ভয় হচ্ছে জেনোভিয়ার, অজানা আশঙ্কায় দিকভ্রান্ত লাগছে। বিকেল থেকে খুঁজে পাচ্ছে না জুরাকে। এখন সন্ধ্যা। চারিদিক অন্ধকারে ঢেকে গেছে। ফ্লোরেনটিনাদের বাড়িতে এখনও খুঁজে দেখা হয়নি। একবার কি সেখানে যাবে? যদি পেয়ে যায় জুরাকে? আশা খুবই ক্ষীণ, কিন্তু তাও গেলে ক্ষতি কী? 

 

জেনোভিয়া ফ্লোরেনটিনাদের বাড়িতে গেল। কিন্তু হতাশ হলো সে। ওদের বাড়িতে যায়নি জুরা। ফ্লোরেনটিনাদের বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর জেনোভিয়ার কান্নাই পেল। এত খুঁজলো অথচ কোথাও পেল না। তার সাথে কী হচ্ছে এসব?

তারাস তাকে রাতের বেলা একা কোথাও যেতে নিষেধ করেছে। যা ঘটে গেল তার সাথে! বাইরে থাকতে ভয় করছে জেনোভিয়ার। আবার জুরাকেও খুঁজে পাচ্ছে না! কী করবে সে? 

জেনোভিয়া বাড়িতে ফিরে আসতে লাগলো। যখন সে বেনিম আর তার বাড়ির মাঝামাঝি চলে এলো, তখন তার বাড়ির সামনে রাস্তায় একটা কালো ব্যাগ দেখতে পেয়েই বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো তার। চক্ষু দাঁড়িয়ে গেল। সে এর আগে শুনেছিল কালো ব্যাগের ভিতর না কি মৃত বিড়াল পাওয়া গেছে। মা’রা হয়েছিল ওগুলোকে। জেনোভিয়ার হৃৎস্পন্দনের গতি বাড়তে থাকলো। সে দৌড়ে এগিয়ে এলো ব্যাগের কাছে। বুকের ভিতরটা আরও জোরে কাপছে। কী দেখতে পাবে এটার ভিতর? 

জেনোভিয়া আচমকা খুলে ফেললো ব্যাগের মুখ। হালকা একটা চিৎকারে নিস্তব্ধ রজনী হঠাৎ কেঁপে উঠলো। তার দু চোখে অবিশ্বাস্য আতঙ্কের ছাপ। মোবাইলের ফ্লাশলাইটের আলোয় সে ব্যাগের ভিতরে একটা লোমশ প্রাণী দেখতে পাচ্ছে। আর তার জন্য দুঃখের বিষয় হলো, এটা তার প্রিয় পোষা প্রাণী জুরা! জেনোভিয়া বিশ্বাস করতে পারছে না। তার দু চোখ দিয়ে জল নামতে লাগলো। এটা কী দেখছে সে? 

জেনোভিয়া ব্যাগের ভিতর থেকে জুরাকে বের করলো। জুরার শরীরে প্রায় কয়েকটা ক্ষ’ত। জেনোভিয়া ওর শরীরে হাত বুলাতে বুলাতে মৃদু কম্পিত গলায় ডাকলো,

“জু…জুরা!”

 

জুরা নিঃশ্বাস নিচ্ছে না। জেনোভিয়া এবার জোরে কেঁদে উঠ