স্বপ্ন কেনার দামে

পর্ব১

 

“বুকের বা পাশে ব্যথা হচ্ছে, তেরো ঘন্টা পয়তাল্লিশ মিনিটের বিচ্ছেদ আর সহ্য হচ্ছে না। আমার এনরিল স্প্রে, তোমার ঠান্ডা ছোঁয়া না পেলে আজ এখানেই না বুকের ব্যথায় প্রাণ হারাই।”

 

সাতটা বেজে পয়তাল্লিশ, পাখির ডাকের শব্দ করে ফোনটা জানিয়ে দেয় একটা এসএমস এসেছে  অরণীর জন্য। দ্রুত হাতে রুটি সেঁকে নেওয়ার মাঝেও এসএমসের শব্দ অরণীর মনোযোগ কেড়ে নেয়। না দেখেও অবশ্য অরণী বলতে পারবে ম্যাসেজটা রিদমের। সাতটা চল্লিশে বাস স্ট্যান্ডে দেখা করার কথা, আর এখন বাজে সাতটা পয়তাল্লিশ। রিদম যে পাগল, প্রতি মিনিট লেটের জন্য একের পর এক এসএমএস দিতে থাকবে, বাবা এত ম্যাসেজের শব্দ শুনলে রাগ করবে, প্রশ্ন করবে, এখুনি ফোন সাইলেন্ট করতে হবে। অরণী ফোনটা হাতে নিয়ে দ্রুত টাইপ করে, “আমি এনরিল স্প্রে না যে সাময়িক ব্যথা কমাবো। আমি ইকোস্প্রিন, তোমার হৃদয়ে রক্তপ্রবাহের ঘাটতি হবে না। আমি আসছি, একটু অপেক্ষা।” 

 

“অরু, রুটি কয়টা সেঁকছিস?” অরণীকে হুমায়রা বেগম ঘরে অরু বলেই ডাকে, এজমার সমস্যা এত তীব্র যে বেশি কথা বললেও ক্লান্ত হয়ে যান। সবকিছু তাই সংক্ষিপ্ত করে ফেলেছেন।

 

“এই তো, আটটা রুটি সেঁকা শেষ মা। আর লাগবে না। দাদীর দুধ গরম করে রেখেছি। খাওয়ার আগে রুটি দুধে ভিজিয়ে দিলেই হবে।”

 

“তুই খাবি না?”

 

“না এখন সময় নেই। দেরি হয়ে গেল।”

 

“হুম, দেরি তো হবেই, দুইটা রুটি সেঁকতে তিনবার ফোন টিপিস।”

 

“মা, আমি ক্যান্টিনে খাব। সত্যি ক্লাসের সময় হয়ে যাচ্ছে। দীপন স্যার আটটা ত্রিশে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দেয়। আর রান্না কী করবা জমিলা খালাকে বের করে দিও। চুলার কাছে আজ যেও না। যে গরম, ঘাম থেকে আবার টান উঠবে তোমার। ইনহেলার হাতের কাছে রেখো। বাবা নাস্তা টেবিলে, ঐ অমিয় ঘুম থেকে উঠ এবার। দাদী আসি আমি। আচ্ছা মা আমি গেলাম….।”

 

চুলের উপর চিরুনি বুলিয়ে দ্রুত পায়ের স্যান্ডেল পরে নেয়। দরজা খুলে বের হতে হতে মাকে আরেকবার বিদায় জানিয়ে বের হয় অরণী। ‘মেয়েটা একটা তুফান মেইল’ মনে মনেই হাসেন হুমায়রা। আসলে ওনার দীর্ঘদিনের অসুস্থতা অরণীকে পরিণত করেছে সময়ের আগেই। সংসারের কর্ত্রী তিনি হলেও, সংসার দেখে রাখে যেন অরণী। এত গুছিয়ে মায়ের সংসার করে যে কে বলবে এখনো পড়াশোনা করছে অরণী, বিডিএস ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী, ভবিষ্যতের দন্তরোগ বিশেষজ্ঞ। মেয়ের গুণে এখানেই ভয়, ‘অতি ঘরণী নাকি ঘর পায় না’ ভেবে নিজেই জিহ্ব কাটেন। অরণী ঘর বর সবই পাবে ইনশাআল্লাহ, খারাপ ভাবার জন্য মনে মনে নিজেকে বকেও দেন।

 

“হুমায়রা আর কতক্ষণ দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে? দয়া করে দুটো রুটি খেতে দিয়েছ, এখন চা কী পাব? না অফিসে গিয়ে খেতে হবে? সময় নাই আমার।”

 

“আনছি। অরণী বোধহয় চায়ের ফ্লাক্স রান্নাঘরে রেখেছে।” জামিল সাহেবের মেজাজ অল্পতেই খারাপ হয়, তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে যান হুমায়রা। চড়া মেজাজের লোক জামিল সাহেব এটা বিয়ের পর থেকেই বুঝেছে হুমায়রা, তার উপর ইদানীং ওনার এজমার সমস্যা বেড়ে যাওয়ায় যে তারউপর এত বিরক্ত, সেটা তিনি বেশ ভালোই বুঝতে পারেন। দিনের পর দিন অসুস্থ স্ত্রী কারও ভালো লাগে না। তা সে যেই বয়সের মহিলাই হোক না কেন। ছোটবেলায় হুমায়রার এজমার সমস্যা থাকলেও যুবতী বয়সে অনেকটা সময় ভালো ছিলেন, এমনকি নিয়মিত ইনহেলারও আর নিতে হতো না। বিয়ের পর ছোট ছেলে অমিয়ের জন্মের পর থেকে অবশ্য শ্বাসকষ্টের সমস্যা আবার দেখা দেয়। তারপরও স্বামী, সন্তান, সংসার সবকিছুর দায়িত্ব পালন করেছেন। শাশুড়ি ভীষণ বিরক্ত হতেন যখন এজমার টান উঠতো। অসুস্থ মেয়েকে গছিয়ে দিয়েছে তার ছেলের কাঁধে, এই ছিল ওনার বিরক্তর কারণ, স্বামীকেও বকাঝকা করতেন, ভালোমতো খোঁজ না নিয়ে ছেলের বৌ আনলো কেন সেই রাগে। 

 

এখন শ্বশুর জীবিত নেই, তারপরও শাপশাপান্ত থেকে মুক্তি পাননি শ্বশুর। গত কয়েকবছর ধরে শীতকালের পাশাপাশি অতিরিক্ত গরমেও শরীর খারাপ হয়ে যায় হুমায়রার। চুলার পাশে বেশিক্ষণ থাকতে পারেন না, ঘেমে গেলে ঠান্ডা লেগে শ্বাসকষ্ট হয়। গত পরশুদিন দুপুরে হঠাৎ ননাস সাথে করে তিনজনকে নিয়ে বেড়াতে এসেছিলেন, বুয়াও ততক্ষণে চলে গিয়েছিল, অরণীর পরীক্ষা ছিল,আসতে দেরি হবে বলেছিল। ভরদুপুরে হঠাৎ রান্নাবান্না করে অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন হুমায়রা, কাল থেকে বলতে গেলে বিছানায়।

 

****

“কয় কাপ খেলে চা?”

 

“বেশি না, তিনকাপ। সিগারেট টেনে নিজেকে পুড়িয়ে দেব ভেবেছিলাম, কিন্তু তোমার কথা ভেবে পারলাম না, তুমি তো গন্ধ সইতে পারো না। আপাততঃ তাই চা খেয়ে কাটালাম।”

 

“ইয়াল্লাহ। চা! আমি তোমার কথা ভাবতে ভাবতে চা বানানোর কথা ভুলেই গিয়েছি। বাবা চা না পেলে মায়ের সাথে মেজাজ খারাপ করবে নিশ্চিত।”

 

“আরে এত এত চায়ের দোকান রাস্তায় রাস্তায়। আঙ্কেল এককাপ চায়ের জন্য রাগ কেন করবেন। আর আজ না হয় আন্টির হাতে খাবে।”

 

“মায়ের শরীর ভালো না। খুব হাঁপানির টান উঠেছিল গতকাল। আজ চুলার কাছে যেতে নিষেধ করছিলাম।”

 

“তাহলে আঙ্কেল রাগ করবে না বোকা। প্রিয়তম স্ত্রী অসুস্থ, আর আঙ্কেল চা নিয়ে রাগ করবে, কী ভাবো পুরুষদের তোমরা। তোমার একটু জ্বর শুনলে আমি নাপা খাই তিনবার, এইটা জানো।”

 

রিদমের কথা বলার ঢঙ্গে হেসে দিলেও অরণীর মনটা ভালো হয় না। রিদমকে বলা হয় না, সবার কাছে প্রিয়তমের অসুখ শুধু চিন্তা না, কারও কাছে বিরক্তির কারণও হতে পারে।

 

(চলবে)

 

স্বপ্ন কেনার দামে 

পর্ব২

 

রান্নাঘরে গিয়ে হুমায়রা বুঝতে পারলেন তাড়াহুড়োয় আজ অরণী চা বানাতে ভুলে গিয়েছে। জামিল সাহেব আটটায় বের হবেন, পাঁচ মিনিটের ভেতর চা না পেলে চা না খেয়েই যাবেন, তবে এমনি এমনি না, কিছু তীব্র বাক্যবাণে বিদ্ধ করে তবেই বের হবেন। আর এরপর সারাদিনই এই কথা তুলবেন শাশুড়ি। বিয়ের তেইশ বছরেও এই সংসার আর সংসারের মানুষগুলোর আচরণে পরিবর্তন আসেনি। জামিল সাহেব উচ্চপদস্থ মানুষ, বড় প্রতিষ্ঠানে এডমিনের দায়িত্বে আছেন, কেতাদুরস্ত চলাফেরা। ধনী না হলেও সচ্ছলতা আছে পরিবারে। বাইরে টিপটপ চলাফেরা দেখে বোঝার উপায় নেই ঘরে ওনার ব্যবহার কেমন। অফিসের সবাই ওনাকে ভদ্র, অমায়িক মানুষ হিসেবেই জানেন। এমনকি কাজেও নাকি বেশ সপ্রতিভ। কিন্তু এই মানুষই আবার বাসায় অন্য রকম, বদরাগী, কথায় কথায় শ্বশুরপক্ষকে ছোট করে কথা বলে স্ত্রীকে আঘাত করা, আর সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি বলে সবসময়ই একটা দাম্ভিক ভাব নিয়ে চলা। 

 

“চ্যারিটি বিগানস এট হোম” কথাটা বহুল প্রচলিত হলেও, এর প্রয়োগ বাস্তব জীবনে খুব কম। বাস্তব জীবনে বেশিরভাগ মানুষ সবচেয়ে অমানবিক ব্যবহার ঘরের মানুষদের সাথেই করে। সামর্থ্য থাকার পরও তাদের  ডাক্তার দেখাতে অবহেলা করে, কথায় কথায় তীব্র ভাষায় অপমান করে, সঙ্গীকে কষ্ট দিতে তার বাবার বাড়ির লোকদের ছোট করে কথা বলে। আর এই বিষয়টা শুধু যে পুরুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা নয়, মুখের বিষে নারীরাও কম যায় না। কণ্ঠে গরল উগড়ে দিতে দিতে সম্পর্কের মিষ্টতা চলে যায় বহুদূর।

 

“অরণীর আম্মু, চা কী ফুডপান্ডায় অর্ডার দিয়েছিলে? এককাপ চা আনতে এতক্ষণ?”

 

“মেয়েটা তাড়াহুড়োয় চা বানাতে ভুলে গিয়েছিল। আমি এখন দ্রুত বানিয়ে আনলাম।”

 

“চা তো মেয়ের বানানোর কথাই না। মেয়েটাকে পড়ালেখা করিয়ে ডাক্তার বানানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু এখন তোমার ঘরের কাজ করতে করতে ভবিষ্যতে কী গতি হবে কে জানে। এত কাজ যখন শিখতেছে আর বিয়েই দিয়ে দেই, শ্বশুর বাড়ি গিয়ে কাজ করুক।”

 

“বাসার কাজে একটু সাহায্য করলে মেয়েদেরই ভালো। হঠাৎ করে নিজের সংসারে গিয়ে বিপদে পড়তে হবে না। সব মেয়েই টুকটাক কাজ জানা দরকার, আমিও করছি ওর বয়সে। আর ওকে আমি সবসময় কাজ করতে বলি না। কাল শরীরটা খারাপ ছিল, তাই আজ সকালে অরু নাস্তাটা রেডি করছে।”

 

অরণীর দাদী রুটি দুধে ভিজিয়ে খাচ্ছিলেন, বেশিরভাগ দাঁত ফেলে দেওয়ায় ভালো চাবাতে পারেন না। নকল দাঁত বানিয়েছেন, কিন্তু অভ্যস্ত হতে পারেন না। খাবার তাই নরম করেই খান। ছেলে আর ছেলের বৌয়ের কথার মাঝে ঢোকা ওনার পুরনো অভ্যাস। সেই অভ্যাস বশতই বললেন, “হুমায়রা, স্বামীর সাথে মুখে মুখে তর্ক করার সময় দেখি নিঃশ্বাস বন্ধ হয় না। অথচ একদিন আগে দুই পদ রান্না করতেই নাকি শ্বাস বন্ধ হয়ে মরে যাচ্ছিলে। শুনো, আমার নাতনি হইলো সুস্থ সবল মেয়ে, তারে যে সংসারে বিয়ে দিব সে সংসার উজ্জ্বল করবে, ডাক্তার মেয়ে আমার নাতনি। তোমার বাপের মতো অসুস্থ মেয়ে কারও গলায় আমরা দেব না, আর ও কোন ফকিরের মেয়ে না যে কাজ শিখে যেতে হবে। নিজে কী কচুর কাজ শিখছো? মাসে বিশ দিন অসুখের নাম করে শুয়ে থাকো, বাচ্চা মেয়েটাকে দিয়ে কাজ করাও, বুয়ার পেছনে হাজার টাকা ঢালো। আমার ছেলের কষ্টের কামাই, তোমার গায়ে লাগে না।”

 

হুমায়রা শাশুড়ির সাথে আর কথা বাড়ায় না। বুয়াকে কয়টাকা বাড়তি দেয় এই হিসেব করলেও, এই সংসারে আর একটা প্রাণীও কাজ করতে চায় না। এই যে অরণীর দাদী বয়স্ক মানুষ, ওনার কাজে সাহায্য করার শক্তি নাই। অবশ্য যখন শক্তি ছিল তখনো করতেন না, সেটা আলাদা কথা। তারপর আছে স্বামী জামিল সাহেব, যিনি বাসায় একটা চামচ নেড়ে খেতে রাজি না। বাপ আর দাদীকে দেখে ছেলেও হয়েছে এমন। ছেলে অমিয় নিজের ঘরের বিছানাটা পর্যন্ত করে না। সে ধরেই নিয়েছে এসব মা বোনদের কাজ, অর্থাৎ মেয়েদের কাজ। ছেলেকে শাসনও করা যায় না, নাতিকে কিছু বলা শাশুড়ি একদম পছন্দ করেন না। আবার বুয়াকে বাড়তি কাজ করিয়ে বকশিস দেওয়াও তাদের ভালো লাগে না, অপচয় মনে হয়। গরমে ঘেমে হাঁপানির টান ওঠে বলে ইদানীং রান্নার কাজের জন্য বুয়া রাখতে হয়েছে, রোজ খাওয়ার টেবিলে বসেই এই নিয়ে একপ্রস্ত কথা শুনতে হয়। সবার মাঝে অরণীটা মায়ের কষ্ট বোঝে, বাসায় থাকলে বাবা আর ভাইয়ের জন্য  ভালো কিছু আইটেম বানায়। খালার রান্না কোনমতে চললেও সেটা কারও খেতে ভালো লাগে না। তাই সুযোগ পেলে অরণী ভালোমন্দ রান্না করে। তবে মাকে মেয়ের এই সাহায্যটুকু করাও আবার বাকিদের ভালো লাগে না। কী অদ্ভুত মানব মন।

 

***

“অরু, চলো আজ রিকশায় যাই। বাসে যা ভীর।”

 

“রিকশায় গেলে ক্লাস ধরতে পারবো না। বাসে আমিও উঠতে চাই না, ভীর অনেক। চলো সিএনজি নেই। বাবা টাকা দিয়েছে সকালে, ভাড়ার সমস্যা নাই।”

 

“হুম, আঙ্কেল তো পয়সাওয়ালা মানুষ। কিন্তু আমার বাবার এত বাড়তি টাকা নাই যে সিএনজিতে যাব। বাসার বড় ছেলে আমি, ইন্টার্নশিপটা শেষ হলেই আমাকে ইনকামের পথ খুঁজতে হবে।”

 

“আর তো কিছুদিন, তারপর আমিও ডাক্তার হয়ে যাব। দু’জন আয় করলে তোমার একার উপর চাপ হবে না।”

 

“যাহ্, বৌয়ের টাকা কেন নেব? আমার অনেক বড় বড় স্বপ্ন আছে। দেখবা একসময় সফল মানুষদের একজন হবো, তখন বাস না রিকশা ভাবতে হবে না, তোমার জন্য গাড়ি নিয়ে আসবো।”

 

“আমার এত কিছু লাগবে না। আমি বাস, রিকশা সবকিছুতে চড়তে পারি, তুমি সাথে থাকলেই হবে। তোমার ইন্টার্নশিপ শেষ হলে যখন তুমি একটা কাজ শুরু করবে, আমরা বিয়ে করে ফেলবো, ঠিক আছে? তোমার আমার টোনাটুনির সংসার হবে।”

 

“আচ্ছা আমার টুনটুনি বৌ। চলো না কোথাও ঘুরতে যাই, আজ ক্লাস না করলে। চন্দ্রিমা উদ্যানে যাবে?”

 

“আরে না, বাবা জানলে খবর আছে। পচাত্তর পার্সেন্ট পার্সেন্টেজ লাগবো ক্লাসে, পরীক্ষার সময় সমস্যা হবে না হলে।”

 

“ধ্যুত, কচু হবে। কত ক্লাস বাংক করলাম।”

 

“তুমি মোটেও ক্লাস ফাঁকি দেওয়া মানুষ ছিলে না। সবাই জানে রিদম হাসান ক্লাসের টপ স্টুডেন্ট ছিল। যত ফাঁকিবাজি গার্লফ্রেন্ডের বেলায়।”

 

” আরে কী শুরু করেছ, চলো না যাই, একদিনই তো। তোমাকে একটু আরাম করে দেখাও হয় না। কেমন মেঘ করেছে, এখুনি বৃষ্টি নামবে। তোমাকে ময়ূরের রূপে দেখি একটু।”

 

“ময়ূরের রূপ!”

 

“হ্যাঁ, বৃষ্টি নামার সময় ময়ূর পেখম মেলে যখন নাচে, তখন তার সৌন্দর্য বেড়ে যায় বহুগুণ। তুমি তেমনি সুন্দর হয়ে যাও। তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম এমনই বৃষ্টি ভেজা দিনে। কলেজের বাইরে টং দোকানে চা খাচ্ছিলাম, আর তখনই নজরে আসে একটা মেয়ে হাতে একগাদা কদম ফুল নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আসছে। বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল হাতে সেই মেয়েকে আমার একটা ময়ূূরই মনে হচ্ছিল।”

 

এই প্রথম দেখার গল্প অরণী বহুবার শুনেছে, তারপরও নানা বাহানায় শুনতে ইচ্ছে করে। এই গল্প যখনই করে, রিদমের চোখগুলো স্বপ্নালু হয়ে যায়। আর অরণী বাতাসে সোঁদা মাটির গন্ধ পায়। মনে পড়ে কলেজের হার্টথ্রব সিনিয়র ভাই ওর সামনে এসে বলছে, “তোমার কাছ থেকে একটা কদম নিতে খুব ইচ্ছে করছে। কিন্তু জানো তো মিথ আছে বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল কখনো নিতে নেই, তাহলে বিচ্ছেদ হয়। আর কোন কিছুর বিনিয়মে যে আমি বিচ্ছেদ চাই না।”

 

খেয়ালের দুনিয়া থেকে বাস্তবে ফেরে অরণী, “আচ্ছা যাব, কিন্তু কদম দিতে হবে, অনেকগুলো। এখন তো আর বিচ্ছেদের ভয় নেই।”

 

অরণী হাসে, অরণীর হাসিতে ঢেউ খেলে রিদমের বুকে।

(চলবে)

 

স্বপ্ন কেনার দামে 

 পর্ব৩

 

অরণী আর রিদম যখন চন্দ্রিমা উদ্যানে পৌঁছায়, ঘড়িতে তখন প্রায় নয়টা বাজে। শুরুতে ক্লাস মিস করবে কী করবে না সিদ্ধান্ত নিতে না পারলেও এখন অরণীর ভালো লাগতে শুরু করেছে। তার আর রিদমের সম্পর্কের সাত মাস হতে চললো, কিন্তু সেভাবে ডেটিং এ যাওয়ার সুযোগ হয় না। মায়ের অসুস্থতার জন্য ক্লাসের পর পর বাসায় ফেরার তাড়া থাকে। অরণীর ক্লাস শেষ হয় দুইটায়, বাসায় আসতে আর একঘন্টা হিসেব করে মা ফোন দিতে থাকে। অরণীর বাবাও ক্লাস টাইমের বাইরে মেয়ের বাইরে থাকা পছন্দ করেন না। বাবা বাসায় ফেরার বেশ আগেই বাসায় ঢুকে অরণী। না হলে দাদী তো আছেই, নাতনির দেরি হয়েছে বাসায় আসতে, ছেলেকে এই তথ্য দিতে ওনার দেরি হবে না। বাবা মায়ের এত সতর্ক চোখ এড়িয়ে প্রেম করা সহজ না। বাসায় থাকলে পারতপক্ষে রিদমের ফোন ধরে না অরণী। আর ধরবেই বা কিভাবে, দাদী অরণীর সাথে একই রুমে থাকে, কান এত সজাগ, রাতেও ফিসফিস করে কথা বলা যায় না। অরণী বারান্দায় গিয়ে কথা বললেও বলবেন,”কার সাথে কথা বলিসরে অরণী?”

 

“অরণী, চন্দ্রিমা উদ্যানে আগে এসেছ?”

 

“হুম, তবে ইদানীং আসা হয় নি। অমিয় যখন ছোট ছিল, তখন বিকেলে মাঝেমাঝে আমরা বেড়াতে আসতাম, লেকের পাশে সিঁড়িতে বসে চানাচুর মাখানো সহ আরও হাবিজাবি খেতাম। তখন আম্মু এত অসুস্থ ছিল না। বাসায় অনেক সুন্দর পরিবেশ ছিল। দাদী টুকটাক অশান্তি করতেন আম্মুর সাথে, কিন্তু সেটা এত বড় কিছু ছিল না। এখন কতদিন হয়ে গেলো, সেই সুন্দর দিনগুলো যেন হারিয়ে গিয়েছে।”

 

“আহ্, কী কথা থেকে কই চলে গেলে। মন খারাপ করো না তো। অবশেষে তোমাকে নিয়ে প্রোপার ডেটিং এ আসতে পেরেছি, এই আনন্দে আমি আত্মহারা।”

 

“আমিও অনেক খুশি। কিন্তু ভয় লাগছে পরিচিত কারও চোখে পড়লে বাসায় খবর চলে যাবে। আমার পরিবার কেমন কনজার্ভেটিভ তুমি জানো না। আচ্ছা তুমি যে হঠাৎ চলে এলে, তোমার প্লেসমেন্টে সমস্যা হবে না?”

 

“কিছু হবে না, ম্যানেজ করে নেব। ইন্টার্নিই তো চাকরি তো না। আচ্ছা চলো ভেতরে বাগানের দিকে গিয়ে বসি। ওখানে নিরিবিলি, একটা বড় গাছের নিচে বসলে কেউ হঠাৎ দেখবে না বিরক্তও করবে না।”

 

“আচ্ছা মাঝেমাঝে ফেসবুকে পোস্ট দেখি যে উদ্যানের পরিবেশ ভালো না, বখাটে আছে। অনেকদিন আসি না, কী অবস্থা এখন কে জানে। ভেতরের দিকে যাব না। লেকের দিকে বসি, রাস্তার উল্টো দিকে মুখ করে। তাহলে পেছন থেকে দেখে হঠাৎ কেউ চিনবে না।”

 

“ওটা বোটানিক্যাল গার্ডেন। এখানে এমন না, ভেতরে আনসার আছে, পুলিশ আছে। সমাধির কাছে সিসি ক্যামেরা আছে। আর আমি তো আছিই তোমার সাথে। তামিল হিরোদের চেয়ে কম নাকি আমি।”

 

চন্দ্রিমা উদ্যান থেকে ততক্ষণে প্রাতভ্রমণ শেষে করে সকালে হাঁটতে আসা লোকজন বের হয়ে যাচ্ছে। ভোরের আলো ফুটতেই একদল স্বাস্থ্য সচেতন লোক ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তের পার্কগুলোতে হাঁটতে চলে আসেন, এছাড়া ইট কাঠের শহরে সবুজ কই। চন্দ্রিমা উদ্যানও তাই এর ব্যতিক্রম নয়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, ওজন কমানো, সৌন্দর্য বর্ধন একেকজনের হাঁটার উদ্দেশ্য একেক রকম। কেউ আবার পার্কে হাঁটতে এসে বন্ধু জুটিয়ে ফেলেন, হয়ে যান বিভিন্ন ক্লাবের সদস্য। কোথাও একদল লোক হাত উপরে তুলে হাসে, হাসলে হার্ট ভালো থাকে, কোথাও হাঁটা শেষে সবাই গোল হয়ে বসে আড্ডা দেয়, খাওয়াদাওয়া করে, তবে এসব গ্রুপে অবসর প্রাপ্ত মানুষেরাই বেশি। তরুণ আর অফিসগামীদের এত সময় কই, তারা হাঁটা শেষে দ্রুত বেড়িয়ে পড়েন। 

 

শেরে বাংলা নগরে, চুয়াত্তর একর জমিতে গড়ে উঠেছে এই উদ্যান, আগে জিয়া উদ্যান নামে পরিচিত হলেও এখন চন্দ্রিমা উদ্যান নামেই সবাই চেনে। উদ্যানের ভেতর রয়েছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধি।  উদ্যানের সামনে বাঁকা চাঁদের মতো ক্রিসেন্ট লেক, তার মাঝে ঝুলন্ত সেতু।।সেতুর দু’দিকে পানির ফোয়ারা আছে। মাঝেমাঝে রাতে পানির ফোয়ারা দুটো চালু করলে ভীষণ সুন্দর লাগে। পরিবার নিয়ে আসা লোকজন মূলত এই ঝুলন্ত ব্রীজ, লেকের আশেপাশে শান বাঁধানো অংশ, আর দক্ষিণ দিকের সারিবাঁধা সিঁড়িতেই বসে। রাস্তার অপর পাশেই লুই কানের ডিজাইন বানানো নয়নাভিরাম পার্লামেন্ট হাউস।

 

রিদম আর অরণী হাঁটতে হাঁটতে সমাধির পূর্ব দিকের পুকুর পাড়ে চলে আসে, কিন্তু এখানে পুকুরপাড়ে বেশ কয়েকটি জুটি বসে আছে বলে রিদম বসতে রাজি হয় না। আবার হাঁটতে শুরু করে তারা, কথা বলতে বলতে উদ্যানের বেশ ভেতর দিকেই চলে এসেছে রিদম আর অরণী, এইদিকটায় বাগান। বড় বড় গাছের ছায়ায় কেমন গা ছমছমে পরিবেশ। এমনিতেই আকাশে মেঘ করেছে, তাই আরও অন্ধকার লাগছে।

 

“অরণী, ঐ গাছটার নিচে বসি চলো। পেপার বিছিয়ে নিচ্ছি।”

 

ব্রীজের কাছে পেপার কিনেছিল রিদম, অরণী কপট রাগও দেখিয়েছিল, ঘুরতে এসে রিদম পেপার কিনছে বলে।

 

“পেপার এই জন্য কিনেছিলে! তবে এখানে বসবো না। কেমন গা ছমছমে। পুলিশ, আনসার কেউ নেই এদিকে। গাছে কোন সিসি ক্যামেরাও নেই। আর যা মেঘ করেছে, হঠাৎ বৃষ্টি নামলে দৌঁড়ে যে কোন ছাউনিতে যাব, সেই অবস্থাও নেই।”

 

“ধ্যুত অরণী, ডেটিং এ আসলে এত কিছু চিন্তা করলে হয়। প্রেমিকের সাথে হতে হয় উদ্দাম, বাঁধনহারা, বেপরোয়া।  ইংরেজিতে যাকে বলে রেকলেস। আর তুমি যা করছো মনে হচ্ছে প্রেমিকা নিয়ে না, মাকে নিয়ে এসেছি। এই করবে না, ঐ করবে না, হাত ধরে হাঁটা যাবে না। এমনিতেও তোমার সাথে রাতে মন ভরে কথা বলতে পারি না, যখন তখন মন চাইলে ঘুরতে যেতে পারি না। ছুটি নিয়ে, কতকিছু ম্যানেজ করে আজ এখানে আসলাম, তারপরও তুমি আমার সাথে এমন করছো।”

 

রাগ দেখিয়ে নিজের বিছানো পেপারে বসে পড়ে রিদম।

অরণী বুঝতে পারে আজ এখানে ঘুরতে আসা হঠাৎ করে নয়, রিদম পরিকল্পনা করেই ছুটি নিয়ে এসেছে। আগে থেকে প্ল্যান করলে হয়তো অরণী মানা করে দিত। আজ সকালে মনটা বিক্ষিপ্ত ছিল, রিদম বলতে তাই মানা করতে পারেনি। এই সাত মাসের সম্পর্কে রিদম কখনো একটু কড়া কথা বলেনি, আজ তার এমন উঁচু গলার কথা শুনে কান্না পেয়ে যায় অরণীর। কত খুশি মনে সেও এসেছে রিদমের সাথে। কিন্তু অরণী এতটা খোলামেলা ভাবে মিশতে পারে না। হয়তো কনজার্ভেটিভ পরিবারে বড় হয়েছে বলে। এই হাতে হাত রেখে জড়িয়ে ধরে হাঁটা, সময়ে অসময়ে রিকশার হুড তুলে ঘুরতে বের হলে সবার চোখ এড়িয়ে চুমু খাওয়া, ফোনে ঘনিষ্ঠ কথা বলা, প্রেমিকের বন্ধুর খালি মেসে যাওয়া। এগুলো অরণী কোনদিন পারবে না। এই কথাগুলো রিদমকে সম্পর্কের শুরুতেই বলে দিয়েছিল, সীমা অতিক্রম করা কখনোই ওর পক্ষে সম্ভব না। যদিও অরণীর বান্ধবীরা বলেছিল শুরুতে সবাই এগুলো বলে, এরপর বেশিদিন সামলে চলতে পারে না। প্রেমের সাথে নাকি শরীর চলেই আসে। কারও চুমু আর হাত ধরাধরিতে থাকে, কারও এরও বেশিদূর চলে যায়। কিন্তু নাচতে নেমে ঘোমটা দিয়ে থাকা, তা হয় না।

 

স্বপ্ন কেনার দামে 

পর্ব৪

 

অভিমানে অরণীর কেমন কান্না পেয়ে যাচ্ছে। সবাই বলে অরণী অনেক লক্ষী মেয়ে, বড় খালাতো সবসময়ই ওনার মেয়েদের বলেন, “অরণী আপুর মতো হও, যেমন লক্ষী তেমন মেধাবী।” 

যেই দাদী সারাক্ষণ সবার ভুল ধরে, সেই দাদীও বলেন, “আমার নাতনির মতো আর কেউ নাই, ফুফুগো মতো সুন্দর আর গুণী হইছে।” দাদীর কাছে সেরার মাপকাঠি হলেন দুই ফুপু।

 

অথচ রিদম তাকে কতগুলো শক্ত শক্ত কথা বলে ফেললো। এই যে ওর এই নরম স্বভাব, চঞ্চল হলেও বেপরোয়া নয়, বাবা মায়ের আদুরে শুধু নয়, আজ্ঞাকারী মেয়ে এটাই তো সবার ভালো লাগে। বন্ধুর মায়েরা বলে অরণীর মতো হও, আত্মীয় স্বজনেরা বলল অরণীর মতো হও। মাঝেমাঝে অতিরিক্ত সতর্ক চোখের পাহারা অরণীর খারাপ লাগলেও, সবার এইসব প্রশংসা বাক্যে যে সে তার খুশি খুঁজে নিয়েছে। 

রিদমও কত বলে, “অরণী, তোমার মতো মেয়ে এখন বিলুপ্ত প্রজাতি জানো। এত মিষ্টি মেয়েকে গার্লফ্রেন্ড বানিয়ে পোষাবে না, আমার বৌ বানাতে হবে তাড়াতাড়ি।”

 

আর আজ সেই অরণীকে রিদম কেমন করে বকে দিল। অরণী মাথানিচু করে ঘাসের দিকে তাকিয়ে কান্না আটকানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছে। ইচ্ছে করছে এখুনি বাসায় চলে যেতে, বাসায় গিয়ে মাকে কিছু একটা বুঝ দিয়ে দেবে যে আজ আর ক্লাস হবে না। মা সহজ সরল মানুষ, এত কিছু খোঁজ নিতে যাবে না। ভয় হলো বাবাকে নিয়ে, ক্লাস হয়নি শুনলে অনেক প্রশ্ন করবেন। বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে মিথ্যে বলতে পারে না অরণী। 

নাকি কলেজে চলে যাবে, যে কয়টা ক্লাস পায় করবে। সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, তাছাড়া আগে কখনো একা এতদূর আসা হয়নি, একা একা পার্ক থেকে বের হতেও অস্বস্তি লাগবে। অরণীর চোখে এবার সত্যিই পানি চলে আসে, আসলেই তো ও এত ভীতু কেন হলো! ওর বান্ধবীরা সমস্ত ঢাকা চষে বেড়ায়, আর অরণীর দৌঁড় কলেজ থেকে বাসা, বড়জোর কলেজের কাছে ফাস্টফুডের দোকানগুলো।

 

হঠাৎ রিদম এসে একদম পায়ের কাছে হাঁটুগেড়ে বসে যায়, “মাফ করে দাও অরু, কী বলতে কী বলে ফেলেছি। প্রথম ডেটিং এ এসেছি তো, অনেক নার্ভাস। জানোই তো নার্ভাস থাকলে প্যানিক এটাক হয়। প্লিজ কেঁদো না। আই অ্যাম স্যরি অরু।”

 

ভালোবাসার তীব্র আবেগের সময় রিদম ওকে অরু করে বলে, তখন রিদমকে মায়ের মতোই কাছের কেউ আর আপন কেউ মনে হয় অরণীর। একটু আগেও ভাবছিল চলে যাবে। কিন্তু এখন রিদম এমন চেহারা করে তাকিয়ে আছে, ক্ষমা চাইছে যে অরণীর শক্ত ভাবটা শিথিল হয়ে যায়। রিদম অরণীর হাত ধরে বসিয়ে দেয়। জোর করে কান্না আটকানোর চেষ্টা করায় অরণীর নাকটা ফুলে ফুলে উঠছে কান্নার দমকে, লম্বা সময় দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে রাখায় নিচের ঠোঁটটা লাল রঙ হয়ে গিয়েছে। আজ সকালে তাড়াহুড়োয় অরণী কোনরকমে চুল আঁচড়ে বের হয়েছিল। অথচ এখন এই প্রসাধন বিহীন, সিধে সাধা মুখটাই লাবণ্যময় লাগছে রিদমের। অরণী মাথা নিচু করে বসে আছে। রিদম হঠাৎ মুখটা তুলে ধরে গালে একটা চুমু বসিয়ে দিলো। ঠোঁটে ঠোঁট বসানোর সাহস হয় না। কিন্তু এতেই অরণী ছিটকে সরে যায়, ও বিশ্বাসই করতে পারে না এইমাত্র কী হলো। 

 

“স্যরি অরু, তোমাকে এত মায়া লাগছিল যে নিজেকে সামলাতে পারিনি। বিশ্বাস করো এরমাঝে কোন নোংরা উদ্দেশ্য নেই। আমি তোমাকে ভালোবাসি বলেই কাছে টেনেছি। আর এতটুকু তো প্রেমে চলেই। বাকিটুকু বিয়ের পর।”

 

অরণীর কানে কোন কথা ঢুকে না, তাই উত্তরও দেয় না। কান ঝা ঝা করছে। অনেকক্ষণ ধরেই চলে যাবে ভাবছিল। এখন আর বসে থাকার মানে হয় না। উঠে যাবে এমন সময় দুইজন টোকাই ধরনের লোক সামনে চলে আসে, “কী ভাই জায়গা লাগবনি, সামনে ঝোপের পিছনে ব্যবস্থা আছে। পলিথিন লাগলে বইলেন।”

 

অরণীতো বটেই রিদমও হচকচিয়ে যায়, “আমাদের কিছু লাগবে না, আমরা এখনি উঠছি” রিদম কণ্ঠে জোর নিয়ে বলে। অরণীর হাত ধরে উঠেও যায়। কিন্তু  লোক দুটো বাজে ভাবে হাসতে থাকে। এর মাঝে আরও দু’জন লোক এগিয়ে আসে। তার মানে জায়গাটা নিরিবিলি মনে হলেও ঝোপের আড়ালে এমন মাদকাসক্ত বখাটেরা ঠিকই লুকিয়ে থাকে। চারজন লোককে দেখে অরণী আর রিদম দু’জনই ভয় পেয়ে যায়। পেপার পত্রিকায় পড়া দুনিয়ার সব কাহিনি অরণীর মাথায় চলে আসে। কী করবে এই লোকগুলো!  এখন তো দিনের আলো, গায়ে হাত টাত দেবে না তো! এমন কিছু হলে অরণী মারাই যাবে। অরণীর ফ্যাঁকাসে রক্তশূণ্য মুখ দেখে রিদমের ভীষণ  খারাপ লাগছে, অরণীর কোন ক্ষতি হলে যে সে নিজেকে মাফ করতে পারবে না, ওকে যে সেই এখানে নিয়ে এসেছে। 

 

“দেখেন ভাই, আপনারা কী চান? এখানে আসেপাশে লোকজন আছে, পুলিশ আছে, আমরা চিত্কার করে লোক জড়ো করবো। আমি ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ি, রাজনীতি করি, ফোন দিলে আমার ছেলেপেলেরা চলে আসবে এখনি।” কণ্ঠ যতটা স্বাভাবিক রেখে ফোন বের করে কল করার ভঙ্গি করে রিদম। মেডিকেল পড়ে, এই পরিচয় দিলে এরা দু’পয়সার ভয় পাবে না। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বলে, কেননা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শুনলে সবাই কিছুটা হলেও সমীহ করে। অরণী বুঝতে পারে কেন রিদম এমনটা বলছে। রিদমের শার্ট খামছে ধরে সেও স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, এদের বুঝতে দেওয়া যাবে না যে ভয় পেয়েছে। 

 

লোকগুলোর মুখের ভাবভঙ্গি একটু পরিবর্তন হলেও রিদমকে খুব একটা পাত্তা দেয় না তারা, দলনেতা গোছের লোকটা বলে “আরে দেখলাম চুম্মাচাটি করতাছেন। তাই একটু সাহাইয্য করতে আইলাম। উল্টা দেখি পুলিশের ডর দেখান, পোলাপান আনার ডর দেখান। পোলাপান আমগো কম আছেনি। আপনে আনার আগে আমগো লোক আইবো। আর পুলিশ আইবো সবার শ্যাষে। তাই কই ঝামেলাত আপনেও না যান, আমরাও না যাই। মজা করতে আসছেন করেন, এই তো বয়স আমনেগো। আমগোও কিছু চা পানি খাওয়ার টাকা দ্যান আমরাও যাই গা।”

 

অরণী ইশরায় রিদমকে টাকা দিতে বলে,যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ও এখান থেকে বের হতে চায়। রিদম একশো টাকার একটা নোট বের করে দেয়। কিন্তু লোকগুলো হাতে নেয় না। “কী দিলেন, ভিক্ষা? তাই তো কই মাইয়া নি হোটেল না যাইয়া জঙ্গলে আইলেন ক্যান। ফকির পাইছেননি? পাঁচশো দ্যান, আমরা পাঁচজন আছি।”

 

“পাঁচজন কই, চারজন আপনারা। আর একশো টাকা কম হলো নাকি?”

 

“না দিলে আমরাও লোক ডাকুম, বলুম পার্কে নোংরা কাম করতাছিলেন, আমরা হাতেনাতে ধরছি। ছবি তুইল্লা নেটেও ছাড়ি দিমু।”

 

অপমানে আর লজ্জায় অরণীর মনে হচ্ছে মাটির সাথে মিশে যাবে। রিদমও ঘামছে। এত টাকা তার কাছে নেই। পকেটে সম্ভবত আর পঞ্চাশ টাকা আছে। অরণীর কাছে পাঁচশো টাকার নোট আছে, সকালেই বাবা দিয়েছিল, আর কিছু খুচরো টাকা হবে। বাসায় যেতে ভাড়া লাগবে কত কে জানে, কিন্তু এখন এসব ভাবার সময় না, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে বের হতে চায়। তাড়াতাড়ি ব্যাগ খুলে পাঁচশো টাকা বের করে দেয়। টাকা নিয়ে লোকগুলো সালাম দিয়ে চলে যায়। অরণী গেটের দিকে দৌঁড়াতে থাকে, জীবনে এত খারাপ দিন তার কখনো আসেনি, কী ভেবে এসেছিল আর কী হলো!

 

রিদমও পেছন পেছন দৌঁড়ায়, “অরু, দাঁড়াও,  আমি বাসায় নামিয়ে দিয়ে আসি। অরু।”

 

“একটা কথা বলবা না আমার সাথে। তোমার জন্য আজ আমাকে এতকিছু শুনতে হলো। ছিঃ”

 

কাঁদতে কাঁদতে রিকশায় উঠে অরণী, রিদম উঠতে চাইলেও দেয় না। রিদমেরও অনেক রাগ ওঠে, অরণী ওভার রিয়াকশন দেখাচ্ছে মনে হয়। “শালা এমন সেনসেটিভ মেয়ের সাথে প্রেম করাই ভুল” মনে মনে নিজেকে গালি দিয়ে সেও উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করে।

 

 

 

স্বপ্ন কেনার দামে 

পর্ব৫

 

অরণী কলিংবেল টিপেই যাচ্ছে। তর সইছে না যেন। হুমায়রা বেগম অবাক হোন, সবে বাজছে সাড়ে এগারোটা, এই সময় কে আসবে! কাজের সহকারী কাপড় ধুচ্ছিল, তাই নিজেই গিয়ে দরজা খুলে দিলেন।

 

“অরণী, তুই এখন? ক্লাস হয়নি আজ?”

 

“ক্লাস হচ্ছে আম্মু, আমি চলে এসেছি।”

 

“কেন? শরীর খারাপ নাকি? আর তুই কান্নাকাটি করছিস নাকি? চোখমুখ ফোলা ফোলা লাগে।”

 

“আম্মু আজ ভাইবা পরীক্ষা ছিল। ভালো হয় নাই,  ম্যাডাম সবার সামনে বকা দিয়েছেন, তাই কান্না করছি। ভালো লাগছিল না দেখে চলে এসেছে।”

 

“আরে পরীক্ষা খারাপ হয়েছে কেন? আর বাকি ক্লাস যে না করে চলি আসলি সেটা সমস্যা হবে না? কলেজে কী বলবে?”

 

“আম্মু, এখন তো স্কুলে পড়ি না যে হঠাৎ চলে আসলে টিচাররা অস্থির হয়ে খোঁজাখুঁজি করবে। অনেকেই পছন্দ মাফিক ক্লাস করে।”

 

“তোর আব্বু এসব একদম পছন্দ করে না অরণী। পছন্দ মাফিক ক্লাস করা মানে কী? সব ক্লাস করবি। এইসব ফাঁকিবাজি করছিস দেখে পরীক্ষা খারাপ হয়েছে।”

 

মা মেয়ের কথার মাঝে অরণীর দাদী মোমেনা খাতুন এসে দাঁড়ান, “জামিলের বৌ, তোমার অসুখ বিসুখের জ্বালায় মাইয়ার লেখাপড়া মাথাত উঠছে। এখন মেয়েরে বকো ক্যান। সকালেও বিছানাত পইড়া ছিলা, আমার নাতনি নাস্তা রেডি কইরা কলেজ গেল। অথচ আগে ঘুম থেইক্কা উঠলে একটু পড়তে বসতো। এখন বাসার কাম কইরা কুল পায় না, পড়বো কী। এইটুকু মাইয়ারে রান্ধন বান্ধনে লাগাই দাও। আসলে ডাক্তারি পড়ার মূল্য তুমি কী বুঝবা, তোমগো বংশে কেউ ডাক্তারি পড়ছেনি।”

 

“আম্মা, আপনি আর আপনার ছেলে কিছু হইলেই খালি আমাকে দোষ দেন। ছেলেমেয়েগুলো যখন ভালো রেজাল্ট করে তখন বাবার ব্রেন পাইসে, ফুপুদের মতো হইছে। আর খারাপ করলে আমার বংশ নিয়ে টানাটানি। ডাক্তারি না পড়লেও আমার দুইভাই মাস্টার্স করছে। বকলম না কেউ।”

 

অরণী আসলে পথে আসতে আসতে ভাবছিল কী বলবে। তাছাড়া মা একনজর দেখলে বুঝে যাবে যে অরণী কান্না করেছে। একটু কাঁদলে অরণীর চোখমুখ ফুলে যায়। শেষে ঠিক করে পরীক্ষা খারাপ হয়েছে বলবে। মা হয়তে একটু বকবে কিন্তু কান্না আর অসময়ে বাসায় আসার বিষয়টা সামলে যাবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এটাও সহজ সমাধান ছিল না। দাদী এই কথা বাবাকে অবশ্যই বলবে। আজ বাসায় একটা অশান্তি হবে। এই একটা জিনিস অরণীর অসহ্য লাগে, এই বাসায় কোন কিছু যেন কেউ সহজ করে গ্রহণ করতে পারে না। তার কত ক্লাসমেট আইটেম আর কার্ড ফাইনালে পেন্ডিং খায়, মেডিকেলে তো এগুলো মামুলি ব্যাপার, কত মানুষ বছর বছর সাপ্লি খেয়ে পাঁচ বছরের কোর্স সাত আট বছরে শেষ করছে। স্যার ম্যামদের কাছে পাশ করার চেয়ে ফেল করা সহজ। সবাই বলে ডাক্তারি পাশ এত সহজ নয়। কিন্তু অরণীর বাসায় কোন কিছু সহজে গ্রহণ করবে না। এখনো রেজাল্ট হলে বাবা জিজ্ঞেস করবে কত মার্কস পেয়েছে, রোল কত হলো, আরও ভালো হলো না কেন। যেখানে পাশ মার্কসই একশোতে ষাট, সেখানে একবারে প্রফের পুলসিরাত পার হওয়াই এভারেস্ট জয়ের আনন্দের মতো। কিন্তু বাসায় কেউ বোঝে না। একশোতে সত্তর কেনো পেয়েছে, নব্বই কেনো পেলো না, এই নিয়ে যেন অসন্তোষ। অরণী বোঝাতে পারে না যে এটা তো স্কুলের লেখাপড়া না। এই যে আজ এই পরীক্ষা কান্ড শেষ পর্যন্ত কই যায় কে জানে।

 

“দাদী, আপনি আম্মুকে দোষ দেন কেন? আমি নিজেই পড়ি নাই। রাতে তো পড়তে পারতাম, আমিই পড়ি নাই। ছোট পরীক্ষা ছিল, ভাইবা দশ মার্কসের। এত জরুরি কিছু না। আমাদের প্রতিদিনই কোন না কোন আইটেম থাকে। এটা এত চিন্তার কিছু না।”

 

হুমায়রা বেগম আর মোমেনা খাতুন তাও শান্ত হোন না। অরণীর এবার সত্যি চিন্তা হচ্ছে। এদিকে সাইলেন্ট ফোনে একের পর এক ম্যাসেজ এসে জমছে। ম্যাসেজর রিপ্লাই না পেয়ে রিদম ফোন করা শুরু করছে। অরণী ফোনটা বন্ধ করে দেয়।

 

****

 

অরণীর উপর রাগ করে রিদম তখন উল্টো পথে হাঁটা শুরু করলেও একটু পর মাথা ঠান্ডা হয়ে যায়। তারপর শুরু হয় অস্থিরতা। বারবার মনে হচ্ছে অরণীকে অতগুলো কড়া কথা না বললেও হতো। অরণী কেমন পরিবারের মেয়ে তাতো তার অজানা নয়। ফয়সালের উপর রাগ হয়, শালা কয়দিন ধরে বন্ধুরা ক্ষেপাচ্ছিল যে কী প্রেম করিস, এখনো রুম ডেটতো দূর হাতও ঠিক মতো ধরতে পারলি না। শুরুতে রিদম কানে নিতো না। কিন্তু ইদানীং ফয়সাল বোঝাচ্ছে যে একদম ছেড়ে দেওয়া ঠিক নয়, দু একটা প্রেমের প্রমাণ হাতে রাখতে হয়, না হলে অরণীর মতো বাবা মায়ের কথামতো চলা গুড গার্লরা হঠাৎ পল্টি খায়, আর সুন্দরমতো বাবা মায়ের পছন্দের ছেলে বিয়ে করে অন্যের ঘরণী হয়ে যায়। বেচারা প্রেমিকগুলো না বৌ পায়, না প্রেমিকা, কারণ প্রেমের সময় এই মেয়েগুলো এত নেকু থাকে যে হাতও ধরতে দিতে চায় না। খামোখা সময়, টাকা আর ইমোশন নষ্ট। 

 

দিনের পর দিন ফয়সালের বয়ান শুনে রিদমের ব্রেনওয়াশ হয়ে গিয়েছে। গত বেশ কিছুদিন ধরেই রিদম অরণীকে বাইরে নিয়ে পার্কে যাওয়ার জন্য জোরাজোরি করছিল। কোন দামী রেস্টুরেন্টে নেওয়া এই মুহূর্তে তার পক্ষে সম্ভব না। পকেটের অবস্থা ভালো না, তবে শান্তি এটাই যে অরণী এসব নিয়ে মাথা ঘামায়নি কখনো। দামি উপহার, ভালো রেস্তোরাঁ এসব নিয়ে কখনোই চাপ দেয়নি। রিদমের সাথে টঙের দোকানের চা সিঙ্গারায় সন্তুষ্ট থাকে। তারপরও ফয়সালের কথায় মনে হয় আসলেও তো এখনও অরণী এত বাবা মায়ের ভয়ে অস্থির থাকে, এই মেয়েকেতো একটু চাপ দিলেই সুরসুর করে বিয়ে করে ফেলবে। রিদমের অরণীকে চাই, ভালোবাসা না অবসেশন ও জানে না। কিন্তু অরণী তারকাছে এক মাদকের নেশার মতো। সেই টোল পড়া হাসি সে আর কারও সাথে ভাগ করতে চায় না, অরণীর একমাথা চুলে যদি কেউ নাক ঢুবিয়ে শ্বাস নেয়, তবে তা রিদমই হবে। এই শ্যামল বরণ মায়াবী মেয়েটার চোখের কাজলে শুধু তারই নাম লেখা থাকবে। আর তারজন্য যদি অরণীকে একটু চাপ দিতে হয় তাও দিতে রাজি।

তাই তো ফয়সাল যখন বলে, “শোন অরণী নরম ধরনের মেয়ে। তুই ওকে একটু হাতে নিতে পারলে আর তোকে ছাড়তে পারবে না।”

 

“দোস্ত আমি অরণীকে যতটুকু ভালোবাসি, ও আমাকে তারচেয়ে বেশি ভালোবাসে। আমার চেয়ে বেশি বিয়ের কথা অরণীই বলে।”

 

“আঁতেলে মতো কথা বলিস না তো রিদম। তুই শালা ওই চোখে দেখে মন ভরাবি, মা* নিয়ে টান দিবে অন্য কেউ”

 

“ফয়সাল, মুখ সামলে কথা বল।”

 

“আচ্ছা স্যরি। আরে আমার মুখ দিয়ে এসব কথা এমনি বের হয়। তুই রাগতেছিস কেন। শোন একটু ঘনিষ্ঠ ছবিটবি হাতে থাকলে ভালো। ও তোকে কোন নু*স পাঠিয়েছে আজ পর্যন্ত? পাঠায়নি তাই না? তারমানে ও তোকে বিশ্বাসই করে না।”

 

“আমি ওকে কখনো পাঠাতে বলিও নাই। প্রযুক্তির কোন বিশ্বাস আছে? আমার ফোন চুরি হলে এইসব ছবির কী হবে জানিস?”

 

“আচ্ছা ছবি বাদ দে। তোর সাথে সেলফি তে তুলতে পারিস।”

 

“ও ভয় পায়, ফেসবুকে দিলে কেউ দেখে ফেললে ওর বাসায় সমস্যা হবে।”

 

“তাহলে তোর কাছে প্রেমের প্রমাণ কী আছ? ঐ চ্যাটবক্স? শোন ভবিষ্যতে সব অস্বীকার করে বলবে আইডি হ্যাক হইছে। না হলে বলবে শুধু বন্ধু ভাবতো তোকে। সময়ে সময়ে এই সব নিরীহ মেয়েরা শেয়ালের চেয়েও ধূর্ত হয়।”

 

অতঃপর ফয়সালের কথায় একসম রিদমের মনে হয়, আসলেও তো টুকটাক ঘনিষ্ঠ কথাবার্তা বলাতো প্রেমে অন্যায় কিছু না। চেষ্টাও করেছিল, দু একটা ফোনকল রেকর্ডও করে রাখবে ভেবেছে। কিন্তু অরণীর সাথে এসব কথা আগায় না। আর যেসময় এসব কথা আগানো যায়, অর্থাৎ গভীর রাতে, তখন অরণী ফোনই ধরে না, চ্যাটও করে না। পার্কে যাওয়ার জন্য বলতে বলতেও অরণী সাহস করে না। ভেবেছিল পার্কে একসাথে সময় কাটাবে, কিছু ছবি তুলবে। তাই তো আজ প্ল্যান করে নিয়ে এসেছে। কিন্তু কী থেকে কী হয়ে গেল। যখন থেকে মাথা ঠান্ডা হয়েছে অরণীকে ফোন আর ম্যাসেজ করে যাচ্ছে। অরণী বেশিক্ষণ রাগ করে থাকতে পারবে না এমনটাই বিশ্বাস ছিল। কিন্তু এখন ফোন বন্ধ পাওয়ায় রিদমের মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। 

 

****

সন্ধ্যার পর বাসায় একটা ঝড় বয়ে গিয়েছে। জামিল সাহেব বাসায় ঢুকতেই মোমেনা বেগম অরণীর পরীক্ষায় খারাপ করার কথা জানালেন। জামিল সাহেব অরণীকে শাসন করার আগে হুমায়রাকে নিয়ে পড়লেন। কথায় কথায় কথা এতদূর বেড়ে গেলো যে হুমায়রার হাঁপানির টান উঠে গিয়েছে। 

(চলবে)

 

স্বপ্ন কেনার দামে 

পর্ব৬

 

“আম্মু, ভাত খাবে আসো, ঔষধ খেতে হবে তো। আব্বু আর অমিয়ও খেয়েছে। দাদীকে রুটি আর ডাল সবজি দিয়েছি।”

 

“কয়টা বাজে?”

 

“দশটা বাজেনি এখনো। নয়টা পঞ্চাশ বাজে বোধহয়।”

 

“তাহলে সবাইকে খাবার দিতে এত তাড়াহুড়ো কেন তোর? খুব কাজ দেখানো শিখছিস না? দেখাস যে আম্মু কোন কাজের না, সব কাজ তুই করে উদ্ধার করিস।”

 

“আম্মু, এভাবে কথা বলছো কেন? আব্বু আর দাদুর রাগ তুমি আমাকে দেখাচ্ছ? আমি কী জানতাম আব্বু এভাবে তোমার উপর রাগ ঝাড়বে। আমি খারাপ করছি আমাকে বকার কথা। আর পরে তো আমাকেও আব্বু বকেছে।”

 

“পরীক্ষায় খারাপ করছিস নিজের দোষে, সারাদিন ফোন টিপিস। তোর আব্বু রেগে যাবে শুনলে, এই জন্য কখনো বলি না। আর তুই নিজে নিজে ক্লাস মিস করিয়, নিজের দোষে পরীক্ষা খারাপ করিস, সেজন্য কথা শুনতে হয় আমাকে। আমার বাসার কাজ আমি যখন পারি করবো, তুই চর কোন কাজ করতে আসবি না। তোর হাতে যেন ফোনও না দেখি।”

 

“আম্মু, সত্যি বলতে বাড়াবাড়ি আব্বু করে। সামান্য একটা আইটেম পরীক্ষা। এই ১০ মার্কসের চইটেম আমাদের সারাবছর চলে। এগুলো মেডিকেলের নিয়মিত ঘটনা। পরীক্ষা খারাপ হলে আবার পেন্ডিং দেওয়া যায়। এই সামান্য জিনিস নিয়ে এই লেভেলে কেউ হইচই করে না। এই বাসায় সবাই বেশি বেশি।”

 

“শোন, তোর আব্বু আর দাদী যা করেন, আল্লাহ একদিন ওদেরও তাই ফেরত দেবে। এই যে তোর বাপ কথায় কথায় আমার উপর রাগ ঝাড়ে, সবকিছুর জন্য আমাকে দায়ী করে, একদিন যখন তার মেয়ের জামাই যখন এই কাজগুলো করবে তখন সে বুঝবে কেমন লাগে। আল্লাহর কাছে দোয়া করি এমন একটা মেয়ের জামাই তোর বাপের কপালে থাকুক।”

 

“আম্মু, তুমি আমাকে অভিশাপ দিচ্ছ? তুমি আব্বুর শিক্ষা চাইতে গিয়ে আমার জন্য বদদোয়া দিচ্ছ। সত্যি এমন মেয়ের জামাই পেলে শুধু আব্বুর কষ্ট হবে, তোমার হবে না? আচ্ছা যখন মন চায় খেও, আমি যাচ্ছি।”

 

হুমায়রা চুপ করে থাকেন, আসলে এতকিছু ভেবে কথাগুলো বলেননি। রাগের মাথায় মনে মনে অনেক বদদোয়া আসছিল জামিল সাহেব আর শাশুড়ির জন্য। ওনাদের সাথে মুখে জবাব দেওয়ায় তিনি বরাবরই দুর্বল। আজ যখন জামিল সাহেব প্রয়াত শ্বশুর শাশুড়িকে তাচ্ছিল্য করে, ব্যঙ্গ করে কথা বলছিলেন, কে যেন ছুরি দিয়ে ওনার বুকটা এফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছিল। যখন অরণীর নানা নানী বেঁচে ছিলেন তখন যে জামিল সাহেব খুব ভালো ব্যবহার করতেন তা নয়। বরং সবসময় প্রতাপ দেখাতে পছন্দ করতেন। হুমায়রার বাবার বাড়ি দাওয়াত ছাড়া কখনো যেতেন না, হাতে করে নামমাত্র ফলমূল নিতেন, কিন্তু নিজের আপ্যায়নে সামান্য ত্রুটি পেলে সেটার ঝাল দেখাতে ভুলতেন ন। বহুবার টেবিলে বসে পছন্দসই খাবার না পেয়ে রাগ করে উঠে যাওয়ার নজির আছে। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের কর্তা, হুমায়রার পিতা সাধ্য অনুযায়ী জামাই আদর করতেন, কিন্তু তারপরও তা জামিল সাহেবের মনপুত হতো না। মুরগী থাকলে, মাছ নেই বলে অভিমান দেখাতেন। মাছ মুরগী দুটোই থাকলে গরু খাসি করা হয়নি বলে কটাক্ষ করতেন। এমন না যে তিনি ভোজনরসিক, এই জিনিসটা শুধুমাত্র শ্বশুরবাড়ির লোকদের হেয় করে করে মজা পেতে করতেন। কোন সম্মানই ওনাদের কাছে যথেষ্ট ছিল না। উপহার দিলে শাশুড়ির পছন্দ হতো না, দাওয়াত দিলে আপ্যায়ন তাদের মনমতো হতো না। নতুন নতুন বিয়ের পর এই দোষ ধরা নিয়ে হুমায়রা আতংকে দিন কাটাতো। আস্তে আস্তে গা সওয়া হয়ে গিয়েছিল। বুঝে গিয়েছিলেন সম্মান পেতে হলে যে সম্মান দিতেও হয়, তা এই মানুষগুলো জানে না। বাবা মা কেউ এখন বেঁচে নেই, আজ সেই মৃত মানুষদের টেনে এনে তাচ্ছিল্য করে বলা কথাগুলো যেন মনটা ভেঙে দিয়েছে। নিজের অজান্তেই মনের কষ্টগুলো বদদোয়া হয়ে ঝরছিল।

 

মুখের প্রতিবাদ করার শক্তি আগেও ছিল না, এখনো পারেন না। তার যে ভয় হয়। আগে সংসার ভাঙার ভয় করতেন, আর এখন নিরাপত্তাহীনতার ভয় পান। আগে শুধু দোয়া করতেন জামিল সাহেবের যেন মাথা ঠান্ডা থাকে, তিনি যেন হুমায়রার উপর খুশি থাকেন। এখন দোয়া করেন এই খারাপ ব্যবহারের শাস্তি যেন আল্লাহ ওনাকে দেন। আর এইভাবেই হয়তো আমাদের মনের অজান্তে আমাদের সঙ্গীর দোয়ায় আমাদের অবস্থান বদলে যায়, আর আমরা তা টেরও পাই না।

 

হুময়রার বাবা মা এখন আার বেঁচে নেই , ভাইবোনেরা নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত, তারউপর এখন সারাবছর হুমায়রা অসুস্থ থাকেন। তারপরও মাঝেমাঝে তার মনে চায় সব লাথি মেরে চলে যেতে, কত লোকতো রাস্তায় ভিক্ষা করেও খায়। কিন্তু পারেন না অরণী আর অমিয়র কথা ভেবে। মাঝেমাঝে ভাবেন অরণীর বিয়ে হয়ে গেলে, আর অমিয় একটা চাকরি পেয়ে গেলে সংসার ডিউটি থেকে ছুটি নেবেন। অমিয়র উপর বড়ো আশা হুমায়রার, নিজের সমস্ত অপূর্ণ স্বপ্নের ভার যেন দেখতে পান অমিয়র ঘাড়ে। অরণী পরের ঘরের বৌ হবে, হয়তো বছরে এক দুখানা শাড়ি কিনে দিবে, একটু ভালোমন্দ এনে খাওয়াবে। এর বেশি অরণীর কাছে আশা করেন  না। হুমায়রার অজান্তেই সমাজের এই বিরূপ চিন্তা তারও মজ্জাগত। এখনো মুক্তির স্বপ্ন দেখেন ছেলের কাঁধে চড়ে। তাই বলে মেয়ের খারাপ কখনো চান না। চান মেয়েটা সুখী হোক, যে সুখ তিনি পাননি। কিন্তু আজ কী যে হলো, মনে মনে স্বামীর শিক্ষা পাওয়ার কামনা করতে গিয়ে যে মেয়ের জন্য অভিশাপ চাইছেন, হতাশার মুহূর্তে তা মনেই আসেনি। নিজের হতাশা আর ক্রোধের কথাগুলোই অরণীর জন্য মুখ দিয়ে বের হয়ে যায়। 

 

কথাটা মনে হতেই একমুহূর্তে রাগ গলে পানি হয়ে যায়, বরং অপরাধবোধ হয়। ওজু করে নামাজে দাঁড়িয়ে যান, নামাজ শেষে মোনাজাতে হাত তুলে বলেন, “ইয়া আল্লাহ আপনি অভিশাপ দেওয়া এবং অভিশাপকারী দুটোই অপছন্দ করেন। আজ নিজের মনের কষ্টে আমি নিজের অজান্তেই সন্তানকে অভিশাপ দিয়ে ফেলেছি। আমাকে আপনি ক্ষমা করুন আল্লাহ। অরণীর বাবাকে আপনি হেদায়েত দিন, হেদায়েত দিন।”

 

জামিল সাহেব শোবার ঘরে এসে হুমায়রাকে জায়নামাজে বসে কাঁদতে দেখেন। বহুদিন তিনি স্ত্রীকে কথার আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করেছেন, আড়ালে আবডালে চড়ও মেরেছেন। পরে অপরাধবোধ হলেও ক্ষমা চাননি, ইগো ওনাকে ক্ষমা চাইতে দেয়নি। মনে মনে ঠিক করতেন আর এমন ব্যবহার করবেন না। কিন্তু মুখে এক কথাটা উচ্চারণ করতেন না। নিজের মতো স্বাভাবিক আচরণ করতেন, নিয়ম করে হুমায়রাকে কাছে টানতেন, যেন কিছুই হয়নি। হুমায়রা নিজের মতো চুপচাপ থেকে নিজে নিজেই স্বাভাবিক হয়ে যেত একসময়। জামিল সাহেবও মনে মনে করা ওয়াদা ভুলে আবারও স্বভাবজাত দুর্ব্যবহার করতেন। এই সাইকেল বছরের পর বছর চলেছে। এখন তো এসব নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে গিয়েছে, আগের মতো হুমায়রাও আর গাল ফুলায় না, বরং স্বাভাবিক ভাবে ঘরসংসার করে। আসলে জামিল সাহেব বুঝে ফেলেছেন শ্বশুর শাশুড়ির মৃত্যু হুমায়রাকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে, তাই তো এখন যখন তখন খারাপ ব্যবহার করতে আরও বাঁধে না। তবে আজ মনে হয় মৃত শ্বশুর শাশুড়িকে টেনে এনে গালিগালাজ না করলেই পারতেন মনে হলো। হুমায়রাকে আগে কখনো এভাবে নামাজের বিছানায় কাঁদতে দেখননি। একবার ক্ষমা চেয়ে নিবেন কিনা ভাবলেন, কিন্তু ঐ যে ইগো! সেটা তাকে ক্ষমা চাইতে দিল না, বরং গলা খাঁকড়ি দিয়ে বললেন, “হুমায়রা, নামাজ পড়া হলে মশারি লাগিয়ে দিও, ঘুমাবো।”

 

(চলবে)

 

স্বপ্ন কেনার দামে 

পর্ব৭

 

রিদমের বাসা বসিলায়, বেড়িবাঁধের তিন রাস্তার মোড়ের কাছে। বাড়িটা ওদের নিজস্ব বলা যায়, অবশ্য পুরো বাড়ি না, চারতলা বিল্ডিং এর তিনটি ফ্ল্যাট  রিদমদের। রিদমের বাবা আফজাল হোসেন এখন কিছু করেন না। অবশ্য একসময় প্রবাসী ছিলেন। আফজাল হোসেনের বাউন্ডুলে স্বভাবের কারণে রিদমের দাদা ভেবেছিলেন ছেলের বিয়ে দিয়ে বিদেশে পাঠিয়ে দিলে ভালো হবে। সংসারী হয়ে গেলে কাজকর্মে মন থাকবে। যতদিন দাদা বেঁচে ছিলেন আফজাল হোসেন দুবাই আর ঢাকায় আসা যাওয়ার ভেতর থাকতেন। দাদার মৃত্যুর পর রিদমের বয়স যখন সাত বছর তখন আফজাল হোসেন পাকাপাকি ভাবে দেশে চলে আসেন। হাতে করে কিছু কাঁচা টাকা নিয়ে এসেছিলেন। কিছু টাকা ব্যবসা খাটানোর চেষ্টা করে ধরা খেলেন, যেহেতু নিজের পরিশ্রম করার আগ্রহ ছিল না, অন্যকে দিয়ে কাজ করাতে গেলে ধরা তো খেতেই হয়। বাকি টাকা দিয়ে বসে বসে খেতে খেতে এখন প্রায় সব শেষ। এখন পৈতৃক সূত্রে পাওয়া তিনটি ফ্ল্যাটের একটায় রিদমের পরিবার থাকে, আর দুটোর ভাড়ার টাকায় সংসার চলে টেনেটুনে। একটু পুরানো ধাঁচের বাড়ি বলে ভাড়াও বেশি নয়, এ এলাকায় এমনিতেও ভাড়া খুব একটা না, তার উপর এত পুরানো বাসায় ভালো অবস্থার কেউ ভাড়া নিতে চায় না।

 

বসিলায় যখন রিদমের দাদা এই বাড়ি করেছিলেন, তখন এই এলাকা ঢাকার ভেতর গ্রামই ছিল বলা যায়। তাই সস্তায়ই জমি পেয়েছিলেন। এখন আস্তে আস্তে বসিলা উন্নত হচ্ছে, চওড়া রাস্তা হয়েছে, জমির দাম বাড়ছে। রিদমের বাকি দুই চাচা আর বড়ো ফুপু চাইছেন এই পুরানো বাড়ি ভেঙে নতুন আধুনিক বাড়ি করে ফ্ল্যাট ভাগ করে নিতে। আফজাল হোসেন ছাড়া বাকি ভাইবোন সবার অবস্থা ভালো, তাদের পক্ষে নতুন বাড়ির জন্য বিনিয়োগ করা সম্ভব হলেও আফজাল হোসেনের পক্ষে সম্ভব না, তাই রিদমের মা বাড়ি ভাঙার পক্ষে না। এই নিয়ে নিত্য ঝামেলা চলছে। বড়ো ফুপু রিদমদের পক্ষ থেকে টাকা দিতে রাজি আছেন, তবে সেক্ষেত্রে ভাই আফজাল হোসেনকে সমপরিমাণ  ফ্ল্যাটের ভাগ ছাড়তে হবে, নতুন বহুতল ভবনে বাকিরা তিনটে করে ফ্ল্যাট পেলেও তিনি পাবেন একটা, কিছু টাকা ক্যাশও দিবেন। এতে রিদমের বাবা রাজি হলেও মা লাকি আক্তার মানতে রাজি নন। তাই কেউ কোন সমাধানেও আসতে পারছে না।

 

ক্লান্ত রিদম রাতে যখন তিনতলার সিঁড়ি ভেঙে উঠছিল তখন মায়ের চিল কণ্ঠ কানে আসে। সংসারের যাঁতাকলে পিষ্ট লাকি আক্তার আগে ভীষণ শান্তশিষ্ট থাকলেও ইদানীং আফজাল হোসেনের সাথে সমানে সমান তাল মিলিয়ে ঝগড়া করেন। রিদমের বিরক্ত লাগছিল, সারাদিন বহু চেষ্টা করেও অরণীর সাথে যোগাযোগ করতে পারেনি। প্রচন্ড অভিমান, হতাশা আর রাগে এমনি মাথা দপদপ করছিল, এখন বাবা মায়ের ঝগড়ায় আরও বিরক্ত লাগে। লাকি আক্তার একাই চিল্লাছেন বোঝা যাচ্ছে, রিদম সিঁড়িতে বসে থাকে, চিত্কার থামলে দরজা নক করবে ঠিক করে। একটু পর শব্দ থামলে দরজায় নক করে রিদম।

 

“ভাইয়া, আজ এত দেরি হয়েছে যে?”

 

“কাজ ছিল। আম্মুর কী হইছে তিথি, এত চিল্লাছে কেন? রাস্তা থেকে গলা শোনা যায়।”

 

“ঐ যা হয়, আব্বুর সাথে লাগছে। আব্বু বড় ফুপির কাছ থেকে কবে একলাখ টাকা নিয়েছে। ফুপি ফেরত চাইছে।”

 

“এতে আম্মা চিল্লায় কেন আব্বুর সাথে? আব্বু টাকা নিয়েছে, আব্বু শোধ করবে।”

 

“ঐ টাই কারণ। আব্বু মনে হয় আম্মুর কোন হাতের বালা টালা বিক্রি করতে চাইছে, জোর করে নিয়ে গেল।”

 

“আম্মুর গয়না আছে এখনো? আম্মু আব্বু কই”

 

“গয়না আছে মনে হয় কিছু। আম্মু তো গয়নাগাটি নিয়ে কথা বলে না, আজ আব্বু বালা বিক্রির কথা বলায় জানলাম যে বালা এখনো আছে। আমি তো ভাবছি আগেই বিক্রি করে দিয়েছে। এতক্ষণ আম্মু একা একা কতক্ষণ ভাগ্যকে শাপশাপান্ত করলেন, এখন বাথরুমে ঢুকেছে। আব্বু বারান্দায়।”

 

“তিথি, মুখ হাত ধুয়ে আসি। খাবার দে তো।”

 

লাকি আক্তার চোখমুখ ধুয়ে এসে আলমারি খোলেন। গয়না বলতে আর সামান্য কিছু আছে, এগুলো বিক্রি করার কোন ইচ্ছে ওনার নেই। বালা জোড়া ঘুরে দেখে আবার আলমারিতে রেখে দেন। রিদমের গলার আওয়াজ শুনছেন, ছেলে ফিরে এসেছে বুঝতে পারছেন। মুখ মুছে খাওয়ার টেবিলের দিকে যান।

রিদম খেতে বসেছে, আয়োজন তেমন কিছু বা, পাট শাক ভাজি, শুকনো মরিচ আর মশুরের ডাল দিয়ে পেঁপে।

 

“রিদম এত দেরি করছিস যে?”

 

“কাজ ছিল আম্মু। আম্মু একটা ডিম পোচ দাও তো, তরকারি ভালো লাগছে না।”

 

“তিথি একটা ডিম দে ভাইকে। কী কাজ ছিলরে? কারও চেম্বারে ঢুকেছিস? না টিউশনি ছিল?”

 

“নাহ্ অন্য কাজ। টিউশনি ছেড়ে দিয়েছি বললাম না। পড়ার সময় পাই না। পোস্ট গ্রাজুয়েশনের পরীক্ষা দিতে পড়া লাগে তো আম্মু।আপাততঃ কারও চেম্বারে ঢুকবো না, বেতন দিবে নামমাত্র, সময় নষ্ট শুধু।”

 

“কই পড়িস? এত কষ্ট করে ছেলেকে ডাক্তার বানালাম শেষ পর্যন্ত একটু শান্তির মুখ দেখবো বলে। আবার কী সব পড়ার কথা বলিস? পাশ তো শেষ। তুইও তোর বাবার মতো বসে খাওয়ার কথা ভাবিস না, হাত পা চালা।”

 

“আমি ইন্টার্নির ভাতা তো দেই তোমাকে, দেই না? ডিউটি শেষে লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়তে হয়। তোমার কী মনে হয় শুধু ডাক্তার হলেই ইনকাম করা যায়? আমি এখনো ইন্টার্নিও শেষ করি নাই, নিজে চেম্বার দিতে হলে অনেক প্রস্তুতি লাগবে। আমাদের পড়ার কোন শেষ নাই। আর আব্বু বসে খেলেও সংসার তো আব্বুর সম্পদে চলে তাই না? বাইপাস করা মানুষ পরিশ্রম তো করতে পারে না।” 

 

“বাবার জন্য এত দরদ, মায়ের কষ্ট চোখে দেখস না? এই আমি সব কলিজায় ধরে রক্ষা না করলে আজ লেখাপড়া করা লাগতো না। তোর বাপের যখন বয়স ছিল তখন কী করছে, বাইপাস করছে এই সেই দিন। একটা শখ পূরণ করতে পারলাম না, ভাবছি ছেলে মানুষ হলে সব হবে।”

 

“আচ্ছা আম্মু কান্না করো না তো। সব হবে ইনশাআল্লাহ। আচ্ছা এখন টাকার কী ব্যবস্থা করবা? তুমি ফুপিকে বলো আর কয়দিন পর টাকা দিবা, এর ভেতর বাসার একটা সিদ্ধান্ত হলে সেখান থেকেও টাকা দেওয়া যাবে।”

 

“হ্যাঁ এটা ভালো বলছিস। আমি বালা বিক্রি করবো না।”

 

“কইরো না। এখন ডিম দাও না, ভাত ঠান্ডা হয়ে গেল। আর আমাকে দুইশো টাকা দিও।”

 

“তোর আবার টাকা লাগবে কেন?”

 

“এক ভাইয়ার চেম্বারে যাব। চেম্বার পুরান ঢাকায়,আমার কাছে ভাড়ার টাকা নাই। দেখি ভাইয়া দেখা করতে বলছিল। বেতন দিলে ভাইয়ার চেম্বারে ঢুকে যাব।”

 

“তাহলে তো ভালোই হবে। বিকেলের সময়টা চেম্বারে বসলে তোর শেখা হবে, ইনকামও হবে। পড়া এর ফাঁকে ফাঁকে পড়বি। পাশ করার পর আর এত পড়া কী।”

 

এই প্রত্যাশার চাপই রিদমের ভালো লাগে না। মায়ের ধারণা ডাক্তার হয়ে বের হলেই ইনকাম। মায়ের এতদিনের সব কষ্টের অবসান রিদম রাতারাতি করে ফেলবে এই স্বপ্নই লাকি আক্তার এখন দিবানিশি দেখেন। অথচ জুনিয়র ডাক্তারদের অবস্থা যে কতটা করুণ, আর বিডিএস হলে তো কথাই নেই। পায়ের নিচে মাটি শক্ত হতেই দীর্ঘ সংগ্রাম করতে হয়, চাকরি নাই বললেই চলে, নিজে চেম্বার দিতে হলে টাকা দরকার, পোস্ট গ্রাজুয়েশন করা ভীষণ  চ্যালেঞ্জের। এই সবকিছু থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য অরণীর হাসি যেন একটা মুক্ত বাতাস। ভাত খেয়ে রিদম বের হয়ে যায়, এখন যাবে কাঁঠালবাগানের ফ্রি স্ট্রীট রোডে, অরণী কিভাবে রাগ করে থাকে সেও দেখবে।

 

(চলবে)

 

স্বপ্ন কেনার দামে 

পর্ব৮

 

রিদম যখন অরণীর বাসার সামনে এসে পৌঁছায়, ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত প্রায় এগারোটা। এত রাতে বের হতে রিদমেরও বেগ পেতে হয়েছে, কিন্তু মা, বাবাকে বুঝিয়েছে যে কলেজের বড়ো ভাইয়ের চেম্বার শেষ হয় রাত দশটায়, ভাই তাকে তাই দশটার দিকে যেতে বলেছেন, রোগী থাকলে ডিটেইলস কথা বলতে পারবেন না।

 চার ভাইবোনের মাঝে রিদম মেজো, বড় বোন মাসুমার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। ছোট ভাই রাতুল তিতুমীরে পড়ছে, পড়ালেখায় অত মনোযোগ নেই, ছাত্র রাজনীতি নিয়েই সে ব্যস্ত। সবার ছোটো তিথি সামনে এইচএসসি দেবে। বলা যায় পুরো পরিবারের সমস্ত প্রত্যাশার ভার রিদমের কাঁধে। শুনতে স্বার্থপর শোনালেও মা, বাবা থেকে শুরু করে ভাই বোন সবাই অপেক্ষায় আছে কবে রিদম অনেক অনেক আয় করা শুরু করবে, আর তাদের হারানো দিন আবার ফিরে আসবে। তাই চেম্বারের কথা শুনে বাসার কেউ আর কোন প্রশ্ন তোলে না।

 

অরণীর বাবা জামিল সাহেব ঘড়ির কাঁটার সাথে চলার মানুষ, রাত এগারোটার ভেতর শুয়ে পড়বেন, আর ঠিক সকাল ছয়টায় উঠবেন। আধাঘন্টা হাঁটাহাটি করে অফিসের জন্য রেডি হবেন। জামিল সাহেবের সাথে থাকতে থাকতে মা হুমায়রারও তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ার অভ্যাস হয়েছে। অরণীর দাদী সকালে ফজরের ওয়াক্তে উঠে নামাজ পড়েন, তাই তিনিও বিছানায় যেতে দেরি করেন না। এই বাসায় তাই অরণী আর অমিয় ছাড়া বাকিরা রাত এগারোটার ভেতর ঘুমানোর আয়োজন করে ফেলে। এখন রাত বারোটা মানে এই বাসায় গভীর রাত, কাল পরীক্ষা না থাকলে অরণীও শুয়ে পড়তো। এই মুহূর্তে অমিয় ওর রুমের দরজা বন্ধ করে গান শুনছে, এই ছেলে নিশাচর, এবং নির্লিপ্ত। এই যে বাসায় এত এত ঝড় বয়ে গেল, একবারও নিজের রুম থেকে বের হয়ে দেখেনি ঘটনা কী। তবে পরিস্থিতি ঠান্ডা হওয়ার পর মায়ের কাছে গিয়ে গুটগুট করে কী যেন গল্প করলো। অরণী খেয়াল করেছে পারিবারিক ঝগড়া, অশান্তি যাই হোক, মা অমিয়র উপর কখনো রাগ ঝাড়ে না, অমিয় গিয়ে দুটো ভালো কথা বললে কেমন নরম হয়ে যায়। একই কাজটা অরণী করতে গেলে মা তেমন পাত্তা দেয় না। আচ্ছা মাও কী এক পুরুষের প্রতাপ থেকে মুক্তি পেতে ভবিষ্যতের আরেক পুরুষের আশ্রয় খোঁজে। না মা ভাবে অরণী অন্যের ঘরেই যাবে, তার সাথে ভালোবাসা ভাগ করা যায়, দুঃখ নয়! কী জানি, এসব বেশি ভাবলে অরণীর এলোমেলো লাগে। তাছাড়া আজকের ব্যাপারটা আলাদা, আজ অরণীর একটা অপরাধবোধও আছে, আজকের এই অশান্তি টা তো সে নিজেই ডেকে আনলো। 

অরণীর বদলে অমিয় একদম আলাদা, যেমন নির্লিপ্ত তেমন ঠান্ডা, কোন আপদ যেমন ডাকে না, তেমনি পারিবারিক কোন ঝামেলায় জড়ায়ও না, নিজের একটা জগত বানিয়ে থাকে।

 

অরণী ‘প্রস্থোডোন্টিকস’ বই খুলে বসে আছে, কাল সত্যি সত্যি আইটেম আছে, আর অরণী পড়ায় মন না বসালে সত্যিই পেন্ডিং খাবে। ফোনটা অবশেষে অন করে, রিক্তাকে ফোন দিয়ে জানতে হবে কী কী পড়েছে। আপাততঃ রিদমের সাথে যোগাযোগ করার কোন ইচ্ছে নেই। থাকুক, একটু শাস্তি পাওয়া দরকার আছে রিদমের, ও বুঝুক অরণী এমনই, এবার প্রেম পোষালে করবে, না করলে নাই। ফোন অন করতেই একের পর এক নোটিফিকেশন আর ম্যাসেজ আসতে থাকে। অরণী ঠিক করে এখন কোন ম্যাসেজ চেক করবে না, বরং রিক্তার সাথে কথা বলেই ফোন অফ করে দেবে।

 

“হ্যালো, রিক্তা?”

 

“অরু তোর ফোন বন্ধ ছিল কেন? রাত কয়টা বাজে খেয়াল আছে?”

 

“স্যরি রে, এত রাতে কল করলাম, কিন্তু আমি জানতাম তুই ঠিক রাত জেগে পড়ছিস, তাই কল দিলাম। আমার কিছু পড়া হচ্ছে না রে। কী যে পরীক্ষা দেব।”

 

“তুই পড়ার চিন্তা করছিস, আর এদিকে রিদম ভাই তোর বাসার নিচে রাস্তায় বসে আছে। রাত বারোটার বেশি বাজে। তোর ফোন বন্ধ দেখে ভাইয়াকে বললাম চলে যেতে, ভাইয়া নাকি তোর সাথে কথা না বলে যাবে না।”

 

“কী বলিস এসব। রিদম কই? আমার বাসার নিচে? এতরাতে এখানে কী করে?  সিকিউরিটি গার্ড একটু পরপর টহল দেয়, বিনা কারণে রাস্তায় ঘোরাঘুরি করলে ধরে পুলিশে দেবে।”

 

“এসব আমাকে বলিস কেন? যাকে বলার দরকার তাকে বল। সেই নাকি সন্ধ্যা থেকে খাওয়া দাওয়া বাদ দিয়ে তোর বাসার নিচে বসে আছে, তোকে এক নজর দেখবে বলে।বাপরে তুই এত পাষাণ কেন?”

 

রিক্তার কথায় অরণীর কান্না পেয়ে যায়। সত্যি রিদম সন্ধ্যা থেকে না খেয়ে রাস্তায় বসে আছে! অরণী কয়েকবার তো বারান্দায় গেল, কই রাস্তায় তাকিয়ে রিদমকে দেখেনি তো। পরমুহূর্তে মনে হয় ও তো জানতো না রিদম এখানে, তাই হয়তো ওভাবে খেয়াল করা হয়নি। ফোন হাতে নিয়ে তাড়াতাড়ি ম্যাসেজ চেক  করে অরণী। অবশ্য রিক্তা ইচ্ছে করেই বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলেছে যেন অরণী তাড়াতাড়ি ম্যানেজ হয়ে যায়। 

 

“অরু, তুমি একবার বারান্দায় আসো। একবার বলো ক্ষমা করছো। যতক্ষণ না বলবে আমি যাব না।”

 

“অরু, তুমি না আমার ইকোস্প্রিন, আমার বুকের ব্যথার ঔষধ। আমার বুকে রক্ত চলাচল করে তোমার নামে। আমার শিরা উপশিরায়  অরণী মিশে আছে ড্রাগসের মতো। অরু আসবে না বারান্দায়?”

 

অরণী টেবিলের উপর ল্যাম্প জ্বালিয়ে পড়ছিল। রিদমের ম্যাসেজগুলো পড়ে তার রাগ গলে জল। আড় চোখে দাদীর নড়াচড়া খেয়াল করে অরণী। মনে হচ্ছে দাদী গভীর ঘুমেই আছে। আস্তে করে উঠে বারান্দায় চলে আসে। ফোন হাতে নিয়ে কল করে রিদমকে

“হ্যালো?”

 

“অবশেষে আমার উপর দয়া হলে। সত্যি আর একটু দেরি হলে মারাই যেতাম।”

 

“কখন থেকে আছ এখানে।”

 

রিদম চিন্তা করে মাত্র একঘন্টা বললে অতটা গভীর শোনাবে না। চার পাঁচ ঘন্টা বলবে নাকি! কিন্তু রিদম জবাব দেওয়ার আগেই অরণী বলে, “এটা কোন কথা রিদম। তুমি কী বাচ্চা? খাওয়া দাওয়া বাদ দিয়ে সন্ধ্যা থেকে এখানে পড়ে আছ। বাসায় যাও প্লিজ, আঙ্কেল আন্টি চিন্তা করবে।”

 

“ইসস এত ভাবলে ফোন অফ রাখতে? আমি যাব, আগে বলো সব ভুলে গিয়েছ?” বলে মনে মনে রিক্তাকে একটা ধন্যবাদ দেয় রিদম। বোঝা যাচ্ছে রিক্তা অরণীকে ভালোই ম্যানেজ করেছে। আরে বন্ধু হলে এমনই হওয়া দরকার। অরণী গলে যাচ্ছে, আর মিনিট পাঁচেক। ফয়সাল গলির মুখে বাইক নিয়ে অপেক্ষা করছে। এমনিও ঠিক করেছিল সাড়ে বারোটার ভেতর যোগাযোগ করতে না পারলে চলে যাবে। এর বেশি দেরি করা মুশকিল। ভালোই হলো, কাজ তাড়াতাড়ি হয়ে গিয়েছে।

 

“আচ্ছা সব মাফ করেছি। তবে আর কখনো আমাকে এমন ডেটে যাওয়ার জন্য জোর করবে না। প্রমিস?”

 

“প্রমিস।”

 

“এখন বাসায় যাও। কিভাবে যাবে এত রাতে?”

 

“সমস্যা নেই ম্যানেজ করে নেব। প্রেমের মরা জলে ডোবে না, এইটা জানো না?”

 

“আচ্ছা তাড়াতাড়ি যাও। পৌঁছে কল দিও। চিন্তায় থাকবো।”

 

“লাভ ইউ বলো।”

 

“লাভ ইউ। এবার যাও।”

 

বারান্দা থেকে হাত নেড়ে রিদমকে বিদায় দেয় অরণী। 

গলির মুখে এসে ফয়সালকে পায় রিদম। রিক্তা মেয়েটা অনেকদিন ধরে ফয়সালের পেছন ঘুরছিল। আজকের এই সাহায্যের বিনিময়ে ফয়সালের সাথে একটা লাইন করিয়ে দিতে হবে। মেয়েটাকে হাতে রাখলে লাভ। বিজয়ীর হাসি হেসে ফয়সালের বাইকে বসে রিদম। বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে শুতে না শুতে ঘুম নামে চোখে, অরণীকে জানানোর কথা মনে থাকে না। আর এদিকে ফোন হাতে নিয়ে দুশ্চিন্তায় নির্ঘুম রাত কাটে অরণীর। দুইবার কল দিয়েছিল, ফোন সাইলেন্ট থাকায় রিদম শুনতে পায়নি। ছটফট করতে করতে সকালের অপেক্ষা করে অরণী।

 

(চলবে)

 

স্বপ্ন কেনার দামে 

পর্ব৯

 

আজ সকালে অরণী যখন কলেজের জন্য বের হয়, আকাশে তখন ঝকঝকে রোদ। চিন্তাও করতে পারেনি বারোটা বাজতে না বাজতে এমন ঘন কালো মেঘে আকাশ ঢেকে যাবে। চারদিকে শীতল বাতাস বইছে, যখন তখন বৃষ্টি নামবে। কালবৈশাখীর বৈশিষ্ট্যই বোধহয় এমন, হঠাৎ করে আসে, আর সব লন্ড ভন্ড হয়ে যায়। আজ প্লেসমেন্টে কারও মন নেই, মাতাল করা আবহাওয়ায় স্যার ম্যামরাও যেন গা ছেড়ে দিয়েছেন। আউটডোরে রোগী নেই, রিদম অরণীকে নিয়ে ক্যাম্পাসের লনে দাঁড়িয়ে আছে। আরও অনেকেই ভীড় করেছে বাইরে, উদ্দেশ্য বৃষ্টি হলে বৃষ্টিতে ভিজবে। কেমন একটা উত্সব উত্সব আমেজ।

 

“রিদম, তুমি ফোন দিলে না কেন রাতে? কী পরিমাণ চিন্তা করেছি জানো? সকালে এসে দেখি তুমি নাই। আমার চিন্তা আরও বেড়ে গেলো।”

 

“বিশ্বাস করো ফোন আব্বু নিয়ে গিয়েছিল। আরে এত দেরিতে বাসায় গিয়েছি এমনিই দুনিয়ার বকা খেলাম। সকালেও আরেক দফা বকে তারপর ফোন দিয়েছে   আব্বু।”

 

আসলে রাতে দেরিতে ঘুমানোয় সকালে উঠতে দেরি হয়ে গিয়েছে। চার্জ না দেওয়ায় ফোনও বন্ধ হয়ে যায়। মোবাইল চার্জ দিয়ে তাড়াহুড়ো করে ডিউটতে আসতে আসতে লেট। এর মাঝে অরণীকে আর জানানোর সময় সুযোগ হয়নি। মেডিকেল অফিসারের কাছে এক দফা বকা খেয়েছে লেট করার জন্য। এখন অরণীর সাথে আর কথা পেঁচাতে ইচ্ছে করছে না। অবলীলায় তাই একটু সত্য মিথ্যা বলে ওকে ম্যানেজ করে নিয়েছে, অরণী এত ইমোশনাল, ওকে ম্যানেজ করা সহজ। রিদমের কথা সহজেই মেনে নেয় অরণী। নিজের বাবার সাথে মিলিয়ে কথাগুলো অবিশ্বাস করার কারণ খুঁজে পায় না।

 

“রিদম, বৃষ্টি নেমেছে। চলো ভিজি।”

 

“আরেহ না। কত মানুষ দেখেছ। দরকার নাই ভেজার।”

 

“ইসস আমাকে না প্রথম এমন বৃষ্টিভেজা দিনেই দেখেছিলে। কত আবেগ নিয়ে সেই দিনের কথা বলো।”

 

“তাই তো তোমাকে ভিজতে নিষেধ করছি। কত কত চোখ এখানে সবাই তোমাকে ঐ একই রকম মুগ্ধতা নিয়ে দেখুক, তা আমি চাই না। সেটা শুধু আমার জন্য।”

 

“হুম, এটাকে পজেসিভ আচরণ বলে জানো তো?”

 

“হলাম একটু পজেসিভ। তুমি কনজার্ভেটিভ নও? এই যে প্রেমের মাঝে এত এত বিধিনিষেধের দেয়াল তুলে রেখেছ। আমি না হয় একটু পজেসিভ হলাম। আমি তোমারটা মানতে পারলে তুমিও মানো।”

 

“আচ্ছা যাও ভিজবো না। ওকে।”

 

বলতে বলতেই বৃষ্টি শুরু। ছেলেমেয়েরা সব হইচই করতে করতে ক্যাম্পাসের মাঠে নেমে গেলো। রিদম ক্যান্টিন থেকে গরম চা নিয়ে এসেছে, সিঁড়িতে বসে বসে বৃষ্টি দেখতে দেখতে আর গরম চায়ে চুমুক দিয়ে অরণীর মনে হয়, জীবনটা খারাপ না, বরং অনেক সুন্দর। আচ্ছা তার বাবা মা এমন হয় না কেন! তেমন কিছু তো লাগে না, একটু ঝগড়ার পর মান ভাঙানো, দুটো মিষ্টি কথা, একসাথে বসে বৃষ্টির পানি মেশানো চা খাওয়া, আর ভালোবাসার অনুভূতি। সুখী হতে আর কী লাগে। সে আর রিদম একদম অন্য রকম যুগল হবে। মান অভিমানের পালা রাত বা পোহাতে শেষ করে ফেলবে, আসলে ঝগড়াই করবে না। মনের ভেতর শত-শত কথার কাটিকুটি খেলে রিদমের হাতটা জড়িয়ে ধরে অরণী। রিদম অবাক হলেও খুশি হয়, অরণী নিজ থেকে কাছে আসে না, আজ এই হাতটুকু ধরাই তাই বিশাল কিছু।

 

সময় কেটে যায় আরও কয়েক সপ্তাহ। রিদমের ইন্টার্নি শেষের দিকে, অরণীর পড়ার চাপও বেড়েছে বহুগুণ। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ব্যস্ততা আর প্রেম। যতকিছুই হোক রিদম অরণীকে রোজ বাসার কাছে এগিয়ে দিয়ে তারপর লাইব্রেরিতে যায়। বাসায় বলেছে চেম্বার করে। দশ পনেরো হাজার টাকার জন্য চেম্বারে না গিয়ে রোজ লাইব্রেরিতে বসে পড়বে ঠিক করেছে রিদম।চ্যালেঞ্জটাই নিতেই হতো, বের হওয়ার সাথে সাথে পোস্ট গ্রাজুয়েশনে চান্স পেলে এগিয়ে যাওয়া যাবে। এফসিপিএস পরীক্ষার দেরি নেই, তাই এখন অন্য কিছু ভাবার সনয় নেই রিদমের। ভাগ্য ভালো অরণী বিষয়গুলো বোঝে, তাই এখন রিদমকে খরচের কোন চাপ দেয় না, রিদমের ভবিষ্যত ভালো হওয়া মানে তো তাদের ভবিষ্যত ভালো হওয়া। 

 

অরণী আজ বাসায় পৌঁছে দেখে তার দুই ফুপু সাথে কিছু লোকজন নিয়ে বসার ঘরে গল্প করছেন।

 

“অরণী, আয় আয়, সালম দে। কে চিনতে পারছিস না? আরে আমার মেঝো ননদের জা, তোর সালমা আন্টি।”

 

শিলু ফুপু এমন ভাবে “তোর সালমা আন্টি” বললেন, যেন অরণী কত চেনে। ফুপুর ননদের জাকে অরণী জীবনে এই প্রথম দেখলো।

 

“আসসালামু আলাইকুম আন্টি।”

 

“ওয়ালাইকুম সালাম মা। ভার্সিটি থেকে আসলে?”

 

“না, কলেজ থেকে।”

 

“ঐ সেটাই। তুমি তো দাঁতের ডাক্তারি পড়ছো তাই না? ভালোই হলো আমাদের।”

 

অরণী কী বলবে বুঝতে না পেরে হ্যাঁ হ্যাঁ করে। আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়ে কোন রকমে ফুপুর হাত থেকে ছাড়া পায়। 

 

“আম্মু, ফুপু হঠাৎ  কাদের নিয়ে আসলেন?”

 

“মেহমান, শুনলি তো। কিন্তু তোর আজ পাঁচটা কেন বাজলো?”

 

“বৃষ্টির জন্য রাস্তায় অনেক জ্যাম ছিল। আমি ড্রেস পাল্টে আসি, তোমাকে হেল্প করবো।”

 

“লাগবে না, জরিনা আছে। তুই ভালো একটা জামা পরিস, যা।”

 

রাত হতে হতে অমিয়র কাছে মেহমান আসার কারণ জানতে পারে অরণী। প্রাথমিক ভাবে পাত্রী দেখতে এসেছে। অরণীকে ওদের ভালোও লেগেছে। ছেলে ভালো চাকরি করে, পরিবার, আর্থিক অবস্থা সবই ভালো। এখন সব ঠিক থাকলে ছেলেকে সাথে নিয়ে কোন একটা রেস্টুরেন্টে বসতে চান ওনারা, মুরুব্বিরা কথা বলবে, আর ছেলে মেয়ে একে ওপরকে দেখবে।

 

“আম্মু, হঠাৎ আমার বিয়ের কথা আসলো কেন? সামনে পরীক্ষা।”

 

“হঠাৎ এর কী আছে। ফাইনাল ইয়ারে আছিস, কয়দিন পর পাশ করে ফেলবি। এই সময় পাত্র দেখার জন্য ভালো। আর বললেই কী বিয়ে হচ্ছে নাকি। ওনারা হঠাৎ আসলো, মেহমানের সামনে না করা যায় নাকি। তুই পড়ালেখা কর, বাকিটা বড়রা দেখবে।”

 

মা পড়ালেখা করতে বললেও, অরণীর সব মাথায় ওঠে। রিদম যে ক্ষ্যাপাটে, এসব শুনলে একটা পাগলামিই করবে। বলবে কী বলবে না সিদ্ধান্ত নিতে পারে না অরণী।

 

(চলবে)

 

স্বপ্ন কেনার দামে 

পর্ব৯

 

আজ সকালে অরণী যখন কলেজের জন্য বের হয়, আকাশে তখন ঝকঝকে রোদ। চিন্তাও করতে পারেনি বারোটা বাজতে না বাজতে এমন ঘন কালো মেঘে আকাশ ঢেকে যাবে। চারদিকে শীতল বাতাস বইছে, যখন তখন বৃষ্টি নামবে। কালবৈশাখীর বৈশিষ্ট্যই বোধহয় এমন, হঠাৎ করে আসে, আর সব লন্ড ভন্ড হয়ে যায়। আজ প্লেসমেন্টে কারও মন নেই, মাতাল করা আবহাওয়ায় স্যার ম্যামরাও যেন গা ছেড়ে দিয়েছেন। আউটডোরে রোগী নেই, রিদম অরণীকে নিয়ে ক্যাম্পাসের লনে দাঁড়িয়ে আছে। আরও অনেকেই ভীড় করেছে বাইরে, উদ্দেশ্য বৃষ্টি হলে বৃষ্টিতে ভিজবে। কেমন একটা উত্সব উত্সব আমেজ।

 

“রিদম, তুমি ফোন দিলে না কেন রাতে? কী পরিমাণ চিন্তা করেছি জানো? সকালে এসে দেখি তুমি নাই। আমার চিন্তা আরও বেড়ে গেলো।”

 

“বিশ্বাস করো ফোন আব্বু নিয়ে গিয়েছিল। আরে এত দেরিতে বাসায় গিয়েছি এমনিই দুনিয়ার বকা খেলাম। সকালেও আরেক দফা বকে তারপর ফোন দিয়েছে   আব্বু।”

 

আসলে রাতে দেরিতে ঘুমানোয় সকালে উঠতে দেরি হয়ে গিয়েছে। চার্জ না দেওয়ায় ফোনও বন্ধ হয়ে যায়। মোবাইল চার্জ দিয়ে তাড়াহুড়ো করে ডিউটতে আসতে আসতে লেট। এর মাঝে অরণীকে আর জানানোর সময় সুযোগ হয়নি। মেডিকেল অফিসারের কাছে এক দফা বকা খেয়েছে লেট করার জন্য। এখন অরণীর সাথে আর কথা পেঁচাতে ইচ্ছে করছে না। অবলীলায় তাই একটু সত্য মিথ্যা বলে ওকে ম্যানেজ করে নিয়েছে, অরণী এত ইমোশনাল, ওকে ম্যানেজ করা সহজ। রিদমের কথা সহজেই মেনে নেয় অরণী। নিজের বাবার সাথে মিলিয়ে কথাগুলো অবিশ্বাস করার কারণ খুঁজে পায় না।

 

“রিদম, বৃষ্টি নেমেছে। চলো ভিজি।”

 

“আরেহ না। কত মানুষ দেখেছ। দরকার নাই ভেজার।”

 

“ইসস আমাকে না প্রথম এমন বৃষ্টিভেজা দিনেই দেখেছিলে। কত আবেগ নিয়ে সেই দিনের কথা বলো।”

 

“তাই তো তোমাকে ভিজতে নিষেধ করছি। কত কত চোখ এখানে সবাই তোমাকে ঐ একই রকম মুগ্ধতা নিয়ে দেখুক, তা আমি চাই না। সেটা শুধু আমার জন্য।”

 

“হুম, এটাকে পজেসিভ আচরণ বলে জানো তো?”

 

“হলাম একটু পজেসিভ। তুমি কনজার্ভেটিভ নও? এই যে প্রেমের মাঝে এত এত বিধিনিষেধের দেয়াল তুলে রেখেছ। আমি না হয় একটু পজেসিভ হলাম। আমি তোমারটা মানতে পারলে তুমিও মানো।”

 

“আচ্ছা যাও ভিজবো না। ওকে।”

 

বলতে বলতেই বৃষ্টি শুরু। ছেলেমেয়েরা সব হইচই করতে করতে ক্যাম্পাসের মাঠে নেমে গেলো। রিদম ক্যান্টিন থেকে গরম চা নিয়ে এসেছে, সিঁড়িতে বসে বসে বৃষ্টি দেখতে দেখতে আর গরম চায়ে চুমুক দিয়ে অরণীর মনে হয়, জীবনটা খারাপ না, বরং অনেক সুন্দর। আচ্ছা তার বাবা মা এমন হয় না কেন! তেমন কিছু তো লাগে না, একটু ঝগড়ার পর মান ভাঙানো, দুটো মিষ্টি কথা, একসাথে বসে বৃষ্টির পানি মেশানো চা খাওয়া, আর ভালোবাসার অনুভূতি। সুখী হতে আর কী লাগে। সে আর রিদম একদম অন্য রকম যুগল হবে। মান অভিমানের পালা রাত বা পোহাতে শেষ করে ফেলবে, আসলে ঝগড়াই করবে না। মনের ভেতর শত-শত কথার কাটিকুটি খেলে রিদমের হাতটা জড়িয়ে ধরে অরণী। রিদম অবাক হলেও খুশি হয়, অরণী নিজ থেকে কাছে আসে না, আজ এই হাতটুকু ধরাই তাই বিশাল কিছু।

 

সময় কেটে যায় আরও কয়েক সপ্তাহ। রিদমের ইন্টার্নি শেষের দিকে, অরণীর পড়ার চাপও বেড়েছে বহুগুণ। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ব্যস্ততা আর প্রেম। যতকিছুই হোক রিদম অরণীকে রোজ বাসার কাছে এগিয়ে দিয়ে তারপর লাইব্রেরিতে যায়। বাসায় বলেছে চেম্বার করে। দশ পনেরো হাজার টাকার জন্য চেম্বারে না গিয়ে রোজ লাইব্রেরিতে বসে পড়বে ঠিক করেছে রিদম।চ্যালেঞ্জটাই নিতেই হতো, বের হওয়ার সাথে সাথে পোস্ট গ্রাজুয়েশনে চান্স পেলে এগিয়ে যাওয়া যাবে। এফসিপিএস পরীক্ষার দেরি নেই, তাই এখন অন্য কিছু ভাবার সনয় নেই রিদমের। ভাগ্য ভালো অরণী বিষয়গুলো বোঝে, তাই এখন রিদমকে খরচের কোন চাপ দেয় না, রিদমের ভবিষ্যত ভালো হওয়া মানে তো তাদের ভবিষ্যত ভালো হওয়া। 

 

অরণী আজ বাসায় পৌঁছে দেখে তার দুই ফুপু সাথে কিছু লোকজন নিয়ে বসার ঘরে গল্প করছেন।

 

“অরণী, আয় আয়, সালম দে। কে চিনতে পারছিস না? আরে আমার মেঝো ননদের জা, তোর সালমা আন্টি।”

 

শিলু ফুপু এমন ভাবে “তোর সালমা আন্টি” বললেন, যেন অরণী কত চেনে। ফুপুর ননদের জাকে অরণী জীবনে এই প্রথম দেখলো।

 

“আসসালামু আলাইকুম আন্টি।”

 

“ওয়ালাইকুম সালাম মা। ভার্সিটি থেকে আসলে?”

 

“না, কলেজ থেকে।”

 

“ঐ সেটাই। তুমি তো দাঁতের ডাক্তারি পড়ছো তাই না? ভালোই হলো আমাদের।”

 

অরণী কী বলবে বুঝতে না পেরে হ্যাঁ হ্যাঁ করে। আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়ে কোন রকমে ফুপুর হাত থেকে ছাড়া পায়। 

 

“আম্মু, ফুপু হঠাৎ  কাদের নিয়ে আসলেন?”

 

“মেহমান, শুনলি তো। কিন্তু তোর আজ পাঁচটা কেন বাজলো?”

 

“বৃষ্টির জন্য রাস্তায় অনেক জ্যাম ছিল। আমি ড্রেস পাল্টে আসি, তোমাকে হেল্প করবো।”

 

“লাগবে না, জরিনা আছে। তুই ভালো একটা জামা পরিস, যা।”

 

রাত হতে হতে অমিয়র কাছে মেহমান আসার কারণ জানতে পারে অরণী। প্রাথমিক ভাবে পাত্রী দেখতে এসেছে। অরণীকে ওদের ভালোও লেগেছে। ছেলে ভালো চাকরি করে, পরিবার, আর্থিক অবস্থা সবই ভালো। এখন সব ঠিক থাকলে ছেলেকে সাথে নিয়ে কোন একটা রেস্টুরেন্টে বসতে চান ওনারা, মুরুব্বিরা কথা বলবে, আর ছেলে মেয়ে একে ওপরকে দেখবে।

 

“আম্মু, হঠাৎ আমার বিয়ের কথা আসলো কেন? সামনে পরীক্ষা।”

 

“হঠাৎ এর কী আছে। ফাইনাল ইয়ারে আছিস, কয়দিন পর পাশ করে ফেলবি। এই সময় পাত্র দেখার জন্য ভালো। আর বললেই কী বিয়ে হচ্ছে নাকি। ওনারা হঠাৎ আসলো, মেহমানের সামনে না করা যায় নাকি। তুই পড়ালেখা কর, বাকিটা বড়রা দেখবে।”

 

মা পড়ালেখা করতে বললেও, অরণীর সব মাথায় ওঠে। রিদম যে ক্ষ্যাপাটে, এসব শুনলে একটা পাগলামিই করবে। বলবে কী বলবে না সিদ্ধান্ত নিতে পারে না অরণী।

 

(চলবে)

 

স্বপ্ন কেনার দামে 

পর্ব১০

 

“ঢং এর কান্না রাখো অরণী। রিদমের জন্য তোমার কান্না করা মানায় না।”

 

“এইসব কী বলেন ভাইয়া, আপনি জানেন না আমি রিদমকে কত ভালোবাসি?”

 

“ভালোবাসলে অন্য ছেলেকে বিয়ে করতে যেতে? তোমার জন্য রিদম আজ সুইসাইড করার চেষ্টা করেছে। আমি ওকে অনেক বুঝিয়েছিলাম, আমি জানতাম তোমার মতো আব্বুর লক্ষী মেয়েরা প্রেমিকা হওয়ার যোগ্য না। তোমরা প্রথমে কমবয়সী ছেলেদের নাচিয়ে মজা পাও এরপর ভালো মেয়ে সেজে আব্বুর পছন্দ করা ছেলে বিয়ে করে নাও।”

 

“ভাইয়া এইভাবে অপবাদ দিয়েন না। বিশ্বাস করেন একদম হঠাৎ করে সব হইছে। আমি রিদমকে জানাতাম, কিন্তু ভাবছি ওর সামনে পরীক্ষা, এইসময় ছেলেপক্ষ দেখতে এসেছে জানিয়ে ওকে টেনশন না দেই। আর গতকাল রেস্টুরেন্টে শুধু দুই পরিবারের কথাবার্তা হয়েছে, আমি এখন বিয়ে করবো না সেটা বলছি আম্মুকে।”

 

“আর তোমার আম্মু তাতে রাজি হয়েছে? আব্বু রাজি হয়েছে? রিদমের কথা বলছো বাসায়, ওনারা মেনে নিয়েছে?”

 

“ফয়সাল ভাইয়া, রিদম তো এখনো ইনকাম করছে না, ওর কথা বাসায় কিভাবে জানাবো? ও কিছুকরা শুরু করলেই বলে দেব।”

 

“তারমানে টাকাটাই সব। টাকা ইনকাম না করলে টাটা বাই বাই।”

 

“ভাইয়া, আমি আগে রিদমের সাথে দেখা করবো, তারপর আমাকে যা বলার বলেন।” ফয়সালেকে পাশ কাটিয়ে রুমে ঢুকে যায় অরণী।

 

গতকাল রেস্টুরেন্টে দুই পরিবারের দেখা করার পর্ব সমাপ্ত হয়েছিল। দুই পরিবারই বিয়ের ব্যাপারে পজেটিভ। হবু বর কর্পোরেট জব করে, ভালো স্যালারি, জব সিকিউরিটি আছে, জবের গ্রোথও ভালো। বড়ো বোন আছে যার বিয়ে হয়ে গিয়েছে। বাবা মা আর ছেলে নিয়ে ছিমছাম পরিবার।

অরণী ডাক্তার হচ্ছে, সামনে নিজের ডেন্টাল চেম্বার দিতে চাইলে তাদের কোন আপত্তি নেই, বরং তারা এই বিষয়ে বেশ আগ্রহ দেখালেন। সবমিলিয়ে ভালো সমন্ধ। অরণী মাকে আবার বলেছে এখন বিয়ে করবে না, এখন বিয়ে করলে ফাইলান প্রফে মন দিতে পারবে না, ফেল করবে। তিনমাস পর অরণীর ফাইনাল প্রফ, ঠিক করা হয় তাহলে প্রফের পর বিয়ের ডেট ফেলা হবে। আপাততঃ বিয়েটা আটকানো গেলেও অরণী কারও সাথে ঘটানাটা শেয়ার করার জন্য আকুপাকু করছিল, শেষ পর্যন্ত রিক্তার সাথে শেয়ার করে। যদিও রিদমকে জানাতে নিষেধ করেছে। কিন্তু নতুন নতুন প্রেমে মত্ত রিক্তা, ফয়সালের কাছে কথা লুকাতে পারে না। আর জানতে পারা মাত্র ফয়সাল রিদমকে জানিয়ে দেয়।

 

এই মুহূর্তে অরণী আছে ফয়সালের মেসে। সকালে অরণী কলেজে এসে রিদমের খোঁজ করে, গতকাল রাত থেকে রিদমের ফোন বন্ধ। সকালে এসে আউটডোরেও রিদমকে না দেখে টেনশনে পড়ে যায়। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়, রিদমের দেখা নেই। এরমাঝে খবর আসে রিদম সকালে ফয়সালের মেসে গিয়ে অনেকগুলো ঘুমের ঔষধ খেয়েছে, ওর বন্ধুরা দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। এখন পেট ওয়াশ করা শেষে আবার মেসে নিয়ে এসেছে। 

 

খবর পাওয়া মাত্র অরণী ছুটে এসেছে, এমন কিছুরই ভয় পাচ্ছিল অরণী, তাই তো রিদমকে জানাতে চায়নি।

ফয়সালের বেডে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে রিদম, ঘুমের ঔষধ ও খেয়েছে, তবে দুটো। বুদ্ধিটা অবশ্য ফয়সালের, একদিকে অরণীকে শিক্ষা দেওয়া হবে, আরেক দিকে ওকে ইমোশনাল ট্রাপে ফেলা যাবে। আর তাই হলো, তীর একদম জায়গামতো। দুটা ঘুমের ঔষধে রিদমের প্রচন্ড ঘুম আর ক্লান্তির চেহারা হয়েছে, তবে কোন ক্ষতি হয়নি, পেট ওয়াশের তো প্রশ্নই আসে না। ওদের এক বন্ধু সরকারি মেডিকেলে ইন্টার্নি করছে, রিদমকে তারা সেখানেই নিয়ে গিয়েছে, বন্ধুর হেল্প নিয়ে একটা স্লিপও জোগাড় করা হয়েছে। বাকিটা রিক্তা করেছে, অরণী সহ বাকিদের কানে কথা পৌঁছে দিয়েছে। ফয়সাল রিদমকে বুঝিয়েছে অরণীকে ধরে রাখতে হলে এই খেলার বিকল্প নেই।

 

রিদমের মুখটা দেখে অরণীর বুকটা ধক করে ওঠে। “রিদম, আমার রিদম সোনা। প্লিজ আমাকে মাফ করে দাও। বিশ্বাস করো আমি তোমাকে ধোঁকা দেইনি। রিদম, জান প্লিজ কিছু বলো, আমাকে বকা দাও, গালি দাও, অপমন করো, যা মন চায় করো। কিন্তু কথা বলো প্লিজ।”

 

“অরণী, কেন বাঁচাতে চাইছো আমাকে? তুমি না থাকলে আমার বেঁচে থাকা অর্থহীন। তুমি অন্য কারও হবে তা দেখার চেয়ে আমার মারা যাওয়া ভালো। হয় তুমি আমার হবে, আর না হয় এই জীবন আমি রাখবো না।”

 

“কী পাগলের মতো কথা বলো রিদম। আমিই কী সব। তুমি না পরিবারের বড়ো ছেলে, তোমার না মা, বাবা, বোন সবার দায়িত্ব নিতে হবে? সেই তুমি এভাবে জীবন শেষ করতে চাইছো আমার জন্য? আমি কে রিদম? আমার মতো একজন গেলে, আরেকজন মেয়ে তোমার জীবনে আসবে। কিন্তু তুমি গেলে কী তোমার মায়ের আরেকটা ছেলে আসবে?”

 

“তোমার মতো কেউ আসবে না অরু। আমার অরু, এই জীবন, জীবন শেষে মৃত্যুর ওপারে, সবসময় আমি শুধু অরু কে চাই। শুধু অরু কে। আমি চোখ খুললে আমার পাশে অরু থাকবে, আমি শ্বাস নিলে অরুর চুলের গন্ধ পাবো, আমি হাত বাড়ালে অরুর স্পর্শ আমাকে ছুঁয়ে যাবে। আর তা না হলে আমি রিদম শুধু জীবন্ত লাশ হয়ে থাকবো।। সবসময় জীবনের সব পর্যায়ে, আমি শুধু আমার অরুকে চাই, তারজন্য মরতে পারি, মারতেও পারি। অরু চলো বিয়ে করি, তাহলে আর কেউ তোমাকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না। প্লিজ অরু আমাকে ফিরিয়ে দিও না, প্লিজ অরু।”

 

দুপুর দুইটা বেজে পঞ্চাশ মিনিট, একহাজার এক টাকা কাবিনে অরণী আর রিদমের বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ে শেষে সাড়ে তিনটে বাজে রিদম বসিলার দিকে, আর অরণী ইস্কাটনের পথে রওনা দেয়, ঠিক আর অন্য দশটা দিনের মতোই যেন সবকিছু। কিন্তু অরণী টের পায় কী বিশাল পরিবর্তন চলে এসেছে ওর জীবনে। এখন আর ও মিস নয়, বরং মিসেস অরণী।

অরু রিকশায় শক্ত হয়ে বসে থাকে, হাতের মুঠোয় একহাজার টাকার নোট, আর একটা একটাকার কয়েন। রিদমকে সালাম করা মাত্র রিদম কপালে চুমু এঁকে দিয়ে কাবিনের টাকাটা অরণীর মুঠোয় দিয়ে দিয়েছে। অরণী না করতে পারেনি। কী এক অচেনা আবেশে যেন আচ্ছন্ন অরণী, সবকিছু চলছে, আর সে যেন থেমে আছে এই অনাদি অনন্তকালে।

 

স্বপ্ন কেনার দামে 

শেষপর্ব

 

এই মেয়ে এমন হাসিস কেন?

হাত বাড়িয়ে ডাকিস কেন?

জানিস কি তোর মুখের হাসি,

বড্ড আমি ভালোবাসি।

 

চুলেতে তোর মেঘ নেমেছে,

কাজল চোখে বৃষ্টি। 

শ্যামল মেয়ে তোর মুখখানি,

খোদার অপরূপ সৃষ্টি।

 

এই মেয়েটা শুধুই আমার,

কী আচানক ব্যাপার স্যাপার। 

অরু, অরু এই অরণী,

আমার বৌ, লক্ষী ঘরণী।

 

সকাল সকাল রিদমের এমন পাগলামি ভরা ম্যাসেজে অরুর মনটা নেচে ওঠে। “রিদমের বৌ” এই কথাটা মনে হতেই কেমন লজ্জা লজ্জা লাগে। গতকাল বিয়ে পড়ানোর সময় ফয়সাল, রিক্তা আর রিদমের দুজন কলেজ ফ্রেন্ড ছিল। যদিও সবাই কথা দিয়েছে, এখন কোন কিছু প্রকাশ করবে না, রিদমের ইন্টার্নশিপ প্রায় শেষ, আর অল্প কিছুদিন পর এফসিপিএস এর জন্য বসবে। অরণী ফাইনাল প্রফেশনাল এক্সাম দিবে। এইসব ঝামেলা শেষে নিজ নিজ বাসায় জানাবে। 

 

অরণীর ভয় রিক্তাকে নিয়ে, এই মেয়ে তার কলিজা বান্ধবী কিন্তু কোন কথা পেটে রাখতে পারে না। অবশ্য ফয়সাল রিক্তাকে ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছে কাউকে না বলতে এখন। আশা করা যায় বয়ফ্রেন্ডকে রিক্তা রাগাবে না। কাল সবকিছুই যেন একটা ঘোরের মতো ছিল। অরণী বাসায় এসে চোরের মতো পালিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছে, মনে হচ্ছিল ওর চোখ দেখলে সবাই সবকিছু জেনে যাবে। রাতেও ভাত নেড়েচেড়ে উঠে গিয়েছে, বাবার সামনে খাবার গলা দিয়ে নামেনি। মাকে মিথ্যা বলেছে যে পরীক্ষার টেনশনে খাওয়া দাওয়া করতে পারছে না।

 

“অরণী, এই অবস্থা কেন চেহারার? কেমন উষ্কখুষ্ক লাগছে। নাতনি, সামনে বিয়া হবে তোর, এখন কোথায় পরিপাটি হইয়া থাকবি।” 

 

অরণী দাদীর কথায় সতর্ক হয়ে যায়, “কার বিয়ে দাদী?”

 

“কার বিয়া আবার। তোর বিয়া, পরীক্ষা শেষ হোক, তারপরই তোরে বিদায় করবো। আচ্ছা এই নাত জামাই তোরে ফোন দেয় নাকি রে?”

 

হুমায়রা রান্নাঘর থেকে এগিয়ে আসেন, “কী বলেন আম্মা। এখন এগুলো বইলেন না। মেয়েটার সামনে পরীক্ষা, ওর আব্বু এখন বিয়েশাদির আলাপ করতে নিষেধ করছে। পরীক্ষা ঠান্ডা মাথায় দেক, তারপর এসব আলোচনা হবে।”

 

“হইছে তোমার আর পন্ডিতি করা লাগব না। আমার নাতনির সাথে তোমার অনুমতি নিয়া কথা বলবো। পরীক্ষার সময় পরীক্ষা দিব, এরপর বিয়া হইবো। এত ঢং এর কী আছে। আর তাইলে রাতে কার সাথে কুটকুট কথা বললি অরণী?”

 

“কার সাথে বলবো দাদী, বান্ধবীর সাথে বলছি।”

 

হুমায়রা ইশারায় অরণীকে উঠে যেতে বলে। অরণীর বাবা এমনি যতই রগচটা হোন, ছেলেমেয়ের লেখাপড়ায় ভেদাভেদ করেননি। অমিয়র মতো অরণীর লেখাপড়ার জন্য একই রকম মনোযোগ দিয়েছেন। আর তাই চান মেয়েটা ভালোয় ভালোয় ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে ডাক্তার হোক। বিয়ের সকল আয়োজন তারপরই হবে। আর তাই তিনি এই মুহূর্তে অরণী পাত্রের সাথে ফোনে কথা বলুক তাও তিনি চান না। তাছাড়া ওনার মতে কোন কিছু ফাইনাল হওয়ার আগে ছেলেমেয়েকে খুব একটা মেলামেশা করুক তা ভালোও নয়। সামনে বিয়ে তো হবেই, এই ধারণা মাথায় থাকলে উঠতি বয়সী ছেলেমেয়ে তাদের সীমা কতটুকু তা ভুলে যেতে পারে। আকদের আগে তাই তিনি এত ঘনিষ্ঠতা পছন্দ করেন না। অবশ্য বাবার এই রক্ষণশীল মনোভাব বরং অরণীর জন্য শাপেবর হয়েছে। পরিবারের ঠিক করা হবু পাত্রের সাথে ফোনে কথা বলাটা একটা বিব্রতকর অনুভূতি হতো, তাছাড়া রিদম জানলে একটা পাগলামি করতো।

 

আজ কলেজে পা দিয়ে কেমন শিরশিরে অনুভূতি হয় অরণীর। মনে হচ্ছে যেন সবাই ওকেই দেখছে। আচ্ছা রিক্তা সব বলে দেয়নি তো! দুরদুর বুকে ক্লাসে ঢুকে অরণী। সবকিছু স্বাভাবিক দেখে হাফ ছেড়ে বাঁচে। এখন ক্লাসগুলো ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ, পরীক্ষা আগে প্র্যাকটিকাল আর ক্লাসের চাপে দম ফালানোর সময় নেই। রিদমের ম্যাসেজের জবাবে “ভালিবাসি” লিখেই তাই ক্লাসে মন দিয়েছে।  প্র্যাকটিকালের সময় আউটডোরে যাবে, তখন দেখা হবে। তার আগে সময় নেই। অবশ্য ব্যাগের ভেতর ফোনের একটু পরপর ভাইব্রেশন বলে দিচ্ছে রিদমের তর সইছে না। 

“পাগল একটা” স্মিত হেসে ক্লাসে মন দেওয়ার চেষ্টা করে অরণী।

 

প্র্যাকটিকাল প্লেসমেন্ট আজ কনজার্ভেটিভ এন্ড এন্ডোডন্টিকস ডিপার্টমেন্টে। খাতা সাইন করতে হবে, কাজ প্রায় গুছানো শেষ, কিছু এক্সরে বসাবে প্রিন্ট করে, ছবি আঁকা ঠিক আছে কিনা দেখিয়ে নিতে হবে। ডেডলাইনের আগে সবকিছু শেষ না করলে খাতা সাইন করলে পরে ম্যামের পেছন পেছন ঘুরতে হবে, সাথে বকা তো ফ্রি। 

 

“এই বৌ, একটামাত্র পতি পরমেশ্বরকে এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে?”

 

অরণী চমকে ওঠে, “আস্তে বলো, কেউ শুনলে? আমি তো সার্জারিতে ঘুরে আসলাম তোমাকে পাইনি সেখানে।”

 

“লাইব্রেরিতে পড়ছিলাম। আমার তো সব ডিপার্টমেন্ট প্রায় শেষ, এখন শুধু এক্সটেনশনের গুলো করছি। পরীক্ষার দেরি নেই। এরমধ্যে বাসায় অশান্তি, পড়ার পরিবেশ নাই। হাউকাউ লেগেই আছে। আপা এসেছে দুই বাচ্চা নিয়ে। আপার চোখের কোণে রেডিই থাকে, একটু কিছু বললেই হলো, টপাটপ ঝরা শুরু। বাসায় আসবে খুশি খুশি, দু’দিন যেতে না যেতে মায়ের সাথে লেগে যায়। মাও দুটো কথা শুনিয়ে দেয়, এরপর কান্নাকাটি, উফ্ বিরক্তিকর।”

 

“বেচারি, কয়দিনের জন্য বেড়াতে আসে বাবার বাড়ি,  এমন করো কেন?”

 

“হুম, এখন খুব দরদ। যখন আমাদের বাসায় যাবে, তখন এই ননদ ননাসের নালিশই করতে আসবে। তবে শুনো ভাই আমার এসব ক্যাচাল ভালো লাগে না। আমি বাসায় রাতে ফিরি, খাই, টুপ করে ঘুমিয়ে যাই।”

 

“আচ্ছা এখন আমাকে এই খাতা ঠিক করতে দাও। আজ সাইন করাবো।”

 

“কাজ শেষে চলো ঘরোয়া খাবারঘরে যাই। তোমাকো গরম ভাত, পাবদা মাছের ঝোল দিয়ে লাঞ্চ করাবো। বেতন পেয়েছি।”

 

“থাক টাকাটা হাতে রাখো। ইন্টার্নি শেষে ভাতা কোথায় পাবে। পরীক্ষা দিবে খরচ আছে না। আমার মনে হয় তুমি কোচিং এ মডেল টেস্ট দেওয়া শুরু করো। কোচিং না করলেও পরীক্ষা দেওয়া দরকার, প্রাকটিস হবে।”

 

“অরু, তোমাকে বলা হয়নি। চেম্বারে জয়েন করছি। জানো তো আব্বু এখন কিছু করে না। শুধু দুটো বাসা ভাড়া দিয়ে ঢাকায় চলা কত কষ্ট এখন। তার উপর বসিলায় আমাদের এই পুরানো বাসার ভাড়াও বেশি না, দুইটা ইউনিট থেকে আর কতই বা আসে।”

 

“পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর জয়েন করতে। আর তো কয়টা দিন।”

 

“সমস্যা নেই ভাইকে বলেছি পরীক্ষার সময়টা ছাড় পাব। কিন্তু ইন্টার্নি ভাতা বন্ধ হয়ে গেলে আমার হাতে টাকাই থাকবে না। পোস্ট গ্রাজুয়েশনের ব্যাপারটা বাসায় সেভাবে কেউ বোঝে না।”

 

“আচ্ছা, বাদ দাও তুমি চাপ নিও না। একটু অপেক্ষা করো, আমি কাজ শেষে আসি।”

 

ঘরোয়া খাবারঘর এই ভর দুপুরে জমজমাট। অল্প টাকায় গরম গরম সুস্বাদু খাবার পাওয়া যায় বলে শিক্ষার্থীদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়। রিদম যখন ভাতে মাছ মাখিয়ে অরণীর মুখে তুলে দেয়, কেন জানি অরণীর চোখজোড়া পানিতে ভিজে ওঠে। কান্নাটুকু গিলে নিয়ে রিদমকে বলে, “সারা দুনিয়ার সবকিছুর বিনিময়ে আমি তোমাকে চেয়েছি রিদম। প্লিজ কখনো বদলে যেও না, প্লিজ।”

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।