ত্রিমুখী

ছোটগল্প

আজম চৌধুরীর দ্বিতীয় বিয়ে করা নিয়ে অনেক আলোচনা, সমালোচনা হলো। আলোচনার মধ্যে ছিল তার প্রশংসা, তার জন্য সহমর্মিতা। আলোচনাকারীরা বলছিল, ‘আজম সাহেব খুব দায়িত্ববান বাবা। কিন্তু যতই দায়িত্ববান হোক চার চারটা বাচ্চা সামলাতে যেয়ে ওনার সমস্ত ব্যবসা বাণিজ্য অনেকটা বন্ধের মুখে। ঘর বাহির দুটো একসাথে সামলানো মুখের কথা না। বিশেষ করে একজন পুরুষের পক্ষে ঘর সংসার সামলিয়ে বাইরের কাজকর্ম সামলানো অনেকটা অসম্ভব। তবুও ছয়মাস চেষ্টা করেছে সে। এখন আর পারা যাচ্ছেনা। ছেলেমেয়েদের স্কুলে আনা নেওয়া, বাচ্চাদের দরকারী সমস্ত কেনাকাটা, বাজারঘাট, রান্নাবান্নাসহ সাংসারিক সমস্ত কিছু সেরে ব্যবসা দেখার আর সময় হয়ে ওঠেনা। এখন বিয়ে করাটা প্রকৃতপক্ষেই প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বিয়েটা হয়ে যাওয়াতে আশা করা যায় ঘর বাহির দুই দিকই গুছিয়ে উঠবে। বাচ্চাগুলি মায়ের আদর ভালবাসা না পেলেও মায়ের মত একজনের স্নেহ যত্নে বড় হবে।’ সমালোচনার মধ্যেও কম ছিলনা! যারা বিষয়টাকে সহজভাবে নিতে পারেনি তারা বলছিল, ‘আজম চৌধুরী কেমন পুরুষ! পুরুষ মানুষ হলেই কি এরকম হতে হবে? সবাই অবশ্য এরকম না। ছয়মাস যেতে না যেতেই বিয়ে করে বসেছে! কত সহজেই ভুলে যেতে পেরেছে প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর কথা। ছেলেমেয়েগুলি এখন সৎ মায়ের কাছে থাকবে। সৎ মা কেমন হয় সেটাতে সবাই জানে। আহারে বাবার বিয়ে নিজের চোখে দেখা কত যে কষ্টের!’
নাজমা চৌধুরীরও এটা দ্বিতীয় বিয়ে। প্রথম বিয়েটা ভেঙেছে বছরখানেক। বিয়ে ভাঙার কারণটা ছিল খুব দুঃখজনক। তিনি একজন বন্ধ্যা নারী। এটা প্রমাণিত হয়ে যাওয়ার পর স্বামীর সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে নাজমার। শেষে বিবাহ বিচ্ছেদ অবধারিত হয়ে যায়। দ্বিতীয় বিয়ের সময় তার জন্য উপযুক্ত স্বামী পাওয়া অতটা সহজ ছিলনা। একেতো ডিভোর্সী উপরন্তু বন্ধ্যা। আজম চৌধুরীর সাথে নাজমার বিয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল দুজনের অতীত। দুজনের ঠিক যেরকম প্রয়োজন সেরকম তারা। একজনের প্রয়োজন ঘর আর আরেকজনের ঘরনী। চল্লিশ বছর বয়সী আজম চৌধুরী আর তেত্রিশ বছর বয়সী নাজমা চৌধুরীর বিয়ের পর শুরু হলো তাদের নতুন জীবন। সেই জীবনের সাথে অনিচ্ছাসত্ত্বেও জড়িয়ে গেল দশ বছরের রিয়া, সাত বছরের জমজ দুই ভাইবোন প্রিয়া -টিঙ্কু আর চার বছরের রিঙ্কু।

আজম চৌধুরী দ্বিতীয় বিয়ে করেছিল সংসারের দায়িত্ব স্ত্রীর হাতে তুলে দেয়ার জন্য। সে ঠিক যেরকম চেয়েছে নাজমা সেরকমই। খুব সংসারী, নম্র, ভদ্র, শিক্ষিতা। প্রথম থেকেই বাচ্চাদেরকে কাছে টানতে সচেষ্ট ছিল সে। বাচ্চাদের পছন্দের নানারকম খাবার তৈরি করে টেবিল ভর্তি করে ফেলা দিয়েই শুরু ছিল। ওদের পড়াশোনার সব দিকও নাজমা দেখে। বাচ্চাদেরকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া, হোমওয়ার্ক দেখা, পরীক্ষার সময় বিশেষ যত্ন নেয়া, বাসায় টিচার রাখা সবই করছে নাজমা। বাচ্চাদের আব্দার মেটানো বা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটা করার দিকেও নাজমার যথেষ্ট খেয়াল। এসব ছাড়া স্বামীর দিকে খেয়াল রাখা, যত্ন নেয়া থেকে শুরু করে সংসারের এমন কোন বিষয় নেই যেখানে নাজমার মনোযোগ নেই। নাজমাকে নিয়ে আজম খুব খুশি। তবুও একটা বড় কিন্তু কষ্ট দেয় তাকে। রিয়া ওর বাবার বিয়ের শুরু থেকেই নাজমাকে মেনে নিতে পারেনি। যত বড় হয়েছে ততই ওর এই মনোভাব বেড়েই চলেছে। প্রিয়া-টিঙ্কু প্রথম প্রথম নতুন মাকে পছন্দ করত। ধীরে ধীরে রিয়ার প্রভাবে ওরাও সরে যাচ্ছে নাজমার থেকে। ওরাও ঢুকে যাচ্ছে বড় বোনের তৈরি করা নিজস্ব জগতটাতে। আজম চেষ্টা করেছে রিয়াকে ওর নিজস্ব বলয় থেকে বের করতে, নাজমাও করেছে। কোন লাভ হয়নি। এক ধরণের ব্যর্থতার কষ্ট ঘিরে রাখে তাকে। এই কষ্ট থেকে রাগও হয় মাঝে মাঝে। কিন্তু রাগটা ঝেড়ে ফেলা যায়না। কার উপর ঝাড়বে সেই রাগ! নাজমা চেষ্টার ত্রুটি রাখেনি। রিয়াকেও কিছু বলা যায়না। মা মরা মেয়ে! এমনিতেই মনে কত শূন্যতা!

নাজমা ওর দ্বিতীয় বিয়েতে অনেক কিছু পেয়েছে। স্বামী, সন্তান, আর্থিক সুখ, সামাজিক সম্মান, মর্যাদা। মাতৃত্বের সুখও কিছুটা পেয়েছে। ছোট রিঙ্কুকে নিয়ে। ছোট রিঙ্কু ছিল চার বছরের বাচ্চা। নাজমাকে পেয়েই কোলে উঠে বসেছিল। তারপর থেকেই আম্মু আম্মু বলে ডাকতে শুরু করেছিল। কি মিষ্টি লেগেছে নাজমার। রিঙ্কু সেরকমই ছিল বহুবছর। নাজমার নারী জীবনের বিশেষ সার্থকতা এনে দিয়েছিল রিঙ্কু। ও এখনও নাজমাকে খুব ভালবাসে। কিন্তু মাঝে মাঝে কেন যেন মনে হয় রিয়া ওকেও টেনে নিয়ে যাচ্ছে নিজের দিকে। প্রিয়া-টিঙ্কু জমজ ভাইবোন। সাত বছরের ছিল ওরা। এখন ওদের বয়স বার বছর। প্রথমদিকে নাজমার সাথে একটা বন্ধুত্ব গড়ে উঠছিল ওদের। ইদানিং জমজ দুজন রিয়ার পৃথিবীতেই বেশি স্বচ্ছন্দ্য। নাজমা চেষ্টা করেছে সাধ্যমত। ওদের সবরকম সুবিধা-অসুবিধা, অসুখ-বিসুখ, ভাল-খারাপের সাথে নিজেকে ওদের সাথে যুক্ত রাখার চেষ্টা করেছে। রিয়া কোনদিনই নাজমার আন্তরিকতা গ্রহণ করেনি। নির্লিপ্ত থেকেছে নাজমার বিষয়ে। নিজের একটা ভিন্ন জগৎ তৈরি করে নিয়েছে। সেই জগতে ছোট ভাইবোনগুলিকেও বন্দী করে ফেলছে আস্তে আস্তে। নাজমা জানেনা আর কি করতে পারত বাচ্চাগুলোকে নিজের আপন করে তুলতে। কি করলে বাচ্চাদের বিশ্বাস আর ভরসা অর্জন করতে পারত সেটা আর জানা নেই তার। কখনও কখনও মনে খেদ হয়। কখনও ভয় আর কখনও ক্ষোভ। ভয় হয় যদি সব হারায় আবার! যদি রিঙ্কুও পুরোপুরি চলে যায় রিয়ার কাছে! আবারও কোলশুন্য হবে নাজমা।

রিয়ার বয়স পনের বছর। প্রাপ্তবয়স্ক না হলেও নিজের খেয়াল রাখার মত বয়স হয়েছে। নিজের পছন্দের টুকটাক খাবার বানানো, সামান্য শরীর খারাপ হলে সেই অনুযায়ী ব্যবস্হা নেয়া, ছোট ভাইবোনগুলোর খেয়াল রাখা সবই সামলে নিতে পারে সে। ওর জীবনের সবচেয়ে খারাপ দিন বাবার বিয়ের দিন। মায়ের মৃত্যুকেও ছাপিয়ে গেছে সেটা। সেই মহিলাকে বিয়ে করে মায়ের জায়গাটা অন্য আরেকজনকে দেয়া হয়েছে, মায়ের স্মৃতিগুলো মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছে সেজন্যই সবচেয়ে খারাপ দিন সেটা। গত পাঁচটা বছরে বোধহয় একটা দিনও মাকে ভুলে থাকেনি রিয়া। আর সেইসাথে বাবা এবং বাবার স্ত্রীর সাথে দুরত্ব বেড়েছে ওর। বাবার উপর একসময় অভিমান ছিল। বাবা কি আসলেই আরেকটা বিয়ে না করলে পারত না? এই প্রশ্নটা অনেক ভাবিয়েছে ওকে। বহুবার মনে হয়েছে এখান থেকে চলে যাবে অন্য কোথাও। সুযোগ থাকলে নিশ্চয় যেত। সেরকম কোন জায়গা নেই যাওয়ার মত। এখানেই থাকতে হয়েছে। বাবা তার নতুন স্ত্রীকে নিয়ে ভাল আছে। ওরা ভাল থাকুক। রিয়াও ভাল থাকতে চায় নিজের মত করে। ছোট ভাইবোনদেরও রক্ষা করতে চায় অপছন্দের মানুষগুলোর হাত থেকে। রিঙ্কুটা কম বোঝে, প্রিয়া-টিঙ্কুও। রিয়া ওদেরকে বোঝাচ্ছে বাবা আর এই আন্টি ওদের জন্য কখনই ভালনা। বিশেষ করে এই আন্টিকে ওরা যতই মা বলে ডাকুক সে কখনই ওদের মা না। ওদের মায়ের জায়গা তাকে দেয়া মায়ের সাথে অন্যায়। রিয়ার তৈরি পৃথিবীতে বাবা আর নাজমা আন্টির কোন স্হান নেই। শুধু বাবার মন রক্ষা করতে অনেক কষ্টে তাকে আন্টি বলে ডাকে রিয়া। তার জন্য মনে কোন সম্মানবোধ নেই ওর। বরং অসন্তোষ আর অপছন্দের পরিমাণ এত বেশি যে কোনদিন সেই মহিলার কোন ভাল দিক চোখেই পড়েনা রিয়ার।

চৌধুরী পরিবারের সেই বিয়ের বয়স এখন পাঁচ বছর। পরিবারটিকে আপাতদৃষ্টিতে দেখে মনে হয় একেবারেই আদর্শ, সুখী পরিবার। সবাই খুব স্বস্তির মধ্যে আছে। আর্থিক সঙ্গতি এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠা তাদেরকে করেছে নিশ্চিন্ত। পরিবারের দুজন প্রাপ্তবয়স্কের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ অপ্রাপ্তবয়স্কদেরকে যথেষ্ট নিরাপত্তার মধ্যে রেখেছে। দিচ্ছে মানসিক, শারীরিক ও আর্থিক সহযোগিতা। পরিবারটি আপাতদৃষ্টিতে বেশ ভাল আছে। সমালোচকদের মুখও বন্ধ। তবে, খুব কাছ থেকে দেখলে কিংবা দেখার মত চোখ থাকলে চৌধুরী পরিবারের সকলের মধ্যেই দেখা যাবে অসন্তোষ, অস্বস্তি আর কমতি। এরা সবাই এমন একটা অবস্হায় পড়েছে যা থেকে বের হওয়া শক্ত। এটা এক ধরণের ত্রিমুখী নিরব লড়াই। এই ত্রিমুখী লড়াইতে আছে আজম চৌধুরী, নাজমা চৌধুরী, রিয়া-প্রিয়া-টিঙ্কু। রিঙ্কু এখনও কোন জায়গায় নিজেকে পাকাপোক্তভাবে বসাতে পারেনি। ওরা সবাই সবাইকে নিয়ে কোথাও না কোথাও অশান্তিতে থাকে। সেই অশান্তি বাইরে থেকে দেখা যায়না। ওরা অনুভব করে। কেউ কাউকে কিছু বলেনা। কারো উপর রাগ দেখায় না কিংবা কটু কথাও বলেনা। নিজের অসন্তোষের জন্য কাউকে দোষারোপও করতে পারেনা। শুধু ভেতরে ভেতরে চাপা অসন্তোষে কষ্ট পায় ওরা। মুক্তি পায়না।
ওরা সবাই ভাল আছে। সামর্থ্যবান, আনন্দপূর্ণ, সফল ও সুখী পরিবার। একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায় এসব কিছু থাকার পরও ওদের সবার জীবনে এক অপার শূন্যতার ছোঁয়া। এই শূন্যতাটা পরিবারের ছয় জনের মধ্যেই থাকলেও সকলের শূন্যতাটা একইরকম না। ত্রিমুখী এক না বলা শূন্যতা ওদের জীবনকে ছেয়ে রেখেছে।
(সমাপ্ত)

©তাসনুভা সোমা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।