LIVE CAMERA START!
আমার সামনে একদল গ্রুপ ক্যামেরা অন করে তাক করে রেখেছে। দুজন মেয়ে আমার দুহাত শক্ত করে ধরে রেখেছে। মুখ আমার ওড়না দিয়ে বেধে পাচজন ছেলে আমার দৃশ্য উপভোগ করছে। আমি ছোটাছুটি করছি, গোঙাচ্ছি কিন্তু কেউ কাছে এসে সাহায্য করছেনা….কেউ না…সবাই ক্যাম্পাসে জড়ো হয়ে আমার দৃশ্য দেখছে। সাদা গোলাপির কামিজটা মিনিটেই টমেটোর সস, কাদার ময়লামাটিতে ধূসর লালে পরিনত হয়েছে। মেয়ে দুটো হোহো করে অট্টহাসি….ছেলেদলের মধ্যে একজন সিগারেট ফুকছে, একজন করতালি দিচ্ছে, দুইজন ক্যামেরাতে সব ধারন করছে, আরেকজন “স্টপ গাইজ ” বলে বাধা দিচ্ছে… কেউ সেটা কানেও নিচ্ছেনা। শেষেরজন হাত ভাজ করে স্ট্রেট হয়ে দাড়িয়ে আছে। সবাই সভ্য, বড়লোক ফ্যামিলির…. শুধু আমি মিডেলক্লাস অর্থাৎ মধ্যবিত্ত পরিবারের। ওদের এই নিচুকাজের শিকার দ্বারা আপনারা বুঝতেই পারছেন আমি ইতিমধ্যে Ragging এর শিকার। আর উনারা আমার সিনিয়র দল। যার যার বাবার দুপয়সা টাকার গরমে ক্যাম্পাসে ওদের পা পড়েনা। খুবই অহংকারী। ভার্সিটিতে সব মেয়েদের মধ্যে আমি নাকি চুপচাপ মেয়ে তাই বলে ওরা আমার সাথে বিভীষিকা আচরন করছে…. কান্নায় আমার চোখমুখ লাল হয়ে আছে কেউ সেটা আগলে নিচ্ছেনা…মুখ দিয়ে আওয়াজ করে টিচারদের ডাকব তাও আমার মুখ বাধা…কখনো এমন বাজে অবস্থায় পড়িনি…কখনো না। মেয়ে দুটো শর্ট টপস, স্লিভলেস হাতা, ওড়না নামক বস্তু ছাড়া। হঠাৎ ডানপাশের জেনি নামের মেয়েটা বলে উঠল,

-রামিম, ইয়ার হারি আপ! সিজার নিয়ে আয়… মেয়েটার চুল দেখছিস কতো বড়!! একটু কেটে দেই… নিয়ে আয়!!

আমার চুল কাটার কথা শুনে আমি হাত মুচড়িয়ে ছাড়ার চেষ্টা করি কিন্তু আমি বারবার ব্যর্থ। মেয়ে দুটো খুবই শক্তিশালী। করতালি দেয়া রামিম ছেলেটা দৌড়ে সামনের ল্যাব থেকে সিজার এনে জেনির হাতে দিলো। জেনি একহাতে আমাকে শক্ত করে চেপে আরেকহাতে সিজার নিয়ে আমার বিনুনির মাঝ বরাবর নিশানা করলো… মাথা ঝুকিয়ে যাচ্ছি…আমার চুল কেটে দিচ্ছে কেউ এগিয়ে আসছেনা…আমাকে টর্চার করছে কেউ ওদের থামাচ্ছেনা…আমার চুল আমার সব… আমার সৌন্দর্য…ওরা শেষ করে দিচ্ছে…কেউ সাহায্য করছেনা…..

বিশিষ্ট নামিদামি SUMMER FIELD ক্যাম্পাসের তুখোর ডেন্জারাস গ্যাং! নাম “হান্টার’স”। সবাই একনামে চিনে এদের গ্যাংকে। একেকটা মেম্বার খুব ভয়ানক। এরা অনেকের দুদর্শা ঘটিয়ে ক্যাম্পাসে থাকা ছুটিয়ে দিয়েছে। দুইজন মেয়ে আর পাচজন ছেলের সম্মেলনে তৈরি “HUNTERS” গ্যাং. সিজার ধরা মেয়েটার নাম জিনিয়া জেনি, যেমন রূপ তেমনি অহংকার। বড়লোক বাবার একমাত্র মেয়ে বলে ক্যাম্পাসে কেউ চোখ তুলেও তাকায় না। আরেকজন মেয়ে নাম রিদিতা রিমি, চেহারার গড়ন তত সুন্দর না হলেও ছেলেরা লাইন লাগাতে টাইম নেয়না। সিগারেট ফুকা ছেলের নাম নাসিফ সরকার, ক্যাসিনো দুনিয়ায় শহর কাপানো উজ্জল সরকারের আদরের ছেলে। দেখতে স্মার্ট হলেও নেশায় এক নাম্বার। এমন কোনো নেশাদ্রব্য নেই যা নাসিফ টেস্ট করেনি। । রামিম ইকবাল, প্রবাসী বাবামায়ের ছোট ছেলে। গ্যাংয়ের সবচেয়ে বড় চামচা যদি ইঙ্গিত করা হয় সবাই আঙ্গুল তুলে রামিমকে দেখাবে। ক্যামেরা তাক করা একজনের নাম আহাদ মল্লিক এবং অপরজনের নাম তন্ময় শিকদার। তারাও খুব উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলে। লাস্ট বাট নট দ্যা লিস্ট! দ্যা গ্যাং লিডার! এন্ড দ্যা মোস্ট হ্যান্ডসাম টায়কুন রাদিফ মুগ্ধ। দেশের টপ লেভেলের বিজনেস ম্যান বাবার দুইমাত্র ছেলে। বড় ভাই রাজিব রুগ্ধ, যেকিনা এই ভার্সিটির ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের লেকচারার।

তাদের এই র‍্যাগের দাপটে কোনো স্টুডেন্ট মুখ ফুটে কথা বলার সাহস পায়না কেননা কিছু বললেই এ্যাকশন! সদ্য ক্যাম্পাসে আসা প্রথম বর্ষ স্টুডেন্ট স্নিগ্ধা মম অলরেডি তাদের র‍্যাগিং অত্যাচারের শিকার। ছোট ভাই এবং মা বাবা নিয়ে নারায়ণগঞ্জে বেড়ে উঠা সে।

চুলের বিনুনি যেই ক্যাচ করে কাটবে তার আগেই লিডার তথা রাদিফ মুগ্ধ জেনিকে “স্টপ!” বলে থামতে বলল। জেনি কিছুটা কপালকুচকে সিজারের হাত থামিয়ে দিল। মুগ্ধ পকেটে দুহাত ঢুকিয়ে ধীরেসুস্থে এগিয়ে এলো। মমর দিকে তাকিয়ে জেনিকে উদ্দেশ্য করে বলল,

-জেনি স্টপ। লেট হার গো…

জেনিসহ সবাই মুগ্ধের কথায় অবাক! এই প্রথম কোনো র‍্যাগিং টাস্কে মুগ্ধ বাধা দিচ্ছে। রিমি কিছু বলতে নেবে মুগ্ধ ঠোটে আঙ্গুল বসিয়ে চুপ করতে বলল। রিমি হাত ছেড়ে দিলে জেনিও মমর হাত ছেড়ে দেয়। মম ওদের কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে মুখ থেকে ওড়নার বাধন খুলে গলায় দিয়ে নিল। চারপাশ পিনপতন নিরবতা। শতশত স্টুডেন্ট সিনেমার ক্লাইম্যাক্স দেখতে চুপ। মম চোখ মুছে হাটা ধরলে মুগ্ধ পেছন থেকে চুলের বিনুনি টেনে ধরে। ওমনেই মম চুলে টান পেয়ে চোখ খিচে থেমে যায়। মম পেছন ফিরে অবস্থা বুঝবে তার আগেই মুগ্ধ বলে উঠে-

-ওয়েট! স্টপ রাইট দেয়ার! কথা না শুনলে চুলের গোছা সাথে থাকবেনা বলে দিলাম!

মাথায় হাত দিয়ে মম ঠাই মেরে দাড়িয়ে যায়। মুগ্ধ জেনির হাত থেকে সিজার নিয়ে বিনুনি একটু উচু তুলে শেষপ্রান্তের তুলি আবদ্ধ চুল পযর্ন্ত ক্যাচচ করে কেটে দেয়। নিমিষেই হাতের এক তালু সমান চুল মাটিতে পড়ে যায়। চুল কাটার বেগতিক বুঝেই মম হুরমুড়িয়ে চুলের বিনুনি সামনে এনে দেখে চুলের আগা ১০ ইন্ঞ্চির মতো কেটে দিয়েছে। চুলের দিকে তাকিয়ে রাগে ফুসতে থাকে মম! হাতমুষ্ঠিবদ্ধ করে চোখ লাল করতে থাকে। সবাই বিশ্বজয়ী হাসিতে ফেটে পড়েছে। সবার হাসি উপেক্ষা করে সে দৌড়ে ছুটে পালালো। মমর দৌড়ে যাওয়াতে হাসির জোয়ার আরো ফেটে পড়লো। এই বুঝি মেয়েটার কষ্ট লাগল!!! কিন্তু নাহ্! সে ফিরে আসলো আর হাতে যা ছিলো সবাই হাসি থামিয়ে চোখ বড় করে শঙ্কামুখ করল। ওড়না আর গলায় নেই। বাকা করে কাধ টু কোমরে বেধে নিয়েছে মম। হাতে হকিস্টিক (Hockey Stick)। রামিম, আহাদ, নাসিফ, তন্ময়, রিমি,জেনি সবাই একে অন্যের দিকে মুখ ফিরে তাকাচ্ছে। মুগ্ধ পকেট থেকে হাত বের করে আবদ্ধ ভাবে হাত ভাজ করে নিল। ফুল ডোজ এটিটিউড। কি হতে চলছে!! এক মেয়ে তাদের সামনে হকিস্টিক নিয়ে এসেছে করবেটা কি! মূহুর্ত্তের মধ্যে দৌড়ে অবসান ঘটানো রোমান্ঞ্চকর ঘটনার!!

“DHOOM!!!” ক্যাম্পাসের ভেতরে পার্ক করা গাড়ির সামনের গ্লাস চুরমার!!
“DHOOM!” গাড়ির জানালার গ্লাস চুরমার!!

ধুমধাপ গাড়ির কাচ গুড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে মম! মনে জিদ…এত্ত সোহাগের চুলের আগা কাটার পরিনাম! জেনিসহ সবাই ওকে থামাতে দৌড় দিলে মুগ্ধ হাত প্রসার করে সবাইকে থামিয়ে দিল। সে দেখতে ইচ্ছুক এই দুদিনের মেয়ে কতটা খেলা রটাতে পারে! গাড়িটা যদিও মুগ্ধের। গাড়ির পিছনের গ্লাসে “RADEEF MUGDHO” বড় বড় হরফে লিখা এতে কারোর বুঝার বাকি থাকবেনা গাড়িটা আসলে কার। তাই মমর বুঝতে সময় লাগেনি গাড়িটা তার চুলকাটা লিডারের। বাকি স্টুডেন্টের মধ্যে হৈহৈ সমালোচনা শুরু হয়ে গেছে। তবুও টিচারদের আসার নামসূত্র নেই। গাড়ির চর্তুপাশে কাচ ভেঙে এবার হকিস্টিক হাতে সামনে এসে দাড়ায় মম। সামনে উচা লম্বা ছয়ফিট হাইটের মোস্ট চার্মিং পার্সন রাদিফ মুগ্ধ। গেটআপে সাদা টিশার্ট ওপরে কালো রঙের জ্যাকেট। জ্যাকেটের হাতা কিছুটা উঠানো। চুল সেট। লালচে গোলাপীর ঠোটজোড়া । পাপড়ি ভরা চোখের ভেতরে কৌতুহলের ভাব। দুজনের মধ্যে দূরত্ব একহাত। মম ঠোট কুচকে হঠাৎ হকিস্টিক আকড়ে “ধুমম” করে এক ঘা বসিয়ে দিল মুগ্ধের মাথা বরাবর। ঘটনাস্থলে সবাই আশ্চর্যের সপ্ত আকাশে!! কি সাংঘাতিক কান্ড করে দেখালো!!

“মুগ্ধ!!!!” চিৎকার দিয়ে দলবলে দৌড়ে এলো। তরল বেগে রক্ত পড়ছে। আঘাত পেয়েই মুগ্ধ সেন্সলেস!!!

-চলবে??

-Fabiyah Momo

তুমিময় প্রেম
সূচনা পর্ব

তুমিময় প্রেম
পার্ট দুই
Fabiyah Momo

“মুগ্ধ!!!!” বলে চিৎকার দিয়ে দলবলে দৌড়ে এলো। তরল বেগে রক্ত পড়ছে। আঘাত পেয়েই মুগ্ধ সেন্সলেস!!!

মম হকিস্টিক ফেলে মুগ্ধের আহত নিরুপায় দৃশ্যপট সিচুয়েশনটা একবার অবলোকন করলো, অতঃপর হাটা দিলো ক্যাম্পাসের বাইরে, মেইন গেটের ওখানে। সবাই ড্যাবড্যাবিয়ে মমকে দেখে যাচ্ছে…মম বলিষ্ঠ বিশ্বাসে গলায় ওড়না ঠিক করে চলে যেতে নিলে মেইন দরজায় পাহারা দেওয়া পন্ঞ্চার্শোধ্ব বুড়ো দাড়োয়ান বলে উঠল-

–শুনেন,
মম বৃদ্ধ লোকের সন্নিকটে গেল। নরম গলায় মুখের তেজী ভঙ্গিমা পরিবর্তন করে বলল-

–জ্বী চাচা বলুন, কিছু বলবেন?

বৃদ্ধ মাথার খাদি টুপিটা ঠিক করে গলা ভিজিয়ে বলে উঠলো-

–আপনার নাম কি জানা যাইবো? মনে কিছু না করলে?
–অবশ্যই। আমার নাম মম। নতুন বর্ষের স্টুডেন্ট। ডিপার্টমেন্ট অফ কেমিস্ট্রি।
–ও আইচ্ছা আইচ্ছা। একটা কথা কই মা? বাপের বয়সী ভাইবা পরোখ করিও।
মম মুখে লম্বা হাসি টেনে প্রসারিত নরম সুরে হ্যা বোধক জানালো।
–মা একটু সামলায়া থাইকো। জমানা ভালো না, পোলাপাইন মেলা খারাপ। যারে তুমি মাথা ফাটায়া দিছো…হেয় কইলাম বড় সাবের ছেলে। টিসি দিবার পারে তোমারে। মাফ টাফ চাইয়ি নিও।

মম বৃদ্ধের উপদেশবাচক কথায় হালকা হেসে দিলো, হাসির অর্থ বৃদ্ধ না বুঝলেও মম পরিস্থিতিটা পরিস্কার বুঝতে সক্ষম। সে বৃদ্ধের বার্তায় অভয় দিয়ে বলে উঠলো-

–চাচা আমি অত্যন্ত খুশি হয়েছি আপনি আমাকে উপদেশ দিয়েছেন। ধন্য আমি। শুকরিয়া আপনাকে, তবে টেনশন নিবেন না। আমি ক্যাম্পাসে পড়তে এসেছি কারোর পা ধরে মাফ চাইতে নতুবা গোলামি করতে আসিনি। সামনের সিচুয়েশন দুর্গতি বয়ে আনতে পারে পুরোপুরি নিশ্চিত, আমার এসবে ভয় নেই চাচা। আসি। আসসালামুয়ালাইকুম।

বৃদ্ধ দারোয়ান সালামের উত্তর নিচু থেকে নিচুস্তরে নামিয়ে বলল, যেটা মমর কানে কি পিপড়ার কানেও আসবেনা। মম তৎপর ভাবে প্রস্থান করেছে তারা স্বীয় বাসা নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশ্যে, যা ঢাকা থেকে এক ঘন্টার দূরে অবস্থিত। মমর শেষ চিহ্ন টুকুতে একপানে চেয়ে বৃদ্ধ মাথা চুলকিয়ে বলে উঠলো-

–মাইয়া বড়ই টাউড!! একলাই একশো।

কলিংবেল বাজিয়ে অপেক্ষা করছি কখন আমার আম্মাজান দরজা খুলে স্বাগতম জানাবেন। নিশ্চিত জামার হাল দেখে ঝাড়ুর বারি বখশিশ মেরে ননস্টপ ভ্যা ভ্যা স্টার্ট করে দিবেন…কমন ব্যাপার! উফ আই উইল বি গন! ফাজিল বজ্জাত বড়লোকের চ্যাংড়া শয়তান!আরো দিতাম কয়টা ঘাড় ধরে! ছেড়ে দিলাম। ফাস্টদিনেই ইজ্জতের কাবাব ফালুদা বানিয়ে প্লাস্টিক মেরে লাটে উঠানোর মানেই হয়না। সময় যাক! ঠেলা বোঝাবো!আম্মু দরজা খুললেন, এক তীক্ষ্ম ধারালো শিং গজানো ডায়নির মতো চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে আছেন, তারপর সুরর…

–দামরি ধিংড়ি মেয়ে! আবার কার গলায় মাদুড় পেচিয়ে হাত ভেঙে দিয়েছিস! গতবার মাফ করেছিলাম এবার ছাড় দিবো না। বল কি করেছিস! জামার অবস্থা নোংরা কেন!

জুতা খুলে ভেতরে ঢুকলাম আমি, আম্মুর হর্ণ বাজানো বিদঘুটে চিল্লানোর ঘ্যানঘ্যাননি শব্দে কানে তব্দা লাগিয়ে দিচ্ছে, জুতার আলমারিতে জুতাজোড়া রেখে গেলাম আমি কাপড় চেন্জ করতে। ততক্ষণে বাড়ি মাতিয়ে শেষ আম্মু! কার সাথে পাঙ্গা মেরে জামার দশা ছুটিয়ে এসেছি। কার গালের চামড়া ঠাটিয়ে পুরো লালে বানিয়ে এসেছি…ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।এর আগে কলেজের র‍্যাগ ডে’র দিন রাস্তার এক হারামজাদাকে ধরে পিটিয়েছিলাম জুতা ছিড়ে…এরপর বাসায় এসে আম্মুর কাছে জুতা ছিড়ার বকুনি। রুমের দরজা চেপে পর্দা টেনে ওয়ারড্রব খুলতেই কর্কশকণ্ঠ ভেসে আসলো, আচ্ছা বকাঝকা করছেন আমাকে। প্রতিবারের মতো এবারও এক কানে ঢুকাচ্ছি অন্যকানের ছিদ্রপথে ফুরফুর করে বের করে দিচ্ছি।

ময়লা পোশাকে গোসল ছাড়া থাকা আর গোবরে হাত ডুবিয়ে ভু ভু শব্দ করা এক বিষয়। এই দাড়ান! গোবরে হাত ডুবিয়ে কেউ মুখ দিয়ে ভু ভু শব্দ করে? হাতের সাথে মুখের ভু ভু শব্দের কি কানেকশন? গোবর‍ের যা গন্ধ না! ছি!! খাচ্চর মাইয়া কথা বলবি… বেক্কলের মতো কথা বলতেছিস কেন? ফোন বাজলো, ফুল ভলিউমে ডিসগাস্টিং উপায়ে। চরম বিরক্তিকর ! ভেজা চুলে তোয়ালে ঘষে বিছানার উপর ফোনের দিকে হাত বাড়ালাম। ‘আননোন’ উঠে আছে, অর্থাৎ অজ্ঞাত পরিচয়ধারী কোনো ব্যক্তি মানুষের কল। করলাম রিসিভ-
ওপাশ থেকে,

–হ্যালো, আমি কি স্নিগ্ধা মমর সাথে কথা বলছি?
পুরুষ মোটা ঘ্যারঘ্যার কন্ঠ, কলের বিপরীতে আমাকে চাচ্ছে,
–ইয়েস আমি মম বলছি। কে আপনি? কোথা থেকে কল করেছেন?
–আমি প্রফেসর আসাদ জামান বলছি, সামার ফিল্ড ইউনিভার্সিটি থেকে। আই হোপ, চিনে গেছো কে এবং কোথা হতে বলছি।
–হেড স্যার? আসসালামুয়ালাইকুম স্যার।
–ওলাইকুমসালাম। নিউ স্টুডেন্ট অলসো এ্যা নিউকামার অফ দ্যা ডিপার্টমেন্ট। ডু ইউ নো, ইউ আর রাস্টিগেটেড?
–হোয়াট! রাস্টিগেটেড? স্যার মানে কি এসবের? হোয়াটস মাই ফল্ট?
–নো রিজন। আমার কাজ ছিলো তোমায় ইনফর্ম করা এন্ড গেট রেডি ফর রাস্টিগেট নোটিশ।
–স্যার প্লিজ…স্যার…

টুট টুট আওয়াজে স্যার কেটে দিলেন কল। তোয়ালে ছুড়ে ইসরাতকে কল করলাম। নাম্বার বিজি, নট এভেইএবেল অবস্থা। তোয়ালে দিয়ে চুল না মুছার পরিনতি আম্মুর আরেকদফা ধমক সেটা কলের তালে ভুলে বসেছি। একনাগাড়ে কলের পর কল ‘ইসরাত’ নামক বেস্টফ্রেন্ড জন্তুকে। সে রিসিভ করছেনা। আমার কাছে আরেকটা কল আসলো, যাকে আমি আগের মতোই ‘আননোন’ ভ্যালিডে দেখছি, তাকেও চিনি না।
–হ্যালো কে বলছেন?

–কাল ক্যাম্পাসে আসো হাইপার! ওয়েট এন্ড ওয়াচ!

.
.

হসপিটালে স্পেশাল কেবিনে দাড়িয়ে আছে সবাই। মাথায় ব্যান্ডেজ লাগিয়ে আধশোয়া হয়ে ইনজেকশন নিচ্ছে রাদিফ মুগ্ধ। জেনি কেবিনের মধ্যে পায়চারি করছে, ছটফটে অবস্থা কখন সে হকিস্টিক দিয়ে মাথা ফাটানো কালনাগিনীকে গলা চেপে শ্বাসরুদ্ধ করবে। রিমি ফোনের কলে হুংকার বাজিয়ে ব্যস্ত। তন্ময় নতুন আসা স্টুডেন্টের ব্যাপারে নানা দিক নিয়ে আলোচনা করছে। তৎক্ষণাৎ কেবিনের দরজা খুলে হুরমুড়িয়ে ভেতরে ঢুকলো রামিম। হাটুধরে কুনো হয়ে হাফাচ্ছে সে…মুগ্ধ ডক্টরকে শক্ত চোখে ইশারা করলো, ডক্টর মুগ্ধের ভাবার্থ বুঝে চলে গেল কেবিন ছেড়ে। রামিমের হাপানোতে ইরিটেট ফিল করছে জেনি, পায়চারি থামিয়ে হাতভাজ করে রামিমের সামনে দাড়ালো।

–রামিম টাস্ক করেছিস? অর নট?
রামিম পকেট থেকে টিস্যু নিয়ে মুখটা মুছে মুগ্ধের বেডের ওখানে বসলো-

–বস! সব ডিটেইলস নিয়ে আসছি!!

মুগ্ধ একটা হাসি দিল! রামিমের সাথে হাই ফাইভ করে বলল,

–নাও দ্যা গার্ল ইউল বি গন ডুড!

-চলবে

তুমিময় প্রেম
PART 03
FABIYAH MOMO

আম্মু বিছানার ঝাড়ু নিয়ে সারা বাড়ি দৌড় লাগিয়েছে!! আমি ধাওয়া খেয়ে চোরের মতো একবার সোফা থেকে লাফিয়ে টেবিলে উঠছি, আরেকবার আম্মুর ঝাড়ুর ঠেলা হটিয়ে রুমের পর রুমে ছুটছি! মানে আজকে আমি শেষ ভাই!! চুল কেটে দিছে চ্যাংড়া শয়তানে!আর বাশের লম্বা ঠেলা খাচ্ছি আমি!

–তুই আজকে বলেই ছাড়বি কার সাথে মাতলামি করছোস! তোরে আমি কতদিন বলছি কাপড় চোপড় নোংরা করবি না! আমি তোর কাপড়ের দাগ উঠাইতে উঠাইতে হাতের চামড়া লাল করে ফেলি! তোর কানে বাতাস ঢুকে না! দাড়াইস তুই! তোর কপালে যদি ঝাড়ু না ভাঙছি! তোর একদিন কি আমার একদিন!

আমি দৌড়াতে দৌড়াতে হাফিয়ে কাহিল, আম্মু আমার পিছু পিছু ঝাড়ু নিয়ে দৌড়ানি দিচ্ছে!!কত করে বোঝাচ্ছি আমি কারোর সাথে উচুনিচু কিছু করিনি। ভালো মানুষের মতো বাসায় আসছি। রাস্তায় এক বিলাতি কুত্তা পথ আটকে বায়োভেন্ট করেছিলো… আমি যেয়ে হাতটান করে এসেছি!!ব্যস!! কিন্তু নাহ্…উনি আমার কথা শুনলেন না শুনলেন ভুট্টু সাহেবের কথা!! ডায়লগের একচুয়েল প্রার্থী ছিলো শেখ মুজিবুর রহমান!! বাট উনি পাকিস্তানি ভুট্টো সাহেবের কথা বললেও আমি এখানে আম্মুর দোটানায় ঝাটার বারি ইঙ্গিত করছি!! দৌড়াতে যেয়ে পিঠের উপর ঝপ করে ঝাড়ুর এক বারি পড়লো! টেস্ট পুরা ঝাল মশলার মতো! আম্মু এখনো বাঘের মতো আরেকদফা দেওয়ার জন্য হাত উচিয়ে বেকেছে….আমিও রুমে যেয়ে দরজা লাগিয়ে ঠাই!! উহআহ্করে হাত উল্টিয়ে পিঠের জ্বলা জায়গায় টাচ করার চেষ্টা করছি। ওইদিকে আম্মু দরজা ধাক্কিয়ে “আইলা” ঝড়ের চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করে ধূলিকনা বানিয়ে দিচ্ছেন! দরজা খুললে আম্মু ঝপাঝপ ঝাড়ুর আনলিমিটেড বারি দিবেন সিউর!

–দামরি কোথাকার! তোর মতো বয়সে আমি মায়ের সব কাপড় ধুয়ে, থালাবাসন ধুয়ে, কাটাকুটা করে কাজ এগিয়ে দিতাম! তুই ধিংরি হইছিস একটা মহারানি! নায়িকা পাভেলা! পায়ের উপর পা তুলে খাও ! টিভির রিমোট ধরে বসো!

আমি বিছানায় ল্যাং ছেড়ে শুয়ে পড়লাম। ক্লান্ত সুরে বলে উঠলাম-

–আম্মু তুমি বিশ্বাস করলে করো…না করলে বসে থাকো। আমি তোমাকে লাস্ট বার বলতেছি রাস্তার এক বিলাতি কুত্তারে চটকনা মারতে যেয়ে পিছলা খেয়ে কাদার মধ্যে পড়ে গেছি, ফলাফল আমার ধৌত পরিস্কার ইস্ত্রি করা জামাখানা কাদার সৌন্দর্যে গলাগলি করে ফেলছে। আর এখন তুমি ঝাড়ু নিয়া ঘর পরিস্কার না করে আমার পিঠের চামড়া জলিয়ে দিতেছো।

কিছুক্ষণ আরো বকবক করে দরজার ওপাশ থেকে চলে গেল আম্মু।
.
.
সকালে রেডি হয়ে ভার্সিটি গেলাম, হেড স্যার আমাকে রেস্টিগেট লেটার আনতে রিকুয়েস্ট করেছেন। কিন্তু আমি ভার্সিটিতে যাচ্চি ঠিকই ওই বিলাতি কুত্তার ঠাট্টা মেরে ইজ্জত মেরে দিতে। কাল ক্যাম্পাসে আমাকে র‍্যাগিং নিয়ে যা টর্চার করলো! চুল কেটে দিলো! আমি আজকে ছাড়বোনা।

সকালে মমর আম্মু রান্নাঘরে কাটাকুটার জন্য ছুড়ি খুজছিলেন। উনি সবজি কুটে চুলোয় রান্না বসাবেন বলে দেড়ঘন্টা ধরে ছুড়ির হদিস তন্নতন্ন করে পুরো বাড়ি খুজছেন কিন্তু পেলেন না। চোর কি তাহলে ছুড়ির চুরি করলো? কি সাংঘাতিক!! চোর দেখি গতি পাল্টিয়ে ছুড়ি চুরি করতে লেগেছে!! মানুষ খুন করবে নাকি! পরে তো ছুড়ির মালিকানাধীন হিসেবে মমর আম্মুকে গ্রেফতার করবে পুলিশ!!

মুগ্ধ তার হান্টার’স গ্যাং নিয়ে সেকেন্ড ফ্লোরের একটা ক্লাসরুমে আড্ডা দিচ্ছে। জেনি, রিমি, তন্ময়, আহাদ, নাসিফ সহ হৈ হুল্লোড়ে হাসিঠাট্টা। হুট করে দৌড়াতে দৌড়াতে দরজাটা ঠাস করে খুলে হাফাতে হাফাতে ঢুকলো রামিম। কপালে ঘামের ছড়াছড়ি, মুখ খুলে হো হো করে শ্বাস ছাড়ছে। মুগ্ধ হাই বেন্ঞ্চে বসে কপালে ভাজ ফেলল, জেনি রামিমের পায়ে হালকা লাত্থি দিল,

–হেই রামিম! হোয়াট হেপেন্ড! এভাবে রাস্তার কুকুরের মতো জিহবা বের করে হাপাচ্ছিস কেন! সে সামথিং!
–জেনি, জেনি ওই মেয়েটা…..মাথা ফাটানো মেয়েটা….ওই মেয়ে ক্যাম্পাসে মুগ্ধকে খুজছে…

জেনি বেন্ঞ্চের লোহাগাড়া পায়ে লাত্থি দিল,

–ড্যাম! হোয়াট রাবিশ! স্টুপিড মেয়েটার সাহস কি করে হয় মুগ্ধকে খোজার! হোয়াট দ্যা বুলসিট সি ইজ!

নাসিফ সিগারেটে এক টান দিয়ে তন্ময় কে খেতে দিলো, ধোয়া ছেড়ে বলল-

–ব্রো, ইফ ইউ গিভ দ্যা পারমিশন মে আই? তুলে এনে গেম ফিনিশ করে দেই? হোয়াট সে?

–অলরাইট! তুলে নিয়ে আসো ডুড! আমিও দেখতে চাই মেয়েটা একচুয়েলি কি চিজ আছে!

রামিম, নাসিফ, তন্ময়, আহাদ গেল….সাথে মজা নিতে রিমিও গেল। ক্লাসরুমের মধ্যে থাকলো মুগ্ধ ও জেনি। হাত মোচড়াচ্ছে জেনি, বুঝাচ্ছে মেয়েটা আসলেই দিয়ে বসবে কয়েক চাবুক থাপ্পর! হুট করে খালি ক্লাসরুমে ঢুকলো কেউ, ওড়নার সাহায্যে মুখ ঢাকা, চোখ দুটি ছাড়া কিচ্ছু দেখা যায় না। একহাত পিছনে লুকিয়ে রেখেছে, অপর হাত দিয়ে জেনিকে আঙ্গুল উচিয়ে বাইরে যেতে বলছে। জেনি রেগেমেগে আগুন! প্রথম কোনো মেয়ে এসে তার উপর আঙ্গুল দেখিয়ে বাইরে যেতে বলছে!! কে এই মেয়ে? ওড়নার আড়ালে কে সে? জেনি ও মুগ্ধ দুইজনে গোলমাল পাকিয়ে ফেলছে, তাদের প্রাইভেট আস্তানার আড্ডার আসরে কে মুখ ঢেকে এলো।

মুখ ঢাকা মেয়েটা এগিয়ে আসলো।লুকানো গুটানো হাতটা বের করতেই জেনির দিকে তাক করে ধরলো! মুগ্ধ ঘটনাক্রমে হাই বেন্ঞ্চ থেকে নেমে দাড়িয়ে পড়েছে। জেনি তোতলিয়ে বলল-

–এএএই…মেমেয়ে, ককে তুতমি….ছুছুড়ি নননামাও ববলছি…

ছুড়ি হাতে মেয়েটা এক কদম এগোলো, জেনির অবস্থা ছুড়ি দেখেই কাপাকাপি। এখনি বুঝি জেনিকে ছুড়িকাঘাত করে ছাড়ে!! মুগ্ধ জেনির কাছে যেতে নিলে মেয়েটা তাকেও ছুড়ি তাক করে থামতে বলল!

–নো মিস্টার! ডোন্ট ডু! ওর দিকে এক পা এগোতে গেলে ছুড়ি বসিয়ে গা ছিদ্র করে দিব! জায়গা মতো থাক্! আর তুই? (জেনির দিকে তাকিয়ে)তুই আমার দিকে তাকা! এক্ষুনি কানে হাত দিয়ে রুম থেকে পালা! নইলে তোর চামড়া ছিড়ে কুত্তাকে খাইয়ে দিবো! এক……দুই…….ততি

‘তিন’ বলার আগেই জেনি ভোদৌড়! ওকে আর পায় কে! মেয়েটা ছুড়ির তাক নামিয়ে নিল। পাকরাও করলো মুগ্ধের চারিদিকে ঘুরঘুর করে। মুগ্ধ ভ্রু কুচকে গম্ভীর হয়ে আছে।

–হেই ইউ!
–স্টপ! নট ইউ! নাম আছে আমার! শুনছিস! ইউ মিউ করবিনা!
–ওয়াও ! ‘তুই’ ? মাথা ঠিক আছে?
–তুই আমার কোন অগাধ জলের পানি রে তোকে ‘তুই’ বলে ডাকা যাবে না! তোর মতো বান্ডুল্লা বিলাতি কুত্তাকে ‘তুই’ ছাড়া আমার মুখে ভাষা আসে না বুঝছিস!
–একবার জাস্ট ফেসটা দেখি! বায় গড ! নাম ঠিকানা কোথায় ভেনিশ করবো! নিজেও জানবে না! তুমি মেবি ভুলে গেছো কার সামনে দাড়িয়ে হুমকি দিচ্ছো!
–তুই একটা জাওড়া! বিলাতি কুত্তা শয়তান বজ্জাত! র‍্যাগিংয়ের নামে তুই আমাদের সাথে অন্যায় অত্যাচার করবি! আর আমরা দিনের পর দিন চুপ মেরে তামাশা দেখবো! কি ভাবছিস! ফাজলামির দ্বারপ্রান্তে তোদের কেউ সাইজ করবে না? তুই আমার স্টুডেন্টশিপ খাইছিস! ছাড় দিবো? জুতা দিবো!

মুগ্ধ সুযোগ বুঝে দিলো এক টান! ওড়না মুখ থেকে সরে বাধন খুলে বেরিয়ে আসলো মেয়েটার চেহারা। মুগ্ধ থ হয়ে গেছে। ওরই মাথা ফাটানো মেয়েটা ফের হমকির দরজা খুলেছে।

— তুমি !

মম চুলের এলোমেলো ভাব ঠিক করতে লাগলো যেটা মুগ্ধের ওড়না টান দেওয়ার ফলে নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। ছুড়ির মোটা হ্যান্ডেলটা মুখে আকড়ে চুলের খোপা করতে লাগল সে। কোনো কারন ছাড়াই বাকা হাসলো মুগ্ধ। অপলক চাহনিতে হাসছে সে। বিষয়টা দেখেই খোপা পেচানো থমকে গেল মমর, কপাল কুচকে ছুড়ির হ্যান্ডেল মুখে নিয়ে চোখ নাচিয়ে মুগ্ধকে ইশারা বোঝালো- ”কি হয়েছে তাকিয়ে কেন?”
মুগ্ধের ধ্যান ভাঙতেই সে মাথা নাড়াচাড়া দিয়ে চোখ নামিয়ে ফেলল। মনে মনে বলল,

–ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম? হোয়াট? তাকিয়ে স্মাইল দিচ্ছিলাম? হাও শেম মুগ্ধ! শেম অন ইউ!

মাথায় খোপা পেচিয়ে মুখ থেকে ছুড়ি নিয়ে হাতের পাচ আঙ্গুলে ধরলো মম,

–ওই তাকা এদিকে ! তাকা বলছি! তুই ডিসেন্ট ছেলের মতো হেড স্যার আসাদ জামানকে বলবি আমার টিসি ক্যানসেল করতে! না করলে এই ছুড়ি দেখছিস না? ক্যাচ করে ঢুকিয়ে মাংস খুবলে দিবো! কাল সকাল পযর্ন্ত টাইম দিলাম! টাস্ক যেন হয়ে যায়। তোর সাঙ্গুদের বলিস আমার রাস্তা ছেড়ে কথা বলতে! নেক্সটে কোনো বলার অপশন দিবো না! ডিরেক্ট এ্যাকশন! ক্লিয়ার? বায় !

মম ঝাঝালো গলায় মুখবানী শুনিয়ে ছুড়িটা নিয়ে অভিনয় করে গলায় জবাই করার দৃশ্য বোঝালো, বলল- “বুঝছিস তো? জবাই করে গলা কেটে দিবো! মাথায় থাকে যেন”

হেনতেন দলের র‍্যাগিং লিডারকে থ্রেড দিয়ে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলাম। সেকেন্ড ফ্লোরের তিনটা ক্লাস পেরিয়ে যেতেই চোখে পড়লো হেনতেন দলের চ্যাংড়া চ্যালাগুলো হন্তদন্তে এগিয়ে আসছে। আমাকে দেখেই যার যার স্ব স্থানে ফ্রিজড হয়ে দাড়ালো। রামিম হা হয়ে তন্ময়কে কনুই গুতিয়ে কিছু একটা সায় বোঝালো। বাট আমি আমার মতোই ওদের সাইডে ফেলে চলে আসি।

সন্ধ্যা ছয়টা। ছোট বদমাইশের সাথে ফোনের এ্যাপসে লুডু খেলছি। আম্মু আমার সাথে সকাল থেকে কথা বলা বন্ধ করে রেখেছেন। কারন, ওই জামার নোংরা আর চুলের এক তালু পরিমান সাথে না থাকা। চুলের যত্ন আমার চেয়ে বেশি আম্মু পরিচর্যা করেন। বড্ড শোকাহত আম্মু!! ফোনের এ্যাপসে লুডু খেললে মজা একটাই ধুমধারাক্কা পাকা গুটি খাওয়া যায়। বর্তমানে ছোট ভাইয়ের সাথে সেটাই চলতেছে। ওর পাকা গুটি খাবো ওমনেই ইসরাতের কল। কেটে দিলাম। আঙুল ফুটিয়ে আবার পাকা গুটির খাওয়ার জন্য রেডি হলাম কলের সাগর বানিয়ে দিচ্ছে ইসু(ইসরাত)! বিরক্তির শরবত গুলিয়ে ধরলাম কল-

–দোস্ত দোস্ত দোস্ত তুতুই বাসার নিচে নাম… তাড়াতাড়ি নিচে নাম দেরি করিস না দোস্ত….জীবন মরনের সওয়াল দোস্ত…..নিচে নাম….ও বরবাদ করে দিবো দোস্ত….নিচে নাম প্লিজ

-চলবে

-Fabiyah Momo

তুমিময় প্রেম
PART 04
FABIYAH MOMO

–দোস্ত দোস্ত দোস্ত তুতুই বাসার নিচে নাম তাড়াতাড়ি নিচে নাম দেরি করিস না দোস্ত….জীবন মরনের সওয়াল দোস্ত…..নিচে নাম….ও বরবাদ করে দিবো দোস্ত….নিচে নাম প্লিজ!!

একটুও সুযোগ পেলাম না আমি কলের বিপরীতে ইসুকে বলবো, “কি হয়েছে?”। ও কেটে দিলো। ছোট ভাই আমার সন্দেহের নজরে ছোট চোখে ঘটনা বুলাচ্ছে। আমি ওর মাথায় চাট্টি মেরে বললাম,

–কিরে শয়তান! তোর পড়া নাই! লেখা নাই! কেমনে তুই লুডুর জন্যে হন্য হয়ে আছিস!যা পড়তে বস যা!

মাথায় থাবড়া খেয়ে ঠোট ফুলিয়ে ও চলে গেল, দরজায় তাকিয়ে আমদানি দুশমনের মতো খাজুরা কি কি বললো ও-ই জানে। আমি গলার ওড়না টেনে মাথায় ঘোমটা দিলাম। আম্মুকে শুনিয়ে জোরে বললাম,
–ইসরাত নিচে ট্যামলা(টমি) কুত্তার দৌড়ানি খাইছে, আমি ছাড়িয়ে নিয়ে আসতেছি। বাসার কেউ যেন আমার তলব না বসায়।

জুতা পড়ে নিচে গেলে ইসরাত আমাকে টেনে ধরে বাসার গলির রাস্তায় এনে দাড় করায়। আঙ্গুল উঠিয়ে রাস্তার ওপাশে থামানো কালো গাড়িটায় দেখায়। ওই বিলাতি কুত্তা চ্যাংড়া শয়তান গাড়ির দরজায় পিঠ লাগিয়ে হাত ভাজে দাড়িয়ে আছে। ডেকির উপর নাসিফ বসে সিগারেটে মধ্যে টানের পর টান ফুকছে। রামিম সুপারম্যানের মতো কোমরে হাত দিয়ে কামলার মতো দাড়িয়ে আছে। পুরাই একখান কামলা! ইসরাতের কবজি ধরে খামচি মেরে বলি,

–খাচ্চর মহিলা! এই সন্ধ্যায় আমাকে চামার,কামার, চ্যাংড়া দেখানোর জন্য নিচে ডাকছিস! তুই জানিস আমার কত্ত স্বাদের পাকা গুটিটা খেতে নিছিলাম! ফালতু বেডি!

ইসরাত “আহ্ মম ছাড়” বলে হাত সরিয়ে নিল,

–তুই চোখ মেলে দেখছিস তোর বাপ এসে দাড়ায়া আছে! তোর বাসায় যদি একটাও পৌছায় কি সর্বনাশ ঘটবো, জানোস!

মেজাজটা খারাপ হয়ে গেলো! ওরা আমার বাপ! আরে চাক্কু একটা এইদিক দিয়া ঢুকালে ওইদিক দিয়া শেষ, আমাকে বুঝায় বাপ! রামিম দ্যা সুইপারম্যান! থুক্কু! আপনারা আবার থুতু ফেলবেন না!! আমি থুক্কু বলছি! দ্যা সুপারম্যান রামিম রাস্তার ওপার থেকে বলে উঠলো,

–এই মম এইদিকে তাকাও!
–ওই শালা তুই কারে মম ডাকোস! আপু ডাক আপু! “তুই” ডাকবি এক্কেবারে তোর গোষ্ঠী-গ্যারাজের নাম ভুলায়া রাস্তায় সাপ্লাই দিবো!
–আপা একটু তাকাবেন, আমরা আপনাকে ভয় দেখাতে আসছি,

ইসরাত রামিমের কথায় আমার পিছু যেয়ে লুকালো, ভীতু বনে বলে উঠলো-

–দোস্ত, দোস্ত, দোস্ত….কত ডেন্জারাস দেখছিস….প্লিজ ওদের কাছে মাফ চা দোস্ত…আমায় ভয় করতেছে মম, ওরা ভালো না,

যা বাবা! কার কথায় ডরায় কে? আমি এইগুলাকে জুতাপেটা করে বিদায় করতাম, ইসরাত দেখি ভয়ে পুরো পানি পানি।
–ওই হারামজাদা! তুই আমাকে তুলবি! পারলে আয় না! আয়! দেখি তোর বুকের পাঠা কতো!
–আপা আপনাকে রিসপেক্ট করে আসতে বলছি আপনি বোধহয় নিতে পারলেন না। আমরা কিন্তু কাউন্টিং করবো,…এক…
–তুই “দুই” টা খালি বলোস না দেখ আমি কি করি!! বল বল বল….কিরে বলা বন্ধ হলো কেন, ওই চামার বলোস না কেন!

ওই বিলাতি কুত্তা মুগ্ধ, রামিমের কানে কানে কি যেনো বলল। নাসিফ সিগারেটে আরেকটান দিয়ে অবশিষ্ট জলন্ত অংশটুকু ফেলে দিল। রামিম দেখি রাস্তার ওপার থেকে এপার আসার জন্য পা বাড়িয়েছে! আমিও পায়ের জুতা খুলে দেই ফিক্কে, “ধরাস” করে রামিমের গালে লেগে জুতা ওইটা পড়লো মাটিতে। রামিম “ও মাগো” বলে এক চিৎকার দিলো!! এদিকে ইসরাত “দোস্ত” বলে আমার দিকে তাকালো! ইসরাত আমার ডানপাশটায় আমার হাত ঝাকিয়ে বলল,

–তুই এইটা কি করলি! জুতা মারলি! ওই জুতা ফিরে পাবি! কি করলি….ওদের তো রাগের গন্ডি পেরিয়ে যাবে!
–আরে চিল মার! বাথরুমের স্যান্ডেল ওইটা। আমার রুমে বাথরুমে যাওয়ার আগে পড়ি, দাম বিশ টাকা। তাও নানির ইউজ করা অর্ধ ক্ষয় মারা মাল। যাহ্ জুতাটা আজকে মনিবের কাজে দিলো।

ইসরাত হ্যাবলা থেকে একটু পর হো হো করে হেসে দিলো, লুটিয়ে লুটিয়ে হাসি। ছেলে হলে মেবি লুঙ্গি উঠিয়ে হাসির নাচুনি দিতো!!বাট বেচারি মেয়ে এজন্য ঢঙ করে ন্যাকান্যাকা সুরে হাসি দিল। রামিম গালে জুতার বারি খেয়ে গাল ধরে “মুগ্ধ” না কি ওর কাছে গেল। নাসিফ-ও ডেকি থেকে নেমে গোল করে মিটিং বসালো। মুগ্ধের পুরো দৃষ্টি আমার দিকে, ওইযে একভাবে হাতভাজ করে দাড়িয়ে আছে এখনো ওভাবেই স্থির। পাশ থেকে রামিম ও নাসিফ নানা কথার ঝুড়ি বসালো, এরপর যার যার মতো একপলক আমার দিকে তাকিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। মুগ্ধ ড্রাইভিং সিটে বসে সিটবেল্ট লাগিয়ে জানালার কাচ সম্পূর্ণ নামিয়ে দিল। ড্রাইভিং হুইলে দুইহাত রেখে জানালা দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল। এখনো তাকিয়ে আছে, চোখের তাপমাত্রা মাপার যন্ত্র থাকলে ডিগ্রি উঠতো ১০৫° তাপমাত্রা। চোখ থেকে আগুনের তীক্ষ্মতর দৃষ্টি ঝড়ছে, “চোখ দিয়ে গিলে খাওয়া” কথাটা সত্যি সত্যি বাস্তব হলে এই বেটা মেবি প্রয়োগ করতো!

ইসরাতকে নিয়ে আমি বাসায় চলে আসলাম। আম্মু ড্রয়িং রুমে সোফায় বসে ছোট বদমাইশকে পড়া রেডি করে দিচ্ছে। ইসরাতকে দেখে আম্মু বলে উঠলো,
–ইসরাত, এখনো টমির ভয় পেলে চলবে? ও তো কিছুই করেনা, অতিথি আসতে দেখলে এই খালি ভেউ ভেউ করে আমাদের সংকেত পাঠিয়ে দেয়।
ইসরাত জুতা খুলে ভেতরে ঢুকে সোফায় যেয়ে বসলো। কপালে জমা ঘামের কনা ওড়না দিয়ে মুছে বলল,
–আন্টি আর বলবেন না, আপনাদের বাসার নিচে টমির লয়েলিটি দেখে আমারই অন্তর কাপিয়ে ছাড়ে….আমাকে এখনো চিনলো না।

আমি একপায়ের জুতা খুলে ভেতরে যেতে নিলে আম্মু পেছন থেকে ডেকে থামালো,
–দাড়া!
–কিছু বলবা?
–আরেক জুতা কই? এক জুতা কেন ওখানে?
–আম্মু রাস্তার মোড়ে কালাচান আছে না? ওই কালাচান জুতা নিয়ে দৌড়ে পালিয়েছে বুঝছো? আমি অনেক খুজছি পাইনি, এজন্য স্মৃতি হিসেবে এটাও নিয়ে আসছি।
–কালাচান কি ওই যে তিয়াশাদের বাসার কুকুর? আজকেও ধাওয়া দিলো?
–মনটা চাইছিলো কি জানো! এই জুতাটা ওর উপর ছুড়ে দিয়ে আসি। কিন্তু আমার মন ভালো, ওই কুত্তার মতো খারাপ না। তাই কিছু করিনি চলে আসছি।

আম্মু কিছু বলল না, আমি ইসরাতকে আমার রুমে আসতে বলে বিছানায় যেয়ে বসলাম। ও পিছু এসে আমার বিপরীতে এসে বসলো,

–দোস্ত ওরা কিন্তু গেছে ঠিকই কাল দেখিস আবার আসবো। আচ্ছা তুই ওদের করছিস টা কি? এমন পিছনে কাঠালের আঠার মতো লেগে আছে কেন?
–ওই হিস্টোরি তোকে বলার টাইম পাইনি, শোন তাহলে……ওই লিডারের মাথায় ব্যান্ডেজ দেখছিস না? কিভাবে ব্যান্ডেজ আসছে জানিস?
–শুনলাম তো তুই যেয়ে ফাটায়া দিয়ে আসছিস!
–তাহলে তো ঘটনা জানিসই!! ওই লিডারের বাচ্চায় ভার্সিটির হেড স্যারকে বলে আমার রাস্টিগেট নোটিশ পাঠাইছে। আর তুই তো জানিস ভালো, আমার জিনিসে কেউ বা-হাত ঢুকাইলে ওই বান্দা শেষষ! আমি জাস্ট টোকা দিতে ওই লিডারের কাছে গেছিলাম আরকি…
–সর্বনাশ! তুই কি থাবড়া দিয়ে আসছিস আবার?
–আরে ধুর! থাপ্পর কেন দিবো? আম্মুর সবজি কাটার ভোঁতা ছুড়ি দিয়ে ভয় দেখিয়ে আসছি। আর কিছু না। তুই দেখ, আমার চুলগুলিকে কেমনে কাটছে! আম্মু কথা বলা অফ করে দিছে। আমার মায়ের শখের চুল….

ইসরাত এবং আমি সারারাত হরর মুভি দেখার জন্য আমার বাসায় ব্যবস্থা করেছি। “The Nun” মুভি। আব্বু ফুপির বাসায় গিয়েছে কাজে, কাল সকাল অবধি ফিরবেন। আম্মু ছোটকে নিয়ে উনার রুমে ঘোড়া বেচে ঘুম। এক মগ পানি ঢাললেও আম্মুর ঘুম সজাগ হবেনা। দুইজনে রুম অন্ধকার করে মোবাইল নিয়ে বিছানায় শুয়ে দেখছি। ইসরাত ভয়ে ওয়াশরুমে যাওয়ার বায়না ধরে পেট চেপে বসে আছে, কারন, আমি এখন মুভি দেখবো। ওয়াশরুমে যেয়ে তথাকথিত দ্যা নান মুভির ভূত এসে ইসুকে খেয়ে ফেলবে বলে আমি আর পাহাড়া দিতে পারবো না। ইসরাত কাতরানো সুরে বলে উঠলো,

–তোর পায়ে ধরি মম, আমার সাথে ওয়াশরুমে আয়…আমার একলা যেতে ভয় করতেছে….আজকে কিন্তু অমাবস্যার রাত…
–চটকনা খাবি ইসরাত! যা বলছি! বাচ্চাদের মতো টুকুটুকু করা লাগবে না। ভূত বলতে কিছু নেই, জাস্ট ইমেজিনেশন! ভূত নেই! গো স্টুপিড ফুল!
–প্লিজ…
–নো! নো মিনস নো!
–দেখিস তোর জামাই শান্তি পাইবো না!! তোর জামাই একটা ভূতের কেদানি হইবো! ভূত!
— হ হ যা….ভূত হইলেই জামাইর সাথে ভূত-ভূত খেলবো! কুত্তার মুখে গরুর ডাক মানায় না। যা ফট!

ইসরাত বিছানা থেকে নামার মধ্যেই একশোবার আমার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো। আমি তো একবাক্যে অটল! না করেছি মানে না- ই। ও চলে গেল। রুম অন্ধকার, পুরো বাসা অন্ধকার, আম্মুও দরজা দিয়ে ঘুমিয়ে আছে, ইসরাত ওর ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে ওয়াশরুমে গিয়েছে, ওকে লাইট জ্বালাতে বারন করেছি। জাস্ট ওয়াশরুমের লাইট জ্বালাতে বলে দিয়েছি। মুভি দেখতে দেখতে পুরো দুই-ঘন্টা পারলাম কিন্তু ইসরাত আর আসলো না। আমি খেয়ালই করিনি ইসরাত এখনো রুমে ফিরেনি। রাতের আকাশে চাদ নেই, বিদঘুটে কালো অন্ধকার। আমি ফোনের ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালিয়ে রুমের সুইচে লাইট জ্বালানোর জন্য ক্লিক করেছি। “অন” জায়গায় সুইচ টিপছি সুইচের অনে লাইট জ্বলছে না! কি আশ্চর্য! পরশুই আব্বু নতুন লাইট লাগিয়ে দিয়েছে, আজই ফিউজ হলো? কয়েকবার “টুসটুস” করেও ফলাফল হলো না। জ্বললই না লাইট। আমি ফ্ল্যাশলাইট নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে গেলাম ইসরাতকে দেখতে।

আমি চোখের সামনে যে দৃশ্য দেখলাম তাতে মোবাইলের হাত কাপতে কাপতে যুদ্ধ করলো। হাত পা ঠান্ডা হয়ে জমে আসছিলো…..

-চলবে

-Fabiyah Momo

তুমিময় প্রেম
PART 05
FABIYAH MOMO

আমি চোখের সামনে যে দৃশ্য দেখলাম তাতে মোবাইলের হাত কাপতে কাপতে যুদ্ধ শুরু করলো। হাত পা ঠান্ডা হয়ে জমে আসছিলো….

মম লোমহর্ষক ভয়ংকর চাহনিতে তাকিয়ে আছে, তার চোখের কালোমনিতে বিশাল বিশাল ভয়ের স্তুপ। ভয়ের স্তুপে কতখানি ডুবে গিয়েছিলো সেটা কেবল মনই জানে। ইসরাত ওয়াশরুমের দরজা খুলে মুখে হাত চেপে অশরীরী ভর করার মতো চুল ছেড়ে দাড়িয়ে আছে, মনে হচ্ছে নিশ্চুপে সে অনেকক্ষন ধস্তাধস্তি করেছে, চুল ফুলে পাখির বাসা হয়ে গেছে, এখন একটা কাক এসে ডিম পারলেই চলবে, ইসরাতের চুলের বাসায় কাকের সংসারকাহন শুরু। মাঝেসাজে কোকিলও বাসা খোজার তাগিদে কাকের বাসা হিসেবে ইসরাতে চুলের ফুলঝুড়িতে ডিম ছেড়ে যাবে। ইসরাত বালতির ভেতরে ছোটবাচ্চার গোসলের মতো তিরিংবিরিং পানি ছুড়ো খেলার মতো দুইপা ঢুকিয়ে দাড়িয়ে আছে। সার্কাস হলে হাসির একটা রোল পড়ে যেত। ওয়াশরুমের দরজার কাছে সাদা টাইলসের উপর তিনটা গুটি পাকানো তেলাপোকা ছিনিমিনি খেলছে, দেখতে খেজুরের কোয়া লাগলেও, কঠিন খোলসে পারা দিলে বুঝবেন ভাই “ইহা প্রতিটি মেয়ের হৃদয় কাপানো হৃদস্পন্দনের ঝাকুনি, নাম “তেলাপোকা শুদ্ধ বুলিতে তেইল্লাচোরা, মহা বিশুদ্ধ বুলিতে “ও মাগো” ডাকের গগনবিদারী চিৎকার। আপনি কোন্ ডাকে সাড়া দেন উহা না হাসিয়া বলিয়া দিয়েন!!

আমি মোবাইলে চুমা মারলাম! আরে ভাই! ইসরাত নামক ভীতুর ডিমকে “উড়ন্ত তেলাপোকার” নাকের তল দিয়ে নিয়ে আসা কি যুদ্ধের মতো কঠিন না?? সহজ? বহুত কঠিন ভাই! বহুত কঠিন!! শলার ঝাড়ু নিলাম। এক বারি দিয়ে ওর বাপের নাম উল্টিয়ে চোরাতেইল্লা বানিয়ে দেয়া ব্যাপক দরকার! রান্নাঘর থেকে ঝাড়ু এনে ‘ঝাপ’ করে মেরে দেই এক ঝটকা! গেম ফিনিশ! হি হা হা! তেলাপোকা ইজ গন! ইসরাত বালতি থেকে বেরিয়ে এসে আমায় জাপটে ধরল। বেচারী কতক্ষণ ধরে ভয় চেপে কলিজা শুকিয়ে বালতিতে দাড়িয়ে আছে কে জানে? মায়ের জন্ম দেয়া নবজাতক বাচ্চাটা ‘ওয়া ওয়া’ করার আগে চুপ করানোর জন্য যে থেরাপি দেয় আমিও ওমন করে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে আহ্লাদী গলায় বললাম-

–ওলেলে ছোট্ট কুট্টো বাচ্চা টা, কাদে না…না কাদে না…ভাউ তাড়িয়ে দিছি, ভাউ চলে গেছে…

ইসরাত বেকে বসল আমার কথায়! আমাকে ছেড়ে দিল। ঝাঝালো গলায় বলল-

— কুটনী ! কথা বলতে আসবি না! তোর উপর ছাই পড়বো দেখিস!! আমি কেমন ভয় পাইছি!! খোদা!

.
.

সকালে দুজন একসাথে রেডি হচ্ছি ভার্সিটি যাবো। আম্মু নাস্তা দিয়ে গেছেন, ও পরোটা ঘুরিয়ে কামড়ে কামড়ে খাচ্ছে। আমি চুল আচড়াচ্ছি। গায়ে নীল কুর্তি, কালো ওড়না, কালো পায়জামা। চুলে খোপা করে কানের সাইডে ছোট চুল গুলো ক্লিপে আটকে নিচ্ছি। ঠোটে গোলাপী লিপবাম দিব, মনিরা বলল-

–তুই খাবি না? তোর পরোটা আমি খাই? ক্ষিদা লাগছে!
–তিনটা পরোটা খাওয়ার পর আমার পরোটা খেয়ে যদি তোর তৃপ্তি লাগে..তুই মুখে ঢুকা!
–কথাটা ভালোভাবে বললে তোর কিছু ক্ষয় হতো মম? রিডিকিলাস!
–ফাইন!

লিপবাম দিয়ে ঠোটজোড়া ঘষছি, যেন সবখানে লিপবাম সেট হয়ে যায়। ইসরাত ভুখা বিড়ালের মতো দুই গাল ফুলিয়ে পরোটা খেয়ে নিচ্ছে। আমি পিঠে ব্যাগপ্যাকটা নিয়ে দৌড়! ইসরাত পানিটুকু নাকি মুখে তুলে কাশতে কাশতে ছুট। রাস্তায় রিকশা নিয়ে জ্যামে পড়ে আছি। ক্যাম্পাসে নিউ নিউ লেট করে গেলে রুগ্ধ স্যার নারাজ হবেন প্লাস লেকচার মিস হয়ে যাবে! ইট উইল বি হ্যাল! ইসরাত ফোনে বফের সাথে খাজুরা আলাপ করছে, বিষয়টা উদ্ভট! বেস্টফ্রেন্ড পাশে থাকলে বয়ফ্রেন্ড আনা যায় না – এই নীতিটা থার্ড ক্লাস মাইয়ার ঘিলুতে ঢোকাতে পারিনি! যেই জায়গার সাদিকের সাথে ওর রিলেশনশিপের দুই বছর ওভার! যত্তসব। রিকশার হুট নামিয়ে বসলাম। সামনে – পিছনে শতশত গাড়ি রিকশা যানবাহন আটকে। এর মধ্যে “প্যা পু” করে হর্ণ বাজিয়েই যাচ্ছে। অসহ্যকর তো! এমনেই বিডি’র ট্রাফিক জ্যামে মানুষ হার্ট আট্যাক করে! তার মধ্যে কোন্ চন্দ্রালোকের বাসিন্দা এসে জ্যাম টপকে উড়াল দেওয়ার চিন্তা করছে দেখা দরকার !!মাথা ঘুরিয়ে তাকালাম। হর্ণটা যেন আমার জন্যই বাজাচ্ছিলো, আমি তাকাতেই বন্ধ। হাতের তুড়ি বাজিয়ে কপালকুচকে ইশারা করলাম,

–কি হ্যা?? হর্ণ কেন?

কটকটে গাঢ় নীল রঙের গাড়ি। একটা সিএনজির পরেই গাড়িটা থামানো। হর্ণ দিচ্ছে। ইসরাতের দিকে কড়া করে তাকালাম। ও বজ্জাত বফের সঙ্গে কথা বলতে খুব ব্যস্ত। থার্ড ক্লাস! হাতের ঘড়িতে সময় দেখছি আবার হর্ণ দিচ্ছে! রাগে জিদে ব্যাগটা ইসরাতের কোলে দিয়ে রিকশা থেকে নেমে পড়লাম। কুর্তির হাতাটা ঠিক করে হাতের ঘড়িটা কবজি থেকে উপড়ে উঠিয়ে নিলাম। ঠাসঠুস থাপ্পর দিতে ঘড়ির কোনো সমস্যা না হয় সেদিকটা বিবেচনায় রাখতে হবে নইলে বাসায় বিপদ! গাড়ির জানালার কাচে নক করলাম। জানালার কাচ নামালো। আমি তার চেহারাটা দেখে মনে করার চেষ্টা করছি, কোথায় দেখেছি!!

–এই যে হ্যালো! আমি কি আপনাকে চিনি? চেহারা তো চেনাচেনা লাগছে! ফরগেট ইট! জ্যামের মধ্যে বেহুদা হর্ণ কেন বাজাচ্ছেন! জানেননা বিনা কারনে হর্ণ বাজানো ক্রাইম!

চোখে কালো সানগ্লাস আটা। গায়ে সাদা শার্ট। দেখে মনে হচ্ছে কোথাও দেখেছি। বাট মেমোরি লুজের কারনে মনে করতে পারছিনা। সে চশমাটা খুলল, আমাকে উদ্দেশ্য করে হাসি টেনে বলল,
–নাও দেখোতো চিনো কিনা???
–বিলাতি কুত্তার চামচা না? মুগ্ধের লেজ ধরে ধরে ঘুরে যে!
–হাও লেম ইন্ট্রোডাকশন? আমি মুগ্ধের…. কি কি যেন বললে?
–চামচা, লেজ,
–হ্যা হ্যা ওটাই। আমি মুগ্ধের চামচা না! আমরা সবাই সবার লিডার। নট অনলি মুগ্ধ।
–তুই তো শালা…সরি সরি তুমি তো ওই মুগ্ধের আগেপিছে ঘুরো। তাই ভাবলাম আর কি। যাইহোক! রাস্তায় বিনা কারনে হর্ণ বাজাবা না। না মানলে! নেক্সট গাড়ি তোমার ভাঙ্গবো।

থ্রেড, চ্যালেঞ্জ- যেটাই ভাবুক আমি আমার কথা পেশ করেছি। এখন সেটা রাখবে কিনা, হি নোউস বেস্ট! আমি পিছু ফিরে তাকাইনি শুধু কানে আসলো, “ফায়ার!”, কমপ্লিমেন্ট ওই চামচা করেছে জানি, ঠাটিয়ে কিছু করার সুযোগ পাইনি। জ্যাম ছেড়ে দিয়েছে রিকশা টানবে আমাদের, আমি আর রাস্তার মধ্যে সিনক্রিয়েট করিনি। এমনেই দুটো কথা শোনানোর সময় বাংলাদেশের মানুষ যেভাবে ড্যাবড্যাব করে তাকাতে পারে ওভাবেই তাকিয়ে ছিলো। বিরক্তিকর!

ফাষ্ট ক্লাস ড্রপ। লেট হওয়ার কারনে রুগ্ধ স্যারের ক্লাস করতে পারিনি। এখন আড্ডাখানার নজরুল চত্বরে বসে পা ঝুলিয়ে বসে আছি। ইসরাত ফোনে চ্যাটিং। আমি কেমিষ্ট্রির নতুন বইয়ের ঘ্রাণ নিতে চোখ মেলে ডুবে আছি। ইসরাত বলে উঠল-
–দোস্ত! আমরা ভার্সিটিতে পড়তেছি। তুই ভাবতে পারছিস! ভার্সিটি!! এখনো চুটিয়ে প্রেম করিনি।

বইটা ধুপ করে বন্ধ করলাম। ও অলরেডি দুই ইয়ারের রিলেশিপে ঝাক্কাস টাইম স্পেন্ড করছে এখন ভার্সিটি এসে আরো প্রেম প্রেম শুরু! বইটা কোলে রেখে চোখ তীক্ষ্ম করে বললাম-

–একটু আগে কোন গুনের বচন বললা বনু? উপকার করো তো শুনিয়ে!
–ওওওইততো পপ্রেম..
–তাতাতা তোতলামি অফ করো! আর ভালো বাচ্চার মতো ঠনঠন করে বলো!
–ওই ছেড়ি! ডর লাগে তো! এমনে কথা বলস কেন!
–চামড়া তুলে লবন ঘষে দিবো! ভার্সিটি তুমি প্রেমগাথা মনে করছো? আব্বু-আম্মু আমাদের কষ্ট করে টাকা খরচ করে প্রেম শিখাতে পাঠায়!
–ফিলোসফি শুরু করলি কেন? নরমাল একটা কথা বলছি তুই নীতিনিষ্ঠ পেচাল পারছিস!
–শোন! ওইযে নোটিশ বোর্ডটা দেখছোস না? ওইযে বোর্ডটা! ওইখানে টপার লিস্টে যেই পযর্ন্ত আমার নাম না থাকবো , আমি ওই পযর্ন্ত প্রেম সম্পর্কে জড়াবো না! ইটস হারাম! নো লাভ! নো পাপ!
–এই যুগে আইসা তুই হারাম-হালাল বলছিস? লাইক সিরিয়াসলি?
–ইয়েস ওভিয়েসলি! আমি প্রেম-ট্রেম করার জন্য ভার্সিটি আসিনাই। টপার লিস্টে ফাস্ট নাম আমি উঠাবো দ্যাটস ফাইনাল!
–আরে ওরে সাব্বাশ! ঠুকো তালি!!

ইসরাত কথা শুনে হাততালি দিতে থাকলে কেউ সমান তালে ওর তালির ছন্দ ধরে জোরালো শব্দ করে। মনে হচ্ছে একের অধিক মানুষ মিলে হাততালি দিচ্ছে। চত্বরের পিছন দিকে দুজনে ঘুরে তাকালে দেখি কুখ্যাত হান্টার’স গ্যাং তালি দিচ্ছে। দ্রুত চত্বরের সিড়ি থেকে নেমে কপাল কুচকে তাকাই। ওরা ঢুলে ঢুলে এগিয়ে আসছে। জেনি এসেই বলল,
–ওহ্ মাই মাই!! পবিত্র পিউর ভার্জিন মেয়ে দেখছি! উপসসস!

চটাস করে আমি পাল্টা জবাব দেই-
–তোর মতো না হোটেলে শরীর দেখিয়ে প্রেমের প্রমান দিতে যাবো!!তুই নিজে কি সেটা চিন্তা কর।
–ডোন্ট ইউ ডেয়ার টু কল মি “তুই” স্টুপিড খালাম্মা টাইপ গার্ল!
–খালাম্মা দিয়ে সংসার টিকে। তোদের মতো দু চারটা বিয়ে নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না! একটাই বিয়ে করি, একটাতেই থাকি।
–ওহ্ রিয়েলি? টাইম উইল সে!বায় দ্যা ওয়ে, সে “সরি”। স্পেশালি মুগ্ধ।
–কেন রে বেশশরম! তুই পোলা? পোলার মতো ভাব দেখাস কেন! ছেড়া জিন্স, পায়ে স্নিকার সুজ পড়লেই তুই ছেলে হবি ভাবিসও না! এটিটিউড তো দূরেই রাখ।
–ইয়াক! কি ভাষা। মুগ্ধ? মেয়েটাকে হোস্টেলের রুমে শক থেরাপি দিবো? মাথায় কারেন্ট দিলে কেমন হয়?

মুগ্ধ স্ট্রেট ফর্মাল ইগোওটিক ভঙ্গিতে দাড়িয়ে আছে। মাথায় এখনো ব্যান্ডেজ। কি যে খুশি খুশি লাগতাছে!! মাথাটা তাহলে ভালোই বাজিয়ে মেরেছি!! এর মধ্যে তন্ময় সানগ্লাস মাথায় পকেটে হাত ঢুকিয়ে বলে উঠলো-

–জেনি বিনা কারনেই রাগ হচ্ছো। রাগারাগী একটু স্লো করো তো। তোমার ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন অবনরমাল দেখায়।

জেনি তন্ময়ের কথায় হা করে অপ্রস্তুত হয়ে যায়। নিজেদের গ্যাং মেম্বার বাইরের মেয়ের সামনে গায়ে লাগানো কথা শোনাবে ভাবাটা মুশকিল!! মুগ্ধের কাধে হাত রেখে জেনি বলল,

–তুমি কিছু বলবে প্লিজ? এনি ওয়ান ইন দ্যা ক্যাম্পাস ইজ জাস্ট ইনসাল্টিং মি।

মুগ্ধ হাত মুঠোতে কেশে নিলো। গলা ঠিক করে বলল,
–জেনি?
আহ্লাদী ন্যাকান্যাকা করে জেনি বলল,
–ই..য়ে…স
–কাল কি যেন বলেছিলাম তুমি ভুলে গেছো। ডোন্ট ওরি, মনে করিয়ে দেই…মুখের ওয়ার্ডসে একটু চেক করে নিবে। ফিউচারে ট্রাবেল হবে।

জেনি কাচুমাচু করে মুখ থেতলে চুপ হয়ে গেল। নাসিফ সিগারেট টেনে ধোয়া ছেড়ে ফিসফিসিয়ে মুগ্ধের কানে কি যেন বলল, আমি শুনিনি। কথাটা কানে নিয়ে মুগ্ধ একটা বাকা হাসি দিল। নাসিফের পেটে একটা কিল মেরে কি যেন করতে ইশারায় বলল। ইসরাত আমার হাত টেনে ওখান থেকে নিয়ে যেতে নিলে পেছন থেকে বলল-

–এই শুনো! স্টপ যেও না।

আমি মাথা ঘুরিয়ে বইটা নিয়ে তাকালাম। মুগ্ধ কয়েক পা এগিয়ে আমার সামনে এসে দাড়ালো। চোখাচোখি নিশান। এসপার-ওসপার মামলা। এই ছেলে কিছু বললে ও করলে ডিরেক্ট ডিরেকশন চেন্জ করে ক্যাম্পাস টু হসপিটালের বাসিন্দা বানিয়ে দিব। ও বলল,
–তোমার রাস্টিগেট ক্যানসেল। ইউ ক্যান স্টে।

–ওহ্ ভালো। গুড গুড। ওয়েল ডান। ভবিষ্যতে এইভাবেই কথা মেনে চলবি। তাহলে আমি কিছু করবো না। আদারওয়াইজ, তোর গাড়ি উইথ মাথা হকিস্টিক দিয়ে মেরামত করে দিবো। (তুড়ি বাজিয়ে) ভুলিস না!

মুগ্ধের পেছন থেকে তন্ময় হুহা করে হেসে দিয়েছে অন্যদিকে সবার মুখ কালো। জেনি, রামিম, রিদিতার মুখ দেখে বোঝাই যাচ্ছে রাগে ফেটে চৌচির অবস্থা। মুগ্ধ ধারালো দৃষ্টিতে চোখ ছোট করলো এবং আমার উদ্দেশ্যে বলল,

–সিনিয়র! আ’ম ইউর ফোর ইয়ার সিনিয়র। সো ডোন্ট কল মি “তুই”!
–এ্যাহ্! সিনিয়র! তোকে সিনিয়র ভাববো আমার জুতা!

-চলবে

তুমিময় প্রেম
PART 06
FABIYAH MOMO

বিকেল চারটা। কড়া রোদের দাপুটে দেখিয়ে স্বর্নবর্নের প্রতিভা ফুটিয়ে পুরো আকাশ ছেয়ে আছে। ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা তুলোর পেজো পেজো মেঘ। ফোন নিয়ে জানালার পাশে বিছানায় বসে আছি। শরীরে ক্লান্তি ভর করেছে প্রচুর। এখন টিউশনিতে যেতে হবে আমার। সাড়ে চারটায় রওনা দিলে পাচঁটার আগেই ছাত্রের বাসায় পৌছাবো আমি। আম্মু ছোট ভাইকে নিয়ে মামার বাসায় গিয়েছে। তালা মেরে চাবি নিয়ে পাশের বাসার আন্টির কাছে দিয়ে আমিও বেরিয়ে পড়বো একটু পর। ঘড়িতে চারটা পাচঁ। মনের ক্লান্তি, শরীরের একঘেয়েমি নিয়েই রেডি হচ্ছি। গা এলিয়ে ঘুমাতে ইচ্ছে করছে। চোখ দুটোতে ঘুম। বেজায় ঘুম। ইচ্ছা বিরুদ্ধে দ্রুত নিজেকে সংযত করছি। আয়নার সামনে দাড়িয়ে নিজেকে নিয়ে মাতোয়ারা হওয়ার সময় নেই, এখন খুব করে জলদি জলদি বেরুতে হবে। রিকশা নিব না। নিলেই টাকা জমাতে পারবো না। আব্বুর ফোনটা নষ্ট।একটা ফোনের খুবই দরকার। মাথায় ঘোমটা টেনে ঘরের ইলেকট্রিসির লাইন সব চেক করে দরজায় তালা লাগিয়ে চাবিটা পাশের ফ্লাটে দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

রোদের তপ্তটা বেশি। কপাল ঘিমে কানের পাশ দিয়ে টপ টপ করে ঘামের বিন্দু কনা গড়িয়ে পড়ছে। পায়ে শক্তি কম। আস্তে আস্তে হাটছি। ব্যাগে দশ টাকার একটা নোট ছাড়া বেশি টাকা নিয়ে বের হইনি। আগে ভার্সিটি ছিলো না, যাওয়া-আসা নিয়ে শরীর ক্লান্ত হতো না। এখন আমার খাটাখাটনি করতে হবে বেশি। চওড়া রাস্তার ফুটপাত ধরে যাচ্ছি। রাস্তায় আজ মানুষ কম। চলাচলের গাড়িও কম। সম্ভবত গরমের জন্যে এমনটা হয়েছে। অলস জাতি বাড়ি বসে অলসতা যাপন করছে। খুব করে মনে হচ্ছিলো পেছন থেকে কেউ অনুসরন করছে। কিন্তু আমি ঘাড় বাকাইনি। আপনমনে নিজগতিতে হেটে চলছি।

–এই শুনো? একটু দাড়াবে?

আচমকা কারোর অনুনয় সুর শুনে হাটা থামালাম। কপালকুচকে চিন্তা করছি পিছনে কি তাকাবো? কে না কে ডাকছে তাকানো ঠিক হবে? না..থাক। একবার দেখে নেই। আমি কপালের কাছে ঘোমটা একটু টেনে নিলাম। পেছন ঘুরে দেখি তন্ময়। ক্যাম্পাসে যে পোশাকে দেখেছিলাম তা এখন ভিন্ন। গায়ে কালো টিশার্ট , জিন্স প্যান্ট পড়নে।

–তুমি আমাকে ডেকেছো? তুমি এখানে কি করে? তোমার বাসা না ধানমন্ডি?

তন্ময় আমার কথায় স্বাচ্ছন্দ্যসূচক হাসি দিলো।

–হ্যা ধানমন্ডি। তুমি কি করে জানো??
–আশ্চর্য! তোমাদের ব্যাপারে ফুল তথ্য পুরো ক্যাম্পাস জানে আর আমি সেটা জানবো না? জবাব দাও! তুমি আমার পেছনে কি করছো? মতলব কি তোমার? আমায় ফলো করছো নাতো?
–নো নো…ফলো করছি না। এইতো নারায়ণগঞ্জ শহরে ঘুরতে এলাম। তোমাদের শহর নিয়ে অনেক আর্টিকেল পড়েছি। দেখতে ইচ্ছে করলো, তাই চলে এলাম।
–আসছো ভালো কথা। আমার পেছনে কি!
–তোমার পেছনে কি হবে ? আমি ঘুরতে এসেছি আর দেখি তুমি এই কাঠফাটা রোদের মধ্যে হেটে হেটে যাচ্ছো।
–মানুষ তো হেটেই গন্তব্যে যায় তাইনা? আমিও হেটেই যাচ্ছি। আমায় ডাক দিবে না। আমি রাস্তায় অপরিচিত মানুষদের ডাকাডাকি পছন্দ করিনা। আল্লাহ হাফেজ।

তন্ময় কোন্ নেকি উদ্দেশ্য নিয়ে হঠাৎ করে নারায়ণগঞ্জ আসলো বুঝলাম না। ওর হুট করে আসাটা ভালো কিছুর পূর্বাভাস দেখাচ্ছে না। টানা পচিঁশ মিনিট পায়ে হেটে মেইন রোড ক্রস করে ছাত্রের বাসায় এসেছি। নাম জোবায়ের, অষ্টম শ্রেনীতে পড়ছে। মাথাভর্তি গোবর, পড়া বাদে সব কুটনামি ওর মাথায় ঢোকে। সপ্তাহে ছয়দিন পড়াই, বেতন দুইহাজার। আজ মাসিক বেতন দেওয়ার কথা, তিনমাসের ছয়হাজার টাকার বেতন আমার আটকে আছে। মুখ ফুটে বলতেও পারছিনা, আন্টি আমার বেতনের টাকাটা দরকার। আব্বুর স্যালারিতে সচ্ছল ভাবে কাটলেও আমার নিজের টাকায় শ্বাস নিতে বেশি শান্তি লাগে।মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের জন্য একমাত্র সুখ- তার টিউশনির টাকা, নিজের টাকা। টানা দুইঘন্টা পড়ালাম। সকালে ক্লাসের চাপে, বতর্মানে ছাত্রকে পড়িয়ে টনটন করে মাথাব্যথা করছে। হাসি দিয়ে মুখোশ পড়ে আছি কেউ যাতে না দেখে। সবকিছু সবাই দেখার যোগ্যতা পায়না। আমি মনে করি এটা। । চায়ের কাপটা জোড়ালো শব্দ করে টেবিলে রাখলেন আন্টি। বুঝে গেছি, আমার কষ্টের প্রাপ্যটা চেয়ে মস্ত বড় ভুল করে ফেলেছি। মনটা আবেগপ্রবন হওয়া থেকে বিরত করছি, কিছুতেই কেদে দিবি না। না মানে একদম না। মানুষের কাছে হক চাইতে লজ্জায় কান্না করা শোভা পায় না। তুই কাদবি না!
.
.

বাথরুমের দরজা লাগিয়ে বসে আছি, মনটা ভেঙ্গে চুরমার কাচের মতো ক্ষতবীক্ষত। সবার সাথে লড়াই, হেনস্ত, অপমান, উপেক্ষা করে দিনশেষে চোখ ভিজে কান্না চলে আসে। মনের মধ্যে অজানা কি পাওয়ার বাসনায় কান্না চলে আসে, বুঝিনা, জানি না। নিজের অক্ষমতা নয়তো ক্ষতচিহ্নের চোটে কান্না জুড়ে আসে। কি নিয়ে কান্না করি আমি, কি নিয়ে হাসি, কি নিয়ে নতুন দিন দেখি, কি নিয়ে পলক ঝাপটাই। মাথায় পানি ঢেলে বাথরুম থেকে বেরিয়ে ভেজা চুলে তোয়ালে লাগাই। চুলের দিকে তাকাতে আমি ফুপিয়ে কেদে দেই, আমার চুলের একতালু পরিমান দৈর্ঘ্যতা নেই। কোনো ভুল ছাড়াই ওরা আমার চুল কেটে দিয়েছে। ওরা বড়লোক, আমি মধ্যবিত্ত। আমার স্ট্যাটাসের লঘুতায় ওরা আমাকে ছোটলোক ভাবে। ওদের খুব টাকা, কাড়িকাড়ি টাকা। আমার মতো না, একবেলা রিকশা দিয়ে গেলে আরেকবেলা খালি ব্যাগ পড়ে থাকে। সত্য এটাই, আমার জন্য খালি ব্যাগের শূন্যতাই শ্রেয়। রোদে হেটে টিউশনি করে টাকা ইনকাম ওদের করা লাগেনা। এসির নিচে বসেই ওরা কষ্টের ভোগান্তি বোঝেনা। আমার গালিগালাজ এবং আমার রূঢ় ব্যবহার সবাই আচ করে দেখে, কিন্তু হাসি শেষে নিবরতা দেখে না কেউ। নেই কেউ যে দেখবে। চোখ বন্ধ করে বিছানায় বসে চুল মুছে নিচ্ছি। বন্ধ চোখের পাপড়ি বেয়ে গালের সমিখে পানি পড়ে যাচ্ছে। শ্বাসরুদ্ধকর কান্না। বেতনের চারহাজার টাকা হাতে পেয়েছি, বাকি টাকায় আশাহত । ওগুলো পাব না। নতুন বইয়ের কেনার লিস্টে দাম উঠেছে সাড়ে চার হাজার। খাতার রিম এবং কলমের পাতার হিসাব বাদই দিলাম। আব্বুর কাছে টাকা চাইতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে, এ মাসের কারেন্ট বিল পূর্বের তুলনায় দেড়গুন বেশি এসেছে। ছোট ভাইয়ের স্কুল ফিস, মাসের বাজার সদাই, বাসাভাড়া নিয়ে আম্মু-আব্বুর সাথে আমিও চিন্তামগ্ন।কাউকে বোঝতে দিচ্ছি না আদৌ। আব্বুর প্রেসার বেড়ে যাওয়ার সমস্যা আছে, আম্মুর হার্টের সমস্যা, ছোট ভাইয়ের সাইনাসে সমস্যা,আমার পায়ের সমস্যা। এমন মেয়ের জন্য ভার্সিটি গিয়ে প্রেমপরায়ণ হওয়ার টাইম থাকে? লুতুপুতু চুটিয়ে প্রেম? বাবার টাকার ফূর্তিবাজ হওয়ার উপায় থাকেনা। বিলাসিতা দেখানোর প্রভাব বিস্তার করেনা। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েরা জীবনসদৃশে বাপের বাড়ি-শ্বশুড়বাড়ি দুই বাড়িতে যোদ্ধা। মানুষ তা কখনো জানবে না।

বালিশে মাথা দিয়ে সটান হয়ে বিছানায় শুয়ে আছি। মাথা ভারী ভারী ঠেকছে, গলায় ঠান্ডাজনিত খুশখুশ। পায়ের হাটু থেকে গোড়ালী পযর্ন্ত অমাত্রিক ব্যাথা। ফোন বাজছে, হাতে নিলাম। নাম্বার চিনি না অপরিচিত।

–আসসালামু আলাইকুম, কে বলছেন?
–আমি কি মমর সাথে কথা বলছি?
–কে আপনি!
–মমকে দিন, ও চিনবে।
–চিনাচিনি বাদ! পরিচয় দিন!
–বলুন ওর সিনিয়র ব্যাচ থেকে কল করেছে। নাম রাদিফ মুগ্ধ।

ধরফরিয়ে উঠে বসি, চোখে মুখে পানসে লাগছে। কানে আঙ্গুল দিয়ে নাড়াচাড়া করে ফোনের স্ক্রিনে তাকালাম। কানে ভুল শুনছি?আমি নিজের কানে ভুল শুনছি? মুগ্ধ? এই নাম বললো ? কান থেকে আঙ্গুল সরিয়ে ফোনে কান বসালাম। ওপাশ থেকে কন্ঠ না পেয়ে রীতিমতো ‘হ্যালো হ্যালো’ করছে।

–কি চাই! চার বছরের জুনিয়র মেয়ের সাথে ইটিসপিটিস করতে মন চায়? কল কেন করছেন!
–শুনো, আমার রিলেশন করার জন্য মেয়ের কমতি নেই। তুমি নিজেকে নিয়ে কি ভাবো ইউ নো বেস্ট!
–তো? কোন্ খাজনার বাজনা দিতে ফোন করছেন!
–কি বললে? বুঝলাম না আবার বলো।
–তুই ফোন রাখবি! নাকি আবার তোর মাথায় ঢোল বাজাবো!
–আর একটা বাজে ওয়ার্ড বলবে, ইন্সট্যান্ট আমি তোমার রুমে এসে খারাপ কিছু করে ফেলবো! আই সয়ার!
–বলুন কি বলবেন!
–এইতো লাইনে এসেছো। আমার ভাতিজির জন্য একটা টিউটর লাগবে।
–তোহ্? টিউটর লাগবে আমার কি কাজ?
–এই মেয়ে চিল্লাচিল্লি বন্ধ করো! কানের পর্দা ফাটিয়ে চড় লাগাবো! চুপ করে কথা শুনতে পারো না!! শোনো! আমার ভাতিজি তোমার ভাইয়ের স্কুলে পড়ে, তোমার ভাইয়ের ক্লাসমেট ও। ইনফরমেশন পেয়েছি, ইউ আর এ্যা গুড টিউটর। দ্যাটস হোয়াই আই নিড ইউ…আই মিন আই নিড ইউ ফর মাই নিস। কাল দুইটায় ক্যাম্পাস শেষে আমার গাড়িতে চড়ে বাসায় আসবে।
–মগের মুল্লুক? আপনি আমায় গাধা ভেবেছেন? আমি কেন আপনার বাসায় আপনার ভাতিজিকে পড়াতে আসবো!
–ও হ্যালো হ্যালো! পুরো কথা না শুনে মনের মধ্যে ঘুড়ি উড়ানো বন্ধ কর! আমার ভাতিজিকে তোমার চেয়ে ভালো কোয়ালিফিকেশনের মেয়ে এসে পড়াতে পারবে! ভালো করেই জানো, আমরা টাকার হিসাব করে চলিনা। মান্থলি স্যালারি সাতহাজার টাকা, মাসে মাসেই পেয়ে যাবে। সো, প্রবলেম হচ্ছে আমাকে নিয়ে।
–আপনি মেয়ে? রেপ করে ইজ্জত লুটবে আপনার? ভয় যে পাচ্ছেন ছেলে হয়েও আপনাকে গনধর্ষন করবে!
–ঠাটিয়ে একটা চড় দেওয়া দরকার ফালতু মেয়ে! কথা পুরোটা শেষ না করতেই কথা শুরু!
–আচ্ছা বলুন,
— এ যাবৎ পাচঁজন টিউটর চেন্জ করতে হয়েছে। আমি আমার ভাতিজিকে ছেলে দ্বারা পড়াই না। মেয়ে টিউটর রেখেছি সবগুলো ইডিয়ট! ড্যামিস!
–উল্টা চড় তো আপনার খাওয়া উচিত দেখছি! কেমন মানুষ রে বাবা!
–এগেইন কথায় বেঘাত ঘটালে!
–নো বলুন,
— ওরা পড়াতে এসে আমার খোজখবর রাখে। এভ্রিটাইম আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি এসব মেয়েদের দেখতে পারিনা। আর তুমি তো মাশাআল্লাহ ফাস্টদিনেই জিরো টলারেন্স !আই নিড ইউ!
–ঠিকাছে ঠিকাছে আম্মুকে বলে দেখি তারপর জানাবো। খবরদার! টিউটর বানাতে গিয়ে প্রেমিকা বানানোর প্রয়াস চালাবেন না! ঘাড় মটকে ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে দিবো!
–বি রেডি !

-চলবে

-FABIYAH MOMO

তুমিময় প্রেম
PART 07
FABIYAH MOMO

রাতে খাওয়া শেষে রুমে এসে বিছানা ঠিক করছি ছোট ভাই এসে আমার পিছু গিয়ে দাড়ালো। ওর উপস্থিতি টের পেয়েও আমি বিছানা বালিশ জায়গামতো রাখছি। ও বিনয়ী সুরে বলল,

–আপু আপু…কথা আছে!!

আমি ব্যাগ গুছাচ্ছি, কাল ক্যাম্পাস, আবার ওই ছেলের ভাতিজিকে পড়াতে যাবো কিনা ফাইনাল না। আমি দুটো টিউশনি করছি, আরো একটা ঘাড়ে নিলে পড়াশুনাতে সময় পাবো কিনা খোদা জানে। ছোট ভাই আবার স্বরের নম্রতা নিচু টেনে এখন সে অনুনয় সুরে বলল,

–এই আপু শুনো না…আমার কথা কেউ শুনে না…আব্বু শুনে না…আম্মু বকে,

সব রেডি করে চুলে দুই বেনি করছি, আয়নায় ওর দিকে মুখ ফুলানো কুটুস চেহেরা আড়চোখে দেখে চলছি। আমি গম্ভীর করে বললাম,

–তোর কথা বল, তারপর রুম থেকে ফোট! আমি ঘুমাবো!
–আপু? আমার ব্যাট লাগবে, সাদির বাসায় ব্যাট আছে…আমার নেই,
–তোর ব্যাট লাগবে আব্বু শুনছে?
–আব্বু বলছে বেতন দিলে কিনে দিবে….বেতন দিতে দেরি আছে…আমার ব্যাট চাই! চাই! চাই! আমার ওই ব্যাট চাই! আমার ব্যাট চাই!

“ব্যাট” নিয়ে ও জেদ চেপে বসলো ওর ব্যাট চাই। আব্বু ওকে ব্যাট কিনে দিবে। উনার স্যালারি দিলেই ব্যাটটা হাতের মুঠোয় এনে দিবে। কিন্তু এই বান্দা বড় নাছোড়বান্দা! আব্বুকে খাপছাড়া বানিয়ে জ্বালাতন না করে শান্তি দিবে না। আম্মু তো চোখ ঘুরালেই চুপ! ফের আম্মু না থাকলে হুল্লোড়! ওকে কোনোরকম সান্ত্বনার বার্তা বুঝিয়ে ঘুমাতে যেতে বললাম। আমি রুমের লাইট অফ করে ঘুমিয়ে পড়লাম। দুঃখিত!…ঘুম নেই আমার। অন্ধকারে আমার সাথে সাথেই শান্তির ঘুম আসেনা। আমার মাথায় প্রচুর চিন্তা। বস্তাভর্তি চিন্তা গাদাগাদা করে থাকে। বই কিনার টাকায় শর্ট, আব্বুর নতুন ফোন কিনে দেয়াতে আমার জমা টাকায় ব্যাঘাত, হাত-খরচা নেই, ক্যাম্পাসে টাকা বাচিয়ে যেতে হবে, রিকশা ভাড়া রোজ রোজ ইসরাত দিলেও কটু দেখাবে, পার্স ব্যাগ বলতে গেলে খালি। এত কিছুর পরেও ঘুম থাকবে? জানি না অন্য মানুষের ঘুম থাকে কিনা আমার চোখে ঘুমের ছিটেফোঁটা থাকেনা। টিউশনি করেও যদি টাকার হিসাব মিলাতে না পারি তখন বুক ফেটে কান্না চলে আসে…আমি দেখাতে পারিনা। মনের মধ্যে না চাইতেই তখন অভিযোগ চলে আসে, “আমরা বড়লোক হলাম না কেন?” কান্না ছাড়া আর কোনো জবাব আসেনা আমার….
.
.

সকাল আটটা। কালো কুর্তি পড়ে নিলাম। চুলে বামপাশ করে বেনি। ছোট চুলগুলো এলোথেলো হয়ে ডানপাশে এসে কাধ ছোয়াচ্ছে। ক্লিপ দিয়ে ছোট চুলগুলো কোনোরকমে আটকে নিলাম। মুখশ্রীতে বিশেষ কিছু মাখার ইচ্ছা নেই, হালকা পাউডার হাতে নিয়ে মুখে মিশিয়ে নিলাম। ব্যাগটা নিয়ে জুতা পড়তেই আম্মুকে জোর গলায় বললাম,

— আম্মু আসি। নতুন ছাত্রী পড়িয়ে দেরিতে আসবো। চিন্তা করো না। ব্যাগে মরিচের থেরাপি নিয়েছি। আসি…আসি!!

রান্নাঘর থেকে ওড়নায় হাত মুছতে মুছতে আম্মু কিছু বলবেন, তার আগেই বাইরে ছুট। দেরি হলে ঢাকাগামী বাস ধরতে পারবো না। বাস লেট করলে রিকশার জ্যামে আটকাবো। এরপর ক্যাম্পাসে লেট! লেকচার মিস! বাসার গলি পার করে রাস্তায় উঠে ফুটপাত অংশে দ্রুতগতিতে হাটছি। লেট করা চলবে না। ইসরাতের জ্বর এসেছে, ক্যাম্পাস আসবে না। একা ট্রাভেল করতে হবে। নিজের কেয়ার রাখতে হবে। হঠাৎ কেউ পূর্বের মতো ডাকলো,

–“এই দাড়াও দাড়াও…..দাড়াও প্লিজ…ওয়েট!!”

আমি এদিকে তাড়াহুড়ো করছি, উল্টো আমাকে কেউ পিছন থেকে ডাকছে। আমি থামলাম। দেখি তন্ময়! এই ফালতু কেন বারবার পিছন থেকে ডাকে! ফালতু! বিরক্তি নিয়ে ওর কাছে গিয়ে বললাম,

–কালকে মানা করছিলাম আমাকে পিছন থেকে ডাকবি না! তোর কানে কথা যায় না!
–তুমি আমায় ভুলছো মম, শুনো প্লিজ!! দরকার আছে…
–চুপ! রাস্তায় কি কথা হ্যাঁ ! রাস্তায় কথা কিসের! তোকে বারন করার পরও তুই ডাকাডাকি ছাড়লিনা! বারবার তুই একই কাজ করিস!
–তুমি আমার জুনিয়র মম। হোয়াই আর ইউ কলিং মি “তুই”?
–দেখ ভাই! আমার বাস চলে গেলে আমি ক্যাম্পাসে লেট করবো, ডাকিস না! তোরে “ভাই” বলতেছি…রাস্তায় ডাকিস না।

আমি মোর ঘুরে আসতে নিলে তন্ময় আমার সামনে এসে দাড়ায়। হাতের ঘড়িটা একটু নড়াচড়া করে ভাব বোঝালো যেন ভয় পাই। ও বলল,

–আমি ছেলে তুমি মেয়ে, রাস্তায় ডাকা ছাড়াও ইউনিক কিছু ফ্যাসিলিটিস দিতে পারি…জানো? চুপচাপ আমার কথা শুনো। তোমার জন্য ধানমন্ডি থেকে এখানে এসেছি, জাস্ট অনলি ফর ইউ! গুড গার্লের মতো আমার গাড়িতে উঠে বসো, পয়ত্রিশ মিনিটের মধ্যে ক্যাম্পাসে পৌঁছে দিবো।
–আমি হাত পেতে বলেছি আমায় লিফট দেন? ভিক্ষা চেয়েছি? এতো দরদ কেন উতলিয়ে উতলিয়ে পড়তেছে! রাস্তা ছাড়ো! আমি বাসেই যাবো!
–লুক মিস মম! আমি রিকুয়েস্ট করা পছন্দ করিনা। আশাকরি তুমি আমাদের গ্যাংয়ের নেগেটিভ বিহেবিয়ার সম্পর্কে জানো! তোমার জন্য ভালো এটাই হবে রাস্তায় সিন ক্রিয়েট না করে গাড়িতে উঠে বসো।
–ড্রাইভার?
–ইয়েস? বুঝলাম না, বুঝিয়ে বলো।
–তোর গাড়িতে….আসলে মানে তোমার গাড়িতে ড্রাইভার আছে?
–ওহ্ হ্যাঁ আছে। বাট রিজন কি?
–তাইলে শোন! তুই তোর ড্রাইভারের সাথে বসবি! আমি তোর পিছনের সিটে! রাজি?
–হোয়াট…. দ্যা …… হ্যাল!
–রাজি? নট রাজি? জলদি জলদি বল!
–এই তু…
–তুমি তুমি করা ভুলে যাবি বুঝছিস! এলাকা আমার! একটা ডাক দিবো সব উড়ে এসে তোর পা ভেঙ্গে হাতে ধরিয়ে ফুটবলের মতো লাত্থি মেরে ধানমন্ডি লেকে পৌঁছে দিবে! বুঝা গেছে!
–ইউ আর……. ওফ! চলো। গাড়িতে বসো।

তন্ময় মুখ প্যাঁচার মতো করে কুজো হলো। তাতে কিছু যায় আসে না, আমি ওদের পা চেটে কামলা খাটি না! ওরা নিজে এসেছে, ওদের গ্যাং লিডার আমার হাত চেয়েছে। আমি শুধু মনুষ্যত্বের নামে সাহায্য করেছি, আর কিছু আয়ের জন্য। ক্যাম্পাস চলে এসেছে। ওদের দাপটের জোরে হেডস্যারের গাড়ি ছাড়াও গ্যাংস্টারের সবার গাড়ি ক্যাম্পাসের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে। তন্ময়ের গাড়িও ঢুকেছে। সব স্টুডেন্ট কিভাবে ভয়ভয় চোখে রাস্তা খালি করে দিচ্ছে গাড়ির জানালায় বাইরে দেখছি। গাড়ি থামলে তন্ময় পিছনে ফিরে তাকায়, আমি ওর দিকে শক্ত দৃষ্টি ছুড়ে দরজা খুলে বাইরে বের হলাম। কেমন তাজ্জব! আমার দিকে স্টুডেন্টগুলো সিনেমার নায়িকা দেখার মতো তাকিয়ে আছে। বোঝলাম…তন্ময়ের গাড়িতে আমাকে দেখে ওদের চাহনির এ অবস্থা। কি কি সমালোচনায় পড়া লাগে খোদা মালুম! আমি ব্যাগের ব্যান্ডেল চেপে ডিপার্টমেন্টের ক্লাসরুমে চলে গেলাম।

.
.

ক্লাস শেষ, দুপুর দুইটা। সিড়ি দিয়ে নেমে গেটের কাছে যাচ্ছি…জোড়ায় জোড়ায়, গুচ্ছাকারে আমার দিকে নিশানা করে কানাঘুসো করছে। আমি ব্যাপারটা আড়চোখে লক্ষ করলেও গায়ে মেখে নিচ্ছি না। গ্রীষ্মের রোদ্রে আমার মাথার তালু গরম হয়ে ঘেমে গেছে। জেনি, রিমিকে ওদের আড্ডাস্থল ‘নজরুল চত্বরে’ দেখলাম। কিন্তু কারো কোনো ব্যাঙ্গ প্রতিক্রিয়া নেই। যে যার যার মতো হাসিতামাশা করছে। গেট দিয়ে বাইরে বের হলাম। কি রোদ! গরমে চান্দি চ্যালা লোকদের মাথা ঘেমে তেলতেলে হয়ে যাবে। অবশ্য হয়েছে হয়তো। হাত ঘড়িটায় দ্বিতীয়বার দেখে নিলাম। দুইটার ত্রিশ। সবাই নিজ গন্তব্যে চলে যাচ্ছে, আমি বাইরে খাম্বার মতো ওই বিলাতি কুত্তার অপেক্ষায় দাড়িয়ে আছি। কেউ বলে উঠল-

–” চলো “।

সঙ্গে সঙ্গে পিছনে ঘুরে তাকালাম। মুগ্ধ গাড়ি থেকে নেমে “চলো” বলেই চলে যাচ্ছে। ওর গাড়ি ভেতরে কোথায় পার্ক করা ছিলো চোখে পড়েনি। আবার দলের সাথেও বসতে দেখিনি। ভূতের মতো গাড়ি নিয়ে ক্যাম্পাসের ভেতর থেকেই গেট দিয়ে বেরুলো…বিষয়টা নেওয়ার মতো ঠেকলো না। ড্রাইভার দরজা খুলে দিয়ে আমার বসার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি কাধ থেকে ব্যাগ নামিয়ে গাড়িতে উঠলাম। মুগ্ধ ড্রাইভারের সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দিলেন। ড্রাইভার গাড়িতে উঠলো। আমি কৌতুহল হয়ে জিজ্ঞেস করে বসলাম,

–ড্রাইভারকে সাথে নেওয়া হচ্ছে না?

সে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে গাড়ির হুইল চেপে চালানো শুরু করে দিলো।

–নো।
–কেন? উনি কীভাবে আসবেন? আজব তো! ড্রাইভারকে একা ফেলে যাচ্ছেন!
–ড্রাইভার কি তোমার? সে কি নাদান বাচ্চা?আমার ফ্যাক্টস আমি বুঝবো! স্টে আউট অফ হেয়ার!
–তুমি নিজেও মানুষ! উনিও একটা মানুষ! ড্রাইভার তো তোমার! তো রিসপন্সলিব্লিটি কি তোমার না??
–জাস্ট শাট আপ! তোমার কথা শোনার জন্য আমি বসে বসে টাকা পাচ্ছি না! সো..ভালো খারাপের নলেজ তুমি না দিলে বেটার হবে!
–তুই আমার চুল কাটছিস! তোর আবার নলেজ আছে নাকি!! নলেজ বানান শিখছোস তাও কতো লাল থাবড়া খাইয়া! তোরে বেটার কেউ নলেজ দিবো! কুত্তা কি কামড়ায়!
–তুমি টিউটর হও কি করে…জাস্ট সে ইট ! নো সিরিয়াসলি…টিউটর এমন হয়? স্ল্যাগ, ল্যাংগুয়েজ এতো ক্রিটিক্যাল?
–তোর ধারনা না থাকলে গাড়ি থেকে নাম্, আর বাপের টাকায় পকেট না দেখিয়ে নিজে রোজগার কর! আমি কেন টিউটর হইছি পাই পাই বুঝবি! আর আমার মুখের ভাষা? শোন একটা কথা বলি? আমি ক্ষেত্রবিশেষে কথা বলি। কে কোন স্ট্যান্ডার্ডের ভাষা বুঝে আই নো ইট ভেরি কেয়ারফুলি! ডোন্ট ট্রায় টু জাজ মি! ইউ আর নট এ্যা ক্যাপিব্যাল পার্সন অফ ইট!ইউ শুড স্টে আউট!

-চলবে

-Fabiyah Momo

তুমিময় প্রেম
PART 09
FABIYAH MOMO

গালে হাত দিয়ে ক্যান্টিনের টেবিলে বসে আছে মুগ্ধ। তার চারপাশ ঘিরে দলবল বসে আছে জনে জনে। পুরো ক্যান্টিন তার এক আদেশে খালি! কেবল বেয়াড়া ছেলে এবং শেফ বাকি। তাছাড়া একটা বাড়তি প্রাণের সন্ধান মিলবেনা। চেয়ার পেতে দূরত্ব রেখে একস্থানে বসেছে সবাই। নাসিফ পকেট থেকে বেনসনের প্যাকেট নিয়ে লাইটার বের করলো, সিগারেটের ধোয়া নাকে না শুকলে স্বাদ আসবেনা। রামিম বাচালের মতো এই স্টুডেন্ট ওই স্টুডেন্ট নিয়ে কথার জরিপ বসিয়েছে, কেউ একবিন্দু নজরও দিচ্ছেনা। রিমি ফোনের মেসেন্জারে ধুমিয়ে চ্যাটিং করছে, নতুন বফ আরাফের সাথে প্রেম জমাতে ব্যস্ত, বফ নাম্বার তিন। জেনি মুগ্ধের অবিকল নকল করে গালে হাত দিয়ে তার পানে তাকিয়ে আছে। আহাদ মোবাইল গেমসে বিজি, হাইয়েস্ট স্কোর পাওয়া নিয়ে হুটহাট হৈহৈ করেও উঠে। অবশিষ্ট ‘তন্ময়’! সে কিছু একটা নিয়ে ফোনের স্ক্রিনে বৃদ্ধাঙ্গুলি চালাতে ব্যস্ত। মুগ্ধের থমথম হয়ে বসে থাকাটা সবাই চুপচাপ দৃষ্টি এড়িয়ে দেখছে। তার একটা কারন আছে অবশ্য। মুগ্ধ যখন গালে হাত দিয়ে চুপ হয়ে যায় তখন ঝড় আসার পূর্ব সংকেত বোঝায়। এখনো তাই বোঝাচ্ছে। সবাই নরমালি থাকার নানা চেষ্টা করছে, কিন্তু একটা কথা ভালোভাবে জানে, মুগ্ধের চুপটি কোনো আগত খারাপ কিছুর সাইন। অবশ্যই সামনে কোনো গন্ডগোল হবে। রিমি জেনির পায়ে হালকা লাত্থি মেরে দৃষ্টিভ্রম ভাঙালো। জেনি মুগ্ধের দিকে না তাকিয়ে বিরক্তি নিয়ে রিমির দিকে কপাল কুচে তাকালো। মাথাটা উপরে উচিয়ে বোঝালো, “কি হয়েছে?”, রিমি চোখ ঘুরিয়ে মুগ্ধের দিকে করলো এবং হাতের ইশারায় বোঝালো, “মুগ্ধের কি হয়েছে?”। জেনি ঠোট উল্টে বোঝালো, “জানি না”। রিমি বোঝালো, “কেউ কি ওকে কিছু বলেছে?”, জেনি চোখ বড় করে হা করলো। বলে কি? মুগ্ধকে কেউ কথা শোনাবে? অসম্ভব! তৎক্ষণাৎ জেনি ভ্রুকুচকে বোঝালো, “নাহ্! কারোর সাহস নেই!”। মুগ্ধের নজরে রিমি,জেনির চোখের ইশারায় কথা বলাবলির জিনিসটা লুকালো না। ধরে ফেলল চট করে। গাল থেকে হাত সরিয়ে হঠাৎ দুজনকে চমকে দিয়ে বলে উঠলো-

–গাইজ ক্যান ইউ স্টপ? কি হচ্ছে কি এসব! আমি কি লেম? স্টুপিড? ফুলিশ অর ব্লাইন্ড? রিমি? সিরিয়াসলি? ডুড, আ’ম ফেসিং সাম প্রবলেম্স! প্লিজ স্টে কাম এন্ড স্টপ!

রিমি ও জিনি থতমত হয়ে চুপ করে রইলো। এখন যদি মুগ্ধের প্রবলেম ফেস হওয়ার কারনটা মুখ ফুটে জিজ্ঞেস করে তাহলে কোন্ টাইফুন এসে আঘাত হানবে কেবল ওরাই জানে। নাসিফ নাক দিয়ে ধোয়া ছেড়ে তন্ময়কে বলল,

–মামা তুমি কোন মেয়ের সাথে জানি লাইন মারতে নিছিলা কাজ হইছে? নাকি গাড়ি থেমে গেছে?

তন্ময় নাসিফের মুখে কথাটা শুনতেই কাচুমাচু করতে লাগল। বড্ড অস্বস্তি ফিল হচ্ছে নাসিফের। কেন যে বেটা মুগ্ধের সামনে ফট করে বললো, ও যদি মামলার ইতিহাস জানতে চায় তাহলে তো গো ধরে বসে থাকবে। কে সামলাবে ওকে? কে বোঝাবে? মেয়েটা নিয়ে দু’পক্ষ অজান্তেই টানাটানি করছে। একজন প্রবলেমের নামে গা ঢাকা দিয়ে আছে। অপরজন মুখে স্কচট্যাপ মেরে কথা হজম করে রেখেছে। কেউ সত্যটা মুখ দিয়ে ফাস করে বলতে ইচ্ছুক না। কি কেলেঙ্কারি হয় কে জানে?

মুগ্ধ কিছু একটা ভাবলো। কি ভাবলো কাউকে জানালো না। টেবিল থেকে ধুপ করে নেমে হাতের ওয়াচটা ঘুরিয়ে নিলো। গায়ের নীল টিশার্টটা ঠিকঠাক টেনে সবাইকে উদ্দেশ্য করে শক্ত গলায় বললো-

–কেউ আমার সাথে আসতে চাইলে আসো। নয়তো বসে থাকো। একাডেমিক ভবন-৪ এর ফোরথ্ ফ্লোরে গেলাম।

রিমি অবাক হয়ে গেল। ওই ভবনে জুনিয়র সেমিস্টারদের ক্লাস চলে। মুগ্ধের ওখানে কি কাজ? কোন কাজে সে ওখানে যেতে ইচ্ছুক? কারন কি? রিমি হাতপাচ না ভেবে কিছু বলবে তার আগেই জেনি ঝট করে বলে ছাড়লো-

–কারোর উপর হাত টান করবে মুগ্ধ? ওই বিল্ডিংয়ে ক্লাস চলছে, ফাস্ট ইয়ারের। তুমি ওখানে কি করবে?

জেনি কথাটা বলে বড় ভুল করে ফেললো। মুগ্ধ ওর কথার উপর বাড়তি কথার ঝুলিটা নিতে পারলোনা। জেনি আজ মেয়ে না হয়ে ছেলে হলে রামিমের মতো গালে ঠাটিয়ে চড় লাগাতো। কিন্তু মেয়ে বলে কিছু করলো না। চোখ রাঙিয়ে শক্ত কোটরে কিছুক্ষন দাড়িয়ে পা চালালো। নাসিফ, তন্ময়, রামিম চেয়ার ছেড়ে মুগ্ধের পিছনে গেলো। বসে রইলো জেনি ও রিমি এবং আহাদ। তিনজন তিনজনের দিকে বোকার মতো তাকালো।

মুগ্ধ দাতে দাত কুটতে কুটতে সিড়ি দিয়ে উপরে উঠছে। যারা ক্লাস না করে সিড়িতে, বারান্দায় ও ক্লাশের আশেপাশে ঘুরঘুর করছিলো তারা ভয়ে একধাপ করে পিছিয়ে গেল। রাস্তা করে দিতে লাগলো মুগ্ধ, নাসিফ, তন্ময় ও রামিমকে। ফোরথ্ ফ্লোরে পৌছে মুগ্ধ তার হাটাঁর গতি হ্রাস করে নিলো। এতোক্ষন হেঁটে দৌড়ে লাফিয়ে আসছিলো হঠাৎই পায়ের হেঁটে যাওয়া গতি কমিয়ে দিলো। তন্ময় জিজ্ঞেস করলো-

–বন্ধু এনি প্রবলেম? ক্লাসরুম থেকে কাউকে তুলে আনবো?হাটা থামালি?
–ইয়ার, আই নিড হেল্প। কিছু একটা করে ওই ৪০৪ নং রুমের গোলাপি ড্রেস পড়া মেয়েকে আড্ডাখানায় নিয়ে আয়।
–৪০৪ নং? মুগ্ধ কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের সেকশন-বি ওটা। রাজিব ভাইয়া ক্লাস নিচ্ছে। বড়ভাই বকবে!

নাসিফ নিকোটিনের গন্ধযুক্ত মুখে বলে উঠলো-
–এই আমি যাই। ডিটেলস ফুল্লি বল। আমি ওই মেয়েকে চুল ধরে আনি।

মুগ্ধ কঠিন করে নাসিফের দিকে তাকালো। ইচ্ছে করলো কানের নিচে দুটো থাপ্পর লাগাতে, কিন্তু জোরে শ্বাস ছেড়ে রাগ নির্গমন করলো। নাসিফ তো জানে না মেয়েটার কদর কতো! মেয়েটা আমার জন্য কি হয়ে দাড়িয়েছে নাসিফকে খুলে বলা যাবেনা। সময় হোক সব বলবো। বলার পরও যদি এভাবে চুল টেনে আনার কথা বলে তখন নাসিফকে মারপিট করতেও ভয় পাবোনা।মুগ্ধ স্বাভাবিক করে বলল-

–অলটাইম এগ্রেসিভ, নট কুল ডুড। আমরা ক্যাম্পাসে কি করতে জানি এভ্রিবডি নোস ইট ভেরি স্ট্রিকলি। মেয়েটাকে ভালোভাবে আমার কাছে….আই মিন আমাদের আড্ডাখানায় নিয়ে আয়।

কেন আনতে বললো? কি দরকার মেয়েটাকে? মেয়েটা কে? নাম কি? কিচ্ছু না জিজ্ঞেস করে নাসিফ হুকুম মতো “গোলাপি ড্রেস” পড়ুয়া মেয়েকে আনতে গেল। তন্ময় মুগ্ধকে জিজ্ঞেস করে বসলো-

–দোস্ত? তুই কিন্তু এখনো বললি না কে ওই মেয়ে? কাজ কি ওর সাথে?

রামিম তন্ময়ের কাধে চাপড় মেরে তাচ্ছিল্য করে বলল-
–হুর বেটা! বুঝিস না! র‍্যাগিং দিতে গোলাপী মেয়েকে ডাকছে। টিপেটুপে দেখতে হবেনা, মাল আসলে কেমন!!

রামিম অশ্লীল ভাবে কথাটা বুঝিয়েছে। মাথাটা ধরে এসেছে মুগ্ধের! অনেক হয়েছে! নাসিফকে চড়টা না দিলেও রামিমকে না দিলেই নয়! মুগ্ধ রামিমের কাছে বাকা হাসিতে এগুলো। তন্ময় রামিমের অশ্রাব্য অশ্লীল কথায় মজা পেয়ে হো হো করে হাসছে। রামিম ভেবেছে মুগ্ধ তাকে বাহবা দিতেই কাছে আসছে, আর মিটিমিটি হাসছে। মুগ্ধ রামিমের কাধে একটা হাত রাখলো। রামিম খুশিতে এটিটিউট নিয়ে নাক ফুলালো। আর গম্ভীর সুরে বলল-

–মেয়েটা আসুক! ওড়না ছাড়া পুরো ক্যাম্পাসে চক্কর দিতে বলবো! যা সেক্সি লাগবেনা….

শেষ করতে পারলো না রামিম…ঠাস করে এক থাপ্পর পড়লো তার তৈলাক্ত গালে। নিমিষেই রামিমের এটিটিউট ভঙ্গি হাওয়ায় মিলিয়ে গাল ধরে মাসুম বাচ্চার মতো মুগ্ধের দিকে তাকালো। নাদান বাচ্চা, মুখ দিয়ে বুলি ফোটাতে পারে? কথাই বলতে পারবেনা এমন মুখ করে তাকিয়ে আছে রামিম। মুগ্ধ রামিমের চুল গুলো হাতড়াতে বলে উঠলো-

–আমরা র‍্যাগ দেই ঠিকআছে, অশ্লীলতা করতে আসিনা। তোর মুখের লাগাম টানিস। আমি আবার লাগাম টানতে গেলে জিহবা ছিড়ে চলে আসে নাকি…বলাতো যায় না। বেশি কথা শুনতে পারিনা। কান ভো ভো করতে থাকে। ডিসগাস্টিং লাগে। বুঝছিস তো রামিম?

তন্ময় হতভম্ভ হয়ে হাসি থামিয়ে দিল। রামিম অবলা ছেলের মতো গাল ডলে ডলে চোখ নিচু করলো। মুগ্ধ কোমরে হাত দিয়ে ক্লাস থেকে তথাকথিত মেয়ের আসার দিকে তাকিয়ে রইলো। কখন আসবে? কেমন প্রতিক্রিয়া দিবে? আজও ইনসাল্ট করবে? চড় দিবে? তুইতোকারি করবে? একটু কথা বলার ফুরসত কি পাবে না? কি যে জ্বালা হচ্ছে বুকে। বেচ্যানইন লাগছে মনে। কেন লাগছে বিব্রতবোধ? কারন কি? হঠাৎ করে কেন তার দেখা পেতে চাচ্ছে? বেহায়া মনটা কেন এমন করছে? ব্রেনের সাথে তাল মিলাচ্ছে না? কেন? নাসিফ আসলো। মাথা নিচু করে মুগ্ধের সামনে দাড়ালো। মুগ্ধ অস্থিরতার সাথে জিজ্ঞেস করলো-

–ইয়ার ডান? ও আসবে? আসছে তো? কি বলেছে?হ্যা – বলেছে?

নাসিফ তন্ময়ের দিকে তাকালো। মুগ্ধ তার প্রশ্নের জবাবটাও পেলো। মেয়েটা তাকে কি বলতে পারে সেটার অনুমান ইতিমধ্যে মুগ্ধের মনে গাথা হয়ে গেছে। মুগ্ধ হাল ছাড়লো। দেখা মেলবেনা। কথা শোনা হবেনা। তন্ময় ফাসফাস করে জিজ্ঞেস করলো-

–মামা মেয়েটা কে কেউ তো বল? চিনি আমরা? শুধুশুধু বসে বসে তামাশা দেখছি।

মুগ্ধ ধীরেসুস্থে আনমনে হাটতে লাগলো। জিন্সের পকেটে দুই হাত ঢুকিয়ে বারান্দা পেরিয়ে চলে যেতে লাগলো। রামিম ঢুলু গলায় বলে উঠলো-

–মুগ্ধ থাবড়া দিলো কেন? কেউ বলবি? কি অশ্লীল কথা বলছি যে থাপ্পর দিতে গেল? মগের মুল্লুক পাইছে আমারে?
তন্ময় রামিমকে থামিয়ে দিয়ে নাসিফকে বলল-

–শালা ****** চুপ না থেকে বলবি? মেয়ে কে? নাম কি?আমি চিনি?
নাসিফ ক্ষীণ গলায় বললো-

–খালি তুই না! আমরা সবগুলি ওই মেয়েকে চিনি। মুগ্ধের মাথা ফাটানো মেয়ে। গোলাপি ড্রেসে ক্লাস করছে। রাজিব ভাই তো ধমক দিছে দিছেই! ওই মেয়েও থাপ্পর মারছে।

এটুকু বলেই তন্ময় আন্দাজ করে ফেললো, মুগ্ধ আসলে কি লুকাচ্ছে। কি নিয়ে সকাল থেকে আড্ডাখানায় মুখ ফুলিয়ে বসে আছে। তন্ময় কিছু আগ বাড়িয়ে বলতে গেলো না। চুপচাপ ‘চল’ বলে সঙ্গে আসতে বললো।

.
.

–মম তুই উঠবি? খাওয়াদাওয়া কি করার ইচ্ছা আছে? সকালেও তুই নাস্তা করে যাসনাই। উঠ, এক্ষুনি!

পুরোদমে দরজা ধাক্কাচ্ছে আম্মু। ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছে করছেনা। কি অন্ধকার!! চারপাশ এমন অন্ধকার কেন? বিভীষিকাময় ভৌতিক বাড়ির মতো অন্ধকার কেন হয়ে আছে? মরে-টরে গেলাম নাকি? নাকি স্বপ্ন দেখছি? ওহ্! খেয়াল হলো, টিউশনি শেষে দরজা আটকিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। রুম অন্ধকার, কারন এখন রাত। চোখ কচলিয়ে বিছানা থেকে উঠে শরীর টানা দিলাম। আম্মু দরজার ওপাশ থেকে চিল্লিয়ে চলে গেছে। আমি রুমের লাইট জ্বালিয়ে জানালা খুলে পর্দা সরিয়ে দিলাম। বাতাস এসে দোল খাইয়ে দিল শরীরে। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাড়িয়ে ঘুমন্ত চেহারার অবশিষ্ট আভা বোঝার চেষ্টা করছি। চোখ ফুলে গেছে, নাক লাল হয়ে আছে, গালেও কেমন কোমল-কোমল ভাব। অসময়ে ঘুমালে আমার চেহারার বাবদশা এভাবে ছুটে। গোলাপি কামিজটাও চেন্জ করে বাসার নরমাল পোশাক পড়িনি। ফাইজাকে পড়িয়ে, জোবায়ের কে পড়িয়ে -ভীষন ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় ফিরেছিলাম। ঘুমে শরীর ভেঙ্গে আসছিলো। দুপুরের খাওয়ার চিন্তা ঘুমের চেয়ে প্রাধান্য পায়নি। তাই সোজা বিছানায় এসে ঘুম। হাই তুলে ফ্রেশ হয়ে দরজা খুলে বাইরে গেলাম। আম্মু টিভি দেখছেন সোফায় বসে। আমাকে জাগ্রত দেখে বলে উঠলেন-

–কিরে কান্না করছিস? মুখ ওমন ফোলা কেন?
–অসময়ে ঘুমের প্রভাব এটা। কান্নাকাটি করিনি। খাবো। খাবার দাও।

আম্মু যেন আমার এ কথাটা শোনার জন্য ব্যগ্র হয়ে ছিলেন। অপেক্ষায় ছিলেন কখন বলবো, আমি খাবো। আম্মু খাবার আনতে গেলেন। ছোট মেম্বার ফ্লোরে ছবি আকাআকি করছে। খাতায় রঙ ঘষতেই বলে উঠলো-

–আপু তোমার ফোনে অনেকগুলা কল আসছিলো। আমি চিনি না এজন্য কেটে দিসি।
–কে দিছিলো? কখন?
–তুমি ঘুমিয়ে ছিলা। ফোন ব্যাগের মধ্যে বাজতেছিলো আমি ফোন নিয়ে কেটে দিছি।
–খুব পূণ্যের কাজ করছোস ! তোরে ফোন ধরতে না করছিনা বদমাইশ!

মেজাজ গরম। আমার নিষিদ্ধ জিনিসে আমার আপন কেউ হাতে দিলেও দোষের কিছু হয়ে যায়। আমার প্রচুর রাগ উঠে! বিনা অনুমতিতে আমার ফোন নিয়ে ছিনিমিনি খেললে প্রচুর রাগ উঠে! কে কল করলো – তা নিয়ে আমি চলে গেলাম ফোনের কাছে। ফোন ডাইনিং টেবিলের ডানপাশে রাখা। চেক করতেই ধরা পড়লো ফাইজার চাচ্চু, মুগ্ধ দিয়েছে! আবার কি সমস্যা হলো! এ নিয়ে সাতবারের মতো আমার সাথে কথা বলার নানা সুযোগ ঠুকালো। জিদ লাগছে! রাগ লাগছে! সহ্যের সীমা অতিক্রম হচ্ছে! কি সমস্যা কি এই লোকের? কতো না করি! অপমান করি! গালিও দেই! রিসপেক্ট করিনা! তাও ঢলতে ঢলতে আমার কাছেই ফোনের বারোটা নিয়ে চলে আসে! নাম্বার সোজা ব্লক করে দিলাম। নে ঠেলা। কথা বলবিনা? বল এখন! বাপের নাম নিয়ে বল! ছ্যাঁচড়া!

রাতের বেলা আব্বুর সাথে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট দেখছি। আম্মু সিরিয়াল না দেখতে পেয়ে মুখের খই ফুটানো বন্ধ করে রুমে গিয়ে শুয়ে পড়েছে। আমি আর আব্বু ড্রয়িং রুমে বসে বসে টিভি দেখছি। ছোট ভাই ঘুমের দেশে অনেক আগেই তলিয়ে গেছে। আব্বু হঠাৎ করে বললো-

–মা তোর বই কিনতে কত লাগবো?

আমি জানি আব্বু নিজের ফোন কেনা বাদ দিয়ে আমার বই কেনায় পড়ে আছেন। নিজের প্যাপু ভাঙ্গা ফোন নিয়েই দিন কাবার করছেন তা আমি বেশ ভালো জানি। প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বললাম-

–আব্বু মারটিন গাপটিল কিন্তু অস্থির খেলছে। দেখো দেখো, এক ওভারে আটাশ রান!

আব্বু অটলভাবে একই প্রশ্ন বলে উঠলো-

–তোর না বই কিনতে টাকা শর্ট ছিলো? কত লাগবে?

–এক টাকাও না। বরং আগামী মাসে তোমার ফোন কিনে দিচ্ছি। ওটা নিয়ে খুশি থাকো। আমার বই কেনার টাকা নিয়ে চিন্তা করতে হবেনা। আমি টিউশনির টাকায় মিলিয়ে নিয়েছি।

জোর গলায় অনেকটা বলে দিলাম।গলায় নমনীয়তা থাকলে আব্বু কথা শুনতে চাইবেনা। নিজের চাহিদার দিকে না তাকিয়ে বই কেনার দিকে চোখ পড়ে থাকবে। আমার সেটা ভালো লাগেনা। অফিসে ডেলি যায় উনি। সব স্টাফদের দামী দামী হ্যান্ডসেট আর উনার হাতে কিনা কমদামী বাটন ফোন! কতটা কষ্ট লাগতে পারে উনার মনে! হয়তো উনি আমাদের দিকে তাকিয়ে নিজের চাওয়া-পাওয়ার কথা ভুলে গিয়েছেন। আচ্ছা উনি এমন কেন? ছেলেদের নাকি দুহাতে টাকা থাকলে, হাতে দামী খানদানী কিছু থাকলে শান উচিয়ে হাটে। কিন্তু যাদের থাকেনা তারা মাথা ঝুকিয়ে শুকনো হাসিতে হাসে। সে হাসির অর্থ দুটো। এক. আমার কাধে পুরো বউ-বাচ্চা নিয়ে সংসার সামলানোর তাগদ। দুই. নিজের চাহিদা বাদ। সংসারের পিছনে টাকা যাক। বড়ই অদ্ভুত এ দুনিয়া!! টাকা থাকলে ফূর্তি, টাকা ফুরালেই অভিনয়ের মূর্তি! অভিনয় করা লাগে ভালো থাকার। ভালো না থাকলে সংসারের রোজগার করবে কি করে?”ছেলে”, “স্বামী”, “বাবা”–হলেও দায়িত্ববোধ কমে না বরং ঘন হয়ে বাড়ে। ক্রমগত বাড়ে।

-চলবে

-Fabiyah Momo

তুমিময় প্রেম
PART 10
FABIYAH MOMO

ক্যাম্পাসের গেট পার করে ভেতরে ঢুকতেই মনে হলো কেউ ভীষন ফলো করছে। পলকে পলকে কদমে কদমে সে আমায় টিপটিপ দেখছে। আমি বিষয়টাতে ঘাবড়ালাম না, শান্ত থাকলাম। ব্যাগের ফিতা আকড়ে ডিপার্টমেন্টের ক্লাসরুমের দিকে যাচ্ছি। সিড়িতে এক পা ফেলবো পেছন থেকে অর্পনা ডেকে দিলো। ওর চিকন গলায় মিনমিন কন্ঠ পেলেই বুঝে যাই ওটা অর্পনা ছাড়া কেউ হবে না। আমার ক্লাসমেট। আবার ব্যাচমেটও বলা চলে। ও বলল-

–মম দাড়াও। একটু কথা আছে।
আমি ওর কথায় দাড়ালাম। হাতের বাদামী ঘড়িতে একবার সময় দেখে নিলাম। দশ মিনিট এখনো আছে। ক্লাস শুরু হতে দেরি হবে। আমি শান্ত গলায় বললাম-

–খুব জরুরী কিছু? কি বিষয়ে বলতে চাও?
–তোমায় ক্যাম্পাসে মুগ্ধ ভাইয়ার দলবল খুজঁছে। কি কাজে উনাদের তোমায় লাগবে। জলদি যাও।
–ওদের কাজে আমার কি প্রয়োজন? একেকটা তো একেকটার চেয়ে কম না! আশ্চর্য! কেমন বেহায়া মুখে আবার ডাকলো!
–আমি কি করি বলো? জেনি আপু যেই খাতারনক, পারেনা গলায় হাত ঢুকিয়ে মারে। ভয় পাই গো। তুমি উদ্ধার করো।
–আচ্ছা তুমি টেনশন নিও না আমি ব্যাপারটা দেখছি। ওদের তলবে আমায় কেন ডাকলো তার জন্য মশলার ঝাটা খেতেই হবে। তুমি আমার ব্যাগ নিয়ে ক্লাসে বসো, আমি আসছি।
–সাবধানে থেকো মম। ওরা কিন্তু আগের বার তোমার চুল কেটে দিয়েছিলো। এবার…
–এবার কিছু করতে পারবেনা। আগেরবার নাহয় ভালোমানুষী করেছি। এবার টাটকা দুই থাপ্পর গালে বসিয়ে আসবো।

অর্পনা আমায় বিড়বিড় করে অনেক কিছু বললেও স্পষ্ট কানে কিছুই শুনিনি। অনুমান শক্তিতে বলছি, অর্পনা খুব সম্ভবত এই বলেছে- মম তোমাকেই খুজছে বাংলাদেশ!

গরম পড়েছে খুব। কি সূর্যের প্রখরতা!! তালু ফেটে গড়াগড়ি খেতেই দ্বিধাগ্রস্ত হবেনা, এমন কাঠফাটা গরম। ইচ্ছা করছে হিম শীতল পানির মধ্যে ডুবে থাকি, কি ঠান্ডা! আহ্..পরানটা জুড়িয়ে যায় ঠান্ডায়। কল্পনারাজ্য থেকে গরমের নিস্তার পাওয়া গেলেও বাস্তব দুনিয়ায় গরমে ঘেমে চৌচির। ওরা আমার সামনে। বদমাশ মুগ্ধ শহীদ মিনারের চকচক ফ্লোরে বসে আছে। বাকি গুলা ফ্লোরের নিচের সিড়িতে। মানে দূর থেকেই বোঝা যায় লিডার বসে আছে।গলার ওড়নাটা নিয়ে কপাল মুছতেই বলে উঠলাম-

–দা না কাস্তে? কোনটা কোনটা? কোনটা দিয়ে কোপাবো?? বল বল দেরি না!!

এক বালতি অবাক নিয়ে মুখ হা করে আছে সবাই। কেবল মুগ্ধ স্বাভাবিক। যেমনটা সর্বদা থাকে। জেনি চিৎকার করে বলল-

–হাউ ডেয়ার ইউ রাস্তার মেয়ে! কাকে ধমকি দিচ্ছো? চোখ নামাও! তোমার বাবার সামনে চোখ উঠাবা! আমাদের সামনে ভুলেও না!

–সোজা হয়ে থাকিস! আমার ফ্যামিলি মেম্বার টেনে আনিস না! তোরটা টানলে ইজ্জত থাকবে না!

নাসিফ সবসময়ের মতো সিগারেট টানছে। ছেলেটাকে সিগারেট ছাড়া একদিনও দেখিনি। সে একটা সিগারেটখোর! মুগ্ধ কেমন শোপিসের মতো পুতুল সেজে আছে।বসে বসে তামাশা দেখছে। জেনি মেয়েটা রিমির দিকে সর্তকতায় ইশারা করলো। অঘটন ঘটানোর ইশারা। রিমি ইশারা পেয়ে আমার দিকে তরল কিছু ছুড়ে মারলো। নিমিষেই পুরো জামা নষ্ট হয়ে গেল। আকষ্মিক চোখ বন্ধ করলেও চোখ যখন খুলি তখন সবাই আমার দিকে অট্টহাসিতে হাসছে। জামার দিকে তাকালাম। বুক ফেটে কান্না আসছিলো! কাদঁতে পারছিলাম না! কালো কালির পানি গুলিয়ে আমার দিকে ছুড়ে মেরেছে। গতবছর আব্বু জন্মদিন উপলক্ষে জামাটা গিফট করেছিলো। সেই পছন্দের জামাটা আমার শেষ। কি করে দিলো? দাগটা সাবান দিয়ে ধুলে, লেবু দিয়ে ঘষলেও উঠবে না। কঠিন দাগ টিভির এডর্ভাটাইজের মতো কোনো ডির্টাজেন্টে উঠবেনা। রাগ লাগছিলো। দা এনে একঘন্টা কুপিয়ে জখম করলেও রাগের স্ফুলিঙ্গ কমবেনা। তবুও কাদো মনে ছোট হয়ে চলে আসলাম। আজ কিছু করলাম না। মনটা শক্ত নেই। প্রচণ্ড নরম হয়ে গিয়েছে। যেকোনো সময় চোখ দিয়ে ছলছল হয়ে জল পড়তে পারে। ওদের সামনে কাদতে নেই। দ্রুত পায়ে হাটঁতেও পারছিনা। সবাই ভাববে হেরে গিয়েছি। নিজেকে কঠোর দেখানোর প্রয়াস করছি।

গার্লস হোস্টেলের ওয়াশরুমে আছি। বেসিনের পানি ছেড়ে মুঠো করে জামার উপর থেকে আলতো কালির ছোপটা উঠাচ্ছি। যদিও জানি কালির দাগ উঠবেনা। পছন্দের জিনিসে কটু দেখা দিলে ভেতরটা কেমন হাহা করে বলে বোঝানো যাবেনা। মেয়েদের কাছে ছোটখাটো জিনিসটাই অনেক। অনেক কিছু। আমার কাছে সর্নালংকারের মূল্য নেই। স্বর্ণ কখনো হীরার যোগ্যতা পায়না, বাবার ভালোবাসা মিশ্রিত উপহারটা হীরার মতো। আমার হীরার খনিতে দাগ লাগলো। জামারহাতায় চোখ মুছে বাইরে বের হলাম। হোস্টেলের ব্যাক এরিয়া এটা। ওয়াশরুম গুলো স্বচ্ছ পরিস্কার। বড় একটা হলরুম পেরিয়ে এখানে আসা লাগে। যেহেতু আমি কান্না করেছি তাই জায়গাটা আমার জন্য উত্তম। নিরিবিলি, কোলাহলমুক্ত। কেউ নেই। কেউ নেই। আমি ওয়াশরুমের দরজাটা বাইরে থেকে সিটকিনি লাগিয়ে পেছনে ঘুরতেই ঝড়ের বেগে কেউ ঝুকে আসলো। একহাত ওয়াশরুমের দরজায় পড়লো। আমি চমকে দরজার সাথে ঠেকে গেলাম। চোখ বড় করে অবাকে দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। মুগ্ধ ধারালো চাহনি দিয়ে তাকিয়ে আছে। পিছনে দরজা সামনে মুগ্ধ ডানে হাত বামেও অপর হাত দিয়ে দিলো। মাঝে আমি পুরো খাচায় বন্দিশিবির! সে বলল-

–আজকের মেয়েটা কে আমি চিনি না। কে সে? Who is she? Is she Momo?

মুগ্ধকে জবাব দেওয়াটা প্রয়োজন মনে করিনা। ওর বুকের উপর হাতজোড়া দিয়ে ধাক্কা দেই। ও জমের মতো লেগে আছে। কেউ ওর হাত দুটোকে আঠা মেরে দরজায় লাগিয়ে দিয়েছে। আমি চরম বিরক্ত। ও আবারো বলল-

–তুমি জবাব দিচ্ছো না কেন!এ্যান্সার মি!কে তুমি! কেন তুমি চুপ আছো!

ওর ফালতু কথা শুনে মাথা গিজগিজ করছে। এমনেই জামা নষ্ট করে দিয়েছে! এখন আমাকে আহ্লাদ দেখাতে চলে এসেছে! ফালতু! গালে একটা থাপ্পর দিলাম। মুগ্ধ রেগে গেল। রাগলো… রাগলো চরম রেগে গেলো। আমার বাহু চেপে ঝাকিয়ে বললো-

–তুমি চুপ থাকবে কেন! চুপ তোমার জন্য চুজেবেল না! তুমি ওদের সামনে কেন চুপ ছিলে ব্লাডি ফুল! হোয়াট দ্যা হ্যাল ইজ উইথ ইউ!আমি তোমার সিচুয়েশন দেখলাম! তুমি ফাউ ফাউ ওদের শেমফুল কাজে চেহারা দেখছিলে! কেন কিছু করলেনা!আমায় চড় মারলেই ওদের কাজে রিভেন্জ পাবে? Why have you slapped me?হোয়াই?

-চলবে

তুমিময় প্রেম
PART 11
FABIYAH MOMO

–তুমি চুপ থাকবে কেন! চুপ তোমার জন্য চুজেব্যাল না!তুমি ওদের সামনে কেন চুপ ছিলে ব্লাডি ফুল!হোয়াট দ্যা হ্যাল ইজ উইথ ইউ!আমি তোমার সিচুয়েশন দেখলাম!তুমি ফাউ ফাউ ওদের শেমফুল কাজে চেহারা দেখছিলে!কেন কিছু করলেনা! আমায় চড় মারলেই ওদের কাজে রিভেন্জ পাবে? Why have you slapped me? হোয়াই?

সজোরে ধাক্কা দিয়ে আমার বাহু ছেড়ে হনহন করে চলে গেল মুগ্ধ। হাতের তালু দিয়ে আমি বাহু বুলাতে ব্যস্ত। মুগ্ধ হলরুম থেকে চলে যাচ্ছে, বারবার চুলগুলোকে ব্যাকব্রাশ করছে। রাগের চোটে তার পায়ের গতি বেড়েছে, আমি বাহুতে হাত ডলতে ডলতে বুঝতে পেরেছি। এতো কি রাগ তার আমার উপর? কোন্ অধিকারের ভাগ ফলাচ্ছে আবার? আমি স্থান ত্যাগ করে ক্লাসে গেলাম। সিড়ি দিয়ে উপরে উঠছি বারবার মুগ্ধের রাগী চেহারাটা ভেসে উঠছে। রাগ যে যেমন তেমন তা না, মনে হয় পুরো এক সাগর আগুনের গোলা পুষে রাখে। ক্লাসে গিয়ে সেখানেও খেলাম বিরাট ঝটকা! আজ নিউকামারদের ক্লাস হবেনা… ডিসমিস! ক্লাস পুরো খালি!সবাই ব্যাগ গুছিয়ে নিচে চলে গেছে। কেন ডিসমিস কেউ জানে না। একজন বললো, সিনিয়র দলের নির্দেশ ! দশমিনিটে ক্লাশ খালির আদেশ! বোঝা গেল, ক্লাসের ডিসমিসটা মুগ্ধদের কাজ। খেয়েদেয়ে কিছু জানে না ক্লাসে ঘটালো ব্যাঘাত!

নিচে যেয়ে দেখি ক্যাম্পাসের দক্ষিণ দিকটায় নতুন স্টেজ বানানো জায়গায় সব শিক্ষার্থী জমায়েত হয়ে দাড়িয়ে আছে। স্টেজে লম্বা মাইক বসানো হয়েছে। সেই সাথে মুগ্ধদের টিম স্টেজ দখলে উপস্থিত হয়েছে। মাইক হাতে সাউন্ড টেস্টে ‘হ্যালো হ্যালো’ করছে রামিম। রিমি জেনির সাথে হাত নাড়িয়ে নানা অঙ্গিভঙ্গিতে কথা বলতে ব্যস্ত। অন্যদিকে তন্ময়, নাসিফ, আহাদ এবং মুগ্ধ মিলে বিশেষ কিছু ব্যাপারে আলোচনা করছে। আমি কৌতুহলে বশবর্তী হয়ে স্টেজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। সামনে এক মস্ত ভীড়ের ঠেলাঠেলি। প্রচুর হৈ হুল্লোড় হচ্ছে। মুগ্ধদের আলোচনার প্রেক্ষাপট কি? তা জানার জন্য আমার মতো বহু স্টুডেন্ট দাড়িয়ে আছে। তন্ময় কথা বলতে বলতে ভীড়ের দিকে তাকালো। স্টেজ থেকে সবার মুখখানা দেখা গেলেও আমি কিছুটা দূরত্ব রেখে দূরে দাড়িয়ে আছি। একবার মনে হলো তন্ময় স্টেজ থেকে আমাকে দেখছে, আর মুগ্ধের জরুরী ডিসকাসে হু হা করে ‘হুদাই টাইপ’ মাথা ঝুলাচ্ছে। মুগ্ধের কথায় তার বিন্দুমাত্র ধ্যান নেই। মুগ্ধ সবাইকে তার কথা বোঝাতেই খেয়াল করলো তন্ময়ের দিকে। মুগ্ধ চুপ হয়ে গেল, পাশ থেকে নাসিফ মুগ্ধের চুপ হওয়ার কারন লক্ষ্য করে বুঝে গেল তন্ময়ের ব্যাপারটা। তন্ময় তাদের ইর্ম্পট্যান্ট ডিসকাশন ছেড়ে ফাউল দিকে তাকিয়ে আছে। মুগ্ধ শার্টের হাতা ভাজ করতেই চট করে গালে দিলো চড়টা! আচমকা চড় খেয়ে তন্ময় গেল চমকে। ভিড়ের চিল্লাচিল্লি সব গেল থমকে। মুগ্ধের মাথায় রাগের ভূত চেপে বসেছে। উনিশ থেকে বিশ হলেই একুশে ফেব্রুয়ারি বানিয়ে ছাড়বে। তন্ময় চড় খাওয়া গালে হাত বুলাতে থাকলে মুগ্ধ প্যান্টের পকেট থেকে ফোন বের করে কানে নেয়। কপালে জমা বিন্দু বিন্দু ঘামের কণাগুলো বুড়ো আঙ্গুলে আড় ভাবে মুছে নেয়। তন্ময় এখনো ক্যাবলা হয়ে আছে কোন্ অপরাধের শাস্তি পেলো চড় খেয়ে? মুগ্ধ কেন হঠাৎ রাগারাগী করছে। মুগ্ধ কানে ফোন লাগিয়ে কথা বলতে বলতে অন্যদিকে চলে গেলে আহাদ এসে তন্ময়কে সমবেদনা জানায়। বেচারা তন্ময় মুগ্ধের হাতে ক্রোধের থাপ্পর খেয়েছে!! ডিসট্রাক্ট হওয়ার কারন যে এক তরুণী! সেটা আড়াল করতে চাইছে। কে সেই তরুনী? কাকে দেখার প্রয়াসে থাপ্পর খেলো তন্ময়?

মাইক টেস্টের পর হাতে নিলো মুগ্ধ। সব স্টুডেন্টের চিল্লাহুল্লা অফ করতে বলে মূল বক্তব্যে প্রবেশ করলো। আজ তার মধ্যে নেতা নেতা ভাব প্রকাশ পাচ্ছে। ঠোটের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রেখে ডানহাতে মাইক, অপরহাত মুঠোকরে পিছনে গুটিয়ে দম্ভভরে দাড়িয়ে আছে মুগ্ধ। রোদ্রের রোদময় ঝিলিক গাঢ় নীলের শার্টকে অদ্ভুত ভাবে স্নিগ্ধ করছে। শার্টের হাতা গুটানো জায়গায় কালো রঙটি দেখা যাচ্ছে। ফোল্ড করাতে ভেতরের কালো রঙটি উঠে এসেছে, সেই হাত দিয়ে বারবার চুল বেয়ে ঘামে ঝরা কনাগুলো অদ্ভুত মোহনীয়!! মুগ্ধের এ অবস্থা দেখে মেয়েগুলো তো লাটে ক্রাশট্রাশ খেয়ে মরে যাবে! দায়ভার কি মুগ্ধ নেবে?? মুগ্ধ স্টেজে পায়চারী ভঙ্গিতে হাটতে হাটতে ঠোটে হাসির রেশ ফুটিয়ে বলে উঠলো,

–হ্যালো এভ্রিবডি! সবাইকে তপ্ত রোদের নিচে প্রাণঢালা শুভেচ্ছা জানিয়ে আমি রাদিফ মুগ্ধ আপনাদের সামনে কিছু জরুরী ব্যাপারে কথাসমূহ পেশ করতে যাচ্ছি। সবাই জানেন প্রতিবছর আমাদের সামারফিল্ড ক্যাম্পাস আমোদ-ফূর্তিতে এডভান্স! এবারও আমরা পিছিয়ে থাকবো না, পিছিয়ে থাকার কথাই আসেনা। এ্যাট ফাস্ট! আমরা নিউ স্টুডেন্টদের ‘নবীন বরন’ উদযাপন করবো। দ্যান আমাদের ‘শিক্ষাসফর’। শিক্ষাসফর শেষে ট্রেডিশনাল ফেস্টিব্যাল ‘বাংলা নববর্ষ’, ‘ক্লাস পার্টি’, ‘রিসার্চ-ট্যুর এসাইনমেন্ট’, লাস্টলি আমাদের সিনিয়র ব্যাচের ‘র‍্যাগ ডে’। আপনারা জানেন ক্যাম্পাসে আমরাই সিনিয়র। আমাদের এটা লাস্ট ইয়ার। কাজেই প্রত্যেকটা সেলিব্রেশন আমরা আমাদের মতানুসারে করবো। প্রত্যেকটা কাজে আমাদের এক্সট্রা হেল্পের হাত লাগবে। তাই ইউ নিড হেল্প গাইজ! কাল আমাদের ক্যাম্পাসে ‘নবীন বরন’ আই হোপ এভ্রিওয়ান নোস এবাউট ইট! আগেই নোটিশ বোর্ডে নোটিশ দেওয়া হয়েছিলো। সো কাল আমাদের নবীন বরন উৎসবে সবাইকে সকাল দশ ঘটিকার সময় উপস্থিত থাকতে আমন্ত্রণ করা হলো। থ্যাংকিউ।

.
.

ক্যাম্পাস থেকে সবার আগে আমি বের হলাম। উদ্দেশ্য একটাই মুগ্ধের সাথে আমি গাড়িতে করে যাবো না। নিজেই একটা রিকশা ধরে তার আগে বাসায় যেয়ে ফাইজাকে পড়িয়ে আসবো। যেই ভাবা সেই কাজ, আমি রিকশা করে রাস্তা চিনে চিনে ওদের বাসায় পৌছাই। মেইন বড় গেটের কাছে রিকশা থামালে আমি রিকশা থেকে নেমে ভাড়া চুকিয়ে গেটে নক করতেই দারোয়ান কাচুমাচু করে গেট খুলে দিলো। তার মুখের ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে কেউ তাকে ঠাটিয়ে দুটো চড়ের হুমকি দিয়েছে। ভয়ে পুরোপুরি ভিজাবিড়াল হয়ে গেছে। দারোয়ান দরজা খুলে দিয়ে মাথা নিচু করে আছে, আমি অবাকের দৃষ্টিতে ভেতরে ঢুকে যেতে নিলে পেছন থেকে দারোয়ান কাপা কাপা গলায় বলে উঠে-

–আফা,

আমি ‘আফা’ ডাক শুনে পিছনে তাকাই। দারোয়ান চোখে তাকিয়ে কথা বলতেই ঢোকের পর ঢোক গিলছে। আমি কপালকুচকে কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম-

–কি মামা? আপনি মিনমিন করে কাহিনি করা বন্ধ করবেন? গলা ঝেড়ে বলুন তো, ব্যাপার কি!
দারোয়ান মামা মাথার টুপিটা বগলের নিচে গুজে থমথম গলায় বলে উঠলো-
–আফা আফনে এট্টু ওইহানে যাইবেন? নাইলে এই গরীবের চাকরি নট হইয়া যাইবো..
–আশ্চর্য তো! শুধু শুধু চাকরি নট হবে কেন?
–আফা এই গরীবের ইট্টু উপ্কার করেন আফা, ইট্টুখানি ওইহানে যান।

দারোয়ান মামা গাড়ির পার্কিং লটের ওখানে যেতে ইশারা করছে। পার্কিং লটে কয়েকটা গাড়ি থামানো। পিছনে আরো গাড়ি আছে কিনা জানি না, থাকতেও পারে। বিশাল বড় এরিয়া জুড়ে ছিমছাম অবস্থাযুক্ত পার্কিং লট। এই লটে ঢোকার এন্ট্রিপথই তিনটা। আর এই গেটসহ টোটাল চারটা। আমি একপ্রকার বাধ্য হয়েই পার্কিং লটের ওখানে গেলাম। দুপুরের কড়া কাঠফাটা রোদ, তার উপর সকাল থেকে প্রায় না খাওয়া আমি। সব মিলিয়ে শরীরে কি পরিমাণ যন্ত্রণা কাজ করছে একমাত্র আমি জানি। প্রথম দুইটা বি.এম.ডব্লিউ গাড়ি পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে গেলাম। তব্দা টাইপ নিরিবিলি, একটা কাক-পঙ্খিও নেই, এখানে কেন যেতে বললো মামা? কিছু ধরতে পারছিনা। পা ঘুরিয়ে চলে আসতে লাগলাম। হঠাৎ হাতে হেচকা টান অনুভব করলাম! ছিটকে গিয়ে তিন নাম্বার গাড়ির উপর পড়লাম। হাতে জোরেসোরে ব্যাথা পেলাম, মাথা তুলে হাতে হাত দিয়ে ডলতে ডলতে ঘুরে তাকাতেই দেখি পকেটে দুহাত ঢুকিয়ে দুই নাম্বার গাড়ির সাথে ঠেস দিয়ে মুগ্ধ দাড়িয়ে আছে। বা-ভ্রু খুব উচুতে তোলা, ঠোট কামড়ে কটমট করছে। মুগ্ধকে দেখেই আমার মাথায় রাগের ঝাপটা বাজ ফাটিয়ে দিলো! মনে মনে ভয়াবহ একটা গালি ছুড়ে মারলেও মুগ্ধ আমার আগেই ধমকের সুরে বলে উঠলো-

–থাপ্পর চিনো? লাইফে থাপ্পর খেয়েছো! গুণে গুণে দশটা থাপ্পর বসালে টেস্ট কেমন হয়! ইউ নো? চামড়া লাল করে দেবো বেয়াদ্দব মেয়ে!

আমি কপালকুচকে মুখ অল্পবিস্তর হা করে আছি। কি বলছে না বলছে, সব মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে!! মুগ্ধ দু’কদম এগিয়ে আসলো। আমি পা পিছিয়ে গাড়ির সাথে সেটে গেলাম। ভয়ে ধকধক করছে, মুগ্ধ সামনে দাড়িয়ে দু’পকেটে দাত ঢুকিয়ে রাগে ফুসফুস করছে।সত্যি সত্যি যদি ধরাম করে চার-পাচটা চড় মারে ! তাহলে তো গালের চামড়া খুলে রাস্তায় গড়াগড়ি খাবে! কি সর্বনাশ!! মুগ্ধ গলার স্বর আরো তীক্ষ্ম করে রাগান্বিত সুরে উঠলো-
–এটিটিউট কাকে দেখাও? মুগ্ধকে! আমাকে রেখে চলে আসছো কেন? সাহস দেখাতে? কত্ত বড়ো সাহস তোমার! একদম পা ভেঙ্গে হাতে ধরিয়ে দিবো ব্রেনলেস ডাফার কোথাকার !

মুগ্ধ রাগ ঝেড়ে একদফা মুখের বুলি শোনালো। ওর মুখের করুণ অবস্থা দেখে আমার পক্ষে পাল্টা কথার জবাব দেওয়া হলো না! আমি মম চুপচাপ শান্তশিষ্ট ভদ্রবিশিষ্ট মেয়ের মতো কুজে গেলাম। আমার সাথে কিসের রাগারাগী? মুগ্ধের সাথে গাড়িতে করে আসতেই হবে এমন কোনো পেপার সাইন আছে নাকি! কি নিয়ে আমার সাথে ক্যাচক্যাচানি! মুগ্ধ ‘ফলো মি! কুইক!’ বলে নাক ফুলিয়ে চলে যেতে লাগলো। আমিও নির্বিকার ভঙ্গিতে যেতে লাগলাম।

ফাইজা আমাকে পেয়ে পূর্বের মতো হাসিখুশিতে পরিপূর্ণ হলো। আমি চেয়ার টেনে ওকে বসিয়ে পাশে আরেকটা চেয়ার টেনে বসে পড়লাম। ফাইজা খুব মিস্টি মিস্টি কথার প্রহর আনতে পারে। মেয়েটা খুবই মায়াবী। আমি পড়ানো শুরু করলে মুগ্ধ রুমে গটগট করে প্রবেশ করে। ফাইজার নরম তুলতুল ফোমের বিছানায় গা এলিয়ে শুয়ে পড়ে। মাথা উচু তুলে মাথার নিচে দুহাত রেখে দেয়। একদম ডোন্ট কেয়ার মুডে সিলিংয়ে লাগানো তিনপাখার ফ্যানের দিকে তাকিয়ে থাকে। আড়চোখে আমি সব পর্যবেক্ষণ করছি। মুগ্ধ কি কি করছে সবই বুঝতে পারছি।

সময় দেড় ঘন্টা পেরুলো। ঘড়িতে আড়াইটা বাজলো। মুগ্ধ এখন ম্যাগাজিন হাতে আধশোয়া স্টাইলে বিছানার সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে। ফাইজা অংক কষছে। মুগ্ধ কি নিয়ে যেন ছটফট ছটফট করছে। খুচখুচানি বিহেব দেখাচ্ছে। বেডের পাশে টেবিলে রাখা জগ থেকে একনাগাড়ে এক চুমুকে দুই তিন গ্লাস পানি গিলছে। আবারো বিছানায় শুয়ে ম্যাগাজিন হাতাচ্ছে। ফাইজার কমিক বুক খুলে নেড়েচেড়ে দেখছে। জগ থেকে পানি ঢেলে ঢকঢক করে পানি গিলছে। অস্থির হয়ে উঠছে। আমি ফাইজার দিকে তাকিয়ে থাকতেই মুগ্ধ ফট করে বলে উঠলো-

–এই শোনো তো!

ফাইজা চেয়ার থেকে মাথা বাকা করে পিছনে ঘুরে বলে উঠলো-
–চাচ্চু তুমি ফাইজার মিসকে ডাকছো কেন? ফাইজা এখন পড়ছে,
মুগ্ধ চেহারায় অস্থিরতার গম্ভীরভাব কেটে দিয়ে ফাইজার জন্য হাসিমুখে বলে উঠলো,

–আম্মাজান!!! আপনার টিচারের সাথে প্রাইভেট টক আছে আম্মাজান!বেশি না… একটুখানি বলবো!! একটুখানি, প্লিজ??
ফাইজা মুখে হাত চেপে খিলখিল করে হেসে বলে উঠলো-
–ঠিক আছে বাচ্চাজান!! ফাইফার মিসকে নিয়ে টক – টক করেন!!
–আম্মাজান! আপনি একটু বাইরে যাবেন? নিচে আপনার জন্য র্সাপ্রাইজ আছে দেখবেন প্লিজ??
–সাপ্রাইজ!!! আমি যাবো আমি যাবো!!

ফাইজা চেয়ার ছেড়ে দৌড়ে চলে গেলো। মাঝখানে আমি চাচা-ভাতিজির কান্ড কারখানাতে জোকার বল্টু হয়ে গেছি। একদল বলছে আম্মা! অন্যদল বাচ্চা! মাঝে আমি খাই কারেন্টের ঝটকা! ফাইজা যেতেই ধপ করে বিছানা থেকে নেমে দাড়ালো মুগ্ধ। দ্রুত রুমের দরজা ঠেলে দিয়ে আমার সামনে ফাইজার চেয়ার টেনে বসলো। হোহো করে শ্বাস ছাড়ছে মুগ্ধ। হাপানি রোগীর এনহেলার নষ্ট হলে যেরূপ থেরাপি দেওয়া লাগে মুগ্ধ এখন রোগী সেজে আমার সামনে তেমনভাবে শ্বাস নিচ্ছে। আমি ভ্রু কুচকে খোচা মেরে জিজ্ঞেস করি-

–মরে যাবেন নাকি? কাফনের কাপড় আনবো? শেষ ইচ্ছা কি, রিপোর্টে বলুন ! আমি নিউজপেপারে ছাপিয়ে দিচ্ছি, একটা রোগী শ্বাসকষ্টে রোগী কুতুকুতু করছে।

মুগ্ধ কঠিন চোখে তাকালো! চোখ দিয়ে ছুড়ি মারার ব্যবস্থা থাকলে এতোক্ষনে মুগ্ধ আমায় খুন করে কুটিকুটি করে ফেলতো! কি ভয়ংকর চাহনি!! মুগ্ধ চোখের অগ্নিদৃষ্টি পাল্টে স্বাভাবিক দৃষ্টিতে অসহায় ভাবে মাথা নুয়ে আছে। আমার কোলে থাকা ব্যাগ থেকে ফোনটি হঠাৎ ভাইব্রেট হয়ে বাজতে লাগলো। আমি ফোন বের করে কল রিসিভ করে ইসুর সাথে কথা বলতে নিলে পাশ থেকে মাথা নুয়ে মুগ্ধ কি বলে শুনতে পাইনা। মুগ্ধ সুরের ভলিউম একটু বারিয়ে কি কি যেন বলতে শুরু করলো।

“তোমাকে আমি আদর করতে চাই! তুমি দূরে থাকলে ধুকেধুকে মরি! শ্বাসকষ্ট হয় প্রচুর! রাতে ঘুমাতে পারি না! ক্যাম্পাসে তোমার পাত্তা মিলে না! আশ্চর্য হই আমি! আমি কেমন হয়ে গিয়েছি। আমার মাথা ফাটিয়ে ইনসাল্ট করেছো তুমি! আমি তোমার পেছনেই মাথা হেট করে পাগলের মতো চলছি! ক্যাম্পাসে সব জুনিয়ররা, বিপক্ষ দলের শত্রুরা সবাই ফায়দা উসুলে আমার সেল্ফ রিসপেক্টের পানি বানাচ্ছে! ইজ্জতের নস্টালজিক এক্সকিউজ করছে! আমি শ্বাস নিতে গেলেও কষ্ট পাই! তুমি ফাইজাকে পড়াও আমি চুপিচুপি তোমাকে দেখি! মাত্র দুটা ঘন্টা! মাত্র দুটা ঘন্টা কাটায় কাটায় পড়িয়ে তুমি চলে যাও! একটা নিরীহ প্রাণী বোবা সেজে তোমার আশায় পথ চেয়ে থাকে একটাবারো জানার চেষ্টা করেছো? তোমার এই ডেভিল লুকটা দেখার জন্য ইচ্ছে করে বলে তোমার ড্রেসে কালি দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি! আমি সরি! সরি আমি! নিজের উপর ছিঃ ছিঃ করেছি, কেন তোমার প্রতি জটিল কায়দায় আসক্ত হয়ে গেছি! আসক্ত হয়ে কতবার যে কন্ট্রোল হারিয়েছি! মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে হাতটা টেনে বুকের সাথে জাপটে ধরি! ইচ্ছে করে…তোমার হাতে হাত রেখে রাতের নিশিপথ হাটি। কত যে ইচ্ছা আমার ! কত যে বাসনা! এ কদিন তোমায় নিয়ে আমি করেছি বহু কল্পনা! কল্পনার জগতে তুমি আমার জন্য বিদ্যমান! হাতে হাত রাখলে হাতটি থাকবে আমার! পাশাপাশি হাটলে মানুষটি হবো তোমার! আকাশ চিড়ে বজ্রপাতের শব্দ হলে চিৎকার দিয়ে জাপটে ধরবে তুমি! কোনো ভুল-ত্রুটি করলে কান ছিড়ে অভিমান দেখাবে খুবই ! ঝগড়া-ঝামেলা শেষে দূরে যাওয়ার ভয় দেখাবে! আমি আরো রাগ দেখিয়ে তোমায় দূরে যেতে বলবো, তুমিও প্রচণ্ড রেগে গিয়ে দূরে চলে যাবে! দিনশেষে পাগলের মতো এলোমেলো হয়ে গেলে, তুমি ফিরবে আমাকে গুছাতে! কিছুদিন তুমি কথা বলবেনা, কিছুদিন তুমি আদর করবেনা, কিছুদিন তুমি চুপটি করে থাকবে, কিছুদিন পর আবারো স্বাভাবিক হয়ে এই রাদিফ মুগ্ধকে ডাকবে!! অপেক্ষায় আছি প্রিয়….নিরবতার কারাগার ভেঙ্গে জবাব একদিন দিও….

মুগ্ধ চোখ বন্ধ করে বুকের উপর চাপা পাথর সরিয়ে ঝটপট করে কথাগুলো বলে দিলো। কি পরিমাণ সাহস করে কথাগুলো বলেছে!! এই সাহস যদি রণক্ষেত্রে দেখানো যায় জিত ছিনিয়ে গোটা রাজ্যে রাজ্যত্ব করা যাবে!! মুগ্ধ ঘন ঘন নিশ্বাস ছাড়ছে। জোরে জোরে শ্বাস ছাড়তেই চোখ খুলে যা দেখলো পায়ের নিচ থেকে মাটি খসে যেতে লাগলো। তার প্রেমপূর্ণ কথাগুলোর একটিও তার প্রিয়তমা প্রিয়া কানে তুলেনি! সে ফোনের ওপাশে বান্ধুবী নামক জীবের সাথে কথা বলতে পুরোই ব্যস্তময়ী!

-চলবে

-Fabiyah Momo

তুমিময় প্রেম

তুমিময় প্রেম
PART 12
FABIYAH MOMO

আমি ফোনটা কান থেকে থেকে রাখতেই দেখি মুগ্ধ হা করে আমার দিকে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। ওর ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে বেচারা জোরেসোরে একটা ধাক্কা খেয়েছে। আমি কপাল কুচকে ওর চোখের সামনে তুড়ি বাজিয়ে বলে উঠলাম,

–এই যে হ্যালো! কি হ্যাঁ? কি? আমার দিকে খাচ্চরের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছো কেনো? চোখের কোটর একদম নিচে কর! নিচে করো বলছি! কাটাচামচ ঢুকিয়ে এমন ঘুরান্টি দিবো না, এক্কেবারে সানডে মানডে ফাদারস দে সব ভুলিয়ে গঙ্গার পানিয়ে ভাসিয়ে দিবো! ফালতু লোক কোথাকার! সাবধান আরেকবার যদি লুচ্চামির নজরে চোখ দিতে দেখছি!!!….চোখ নিচে!

মুগ্ধ বিষম খেয়ে হতভম্বের মতো চটপট মুখ বন্ধ করে চোখ নিচু করলো। ফাইজা এখনো আসছেনা। ঘড়িতে এখন বাসায় ফেরার সময় হয়েছে। আমি মুগ্ধকে বলে উঠলাম-

–তোমার ভাতিজি আর পড়বে? আমার তো মনেহয় নাহ্। র্সাপ্রাইজ দিতে পাঠিয়েছো, আর তো আসবে না। তাহলে আমি আজকের মতো উঠি?
মুগ্ধ কি যেন বিড়বিড় করে বললো। আমি শুনতে পাইনি।

–আমাকে সাথে নিয়ে উঠো!! একা একা এই অবুঝ ছেলেকে পাগল বানিয়ে চলে যাবে??প্লিজ একটা বার হাতটা ধরে বলো, ‘চলো’?

মম মুগ্ধের বিড়বিড়ানি শুনতে না পেয়ে রেগে গেলো।সে চেচিয়ে বলে উঠলো,

–এই হ্যালো! তুই জোরে জোরে কথা বলবি? নাকি হাতের উল্টোপিঠের থাপ্পর দিবো! কি করবো? বল!! বল!!জলদি বল!!

মুগ্ধ মমর ‘তুইতোকারি’ ভাষা শুনে মুখ কুচকালো। শক্ত গলায় কিছু খারাপ কথা বলতে যেয়েও নিজেকে পবর্তসমান কন্ট্রোল করে বুক ভরে নিশ্বাস ছাড়লো। চোখ খুলে জোরপূর্বক হাসি দিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে উঠলো,

— তুইতোকারি করেনা মিস মম পাকনি, সিনিয়র ছেলেদের ‘তুই’ করে বলতে হয়না… আ’ম ইউর সিনিয়র ইউ নো, না? ফোর ইয়ার সিনিয়র??রাইট ??

মম রাগে গজগজ করলেও মুগ্ধকে টেনে দুটো থাপ্পর বসালো না। সে নাক দিয়ে রাগী শ্বাস ছেড়ে ব্যাগের ফিতা আকড়ে উঠে দাড়ালো। হনহন করে চলে যেতে নিলে মুগ্ধ মমর যাওয়ার পানে তাকিয়ে বলে উঠলো,

–মিস মম? একটা ইর্ম্পট্যান্ট কথা ছিলো?

পেছন থেকে মুগ্ধের গলা শুনে রুম থেকে বের হওয়া আটকে গেল মমর। সে কাধের ফিতাটা আরো শক্ত করে মুঠো চেপে মুগ্ধের দিকে ঘুরে তাকালো। তার চোখেমুখে ভীষন বিরক্তি। মুগ্ধ কাচুমাচু করে বলল,

— একচুয়েলি…কাল ক্যাম্পাসে একটু তাড়াতাড়ি আসতে পারবে? না আসলে হয়েছে কি…কাল তো ‘নবীণ বরণ’ অনুষ্ঠান, আবার হেল্পার মানুষও কম। বাজেট শর্ট, বুঝোও তো, কম বাজেটে কত কাজ!!আমার একটু হেল্প লাগবে বুঝছো? যদি তুমি কাল আস…

মুগ্ধ বলা শেষ না করতেই মম একপ্রকার তেড়ে এসে ঝাঝালো গলায় বললো,

–খবরদার! খবরদার তুই যদি আমায় হেল্পের জন্য ডাকিস! তোর হেল্পের জন্য আমি জীবনেও আসবো না ! তুই আমাকে যে টর্চার করেছিস আরো কি কি যে বলেছিস আমি কিচ্ছু ভুলিনি! আমায় একটা বার যদি কল করার হিম্মত করিস, তোর কলিজা বরাবর ছুড়ি বসিয়ে দিবো! খবরদার !

মম আগুনের মতো সব কথা ছুড়ে বাইরের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো। পিছু থেকে একজোড়া নয়ন স্থির চাহনিতে তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে আছে। মুখের উপর অতোগুলি কথা শুনে মনটা উদাস হয়ে দুই টুকরা হয়ে গেল তার। মম যেতেই মুগ্ধ টেবিলে ধাম করে থাপ্পর বসালো। রাগে ঠোট কামড়ে ফাইজা চেয়ার উপড়ে ফেললো! নিমিষেই চেয়ারের একপায়া খুলে পুরো চেয়ারটা লন্ডভন্ড হয়ে গেলো। মুগ্ধ চুলে দুইহাত ঢুকিয়ে বেডে ধপ করে বসলো। ইচ্ছা করছে চুল টেনে ছিড়ে ফেলতে! সব শেষ করে দিতে! সব খতম করে দিতে! কেন? কেন এমন হলো আমার সাথে? আমি কি ভুল করেছি ও আমাকে বুঝতে যেয়েও বুঝতে পারেনা! কেন ওর প্রতি ফিলিংস চলে আসলো? কেন? কেন? কেন আল্লাহ? কেন?

মুগ্ধ চিৎকার হট্টগোল করছে। খুব জোরে জোরে চিৎকার করে রুমের মধ্যে কথা বলছে। রুমের চার দেওয়ালে মুগ্ধের ধ্বনি ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনিত্ব হচ্ছে। হঠাৎ মুগ্ধের চেচানো শোরগোল পেয়ে ফাইজা রুমে দৌড়ে আসে। এসে দেখে মুগ্ধ বেডে বসে দুইহাতে মুখ ঢেকে চেচামেচি করছে, নিজেই নিজের সাথে কথা বলছে।

–চাচ্চু…
ফাইজার কৌতুহল গলায় ‘চাচ্চু’ ডাক শুনে হুশ ফিরে মুগ্ধের। মাথা তুলে ফাইজাকে দেখেই মুগ্ধ বেড থেকে উঠে দাড়িয়ে ঠেলেঠুলে হাসি দেয়। ফাইজা ফ্যালফ্যাল করে মুগ্ধের দিকে তাকালে মুগ্ধ ফাইজাকে কোলে তুলে রুমের বাইরে নিয়ে যায়। লিফটের বোতাম ‘UP’ চেপে ফাইজার গাল টেনে বলে,

–আম্মাজান? এভাবে তাকিয়ে কি দেখছেন হু? ফাইজার চাচ্চু কি এক্সট্রা কিউট লাগছে নাকি!! আচ্ছা…চাচ্চুর আইসক্রিম র্সাপ্রাইজ কেমন লেগেছে আম্মাজান??

ফাইজা এখনো অবাক চোখে হা করে আছে। মুগ্ধ ফাইজার কপালে চুমু দিয়ে দিলো, ফাইজার বেবিগুলো মাঝে সিথি করে বলে উঠলো,
–আম্মাজান? ছাদে চলুন। খেলাধুলা করে আসি কেমন?

মাঝে সিথি কেটে মুগ্ধ ফাইজার লাল টুকটুকে গালে চুমু বসিয়ে দিলো। লিফটের দরজা কুলতেই মুগ্ধ ফাইজাকে নিয়ে ছাদের বাম কোনাটায় গেল। সাদা টাইলস বসানো ছাদ। টাইলসের উপর সূর্যমুখী ফুলের ডিজাইন করা। ছাদের একপাশে ছাউনি দিয়ে বসার জায়গা, অপরপাশে নানা ফুল ও ফলের গাছ লাগানো বাগান। ছাদে এসময় রোদের তপ্তটা খুব বেশি থাকার কথা কিন্তু আজ রোদের প্রকোপ কম। চারিদিক থেকে বাতাস ছুটে আসছে। বাতাসে হেলছে মুগ্ধের কপালের চুল, উড়ছে মাথার তালুর চুলগুলোও। ফাইজা মুগ্ধের গলা জড়িয়ে আছে দু’হাতে। মুগ্ধের কাধে ফাইজা মাথা হেলে দিয়ে চুপটি করে আছে। মুগ্ধ ছাদের রেলিংয়ের কাছে তুলোয় ভরা মেঘের আকাশ দেখছে। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা উড়ছে। দিক দিগন্তে ছুটে চলছে মেঘগুলো।

–চাচ্চু…তুমি চিৎকার করছিলে কেন…

ফাইজা নরম গলায় প্রশ্ন করে মুগ্ধকে। মুগ্ধ ফাইজার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে উঠে,

–আম্মাজান আপনার চাচ্চু না একটা সুন্দর জিনিস পছন্দ করে। জিনিসটা আপনার চাচ্চুকে সহ্য করতে পারেনা। আপনার চাচ্চু যখন ওই জিনিসটা না পায় তখন পাগলের মতো চিৎকার করে আম্মাজান…
ফাইজা বাচ্চাসুলভ মায়ায় মুগ্ধকে বলে উঠে,
–তুমি ওটা কিনে ফেলো চাচ্চু, ফাইজার চাচ্চু যা চায় সব কিনতে পারে, তোমার সুন্দর জিনিসটাও কিনে ফেলো চাচ্চু…

মুগ্ধ ঠোট কামড়ে বুকভর্তি নিশ্বাস ছাড়ে। নিশ্বাসের পরীক্ষা করলে হয়তো রিপোর্টে ধরা পড়তো, “মুগ্ধ নামক পেশেন্টের নিশ্বাসে সাংঘাতিক রোগ ধরা পড়েছে! রোগের নাম ‘দুঃখপূর্ণ যন্ত্রনা’। এ যন্ত্রণায় সে দ্বিতীয় স্টেজে আছে!! যদি শিগগিরি এর চিকিৎসা করানো না হয় তাহলে রোগী কষ্টযন্ত্রনায় অকালে মারা যাবে, কষ্টদায়ক মৃত্যু হবে ডক্টর!!” কিন্তু আফসোস! “দেহের চিকিৎসা আছে, মনের চিকিৎসা নেই।”

.
.

বাসায় এসে কাপড়চোপড় পাল্টে বিছানায় গা এলিয়ে শুলাম। টিউশন টিউশন টিউশন!! উফ! টিউশনি করতে করতে শরীরের অবষাদ, রাত জেগে জেগে লেকচার নোট, সকাল সকাল ঘুম ভেঙে জেগে উঠা…..মধ্যবিত্ত মেয়েদের রোজকার রুটিন। রুটিনটাও অদ্ভুত! যত খাটনি তুমি করো না কেন, দিনশেষে রোজগারের টাকাগুলো দেখে এক নিমিষেই দুঃখ গুলো ছুটি পায়। অপেক্ষায় কাটানো মাসের শেষের সপ্তাহটা ঈদের মতো অস্থিরতায় কাটে!! “কবে আসবে ঈদ কবে দেখবো ঈদের চাদঁ!!” ঠিক এরকমই আমার ক্ষেত্রে ঘটে টাকাগুলোর জন্যে , “কখন আসবে মাসের শেষ তারিখ?? কখন পাবো টিউশনির টাকাটা!!”

চোখে জগতের সব ঘুম এসে কড়া নেড়েছে। কাল ‘নবীন বরন’, সকাল সকাল না উঠলে কি মজা আছে? ইসরাত আসবে, ওর সাজগোজের কারখানা দেখতে হবেনা?? ভুতনি সেজে কাল হট হট ছেলেদের দেখবে বুঝিনা?? বুঝি বুঝি!! সব বুঝি। আমিও
হাই তুলে কাথা টেনে ঘুমের জন্যে ওকাত হবো ওমনেই ফোনটা পচা রিংটোনে বাজতে লাগলো। ঠোট উল্টিয়ে ফোনের দিকে তাকাতেই এক জগ পানি ফোনের উপর ছুড়ে মারতে মন চাইলো। ঘুমের রাজ্যে ঘুম তাড়ানো শত্রুগুলা একেকটা বদমাইশের দল! ভয়ংকর কটা গালি মনে মনে বলে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখি ইসুর কল! না চাইতেই মুখ ফসকে ‘বজ্জাতের ঢেকি’ গালিটা চলে আসলো!

–হ্যালো মম জান্টু! দোস্ত কালকে কি শাড়ি পড়বি??? দেখ্ আমরা কিন্তু ম্যাচিং ম্যাচিং পড়বো বলেছিলাম!! তুই কিন্তু কথা ঘুরাবি না মম!! সাবধান!
আমি ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখে হাই তুলে বলে উঠলাম,
–ইসু…আআমার ঘুঘুমে ধরছে, কাল আয় পরে দেখতেছি…
–ওয়্যাক আপ মম! কাল আমাদের নবীন বরন দোস্ত!! নবীন বরন! তুই ভুলে গেলি?? কত প্ল্যানিং করছি এই নবীন বরন নিয়ে!! এটা করবো ওটা করবো, এই শাড়ি পড়বো! ওই কালার পড়বো! ওই ঝুমকা পড়বো! ভুলে গেলি? তুই মুখে পানি দে তো! চোখের ঘুম তাড়া!
–ওই শালী ! বজ্জাত অর্কমা! শালী রাত সাড়ে এগারোটা বাজে তুই আমাকে কল দিয়ে বলতেছিস নবীন বরনের শাড়ি কি কালার চুজ করছি! থাবড়ায়া চাপার দাত খুলে ভ্যাবলা বানায়া দিবো, শালী বদমাইশের ঢেকি! ফোন রাখ্!
–বইন তুই হাইপার হয়ে আছিস কেন? কে কি করলো আবার? কার রাগ কার উপর ঢালিস তুই?? কি হইছে সত্যি করে বলবি!!
মম গম্ভীরভাবে বললো,
–কালকে কিসের উৎসব?
–আবার জিগায়! কাল নবীন বরন! আমাদের নিউ কামারদের উৎসব!কত সাধনার পর নবীন বরন দিছে….ইশশশ!
–এইবার লাইনে আসছো তুমি! শুনো ইরানির মা! আমাদের এইটা ‘নবীণ বরণ’ না! এইটা হলো ‘প্রবীণ বরণ’ উৎসব! আজাইরা কাজে সেমিস্টারের এক সপ্তাহ আগে সিনিয়রের গাধাগুলা উৎসবটা দিছে!!
–তুই সোজা রাস্তা ধরে কথা বলবি? সিনিয়র কি আবার কিছু করছে? কিছু বলছে তোরে?কালকের উৎসব নিয়ে??
–হ্যাঁ বলছে! আমাকে আগে আসতে বলছে! তার মধ্যে বলছে হেল্পও করতে! আমি না করে দিছি।
–তুই ‘না’ করে দিছিস? ওই মাইয়া কি করলি এইটা?? সিনিয়র ভাইরা তোরে কাজে রাখতে চায় তুই না করলি?তুই জানিস এইটা কতো বড় অপরচুনেটি ছিলো? ওরা একটা ইশারা দিলে তোর প্র‍্যাক্টিক্যাল মার্কস আর এসাইনমেন্ট নাম্বার ফুল আসবো আসতো !

–আহাহাহাহা…আমার কত ঠেকা! আমি কি ভোতা স্টুডেন্ট ইসু? ব্রেন নলেজ কি মাথায় নেই? ড্যামিশ আমি?? সিজিপিএ খারাপ আমার?? দেখিস দেখিস…ক্লাসে টপ গ্রেডে উঠাবো! তাও ওদের হেল্প চাবো না প্লাস হেল্প করবোও না! না মানে ন আকার না ! বায় !

ইসরাত মমর ধমকি খেয়ে ফোন রাখলো। ক্যাম্পাসের সিনিয়ররা আজ পযর্ন্ত নিজেদের কাজে নিউ স্টুডেন্টের কাছে হেল্প চায়নি মম এমন কি করলো ওর কাছে হেল্পের আবদার করলো? ও তো দেখতে সুন্দরও না, কালো। এমন মেয়ে দেখে মুগ্ধ ভাইয়ারা সিলেক্ট করলো? ওর মধ্যে ব্রেন ছাড়া কিছু নাই গোল্লা। হাহ্! কালকে আমি ওর থেকে অনেক সুন্দর সাজবো! দেখি মুগ্ধ ভাইয়া কিভাবে আমার দিকে না তাকায়!! ওর মতো ম্যাচিং শাড়ি পড়বো? কি শখ! ওর মতো ম্যাটম্যাটে কম দামী শাড়ি পড়বো না! সবচেয়ে দামী শাড়িটা আমি পড়বো! পুরো ক্যাম্পাস কাল আমার দিকে ঘুরঘুর করে দেখবে! আর ওর না রূপ! না আছে ফ্যাশন! ক
খ্যাত একটা…তাও কি ভাব ওর হুহ! যত্তসব বান্ডুলা ঢঙ! একবার ওর নোটগুলা পাই খালি !সেমিস্টারে যে খেলা দেখা দেখাবো না!! টপ গ্রেড না, একদম ফেল্টুস ইজ্জত লুটিয়ে ছাড়বো! যেমন র‍্যাগিংয়ে করেছিলো চুল কেটে তেরোটা বাজিয়ে হা হা হা হা !!! আমাকে চিনে না, আমি ইসরাত কি জিনিস!! চিনে না!!

–চলবে

Fabiyah Momo

তুমিময় প্রেম
PART 13
FABIYAH MOMO

সকাল কয়টা বাজে জানি না সোনালী রৌদের তপ্ততার কারনে চোখের ঘুম সরে গেছে। এখন ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছে করছেনা। আজ শুক্রবার, সরকারি ছুটির দিন উহু…ঘুমানোর দিন! এইদিনে সবাই হাত পা ছড়িয়ে দশটা এগারোটা অবধি নাক ডেকে ঘুমাতে পারে। উফ কি যে শান্তি! ঘুমে ঢুলু চোখে ঘড়িতে একবার দেখে নিলাম…সকাল দশটা বেজে পাচঁ মিনিট। আজ নবীন বরণ অনুষ্ঠান, অনুষ্ঠান শুরু হবে বারোটায়। দেরি করা চলবেনা আমার। হাই তুলে বিছানা থেকে নেমে ফ্রেশ হয়ে চোখ কচলাতে কচলাতে বাইরে গেলাম। আম্মু পরোটাগুলো টেবিলের উপর রাখছেন। আব্বু গপাগপ গরম পরোটা সাথে গাঢ় করে মাখামাখা মাংসের ঝোল লাগিয়ে ফু ফু করে খাচ্ছেন। দেখেই বোঝা যাচ্ছে খেতে খুব সুস্বাদু এবং অসাধারণ হয়েছে! অবশ্য মায়ের হাতের রান্না বলে কথা, আলাদা একটা অদৃশ্য জাদু কোত্থেকে যেনো খাবারে মিশে যায় আর টেস্ট শতগুণে বাড়িয়ে দেয়। বাসার সবাই ন’টার মধ্যে খাওয়া পর্ব সেরে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, সেজায়গায় আজ দেখি ছুটির দিন উপলক্ষে দশটায় খাওয়া চলছে! সর্বনাশ ! আম্মু এজন্যই টেপ মেরে আছে। গম্ভীর মুখে ধামধুম গ্লাস প্লেট রাখতে গিয়ে শব্দ করছে।ঝড়ের আগে প্রথম যে সুনশান নিরবতা হয় তা দেখছি….লক্ষন তো ভালো না ভাই। আম্মু আমাকে দেখে একবার ধারালো দৃষ্টি ছুড়লো। বুকটা ধক করে কেপে উঠলো। আম্মু ফণা তুলা রেডি হয়ে আছে, সুযোগ পেলেই জোশ ভাবে সুযোগের সৎ ব্যবহার করবে। আমি ছোট্ট নিশ্বাস ছেড়ে বড় ঢোক গিলে মৃদ্যু হাসিতে চেয়ার টেনে বসলাম। আম্মু আব্বুকে চা দিতেই আব্বু চায়ের কাপে চুমুক দিলো। ওমনেই মুখ বেজার করে বলে উঠলো আব্বু,

–মমর মা, চায়ে চিনি বেশি দিছো কেন গো? এই বয়সেই মেরে ফেলবা নাকি? নাতি নাতনি দেখার সুযোগ দিবা না? তোমার বয়স হচ্ছে..বোঝ হচ্ছেনা কেন গো?….তোমার সামনেই না ডাক্তার বললো নিয়ম মেনে চলতে, আর তুমিই কিনা!!

আম্মু তীক্ষ্ম চোখে আব্বুর দিকে তাকিয়ে ঠাস করে পানির গ্লাস টেবিলে রাখলো। যেভাবে নাক ফুলিয়ে তাকালো আমার বুঝা শেষ আজ আব্বুর রক্ষে নেই! আব্বুও ইতিমধ্যে সিচুয়েশন বুঝে ঢোক গিলে জোরপূর্বক হাসি দিচ্ছেন।আব্বুর হাসি দেখে আমার পেট গুলিয়ে হাসি আসছে। ঠোট কামড়ে কোনোরকমে চেপেচুপে হাসছি। আব্বু বত্রিশ দাতেঁর কেলানি টাইপ হাসি দিলে আম্মু রাগে কটমট করে বলে উঠলো,

–বেশি খারাপ লাগলে নিজেরটা নিজে বানায়া খাও! সকাল দশটা বাজে একেকজনে উঠবা আর টাইমে টাইমে অর্ডার দিবা এটা দাও ওটা দাও এটা কর ওটা কর, কত্তদিন বলছি সকাল সকাল উঠে হাটতে যাও। কি বলি নাই? ডায়াবেটিসের রোগি হাটাহাটি করো! বলি নাই? কান দিয়ে কথা ঢুকছে? না বাপু! আমার কথা কেন শুনবা ? তুমি তো লুঙ্গি চাড়া দিয়ে উপুত হয়ে নাক ডাকবা! আর ডাক দিয়ে সজাগ করলে আউমাউ করে আরেক কাত হয়ে উপুত হইবা! এইটাও দৈনন্দিন দেখতেছি!

পাশ থেকে ছোট বদমাইশ সুরের সংযোগ গানের দিকে কনভার্ট করে দুলেদুলে বলল,

— আহা..দখিনা বাতাসে লুঙ্গি ওড়ে আকাশে… প্লাজু উড়ে ছাদে ছাদে…ওয়ে! প্লাজু উড়ে ছাদে ছাদে…

আম্মু ছোট বদমাইশের কানটা টেনে ঠাটিয়ে থাপ্পর লাগাতেই বেচারা গাল বুলাতে বুলাতে চুপ হয়ে গেল ছোট ভাই। আব্বু হোহো করে হাসতে থাকলে আম্মু ভয়াবহ চাহনিতে চোখের দৃষ্টি ছুড়ে মারে! আব্বু তৎক্ষণাৎ হাসি থামিয়ে পানির গ্লাসে হাত দিলেন! পানি খেতে খুব বিষম খাচ্ছে আব্বু। খুকখুক করে কাশছে লাগাতার। কাশির বেগ তীব্র হয়ে যক্ষ্মা রোগীর মতো শুরু হতে লাগলো। আম্মু আরো ক্ষেপেক্ষুপে আগুন চোখে তাকিয়ে দাঁত চিবিয়ে বলে উঠেন,

–বুঝি তো বাপু! সব বুঝি! আমার কথা তো কারোর সহ্য হয় না। উচিত কথা তো কারোর গায়ে লাগে না। আমি বললেই দোষ! আর সবাই দুধে ধোয়া তুলছি পাতা! মাঝে আমি নিমের বিষ তিতা পাতা !

.
.

খাবারের প্লেট নিয়ে রুমে বসে খাচ্ছি। আম্মু আব্বুর খামোখা তর্কবিদ্যায় আমার কোনো কর্ম নেই। পরোটা ঝোলে চুবিয়ে ফোন নিয়ে ইসুকে কল দিচ্ছি। ও কাল কল করেছিলো বেচারিকে শুধুশুধু অকথ্য ভাষায় কথা শুনিয়েছি। আমার যে মাঝেমাঝে কি হয়! আল্লাহ মাবুদ জানেন! মন মেজাজ সবটাই উল্টেপাল্টে জটলা হয়ে থাকে, আপন মানুষগুলোর সাথে প্রচণ্ড রাগ দেখিয়ে দুচারটা পচা কথা বলে ফেলি। ঝোল ভরানো পরোটায় কামড় দিতেই ইসু ফোনটা রিসিভ করে বলে উঠলো,

–হ্যালো মম বল,
–ইসু আজকে কয়টায় বের হবি? অনুষ্ঠান তো বারোটায় আগেআগে যাবি?
–না রে, আমি আজকে যাবো না। তুই গেলে যা।
–কি আশ্চর্য! কি বলছিস এগুলো?
–আরে হ্যাঁ আ’ম সিরিয়াস। আমি যাবো না। ইরিনা আপু শপিংয়ে যাবে আমাকে রেডি হতে বলছে। বড় আপুর সাথে না গেলে বাসায় কেলেঙ্কারি বাধিয়ে দিবে! জানিসই তো!
–তোর মাথা ঠিক আছে ইসু? তুই আমাদের ভার্সিটি লাইফের নবীন বরন নিয়ে কত এক্সাইটেড ছিলি! ইভেন কাল রাতে সাড়ে এগারোটায় তুই কল দিয়ে আমায় শাড়ির ব্যাপারে আস্ক করছিলি!
–হ্যা তখন সব ঠিক ছিলো। এখন সকালে সবাই খেতে বসেছি তখন আপু কড়া গলায় আব্বুর কাছ থেকে শপিংয়ে যাওয়ার পারমিশন নিয়েছে। এখন আমি কি করি?? আবার…বসুন্ধরায় যাবো বুঝছিস তো? কত টাকার লেনদেন, তার মধ্যে দামী দামী প্রোডাক্ট না কিনলে আপুর পছন্দ হয়না। এই সুযোগে আমিও কিছু কেনাকাটা করে নিবো এই আরকি….তুই যা। মজা কর। অর্পনা তো আছেই ওর সাথে থাকবি!!
–ধ্যাৎ! মুখ খারাপ করাবি না! অর্পনা ওর বয়ফ্রেন্ডের সাথে থাকবে। ও বয়ফ্রেন্ড রেখে আমার সাথে ঘুরবে ইম্পসিব্যাল! প্লিজ ইসু তুই আয় না…তুই না গেলে তাহলে আমিও যাবো না!!
–এই ছি! যাবি না কেন? কি যে বলিস! আমার সাথে তোর জোড়া? তুই যা না…মজা কর সিরিয়াসলি মম। আমি তো যেতে পারবো না ইয়ার!!
মনটা খুব বসে যাচ্ছিলো ইসুর কথা শুনে। আর একটা কথাও মুখ খুলে বের করতে ইচ্ছে করছিলো না। তবুও স্বর নামিয়ে বললাম,
–আচ্ছা দোস্ত তাহলে…রাখি… সাবধানে যাস, ড্রাইভারকে গাড়ি সাবধানে চালাতে বলিস, খুব হুড়োহুড়ি করে গাড়ি চালায় তো…
–আরে টেনশান করিস কেন? বাবার গাড়িতে যাচ্ছি, ড্রাইভারও খুব দক্ষ। পরশু দেখা হবে ক্যাম্পাসে? ঠিক আছে? তাহলে, রাখি।

ফোনটা কান থেকে নামিয়ে কিছুক্ষণ থমকে বসেছিলাম। হাতের পরোটা আর খেতে ইচ্ছে করছিলো না। দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে আধখাওয়া পরোটা প্লেটে রেখে ডাইনিং টেবিলে রেখে এসেছি। মনে পোষা দীর্ঘদিনের সতেজ ইচ্ছাটায় শুকনো মাটি ঢেলে দিতে হলো। নবীন বরনে আম্মুর হালকা গোলাপি রঙের শাড়িটা পড়বো, চোখে কাজল টানবো, সাদাচুড়ি দ্বারা হাতভর্তি করবো, চুলে খোপা গুজে কানের পাশে ছোট চুল রাখবো…সব ইচ্ছাই কি পূর্ন হয়? উহু হয়না, অপূর্ণ থেকে যায়। অপূর্ণ থেকে আজীবন আফসোসের দেয়াল গেড়ে যায়। কষ্ট হয়! প্রচণ্ডরূপে কষ্ট! যখন দেখবেন চোখের সামনে দীর্ঘদিনের ইচ্ছাটা ভেঙ্গে ছাই হয়ে যায়! এগুলোর কখনো নাম নেই…নাম না ছাড়া কষ্ট…অদ্ভুত কষ্ট!! টের শুধু আপনি পাবেন! আর কেউ না।

বিছানায় সোজা হয়ে শুয়ে আছি। চোখ দুটো টলমল হয়ে আসছে বারবার। কি বেহায়া এই চোখ! বারবার পানি এসে জড়ো হচ্ছে। চোখের দুকোণা থেকে বেয়ে পড়ছে, আমি কেন কাদছি? ডোন্ট নো… জানি না…সত্যি জানি না। আমার ছোট ভাই দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে রুমে চুপি দিয়ে বললো,

–আপু তোমার ফোন বাজতেছে…

আমি হাত দিয়ে চোখ লুকিয়ে ওড়না দিয়ে মুখ মুছতেই ওকে বলে উঠলাম,

–ফোন কোথায়? দিয়ে যা এখানে। কে কল দিছে দেখছিস?
–‘না আপু….’ বলেই ছোট ভাই আমার দৌড় লাগালো ফোন এনে দিতে। ফোন আমার হাতে দিয়ে আগের মতো চলে গেল রুমের বাইরে। ওড়না দিয়ে চোখের কোণা মুছতেই দেখি ফাইজার চাচ্চুর কল। মানে মুগ্ধ। কল ধরিনি, বাজতে বাজতে কলটা কেটে গেল। ঠিক পাচঁটা মিস্ড কলের নোটিফিকেশনটা বারবার ফোনের স্ক্রিনে দেখাচ্ছে। দেখতেই দেখতে আবারো ফোনটা বাজতে লাগলো। অনিচ্ছায় ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কেউ ধমকের সুরে বলে উঠলো,

–কই তুমি! কোথায় ! হোয়ার আর ইউ শিট !

কঠোর ধমকানিতে আমার হাত কেপে কান থেকে ফোন পড়ে গেল। কানের পর্দা বুঝি ফেটে গেল আমার! ইশশ…আল্লাহ এই বান্দা কি চিৎকারটাই দিলো! মাবুদ…কানের ভেতরে এখনো হু হু করছে। আমি কানে আঙ্গুল দিয়ে ফোনটা অপর কানের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রেখে ধরে বললাম,

— বজ্জাত ! তুই কোন সাহসে আমার উপর চিল্লানোর সাহস পাস ! কে তুই ! মন্ত্রী মিনিস্টার? জুতা তুই ! তোকে যদি জুতাপেটা না করছি দেখিস! ইশশশ…কানটা খেয়ে দিছিস! থার্ড ক্লাস কোথাকার!!!
ওপাশ থেকে আরেক ধাপ চেচিয়ে বললো,

–Shut up ! I said just shut up ! থাপ্পর দিয়ে জবান বন্ধ করে দিবো বেয়াদ্দব মেয়ে ! আমি এক ঘন্টা ধরে ভার্সিটির গেইটে দাড়িয়ে আছি ! আর তুমি বলছো চিল্লাচ্ছি কেন ! তুমি আমাকে মারবে? তাই না…জাস্ট ওয়েট ! তুমি সেদিন আমায় হকিস্টিক দিয়ে মেরেছো না?? আমি তোমায় লোহার রড দিয়ে খুন করবো ! একদম খুন করে মেরে টেরে নিজের গলাতেও দড়ি দিয়ে সিলিং ফ্যানে ঝুলবো ! আমি কিচ্ছু বলি না! কিচ্ছু করি না দেখে একেবারে আকাশে উঠে গেছো না? আমি এক চান্সে মাটিতেও নামাতে পারি! বেশি বেড়ে গেছো না!! তোমার বাড়াবাড়ি যদি না কমাই !! জাস্ট ওয়েট ! আসতেছি…

টুট টুট টুট… শব্দ হতে লাগল ওপাশ থেকে। কান থেকে ফোন সরিয়ে দেখি মুগ্ধ কল কেটে দিয়েছে। লাস্ট কি বললো? ”আসতেছি”? কোথায় আসতেছে? আল্লাহ !! ওকি এখানে আসতেছে? মাবুদ বাচাঁও! বাসায় আম্মু আব্বু! ও এদিকে এসে রাগ দেখালে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে! কি না কি ভাববে! না না… আল্লাহ ও আসলে আমি শেষ!!! আমি বিছানা থেকে ধুমধাম নেমে কলের পর কল দিচ্ছি মুগ্ধকে। ও আমার একটাও কল রিসিভ করছেনা। নার্ভাসনেসে আমার নখ কামড়ানো শুরু হয়ে গেছে!! কি করি কি করি…আব্বু আম্মু রুমে!! উনারা ওকে দেখলে শেষষ !! শেষ আমি শেষষষষ….আমি দাতঁ দিয়ে নখ খুটতে খুটতে রুমের মধ্যে পায়চারী করছি। পুরো রুমময় ঘুরঘুর করছি। মম..মাথা ঠান্ডা! ঠান্ডা ঠান্ডা কুল কুল…আইস কুলিং পাউডারের মতো মাথাটাকে ঠান্ডা কর…..হু…বুদ্ধি আসবে। পাক্কা বুদ্ধি আসবে। মম ভাব্… ক্যাম্পাস থেকে তোর বাসার পথে রওনা দিলে পৌছতে লাগে পয়ত্রিশ মিনিট! তোর হাতে আছে মোটমাট পয়ত্রিশ কি ত্রিশ মিনিটের মতো। আচ্ছা? ও যদি গাড়ির স্পিড বারিয়ে চালায়?? বাপ রে!! রাগের মাথায় এই বান্দা অবশ্যই স্পিড বারিয়ে দিয়েছে ড্যাম টু ড্যাম সিউর! তাহলে তোর হাতে আছে ম্যাক্সিমাম বিশ মিনিট! বা আরো কম! না না…ভাবতে থাক। আরো ভাবতে থাক। আব্বুকে বাসা থেকে বিদায় করা সম্ভব! জাস্ট এক প্যাকেট বিরিয়ানীর লোভ দেখালেই কাজ শেষ! বাট আম্মু? এই আম্মুকে কি বলে ম্যানেজ করি? যাসব গন্ডগোল করার তা তো সবসময় আম্মুই করে, আব্বু না। ওহ্ গট ইট ! আম্মুকে পাশের বাসার নিলুফা আন্টির কাছে পাঠিয়ে দেওয়া যায়! সাংসারিক সুখ-দুঃখ নিয়ে পেচাল পারতে পারতে ঘন্টার পর ঘন্টা পার হয়ে যাবে নিশ্চিত! যাক শান্তি। আর ছোটকে কা করবো? ওকে নাহয় তালহার বাসায় খেলতে পাঠিয়ে দিলেই চলবে। ব্যস!

সব পরিকল্পনা মতো কাজ হলো। আব্বুকে ইউটিউব থেকে চালাকি করে বিরিয়ানি রান্নার টিউটোরিয়াল ভিডিও দেখিয়েছি। ব্যস..দেখার সাথে সাথেই আব্বুর ছুট। আসার সময় দুএক প্যাকেট আনতেই পারে, ওউফ! আম্মুকে নিলুফা আন্টির বাসায় পাঠাতে একটু বেগ পেতে হলো! কিন্তু আম্মু শেষমেশ উনার বাসায় গেলোই গেল। ছোট ভাই খেলার পারমিশন পেয়ে চটপট ভোদৌড়ে পালিয়েছে। সবকিছু আমার মনমতো হলেও আমি এদিকে ঠিক থাকতে পারছিনা। মুগ্ধ এসে কি তান্ডব করে আল্লাহ মালুম! আচ্ছা মুগ্ধ কি আমার বাসার ঠিকানা জানে?? ধ্যত! এগুলা বের করা কি ওর জন্য ব্যাপার!! বাম হাতের খেলা মাত্র! চিন্তার সমুদ্রে গভীরভাবে ডুব দিতেই দরজায় বিকট শব্দে কলিং বেল বাজলো! চিন্তার সমুদ্র থেকে চমকে উঠে আমি দ্রুত দরজা খুলতে গেলাম। সিটকিনি খুলতেই কলিজা বেরিয়ে আসছে। আমি আদৌ এমন লোমহর্ষক ভয়ে কাপাকাপি করিনি। আজ ওর সুরের মধ্যে অন্যকিছু ছিলো যা আমি এতোদিন বুঝতে পারিনি। কি ভয়ংকর গলায় ধমকগুলো দিয়েছে!! আমি যেনো ওর বউ! কথা না শুনলেই ধরে আছাড় মারবে! দরজায় টানা তিনটা বেল একনাগাড়ে পড়লো! ভয়ে দ্বিতীয়বারের মতো চমকে উঠলাম। কাপা কাপা হাতে দরজার সিটকিনি খুলে দরজা সরু ফাক করে একচোখ দিয়ে বাইরে তাকাবো… তার আগেই দরজায় কেউ সজোরে ধাক্কা দিলো! আমি দরজা ছেড়ে কয়েক পা পিছিয়ে ফ্লোরে যেয়ে পড়ি। আকষ্মিক ঘটনায় আমি চোখ কুচকে দুহাত দিয়ে মুখ ঢেকে নিলে কানে শব্দ আসে কেউ দরজা লাগিয়ে দিচ্ছে। সাহস হচ্ছেনা মুখের উপর থেকে হাত সরিয়ে তাকে দেখার! হঠাৎ কোত্থেকে আমার ভয়ের আমদানি হলো মাথায় ঢুকছেনা!!তার জুতা পায়ে কাছে আসার পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। শব্দটা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে, খুব ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। আমি যে উঠে এ্যাকশ্যান শুরু করবো সেই তাল আমার নেই। সে আসছে। আসতে আসতে মনে হলো একসময় পদধ্বনিটা থেমে গেছে। কোনো শব্দই এখন কানে আসছেনা। আমি মনে একটু সাহস সন্ঞ্চার করে মুখের উপর রাখা হাতের আঙ্গুল চোখের দিক থেকে আলতো করে ফাক করছি। একটু ফাক করতেই চোখের দৃষ্টি বাইরে দিয়ে তাকে দেখার চেষ্টা করছি। সামনে এক হাটুগেড়ে ফ্লোরে বসে আছে মুগ্ধ! চোখেমুখে অসম্ভব রাগ! জলন্ত অগ্নিপিণ্ডের দু’টুকরো আগুন যেন তার চোখে দাউদাউ করছে! ভয়ঙ্কর রাগে নিশ্বাসের শব্দও তার জোরে জোরে পড়ছে! রাগে ফুসফুস করছে মুগ্ধ! হাতঘড়ির হাতটাও অদ্ভুত নিয়মে কাপছে। রাগলে মানুষের হাত কাপে? চোখের মনি ভয়ঙ্কর লাগে? সবই কি বীভৎস ভয় লাগিয়ে দেয়?? আমার প্রচুর ভয় করছে! প্রচুরপরিমাণে ভয় করছে ! তাও বাইরে থেকে কঠোর বেশভূষায় কিছুটা শক্তপোক্ত দেখাচ্ছি। কিন্তু ভেতরের অবস্থা পুরোই কাহিল! বড় দুটো ঢোক গিলে মুখের উপর থেকে হাত সরিয়ে একটা হাসি দেওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু নাহ্ কোনো কাজ হলো না। মুগ্ধ আগের মতোই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। নিচের ঠোটঁটা নড়েচড়ে উঠছে তার। আমি মুখের উপর জোরপূর্বক হাসি রেখে বলে উঠলাম,

–তুমি এখখানে ককেন…?ননবীন ববরন অনু….

মুগ্ধ ফ্লোরে ধাম করে চাপড় মেরে দাঁতে কটমট করে বলে উঠলো,

–তুমি কি জানো না বেব আমি এইখানে কোন সুখে আসছি!

আমি ফ্লোরে হাতের তালুতে ভর দিয়ে ধীরেধীরে পিছনের দিকে পিছিয়ে যাচ্ছি। হালকা করে পিছিয়ে যেতেই বলে উঠলাম,
–ননা আআমি জজানবো ককিভাবে আআজজব….আআমি ককি অঅর্ন্তযামী নানাকি..

মুগ্ধের নিশ্বাসের গতি আরো বেড়ে গেছে। সে নাক ফুলিয়ে ক্রমাগত নিশ্বাস ছাড়ছে। আমার দিকে চোখ ছোট করে কপাল কুচকে ভ্রু উচু তুলে বলল,

–থাপ্পর দিতে চাই না মম পাকনি! (ডানেবানে ধীরে মাথা নাড়িয়ে) আমাকে বাধ্য করো না ! আমাকে বাধ্য করলে চরম পরিক্রমায় খারাপ বিহেব করবো ! এরপর তুমি আমাকে খারাপ ভাবলেও আই ডোন্ট কেয়ার ! শাড়িটা পড়ো ! আর জলদি দশ মিনিটের মধ্যে রেডি হও ! নো মেলোড্রামা প্লিজ ! আদারওয়াইজ রাদিফ মুগ্ধ উইল বি হার্মফুল ফর ইউ! স্ট্রংলি মাইন্ড ইট ! গেট রেডি !

-চলবে

FABIYAH MOMO

তুমিময় প্রেম
PART 14
FABIYAH MOMO

মুখের উপর শপিংব্যাগ ছুড়ে মারলো মুগ্ধ। ব্যাগটা আমার মুখে আলতো ধাক্কা খেয়ে ফ্লোরে যেয়ে পড়লো। মুগ্ধ উঠে দাড়িয়ে ড্রয়িংরুমের সোফায় পা তুলে বসলো। পকেট থেকে ফোনটা বের করতেই আমাকে ঝাঝালো সুরে আরেকদফা বলে উঠলো,

–আমি যে সোফায় বসেছি না?? ঠিক দশমিনিট বসবো! যদি তোমার দশমিনিটের চেয়ে এক্সট্রা টাইম লাগে! খবর আছে !!

আমি মুগ্ধের শাসানো বানী শুনে তাড়াহুড়ো করে ব্যাগ নিয়ে রুমে চলে যাই। দরজা আটকিয়ে শপিংব্যাগ বিছানায় ছুড়ে কোমরে একহাত রেখে পায়চারী করছি। আরেকহাত মুখে ঢুকিয়ে অলরেডি নখ কামড়ানো শুরু। আমি পায়চারী করতে থাকলে উচ্চস্বরে মুগ্ধ বলে উঠে,

–দশমিনিটের একমিনিটও যদি বেশি লাগে ! এই দরজা আস্তো রাখবো না ! খবরদার !

মনটা চাচ্ছে নিজেকেই নিজে কষিয়ে দুটো চড় লাগাই! কি দরকার ছিলো দরজা খুলার? ওকে বাইরেই দাড় করিয়ে রাখতাম!! ধ্যাৎ ধ্যাৎ ধ্যাৎ ! নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারলাম! এখন ওর কথা না শুনলে কোন দাবাংখেলা দেখায় আল্লাহ্ জানে !! অবশেষে না পারতে বিছানা থেকে ব্যাগ নিয়ে খুলে দেখি একটা হালকা কমলা রঙের শাড়ি। শাড়ির পাড় লাল, আচলটাও লাল। লাল-কমলার এতো সুন্দর শাড়ি আদৌ আমার চোখে পড়েনি। সত্যি!! শাড়িটা এককথায় চমৎকার!! আমি রীতিমতো বলতে বাধ্য, শাড়িটা যে পছন্দ করেছে তার পছন্দসই খুবই শৌখিন এবং মোহপূর্ন। শাড়িটা দেখে মুখে অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে আসলো। কেনো আসলো জানা নেই!! আমি শাড়িটা নিয়ে পড়া শুরু করলাম। ঠিক আটমিনিটের মাথায় আমার শাড়ি পড়া শেষ। ওদিকে আমার হাতে আছে মাত্র দুই মিনিট!! ইতিমধ্যে মুগ্ধ হুশিয়ারী দিয়ে বলেছে, ‘মম সময় কিন্তু দুইমিনিট বাকি! যা করার জলদি করো দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে যদি দেখি তুমি হাফ রেডি তাহলে তোমার মান সম্মানের কি হবে বুঝে নিও !!’ আমি শাড়ি ঠিকঠাক করে পড়ে আয়নায় নিজেকে হালকা সাজে সজ্জিত করার প্রয়োগে আছি। চোখে চিকন করে আই লাইনার, চোখের ওয়াটার লাইনে কালো কাজল, ঠোটে মেরুন রঙের লিপ আর্ট করে হালকা লালের লিপস্টিক দিয়ে লিপের সাজ কমপ্লিট করি।মুখে হালকা পাউডার দিয়ে ঠিকঠাক মতো ব্লেন্ড করি। চুলে চটপট হাতে চিড়ুনি করতেই ওদিকে দরজা ধাক্কানো শুরু! আমি খুব তাড়াতাড়ি করে চুলের জট ছাড়িয়ে মাঝে সিথি গাথলাম। কাধের দুপাশ থেকে দু খন্ড চুল সামনে আনতেই দরজার দিকে পা চালালাম। আমি দরজা খুলে দাড়াতেই মুগ্ধ ধাক্কা দেওয়ার জন্য প্রস্তত হাতটা শূন্যে থামিয়ে দিলো। দরজায় আর ধাক্কা দেওয়া হলো না। হাতটা আর আগের জায়গায় রাখা হলো না। সে স্ট্যাচু হয়ে দাড়িয়ে আছে হা করে। মুগ্ধের চাহনি আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছে। আমি ভেতরে প্রচুর কাচুমাচু করছি। ও এখনো ফ্রিজ্ড অবস্থায় থমকে আছে। চোখের গোলক আমার দিকে স্থির হয়ে আছে। পলক ঝাপটাচ্ছে একদমই। আমি ওর চোখের সামনে তুড়ি বাজাতে বাজাতে বলে উঠি,

–ইয়েস আই নো আমাকে আজ সুন্দর লাগছে! সো তোমার গান্দি নজর নিচে নামাও ! আমার রাস্তা থেকে সরে দাড়াও ! আমি জুতা পড়ব !

মুগ্ধ থতমত খেয়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে দরজার সামনে থেকে সরে গেল। ও সরতেই আমি রুমের বাইরে বেরিয়ে যেয়ে দরজার কাছে গিয়ে জুতা পড়তে থাকি। মুগ্ধ আমার পিছু দাড়িয়ে বললো,

–বাংলা ভাষায় গালিগালাজ + তুইতোকারি করো সেগুলো অন্য ফ্যাক্ট! বাট প্লিজ ! হিন্দি ল্যাঙ্গুয়েজ ইউজ করবা না ! আমার হিন্দি ভাষা আর হিন্দি কালচার পছন্দ না! সো স্ট্রেট রিকুয়েস্ট। প্লিজ খেয়াল রাখবা। চলো…

‘চলো’ বলে আমার সাইড ঘেষিয়ে বাইরে পা বারালো মুগ্ধ। জুতা পড়া থামিয়ে এক পলক বাইরে তাকাই…পান্জাবীর হাতাটা আলতো করে কনুইয়ে ফোল্ড করতে করতে সিড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে মুগ্ধ। গায়ের খয়েরী রঙের পান্জাবীটা চোখসই করে দিচ্ছে বারবার। হাতের ব্রাউন ঘড়িটাও হাতের সৌন্দর্য্য বর্ধন করছে প্রতিটা ক্ষনে ক্ষনে। সে কি আজ মনকাড়ার উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছে?? হয়তোবা! হয়তোবা মুগ্ধ কারোর জন্য নিজেকে অন্য বেশে সাজিয়েছে। হয়তোবা একটুখানি ভালোলাগা জাগানোর জন্য সুন্দরভাবে এসেছে!! যেখানে ক্যাম্পাসে শতশত ক্রাশ খাওয়া মেয়ে আছে, সেখানে আমার মতো একজনের কাছে ও মূল্য পেতে আসে। কি আফসোস। কিন্তু আমার যে সে বোধশক্তি নেই! আমি কারো জন্য প্রেমময় নই! আমার জীবনে প্রেম গাথার সময় নেই। সময়টা আছে শুধু উচ্চলক্ষে পৌছাবার এবং পরিবার নামক বিশেষ মানুষগুলোকে একটু বিলাসিতা দেওয়ার। হয়তো একটুকুই আমার চাওয়া…

আজ মুগ্ধের আচরনটা অন্যরকম ঠেকিয়ে দিচ্ছে। সে সবসময় চুপ করে আমার সাথে ঘটা তামাশাগুলো দেখতো। আজ সে নিজেই আমার বাসায় এসে অধিকার খাটিয়ে পটাপট হুকুম দিচ্ছে। মানুষটা খুব ইউনিক!

শাড়ি ধরে ধরে আমি সিড়ি দিয়ে নিচে নামি। মেইন গেইট থেকে কিছুটা দূরে গাড়ি থামিয়েছে মুগ্ধ। গাড়িতে ঠেস দিয়ে পকেটে এক হাত ঢুকিয়ে ফোন দেখছে সে। আমি গাড়ির কাছাকাছি পৌছাতেই মুগ্ধ ফোন আমাকে একবার দেখে নিয়ে ফোনটা পকেটে পুড়লো। এরপর ও কি করলো বুঝলাম না। গাড়ির দরজা খুলতে যেয়েও কি মনে করে খুললো না.. বন্ধ করে দিলো। আমি ওর সামনে এসে দাড়ালে আমার দিকে তাকিয়ে বলে,

–জাস্ট পাচঁটা মিনিট ওয়েট করা যাবে???জাস্ট পাচঁ মিনিট? আমি এই যাচ্ছি এই আসছি!!

আমাকে বলার সুযোগ না দিয়েই ও রাস্তা ধরে সামনে হাটতে লাগলো। আমি অবুকের মতো রাস্তায় দাড়িয়ে রইলাম। রাস্তার আশেপাশের মানুষগুলো কেমন করে তাকাচ্ছে!! মন চাচ্ছে শাড়ি ধরে বাসায় চলে যাই! আমার বড্ড বেশি অস্বস্তিকর লাগছে এই দুপুরবেলায় একা একা রাস্তায় দাড়িয়ে থাকতে! বাংলাদেশের কালচারে একটা বিরাট সমস্যা হলো কেউ একটু সাজগোজ করে সুন্দর করে আসলে চর্তুদিক থেকে ঘুরঘুর করে নজর দিতে থাকে। কমবয়সী মেয়েদের ক্ষেত্রে চাওয়াচাওয়ির প্রবনতাটা একটু বেশি। অতিরিক্ত মাত্রায় তাকিয়ে থাকে, বিশেষ করে পুরুষ লোকরা। রাস্তায় কমবেশি টুকটাক রিকশা চললেও কোনো গাড়িটারি ছিলো না। হঠাৎ একটা সিএনজি এসে আমার পায়ের কাছে থামলো। আরেকটু হলে আমার পায়ের উপর উঠিয়ে দিতো! আমি মনেমনে ঠিক করছি ড্রাইভারকে কড়াকড়ি গলায় কথা শুনাবো ওমনেই দেখি সিএনজির জালিওয়ালা দরজা খুলে উকি দিলো মুগ্ধ। আমাকে নম্রভাবে বলে উঠলো,
–জলদি ওঠো! হারি আপ!
আমি মুখ কুচকে শক্ত হয়ে আছি! আমি সিএনজিতে উঠলে মুগ্ধের সাথে যাবো না! আমি মুগ্ধের পাশে বসবো না! আমি হাতভাজ করে মুগ্ধের দিকে হাসি ছুড়ে বলে উঠি,

–তুমি না খুব ভালো?? আমার সব কথা শোনো!! এখন ভালো বাচ্চার মতো নামো তো মুগ্ধ!! তুমি না খুব কিউট করে কথা শুনতে পারো?? প্লিজ সিএনজি থেকে নেমে পড়ো!! আমি সিএনজিতে একা যাবো বুঝছো। তুমি তোমার গাড়িটা চালিয়ে পিছুপিছু আসো ওকে??

মুগ্ধ ভ্যাবাচেকা খেয়ে তাকিয়ে রইলো। সিএনজি ড্রাইভারটাও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মুগ্ধের কোনো হুহা হুশ হলো না। সে ঘাপটি মেরে আমার মতো হাসি দিয়ে বলে উঠলো,
–গাড়িটা সিঙ্গেল থাকতে পারে। আমি না থুক্কু মানুষ না। মানে মানুষ একা একা দুনিয়ায় থাকতে পারেনা। একটা সঙ্গী সরি! সাঙ্গু লাগে। এখন উঠো!

কথাগুলো বিরাট প্যাঁচ লাগিয়ে দিলো মাথায়। সঙ্গী সাঙ্গু হেনতেন কি বললো কিছুই বুঝলাম না। আমি অবুঝের মতো মুখভঙ্গি করলে মুগ্ধ সিটে বসা অবস্থায় হঠাৎ আমার হাত টান দিয়ে সিএনজিতে বসিয়ে ছাড়লো! হাতের কনুই ও পায়ের গোড়ালিতে একটুআধটু ব্যথা পেয়ে সিএনজিতে বসতেই সামনের সিট থেকে ড্রাইভার মামা হাত বারিয়ে জালি দরজা লাগিয়ে দিলো। মুগ্ধের কাছ থেকে এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে আমি সিটের কোণায় চেপে বসি। মুগ্ধ আমার হাত ছেড়ে ওর চুলগুলো সামনে পেছনে করছে। সিএনজি হুরহুর করে চলছে। বাতাসের বেগ দুইসাইড থেকে আসছে প্রচুর। বাতাসের বেগের কারনে চোখ মেলে ঠিক করে তাকানো যাচ্ছেনা। চুলগুলো বারবার মুখ থেবড়ে পড়ছে। মুগ্ধের দিকে তাকালাম ওরও একই অবস্থা। সামনের চুলগুলো এলোপাথাড়ি কপাল ছুয়ে চলছে। হঠাৎ মুগ্ধ আড়চোখে আমাকে পরোখ করলো কিনা জানিনা ও তাচ্ছিল্যের সুরে সামনের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,

–আচ্ছা তুমি আমার দিকে তাকাতে হিমশিম খাচ্ছো কেন? কি ব্যাপার? আমায় কি পান্জাবীতে বর বর লাগছে??

আমি মুখটা বিরক্তিতে চুবিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে ঝাঝালো গলায় বলে উঠি,

–বুড়া বুড়া লাগছে বর না! চুপ ! একটা কথাও না! গাড়িতে বসেছি এটাই শোকর করো! বেশি করলে কান টেনে ছিড়ে নিয়ে আসবো! একদম চুপ !

মুগ্ধ হালকা হেসে ঠোটের মুখের ‘Zip up’ ভঙ্গি দেখালো মানে তালা লাগিয়ে বোঝালো। সিএনজি মামা সুযোগটা খুজছেন কিভাবে পেছন থেকে আমার কান্ডকারখানা দেখতে পারেন। কেননা এই গাড়িতে কোনো মিরর নেই। আচ্ছা মুগ্ধ আমায় সিএনজি করে কেন নিয়ে যাচ্ছে? কোনো বিশেষ কারন আছে? কোনো স্পেশাল মোটিভ? থ্রিলার মুভির মতো?? জিজ্ঞেস করা উচিত!

–এই শুনো!
মুগ্ধ হালকা কেশে গলা ঝেড়ে বলল,
–আমার বাবা-মা আকিকা দিয়ে ভালো নাম রেখেছে। আই হোপ তুমি ডিসেন্ট নামটা জানো!
–জানাজানির দিন শেষ!! আমার উপর কিসের জোর খাটাচ্ছো তুমি! কিসের !
–আচ্ছা মিস ফোর ইয়ার জুনিয়র, একটা জিনিস লজিক্যালি ভাবো তো। আমি যে তোমার বাসায় ঢুকে মেজর স্টেপে তামাশা করলাম তুমি কি পারতে না চিল্লাচিল্লি করে আশপাশের মানুষ ডাকতে? তুমি কি ডেকেছো? তাছাড়া তুমি নিজেও কোনো দিক দিয়ে কম না। পারলে আমার মতো চারটা কে মাটিতে শুইয়ে মাথা ফাটিয়ে দিতে পারো। কিন্তু জাস্ট থিংক, এসব খেয়াল তোমার মাথায় কি একফোঁটাও এসেছে? নো ! তুমি আমাকে মারা তো দূর আমার প্রতিটা কথা সভ্য মেয়ের মতো শুনেছো। যা বলেছি যেভাবে বলেছি সব করেছো। তাও বলছো আমি জোর খাটিয়েছি? হাসালে পাকনি।তুমি চাইলে আমাকে বাজেভাবে ইনসাল্ট করে তাড়িয়ে দিতে পারতে! জোর খাটালে তুমি চিল্লাহুল্লা করতে মাস্ট ! বাট দেখো তুমি কিছুই করোনি দশমিনিট বলেছি দশমিনিটেই রেডি হয়েছো। আরো বলবে জোর খাটিয়েছি? তাহলে বলো যাও। আমার তাতে যায় আসে না…যার যা চিন্তা ওটা নিয়েই পড়ে থাকুক, আই ডোন্ট কেয়ার।

মুগ্ধ ডোন্ট কেয়ার ভঙ্গিতে হালকা নিশ্বাস ছাড়লো। আসলেই তো! আমি নিয়ম করে সব কথাই দেখি শুনেছি! কেন শুনেছি? মাথা কি আউট হয়ে গেছে? মুগ্ধকে ধরে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছি আমি! সেই মেয়ে আজ ওর কাছে নুয়ে মুড়ে সব কথা শুনলো? কি বেক্কল আমি ! মাথা তো দেখি টোটালি গেছে ! আমি চিন্তাভাবনার দেয়াল বানিয়ে ওকে আবার শক্ত গলায় বলে উঠি,

–শোনো এখন! কান পরিস্কার করে শোনো, আচ্ছা আমার বাসায় কোন রাইটে এসেছো ? কি তোমার অধিকার ! কোন দাসত্বের দাপট দেখিয়ে নিজের মনমর্জিমতো আমায় রেডি করালে? তাও হুট করে সিএনজি! মতলব কি তোমার ? কি মতলব !

মুগ্ধ ম্যাজিশিয়ানদের মতো রহস্যজনক হাসি দিলো। খুবই রহস্যজনক হাসি। এই হাসিটা তখন ইউজ হয় যখন কেউ সামনের মানুষকে বোকা বানিয়ে দেয় এবং মারাত্মক কঠিন কিছু লুকিয়ে বেড়ায়! এমন কিছু লুকোয় যেটা শুনলে হয়তো পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাবে! আমি ওই রহস্যজনক হাসিটার মানে বুঝতে পারছিলাম না। একদম না। কি আছে সামনে? মুগ্ধ কি খারাপ কিছু পরিকল্পনা করেছে? প্রতিশোধের আগুন তবে আজ নিভিয়ে ছাড়বে ?? আমি যা খারাপ বিহেব করতাম তার প্রতিশোধ নয়তো….

-চলবে

-Fabiyah Momo

তুমিময় প্রেম
PART 15
FABIYAH MOMO

শান বাজিয়ে ছুটছে গাড়ি। মাথার উপর সূর্যের দারুন দাপট। সিএনজির ভেতরে খাচায় বন্দি পাখির মতো লাগছে আমার। ওদিকে মুগ্ধ মুচকি হেসে হেসে ফোন টিপে চ‍্যাটিং করছে। কার সাথে প্রেমালাপ করছে ও-ই জানে! বেটা খাটাশ কোথাকার! ধরে চিবিয়ে খেতে ইচ্ছে করছে! যাত্রাবাড়ি এবং সায়েদাবাদের জ‍্যাম কাটিয়ে আমরা বিশ মিনিটের মাথায় ক‍্যাম্পাসে এসে পৌছলাম। মুগ্ধ ভাড়া চুকাচ্ছে। আমি সিএনজি থেকে নেমেই ওকে রেখে হনহন করে ক‍্যাম্পাসে ঢুকে গেলাম।

পুরো ক‍্যাম্পাস আজ বর্নিল সাজে সেজেছে। জাকজমকপূর্ন পরিবেশ। সেই সাথে ফুল বিটে গান বাজনা তো আছেই। সবার পোশাক আশাকে আজ অন‍্য একটা মার্ধূয‍্য ফুটে উঠেছে। মেয়েরা বাহারি রঙের শাড়ি পড়ুয়া।মাথায় ফুলের তোড়া। ছেলেরা একেক রঙের পান্জাবীতে! চোখ আমার খুশি আমোদিত লাগছিলো নবীন বরন উৎসব দেখে। এতো ভিড়, এতো কোলাহল তার উপর গানের উচ্চ আওয়াজ…সব মিলিয়ে জমজমাট অবস্থা। হৈ হুল্লোড় করে স্টেজ মাতিয়ে নাচছে একদল। মিউজিক ছিলো হিন্দি গানের….তাম্মা তাম্মা সং। মানুষের হৈচৈয়ের মধ্যেই আমার মনে হলো কেউ আমার নাম ধরে ডাকছে। পিছনে ফিরে চোখ বুলাতেই দেখি তন্ময় আমার দিকে দ্রুত পায়ে ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসছে। তার পোশাকও আজ চমৎকার লাগছে। মেয়েরা মুগ্ধের পাত্তা না পেলে তন্ময়ের দিকে তাকাতে সময় নিবেনা। কালো পান্জাবী পড়নে। বুকের কাছে দুটা বোতাম খোলা। হাতা ভাজ করা। বাম হাতে বড় কালো ঘড়ি। সাদা গ‍্যাবার্ডিন প‍্যান্ট। চুলগুলোতে জেল বসানো দাড়িয়ে আছে। তন্ময় চুলের কানের পাশটা হাত দিয়ে পেছনে ঠেলে আমার এসে দাড়ালো। মুখ জুড়ে হাসি ফুটিয়ে বলে উঠলো,

— হেই মিস! হোয়াটস আপ! ইউ আর লুকিং অস্থির!
আমি ওর প্রশংসা শুনে বিরক্তবোধ করলাম। কারন, ওর চোখের চাহনি ভালো না, ও সর্বত্র চোখ দিয়ে আমাকে আপাদমস্তক দেখছে। তন্ময় উত্তর না পেয়ে আবার বলল,
— হেই আজও তুমি মুখের পটকা ফুলিয়ে রাখবে? একটু হাসো! হাসলে কত বিউটিফুল লাগবে জানো? গিভ মি এ‍্যা স্মাইইইললল…
ওর কথা শুনে ব‍্যাঙ্গ করে ছোট বাচ্চার মতো বললাম,
— ভ‍্যা ভ‍্যা ভাইইই….তোর টা তুই দে! খরবদার আমার সাথে ভাব জমাতে আসবি না। তোদের একটাকেও আমার সহ‍্য না! তোদের লিডারকে বলিস আমার পিছে ঘুরে সময় নষ্ট না করতে! শুনছিস? মনে থাকে যেনো!

তন্ময় বোকার মতো চোয়াল ঝুলিয়ে মাথা চুলকাতে লাগলো। মমর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠলো, এই মেয়ে কি জীবনে গলবে না…এইটাকে মেয়ে না বানিয়ে ছেলে বানালে ঠিক হতো…কি আস্তা একটা পাষাণ হার্টের মানুষ…ইমোশন বলতে ইমোশন কাজ করেনা। অন‍্য মেয়েকে এমন তারিফ করলে গদগদ হয়ে যেত আর এই মেয়ে! ড‍্যামিশ গার্ল ! তন্ময় মমকে নিয়ে রাগী গলায় উল্টাপাল্টা কথা বলতে থাকে। তন্ময়কে ইগনোর করার কারনে তন্ময়ের মধ্যে মারাত্মক রাগ কাজ করছে..

— তুই কাকে ড‍্যামিশ গার্ল বললি ইয়ার! এইদিকে তাকিয়ে বলতো…

পাশ থেকে কারোর গলার আওয়াজ পেয়ে পাশে তাকায় তন্ময়। তাকাতেই গলার স্বর মিনমিনে হয়ে রাগ ভষ্ম হয়ে যায় তার। মুগ্ধ পান্জাবীর পকেটে হাত ঢুকিয়ে ভ্রু উচু করে তাকিয়ে আছে। মুগ্ধের মুখের ভঙ্গি বলে দিচ্ছে সে তন্ময়ের কথা সবই শুনেছে ও বুঝেছে। ভয়ে তন্ময় ঢোক গিলে একটা জোরপূর্বক হাসি দেওয়ার চেষ্টা করলো। অতপর বলে উঠলো,

— ডড‍্যামিশ?? না তো বন্ধু। কে বলছে?? কোন শালায় বলেছে রে…?যেই ভিড়! ‘ড‍্যামিশ’ বলা শালারে খুজবি কেমনে?
মুগ্ধ পকেট থেকে হাত বের করে তন্ময়ের বা কাধে জোরে হাতটা রাখলো। তন্ময় চমকে উঠলো কিছুটা কিন্তু ভেতরে যে ভয় পাচ্ছে তা বুঝতে দিলো না। মুগ্ধ আরেকহাত দিয়ে তন্ময়ের চুল ঠিক করার ব‍্যস্ততা দেখিয়ে বলে উঠলো,
— ভিড়ের মধ্যে কোন্ শালা বলছে মুগ্ধের কানে অবশ্যই গেছে। তারপরও ওই শালারে একটু স্পেশাল ওয়ার্নিং দিস! বলবি রাদিফ মুগ্ধের জিনিসের দিকে চোখ আর মন্তব‍্য না দিতে! যা দেওয়ার..চোখ,মন্তব্য ওইগুলো আমি-ই দিবো। বুঝছিস তো ইয়ার? জিনিসটার জন‍্য হাই লেভেলে ডেম্পারেট!

তন্ময়ের মুখ ভয়ে ফ‍্যাকাশে আকার ধারন করেছে তবুও একচিলতে হাসি দিয়ে আছে। কারন মুগ্ধের সামনে এমতাবস্থায় না হাসলে বিপদ! মুগ্ধ চুলগুলো সম্পূর্ণ এলোমেলো করে কাধ থেকে হাত সরাতেই বলে উঠলো,

— কুইক.. স্টেজটা খালি কর তো! পাচঁ মিনিটের মধ্যে খালি করার ব্যবস্থা কর! আজকে কিছু করার ইচ্ছা আছে বুঝলি!! পুরোনো একটা হিসাব এখনো চুকানো বাকি।

বলেই বাকা হাসলো মুগ্ধ। তন্ময় অবাক চোখে তাকিয়ে আছে মুগ্ধের দিকে। ভেবে পাচ্ছেনা মুগ্ধের বদলে যাওয়া রূপের রহস্য। কেন্ সে ইদানিং অন্যরকম করছে।

সবাই ধুমিয়ে নাচানাচি করছিলো হঠাৎ সাউন্ড বক্সটা অফ হয়ে হলো। উপস্থিত জনতার সবাই একপ্রকার খ্যাকিয়ে উঠলো। রিমি, জেনি, আহাদ, নাসিফ সবাই চত্বরের এক কোনা জুড়ে নাচানাচি করছিলো হঠাৎ গান বন্ধ হওয়াতে ওরাও থেমে গেলো। রামিম অস্ফুট কন্ঠে চেচিয়ে বলল, কোন্ আবালে গানটা বন্ধ করলো! কলিজা কতো বড়ো গানের সুইচে হাত লাগায়! রামিমের বকবক চলতে থাকলে হুট করে স্টেজে এন্ট্রি নিলো মুগ্ধ। রামিম কথা বলতে বলতে ঘুরে স্টেজের দিকে তাকাতেই জিহবায় কামড় দিয়ে বসলো! মুগ্ধ মাইক হাতে স্টেজে উঠৈ সবাইকে শান্ত হতে বলল। সবাই শোরগোল থামালে মুগ্ধ মাইক মুখের কাছে এনে বলে উঠে,
— সালাম আদাব নমস্কার সবাইকে!! কেমন কাটছে নবীন বরন উৎসব???
সবাই একযোগে চিৎকার করে বলল,
— ভালো!!
মুগ্ধ হালকা হেসে স্টেজে হাটতে লাগলো। হাটতে হাটতেই বলে উঠলো,
— গানটা হুট করে অফ করে দিয়েছি বলে মানুষ দেখি আমায় গালাগাল করছে!! ওহ্ মাই গড! আমি কি আপনাদের আনন্দে বেশি সমস্যা করে ফেলেছি গাইজ??
আগের মতোই সবাই চেচিয়ে বলে উঠলো,
— না!!
মুগ্ধ মাইকটা বা হাতে নিয়ে ডান হাতটা পকেটে পুড়ে নিলো। এরপর মুচকি হেসে বলে উঠলো,
— সবাই খুব এক্সাইটেড তাইনা!! রাদিফ মুগ্ধ কি করবে…নিউ কি করবে!! সবার মধ্যে দেখি এমন টাইপ ফিলিং কাজ করছে!! আচ্ছা আচ্ছা আমি আর ওয়েট না করাই। ডিরেক্ট কথাতে যাই কেমন!! একচুয়েলি এই বদমাইশ, গুন্ডা, বদ ছেলেটা কনফেস করতে এসেছে। হু সত্যি! অবাক হবেন না প্লিজ!! আমি সত্যি কনফেশান দিতে এসেছি। ভার্সিটি লাইফের লাস্ট ইয়ার কাটাচ্ছি। এবারই আমাদের ভার্সিটি ইয়ার শেষ। দেখতে দেখতে সময় কিভাবে গেলো জানি না, কিন্তু এই শেষ বছরটা অদ্ভুত কিছু দিয়েছে আমায়। আমি আজ তিনটা কনফেশান দিতে এসেছি। টোটাল তিনটা। এখান থেকে একটা আমার ফিউচার লাইফ সংক্রান্ত। বাকি দুইটা লাইফ নিয়ে বললেও বলতে পারেন যে মাস্তি ফান ছিলো। আচ্ছা আর কথা না বাড়িয়ে মেইন টপিকে আসি….

সবার মাঝে পিনপতন নিরবতা। কেউ একটা শব্দও করছেনা। রিমি, জেনি, পুরো হার্ন্টাস গ্যাং একধ্যানে মুগ্ধের কথা শ্রবন করছে। আমি স্টেজ থেকে দূরে গাছতলার কাছে দাড়িয়ে আছি। এখান থেকে স্টেজটা দেখতে পুরো স্পষ্ট।
— আমার কনফেশান নাম্বার এক. আমি ভার্সিটি লাইফে যতটা উগ্র আছি, রিয়েল লাইফে পরিবারের কাছে ঠিক ততোটাই নরম। কাজেই ভার্সিটির শিক্ষকগনকে আমি ছোট্ট পরিবার মনে করি। তাই তাদের কাছে নরম। অনেকের মনে প্রশ্ন, প্রিন্সিপাল আমার বিরুদ্ধে কেন নালিশ শুনেন না। আর শুনলেও কেন এ্যাকশান হিসেবে মামলাকারীকে রেস্ট্রিক্ট করা হয়। উত্তরটা হলো তারা আমাকে শ্রদ্ধা করেন। ভালোবাসেন তারা। তবে কেন শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসেন তা আমি সেটা বলবো না!! আপনারাই ঘেটেঘুটে জেনে নিয়েন…হা হা হা…

মুগ্ধের কথায় সবাই খুব মন দিয়ে শুনলেও শেষের কথাতে সবাই ভ্রু কুচকে যার যার পাশের জনের দিকে তাকালো। শুধু প্রিন্সিপাল স্যার হো হো করে হেসে দিলো। কারন কি বুঝলাম না!!
–আমার কনফেশান নাম্বার দুই. আমার বিপক্ষ দলের নেতার সাথে আমি একটা চিটিং করেছি। চিটিংটা বলতে গেলে বিগত তিনবছর ধরে করছি কিন্তু কেউ সেটা ধরতে পারেনি। যাইহোক আজ সেটা খুলে বলবো। ক্যাম্পাসে ‘ছাত্রনায়ক’ বা ‘ছাত্রনেতা’ হিসেবে যে নির্বাচন হতো সেখানে আমার দলের কজন ছেলে বিপক্ষ দলের ব্যালেট বাক্স গায়েব করে দিতো। তার বদলে সেই ব্যালেট বাক্সে ভরে দিতো আমার নামের ব্যালেট পেপার। যার ফলাফল হতো এই প্রতিবছর আমি সেই নির্বাচন জিততাম। বিপক্ষ দলের মেহেদি মাহবুব নাহ্। কারা অবশ্য আমার কাজে হেল্প করতো সেটা আমি মরলেও বলবো না…ইটস সিক্রেট!

এবার প্রিন্সিপাল স্যারের হাসির সাথে যোগ দিলো ফিসফিসানি হাসির শব্দ। কিন্তু কারা হাসছে ভিড়ের মধ্যে বুঝা বড় দায়!! বিপক্ষ দলের মাহবুবকে দেখে বুঝা গেলো রেগেমেগে ফায়ার হয়ে গেছে! সাঙ্গু পাঙ্গুর দল তাকে ঠান্ডা হতে বলছে।

— গাইজ?? এই কনফেশানটা না করলে চলে না?? আমার প্রচুর নার্ভাস লাগছে। আই নো, আমার মতো ট্রিপিক্যাল ছেলের মুখে এই কথা মানায় না। বাট আই কান্ট ডু! দেখুন…হাতও কাপছে। ভাবা যায়?? এই হাত দিয়ে কতো কান থেতলিয়ে মেরেছি! সেই হাতই কথা বলার জন্য কাপছে!!

মুগ্ধ মুখ থেকে মাইক সরিয়ে জোরে জোরে চোখ বন্ধ করে নিশ্বাস ছাড়ছে। সবাই খুব উদগ্রীব হয়ে আছে মুগ্ধ কি বলবে! হঠাৎ দেখি মেয়েরা নিজেদের মধ্যে কানাঘুসো শুরু করলো। কয়েকটা মেয়ে বলছে, শোন শোন!! আমার যা মনে হচ্ছেনা!! মুগ্ধ দ্যা সিনিয়র ভাই কাউকে প্রোপ্রোজ করবে বুঝলি!! আমার মন বলছে আজ কাউকে প্রোপ্রোজ করবেই!! আরেকটা মেয়ে ওকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠলো, ধুর ছাই! কি যে বলিস না! এই বেটা কারোর প্রেমে পড়বে?? তুই কুয়োয় ডুব দিলেও বিশ্বাস করবো না। পাশেরজন বললো, কেন? তোর আবার এই ধারনা কেন হচ্ছে?? তুই দেখোস নাই মুগ্ধ ডেভিল ইদানিং চুপিচুপি কি নিয়ে যেনো মনমরা থাকে?? প্রেমে পড়লেই এমন হয় ছাগল! মিলিয়ে নিস দেখিস! সবার কানাকানি চলতে থাকলে মাইক তুলে ফের হাস্যজ্জ্বল ভঙ্গিতে বলে উঠে মুগ্ধ,

— হুহ্…অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটাই তাহলে!! আমার কনফেশান নাম্বার তিন. বলতে গেলে আমি এমনেতে চুপচাপ কিন্তু কাজের বেলায় বাচাল। এটা সবাই জানে অবশ্য আমায় যারা চেনে। কিন্তু রিসেন্ট কি হচ্ছে জানেন? আমি কাজের বেলায় চুপ। অন্যবেলায় বাজ খাই অবস্থা। রোটেশন কিভাবে ঘুরলো কেউ বুঝতে পারছেন? রোটেশনটা কখন মানুষের জন্য হয় সেটা তো ধরতে পারবেন?? রোটেশন হচ্ছে ঘূর্নন! কিন্তু একটা মানুষের মধ্যে হুট করে রোটেশন ধরা পড়লে বিরাট প্রবলেম! সে দিন টু রাত ভুলে এমন একটা সিচুয়েশনে ফাসে যেটা তাকে বেহাল করে ছাড়ে। আমারো একই অবস্থা। দেখুন…চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল পড়তে শুরু করেছে, গাল পাতলা হয়ে যাচ্ছে। মোটকথা মুগ্ধ এখন কিছু একটার মুগ্ধতায় উপচে পড়েছে। ব্যাপারটা আরো ক্লিয়ারলি বুঝাই তাহলে বুঝবেন। আগে আমি পান থেকে চুন খসতে দেখলেই হুংকার দিয়ে উঠতাম। এখন পান থেকে চুন খসে গলে পড়ে যায় তাও আমার হুশঁজ্ঞান নেই। আমার এমন হাল কেনো হয়েছে বুঝেছেন তো? মানুষ লাইফে যেটা নিয়ে ভয়ে থাকে সেটাই তাকে গিলে ধরে। আমাকে গিলে ধরে তো গলাধকরন করে ফেলেছে। কি ডেন্জারাস দেখছেন?? কিসের মুগ্ধতায় এই মুগ্ধ এখন এলোমেলো হয়েছে…ইশারাটা আই হোপ বুঝে নিবেন। আমার কনফেশান কিন্তু শেষ। বিজ্ঞ বিজ্ঞ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষগুলা মেবি বুঝে নিয়েছেন। ধন্যবাদ!!

মুগ্ধের তিন নাম্বার কনফেশান নিয়ে আমি বাদে সবাই মিটিমিটি হাসছে। আমার সামনে দাড়ানো মেয়েদের গ্রুপটা আবারো গমগমে গলায় বলে উঠলো, ‘কিরে ফকিন্নি! দেখলি তো বেটা প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে!’ পাশে থাকা আরেকটা মেয়ে মুখের কথা ছিনিয়ে বললো, ‘আরে হারামীর দল! মেয়েটা কে ওইটা ভাবছোস? ওই মেয়েটা তো তুইও হতে পারিস! আমিও হতে পারি! বেটা কথা যে বললো বলতে গিয়েও কোয়েশ্চ্যান মার্ক মারলো।’ মেয়েগুলো নিজেদের মধ্যে হায়হায় করতে লাগলো। কেনো মুগ্ধ বিস্তারিত বললো না!! আমার পানির পিপাসা পেয়েছে। ঠা ঠা রোদে দাড়িয়ে থেকে গলা শুকিয়ে কাঠ। আমি পানি খেতে ওডিটোরিয়ামের উদ্দেশ্যে যাই। ওখানে লিখাই আছে ‘খাবার পানীয় ব্যবস্থা(ফিল্টারকৃত)’। আমি ওডিটোরিয়ামের উদ্দেশ্যে হাটা ধরলে সাউন্ড বক্স আবারো মাতিয়ে বাজানো শুরু হয়। ভলিউম আগের তুলনায় তিনগুন বেশি। একতালু দূরত্ব থেকে কেউ যদি কথা বলে তাও কারোর কানে পৌছাবেনা। আমি কানে হাত চেপে চত্বর পেরিয়ে ওডিটোরিয়ামে ঢুকে যাই। উফ! শান্তি! এখানে সাউন্ড কিছুটা কম আসছে। কেননা চত্বর কি আর কম ছোট?? একটা উঠান সমান জায়গা ছিলো! আমি আচল দিয়ে কপালে আলতো চেপে ঘাম মুছে চলছি। একটা টেবিলের উপর ফিল্টার রাখা। ফিল্টারের সাথেই সারি সারি স্বচ্ছ পরিস্কার গ্লাস সাজানো। পানি খেতেই হঠাৎ আমার কাধে কেউ হাত রাখলো! তখন কেবল গ্লাসে চুমুক দিয়ে একঢোক গিলেছি! সেই হাতের স্পর্শ কাধ ছুয়ে ছুয়ে ক্রমশ নিচের দিকে নামতে লাগলো। হাতের স্পর্শ পেয়ে আমার চোখ আটকে স্থির হয়ে গেছে! চুমুক বসানো পানির গ্লাস থরথর করে কাপতে লাগলো! তার স্পর্শ থামছেনা! আঙ্গুলের ছোয়া আমার শরীরে বসিয়ে ধীরেধীরে কোমরের দিকে যাচ্ছে! আমার সমস্ত তখন ভয়ের কারনে কাবু হয়ে শিরশির করছিলো! কি হচ্ছে আমার সাথে!

-চলবে

-Fabiyah Momo

তুমিময় প্রেম
PART 16
FABIYAH MOMO

হাতের স্পর্শ পেয়ে আমার চোখ আটকে স্থির হয়ে গেছে! আমার চুমুক বসানো পানির কাপটা থরথর করে কাপতে লাগল! তার স্পর্শ থামছেনা! আঙ্গুলের ছোঁয়া আমার শরীরে বসিয়ে ধীরেধীরে কোমরের দিকে যাচ্ছে! আমার সমস্ত ইন্দ্রিয় তখন ভয়ের কারনে কাবু হয়ে শিরশির করছিলো! তবুও নিজেকে শক্ত রাখার কঠিন ব্রত পালন করছিলাম! কি হচ্ছে আমার সাথে!

কাপা হাতে পানির গ্লাসটা টেবিলের উপর আস্তে করে রাখলাম। হাতের স্পর্শটা শাড়ির উপর কোমরের কাছে চলে গেছে। আমি ঠোট কুচকে সজোরে পিছনের দিকে কনুই মেরে দেই! ‘আউউ..’ শব্দযোগে কেউ চিৎকার করে উঠলো! আমি সাথেসাথে পেছন ফিরে সরে দাড়াই! তার দিকে তাকাতেই দেখি খারাপ স্পর্শওয়ালা ব্যক্তি আর কেউ না তন্ময়! আমার কনুই মারার আঘাত ডিরেক্ট পেটে যেয়ে লেগেছে তা তন্ময়ের পেট চেপে মুখের গোঙানিতেই বুঝা যাচ্ছে। হাটু ভাজ করে ফ্লোরের দিকে ঝুকে গোঙাচ্ছে খুব! আমি চটজলদি কাধের পেছন থেকে শাড়ির আচল টেনে বাইরে দৌড়ে যেতেই হঠাৎ কারোর আগমনী ধাক্কায় চোখমুখ খিচে উল্টে পড়ে যাই। ফ্লোরে পড়তেই মনে হলো কোমর বুঝি ভেঙ্গে চুরমার হলো! সমস্ত শরীরে ব্যথার ঝাকুনি অনুভূত হলো! এই বুঝি শেষ! মরে গেলাম! কয়েক সেকেন্ড না পেরুতেই একজোড়া হাত এসে শূন্যে তুলে নিলো! আমি হঠাৎ ধাক্কায় শক্ত টাইলস বসানো ফ্লোরে পড়ে ব্যথায় চোখ বন্ধ করে আছি। শরীরের সমস্ত ভর ছেড়ে দিয়েছি, মাথা সহ পুরো শরীরে তন্দ্রা মতো ঘোর লাগছে। চোখটা খুলে যে দেখবো সেই মিনিমাম শক্তিটুকু পাচ্ছিলাম না। আমি ধীরেধীরে জ্ঞান হারাই…

চোখটা খুলতে ইচ্ছে করছেনা কিন্তু মুখের উপর উজ্জ্বলবর্ণের সূর্যালো পড়ছে। মাথাটায় কেউ ঠান্ডাজাতীয় কিছু চেপে ধরেছে। আমি কোথায় আছি কিছুই বুঝতে পারছিনা। একবার মনে হয় কোনো নরমস্থলে মাথা পেতে শুয়ে আছি। আরেকবার মনে হয় কোনো ভিন্ন জগতে চলে গেছি। আচ্ছা আমি কি মরে গেলাম নাকি? আকষ্মিক মৃত্যুতে ঢলে পড়লাম? মরে গেলে এরকম অনূভুত হয়?? কিন্তু আমার যে কষ্ট হচ্ছেনা!! বরন্ঞ্চ আরামদায়ক অনুভব হচ্ছে। যেখানে আছি সেখানে এভাবেই যেন যুগ যুগ পার করতে ইচ্ছে করছে। কি অদ্ভুত শান্তি! এই শান্তি আম্মুর কোলে ঘুমালে ভীষণভাবে অনুভব করা যায়! শান্তির ঘুম! চোখের উপর কড়া করে আলো পড়তেই চোখদুটো আপনাআপনি খুলে গেলো। আমি ছোট ছোট চোখ করে তাকালাম। সবুজে ঘেরা বৃক্ষ সমারোহে আছি। মাটির বদলে সবুজ দূর্বাঘাস, খুব সুন্দর মিষ্টি সুভাষী ফুল, কিছুদূরে ঠান্ডা স্নিগ্ধ পরশ জাগানো পাখির সুর। আমি মাথা ধরে আলতো করে উঠাতেই কেউ মাথাটা আবার আগের জায়গায় চেপে ধরলো। আমি ভ্রুকুটি করলাম। কে আমায় ধরলো?? মাথায় ঠান্ডাজাতীয় কিছু আরো কঠিন করে চেপে ধরে নরম কন্ঠে বলে উঠলো,

— খারাপ লাগছে?? তোমাকে হসপিটালে নিবো?? খুব খারাপ লাগছে?

আমি কন্ঠটা শুনে ঝট করে মাথা উঠিয়ে ফেলি। মাথায় তৎক্ষণাৎ ব্যথা করে উঠলো! আমি মাথা ধরে একচোখ কুচকে মুগ্ধের দিকে তাকাতেই মুগ্ধ আমার হাতটেনে ওর কোলে শুয়িয়ে ছাড়লো! আমি বাধ্য মেয়ের মতো ওর কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে থাকি। মুগ্ধ আমার মাথায় বরফভর্তি আইসপ্যাক চেপে ধরেছে।

— তোমাকে আমি না করলে তুমি ত্যাড়ামি করবেই! তোমার স্বভাব এটা ! আমি যা বলবো তার খেলাফ করবেই! বেয়াদবি করলে কিন্তু রেহাই নাই পাকনি! সাবধান করে দিচ্ছি!
আমি আশেপাশে তাকিয়ে দেখতে ব্যস্ত আসলে আমি কোথায় আছি! এক কানে মুগ্ধের পেচাল শুনলেও কোনো ভাবাবেগ নেই আমার! মুগ্ধ আমার কপালের উপর থেকে চুল সরিয়ে কানের কাছে গুজে দিতে বলে উঠলো,

— এটাই ভাবছো কোথায় তুমি?
আমি মুগ্ধের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছি। এই বেটা মনের কথা বুঝলো কি করে?? মন বিশ্লেষণের স্পেশাল ট্রেনিং নিয়েছে নাকি?? মুগ্ধের দিকে তাকিয়ে নানা উল্টাপাল্টা চিন্তা করতে থাকলে মুগ্ধ আমার মাথা থেকে আইসপ্যাকটা সরিয়ে পাশের ছোট টেবিলে রাখলো। ছোট করে ঢোক গিলে ঠোটটা ভিজিয়ে বলে উঠলো,

— আমি সরি পাকনি! তোমাকে না জানিয়ে একটু দূরে নিয়ে এনেছি। আসলে আমার কিচ্ছু করার নেই বিশ্বাস করো!!

উনি পান্জাবীর পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে বরফ বসানো জায়গায় আইসপ্যাকের বারতি পানি মুছে দিতে লাগলো। নরমভাবে বলে উঠলো,

— তোমাকে ভালোবাসি বুঝছো! সোজা ভাষা তো বুঝোনা! না বুঝে ভং ধরে থাকো খালি! ভাব্ এমন..ভাজা মাছটা উল্টানো দূর, মাছ যে উল্টাতে হয় তাও জানো না। কি একটা অভিনয় মাই গড!
— ফালতু কথা বাদ দাও মুগ্ধ! তুমি আমায় কোথায় এনেছো জলদি বলো নাহলে আমি চিৎকার করবো!
— এটা সাজেক।

সাজেক শব্দ শুনে “অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর” প্রবাদের বাজনা বাজছে আমার! যেই বড়ো ছ্যাকাখোর লাগছে নিজেকে আল্লাহহহহ!!! মুগ্ধের প্রোপোজাল পেয়ে যে ছ্যাকা খেয়েছি, তার চেয়ে বড়ো ছ্যাকা ‘সাজেক’ আছি শুনে ফিল করছি! মুগ্ধ একদম বাজিমাত করে দিলো খোদা! আমার উপর ডাবল খেলে দিলো! আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে কোলে মাথা রেখে তাকিয়ে থাকলে মুগ্ধ বলে উঠে,

— দেখো আই লাভ ইউ! আমি আর কিচ্ছু চাইনা! তোমাকে চাই! হেই ড্যামিট তাকাও আমার দিকে! আই লাভ ইউ! আই সেইড আই লাভ ইউ! হকিস্টিকের বারি খেয়ে বলতে পারো আমি প্রেমময় হয়ে গেছি! তুমিময় প্রেমনামক পাগলামি শুরু করেছি! আমার কোনো সকাল নেই দুপুর নেই, খাওয়া নেই দাওয়া নেই! খালি বিছানায় শুয়ে শুয়ে তোমার কারনামা ভাবি! কি সাংঘাতিক ব্যাপার! উফ ! আমি ভালোবাসি ভালোবাসি ভালোবাসি! শেষষষ! আই জাস্ট লাভ ইউ!

আমি বোকার মতো মুগ্ধের দিকে তাকিয়ে আছি। এই বান্দা কেমন পাগলামো করছে!!! মুগ্ধ মৃদ্যু নিশ্বাস ছেড়ে আমার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে উঠলো,

— পাকনি মাথার বাম সাইড তো ফুলে গেছে!! তোমাকে হসপিটালে নেবো কি?? ইশশ কি যে পেইন হচ্ছে তোমার! কি যে করি!! আইসপ্যাকে তো কাজ হলো না!! ফোলা যে কমছেনা!! শালার তন্ময় রে যদি জবাই না করছি আমার নামও রাদিফ মুগ্ধ না! শালার সাহস কত্ত তোমাকে টাচ করছে! ওরে বারবার এলার্ট করার পরেও তোমাকে টাচ করার কলিজা কিভাবে আসলো! আই সয়ার পাকনি তন্ময়কে আমি ছাড়বো না! নো ম্যাটার হোয়াট, আই ওন্ট লিভ হিম !

-চলবে

-Fabiyah Momo

তুমিময় প্রেম
PART 17
FABIYAH MOMO

মুগ্ধ চিন্তিত মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কোনো বলা নেই, কওয়া নেই হুট করে মুখের উপর এত্তোগুলা কথা বলে উঠলো আমি কোনো প্রতিক্রিয়া দিতে পারছিলাম না। সম্পূর্ণ হতভম্ব হয়ে কোলে মাথা রেখে ওর দিকে তাকিয়ে আছি, মুগ্ধ অস্থিরচিত্তের মতো ছটফট করছে! একটুপর আমার হুশ ফিরলে আমি ঝট করে কোল থেকে মাথা উঠিয়ে দাড়িয়ে পড়ি। সাথেসাথেই মাথায় হালকা চক্কর দিয়ে উঠে। আমি পড়ে যেতে নেই। মুগ্ধ দৌড়ে ধরতে আসলে আমি মাথা ধরে নিজেকে সামলে নেই। ওর দিকে তর্জনী উঠিয়ে ওখানেই স্টপ হতে বলি। ও হাত বাড়িয়ে দিলেও সেই হাত অসহায় ভঙ্গিতে থামিয়ে দেয় মুগ্ধ। আমি মাথায় ফোলা সাইডটায় আলতো আলতো করে বুলিয়ে দেখছি। অনেকখানি ফুলে গেছে। হলরুম থেকে বেরুনোর সময় হঠাৎ মুগ্ধের সাথে ধাক্কা খেয়ে ডিরেক্ট ফ্লোরে মাথা গেথে পড়ি, তাতেই ডানসাইডটা ফুলে বোম হয়ে আছে। এই বোম ফুটলেই আমি ব্রেনলেস হয়ে মারা যাবো!! মুগ্ধ কাতর গলায় বলে উঠলো,

— প্লিজ পাকনামি করো না! মাথায় ভীষন ফুলে উঠেছে! এ অবস্থায় তুমি পড়ে যাবে! বিশ্বাস করো! আমাকে ধরতে দাও!! আমি প্রমিস করছি তোমার হাত ছাড়া আর কোথাও টাচ করবো না!! প্লিজ! তুমি পড়ে যাবে! কথা শুনো..
আমি সব শ্রবন করে কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে শক্ত গলায় বলে উঠি,
— পানির বোতল থাকলে পানি দাও! একটা বাড়তি কথা বলবা না! আমার কাছ থেকে দূরে থাকো! দূরে থাকো বলছি!
— দিচ্ছি !! আমি দিচ্ছি!!

মুগ্ধ কথামতো পানির বোতল এনে হাজির হয়। আমি ওর হাত থেকে বোতলটা নিয়ে অর্ধেকটা খেয়ে গলা ভিজিয়ে বাকি অর্ধেকটা মাথা মাটির দিকে নুয়ে টনটন করা ডানদিকটায় ঢালি। মুগ্ধ কিছুদূর থেকে আমার অবস্থা চোখ দিয়ে দেখছে, কিন্তু আদেশের কারনে আমার কাছে এসে কিচ্ছু করবে সেই সাহস দেখাচ্ছে না। নিজেকে কিছুটা সুস্থবোধ ফিল হলে পরিবেশটার চারপাশে তাকাই। সুন্দর একটা জায়গা। জায়গাটা বৃক্ষসাজিতে ঘেরা। বিশাল বড়ো বড়ো লম্বা গাছ, প্রশ্বস্ত শাখাওয়ালা ঝাপটানো গাছের বহর। বটগাছটার নিচে বাধানো ইট সিমেন্টের কৃত্রিম সোফামতো জায়গায় মুগ্ধ আমাকে কোলে নিয়ে শুয়ে বসেছিলো। আমি যেদিকটায় দাড়িয়ে আছি এখানে ছোট্ট লেক। লেকের চর্তুপাশে ঝার বাতি লাগানো। মাথা এখন ঘুরছেনা, অনেকটাই বেটার ফিল হচ্ছে সতেজ পরিবেশে। মুগ্ধ আর তর সইতে পারলো না জলদি আমার দিকে তেড়ে এসে ঠিক একহাত দূরত্ব রেখে দাড়ালো! ওর নিকটস্থ আসাটা আমাকে চরম ভোগান্তিতে ফেলছে!মুগ্ধ কিছু বলার জন্য ঠোট নড়াবে তার আগেই ঠাস করে এক চড় মুগ্ধের গালে বসিয়ে দেই। চড়ের জোরে সে কিছুটা হেলে দুকদম পিছিয়ে যায়। আমার এখনো রাগ কমেনি! একফুটাও নাহ্! দুহাতে মুঠি চেপে দাতেঁ দাত চিবাচ্ছি! মুগ্ধের কোনো ভাবাবেগ হলো না! সে নির্লজ্জের মতো আবার কাছে এসে মুখ খুলে হনহন করে বলে উঠলো,
— চড় মারলে না? প্লিজ আরো মারো! মারতে থাকো! যতো জিদ আছে সব ঢালো! তবুও প্লিজ আমায় একসেপ্ট করো! আই জাস্ট ওয়ান্ট ইউ! প্লিজ আমি আর পারছি না…

কথা শেষ না হতেই হাত উঠিয়ে একই গালে আরেক দফা চড় দিলাম! চড়ের শব্দ নিস্তব্ধ পরিবেশে বিকট শব্দ করে উঠলো! ফর্সা চামড়ার উপর পাচঁ আঙ্গুলের ছাপ বসে গেছে। কেউ ওর চড় খাওয়া মুখ দেখলে উল্টো আমার উপর বন্দুকের দুটো বুলেট ছুড়তে একটুও দ্বিধাবোধ করবেনা। কেননা, রাদিফ মুগ্ধের জন্য চড়ের ছাপ মানান না! তাও আবার মিডেল ক্লাস মেয়ের হাতের চড় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য না।

— তোকে ওয়ার্ন করার পরেও কানে যেহেতু শুনিস না! আশাকরি চড়ের ভাষা কক্ষনোও ভুলবি না! তুই যেমন ! তোর সাথে তেমন বিহেব করার দরকার ছিলো! মাঝেমাঝে তোর সাথে কি আহামরি ভালো বিহেব করেছি তা দেখেই ভেবেছিস তোর প্রেমের প্রোপ্রোজাল আমি খুশিখুশি মেনে নিবো! হায়রে বেচারা! আরে শুনে রাখ! আমি তোর প্রথমদিনের ব্যবহার যেমন ভুলবো না, তুইও এই ঠাসঠাস চড়ের আঘাত কোনোদিন ভুলতে পারবিনা! আমি তোর বাসায় আর পড়াতে যাবো না! তোর ভাতিজিকে বলে দিস নিউ একটা যোগাড় পেতে! আমি আর আসবো না! বায়!

কঠিন ভাষায় কথাগুলো বলে চলে আসতে নিলে মুগ্ধ আমার পেছন থেকে সামনে এসে পথ আটকায়। চোখ দুটো ছলছল করছে তার। যেকোনো মূহুর্তে অশ্রুবন্যা বইয়ে যেতে পারে। আমি চোখমুখ শক্ত করে কঠিন কিছু বলতে নিবো! মুগ্ধ আরো অসহায় দৃষ্টিতে চোখের বাধ কোনোরকমে আটকে বলে উঠলো,

— আমিই তো দোষ করেছি, আমিই দোষী….ফাইজাকে কষ্ট পেতে দিও না প্লিজ…ওর জন্য তুমি এখন অনেক কিছু…ও তো মাসুম, প্লিজ ওর দিকে তাকিয়ে একবার ভাবো! ওকে পড়ানো বন্ধ করো না পাকনি, তোমাকে দোহাই দিচ্ছি, আমি তোমাকে আর প্রবলেমে ফেলবো না!! আমি প্রমিস করছি!!
— তোর ভাতিজির দোহাই দিয়ে বাচার চেষ্টা করবি না! আই ওয়ার্ন ইউ!
— আই সয়ার! আই সয়ার ওকে আমাদের মাঝে টানবো না! আমি কথা দিচ্ছি!! আমি কথা দিচ্ছি প্লিজ বিশ্বাস করে দেখো!!

আমি অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে চোখ বন্ধ করে জোরে নিশ্বাস ছাড়লাম। নিজেকে কন্ট্রোল করা খুব জরুরী! নয়তো খারাপ কিছু ঘটিয়ে ফেলবো আমি! মুগ্ধ মাটির দিকে তাকিয়ে পান্জাবীর ফোল্ডেড হাতাটা চোখের কাছে ঘষে নিলো। আমি ওর দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টি ছুড়ে সেখান থেকে পা চালিয়ে চলে আসতে লাগলাম। অনেকখানি রাস্তা পেরিয়ে মেইন গেট দিয়ে বের হতে নিলে ওর দিকে একবার পিছু ফিরে তাকাই! মানুষটা একাধারে পান্জাবীর হাতাটা চোখে ডলেই যাচ্ছে। বারবার মুছে চলছে দুচোখের অশ্রান্ত অশ্রুগুলো। কোনো থামা নেই, কোনো বাধা নেই…রাদিফ মুগ্ধ আজ আবেগের কাছে হেরে বসলো। আমি আমার পথপানে চেয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেই। দেখার ইচ্ছে নেই আমার! এসবে আগ্রহ নেই!

মুগ্ধ হাটুগেড়ে বসে পড়লো মাটিতে। হাতদুটো কানে চেপে নিশব্দে চোখের পানি ফেলতে লাগলো! প্রচুর কষ্ট হচ্ছে তার! গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিতে ইচ্ছে করছে! নিজেকে গাড়ির নিচে পিষে ফেলতে ইচ্ছে করছে! সবকিছু লন্ডভন্ড করতে ইচ্ছে করছে! কেনো ছিড়ে যাচ্ছে বুকের মাঝখানটায়? পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অসহায় বাক্য তাহলে, “সে তোমাকে ভালোবাসে না”!!

-চলবে

-Fabiyah Momo

তুমিময় প্রেম
PART 18
FABIYAH MOMO

আকাশ অন্ধকার করছে। হালকা ঝিড়িঝিড়ি বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তায় একটা জনমানব নেই। একদম এই মাথা থেকে ওই মাথা খালি। একটা গাড়িও চলছে না। মুগ্ধ আমায় কেমন জায়গায় নিয়ে আসলো? হাটতে হাটতে অনেক দূর চলে এসেছি। পিছু ফিরে যাওয়ার সময় নেই। মুগ্ধ হয়তো চোখ টলমল করে আকাশের পানে চেয়ে অভিযোগ বানী শুনাচ্ছে। হাতটা উঠিয়ে দেখলাম। আমার হাতটা এখনো লালবর্ণ ধারন করে আছে। থাপ্পরটা তার গালে কেমন দাগ বসেছে সেটা আমার হাতই বলে দিচ্ছে। শাড়ির আচঁলটা আরেকটু টেনেটুনে হাতটা নামিয়ে হাটতে লাগলাম। নজর শুধু একটা গাড়ির জন্যে। কেউ যদি লিফট দিতো!! কিন্তু এই সুনশান জায়গায় গাড়ির প্রকাশও নেই। লিফট কে দিবে!!

আরো আধঘন্টা হেঁটে অনেকদূর চলে এসেছি। মেঘের কালোভাবটা যেনো তীব্র আকারে ঘনিয়ে এসেছে। বাতাসের গতিবিধি একটা ঝড়ের আভাস দিচ্ছে। এখনো গাড়ির দেখা মিলছেনা। জায়গাটা এমন নিরব কেনো? মানুষ থাকে না? প্রশ্নগুলো অগোচরে মনের মধ্যে ঢিল ছুড়তে লাগলো। সেগুলো দমিয়ে রেখে সামনে কয়েক কদম দিবো ওমনেই শো করে একটা গাড়ি এসে ঠিক আমার পায়ের কাছে থামালো। আমি ঘটনাক্রমে ভ্রু কুচকে চমকে উঠলে গাড়ির কাঁচটা নেমে গেলো। আরো দুদফা ভ্রু কুচকে এলো আমার! মুগ্ধ গিয়ারে দুহাত রেখে গম্ভীর ভাবে সামনে তাকিয়ে আছে। ওকে ভয়াবহ গালি দিতে ইচ্ছা করলেও মনে মনে নিজেকে কন্ট্রোল করি। জোরে শ্বাস ছেড়ে ওকে ইগনোর করে সামনে পা বাড়ালে মুগ্ধ বলে উঠে,

— নিজেকে বেশি পন্ডিত ভেবো না! গাড়িতে উঠো! এখানে কোনো গাড়ি পাওয়া যায়না!
— লজ্জা থাকা উচিত! কোন্ মুখে আমাকে পন্ডিত বলতে আসো!

মুগ্ধ সোজা আমার দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভ্রু উচু করলো। মুখে ফুল ডোজ এক্সট্রা এটিটিউট! গিয়ার থেকে হাত ডান সরিয়ে থুতনি বুলাতেই আপাদমস্তক দেখে নিলো আমার! ওর চাহনি কখনো অশ্লীল লাগেনি, কিন্তু এভাবে কেনো তাকাচ্ছে আজ?

— তুমি এটা অন্তত জানো, আমি একটা ছেলে! সো আমি কি কি করতে…..

কথাটুকু বলে উদ্ভট করে তাকালো সে। পরক্ষনে গাড়ি থেকে নেমে আমাকে টেনে ধরে গাড়িতে বসিয়ে গাড়ি স্টার্ট দেয় মুগ্ধ। গাড়ি সুগম পাকা রাস্তা ধরে একেবেকে চলছে। আকাশ ভেদ করে বৃষ্টির বড় ফোটা পড়ছে এখন। একেকটা বৃষ্টির ফোটা গাড়ির জানালায় ঘোলাটে থেকে স্বচ্ছ বানিয়ে দিচ্ছে। অনেকক্ষন যাবৎ চুপচাপ সময় কাটার পর ওর পাশ থেকে কন্ঠস্বর ভেসে আসলো। আমি তখন জানালার দিকে তাকিয়ে সিটে হেলান দিয়ে বৃষ্টি দেখছি।

— তুমি অন্য কাউকে ভালোবাসো? বলো? আমায় কেনো রিজেক্ট করলে? কি কারন বলো প্লিজ!

আমি জবাব না দিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে আছি। মুগ্ধ একই প্রশ্ন গমগম গলায় কয়েকবার করলো। আমি ঘাপটি মেরে চুপ করে আছি তো আছিই। জবাব না দিয়ে উল্টো শক্ত হয়ে আছি। হঠাৎ বিকট একটা শব্দ হলো মুগ্ধের সাইড থেকে। আমি শব্দটা শুনে পুরো বিচলিত চাহনিতে ওর দিকে হতবাক হয়ে আছি! দরুন শব্দটা হওয়ার পরপরই মুগ্ধ ব্রেক কষে দিলো! মুগ্ধের হাত থেকে রক্ত পড়ছে।

জানালার কাচটা অক্ষত নেই। পুরো জানালাটা চুরমার হয়ে গেছে মুগ্ধের ঘুষিতে। হিংস্র ন্যায়ের রাগ দেখাচ্ছে মুগ্ধ। নাক দিয়ে ফোস ফোস করে নিশ্বাস ছাড়ছে ক্রমাগত। আমি ওর অবস্থা দেখে কি করবো বুঝতে পারছিনা। প্রচুর রক্ত পড়ছে হাত থেকে!! হাতটা টেনে দেখবো কি!! নিজের উপর থেকে সিটবেল্টটা খুলে ওর দিকে ঝুকে হাতটা কাছে টেনে নেই। এখনো একটা কাচ টুকরো ওর হাতে ঢুকে আছে। রক্ত গলগল করে মুগ্ধের হাত বেয়ে পান্জাবীর ফোল্ডেড হাতায় যেয়ে লাগছে। ওর রাগ এতেও যেনো কমলো না। আমার কাছ থেকে হাত ছাড়িয়ে কাটা হাতে পরপর আরো দুটো ঘুষি মারলো মুগ্ধ। আমি কানে হাত চেপে চোখ খিচে শক্ত হয়ে আছি। ওর এই রূপ দেখার জন্য আমি প্রস্তুত না! একদম না!! এই মুগ্ধকে আমি চিনি না!!

মুগ্ধ ফোস ফোস করে চেচিয়ে বলে উঠলো,

— ভয় পাচ্ছো পাকনি? ভয় পেও না! আমি তোমাকে মনের ভুলেও ক্ষতি করবো না। যা করবো এই নিজেকে করবো! নিজেকে শেষ করবো! তিলেতিলে শেষ করবো! বারবার ক্ষত করবো নিজেকে! তুমি ভয় পেও না।

আস্তে আস্তে কান থেকে হাত সরিয়ে মুগ্ধের দিকে তাকাতেই মুগ্ধ আমার হাত টেনে আমার মাথা ওর বুকে চেপে ধরলো। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত হতে বললো সে। আমি ঘন ঘন হাফিয়ে জোরে নিশ্বাস ছাড়ছি। মুগ্ধ ওর রক্ত মাখা হাতটার উপর সাদা কাপড়ে মুড়ে নিলো। মাথায় হাত বুলিয়ে আলতো ঠোঁট ছুয়িয়ে নম্র কন্ঠে বলে উঠলো,

— শান্ত হও পাকনি। ভয় পেও না প্লিজ। ভয় পেও না। আমি আছি তো। শান্ত হও…

-চলবে

Fabiyah Momo

তুমিময় প্রেম
PART 19
FABIYAH MOMO

মাথায় হাত বুলিয়ে ঠোটঁ ছুয়িয়ে দিলো মুগ্ধ। গলায় আর তীক্ষ্ম মেজাজের আভাস নেই। নম্র গলায় আলতো করে মাথায় হাত ছুয়িয়ে দিচ্ছে সে। আমার মাথাটা বুকে আগলে ধরে কাটা হাত দিয়ে সামনে থেকে পানির বোতলটা নিলো মুগ্ধ। আমাকে পানি খাইয়ে সিটে হেলান দিয়ে বসিয়ে সে তাড়াহুড়ো করে হাতে রুমাল পেচালো। ভাঙা জানালা দিয়ে পানি এসে মুগ্ধের পান্জাবী ভিজিয়ে দিচ্ছে। মুগ্ধ কোনোমতো হাতে রুমাল বেধেঁ বৃষ্টির মধ্যেই গাড়ি স্টার্ট দিলো। প্রচুর অস্থিরতা কাজ করছে ওর মাঝে। কতক্ষণে গাড়ি ছুটিয়ে বাড়ি পৌছাবে সেই চিন্তাভাবনা মাথায় চেপে বসেছে। আমি কাটাছেড়া একদম দেখতে পারিনা। একটুও না। ওর হাতের দিকে একবার তাকালে আমার দম বন্ধ হয়ে নিশ্বাস আটকে আসে। কাচ দিয়ে গভীর করে কেটেছে হাতটা। অনেক গভীরভাবে কেটেছে। সেলাই পড়ে কিনা কে জানে?

.
.

বৃষ্টির মধ্যে পাড়ি দিয়ে রাত ঠিক একটার দিকে বাসার সামনে নামি। মুগ্ধের সাদা রুমাল আর সাদা অবস্থায় নেই। রক্তে মাখামাখি হয়ে গেছে সম্পূর্নটা। রক্ত শুকিয়ে চটচটে আকার ধারন করেছে। রুমালটা এনে বেসিনের ট্যাপের নিচে ভিজিয়ে চিপলে বেশখানিক তরল রক্ত পড়বে গ্যারান্টি! মুগ্ধ গাড়ির দরজায় ঠেস দিয়ে বামহাত দিয়ে কাটাহাত আকড়ে দাড়িয়ে আছে। অসহ্য জ্বালা করছে হয়তো!! আমি ওর অসহায় চাহনিটা একবার দেখে বাসার গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলাম। মুগ্ধ হয়তো চোখ দিয়েই বলছিলো, “প্লিজ যেও না! আচ্ছা না গেলে হয়না?? আমার কাছেই থাকো?? আমিতো তোমায় যেতে দিতে চাইনা!! প্লিজ থাকো!!”

সিড়ি দিয়ে উঠতেই সিড়ির জানালায় উকি দিলাম। মুগ্ধ কাটাহাতের দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো ভাবছে, “হাতটা দিয়ে কিছুক্ষণের জন্য ওকে কাছে পেয়েছিলাম! এই হাতটার জন্য মুগ্ধ ধন্য!” দরজায় কলিংবেল দিতেই দেখি দরজায় একটা বড় তালা ঝুলানো। আব্বু আম্মু বাসায় নেই? আশ্চর্য উনারা কোথায় গেলো? আমার কাছে ব্যাগটাও নেই! ধ্যাৎ সেটা মনেহয় হলরুমের ওখানে দৌড়াতে গিয়ে ফেলে এসেছি! এখন কল করি কিভাবে? পায়চারি করতে লাগলাম আমি। কি করি ভেবে পা চালিয়ে একবার এইদিকে, একবার ওইদিকে হাটছি। মুগ্ধকে বলবো? নাহ্ দরকার নেই! ওর হাত কেটে গেছে, এক্ষুনি ড্রেসিং করাতে হবে! গরমে ঘেমে উঠছি আমি। কপাল বেয়ে কানের কাছে ঘামের তরল পড়ছে। আমি শাড়ির আচঁলে ঘাম মুছতেই ঘামের বদলে রক্ত দেখে শিউরে উঠলাম! একি!! আমার মাথাও কি ফেটেছে? মাথার কোথা রক্ত থেকে পড়ছে? আবারো মাথায় হাত দিয়ে ব্যথার পরিক্রমা বুঝার চেষ্টা করছি। আমার তো কোথাও ব্যথা জ্বালা করছেনা!! তাহলে কি মুগ্ধের হাত থেকে রক্ত এসে আমার মাথায় লেগেছে?? আল্লাহ ওর হাত…. আমি ধরফর করে সিড়ি দিয়ে নেমে গেটের বাইরে গেলাম। জোরে জোরে হাপাচ্ছি আমি। মুগ্ধ চলে যায়নি। ও দাড়িয়ে আছে। ঠিক ওভাবেই আছে যেভাবে আমি সিড়ির জানালা দিয়ে দেখেছিলাম। মুগ্ধ আমার দিকে তাকাতেই ভ্রু কুচকে প্রশ্নসূচক ভঙ্গিতে এগিয়ে আসলো। কন্ঠে বিষ্ময় গুলিয়ে বলে উঠলো,

— তুমি নিচে নামলে যে?? আঙ্কেল আন্টি বকেছে??

আমার হাপানো শেষ হয়নি। আমি এখনো মুখ হা করে নিশ্বাস ছাড়ছি। মুগ্ধ আমার হাত ধরে বলে উঠলো,
— চলো আমি দেখছি! ব্যাসিক্যালি ফল্টটা আমার। আমিই আঙ্কেল আন্টিকে বোঝাবো। দরকার পড়লে আরো দশটা থাপ্পর খাবো তবুও চলো প্লিজ। আমি আঙ্কেলকে খোদ বুঝাবো!

থাপ্পড়ের কথা মনে উঠতেই আমার চোখ যেয়ে ওর গালের দিকে আটকালো। গালে পুরোপুরি পাচঁটা আঙ্গুলের ছাপ বসেছে। লাগাতার দুটো কষিয়ে চড় দেওয়াতে রক্ত জমে গেছে গালে। মুগ্ধ আমার হাত ধরে গেটের জন্য পা বাড়াতেই আমি বলে উঠলাম,

— উনারা বাসায় নেই। দরজায় তালা।

কথা কানে পৌছাতেই মুগ্ধ আমার হাত ছেড়ে অবাকচোখে তাকালো। রাতের একটারও খুব বেশি বাজে আর উনারা বাসায় নেই! ব্যাপারটা স্ট্রেন্জ! মুগ্ধ কিছুক্ষন চুপচাপ তাকিয়ে থেকে ঠান্ডা কন্ঠে বলে উঠলো,

— আচ্ছা তুমি চলো। আমি থাকার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। আমি থাকতে তোমাকে টেনশান ভোগ করতে দিবো না।

আমি ওর সাথে যাবো যাবো করলেই যাওয়াটা মোটেই ঠিক হবেনা আমার। প্রথমত আব্বু আম্মু কোথায় আছেন জানতে হবে, কেনো এতো রাতে উনারা বাইরে গিয়েছেন, কোনো আপদ এসে বিপত্তি করলো কিনা খোঁজ নিতে হবে। মুগ্ধ আমার ভাবুক দুনিয়ায় ছেদরেখা টেনে বলে উঠে,
— গাড়িতে উঠো! এইবার কথা না শুনলে নিজের বুকে ছুড়ি ঢুকাবো!

.
.

–হ্যালো ইসু? ইসু? তুই শুনতে পাচ্ছিস!! আমার একটা হেল্প লাগবে!! হ্যালো….হ্যালো ইসু…

কল রিসিভ করে কোনো কথা বলছেনা ইসু। আমি এইযে চেচিয়ে ইসু ইসু করছি কোনো লাভ হচ্ছেনা। মুগ্ধ গাড়ি চালাচ্ছেন। রাস্তাঘাট পুরো নিরব। শুধু আমাদের গাড়ি ও কেবল আমরা। মুগ্ধ পাশ থেকে ড্রাইভ করতেই বলে উঠলো,

— তুমি এই মেয়েটাকে আর কক্ষনো কল করবেনা পাকনি। মেয়েটা ভালো না।

আমি অবাক হয়ে গেছি। মুগ্ধ আমার ইসরাতকে নিয়ে কিভাবে খারাপ কথা বললো! ইসু আমার বেস্টু! আমি জবাবের আশায় কপাল কুচকে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলে মুগ্ধ সামনের দিকে তাকিয়ে বলে উঠে,
— ক্যাম্পাসে তোমার নামে যতপ্রকার কুটনামি হয়েছে তার জন্য ইসরাত দায়ী। তুমি জানো কিনা ডোন্ট নো, বাট ইসরাত আমাদের গ্যাংয়ের কাছে তোমার কিছু গোপন তথ্য শেয়ার করেছে।
— কি তথ্য??
— সেটা সিক্রেট! জাস্ট এটুকু শুনে রাখো মেয়েটা তোমার জন্য ভয়ঙ্কর। প্লিজ নিজেকে মেয়েটার কাছ থেকে দূরে রাখো। আই বেগ ইউ!

মুগ্ধ গাড়ির স্পিড আরো বাড়িয়ে দ্রুত চালালো। আমি থতমত খেয়ে জানালায় তাকিয়ে রাতের অন্ধকার দেখছি। গাড়িতে থাকতেই মুগ্ধ একটা কল করে বসলো,

— হেই রিনি! আর ইউ স্লিপিং? প্লিজ! আই নিড হেল্প নাও! বেব্ তোর বাসায় আসছি। হ্যাঁ আমি গাড়িতে। আমার সঙ্গে…আমার সঙ্গে কে আছে সেটা পরে দেখিস প্লিজ আগে থাকার ব্যবস্থা কর! থ্যাংকিউ সো মাচ্ বেব! থ্যাংকিউউ! আমি আসছি!!

.
.

আভিজাত্য সোসাইটির শৌখিন রাস্তা ধরে গাড়ি ঢুকলো মুগ্ধের। রাস্তার দুধারে অসংখ্য ল্যাম্পপোস্টের বাতি জ্বলছে। মুগ্ধ একটা বিল্ডিংয়ের কাছে নামিয়ে দিয়ে গাড়ি পার্ক করতে পার্কি লটে গেলো। আমি বিল্ডিংয়ের মেইন গেটের কাছে মুগ্ধের জন্য অপেক্ষা করছি। সুন্দর একটা নয়তলা বিল্ডিং। নিখুঁত নিপুণতার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে বিল্ডিংয়ের দেয়ালে দেয়ালে। নাম, “আজগর ভিলা”। বোঝাই যাচ্ছে খুব ভালোমানের প্রকৌশলী দ্বারা বিল্ডিং নকশা করা হয়েছে। মুগ্ধ গাড়ি পার্ক করে আমার হাতটি ধরলো এবং “চলো” উক্তি শুনিয়ে গেটের ভেতরে নিয়ে গেলো। লিফটের ছয়নাম্বার বাটন চেপে দিলো মুগ্ধ। লিফট উপরে উঠছে। মুগ্ধ নিচের ঠোটটা দাঁতে চেপে খিচ মেরে আছে। ওর হাত কি প্রচন্ড জ্বালা করছে? করতেই পারে! অনেক খানি কেটেছে!

বড় একটা কাঠের দরজার সামনে দাড়িয়ে বেল দেওয়া হলো। বেল বাজাতে দেরি চট করে দরজা খুলতে সময় লাগলো না। গোলাপি রঙের টিশার্ট ও লাল রঙের ট্রাউজার গায়ে দরজা ধরে দাড়িয়ে আছে রিনি। চোখ বিশাল আকারে বড় করে দেখছে আমাকে, চোখ ঝুলে গেছে ওর। মুগ্ধ রিনিকে দরজা থেকে সরতে বলে ভেতরে ঢুকলো আমার হাত ধরে। রিনি হতভম্বের মতো তাকিয়ে আছে এখনো। মুগ্ধ ওকে স্বাভাবিক হতে বলে রুম দেখাতে বললো। রিনির দেখানো গেস্টরুমে গিয়ে বেডে বসলাম। মুগ্ধ সোফায় গিয়ে পা তুলে বসলো। রিনি সার্ভেন্ট ডাকিয়ে লেমনেড আনালো। মুগ্ধ ফোনে ব্যস্ত। চুটিয়ে চ্যাটিংয়ে করছে ফোনে। রিনি আমতা আমতা করে বলে উঠলো,

— মুগ্ধ তুমি এই অবস্থায় কেনো? কোথায় ছিলে? পান্জাবীতে রক্ত কিসের? হাত! হাতে কি হয়েছে??
— মাই গড! রিনি থাম তো! চেচাস না প্লিজ। আমি ইর্ম্পট্যান্ট একটা কাজে ছিলাম। হাতে কিছুই হয়নি। নরমাল ইন্জুরি।
— না ! এটা নরমাল না মুগ্ধ! তোমার সাদা রুমালটা ব্লিডিংয়ে ভরে গেছে! দেখি হাতটা দেখাও দেখি!!
— দূরে থাক! কাছে আসবি না! একটা ফাস্ট এড বক্স দিয়ে যা প্লিজ। বাকিটা ও দেখবে! গো!
রিনি আমার দিকে ভ্রু কুচকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে চিকিৎসা বাক্স আনতে ছুটে গেলো। রিনি যেতেই দরজা ঠেলে দিলো মুগ্ধ। ওর ফোনটা আমার হাতে বললো,

— আরেকটা বার ট্রায় করো দেখো! যদি আঙ্কেল ফোন পিক করে!! নাও ধরো!

মুগ্ধের ফোন দিয়ে এই পযর্ন্ত বহুবার কল দিয়েছি। আব্বু আম্মু কেউই কল রিসিভ করছেনা। কি হলো উনাদের? আমার তো এখন কাদঁতে ইচ্ছে করছে! উনারা কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে গেলো?? ফোন ধরলো না কেউ। বাজতে বাজতে কেটে গেলো কল। মুগ্ধ আমার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে চার্জিং সকেটে বসালো। জানালা দিয়ে দুমকা হাওয়া আসছে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উঠছে বারবার। আমি সেদিকে তাকিয়ে আছি। চোখের বাধ মানছেনা কিছুতেই। গালের উপর দিয়ে নোনা বিন্দু গড়াতে লাগলো নিমিত্তে। মুগ্ধ আবারো ব্যস্ত হয়ে উঠলো। প্রতিবার এই মানুষটা অস্থির হয়ে উঠে কেনো? আমার মন খারাপের প্রতিটা প্রহরে সেও কি অনুভব করে ক্ষনে ক্ষনে? মুগ্ধ আমার খুব কাছে এসে বসলো। বাতাসের প্রবাহে মুখের উপর থেবড়ে পড়া চুলগুলো আলতো করে কানের পিছনে সরিয়ে দিলো মুগ্ধ। আমার থুতনিতে হাত রেখে মুখটা সম্পূর্ন তার দিকে ঘুরিয়ে ঝট করে আমাকে চমকে দিয়ে ঠোঁট ছুয়িয়ে দিলো কপালে। আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেছে!! মুগ্ধ চোখের পলকে কি করলো !! আমি এক ধাক্কা দিয়ে ওকে কিছুটা দূরে সরিয়ে দিলাম। ঠোঁট কুচকে থাপ্পর মারার জন্য হাত উঠালে মুগ্ধ খপ করে আমার হাত ধরে নিজের দিকে টান মারে। কাটাহাত দিয়ে আমার ঘাড়ের উপর আগলে ধরে মুখের উপর চুলগুলো আঙ্গুল দিয়ে সরিয়ে মুগ্ধ বলে উঠে,

— থাপ্পর মারবে না পাকনি। উহু!!এই ভুল করবেনা!! আদর করবো কিন্তু…আদর!! তুমি থাপ্পর মারলেই চটান করে চুমু বসিয়ে দিবো!! এন্ড বাকিটা ইতিহাস..

আমি ছাড় পাওয়ার জন্য ছুটাছুটি করছি। মুগ্ধ সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে আমাকে ধরে রেখেছে ওর সাথে। আমি ছুটার চেষ্টা করলে মুগ্ধ আরো দ্বিগুণ শক্ত করে চেপে ধরে। নিজের সাথে মিশিয়ে ধরে। আমাদের মধ্যে ছোটোখাটো দস্তাদস্তি শুরু হতেই কেউ দরজার কাছে ভ্যাবাচেকা দৃষ্টিতে অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো,

— মুগ্ধ? ততুমি মমকে জড়িয়ে ধরেছো কেনো?

মুগ্ধ রিনির কন্ঠ পেয়ে তৎক্ষণাৎ আমাকে ছেড়ে দিলো। লজ্জায় মিশে যাচ্ছি আমি! মুগ্ধ রিনির দিকে ঝাঝালো সুরে বলে উঠলো,

— ইডিয়েট! ড্যামিশ! রুমে ঢুকার আগে নক করতে হয় মেনার্স জানিস না! গেট আউট ইডিয়েট! আই সেইড গেট লস্ট!

-চলবে

তুমিময় প্রেম
PART 20
FABIYAH MOMO

— ‘ইডিয়েট! গাধা কোথাকার! কথা কি কানে যাচ্ছে না! বেরিয়ে যাওবলছি! বেরিয়ে যাও!আই সেইড গো! গেট আউট!

— তুতমি আমাককে ইইনসসাল্ট কররলে মুমুগ্ধ…

কথা আটকে আসছিলো রিমির। নিজের বাড়িতেই রিমি এতোটা অপমানিত হবে ভাবতেও পারেনি! নিমিষেই মুখের রঙ পাল্টে কাদোঁকাদোঁ চেহারা করে রুম থেকে দৌড়ে পালালো। এদিকে মুগ্ধ এমন অপ্রতিভ কান্ড
করবে আন্দাজের বাইরে ছিলো আমার! আমি বোকা বনে ঝিম খেয়ে দাড়িয়ে আছি। মুগ্ধ জোরে একটা নিশ্বাস ছেড়ে বিছানায় গিয়ে বসলো। ওর কাটা হাতটা চোখের সামনে এনে বলে উঠলো,

— এই নিরীহ প্রাণীটার উপর একটু দয়া করবে? ব্যথাটা প্রচুর যন্ত্রনা দিচ্ছে….পারলে এটাকে আমি খন্ডখন্ড করে কেটে ফেলতাম! কিন্তু পারছিনা….অসহ্য লাগছে…ব্যথাটা আমি নিতে পারছিনা…

মুগ্ধের ওমন আকুতি ভরা কন্ঠ শুনলে যে, কারো যে মন গলবে, এটা আমি নিশ্চিতরূপে বলতে বাধ্য। মাঝে মাঝে মানুষের আকুতির মধ্যেও খানিকটা সত্য মেশানো থাকে! কিন্তু এখানে খানিকটা নয়, অনেকটাই সত্য জড়ানো! মুগ্ধের অসহনীয় ব্যথা হচ্ছে। কিন্তু সে মুখে না বলে চুপচাপ দাতঁ চিবিয়ে বসে আছে। আমি লম্বা দম নিয়ে ওর দিকে এগিয়ে গেলাম।এলোমেলো চুলগুলোকে দুহাতে শক্ত খোপা পেচিয়ে নিলাম। ফাস্ট এ্যাড বক্সটা রিনি দরজার ওখানে ফেলে দিয়ে গেছে। আমি ততক্ষণে বক্সটা নিয়ে দরজা ঠেলে মুগ্ধের কাছে ফ্লোরে আটোঁ হয়ে বসি। ঝটপট ড্রেসি করবো তা না! উল্টো হাতের রুমাল খুলে স্যাভনল দিতেই গলগল করে রক্ত বেরুতে লাগলো। তুলো দিয়ে মুছেও আমি রক্তপাত বন্ধ করতে সক্ষম হচ্ছিলাম না! আমার হাত পযর্ন্ত রক্তে মাখামাখি হয়ে যাচ্ছিলো! আমি বুঝতে পারছিলাম না রক্ত কীভাবে বন্ধ করবো! মুগ্ধের দিকে একবার তাকালাম। ও কেমন শান্ত দৃষ্টিতে পূবের আকাশ দেখছে!! যেনো একবিন্দু জ্বালা হচ্ছে না!! একদম কিছু হয়নি!!ওর জায়গায় আমি থাকলে এতোক্ষনে চিৎকার করে বাড়ি মাতিয়ে ফেলতাম! বড় একটা ঢোক গিলে নিজেকে ঠান্ডা করলাম। আমার হাত থরথর করে কাপছিলো! বেগতিক হারে কাপছিলো! তুলোটা ওর কাটা ঘা-য়ে দিতে যেয়েও দিতে পারছি না। চোখ বন্ধ করে আল্লাহকে ডাকছি! এমন কঠিন পরিস্থিতিতে আমি আদৌ পড়িনি। তুলোর সম্পূর্ন প্যাকেটটা মুছতে মুছতে বহু চেষ্টার পর রক্তপাত বন্ধ করি। ব্যান্ডেজের শেষ গিটটা দিয়ে উঠতে যাবো হঠাৎ মুগ্ধ বলে উঠলো,

— তুমি প্লিজ আমার একটা কথা রাখবে?
— রাখতে পারলে রাখবো!
— আমার সাথে আমার বাসায় চলো। তুমি ওখানে থাকবে। আমি তোমাকে রিনির কাছে রেখে যেতে ভয় পাচ্ছি! আমার কারনে যদি ও তোমার ক্ষতি করে?
— তাহলে এখানে আনলেই কেনো তুমি! আমি বলেছিলাম আনতে? বলো? বারবার আমাকে নিয়ে এতো ছয়নয় করছো কেনো?
— আ’ম সরি! প্লিজ, আমার সিচুয়েশনটা বুঝো! এমনেই আঙ্কেল আন্টির হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়াটা আমার কাছে কোনো এ্যাঙ্গেলে ভালো মনে হচ্ছে না। তার উপর রিনির এমন গোয়েন্দাগিরীর, রাগচটা স্বভাবটা….ড্যাম! আমারই ভুল হয়েছে তোমাকে এখানে আনা! রিনির নেচার সম্পর্কে আমি ভালো জানি! ও যে তলে তলে তল্লাশি করবে, ফ্যাক্টটা ভুলেই গিয়েছিলাম! নাহ্…চলো!

চট করে আমাকে উঠতে বলে টেবিলের উপর থেকে ফোন ও গাড়ির চাবিটা দ্রুত পকেটে ঢুকাতে লাগলো মুগ্ধ! আমি সোজা হয়ে দাড়াতেই মুগ্ধ তাড়াহুড়ো করে আমার হাতের কবজি ধরে সামনের দিকে পা ফেলতেই হুট থমকে দাড়ালো! আমার মুখপানে তাকিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতে ইতস্তত করছিলো মুগ্ধ! ‘জিজ্ঞেস করবে নাকি করবে না’ ঠিক এমন টাইপ জড়তা!

— কি হলো? কিছু বলবে? ওমন মিনমান করছো কেনো?
— মানে…বিষয়টা হলো…
— হ্যাঁ বিষয়টা কি? চুপ হলে কেনো? বলো?
— প্লিজ আমাকে ভুল বুঝবে না। একচুয়েলি, তোমার শাড়ি টারি ঠিক করতে হবে? যেহেতু আমি তোমাকে ফ্রেশ হতে অতো সময় দেইনি… মানেটা বুঝেছো তো??

আমি ফিক করে হেসে দিলাম!! সামান্য একটা প্রশ্ন করতেই ওর জান বেরিয়ে যাচ্ছিলো!! আল্লাহ্ এগুলো ভাবা যায়??মুগ্ধ আমার হাসি দেখে লজ্জায় কাচুমাচু করছিলো। আমি হাসি আটকে কোনোরকমে বলে উঠি,

— তোমার গ্যাংয়ের রিমি, জেনি শাড়ি পড়লে সেকেন্ডে সেকেন্ডে ‘উলালা উলালা’ গানে ডান্স দিয়ে ছেলেদের মনোরন্জন দিতে পারবে মুগ্ধ সাহেব! আমি ওমন না! বাঙালি মেয়েরা শাড়িতে ‘স’ থেকে ‘সবকিছু’ করতে পারে! বুঝলেন??

মুগ্ধ জড়তা কাটিয়ে আমার দিকে একচিলতে গর্বসূচক হাসি দিয়ে যাত্রা ধরলো বাসার উদ্দেশ্যে! রিমি নাকি রুমের দরজা বন্ধ করে হু হু করে কাদঁছে। ওর আব্বু আম্মু চিকিৎসার জন্য বাইরে বিধায় আমাদের অযথা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়নি। ওদের একটা সার্ভেন্টকে জানিয়ে আমরা চলে এসেছি রিমির বাসা থেকে।

.
.

রাতের আধারে সুনশান সড়কে গাড়ির চলাচল খুব কম! মাঝেমাঝে দু-একটা গাড়ি শান বাজিয়ে ছুটে যাচ্ছে গন্তব্যস্থলে। মুগ্ধ একহাতে গাড়ি চালাচ্ছে, অন্যহাতটা আপাতত রেস্টে আছে। গাড়িতে লাইট জালানো হয়নি। সেটা বর্তমানে বন্ধ রাখা হয়েছে। আমি সিটে গা হেলিয়ে বাইরের আধার দেখছি। হঠাৎ চলন্ত গাড়িতে বিকট রিংটোনে মুগ্ধের ফোনটা বাজতে লাগলো। স্বাভাবিক ভাবে, মুগ্ধ ফোনটা হাতে নিলো। কিন্তু স্ক্রিনে লক্ষ্য করতেই যেনো মুখের অবস্থা পাল্টে গেলো! একবার আমার দিকে, আরেকবার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে একটা ঢোক গিললো! সামান্য একটা কল নিয়ে মুগ্ধের আচমকা পরিবর্তনটা আমার কাছে খটকা লাগছিলো! খচখচ করছিলো মনে, কে দিলো কলটা ফোনে! মুগ্ধ আমার দিকে একটা জোরপূর্বক হাসি দিয়ে কলটা রিসিভ করলো! গাড়িটা পার্ক না করে কানে ফোন লাগালো মুগ্ধ,

‘হ্যালো…’
প্রথম শব্দটা বলার পর মুগ্ধ আমার দিকে অনাকাঙ্ক্ষিত চাহনি ছুড়লো। ড্রেসিং করা হাত দিয়ে পাশের জানালাটা নামিয়ে সেদিক মুখ করে কথা বলতে লাগলো। মেইন কথা, মুগ্ধ চাচ্ছিলো না ওর কথোপকথন আমি কোনোভাবে শুনি! একটু আধটু শোনা যাচ্ছিলো। যা ছিলো এমন…

‘হোয়াট! তুমি আমাকে এই নিউজ দেওয়ার জন্য কল করেছো? হোয়াট সরি? আমি তোমার সরি শোনার জন্য বসে আছি! আই উইল ফায়ার ইউ নিজাম! রিজাইনেশন লেটার নিতে প্রস্তুত থাকো!’

কথা দ্বারা যতদূর বুঝলাম সম্ভবত স্টাফের কোনো বড়ো ভুল নিয়ে মুগ্ধ এখন চেচামেচি করছে। চোখে প্রচুর ঘুম। তবুও চোখের পাতা বেশি ঠেলেঠুলে খোলা রাখার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করছি। আমি হাই তুলতেই দেখি, মুগ্ধ কল কেটে ফোনে ধুমাধুম টাইপিং করছে। টাইপ শেষ হতেই ফোনটা গাড়ির পিছন সিটে ছুড়লো! এবং রাগী গম্ভীর মুখ করে চাবি ঘুরিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিলো।

.
.

ঠিক একঘন্টা পর মুগ্ধের বাসায় পৌছলাম। ওদের দারোয়ানটা আমাকে মুগ্ধের সাথে গাড়ি থেকে নামতে দেখে চোখের গোলক ইয়া বড় বড় করে দেখছিলো! যখন আমরা লিফটে আবদ্ধ, মুগ্ধ তখন বলে উঠলো,
— আমার একটু ইর্ম্পট্যান্ট কাজ আছে পাকনি। তোমাকে ভেতরে পৌছে দিয়ে আমাকে জরুরী কাজে বাইরে যাওয়া লাগবে। তুমি থাকো? কোনো টেনশান করবে না। সার্ভেন্ট আছে, চাচা আছে, উনারা তোমার দেখাশোনা করবে। কেমন? আমি খুব জলদি কাজ সেরে আসবো! আই প্রমিস!

‘কি এমন মহা ইর্ম্পট্যান্ট কাজ তোমার যাওয়াই লাগবে!’ প্রশ্নটা করা হলো না, লিফটের দরজা খুলে গেলো! লিফট খুলতে দেরি মুগ্ধের অপেক্ষায় থাকা সার্ভেন্ট দল দৌড়ে সেবা দিতে দেরি করলো না! মুগ্ধ তাদের চোখের ইশারায় কি যেনো বুঝালো তারপর লিফটের বাটন টিপে চলে গেলো। সার্ভেন্টরা আমাকে নানা ভাবে নানা কাজ করার জন্য হুকুম চাইলো। এতোগুলো চোখ যখন আমার দিকে আমি হড়বড় করে বলে উঠি,

— আমি ঘুমাবো। বেডরুম চাই। ফ্রেশ হতে চাই।প্রচন্ড খুদা পেয়েছে। খাবো আমি!

উনাদের মধ্যে অলরেডি ক’জন নির্দেশ পাওয়ার মতো একেকদিকে ছুটে গেলো। বাকি কিছু সার্ভেন্টের মধ্যে একটু বয়স্ক মতোন এক বৃদ্ধ এসে আমাকে রুমে নিয়ে গেলেন। পথিমধ্যে অনেককিছুই আমাকে বললেন উনি। জানতে পারলাম, উনার নাম রফিকুল ইসলাম। মুগ্ধ এনাকেই ‘চাচা’ বলে ডাকেন। এ বাড়িতে প্রায় একুশ বছর ধরে ঢ় গিয়ে দেখি লক ঘুরছেনা! মূহুর্তেই শরীরে কাটা দিয়ে উঠলো! আমাকে…আমাকে কি ইচ্ছাকৃত ভাবে অপহরণ করা হলো? মুগ্ধের প্ল্যান কি তাহলে কিডন্যাপ করা ছিলো? শত জোরাজুরি করলেও কেউ লক খুললো না। আমার চিৎকার করা গলার আওয়াজ শুনেও না। কেউ দরজা খুললো না।

আমি দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে হাল ছাড়ার মতো বসে পড়েছি। চোখের সামনে দূরদূর পযর্ন্ত অন্ধকার। কিছুই ধরতে পারছিনা। সব ঘোলাশা। সব! চোখ বন্ধ করতেই চোখের দুকোণা থেকে দুফোটা অশ্রু গড়িয়ে হাতের উপর পড়লো। শব্দ করে কাদঁতে মন চাচ্ছিলো। আব্বু-আম্মু-ভাই এই তিনজন সদস্যের কোনো লাতাপাতা নেই! অনুষ্ঠানের উছিলায় হলরুমে কে উগ্র স্পর্শ করেছিলো জানা নেই! মুগ্ধ হেলাখেলা করে কেনো কিডন্যাপ করলো উত্তর নেই! এ কেমন বিপদে পড়লাম আল্লাহ্? এ কেমন সঙ্কট? চোখ থেকে থেমে থেমে পানি ঝরছিলো! কান্না পাচ্ছিলো ডুকরে! তবুও নিজেকে সামলে চোখ মুছে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরুতেই বিছানার উপর একটা শপিং ব্যাগ দেখি। আচঁলে মুখ মুছে ব্যাগ খুলে দেখি কিছু জামা রাখা এবং ওগুলো যে কেবল আমার জন্যই ছিলো সুস্পষ্ট প্রমাণ হলো জামাগুলো কালার। সবগুলো আমার পছন্দসই রঙের! একটা জামা তুলে ওয়াশরুমে গেলাম।শাড়ির গেটআপ পাল্টে বেরিয়ে দেখি, এখন টেবিলের উপর খাবার রাখা! খাবারটা খেলাম না। ওভাবেই রেখে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। কাথাটা মেলে শরীরে জড়াতেই ঘুম এসে হানা দিলো…

.

সূর্যের সোনালি মিষ্টি আলোয় ঘুমটা ভাঙলো আমার। আড়মোড়ে শরীর টানা দিয়ে উঠে বসতেই জানালার কাছে কারো উপস্থিতি দেখলাম। সে দুহাত ভাজ করে জানালার বামপাশে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে। সাদা পান্জাবীর জায়গায় এখন কালো পান্জাবী। সূর্যের আলোয় মাথার চুলগুলো চকচক করছে।যেনো সদ্য তেল মাখানো ঝলমল চুল!! বর্তমানে তার বাহ্যিক রূপ বর্ননা করার মতো নয়! শুধু চেয়ে চেয়ে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকতে হয়! বিছানা থেকে চুপিসারে নেমে মুগ্ধের ঠিক পেছন দাড়িয়ে বলে উঠি,

— আমায় কিডন্যাপ কেনো করেছো রাদিফ মুগ্ধ!
হাতের ভাজ খুলে ঘুরে দাড়াতেই মুগ্ধ আমাকে দেখলো। সে মুচকে হেসে জবাব দিলো,
— ভুল! কিডন্যাপ করিনি। যা করেছি, যে জন্যে করেছি। সময়মতো সব জানবে পাকনি।
— খবরদার! পাকনি ডাকবেনা! ডাকবেনা!
মুগ্ধ আলতো করে আমার নাকটা টেনে হেসে বলে উঠলো,
— ইশশ…তুমিও না!! একটু বেশি বেশি!! কেনো ডাকি জানো না?? তুমি হচ্ছো রাদিফের পাকনি! মুগ্ধের মম! রাদিফ মুগ্ধের পাকনি মম!
আমি রাগী চোখে নাক ফুলালে মুগ্ধ হাসা বন্ধ করে এবং স্বাভাবিক ভাবে বলে উঠে,
— যারা মূলত ত্যাড়া, শুদ্ধ বাংলা ভাষা বুঝেনা ও অন্যের উপদেশ না মেনে নিজেকে পন্ডিত মনে করে, তাকে মুগ্ধের ভাষায় ‘পাকনি’ বলে। তোমায় আমি পাকনি ডাকবো! এবং এই নামে ডাকার অধিকার স্রেফ আমার! ‘বাবু,সোনা,পাখি,ময়না,গিলা,কলিজা ব্লা ব্লা ব্লা… আমি এইসব নামে ভালোবাসা দেখিয়ে শো-অফ করতে চাইনা! নেভার এভার! আমার বিহেভিয়ারের সাথে ভালোবাসার শোঅফ…ধুর! ইমেজিন করতেও সমস্যা হয়! ছিহ্ঃ!

‘ চলবে ‘

ফাবিয়াহ্ মম

তুমিময় প্রেম
PART 21
FABIYAH MOMO

.
সকাল দশটা! আমাকে চরম বিক্ষিপ্ত বন্দীদশায় রেখে সে গেছে বাইরে! কোথায় গেছে, কখন আসবে কেউ তা জানে না! বাড়ির সার্ভেন্টগুলো খুব অদ্ভুত! তাদের আচরন মাঝেমাঝে এতোটাই উদ্ভট ধরনের হয়, সন্দেহের মায়াজালে নিজেই অভিভূত হয়ে যাই! একটু আগে এক সার্ভেন্ট এসে বললো,

— ম্যাম? কিছু লাগবে? চা, কফি সামথিং?আনবো?
— বিষ এনে দাও! জিংক ক্লোরাইড! হবে না ইদুর মারার ঔষুধ এই বাড়িতে? যাও আনো!

সার্ভেন্টটা ধমক খেয়ে চলে গেলো। কেউ কিডন্যাপ করে ভিক্টিমকে খাবার সাধে? তাও আবার চা নাকি কফি?? এ বাড়ির চার সীমানায় হিসেব ছাড়া প্রহরী। সবই যেনো আমার জন্য বন্দোবস্ত। মুগ্ধের বেডরুম বাদে সব কটা রুম সিসিক্যামেরা এবং মনিটরিং করার জন্য আছে সুব্যবস্থা। সকাল থেকে এক গ্লাস পানি ছাড়া কিছুই খাইনি, খাবোও না। রুম থেকে বেরিয়ে বাড়ির চারপাশটা তীক্ষ্ম চোখে দেখছিলাম। গভীরে পর্যবেক্ষণে এদিক ওদিক তাকাতেই আমার ভাবনার চাদঁরে কেউ সুতো কেটে বললো,

— মুগ্ধ বাবাকে ডাকবো?
আমি মাথা ঘুরিয়ে শব্দ উৎসের দিকে তাকালাম। ঠিক ষাটের এসপার ওসপার বয়সটা হবে বৃদ্ধার। পড়নে পরিস্কার শাড়ি, সোনালী পাড়। উত্তর না পেয়ে আবার বলল,
— মুগ্ধ বাবাকে ডেকে দেবো মা? ও কে খুজছো?
— নাহ্। কাউকে ডাকা লাগবেনা। ইচ্ছে হলে পুলিশ ডাকুন! আমি মামলা করবো।
বৃদ্ধা ফোকলা দাতেঁ হাসলেন। উপর চোয়ালের ডানপাশটায় দুটো দাতেঁর জায়গায় খালি।
— মুগ্ধ বাবার উপর রাগ? রাগ করো না মা। ছেলেটা ভদ্র। ও তোমার কোনো ক্ষতি করবেনা তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। আসো মা, আমার সাথে বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখো।
বৃদ্ধার কন্ঠে কিছু একটা ছিলো। উনার কথাটা অগ্রাহ্য করার অধিকার কেনো জানি পাচ্ছিলাম না। হয়তো বুড়ো মানুষ বলে এজন্য। আমার এমনেই বয়স্কদের প্রতি টান কাজ করে। দাদীর কথা মনে পড়ে। বয়সের ভারে বৃদ্ধার হাটঁতে কষ্ট হলেও আমাকে নিয়ে র্নিবিঘ্নে হাটাঁর মতো ভাব ধরেছেন। মুগ্ধের রুম আলোকিত হলেও পুরো বাড়িটা কেমন ঝিম ধরানো ঝাপসা অন্ধকার। সার্ভেন্টগুলোও আশ্চর্যজনক ভাবে সামান্যতম শব্দ না করে কাজ করছে। বৃদ্ধা আমার সাথেসাথে হাটঁছে। মনের শতশত প্রশ্নের আকিবুকি করতেই ওড়নায় লাগাতার হাত মুচড়ে যাচ্ছি। বৃদ্ধা আড়চোখে ব্যাপারটা লক্ষ করলেন এবং হালকা কেশে বললেন,
— মুগ্ধ বাবা কেনো বন্দি করে রেখেছে, এটাই জিজ্ঞেস করতে চাচ্ছো, তাইনা মা?
আমি হাত স্থির করে উনার দিকে অবাক দৃষ্টি ছুড়লাম। জানলেন কি করে আমার মনের কথা? আমি তো কিচ্ছু বলিনি মনের ব্যাপারে!
— আপনি জানলেন কি করে আমি আপনাকে স্পেসিফিক্যালি এটাই জিজ্ঞেস করবো?
বৃদ্ধা বিনা শব্দে হাসলেন। একটু থেমে বললেন,
— আমি সত্য লুকিয়ে রাখি না মা। তাই উত্তরটা দিবো। চলো ওদিকটায় বসি?
আঙ্গুল দিয়ে একটা রুমের দিকের দিকে নির্দেশ করলেন। আরে! রুমটা আমার চেনা চেনা লাগছে কেন্? আগেও কি এসেছি? বাইরে থেকে না চিনলেও ভেতরে ঢুকতেই মনে পড়েছে এটা ফাইজার রুম। মুগ্ধের ভাতিজি। কিন্তু ফাইজা কোথায়? ওর কি কিছু হলো? ওহ্ এখন তো ওর স্কুল। বৃদ্ধা ফোমের বিছানার উপর আরাম করে বসলেন। আমি চেয়ার টেনে মুখোমুখি হয়ে বসলাম। বৃদ্ধা কোলের দিকে চোখ রেখে ধীরেসুস্থে বললেন,

— আজ থেকে প্রায় আঠারো বছর আগে বাড়িটায় নিরবতা ছিলোনা। অন্য দশটা বাড়ির মতো প্রতিটা আনাচে কানাচে পরিবারের হাসিঠাট্টার শব্দ শোনা যেতো। পূবের সূর্য উঠার পৃর্বেই সবার চোখ খুলতো। উৎসব ছাড়াই সবার মধ্যে উৎসবমুখর আনন্দ বিরাজ করতো। কিন্তু বাড়িটা আর নেই…
একদীর্ঘ নিশ্বাস ফেললেন। চেষ্টা করলেন ভেতরে চাপাকষ্ট কিছু নিশ্বাসের সাথে ঝেড়ে ফেলতে। বৃদ্ধা পুনরায় বললেন,

— আমাদের মুগ্ধ এমন ছিলো না। খুব চন্ঞ্চল ও ডানপিটে ছিলো। কোনোদিন স্কুল থেকে নালিশ ছাড়া বাড়ি ফিরেনি। ওরা দুটো ভাই ছিলো সকলের আদরের টুকরা। রুগ্ধ একটু হিংসুটে হলেও ছোটভাইয়ের সাথে হিংসা করতো না। ও মুগ্ধকে সবচেয়ে বেশি আদর করতো। একদিন ওর মা প্রচুর ঝগড়া করে ওর বাবার সাথে। প্রচুর কথা কাটাকাটি হয়, কি কারনে হয় কেউ আন্দাজ করতে পারেনি। রাগে, ক্ষোভে, অপমানে মুগ্ধের বাবা বাসা থেকে বেরিয়ে যায়, আর ফেরেনি। ঠিক দু’দিন পর খবরে এলো, মুগ্ধের বাবা দেশ ছেড়ে চলে গেছে। ততোদিনে পরিবারের সবাই জানতে পারলো মুগ্ধের বাবার অন্য একটা মেয়ের সাথে অবৈধ সম্পর্ক ছিলো সেটা মুগ্ধের মা জানতে পেরে পুলিশে মামলা করার হুমকি দিয়েছিলো।

পুরো পরিবার আছড়ে পড়লো কান্নাকাটিতে। সবচেয়ে বেশি ভেঙ্গে পড়েছিলো মুগ্ধের মা। মুগ্ধ তখন মাত্র সাতবছরের বাচ্চা। কারোর কান্নার কারন বুঝতো না, শুধু নিষ্পাপ চোখ দিয়ে চেয়ে চেয়ে সবাইকে দেখতো। কখনো কখনো অন্যের কান্না দেখে নিজেই ফুপিয়ে কেদেঁ দিতো। পরিবারের বেজ্জতিতে, পাড়া প্রতিবেশীর কটুক্তিতে, আত্মীয় স্বজনের গালাগালে সব সম্পর্ক ধ্বংসস্তুপে বিলীন গেছে। সবাই একে একে বিদেশের মাটিতে পাড়ি জমালো। মুগ্ধ দাদার হাতে মানুষ হচ্ছিলো। জীবনের নিয়মে একদিন সেও মুগ্ধকে বিদায় জানালো। মুগ্ধ দাদার লাশের পাশে চিৎকার করে কেদেঁছিলো, ‘যেও না দাদাভাই, প্লিজ তুমি একা চলে যেও না। আমাকেও নিয়ে যাও!! আমার কেউ নেই আমাকেও সঙ্গে নিয়ে যাও…’

দাদা যাওয়ার পর থেকে সবাই ভিন্ন মুগ্ধকে দেখলো। বিনা কারনে রাগ নিয়ে চলতো, কারোর সাথে একটু কথাও বলতো না। রুগ্ধ পড়া শেষে দেশে ফিরলো। বিয়ে করলো, নতুন সংসার সাজালো। মুগ্ধকে নিজের কাছে এনে দেখাশুনা করতো। রুগ্ধের স্ত্রী ফারিয়া মুগ্ধকে নিজের ছেলের মতো মানুষ করতে লাগলো। শুধুমাত্র ভাই ভাবীর কথা ছাড়া একটা মানুষের কথা কানে ঢুকাতো না।

বৃদ্ধা কথার মাঝে ছাট বসিয়ে ক্ষীণ স্বরে বলে উঠি,

— বাড়িটা যে খালি… বাড়ির বাকি সদস্যরা কোথায়?
— বাড়িতে কেউ…

বৃদ্ধা কথাটা বলতে যেয়েও বললো না। অদ্ভুতভাবে এমন প্রসঙ্গ তুললো আমি পুরো বিষ্মিত হয়ে গেলাম! ‘উনার নাকি হাটু ব্যথা করছে, ঔষুধের সময় চলে যাচ্ছে’ হেনতেন বাহানা বানিয়ে কেটে পড়লো সামনে থেকে। আশ্চর্য তো! এই বাড়ির মানুষগুলো এতো উদ্ভট কেনো?

.
সার্ভেন্ট দুপুরের নাস্তা নিয়ে যথারীতি রুমে ঢুকতেই বিছানায় বসা মমকে দেখলো। মেয়েটা কিছু তো একটা ভাবছে! নাস্তা টেবিলের উপর রাখতে রাখতে সার্ভেন্টটা বলে উঠলো,

— ম্যাম খাবারটা খেয়ে নিন। নয়তো স্যার আমাদের খুব বকবে। প্লিজ..

মম চোখমুখ কঠিন করে সার্ভেন্টটার মাথা থেকে পা পযর্ন্ত একবার চোখ বুলালো। বিছানা থেকে উঠে সার্ভেন্টকে বললো,
— খাবারগুলো যেভাবে এনেছো ওভাবে নিয়ে যাও!
— ম্যাম খাবেন না?
— না!
— একটা কাজ আছে করবে?
সার্ভেন্ট চোখ উজ্জ্বল করে বললো,
— জ্বী জ্বী ম্যাম বলুন!!
— তোমার মোবাইলটা দাও! জরুরি একটা কল করবো!
— সরি ম্যাম পসিবল না। স্যারের স্ট্রিক্ট নির্দেশ আপনাকে ফোন কোনোভাবে দেওয়া যাবেনা!
মমর দ্বিগুণ রাগ উঠলো!দাউদাউ করে শরীর জ্বলছে! সে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে উঠলো,
— এক্ষুনি যদি ফোন না দাও পরদিন তুমি স্যার ডাকার জন্য সুস্থ থাকবেনা কচিবাবু !

মমর রাগী রূপ দেখে সাভেন্ট দুটো ঢোক গিললো। একদিকে স্যারের নির্দেশ, অন্যদিকে মমর ভয়ংকর চাহনী! সে উপায়ন্তর না পেয়ে হুড়হুড় করে খাবারের ট্রে নিয়ে চলে গেলো।

.
— এই মনির? ম্যাডামের খাবার ফেরত আনলি যে?
— ওই মেয়ে খেলে তো! যেই ঝংকার, যেই তেজ! মাগো! স্যার যে কেমনে এইটারে সোজা করবো ভাবতাছি!
— মুগ্ধ স্যার ভালো ভালোর অবস্থা টাইট করছে এই মেয়ে কি জিনিস? গতবার দেখলি না? মিনিস্টারের সামনেই এসিসটেন্টরে কেমনে সাবান পানি ছাড়া ধোয়া মারলো? এই মেয়েকে ধরে ঠাস করে একটা চটচনা দিলেই হাওয়া লুজ হইয়া যাইবো। যা এগ্লা বাদ দে, কাজ কর। কিরে প্লেটে কাটাচামচ দেসনাই?চামচ কই?
মনির কপালকুচকে দুলালের দিকে তাকালো। বিষ্মিত স্বরে বললো,
— ভাই? আমি তো কাটাচামচ মনেহয় দিছিলাম…

.

ঘড়িতে বারোটার ঘন্টা বাজছে। ঢং ঢং ঢং — শব্দটা এতো বিকট ও বিরক্তির ঠেকছে মমর ইচ্ছে করছে দেয়াল ঘড়িটা ছুড়ে ফ্লোরে ফেলতে। কোনোমতে নিজের রাগকে কন্ট্রোল করে, আরো একবার দরজার দিকে চোখ বুলালো। ‘মুগ্ধ কি আসবে না?’ এই নিয়ে টানা কতোবার যে প্রশ্নটা মুখের ভাঁজে আওড়ালো হিসাব নেই। কিন্তু আফসোস!! মুগ্ধ আসছেনা !প্রকান্ড বিছানায় ফাইজা তার রুমে ঘুমিয়ে আছে। মেয়েটা আজ মমকে পেয়ে কি যে মহাখুশি !! তা বলার বাইরে। মমর মাথায় এখন ফোন করার চিন্তা ঘুরছে! কিন্তু কি করে সম্ভব হবে তা নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবতেই এক সার্ভেন্টকে ডাক লাগালো মম। কোন্ প্রয়োজনে ডাক লাগালো বোঝা গেল না,

— হ্যালো? কেউ আছে?
— ম্যাম কিছু লাগবে আপনার?
— এইদিকে আসো তো!
সার্ভেন্ট কথামতো এগিয়ে গেলো। মম বললো,
— আরো কাছে আসো! কি হলো? কাছে আসতে বলছি না?
সার্ভেন্ট মমর ইঙ্গিতে অন্যকিছু ভেবে, কাছে যেতে লজ্জা পাচ্ছিলো। তবুও যেহেতু এটা আদেশ ! তাই শিরধার্যরূপে মান্য করে মমর অনেকটা কাছে গিয়ে দাড়ালো। দূরত্ব ক্রমশ ঘন হয়ে আসতেই মম ঠোট কুচকে ডানহাতে চুলের খোপা থেকে লুকানো কিছু বের করলো! সার্ভেন্ট ভয়ে দুহাত আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে শূন্যে উঠাতেই বিড়বিড় করে বললো,
— ম্যাম ম্যাম! কি করছেন! ওটা ফেলে দিন!! কাটাচামচ ফেলে দিন প্লিজ!!

কাটাচামচের অস্ত্র দেখে থতমত করছে সার্ভেন্ট!মমর একহাতে ছুড়ি ধরার স্টাইলে কাটাচামচ আকড়ে, অন্যহাত দুলালের দিকে বাড়িয়ে বললো,
— দে ফোন দে! হাতে ফোন দে বলছি নয়তো এটা দেখছিস না? তোর চোখে ঢুকিয়ে অন্ধ করে দিবো!
সার্ভেন্ট ভয়ে কাপাকাপি করছে! থরথর করে হাত কাপছে। সে বড় করে ঢোক গিললো। একটাহাত শূন্য থেকে নামিয়ে পকেটে ঢুকিয়ে ফোন বের করে কাপা হাতে এগিয়ে দিলো! মম খপ করে ফোনটা নিতেই আবার আগের মতো সারেন্ডার ভঙ্গিতে দুই হাত উচু করে রাখলো।

— উল্টো ঘুর! ঘুর বলছি! হ্যাঁ, ঘুর ঘুর! খবরদার এদিকে মুখ ঘুরাবি না!

মম কাটাচামচটা মুখে আকড়ে বিছানা থেকে কয়েকটা ওড়না নিয়ে দুলালের হাত, মুখ ও পা বাধলো! বেচারা মাটিতে লুটিয়ে ছটফট করছে! দাপাদাপি করছে! মুখ থেকে কাটাচামচ ফেলে মম দৌড়ে জানালার কাছে গিয়ে ডায়াল করলো! ‘দ্যা নাম্বার ইউ হেভ ডায়াল্ড, ইজ কারেন্টলি নট রিচেব্যাল!প্লিজ ট্রায় এগেইন লেটার!’ বেশ ক’বার ট্রায় করলেও একই কথা! প্লিজ আব্বু ফোন ধরো!! তোমরা কোথায়? প্লিজ ফোনটা ধরো!! কেউ ধরলো! মম এবার ইসরাতকে কল করলো! রিং বাজছে!! ইশশ…প্লিজ ইসরাত কলটা ধর!! কলটা ধর ইসু!! কয়েকটা রিং যেতেই ওপাশ থেকে ইসরাত ফোনটা ধরলো!

— হ্যালো? কে বলছেন?
— বেব্ আমি!
— এই আমিটা কে? কে বলছেন?
— বান্দি আমি বলতেছি!
— মম তুই? তুই কোথায়? তুই কার নাম্বার দিয়ে কল করছিস?
— সব বলবো ইসু!! তুই প্লিজ! প্লিজ আমায় উদ্ধা.. হ্যালো? হ্যালো? প্লিজ তুই তো জবাব দে! হ্যাল…

কানে ফোন লাগিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখি মুগ্ধ! ওর হাতে একটা ছোট্ট রিমোট! কিসের রিমোট জানি না। আমার চোখমুখ স্থির হয়ে হাত থেকে অজান্তেই ফোনটা ধপাস করে পড়ে গেলো। মুগ্ধ তার বাম ভ্রুটা উচুতে তুলে ঠোট শক্ত করলো! আমার খুব কাছে এসে শক্ত গলায় বলে উঠলো,

— এই মূহুর্তে তুমি যেই ভুলটা করেছো তার কি পরিণাম হবে ভেবেছো?

মুগ্ধ হুট করে আমার চুলের মধ্যে হাত ডুবিয়ে পাচঁ আঙ্গুলে শক্ত করে ধরলো! অসহ্য ব্যাথায় কুকড়ে উঠি! ও আরো জোরে ধরলো! একহাত আমার মাথায় ডুবিয়ে, অন্যহাত দিয়ে গাল চোয়াল চেপে ধরলো! ব্যথায় নাকমুখ লাল হয়ে যাচ্ছে আমার! শতচেষ্টা করেও মুগ্ধের কোনোহাত ছাড়াতে পারছিনা! ও যেনো ভয়ঙ্কর জন্তুর মতো আমাকে শিকার করে ধরেছে!

— তুমি আমার রাগের সীমা দেখোনি মম! যেটা তোমাকে দেখা চাইনা সেটাই দেখার জন্য তুমি বারবার আমাকে ফোর্স করো! তুমি মেবি ভুলে গেছো এই রাদিফ মুগ্ধ ভার্সিটির ফাস্ট দিনে তোমার সাথে কি করেছিলো!

গলা শুকিয়ে এলো আমার! আজকে অন্যান্য দিনের তুলনায় বহুগুণ রাগী দেখাচ্ছে! ও কি সত্যি সত্যি আমার ক্ষতি করে বসবে?

চোয়ালের যন্ত্রণা ও মাথায় চেপে ধরাতে মম চোখ বন্ধ করে নিলে মুগ্ধ ওকে ছেড়ে দেয়। শার্টের উপর থেকে কালো হুডিটা খুলে বিছানায় ছুড়ে ফেলে। শার্টের কাফ হাতাটার বোতাম দুটো খুলে কনুইয়ে ভাজ করতেই পকেট থেকে ফোন বের করে কল দেয়।

— হ্যালো? রামিম? ইমিডিয়েটলি ওর পরিবাকে তুলে নিয়ে আয়! যেভাবেই হোক কাজিকে ধরে আনবি! যদি আসতে দেরি হয়…বায় গড! নিজের মুখ আর আয়নায় দেখার সুযোগ পাবি না!

– চলবে

তুমিময় প্রেম
PART 22
FABIYAH MOMO

মাথা ফাটা, ঠোঁট কাটা, ঠোঁটের রক্ত চোয়াল পযর্ন্ত গড়িয়ে চুয়ে চুয়ে গাড়ির দরজায় পড়ছে। হাত একটা জানালা দিয়ে বের হয়ে গেছে। গাড়ির জানালা ভেঙ্গে কিছু কাচঁ গালে ঢুকে গেছে। কিছু কাচঁ জায়গা করেছে মাথার চুলের কিউটিক্যালে। মাথাটা জানালার সাথে ভয়ঙ্কর ভাবে ধাক্কা লেগেছে বিধায় শেষ নিশ্বাসের মূহুর্ত চলছে। সমস্ত শরীর কেমন নিস্তেজ লাগছে, যেনো দেহ থেকে রূহটা ধীরে ধীরে নিস্তার নিচ্ছে। চোখদুটো ঝাপসা হয়ে আছে। সেই ঝাপসা চোখে বহু কষ্টে নিজেকে আবিস্কার করেছে রাত আড়াইটার হাইওয়ে সড়কে! গাড়ির ফ্রন্টলাইট বারবার ‘অনঅফ’ হয়ে ভেলকি দেখাচ্ছে। ঠিক হরর মুভিতে যেমনটা রুমের লাইটগুলো অন-অফ হতে থাকে, ঠিক সেরকম। কাপা কাপা হাতে অসার শরীরে কোনোমতে পকেট থেকে ভুম ভুম শব্দ করা কম্প বস্তুটা বের করলো। বস্তুটার কম্পনের চেয়ে সহস্রাধিক গুণে হাতটা যেন কাপছে। রক্তেমাখা বুড়ো আঙ্গুলটা স্ক্রিনে হালকা টাচ করেও টাচ হচ্ছিলোনা রক্তের দাপটের কারনে। লাগাতার বুড়ো আঙ্গুলকে সেই কাজে লিপ্ত রাখতেই একটা রাগান্বিত গলার কন্ঠস্বর ভেসে আসলো,

— জাহান্নামের কোন্ রাস্তায় তুই টিকিট বিক্রি করতে গেছিস হারামজাদা! কল করছি কল ধরছিস না! কত্ত বড়ো সাহস! শালা কথা বলছিস না কেন্? মরে গেছিস!!
অস্ফুট স্বরে ঠোঁট নাড়িয়ে ঠেলেঠুলে বলে উঠলো,
— মরে যাচ্ছি… মরে যাচ্ছি..
গলার স্বর নিচু থেকে নিচু হচ্ছিলো বলে ফিসফিসানির আওয়াজটা ওপাশ থেকে কম শোনা গেল! বকাবকি করা ব্যক্তিটাও পরিস্কার বুঝতে পারলোনা। আগুনের হুল্কার মতো আরো দুদফা চেচিয়ে বললো,
— শালা হারামি! মদ রেখে বসে আছিস!থাবড়া দিয়ে দাতঁ ফেলে দিবো! তুই কথা বলবিনা, না? দেখিস এবার যদি সামনে পাই এমন শিক্ষা দেবো জীবনেও ভুলবিনা!

মৃত্যুযন্ত্রনা থেকে কঠিন কোনো যন্ত্রনা দুনিয়ায় হয়না। ‘সুইসাইড’ করতে চাওয়া মানুষ যদি ইচ্ছার আশা ফিরে পায় তারা আর সুইসাইডের চিন্তাও করেনা! আজ গাড়িতে এক্সিডেন্ট হওয়া রামিম চাচ্ছিলো মুগ্ধ ওকে বকুক! ইচ্ছেমতো বকুক! তবুও ওর মৃত্যুযন্ত্রনার মতো ভয়ঙ্কর যন্ত্রণাটা বিনা শব্দে বুঝুক! হঠাৎ ওপাশ থেকে চমকিত কন্ঠে মুগ্ধ বলে উঠলো,

— প্লিজ রিসপন্স মি, ড্যাম! রামিম প্লিজ কিছু বল? তোর কিছু… আমি এক্ষুনি আসছি! আমি এক্ষুনি আসছি! চোখ খোলা রাখ্ রামিম! পুশ ইউরসেল্ফ! আ’ম কামিং…

পান্জাবী পড়া বাদ দিয়ে আলমারি খুলে হাতের কাছের কাছে যা পেল তাই সে ঝটপট গতিতে গায়ে জড়িয়ে লিফটের ভেতরে ঢুকে গেল! কানের কাছে ফোন লাগিয়ে চিৎকার করে রামিমকে সজাগ রাখায় ব্যস্ত ছিলো মুগ্ধ! লিফটের দরজাটা আপনাআপনি বন্ধ হতে গিয়েও যেনো বন্ধ আর হলো না, কিছু একটার সাথে বাধা লেগে দরজাটা খুলে গেলো! মুগ্ধ ভ্রুকুচকে লক্ষ করতেই দেখলো লিফটের মধ্যবর্তী জায়গায় কারো পা বসানো! তাকে দেখে মুগ্ধের হাত লিফটের সুইচ থেকে ধীরগতিতে নামতে লাগলো। কঠিন চাহনি ছুড়ে একজোড়া নয়ন তার দিকে লক্ষ করতেই মুগ্ধ আটকা গলায় বলে উঠলো,

— রারামিম.. রারামিম.. রারামিমিম ওওর…

একজোড়া নয়নের অবয়বটা তার কাছে চলে আসলো! লিফটের দরজাটাও অফ হয়ে গেলো। লিফট নিচে যাচ্ছে। মুগ্ধের গলা ধরে আসছিলো। কিচ্ছু উচ্চারন করতে পারছিলো না সে মমর কাছে।

— কি মশাই? বিয়ের পিড়িতে বসার জন্য লাফালাফি করে এখন নিজেই পালাচ্ছেন রামিমের অজুহাতে? জোশ তো!

মুগ্ধ নিজেকে কোনোরকমে সামলে মানুষটার দুইগালে দুইহাত রেখে অস্থির কন্ঠে বলে উঠলো,
— আমি বিয়ে করবোই! আমি মিথ্যে বলছিনা! আমি বিয়ের আসর থেকে পালাচ্ছি না! আমি আসবো! বিশ্বাস করো আমি আসবো! রামিম…রামিমের সত্যি কিছু হয়েছে পাকনি। ফোনের ওওপাশে ও গোঙাচ্ছে..

লিফট খুলতেই মমকে উপেক্ষা করে পার্কিং লটে ছুটেগেলো মুগ্ধ! ড্রাইভারটা দারোয়ানের সাথে গল্প করছিলো। মুগ্ধকে হুলস্থুল অবস্থায় দেখে পিছে পিছে দৌড়ে এসে ড্রাইভার বললো,
— স্যার? আপনি কোথায় যাবেন বলুন। আমি ড্রাইভ করছি।
মুগ্ধ গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে সিটবেল্ট বাধতেই বললো,
— দরকার নেই। আপনি থাকুন!

আচমকা গাড়ির অপর দরজাটা খুলতেই মুগ্ধ হকচকিয়ে ওখানে তাকালো! মম গাড়িতে বসে সিটবেল্ট বাধতে লাগলো। মুগ্ধ ভ্রুকুচকে স্থির হয়ে ওকে দেখতেই মম মুগ্ধকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,

— আমাকে দেখা বাদ দিয়ে রামিমের জিপিএস ট্র‍্যাক করো মুগ্ধ! কোথায় আছে চেক করো! কুইক!

মুগ্ধ সর্বোচ্চ স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছে। পাশ থেকে রাস্তার খবরটা কানে পৌঁছাচ্ছে মম। মুগ্ধ ওকে বললো-
— আর কতদূর?
— সিগন্যাল আশপাশেই দেখাচ্ছে!! রামিম এখানেই কোথাও আছে! তুমি আরেকটু সামনে যাও!

মম ফোনের দিকে মগ্ন থাকতেই হঠাৎ ব্রেক কষলো মুগ্ধ! ক্রুদ্ধভাবে মুগ্ধের দিকে দৃষ্টি ছুড়তেই স্ট্যাচুর মতো আবিষ্কার করলো মুগ্ধকে। মম অবাক দৃষ্টিতে মুগ্ধের অবস্থা বুঝার জন্য সামনে তাকাতেই বুকটা ধ্বক করে উঠলো তার! মম চোয়াল ঝুলিয়ে মুখে হাত দিয়ে স্থিরদৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে আছে। মুগ্ধের ঠোঁটজোড়া ওই দৃশ্য দেখে অনবরত কাপঁছে। সামনের দিকে দৃষ্টিস্থির করে স্টিয়ারিংয়ে বসানো হাতদুটো দ্বারা সিল্টবেল্ট খুললো মুগ্ধ। আস্তেধীরে গাড়ির দরজা খুলে বাইরে পা ফেলতেই মম আড়ালে চোখ মুছলো।

গাড়ির বামপাশটা থেবড়ে গেছে! ডানপাশটা অক্ষত হিসেবে একাংশ জীবিত আছে! কোনো মানুষ ভয়াবহ এই এক্সিডেন্টে বাচঁবে বলে তার কোনো আশঙ্কা নেই! মোটকথা কেউ বেচে থাকলেও বেশিক্ষন বাচঁবে বলে মনে হয়না! মুগ্ধ রোবটের মতো একপা একপা ফেলে গাড়ির ডানপাশটা দেখতে যাচ্ছিলো যেখানটার এখনো কিছু অংশ অক্ষতাবস্থায় ছিলো! মুগ্ধ গাড়ির ঠিক সামনে দাড়াতেই হুট করে বজ্রাঘাতের মতো কয়েকপা পিছিয়ে গেলো! মম সচকিত চোখে মুগ্ধকে ধরে বলে উঠলো,

— পপিছালে ককেনো?

মুগ্ধ বড় ঢোক গিলে কপালের ঘাম মুছে মমর দিকে তাকালো। চোখদুটো বুজে আধো আধো গলায় বললো,
— রারামিম নেনেই…
— মানে! রামিম নেই মানে? রামিম কই গেলো?
মম গাড়ির ড্রাইভিং সিটে ঝুকে দেখলো আসলোই কেউ নেই, সিট খালি। হঠাৎ একটা মানুষ কিভাবে উধাও হলো? মম গাড়ির দরজা ও জানালার অবশিষ্ট কাচেঁর উপর রক্তের অবস্থান পেলো! মম দুইআঙ্গুলে রক্ত নিয়ে ঘষে দেখলো, নাকে শুকে বুঝতে পারলো — এগুলো রক্তই! মম আশেপাশে চোখ বুলিয়ে সিচুয়েশনটা দেখলো এবং পরক্ষনে ‘মুগ্ধ!! মুগ্ধ!!’ বলে চিৎকার চেচামেচি করতে লাগলো! মুগ্ধ বন্ধ চোখজোড়া খুলে জিহ্বা দিয়ে ঠোঁটটা ভিজিয়ে মমর কাছে দ্রুত গেলো! মম সম্পূর্ণ একটা ব্যাখ্যা সাজিয়ে মুগ্ধের কাছে পেশ করলো,

— “মুগ্ধ লুক! এটা দুইরাস্তার মোড়! রামিমের গাড়িটা হাইওয়ের এমন ট্র‍্যাকে এক্সিডেন্ট হয়েছে যেটা দুই রাস্তার মোড় পার করে বেশ খানিকটা দূরে! গাড়িটা নিখুঁতভাবে দেখো মুগ্ধ! গাড়ির দরজায় লাল রক্ত! আ’ম ভেরি সিউর এবাউট ইট, এটা রামিমের রক্ত! ওর বাজেভাবে এক্সিডেন্ট হয়েছে মুগ্ধ ! ওকে ডেফিনেটলি কোনো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে! বিকজ ওর রক্ত ছাড়া গাড়িতে কিছুই নেই!”

.

মুগ্ধ হাইস্পিডে স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে! বাতাসের ‘শো শো’ শব্দ এখন ‘হো হো’ ব্যগ্রধ্বনিতে শোনা যাচ্ছে! তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে গাড়ির গতি! আধাঘন্টার রাস্তা সেখানে কভার করলো এগারো মিনিটের মধ্যে! হাসপাতালের সামনে থামিয়ে রিসেপশন থেকে খবর নিয়ে দুজন চললো রামিমের কাছে! ‘অপারেশন থিয়েটার’ — শব্দটা চোখে পড়লো সবার আগে! মুগ্ধ শব্দটার কাছে গিয়ে দাড়ালো না! মূলত সেই সাহস বুকে জুটলো না! মুগ্ধ যাকে ডানহাত-বাহাত সবকিছু ভাবতো, আজই তারই এমন লোমহর্ষক হৃদয়নিংড়ানো অবস্থা দেখতে হলো! মুগ্ধ হাতে থাকা ফোনটা নিয়ে থমথম গলায় কাউকে কল করলো! বিপরীত দিক থেকে কলটা রিসিভ হতে বেশি দেরি হলো না! চট করা ধরে ফেললো,

— জেনি…
— মুগ্ধ? তোমার কি হয়েছে? তোমাকে এমন শোনাচ্ছে কেনো?
— জেনি.. রারামিম..
— হ্যাঁ, রামিম এরপর? মুগ্ধ কিছু বলো? রামিম গাধাটা কি করেছে আবার?
— জেনি রামিম হসপিটালে…

ওপাশ থেকে চিৎকার দেওয়া কন্ঠস্বর পাওয়া গেলো! জেনি খুব সম্ভবত চিৎকার দিয়ে দাড়িয়ে পড়েছে! দুজনের কলের মধ্যে এমন নিবরতা চললো, মুগ্ধ ফোন কেটে দিলো। মম পাশ থেকে সব অবলোকন করছিলো। এই প্রথম মুগ্ধকে চুড়মার অবস্থায় দেখতে পেলো!! ইচ্ছে করছিলো মুগ্ধকে শান্ত করার, কিন্তু কিছুতেই করবেনা মম নিজের পরাজয় স্বীকার!
ফোন কলটা করার বোধহয় মিনিট বিশেক পেরুলো, ওমনেই হৈচৈ করে জেনি, রিমি, আহাদ, নাসিফ ও তন্ময় চলে এলো। মুগ্ধ ওদের দেখে সিট ছেড়ে গিয়ে দৌড়ে কাছে গেলো! তন্ময়, আহাদ, নাসিফ, মুগ্ধ – চারজনই গলা জড়িয়ে রামিমের জন্য কাদঁছে! সবচেয়ে বেশি কাদঁছে জেনি ও রিমি!বাচ্চাগুলোর খেলনা নিলে ঠোট উল্টে যেভাবে কাঁদে, জেনি সেই বাচ্চার ন্যায় ডুকরে ডুকরে কাদঁছে। রিমি জেনিকে আগলে ধরে নিশব্দে কাদঁছে। ছেলেরা বেশিরভাগ দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাড়িয়ে আছে। শুধু তন্ময় ও আহাদ রিমি, জেনির সাথে সিটে বসে আছে। আমি চুপচাপ জানালা দিয়ে আকাশে তাকিয়ে আছি। যদিও রামিম আমার কেউ না, তবুও মনুষ্যত্বের খাতিরে ওর জন্য বুকফাটা কষ্ট হচ্ছে। হুর হুর করে সময়ের পাল্লা আরো কেটে গেলো। এখনো কোনো খবর আসছেনা! এক নার্সকে ধরে জানা গেলো, রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক! রক্ত লাগবে, ‘ও-পজেটিভ’ এখন সেটাই জোগাড় করতে হবে তিনব্যাগ! মুগ্ধ নার্সের কথা শুনেই পরিচিত কিছু ব্লাডব্যাংক ও ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করলো! ব্লাডব্যাংকে একব্যাগ পাওয়া গেছে! আরো দুই ব্যাগ লাগবে। কিন্তু বিপত্তি ঘটলো ব্লাডব্যাংকটা এখান থেকে দুইঘন্টার দূরে! ওদের ছয়জনের মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট! হঠাৎ মুগ্ধ প্রশ্ন ছুড়ে বললো,
— জেনি? তোর ব্লাড গ্রুপ না ‘ও-পজেটিভ’?
— হ্যাঁ মুগ্ধ! বাট আমার খুব এর্লাজী! আই কান্ট ডোনেট, মাই ব্লাড টু রামিম!

আরো কিছুক্ষন ভাবলো! এর মধ্যে চোখ তুলে জেনি আহাদের দিকে তাকালো!
— আহাদ? এজ ফার আই রিমেম্বার! তোমার ব্লাড গ্রুপটাও ও-পজেটিভ! ব্লাডটা তুমি কেনো দিচ্ছো না?

আহাদের মুখ শুকিয়ে গেলো। শুকনো মুখে একটু রস এনে ইচ্ছাবিরোধী হাসিতে বললো,
— আর ইউ কিডিং, জেনি? লাস্ট মান্থ আমি ব্লাড ডোনেট করেছি, আর এখন আবার কাউকে ব্লাড দিবো? আমার এই শরীরটা কি জানে কুলাবে?
জেনি চেচিয়ে উঠলো,
— হোয়াট? তুমি কি বললে, আবার বলো তো! তুমি এই ”কাউকে” দ্বারা কাকে মিন করছো? এখানে রামিমকে তুমি কাউকে বলেছো, আহাদ? রামিমকে? আর লাস্ট মান্থে তুমি কোথাও ডোনেট করতে যাওনি! গিয়েছো, ফোর মান্থস বিভোর!
মুগ্ধ কপালকুচকে আহাদের দিকে এগুলো! তপ্ত শ্বাস ছেড়ে মুগ্ধ বলে উঠলো,
— তুই ব্লাড দিবি নাকি দিবিনা? পরিস্কার করে বল।
— দোস্ত? প্লিজ বুঝার চেষ্টা কর! আমার এমনেই গত ক’মাস ধরে রক্ত স্বল্পতা চলছে…
জেনি গর্জে উঠে কথা ছিনিয়ে বলে উঠে,
— তোমার কি পিরিয়ড চলে? হ্যাঁ? কিসব ভাওতাবাজি করছো আহাদ! লাইনে আসো সময় থাকতে!ব্লাড দাও।
মুগ্ধ বিরক্ত গলায় বলে উঠে,
— ইশশ জেনি চুপ করো! কি থেকে কি বানিয়ে ফেলছো?
— না না, ওর কি মাসে মাসে পিরিয়ড চলে নাকি জিজ্ঞেস করো! খামোখা আমাদের একটা বুঝাবে, আর আমরাও ওর তালে তালে নাচবো, এসব তো চলবে না! এখানে রামিমের জীবন নিয়ে প্রশ্ন উঠছে মুগ্ধ!

মুগ্ধ আহাদের দুই কাধে হাত রেখে বললো,
— আচ্ছা তোর মেইন সমস্যাটা কোথায় খুলে বল তো? তুই ব্লাড কেনো দিতে চাচ্ছিসনা, ভ্যালিড আন্সার দে!
— আআরে বললামতো ব্লাড শর্টেজ..

কথাটুকু শেষ হতেই ঠাস করে থাপ্পর বসালো মুগ্ধ! গালে হাত থিয়ে অপরাধী ভঙ্গিতে চোখ নিচু করে আছে আহাদ। পাশ থেকে জেনি বলে উঠলো,
— ওয়েল ডান মুগ্ধ! কাজটা আগেই করা উচিত ছিলো!

— হুঁশ ফিরছে তো? যা! ব্লাড দেওয়ার মতো মহান কাজটাও করে ফেল এখন!

মুগ্ধ আহাদের ঘাড়টা ধরে তন্ময়, নাসিফ ও রিমির সাথে ব্লাড দিতে পাঠালো। জেনি ও মুগ্ধ চুপচাপ বসে আছে। জেনির অক্ষিকোটরটা মমর দিকে ঘুরতেই মুগ্ধকে জিজ্ঞেস করে বসলো,
— মুগ্ধ? এই মেয়ে এখানে কেনো?
মুগ্ধ একপলক মমর দিকে তাকিয়ে জেনির দিকে মুখ ফিরালো। জেনি মুগ্ধের দিকে উত্তর পাবার আশায় উশখুশ করছে,
— বিয়ে করবো। হবু বউ।
জেনি সপ্ত আকাশ বাদ দিয়ে অষ্টাকাশে আশ্চর্যের সীমা ছুড়ে মেরেছে। মুগ্ধ এতো বড় কথা শান্ত গলায় বললো কীভাবে?

— এই মেয়েকে বিয়ে করবা? পাগল হইছো?এই থার্ড ক্লাসকে বিয়ে করে বউ বানাতে চাও! মাই গড!
— উফ জেনি, বাড়াবাড়ি করবিনা কিন্তু! চুপচাপ বস এমনেই রামিমের সিচুয়েশন আহামরি ভালো না।

অপারেশন থিয়েটার থেকে ডাক্তার বেরিয়ে এলো। মুখের মাস্কটা খুলে নার্সের সাথে কথা বলতেই মুগ্ধ, জেনি দুজন এগিয়ে গেলো।
— রামিম কেমন আছে ডক্টর!! ইজ হি ফাইন? আউট অফ ডেন্জার??
ডাক্তার হালকা কেশে গলা ঝেড়ে বলে উঠলো,
— ডেন্জার সিচুয়েশন ওভারকাম হয়েছে। বডির অনেক জায়গায় স্টিচ লেগেছে। বাট পেশেন্টের জ্ঞান ফিরার উপর ডিপেন্ড করছে। আপনারা ওনার কি হন?
— রামিম আমাদের বন্ধু ডক্টর!
— ওকে। তো একটা ইর্ম্পট্যান্ট কথা আপনাদের বলা দরকার।
— কি কথা ? গুরুতর কিছু?
— না। আগে এক্সিডেন্ট রিলেটেড কিছু তথ্য আমায় বলতে হবে। কিছু জিনিস কনর্ফাম হওয়া জরুরী।

মুগ্ধ ও জেনি ডাক্তারের কথা শুনে একে অপরের মুখ চাওয়া চাইয়ি করলো। ডাক্তার আবার বলে উঠলো,
— দেখুন ভয়ের কারন নেই। আপনারা প্লিজ বলুন, এক্সিডেন্টটা কোথায় ও কিভাবে হয়েছে।
মুগ্ধ ও জেনি এখনো চুপ! ডাক্তার তার কাঙ্ক্ষিত উত্তর পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করছে। মম সবটা আন্দাজ করে ডাক্তারের কাছে এসে বললো,
— ঘটনাটা আমি বলছি। মুগ্ধের ফোনে রামিমের কল আসে। রামিম গোঙানি ছাড়া ক্লিয়ার কোনো কথা বলতে পারছিলো না। মুগ্ধের সন্দেহ হয় এবং রামিমের জিপিএস ট্র‍্যাক করে স্পটে পৌছাই। সেখানে গিয়ে দেখি গাড়ির ফ্রন্টলাইট ও ড্রাইভিং পার্টটা বাদে অলরেডি গাড়ির সেভেনটি পার্সেন্ট চ্যাপ্টা হয়ে গেছে। গাড়ির বামপাশটা থেবড়ে ছিলো। রামিম সেখানে ছিলো না। ওকে ওখানকার লোকজন তুলে হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। এই হচ্ছে ঘটনা ডাক্তার…
ডাক্তারের মুখে চিন্তার রেশ ফুটে উঠলো। দুমিনিটের মতো চশমার আড়ালে চোখদুটোকে স্থির রেখে ভাবলো। তারপর গম্ভীরভাবে বললো,
— পেশেন্টের ইনজুরি দেখে মনে হচ্ছেনা এটা কোনো নরমাল এক্সিডেন্ট! আপনি বললেন গাড়ির বামপাশটা বেশি থেবড়ে ছিলো। আই থিংক এটা কোনো রোড এক্সিডেন্ট না!
সবার ভ্রুযুগল একসাথে কুন্ঞ্চিত হলো! বিষ্ময়সূচকে বলে উঠলো,
— মানে!
— মানেটা খুব সিম্প্যাল! পেশেন্টকে মার্ডার করার চেষ্টা করা হয়েছে। কোনো গাড়ি এভাবে এক্সিডেন্ট হলে সেখানে ট্রাক বা বাসের যাত্রীরাও আহত থাকতো, কিন্তু আপনারা এসেছেন কেবল একজন পেশেন্ট নিয়ে। তাও গাড়িটার! ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন তো?

ডাক্তার প্রস্থান করলেন। জেনি বিড়বিড় করে কিছু বলছিলো যা কানে পৌছানোর মতো না। মম সিটে বসতেই পাশের সিটে মুগ্ধ ধপ করে বসলো। মুগ্ধ শান্ত গলায় বলতে লাগলো,
— রামিমের এক্সিডেন্ট হয়নি। ফ্লোলেস মার্ডার হয়েছে! ফ্লোলেস মার্ডার! কে করবে এটা? কার এতো সাহস?
মম বলে উঠলো,
— আমার মনেহয় তোমার কাছের লোক। আচ্ছা আমি তাহলে উঠি। এখানে আমার দমবন্ধ হয়ে আসছে। আমি হাসপাতাল একদম পছন্দ করিনা। আসি।
— আজব! কোথায় যাবা তুমি? আমার সাথে এসেছো আমার সাথেই যাবা! বসে থাকো এখানে! সকাল হলেই বিয়েটা করবো!
— আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাইনা মুগ্ধ। প্লিজ বাচ্চামো না করে ব্যাপারটা বুঝো। আমাকে যেতে দাও। আর যদি হেল্প করতেই পারো তাহলে আমার পরিবারকে ছেড়ে দাও।

মুগ্ধ মমর হাতটা ধরলো! যাকে বলে ‘বজ্র আটুনি’! হাতের ‘রেডিও’ ও ‘আলনা’ যেনো মটমট করে ভেঙ্গে যাবে এখনই! মুগ্ধ শান্ত থেকে ক্ষান্ত গলায় কনভার্ট করে বলে উঠলো,

-চলবে

-ফাবিয়াহ্ মম

তুমিময় প্রেম
PART 23
FABIYAH MOMO

.
আকাশে আজ সূর্য নেই! অদ্ভুত বিষন্নতার প্রভাব ছেয়ে আছে চারপাশে! গুমোট আবহাওয়ার পূর্বাভাস! যেনো কিছু খারাপ ঘটতে চলেছে! মুগ্ধ এনে কাজির সামনে বসিয়েছে আমায়! আমার হাত এমন কঠিনভাবে ধরেছে একসেকেন্ডের জন্যও সেই হাত ছাড়েনি! কাজি দোয়া পড়তে শুরু করেছেন! আমি হাত ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে গেলেও মুগ্ধ নামক তুখোড় শক্তির কাছে হেরেই যাচ্ছি!! ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে আমি হাল ছেড়ে দিয়ে শান্ত হয়ে বসলে মুগ্ধ কানের কাছে মুখ এগিয়ে বলে উটে,

— শক্তি খরচ করে কি লাভ হলো? গাধা একটা! বাসররাতে এখন আড্ডা কিভাবে দিবো?
আমি ভ্রুকুচকে অবাকচোখে তাকাতেই মুগ্ধ চোখ টিপ মেরে ঘায়েল করা এক মুচকি হাসি দিলো! জেনি হলে বলতো, মুগ্ধ প্লিজ এভাবে লুক দিবেনা। আমি অসুস্থ হয়ে পড়বো! ‘বাসররাতের আড্ডার’ সাথে আমার ব্যর্থ ধস্তাধস্তির মর্ম কি বুঝালো? শক্তির খরচ আবার মিনে বুঝালো? উল্টাপাল্টা কিছু? জানি না!

কাজি চোখের চশমা খুলে টেবিলের উপর রাখলো। হালকা কেশে বলে উঠলো,
— গার্ডিয়ান কই? গার্ডিয়ান ছাড়া বিয়া করাই না। আগে বাপ মা আনেন।

মুগ্ধ ভয়ংকর দৃষ্টিতে কাজির দিকে তাকালো! পারলে এখনই আছাড় মেরে মুখ থেতলে দিবে ও! মুগ্ধ জোর গলায় বললো,
— যাদের গার্ডিয়ান নেই তারা কি বিয়ে করেনা? নতুন কাহিনি করছেন? শুরু করুন! মনে করবেন গার্ডিয়ান নেই!ব্যস!
— গার্ডিয়ান ছাড়া বিয়া করনের নিয়ম নাই। আমি বিয়া পড়াইতে পারমু না।
মুগ্ধ ধামম.. করে টেবিলের উপর একটা ঘুষি মারলো! কাজি ভয়ে চমকে উঠলো। বেচারা ঢোকের পর ঢোক গিলছে। মুগ্ধ রাগে জর্জরিত হয়ে তর্জনী তুলে কঠিন কিছু বলবে তার আগেই কাজি ভয়ে তটস্থ হয়ে হাসি ঠেলে বললো,
— পড়াইতাছি পড়াইতাছি…আমি তো মজাক করতাছিলাম। মজা পাইছেন না কন? মজা না?

মুগ্ধ হাসলো না। কাজি চটপট হাতে আমাদের সামনে স্ট্যাপলার করা তিনটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে ‘সাইন’ করতে বললেন। মুগ্ধ নির্বিকার ভঙ্গিতে কলম ঘুরিয়ে ফটাফট সাইন করে আমার হাতে কলম গুজিয়ে বললো, ‘সাইন প্লিজ!’। আমি কলম হাতে নাড়াচাড়া করতেই ওর দিকে একবার তাকালাম। মুগ্ধ চোখ দিয়ে কাগজের দিকে ইশারা করছে। অর্থ এই, ‘আমার দিকে না তাকিয়ে সাইন করো!’ চোখের সামনে পরপর স্মৃতিগুলো ভেসে আসছে আমার! এই স্মৃতিগুলোর সাথে আমার অদ্ভুত রকমের ঘনিষ্ঠতা জড়িয়ে আছে তা কেউ জানেনা। এক. আব্বু, আম্মু ও ভাই নামক অদৃশ্য জন্মসূত্রের আকৃষ্টতা! দুই. ছোট থেকে দেখা স্বপ্ন ও ক্যারিয়ারকে নিজহাতে খুন করা! তিন. মধ্যবিত্ত মেয়ে হিসেবে ইচ্ছাগুলো মাটিচাপা দেওয়া! কতো ইচ্ছা ছিলো নিজের কষ্টের টাকায় আব্বুকে একটা ফোন কিনে দিবো! আব্বুর মুখে সেই বুকভরা হাসিটা দেখবো! ‘আব্বু’ নামক মানুষটার কাছে প্রতিটা মেয়ে খুবই ঋণী। মেয়েরা কখনো জানবেও না বাবা নামক মানুষটার উপর কতো ভারী দায়িত্ব থাকে। ইচ্ছে ছিলো, পরিবারের ছোটখাটো অর্থ সমস্যায় আমি পাশে থাকবো! নিজের ইচ্ছাগুলোকে সঙ্গী করে বড় পর্যায়ে উঠবো! কিন্তু শেষে কি হলো? আত্মবিসর্জন দিয়ে ইচ্ছেপুরিকে সমুদ্রের অতল গভীরে তলিয়ে দিতে হলো! এই দিন দেখার জন্য হাড়ভাঙ্গা কষ্ট করেছিলাম? কি অদ্ভুত! মানুষের এতোখানি জীবনে সবাই চায় একটু আশা! অথচ সেই আশার ভঙ্গ হলে, পুরো জীবনটাই লাগে হতাশা! হায়রে এই অদ্ভুত দুনিয়া…

কলমটা নিয়ে চিন্তার দেয়ালে আকিঁবুকি করছিলাম। হঠাৎ পাশ থেকে মুগ্ধ বলে উঠলো,
— কি ভাবছো? সাইনটা করো!
আমি কাগজে কলম বসাতে গিয়েও বসালাম না। কলমটা রেখে মুগ্ধের উদ্দেশ্য বলে উঠলাম,
— জরুরি কথা বলতে চাই। সময় দিবে? প্লিজ? খুবই জরুরি!
মুগ্ধ কিছুক্ষণ চুপটি থেকে মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো। অর্থাৎ, সে কথা বলবে। আমি উঠে একটা রুমে ঢুকে চুপচাপ মুগ্ধের জন্য দাড়ালাম। মুগ্ধ ঢুকলো এবং দরজাটা হালকা ঠেলে আমার কাছে এসে বললো,
— কি কথা? প্লিজ এখন ‘বিয়ে করবেনা’ টাইপ কথা নিয়ে গলাবাজি করো না!
— আমি বিয়ে করবো!
— তাহলে চলো। সাইন করো।
— কিন্তু শর্ত আছে!
— হ্যাঁ আমি প্রস্তুত! প্লিজ চলো! সাইন করবে।
— শর্ত শুনে রাখা ভালো জনাব রাদিফ মুগ্ধ! ফিউচারে আপনার ঝামেলার হতে পারে।
— বলো কি শর্ত? আর কিসব ঝামেলার ইন্ডিকেট করছো?
— আমি আপনাকে বিয়ে করবো বাট! আপনার সাথে থাকবো না! আপনি আমাকে সমাজের সামনে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনোদিন স্ত্রী বলে পরিচয় দিবেন না! না আমি আপনার কেউ! না আপনি আমার কেউ! কথাটা লাইনে লাইনে মাথায় ঢুকাবেন! শুধুমাত্র এই বাড়ির চার দেয়ালের মধ্যে এই কথাটা লুকায়িত থাকবে! আপনার সব চাকর-বাকর ও রিলেটিভদের আমার এবং আমাদের বিয়ে সম্বন্ধে কিছু বলতে যাবেন না! কাগজের সই শেষে কাজিকে আশপাশের চারটা জেলা থেকে বিদায় দিবেন! আপনার গ্যাংয়ের সবকয়টাকে বলবেন, বিয়েটিয়ে হয়নি! এমনেই হুমকিধামকি ছিলো! রাজি?

আকাশ চরম অন্ধকার করে বিকট একটা বাজ পড়লো। শরীরের অঙ্গপ্রতঙ্গসহ শিরা-উপশিয়ায় রক্তের স্রোত অদম্যভাবে ছুটছে। মুগ্ধ নিজেকে সামাল দেওয়ার জন্যে পলকহীন চোখদুটোকে নিচে নামালো। নিচের ঠোঁটটা দাতেঁ কামড়ে অতি কষ্টে গলায় ঢোক গিললো। চোখদুটো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। ঘরের সমস্ত জিনিস উপড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে! ছুড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে! ভাঙচুর করতে ইচ্ছে করছে! মুগ্ধ চোখ উঠালো না। শান্ত সুরে বলে উঠলো,
— আমি রাজি। তুমি সাইন কর। আমি আসছি..

.
.

ঘড়ির কাটা ন’টার সময় শেষ করে দশটার ঘরে থেমেছে। আমি বাথরুমের দরজায় কান পেতে বসে আছি রুমে কেউ আসছে নাকি! ‘বাসররাতের আড্ডা’ — শব্দটা মৌমাছির মতো কানের চর্তুপাশে ভন ভন করছে! কি সর্বনাশ করবে কে জানে? আমি একটুও রিস্ক নিতে চাচ্ছিনা! কাজি যাওয়ার পরপরই বাথরুমে অবস্থান করছি! কেননা, রুমের দরজা খোলা মুগ্ধের জন্য ম্যাচ দিয়ে আগুন ধরানোর মতো সোজা! কাজেই বাথরুমে আর যাই করুক মরে গেলেও ঢুকতে পারবেনা! হঠাৎ কারোর পায়ের শব্দ শোনা গেলো! আমি চোখবন্ধ করে বলে দিতে পারি এটা মুগ্ধের শব্দ! দ্যাট মিন্স, রুমের দরজা খুলা শেষ! নিশ্চয়ই রুমের কোণায় কোণায় আমাকে খুজছে!! না পেলে? ইশশ..না পেলে এদিকেই আসবে! পরে যদি দরজা ভাঙ্গে? নো, কান্ট হেপেন্ড! হঠাৎ দরজায় ঠকঠক করে কড়া দিলো!

— তুমি কি পালানোর আর জায়গা পেলে না? এই বাথরুমে! ইয়াক! বের হও!
— আমি বের হবো না! নির্ঘাত আমার ঘাড় মটকে দিবেন! সিউর সিউর!!
— বোকার মতো কথা বলো না! ঘাড় কেনো মটকাবো? বের হও জলদি! বের…
মুগ্ধকে বলতে না দিয়ে মম বললো,
— বাড়িতে কি আর বাথরুম নেই! এক নাম্বার পেলে ওখানে যান! আমি দরজা খুলবো না!
— পাগল নাকি ..
মম আবার মুগ্ধকে কেটে বললো,
— পেট খারাপ? আমাশয় হয়েছে? বাথরুমে আসার জন্য এতো উতলা কেনো? হ্যাঁ!
— কেমন মেয়েরে বাবা! কথাই বলতে দিচ্ছে না!
— সরি.. সরি। বলুন।
— ফার্স্ট কথা বাথরুম থেকে বের হও। বাথরুমে কেউ লুকায়? তোমার মতো ম্যাচিউর মেয়ে এইসব বাচ্চার মতো বিহেভ!
— যা বলার বলুন! আমি বের হবো না!
— ওকে ফাইন! বের হওয়া লাগবেনা! আমিও দরজার কাছে বসে থাকবো!..ইটস ডান!

দরজার এপাশে মুগ্ধ ওপাশে মম। মাঝে শুধু একটুখানি দূরত্ব। মুগ্ধ দরজায় পিঠ লাগিয়ে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। দরজার বিপরীত পাশে মম হাটুতে মাথা লাগিয়ে ফ্লোরে বসে আছে। বেশ সময়কাল ধরে নিরবতা চলছে। কোনো সাড়াশব্দ নেই রুমে। মুগ্ধ সাদা শার্টটার উপরের দুটো বোতাম খুলে ফেললো। চুলগুলোতে আঙ্গুল চালিয়ে পিছনে ঠেলে দিলো। বন্ধ চোখে জোরে জোরে নিশ্বাস ছাড়ছে মুগ্ধ। খানিকটা সময় চুপটি থেকে অশান্ত কন্ঠে বলে উঠলো,

— আমার ভালো লাগছেনা। কিচ্ছু ভালো লাগছেনা। একটাবার দরজা খুলো?প্রচন্ড অস্বস্তি লাগছে! প্রচন্ড। বিশ্বাস করো দম বন্ধ হবার উপক্রম হচ্ছে। মম তুমি কি একটাবারো আমার দিকে তাকিয়ে দেখেছো? চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল গুলো চোখে পড়েনি? আমার মুখের বির্বণতা তোমার দৃষ্টি এড়ায়নি?গলার দৃঢ়তা কেমন নরম হয়ে যাচ্ছে?? আমার মধ্যে সবকিছু কেমন খারাপভাবে বিকৃত হয়ে যাচ্ছে জানার চেষ্টা করেছো? তুমি স্বার্থপর কেনো? কেনো তুমি বুঝতে পারছো না আমি মারা যাবো! প্লিজ দরজাটা খুলো। প্লিজ…পায়ে ধরতেও রাজি আছি। প্লিজ।

মুগ্ধের কথায় হাটু থেকে মাথা উঠালো মম। দরজার দিকে মুখ করে বসতেই মুগ্ধ একটু থেমে আবার বলে উঠলো,

— ওপাশ থেকে একটা জবাব দাও? তুমি আমার বিয়ে করা বউ!
— আমি আপনার কেউ না! আমি ওই দুইটুকরা কাগজকে বিশ্বাস করিনা!
— আমি বিশ্বাস করি! আমি এটাও বিশ্বাস করি একদিন না একদিন তুমিও স্বীকার করবে উই আর ম্যারিড!
— বেচেঁ থাকতে জীবনেও না! যেখানে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে হবে সেখানে আমি কখনোই বিশ্বাস স্থাপন করবো না।
— দোয়া করো যেনো তাড়াতাড়ি মরে যাই। মরে গেলে তোমার কষ্ট পেতে হবেনা। তুমিও রেহাই পাবে। আর সত্যও কখনো বাইরে আসবেনা।

শেষ কথাটা শুনে গা শিউরে উঠলো মমর! এই ফালতু কথাটা বললো কেন? ইচ্ছে করছে এক্ষুনি দরজা খুলে মুগ্ধের গালে দুটো চড় বসাতে! কলারটা টেনে ভয়াবহ গালি দিতে! মম এই কথাটা শুনলে প্রচুর ভয় পায়! মুগ্ধ কি এটা জানেনা? কিভাবে উচ্চারন করলো এই ভয়ংকর শব্দগুলো? মম হাসফাস করতে থাকলে একপর্যায়ে হাতের তালু দিয়ে দরজায় সজোরে ধাক্কা মারে। মুগ্ধ ওপাশ থেকে চমকে উঠে দরজার দিকে মুখ করে বলে
— তুমি ব্যথা পেলে নাকি? দেখি দরজা খুলো! অনেক হইছে এইবার দরজা খুলো!তোমাকে ভেতরে থাকতে দেওয়াটাই ভুল! আমি দরজা ভাঙ্গবো! না ভালোমেয়ের মতো বের হবা!

ভেতর থেকে কোনো জবাব আসলো না দেখে মুগ্ধ দরজা ভাঙতে উদ্যত হলে খট করে দরজাটা খুলে গেলো। দরজার সরু ফাক দিয়ে একজোড়া চোখ তাকে দেখছে। মুগ্ধ তা দেখে হাতভাজ করে বলে উঠলো,
— আপনার পদধূলি দিয়ে এই রুমকেও একটু ধন্য করুন ম্যাম। অত্যন্ত বিগলিত হয়ে আপ্রাণ রূপে খুশি হবো!

মুগ্ধ কুর্নিশ ভঙ্গিতে মাথা নুইয়ে স্বাগত জানাতেই মম তড়িঘড়ি করে বাথরুম থেকে বেরিয়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো। মাথা থেকে পা পযর্ন্ত কাথা দিয়ে ঢাকতেই দরজায় একটা টোকা পড়লো। মুগ্ধ মমর দিকে একপলক দেখে দরজা খুলতেই সার্ভেন্ট মোখলেস ভেতরে ঢুকে খাবারটা টেবিলে রাখলো। মুগ্ধ এখনো হাতভাজ করে আছে। দাতঁ কিড়মিড় করে কিছু একটা ভেবে মুচকি মুচকি হাসছে। মোখলেশ কাজ শেষে যাওয়ার জন্য পা ফেলতেই মুগ্ধ মোখলেসকে থামিয়ে বললো,

— মোখলেস? দাড়াও তো একটু!

মোখলেস সুলভ ভঙ্গিতে বললো,
— জ্বী স্যার বলেন।

মুগ্ধ আবারো মমর দিকে তাকিয়ে দেখলো। মম নড়চড় করছে! তার মানে মেয়েটা ঘুমায়নি! মুগ্ধের মন খুশিতে কুপোকাত! এদিকে কাথার নিচে কান সজাগ করে আছে মম। মুগ্ধ যদি সার্ভেন্টকে দিয়ে উল্টাপাল্টা কিছু আনাতে বলে এক্ষুনি একটা সাংঘাতিক কারবার ঘটিয়ে ফেলবে ! মনেমনে খিচ মেরে দুরুদ শরীফ জপছে মম! ‘প্লিজ আল্লাহ্ বাচাঁও!এই মুগ্ধ যেনো কিছু না করে!’

মুগ্ধ হালকা কেশে গলা পরিস্কার করলো! কাশির শব্দে মমর বুকে ধ্বক ধ্বকানি বাড়ায়ে দিচ্ছে। যদি উটকো কিছু আনতে বলে? যদি ও সত্যি সত্যি কিছু করতে আসে? মম কাথাটা আস্তে আস্তে মাথা থেকে সরিয়ে দুইহাত দিয়ে নাক পর্যন্ত ঢেকে চোখদুটো বের করলো। যদি ঝড়ের আভাস দেখে ওমনেই মম কাথাটা দিয়ে মুগ্ধকে রোল বানিয়ে পালিয়ে যাবে! মুগ্ধ আড়চোখে মমর ভর্য়াত চাহনি দেখলো। মনেমনে একটু হাসলো এবং দুলতে দুলতে মোখলেসকে বলে উঠলো,

— আচ্ছা মোখলেস? তোমাদের ইন্ডিয়াতে পুরোনো আমলে বাথরুমকে কি বলতো?আই মিন হিন্দিতে কি বলতো?

— “দেবীও কি হাগনকুঠি”

মুগ্ধ ফিক করে হেসে দেয়! মম ঝটকা মেরে থেকে কাথা পুরোটা সরিয়ে বিছানায় বসে পড়তেই দেখে হো হো করে অট্টহাসিতে রুম কাপিয়ে হাসছে মুগ্ধ! মোখলেশ বোকার মতো মাথা চুলকাতে চুলকাতে প্রস্থান! মুগ্ধ পেট ফাটানো হাসিতে হাসতে হাসতে বলে উঠলো,

— দেবীও কি হাগনকুঠি ছেড়ে কেনো বাইরে আসতে ইচ্ছে করে না

-চলবে

ফাবিয়াহ্ মম

তুমিময় প্রেম
PART 24
FABIYAH MOMO

ক্যাম্পাসে যাবো! রেডি হচ্ছি! মুগ্ধ গাড়িতে বসে নিচ থেকে হর্ণ বাজাচ্ছেন! আমি ফাইজাকে বিদায় জানিয়ে তাড়াহুড়ো পায়ে গাড়িতে যেয়ে উঠলাম! মুগ্ধ তার পাশের সিটের দরজাটা খুলে স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। কখন এসে তার পাশের সিটটায় বসবো! আমি মুগ্ধের ইচ্ছাটা জলে ডুবিয়ে পেছনের সিটে গিয়ে বসলাম! মুগ্ধ বিষ্মিত চোখে আমাকে দেখছে! আমি কোলের ব্যাগটা সিটে রেখে ওর উদ্দেশ্য বললাম,
– সামনে তাকাও! পিছনে কি?
মুগ্ধ অসহায় বাচ্চার মতো মুখটা ঘুরিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিলো! মনে আনন্দ লাগছে! কেন লাগছে? ব্যাপারটা বলি, শুনুন! যখন কেউ আপনাকে নিয়ে উচ্চমানের এক্সপেকটেশন রাখে সেটাকে ধুলিসাৎ করতে অন্যরকম শান্তি লাগে! এতে ওই ব্যক্তি কষ্ট পায় আর আপনি পান চরমভাবে শান্তি!

আমার আব্বু আম্মুকে নিয়ে মুগ্ধ যে ফুলপ্রুফ করেছে এখন সেটা আপনাদের বলি! মুগ্ধ আমার পরিবারের কাউকে অবশ্য কিডন্যাপ করেনি। উনারা আমার মামার বাসা মিরপুর-১১তে গিয়েছেন। মামীর ডেলিভারী ছিলো এবং একটা মামাতো বোন হয়েছে আমার। মামা মিরপুরে একা একটা ফ্ল্যাটে থাকেন বিধায় মামীর লেবার পেইনে মামা আব্বু আম্মুকে ওখানে আর্জেন্ট ডাকেন। আব্বু, আম্মু আমাকে একহাজারটা কল হয়তো করেছিলো বাট নবীন বরন অনুষ্ঠানে আমার সাথে যেই হলরুমের ঘটনাটি ঘটেছিলো ফোনটা ওখানেই ফেলে আসি। এরপর মুগ্ধের ট্র‍্যাপে ফাসি। শেষমেশ যখন আমি বাড়ি ফিরি তখন আব্বু আম্মু ও ছোট ভাই বাসায় ছিলো না। তারা হসপিটালে মামীর কাছে ছিলো। এখনো উনারা ওখানেই আছেন মামীর অবস্থা ভালো না। বেবি নাকি পজিশন বিগড়ে উল্টে আছে। গতকাল রাত সাড়ে তিনটা পযর্ন্ত রাদিফ মুগ্ধের কাছ থেকে সবটা দু’কানে শুনি এবং এটাও জানতে পারি আব্বু আম্মু আজ বিকেলের দিকে আমার খোঁজ নিতে নারায়ণগঞ্জ ফিরবেন। কেন আমি ফোন ধরছিনা, কোথায় গেলাম, গুম হলাম কিনা…সব চেক দিতে আব্বু আসবেন। গাড়ির জানালাটা একটু খুলে বাইরের বাতাসটা মুখে মাখছি। চোখ খুলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কারন মুগ্ধ প্রচুর স্পিড দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। এই বান্দা আজীবন তাড়াহুড়োতে থাকে! ‘ধৈর্য্য, সবর, অপেক্ষা’ এই তিনটি জিনিসের সাথে তার সংযোগ নেই। জানালার উপর ডানহাতটা মেলে দিয়ে তাতে থুতনি বসিয়ে ভাবছি। মুগ্ধ খুব চালাক পার্সোনালিটির। মাথায় এতো বুদ্ধি গিজগিজ করে আগে জানতাম না। ওকে সবাই কেনো এতো মান্য করে এখন বুঝলাম। তুড়ি বাজাতেই যেকোনো সমস্যার সমাধান করতে পারে এই চতুর বান্দা।

মুগ্ধ গাড়িটা রাস্তার মোড়ে থামালো। আমি হাত থেকে থুতনি উঠিয়ে স্বাভাবিক হয়ে বসতেই মনে কিছু প্রশ্নের দাগ কাটলো। প্রথম প্রশ্ন, ও গাড়িটা এখানে কেনো থামালো? দ্বিতীয়, আজ এতো চুপচাপ? সর্বশেষ, আবার কোনো নতুন প্ল্যান করছে? কিছুক্ষন গাড়িতে নিরবতা চললো! মুগ্ধ মাথাটা আমার দিকে না ঘুরিয়ে বাঁ কাধ বরাবর করলো।

— গাড়ি থেকে নামো!
ভ্রুকুচকে এলো আমার!
— গাড়ি থেকে নামবো মানে? রাস্তার মোড় কি তোমার কাছে ক্যাম্পাসের গেট লাগছে? এটা ক্যাম্পাস!!
— ক্যাম্পাসের গেট পযর্ন্ত হেঁটে যাও। আমি তোমাকে নিজের গাড়ি করে ক্যাম্পাসে যেতে পারবো না। ভালো হবে তুমি এখানেই নামো।
— আশ্চর্য কিসিমের লোক তো! তন্ময় আমাকে ওর গাড়িতে করে ক্যাম্পাসের ভেতর পযর্ন্ত নিয়ে গেছে! আর তুমি এখানে নাটক করছো?
— তন্ময় তো আর স্বামী না।

তন্ময় আমার স্বামী না মানে? কি বুঝালো? ও স্বামী দেখে আমাকে গাড়ি থেকে রাস্তার মোড়ে নামিয়ে দিবে?শান্তমুখে কথাটা বলে সিটবেল্ট খুলে বাইরে গেল মুগ্ধ। পিছনে এসে আমার সিটের কাছে দরজা খুলে বেরুতে আজ্ঞা করলো। আমি হতভম্বের মতো ওর দিকে তাকিয়ে আছি! ‘বের হও মম, কেউ দেখলে সিনক্রিয়েট হবে ‘ – কথাটা কানে পৌছাতেই মস্তিষ্ক বাইরে যাওয়ার জন্য আগে পা বাড়াতে সংকেত দিলো। আমি বের হতেই মুগ্ধ দরজা লাগিয়ে ওর ড্রাইভিং সিটে যেয়ে বসলো। সিটবেল্ট লাগাতেই আমার হকচকিত মুখের পানে কথার ঝুড়ি ফেলে বললো,

— চিন্তা করো না ক্যাম্পাসে তোমার হাসবেন্ড বলে পরিচয় দিবো না। আমার বাসা থেকে তোমার আমার যাত্রা এটুকুই থাকবে। সামনে আগানোর চেষ্টা করবো না। ক্লাস শেষে তুমি বাসায় যেতে পারো। ফাইজা ভাইয়ার কাছে যাবে। কিছুদিন ওখানেই থাকবে। ও আসলে পরে জানাবো। টেক কেয়ার।

গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চলে গেলো। এখনো গাড়িটার যাওয়ার দিকে দৃষ্টি স্থির করে আছি। ব্যাগটার বাদামী ফিতা আকড়ে হাটা দিয়েছি আমি। কবজি ঘুরিয়ে হাতঘড়িতে সময়টা দেখলাম। আরো পচিঁশ মিনিট সময় আছে ক্লাস শুরু হতে। যেতে লাগবৌ দশমিনিট। মুগ্ধের আচরণে খারাপ লাগছেনা। বরঞ্চ ওর বুদ্ধি দেখে সাব্বাশি দেওয়া লাগে! আসলেই ঠিক করেছে। আমাদের সমাজের মানুষ কতো গুণধর তা সবাই জানে। ক্যাম্পাসের ভেতরে শতশত শিক্ষার্থীর সামনে ওয়েল সোসাইটির মুগ্ধ সাহেবের গাড়ি থেকে নামলে সবাই নানারকম ধারনা করতো সিউর! ইতিবাচক ধারনার চাইতে নেতিবাচক ধারনাটা প্রাধান্য পেতো বেশি! সেদিন তন্ময়ের গাড়ি থেকে কি নেমেছি!! তাতেই মানুষ বলে ফেলেছে ‘আমি তন্ময়ের গার্লফ্রেন্ড নাকি?’ আজ মুগ্ধের গাড়ি থেকে নামলে নির্ঘাত স্ট্যাপ লাগতো ‘বারোভাতারী’! মুগ্ধ আসলেই একটা জিনিয়াস পাবলিক! মারাত্মক জিনিয়াস!

তিনটা লেকচার পরপর এটেন্ড করলাম। এখন গা গুলিয়ে বিরক্ত লাগছে। কলেজে উঠার পর থেকে আগের মতো টানা ক্লাস করার ইচ্ছাশক্তি নেই বলতে গেলে। এখন মনেহয় বড় হয়ে গেছি। ওসব লাগাতার ক্লাস বাচ্চারা করে।কারন, ভার্সিটি মানেই ক্লাস ড্রপ এবং পরীক্ষার রাতে পড়া এবং ফুলটাইম আনলিমিটেড আড্ডা দেওয়া! বই খাতা নিয়ে কাধে ব্যাগের ফিতাটা ঝুলিয়ে নজরুল চত্বরে গিয়ে বসলাম। চত্বরটা আজ ফাকা ফাকা। সবাই মাঠের আনাচে-কানাচে গোল হয়ে বসেছে। একটু দূরে শহীদ মিনারের সিড়িতে জেনি, রিমি, তন্ময়, নাসিফ ও মুগ্ধ বসে আড্ডা দিচ্ছে। সবার মন ফুরফুরে দেখা যাচ্ছে। সম্ভবত রামিমের অবস্থা এখন ভালো। আমি নোটখাতায় আজকের ইর্ম্পট্যান্ট টপিক টুকে লিখছি। জগতের সমগ্র জিনিস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গভীর নিমগ্নে কলম চালাচ্ছি।

— ‘বেবি কি লিখছিস?’
চোখ তুলে প্রশ্নকারীর দিকে তাকালাম। দেখি ইসরাত আর অর্পিতা দাড়িয়ে। অর্পিতা হাসিমুখে আমার বামপাশে বসলো এবং ইসু বসলো বসলো ডানপাশে। জবাব না দিয়ে আমি খাতায় কলম ঘুরাচ্ছি। অর্পিতা খচখচ শব্দ করে কিছু একটা ছিড়তেই বলে উঠলো,

— মম কি লিখছিস? নোট নাকি? আচ্ছা ক্লাসে তোর কি হয়েছিলো বলতো? তুই আলাদা হয়ে পিছনে বসলি কেনো?
ইসুও অর্পিতার সাথে যোগ দিয়ে বললো,
— তোর আজ কি হয়েছে রে? একা বসলি! একা ক্লাস করলি! এখন এখানেও একা আছিস! কি হয়েছে খোলাখুলি বলবি?

আমি বিরস মুখে বলে উঠলাম,
— প্লিজ ডিস্টার্ব করিস না। কাজ করছি। পারলে তোরা এখান থেকে যা।
অর্পিতা চোখে কাঠিন্য ভাব এনে ছোঁ মেরে হাত থেকে খাতাটা নিয়ে নিলো। আমি বিরক্ত মুখে চেতে উঠি!
— উফ অর্পিতা! আমার পড়াশোনা দেখে তোদের ভালো লাগছেনা!
— না ভালো লাগছেনা! তোর লোক দেখানো পড়াশোনা অন্যের সামনে দেখাবি। আমার সামনে না! তুই যদি কি হয়েছে না বলিস এক্ষুনি তোর খাতাটা কুটিকুটি করে ফেলবো!
— তুই আমাকে শান্তি দিবি? বল শান্তি দিবি?
— চড় দিবো!তুই শেয়ার না করা পযর্ন্ত তোর পিছু ছাড়বোনা বুঝছিস! এখন পটাপট উগলে দে কি হয়েছে!
ইসু পাশ থেকে অনুযোগের সুরে বলে উঠলো,
— তুই আমার বেস্টু! তুই কথা শেয়ার না করলে আমার ভালো লাগবে?

হঠাৎ মস্তিষ্কের রিনরিন শব্দটা বেজে উঠলো! মুগ্ধ বলেছিলো, আমার ব্যাপারে যতপ্রকার কুটনামি সব এই ইসু করেছিলো! পুরো ক্যাম্পাসে আমার নামে মুখরোচক দুর্নাম গেয়েছে!তবে মুগ্ধ ও আমার বিয়ের কথাটা কি শেয়ার করা ঠিক হবে? মন বলছে ‘না’! করা ঠিক হবেনা! অর্পিতা আমার হাতটা ধরে বলে উঠলো,
— কথাগুলো বলে মনটা হালকা কর মেয়ে। এভাবে চুপ করে থাকলে মন ভারী হয়ে কান্না বসে যাবে।

অর্পিতাকে ‘বিশ্বাসযোগ্য’ হিসেবে মস্তিষ্ক সাইরেন দিচ্ছে। কিন্তু ইসুকে নিয়ে নাহ্। কাজেই বুদ্ধি করে ইসুকে দূরে পাঠিয়ে তবেই অর্পিতাকে সব কথা বলা যাবে। নাহলে সত্যি দমবন্ধ হয়ে আমি মারা যাবো! ইসুকে ক্যান্টিন থেকে নুডলস আনতে পাঠিয়ে দিলাম। ওর আসতে কমপক্ষে বিশ মিনিট লাগবে! ততক্ষণে আমি অর্পিতাকে হাসঁফাসঁ করতে করতে সব বলে দিলাম। অর্পিতা চোয়াল ধুলিয়ে দূরে ছিটকে গিয়ে বসলো। চোখেমুখে ব্যাপক আশ্চর্যের ঝলক! অর্পিতা কাপাঁ কাপাঁ হাতে ব্যাগের চেইন খুলে পানির বোতল নিয়ে ঢকঢক করে পানি খাচ্ছে। বেশিরভাগ পানি ওর জামার উপর পড়লো। আমি ঝাট দিয়ে দিয়ে অবশিষ্ট পানি ফেলতেই অর্পিতা বোতলটা না লাগিয়ে পাশে পাটাতনের উপর রাখলো।

— অর্পি তোকে কথাগুলো বললাম প্লিজ আর কাউকে বলিস না। ইভেন ইসুকেও না। তোকে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে তাই আগেভাগে না ভেবে বলে দিলাম।
অর্পি চুপ করে আছে। কিছুটা শান্তবোধ হলে আমার দিকে সম্পূর্ণ তাকিয়ে বলে উঠলো,
— তোর বিয়ের খবর শুনে আমার আত্মা কাপছিলো জানিস? থাক গে, ওগুলা মাথা বাদ। কথা শোন আমার! মন দিয়ে চুপচাপ শুনবি! একদম চুপ করে শুনবি! ওকে?
— হু।
— মুগ্ধ ভাই তোকে পাগলের মতো ভালোবাসে। এন্ড নাও, তুই না চাইলেও উনার ওয়াইফ! আবার তুই বললি উনার ফ্যামিলি কেউ নাই। উনি একা একটা ফ্ল্যাটের মধ্যে থাকেন। তুই জানিস একা থাকাটা কত কষ্টকর? আমি জানি! বাবা – মা কেউ নাইতো মুগ্ধ ভাইয়ার অবস্থাটা বুঝি। আর একটু আগে বললি না?মুগ্ধ ভাই তোকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিছে? ক্যাম্পাসে তোকে সাথে আনেনি! তুই যে আজাইরা মার্কা শর্ত দিছোস না? ওইটার জন্য বেচারা এমন করছে! উনার কি দোষ দিবি তুই? তুই তো নিজেই একটা দোষী!
— তুই আমাকে লেকচার দেয়ার জন্য চুপ থাকতে বলছিস?
— জীবনেও না। এগুলা তোর কাছে লেকচার লাগে? আমি অর্পিতা যা যা বলি সব সত্য! একটাও মাটিতে ফালানোর মতো কথা না! আরেকটা কথা ‘ইসু ইসু’ করে যে জানটা দিয়ে দেস না? সাবধানে থাকিস। এই মেয়ে বড়মাপের চালবাজ! তোর এই কথা শুনলে ইজ্জত কিভাবে হালুয়া করে টের পাবি।
— জানিস?সবাই বলে ইসু দুমুখো! বাট আদৌ আমি ধরতে পারলামনা।
— তুই তন্ময়ের গফ! কথাটা কিন্তু ইসুই ছড়াইছে! মুগ্ধ ভাই পরে সব কথা কিভাবে ঠিক করছে কে জানে? মুগ্ধ ভাইকে ভুলেও হাতছাড়া করিস না! পস্তাতে পস্তাতে মরে যাবি!
— অর্পি, আমি ওকে পছন্দ করিনা। যেখানে পছন্দ শব্দই আসেনা সেখানে আবার ভালোবাসা কিসের? ভালোবাসা কি পুতুলনাচ? যে দেখলে মজা পেলে ভালোবাসা হয়ে যাবে?
— মনের অনুভূতি বলার জন্য মুখের শব্দ লাগেনা বোকা। একটা মেয়ের চোখেই সব স্পষ্টভাবে লেখা থাকে। যে পড়তে পারে সে মোক্ষমভাবে ভালোবাসতেও জানে! লিমিট ক্রস করে পাগলামি করে! আমি ওই পাগলামি মিন করিনাই! যেটা এই যুগের বফ,গফ হাত পা কেটে প্রমাণ করে! ওইটা বালপাকনা ছ্যাঁচড়ামি ছাড়া কিছুই না! মুগ্ধ ভাইকে ডাক দে, তোকে এখনই হাতেনাতে প্রমাণ দেই!
— কিহ্! দলবল নিয়ে বসে আছে আর আমি এখান থেকে ডাক দিবো?অসম্ভব!
— তুই না দিলে আমি দেই। মুগ্ধ ভাই? এইযে ভাইয়া? হ্যাঁ আমি ডাকছি। একটু আসবেন এখানে? একটু? দরকার আছে তো…

ডাক দিলো মুগ্ধকে! কিন্তু সঙ্গে আসলো তন্ময়,নাসিফ! মুগ্ধ অর্পিতার ডাকে আমাদের সামনে এসে দাড়ালো। লম্বাটে হাইট, কালো কুচকুচে শার্ট, অফ হোয়াইটের গ্যাবার্ডিন প্যান্ট, হাতাটা মোটা করে গোটানো, ছিমছাম দেহের আর্কষনীয় মুখটা নিয়ে চুপ করে দাড়িয়ে আছে। অর্পিতা কনুই মেরে আমাকে তাকাতে বললো! আমি দুলিয়ে আকাশ দেখছি। বাপাশ থেকে লাগাতার কনুইয়ের গুতায় ঝাঝড়া হয়ে যাচ্ছে। উঠে একটা থাপ্পরও দিতে পারছিনা!

— ভাইয়া মাইন্ড করবেন না। আমি আপনার বোনের মতো। আপনাকে একটা কোয়েশ্চ্যান দিবো প্লিজ সল্ভ করে দিবেন? শুনেছি আপনার ব্রেন খুব চালু! প্লিজ ভাইয়া না করবেন না। ছোট্টবোনের অনুরোধ..

মুগ্ধ মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ সূচক বোঝালো। তন্ময় নাসিফের ব্যাপারটা ঘাপলা লাগছে। তাই তারা চোখাচোখি করে বিনা শব্দে কথা বলছে। অর্পিতা আমার খাতা থেকে একটা পেজ ছিড়ে কলম নিয়ে কিছু একটা লিখলো এবং কাগজটা মুগ্ধের দিকে বাড়িয়ে দিতেই মুগ্ধ নিয়ে দেখতে লাগলো। তন্ময় ও নাসিফ দেখল, কাগজে সাংকেতিক ভাষায় কিছু লেখা,

‘m mmmm mmm mmmm’

মুগ্ধ লোয়ার লিপটা আলতো করে দাঁতে চেপে ভাবছে। মম আড়চোখে তিনজনের অবস্থা দেখে মনেই মন হাসলো! কারন, তারা এসব পারবেনা! মুগ্ধ তো আরো আগে না যতই সে বুদ্ধিমান হোক! নাসিফ কাগজটায় চোখ বুলিয়ে কপাল কুচকে আছে। তন্ময় কাগজটার একটা কোণা ধরে বিষ্ময়সূচকে বললো,

— দোস্ত ধরতে পারছিস কেউ? এটা কিসের ইকুয়েশন? ম্যাথ না ফিজিক্সের?
অর্পিতা হালকা কেশে বললো,
— ভাইয়া এটা নরমাল প্রবলেম। যাদের আইকিউ(IQ) ভালো তারা পারবে। যাদের নেই তারা কলম কামড়াবে।
— এই মেয়ে! কাদের গাধা বলছো! র‍্যাগ দিবো নাকি!
— ভাইয়া..
মুগ্ধ অর্পিতাকে থামিয়ে বলে উঠলো,
— আহ্ তন্ময়। পারছিস না চুপ থাক! থ্রেট কেন দিচ্ছিস!
— সরি ডুড।

ঠিক দুই মিনিট পেরুতেই মুগ্ধ বললো গলা ঝেড়ে বললো,
— তন্ময়? নাসিফ? চল! জুনিয়রদের কাহিনি নিয়ে মাথা নষ্ট করার সময় নেই। নিজেরা বুঝেনা ! আমাদের দিয়ে করায়!

তন্ময় নাসিফ মুখ গম্ভীর করে চলে যেতে লাগলো। অর্পিতা হাতে হাত ডলে উশখুশ করছে! ওদের না-ও করতে পারছেনা! আবার আটকাতেও পারছেনা! মুগ্ধ কাগজটা দুই ভাজঁ করে অর্পিতার হাত টেনে হাতে ধরিয়ে দিতেই স্বর খাদে ঢেলে স্পষ্ট বাক্যে বললো!

— ওয়ান ‘এম’, ডাবল ‘এম’ ডাবল ‘এম’, ট্রিপ্যাল ‘এম’, ডাবল ‘এম’ ডাবল ‘এম’… ইকুয়েল টু(=) ‘আই লাভ ইউ মম’ ! গিভ দিস টু ইউর ফ্রেন্ড, এন্ড স্যা টু হার, সাম লাভ ওয়ার্ডস ফ্রম রাদিফ মুগ্ধ!

বাকাঁ হাসি উপহার দিয়ে প্রস্থান করলো মুগ্ধ! আমার ও অর্পিতার দুজনের অবস্থা পুরোপুরি জবানবন্দ!

.
.

বাসায় ফিরলাম! একগাদা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে আব্বুকে শান্ত ভাবে ট্যাকেল করেছি। আব্বু আজ বাসায় থেকে কাল সকালে আবার রওনা দিবেন আম্মুকে আনতে। আজ আম্মু আসেনি, কাল আসবে। রাতের খাবার হিসেবে গরম ও ডিম ভাজা ছাড়া উপায় নেই। ঘরে বাজার নেই! আবার রাত করে বাজার খোলাও থাকেনা। পেয়াঁজ, মরিচ কাটছি। ডিম কাপে নিয়ে চামচ দিয়ে ফেটছি। দ্রুত হাত চালাতেই দরজায় বেল পড়লো! ঘড়ির দিকে দেখলাম! সাড়ে দশটা! এই রাতে কে আসলো?

— আব্বু? আব্বু শুনছো? দরজাটা একটু খুলে দেখো তো কে এসেছে।

খট করে কিছু খুলার শব্দ পেলাম। আব্বু বাথরুমের দরজা ধরে উকি দিয়ে বলছেন,
— আমি বাথরুমে। তুমি দরজাটা খুলে দেখো!

ডিমের কাপ চুলার কাছে রেখে দরজা খুলতে গেলাম। দারোয়ান একটা সাদা ব্যাগ এগিয়ে বলছেন পার্সেলটা নাকি আমার নামে এসেছে! আমি কিছুটা অবাক। দরজা লাগিয়ে পার্সেল নিয়ে টেবিলের উপর রাখতেই আব্বু বাথরুম থেকে গলা উচিয়ে বললো,

— মম? কে এসেছে?
আমি পার্সেল খুলতে খুলতে বললাম, ‘পার্সেল দিছে আব্বু!’ ব্যাগটা খুলে দেখি খাবারের ঘ্রাণ আসছে। স্ট্যাপলার দেয়া কাগজের ব্যাগটা ছিড়ে দেখি দুটো সাদা প্যাকেট! ভুরভুর করে বিরিয়ানীর গন্ধ আসছে। প্যাকেটে সত্যি সত্যি বিরিয়ানী! একদফা চমকে আছি! এটা নিশ্চয়ই মুগ্ধের কাজ! ও ছাড়া কেউ এই আকাম করতে যাবেনা! দৌড়ে রুমে গিয়ে ওকে কল করছি! আজ মনের মাধুরী মিশিয়ে একচোট খারাপ ভাষায় গালি দিবোই! ফোন বাজতেই ও রিসিভ!

— হ্যালো,
— ভাই একটা কথা বলবা? ছেলেদের লজ্জা শরম কি কম থাকে? এইযে জঘন্য ভাষায় অপমান করি! গায়ে কি ছিটেফোঁটাও লাগেনা?
— আরে! আমি করেছিটা কি? আমাকে ভাই বলছো কেনো? এটা কোন ধরনের অসভ্যতা?
— অসভ্যতার এখনো করিনি! তাই ভালো করে জিজ্ঞেস করছি! খাবার পাঠাতে বলছিলো কে? আমি?
— খাবার? আমাকে পাগল কুকুর কামড়ায় না বুঝছো! আমি তোমার বাসায় খাবার পাঠাইনি।
— তাহলে কে পাঠাইছে? কে জানছে আমার বাসার অবস্থা?
— তা আমি কি করে বলবো?
— তুমি পাঠাওনি?
— না,
— সিউর!
— ফাইজার কসম!

ফোন কেটে দিলাম। অনবরত ভাবছি কে কাজটা করলো? খাবারের কথা মুগ্ধ ছাড়া কে জানবে? উহু, বিষয়টা সোজা ঠেকছেনা! মোটেও সোজা ঠেকছে না! খাওয়া পর্ব শেষে রুমে এসে রামিমের খোঁজ নিতে জেনিকে কল দিলাম। যদিও জেনিকে আমার সহ্য না! জেনি কলটা ধরে বলে উঠলো,

— তুমি আমার ফোনে কল দিয়েছে কেনো!
— তোর ফোন কি গ্রিনিজের মাল? ফোন দেওয়া যাবেনা?
— মাইন্ড ইউর ল্যাঙ্গুয়েজ!
— আমি বাংলাতেই কথা বলছি! তুইও ইংলিশ ভাষা সাইড পকেটে ঢুকা! আর বল রামিম কেমন আছে? জ্ঞান ফিরেছে?
— সেটা তোমাকে কোন শখে বলতে যাবো!
— আহহা! তুই আমাকে শখের ডেফিনেশন না দিয়ে রামিমের খবর বল! এক্সট্রা কথা বলবি আরেক কল সোজা মুগ্ধের ফোনে বাজবে!
— রামিম সুস্থ আছে। জ্ঞান ফিরেছে।
— গুড! এরপর বল ওর উপর এ্যাটাক কে করেছে জানা গেছে?
— না। তন্ময় ও নাসিফ বলেছে ব্যাপারটা ওরা দেখবে।
— কেনো? মুগ্ধ জানে?
— কেউ জানিনা। মুগ্ধকে বলবো ভেবেছি ও আমাদের কারোর সাথে কেনো জানি কথাই বলছেনা।
— আচ্ছা। এখন কোথায় তুই?
— রামিমের কেবিনে।
— ও কি ঘুমে?
— না।
— একটা কাজ কর। ফোনটা ওর পাশে রেখে কেবিন থেকে বাইরে যা।
— হোয়াট?
— যা বলছি তাই কর! কথা না শুনলে..
— যাচ্ছি..

‘রামিম মম তোর সাথে কথা বলবে! তুই পারবি?’
‘হ্যাঁ জেনি পারবো’

উপরোক্ত দুইটি বাক্য শেষে কিছুক্ষণ সময় পেরুলো। রামিম ভাঙ্গা গলায় বলে উঠলো,

— হহ্যালো..
— রামিম? কেমন আছো? কি অবস্থা? শরীর কি এখনো প্রচুর খারাপ?
— ননা ভাবি..
— আমি তোমার ভাবি না রামিম।
— আআপনার সসাথে বসের বিয়ে হইছে ভভাবি। আমি সসব জজানি।
— কিভাবে? কি করে?
— ভভাবি ওওসব কথা বাদদ দদেন, আপনি আআমার ককথা শুনেন.. তন্ময় খুখুব খখারাপ..আপনি এএকা থাককবেন না..ওওরা গুরুততর প্ল্যানন বানাইছে ভভাবি, ওওরা জানে বিয়ের বব্যাপারে..

এটুকু বলেই খুকখুক করে কাশতে শুরু করলো রামিম। কাশতে কাশতে দম বেরিয়ে যাওয়ার অবস্থা! মম বিচলিত হয়ে ফোনের মধ্যেই চেচাতে লাগলো,

— রামিম! তুই ঠিক আছো! রামিম? রামিম জবাব দাও! তুমি অসম্পূর্ণ কথা বলতে পারো না! সব বলো প্লিজ!

কাশতে কাশতে রামিম গলা পরিস্কার করে প্রতিটা শব্দ থেমে থেমে বললো,
— আপনার উপর প্রতিশোধ নিতে চায়…এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চায়…আপনাকে শেষ কইরা বসকে হাত করার নীনীল নকশা ককরছে..

-চলবে

ফাবিয়াহ্ মম

তুমিময় প্রেম
PART 25
FABIYAH MOMO

১.
মুগ্ধের বাসায় যাবো! ওর পেয়ারা বন্ধু তন্ময়ের ইতিহাস বলতে! আব্বুকে বিদায় করে কোনোরকমে রেডি হয়ে বেরিয়ে গেলাম বাসা থেকে! উদ্দেশ্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মুগ্ধের বাসায় পৌছানো এবং সবটা খুলে ওকে জানানো। মুগ্ধের বাসায় যেতেই দারোয়ান আমার হাতে একগুচ্ছ চাবি ধরিয়ে দিল এবং বলল, এগুলো বাসার এক্সট্রা চাবি, যা মুগ্ধ কেবল আমার জন্য বরাদ্দ রেখেছে। আমি চাবি হাতে দ্রুতপায়ে একেবারে থামলাম মুগ্ধের রুমের কাঠালি দরজার কাছে। দরজা ভেতর থেকে লাগানো। মুগ্ধ এখনো ঘুমাচ্ছে। চাবি গুচ্ছা থেকে বেছে বেছে একটা চাবি নিয়ে নবে ঢুকিয়ে দিলাম মোচড়! ব্যস! দরজা খুলেছে! আমি টুপ করে ঢুকে পড়ি। দরজাটাও চাপিয়ে দেই। চোখের সামনে বিশাল মাঠের মতো মস্ত এক বিছানায় উপুড় হয়ে ঘুমিয়ে আছে মুগ্ধ। পা থেকে মাথা পযর্ন্ত কম্বল দিয়ে ঢাকা। আমি আস্তে করে কাধের ব্যাগটা রেখে ওর মাথার কাছে বসি। সাদা নরম তুলতুলে কম্বলটা ধীরগতিতে সরিয়ে দেই। মুগ্ধের চোখে সকালের মিষ্টি আমেজের রোদটা যেয়ে পড়লো। এতে মুগ্ধ নড়েচড়ে ঘুমে ঢুলু চোখে উঠে বসলো। শরীর টানা দেওয়ার জন্য কম্বলটা গা থেকে সরতেই আমি এক চিৎকার দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলি! মুগ্ধ চোখ কচলে আমার উদ্দেশ্যে বললো,

— ভূত দেখছো? চিৎকার দিলে কেনো?
আমি থতমত গলায় তোতলাতে তোতলাতে বলি,
— তু তুমি উ উদাম!
— উদাম কি শব্দ?
আমি দুইহাতে মুখ ঢেকেই বেড থেকে দাড়িয়ে পড়ি! বিচলিত গলায় বলে উঠি,
— আরে তোমার গায়ে কিছুই নেই! তুমি খালি গায়ে!

আমার কথা শুনে মুগ্ধ নিজের দিকে তাকালো। রাতে ওর খালি গায়ে ঘুমানোর স্বভাব। শুধু একটা ট্রাওজার পড়ে ঘুমায়। মুগ্ধ কম্বল দিয়ে গা ঢেকে ঘুম জড়ানো কন্ঠে বললো,
— লজ্জার কি আছে পাগল? তোমার জায়গায় অন্য কোনো মেয়ে হলে এতোক্ষনে কতোওও আদর করতো। ডিপলি একটা মনিং কিস দিতো মাস্ট!
— ছি! বাসি মুখে কিস! বমি করে দিবো!
— তাহলে ব্রাশ করি! একটা কিস দাও!
— আগে তুমি গা ঢাকো! নাহলে আমি এক্ষুনি চলে যাবো!
মুগ্ধ বিরক্ত গলায় বললো,
— চোখ খুলুন ম্যাডাম! আমি আপনাকে নিজের গা দেখিয়ে পাগল বানাতে চাইনা। এসব বাজে স্বভাব থাকলে অলেরেডি মুগ্ধের ক্যারেক্টারলেসের সার্টিফিকেট থাকতো।

আমি অতি আস্তে আস্তে মুখ থেকে হাত সরিয়ে ফেলি। ওর চোখ এখনো বন্ধ করা। পুরো বাচ্চা বাচ্চা লাগছে ওকে! এলোমেলো চুলগুলো কপাল ঢেকে দিয়েছে। আমি পাশে যেয়ে বসতেই মুগ্ধ বাচ্চার মতো ঠোট উল্টে বললো,
— আমি কিন্তু উদাম টুদাম না। ট্রাউজার পড়ে আছি। বাট তুমি আমাকে নিয়ে কি কি অশ্লীল চিন্তাভাবনা করেছো হু নৌস? একটা কাজ করো প্লিজ। আলমারি থেকে টিশার্ট এনে দাও। আর হুট করে এতো সকালে তুমি এখানে? কোনো প্রবলেম?

আমি আলমারি থেকে টিশার্ট নিতেই বলে উঠলাম,
— আমি কালরাতে আসতে চেয়েছিলাম। তোমার ফোন ট্রায় করেছি বন্ধ ছিলো। না পারতে সকালের বাস ধরে চলে এসেছি। এই নাও টিশার্ট..
মুগ্ধ টিশার্টটা হাতে নিয়ে বললো,
— সিট! ফোনটা চার্জে ঢুকাতে ভুলে গেছি। আমি টিশার্ট পড়বো তুমি অন্যদিকে তাকাবে? চাইলে আমাকে দেখতে পারো। আই হেভ নো প্রবলেম।

কথা শেষ করে মুগ্ধ মিচকে একটা হাসি দিলো। আমি সাথেসাথে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলা শুরু করলাম,
— তোমার কল কাটার পর জেনিকে কল করেছিলাম। রামিমের খোঁজখবর নিতে। রামিমের সাথে কথাও হয়েছে..

মুগ্ধ টিশার্টের গলা দিয়ে মাথা ঢুকাতেই বিষ্মিত কন্ঠে বললো,
— কি বললে? রামিমের সাথে কথা বলেছো! হাও ইজ দিস পসিবল!
— প্লিজ আমি কথা শেষ করি। তারপর বলো।
— সরি! ডান পাকনি এখন তাকাতে পারো।
আমি মুখ ঘুরিয়ে মুগ্ধের দিকে ফিরলাম।
— একটা প্রমিস করবে?
— ইয়েস প্রমিস। বলো।
— রামিমের এক্সিডেন্টটা তন্ময় করেছে মুগ্ধ! তন্ময় একটা শয়তান! তলে তল তোমাকেও মারার জন্য প্ল্যান করেছে! আরেকটা কথা! আমাদের বিয়ের ব্যাপারে ও সবটা জানে! তুমিই বলো যেখানে তোমার বাসার চাকররা এই বিয়ে সম্বন্ধে কিছু জানেনা সেখানে তন্ময় জানলো কি করে? আমার মাথা আওলা হয়ে আছে মুগ্ধ! আমি কোনোকিচ্ছু ভাবতে পারছিনা!
মুগ্ধ কপালের চিন্তার ভাঁজ পড়লো। এই মূহুর্তে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে মুগ্ধকে। কিছুক্ষণ চুপটি থেকে কৌতুহল গলায় বললো,
— কথাগুলো রামিম বলেছে? বিয়ের ম্যাটার ও জানে?
আমি মাথা উপর-নিচ নাড়লাম! যার অর্থ ”হ্যাঁ”!
— মামলা সিরিয়াস! ওয়েট! মুখটা ধুয়ে আসি!

মুগ্ধ ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বললো,
— পাকনি আই ডোন্ট নো! বাট আমার হেভি ডাউট হচ্ছে তন্ময়ের উপর! তন্ময়ের মতো মিথ্যুক আমি সেকেন্ড একটা দেখিনি! ওর মাথায় কত খারাপ কনসাইন্স থাকতে পারে জাস্ট আই নো!
মুগ্ধ আলমারি থেকে শার্ট, প্যান্ট, ঘড়ি বের করে রেডি হচ্ছে! আমি মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে আছি! ওর টিশার্ট ছাড়া গা আরেকবার দেখলে সিরিয়াসলি আমি কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলবো! এমনেই চোখের সামনে একটু আগের দৃশ্য ভাসছে! চোখবন্ধ করলেও একই অবস্থা দেখছি! ওমন ইয়াং একটা ছেলের শরীর দেখতে মেয়েদের চমৎকার লাগলেও আমার জাস্ট একপলক দেখতেই শ্বাস ভারী হয়ে আসছে! নো নেভার তাকানো যাবেনা!

২.
ভার্সিটির প্রাঙ্গণে পা রাখতেই আমার চোখ ছানাবড়া! সবাই দৌড়াচ্ছে কেনো? কিছু হয়েছে? সবাই দেখি একদিকে পালাচ্ছে! আমার হৃৎ গতি হঠাৎ বেড়ে যেতে লাগলো! সবার চোখমুখে আলাদা রকমের ভয় দেখছি! রহস্যজনক ভয়! মুগ্ধ কোথায়? ওকে যে দেখছিনা! আমাকে এখানেই থাকতে বলে মুগ্ধ গাড়ি করে ঢুকেছিলো।আমি কাউকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করবো, কেউই আমার ডাকে শুনছেনা! পায়ের দৌড়াদৌড়িতে বাতাসের ধূলো উড়ছে! অনুভব করলাম কলিজাটা ধুকপুক করছে! দূর থেকে একটা ডাক শুনতে পেলাম! কেউ আমার ধরে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে! আমি উৎসটার খোঁজে এদিক ওদিক দেখতেই মাঠের শেষপ্রান্তটার হলরুমের ওখানে অর্পিতা দাড়িয়ে! দুহাত দিয়ে ঠোটের চারপাশ ঘিরে বেগতিক হারে চিল্লাচ্ছে! আমি দৌড়ে হাফাতে হাফাতে অর্পিতার কাধ ধরে থামলাম। অর্পিতা কান্নার সুরে অস্থির কন্ঠে বলে উঠলো,

— গন্ডগোল হয়ে গেছে দোস্ত! গন্ডগোল হয়ে গেছে! তন্ময়, নাসিফ, আহাদ মিলে মুগ্ধ ভাইকে পিটাচ্ছে! অনেক ফোন করেছি তুই ধরিসনি!! একনাগাড়ে দশমিনিট ধরে মারছে!! ভাইকে বাঁচা প্লিজ! কুত্তাগুলা মেরে ফেলবে ওকে!!

আমার আত্মাটা যেনো সাথে নেই কথাটা শুনার পর! আপনাআপনি অর্পিতার কাধ থেকে পড়ে গেলো হাতটা। বুকের মধ্যে ধুপধুপ করে হাতুড়ি চালাচ্ছে কেউ! কানেও যেনো শব্দটা বিধছে খুব! বহু কষ্টে ঢোক গিলে অর্পিকে প্রশ্ন করলাম,
— উউনি ককোথায়?
অর্পি কান্না করে বলে উঠলো,
— হহলরুমে

শরীরের শেষটুকু শক্তি দিয়ে দৌড়াচ্ছি! এই দৌড়টা জীবনের শেষ দৌড় এমন নীতিনিষ্ঠে দৌড়াচ্ছি! বুকটা ফেটে ছিন্নভিন্ন লাগছে প্রচুর! এই বুঝি ওরা উনাকে মেরে ফেললো! হলরুমের দরজায় কি ভীড়! ভেতরে যাওয়া মুশকিল! নাহ!! এভাবে হাতে হাত রেখে তামাশা দেখার সময় নেই!ওরা মুগ্ধকে মেরেই ফেলবে! জামার হাতায় চোখ ডলে হলরুমের উল্টোদিকে যাচ্ছি! ওখানে একটা জানালা সর্বদা খোলা থাকে! জানালার নিকটস্থ হতেই নাসিফের হো হো হাসির গলা শোনা যাচ্ছে। আমি জানালা টপকে ভেতরে ঢুকতেই গায়ের সবগুলো পশম কাটাঁ দিয়ে উঠলো! হিরহির করে আলোর গতিতে রক্ত সন্ঞ্চালন বৃদ্ধি পাচ্ছে! আমার পুরো শরীর কাবু হারিয়ে ফেলেছে! মুগ্ধের মাখন রঙের শার্টটা রক্তে লালটম্বুর!হলরুমের ময়লা ফ্লোরে কালো প্যান্টটা ধূসরবর্ণে মাখামাখি। দুইহাত মাথার দুইদিকে মেলে উপুড় হয়ে কাশছে মুগ্ধ! কাশির সাথে মুখ থেকে লালরক্ত বেরুচ্ছে! তন্ময় লাগামহীন পিটিয়ে হাফিয়ে উঠেছে বিধায় একটু জিরিয়ে নিচ্ছে!

সকালেই না মানুষটাকে হাসিখুশি সুস্থ দেখলাম? লজ্জামিশ্রিত ভাবনায় উনাকে মনের কোণে আনলাম। কি করে দিলো ওরা মুগ্ধকে? কি করে দিলো? জানালা ধরেই কেঁদে দেই আমি। চোখ কুচকে ফুপিয়ে কেদেঁ দেই! মম কাদলে চলবেনা! কাদিস না! থামা নিজেকে! জানোয়ারগুলাকে আগে টাইট কর! তোর মুগ্ধকে পিটিয়েছে না? তুইও কুত্তার মতো পিটাবি! একটাকেও ছাড় দিবিনা! জোরে জোরে নিশ্বাস ছেড়ে হাতের তালু চোখের পানি মুছে ওড়নাটা হাতে নিলাম! কাধ থেকে কোমর বরাবর বাকা করে বেধেঁ ব্যাগের ভেতর থেকে প্রয়োজনীয় সরন্জামাদি নিয়ে হাতে পুড়লাম! আমি ওদের পেছনদিকে বিধায় এখনো ওরা দেখেনি আমায়! চুপিচুপি বিনা শব্দে ওদের পেছনে দাড়াতেই ওরা বলছে,
— মাম্মা? এই শালাকে মেরে কোথায় ফালাবি? মরা লাশ তো সাথে রাখা যাবেনা।
তন্ময় বললো,
— হুর বেক্কল! এইটা মরছে নাকি! এখনো মরেনাই! শালার নিশ্বাস পড়তেছে! মাথায় দুইটা জোরে দেওয়া লাগবো!
আহাদ বলে উঠলো,
— দেখ মামা! যেমনেই হোক লাশ ড্রেনে ফালাইস না! নদীতে ফালাইতে গেলেও কেউ না কেউ মাস্ট বি দেখবো! তার চেয়ে ভালো ! কবরস্থানে কবর দেওয়া!
নাসিফ ধমকে বলে উঠলো,
— গাধার বাচ্চা! ঘিলু নাই? কবরস্থানের মানুষ মনেহয় তোর চাচা লাগে বললেই একেবারে কবর দিয়ে দিবো!

ওরা নিজেদের মধ্যে কথা কাটাকাটিতে ব্যস্ত থাকলে পেছন থেকে সামনে এসে আমি শুরু করি হামলা! টিনের বোতলটা জোরে ঝাকিয়ে ডিরেক্ট হামলা চোখে, পেপার স্প্রে দিয়ে! ওরা চোখ ধরে চিল্লাচিল্লি করছে! কেউ চোখ মেলে তাকাতে পারছেনা! এইসুযোগে আমি মুগ্ধকে ডাকছি! ও চোখটা পযর্ন্ত খুলতে পারছেনা! ওড়নাটা দিয়ে তাড়াতাড়ি ওর মুখ ঢেকে দেই! বাতাসে ব্যাপন প্রক্রিয়ায় পেপার গ্যাস যেভাবে ছড়াচ্ছে বেশিক্ষন থাকা যাবেনা এখানে! মুগ্ধকে উঠিয়ে যতদ্রুত সম্ভব ধরে ধরে হলরুমের পিছন গেটে দিয়ে বের হলাম! মাথায় শুধু একটাই কথা পাক খাচ্ছে, মুগ্ধ বাচঁবে তো? তুই ওকে বাচাঁতে পারবি??? পেছন থেকে চেচামেচি করছে ওরা,

‘তোকে আমরা ছাড়বোনা! মুগ্ধকে মেরেই ফেলবো! তুই ওকে যেখানেই নিস যাস কেনো! আকাশ পাতাল ভেদ করতে হলেও মারবো! মার্ক মাই ওয়ার্ডস!’

৩.
রাদিফ মুগ্ধ চিকিৎসাধীন! প্রচুর রক্ত গেছে ওর! আমার নিজের জামাটাই ওর রক্তে চটচটে আকার ধারন করেছে! ওড়নাটা চিপলে বেসিন ভর্তি রক্ত ঝড়বে! অর্পির সাহায্য নিয়ে মুগ্ধকে বাসায় এনে ব্যবস্থা করেছি! ভেতরে একটা ডাক্তার, দুটো নার্স মিলে ওর ট্রিটমেন্ট করছে ! আমি রুমের বাইরে পায়চারি করছি। সার্ভেন্টরা সবাই এটা ওটা এনে হেল্প করছে। সবচেয়ে বড় সাহায্য করেছে মুগ্ধকে রক্ত দিয়ে! ডাক্তার এসে ব্লাড চাইলেই তিনজন এগিয়ে আসে!
— ‘স্যারের ব্লাড আমি দিবো ডাক্তারসাহেব!আমার থেকে রক্ত নিন!’
আরেকজন বলে উঠলো,
— ‘ডাক্তার বাবু! আমার শরীরে যত্টুক রক্ত আছে নিয়ে নেন! তারপরও আপনে মুগ্ধ বাবারে বাচায়া দেন ডাক্তার বাবু!

আমি হতবিহ্বল হয়ে কাদছিলাম শুধু! সার্ভেন্টদের এমন রক্তদান হৈহৈ দৃশ্য আমার কাছে একটা রঙিন দৃশ্যপট! আচ্ছা মুগ্ধ এমন কি জাদু করেছে উনাদের মনে এতো দাগ চিড়ে গিয়েছে?বেশিরভাগ সার্ভেন্ট দরজার বাইরে ফ্লোরে বসে দুহাত তোলে দোয়া পড়ছে। হয়তো প্রতিটি মোনাজাতে কাদঁতে কাদঁতে মুগ্ধের জন্য অকুল কন্ঠে সুস্থতা কামনা করছে। একটু দূরে গিয়ে দাড়ালাম। অনবরত চোখের স্থল ভরে ভরে পানি গড়াচ্ছে। বারবার মুছলেও যেনো অশ্রুর সোডিয়াম ক্লোরাইডের কমতি হচ্ছেনা। আমার পাশে এসে সেদিনের বৃদ্ধাটা দাড়ালো। আমার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে উঠলেন,

— মিস্টি মা টা? নাক ফুলিয়ে ফেলছো… কান্না করেনা মা। ও দেখো সুস্থ হয়ে যাবে।
আমি হেঁচকির সুরে আটকা গলায় বললাম,
— সসুস্থ হহবে তো?
বৃদ্ধা আঙ্গুল উচিয়ে সার্ভেন্টদের দিকে দেখালেন এবং নম্র গলায় বললেন,
— এদের মোনাজাত বিফলে যাবে না মিস্টি মা। পরিস্কার মন থেকে নিজেকে ভিখারি করে আল্লাহর দরবারে চাচ্ছে। আল্লাহ কি শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেয়? দেয় না। মানুষ শূন্যহাতে ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। আল্লাহ্ নাহ্! ভরসা রাখো। সব ঠিক হবে। আমার দাদুভাইয়ের কিচ্ছু হবেনা।
আমি অস্পষ্ট সুরে থেমে বলি,
— উউনি আআপনার নানাতি?
বৃদ্ধা আমার চোখের পানি মুছে বললেন,
— হুম মিস্টি মা। দাদুভাই আমার। যাও দাদুকে দেখে আসো। ডাক্তার ভেতরে যেতে অনুমতি দিয়েছে।

আমি হ্যাঁ সূচকে মাথা নাড়িয়ে দরজার নব ঘুরিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। চোখের সামনে সটান হয়ে শুয়ে আছে মুগ্ধ! সকালের পরিস্কার চাদরটা এখন রক্তে মত্ত! সুস্থ ফাজলামি করা মানুষটা এখন বিছানায় আহত! মুগ্ধ চুপ করে আমাকে দেখছে। কপাল কুচকে ঠোট নাড়িয়ে কিছু বলার চেষ্টা করছে। কিন্তু ঠোটের কোনাটা একদম চিড়ে আছে! একটা সেবিকা পাশ থেকে বললেন,
— আপনি পেশেন্টকে কথা বলতে দিবেননা প্লিজ! উনি এখনো দূর্বল! চুপচাপ পাশে বসে কথা বলুন। উনাকে মনের ভুলেও টু শব্দ করতে দিবেন না। চলি।

নার্সটা চলে যেতেই আমি বিছানায় বসলাম। মুগ্ধ ঠোটটা নাড়াচ্ছে এখনো! যন্ত্রণায় কথা বলছেনা একটুও!

আমি শাষন গলায় বললাম,
— ভালো হইছেনা একা একা মার খেতে! ভালো হইছে? মনের স্বাদ মিটছে আপনার? না করছিলাম না? কথা কানে নিছেন?

মুগ্ধ জোরে নিশ্বাস ছেড়ে বললো,
— সরি! আ’ম সরি।

ঠোঁট কাপিয়ে শক্ত করে থাকলেও আমি ওইটুকু শব্দ শুনেই ডুকরে কেদেঁ দেই। যদি আজ আমার ক্যাম্পাসে যেতে দেরি হতো? যদি আজ অর্পিতা সঠিক সময়ে ওকে গাড়িতে না তুলতো? তাহলে কি এই দুটি শব্দ শোনার মতো অবস্থাটুকু বাচঁতো? নাকি লাশে পরিণত হওয়ার মতো মুরদা হয়ে যেতো? কে জানে?

-চলবে

ফাবিয়াহ্ মম

তুমিময় প্রেম
PART 26
FABIYAH MOMO

৪.
মেঘের গর্জনে ঢেকে গেছে পরিস্কার আকাশ! আকােশর দিকে তাকালেই যেনো গা শিউরে উঠে! রাস্তাঘাট খালি হচ্ছে অতি জলদিতে! আগাম ঝড়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে নিউজ পোর্টাল! অতি শিগগিরি নিরাপদে সবার চলে যাওয়ার আহ্বান! বাতাসের তান্ডব শুরু হয়ে গেছে! মুগ্ধ বিছানায় শুয়ে শুয়ে আকাশটা দেখছে। ওর কাছে আকাশটা আজ মস্ত আশ্চর্যের বস্তু! বারবার ঘড়িতে সময় দেখতে দেখতে মন বেচইন করে ফেলেছে। মনে প্রশ্ন একটাই! কখন নিজের চোখদুটোতে একটু উষ্ণতা পাবে! তৃষ্ণায় চোখদুটো জ্বালাময় করছে। এই তৃষ্ণা কিন্তু পানির তৃষ্ণা না! অন্যকিছুর তৃষ্ণা! স্বাভাবিক তেষ্টায় মানুষের ঘিলু শুকিয়ে যায়! কিন্তু চোখের তেষ্টায় হৃদয়ের অলিন্দসমূহ খরা হয়ে যায়!

ছাদের রেলিংয়ে হাত রেখে আকাশ দেখছে মম। চোখদুটো আজ আকাশের মতো বিষন্ন। আকাশ যখন বিষন্ন হয়ে থাকে তখন ‘বৃষ্টি’ হিসেবে পৃথিবীতে জলকণা ছাড়ে। মানুষের বেলায়ও তাই। বৈরি আবহাওয়ার দারুন প্রবলে বাতাস ছুটছে জোরে জোরে। মুখের উপর ঝাপটানি খাচ্ছে খোলামেলা চুলগুলো। মুগ্ধ ওকে কাছে ভিড়তে দেয়না। দূরদূর করে তাড়িয়ে দেয় সবসময়। আজ এক সপ্তাহ হতে চলল মুগ্ধ বিছানায়। একটাবারো খোঁজখবর নিতে দেয়নি, নিজেকে দেখতে দেয়নি, কারনটা জানতে দেয়নি। কেন মুগ্ধ হঠাৎ পরিবর্তন হলো? এভাবে কারোর পরিবর্তন মেনে নেওয়া যায়না! ভালোবাসার মানুষের পরিবর্তন তো আরো আগেনা! তখন ইচ্ছে করে নিজের গলায় দড়ি দিতে! মরে যেতে! মম হাতের উল্টোপিঠে চোখ মুছলো। ভিজে যাচ্ছে চোখদুটো। আকাশের পানে তাকিয়ে অশ্রুপূর্ণ চোখদুটো দিয়ে নিশব্দ বার্তা পাঠালো..


— মুগ্ধ তোর কল পিক করেনি, না?
— না।
— ওর কি হয়েছে জিজ্ঞেস করেছিস?
— না।
— ও কি সুস্থ? তুই নিজের চোখে দেখেছিস?
— জানি না।
অর্পিতা ‘মম’ নামক মেয়েটার জেরা করা কিছুক্ষন অফ রাখলো। অর্পিতার মনে হচ্ছে ও একটা রোবটের সাথে কথা বলছে! ‘ইয়েস’ ‘নো’ ছাড়া ব্যতিক্রম আন্সার ফিচারে যেনো নেই। বাইরে মুখলধারে বৃষ্টি। অর্পি দেখল মম কোলে বালিশ রেখে জানালার গ্লাসে বৃষ্টির ছাট দেখছে। অর্পি গুটিশুটি হয়ে মমর কোল থেকে বালিশ সরিয়ে কিছুটা কাছে আসলো। মমর থুতনিটা ধরে ওর দিকে ঘুরিয়ে চোখে চোখ রেখে বললো,
— মুগ্ধ ভাই তোর সাথে দেখা করছেনা দেখে তোর কি হাল হয়েছে আয়নায় দেখছিস? আঙ্কেল আন্টি পযর্ন্ত এখন ডাউট করছে তোর উপর। তুই জানিস তোর রুমে আসার আগে আন্টি আমাকে কি আস্ক করেছে? আস্ক করেছে তুই প্রেমটেম করিস নাকি, ছ্যাকা খেয়েছিস ইত্যাদি ইত্যাদি জিজ্ঞেস করছিলো। তুই বুঝ! তুই কেমন সিচুয়েশন ক্রিয়েট করছিস! আঙ্কেল আন্টি পযর্ন্ত তোর ফেস দেখে কারেক্ট গেস করে ফেলছে! এভাবে আর কতদিন চলবে? কিছুদিন পর এক্সাম! এক্সামে ভালো না করলে ড্রপ যাবে এক ইয়ার। প্লিজ নিজেকে ঠিক কর। এভাবে কোনোকিছুর সমাধান হয়না। মুগ্ধ নিজেই যেহেতু তোকে আর লাইফে চায়না। তুই কেন নিজেকে সস্তা বানাবি? তুই কি সস্তা? স্টিল কানে আসছে তন্ময় তোকে লাভ করে। পারলে তন্ময়কে মাফ করে ওর সাথে রিলেশনে যা। মুগ্ধকে জেলাস করা। তারপরও মুগ্ধ যদি ভুল বুঝতে না পারে সেটা অন্য হিসাব! মুগ্ধকে ভুলার জন্য তন্ময়কে ট্রায় কর!

মম ঝামটা দিয়ে অর্পির কাছ থেকে হাতটা সরিয়ে নিলো। চোখ শক্ত করে তাকিয়ে বললো,
— তন্ময়ের সাথে রিলেশনে যাওয়ার চাইতে আমি বিষ খাইতেও রাজি! আমি তন্ময়কে জীবনেও মাফ করবোনা!
— তুই কিন্তু ঘুরেফিরে একইদিকে যাচ্ছিস মম! তুই বারবার মুগ্ধের ফ্যাক্ট লাইফের সাথে জড়িয়ে নিজেকে কষ্ট দিচ্ছিস! তন্ময় মুগ্ধকে ওর বেয়াদবির জন্যেই মেরেছিলো! মুগ্ধ তন্ময়দের সাথে লিমিটলেস রুড বিসেভ করেছে। এমনেই ছেলেদের রক্ত গরম! সো মারামারিতে একদল জিতবে আরেকদল বাচবে এটাই নিয়ম!
— পুরো সত্য না জেনে তন্ময়দের সভ্য বলা উচিত না অর্পি! আধা সত্য মিথ্যার চাইতেও ভয়ংকর !
— পুরো ক্যাম্পাস কি মিথ্যা বলবে, বল?
— জানিনা! আমি জানতেও চাইনা! আমি জাস্ট জানতে চাই মুগ্ধ কেন আমায় ওর লাইফ থেকে হুট করে তাড়িয়ে দিলো! কেনো ডিভোর্স পেপার সাইন করে নিজের রাস্তা রফাদফা করলো! আমি জাস্ট কারনটা জানতে চাই! পারবি হেল্প করতে? পারলে বলিস! নাহলে তোর কথার ঝুলি নিয়ে আজকের মতো যেতে পারিস!

অর্পি কিছুক্ষন ভেবেচিন্তে বললো,
— তুই কি সত্যিই চাচ্ছিস মুগ্ধের বদলে যাওয়ার কারন জানতে?
— হ্যাঁ চাচ্ছি।
— আমি হেল্প করবো! বাট তুই প্রমিস কর এরপর থেকে তুই ওর দিকে ফিরেও তাকাবিনা! মন ও মনোযোগ সবটা এক্সামের দিকে দিবি! প্রমিস কর!
— আই প্রমিস! বাট আই রিয়েলি ওয়ান্ট টু নো হোয়াট হেজ হেপেন্ড টু মুগ্ধ!

রাত আটটার দিকে মম ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে পা মেলে টিভির রিমোট হাতে ফিল্ম দেখছিলো। চুলায় ভাত বসিয়ে রুমে গেল মা। ওয়ারড্রবের উপর থেকে একটা পেটমোটা খাম এনে মমর সামনে টি-টেবিলে রাখলো। মমর সেদিকে বিন্দুমাত্র দৃষ্টিপাত নেই। মা মমকে উদ্দেশ্য করে বললো,
— খামটা খুলে দেখ তো। কিছু ছবি আছে। যেটা ভালো লাগবে, আলাদা করে রাখিস।
মম রিমোটটা কোলের উপর রেখে খামটা হাতে নিয়ে দেখতে লাগলো। ভেতর থেকে কিছু ছবিসহ বায়োডাটার কাগজ বেরিয়ে এসেছে। মম গম্ভীর মুখে সব কয়টা ছবি উল্টেপাল্টে দেখে ভাবলেস ভঙ্গিতে আবারো খামে ভরে রাখলো। রান্নাঘর থেকে একটা শব্দ আসলো,
— ছবি দেখছিস তুই? কোনোটা পছন্দ হইছে?
মম উত্তর দিলো না। হঠাৎ ছোট ভাই দৌড়ে এসে মমর সামনে দাড়ালো। মমর দিকে ভাইব্রেট ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বললো,
— আপু আপু!! তোমার কল আসছে!! দেখো!!
ফোনটা নিতেই স্ক্রিনে দেখল বড় করে ‘অর্পি’ লিখা। কলটা রিসিভ করে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে বললো,
— দোস্ত মুগ্ধ বাসা ছেড়ে চলে গেছে! ও বাসায় নেই!
— নেই মানে? কেমন কথা বলছিস ‘বাসায় নেই’?
— ওদের দলের সাঙ্গু রামিম ছিলো না? ওর সাথে এইমাত্র আমার রাস্তায় দেখা হইছে!ও বললো মুগ্ধ গত দুদিন আগেই বাসা ছেড়ে এব্রর্ড চলে গেছে!
— ইমপসিবল! জাস্ট ইমপসিবল! এ হতেই পারেনা!
— এটাই হয়েছে! হ্যালো? হ্যালো…তুই জবাব..
টুট টুট শব্দ শুনতে পেলো অর্পি! এই মেয়ে রাগের মাথায় অঘটন কিছু করে ফেলে কিনা কে জানে? টেনশন হচ্ছে অর্পির!

৫.
ভালোলাগা ও ভালোবাসার মধ্যে সুক্ষ্ম কিছু পার্থক্য থাকলেও দুটোর বেলায় মন খুব ছটফট ও অস্থির থাকে। সেটা ভার্চুয়ালে ভালোলাগা হোক বা রিয়েলে ভালোলাগা! দুটোর পরিনাম কিন্তু একটাই! “মন অসুখে আক্রান্ত হওয়া!” জেনি, রিমি, রামিম একাডেমিক ভবন-২’ এর দ্বিতীয় ফ্লোরে বসে আছে। সবার মধ্যে একরাশ ভয় ও মাথাভর্তি চিন্তা! কোন জরুরি তলবে মম ওদের একত্রে ডেকেছে কেউ জানেনা। সময় ঠিক মিনিট দশেক পেরুলো বৈকি, দরজা খুলার আওয়াজ ওরা সবাই শুনতে পেলো। সবাই দেখলো মম শান্তমুখে এদিকে আসছে। মম কাধের ব্যাগটা লোবেন্ঞ্চে রেখে ওদের সাথে নিজেও হাইবেন্ঞ্চে উঠে বসলো। জেনি সবার প্রথম বলে উঠলো,
— তুমি আমাদের ডেকেছো কেন?
— দরকার আছে তাই ডেকেছি। তোমাদের সকলের সাথে আমার কিছু জরুরি কথা আছে এজন্যই প্রাইভেট বৈঠকে বসা!
রিমি বৈঠকের নাম শুনেই ফট করে বললো,
— কি বিষয়ে বৈঠক? কি বলতে চাও?
— রিল্যাক্স! সব খুলে বলছি। মুগ্ধ এব্রর্ড চলে গেছে কথাটা সত্যি?
রামিম বললো,
— চলে গেছে সত্যি। বট এব্রর্ডের ব্যাপারে সিউর না। মুগ্ধ যাওয়ার আগেরদিন আমার সাথে দেখা করেছে।
জোরে নিশ্বাস ছাড়লাম আমি। মুগ্ধের যাওয়ার নিউজ আমার কান পযর্ন্ত এলোনা এমন কি হলো ওর সাথে? জেনি আমার হাতের উপর ওর হাতটা রাখলো। আমি কিছুটা অবাক চোখে ওর দিকে তাকালাম। রিমি ওর ব্যাগের চেইন খুলে পানির বোতলটা এগিয়ে বললো, ‘পানি খাও।’ আমি বোতল থেকে কয়েক ঢোক পানি খেলাম। জেনি নম্রকন্ঠে বলে উঠলো,
— জানি তুমি কেমন পরিস্থিতির মধ্যে আছো। দেখো আমি মেয়ে আমিও বুঝি। তোমাকে আগে ঘৃনা করলেও তুমি কিন্তু মোটেও খারাপ না। উল্টো আমি মনে করি তুমি খুব ভালো। আমরা তোমার সাথে খারাপ আচরন করেছি। নিজের উপর ঘেন্না হয়।
রিমি বোতলের মুখ লাগাতে লাগাতে বলে উঠলো,
— মুগ্ধের এমন স্টেপে আমারই রাগ লাগছে মম। সামনে থাকলে দুটো থাপ্পর দিতাম। তুমি প্লিজ স্ট্রং হও। ভেঙ্গে পড়াটা জাস্ট তোমার সাথে যায়না।
কিছুকালব্যাপী নিরবতা কাটতেই রামিম ব্যস্ততার সুরে বলে উঠলো,
— ভাবী? আপনি চাইলে আমি বসের লোকেশন বের করতে পারি। শুরু করবো?
আমি মুখ তুলে রামিমকে কিছু বলবো তার পূর্বেই জেনি ও রিমি একসঙ্গে বলে উঠলো,
— কর! ইডিয়েট!
— যো হুকুম মেরে আকা! আমি মুগ্ধের লোকেশন বের করতে রওনা দিচ্ছি! কেমন?

৬.
‘ঢাকা-টু-গাজীপুর’ রোডে রওনা হয়েছি আমরা! গাড়িটা রিমির। রিমির ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছে। রিমি, জেনি দুইপাশে এবং আমি মাঝখানে বসে আছি। রামিম ড্রাইভারের পাশের সিটে। জেনির অবস্থা ভালো না, বমি করতে করতে শেষ। এতোবার বমি করলে কেউ সুস্থ থাকে? আমার কাধে মাথা হেলিয়ে জেনি ঘুমিয়ে আছে। মুগ্ধ কোনো এব্রর্ডে যায়নি, ও দেশেই আছে। আজ মনটা কেমন শান্তি লাগছে বলতে পারছিনা। যারা জেনি, রিমি, রামিমদের কখনো সহ্য করতো না, ভালো বলতো না…আজ এই মানুষগুলো নিজেদের সুধরে ফেলেছে। মানুষের ভালো হতে সত্যি কোনো সময় লাগেনা। লাগে একটা সুযোগ! সুযোগের সৎব্যবহারে মানুষ হতে পারে সর্বোত্তম।
গাড়িটা গাজীপুরের কলেজরোড সড়কে থামলো। আমরা সবাই গাড়ি থেকে নেমে একটা গলি ধরে হেঁটে যাচ্ছি। সরু একটা গলি, মেটো রাস্তা, ছিমছাম নিরিবিলি, মানুষজন খুব কম। রামিম আগেভাগে এসে একটা দোতলা বাড়ির সামনে দাড়িয়ে আছে। জেনির খুব নাজুক অবস্থা, গাড়ি থেকে নামতেই দুইবার বমি করলো। রিমি ও আমি জেনিকে ধরে ধরে নিয়ে এসে বাড়িটার সামনে আসলাম। রামিম পকেট থেকে ফোনটা বের করতে বলে উঠলো,
— জেনি? তুমি কি খুব অসুস্থবোধ করছো? হসপিটালে নিয়ে যাবো?
জেনি থেমে থেমে অসুস্থ গলায় বললো,
— না রামিম। এখন হসপিটাল না। আ’ম ফাইন। তুমি প্লিজ আমার জন্য মুগ্ধের খোঁজ বন্ধ করোনা।
— ওকে।
রামিম ফোনের স্ক্রিন থেকে বাড়িটার ঠিকানা মিলিয়ে আমাদের দিকে ইশারা করলো পিছু পিছু আসতে। রামিম দরজায় কলিংবেল দিয়ে লুকিং মিররে হাত রেখে ঢেকে দিলো। জেনি খুব দূর্বল। সম্পূর্ণ ভর আমাদের দুজনের উপর ছেড়ে দিয়েছে। আরো কয়েকটা বেল দিতেই দরজাটা খুলে বেরিয়ে এলো একজন পুরুষ। তার চোখেমুখে কৌতুহল। লোকটা জিজ্ঞেস করলো,
— জ্বি? আপনারা কে?
— একচুয়েলি আমরা আমাদের এক বন্ধুকে খুজতে এখানে এসেছি। এইযে দেখুন ছবিটা..ছেলেটাকে দেখেছেন? এর নাম রাদিফ মুগ্ধ। ঠিকানা পেয়েছি ও এই বাড়িতে থাকে।
লোকটা রামিমের ফোন থেকে মুগ্ধের ছবিটা তীক্ষ্মভাবে পরোখ করলো। গলায় আশ্চর্য ভাব এনে বললো,
— এই ছেলের নাম মুগ্ধ?
— জ্বী আঙ্কেল। আপনি চেনেন? চিনলে প্লিজ বলবেন ও কোথায় আছে?
— এই ছেলে তো এখানে থাকেনা। কিন্তু হ্যাঁ তোমরা যেই নামটা বলেছো সেই নামে একজন এখানে থাকে। রাদিফ মুগ্ধ নাম।

রামিম পিছু ফিরে আমাদের দিকে হতবুদ্ধির মতো তাকিয়ে আছে। রিমি ও আমি দুজন দুজনের দিকে চাওয়াচাইয়ি করলাম। মুগ্ধ আমাদের বিরাট গুল খাইয়েছে। গাড়ির কাছে ঘুরেফিরে উপস্থিত হলাম । জেনি খুব অসুস্থ বিধায় ওকে রিমির গাড়ি করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। সাথে রিমির যাওয়ার কথা থাকলেও রিমি আমাকে একা শহরে ফেলে যাবেনা। কাজেই ড্রাইভার দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে জেনিকে। আশেপাশের সব কয়টা বাসাবাড়ি ও অলিগলিতে ঢুকে তিনজন মিলে মুগ্ধের সন্ধান করলাম। কিন্তু কোনো হদিশ মেললো না! কেউ ওকে চিনেনা, জানেনা, দেখিনি আদৌ! দুপুরের কোল গড়িয়ে রাত্রির আধারে চারপাশ আচ্ছন্ন হতেই মাগরিবের আযান শুনছি। ক্লান্ত শরীরে খিদা পেটে তিনজন গেলাম এসিওয়ালা রেস্টুরেন্টে। রামিম হোয়াইট সস পাস্তা খাচ্ছে, রিমি খাচ্ছে রামেন। আমি বসে বসে চাওমিনের কাটাচামচ ঘুরাচ্ছি। গলা দিয়ে খাবার নামছেনা একদমই। রামিম চামচভর্তি পাস্তা নিয়ে মুখে পুড়তেই বলে উঠলো,
— ভাবী? ফিরে যাবেন? মুগ্ধকে তো পাওয়া গেলো না।
রিমি রাগী সুরে চেচিয়ে বললো,
— তুই মুগ্ধকে পাসনি বলে ফিরে যাবো? এতো সহজ?
— রিমি তুমি থামবে! আমার উপর চিল্লাচ্ছো কেন? আমি কি জানতাম? মুগ্ধ আমাদের বাশঁ খাওয়াবে!
আমি দুজনকে থামিয়ে বলে উঠলাম,
— প্লিজ গাইজ অফ যাও! তর্কবিতর্ক শুরু করো না!
— ভাবী! আপনিই বলুন এখন আমরা কি করবো? রাতে নাহয় হোটেলে থাকলাম বাট? মুগ্ধ যদি এখানে নাই থাকে! আমাদের থেকে কি লাভ?
— রামিম শেষবারের মতো ওই বাড়িটা আবার চেক দিবে? আমার ইনটুশেন বলছে মুগ্ধকে ওই বাড়িতেই পাবো।

রিমি ও রামিম দুজন খাবারটুকু শেষ না করে বিল পে করে উঠে দাড়ালো। আমরা আবার ফিরে গেলাম ওই বাড়িতে। এবার একটা কৌশল করে আগে আমি কলিংবেল টিপলাম। মুখে সার্জিকাল মাস্ক পড়েছি যাতে চিনতে না পারে। লোকটা দরজা খুলে একইভাবে পরিচয় জিজ্ঞেস করলে আমি লোকটাকে ধাক্কা মেরে ভেতরে ঢুকে যাই! লোকটা তেড়ে আসতে নিলে পেছন থেকে রামিম ও রিমি লোকটার হাত ও মুখ বেধেঁ দরজা লাগিয়ে দেয়। আমি সবকয়টা রুমে ঢুকে চেক করছি। ওরা লোকটাকে ধরেবেধে সোফার রুমে বসে আছে। প্রায় সব রুম চেক হলেও কোণাচে একটা রুম দেখা এখনো বাকি। আমি সেদিকে পা বাড়িয়ে দরজা খুলে উকি দিতেই কেউ ঘুমাবস্থা কন্ঠে ‘কে? কে?’ করে উঠলো! অলৌকিকভাবে সমস্ত শরীর হিমবাহে কেপে উঠলো! বুকের মধ্যে ধুকপুকনি চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে। শ্বাস নিতে যেয়েও গলা ধেয়ে আসছে। শ্বাস নিতে পারছিনা আমি। মুখের মাস্ক খুলারও শক্তি পাচ্ছিনা। প্রচুর দূর্বল লাগছে, জেনির থেকেও দূর্বল! হাটুর নিচ থেকে পুরো শরীর অবশ হয়ে আসছে।
— হু আর ইউ! টেল মি! কে তুমি!
আমি মুখ থেকে মাস্ক খুলতেই মুগ্ধের চক্ষুতারা সজাগ হয়ে উঠলো! তোতলিয়ে বলে উঠলো,
— পাকনি..
মুগ্ধকে দেখে একদৌড়ে ওর গলা জড়িয়ে ধরলাম। ফুপিয়ে কেদেঁ চলছি অনবরত। আজো ওর গা খালি কিন্তু নির্দিধায় দুহাতে চেপে ধরেছি। মুগ্ধ বারবার হতবিহ্বল সুরে বলে উঠছে,
— পাকনি তুমি ভেতরে ঢুকলে কিভাবে? তুমি চলে যাওনি..
আমি চুলে হাত ডুবিয়ে কাধে কপাল লাগিয়ে কাদছি। ওর কোনো প্রশ্নেরই উত্তর দিচ্ছিনা। মুগ্ধ মাথায় হাত বুলিয়ে চোখবন্ধ করে বলে ঊঠলো,
— চুপ কর। চুপ চুপ…

-চলবে

ফাবিয়াহ্ মম

তুমিময় প্রেম
PART 27
FABIYAH MOMO

৭.
‘আঘাত না দিলে মন কাদেঁ না, মন না কাদঁলে ব্যাথা যায়না’ — মেয়েটা কাদঁছে কাদুক! মনটা হালকা করে কাদুকঁ! সবাই মন হালকা করার সুযোগ পায়না! সবার কান্না করার সুযোগ হয়না! আমার বুকে মাথা গুজে ফুপিয়ে কেদেঁ চলছে! আমি শান্ত হতে বললে আরো কেদেঁ উঠে। জানি কষ্টের দাগটা কতো গভীরভাবে কেটেছে! কিন্তু আমি কি করবো? আমি যে নিরুপায়! বেশ খানিকক্ষন পর কিছুটা শান্ত হলে বুক থেকে তুললাম। চোখ মুছে দিলাম। চোখদুটোতে হাত রেখে দেখি কি গরম! কাদতে কাদতে চোখ গরম করে ফেলেছে! নিজের উপর চরম রাগ লাগছে! কি করলাম ধ্যাত? শান্ত হলেও কান্না থামেনি। চোখ থেকে পানি এখনো ঝরছে। চুলে ডানহাত ডুবিয়ে চোখদুটোতে ঠোঁট ছুয়িয়ে দিলাম। কাদঁলে মেয়েদের এতো অদ্ভুত লাগে কেনো? এইযে ফোলা ফোলা চোখ, লাল লাল নাক, চকচক গাল সবকিছুতে যেনো অদ্ভুত মায়া জড়িয়ে আছে! কপালে চুলগুলো ঘেমে লেপ্টে গেছে ওর। চুলগুলো কপাল থেকে সরিয়ে পেছনে ঠেলে দিলাম। ফ্যান অফ ছিলো, ছেড়ে দিলাম। গালে, কপালে, থুতনি ঠোঁট ছুয়িয়ে দিলাম। ও গুটিশুটি হয়ে বাচ্চার মতো করে আমার বুকে মুখ গুজালো। ওর কপালে ঠোট বসিয়ে দিতেই হাতের বাধন শক্ত করে ধরলো। কিছুদিন আগে আমার সামান্য টিশার্ট ছাড়া গা দেখতে পারতো না, লজ্জায় রক্তগোলাপ হয়ে যেতো সেই মেয়েটা আমার বুকে! ভাবতেই বড্ড অদ্ভুত লাগে! মাথায় হাত বুলিয়ে বলে উঠলাম,
— এই মেয়ে আমার ইজ্জত হরন করে ফেলছো তো! ছেলেদেরও লজ্জা হয়! শরম লাগে! উঠো!
আরো ঘন করে ধরলো। মানে আমাকে আচ্ছা করে ধরেছে কোনোমতেই ছাড়বে না। আমি আবারো সুর টেনে বললাম,
— উফফ! ছাড়ো তো! মেয়েদের খালি গা দেখাতে নেই! সমস্যা!
শিট! কেদেঁ দিছে! এতোক্ষন চুপ ছিলো এখন ফুপিয়ে কাদঁছে। আমি ব্যস্ত হয়ে বললাম,
— আরে কেদোনা। আমি মজা করছি। প্লিজ চুপ। চুপ কর। কান্না করো না প্লিজ।
আমি মাথাটা চেপে ধরলাম বুকের সাথে। আমার ভেতরের দহনক্রিয়া কিছুটা শান্ত হোক, আমাকে কিছুটা মুক্তি দিক! আর পারছিনা! চাপা কষ্টের আড়ালে আমি ধুকেধুকে মরছি! প্রচুর যন্ত্রণায় ভুগেছি কেউ পাশে ছিলোনা! কেউ না! দেয়ালে পিঠ লাগিয়ে চোখ বন্ধ করে আছি। খানিকটা পর জিজ্ঞেস করলাম,
— আমার ঠিকানা কোথায় পেলে? তাছাড়া তুমি ভেতরে কিভাবে আসলে পাকনি? নিমেষদা কে পাওনি? নিমেষদা কোথায়?
বুকে তপ্ত শ্বাস ছেড়ে চাপা গলায় উত্তর দিলো,
— আপনার ঠিকানা আপনার বন্ধু রামিম জোগাড় করে দিয়েছে। আমি নিমেষ নামে কাউকে চিনিনা। আসার সময় একজন পুরুষ রাস্তা আটকে দিয়েছিলো তাকে ওভারটেক করে এসেছি।
— ওহ্ মাই গড! নিমেষদাকে তো তুমি কিছু করেছো?
— কিছু করিনি।
— শরীরের কি হাল করেছো? হাড্ডি গুনা যাচ্ছে! কতদিন ধরে খাওয়াদাওয়ার সাথে সম্পর্ক নেই? কি হলো জবাব দিচ্ছোনা কেন? দাও?
কোনো উত্তর নেই। শরীরের সাদা কঙ্কালটা বের হওয়া বাকি শুধু! বুকে যে একটা জ্যান্ত মানুষ চেপে ধরেছি তা মনেই হচ্ছেনা! মনেহচ্ছে বুকে একটা আস্তো কঙ্কাল ধরে আছি! কড়া গলায় বললাম,
— থাপ্পর চিনো? গুণেগুণে দশটা করে টোটাল বিশটা থাপ্পর গালে বসানো দরকার! আমি হৃদয়বান মানুষ! ছেড়ে দিচ্ছি!
এদিক-ওদিক হাতড়ে মোবাইলটা কাছে পেলাম। কিপেডে ডায়াল করে কল দিলাম একটা!
— হ্যালো, মজিদ আঙ্কেল? আপনাদের হোটেল বয়কে দিয়ে কিছু খাবার পাঠিয়ে দিন। না না, তেমন কেউ না। ওইতো রিলেটিভ। আচ্ছা, আচ্ছা ঠিকআছে তাহলে রাখি।
ফোন কাটতেই চেচিয়ে বললাম,
— সত্যি বলো কার সাথে এসেছো? যদি শুনি একা..
আমাকে থামিয়ে ও বলে উঠলো,
— রামিম, রিমি, জেনি আছে। আমি একা আসিনি।
স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়লাম। এটলিস্ট একা আসেনি। পাকনি অভিমানভরা কন্ঠে বললো,
— আপনি আমাকে একা ফেলে এসেছেন কেনো? কোন প্রয়োজনে এখানে এসে লুকিয়ে আছেন? আমাকে ভোগ করতে পারেননি বলে মূল্য শেষ?
— থাপ্পর দিবো বাজে কথা বললে! ওরা কোথায়? বাইরে?

উত্তর দিলোনা। মুগ্ধ ওদের নাম ধরে ডাকতেই উপস্থিত হলো দুজন। রিমি ও রামিম ধীর কদমে মুগ্ধের বেডে এসে বসেছে। মুগ্ধ গায়ের পাতলা কাথা দিয়ে গা ঢেকে মমকে চুপ করে পাশে বসতে বলল। সর্বপ্রথম রিমি জিজ্ঞেস করলো,
— তুমি নিজেকে কি ভাবো মুগ্ধ? কাউকে না বলে, না জানিয়ে এভাবে হুট করে চলে আসবা ? প্লিজ! জবাবটা দিও।
রামিম মুগ্ধের গম্ভীর মুখখানার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ দুটোতে কেমন কাঠিন্যভাব! রামিম ডানেবামে না ভেবে বলে উঠলো,
— বস জবাবটা দিও! তোমার পাশে যে বসে আছে অন্তত তার দোহাই!
মুগ্ধ ঘাড় বাকিয়ে মমর দিকে তাকালো। মেয়েটা মাঝেমাঝে কেপে উঠছে। মুগ্ধ রামিমের দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,
— দোহাইটা ভালো দিছিস রামিম! মাথায় তাহলে বুদ্ধি হচ্ছে!একটা কাজ তুই ঠিক করিসনি ব্যাটা! আমার বউকে দেখেশুনে রাখবি, চলাফেরা, খাওয়াদাওয়া সব দেখবি! তুই তা না করে এক সপ্তাহের মধ্যে একটা কঙ্কাল এনে হাজির করেছিস! কি করা উচিত তোকে? শাস্তি দিবো?
রামিম মলিন হেসে বলে উঠলো,
— হসপিটালে ছিলাম বস। ভাবীকে দেখে রাখবো!সেই সুযোগ ভাবী নিজেই দেয়নি। ক্যাম্পাসেই আসতো না উনি। বাসায় যেয়ে খোঁজ নিতে গেলেও বকাবকি করে তাড়িয়ে দিতো। কেসটা আউট অফ ছিলো বস!
পাশ থেকে একটা সুর মুগ্ধকে উদ্দেশ্য করে বললো,
— কিসের বউ? আমি কারো বউ না! যেই বান্দা আমাকে ফেলে এখানে এসে শান্তিপূর্ণ দিন যাপন করছে! এটলিস্ট তার লাইফের কোনো তুচ্ছ বস্তুও না!
মুগ্ধ ঝাঝালো গলায় বললো,
— থাপ্পর মারতে ইচ্ছে করেনা, এগুলা শুনলে? কেমন ভাষা! এই তুমি বস্তু? তোমাকে আমি বস্তু ভেবে কান্না থামাইছি? কি ভাবো তুমি নিজেকে? যত্তসব ফালতু কথা শিখে নিছে! খবরদার অশ্রাব্য ওয়ার্ড আর বলবা না!
রামিমের দিকে তাকিয়ে, ‘রামিম? তুই ব্যাটা অজুহাত কম দিস! তোর হাতভাঙ্গা পা ভাঙ্গার খবর বলে আমার সাথে ফাজলামো করিস না! মানুষ ইচ্ছা করলে এভারেস্টে পৌঁছে যায়! তুই গাধা একটা মেয়েমানুষকে দেখে রাখতে পারিসনা! তোর জীবনে হবেটা কি!
‘চোরের উপর বাটপারি’ — কথাটা মুগ্ধের উপর পুরোপুরি খাটে! নিজেই সবাইকে না জানিয়ে গাজীপুর লুকিয়ে থাকে। কিন্তু নিজের দোষের সাফাই বাদ দিয়ে বন্ধুদের দোষের হিসাব টুকছে!
রাত এখন সোয়া এগারোটার ঘরে। সবাই রাতের খাবারটা খেয়ে ক্লান্ত শরীরে কেয়ারটেকার নিমেষের দেখানো রুমে শুয়ে পড়েছে। নিমেষ নিজেও কয়েকঘন্টা জিম্মিদশা কাটিয়ে মাত্র বিছানায় এলিয়ে শুয়েছে। মম মুগ্ধের পাশের রুমটায় শুয়ে আছে। চোখে একফোঁটা ঘুম নেই। ঘূর্ণায়মান ফ্যানের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবছে। ওর মনে মুগ্ধের ব্যবহারগুলো নিয়ে প্রচুর খটকা লাগছে। মুগ্ধ যদি সুস্থ থাকে তাহলে কেনো সব ছেড়ে এখানে এসেছে? মুগ্ধের জীবনে কি অন্য কোনো মেয়ের আগমন ঘটেছে নাকি ব্যাপারটা আসলে অন্যকিছু? কি কারন হতে পারে মুগ্ধের এমন রহস্যময় পদক্ষেপে পেছনে? আচ্ছা মুগ্ধ কি ইন্টার্নাল ভাবে সিক? মনে তো হয়না। এক মিনিট! মুগ্ধ যেটাই করুক সবসময় বসে বসে অর্ডার দেয়! ব্যাপারটা অদ্ভুত না? একবারো কি দুপায়ে দাড়াবে না? ঝট করে বিছানা থেকে নামলো মম। মাথায় এখন মুগ্ধের পা নিয়ে প্রশ্ন জেগেছে! ইশ..বিষয়টা একবারো চোখে পড়লো না? ও কি …? ছিহ্! না! কিছুই হয়নি শিউর! ও ঠিক আছে! ওর কিচ্ছু হয়নি, ঠিক আছে!

মুগ্ধের রুমে ঢুকে মম রীতিমতো একটা শক খেলো! দরজায় খাম্বার মতো দাড়িয়ে পড়লো দেখে! মুগ্ধ এখনো জেগে আছে এবং বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে আছে। কোলের উপর ট্যাবলেট। অন্ধকার রুমে ট্যাবলেট পিসির আলোতে মুগ্ধের মুখটুকু কেবল আলোকিত হয়ে আছে। মম দুঠোট চেপে ধীরেধীরে ভেতরে ঢুকে দরজা লাগাতে নিলে পেছন থেকে কেউ বলে উঠলো,
— ‘শ্বশুড় মশাইকে কি বলে এতোদূর এসেছো? টেনশন করছে না?’
মম চমকে উঠে দরজা লাগিয়ে পেছন ঘুরে তাকায়। লজ্জায় কুকড়ে যাচ্ছে, ধুর!মুগ্ধ টের পেয়ে গেলো ইশশ!মম রুমের লাইট জ্বালাতে সুইচবোর্ডে হাত দিলে মুগ্ধ বলে উঠে,
— লাইট অফ! জ্বালাবা না! রুম অন্ধকার থাকুক! চুপচাপ এসে বসো!
গুটিগুটি পায়ে পাশে যেয়ে বসলো। মুগ্ধ ওর দিকে না তাকিয়ে বললো,
— কিছু জিজ্ঞেস করেছিলাম।
— আব্বু জানে আমি রিমির সাথে হোস্টেলে আছি।
— রিমি কে চিনে? না চিনলে কিন্তু সমস্যা! পরে হোস্টেলে খোঁজ করতে গিয়ে দেখবে তুমি নেই।বিরাট ঝামেলায় ফাসবে!
— ফাসলে ফাসবো! আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দিন! কেন হুট…
— আমি কেন এসেছি জানতে চাও,তাইতো? তাহলে শুনো,
মুগ্ধ ট্যাবটা পাশে রেখে কথা বলার জন্য উদ্যত হলো। শুরু করলো তার অব্যক্ত কথা,
— ‘তন্ময়, নাসিফ এবং আহাদ’ আমি ওদের কলিজার বন্ধু বলতাম। আমার সবকিছুতে ওরা থাকতো, ভালোবাসতাম ওদের। কিন্তু কখনো মুখ ফূটে বলিনি, ‘বন্ধু তোদের খুব ভালোবাসি! তোরা আমার সব!’ কখনো বলিনি। আমি চুপ থাকতাম। বন্ধুত্ব তো এমনই তাইনা পাকনি? কিছু বলা লাগেনা, বুঝাতে হয়না ওরা কেমন করে যেনো চট করে সব ধরে ফেলে। ওরা আমাকে হাসিখুশি হলরুমে নিয়ে গেলো। আমি রামিমের ব্যাপারটা আলোচনা করে জিজ্ঞেস করলাম। ওরা অস্বীকার করে বললো তুমি যা যা বলেছো সব মিথ্যে। আমি একমূহূর্তের জন্যে ওদের হ্যাঁতে হ্যাঁ বললাম। তন্ময় শান্ত হয়ে আমার কাছে আবদার করলো। তোমাকে ডিভোর্স দিয়ে ওদের হাতে তোমায় তুলে দিতে। তুমি বেশরম, বেলাজা ব্লা ব্লা গালিগালাজ করে তোমার ইনসাল্ট করলো! বিশ্বাস করো ওই মূহুর্তে আমার ইচ্ছা করছিলো জিহবা কেটে সবকয়টার গলায় ছুড়ি চালিয়ে দেই! নিজেকে কন্ট্রোল করলাম। ওদের ভালোভাবে বুঝালাম কাজ হলোনা। হকিস্টিক তুলে পেটাতে লাগলো। হয়তো সেদিন মরে যেতাম..রূহ কবজের উছিলায় না, ওদের ধোকাবাজির কর্মে মরে যেতাম।

মুগ্ধ মাথাটা উপরে তুলে জোরে নিশ্বাস ছাড়লো। ভেতরের দুঃখগুলোকে ঝেড়ে ফেলার ব্যর্থ চেষ্টা করলো। আমার পাচ্ছিলো ওর কথা শুনে। একটা মানুষ পদে পদে ধোকার সম্মুখীন হয়ে স্বাভাবিক থাকে কিভাবে? মুগ্ধ মাথা নামিয়ে বলা শুরু করলো,
— আমি তোমাকে ভালোবাসি। ঠিক কেমন ভালোবাসি ব্যখ্যা জানা নেই। আমি নিজেকে সবচেয়ে দুঃখী এবং একা মানুষ ভাবতাম, কিন্তু তোমার পাশে যখন থাকতাম আমার উপর কিসের ইফেক্ট পড়তো জানিনা, আমি রাতে ঘুমাতে গেলেও তোমার আজগুবি কথা মনে করে হাসতাম। প্রচুর হাসতাম। শাওয়ার ছেড়ে ঘন্টার পর ঘন্টা নিরবে তোমার কথা ভাবতাম। একটা সত্যি কথা বলি? ফাইজাকে পড়ানো একটা উছিলা ছিলো। উল্টো আমি ওইসব মেয়ে টিউটরকে বকাঝকা করে বিদায় করতাম। ফাইজাকে পড়াতে আর আমি চুপিচুপি দেখতাম। ততোদিনে আমি বুঝে গেছি আমার মন পিন্জরা অন্য কারোর জন্য বাসা বুনে ফেলেছে। উদাস হয়ে ক্লাস বাঙ্ক মেরে তোমাকে দূর থেকে ফলো করতাম। তুমি কখনো খুজে পেতে না। তোমায় জোর করে হুমকি দিয়ে বিয়ে করলাম। তুমি আমার মনটা বুঝলে না, উল্টো অযৌক্তিক শর্ত জুড়ে দূরে ঠেলে দিলে। চুপচাপ সব মেনে নিচ্ছিলাম কিন্তু কোথাও যেনো ক্ষতটা বড় হচ্ছিলো। জ্বলতো, পুড়তো, কষ্ট দিতো। সমাজের কাছে তোমাকে পরিচয় দিলাম না তুমি আমার বউ বা তোমায় আমি বিয়ে করেছি! সব আমি চুপচাপ সহ্য করলাম। কিন্তু আমার কি কারনে কষ্ট হয়েছে জানো? যখন আমি তোমার জন্য তোমার পরিবারের কাছে হালালটা চাইলাম! আমি তোমাকে তিন কবুল বলেই বিয়ে করেছি! জাস্ট ওই সময় তোমার ফ্যামিলির কেউ ছিলো না বলে ব্যাপারটা সুন্দর ও গোছালো করার জন্য একটা স্টেপ নেই। ভাবি তোমার আব্বুকে জানিয়ে আবার আমরা বিয়ে করবো। ঘরোয়াভাবেই সিধাসাদায় বিয়ে করবো! তুমি চাইলে তখন তোমাকে পড়াশোনা শেষ করার আগ পযর্ন্ত পরিবারের সাথে থাকতে দিতাম। আমার আপত্তি থাকতো না! তবুও বুকভরা অধিকার খাটিয়ে বলতে পারতাম তুমি আমার বউ! সেদিন তোমার বাসায় গেলাম। তুমি ছিলেনা, অসুস্থ মামীকে তোমার আম্মুর দেখতে ঢাকায় গিয়েছিলে। বাসায় কেবল তোমার বাবা ছিলো। আমি আমার অসুস্থ মারখাওয়া ব্যান্ডেজে মোরা শরীরটা নিয়েই তোমার আব্বুর সামনে নত হয়ে সম্পূর্ণ কথা পেশ করলাম। উনি বিশ্বাস করলেন না। বিয়ের রেজিস্ট্রি পেপার দেখালাম উনি রেগে গেলেন। আমি উনাকে বুঝিয়ে বললাম, আঙ্কেল আমার তো কেউ নেই। আমি আপনার মেয়েকে ভালোবাসি। আপনি পাগলামি ভাবেন বা অন্যকিছু আমি বিয়েটা করে ফেলেছি। তোমার আব্বু শর্ত দিলেন। শর্তটা কি জানো? আচ্ছা পাকনি আমার একটা প্রশ্নের জবাব দাও, ধরো তোমার আব্বুআম্মু কেউ নেই। তোমার ভাইটা বেশ ছোট। তোমার জন্য বিয়ের ঘর আসলো, তারা রাজিও হলো এবং বললো, তুমি বিয়ের পর ছোটভাইকে সাথে রাখতে পারবে না। তুমি কি এতিমখানায় ফেলে রাখবে? দূরে পাঠিয়ে দিবে?
আমি ভ্রুকুচকে আৎকে উঠলাম! ঝাঝ মাখানো গলায় বললাম, ‘অসম্ভব! দরকার পরলে আমি বিয়েই করবো না! তবুও ভাইকে কোত্থাও পাঠাবো না!’
— এ্যাকজেক্টলি মাই পয়েন্ট! আমিও ফাইজাকে দূর করতে পারবো না। তোমার বাবার কাছে উনার মেয়ের খুশি যদি একটা নিষ্পাপ মাসুম বাচ্চার জন্য আটকে থাকে! তাহলে আটকে থাকুক! আমি তোমাকে চাইনা! দরকার পড়লে তোমার কাছ থেকে আজীবন দূরে থাকবো তবুও ফাইজার জন্য নিজের খুশি চাইবো না! তুমি আমাকে স্বার্থপরও বলতে পারো আবার দুনিয়ার সবচেয়ে বড় বোকা! ভাইয়ের মেয়ের জন্য নিজের সবকিছু বিলিয়ে দিবে… এমন গাধা মেবি দ্বিতীয়টা জন্মায়নি।তোমাকে আমি দূর থেকেই ভালোবাসবো পাকনি। অনেক বেশি ভালোবাসবো। হয়তো তুমি রিখটার স্কেলে মাপতে তোমার জন্য কতটুকু ভালোবাসা নিজের মধ্যে রাখি। কিছু ভালোবাসা পাওয়া না হলেও কোনোদিন সেটার জায়গা পূর্ণ হবেনা। ভুলা যাবেনা। তুমি তো আমার প্রথম প্রেম! শেষ নিশ্বাসটা ফেলার আগ পযর্ন্ত তোমায় স্মরন করবো। ভুলবো না।আমার মন কখনো তোমার স্মৃতি মিটাবেনা। শূন্যময় জায়গাটার কাছে, পুরোটা জুড়ে তুমি, তুমি এবং তুমি হয়েই থাকবে! মৃত্যুর পরও যদি চাওয়ার উপায় থাকে আমি তোমাকে চাইবো! কিন্তু ফাইজার বদৌলতে আমি তোমাকে চাইনা পাকনি। তুমি আমার তুমিময় প্রেমহয়েই থাকো। এই প্রেমে শুধু দূর থেকে ভালোবাসা যায়, কাছে এসে মেবি থাকা যায় না।
মুগ্ধ চোখের পানি ছেড়ে দিয়েছে। চোখ ঝাপসা ট্যাবের স্ক্রিন ভিজে গেছে। চোখের দু’কোণা থেকে একের পর এক পানি পড়ছে তার। দাত দিয়ে নিচের ঠোটটা শক্ত করে চেপে আছে। মাথা নিচু করে আছে। হয়তো আড়ালে থাকার জন্যই রুমটা অন্ধকার রাখা হয়েছিলো। ঘুটঘুটে অন্ধকার।

আমি পাচঁ আঙ্গুলে বিছানার চাদর আকড়ে মাথা নুয়ে আছি। চোখ থেকে টপটপ করে বিছানায় পানি পড়ছে। আমার শরীরের একটা অংশ কিরূপ অকার্যকর লাগছে তা বলে বুঝাতে পারছিনা। বারবার মুগ্ধের কথাগুলো কানের পর্দায় ভনভন করছে। ‘এই প্রেমে শুধু ভালোবাসা যায়, কাছে এসে মেবি থাকা যায় না’….ভয়ঙ্কর শব্দগুলো কিভাবে উচ্চারণ করলো? কিভাবে! কতো ভয়ঙ্কর শব্দ! রাতের নিস্তব্ধ প্রহরে এই শব্দগুলো ভয়ানকের চেয়েও ভয়াবহ লাগছে। বুকে চিড়ে কান্না চলে আসছে আমার! শব্দ করেও কাদার শক্তি পাচ্ছিনা। কেমন অকেজো লাগছে স্নায়ুবিক ভরে। মানুষ কতোটা সাহসী হলে ভালোবাসা ভুলানোর মতো ভয়াবহ পদক্ষেপ নিতে পারে! জানা নেই, জানা নেই…

-চলবে

তুমিময় প্রেম
PART 29
FABIYAH MOMO

১২.
কোনো ছেলের কান্নার দৃশ্য কতটা ভয়ঙ্কর!কতটা হৃদয় কাপানো হুল্কার মতো! কতটা ধ্বংসাত্মক অবস্থার মতো! পরিস্থিতিতে পরলে কঠিন কঠিন অক্ষরে টের পাবেন। মুগ্ধ আমাকে জড়িয়ে ধরেই কেদেঁ দিয়েছেন। টুপটুপ করে গাল বেয়ে পড়া পানি আমার কাধের অংশে ভিজিয়ে দিচ্ছেন। আমি উনাকে থামাবো? উল্টো আমার অবস্থা নাজেহাল। আমি নিজেকে সামলাতে পারছিনা আর। আমি জানিনা, ছেলেদের কান্না থামানোর মতো যন্ত্র বা পন্থা আছে নাকি, জানিনা তাদের ভেতরটা কতখানি পুড়তে থাকলে কাদতে পারে। ছেলেরা কখনো কাঁদেনা বলে, ওদের উপর যুগের পর যুগ যেই জুলুম করা হচ্ছে! জানা নেই কারো! ওরাও মানুষ, ব্যথা হয়, কষ্ট হয়, অসহিষ্ণু মাত্রায় সব ভেতরে আড়াল করে…কাউকে কিচ্ছু বুঝতে দেয়না। নিজের নাড়ী ছেড়া টান মাকেও না।
— মুগ্ধ সাহেব? কান্না থামান না..আমার যে কষ্টদায়ক যন্ত্রণা হচ্ছে! বুঝেন না কেন? প্লিজ শান্ত হন..
— শেষ একটা প্রমিস করি, আমি..আমি আর কোনোদিন বিয়ে করবো না। বিয়ে নামক উপকণ্ঠায় কখনো নিজেকে ধাবিত করবো না। তুমি প্রথম! তুমি শেষ!

ছেড়ে দিলেন। মুগ্ধ নাক টেনে হাতের উল্টোপিঠে চোখ মুছলেন। আমার দিকে জোরে নিশ্বাস ছেড়ে বললেন,
— আমি ঠিক আছি। কিচ্ছু হয়নি, তুমি ঘুমাও। আমি যাই কেমন? কাল সকালে রেডি থেকো। ঘুমাও,
নিজেকে স্বাভাবিক করে এমনভাবে কথাগুলো বললো যেনো কিছুই হয়নি। দ্রুত চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালে আমি হাত ধরে আটকে ফেলি। মুগ্ধ আমার দিকে ড্যাবড্যাবে তাকিয়ে আছেন। কি মায়াবী চোখদুটোতে গভীর কষ্ট লুকিয়ে আছে! এ যেনো কষ্টের গহীন মহল। কেন কষ্ট লুকাচ্ছেন মুগ্ধ? নিজেকে হালকা করুন! ভেতরের জমা কালোঘনীভূত কষ্টগুলো উপড়ে ফেলুন! গালদুটোতে হাত রেখে আমি উনার দিকে ঘন হয়ে আসি। মুগ্ধ এখনো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন। উনার ঠোঁটের দিকে এগিয়ে যেতেই আচমকা উনি আমার ঠোটে হাত রেখে থামিয়ে দিলেন। আমি কিছুটা আশ্চর্য নয়নে ভ্রু কুচকালে উনি দুইপাশে মাথা নাড়ান। অর্থ মানা করছেন।
— আমি জানি আমার উপর তোমার অধিকার আছে। সেটা আজীবন থাকবে। কিন্তু প্লিজ আমি কন্ট্রোল করতে পারবো না মমপাকনি। এই কন্ট্রোলটা হারিয়ে ফেললে বিরাট কিছু ঘটিয়ে ফেলবো! আমি চাইনা তোমার কোনো কষ্ট হোক! তোমার এই মিষ্টিছোঁয়াটা তোলা থাকুক। নাহ্ আর পারছিনা! আমাকে যেতে হবে! আমি থাকতে পারছিনা। কন্ট্রোল হারাচ্ছি!!
মুগ্ধ দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। যাওয়ার পথে দরজার সাথে ব্যথাও পেলেন। একটা উফ শব্দ করলেন না উনি। সোজা পাশের রুমে গিয়ে শব্দ করে দরজা লাগালেন। আকাশের দিকে তাকাতেই আমার চাপা কষ্টগুলো হু হু করে কান্নাযোগে বেরিয়ে আসলো। হাটুতে মাথা লাগিয়ে ফুপিয়ে কাদঁছি। বুকের ভেতরটা ফাপা শূন্যতার মতো খা খা করছে। কিচ্ছু নেই, ছোট্ট বুকের সিন্দুকটাতে কিচ্ছু নেই। যার বিচরণ চাচ্ছি, তার পদচারন নেই। ভালোবাসি তাকে!অথচ সময়টা আর আগের মতো নেই! কি অদ্ভুত মানুষের জীবনকোঠা!

১৩.
রাতের আকাশ ফেটে ভোরের সূর্য উঠছে। সোনালী বর্ণের অসীম আলো নিয়ে পূবের দিকে প্রহর টানছে। একটু আগে মুখহাত ধুয়ে আবার বিছানায় শুয়েছি। রাতটা ভয়ঙ্কর ভাবে নির্ঘুমে কাটিয়েছি। দুচোখের পাতা একটা সেকেন্ডের জন্য লাগাতে পারিনি মন ও মস্তিষ্ক শুধু অস্থির অবস্থায় ভুগছে। সকালের সূর্যোদয় বেঁচে থাকার আশা নিয়ে উদয় হয়, কিন্তু আমার জীবনে ভাগ্যরেখা আদৌ সদয় নয়। ‘মুগ্ধকে হারাতে যাচ্ছি’ – পুরোটা রাত এই একটি কথাই মানলো। দরজায় দু তিনটা কড়া পড়লো। আমি উঠে চোখে ওড়না চোপে দরজা খুললাম। মুগ্ধ একগাল মিস্টি হাসি উপহার দিয়ে বললেন,
— কি ব্যাপার? নক না করতেই দরজা খুলে সাবাড়? দরজায় দাড়িয়ে ছিলে নাকি?
আমি না সূচকে মাথা নাড়লাম।
— চোখে ওড়না ঘষছো কেন? তুমি কি….প্লিজ ডোন্ট স্যা! তুমি এখনো কাদছো!
— চোখ চুলকাচ্ছে।
— সত্যি? আচ্ছা খাবে চলো। সাতটায় ট্রেন। তোমাকে ড্রাইভার ট্রেনে তুলে দিবে। বাকিটা রামিমকে বুঝিয়ে দিয়েছি। তোমার সমস্যা হবেনা। হাত ধরো, আসো।
— ট্রেনে যাবো না।
কথাটুকু বলে আমি মুগ্ধের এগিয়ে দেওয়া হাতটা ধরে ডাইনিং টেবিলে বসলাম। রুটি, সবজি, দুধ, কলা, আপেল, মালটা সব টেবিলে গুছিয়ে সাজানো। মুগ্ধ ব্যস্ত হয়ে আমার প্লেটে তিনটা রুটি তুলে দিলেন, সাথে দিলেন সবজি। একটা চকচকে কাঁচের গ্লাসে দুধ ঢেলে আপেল, মালটার পিরিচটা এগিয়ে দিলেন। পানির লম্বা গ্লাসটা পাশে রেখে উনি আমার কাছাকাছি চেয়ার টেনে বসলেন।
— নাস্তাগুলো আপনি বানিয়েছেন?
— উফ তুমি খাও তো। খাওয়ার সময় কথা বললে গুনাহ হয়!
— আমি সকালে এতো নাস্তা খেতে পারিনা। বমি হয়। এখন তো জার্নি করবো, রাস্তায় আরো আগে বমি হবে। প্লিজ এগুলো রেখে দিন।
— কানের নিচে লাগাবো! খালি পেটে কিসের জার্নি? নো এক্সকিউজ! খাও!
— তুমি কি চাও আমি শারীরিকভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়ি? রাস্তাতেই বেহুঁশ হয়ে মরে থাকি? প্লিজ জোর করো না। মনের বিরুদ্ধে আর কষ্ট পোহাতে চাইনা। মাফ করো।
মুগ্ধ রুটি ছিড়ে ভাজি তুলে আমার মুখের সামনে ধরতেই বললেন,
— আমাকে ‘আপনি’ বলে ডাকলে অন্যরকম ফিল হয় পাকনি। আমাকে তুমি করে ডেকোনা। তোমার নামটা যেমন বাচ্চাদের মতো আদর করে দেওয়া, তুমিও একচিমটি আদর মিশিয়ে আপনি ডেকো। হু, এখন হা করো।
ভাজিযুক্ত রুটি মুখে নিলাম। সকাল সকাল পেটটা খুব ভরা ভরা লাগে। এইযে একটুকরো রুটি মুখে নিলাম! মন চাচ্ছে ওয়াক করে ফেলে দেই। মুগ্ধ শান্ত মনে আমাকে খাইয়ে দিচ্ছেন। মাঝেমাঝে পানির পরিবর্তে দুধের গ্লাসটাও ঠোঁটে ধরছেন। মুগ্ধের জায়গায় আম্মু থাকলে সিউর এতোক্ষনে তুলকালাম বাজিয়ে ফেলতাম। দুধ যতোই উপাদেয় পর্দাথ হোক না কেন! আমার কাছে অন্যতম জঘন্য একটা পানীয়!

১৩.
— হ্যালো ড্রাইভায সাহেব? জ্বি আঙ্কেল কতক্ষন লাগবে? ওহ্! আর দশমিনিট? আচ্ছা থ্যাংকস।
কল কেটে ফোন পকেটে ঢুকালেন মুগ্ধ। বাসা থেকে আধঘন্টা আগেই রওনা দিতে হবে আমার। স্টেশন এখান থেকে পনের বিশ মিনিটের দূরে। মুগ্ধ জানালার কাছ থেকে এসে আমার ঠিক সামনে টি-টেবিলে বসলেন। আমি সোফায় বসেছি। মুগ্ধ মাথা নিচু করে আছেন।

— আপনি একটা সুন্দর মেয়ে দেখে বিয়ে করে নিয়েন মুগ্ধ। আপনার জীবনে কাউকে দরকার। ফাইজাকে দেখাশুনার জন্য হলেও কাউকে দরকার। বিদেশের মাটিতে দেশীয় মেয়ে পাবেন না জানি, তবুও দোয়া করি আপনার লাইফে কেউ আসুক।
মুগ্ধ চট করে মাথাটা তুলে কপালে কয়েকরেখা ভাঁজ ফেললেন। আমার কথায় উনি ক্রদ্ধ হয়েছেন বোঝা যাচ্ছে।
— আমার দ্বিতীয় বিয়ে করার ইচ্ছা মোটেও নেই! দয়াকরে এমন ফালতু উপদেশ দেবেনা! আর ফাইজাকে দেখাশোনার জন্য আমিই এনাফ! আমার কোনো বিয়ের প্রয়োজন নেই! তোমার যদি বিয়ে করার আহ্লাদ থাকে! তুমি নির্দ্বিধায় করো! আমার আপত্তি নেই!
— আমার বিয়ে নিয়ে সত্যিই আপত্তি থাকবেনা?
— না। আমি উল্টো বলবো বিয়ে করো! স্বামী নিয়ে, সংসার নিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখো, এতে আর কক্ষনো আমার মতো অলুক্ষনেকে মনে পড়বেনা। আর পড়লেও লাভ হবেনা।
— নিজেকে নিকৃষ্ট হিসেবে পরিচয় দিতে লজ্জা করেনা? আপনি আমাকে আহত করছেন, জানেন? বারবার আপনি বুঝাচ্ছেন আপনি আমার পায়ের আঙ্গুলের নখের সমানও না! ছি! মুখ দিয়ে কথাগুলো আসে কিভাবে?
— আমার মতো হতভাগার কপাল আরো কলুষিত হোক!তোমাকে কষ্ট দিয়ে আমি সুখ চাইনা! আমি ভুগতে চাই! শাস্তি পেতে চাই! ধুকে ধুকে তিলেতিলে দিনেদিনে নিজেকে শেষ করতে চাই!

দরজায় বেল বাজলো। মুগ্ধ তড়িঘড়ি করে দরজা খুলতে চলে গেলেন। দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়লাম। ভার্সিটির সেই মুগ্ধ ! আর আজকের মুগ্ধর মধ্যে বিশাল তফাত! পুরোনো রাগচটা মুগ্ধটা আর নেই। হারিয়ে গেছে।

নাকের ডগা বেয়ে দুচোখের কোণা থেকে দুফোটা জল গড়ালো। মুগ্ধ নিচের ঠোট কামড়ে ভেজা চোখে দরজার নব ধরে দাড়িয়ে আছেন। চোখের পানি মুছলে আবার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে উনার। মুখ আড়াল করে কতবার শার্টের হাতায় চোখ ডলছেন, হিসাব নেই। হঠাৎ দরজার বাইরে এক পা ফেলবো ওমনেই হাতে টান অনুভব করলাম। আকষ্মিক টানশক্তির কাছে আমি চোখমুখ খিচে শক্ত কিছুতে পিঠে ব্যথা পেলাম। শ্বাস তীব্রগতিতে উপর-নিচ হচ্ছে! শরীরের উপর ভারী কিছুর অনুভব হচ্ছে! কিন্তু সেটা কি? হাত এদিক ওদিক নাড়াচ্ছি। আমার পেছনে কাঠের দরজা। হাত আরেকটু নাড়িয়ে বুঝতে পারি মুগ্ধ আমার উপর ভর ছেড়ে দিয়ে দরজার সাথে চেপে ধরেছেন। আমার গালের উপর কোথা থেকে যেন টুপটুপ করে পানি পড়ছে। আমার চোখ শুস্ক! পানি আসছে কোত্থেকে? বামহাত চাপা পড়ে আছে বিধায় ডানহাত উঠিয়ে মুগ্ধের মুখটা বুঝার প্রয়াস করছি। মুগ্ধের বাহু ছুয়ে ছুয়ে গলা পযর্ন্ত উঠিয়ে গালের উপর আঙ্গুল পৌছাতেই বুঝতে পারি মুগ্ধের চোখ থেকে পানি পড়ছে। বুকটা ধক করে উঠলো আমার! মুগ্ধ আমার হাত সরিয়ে দরজায় আরো চেপে ধরলেন! কিছু বুঝে উঠার আগেই উনি ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিলেন হুট করে। ভেতরের সব ঝাঝঁ উনি ঠোটেঁর উপর ঢেলে দিচ্ছেন জোরপূর্বক! কিছুক্ষণ পর উনি ছেড়ে দিয়ে নাক টানতেই ঠোঁট মুছলেন। দরজা খুলে আমাকে এক ধাক্কা মেরে বাইরে বের করে দরজা ধাম করে লাগিয়ে দিলেন। আমি হিতাহিত জ্ঞানশূন্য বেকুবের মতো ঠাঁই দাড়িয়ে আছি। মুগ্ধ আমাকে ধাক্কা দিলেন? পেছন থেকে কেউ বলে উঠলেন,
— ম্যাম আপনি যাবেন না? দেরি হয়ে যাচ্ছে।

আমি কিন্ঞ্চিত চমকে উঠে পা ঘুরালাম। গাড়িতে বসতে বসতে চোখজোড়া আরেকবার বন্ধ দরজার দিকে দেখলাম। ভালো থাকবেন মুগ্ধ। ভালোবাসি! অনেক বেশি ভালোবাসি! হয়তো আপনার মতো করে ভালোবাসতে পারিনি, তবুও প্রতিটি নিশ্বাস প্রশ্বাসের সাথে আপনাকে জড়িয়ে অনুভব করি। ধীরে ধীরে বাড়িটা পেছনের দিকে যেতে লাগল। জানালায় একহাত রেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। গাড়ি সরু রাস্তা ছেড়ে মেইন রাস্তায় উঠলো। কিছুদূর যেতেই মনে হলো ড্রাইভার ফ্রন্ট মিররে বারবার তাকাচ্ছেন। কয়েকবার চোখে চোখ পড়তেই উনি বিষম খেয়ে চোখ সরিয়ে ফেলেন। ব্যাপারটা খটকা লাগছে। ড্রাইভার আমার দিকে কেনো তাকাচ্ছে? আমি বায়পাস না ভেবে বলে উঠি,
— ‘এইযে? আপনি বারবার পেছনে তাকাচ্ছেন কেন? গাড়ি সামনে তাকিয়ে চালান! আরেকবার যদি মিররে তাকাতে দেখি! ফলাফল খুব বাজে হবে বলে দিলাম!’

ড্রাইভার খুব বিব্রত ফিল করছেন আমার ধমক খেয়ে। ভ্রুকুচকে আছে আমার, ড্রাইভারের অপ্রস্তুত চাহনি দেখে। আমি বামদিকে চেপে জানালা খুলে ঘেঁষে বসলাম। হাইওয়েতে উঠতেই মনে হলো ড্রাইভারের অঙ্গীভঙ্গি বেশ একটা সুবিধার না। উনি পা নাড়াচাড়া করছেন অশ্লীল ভঙ্গিতে। সুযোগ পেলে থাই বুলাচ্ছেন অতি সাবধানে। মিররটা নজর গেলো! কি আশ্চর্য! মিরর আমার দিকে ঘুরানো কেন? একটু আগে এরকম ছিলো না! আমি সতর্ক হলাম। আড়চোখে ড্রাইভারের ক্রিয়াকলাপ দেখায় নিজেকে প্রস্তুত করলাম। উনি জ্যামের মধ্যে মাঝেসাঝে মিররে তাকান, বুকপকেটের ফোনে কিছু লুকিয়ে লুকিয়ে দেখেন। মন সাড়া দিচ্ছে, লোকটা নিশ্চয়ই খারাপ কিছু দেখছেন। আমি আরেকটু কোণায় চেপে ড্রাইভারের ফোনের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুড়তেই চোখ আমার কপালে উঠলো! এই ফালতু লোকটা ফোনের স্ক্রিনে নোংরা ভিডিও দেখছেন। মাথা নষ্ট হয়ে গেল আমার ড্রাইভারের উদ্দেশ্য বুঝে! এই মূহুর্তে কি করবো? কি করা উচিত একজেক্টলি? মুগ্ধকে কল করবো? আমার ফোন! ধ্যাত! ধ্যাত! আমার তো হাতে ফোনই নেই! হারিয়ে গেছে! গাড়ি থেকে হেল্প চাওয়া! আর নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনা একই কাজ! তার চেয়ে বরং চুপ থাকি! শেষে দেখাচ্ছি মজা!

১৪.

— তুমি মুগ্ধকে কোন অধিকারে অপমান করেছো আব্বু! চুপ থাকবেনা! খবরদার তুমি চুপ থাকবেনা!
— তুই ওই কুলাঙ্গার জন্য আমার সাথে এই আচরন করছিস!
— সাবধান আব্বু! কোনো খারাপ কথা উচ্চারন করবেনা! মুগ্ধকে বাজে কথা বলার আগে তুমি নিজের ভুলে আঙ্গুল দাও!
— একটা থাপ্পর মারবো মুখে মুখে কথা বললে! তুই ওই ছেলের জন্য আমাকে যা তা বকে যাচ্ছিস?
— হ্যাঁ বলছি! উনার মতো ছেলেকে তুমি অশ্রাব্য ভাষায় কটুক্তি করবে! লজ্জা করছে আব্বু! তোমার ব্যবহার দেখে ধিক্কার হচ্ছে!
— সত্যি করে বলতো তুই কাল কোথায় ছিলি! তুই হোস্টেল থেকে এসে ওই বজ্জাতের কথা তুলছিস কেন!
— বজ্জাত বলবেনা আব্বু! উনাকে ভুলেও বজ্জাত বলবেনা! তুমি নিষ্পাপ বাচ্চা ফাইজার জন্য মুগ্ধকে কেন তাড়িয়েছো! বলো!
— নিষ্পাপ বলিস না! তোর জামাইর অবৈধ সন্তান ওই মেয়ে! বড়ভাবির সাথে নোংরামি করে এখন ভাতিজি বলে পরিচয় দিচ্ছে! তুই ওই নোংরা ছেলের কাছ থেকে সরে আয়! আমি তোকে ভালো জায়গায় বিয়ে দিবো! সব ভুলে যা! সামনে পরীক্ষা দে! তারপর বিয়ের ব্যাপার স্যাপার দেখবো!

আমি আব্বুর কথায় ছিটকে গিয়ে সোফায় বসলাম। আব্বু এতো বড় জঘণ্য মিথ্যা কিভাবে বললেন? মুগ্ধের চরিত্র নিয়ে মিথ্যা ! আমার পিঠ পেছনে কে ছুড়িটা মারলো? কে মুগ্ধের ব্যাপারে আব্বুর নিকট কুৎসা রটালো! কে করছে মুখোশের আড়ালে এসব!

— তোমাকে কে ব্রেনওয়াশ করেছে আব্বু? কে তোমাকে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা বলেছে?
— তুই এখনো আমার কথায় বিশ্বাস করতে পারছিস না? কি জাদু করেছে ওই ছেলে! কি পট্টি পড়িয়েছে!
— সত্য বলো আব্বু! কে বলেছে! কে বলেছে এই কথাগুলো!
— তোর শুভাকাঙ্খী বলেছে। আমাকে নাম বলতে বারন করেছে।
— তোমাকে আল্লাহর কসম! নাম বলো আব্বু! নয়তো ভয়ানক কিছু করে ফেলবো! আমি ট্রেনের নিচে লাফ দিবো বলে দিচ্ছি!
— তুই আমাকে কসম দিয়ে সত্য ঢাকার চেষ্টা করবিনা! আমি ওই বেহায়া ছেলের জন্য তোর সম্পর্ক কোনোদিন মানবো না!
— তুমি নাম বলবে না তাইনা? বলবে না?

আমি রান্নাঘরের দিকে দৌড়ে গিয়ে কিছু হাতে নিয়ে ফিরলাম! আব্বু ভীতশঙ্কিত হয়ে কপাল কুচকে অবস্থা দেখছেন! আমি পেছন থেকে হাতটা বের করতেই আব্বু তেড়ে আসতে নিলেন! আমি থামিয়ে দিলাম! উনি অস্থির কন্ঠে বলে উঠলেন,
— এই এই তুই ছুড়ি নিয়েছিস কেন! ছুড়ি ফেলে দে! ছুড়ি ফেল মম! নিজেকে ঘা বসাবি না!

মাথা ডানেবামে ঘোরালাম। বামহাতে কবজির উপর একটু দূরত্ব রেখে ছুড়ি ধরেছি! আব্বু আমাকে নাম না বললে ধারালো ছুড়ি চালিয়ে দিবো! আব্বু ভয় ভয় কন্ঠে বলে উঠলেন,
— মা আমার! ছুড়ি ফেলে দে বলছি! কথা শোন!! ছুড়ি অনেক ধার মা!
— তুমি বলবে! নাকি বলবেনা!
— আমি বলবো!! বলবো!! তুই ছুড়িটা ফেলে দে!!
— নাম বলো!
— ‘তন্ময়’

-চলবে

ফাবিয়াহ্ মম🌸

তুমিময় প্রেম
LAST PART
FABIYAH MOMO
(অংশ-১)

১৫.
— আমারে মাফ কইরা দেন স্যার, আমি আর কোনোদিনও মাইয়া মাইনষের দিকে তাকামু না, আমার ভালা শিক্কা হইছে স্যার..আমারে মাফ কইরা দেন!!
মুগ্ধ দরজা খুলে একদফা অবাক হলো। ড্রাইভার হাটুগেড়ে মাফ চাইছে কেনো? কিছুতেই সমীকরন মিলাতে পারছে না।
— আরে আপনি মাফ চাইছেন কেনো? কি হয়েছে? কিসের জন্যে মাফ চাইছেন?
ড্রাইভার এগিয়ে মুগ্ধের দুইপা ধরে আকুতিমিনতি করছে। এখনো বুঝতে পারছেনা সে।
— আরে আরে পা ধরছেন কেন! আচ্ছা পাগল তো দেখছি! আপনাকে বলছিনা উঠুন! কিসের জন্য মাফ চাচ্ছেন?
— স্যার আমার ভুল হইয়া গেছে স্যার…আমি ম্যাডামের দিকে ভুলভাল নজরে তাকাইছিলাম, স্যার গো কানে ধরছি, আমি আর মাইয়া মাইনষের দিকে খাসড়া নজরে তাকাইতাম না। সকল মাইয়াগো মা ডাকুম স্যার..

মুগ্ধের মাথায় রাগ চটে এলো! এক লাত্থি দিয়ে দূরে সরিয়ে ড্রাইভারের কলার চেপে ধরলো! ড্রাইভার দুইহাত জোর করে মাফ চাইছে, কাদছে, ভুলের জন্য পস্তাচ্ছে..মুগ্ধের সেদিকে নজর নেই একবিন্দু! বেধড়ক পেটাতে শুরু করলো! মারতে মারতে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেও মুগ্ধের একনাগাড়ে ঘুষি দেওয়া থামছেনা। রাস্তার আশপাশে ছোটখাট জটলা পাকিয়ে গেছে, ছোট ছেলেমেয়েরা উৎসুক নজরে দেখছে, বিল্ডিং থেকে মহিলা-কিশোরীরা বারান্দা ধরে, জানালা খুলে মুগ্ধের পেটানো অবস্থা দেখছে। কিছু এলাকাবাসী মুগ্ধের কাছ থেকে ঘটনা শুনে পুলিশ ডেকে ড্রাইভারকে তুলে দিলো। মুগ্ধ হাপাতে হাপাতে কপালের ঘাম কনা মুছে ভেতরে গিয়ে সোফায় বসলো। বোতলে মুখ লাগিয়ে সবটুকু পানি খেয়ে গলা ভিজিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে রামিমকে কল করলো,

— হ্যালো,
— বস হাপাচ্ছো কেন? এনিথিং রং?
— নাহ্ না, আ’ম ওকে। ও ঠিকমতো পৌছেছে? কোনো সমস্যা হয়নি তো?
— বস ভাবী কে উনার বাসায় সহি সলামত পৌছে দিছি। টেনশন নিও না। তুমি হাপাচ্ছো কেন প্লিজ লুকাইয়ো না! বলো?
— ড্রাইভার শালা! তোর ভাবীকে দেখে রক্ত গরম করছে! খারাপ ইশারা নাকি দিয়েছে!হারামজাদাকে দিছি ধোলাই! জবাই করতে পারলে কলিজা ঠান্ডা হতো! তার আগেই পুলিশ এসে ধরে নিয়ে গেছে..
— কি ডেন্জারাস! ভাবী তো আমাকে কিছুই বললো না!
— তোর ভাবী নিজেই একটা ডেন্জারাস পাব্লিক! সমস্যার কথা মুখে বলবে? তার আগেই শালাকে উচিৎ শিক্ষা দিয়ে দিছে..
— কি বলো! ভাবী শিক্ষা দিছে?
— ইয়েস ডুড, শালার একেবারে জায়গামতো ইট ছুড়ে মেরেছে! বুঝতেই পারছিস বেচারা কোন লেভেলের পেইনে ছিলো?
— মাই গড! হালকা ঘুষিতেই কাম মাতাম হয়ে যায়! এইদিকে ভাবী তো দেখি পুরাই হিটলার!
— আমি তো এমনে এমনেই এই মেয়ের প্রেমে পড়িনি। হকিস্টিকের বারি কিন্তু এখনো করে,
— হা হা বস! আমি জীবনেও ভুলবো না! ভাবী যেই ঘুরান ঘুরাইছে! অন্য মেয়ে হইলে এতোদিনে তুমি তিনবাচ্চার বাপ থাকতা!
— ধুর ব্যাটা! কি যে বলিস না! মেয়েটার খেয়াল রাখিস। ওর কিচ্ছু যেনো না হয়! কোনো সমস্যা হলে জানাবি! হেড স্যারকে বলে দিছি ওর থেকে কোনো এমাউন্ট না নিতে। যা লাগবে আমি দিবো। তুই জাস্ট এটা কনফার্ম করিস ও যেনো স্কলারশিপ ভাবে! আমার হাত আছে ও ভুলেও যেন না জানে!
— টেনশন করো কেন বস? রামিম থাকতে এইসবের চিন্তা করা লাগবেনা। আমি আছি।

মুগ্ধ মৃদ্যু করে হাসলো। এই হাসির তৃপ্তিটা রামিম জানলো না। অদৃশ্য এক গোপন খামে ঢেকে রাখলো বিশ্বাসের সেই আবেগটা। বুন্ধু নামক আশ্বাসের সাথে যত্ন করে রাখলো ভরসাটা। মুগ্ধ এবারও রামিমকে বুক ফাটিয়ে বলতে পারলোনা, ‘তুই না থাকলে কি হতো দোস্ত?তুই ছিলি! তুই আছিস! জানি তুই থাকবি!’

১৬.
রাতের পর রাত বইয়ে মুখ ডুবিয়ে জোরদার প্রস্তুতি নিচ্ছি। ফাইনাল পরীক্ষা বলে কথা! রেজাল্টটা ভালো হলে নিজেই গড়তে পারবো উজ্জ্বল ক্যারিয়ারটা! এখন আর মুগ্ধের শোকে শোকে রাত্রি কাটেনা, একাকিত্ব দুঃখ দুর্দশায় মন বিষন্ন হয়না। ‘ব্যস্ত’ — নামক দুটি শব্দের কাছে ইতি টেনেছি অনুভূতির! দাবিয়ে দিয়েছি জীবনের সুক্ষতম সুখগুলি। ইসরাত নামক ফ্রেন্ডশিপ আর নেই। ত্যাগ করেছি তাকে, ভুলে গিয়েছি বহুদিন আগে। ক্যাম্পাসটা এখন শূন্যতায় ভরপুর খরার ন্যায় শুস্ক থাকে। সিনিয়রদের র‍্যাগিং ক্যাপাসিটি নিয়ে জুনিয়রদের ভয় নেই বললেই চলে। সবাই যার যার মতো আড্ডা দিচ্ছে, হৈচৈ করছে, নিয়ম ভাঙ্গছে, গুন্ডামি করছে। কিন্তু রাদিফ মুগ্ধের মতো কিলিং এসপেক্টস গুলো নেই আর ক্যাম্পাসের মাঠে। নেই ওর মতো ভাব গাম্ভীর্য মুখ, নেই কোনো দ্বিতীয় ক্যাম্পাস কাপাঁনো মুখরিত লোক! জেনি, রিমি এখন আমার সাথেই চলাফেরা করে। ওদের পোশাক আশাকে এতোদিনে সুশীল সভ্যতা ধারন করেছে। রামিমের উটকো পাগলামিতে কত যে ওকে চড়-থাপ্পর দিয়েছি! তবুও মনেমনে বড্ড হাসি রামিমের সেবাগুলিতে। ছেলেটা ভীষন ভালো। আই উইস সবার মনটা যদি ওর মতো ভালো হতো। তন্ময়, আহাদ এবং নাসিফের ঘটনা আরেকদিন বলবো। আজ না। এই তিনজন আমার জীবনের ঘোর শত্রু বলা চলে। মুগ্ধ এদের ছেড়ে দিয়েছেন ভাবতেই কেমন জানি লাগে। কিন্তু আমি তো সহজে অতীত ভুলিনা!! তাই মুগ্ধকে দেওয়া প্রতিটা পেটানোর দাগ! মন থেকে মুছিনা!!

আব্বুর সাথে কথা কম বললেও আব্বু নিজে থেকে আমার সাথে কথা বলার কোনো সুযোগ ছাড়েন না। আম্মু এখন নেতিয়ে গেছেন বয়সের ভারে, সংসারের টানাপোড়নে। ছোটটা আমার বড় হয়ে যাচ্ছে দিনদিন। প্রতি সপ্তাহে একদিন এসে আমার সাথে হাইট মাপবে। কতটুকু উচ্চতা ছাড়িয়ে টগবগ করে লম্বা হচ্ছে ইনিয়েবিনিয়ে খোচা মারে। আমি খিলখিল করে হাসি। কিন্তু রুমে গেলেই হাসির খোলস খুলে ডাস্টবিনে ছুড়ে মারি। ভালো থাকার অভিনয় আর কতো? আমি ভালো নেই — কথাটা সহজ হলেও বলার বিন্দুটুকু শক্তি নেই! কেন জানি মনেহয়, মানুষ আমায় বুঝবেনা! মূল্য করবেনা! শ্রদ্ধা তো দূরে থাক! কথা পেটে হজম করবেনা!

১৭.

শীতের সকালে উষ্ণ কফির কাপে ঠোট ছুয়িয়ে খাচ্ছে মুগ্ধ। ধোয়া উঠা গরম কফির মগটা আবদ্ধ আছে দু’হাতের বন্ধনীতে। গায়ে ভারী পশমী চাদর, গলায় কালো মোটা মাফলার। বারান্দার রেলিং ঘেঁষে দাড়িয়ে দেখছে ম্যান হ্যাটান শহর। নরম ঠোটদুটিতে কফির পানীয় শুষে নিতেই চোখ বন্ধ করে অনুভব করছে প্রহর। সেদিনের প্রহর! যখন তার পাশে স্বপ্নের মেয়েটি ছিলো। পাগলের মতো খুজতে খুজতে একটি বিশেষ দিন উপহার দিয়েছিলো। মনে পড়তেই শিরশির করে উঠে মুগ্ধের লোমস্তর। কি অদ্ভুত সেই উষ্ণ অনুভূতি। কত সুখময় সেই ঠোঁটজোড়ার ছোয়া। শেষ বিদায়ের বেলায় শক্ত করে চেপে ধরে ঠোট ডুবিয়ে দিয়েছিলো পাগল মনটা। মুগ্ধ পিটপিট করে চোখ মেলে বরফ পড়ার দৃশ্যটা দেখে। কফির মগটা রেলিংয়ে রেখে দুহাতে চাদরটা ঘন করে টানে। বারান্দা থেকে নিচে তাকাতেই চোখ পড়লো একজোড়া নব্য দম্পতির দিকে। বরফ পড়া আবহাওয়াতে মানুষশূন্য একটি বেন্ঞ্চিতে তারা বসেছে। মেয়েটি শীতে কাপছে বিধায় ছেলেটা গায়ের শোয়েটার খুলে মেয়েটার শরীরে জড়িয়ে দিচ্ছে। মেয়েটার কত অভিমান! সে সোয়েটার নিবেনা! বারবার হাত দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছে! ছেলেটাও নাছোড়বান্দার মতো প্রতিবার গায়ে সোয়েটার জড়িয়ে দিচ্ছে। মেয়েটার ক্ষুদ্র অভিমানে ছেলেটা মিটিমিটি হাসলে মেয়েটা আরো রেগে উঠে। মুখ ফুলিয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরালে ছেলেটা ব্যস্ত হয়ে মেয়েটার সামনে হাটুগেড়ে কান ধরে বসে। দূর থেকে মুগ্ধ এসব দৃশ্য দেখে প্রফুল্লচিত্তে হাসছে। কফির কাপটা হাতে তুলে ঠোট বসিয়ে চুমুক দিতেই দেখল মেয়েটা টুস করে চুমু খেতে লাগল। উহু! এই দৃশ্য দেখা চলবেনা! প্রাইভেসির ব্যাপার বলে কথা! তাছাড়া মুগ্ধের বুকে চিনচিন করে আলাদা ব্যথা শুরু হলো। এই ব্যথা সহজে ছাড়বেনা বুঝতে পারলো। সে কফি খেতে খেতে ভেতরে চলে গেল। সোফায় ল্যাপটপ অন করে কনফারেন্স এটেন্টের প্রস্তুতি নিতেই ক্রিং ক্রিং ঘন্টা বাজল। খুবই আভিজাত্য বেলের শব্দ। মুগ্ধ ঠোঁটে কফির চুমুক বসিয়ে বললো, ‘কাম ইন!’
— থ্যাংক ইউ মিস্টার।
— মাই প্লেজার বিউটিফুল লেডি।

ধবধবে চামড়ার সুন্দরী একটা যুবতী প্রবেশ করলো। যুবতী মেয়েটা হোটেলটার মালিক হলেও কোনো এক বিশেষ আর্কষনে বিশেষ ব্যক্তির জন্য চাকরানীর বেশভূষা ধরেছে। মুগ্ধ ব্যাপারটা জানেনা এবং জানার জন্য তার মধ্যে কোনো অনুভূতিও নেই। মেয়েটার নাম মার্থা ক্রুজ। মার্থা আজ সুন্দর পরী সেজে দুপুরের লান্ঞ্চ ট্রলি সাজিয়ে এনেছে। সুযোগ মতো ব্যস্ত মুগ্ধের দিকে তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে মুচকি হাসছে। মার্থা সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে আজ রাদিফ মুগ্ধকে মনের কথা বলেই ছাড়বে! আর কতো অপেক্ষা করবে? দেখতে দেখতে পাচঁটা বছর পেরিয়ে যাচ্ছে বাট মুগ্ধ নিজে থেকে প্রোপ্রোজ করেনা। প্রোপ্রোজ করলে কত চমৎকার হতো! মার্থা হাসিমুখে নব্য কিশোরীর মতো লাজুক ভঙ্গিতে মুগ্ধের টেবিলে ভেজ-রোলসের প্লেটটা রাখলো। মুগ্ধ একবার খাবারটির দিকে তাকিয়ে আবার ল্যাপটপে মগ্ন হলো। মার্থা মুগ্ধের এটেনশন সিকের জন্য খুক খুক করে কাশলো। একবার, দুইবার, শেষে তৃতীয়বার কাশতেই মুগ্ধ ল্যাপটপ বন্ধ করে বললো, ‘ইয়েস?’
— হ্যালো হ্যান্ডসাম। একচুয়েলি আই ওয়ান্ট টু স্যা সামথিং। ক্যান ইউ গিভ মি সাম মিনিটস?
— ইয়াহ্ সওর। প্লিজ স্যা,
মার্থা মুগ্ধের সামনে হাটুগেড়ে গোলাপ ফুল এগিয়ে বললো,
— আই লাভ ইউ মিষ্টার রাড। আই ওয়ান্ট টু মেরি ইউ। উইল ইউ মেরি মি? প্লিজ একসেপ্ট মাই কর্ডিয়াল লাভ হ্যান্ডসাম।
মুগ্ধ আশ্চর্যের চোখে দাড়িয়ে পড়ে। মার্থা এখনো হাটুগেড়ে বসে আছে। মুগ্ধ কয়েক সেকেন্ড সময় নিলো মার্থার সিচুয়েশন বুঝতে। মার্থার হাত থেকে গোলাপ ফুলটা নিয়ে ঘ্রাণ নিলো মনভরে। মার্থার ফুল একসেপ্ট করাতে মার্থা নিজেকে সবচেয়ে সুখী হিসেবে দাবি করতে লাগল। মুগ্ধ ফুলটা মার্থার হাতে গুজে দিয়ে বললো,

— থ্যাংক ইউ বিউটিফুল লেডি ফর দিস রোজ। বাট আ’ম সরি, আই কান্ট মেরি ইউ। আই হেভ হেভ টু ডাউন ইউর প্রোপ্রোজাল প্রিটি।

মার্থার ঠোট থেকে হাসি মিলিয়ে গেল তৎক্ষণাৎ। আহত কন্ঠে বললো,
— হোয়ায়? হোয়াটস দ্যা রিজন বিহাইন্ড দিস ডিসিশ্যান? প্লিজ ডোন্ট মেক ইট হারি। ইফ ইউ ওয়ান্ট সাম টাইম, প্লিজ টেক। বাট ডোন্ট রিজেক্ট মি অর মাই প্রোপ্রোজাল রাড। আই লাভ ইউ।
— আ’ম এ্যা ম্যারিড গায় বিউটিফুল লেডি। আই লাভ সামওয়ান। আই লাভ মাই গার্ল। সি মিন্স টু অল ফর মি। আই কান্ট একসেপ্ট ইউ।
— দ্যা গার্ল ইউ লাভ ইজ সি এ্যালাইভ? হোয়ায় আর ইউ টেলিং লাই রাড? দ্যাট গার্ল ডাজেন্ট একজিস্ট! আই নো ইউ আর লায়িং!
— নো আ’ম টেলিং দ্যা ট্রুথ। আই হেভ মাই লাভ! মাই ওয়াইফ। প্লিজ গো আউট! লিভ মি এলোন মার্থা!
— প্লিজ ডোন্ট লেট মি ডাউন রাড। প্লিজ।
— আ’ম সরি প্রিটি লেডি। আ’ম রিয়েলি ভেরি সরি।
মার্থা কাঁদতে কাঁদতে বাইরে চলে গেল। মুগ্ধ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে বিছানায় শুয়ে পড়লো। পায়ের নিচ থেকে ভাজ করা ব্ল্যাঙ্ককেট নিয়ে গায়ে জড়ালো। মনটা আবার ব্যথা পাচ্ছে। বুকে ব্যথার শিহরন শুরু হলেই চোখ ছলছল হয়ে আসে। মাথার নরম বালিশটির নিচে হাত দিয়ে কিছু বের করে আনলো। দুইহাতে জিনিসটা ধরে চুমু বসালো। মনেমনে বলতে লাগলো, দেখছো আরো একটা মেয়ে এসে তোমার মুগ্ধকে প্রস্তাব দিলো। আমার খুব খারাপ লাগে বুঝছো! এভাবে একটা মেয়ের মন ভাঙ্গতেও আমার খুব খারাপ লাগে। তুমি কিভাবে আছো জানিনা। কিন্তু তোমাকে ছাড়া দিনের শুরু হয়তো আমার কখনোই হয়না। একটু আগে একটা কিউট কাপল দেখে মনটা ভালো লাগল, আবার বিষাদে ঘনীভূত হয়ে মনটা নিঃস্ব হয়ে গেল। কি যে বিরাট জ্বালা! কোনো কাপল দেখলেই তোমার শূন্যতা অনুভব হয়। কোথাও গেলে তোমাকে ছাড়া যেতে হয়। কাউকে বলতেও পারিনা আমার ওয়াইফ বেঁচে আছে ভাই। আমি নিজেকে মিথ্যে বলে ম্যারিড দাবী করিনা। আমার বেডের পাশের জায়গাটা, গাড়ির পাশের সিটটা, রেস্টুরেন্টের পাশের চেয়ারটা সদা সর্বদা তোমার জন্য খালি রাখি। নিজের মনের মধ্যেও তুমিময় নামক জায়গাটা খালি। আমি পাঁচটা বছর পার করে ফেলেছি পাকনি। পাচঁটা বছর! এই পাচঁ বছরে প্রতিটা সময়, প্রতিটা মূহুর্ত, প্রতিটা সেকেন্ডে সেকেন্ডে আমি তোমায় স্মরন করেছি। কত স্মৃতি নিয়ে এখনো বেঁচে থাকার আশা বুনি! যার কোনোদিন শেষ নেই। মুগ্ধ তো তোমারই। প্রমিসটা সে কখনো ভঙ্গ করবেনা। আই লাভ ইউ। আই লাভ ইউ মাই ওয়াইফ!

এ্যালবাম সাইজের লেমিনেট ছবিটা বুকে রেখে ঘুমিয়ে পড়লো মুগ্ধ। আজ দুপুরে খাওয়া হবেনা একবারো। মুগ্ধ ঘুমের মধ্যে ‘লাভ ইউ লাভ ইউ ‘ উচ্চারণ তুলে বিড়বিড় করে ঘুমিয়ে গেলো।

১৮.

চারটা বছর পার হলেও বাংলাদেশে গ্রীষ্মের প্রকট থেকে কখনো পার পাওয়া সম্ভব না। যেভাবেই হোক গ্রীষ্মের উষ্ণতা পোহাতেই হবে। ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার দাপুট মার্কা গরমে ছাতা হাতে হাটছে মম। মাথার চুল ঘেমে কানের পাশ দিয়ে চুয়ে চুয়ে পানি ঝরছে। রাস্তার দুধারে ভালোই পসরা সাজিয়েছে ঠান্ডা শরবত বিক্রেতারা। দোকানে কাস্টমারও আজ তুলনামূলকভাবে বেশি। শাড়ির আচঁলে বারবার মুখ মুছছে মম। গন্তব্যে পৌছতে পারলেই ঠান্ডা পানিতে গা ভাসিয়ে গোসল দিবে কঠিন সিদ্ধান্ত। এই গরমের প্রচন্ড যন্ত্রণা একদমই সহ্য হয়না ওর। বিশ মিনিটের রাস্তা পেরিয়ে বড় একটা গেট দিয়ে ঢুকলো সে। বড় বড় অক্ষরে স্পষ্ট করে লিখা, ‘হাফেজা অরফানেজ’। একঝাঁক বাচ্চার দল ঘিরে ধরতেই ছাতাটা বন্ধ করে ব্যাগ খুললো। পনের-বিশটার মতো চকলেট বের করে সবাইকে ভাগযোগ করে বিলিয়ে ভেতরে গেল। দূর থেকে একজোড়া চোখ দূরবীন দিয়ে ফলো করছিলো বহুক্ষন যাবৎ। মম হাসিখুশি ভেতরে ঢুকে যেতেই স্বস্তির ভারী নিশ্বাস ছাড়লো। চোখ থেকে দূরবীন সরিয়ে গাড়ির সিটে মাথা হেলে বললো,
‘ বস আপনার জন্য এখনো কষ্ট পায় ভাবী! আপনি একটাবার ওয়াদার বিরুদ্ধে বসকে ডাকতেন! বস সব ফেলে চলে আসতো! আফসোস!’

আয়নার সামনে ভেজা চুলে তোয়ালে ঘষছে মম। চুল বেয়ে ঝরে পানি চুয়ে চুয়ে ফ্লোরেও পড়ছে টপটপ। আনমনে চুল মুছতেই হঠাৎ দরজায় কড়াঘাত করলো। চুলে তোয়ালে মুড়ে দরজা খুললে দেখে একটা লোক কিছু কাগজ এগিয়ে দিচ্ছে। পরিচয় দিলো পিয়নের লোক। মম কাগজগুলো নিয়ে দরজা আটকে বিছানায় বসে উল্টেপাল্টে দেখতে লাগলো। কাগজগুলোতে ওর আব্বুর হাতের অক্ষর বসানো। তিনি নারায়ণগঞ্জ থেকে মেয়ে উদ্দেশ্যে চিঠি পাঠিয়েছেন নিয়ম মতো। চিঠির প্রথমেই বড় করে প্রিয় বাক্য লেখা, ‘আমার মা’, পড়তে বুকে চাপাকষ্টের ব্যথা অনুভব করলো।

আমার মা,
কেমন আছিস রে? কতদিন তোকে দেখিনা, চোখদুটো এখন জ্যোতি হারিয়ে ফেলেছে মা। আমি বুড়ো হয়ে গেছি হাঁটতেও পারিনা। তোর আম্মু ধরে ধরে বাথরুমে বসায়। তোর ভাইটা এখন ভালোই ব্রিলিয়ান্ট হয়েছে জানিস? সবসময় বলে আমি মম আপুর মতো হতে চাই। আপুর মতো কষ্ট করে পড়াশোনা করবো আর একদিন আপুর মতো ভালো আর্কিটেক হবো। ছেলেটা এইটুকুন বয়সে তোর মতো ম্যাচিউর কথাবার্তা বলে। তুই তো আমার সোনার টুকরা। তোর সাথে ওর কেন জানি তুলনা দিতে পারিনা। মেয়েরা বাবার হীরার রত্ন, এমন স্বর্গীয় হীরা যখন মেয়ের চাহিদা পূরন করতে না পারলেও মেয়ে মুখফুটে কিছু চাইবেনা। বলবেনা, আব্বু আমার এটা চাই, ওটা চাই! তোমাকে দিতেই হবে! মেয়েরা কঠিন মুখে বায়না করেনা। আমার বুকটা খালি হয়ে আছে রে মা, তুই আমাদের সাথে থাখিস না। তোকে দেখতেও পারিনা, মা বলে পরান জুড়িয়ে ডাকতেও পারিনা। মারে তোর প্রথম বেতনের টাকায় যে ফোনটা দিয়েছিলি, ফোনটা দেখলে এখনো কাদিঁ রে মা। আমি বাবা হয়ে আজ পযর্ন্ত ভালো একটা ফোন কিনে দিতে পারিনি। তুই তো মুখ দিয়ে বলতিও না আব্বু একটা ভালো ক্যামেরার ফোন কিনে দাও। অথচ দেখ, তোর ফোন দিয়ে আমি ডিএসএলআরের মতো ক্লিন ছবি তুলি। মারে জীবনে কত কষ্ট করলাম তোর শখগুলোই পূরণ করতে পারলাম না। গরীবের ঘরে মধ্যবিত্ত ট্যাগ নিয়ে তুই যে কষ্টটা করেছিস তার কিন্ঞ্চিত কষ্ট যদি আমি করতাম, আমার বাচ্চাগুলির সব ফরমাশ পূরন করতে পারতাম। মা আমার হাতের জোর নেই রে। ঔষুধের উপর বেঁচে আছে তোর বাবা। কবে যে দুনিয়া ছেড়ে চলে যাই জানিনা। কিন্তু আল্লাহর কাছে লাখ কোটি শুকরিয়া জানাই আমার ঘরে এমন মেয়ে জন্মেছে যে কখনো আমাকে দুঃখ পেতে দেয়নি। জীবনের এই স্তরে এসে বুঝতে পেরেছি একটা মেয়ে সন্তান পাওয়া কতটা সৌভাগ্যের। আল্লাহ প্রতিটা ঘরে মেয়ে পাঠায় বাবার কষ্ট বুঝার একেকটা উপহার হিসেবে। এই কষ্ট বাবার মেয়েগুলোই বুঝে রে মা। আদরের ছেলেরা তা পারেনা। মারে, ও মা, চট্টগ্রাম থেকে একবার এসে নাঃগন্জ ঘুরে যা। তোর মাকে দেখে যা। বেচারী পায়ের ব্যথায় ঘুমাতে পারেনা। রাতভর ছটফট করে কাঁদে। হাতের লেখাগুলি পচা হয়েছে রে, একটু কষ্ট করে পড়ে নিস। হাত কাঁপে ব্যথা করে, একটানে চিঠি লিখতে পারিনা। বয়সের ভারে চারদিন মিলিয়ে এই চিঠি টুকটুক করে লিখছি। মারে? ছেলেটাকে একবার দেশে ফিরতে বল। দেখিস তোর এই আব্বু ওর পায়ে পড়ে ভুলের ক্ষমা চাইবে। আমার ভুলের জন্য ছেলেটাকে কষ্ট দিস নারে। ওকে ডাক, দেশে ফিরতে বল। তোরা সংসার শুরু কর, ভাতিজিকে মেয়ের মতো বড় কর, আমার কোনো আপত্তি নেই মা। অতীতে করা ভুলটা আমার সুখশান্তি কেড়ে নিয়েছে, মনে দুঃখ ছাড়া কিছুই উপলব্ধি করিনা। মরনের জন্য গুন গুনছি। আল্লাহর কাছে ফিরে যাবো সময় ঘনিয়ে আসছে হয়তো। ভালো থাকিস আমার মা। পরপারে পাড়ি দিলে একটু লাশটা দেখে যাস।

ইতি

তোর আব্বু।

টপটপ করে চোখের অশ্রুতে ভিজে গেছে হাতের চিঠিটা। অশ্রুজলের কারনে কলমের কালি লেপ্টে যাচ্ছে গোলাকার। বাবা এই নিয়ে অসংখ্যবার চিঠি পাঠালেও নারায়ণগঞ্জ ফিরেনি বিগত দুই বছরে আর। পড়াশোনা শেষ করে ভালো একটা গ্রেড তুলে আজ বহুদূরে বসবাস করে। আর্কিটেক হিসেবে চাকরীর সুবাদে চট্টগ্রাম থাকছে। নিজের কর্মক্ষেত্রে ঘুমকাড়া ব্যস্ততায় ডুবে থেকে পুরোনো কষ্টগুলো লাঘব করার প্রয়াস করে। কিন্তু একবার না একবার হলেও পুরোনো ক্ষতগুলো নাড়া দিয়ে উঠে। ভেজা চিঠিটা ভাঁজ করে টেবিলের ড্রয়ারে রাখে মম। তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে চুল শুকাতে বসে পড়ে ফ্যানের নিচে।

মম ভাবলো, গ্রীষ্মের ভেকেশ্যান এলেই লম্বা ছুটি এপ্লিকেশন করে নারায়ণগঞ্জ যাবে। অনেকদিন হয়ে গেছে আব্বু, আম্মুকে দেখে না সে। সর্বদা কাজের ব্যস্ততা নিয়ে গুটিয়ে রাখে নিজেকে। ক্লান্ত শরীরে বিছানায় শুতেই রাজ্যের ঘুমকাড়া সব চিন্তা এসে মাথায় ঘন্টা বাজালো। পুরোনো অতীতে ডুবে যেতে লাগল বন্ধ চোখপাতার জোড়ায়।

আমি ক্যাম্পাসে যেতাম দুটো ভয়ংকর উদ্দেশ্য নিয়ে! এক. নিজের পড়াশোনায় হাইয়েস্ট র‍্যাংকিং করতে! দুই. তন্ময়,আহাদ ও নাসিফকে পাই পাই করে শিক্ষা দিতে! আমার মাথায় এক নাম্বার উদ্দেশ্য অনড় থাকলেও রক্তে রক্তে দুই নাম্বার উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ব্যকুল থাকতাম। রামিমের কিছু কৌশলের কারনে ওরা আমাকে চাইলেও ক্ষতি করতে পারতো না। একটা জিনিস ভালো করে জানতাম, রামিমের মতো হাবার মাথায় ফার্স্ট ক্লাস বুদ্ধির পেছনে কার হাত বা কার মাথা থাকতে পারে। কখনো মুখে সেটা আওড়াতাম না। কিন্তু রামিমের জন্যই বেচে যেতাম হাজারবার।

ক্যাম্পাসে ওদের র‍্যাগ ডে’র জন্য বর্ণিল আয়োজন করা হয়েছে। ক্যাম্পাসের গেট থেকে শুরু করে প্রতিটা একাডেমিক ভবন রঙ বেরঙের সজ্জাদ্বারা সাজানো হয়েছে। হেডস্যার সহ অন্যান্য স্যার সকাল আটটা টু রাত আটটায় পার্টি করার আবেদন মন্জুর করে দেন। সবই ছিলো ওদের দখলে। আমি, অর্পি, জেনি, রিমি ও রামিম মিলে একটা প্ল্যান করি। যদিও এতে কি পরিনাম হতে পারে জানা নেই। ফুল ভলিউমে গান বাজনার সৌহার্দ্যে পুরো ক্যাম্পাস জমকালো পার্টি শুরু করলো। সবাই নাচানাচি, মাতামাতি, হৈহুল্লোড়ে মাতাল। রিমি, জেনি পরিকল্পনার মুখ্যপাত্রী। ওরা তন্ময়দের সাথে মিশেমিলে প্ল্যান মোতাবেক সিলেক্টেড জায়গায় আনবে। সেটা হবে স্টেজের পেছনের জায়গা। অর্পি ও আমি গুড়ো রঙের মধ্যে কঠিন কিছু মেশাচ্ছি। রামিম আমাদের আড়াল থেকে দুরবীন নিয়ে আশপাশ দেখছে কেউ এখানে আসছে কিনা। কেউ আসলেই রামিম সর্তক বার্তা দেয়। দুরবীনে চোখ বসিয়ে রামিম বললো,
— ভাবী! অর্পি! সব রেডি? ওরা কিন্তু আসতেছে। জলদি জলদি!!
— হয়ে গেছে রামিম!! তুমি তাড়াতাড়ি দুরবীন লুকাও।
রামিম দ্রুত কোমরের পেছনে প্যান্টের সাথে গুজে নিলো দুরবিন। অর্পি ঢালাভরা রঙের স্তুপ ছেড়ে জলদি ওড়নার পুটলি থেকে বেগুন, সবুজ কালারের রঙ বের করলো। আমি এক খাবলা নিয়ে দুহাতে মুখে ঘষছি, অর্পিও সারা মুখে রঙ মাখছে। অর্পি রঙ মেখে জিজ্ঞেস করে,
— ওই মাইয়া! আমাকে চিনা যায়? আরো রঙ মাখবো?
— ‘না না দিস না! ঠিকাছে!!’ আমি চটপট উত্তর দিলাম।
— কিরে ছেমড়ি! তোরে তো মুগ্ধ ভাইও চিনবো না!! এত্তোদি দিছোস কেন!
— চুপ! ফাতড়া পেচাল পারিস না! ভেটকি মাছের হাসতে থাক! ওরা ডাউট করলে কিন্তু শেষ বুঝিস!
রিমি, জেনি চোখ ঘুরিয়ে ইশারা দিলে রামিম যেয়ে তন্ময়, নাসিফ ও আহাদের সাথে গলাগলি করে। ওরা খুশিতে আরো হৈহৈ করে উঠে। তন্ময়ের নজর সবাইকে ছেড়ে আমাদের দিকে পড়ে। অর্পি অপ্রস্তুত হাসি দিলে তন্ময় কিছুটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুড়ে কাছে আসতে নিলে রামিম বাধা দেয়।
— আব্বে ডুড! যাও কোথায়? ওরা ফ্রেশার স্টুডেন্ট! র‍্যাগ দিতেছি বুঝছো!

জেনি ও রিমি ওদের পাশ থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। এদিকে রামিম ওর কথার জালে তিনজনের ধ্যান আর্কষন করলে ধামম করে দুটো বিকট শব্দে গগনবিদারী চিৎকার উঠে! তন্ময়, নাসিফ মাথায় হাত দিয়ে বেহুঁশ। আহাদ আশ্চর্যের সপ্ত আকাশে পৌছে গেছে! ভীত ভীত চোখে আলতো ঢোক গিলে দেখে জেনি ও রিমির হাতে মোটা বাশঁ! তারাই মেরেছে তন্ময় ও নাসিফকে! আহাদ ভয়ে কুজো হয়ে যাচ্ছে! একবার তন্ময়ের দিকে আরেকবার রিমির দিকে তাকাচ্ছে। রিমি দুহাতে বাশঁ ধরে তন্ময়ের বুকের উপর দিয়ে হেটে এগিয়ে আসছে। আহাদ ঘাম ছুটিয়ে একপা দুইপা করে পেছাতেই আরেকটা অস্ফুট শব্দে আঘাত দিয়ে বসে। আহাদ রক্তাক্ত মাথা নিয়ে লুটিয়ে পড়লো মাটিতে। রিমি ও জেনি একসাথে বাশঁ ছুড়ে ফেলল। আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল,
— ওদের চামড়া এমনভাবে দংশন করবা যেনো আমাদের মুগ্ধের উপর টর্চার করা প্রতিটা দাগ চামড়া ভেদ করে ফুটে উঠে! মেরে ফেলো!

রামিম একটা বক্স এনে মাটিতে রাখলো। সবাই সেখান থেকে গ্লাভস নিয়ে পড়ছে। গ্লাভস গুলো মোটা, শক্ত, বলিষ্ঠ! আমরা পাচঁজন হাতে গ্লাভস পড়ে রঙের ঢালা থেকে খাবলা খাবলা রঙ নিচ্ছি। দুইহাতে মুঠোভরা রঙ তন্ময়ের গালে ঘষতেই চামড়া চিড়ে তরল লাল রঙ বেরিয়ে আসছে। জেনি বজ্রচাহনিতে একঢালা রঙ দিয়ে চামড়া খসিয়ে ফেলেছে নাসিফের। রামিম বাকি দুই ঢালা রঙের স্তুপ এনে মাটিতে রাখতেই ওরা হামলে পড়ে ওদের উপর নৃশংস তান্ডব চালায়! শেষে জেনি খুব উত্তেজিত হয়ে পড়লে বহুকষ্টে থামানো হয়। আর অত্যাচার চলবেনা। সমাপ্ত! আমরা সব গুটিয়ে জিনিসপত্র গুছাই। ওদের উপর ভালো রঙ ঢেলে সেখান থেকে চলে যাই। পরদিন জেনি, রিমি ও রামিমের বাসায় পুলিশ গেলেও লাভ হয়নি কোনোটাই! বড়লোক পরিবারের ক্ষমতার জোরে তিনজনের একজনকেও পুলিশ ধরতে পারেনি।তাছাড়া পুলিশের কাছে প্রমাণসাধ্য কিছু না থাকার কারনে আইনি কাজ সম্ভব হয়নি। আমি ও অর্পি এ প্ল্যানের অংশীদার ছিলাম, তন্ময়রা আঁচ করতে পারেনি। কেননা জেনি, রিমি আমাদের সাথে মিশেছে, ওদের জানা নেই। সবই নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হয়েছিলো। তন্ময় আর কোনোদিনও ফ্রেশ দাগহীন চেহারা পাবেনা। পাবেনা কোনো মেয়ের কাছে কুপ্রস্তাবের ভোগ অবস্থা। আয়নায় দেখলে বীভৎস লাগে তন্ময়, নাসিফ ও আহাদকে। তবে আহাদের ক্ষেত্রে কিছুটা কম চোট দিলেও ভয়ে মুখ খুলবেনা কোনোদিনও। সময়ের সাথে সাথে দমে গেছে তিনজনের অহংকার! গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে লালসা করার চেহারা! সব শেষ! তোমরা মুগ্ধকে একবার মেরেছো! আমি তোমাদের অজস্রবার মারছি! এই মারার শেষ তোমাদের কোনোকালে পরিশেষ হবে কিনা! জানা নেই আমার।

মম ঘুম থেকে চট করে উঠে বসলো। পুরোনো স্মৃতি কেন যে বারবার তাড়ায়? ভালো লাগে না অতীত নিয়ে ঘাটতে। কষ্ট লাগে। অসহনীয়, অব্যক্ত, অপ্রকাশ্য কষ্টানুভব হয়! মম চুলে হাতখোপা পাকিয়ে হাত মুখ ধুয়ে আসে। বিছানায় বসে জানালায় ডানকাত করে মাথা হেলিয়ে চায়ের কাপে চুমুক বসায়। বিকেল গড়িয়ে লাল আভায় ঢেকেছে আকাশ। কি সুন্দর এই আকাশটা! কি শান্ত পরিস্কার চুপচাপ! মুগ্ধের কথা মনে পড়ছে তার। মুগ্ধ যদি হুট করে আসতো! যদি আসতো চমকে দিয়ে! কিন্তু সে তো আসবে না। সে আর কোনোদিন আসবেনা। আসার ইচ্ছে হলে পাঁচটা বছরে না আসতো? একা একা থাকতো? এই পাঁচবছরে অবশ্যই সে দেখা দিতো! কিন্তু সকাল শেষে রাত হলেও মুগ্ধের আশা করা যায় না।

১৯.

চকচকে আভিজাত্য কালো গাড়ি থেকে বের হলো দুটি বুট পড়ুয়া পা। দরজা ঠেলে চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে গলায় ঝুলালো মেয়েটা। কালো লং জ্যাকেট, নেভি ব্লু জিন্স, পায়ে কালো বুটস। চুলগুলো নায়িকাদের মতো সিল্কি ও প্রাণবন্ত। ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে বললো,
— বিডিতে এতো গরম! থাকেন কিভাবে? আমার তো জ্যাকেট খুলে খেলতে ইচ্ছে করছে! উফ!
ড্রাইভার ঠোট হাসি ঝুলিয়ে বললো,
— গরমের সিজন চলে ম্যাম। বাংলাদেশের টেম্পারেচার এমনই হয়।
মেয়েটা প্রতিউত্তরে কিছু না বলে মাটিতে গটগট শব্দ করে চলে গেল। রিসেপশনের সামনে দাড়িয়ে একগাল প্রশ্ন ছুড়লো,
— এক্সকিউজ মি? ক্যান ইউ হেল্প মি?
রিসেপশনে বসা যুথিঁ মেয়েটার আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে দেখলো। মেয়েটাকে দেখে মনেহচ্ছে সদ্য দেশের মাটিতে পা ফেলেছে। কেমন শুভ্র শুভ্র ভাব চোখে, মুখে, গায়ে। যুঁথি হাসিমুখে বললো,
— ইয়েস।
— আমি একজনকে খুজতে এসেছি। নাম স্নিগ্ধা মম। চিনেন? উনার এড্রেসটা লাগবে প্লিজ!
— জ্বি? কিন্তু আপনার নাম?
— সাফিয়া তাবাস্সুম। আমাকে একটু ঠিকানাটা দিন।
— সওর।
রিসেপশন থেকে এড্রেস পেয়ে মেয়েটা ড্রাইভারকে দেখিয়ে বলল ঠিকানুয়াযী নিয়ে যেতে। ড্রাইভার সম্মতি জানিয়ে বলল, রাত পার হবে জায়গায়টায় যেতে। মেয়েটা তবুও অটল ভাবে জানালো ‘যাবে!’
— হ্যালো? তুমি একজেক্টলি কোথায় আছো?
–………
— ওহ্ মাই গড! নো চিটিং! প্লিজ আমার সাথে চিটিং করবেনা!
–……..
— আমি তোমার আগেই পৌছাবো! বায় হুক অর বায় ক্রুক! আই উইল ফাইন্ড হার ফার্স্ট! ইটস মাই চ্যালেন্জ!

-চলবে

ফাবিয়াহ্ মম

তুমিময় প্রেম
পার্ট ৩০
LAST PART
FABIYAH MOMO

(শেষ অংশ)

১৯.
ঝড়ো হাওয়া বইছে সকাল থেকে। ভয়ংকর কালো মেঘের আড়ালে দিনের আলো ঢেকে গেছে। আকাশের দিকে তাকালেই বুক ভয়ে দপাদপ করে। একটু আগে এলাকায় মাইকিং করে ‘সর্তক সংকেত’ দিয়েছে। সমুদ্রসৈকতে উথালপাথাল প্রাণচাঞ্চল্য অবস্থা হচ্ছে সুউচ্চ ঢেউয়ের জোরে। সবাইকে নিরাপদে সরে যাওয়া ঘোর আহ্বান জানানো হয়েছে। আমি রুমে জানালা আটকে, দরজা লাগিয়ে চুপচাপ বসে আছি। হালকা বাতাসেই কারেন্ট ফুরুৎ! টিভিও দেখতে পারছিনা এই শোকে। আজ মনটা অদ্ভুত ভাবে তোলপাড় করছে, বুঝতে পারছিনা কিছু। বিচিত্র অস্থিরতায় এ পযর্ন্ত কতগ্লাস পানি খেলাম হিসাব নেই! মোবাইলে জরুরি কলটা করবো নেটওয়ার্ক নেই! বাইরে যাবো সেই পরিস্থিতিও নেই! দরজায় হুট করে কেউ নক করলো। আমি অবাক হয়ে ঘড়ির দিকে তাকালাম! বাইরে যেই তুলকালাম ঝড় হচ্ছে এমন স্তব্ধ পরিস্থিতিতে কে আসবে বাইরে থেকে? আমি দরজা খুলে দিলাম। দেখি কাজের বুয়া।

— আপা আপনার সাথে কেউ দেখা করতে চায়। উনারে আসতে বলবো?
— এই খারাপ আবহাওয়ায় কে আসলো দেখা করতে?
— আপা পিচ্চি মেয়ে একটা। নাম বলছে সাফিয়া।
— আচ্ছা দেখি আসতে বলুন তো। নাম শুনে তো মনে হচ্ছেনা চিনি..
আমি দরজা খুলাই রাখলাম। জানালার কাছে গিয়ে থাইগ্লাসের বাইরে ঝড়ের তান্ডব দেখছি। সুপাড়ি গাছের হাল বড্ড বাজে।ঝড়ের প্রতিটা ঝাপটায় নুয়েশুয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ছে। কি ভয়ংকর দৃশ্য! হঠাৎ কেউ মিষ্টি গলায় বললো,

— আমি আসতে পারি?

মুখ ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখি অনেকটা চেনাচেনা মুখ। কোথাও যেনো দেখেছি! আচ্ছা কোথায় দেখেছি মেয়েটাকে? মনে করতে পারছিনা!! মেয়েটা একইসুরে আবার বললো,

— আমি আসতে পারি?

ভাবনার প্রহর ভাঙ্গলে আমি ভেতরে আসার জন্য অনুমতি সূচকে মাথা ঝাঁকাই। মেয়েটা ভেতরে না এসে দরজায় দাড়িয়ে কিছু একটা গভীরভাবে চিন্তা করছে। নজরটা পায়ের জুতোর উপর। কাদায় লেপ্টে খুবই নোংরা অবস্থা। আমি ব্যাপারটা বুঝে উঠতেই বলে উঠি,

— জুতো খুলে আসতে হবেনা। ভেতরে আসো।
— থ্যাংকিউ।
— তোমার নাম কি? আমাকে কিভাবে চেনো?
— আপনি আমায় চিনতে পারেননি?
— না তো,
— সাফিয়া? নামটা মনে নেই?
— শোনা শোনা লাগছে তবে মনে করতে পারছিনা।
— আপনাকে খুব মনে পড়ে মিস। আপনি আমার জন্য চাচ্চুকে ছেড়ে দিয়েছেন। চাচ্চু ভালো নেই মিস।

কথাগুলো শোনার পর যেনো ঝড়ের বীভৎস ঝাপটাটা এবার আমার উপর পড়লো। আমি নিজেকে সামলাতে না পেরে পিছিয়ে জানালার সাথে ধাক্কা খাই। এই মূহুর্তে আমার ফাইজাকে দেখে আবেগান্বিত হওয়া ঠিক? ফাইজাকে দেখে হুহু করে কাঁদা উচিত? নাকি মুগ্ধের ব্যাপারে আগেভাগে জিজ্ঞাসা করাটা বেঠিক?আমি জবাবশূন্য হয়ে তীব্র উৎকন্ঠায় ছটফট করছি। ফাইজা আমাকে দূরে যেতে দেখে দৌড়ে এসে আমাকে শক্ত হাতে জাপটে ধরলো। আমি আরেকদফা বিদ্যুপৃষ্ঠের মতো চমকে উঠি। হাত কাপছে, পা কাপছে, মুখ কাপছে, আমি যেনো আমাতে নেই। সমস্ত শরীর বিষাদের ঘোরে অবশ, বিপন্ন লাগছে।

— আপনাকে প্রচুর মিস করেছি মিস, আপনাকে ছাড়া আমার ভালো লাগে না, আমি সবসময় দেশে ফিরতে চাইতাম।কিন্তু চাচ্চু আসতে দিতো না। বারন করতো। বলতো, আপনি চাচ্চুকে দেখতে পারেননা, চাচ্চুকে দেখলে রাগ করবেন। আমার চাচ্চুকে আপনি আমার জন্য কেন ছাড়লেন মিস? বলুন না মিস!! আমি সব ছেড়ে আপনার কাছে জানতে এসেছি!!

আমি কঠিন অবস্থাগুলো হজম করার চেষ্টা করে মৃদ্যু কাপুঁনিতে কাঁপছি। দাতঁ শক্ত করে মাথা নুয়ে আমাকে জাপটে ধরা মেয়েটিকে দেখছি। ছোট্ট ফাইজা পাচঁবছরের দৃঢ়তায় বড় হয়ে গেছে, চিনতে পারিনি প্রথমে। ফাইজা কাদঁছে, কান্নার সুরে আমাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, আমি কি উত্তর দিবো? বলবো তোমার চাচ্চু নিজেই আমাকে ছেড়ে গিয়েছে? আমি চোখ মুছে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বিছানায় বসালাম। ওর চোখ মুছে দিতেই ফাইজা আমার হাত ধরে বললো,
— চাচ্চু আমাকে সব না বললেও আমি সব জানি মিস। আব্বুর নতুন বউ আমাকে সব বলেছে। জানেন মিস আব্বুর নতুন বউটা খুব খারাপ। আমার নামে মিথ্যা মিথ্যা কথা বানিয়ে আব্বুর কাছে মার খাওয়ায়। আজ আম্মু থাকলে ওই দুষ্টু মহিলা কখনো আমায় মারধর করতে পারতো না। জানেন মিস, চাচ্চুর উপরও একদিন মহিলাটা হাত তুলেছিলো। চাচ্চু সেদিনের পর থেকে ওই মহিলাকে আর সহ্য করতে পারেনা। আমি যে পাচঁ বছর ধরে আমেরিকায় আছি মনের ভুলেও খোঁজ নেয়নি। পচাঁ পরিবারের নোংরা মানুষ ওরা। মিস? আপনি আমার সাথে চলুন, আমি আপনাকে চাচ্চুর সাথে বিয়ে দিয়ে সুন্দর পরিবার বানাবো। চাচ্চুও কাদঁবেনা। আপনিও দূরে থাকবেন না। আপনাকে আমি নিতে এসেছি মিস। চলুন।

গুণে গুণে ‘বারো’ বছর বয়স হবে ফাইজার।অথচ মা হারা মেয়েটা এতো সুন্দর কথা কিভাবে শিখলো সেটাই বুঝতে পারিনা। পাচঁ বছরের ব্যবধানে মুগ্ধ ওকে সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছে, দেখলে মনে হবেনা কেবল বারো বছরের মেয়ে। মুগ্ধের বড়ভাই কিভাবে পারলো ফুটফুটে নিষ্পাপ মেয়েকে ভুলে যেতে? নিজেরই তো মেয়ে তবুও কেন দূরে রাখে? লোকটার প্রতি ঘৃণা লাগছে আমার। এইসব পুরুষের বাবা হওয়ার যোগ্যতা নেই। আমি ফাইজার মাথায় হাত বুলিয়ে গালে চুমু একে দিলাম। ফাইজা আচমকা আমার ঠোঁটে চুমু দিয়ে বলে উঠলো,

— আপনি খুব বড় হয়ে গেছেন মিস। মেয়েদের মতো শাড়ি পড়েন। চাচ্চু আপনাকে শাড়িতে দেখলে পাগল হয়ে যাবে, সিরিয়াসলি!!

হঠাৎ মনের মধ্যে ঝংকার দিয়ে উঠলো ফাইজার কথা শুনে। অজানা উত্তেজনায় তৎক্ষণাৎ উৎকন্ঠা বোধ করছি আমি। শরীরে অদ্ভুত শিহরন বয়ে যাচ্ছে, নিজের মধ্যে অপ্রকৃতিস্থ ভাব রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনুভব করছি। মুগ্ধের কথা শুনে কি এমন ঝিমঝিম করে উঠলো? মুগ্ধ আমায় দেখে কেমন করবেন, জানার বহু আগ্রহ!!

২১.
ঝড়ের ভারি বর্ষনে রাস্তা সব গোলমেলে লাগছে। বৃষ্টির প্রবণতা, ঝড়ের ঝাপটা — সব মিলিয়ে বিরাট সমস্যার সৃষ্টি করেছে। গাড়ি চালিয়ে সামনে এগুতেই প্রচুর রিস্ক নিতে হচ্ছে। এই কর্দমাক্ত রাস্তায়, বৃষ্টির ঝাপটায়, গাড়ি যদি উল্টে পড়ে তাহলে উদ্ধার করার জন্য কেউ আসবেনা এখানে। খুবই খারাপ অবস্থা বিরাজ করছে চট্টগ্রামের উন্নত শহরে। হঠাৎ দ্রুত স্পিডে মূল সড়কে একটি কালো গাড়ি চলতে নিলে এলার্ট সাউন্ড বাজিয়ে গাড়ি আটকায় ট্রাফিক কর্মী। ঠোঁটে বাঁশি ফুকতে ফুকতে বন্ধ জানালায় আলতো লাঠি মারে। জানালার কাচঁ নেমে গেলে রেইনকোর্ট গায়ে ট্রাফিক পুলিশটি চেচিয়ে বলে উঠে,

— এ্যাই মিয়া! ঝড়বৃষ্টি হইতাছে চোখে দেখেন না? এইভাবে কেউ স্পিড দিয়ে গাড়ি চালায়?দেখি লাইসেন্স!
ট্রাফিক পুলিশটা দেখল, ড্রাইভিং সিটে বসা ছেলেটি ঝড়ের চেয়েও তিনগুণ বেশি স্পিডে লাইসেন্স হাতে গুজলো।

— নাম কি? কোনদিকে যাচ্ছেন?
— স্ট্রেন্জ! আপনি আমার লাইসেন্স হাতে নিয়ে আবার নাম জিজ্ঞাসা করছেন? ওখানে নাম নেই?
— ওই মিয়া! মস্কারা করো!
— আপনার কি মনেহয় আমি ঝড়ের মধ্যে বিনোদন দিতে বের হয়েছি? চেহারা দেখতে কি আমার জোকার মনেহচ্ছে ? লাইসেন্সে ফটো নেই?
— বেশি বাড়াবাড়ি করছেন মিয়া! গাড়ি জব্দ করলে কিন্তু পার পাবেননা!
— দেখুন আমার তাড়া আছে! আপনার সাথে তর্ক করার টাইম নেই! সরি!

২০.

— সবাই কেমন আছে?
— সবাই আবার কে? আপনি ক্লিয়ারলি চাচ্চুর কথা বলতে লজ্জা পাচ্ছেন মিস? চাচ্চু জানেন বিয়েও করেনি। বলেছে আমার চাচী আছে। তাই সে বিয়ে করবেনা। কিন্তু আমি না সব জানি মিস!! আপনি যে আমার চাচী সেটাও জানি!! কিভাবে জানি ওটা টপ সিক্রেট!! বলবো না।

ফাইজা হো হো করে হাসতে শুরু করলো। মেয়েটা বকবক করতে পারে খুব। কথাবার্তাও বেশ চটাং চটাং। ফাইজা আমার ছোটবেলার ডুপ্লিকেট ! ব্যাপারটা ভেবে আড়ালে হাসলাম! হঠাৎ দরজার দিকে কোন্ মনে তাকালাম জানিনা না, চোখ পড়তেই শক্ত হয়ে গেছি মূহুর্তের মধ্যে ! পায়ের নিচ থেকে ধীরেধীরে বুঝি মাটি সরে যাচ্ছে! সমস্ত শরীর দারুন দাপুটে শিরশিরিয়ে উঠছে। তীব্র উৎকন্ঠায় আমি বিবেকহীন হয়ে ঝটকায় দাড়িয়ে পড়ি। বিছানায় বসা ফাইজা আমার হাত ঝাকিয়ে অগণিত প্রশ্ন করছে। মিস কি হলো, আপনি দাড়ালেন কেন, কে ওখানে। একটা জবাবও দিতে পারছিনা একদৃষ্টিতে স্থির হয়ে গেছি। অস্বাভাবিক হারে ধুকপুকের কারনে শিরা উপশিরায় রক্তের স্রোত উচ্চাঙ্গে টগবগ করছে। আমি পিছাচ্ছি, শুধু পিছাচ্ছি…
সুন্দর দেহের উপর কালো কুচকুচে শার্ট। শার্টের উপর নেভিব্লু হুডির অর্ধচেইন লাগানো জ্যাকেট, পায়ে পালিশ করা নতুনত্বের চকচকে সুজ। সেই সুপরিচিত চিরচেনা মনোমুগ্ধকর সিক্ত মুখ। একহাতে ভেজা চুল ঝেড়ে জ্যাকেট ঝাট দিচ্ছে সমান তালে। পায়ের জুতো না খুলে ভেতরে প্রবেশ করলে ধক করে ওঠে বুকে। উনার দৃষ্টিতে শুধু আমি আবদ্ধ। আশেপাশে কি আছে, কে আছে, ধ্যান দেয়নি একবারো। শরীর থেকে পানি চুয়ে পড়ছে। টপটপ করে ফ্লোর ভাসাচ্ছে মুগ্ধ। বর্ষনের এমন ভয়ঙ্কর কালোমেঘের দিনে উনি আমার সামনে দাড়িয়ে আছেপ বিশ্বাস করতেও কলিজা চুপসে যাচ্ছে আমার। চোখের পলক ফেলার শক্তিটুকু হারিয়ে ফেলেছি আমি। উনি আগের চেয়ে আরো বেহিসেবী লেভেলে মারাত্মক সুন্দরের তকমায় লেপ্টে গেছেন। এতো সুন্দর হয়ে গেছেন যেটা আগে কখনো অভিভূত হয়ে নজরে পড়েনি আমার। উনার সামনে দাড়ালেও আমাকে রাস্তার ফালতু ভিখিরির মতো দেখাবে। নিন্দা, টিটকারি, তামাশা করবে। মুগ্ধ চুল ঝাড়তেই বলে উঠলো,

— আম্মাজান প্রাইভেট টক আছে! প্লিজ বাইরে যান!
ফাইজা চট করে দুহাত মেলে মুগ্ধের রাস্তা আটকে বললো,

— নো চিটিং! বেরিয়ে যাও চাচ্চু! গেম মোতাবেক আমি জিতেছি! আমি সর্বপ্রথম মিসকে খুজে পেয়েছি! তুমি লেট! নাও লিভ মি এলোন!
— আম্মাজান প্লিজ না? আপনার মিসের সাথে কাজটা খুবই জরুরী। আপনি তো কাজটা জানেন?
— চাচ্চু তুমি হেরে গেছো! আমি কোনো সাফাই চাইনা! সো গেট আউট! কালকে তোমার টাইম!
— আম্মাজান প্লিজ! ও আম্মাজান?? হাম্বেল রিকুয়েস্ট প্লিজ শুনুন না !
— নো!
— লক্ষী পক্ষী সোনা আম্মাজান!
— নো মিন্স নো!
— ও আম্মাজান, আমার কলিজার টুকরা প্লিজ। কাল থেকে পাক্কা আপনার সব কথা শুনবো! স্ট্রং প্রমিস!
মুগ্ধের আকুতি মিনতি দেখে ফাইজা রাস্তা ছেড়ে দিয়ে মুখ ফুলিয়ে চলে যায়। উনি আমার দিকে স্থির দৃষ্টি ছুড়ে হঠাৎ বলে উঠেন,
— দাড়ান আম্মাজান! দরজাটা লাগিয়ে দিয়েন একটু।
মুগ্ধ বাঁকা হেসে কাছে আসছেন। ফাইজা দরজা লাগিয়ে চলে গেল। কথায়, কাজে, আচরনে বেশ আজ মুগ্ধ বেশ অন্যরকম। উনি নেশাগ্রস্ত পায়ে এগিয়ে আসলে আমি ভয়ে চাপতে চাপতে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে অপ্রস্তুত হয়ে চমকে উঠি। সর্বনাশ! পেছনে দেয়াল এখন পালাবো কোথায়? হঠাৎ আমাকে ভয়ের উচ্চশিখরে পৌছে দিয়ে উনি জ্যাকেটের চেইনটা একটানে খুলে ফেললেন। কি করবেন উনি? জ্যাকেটটা খুলে ছুড়ে ফেললেন বিছানায়। মোহনীয় দৃষ্টিতে ছোট ছোট চোখ করে তাকিয়ে আছেন উনি। শার্টের হাতার দুটো বোতাম খুলে পেচিয়ে মুড়িয়ে কনুইতে ভাঁজ করলেন। আমি ঢোকের পর ঢোক গিলে গা চুবিয়ে ঘামছি। মাথা শূন্য ফাকা বাসা হয়ে গেছে হঠাৎ এরকম করতে দেখে! কোমর থেকে একটানে বেল্ট খুলে ফ্লোরে ফেললেন মুগ্ধ। ধপ করে দেয়ালে দুই হাত লাগিয়ে আমায় মাঝখানে বন্দী করলেন। আমার মুখের উপর গরম নিশ্বাস পড়ছে উনার। নিশ্বাসের উষ্ণতায় চোখ খিচে আমি দাঁত কিড়মিড় করছি। তাকানোর জো পাচ্ছিনা একদমই। হঠাৎ আমার কানে তপ্ত ভারী নিশ্বাসের সাথে উষ্ণ ছোঁয়া অনুভব করলাম। ফিসফিসানি আওয়াজে কানে এলো,
— আই লাভ ইউ।
আমি চোখ খুলে কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম,
— ককি..

উনি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কোমরে একহাত চেপে একটানে বুকে মেশালেন। আমি হকচকিয়ে কেঁপে উঠি। ভয়ার্ত গলায় বলি,
— আআপনি এএসব কি করছেন? ছাড়ুন আমায়!
উনি নেশাভরা কন্ঠে বলে উঠলেন,
— ছাড়ার জন্য আমেরিকা থেকে এসেছি? মাথা নষ্ট ভাবছো?
— কিকি ববলতে চাইছেন আপপনি?
— বলতে না করতে এসেছি।
উনি গালে নাক ঘষতেই বলে উঠলেন,
— শাড়ি পড়ছো কবে থেকে? উফ! দিনদিন কি হটনেস বাড়ছে তোমার?
— অসভ্যের মতো কথা বলবেন না! ছাড়ুন!

উনি আমার মুখ থেকে ‘অসভ্য’ ওয়ার্ড শুনে আরো কঠিন করে চেপে ধরলেন। আমি ছাড়ানোর জন্য বৃথা চেষ্টায় ছুটাছুটি করছি। সহ্য হচ্ছেনা উনাকে! কেন এসেছেন উনি? আসার কি দরকার ছিলো? আমাকে নিজের জীবন থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে আবার কেনো এসেছেন? উনি চুলের খোপায় হাত ডুবিয়ে চোখবন্ধ করে ঠোঁট কপালে ছোঁয়ালেন। নরম কন্ঠে মাথায় হাত বুলিয়ে বলে উঠলেন,

— প্লিজ আমার সাথে এমন করো না। আমি খুব খারাপ ভাবে ভেঙ্গে পড়েছি। পাচঁটা বছরে কি কি করে নিজেকে সামলিয়েছি আমি তোমায় বলে বুঝাতে পারবো না। আমি মুগ্ধ কখনো ভেঙ্গে সন্দিহান হয়ে যাবো কখনো ভাবতে পারিনি। তোমার বাবার ওয়াদা ভাঙ্গতে খুব কষ্ট লাগতো, তোমার কাছে ফিরতেই পারতাম না। আমাকে প্লিজ তাড়িয়ে দিওনা। আমি তোমার কাছে নত হয়ে ফিরেছি, ভিখারির মতো নিঃশেষ হয়ে ফিরেছি। আমাকে ফিরিয়ে দিও না। তুমি ফিরিয়ে দিলে কার কাছে যাবো?কে আছে আমার তুমি ছাড়া?একটু কাছে নাও?

আমাকে আষ্টেপৃষ্টে বুকে মিশিয়ে ধরলেন উনি। কাধের কাছে মুখ ডুবিয়ে দিয়েছেন। আমি ধরিনি। অশ্রুফোঁটা থুতনি গড়িয়ে উনার শার্টের উপর কাধে পড়ছে। উনি হাতের বাধন ঢিলে করে হাত আনলেন আমার গালের উপর। ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে উনি অঝোরে কাঁদছেন। চোখের পানি আমার মুখের উপর পড়ছে। কিছুক্ষণ পর উনি ছেড়ে দিয়ে অন্যদিকে মুখ লুকান। পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখে ডলছেন। আমি দাঁতে ঠোঁট চেপে আচঁলে চোখের কোণা মুছে চলছি। হঠাৎ আমার মনেহলো কেউ আমার পায়ের কাছে বসেছে। পায়ের কাছটায় ভারী ভারী ঠেকছে। চোখ মুছার হাত থামিয়েগে আমি ভ্রু কুচকে নিচে তাকাই। দেখি মুগ্ধ আমার পায়ের কাছে হাটুগুজে বসে আছেন। আমার মাথায় বাজ পড়লো দৃশ্যটা দেখে!দুমড়ে মুচড়ে আসছে ভেতরের পাজরে। আমি তড়িঘড়ি করে ফ্লোরে নুয়ে বসি।

— উঠুন মুগ্ধ! কি করছেন! ছিঃ আমার পাপ হবে মুগ্ধ প্লিজ!! আমার পা ধরবেন না উঠুন!! আমি আপনাকে..
উনি কান্না সিক্ত কন্ঠে বলে উঠলেন,
— আমাকে..আমাকে মাফ.. মাফ করে দাও..
হুহু করে বাধভাঙ্গা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছি আমি। আমার সামনে উনিও মাথা নুইয়ে কাঁদছেন। পা ধরে মাফ পাওয়াটা আমার জন্য কষ্টদায়ক! আমার পা ধরে মাফ চাবে, সেই দৃশ্য দেখে দেখে উপভোগ করে আমি শান্তি পেতে চাইনা। আমি যতোই বলি উনাকে চাইনা, সহ্য করিনা, ভালোবাসিনা। কিন্তু দিনশেষে উনাকে ছাড়া আমি একমূহূর্তও চিন্তা করতে পারিনা। আমার অস্তিত্বের সাথে মিলেমিশে যাওয়া ব্যক্তিটির অসহনীয় কান্না, যন্ত্রনা, দুর্দশা আমি নিতে পারিনা।

মুগ্ধ আমায় বুকে জড়িয়ে ধরেছেন। থেমে থেমে উনিও কাঁদছেন। কিছুক্ষণ পর পর শক্ত করে চেপে ধরেন বুকে, কখনো ঠোঁট ছোঁয়াতে থাকেন আলতো করে। আমি ঠিকমতো নিশ্বাস নিতে পারছিনা উনার চেপে ধরাতে। কিন্তু অনুভব করছি উনার অস্থিতি হৃৎযন্ত্র হুল্কোর মতো লাফাচ্ছে। বামপাশটায় হাত রাখলাম। উনি আরেকদফায় মাথায় ঠোঁট বুলালেন। নিরবতার প্রহর কাটিয়ে বদ্ধ চোখে বললেন,
আমার প্রাপ্তিতে, সমাপ্তিতে, প্রতিটি অনুভূতিতে শুধু তুমি। ভালোবাসি তোমাকে পাকনি। মনের উজান জুড়ে অজস্র প্রহরে আমি ভালোবাসি

২১.
দরজার ওপাশে পিঠ লাগিয়ে ফ্লোরে বসে কাদঁছে ফাইজা। চোখে বিশাল বিশাল নোনাজলের সমুদ্র। ফাইজা নিজেকে দোষী ভাবে মুগ্ধের কান্নার জন্য। ওর চাচ্চুর মতো ভালো মানুষটার সাথে খারাপ হয়েছে জীবনে। নিজের বাবা যেখানে দ্বিতীয় বৈবাহিক জীবন পেয়ে অবুঝ ফাইজাকে ভুলে গিয়েছে, তখন চাচ্চু এসে নরম হাতদুটো ধরে কোলেপিঠে মানুষ করে। ফাইজার ছোট্ট মনটা মনেমনে বললো, ভালো মানুষরা খারাপ! আর খারাপ মানুষরা শান্তিতে থাকে কেন? ভালো মানুষ কত দুঃখ পায়, কষ্ট করে। তার এককোনা কেন খারাপ মানুষগুলা পায়না? আমার চাচ্চু খুব কষ্ট পেয়েছে আল্লাহ্। আমার চাচ্চুকে তুমি কষ্ট দিও না। আমার আব্বু তো আমায় স্মরন করলো না। তবুও আব্বুকে কষ্ট দিও না। আমি কারোর জন্য খারাপ দোয়া করিনা। শুধু চাই, ফাইজার জন্য কষ্ট পাওয়া মানুষগুলোকে সুখী করে দিও আল্লাহ্। আব্বু ভালো থাকুক আব্বুর জন্য খারাপ দোয়া করতে পারিনা। আমি আব্বুকে মিস করি। না চাইলেও আব্বুকে মিস করি। আব্বু আমাকে চায় না। প্লিজ আল্লাহ্ আমার কারনে আব্বুকে কষ্ট দিওনা। আমার জন্য আব্বুকে দুঃখ দিও না। আমার মতো অনাথের কথা তুমি পূরন করে দিও। আমার জীবন থেকে সব সুখশান্তি, হাসিখুশি নিয়ে উনাদের সবাইকে দিয়ে দিও…

-‘সমাপ্ত’

ফাবিয়াহ্ মম

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।